📄 হাত্তিনের যুদ্ধ ও জেরুজালেম বিজয়
রেজিনাল্ডের ঘৃণ্য আক্রমণের পর সালাহউদ্দীন তাঁর সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন দিকে অভিযানে পাঠাতে থাকেন যাতে ফ্র্যাংকদেরকে উচিত শিক্ষা দেওয়া যায় এবং জেরুজালেমকে মুক্ত করা যায়। জেরুজালেমই তো সেই স্থান যেখান থেকে মুহাম্মাদ মি'রাজে গমন করেন এবং যা নবীগণের জন্মস্থান।
সেসময় কেরাকের রাজা হাজ্জ ফেরত মুসলিমদের আক্রমণ করার জন্য এক সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। সালাহউদ্দীন হাজীদের প্রতিরক্ষায় জিহাদের ডাক দেন। তিনি বসরার কাছে কাসরুস সালামাহ-তে শিবির করেন এবং হাজীরা নিরাপদে ফিরে আসা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। হাজীগণ সালাহউদ্দীনের বিজয়ের জন্য দু'আ করেন এবং চুক্তি ভাঙতে ওস্তাদ কাফিরগুলোর জন্য বদদু'আ করেন। ফ্র্যাংকরা ঘৃণা ও শত্রুতায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো যা তাদের অন্তরগুলোকে শক্ত করে দিয়েছিলো। অথচ এগুলোর ফলাফল উল্টো তাদেরকেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিলো।
সেনা প্রস্তুত করার পর সালাহউদ্দীন তাঁর উপদেষ্টাদের সাথে যুদ্ধের উপযুক্ত সময়ের ব্যাপারে মাশোয়ারা করেন। ৫৮৩ হিজরি সনের ১৭ই রবি'উস সানি জুমু'আর পরের সময়কে নির্ধারণ করা হয়। সময় হলো তাকবির দেওয়ার এবং বিজয়ের জন্য দু'আ করার।
সালাহউদ্দীন দামেস্ক ত্যাগ করে রা'স আল-মা' অঞ্চলের দিকে রওনা দেন। এই জায়গাটি সৈন্য জড়ো করার জন্য ব্যবহৃত হতো। তাঁর ছেলে আল-মালিক আল-আফদাল রা'স আল-মা'তে থাকেন এবং তিনি নিজে যান বসরায় আর মুযাফফারুদ্দীন কুবরি যান অ্যাকরে। বসরা থেকে সালাহউদ্দীন কেরাক এবং আশ-শুবকের দিকে যাত্রা করেন। তারপর তিনি টাইবেরিয়াসে ফিরে আসেন। মুসলিম সৈনিকদের জিহাদী চেতনাকে উজ্জীবিত রাখতে সালাহউদ্দীন চেষ্টার কোনো কমতি রাখেননি। তিনি সবসময় উম্মাহর চিন্তায় ব্যথিত থাকতেন। খুব কম খেতেন। তাঁকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, “জেরুজালেম ক্রুসেডারদের হাতে বন্দী। এ অবস্থায় আমি কী করে আমোদ প্রমোদ আর উদরপূর্তি করতে পারি?” ক্রুসেডের সময়ে তাঁর অবস্থা বর্ণনা করে তাঁর সঙ্গী আল-কাযী বাহাউদ্দীন ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
“জেরুজালেমের দখল এতই গুরুতর বিষয় ছিলো যে, পাহাড়ও তার ভার বইতে অক্ষম তাঁকে (সালাহউদ্দীন) মনে হচ্ছিলো এমন এক মা, যার কাছ থেকে তার সন্তানকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে জিহাদের বাণী ছড়িয়ে দিতেন আর চিৎকার করতেন, “হায় ইসলাম! হায় ইসলাম!” তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যেতো। তিনি অ্যাকরের লোকদের দুর্দশা যতই দেখতেন, ততই আরো জিহাদের ডাক দিতেন। তিনি ডাক্তারদের দেওয়া ঔষধ ছাড়া আর তেমন কোনো খাবারই খেতেন না। ডাক্তাররা আমাকে জানালেন যে, তিনি জুমু'আর দিন থেকে রবিবার পর্যন্ত বলতে গেলে কিছুই খাননি। কারণ সেসময় তিনি যুদ্ধ নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিলেন।”
ক্রুসেডাররা যখন সালাহউদ্দীনের বিশাল কর্মযজ্ঞের খবর পেলো, তখন তারা প্রস্তুতি নিয়ে টাইবেরিয়াসের দিকে অগ্রসর হলো। হাত্তিন নামক একটি জায়গায় উভয় পক্ষের সংঘর্ষ হয়। সকালের সূর্য ছিলো আগুনের মতো গরম। মুসলিমরা ক্রুসেডারদেরকে তৃষ্ণায় কাতর করে ফেলার উদ্দেশ্যে পানির উৎসগুলো দখল করে ফেলেন। বীর সালাহউদ্দীন এই সুযোগে তাদের আক্রমণ করে ছত্রভঙ্গ করে দেন। ভীত, তৃষ্ণার্ত ক্রুসেডার সেনারা হাত্তিনের কিনারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ যুদ্ধের ফলাফল ছিলো সালাহউদ্দীনের জন্য এক গৌরবময় বিজয় আর ক্রুসেডারদের জন্য লাঞ্ছনাকর পরাজয়। তাদের কেউই পালাতে পারেনি। তাদের দশ হাজার জন মারা যায় আর প্রচুর সংখ্যক সালাহউদ্দীনের সেনাদের হাতে বন্দী হয়। তিনি অ্যাকরের বিশপকে হত্যা করে তাঁর ক্রুশ ছিনিয়ে নেন। এত লাঞ্ছনাকর পরাজয় তারা এর আগে কখনো ভোগ করেনি।
মুসলিমরা অগ্রসর হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেন। ক্রুসেডারদের মধ্যে বাকি ছিলো কেবল জেরুজালেমের রাজা এবং দেড়শ মতো ঘোড়সওয়ার। তৃষ্ণা, ভয় আর ক্লান্তির আতিশয্যে তাদের কেউই লড়াই করার মতো অবস্থায় ছিলো না। রাজাসহ সব ঘোড়সওয়ারকে বন্দী করা হয়। যুদ্ধের মূল উস্কানিদাতা রেজিনাল্ডও বন্দী হয়। সুলতান সালাহউদ্দীন এক তাঁবুতে বিজ্ঞ উপদেষ্টাদের সাথে সলা- পরামর্শ করেন। বিজয়ের শোকরানা স্বরূপ তাঁরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন।
তারপর রাজা গায় অব লুসিগ্নান ও কেরাক সম্রাট রেজিনাল্ডকে সালাহউদ্দীনের তাঁবুতে আনা হয়। সালাহউদ্দীন তাঁদের জন্য পানি আনার নির্দেশ দেন। পেয়ালার বেশিরভাগ পানি রাজা একাই সাবাড় করে বাকিটা রেজিনাল্ডকে দেন। সুলতান বললেন, “আমরা তার প্রাণ বাঁচাতে পানি দিইনি।” তিনি রেজিনাল্ডকে মুসলিমদের কাফেলা আক্রমণ ও রাসূলুল্লাহকে গালিগালাজ করার অপরাধে তিরস্কার করেন। পূর্বের শপথ অনুযায়ী তিনি রেজিনাল্ডকে হত্যা করেন। তা দেখে রাজা ভীত হয়ে পড়েন। সালাহউদ্দীন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, “একজন রাজার জন্য অপর রাজাকে হত্যা করা শোভনীয় নয়। কিন্তু এই লোক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো।” রাজা ও তাঁর অনুসারীদেরকে তিনি সসম্মানে দামেস্কে পাঠিয়ে দেন।
এই যুদ্ধে সালাহউদ্দীন আর ক্রুসেডারদের মধ্যে একটি এসপার-ওসপার ফায়সালা হয়ে যায়। সুসজ্জিত, সুসংগঠিত, দক্ষ ও সুনিপুণ নেতৃত্বসম্পন্ন মুসলিম বাহিনীর হাতে ফ্র্যাংকদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। সামরিক প্রজ্ঞা খাটিয়ে মুসলিমরা যুদ্ধের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান বেছে নিয়েছিলো।
এই বিজয়ের পর সালাহউদ্দীন অ্যাকর পোতাশ্রয়ের দিকে অগ্রসর হন। ৫৮৩ হিজরিতে সেখানকার সবাই আত্মসমর্পণ করে। ক্রুসেডাররা সে জায়গা ছেড়ে টায়ারে চলে যায়। অ্যাকরের আশেপাশে আরো অনেক শহর-দূর্গ দখল করেন সালাহউদ্দীন। যেমন- তাবনাইন, সিডন, জুবাইল এবং বৈরুত। তারপর তিনি আশকেলনের উপকূল চৌদ্দ দিন অবরোধ করে রাখার পর তারা আত্মসমর্পণ করে। এরপর তিনি জেরুজালেম অবরোধ করে রেখে উপকূল থেকে ক্রুসেডারদের কাছে রসদের সাপ্লাই আটকে দেন। রামাল্লা, আদ-দারুম, বেথেলহেম ও আন-নাতরুন দখল করার পর তিনি জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন।
