📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 জন্ম

📄 জন্ম


সুলতান ইউসুফ সালাহউদ্দীনের জন্ম হয় ৫২৩ হিজরি মোতাবেক ১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দে। বাগদাদের কাছাকাছি তিকরিত নামে সুপ্রাচীন গ্রামের এক দূর্গে তাঁর জন্ম। অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করা ও নজরদারি করার উদ্দেশ্যে পারস্যের সম্রাটগণ দজলা[৫] নদীর তীরে এই দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। 'উমার বিন খাত্তাবের (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) খিলাফতকালে ১৬ হিজরিতে মুসলিমগণ তিকরিত জয় করেন।[৬]

এটি বিভিন্ন মুসলিম শাসকের হাত ঘুরতে থাকে। তুর্কি সেলজুকগণ ক্ষমতায় আসার পর সালাহউদ্দীনের পিতা নাজমুদ্দীন আইয়ুব ইবনু শাযি বাগদাদে সেলজুক পুলিশ বাহিনীর এক বড় অফিসারের সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁর নাম মুজাহিদুদ্দীন বাহরুয। তিনি সালাহউদ্দীনের পিতা আইয়ুবকে তিকরিত দূর্গের সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। একইসাথে তাঁর ভাই শিরকুহ আসাদুদ্দীনকে তাঁর সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে দুই ভাই মিলে আযারবাইজানের দেউইন গ্রাম থেকে ইরাকে চলে আসেন।

তাঁরা দুজনই ছিলেন রাওয়াদিয়ান কুর্দি। তাঁরা বাহরুযের পুলিশ বাহিনীতে কাজ করতে তিকরিতে আসেন। সেই দূর্গের এক রক্ষী একজন নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়। উক্ত নারী শিরকুহ'র কাছে নালিশ করলে তিনি রক্ষীকে হত্যা করে বসেন। হত্যার অপরাধে এখন শিরকুহকে কি বহিষ্কার করা হবে নাকি ছেড়ে দেওয়া হবে এ নিয়ে মুজাহিদ বাহরুয দ্বিধায় পড়ে যান। পরে ওই রক্ষীর পরিবার প্রতিশোধ নিতে পারে এই ভয়ে তিনি নাজমুদ্দীন ও শিরকুহ উভয়কে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁদেরকে রাতের বেলায় পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এই বহিষ্কারের দিনই নাজমুদ্দীনের স্ত্রী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, যার নাম রাখা হয় সালাহউদ্দীন আইয়ুবী। তাঁরা তাঁদের পরিবার ও সদ্যজাত সালাহউদ্দীন আইয়ুবীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং মসুল চলে যান।

ওয়াফায়াতুল আ'ইয়ান গ্রন্থে ইবনু খালিকান বলেন, নাজমুদ্দীন তাঁর এই সদ্যজাত সন্তানকে নিয়ে খুবই বিরক্ত ছিলেন। বের হওয়ার সময় তিনি ভাবছিলেন যে, বাচ্চাটির কান্নার কারণেই তাঁদের উপর দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে। তিনি বাচ্চাটাকে হত্যা করে ফেলতে পর্যন্ত চাইলেন। কেউ একজন সাবধান করে দিয়ে বললো, “জনাব, সদ্যজাত শিশু তো কিছু বোঝেই না। তার উপর আপনি বিরক্ত হচ্ছেন কেন? এটি তো আল্লাহরই নির্ধারিত তাকদির। কে জানে এই শিশুই হয়তো ভবিষ্যতে বিখ্যাত বাদশাহ হয়ে উঠতে পারে। কাজেই কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে এর যত্ন নিন।” এই কথায় নাজমুদ্দীনের হুঁশ ফিরে এলো এবং তিনি তাওবাহ করে নিয়ে আল্লাহ্ নির্ধারিত কদরের উপর ধৈর্য ধারণ করলেন।

টিকাঃ
[৫] নদীটির উৎপত্তি তুরস্কে। ইরাকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইউফ্রেটিস নদীর সাথে মিলিত হয়েছে এবং শাত আল আরব নামে পারস্য উপসাগরে গিয়ে পড়েছে।- সম্পাদক
[৬] মু'জামুল বুলদান, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯১

