📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজ সেনাবাহিনী

📄 ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজ সেনাবাহিনী


ফ্রেঞ্চ ও ইংলিশ সেনাবাহিনী সিসিলিতে মিলিত হয়। উভয় দলের মতানৈক্যের কারণে তারা সেখানে দীর্ঘসময় অবস্থান করে। এদিকে অ্যাকরে অবস্থানরত ক্রুসেডাররা তাদের অপেক্ষায় থাকে। অবশেষে ক্রুসেডাররা সিসিলি ছেড়ে অ্যাকরের দিকে যাত্রা করে। দশ দিনের ব্যবধানে ইংরেজরাও রওনা দেয়। অ্যাকরের ক্রুসেডাররা ফ্রেঞ্চদের আগমনে বেশ আনন্দিত হয়।

ইংরেজ রাজা রিচার্ডের বাহিনী ঝড়ের কবলে পড়ে বাইজেন্টাইন সম্রাটের নিয়ন্ত্রণাধীন সাইপ্রাসে গিয়ে পড়ে। রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট বাইজেন্টাইনদের সাথে লড়াই করে সাইপ্রাস দখল করে নেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। সালাহউদ্দীনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া জেরুজালেমের রাজা রিচার্ডের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি অ্যাকরে জাহাজ ভেড়ান।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 মুসলিমদের প্রতিরোধযুদ্ধ

📄 মুসলিমদের প্রতিরোধযুদ্ধ


ইংরেজরা যোগ দেওয়ার পর যে ক্রুসেডারদের শক্তি আরো বৃদ্ধি পায়, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শত প্রচেষ্টার পরও সালাহউদ্দীন অ্যাকরের মুসলিমদের উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। অবস্থা বেগতিক হয়ে গেলে অ্যাকরের মুসলিমরা আত্মসমর্পণ করে।

৫৮৭ হিজরি মোতাবেক ১১৯১ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ই জুমাদা আস-সানি শুক্রবার সালাহউদ্দীন তাঁর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শে বসেন। আলোচনার বিষয় ছিলো অবরুদ্ধ মুসলিম জনতা, অ্যাকরে ক্রুসেডের দখলদারিত্ব এবং সেখানকার দূর্গে উড়তে থাকা ক্রুসেডীয় পতাকা। মুসলিমরা ছিলো শঙ্কিত আর ক্রুসেডাররা আনন্দিত। আগের মতোই বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ঘটে অ্যাকরে। সালাহউদ্দীনের সদ্ভাবচণের কথা ভুলে গিয়ে সব চুক্তি ভঙ্গ করে ক্রুসেডাররা দখলকৃত এলাকায় মুসলিমদেরকে নির্যাতন ও হত্যা করতে থাকে। পুলের বর্ণনানুযায়ী, ২৩শে রজব ৫৮৭ হিজরি (১৬ই আগস্ট, ১১৯১ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলিম ও ক্রুসেডার শিবিরের সামনে রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট দুই হাজার সাতশ মুসলিমকে হত্যা করেন।

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, ক্রুসেডারদের নৃশংসতা জানতে আপনারা পুলের বর্ণনা পড়ে দেখুন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অ্যাকরে ষাট হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হয়। অল্প কিছু ধনীকে বাঁচিয়ে রাখা হয় তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্দেশ্যে। যথারীতি এই অঞ্চল বিজয়ের পর ক্রুসেডাররা আমোদ-ফূর্তিতে লিপ্ত হয়ে ওঠে। মিশহুদ উল্লেখ করেন যে, লেভান্তে আসার পর থেকে নিয়ে অ্যাকর বিজয়ের পরই অবশেষে তারা দম ফেলার একটু ফুরসত পায়। শান্ত পরিবেশ, খাবারদাবার আর আশপাশের দ্বীপগুলো থেকে আসা ললনারা তাদেরকে পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।

ক্রুসেডারদের অ্যাকর বিজয়, তাদের বিশাল সেনাবাহিনী ও ক্ষমতা, ইউরোপ থেকে আসা সাহায্য, এশিয়ার ল্যাটিন রাষ্ট্র, অন্যান্য সহযোগী শক্তি সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিলো ক্রুসেডাররা যা হারিয়েছে, সবই তারা পুনরুদ্ধার করে ছাড়বে। কিন্তু ওই একটি শহর জয় করা ছাড়া তারা আর কোনো সাফল্যই পায়নি। কিছু ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সালাহউদ্দীনের সেনাবাহিনী চরম প্রতিরোধ বজায় রাখে।

