📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 লেখকের আরজ

📄 লেখকের আরজ


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যার অনুগ্রহে বান্দারা নেক আমল করতে সমর্থ হয়। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক যোদ্ধা ও বীরদের নেতা মুহাম্মাদের উপর, তাঁর সাহাবাগণের উপর, এবং কিয়ামাত পর্যন্ত আগত তাঁর সকল অনুসরণকারীর উপর।

দুর্ভাগ্যবশত আজ কিছু মুসলিম এই ভেবে হতাশ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছে যে, মুসলিমদের পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনার কোনো পথ এখন আর নেই। আবার কিছু মুসলিম আমাদেরকে সন্ন্যাসবাদের দিকে আহবান করে, কারণ তারা ভাবে ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য বকরি নিয়ে পাহাড়ে ও বৃষ্টিময় স্থানে চলে যাওয়ার সময় চলে এসেছে। সহীহ বুখারিতে রয়েছে, “এমন এক সময় আসবে, যখন মুসলিমের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পত্তি হবে বকরি যা নিয়ে সে পাহাড় ও বৃষ্টিস্নাত স্থানে (উপত্যকায়) চলে যাবে, যাতে সে তার দ্বীন নিয়ে ফিতনা থেকে পালাতে পারে।” কিন্তু নবীজী তাদের কথা বলছেন, যাদেরকে মুরতাদ হতে বাধ্য করা হবে। মুসলিমদের যতদিন ইসলামী বিধান পালনের ও পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে, ততদিন বৈরাগী জীবনযাপন হারাম।

আবার কিছু 'আলিম বলে থাকেন যে, ইমাম মাহদি ও ঈসা (আলাইহিমাসসালাম) আসা ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। এ ধরনের হতাশ মনোভাব রাখা মুসলিমরা অন্য মুসলিমদের আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে। নবীজী বলেছেন, “যে বলবে যে মুসলিমরা ধ্বংস হয়ে গেছে, সে তাদের আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে।”

কে ভেবেছিলো যে, ক্রুসেডারদের হাতে একশ বছর পরাধীনতার পর জেরুজালেমসহ অন্যান্য মুসলিম ভূখণ্ড আবারও মুক্ত হবে? কে ভাবতে পেরেছিলো যে, বীর সালাহউদ্দীন এসকল ভূখণ্ড মুক্ত করবেন এবং হাত্তিনের যুদ্ধে জয়লাভ করে মুসলিমদের ক্ষমতা-প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনবেন? কে ভাবতে পেরেছিলো যে, তাতারদের হাতে সারা মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন এবং মুসলিমদের উপর ব্যাপক হত্যা ও ধর্ষণের পর আবারও ইসলাম গৌরব ও ক্ষমতা সহকারে মাথা তুলে দাঁড়াবে? অথচ বলা হয়ে থাকে তাতারি নেতা হালাকু খাঁ মুসলিমদের খুলি দিয়ে পাহাড় গড়েছিলো। কে বিশ্বাস করতে পেরেছিলো যে, বীর সাইফুদ্দীন কুতুয 'আইন জালুতের যুদ্ধে জয়লাভ করে মুসলিম বিশ্বকে মুক্ত করে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবেন? ইতিবাচক মনোভাব একটি জাতির উপর বিরাট প্রভাব ফেলে। জাতির মানুষেরা উদ্বুদ্ধ হয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনে।

যুবসমাজের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে সালাহউদ্দীনের (রাহিমাহুল্লাহ) জীবনী ও তাঁর বিজয়ের কারণগুলো অধ্যয়ন করার জন্য। আমি নিশ্চিত যে, মুসলিম শাসক ও যুবসমাজ যদি সালাহউদ্দীনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে, তাহলে তারা আবারও জেরুজালেম মুক্ত করবে, ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করবে এবং ইসলামের পতাকা আবারও উঁচিয়ে ধরবে।

আল্লাহ্ বলেন
“দেশে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিলো, আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার এবং তাদেরকে নেতা ও উত্তরাধিকারী করার ইচ্ছে করলাম।"[১]

হে যুবসমাজ! ভবিষ্যতে একদিন না একদিন মুসলিমরা অবশ্যই বিজয়ী হয়ে ইসলামের গৌরব পুনরুদ্ধার করবে। এটি নবীজীর হাদীস থেকে প্রমাণিত, “তোমাদের মধ্যে নবুয়ত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, তারপর আল্লাহ তার সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়তের আদলে খিলাফত। তা তোমাদের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, অতঃপর তিনি তারও সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর আসবে যন্ত্রণদায়ক বংশের শাসন, তা থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করবেন। এক সময় আল্লাহর ইচ্ছায় এরও অবসান ঘটবে। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে জুলুমের শাসন এবং তা তোমাদের উপর থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করবেন। তারপর তিনি তা অপসারণ করবেন। তারপর আবার ফিরে আসবে নবুয়তের আদলে খিলাফত। তখন ইসলামের শিক্ষা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে জমিন ও আসমানবাসীরা খুশি হবে। তখন আসমান থেকে অবারিত বৃষ্টি ঝরবে এবং জমিন থেকে সবরকম উদ্ভিদ জন্মাবে।”

প্রতীয়মান হয় যে, বংশীয় শাসন উসমানী খিলাফাতের মাধ্যমে শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা যুলুমের শাসনের অধীনে আছি, যা তুরস্কে কামাল পাশার হাতে শুরু হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু ইসলামী পুনর্জাগরণের আভাস থেকে বোঝা যায় যে এই শাসন কখনই স্থায়ী হবে না। নবুয়তের আদলে খিলাফাত আবার ফিরে আসবে। ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই তা বাস্তবায়িত হবে বলে আমি আশা রাখি।

আমি আশাবাদী যে যুবসমাজের হাত, পুরুষদের শক্তি, দা'ঈদের অবিচলতা ও ধনীদের দানশীলতার মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হবেই। এবং আল্লাহর জন্য তা মোটেও কঠিন নয়। (আরও দেখুন আমার বই হাতা ইয়া'লামুশ শাবাব, পৃষ্ঠা ৮৭-৮৮)

পরিশেষে এই বইয়ের সকল শুভানুধ্যায়ীদের আমি ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই কবি আব্দুল জাব্বার আর-রাহবিকে তাঁর প্রশংসা, চমৎকার কবিতা ও গভীর আস্থার জন্য। আমি তাঁর প্রশংসা ও কবিতা শেষ পৃষ্ঠায় পাঠকদের জন্য উল্লেখ করে দিয়েছি। আল্লাহ্ আমাদের নেক আমলগুলো ইখলাসপূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে সর্বদা আমাদের সাহসী বীর পূর্বসূরিদের নিয়ে লেখার সামর্থ্য দান করুন, যাতে নতুন প্রজন্ম তা থেকে উৎসাহ লাভ করে। একমাত্র আল্লাহই দু'আ কবুলকারী।

'আব্দুল্লাহ নাসিহ 'উলওয়ান (রাহিমাহুল্লাহ)

টিকাঃ
[১] সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৫

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 আমাদের কথা

📄 আমাদের কথা


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
সমস্ত প্রশংসা মহান রবের যিনি দয়া করে আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের জন্য একটি মহৎ কাজের আঞ্জাম দেওয়ার তৌফিক দান করেছেন। মুসলিম উম্মাহ চারদিক থেকে বহিঃশত্রুদের হাতে অত্যাচারিত, নির্যাতিত হতে হতে দেয়ালে পিঠ এসে ঠেকেছে। কিন্তু ঠিক কী কারণে আমরা এভাবে অসহায় হয়ে পড়েছি, আর কোন কারণে কোটি কোটি মুসলিমের রক্ত এত সস্তা হয়ে জমিনের পর জমিন রাঙিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি নিবন্ধ করা সময়ের দাবি। আর এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় পাঠ হতে পারে মুসলিম ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল সময় এবং সেই সময়গুলোতে যেসব মহান ব্যক্তিরা উম্মাহর ইযযাত রক্ষায় সিনা টান করে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের ঘটনাপ্রবাহকে উম্মাহর সামনে উপস্থাপন করা।

