📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 শাওয়ির আস-সা’দীর বিদ্রোহ

📄 শাওয়ির আস-সা’দীর বিদ্রোহ


রুযযিক ইবনু তালা'ই' ফাতিমি খলিফাতের উজির হওয়ার পর উঁচু মিশরের (Upper Egypt) গভর্নর শাওয়ির ইবনু মুজাইর আস-সা'দী তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তিনি রুযযিককে পরাজিত ও হত্যা করতে সমর্থ হন এবং ৫৫৮ হিজরিতে ফাতিমি খলিফা আল-'আদিদের উযির পদে আসীন হন।

শাওয়ির আস-সা'দী ও তাঁর পুত্ররা যখন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন দুর্গাম বিন 'আমির আল-লাখামি নামক একজন জেনারেল ফাতিমি খলিফার সাথে মিলে তাঁকে হটানোর প্রস্তুতি নেন। শাওয়িরের বিরুদ্ধে খলিফা বিদ্রোহ করেন এবং তাঁকে পালাতে বাধ্য করেন। শাওয়িরের জায়গায় আসীন হন দুর্গাম। শাওয়ির আস-সা'দী তখন দামেস্কে গিয়ে নূরুদ্দীন মাহমুদের সাহায্য চান। তিনি মিশর অভিযানের খরচ এবং বার্ষিক কর হিসেবে মিশরের আয়ের এক-তৃতীয়াংশ প্রদান করার অঙ্গীকার করেন। নূরুদ্দীন প্রথমে এ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। পরে খবর এলো যে, জেরুসালেমর রাজা আলমারিক মিশর আক্রমণ করে দুর্গামকে পরাজিত করেছেন। দুর্গাম আবার শাওয়িরের সাথে নূরুদ্দীনের জোটের ভয়ে আলমারিকের সাথে সন্ধি করে তাঁকে কর দিতে শুরু করেছেন। ফলে দুর্গামের বিরুদ্ধে শাওয়িরকে সাহায্য করতে বাধ্য হন নূরুদ্দীন। তিনি আসাদুদ্দীন শিরকুহকে বাহিনীর প্রধান করে পাঠান, যিনি ভাতিজা সালাহউদ্দীনকেও সাথে করে নিয়ে যান। তাঁরা জয়লাভ করেন এবং শাওয়ির আবার উজির পদে আসীন হন।

কিন্তু নূরুদ্দীনের প্রতি নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন শাওয়ির। তিনি উল্টো গোপনে জেরুজালেমের রাজার সাথে সন্ধি করেন। আসাদুদ্দীন ও সালাহউদ্দীন তখন শাওয়িরের সাথে লড়াই করতে বাধ্য হন আর শাওয়ির জেরুসালেমের রাজার কাছে সাহায্য চান। ৫৫৯ হিজরি মোতাবেক ১১৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রমযান থেকে যুলহিজ্জা পর্যন্ত বুলবাইস নামক স্থানে মিশরীয় ও ক্রুসেডার জোটকে আটকে রাখতে সমর্থ হয় শামের বাহিনী। মিশর নিয়ে জেরুসালেমের রাজার ব্যস্ততার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নূরুদ্দীন হারাম ও প্যানিয়াসের শক্ত ঘাঁটিগুলো দখল করে নেন। জেরুসালেম সম্রাট আলমারিক নিজের রাজ্য খোয়ানোর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন। তিনি আসাদুদ্দীনের সাথে এই শর্তে চুক্তি করেন যে উভয় পক্ষই মিশর থেকে হাত গুটিয়ে নেবে। এর মধ্য দিয়ে মিশরকে কেন্দ্র করে নূরুদ্দীন ও ক্রুসেডারদের (যারা ফ্র্যাংক নামেও পরিচিত) দ্বন্দ্বের প্রথম পর্যায় শেষ হয়।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 মিশরকেন্দ্রিক দ্বন্দের দ্বিতীয় পর্যায়

📄 মিশরকেন্দ্রিক দ্বন্দের দ্বিতীয় পর্যায়


মিশরে গিয়ে আসাদুদ্দীন শিরকুহ'র লাভ হয়। তিনি বিস্তর গবেষণা করে আবিষ্কার করেন যে মিশরই হলো সেই ভূমি, যাকে ব্যবহার করে তিনি ক্রুসেডারদেরকে পরাজিত করতে পারবেন। তিনি নূরুদ্দীনকে বিষয়টি অবগত করেন এবং একে দখল করার অনুমতি চান। নূরুদ্দীন তাতে সাড়া দিয়ে ৫৬২ হিজরিতে শিরকুহ ও সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে দ্বিতীয়বারের মতো অভিযানে প্রেরণ করেন। উজির শাওয়ির যখন শামের বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার খবর পান, তখন তিনি ক্রুসেডার মিত্রদের সাহায্য চান এবং তারা সাহায্য করতে রাজি হয়। উঁচু মিশরের মুনিয়ায় এই দুই দলের সংঘর্ষ হয়। ৫৬৩ সালে শত্রুদের বিরুদ্ধে শামের বাহিনী বিজয়ী হয়। এই যুদ্ধ সালাহউদ্দীনের বীরত্ব ও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

