📄 নাজাহ’র ষড়যন্ত্র
নাজাহ ছিলো সর্বশেষ ফাতিমি খলিফা আল-'আদিদের দরবারের এক খোজা পুরুষ। ৫৬৪ হিজরিতে সে সালাহউদ্দীনের বিরুদ্ধে একদল মিশরীয়র সাথে মিলে ক্রুসেডারদের সাথে চক্রান্ত করে।
নপুংসক এই গাদ্দার ক্রুসেডারদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে মিশর আক্রমণ করার আহ্বান জানায়। তার পরিকল্পনা ছিলো ক্রুসেডাররা যখন আক্রমণ করবে তখন সালাহউদ্দীনকে পেছন থেকে আক্রমণ করে উভয় সঙ্কটে ফেলে দেওয়া। চিঠি লিখে সে একটি নতুন জুতায় তা লুকিয়ে রাখে এবং ফ্র্যাংকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়।
এর আগেই জুতোটি সালাহউদ্দীনের এক অনুসারীর হস্তগত হয় এবং সে দ্রুত সালাহউদ্দীনকে তা জানিয়ে দেয়। কিন্তু সালাহউদ্দীন নাজাহ'র অনুসারীদের প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে বিষয়টি আপাতত গোপন রাখেন এবং উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় থাকেন।
একবার নাজাহ কায়রোর বাইরে নিজের দূর্গের উদ্দেশ্যে রওনা হলে সালাহউদ্দীন তাকে হত্যা করতে এক দল সৈন্য পাঠান। এই ঘটনার পর ফাতিমি খলিফার অনুসারি সৈন্যরা ফুঁসে উঠে। খলিফাহ'র পঞ্চাশ হাজার সুদানী সেনা সালাহউদ্দীনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়। সালাহউদ্দীনের সাথে তাদের যুদ্ধ বেঁধে যায় যা দু'দিন স্থায়ী হয়। তাদেরকে পরাজিত করে সালাহউদ্দীন নাজাহ ও সুদানী সেনাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেন।
শুধু যে সুদানীরাই বিদ্রোহ করেছিলো তা না। ফাতিমি রাজকুমাররাও দেশে যুদ্ধ ও কলহের আগুন লাগিয়ে দেয়।
📄 ইমারাহ আল-ইয়ামানির ষড়যন্ত্র
আরেকটি উল্লেখ করার মত ষড়যন্ত্র ছিলো বিখ্যাত কাহিনীকার 'ইমারাহ আল-ইয়ামানির ষড়যন্ত্র। একদিকে আল-'আদিদের এক ছেলেকে ক্ষমতায় বসিয়ে ফাতিমি শাসন পুনরুদ্ধার এবং সালাহউদ্দীনকে বিতাড়িত করার জন্য সে কায়রোতে বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী জোগাড় করে। অন্যদিকে দ্রুত ফ্র্যাংকদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে মিশর আক্রমণের জন্য আহ্বান জানায়। বিরাট সংখ্যক সালাহউদ্দীন বিরোধী এ কাজে সাহায্য করে।
তাদের একজন পুরষ্কারের আশায় যাইনুদ্দীন ইবনু নাজাকে ডেকে সালাহউদ্দিনের হাতে ধরিয়ে দেয়। সালাহউদ্দীন তাদের সবাইকে হত্যা করে দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের ব্যাপারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই ষড়যন্ত্র সংঘটিত হয় ৫৬৯ হিজরি সনে।
📄 কানযুদ দাওলাহ’র ষড়যন্ত্র
আসওয়ান এবং কুসে'[১] ৫৭০ হিজরিতে আরেকটি ষড়যন্ত্র হয়। আল-মাকরিযি তাঁর আস-সুলুক লি মা'রিফাত দিওয়ালাল মুলুক গ্রন্থে এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে লেখেন:
৫৭০ হিজরি সনে আসওয়ানের শাসক কানযুদ দাওলাহ আরব ও সুদানীদেরকে জড়ো করেন। তারা ফাতিমি সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সোজা কায়রোর দিকে অগ্রসর হয়। সে এতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। আরেকটি দল তাদের সাথে যোগ দিয়ে সালাহউদ্দীনের অনুসারী দশজন রাজকুমারকে হত্যা করে। তুদ গ্রামের কিয়াস ইবনু শাদি নামের এক লোক কুস আক্রমণ করে এর সম্পদ লুণ্ঠন করে। ভাই আল-মালিকুল 'আদিলের নেতৃত্বে এক বিশাল সেনাবাহিনী তৈরি করে সালাহউদ্দীন তাদেরকে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেন। আল-মালিকুল 'আদিল কিয়াসকে হত্যা করে তার সৈন্যদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। এরপর তিনি কানযুদ দাওলাহর উদ্দেশ্যে তুদে যান। কানযুদ দাওলাহ'র বেশিরভাগ সৈন্য নিহত হলে পরাজয়ের ভয়ে সে পালিয়ে যায়। সফর মাসের ৭ তারিখ তাকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধ শেষে আল- মালিকুল 'আদিল কায়রোতে ফেরেন ১৮ই সফর।