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 বেড়ে ওঠা

📄 বেড়ে ওঠা


আইয়ুব এবং শিরকুহ বাগদাদ থেকে এসে মসুলের 'ইমাদুদ্দীন যাঙ্কির সাথে থাকতে লাগলেন। বাহরুয বাগদাদের গভর্নর থাকাকালে সেলজুকদের সাথে এক যুদ্ধে 'ইমাদুদ্দীন পরাজিত হয়েছিলেন। সেসময় তিনি সৈন্যদের নিয়ে তিকরিত দিয়ে ফিরে আসছিলেন। তিকরিত দূর্গের তৎকালীন সেনাপতি নাজমুদ্দীন তাঁকে সাময়িকভাবে বন্দী করেন। তিনি 'ইমাদুদ্দীনকে হত্যা বা বন্দী করে রাখতে পারতেন। এর বদলে তিনি তাঁকে ছেড়ে দেন এবং মসুলে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। এই দুই ভাই এবার মসুলে আশ্রয় নেওয়ার পর সেই উপকারের প্রতিদানস্বরূপ তিনি তাঁদেরকে সাদরে বরণ করে নেন এবং বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে সম্ভাষণ জানান।

তাঁদের পরিবারগুলো 'ইমাদুদ্দীনের অধীনে ভালোভাবেই দিন কাটাতে লাগলো। তার উপর 'ইমাদুদ্দীন এই দুই ভাইকে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন। ৫৩৪ হিজরিতে 'ইমাদুদ্দীন বা'আলবেক[৭] দখল করার পর নাজমুদ্দীনকে এর গভর্নর হসেবে নিয়োগ দেন। এ থেকেই বোঝা যায় নাজমুদ্দীনের প্রতি তাঁর আস্থা ও নির্ভরতা কত বেশি ছিলো।

সালাহউদ্দীনের শৈশবের একটি অংশ কিংবা বলা যেতে পারে জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশটি কাটে বা'আলবেকে। তিনি সেখানে অশ্বচালনা শেখেন, জিহাদের প্রশিক্ষণ নেন এবং রাজনীতি ও ব্যবস্থাপনার জ্ঞান রপ্ত করেন। ১১৫৪ খ্রিষ্টাব্দে 'ইমাদুদ্দীনের ছেলে নূরুদ্দীন যখন দামেস্ক দখল করেন, সালাহউদ্দীন সেখানে জীবনের অসাধারণ কিছু সময় কাটান। তাঁর সাহসিকতা ও শৌর্য-বীর্য পূর্ণতা পায়। দামেস্কের শাসকের ছেলের মতোই তিনি মান-মর্যাদা পান। শান্ত-ভদ্র চরিত্র ও ধার্মিকতার জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য তাঁর অন্তরে ছিলো দুর্দমনীয় জ্যবা।

নুরুদ্দীনের শাসনামলে সালাহউদ্দীন দামেস্ক পুলিশের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে তিনি সুনিপুণ হাতে দামেস্ক থেকে চোর-ডাকাতের উপদ্রব উচ্ছেদ করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কর্তৃত্বাধীনে মানুষ নিরাপত্তা ও শান্তিতে ছিলো। হাসসান বিন নুমাইর (ডাকনাম 'আরকালাহ) ইউসুফ সালাহউদ্দীনের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে কবিতা লিখেন।
সিরিয়ার তস্করেরা, হুঁশিয়ার সাবধান!
এসে গেছে ইউসুফ, প্রখর দূরদৃষ্টি আর জ্ঞানে মহীয়ান।
ইউসুফ নবীকে দেখে হাত কাটে নারীদের,
আর এই ইউসুফ হাত কাটে চোরেদের।

বীরত্ব ও সামরিক দক্ষতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ তিনি লাভ করেন মিশরে থাকাকালীন। ৫৫৮ হিজরিতে কায়রো-কেন্দ্রিক ফাতেমি খলিফা আল-'আদিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন শাওয়ির আস-সা'দী। শাওয়ির দামেস্কে এসে নূরুদ্দীন মাহমুদের সাহায্য চান। তিনি এতে রাজি হয়ে আসাদুদ্দীন শিরকুহের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী পাঠান। এই অভিযানে ভাতিজা সালাহউদ্দীনকেও সাথে নেন তিনি। সমরশৈলীতে সালাহউদ্দীন অসাধারণ নৈপুণ্য দেখান। ফলাফল, শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় এবং ৫৬৪ হিজরিতে নূরুদ্দীন মাহমুদের সাম্রাজ্যের সাথে মিশরের সংযুক্তি। পরবর্তী অধ্যায়ে তা ব্যাখ্যা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

মোট কথা, শৈশবে এবং যৌবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে সালাহউদ্দীন মহান গুণাবলি ও দ্বীনদারি নিয়ে বেড়ে ওঠেন। রাজ-রাজড়াদের সাথে চলাফেরা করে তিনি সামরিক দক্ষতা, আচার-প্রথা, ইসলামী জযবা, সাহিত্যগুণ ও আর্থিক সচ্ছলতা লাভ করেন। এভাবেই তাঁর অসাধারণ চরিত্র গড়ে ওঠে আর ইতিহাসের মোড় ঘুরে যেতে থাকে।

