📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 অ্যাকর অবরোধ ও তৃতীয় ক্রুসেড

📄 অ্যাকর অবরোধ ও তৃতীয় ক্রুসেড


আগেই বলা হয়েছে যে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম ও অ্যাকর ছেড়ে মুসলিম সেনাদের তত্ত্বাবধানে লেবাননের টায়ারে চলে যায়। ক্রুসেডাররা শান্তিচুক্তি করেও পরে তা ভঙ্গ করে। তারা টায়ারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সালাহউদ্দীনের সাথে করা সমঝোতা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউরোপ থেকে আসা মিত্রবাহিনী ও রসদের উপর নির্ভর করে তারা অ্যাকর অবরোধ করে। উভয় পক্ষের অভূতপূর্ব সাহসিকতা ও দৃঢ়তার কারণে দুই বছর স্থায়ী এই অবরোধ ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

৭ই রজব ৫৮৫ হিজরি মোতাবেক ১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডাররা অ্যাকরের দিকে অগ্রসর হয় এবং স্থল ও জলপথে একে অবরোধ দিয়ে রাখে। মুসলিম সেনাবাহিনী পরে এসে ক্রুসেডারদের উপর স্থলপথে অবরোধ বসায়। তাল কিসান নামক এক পাহাড়ে সালাহউদ্দীন শিবির স্থাপন করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে দাঙ্গা ও সম্মুখযুদ্ধ লেগে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হতে থাকে। সালাহউদ্দীন কিছু সৈনিককে তাঁর রাজ্যের সীমান্তে পাঠিয়ে জনগণকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এদিকে জেরুজালেম হাতছাড়া হওয়ার খবরে হতাশ ইউরোপ ক্রুসেডারদের জন্য নতুন উদ্যমে রসদ পাঠায়।

ক্রুসেডাররা অ্যাকর অবরোধ করে রাখার সময় ইউরোপ তৃতীয় ক্রুসেডের প্রস্তুতি নেয়। বিশেষত একের পর এক পরাজয় তাদেরকে অস্থির করে তুলেছিলো। তৃতীয় ক্রুসেডে নেতৃত্বদাতা রাজাদের কারণে এই যুদ্ধ আলাদা গুরুত্ব লাভ করে। তাঁরা হলেন জার্মান সম্রাট ফ্রেডেরিক বারবারোসা, ফ্রেঞ্চ রাজা ফিলিপ অগাস্টাস এবং ইংলিশ রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 জার্মান প্রচেষ্টা

📄 জার্মান প্রচেষ্টা


জার্মান সম্রাট এবং তাঁর এক লক্ষ সেনা হাঙ্গেরি হয়ে কন্সটান্টিনোপলের দিকে যাত্রা করে। বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় আইজ্যাক প্রবল ভীত হয়ে পড়েন এবং তাঁদেরকে সাহায্য করতে ও পথ দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। দ্বিতীয় আইজ্যাক সালাহউদ্দীনকে জার্মানদের অগসর হওয়ার কথা জানিয়ে দেন এবং তাদেরকে সাহায্য করতে নিজের অস্বীকৃতির কথা জানান। জার্মান বাহিনী এশিয়া মাইনর দিয়ে পার হয়। আর্মেনিয়া পর্বতমালায় অবস্থানকালে সালিফ নদীতে ডুবে সম্রাটের মৃত্যু হয়। ফলে জার্মান বাহিনী ছন্নছাড়া হয়ে যায়। কেউ জার্মানিতে ফিরে যায় আর কেউ সম্রাটের ছেলে ফ্রেডেরিকের নেতৃত্বে জাহাজে করে অ্যাকর ও টায়ারে আসে। পথিমধ্যে ফ্রেডেরিকের মৃত্যু হলেও অল্প কিছু জার্মান সেনা অ্যাকরে পৌঁছায়। পূর্ণশক্তি নিয়ে তারা আসতে পারলে লড়াই ভীষণ জমে উঠতো।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজ সেনাবাহিনী

📄 ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজ সেনাবাহিনী


ফ্রেঞ্চ ও ইংলিশ সেনাবাহিনী সিসিলিতে মিলিত হয়। উভয় দলের মতানৈক্যের কারণে তারা সেখানে দীর্ঘসময় অবস্থান করে। এদিকে অ্যাকরে অবস্থানরত ক্রুসেডাররা তাদের অপেক্ষায় থাকে। অবশেষে ক্রুসেডাররা সিসিলি ছেড়ে অ্যাকরের দিকে যাত্রা করে। দশ দিনের ব্যবধানে ইংরেজরাও রওনা দেয়। অ্যাকরের ক্রুসেডাররা ফ্রেঞ্চদের আগমনে বেশ আনন্দিত হয়।

