📄 (গ) ইসলামের বুঝকে সহজবোধ্য করা
আল্লাহ তা'আলা ইসলামী দ্বীনকে ও তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন এবং যেহেতু মানুষের মধ্যে মেধা ও বুঝের তারতম্য আছে, সেকারণ আল্লাহ রব্বুল 'আলামীন স্বীয় প্রেরিত দ্বীনকে কেবল ব্যবহারগত দিক দিয়েই নয়, বরং জ্ঞানগত দিক দিয়েও সহজ করে দিয়েছেন। অতএব দ্বীনের বুনিয়াদী সত্যগুলি উপলব্ধি করা খুবই সহজ। চাই তা আক্বীদা-বিশ্বাসগত হৌক কিংবা জ্ঞানগত ও বিধানগত হৌক। যেমন তাওহীদের বিষয়টি অল্প কথায় ও স্বল্প সময়ের বৈঠকেই বুঝা সম্ভব ঐ ব্যক্তির জন্য, যিনি কুরআন ও সুন্নাহ্ জ্ঞানে প্রকৃত জ্ঞানী। তেমনিভাবে ইসলামের পাঁচটি বুনিয়াদী ফরযের হুকুম-আহকাম মোটামুটিভাবে যেকোন স্বল্পবুদ্ধির লোক অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে নিতে পারে। যেমন ওযূ ও ছালাতের নিয়ম-কানুন, ছিয়াম ও হজ্জের বিধি-বিধান সমূহ, যাকাতের মাসায়েল প্রভৃতি আয়ত্ত করতে যে কারু পক্ষেই এক-দু'ঘণ্টা বা আরও স্বল্প সময়ে শিখে নেওয়া সম্ভব হয়। যদি সেটি কোন বিদ্বান ব্যক্তি শিক্ষা দেন।
মোটকথা ইসলাম বুঝ ও জ্ঞানের দিক দিয়ে এবং আমলের দিক দিয়ে একটি সহজ জীবন পদ্ধতি। কোন দিক দিয়েই এতে কোন কাঠিন্য নেই। যেমন আল্লাহ বলেন, 'কুরআনকে উপদেশের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব আছে কি কেউ উপদেশ গ্রহণকারী?' (ক্বামার ৫৪/১৭)। ইসলামী শরী'আতের ভিত্তি হিসাবে আল-কুরআন যে যিকর বা চিন্তা-গবেষণার জন্য খুবই সহজ, অত্র আয়াত তার স্পষ্ট দলীল। আর যিকর ইল্ম ও আমলকে শামিল করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই এই দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি এই দ্বীনকে কঠিন করে, দ্বীন তাকে পরাজিত করে। অতএব তোমরা মধ্যপন্থার উপরে দৃঢ় থাক ও সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য সন্ধান কর'। ইসলাম বুঝা ও তার উপর আমল করা যে সহজ, উক্ত হাদীছ তার অন্যতম দলীল।
কিন্তু এই সহজ-সরল দ্বীন আজ মানুষের নিকট অবোধ্য করে তোলা হয়েছে এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ হ'তে সরাসরি ফায়েদা হাছিলের পথ লোকদের জন্য রুদ্ধ করা হয়েছে। ফলে ইসলাম এখন রূপকথার গল্প সমূহের মত হয়ে গেছে। এর কারণ হ'ল ইসলাম বিষয়ক শাখা-প্রশাখা সমূহের জন্য বিভিন্ন পরিভাষার ছড়াছড়ি। ইলম ও মা'রেফাতের (নামে আলাদা পরিভাষা) সৃষ্টি হ'ল, যাতে ইসলামের কিছুই নেই। যদিও আমরা ওগুলিকে উপরোক্ত নামে নামকরণ করেছি। কুরআন ও সুন্নাহ বুঝার মাধ্যম তথা আরবী ভাষার ব্যাকরণ ও উছুলে ফিক্বহ বিষয়ে দারুশ বাড়াবাড়ি শুরু হ'ল। ফলে উপরোক্ত বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিগণও তাদের মূল লক্ষ্য কুরআন ও হাদীছ বুঝার ক্ষেত্রে অপারগ হয়ে পড়লেন। এমনকি ইসলামের অন্যান্য শাখা-প্রশাখাগুলি সম্পর্কেও তারা অজ্ঞ হয়ে রইলেন। এমনকি আমরা আরবী সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেও দেখছি যে, কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে কিছুই জ্ঞান রাখেন না, সামান্য কিছু ব্যতীত। তেমনিভাবে উছুলে ফিক্বহে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তি তাওহীদ ভাল বুঝেন না। এমনকি তিনি