যেসব কারণে ক্রুসেডারদের অগ্রগতি থমকে দাঁড়িয়েছিলো, তার একটি হলো সিসিলিতে ইংরেজ ও ফ্রেঞ্চদের মধ্যকার মতবিরোধ। এর চেয়েও কঠিন সমস্যা ছিলো জেরুজালেমের ফেরারি রাজা এবং টায়ারের শাসক মারকুইস কনরাড মন্টের মধ্যকার বিরোধ। ইংলিশ রাজার সমর্থন ছিলো জেরুজালেমের রাজার দিকে। অপরদিকে ফ্রেঞ্চ রাজা সমর্থন করেছিলেন টায়ারের শাসককে, যিনি জেরুসালেমের রাজা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন। অ্যাকর বিজয়ের পর পুরনো মতবিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় যে, জেরুজালেমের রাজা আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকবেন, তারপর কনরাড মন্টে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন। এরপর ফ্রেঞ্চ রাজা হঠাৎই ফ্রান্সে ফিরে যান এবং ইংরেজ রাজা অহংকারের বশবর্তী হয়ে তাঁর বর্বরতা চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি সালাহউদ্দীনের দখলকৃত রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। উভয় পক্ষের মাঝে মুহুর্মুহু সংঘর্ষ হয়। এর মাঝে সবচেয়ে স্মরণীয় হলো আরসুফের যুদ্ধ, যেখানে ক্রুসেডাররা মুসলিমদেরকে পরাজিত করে। একে তারা হাত্তিনের প্রতিশোধ বলে মানে।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 যুদ্ধের সমাপ্তি

📄 যুদ্ধের সমাপ্তি


দুই দলের মাঝে যুদ্ধ চলতে থাকে। ক্রুসেডাররা কয়েকবার জেরুজালেমের কাছাকাছি চলে আসে। একবার জেরুজালেমের দুই লীগ দূরত্বে পৌঁছে যায় তারা। কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্রের আশংকায় ইংরেজ রাজা জেরুজালেম অবরোধ করার সাহস পাননি। আর এই যুদ্ধে যারা জেরুজালেমের প্রতিরক্ষায় আছে, তারা আগেরবারের লোকদের চেয়ে আলাদা। দুই পক্ষের যুদ্ধের ফলাফল একরকম অমীমাংসিত হয়ে যায়। ক্রুসেডাররাও জেরুজালেম বা অন্য কোনো শহর দখল করতে পারেনি, সালাহউদ্দীনও ক্রুসেডারদেরকে বিতাড়িত করে উপকূল থেকে সমুদ্রে ঠেলে দিতে পারেননি। উভয় পক্ষই সন্ধি করতে আগ্রহী হয়। কিন্তু সন্ধির শর্ত নিয়ে মতবিরোধ লেগে যায়। অবশেষে ৫৮৮ হিজরি তথা ১१९২ খ্রিষ্টাব্দে শা'বান মাসে রামাল্লায় সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো হলো:

* ক্রুসেডাররা উপকূলেই টায়ার থেকে হাইফা পর্যন্ত অবস্থান করবে।
* খ্রিষ্টানরা কর পরিশোধ ছাড়াই জেরুজালেম ভ্রমণ করতে পারবে।
* চুক্তির মেয়াদ হবে তিন বছর আট মাস।

উপকূলীয় যে এলাকায় ফ্র্যাংকরা অবস্থান করছিলো, তাকে পূর্ববর্তী জেরুসালেম রাজ্যের বর্ধিত অংশ বলে বিবেচনা করা হতো। নব্য জেরুজালেম রাজ্যের রাজধানী হয় অ্যাকর। চুক্তি সই করে তৃতীয় ক্রুসেডের সবচেয়ে বিখ্যাত চরিত্র রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট দেশে ফিরে যান।

এভাবে অসংখ্য প্রাণহানি, শহর ধ্বংস, জার্মান সাম্রাজ্যের ভরাডুবি, এবং ইংলিশ ও ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্যের অসংখ্য সৈন্য হারানোর মাধ্যমে পাঁচ বছর পর তৃতীয় ক্রুসেডের অবসান ঘটে। ফ্র্যাংকরা অ্যাকর দখল করা ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারেনি। প্রাপ্তি ও হারানোর বিচারে এ যুদ্ধে পরাজিত হয় ইউরোপীয় পক্ষ। পক্ষান্তরে সালাহউদ্দীনের আগমনের আগে যে মুসলিমদের হাতে কিছুই ছিলো না, হাত্তিনের যুদ্ধ ও রামাল্লা চুক্তির মাধ্যমে তাদের অধীনে এখন টায়ার ও অ্যাকরের মধ্যকার সরু উপকূলবর্তী এলাকা ছাড়া পুরো ফিলিস্তিন চলে আসে।

এভাবেই সালাহউদ্দীন হয়ে থাকেন ইতিহাসের স্মরণীয়তম চরিত্রগুলোর একটি। তিনি রাজাদেরকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করান, ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করেন, জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন, ইসলামের গৌরব ফিরিয়ে আনেন, আর এমন এক রাজ্য গড়ে তোলেন যার পরিধি ছিলো উত্তর ইরাক (কুর্দিস্তান), লেভান্তের অধিকাংশ, শাম, মিশর, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, এবং বারকাহ। আর এ সবই ঘটে মাত্র অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00