📄 সালাফী দাওয়াতের মূলনীতি : এক নজরে
১. সালাফী দাওয়াত বলতে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের বিশুদ্ধ ইসলামের দাওয়াতকে বুঝায়।
২. সালাফী দাওয়াতের মূলনীতি হ'ল ৩টি : তাওহীদ, ইত্তেবা ও তাযকিয়াহ তথা আল্লাহ্ একত্ব, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অনুসরণ ও আত্মশুদ্ধি অর্জন।
৩. সাধারণ ধারণা মতে তাওহীদ অর্থ তাওহীদে রুবুবিয়াত তথা আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। কিন্তু সালাফী আক্বীদা মতে তাওহীদের মূলনীতি হ'ল চারটি : (ক) তাওহীদে আসমা ও ছিফাত তথা কোনরূপ পরিবর্তন ও দূরতম ব্যাখ্যা ছাড়াই আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর একত্বের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা যেমনটি তাঁর উপযোগী। (খ) ইবাদতের জন্য আল্লাহকে একক গণ্য করা। (গ) ঈমান আনা এ ব্যাপারে যে, মানুষের দুনিয়াবী জীবনে প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে বিধান রচনার একমাত্র হকদার হ'লেন আল্লাহ। (ঘ) তাওহীদের উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের প্রতিটিই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য এক একটি রুকন বা স্তম্ভ।
৪. ইত্তেবা : অর্থ অনুসরণের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে একক হিসাবে মান্য করা। যা কালেমায়ে শাহাদাতের দ্বিতীয় অংশের দাবী।
৫. ইত্তেবা যথার্থ হ'তে পারে না চারটি বিষয় ব্যতীত। (ক) একথা জানা যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় মহান প্রতিপালকের পক্ষ হ'তে বান্দাদের প্রতি একজন মুবাল্লিগ বা প্রচারক ছিলেন। তিনি দু'টি 'অহী' নিয়ে এসেছিলেন। একটি আল্লাহ্ কিতাব। অন্যটি তাঁর সুন্নাহ। (খ) দ্বীন হ'ল- একটি পদ্ধতি, একটি তরীকা ও একটি ব্যাপক (সামাজিক) রঙের নাম। কেবল আল্লাহ্ সঙ্গে বান্দার একান্ত সম্পর্ক মাত্র নয়। এর অর্থ হ'ল, আল্লাহ্ হুকুম অনুযায়ী তাঁর রাসূল (ছাঃ) হ'লেন মানুষের সার্বিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের বিধানদাতা। অতএব ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ-তালাক, শাসন ও রাজনীতি এবং দণ্ডবিধি সমূহ প্রভৃতি বিষয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছকে অমান্য করা ছালাত, ছিয়াম, যাকাত, হজ্জ প্রভৃতিকে অমান্য করার ন্যায় গুনাহের কাজ। (গ) পূর্বোক্ত দু'টি বিষয়ের আলোচনায় রাসূল (ছাঃ)-এর মর্যাদা এমন এক স্তরে উন্নীত হয়েছে, যার নিকটবর্তী হওয়া কোন মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। সেকারণ তার বিরোধিতায় দুনিয়ার কারু কোন কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। চাই তিনি ইমাম, ফক্বীহ, নেতা, রাজনীতিক, চিন্তাবিদ, সমাজ সংস্কারক যিনিই হৌন না কেন। যে ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর কথার পরেও অন্য কারু কোন কথা পেশ করল, সে ব্যক্তি মন্দ কাজ করল, সীমালংঘন করল ও যুলুম করল। সে ব্যক্তি কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতের বিরোধিতা করল। (ঘ) ইত্তেবা বা অনুসরণ কখনোই পূর্ণাঙ্গ হবে না রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা ব্যতীত।
৬. ইত্তেবা দুর্বল হওয়া এবং রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি প্রশমিত হওয়ার কারণ ৪টি (ক) তাক্বলীদকে জায়েয গণ্য করা (খ) ইলম ও দলীল ছাড়া ফৎওয়া দেওয়া (গ) কুরআন ও সুন্নাহ্ পঠন ও পাঠনের পথ রুদ্ধ করা (ঘ) জীবনের বহু ক্ষেত্র হ'তে শরী'আত অনুযায়ী আমল বন্ধ করা।
৭. তৃতীয় মূলনীতি: তাযকিয়াহ বা শুদ্ধিতা। এতে দু'টি বিষয় রয়েছে: (ক) রাসূল আগমনের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল আত্মশুদ্ধি আনয়ন করা। (খ) জান্নাতে প্রবেশের জন্য ওটাই অপরিহার্য গুণ। যে ব্যক্তি এই গুণে গুণান্বিত নয়, সে ব্যক্তি জান্নাতের অধিকারী নয়।