এ সময় আল-আকসা মাসজিদের পক্ষ থেকে সালাহউদ্দীনকে আহ্বান করে জেরুজালেমের এক বন্দী মুসলিম কবিতা লিখে পাঠান:
হে ক্রুশ ধ্বংসকারী বাদশাহ!
এখনো আঁধারেই আছে জেরুজালেম!
সব মাসজিদ পবিত্র হয়ে গেছে,
শুধু আমিই নাপাক রয়ে গেলেম।
সালাহউদ্দীন আল-আকসার নিরাপত্তা চাইছিলেন। তাই তিনি বলপ্রয়োগ করার চেয়ে সন্ধির মাধ্যমেই জেরুজালেমে প্রবেশ করতে চাইলেন। নতুবা আল-আকসার পবিত্রতা লঙ্ঘন ও ঘরবাড়ি ধ্বংসের আশংকা রয়ে যায়। এভাবে তিনি 'উমার বিন খাত্তাবের (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) জেরুজালেম বিজয়ের পদ্ধতি অনুসরণ করলেন। তিনি দূত মারফত তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানালেন, "আমিও আপনাদের মতো জেরুজালেমের পবিত্রতায় বিশ্বাস করি। আমি এই পবিত্র স্থানটিকে আক্রমণ বা অবরোধ করতে চাই না।” কিন্তু ফ্র্যাংকরা আত্মসমর্পণ না করে গোঁ ধরে বসে রইলো। সালাহউদ্দীন এবার আক্রমণাত্মক অবস্থানে যেতে বাধ্য হলেন। এক সপ্তাহ যাবত অবরোধ করে রাখার পর ফ্র্যাংকরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়। সালাহউদ্দীন তাদেরকে শর্ত দেন যে, চল্লিশ দিনের মধ্যে তাদের সবাইকে এই ভূমি ছেড়ে চলে যেতে হবে। মুক্তিপণ হিসেবে প্রত্যেক পুরুষ দশ দিনার, প্রত্যেক নারী পাঁচ দিনার, আর অপ্রাপ্তবয়স্করা দুই দিনার করে পরিশোধ করবে। যাদের পক্ষ থেকে মুক্তিপণ পরিশোধ করা হবে না, তাদেরকে বন্দী করে রাখা হবে।
সালাহউদ্দীন জেরুসালেম জয় করার পর কবি জুবাইর লিখেন:
জেরুসালেম জয় হয়েছে দুইবারে দুই দিন,
একটি করেন উমার ফারুক, আরেকটি সালাহউদ্দীন।
ক্রুসেডাররা সালাহউদ্দীনের নিযুক্ত লোকদের কাছে মুক্তিপণ পরিশোধ করে ৫৮৩ হিজরি সনের ২৭শে রজব জেরুজালেম সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে চলে যায়। ঐতিহাসিকদের প্রসিদ্ধ মত হলো, এই তারিখেই রাসূলুল্লাহর মি'রাজ সংঘটিত হয়।
আল-কাদি মুহিউদ্দীন ইবনুযযাকি'র লেখা সেই কবিতা যেন অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেলো:
সফর মাসে আপনার তলোয়ারে হালাব বিজয়
যেন রজবে জেরুসালেম বিজয়ের লক্ষণ হয়।
পুনঃমুক্ত জেরুজালেমের মাসজিদুল আকসায় প্রথম জুমু'আর খুতবা দিতে মুহিউদ্দীনকে ডেকে আনেন সালাহউদ্দীন। বিপুল সংখ্যক মুসল্লি ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সহকারে এই জুমু'আয় অংশ নেন। এই খুতবা আর-রাওদাতাইন কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডে লিপিবদ্ধ আছে। এর কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে উল্লেখ করা হলো:
“হে জনগণ! মহান আল্লাহর রহমতে আপনাদের কাছে সুসংবাদ এসে পৌঁছেছে। প্রায় একশ বছর মুশরিকদের নাপাক হাতে থাকার পর এই বহুল আকাঙ্ক্ষিত বস্তুকে (জেরুজালেম) আল্লাহ আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই ঘর (মাসজিদুল আকসা) যেখানে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়, তাকে আপনাদের হাত দিয়ে পাক-পবিত্র করিয়েছেন। তিনি আপনাদেরকে তাওফিক দিয়েছেন শিরকের সব চিহ্ন ও ছবি এখান থেকে মুছে ফেলার। আর তাওহীদের যেই ভিত ও তাকওয়ার খুঁটির উপর এই মাসজিদ নির্মিত হয়েছিলো, তাতে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এই স্থান আপনাদের পিতা ইব্রাহীমের ('আলাইহিসসালাম) বাসভূমি, নবীজী মুহাম্মাদের মি'রাজে আরোহণের স্থান, আপনাদের প্রথম কিবলা, নবী-রাসূলগণের ('আলাইহিমুসসালাম) ঘাঁটি এবং মুত্তাকীগণের গন্তব্য। (পূর্ববর্তী নবীগণের সময়ে) ইসলামের শৈশবে এখানেই হালাল-হারামের বিধান নিয়ে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, এটি সেই স্থান যেখানে কিয়ামাতের দিন মানুষেরা দাঁড়াবে, আর এটি কুর'আনে উল্লেখিত পবিত্র ভূমি। এই সেই মাসজিদ, যেখানে রাসূলুল্লাহ আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণের ইমামতি করেছেন। এই সেই ভূমি যেখানে মারইয়ামের ('আলাইহাসসালাম) গর্ভে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন 'আব্দুল্লাহ, রাসূলুল্লাহ, রূহুল্লাহ 'ঈসাকে ('আলাইহিসসালাম)। (তিনি ইলাহ ছিলেন না), তিনি তো কেবলই আল্লাহর বান্দা।
আল্লাহ বলেন:
“মাসীহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করে না।”
আল্লাহ আরও বলেন:
“অবশ্যই তারা কুফরি করেছে যারা বলে মারইয়ামের ছেলে মাসীহ হলেন আল্লাহ।”
এটি প্রথম কিবলাহ, (মক্কার) মাসজিদুল হারামের পর নির্মিত পৃথিবীর দ্বিতীয় মাসজিদ, এবং মাসজিদুল হারাম ও মাসজিদে নববির পর আল্লাহর কাছে তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মানিত মাসজিদ। মাসজিদুল হারাম ও মাসজিদুন নববি ব্যতীত এটিই একমাত্র মাসজিদ যেখানে সালাত পড়ার উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয।
এটি চুক্তিসমূহ স্বাক্ষরিত হওয়ার স্থান। আল্লাহ যদি আপনাদেরকে অন্যদের উপর নির্বাচিত না করে থাকতেন, তাহলে এই বিরল সম্মানে আপনারা কখনোই ভূষিত হতে পারতেন না। আল্লাহ আপনাদেরকে রহম করেছেন আর আপনাদেরকে দিয়েছেন এমন এক বাহিনী, যা মুহাম্মাদের বদরের বাহিনীর মতো কারামত দেখিয়েছে, আবু বকরের (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) মতো দৃঢ়তা দেখিয়েছে, ‘উমারের (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) মতো জয় করেছে, ‘উসমানের (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বাহিনীর মতো লড়াই করেছে, আর ‘আলীর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) মতো বীরত্ব দেখিয়েছে। আপনারা কাদিসিয়া, ইয়ারমুক ও খাইবারের যুদ্ধগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন, খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) মতো আক্রমণ চালিয়েছেন। আল্লাহ আপনাদের প্রচেষ্টা বরকতময় করুন, আপনাদের রক্তের কুরবানিকে কবুল করুন এবং আপনাদেরকে চির সুখের জান্নাত দিয়ে পুরষ্কৃত করুন। আপনাদেরকে এই নি'য়ামাতের কদর করতে হবে এবং তা পাওয়ার কারণে আল্লাহর কাছে শোকরগুজার হতে হবে।”
টিকাঃ
[২৫] আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং বিজয় অর্জিত হওয়া শুধুমাত্র দু'আ করার মাধ্যমে হয়ে যাবে এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই। আল্লাহর কাছে দু'আ এবং সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা হবে নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিশ্চিত করে ময়দানে সমাবেত হওয়ার পর। সালাহউদ্দীন আমাদের খুলাফায়ে রাশিদা এবং প্রিয় নবীর সুন্নতই অনুসরণ করেছেন। আল্লাহর রাসূল বদর, উহুদ, আহযাব, হুনাইনের যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ, তোমার প্রতিশ্রুত বিজয় পাঠাও। যদি মুসলিমদের এই বাহিনী আজ এখানে পরাজিত হয়ে যায় তবে এই জমিনে তোমার ইবাদাত করার মত যে আর কেউ রইবে না।'
[২৬] সেসময় বিশপরাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে এবং যুদ্ধের উস্কানি দেওয়ার নাটের গুরু হিসেবে কাজ করতো। তারা এটাকে পবিত্র যুদ্ধ বলে প্রচার করতো এবং অনুসারীদেরকে উদ্ভুদ্ধ করতো।- সম্পাদক
[২৮] সূরাহ আন-নিসা ৪:১৭২
[২৯] সূরাহ আল-মা'ইদাহ ৫:১৭
📄 ক্রুসেডারদের সাথে সালাহউদ্দীনের আচরণ
জেরুজালেম ত্যাগ করা ও মুক্তিপণ পরিশোধ করার জন্য সালাহউদ্দীন ক্রুসেডারদেরকে কাগজে-কলমে কঠোর কিছু শর্ত দিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু বাস্তবে সেই যালিম-লুটেরা ক্রুসেডারদের সাথে দয়ালু আচরণ করে ইসলামী সদাচরণের ব্যবহারিক শিক্ষা দিয়ে দিয়েছেন। কোনো যিম্মি (মুসলিম শাসনাধীনের অনুগত অমুসলিম) বা সাধারণ জনগণের উপর অন্যায়ভাবে তলোয়ার চালানোর কোনো ঘটনা পাওয়া যায় না।
সালাহউদ্দীন যখন দেখলেন বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের বৃদ্ধ পিতামাতাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, বিশাল বিশাল মালামাল কষ্ট করে বহন করছে, তাঁর তা সহ্য হয়নি। তিনি তাদের জন্য যাতায়াত খরচ ও সওয়ারির ব্যবস্থা করে দেন।
নারীদের প্রতি সালাহউদ্দীন সম্মানসূচক আচরণ করেন। বাইজেন্টাইন সম্রাটের এক ধনাঢ্য স্ত্রী সেখানে এক আল্লাহর জন্য উপাসনালয় স্থাপন করে সন্ন্যাসজীবন যাপন করতেন। তাঁর প্রচুর অনুসারী ছিলো। সালাহউদ্দীন তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদেরকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেন। রাণী সিবিল তাঁর অনুসারীদের সহ যাত্রা করার অনুমতি চাইলে সালাহউদ্দীন সে ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর স্বামী নাবলুসে কারাবন্দী ছিলেন। সালাহউদ্দীন তাঁকে স্ত্রীর সাথে সঙ্গ দেওয়ার অনুমতি দেন। সন্তান কোলে অসংখ্য নারী রাণীর পেছন পেছন আসে। তারা তাদের কারাবন্দী পুরুষ অভিভাবকদের ব্যাপারে মিনতি করে বলে, “হে সুলতান! আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন আমরা চলে যাচ্ছি। আমরা ওই বন্দীদের কারো মা, কারো স্ত্রী, কারো কন্যা। আমরা এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি আর আমাদের অভিভাবকদের ওই কারাগারের আঁধার প্রকোষ্ঠে ফেলে রেখে যাচ্ছি। আপনি যদি তাদের হত্যা করে ফেলেন, তাহলে তো আমাদের জীবন ধ্বংস হয়ে গেলো। আর আপনি যদি তাদের মুক্তি দিয়ে দেন, তাহলে আমাদেরকে অনুগ্রহ করলেন এবং দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট থেকে উদ্ধার করলেন।”