টিকাঃ
[৭] বা'আলবেক বর্তমান লিবিয়ার একটা জেলার নাম, যা বা'আলবেক-হারমেল প্রদেশের রাজধানীও। -সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 শিক্ষা

📄 শিক্ষা


আগেই বলা হয়েছে সালাহউদ্দীন শৈশবে বা'আলবেকে ছিলেন। স্বভাবতই তাঁর বিদ্যাপীঠ এক শহর থেকে আরেক শহরে পরিবর্তিত হতে থাকে। অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের সন্তানদের মতোই তিনি লেখাপড়া, কুরআন হিফয করা ও আরবি ভাষার নিয়ম রপ্ত করেন।

তাবাকাত আশ-শাফ'ইয়্যাহর লেখক বলেন যে, সালাহউদ্দীন হাদীস শিখেন আল-হাফিয আস-সালাফি, ইবনু 'আউফ, আন-নাইসাবুরি এবং 'আব্দুল্লাহ ইবনু বাররির কাছে। তিনি ছিলেন বিচারক, কুরআনের হাফিয এবং তুখোড় কবি।

ইতিহাসবিদগণ একমত যে, পূর্ব থেকে পশ্চিম, সামারকান্দ থেকে কর্ডোভা, সব জায়গা থেকে আলিমগণ দামেস্কের মাসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতে পড়তে এবং শিক্ষকতা করতে আসতেন। সালাহউদ্দীন এঁদের সোহবত পেয়েছিলেন। বিশেষ করে আল-উমাওয়ি মাসজিদের খতিব 'আব্দুল্লাহ ইবনু আবি 'আসরুনের কাছে। তাঁকে দামেস্কে এনেছিলেন নূরুদ্দীন, যিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের উদ্দেশ্যে দামেস্কে এবং শামের বড় বড় শহরগুলোতে প্রচুর বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। আবি আ'সরুন এত দক্ষ ও বিখ্যাত ছিলেন যে, তিনি দামেস্কের প্রধান বিচারপতির পদ লাভ করেন। এই আলিমকে সালাহউদ্দীন খুব সম্মান করতেন এবং যত্ন নিতেন, বিশেষত তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার পর।

অশ্বচালনা, বর্শা নিক্ষেপ, শিকার ও সমরকৌশলে সালাহউদ্দীন খুবই দক্ষ ছিলেন। তিনি যে পরিবেশে থাকতেন, সেখানে এসব শেখার জন্য খুব উপযুক্ত ছিলো। ফলস্বরূপ তিনি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান এবং যুদ্ধের ময়দানের জটিল সমস্যা সমাধান করতে পারার গুণ রপ্ত করেন। এছাড়া দক্ষ যোদ্ধার মৌলিক সব গুণাবলিই তাঁর মধ্যে ছিলো। যেমন: মেধা, বুদ্ধি, বংশ, পরিবেশ, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা সব! একজনের ভেতর এত গুণের সমাহার খুবই দুর্লভ।

সবাই যখন দিশেহারা হয়ে পড়তো, তখনও তাঁর হৃদয় থাকতো অবিচল আর চিন্তাশক্তি থাকতো ভারসাম্যপূর্ণ। এটিও ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের একটি গুণ। উদাহরণস্বরূপ, শাম বিজয়ের সময় খবর আসে যে তাঁর ভাই তাজুল মুলুককে হত্যা করে হয়েছে। তারপর তাঁর আরেক ভাই আল-মালিক আল-মুযযাফফারের মৃত্যুসংবাদ আসে। শেষের জন ছিলেন দূর্গের নিরাপত্তা বিভাগের একজন দক্ষ প্রকৌশলী। কিন্তু এসব দুঃসংবাদ সালাহউদ্দীনকে ব্যথিত করলেও বিচলিত করতে পারেনি।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সালাহউদ্দীন ছিলেন দক্ষ রাজনীতিবিদ, অভিজ্ঞ নেতা, প্রশিক্ষিত যোদ্ধা এবং সম্মানিত আলিম। তাঁর তাকদিরে লেখাই ছিলো যে তিনি হবেন হাত্তিনের বিজয়ী বীর, ক্রুসেডারদের ত্রাস, পূর্ব-পশ্চিম সবখানে খ্যাতিমান, উত্তরসূরীদের আদর্শ এবং ইতিহাসের এক মহান চরিত্র। সালাহউদ্দীনের মতো এমন ইসলামী জযবাধারী, তেজস্বী, ইসলামের সুরক্ষিত ঘাঁটি ও নবীদের ভূমির প্রতিরক্ষাকারী আরেকটি সন্তান মুসলিম মায়েরা আর জন্ম দিতে পারেনি। কবির ভাষায়,

হায়!
এমনই ছিলেন আমার পিতাগণ!
কে আমায় এনে দেবে আবার সে রতন?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00