এভাবে সালাহউদ্দীন ঘরের শত্রু যালিম ষড়যন্ত্রকারীদেরকে দমন করেন। প্রজাদের কল্যাণকল্পে তাঁর দৃঢ়তার আরেকটি দৃষ্টান্ত এটি। মুতানাব্বির কথাগুলো যেন তাঁরই চরিত্রের দিকে ইঙ্গিত করছে:
"বিপদ তো তাদেরই আসে যারা একে সইতে জানে,
সদাচার থাকে তাদেরই মাঝে যারা ভরপুর সম্মানে।
ছোট জিনিসকে বড় করে দেখে যতসব ছোটলোকে,
বড় জিনিসও ছোট হয়ে যায় বড়দের চোখে।”
টিকাঃ
[১] আসওয়ান মিশরে অবস্থিত আসওয়ান প্রদেশের রাজধানী। আর কুস বর্তমানে মিশরের কুয়েনা প্রদেশের একটি শহর। - সম্পাদক
📄 বহিঃশত্রুদের ষড়যন্ত্র দমন
সালাহউদ্দীন মিশরের শাসনভার পাওয়ার পর ফ্র্যাংকরা তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তারা ভয়ে ভয়ে ছিলো যে মুসলিমরা তাঁর সাথে মিলে পবিত্র ভূমি জেরুসালেম মুক্ত করতে চলে আসে কি না। তাঁকে হটানোর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো তারা।
তাদের প্রথম প্রচেষ্টা ছিলো দামিয়েটা আক্রমণের। সালাহউদ্দীন মিশরে থিতু হওয়ার পর পূর্বদিকের ফ্র্যাংকরা অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলো। তারা স্পেন ও সিসিলিতে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে জেরুসালেম হুমকির মুখে পড়েছে বলে উত্তেজিত করতে লাগলো। এছাড়া পাদ্রী-সন্ন্যাসীদেরকেও টাকাপয়সা আর অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তাদের কাছে পাঠালো যাতে তারা জনগণকে উৎসাহিত করে।
এর পরপরই ৫৬৪ হিজরিতে তাদের সেনাবাহিনী দামিয়েটা অবরোধ করে। সালাহউদ্দীন একদল অস্ত্রসজ্জিত সেনাবাহিনীকে নীলনদ হয়ে দামিয়েটায় প্রেরণ করলেন। এছাড়া তিনি নূরুদ্দীনকেও সাহায্যের জন্য আবেদন করলেন। নূরুদ্দীন এই আহবানে সাড়া দেন। মিশরে তিনি সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেন এবং পূর্বদিক ও ফিলিস্তিনে ক্রুসেডারদের বড় বড় ঘাঁটিগুলোতে নিজের বাহিনীসহ সশরীরে হাজির হন। মিশরে সেনা আসতে দেখে আর তাদের ভূখণ্ডে নূরুদ্দীনকে ঢুকতে দেখে ক্রুসেডাররা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। তারা দামিয়েটায় পঞ্চাশ দিন অবস্থান করে বিফল হয়।
পাঁচ বছর পর ৫৬৯ হিজরিতে সিসিলির ফ্র্যাংকরা আলেক্সান্দ্রিয়া আক্রমণ করে। পনেরশ ঘোড়া, অশ্বারোহী আর পদাতিক মিলিয়ে ত্রিশ হাজার যোদ্ধা, অস্ত্র, রসদ, মিনজানিক[১০], গোলন্দাজ যান এবং নৌকা নিয়ে তাদের বহর উপকূলে ভেড়ে। তীরে নেমেই তারা সাতজন মুসলিম সেনাকে হত্যা করে, মুসলিমদের কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় এবং তিনশ তাঁবু গেড়ে বসে। এরপর তারা আলেক্সান্দ্রিয়ার দিকে অগ্রসর হয়।
সালাহউদ্দীন তখন ফাকুস[১১] শহরে ছিলেন। তৃতীয় দিনে তিনি যখন জানলেন যে আলেক্সান্দ্রিয়া ঘিরে ফেলা হয়েছে, তখন তিনি অস্ত্র ও গোলাসজ্জিত এক বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। চতুর্থ দিনের বিকেল পর্যন্ত সংঘর্ষ স্থায়ী হয়। সালাহউদ্দীন তাদেরকে পরাজিত করে তাদের প্রচুর সেনা হত্যা করেন, জাহাজ ডুবিয়ে দেন, তাদের রসদ ও অস্ত্র গানীমাত হিসেবে লাভ করেন। সালাহউদ্দীনের বাহিনী ও সেনাবাহিনীর বীরত্বের কাছে শত্রুদের অবরোধ চূর্ণ হয় আর তাদের সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সালাহউদ্দীনের বাহিনীর তলোয়ারের ধার থেকে যারা বেঁচে গেলো তারা হতাশ হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরে যায়।
সালাহউদ্দীন এভাবে দুই-দুইবার মিশরকে উদ্ধার করেন এবং ফ্র্যাংকদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেন। তিনি ছিলেন ক্রুসেডারদের গলায় ধরা এক তরবারি আর ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত এক সিংহ।
টিকাঃ
[১০] মিনজানিক এক ধরণের গুলতি যা পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর যুদ্ধক্ষেত্রে সুরক্ষিত দূর্গ আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতো। - সম্পাদক
[১১] ফাকুস বর্তমান মিশরের আশ-শারকিয়্যাহ প্রদেশের একটি শহর। - সম্পাদক