এ কথায় সালাহউদ্দীন প্রচণ্ড আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি মায়েদের পুত্রদেরকে, স্ত্রীদের স্বামীদেরকে এবং কন্যাদের পিতাদেরকে মুক্ত করে দেন। সেই সাথে বাদ বাকি বন্দীদের সাথে সদাচরণের প্রতিশ্রুতি দেন।
স্টিভেনসনের বর্ণনামতে, সুলতান বিপুল সংখ্যক মানুষকে মুক্তিপণ ছাড়াই যেতে দেন। আর্নল্ডের সূত্রে পুল বর্ণনা করেন যে, বিকলাঙ্গ ও গরীবদেরকে মুক্তিপণ ছাড়াই সুলতান বেরিয়ে যেতে দেন। ধর্মগুরু ও ধনীদেরকে সাধ্যমতো সম্পদ সাথে করে নেওয়ার অনুমতি দেন। তারা যতটুকু বহন করতে পারছিলো না, মুসলিমরা তা বহন করতে সাহায্য করে।
সালাহউদ্দীনের ভাই আল-মালিক আল 'আদিল সাত হাজার বিকলাঙ্গ ও গরীব লোকের পক্ষে মুক্তিপণ মওকুফের সুপারিশ করেন। সালাহউদ্দীন দশ হাজারের জন্য অনুমতি দিয়ে দেন।
হাত্তিনের বিজয়ের পর সালাহউদ্দীন ফ্র্যাংকদের সাথে যে আচরণ করলেন তা তাদের নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষ ও প্রথম ক্রুসেডে মুসলিমদের উপর চালানো তাদের পাশবিকতার সাথে অতুলনীয়।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ মিলের সূত্রে প্রিন্স 'আলী বর্ণনা করেন যে, জেরুজালেম ত্যাগ করে অনেকে আশ্রয়ের সন্ধানে খ্রিষ্টান শাসিত এন্টাকিয়ায় যায়। সেখানকার সম্রাট তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করে তাড়িয়ে দেয়। তারা অবশেষে মুসলিম ভূমিগুলোর দিকে যাত্রা করে এবং মুসলিমরা তাদের অভূতপূর্ব আদর-আপ্যায়ন করে। প্রিন্স 'আলী আরো বলেন:
“জেরুজালেম ত্যাগ করে তাদের খ্রিষ্টান ভাইদের কাছে আশ্রয় চাওয়ার পর তাদের কেমন শোচনীয় অবস্থা হয়, তা জানা যায় মিশহুদের বর্ণনা থেকে। তারা শামে গিয়ে অনাহার ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। ত্রিপোলিও তাদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়। এক নারী অভাবের তাড়নায় তার সন্তানকে সাগরে ছুঁড়ে ফেলতে বাধ্য হয় আর এরকম বিপদের সময় এতটুকু এগিয়ে না আসায় খ্রিষ্টানদেরকে লা'নত দিতে থাকে।”
ধনাঢ্য প্যাট্রিয়ার্ক তাঁর বিপুল সম্পদ ও গাট্টিবোঁচকা নিয়ে কেটে পড়েন, অথচ গরীব ক্রুসেডারদের মুক্তিপণের কোনো ব্যবস্থা করলেন না। পুল তাঁকে একজন কাণ্ডজ্ঞানহীন লোক বলে অভিহিত করেন। সালাহউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, “আপনি তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিতে কাজে লাগালেন না কেন?” তিনি জবাব দেন, “(চুক্তি ভেঙে) তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (বিপুল সম্পদ লুট) করার চেয়ে (চুক্তির শর্তানুযায়ী) দশটি দিনার নেওয়াই আমার বেশি পছন্দের।” এ ব্যাপারে পুলের মূল্যায়ন, “মুসলিম সুলতান খ্রিষ্টান যাজককে সত্যিকারের নৈতিকতা ও সততার সবক দিয়ে ছাড়লেন।"