বর্তমান বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের উপর কাফের-মুশরিক জোটের সম্মিলিত আগ্রাসন, পবিত্র ভূমি জেরুজালেম বে-দখল আর শামের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে আমরা ইতিহাসের মহাবীর সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর (রহঃ) সময়ের সাথে কিছুটা মেলাতে পারি। দুনিয়া আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অন্ধ মুসলিম শাসকবর্গ যখন উম্মাহকে ভুলে গিয়েছিলো, একজন সালাহউদ্দীন সেদিন একাই একটি উম্মাহ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। মিশর হয়ে শামে শান্তি ফিরিয়ে এনেছেন, জেরুজালেমকে কাফেরদের হাত থেকে পবিত্র করেছেন, আর সমস্ত বিশ্ববাসীর কাছে সাহসিকতা, বিচক্ষণতা আর মহানুভবতার যে নজির রেখে গেছেন, সেটা মুসলিম বিশ্ব তো বটেই; অমুসলিম ইতিহাসবিদরাও গুরুত্বের সাথে স্মরণ রেখেছেন।

সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বারবার মুসলিমদের সামনে তুলে আনা উচিত। সত্তরের দশকে শাইখ আবদুল্লাহ নাসিহ উলওয়ানের (রহঃ) লেখা সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর এই জীবনালেখ্য ঠিক সেই কারণেই আমরা বাংলায় রুপান্তরের সিদ্ধান্ত নিই। যে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণকে সামনে রেখে আমরা এই কাজে হাত দিই:

প্রথমত, এই বইটা কলেবরে এত বিশাল নয় যে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে, অথচ বইটি কম্প্রিহেনসিভ। সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর একেবারে শুরু থেকে শেষ সবকিছুই এখানে এসেছে, তবে অত বিস্তৃত পরিসরে খুঁটিনাটি নয়। পাঠক সহজেই সালাহউদ্দীনের জীবনের একটা ফ্লো-চার্ট পেয়ে যাবেন।

দ্বিতীয়ত, বইয়ের একটা বড় অংশ জুড়ে লেখক রাহিমাহুল্লাহ আমাদেরকে দেখিয়েছেন কেন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছেন, তাঁর শক্তির জায়গাটা কোথায় ছিলো, তাঁর কৌশল কেন কাজ করেছে; পক্ষান্তরে এত বিশাল মুসলিম উম্মাহ আজ কেন এভাবে মার খাচ্ছে, আমরা কেন পেরে উঠছি না, আমাদের দুর্বলতা কোথায়!

তৃতীয়ত, লেখক যখন বইটি লিখেন তাঁর আগেই জেরুজালেম দখল করে রাখা ইসরায়েলের সাথে আরবদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। সেসব ঘটনার আলোকে কীভাবে ইসলামি জিহাদ আরব জাতীয়তাবাদ, বিভিন্ন আদর্শ আর স্লোগানের ভিড়ে হারিয়ে গেছে, কীভাবে আমাদের ইসলামী চেতনা পরিবর্তিত হয়ে আবর্জনায় রূপ নিয়েছে তা লেখক রাহিমাহুল্লাহ এখানে সুন্দর এবং বাস্তবিকভাবে তুলে এনেছেন, যা আমাদের চিন্তার খোরাক জোগাবে নিঃসন্দেহে।

বাংলা ভাষায় এই মূল্যবান বইটি অনুবাদ হবে সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ শুরু করি। ছোটভাই নিলয়কে দায়িত্ব দিলে সে দ্রুতই কাজ শেষ করে ফেলে। এরপর বেশ কিছুদিন আমি এটার সম্পাদনার কাজ করেছি। কিছু কিছু জায়গায় টীকা সংযোজনের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে, সাহস করে দু'একটা সংযোজনও করেছি। অবশেষে সমপর্ণ প্রকাশনী বইটি প্রকাশের দায়িত্ব নেয়, নতুন হলেও তারা ইতিমধ্যে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের আস্থা অর্জন করেছে। আল্লাহ তাদের মেহনতকে কবুল করুন।

সবশেষে, বইটি প্রকাশিত হয়ে পাঠকের হাতে যাচ্ছে এটা আমার জন্য আনন্দের, আল্লাহ রাব্বুল ইযযাতের দরবারে আবারও শুকরিয়া জানাই। এই বইটি থেকে যদি পাঠকরা উপকৃত হয়, আমাদের মায়েরা যদি তাদের সন্তানদেরকে একেকজন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন বুনে, যদি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মাঝে সালাহউদ্দীনের মত দ্বীনের সম্মানে ঝাঁপিয়ে পড়ার সেই পৌরুষ ফিরে আসে; তবেই আমরা সার্থক ইনশাআল্লাহ।

বিনীত
সাজিদ ইসলাম
সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সালাহউদ্দীনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ মুসলিম ভূখণ্ড

📄 সালাহউদ্দীনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ মুসলিম ভূখণ্ড


১. সুলতান নূরুদ্দীনের মৃত্যুর পর বীর সালাহউদ্দীনের সামনে নিজের পতাকার অধীনে সব মুসলিম ভূখণ্ডকে একত্র করার সকল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। নিজের সামরিক ও রাজনৈতিক দক্ষতা খাটিয়ে তিনি একের পর এক ভূখণ্ড ঐক্যবদ্ধ করতে থাকেন। এ সময় ইয়েমেনের বিভিন্ন দল একে অপরের সাথে সারাক্ষণ সংঘর্ষে লিপ্ত ছিলো। ফলে এই দেশটির একেবারে ছিন্নভিন্ন অবস্থা হয়ে যায়। সানার হামাদানি গোষ্ঠী ও যুবাইদের নাজাহি গোষ্ঠী একে অপরের সাথে যুদ্ধরত থাকতো। এরই মাঝে এক ভণ্ড আবার নিজেকে ইমাম মাহদী দাবি করে বসে। তার কারণে ইয়েমেনে অনেক প্রাণহানি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। সালাহউদ্দীন মুসলিমদের এই অন্তর্কলহ দেখে খুবই ব্যথিত হন। তিনি তাঁর ভাই তুরান শাহকে ইয়েমেন অভিযানে পাঠান। তিনি সাফল্যের সাথে এসকল বিশৃঙ্খলা দূর করে ইয়েমেনকে মিশর ও শামের সাথে যুক্ত করেন।

২. তুরান শাহ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে নীলনদ পার করে কুস পর্যন্ত যান। তারপর তিনি স্থলপথে লোহিত সাগরের উপকূল পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে জেদ্দাহ ও ইয়েমেনে নৌযাত্রা করেন। তিনি যুবাইদ অঞ্চল ও আরো কিছু ঘাঁটি দখলে সমর্থ হন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ বলেন তিনি ইয়েমেনে আশিটিরও বেশি ঘাঁটি, দূর্গ ও শহর দখল করেন। প্রতীয়মান হয় যে, ইয়েমেনবাসীরা তুরান শাহ'র আগমনে খুশিই হয়েছিলো। কারণ তিনি সেখানে বিরাজমান অস্থিতিশীলতা দূর করার জন্যই গিয়েছিলেন। ইয়েমেনিদের অনেকেই তুরান শাহ'র জন্য পথ করে দেয়। অনেক জায়গায় রক্তপাত এড়াতে দূর্গরক্ষীরা বিনা বাধায় তাঁর হাতে দূর্গের চাবি তুলে দেয়। তারা সবাই শান্তি চাইছিলো। ইয়েমেন জয় করার পর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করে তুরান শাহ তাইজ শহরকে রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করেন।

৩. সালাহউদ্দীন তুরান শাহকে ইয়েমেনের শাসক নিযুক্ত করেন। তাঁর পরে তাগতাকিন ইবনু আইয়ুব এ অঞ্চলের শাসক হন। ইয়েমেনে আইয়ুবী শাসন স্থায়ী হয় প্রায় আশি বছর, ৫৬৯ থেকে ৬৫২ হিজরি।

৪. ইয়েমেন জয় করার একই বছরেই, অর্থাৎ ৫৬৯ হিজরিতে সালাহউদ্দীন বারকাহ, ত্রিপোলি এবং তিউনিসিয়ার পূর্ব অংশ থেকে কাবিস পর্যন্ত জয় করেন।

