📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 আব্বাসি খলিফার নামে পঠিত খুতবা

📄 আব্বাসি খলিফার নামে পঠিত খুতবা


ভেতর-বাহিরের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে থিতু হওয়ার পর নিজে স্বাধীনভাবে কাজ করার পথে অন্যান্য বাধাগুলো সরাতে তৎপর হয়ে ওঠেন সালাহউদ্দীন। রাসূলুল্লাহর ﷺ আহলে বাইতকে সম্মান জানাতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করা মিশরবাসী শি'য়া মতবাদের অনুসারী হয়ে গিয়েছিলো। সালাহউদ্দীন মিশরবাসীকে আহলুস সুন্নাহর মতবাদের দিকে দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তিনি দুটি বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন যাতে মানুষ সঠিক মতবাদ শিখতে ও অনুসরণ করতে পারে। এ দুটি হলো নাসারিয়াহ মাদ্রাসা ও কামিলিয়া মাদ্রাসা। সহজেই তিনি পরিবর্তন আনতে সমর্থ হন। কারণ এদিকে নূরুদ্দীনও তাঁকে অনুরোধ করেন জুমু'আর খুতবা ফাতিমি খলিফার নামে না পড়ে আব্বাসি খলিফার নামে পড়তে। এভাবে ফাতিমিদের প্রভাব আরো দুর্বল হয়ে গেলো। শুধু সালাহউদ্দীনই নন, সমগ্র মুসলিম বিশ্বই এই পরিবর্তন খুব করে চাইছিলো। সালাহউদ্দীনের খতীব আল-'ইমাদ তাঁকে উদ্দেশ্য করে এক কবিতায় বলেন,

ফিরিয়ে আনুন এই খিলাফাহ আব্বাসিদের হাতে
মিথ্যাবাদীর দলেরা থাকুক মৃত্যুতে তড়পাতে।
ষড়যন্ত্র টের পেলেই করে দেবেন নস্যাৎ
মনের সকল দ্বন্দ্ব-দ্বিধা করুন ধূলিসাৎ।

কিন্তু সালাহউদ্দীন ভাবলেন মিশরীয়দেরকে পরিপূর্ণরূপে সুন্নী ধারায় ফিরিয়ে আনার আগ পর্যন্ত খুতবার পরিবর্তনটি স্থগিত রাখা উচিত। ফাতিমি খলিফা অসুস্থ হয়ে পড়লে নূরুদ্দীন বিষয়টি নিয়ে আরো জোরাজুরি করতে লাগলেন। সালাহউদ্দীন তাঁর উপদেষ্টাদের জড়ো করে তাঁদের মতামত চাইলেন। সেই সভায় “আলিমগণের যুবরাজ” খ্যাত আল-আমির আল-'আলিম এই দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার প্রস্তাব দিলেন। তিনি পরের জুমু'আর খুতবায় ফাতিমি খলিফার বদলে আব্বাসি খলিফার নামে খুতবা দিলেন। সালাহউদ্দীন তাঁর অনুসারীদেরকে নির্দেশ দিলেন ফাতিমি খলিফার কাছ থেকে বিষয়টি আপাতত গোপন রাখতে। তিনি বলেন, “তিনি সুস্থ হলে একে স্বীকৃতি দেবেন। আর যদি তিনি মৃত্যুপথযাত্রী হন, তাহলে তাঁকে এই দুঃসংবাদ জানানো ঠিক হবে না।”

ইবনু আসির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, জনগণ খুতবার এই পরিবর্তনকে শান্তভাবে মেনে নিয়েছিলো। অবশেষে ৫৬৭ হিজরি মোতাবেক ১১৭১ খ্রিষ্টাব্দে আল-'আদিদের মৃত্যুর মাধ্যমে ফাতিমি যুগের অবসান ঘটে।

আল-'আদিদের মৃত্যুর পর মিশরে সালাহউদ্দীনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি আল-'আদিদের মৃত্যুতে তিনদিন শোক পালন করেন এবং তাঁর পরিবারের সাথে সম্মানসূচক ও দয়ালু আচরণ করেন।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 নূরুদ্দীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক

📄 নূরুদ্দীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক


ফাতিমি খলিফার মৃত্যুর পর নুরুদ্দীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তৎপর হয়ে ওঠেন সালাহউদ্দীন। অন্যথায় নুরুদ্দীনের মনে হতে পারতো যে সালাহউদ্দীন ক্ষমতায় জেঁকে বসতে চাইছেন। শিরকুহ’র সময় থেকে নুরুদ্দীনের সাথে যে ভালো বোঝাপড়া চলে আসছিলো, তা তিনি বজায় রাখেন। যৌবনে তাঁর প্রতি নুরুদ্দীনের অনুগ্রহকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণে রাখেন।

কিছু সময় পরই আব্বাসি খলিফার পরিবর্তে নুরুদ্দীনের নামে খুতবা দেওয়ার আদেশ দেন সালাহউদ্দীন। তিনি তাঁর নাম খচিত মুদ্রা প্রচলন করেন এবং তাঁকে প্রাসাদের কোষাগার থেকে উপঢৌকন পাঠান।

মিশরে সালাহউদ্দীনের শাসনামলে কিছু বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি তাঁকে অমান্য করে এবং মিশরে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা সালাহউদ্দীনের সাথে নুরুদ্দীনের কলহ বাঁধিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং এই হীন প্রচেষ্টায় কিছু মাত্রায় সফলও হয়। কিন্তু প্রজ্ঞাবান জনগণ এই চক্রান্তগুলো ধরে ফেলে এবং উভয়পক্ষকে সুপরামর্শ দিয়ে শত্রুতার কুফল বোঝায়। অন্তর্কলহ থেকে কেবল বহিঃশত্রুরাই উপকৃত হয়। অল্প সময়ের মাঝেই উভয় পক্ষের মাঝে আস্থা পুনরুদ্ধার হয়। ৫৬৯ হিজরি তথা ১১৭৩ নুরুদ্দীনের মৃত্যু পর্যন্ত সালাহউদ্দীন তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন।

এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সালাহউদ্দীন স্বাধীনতার পথে সব বাধা দূর করতে সমর্থ হন এবং প্রাচ্যের মুসলিমদের পক্ষে এক দুর্জয় শাসক ও যোদ্ধায় পরিণত হন। বিভিন্ন সময় ক্রুসেডারদের যুলুমে মুসলিমদের যে ক্ষতি হয়েছিলো, আল্লাহ তার কড়ায়-গণ্ডায় শোধ তোলার নিয়তি লিখে দিয়েছেন সালাহউদ্দীনের জন্য। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে ইনশাআল্লাহ আলোচনা করবো সালাহউদ্দীন কীভাবে মুসলিম ভূমিগুলোকে নিজের শাসনাধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং হাত্তিনের মহাগুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে ইসলাম ও মুসলিমদের গৌরব পুনরুদ্ধার করেন।

“এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তাকেই তিনি দান করেন। এবং আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, সর্বজ্ঞ।”[১২]

টিকাঃ
[১২] সূরাহ আল-মা'ইদাহ ৫:৫৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00