প্রথম ক্রুসেডে মুসলিম ও ইসলামের সাথে ক্রুসেডারদের আচরণ, গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও রক্তবন্যার বর্ণনা তো পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোতেই আলোচিত। হয়েছে। ৪৯২ হিজরি তথা ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তাদের হাতে চলা এসব নির্মমতার কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। তারা জেরুসালেমে প্রবেশের পর কী ঘটেছে, তা মিশহুদের বর্ণনা থেকে মিলের সূত্রে বর্ণনা করেন প্রিন্স 'আলী:
“মুসলিমদেরকে রাস্তাঘাটে ও ঘরের ভেতর হত্যা করা হয়। কেউ কেউ গণহত্যা থেকে বাঁচার জন্য উঁচু দালানের ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যরা কেল্লা, প্রাসাদ, এমনকি মাসজিদেও লুকিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু খ্রিষ্টানরা খুঁজে খুঁজে তাদেরকে বের করে আনে। পদাতিক ও অশ্বারোহীরা মুসলিমদের লাশের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আশ্রয়সন্ধানী পলাতকদের খুঁজে বেড়ায়।”
মিশহুদের সূত্রে প্রিন্স 'আলী আরো বর্ণনা করেন:
“যেসব মুসলিমদের সম্পদ লুট করার জন্য জীবিত রাখা হয়েছিলো, তাদেরকে পরে হত্যা করা হয়। অন্যদেরকে জীবিত পুড়িয়ে মারা হচ্ছিলো। অনেকে আতংকে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে যায়। অন্যদেরকে লুকানোর জায়গা থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে প্রকাশ্যে অন্যান্য লাশের উপর এনে মারা হয়। যেই স্থানে ঈসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর শত্রুদেরকে ক্ষমা করেছিলেন, তা নারী-শিশুর কান্না ও লাশে ভরপুর হয়ে যায়।”
মিল আরো বলেন, “বিনা অপরাধে নিহতদের প্রতি কোনো দয়া করা হয়নি। সত্তর হাজার নিরীহ লোককে হত্যা করা হয়।”
সালাহউদ্দীনের মতো করে শত্রুদেরকে ক্ষমা ও দয়া কি আর কোনো বিজয়ী বীর করেছে? ক্রুসেডারদের মতো ভয়াল আচরণ কি সালাহউদ্দীনের মধ্যে আছে? আল্লাহ সেই কবিকে রহম করুন যিনি বলেছেন:
জেরুজালেমে আমাদের শাসন ছড়িয়েছে ন্যায়বিচার,
তোমাদের (ক্রুসেডারদের) শাসনে হয়েছে সেথায় হত্যা- বলাৎকার।
তোমরা করেছো বন্দী হত্যা, আমরা করেছি দয়া,
ফারাক বোঝাতে লাগে না কোনো উপমা নয়া।
আটাশি বছরের ব্যবধানে সাধারণ মুসলিমদের প্রতি ক্রুসেডারদের আচরণ আর সাধারণ ক্রুসেডারদের প্রতি মুসলিমদের আচরণ ইতিহাসের শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
টিকাঃ
[৩০] পুরো নাম জোসেফ স্টিভেনসন। সালাহউদ্দীনকে নিয়ে লেখা তার বইয়ের নাম 'De Expugatione Terrae Sanctae per Saladinum: Capture of Jerusalem by Saladin, ১১৮৭'- সম্পাদক
[৩১]. লেন পুল, স্টেনলে লিখিত 'Saladin and the Fall of the Kingdom of Jerusalem' একটি বিখ্যাত বই। সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) সালাহউদ্দীনের জীবনীতে (সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস, ১ম খণ্ড) এই বই থেকে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন। -সম্পাদক