৫. ৫৭৯ হিজরিতে মুসলিম প্রতিনিধি ও রাজকুমারদের নিয়ে দামেস্কে আয়োজিত ইসলামী সম্মেলনে উপস্থিত থাকার জন্য ভাই আল-মালিক আল-'আদিলকে আহ্বান জানান সালাহউদ্দীন। এই সম্মেলনে উপস্থিত হন মহান শাইখ সাদরুদ্দীন, আব্বাসি খলিফা আন-নাসর লিদ্বীনিল্লাহ'র প্রতিনিধি শিহাবুদ্দীন বাশর, আল-ক্বাদি মহিউদ্দীন আশ-শাহরানযুরি, মসুল শাসকের প্রতিনিধি বাহাউদ্দীন ইবনু শাদ্দাদ, আল-জাযিরাহ'র শাসকের প্রতিনিধি মু'ইযুদ্দীন সিনজার সহ আরো অনেকে। মুসলিম নেতাদের মধ্য থেকে সালাহউদ্দীন সকল মতভেদ ও ঝগড়া-বিবাদ দূর করতে সচেষ্ট হন। মসুল শাসকের প্রতিনিধি ছাড়া বাকি সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি হন। একমাত্র তিনিই সালাহউদ্দীনের বিরোধিতা করেন।

৬. মসুলের শাসক মুসলিম বিশ্বের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে অসম্মত হলে তাঁকে সঠিক পথে আনার জন্য সালাহউদ্দীন তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন। সালাহউদ্দীন শহরটিতে অবরোধ আরোপ করলে এর শাসক 'ইযযুদ্দীন আত্মসমর্পণ করে ৫৮১ হিজরি সনে হাররান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী 'ইযযুদ্দীন শাহার যুর, আল-কারাবিলি ও তাজফাক শহর এবং এর সংলগ্ন প্রদেশগুলো সালাহউদ্দীনের হাতে তুলে দেন। পক্ষান্তরে, সালাহউদ্দীন তাঁকে এই শর্তে মসুলের কর্তৃত্ব দেন যে, জুমু'আর খুতবা ও মুদ্রা হবে সালাহউদ্দীনের নামে। সেই সাথে 'ইযযুদ্দীন সালাহউদ্দীনের নীতিমালা অনুসরণ করতেও বাধ্য থাকবেন।

মাফরাজুল কুলুব ফি তাওয়ারিখ বানি আইয়ুব গ্রন্থের লেখক ইবনু ওয়াসিল বলেন, হাররান চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মসুল, সিনজির, আল-জাযিরাহ, আরবিল, হাররান, দিয়ার বাকর ও অন্যান্য স্থানের শতধা বিভক্ত সৈন্যদেরকে সালাহউদ্দীন এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেন।

৭. বাগদাদের আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাদি'র কাছে সালাহউদ্দীন একটি বার্তা পাঠান। সালাহউদ্দীনের উজির আল-কাদি আল-ফাদল সেই চিঠিতে সালাহউদ্দীনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর জিহাদ ও বিভিন্ন অর্জন, যেমন শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই, মিশর, ইয়েমেন ও উত্তর আফ্রিকা জয়, এবং আব্বাসি খলিফার নামে খুতবা পাঠের প্রচলন। সেই সাথে তিনি অনুরোধ করেন যেন সালাহউদ্দীনকে মিশর, মরক্কো, ইয়েমেন, সিরিয়া ও তাঁর বিজিত অন্যান্য শহরের উপর শাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এছাড়া তাঁর পরে যেন তাঁর ভাই বা পুত্র তাঁর উত্তরাধিকারী হন। খলিফা আল-মুস্তাদি' তাতে সাড়া দেন এবং তিনি কোন কোন অঞ্চল শাসন করতে চান তা জানানোর জন্য প্রতিনিধি দল পাঠান। এছাড়া তিনি প্রতিনিধি দল ও সুলতানের আত্মীয়দের জন্য উপহার সামগ্রী ও সম্মানসূচক জোব্বা পাঠান।

৮. উপর্যুক্ত বর্ণনা থেকে জানা গেলো যে, সালাহউদ্দীন প্রচুর এলাকাকে এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেন। রামাল্লা থেকে নীল অববাহিকা, উত্তর আফ্রিকা থেকে ত্রিপোলি পর্যন্ত অনেক শহর তিনি শাসন করেন। এছাড়া তিনি মিশর, শাম ও উত্তর ইরাকের পাশাপাশি ইয়েমেন, এডেন, ত্রিপোলি উপকূল এবং তিউনিসিয়ার একটি অংশ থেকে কাবিস পর্যন্ত এলাকা জয় করেন। তাঁর শাসনাধীন এলাকাগুলোতে তাঁর নামে জুমু'আর খুতবা পড়া হতো। তাঁর শাসনাধীন এলাকাগুলো হলো উত্তর ইরাক (কুর্দিস্তান), শাম, ইয়েমেন, মিশর, মরক্কো, এবং উত্তর আফ্রিকা উপকূল।

নিঃসন্দেহে মুসলিমদের আশা-ভরসার স্থল ছিলেন সালাহউদ্দীন। জনগণ তাঁর মাঝে মুসলিমদের ঐক্য গড়ার ও ক্রুসেডারদেরকে চূড়ান্ত আক্রমণ করে জেরুজালেম মুক্ত করে ঐতিহাসিক গৌরব ছিনিয়ে আনার অপার সম্ভাবনা দেখতে পায়।

৯. মুসলিম উম্মাহ অযোগ্য শাসকদের যুলুমের অনেক ভুক্তভোগী ছিলো। সালাহউদ্দীনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে কবিদের দল মুসলিম ও ইসলামের গৌরব হিসেবে বর্ণনা করে। ইবনু সানান এক কবিতায় বলেন:
শাসক তো নয় যেন আলসের ধাড়ি সবগুলোর আচরণ শিশুদের মতো। সালাহউদ্দীন আসামাত্রই দূর হলো আঁধার সেরে গেলো নিমেষে রোগ-শোক যত।

তারা আরো বিশ্বাস করতো যে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য হলো জেরুজালেমকে ক্রুসেডারদের নোংরা থাবা থেকে মুক্ত করার সূচনা মাত্র। আর জেরুজালেম বিজয় হবে সমগ্র ফিলিস্তিন বিজয়ের পথে আরেকটি ধাপ। সালাহউদ্দীনের প্রশংসায় আল-'ইমাদ আল-আসবাহানি বলেন,
তুমি জিতলেই ইসলাম জিতে যায় দ্বীন-দুনিয়ার শক্তি ও আশা বেড়ে যায়। থামিও না রথ, জেরুজালেমও জিতে নিয়ে এসো ইসলামের এক সৈনিক হয়ে মর্যাদার আসনে বসো।

১. সুলতান নূরুদ্দীনের মৃত্যুর পর বীর সালাহউদ্দীনের সামনে নিজের পতাকার অধীনে সব মুসলিম ভূখণ্ডকে একত্র করার সকল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। নিজের সামরিক ও রাজনৈতিক দক্ষতা খাটিয়ে তিনি একের পর এক ভূখণ্ড ঐক্যবদ্ধ করতে থাকেন। এ সময় ইয়েমেনের বিভিন্ন দল একে অপরের সাথে সারাক্ষণ সংঘর্ষে লিপ্ত ছিলো। ফলে এই দেশটির একেবারে ছিন্নভিন্ন অবস্থা হয়ে যায়। সানার হামাদানি গোষ্ঠী ও যুবাইদের নাজাহি গোষ্ঠী একে অপরের সাথে যুদ্ধরত থাকতো। এরই মাঝে এক ভণ্ড আবার নিজেকে ইমাম মাহদী দাবি করে বসে। তার কারণে ইয়েমেনে অনেক প্রাণহানি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। সালাহউদ্দীন মুসলিমদের এই অন্তর্কলহ দেখে খুবই ব্যথিত হন। তিনি তাঁর ভাই তুরান শাহকে ইয়েমেন অভিযানে পাঠান। তিনি সাফল্যের সাথে এসকল বিশৃঙ্খলা দূর করে ইয়েমেনকে মিশর ও শামের সাথে যুক্ত করেন।