ইংরেজ রাজা রিচার্ডের বাহিনী ঝড়ের কবলে পড়ে বাইজেন্টাইন সম্রাটের নিয়ন্ত্রণাধীন সাইপ্রাসে গিয়ে পড়ে। রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট বাইজেন্টাইনদের সাথে লড়াই করে সাইপ্রাস দখল করে নেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। সালাহউদ্দীনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া জেরুজালেমের রাজা রিচার্ডের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি অ্যাকরে জাহাজ ভেড়ান।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 মুসলিমদের প্রতিরোধযুদ্ধ

📄 মুসলিমদের প্রতিরোধযুদ্ধ


ইংরেজরা যোগ দেওয়ার পর যে ক্রুসেডারদের শক্তি আরো বৃদ্ধি পায়, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শত প্রচেষ্টার পরও সালাহউদ্দীন অ্যাকরের মুসলিমদের উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। অবস্থা বেগতিক হয়ে গেলে অ্যাকরের মুসলিমরা আত্মসমর্পণ করে।

৫৮৭ হিজরি মোতাবেক ১১৯১ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ই জুমাদা আস-সানি শুক্রবার সালাহউদ্দীন তাঁর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শে বসেন। আলোচনার বিষয় ছিলো অবরুদ্ধ মুসলিম জনতা, অ্যাকরে ক্রুসেডের দখলদারিত্ব এবং সেখানকার দূর্গে উড়তে থাকা ক্রুসেডীয় পতাকা। মুসলিমরা ছিলো শঙ্কিত আর ক্রুসেডাররা আনন্দিত। আগের মতোই বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ঘটে অ্যাকরে। সালাহউদ্দীনের সদ্ভাবচণের কথা ভুলে গিয়ে সব চুক্তি ভঙ্গ করে ক্রুসেডাররা দখলকৃত এলাকায় মুসলিমদেরকে নির্যাতন ও হত্যা করতে থাকে। পুলের বর্ণনানুযায়ী, ২৩শে রজব ৫৮৭ হিজরি (১৬ই আগস্ট, ১১৯১ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলিম ও ক্রুসেডার শিবিরের সামনে রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট দুই হাজার সাতশ মুসলিমকে হত্যা করেন।

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, ক্রুসেডারদের নৃশংসতা জানতে আপনারা পুলের বর্ণনা পড়ে দেখুন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অ্যাকরে ষাট হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হয়। অল্প কিছু ধনীকে বাঁচিয়ে রাখা হয় তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্দেশ্যে। যথারীতি এই অঞ্চল বিজয়ের পর ক্রুসেডাররা আমোদ-ফূর্তিতে লিপ্ত হয়ে ওঠে। মিশহুদ উল্লেখ করেন যে, লেভান্তে আসার পর থেকে নিয়ে অ্যাকর বিজয়ের পরই অবশেষে তারা দম ফেলার একটু ফুরসত পায়। শান্ত পরিবেশ, খাবারদাবার আর আশপাশের দ্বীপগুলো থেকে আসা ললনারা তাদেরকে পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।

ক্রুসেডারদের অ্যাকর বিজয়, তাদের বিশাল সেনাবাহিনী ও ক্ষমতা, ইউরোপ থেকে আসা সাহায্য, এশিয়ার ল্যাটিন রাষ্ট্র, অন্যান্য সহযোগী শক্তি সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিলো ক্রুসেডাররা যা হারিয়েছে, সবই তারা পুনরুদ্ধার করে ছাড়বে। কিন্তু ওই একটি শহর জয় করা ছাড়া তারা আর কোনো সাফল্যই পায়নি। কিছু ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সালাহউদ্দীনের সেনাবাহিনী চরম প্রতিরোধ বজায় রাখে।

যেসব কারণে ক্রুসেডারদের অগ্রগতি থমকে দাঁড়িয়েছিলো, তার একটি হলো সিসিলিতে ইংরেজ ও ফ্রেঞ্চদের মধ্যকার মতবিরোধ। এর চেয়েও কঠিন সমস্যা ছিলো জেরুজালেমের ফেরারি রাজা এবং টায়ারের শাসক মারকুইস কনরাড মন্টের মধ্যকার বিরোধ। ইংলিশ রাজার সমর্থন ছিলো জেরুজালেমের রাজার দিকে। অপরদিকে ফ্রেঞ্চ রাজা সমর্থন করেছিলেন টায়ারের শাসককে, যিনি জেরুসালেমের রাজা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন। অ্যাকর বিজয়ের পর পুরনো মতবিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় যে, জেরুজালেমের রাজা আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকবেন, তারপর কনরাড মন্টে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন। এরপর ফ্রেঞ্চ রাজা হঠাৎই ফ্রান্সে ফিরে যান এবং ইংরেজ রাজা অহংকারের বশবর্তী হয়ে তাঁর বর্বরতা চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি সালাহউদ্দীনের দখলকৃত রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। উভয় পক্ষের মাঝে মুহুর্মুহু সংঘর্ষ হয়। এর মাঝে সবচেয়ে স্মরণীয় হলো আরসুফের যুদ্ধ, যেখানে ক্রুসেডাররা মুসলিমদেরকে পরাজিত করে। একে তারা হাত্তিনের প্রতিশোধ বলে মানে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00