[৩২] পুরো নাম জেমস মিল। তিনি একাধারে ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক ছিলেন। 'The History of British India' মিলের লেখা একটি বিখ্যাত বই। -সম্পাদক
📄 অ্যাকর অবরোধ ও তৃতীয় ক্রুসেড
আগেই বলা হয়েছে যে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম ও অ্যাকর ছেড়ে মুসলিম সেনাদের তত্ত্বাবধানে লেবাননের টায়ারে চলে যায়। ক্রুসেডাররা শান্তিচুক্তি করেও পরে তা ভঙ্গ করে। তারা টায়ারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সালাহউদ্দীনের সাথে করা সমঝোতা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউরোপ থেকে আসা মিত্রবাহিনী ও রসদের উপর নির্ভর করে তারা অ্যাকর অবরোধ করে। উভয় পক্ষের অভূতপূর্ব সাহসিকতা ও দৃঢ়তার কারণে দুই বছর স্থায়ী এই অবরোধ ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
৭ই রজব ৫৮৫ হিজরি মোতাবেক ১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডাররা অ্যাকরের দিকে অগ্রসর হয় এবং স্থল ও জলপথে একে অবরোধ দিয়ে রাখে। মুসলিম সেনাবাহিনী পরে এসে ক্রুসেডারদের উপর স্থলপথে অবরোধ বসায়। তাল কিসান নামক এক পাহাড়ে সালাহউদ্দীন শিবির স্থাপন করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে দাঙ্গা ও সম্মুখযুদ্ধ লেগে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হতে থাকে। সালাহউদ্দীন কিছু সৈনিককে তাঁর রাজ্যের সীমান্তে পাঠিয়ে জনগণকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এদিকে জেরুজালেম হাতছাড়া হওয়ার খবরে হতাশ ইউরোপ ক্রুসেডারদের জন্য নতুন উদ্যমে রসদ পাঠায়।
ক্রুসেডাররা অ্যাকর অবরোধ করে রাখার সময় ইউরোপ তৃতীয় ক্রুসেডের প্রস্তুতি নেয়। বিশেষত একের পর এক পরাজয় তাদেরকে অস্থির করে তুলেছিলো। তৃতীয় ক্রুসেডে নেতৃত্বদাতা রাজাদের কারণে এই যুদ্ধ আলাদা গুরুত্ব লাভ করে। তাঁরা হলেন জার্মান সম্রাট ফ্রেডেরিক বারবারোসা, ফ্রেঞ্চ রাজা ফিলিপ অগাস্টাস এবং ইংলিশ রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট।
📄 জার্মান প্রচেষ্টা
জার্মান সম্রাট এবং তাঁর এক লক্ষ সেনা হাঙ্গেরি হয়ে কন্সটান্টিনোপলের দিকে যাত্রা করে। বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় আইজ্যাক প্রবল ভীত হয়ে পড়েন এবং তাঁদেরকে সাহায্য করতে ও পথ দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। দ্বিতীয় আইজ্যাক সালাহউদ্দীনকে জার্মানদের অগসর হওয়ার কথা জানিয়ে দেন এবং তাদেরকে সাহায্য করতে নিজের অস্বীকৃতির কথা জানান। জার্মান বাহিনী এশিয়া মাইনর দিয়ে পার হয়। আর্মেনিয়া পর্বতমালায় অবস্থানকালে সালিফ নদীতে ডুবে সম্রাটের মৃত্যু হয়। ফলে জার্মান বাহিনী ছন্নছাড়া হয়ে যায়। কেউ জার্মানিতে ফিরে যায় আর কেউ সম্রাটের ছেলে ফ্রেডেরিকের নেতৃত্বে জাহাজে করে অ্যাকর ও টায়ারে আসে। পথিমধ্যে ফ্রেডেরিকের মৃত্যু হলেও অল্প কিছু জার্মান সেনা অ্যাকরে পৌঁছায়। পূর্ণশক্তি নিয়ে তারা আসতে পারলে লড়াই ভীষণ জমে উঠতো।