ওযূর নিয়মটাও ভালভাবে জানেন না। জানেন না কুরআন ও সুন্নাহ হ'তে কোন বিষয়ের সঠিক সমাধান বের করতে। বরং তার চাইতে কঠিন ও তিক্ত বিষয় হ'ল এই যে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বর্তমানে এমন সব আলেম তৈরী করছে, যারা মিম্বরে ও স্টেজে দাঁড়িয়ে লোকদের নিকট উচ্চকণ্ঠে বক্তৃতা করেন। কিন্তু ছহীহ ও মওযু' হাদীছ এবং বানাওয়াট কথাসমূহের পার্থক্য বুঝেন না। এভাবে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি ইসলামী শিক্ষার বিভিন্ন শাখার উপরে পৃথক পৃথক বিশেষজ্ঞ তৈরী করছে, যারা ইসলামের সামষ্টিক জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছেন।
এমনিভাবে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি কিছু ধর্মীয় পুরোহিত সৃষ্টির কাজে পরস্পরে অংশগ্রহণ করেছে। তারা লোকদের কাছ থেকে দ্বীন গোপন করেছে ঐসব আলেমদের মাধ্যমে যারা নিজেদেরকে দ্বীনের 'অছি' বা তত্ত্বাবধায়ক বলে দাবী করেন। যখন তুমি তাদের কাছে কোন একটি বিষয় বুঝার জন্য দলীল সন্ধানের উদ্দেশ্যে আসবে, তখন তারা বলবেন, 'আমাদের সঙ্গে তর্ক করো না। আমাদের কথা মেনে নাও, দলীল জিজ্ঞেস করো না'। এটা এজন্য যে, তারা তোমার জ্ঞান চক্ষুকে বন্ধ করে দিতে চায় এবং মানুষকে অজ্ঞ রেখে অন্ধের মত তাদের পিছনে ঘুরাতে চায়।
সালাফী দাওয়াতের প্রধান প্রচেষ্টা হ'ল মানুষের জন্য ইসলামের বুঝকে সহজ করে দেওয়া। আর তা হ'ল সমস্ত মানুষের নিকট কিতাব ও সুন্নাহর শিক্ষা ও জ্ঞান সহজ ও স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়ার সমস্ত পথ খুলে দেয়া। যাতে এই জ্ঞান সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। মানুষ যেন কুরআন ও সুন্নাহ্র সাথে যুক্ত হয় এবং তা অনুধাবন করে ও তার বুঝ হাছিল করে। সেই সাথে দ্বীন ও আমলের বুঝ যেন কেবলমাত্র বিশেষ পোষাকের ও বিশেষ চাল-চলনের একদল লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং ইসলামের জ্ঞান হবে সকলের জন্য উন্মুক্ত। যেমন মুক্ত বায়ু থেকে আমরা নিঃশ্বাস নিয়ে থাকি।
আল্লাহ্র রহমতে এর প্রভাব আমরা আমাদের ভাইদের মধ্যে দেখতে পাই। যখনি তারা সালাফী পদ্ধতি অনুযায়ী ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করেন, তখনি অল্পদিনের মধ্যেই তারা যথেষ্ট জ্ঞানী বনে যান। আক্বীদা, ব্যবহারিক জ্ঞান ও আচরণের দিক দিয়ে দ্বীনের মোটামুটি বিষয়গুলি সম্পর্কে পরিষ্কার ও সম্যক জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার কারণে এবং দৈনিক তার ইলম বৃদ্ধির প্রচেষ্টার কারণে। অবশ্য তার জন্য চিকিৎসককে তার চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারকে তার পেশা ও ব্যবসায়ীকে তার ব্যবসা ছাড়তে হয় না। এটা এজন্যই সম্ভব হয় যে, সালাফী পদ্ধতি শিক্ষার্থীকে তার দ্বীন বুঝবার বিভিন্ন পথ-পন্থার সন্ধান দেয়। ফলে তিনি ইসলামের মূলনীতি সমূহ এবং আক্বীদা ও আহকাম বিষয়ের মূল সূত্রগুলি অবহিত হন। অবহিত হন কিভাবে একজন ব্যক্তি তাক্বলীদের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তার অধিকারী হ'তে পারেন। কিভাবে আলেমদের কথার উপর গোঁড়ামি না করেও তাদেরকে সম্মান দেখানো যায়। অবহিত হন কিভাবে হক গ্রহণ করতে হয়, যেখান থেকেই তা পাওয়া যাক না কেন, যদি তা দলীল দ্বারা শক্তিশালী হয়। কিভাবে বাতিলকে পরিত্যাগ করতে হয়, যে সূত্র থেকেই তা পাওয়া যাক না কেন, যদি তার বাতিল হওয়ার দলীল পাওয়া যায়। এভাবেই ইসলাম খুব সহজে বোধগম্য হয়।