৮. শুদ্ধিতা অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কোন আমল নেই। বরং ইসলামের সমস্ত রীতি-পদ্ধতি, আক্বীদা-বিশ্বাস ও আচরণবিধি সব কিছুরই শেষ ফল গিয়ে দাঁড়ায় তাযকিয়াহ বা আত্মার পরিশুদ্ধি।
৯. পরবর্তীকালে তাছাউওফের নামে ইছলাহে নাফস বা আত্মশুদ্ধির বহু তরীকা সৃষ্টি হয়েছে। যা তারবিয়াত ও ইবাদতের গতি পেরিয়ে আক্বীদা ধ্বংস করা ও শরী'আত দলনের ক্ষেত্র অতিক্রম করেছে। তারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদত তথা শিরকের মহাপাতকে লিপ্ত হয়েছে এবং অদ্বৈতবাদ, সর্বেশ্বরবাদ প্রভৃতি নানাবিধ শিরকী মতবাদ আবিষ্কার করেছে। ফলে পাপীরাই সেখানে সৎলোকের চাইতে অধিক মর্যাদাবান হিসাবে গণ্য হয়।
১০. ছুফী মতবাদের মুকাবিলায় একটি ফিক্বহী জড়তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। যা কুরআন ও সুন্নাহ্ বিধানগুলিকে মেশিনের ছাঁচের ন্যায় তাদের মনগড়া উছুলে ফিক্বহের পরিভাষার ছাঁচে ঢেলে দেয়। ফলে মানুষ কিতাব ও সুন্নাহর মূল উৎস হ'তে দূরে সরে যায়। এইসব ছাঁচ বহু হালালকে হারাম করে এবং হারামকে হালাল করে।
১১. সালাফী তরীকা উপরোক্ত ছুফী ও ফিক্বহী তরীকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে তাযকিয়াহ আল্লাহর দ্বীনের যথাস্থানে রক্ষিত হয়েছে। এর জন্য সে শরী'আত সম্মত পদ্ধতি সমূহ অনুসরণ করেছে, যা কিতাব ও সুন্নাহতে মওজুদ রয়েছে। ঐ দু'টির বাইরে তাযকিয়াহ নেই এবং ঐ দু'টি ব্যতীত তাযকিয়াহ কখনোই হাছিল হ'তে পারে না।
১২. সালাফী তরীকা ঐসব যাহেরী কট্টর মতবাদীদেরকেও বাতিল গণ্য করেছে, যারা দলীল নিয়ে চলে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুলে যায়।... এই তরীকা হ'ল সংশোধন, প্রশিক্ষণ, আল্লাহ্ নৈকট্য হাছিল ও শুদ্ধিতা অর্জনের জন্য। এখানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যতীত সে কাউকে শ্রেষ্ঠতম নমুনা মনে করে না। তিনি মানবজাতির মধ্যে আত্মার দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা পবিত্র, মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বোচ্চ, চরিত্রে সুদৃঢ় এবং তরীকা ও পদ্ধতিতে শ্রেষ্ঠতম পথ প্রদর্শক।
১৩. সালাফী দাওয়াতের উদ্দেশ্য সমূহ ৪টি : (ক) খাঁটি মুসলিম তৈরী করা (খ) এমন একটি মুসলিম সমাজ কায়েম করা যেখানে আল্লাহ্ কালেমা উন্নত থাকবে এবং কুফরীর কালেমা অবনমিত হবে (গ) আল্লাহর জন্য দলীল কায়েম করা (ঘ) আমানত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ওযর পেশ করা।
১৪. সালাফী তরীকায় দাওয়াত দানকারীকে অবশ্যই নিম্নোক্ত দু'টি বিষয়কে তার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।- (ক) (দাওয়াতের) আমানত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ্র নিকট ওযর পেশ করা। (খ) হঠকারী বান্দাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর জন্য দলীল কায়েম করা। এরপর বাকী দু'টি উদ্দেশ্য আল্লাহর উপরে ন্যস্ত করতে হবে। চাইলে তিনি তাড়াতাড়ি সে দু'টি বাস্তবায়িত করবেন, চাইলে দেরীতে করবেন। সে দু'টি হ'ল: (ক) মানুষের হেদায়াত পাওয়া এবং (খ) তাঁর শরী'আত যমীনে কায়েম হওয়া।
১৫. সালাফী দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য সমূহ ৩টি : (ক) তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা (খ) ঐক্যের বাস্তবায়ন (গ) ইসলামের বুঝকে সহজবোধ্য করা।
১৬. সালাফী দাওয়াতের মাধ্যমে উম্মতের ঐক্যের দাওয়াত। যা ব্যবহারিক জীবনে একক বিধান চালু করতে চায় কিতাব ও সুন্নাহ্ ভিত্তিতে। ইমামদের কথা তারা গ্রহণ করবে। কিন্তু কোন একজনের রায়ের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না। অতএব হে আমার জাতি! এই দাওয়াতের মধ্যে কোন ত্রুটি আছে কি?