২. তুরান শাহ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে নীলনদ পার করে কুস পর্যন্ত যান। তারপর তিনি স্থলপথে লোহিত সাগরের উপকূল পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে জেদ্দাহ ও ইয়েমেনে নৌযাত্রা করেন। তিনি যুবাইদ অঞ্চল ও আরো কিছু ঘাঁটি দখলে সমর্থ হন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ বলেন তিনি ইয়েমেনে আশিটিরও বেশি ঘাঁটি, দূর্গ ও শহর দখল করেন। প্রতীয়মান হয় যে, ইয়েমেনবাসীরা তুরান শাহ'র আগমনে খুশিই হয়েছিলো। কারণ তিনি সেখানে বিরাজমান অস্থিতিশীলতা দূর করার জন্যই গিয়েছিলেন। ইয়েমেনিদের অনেকেই তুরান শাহ'র জন্য পথ করে দেয়। অনেক জায়গায় রক্তপাত এড়াতে দূর্গরক্ষীরা বিনা বাধায় তাঁর হাতে দূর্গের চাবি তুলে দেয়। তারা সবাই শান্তি চাইছিলো। ইয়েমেন জয় করার পর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করে তুরান শাহ তাইজ শহরকে রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করেন।

৩. সালাহউদ্দীন তুরান শাহকে ইয়েমেনের শাসক নিযুক্ত করেন। তাঁর পরে তাগতাকিন ইবনু আইয়ুব এ অঞ্চলের শাসক হন। ইয়েমেনে আইয়ুবী শাসন স্থায়ী হয় প্রায় আশি বছর, ৫৬৯ থেকে ৬৫২ হিজরি।

৪. ইয়েমেন জয় করার একই বছরেই, অর্থাৎ ৫৬৯ হিজরিতে সালাহউদ্দীন বারকাহ, ত্রিপোলি এবং তিউনিসিয়ার পূর্ব অংশ থেকে কাবিস পর্যন্ত জয় করেন।

৫. ৫৭৯ হিজরিতে মুসলিম প্রতিনিধি ও রাজকুমারদের নিয়ে দামেস্কে আয়োজিত ইসলামী সম্মেলনে উপস্থিত থাকার জন্য ভাই আল-মালিক আল-'আদিলকে আহ্বান জানান সালাহউদ্দীন। এই সম্মেলনে উপস্থিত হন মহান শাইখ সাদরুদ্দীন, আব্বাসি খলিফা আন-নাসর লিদ্বীনিল্লাহ'র প্রতিনিধি শিহাবুদ্দীন বাশর, আল-ক্বাদি মহিউদ্দীন আশ-শাহরানযুরি, মসুল শাসকের প্রতিনিধি বাহাউদ্দীন ইবনু শাদ্দাদ, আল-জাযিরাহ'র শাসকের প্রতিনিধি মু'ইযুদ্দীন সিনজার সহ আরো অনেকে। মুসলিম নেতাদের মধ্য থেকে সালাহউদ্দীন সকল মতভেদ ও ঝগড়া-বিবাদ দূর করতে সচেষ্ট হন। মসুল শাসকের প্রতিনিধি ছাড়া বাকি সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি হন। একমাত্র তিনিই সালাহউদ্দীনের বিরোধিতা করেন।

৬. মসুলের শাসক মুসলিম বিশ্বের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে অসম্মত হলে তাঁকে সঠিক পথে আনার জন্য সালাহউদ্দীন তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন। সালাহউদ্দীন শহরটিতে অবরোধ আরোপ করলে এর শাসক 'ইযযুদ্দীন আত্মসমর্পণ করে ৫৮১ হিজরি সনে হাররান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী 'ইযযুদ্দীন শাহার যুর, আল-কারাবিলি ও তাজফাক শহর এবং এর সংলগ্ন প্রদেশগুলো সালাহউদ্দীনের হাতে তুলে দেন। পক্ষান্তরে, সালাহউদ্দীন তাঁকে এই শর্তে মসুলের কর্তৃত্ব দেন যে, জুমু'আর খুতবা ও মুদ্রা হবে সালাহউদ্দীনের নামে। সেই সাথে 'ইযযুদ্দীন সালাহউদ্দীনের নীতিমালা অনুসরণ করতেও বাধ্য থাকবেন।

মাফরাজুল কুলুব ফি তাওয়ারিখ বানি আইয়ুব গ্রন্থের লেখক ইবনু ওয়াসিল বলেন, হাররান চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মসুল, সিনজির, আল-জাযিরাহ, আরবিল, হাররান, দিয়ার বাকর ও অন্যান্য স্থানের শতধা বিভক্ত সৈন্যদেরকে সালাহউদ্দীন এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেন।

৭. বাগদাদের আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাদি'র কাছে সালাহউদ্দীন একটি বার্তা পাঠান। সালাহউদ্দীনের উজির আল-কাদি আল-ফাদল সেই চিঠিতে সালাহউদ্দীনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর জিহাদ ও বিভিন্ন অর্জন, যেমন শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই, মিশর, ইয়েমেন ও উত্তর আফ্রিকা জয়, এবং আব্বাসি খলিফার নামে খুতবা পাঠের প্রচলন। সেই সাথে তিনি অনুরোধ করেন যেন সালাহউদ্দীনকে মিশর, মরক্কো, ইয়েমেন, সিরিয়া ও তাঁর বিজিত অন্যান্য শহরের উপর শাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এছাড়া তাঁর পরে যেন তাঁর ভাই বা পুত্র তাঁর উত্তরাধিকারী হন। খলিফা আল-মুস্তাদি' তাতে সাড়া দেন এবং তিনি কোন কোন অঞ্চল শাসন করতে চান তা জানানোর জন্য প্রতিনিধি দল পাঠান। এছাড়া তিনি প্রতিনিধি দল ও সুলতানের আত্মীয়দের জন্য উপহার সামগ্রী ও সম্মানসূচক জোব্বা পাঠান।

৮. উপর্যুক্ত বর্ণনা থেকে জানা গেলো যে, সালাহউদ্দীন প্রচুর এলাকাকে এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেন। রামাল্লা থেকে নীল অববাহিকা, উত্তর আফ্রিকা থেকে ত্রিপোলি পর্যন্ত অনেক শহর তিনি শাসন করেন। এছাড়া তিনি মিশর, শাম ও উত্তর ইরাকের পাশাপাশি ইয়েমেন, এডেন, ত্রিপোলি উপকূল এবং তিউনিসিয়ার একটি অংশ থেকে কাবিস পর্যন্ত এলাকা জয় করেন। তাঁর শাসনাধীন এলাকাগুলোতে তাঁর নামে জুমু'আর খুতবা পড়া হতো। তাঁর শাসনাধীন এলাকাগুলো হলো উত্তর ইরাক (কুর্দিস্তান), শাম, ইয়েমেন, মিশর, মরক্কো, এবং উত্তর আফ্রিকা উপকূল।

নিঃসন্দেহে মুসলিমদের আশা-ভরসার স্থল ছিলেন সালাহউদ্দীন। জনগণ তাঁর মাঝে মুসলিমদের ঐক্য গড়ার ও ক্রুসেডারদেরকে চূড়ান্ত আক্রমণ করে জেরুজালেম মুক্ত করে ঐতিহাসিক গৌরব ছিনিয়ে আনার অপার সম্ভাবনা দেখতে পায়।

৯. মুসলিম উম্মাহ অযোগ্য শাসকদের যুলুমের অনেক ভুক্তভোগী ছিলো। সালাহউদ্দীনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে কবিদের দল মুসলিম ও ইসলামের গৌরব হিসেবে বর্ণনা করে। ইবনু সানান এক কবিতায় বলেন:
শাসক তো নয় যেন আলসের ধাড়ি সবগুলোর আচরণ শিশুদের মতো। সালাহউদ্দীন আসামাত্রই দূর হলো আঁধার সেরে গেলো নিমেষে রোগ-শোক যত।

তারা আরো বিশ্বাস করতো যে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য হলো জেরুজালেমকে ক্রুসেডারদের নোংরা থাবা থেকে মুক্ত করার সূচনা মাত্র। আর জেরুজালেম বিজয় হবে সমগ্র ফিলিস্তিন বিজয়ের পথে আরেকটি ধাপ। সালাহউদ্দীনের প্রশংসায় আল-'ইমাদ আল-আসবাহানি বলেন,
তুমি জিতলেই ইসলাম জিতে যায় দ্বীন-দুনিয়ার শক্তি ও আশা বেড়ে যায়। থামিও না রথ, জেরুজালেমও জিতে নিয়ে এসো ইসলামের এক সৈনিক হয়ে মর্যাদার আসনে বসো।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সালাহউদ্দীনের জীবনাবসান

📄 সালাহউদ্দীনের জীবনাবসান


১. ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সালাহউদ্দীন স্বেচ্ছায় সন্ধিচুক্তি করেননি। কিন্তু সৈনিকদের অবাধ্যতা ও বিরক্তির কারণে তিনি তা করতে বাধ্য হন। আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা এবং সিরিয়া ও ফিলিস্তিনকে পাক-পবিত্র করার জন্য তিনি জিহাদ চালিয়ে যেতে খুবই উদগ্রীব ছিলেন। তাঁর আশংকা হচ্ছিলো যে ক্রুসেডাররা তাদের শাসনাধীন শহরগুলোতে সবরকমের অনাচার-অনর্থ চালিয়ে যাবে। তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে দখল করে বসবে, এমন আশংকাও অমূলক ছিলো না।

আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তাঁর আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়া কিতাবে লেখেন:
“আল্লাহর কসম! তিনি সমঝোতা চাননি। সমঝোতা সংক্রান্ত এক কথোপকথনে তিনি বলেন, 'আমি তাদের সাথে সমঝোতা করতে চাই না। কারণ, এমনটা করলে তারা হয়তো আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের সাথে লড়াই করে শহরগুলো পুনর্দখল করতে চাইবে। তাদের প্রত্যেকে একটা করে শহর শাসন না করা পর্যন্ত থামবে না।”

যা-ই হোক, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো এই যুদ্ধের পর উভয় পক্ষই রামাল্লা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়। উভয় পক্ষের জন্যই যুদ্ধটি ছিলো হতাশাজনক। সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ও গঠনমূলক কাজের জন্য উভয় দলই চাইছিলো পরিস্থিতি শান্ত হোক। চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুসলিম-খ্রিষ্টান উভয় পক্ষই যে কী পরিমাণ খুশি হয়, তার বর্ণনা দিয়ে আস-সুলুক কিতাবে আল-মাকরিযি বলেন, “চুক্তির দিনটি ছিলো স্মরণীয় একটি দিন। দীর্ঘ যুদ্ধের পর উভয় পক্ষেই স্বস্তির সুবাতাস বইতে থাকে।”

সালাহউদ্দীন ঘোষণা করেন, “চুক্তির কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে। অতএব, তাদের মধ্য থেকে কেউ আমাদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে ঢুকুক। আমাদের কেউ ওদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে তাতেও আপত্তি নেই।” শান্তিচুক্তির পর ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। মুসলিমরা ব্যবসায়িক কাজে ইয়াফফা যাতায়াত করতে থাকে। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে আর জনগণ শান্তি-নিরাপত্তা উপভোগ করতে থাকে।

শুধু তা-ই না। খ্রিষ্টানদের অবাধ যাতায়াতের জন্য সুলতান সালাহউদ্দীন জেরুজালেমের দরজা খুলে দেন। বিপুল সংখ্যক খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীর খবর পেয়ে রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট শংকিত হয়ে যান যে, সালাহউদ্দীন বিরক্ত হতে পারেন। তাই তিনি সুলতানকে অনুরোধ করেন যেন লোকসংখ্যা কমিয়ে আনা হয় এবং রিচার্ডের বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো খ্রিষ্টানকে জেরুজালেমে যেতে না দেওয়া হয়। কিন্তু সালাহউদ্দীন তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই তীর্থযাত্রীরা দূর-দূরান্ত থেকে এই পবিত্র ভূমিতে আসছে। আমার কোনো অধিকার নেই তাদেরকে বাধা দেওয়ার।” তিনি খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের প্রতি সদয় আচরণ করেন, তাদেরকে খাবার প্রদান করেন এবং তাদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করেন।

পূর্ব থেকে পশ্চিম সমস্ত রাজাদেরকে সালাহউদ্দীন সহনশীলতা, ক্ষমা, সুন্দর আচরণ ও নৈতিকতার মহান শিক্ষা দিয়ে গেলেন। রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট দেশে ফেরার আগেই এসবকিছু ঘটে। সালাহউদ্দীনকে আল্লাহ রহম করুন এবং তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন。

২. রামল্লা চুক্তির পর সালাহউদ্দীন জেরুসালেমের অবস্থা পরিদর্শন, ব্যবস্থাপনা, বিদ্যালয় ও হাসপাতাল স্থাপন ও প্রশাসন তদারক করতে যান। তিনি হাজ্জে যেতে চান, কিন্তু ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ক্ষতির আশংকায় রাজকুমাররা তা না করার পরামর্শ দেন। তিনি পরামর্শ মেনে নেন। তারপর উপকূলে গিয়ে ক্রুসেডারদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত দূর্গগুলোর পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কাজে মন দেন। ২৬শে শাওয়াল তিনি জেরুজালেম থেকে নাবলুস, বিসান, টাইবেরিয়াস, বৈরুত হয়ে দামেস্কে যান। জনগণ দোকান-পাট বন্ধ করে তাঁকে বরণ করে নিতে এগিয়ে আসে। এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ আল্লাহর ইচ্ছায় তিনিই তাদের দেশে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমন করে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন।

দামেস্কে এসে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজ তদারক, দানের উপযুক্তদের মাঝে অর্থ বিতরণ, সৈনিকদের ছুটিছাটা, জনগণের অভিযোগ শ্রবণ ইত্যাদি কাজে মন দেন। দামেস্ক ছিলো শান্তিময় এক জায়গা। সেখানে তিনি ভাই আল-'আদিল এবং সন্তানদের সাথে শিকারে বের হন। দীর্ঘ দিবস রজনীর পরিশ্রমের পর অবশেষে তিনি একটু শান্তির সুবাতাস খুঁজে পান। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ বলেন যে, দামেস্কের প্রশান্তি পেয়ে তিনি মিশরে আর ফিরে না যাওয়ার ইচ্ছা করেন। তিনি ইবনু শাদ্দাদকে দামেস্কে ডাকিয়ে আনেন। ইবনু শাদ্দাদ বলেন, “আমি তাঁর কক্ষে যাওয়ার পর তিনি আমাকে স্বাগত জানান, জড়িয়ে ধরেন এবং কান্না করেন। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।”

৫৮৯ হিজরির ১৪ই সফর পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকেন। তারপর হাজ্জফেরত জনগণকে অভ্যর্থনা জানাতে বের হন। হাজীদের দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাদের মধ্যকার একজন হওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। কিন্তু এই মহান নিয়ামত তাঁর তাকদিরে ছিলো না।

৩. হাজীদের সাথে মোলাকাত করে ফিরে এসেই তিনি পীতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। দিন দিন তাঁর অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা শেষমেশ সব আশা ছেড়ে দেন। তাঁর রোগের কথা যখন ঘোষণা করা হয়, জনগণ ভীত ও দুঃখিত হয়ে পড়ে। অনেকে দামস্কের দূর্গের কাছে জড়ো হয়ে তাঁর খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করে, কেউবা আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকে। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ এবং আল-কাযী আল-ফাদল ছাড়া আর কেউই তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি পাননি। সুলতানের অসুস্থতার পুরো সময়টা এই দুজন তাঁর সঙ্গ দেন।

ষষ্ঠ দিন। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তখন সুলতানের সাথে। ভৃত্যরা সুলতানের ঔষধ খাওয়ার পর পান করার জন্য ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসে। কিন্তু সুলতানের কাছে সে পানি খুব গরম মনে হলো। অন্য পানি আনা হলে তিনি বেশি ঠাণ্ডা বলে অভিযোগ করেন। তিনি বললেন, "আল্লাহ মহান! কারো সামর্থ্য নেই পানি পরিবর্তন করার।” তিনি আসলে রাগান্বিত হয়ে এ কথা বলেননি। ইবনু শাদ্দাদ আরো বলেন, "আল-কাযী আল-ফাদল আর আমি বাইরে গিয়ে কাঁদতে লাগলাম।" আল-কাদি আল-ফাদল বলেন, "তাঁর মতো উত্তম চরিত্রের অধিকারী কাউকে আর কখনো দেখতে পাবো না। আল্লাহর কসম! এমনটা যদি অন্য কোনো রাজার সাথে ঘটতো, তিনি চাকরকে পেয়ালা দিয়ে আঘাত করে বসতেন।"

ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
"দশম দিনে তাঁকে দুইবার ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়। তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে অল্প একটু পানি পান করেন। মানুষ সেদিন খুবই খুশি ছিলো। যখন বলা হলো তাঁর পা ঘামছে (জ্বর ছাড়ার লক্ষণ), তখন আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম। যখন জানানো হলো তাঁর সারা শরীর ঘামছে, তখনও আমরা খুশি হলাম। এগারো তম দিনে অর্থাৎ, ২৬শে সফর বলা হলো যে তাঁর শরীর এত ঘেমেছে যে বিছানা, মাদুর ও মেঝে ভিজে গেছে। ডাক্তাররা তাঁর জন্য কিছুই করতে পারলেন না।”

সালাহউদ্দীনের বড় ছেলে আল-মালিক আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী নিশ্চিত করলেন যে, সুস্থতার আর কোনো আশা নেই আর তাঁর পিতা এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর। তিনি জনগণকে শপথ করালেন যে, তাঁর পিতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তাঁর মৃত্যুর পর তা নূরুদ্দীনের হাতে আসবে। আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়্যা কিতাবে ইবনু শাদ্দাদ শপথটির কথাগুলো উল্লেখ করেন:
“এখন আমার নিয়্যাত ইখলাসপূর্ণ। আমি সুলতানের জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি অনুগত থাকবো। আমি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা করবো এবং তজ্জন্য আমার সম্পদ ও সময় ব্যয় করবো। আমার তলোয়ার ও সৈনিকেরা তাঁর আজ্ঞাধীন। তারপর তাঁর ছেলে আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী হবেন তাঁর উত্তরাধিকারী। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর আনুগত্য করবো, রাষ্ট্রকে নিজের জান-মাল ও তলোয়ার দিয়ে রক্ষা করবো এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবো। আমার ভেতর-বাহির একই (অর্থাৎ, মুখে যা বলছি অন্তরেও তা আছে)। আল্লাহই সর্বোত্তম সাক্ষী।”

৪. ২৭শে সফর বুধবার অসুস্থতার বারোতম দিনে সালাহউদ্দীনের স্বাস্থ্যের অবস্থা আরো খারাপ হয় এবং তিনি একরকম কোমায় চলে যান। একজন কারীকে কুর'আন তিলাওয়াত করার জন্য আনা হয়। তিনি যখন এই আয়াতে পৌঁছান, সালাহউদ্দীনের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে:
“তিনি (আল্লাহ) ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর উপরই আমার ভরসা।”
২৭শে সফর, ৫৮৯ হিজরি, ফজর সালাতের পর তাঁর রূহ মহান রব্বের নিকট ফিরে যায়।

৫. সালাহউদ্দীনের মৃত্যু ছিলো মুসলিমদের জন্য বিরাট এক ধাক্কা। ইবনু শাদ্দাদ ছিলেন এর চাক্ষুস সাক্ষী। তিনি সেসময়ে মুসলিমদের মনোবেদনার বর্ণনা দিয়ে বলেন:
“এ ছিলো এক শোকের দিন। খুলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ জনের মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে উম্মাহ এমন শোকে আর কোনোদিন মূহ্যমান হয়ে পড়েনি। সেই দূর্গ, সেই জাতি ও এই পৃথিবী জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। আল্লাহর কসম! আমি কিছু মানুষকে তাঁর জন্য নিজের জীবন কুরবানি করে দেওয়ার কথা বলতে শুনেছি। এমন গুরুতর কথা আমি কখনো কাউকে বলতে শুনিনি। এমন কুরবানি যদি জায়েয হতো, তাহলে মনে হয় তা কবুল হয়ে তাঁর জীবনই বেঁচে যেতো। তাঁর ছেলেরা রাস্তায় বেরিয়ে গিয়ে কাঁদতে থাকে। মানুষ এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। যুহরের ওয়াক্ত পর্যন্ত এই ছিলো পরিস্থিতি। 'আসর সালাতের আগে তাঁকে দাফন করা হয়। রাহিমাহুল্লাহ! তাঁর ছেলে আল-মালিক আয-যাফির শোকার্ত জনতাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।"

৬. আল-কাযী আল-ফাদলের আনা একটি কাফনে মোড়া অবস্থায় 'আসরের আগে সালাহউদ্দীনকে তাঁর কবরের আবাসস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কফিন দেখামাত্র সবাই একসাথে এমনভাবে কান্না জুড়ে দেয় যে, মনে হতে থাকে একজন মানুষই এভাবে কাঁদছে। দামেস্কের দূর্গের প্রাঙ্গনে তাঁকে দাফন করা হয়। তিন বছর পর আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছেই এক নেককার লোকের কাছ থেকে একটি ঘর ক্রয় করেন আল-মালিক আল-ফাদল। তারপর তিনি একে সমাধির মতো বানান। 'আশুরা'র দিনে (১০ই মুহাররম) বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তিনি সালাহউদ্দীনের দেহাবশেষ সেখানে স্থানান্তর করেন এবং আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছে তিন দিন শোক পালন করেন।

সালাহউদ্দীনের মৃত্যুর দিন মুসলিমরা এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্রকে হারায়, যিনি মানুষের হৃদয়ে সম্মানের জায়গা করে নিয়েছিলেন। মায়েদের জন্য কতই না কঠিন এমন আরেকটি সন্তানের জন্ম দেওয়া, যার মাঝে একসাথে এত গুণাবলির সম্মেলন ঘটেছে: মহান, কুরবানিওয়ালা, সৎ এবং বীর যোদ্ধা। আল্লাহ তাঁকে আখিরাতে সম্মানিত করুন, তাঁর কবরকে আলোকিত করুন এবং জান্নাতে তাঁকে উঁচু মাকাম দান করুন।

৭. মৃত্যুকালে সালাহউদ্দীন (রাহমাতুল্লাহ 'আলাইহি) এর বয়স ছিলো সাতান্ন বছর। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক দিনার। এছাড়া কোনো জমি, বাগান, খামার বা সম্পত্তি তিনি রেখে যাননি।

৮. তাঁর মৃত্যুর পর অসংখ্য কবি তাঁকে নিয়ে কাব্যরচনা করে। তারা তাঁর মহান গুণাবলি বর্ণনা করে, যেমন জনগণের প্রতি তার ভালোবাসা। মুসলিমদের পবিত্র ভূমিসমূহের প্রতিরক্ষা ও হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করার প্রতীক হিসেবে তাঁকে তুলে ধরা হয়। এসব কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো 'ইমাদ আল-আসবাহানির লেখা একটি কবিতা:
রাজ্যগুলোকে শাসন করতো বিভেদ। সব ভালাই দূর হয়ে মন্দেরা জেঁকে বসেছিলো।
কোথায় সেই লোক যাকে আমরা অনুসরণ করতাম আর যার আনুগত্য আল্লাহরই প্রতি ছিলো?
কোথায় আন-নাসির আল-মালিক যার নিয়্যাত ছিলো খালিস আর কাজ ফী সাবীলিল্লাহ?
কোথায় সে নেতা যার শাসন ছিলো বহুলাকাঙ্ক্ষিত, যার কর্তৃত্বে মন্দেরা ভীত, হে আল্লাহ?
কোথায় তিনি যিনি যুগের চাহিদা বুঝতেন, সম্মানিতদের করতেন সম্মান?
কোথায় তিনি যার অসম সাহসিকতায় ক্রুসেডাররা সব হয়ে গেছে অপমান?
জিহাদের রাহে শত দুখ ভোগী দুনিয়ারে দূরে ঠেলে দিলেন যিনি জেনে নিয়ো আমরা তো সব মরেই আছি, শুধু বেঁচে আছেন তিনি।
ইসলামের তরে সদা তৎপর জান্নাতে পেতে স্থান এমনই এক রাজা তিনি যিনি দ্বীনের তরে কুরবান।
ইয়াতীম এবং বিধবাদের প্রতি তিনি ছিলেন সদা দানশীল-দয়াময়,
সীমান্তগুলো আজ অনিরাপদ কারণ কারো জিহাদ তাঁর জিহাদের মতো নয়।
হায় ইসলামের জন্য! প্রতিটি মুমিনের মন ভরে গেছে ভয়ে, ঘণ্টার মতো করে তাঁর আমলের বছরগুলো গেছে বয়ে।
রহমত দিয়ে ভরে দিও তাঁকে, ইয়া রাহমানুর রাহীম! প্রশংসা তোমারই, হে রব্বুল 'আরশীল 'আযীম!

১. ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সালাহউদ্দীন স্বেচ্ছায় সন্ধিচুক্তি করেননি। কিন্তু সৈনিকদের অবাধ্যতা ও বিরক্তির কারণে তিনি তা করতে বাধ্য হন। আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা এবং সিরিয়া ও ফিলিস্তিনকে পাক-পবিত্র করার জন্য তিনি জিহাদ চালিয়ে যেতে খুবই উদগ্রীব ছিলেন। তাঁর আশংকা হচ্ছিলো যে ক্রুসেডাররা তাদের শাসনাধীন শহরগুলোতে সবরকমের অনাচার-অনর্থ চালিয়ে যাবে। তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে দখল করে বসবে, এমন আশংকাও অমূলক ছিলো না।

আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তাঁর আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়া কিতাবে লেখেন:
“আল্লাহর কসম! তিনি সমঝোতা চাননি। সমঝোতা সংক্রান্ত এক কথোপকথনে তিনি বলেন, 'আমি তাদের সাথে সমঝোতা করতে চাই না। কারণ, এমনটা করলে তারা হয়তো আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের সাথে লড়াই করে শহরগুলো পুনর্দখল করতে চাইবে। তাদের প্রত্যেকে একটা করে শহর শাসন না করা পর্যন্ত থামবে না।”

যা-ই হোক, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো এই যুদ্ধের পর উভয় পক্ষই রামাল্লা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়। উভয় পক্ষের জন্যই যুদ্ধটি ছিলো হতাশাজনক। সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ও গঠনমূলক কাজের জন্য উভয় দলই চাইছিলো পরিস্থিতি শান্ত হোক। চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুসলিম-খ্রিষ্টান উভয় পক্ষই যে কী পরিমাণ খুশি হয়, তার বর্ণনা দিয়ে আস-সুলুক কিতাবে আল-মাকরিযি বলেন, “চুক্তির দিনটি ছিলো স্মরণীয় একটি দিন। দীর্ঘ যুদ্ধের পর উভয় পক্ষেই স্বস্তির সুবাতাস বইতে থাকে।”

সালাহউদ্দীন ঘোষণা করেন, “চুক্তির কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে। অতএব, তাদের মধ্য থেকে কেউ আমাদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে ঢুকুক। আমাদের কেউ ওদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে তাতেও আপত্তি নেই।” শান্তিচুক্তির পর ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। মুসলিমরা ব্যবসায়িক কাজে ইয়াফফা যাতায়াত করতে থাকে। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে আর জনগণ শান্তি-নিরাপত্তা উপভোগ করতে থাকে।

শুধু তা-ই না। খ্রিষ্টানদের অবাধ যাতায়াতের জন্য সুলতান সালাহউদ্দীন জেরুজালেমের দরজা খুলে দেন। বিপুল সংখ্যক খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীর খবর পেয়ে রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট শংকিত হয়ে যান যে, সালাহউদ্দীন বিরক্ত হতে পারেন। তাই তিনি সুলতানকে অনুরোধ করেন যেন লোকসংখ্যা কমিয়ে আনা হয় এবং রিচার্ডের বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো খ্রিষ্টানকে জেরুজালেমে যেতে না দেওয়া হয়। কিন্তু সালাহউদ্দীন তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই তীর্থযাত্রীরা দূর-দূরান্ত থেকে এই পবিত্র ভূমিতে আসছে। আমার কোনো অধিকার নেই তাদেরকে বাধা দেওয়ার।” তিনি খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের প্রতি সদয় আচরণ করেন, তাদেরকে খাবার প্রদান করেন এবং তাদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করেন।

পূর্ব থেকে পশ্চিম সমস্ত রাজাদেরকে সালাহউদ্দীন সহনশীলতা, ক্ষমা, সুন্দর আচরণ ও নৈতিকতার মহান শিক্ষা দিয়ে গেলেন। রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট দেশে ফেরার আগেই এসবকিছু ঘটে। সালাহউদ্দীনকে আল্লাহ রহম করুন এবং তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন。

২. রামল্লা চুক্তির পর সালাহউদ্দীন জেরুসালেমের অবস্থা পরিদর্শন, ব্যবস্থাপনা, বিদ্যালয় ও হাসপাতাল স্থাপন ও প্রশাসন তদারক করতে যান। তিনি হাজ্জে যেতে চান, কিন্তু ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ক্ষতির আশংকায় রাজকুমাররা তা না করার পরামর্শ দেন। তিনি পরামর্শ মেনে নেন। তারপর উপকূলে গিয়ে ক্রুসেডারদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত দূর্গগুলোর পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কাজে মন দেন। ২৬শে শাওয়াল তিনি জেরুজালেম থেকে নাবলুস, বিসান, টাইবেরিয়াস, বৈরুত হয়ে দামেস্কে যান। জনগণ দোকান-পাট বন্ধ করে তাঁকে বরণ করে নিতে এগিয়ে আসে। এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ আল্লাহর ইচ্ছায় তিনিই তাদের দেশে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমন করে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন।

দামেস্কে এসে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজ তদারক, দানের উপযুক্তদের মাঝে অর্থ বিতরণ, সৈনিকদের ছুটিছাটা, জনগণের অভিযোগ শ্রবণ ইত্যাদি কাজে মন দেন। দামেস্ক ছিলো শান্তিময় এক জায়গা। সেখানে তিনি ভাই আল-'আদিল এবং সন্তানদের সাথে শিকারে বের হন। দীর্ঘ দিবস রজনীর পরিশ্রমের পর অবশেষে তিনি একটু শান্তির সুবাতাস খুঁজে পান। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ বলেন যে, দামেস্কের প্রশান্তি পেয়ে তিনি মিশরে আর ফিরে না যাওয়ার ইচ্ছা করেন। তিনি ইবনু শাদ্দাদকে দামেস্কে ডাকিয়ে আনেন। ইবনু শাদ্দাদ বলেন, “আমি তাঁর কক্ষে যাওয়ার পর তিনি আমাকে স্বাগত জানান, জড়িয়ে ধরেন এবং কান্না করেন। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।”

৫৮৯ হিজরির ১৪ই সফর পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকেন। তারপর হাজ্জফেরত জনগণকে অভ্যর্থনা জানাতে বের হন। হাজীদের দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাদের মধ্যকার একজন হওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। কিন্তু এই মহান নিয়ামত তাঁর তাকদিরে ছিলো না।

৩. হাজীদের সাথে মোলাকাত করে ফিরে এসেই তিনি পীতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। দিন দিন তাঁর অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা শেষমেশ সব আশা ছেড়ে দেন। তাঁর রোগের কথা যখন ঘোষণা করা হয়, জনগণ ভীত ও দুঃখিত হয়ে পড়ে। অনেকে দামস্কের দূর্গের কাছে জড়ো হয়ে তাঁর খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করে, কেউবা আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকে। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ এবং আল-কাযী আল-ফাদল ছাড়া আর কেউই তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি পাননি। সুলতানের অসুস্থতার পুরো সময়টা এই দুজন তাঁর সঙ্গ দেন।

ষষ্ঠ দিন। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তখন সুলতানের সাথে। ভৃত্যরা সুলতানের ঔষধ খাওয়ার পর পান করার জন্য ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসে। কিন্তু সুলতানের কাছে সে পানি খুব গরম মনে হলো। অন্য পানি আনা হলে তিনি বেশি ঠাণ্ডা বলে অভিযোগ করেন। তিনি বললেন, "আল্লাহ মহান! কারো সামর্থ্য নেই পানি পরিবর্তন করার।” তিনি আসলে রাগান্বিত হয়ে এ কথা বলেননি। ইবনু শাদ্দাদ আরো বলেন, "আল-কাযী আল-ফাদল আর আমি বাইরে গিয়ে কাঁদতে লাগলাম।" আল-কাদি আল-ফাদল বলেন, "তাঁর মতো উত্তম চরিত্রের অধিকারী কাউকে আর কখনো দেখতে পাবো না। আল্লাহর কসম! এমনটা যদি অন্য কোনো রাজার সাথে ঘটতো, তিনি চাকরকে পেয়ালা দিয়ে আঘাত করে বসতেন।"

ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
"দশম দিনে তাঁকে দুইবার ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়। তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে অল্প একটু পানি পান করেন। মানুষ সেদিন খুবই খুশি ছিলো। যখন বলা হলো তাঁর পা ঘামছে (জ্বর ছাড়ার লক্ষণ), তখন আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম। যখন জানানো হলো তাঁর সারা শরীর ঘামছে, তখনও আমরা খুশি হলাম। এগারো তম দিনে অর্থাৎ, ২৬শে সফর বলা হলো যে তাঁর শরীর এত ঘেমেছে যে বিছানা, মাদুর ও মেঝে ভিজে গেছে। ডাক্তাররা তাঁর জন্য কিছুই করতে পারলেন না।”

সালাহউদ্দীনের বড় ছেলে আল-মালিক আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী নিশ্চিত করলেন যে, সুস্থতার আর কোনো আশা নেই আর তাঁর পিতা এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর। তিনি জনগণকে শপথ করালেন যে, তাঁর পিতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তাঁর মৃত্যুর পর তা নূরুদ্দীনের হাতে আসবে। আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়্যা কিতাবে ইবনু শাদ্দাদ শপথটির কথাগুলো উল্লেখ করেন:
“এখন আমার নিয়্যাত ইখলাসপূর্ণ। আমি সুলতানের জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি অনুগত থাকবো। আমি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা করবো এবং তজ্জন্য আমার সম্পদ ও সময় ব্যয় করবো। আমার তলোয়ার ও সৈনিকেরা তাঁর আজ্ঞাধীন। তারপর তাঁর ছেলে আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী হবেন তাঁর উত্তরাধিকারী। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর আনুগত্য করবো, রাষ্ট্রকে নিজের জান-মাল ও তলোয়ার দিয়ে রক্ষা করবো এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবো। আমার ভেতর-বাহির একই (অর্থাৎ, মুখে যা বলছি অন্তরেও তা আছে)। আল্লাহই সর্বোত্তম সাক্ষী।”

৪. ২৭শে সফর বুধবার অসুস্থতার বারোতম দিনে সালাহউদ্দীনের স্বাস্থ্যের অবস্থা আরো খারাপ হয় এবং তিনি একরকম কোমায় চলে যান। একজন কারীকে কুর'আন তিলাওয়াত করার জন্য আনা হয়। তিনি যখন এই আয়াতে পৌঁছান, সালাহউদ্দীনের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে:
“তিনি (আল্লাহ) ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর উপরই আমার ভরসা।”
২৭শে সফর, ৫৮৯ হিজরি, ফজর সালাতের পর তাঁর রূহ মহান রব্বের নিকট ফিরে যায়।

৫. সালাহউদ্দীনের মৃত্যু ছিলো মুসলিমদের জন্য বিরাট এক ধাক্কা। ইবনু শাদ্দাদ ছিলেন এর চাক্ষুস সাক্ষী। তিনি সেসময়ে মুসলিমদের মনোবেদনার বর্ণনা দিয়ে বলেন:
“এ ছিলো এক শোকের দিন। খুলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ জনের মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে উম্মাহ এমন শোকে আর কোনোদিন মূহ্যমান হয়ে পড়েনি। সেই দূর্গ, সেই জাতি ও এই পৃথিবী জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। আল্লাহর কসম! আমি কিছু মানুষকে তাঁর জন্য নিজের জীবন কুরবানি করে দেওয়ার কথা বলতে শুনেছি। এমন গুরুতর কথা আমি কখনো কাউকে বলতে শুনিনি। এমন কুরবানি যদি জায়েয হতো, তাহলে মনে হয় তা কবুল হয়ে তাঁর জীবনই বেঁচে যেতো। তাঁর ছেলেরা রাস্তায় বেরিয়ে গিয়ে কাঁদতে থাকে। মানুষ এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। যুহরের ওয়াক্ত পর্যন্ত এই ছিলো পরিস্থিতি। 'আসর সালাতের আগে তাঁকে দাফন করা হয়। রাহিমাহুল্লাহ! তাঁর ছেলে আল-মালিক আয-যাফির শোকার্ত জনতাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।"

৬. আল-কাযী আল-ফাদলের আনা একটি কাফনে মোড়া অবস্থায় 'আসরের আগে সালাহউদ্দীনকে তাঁর কবরের আবাসস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কফিন দেখামাত্র সবাই একসাথে এমনভাবে কান্না জুড়ে দেয় যে, মনে হতে থাকে একজন মানুষই এভাবে কাঁদছে। দামেস্কের দূর্গের প্রাঙ্গনে তাঁকে দাফন করা হয়। তিন বছর পর আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছেই এক নেককার লোকের কাছ থেকে একটি ঘর ক্রয় করেন আল-মালিক আল-ফাদল। তারপর তিনি একে সমাধির মতো বানান। 'আশুরা'র দিনে (১০ই মুহাররম) বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তিনি সালাহউদ্দীনের দেহাবশেষ সেখানে স্থানান্তর করেন এবং আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছে তিন দিন শোক পালন করেন।

সালাহউদ্দীনের মৃত্যুর দিন মুসলিমরা এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্রকে হারায়, যিনি মানুষের হৃদয়ে সম্মানের জায়গা করে নিয়েছিলেন। মায়েদের জন্য কতই না কঠিন এমন আরেকটি সন্তানের জন্ম দেওয়া, যার মাঝে একসাথে এত গুণাবলির সম্মেলন ঘটেছে: মহান, কুরবানিওয়ালা, সৎ এবং বীর যোদ্ধা। আল্লাহ তাঁকে আখিরাতে সম্মানিত করুন, তাঁর কবরকে আলোকিত করুন এবং জান্নাতে তাঁকে উঁচু মাকাম দান করুন।

৭. মৃত্যুকালে সালাহউদ্দীন (রাহমাতুল্লাহ 'আলাইহি) এর বয়স ছিলো সাতান্ন বছর। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক দিনার। এছাড়া কোনো জমি, বাগান, খামার বা সম্পত্তি তিনি রেখে যাননি।

৮. তাঁর মৃত্যুর পর অসংখ্য কবি তাঁকে নিয়ে কাব্যরচনা করে। তারা তাঁর মহান গুণাবলি বর্ণনা করে, যেমন জনগণের প্রতি তার ভালোবাসা। মুসলিমদের পবিত্র ভূমিসমূহের প্রতিরক্ষা ও হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করার প্রতীক হিসেবে তাঁকে তুলে ধরা হয়। এসব কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো 'ইমাদ আল-আসবাহানির লেখা একটি কবিতা:
রাজ্যগুলোকে শাসন করতো বিভেদ। সব ভালাই দূর হয়ে মন্দেরা জেঁকে বসেছিলো।
কোথায় সেই লোক যাকে আমরা অনুসরণ করতাম আর যার আনুগত্য আল্লাহরই প্রতি ছিলো?
কোথায় আন-নাসির আল-মালিক যার নিয়্যাত ছিলো খালিস আর কাজ ফী সাবীলিল্লাহ?
কোথায় সে নেতা যার শাসন ছিলো বহুলাকাঙ্ক্ষিত, যার কর্তৃত্বে মন্দেরা ভীত, হে আল্লাহ?
কোথায় তিনি যিনি যুগের চাহিদা বুঝতেন, সম্মানিতদের করতেন সম্মান?
কোথায় তিনি যার অসম সাহসিকতায় ক্রুসেডাররা সব হয়ে গেছে অপমান?
জিহাদের রাহে শত দুখ ভোগী দুনিয়ারে দূরে ঠেলে দিলেন যিনি জেনে নিয়ো আমরা তো সব মরেই আছি, শুধু বেঁচে আছেন তিনি।
ইসলামের তরে সদা তৎপর জান্নাতে পেতে স্থান এমনই এক রাজা তিনি যিনি দ্বীনের তরে কুরবান।
ইয়াতীম এবং বিধবাদের প্রতি তিনি ছিলেন সদা দানশীল-দয়াময়,
সীমান্তগুলো আজ অনিরাপদ কারণ কারো জিহাদ তাঁর জিহাদের মতো নয়।
হায় ইসলামের জন্য! প্রতিটি মুমিনের মন ভরে গেছে ভয়ে, ঘণ্টার মতো করে তাঁর আমলের বছরগুলো গেছে বয়ে।
রহমত দিয়ে ভরে দিও তাঁকে, ইয়া রাহমানুর রাহীম! প্রশংসা তোমারই, হে রব্বুল 'আরশীল 'আযীম!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00