এই সহজবোধ্যতা বিগত যুগে যত না যরূরী ছিল, বর্তমান যুগে তা আরও অধিক যরূরী এবং আমাদের জন্য অধিক প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা এ যুগের মানুষ তাদের সমস্ত জীবনটাই বলতে গেলে দুনিয়াবী শিক্ষা অর্জনের মধ্যে লিপ্ত রাখে। আধুনিক সভ্যতা তাদেরকে ধ্বংস করার পিছনে সর্বদা লেগে আছে। লোকেরা পার্থিব জীবন-জীবিকার পিছনে তাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত রেখেছে। আর সে কারণেই সালাফী শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ পদ্ধতি। কেননা এটি মানুষের কাছ থেকে খুব কম সময় নেয় এবং তাকে সর্বাধিক ফায়েদা প্রদান করে। ফলে একজন ব্যক্তিকে তার সমস্ত জীবন শেষ করতে হয় না কোন মাসআলায় হাশিয়া, টীকা-টিপ্পনী, শাখা-প্রশাখা ও অন্যান্য অনর্থক বিষয় সমূহ জানার জন্য। যা তার দ্বীনের বা দুনিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। বরং সালাফী দাওয়াত প্রধানতঃ দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলির দিকে মনোনিবেশ করে। অতঃপর ঈমান ও আক্বীদা শুদ্ধ করার জন্য তাকে তাওহীদের মূলনীতিগুলি শিক্ষা দেয়। অতঃপর আমল শুদ্ধ করার জন্য ও সৎকর্মশীল হওয়ার জন্য ইবাদতের মূলনীতিগুলি শিক্ষা দেয়। অমনিভাবে আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের জন্য শুদ্ধিতার মূলনীতিগুলি তা'লীম দেয়। সবকিছুই হয় কিতাব ও সুন্নাহ থেকে। যেন একজন সালাফী তার যাবতীয় কাজকর্ম আল্লাহ ও রাসূলের কালাম অনুযায়ী করতে অভ্যস্ত হয়। আল্লাহ্র যে কালামকে তিনি 'রূহ' ও 'নূর' এবং রাসূলের যে কালামকে তিনি 'হিকমত' ও 'হেদায়াত' নামে অভিহিত করেছেন।
তৃতীয় এই বিষয়টিই হ'ল সালাফী তরীকায় পদচারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য। যা নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর তরীকা। যা তিনি অতি অল্প আয়াসে ও স্বল্প প্রচেষ্টায় সমস্ত উম্মতকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর ছাহাবীগণও সেটা করে গিয়েছেন। যেমন ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'ছাহাবীগণ ছিলেন এই উম্মতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী, গভীর জ্ঞানী ও সর্বাপেক্ষা কম ভানকারী'। এভাবে আমরা মনে করি সালাফী উত্তরসুরীগণ তাদের প্রথম যুগের নেতৃবৃন্দের ন্যায় উপরোক্ত বিশেষ গুণ সমূহের অধিকারী হবে।
سبحانك اللهم وبحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك وأتوب إليك، اللهم اغفر لي ولوالدي وللمؤمنين يوم يقوم الحساب -
টিকাঃ
৩৯. নাসাঈ হা/৫০৩৪; বুখারী হা/৩৯; মিশকাত হা/১২৪৬।
৪০. রাযীন, মিশকাত হা/১৯৩; ইবনু আব্দিল বার, জামে'উ বায়ানিল 'ইলমি ওয়া ফাযলিহী ২/৯৭ পৃ. ১৮১০; সনদ মুনক্বাতি' হ'লেও ইবনু ওমর (রাঃ) হ'তে 'হাসান' সনদে একই মর্মে বর্ণিত 'আছার' দ্বারা প্রমাণিত (আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ১/৩০৫ পৃ.); হেদায়াতুর রুওয়াত হা/১৯১, টীকা-২।