১৭. কিন্তু এই সহজ-সরল দ্বীন আজ মানুষের নিকট অবোধ্য করে তোলা হয়েছে এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ হ'তে সরাসরি ফায়েদা হাছিলের পথ লোকদের জন্য রুদ্ধ করা হয়েছে। ফলে ইসলাম এখন রূপকথার গল্প সমূহের মত হয়ে গেছে। এর কারণ হ'ল ইসলাম বিষয়ক শাখা- প্রশাখা সমূহের জন্য বিভিন্ন পরিভাষার ছড়াছড়ি। ইলম ও মা'রেফাতের (নামে আলাদা পরিভাষা) সৃষ্টি হ'ল, যাতে ইসলামের কিছুই নেই।... আরবী সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেও দেখছি যে, কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে কিছুই জ্ঞান রাখেন না, সামান্য কিছু ব্যতীত। এমনিভাবে উছুলে ফিক্বহে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তি তাওহীদ ভাল বুঝেন না। এমনকি তিনি ওযূর নিয়মটাও ভালভাবে জানেন না।
১৮. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বর্তমানে এমন সব আলেম তৈরী করছে, যারা মিম্বরে ও স্টেজে দাঁড়িয়ে লোকদের নিকট উচ্চকণ্ঠে বক্তৃতা করেন। কিন্তু ছহীহ ও মওযু' হাদীছ এবং বানাওয়াট কথাসমূহের পার্থক্য বুঝেন না। এভাবে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি ইসলামী শিক্ষার বিভিন্ন শাখার উপরে পৃথক পৃথক বিশেষজ্ঞ তৈরী করছে, যারা ইসলামের সামষ্টিক জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছেন।
১৯. সালাফী দাওয়াতের প্রধান প্রচেষ্টা হ'ল মানুষের জন্য ইসলামের বুঝকে সহজ করে দেওয়া। আর তা হ'ল সমস্ত মানুষের নিকট কিতাব ও সুন্নাহর শিক্ষা ও জ্ঞান সহজ ও স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়ার সমস্ত পথ খুলে দেয়া। যাতে এই জ্ঞান সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।... বরং ইসলামের জ্ঞান হবে সকলের জন্য উন্মুক্ত। যেমন মুক্ত বায়ু থেকে আমরা নিঃশ্বাস নিয়ে থাকি।
২০. এই সহজবোধ্যতা বিগত যুগে যত না যরূরী ছিল, বর্তমান যুগে তা আরও অধিক যরূরী এবং আমাদের জন্য অধিক প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা এ যুগের মানুষ তাদের সমস্ত জীবনটাই বলতে গেলে দুনিয়াবী শিক্ষা অর্জনের মধ্যে লিপ্ত রাখে।... আর সে কারণেই সালাফী শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ পদ্ধতি। কেননা এটি মানুষের কাছ থেকে খুব কম সময় নেয় এবং তাকে সর্বাধিক ফায়েদা প্রদান করে।
২১. এই ফায়েদাটিই হ'ল সালাফী তরীকায় পদচারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য। যা নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর তরীকা। যা তিনি অতি অল্প আয়াসে ও স্বল্প প্রচেষ্টায় সমস্ত উম্মতকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর ছাহাবীগণও সেটা করে গিয়েছেন।... এভাবে আমরা মনে করি সালাফী উত্তরসুরীগণ তাদের প্রথম যুগের নেতৃবৃন্দের ন্যায় উপরোক্ত বিশেষ গুণ সমূহের অধিকারী হবে।