শামের বাহিনী এরপর আলেক্সান্দ্রিয়ার দিকে অগ্রসর হয় এবং একরকম বিনা বাধায় তা দখল করে নেয়। আসাদুদ্দীন তাঁর ভাতিজা সালাহউদ্দীনকে আলেক্সান্দ্রিয়ার শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন। শাসক হিসেবে সালাহউদ্দীনের এটিই অভিষেক। তাকদিরের লিখনে তিনি যেন তাঁর মেধা ও যোগ্যতা প্রমাণ করার এক সুবর্ণ সুযোগ পেলেন। আসাদুদ্দীন আল-ফুস্তাত ও কায়রোতে যাওয়া মাত্রই বাইজেন্টাইন বাহিনীর সাহায্যে ক্রুসেডার বাহিনী আলেক্সান্দ্রিয়া আক্রমণ করে স্থল ও নৌ উভয় পথে এর উপর অবরোধ আরোপ করে। আলেক্সান্দ্রিয়ার জনগণ প্রায় আত্মসমর্পণ করেই ফেলেছিলো। কিন্তু চাচার আগমনের আগ পর্যন্ত সালাহউদ্দীন শত্রুদের প্রতিরোধ করে রাখতে সমর্থ হন। ফলাফলস্বরূপ, উভয়পক্ষ একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং মিশর থেকে সরে যেতে রাজি হয়।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 মিশরকেন্দ্রিক দ্বন্দের সর্বশেষ ধাপ

📄 মিশরকেন্দ্রিক দ্বন্দের সর্বশেষ ধাপ


রাজা আলমারিক চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে কিছু সৈন্য মিশরে রেখে দেয় এবং শামের বাহিনীর চলে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। তারা অভিযানের প্রস্তুতি নেয়, বুলবাইস শহর দখল করে প্রচুর মানুষ হত্যা করে এবং আল-ফুস্তাত দখল করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়। উজির শাওয়ির যখন খবর পান যে ক্রুসেডাররা আল-ফুস্তাত দখল করতে আসছে, তখন তিনি সেখানে আগুন ধরিয়ে দেন এবং চুয়ান্ন দিন যাবত এই অবস্থাই থাকে। ক্রুসেডাররা তখন কায়রোর দিকে অগ্রসর হয়ে একে অবরোধ করে। শাওয়ির ক্রুসেডারদের সাথে সমঝোতা করেন। এদিকে শামের বাহিনীকে তিনি পুনরায় আসার আহ্বান করেছিলেন এবং তারা এতে সাড়া দিয়ে আবারো বাহিনী প্রেরণ করে।

নূরুদ্দীন মিশর দখল করার এই সুযোগকে লুফে নেন। তিনি তৃতীয়বারের মতো শিরকুহ ও সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ করেন। তাঁরা এসে মিশরীয় সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হলে ক্রুসেডাররা লড়াই না করেই পালিয়ে যায়। শিরকুহ কায়রোতে প্রবেশ করার পর জনগণ তাঁকে সাদরে বরণ করে নেয় এবং তাঁর মাঝে ভালো লক্ষণ আঁচ করতে পারে। ফাতিমি খলিফা আল-'আদিদ তাঁকে কাছে টেনে নেন এবং তাঁর সাথে ভালো আচরণ করেন। শাওয়ির আস-সা'দীর বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র চলছিলো, যার জের ধরে ৫৬৪ হিজরিতে তিনি খুন হন। আসাদুদ্দীন শিরকুহ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু মাত্র দুই মাস পরই ৫৬৪ হিজরি মোতাবেক ১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 বিশ্লেষণ ও মন্তব্য

📄 বিশ্লেষণ ও মন্তব্য


এখন পর্যন্ত আলোচিত ঘটনা থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, চাচার সাথে মিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক জটিলতা ও যুদ্ধ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সালাহউদ্দীন অসাধারণ সাহসিকতা ও প্রজ্ঞার এক দুর্লভ সমন্বয় প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ যেন তাঁকে শুরু থেকেই বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় চরিত্রে পরিণত করছিলেন। তিনি যেসব যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সেগুলো নিঃসন্দেহে তাঁর অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস ও ঈমানের ঝুলিতে একেকটি অর্জন। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা ইনশাআল্লাহ আলোচনা করবো কীভাবে তিনি মুসলিম ভূমিগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে একটি একক ইসলামী বাহিনী গড়ে তোলেন। এর ফলেই হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জিত হয় এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে。

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية