📘 সালাফি দাওয়াতের মূলনীতি 📄 (খ) ঐক্যের বাস্তবায়ন

📄 (খ) ঐক্যের বাস্তবায়ন


ইসলামী দাওয়াত সমগ্র মানবজাতির প্রতি দাওয়াত। যেমন আল্লাহ স্বীয় নবীকে বলেন, 'তুমি বল, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল। যার জন্যই আসমান ও যমীনের রাজত্ব' (আ'রাফ ৭/১৫৮)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, '(জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না' (সাবা ৩৪/২৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন 'অন্যান্য নবীগণ স্ব স্ব জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। আর আমি সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছি'। একই মর্মের বহু আয়াত ও হাদীছ রয়েছে।

কিন্তু যখন মানুষ এই মহান রাসূলের ব্যাপারে মতভেদ করেছে এবং তাদের মধ্যে মুমিন ও কাফের হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, 'তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের মধ্যে রয়েছে কাফের ও মুমিন' (তাগাবুন ৬৪/২), তখন আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসী বান্দাদেরকে পরস্পরে ভাই হিসাবে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, 'নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পরে ভাই ভাই' (হুজুরাত ৪৯/১০)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে কেউ (পূর্ণ) মুমিন হ'তে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেই বস্তু পসন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পসন্দ করে'। অর্থাৎ পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব না থাকলে ঈমানও থাকবে না। এ কারণেই ঝগড়ার সময় বাজে কথা বলাকে 'মুনাফিকের নিদর্শন' হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। আর তা হ'ল ঝগড়ার সময় বাড়তি কথা বলা। বিশ্বাসী সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের প্রতি উৎসাহ ও তার ভিত্তিকে মযবুত করা এবং আপোষে দলাদলি ও অনৈক্য সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সমূহে বর্ণিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, 'তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ কর এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহ্র সেই নে'মতের কথা স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তর সমূহে মহব্বত পয়দা করে দিলেন। অতঃপর তোমরা তার অনুগ্রহে পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা অগ্নি গহ্বরের কিনারায় অবস্থান করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করলেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করেন, যাতে তোমরা সুপথপ্রাপ্ত হও' (আলে ইমরান ৩/১০৩)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া প্রদর্শনের ব্যাপারে মুমিনদের তুলনা একটি দেহের ন্যায়। জাগরণে কিংবা জ্বর অবস্থায় তার একটি অঙ্গ ব্যথাতুর হ'লে সমস্ত অঙ্গ ব্যথাতুর হয়ে ওঠে'। তিনি বলেন, 'আমার মৃত্যুর পরে তোমরা একে অপরের গর্দান উড়িয়ে দিয়ে পুনরায় কাফের হয়ে যেয়ো না'। তিনি আরও বলেন, 'মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফুরী'। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যাতে মুসলিম উম্মাহ পরস্পরে ভাই হিসাবে নিকটবর্তী হয়। আর আল্লাহ এজন্য তাদেরকে বহু পুরস্কারও ঘোষণা করেছেন। যেমন হাদীছে এসেছে, যখন কোন ব্যক্তি তার কোন মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে আল্লাহর ওয়াস্তে মোলাকাতের জন্য নিজের গ্রাম (বা বাসা) থেকে অন্যত্র গমন করে, আল্লাহ তাঁকে মাফ করে দেন। এছাড়া তিনি ঐ স্বামী-স্ত্রীকেও ক্ষমা করে দেন, যারা মেহমানকে খাওয়ানোর পর নিজেরা সন্ত ান-সন্ততি নিয়ে অভুক্ত অবস্থায় রাত্রি যাপন করে'।

আর এটা বাস্তব যে, এই বিস্ময়কর ভ্রাতৃত্ববোধের কারণেই প্রাথমিক যুগে ইসলামের ব্যাপক প্রসার লাভ সম্ভব হয়েছিল, যা ছাহাবায়ে কেরামকে কঠিন ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। যদি মুহাজির ভাইদের জন্য আনছার ভাইয়েরা বসবাসের ব্যবস্থা না করতেন এবং মুহাজিরগণ আনছার ভাইদের প্রতি অভূতপূর্ব ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন না করতেন, তাহ'লে এইসব বড় বড় বিজয় কখনোই সম্ভব হ'ত না এবং প্রাচ্যে ও প্রতীচ্যে এত দ্রুত ইসলামের প্রসার লাভ ঘটতো না। এজন্যেই উম্মতের উপর সব চাইতে বড় মুছীবত হ'ল তাদের মধ্যে হঠকারিতা, বিভেদ ও দলাদলি সৃষ্টি হওয়া এবং যে তরবারি তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত হ'ত, তা নিজেদের উপর পরিচালিত হওয়া।

এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহকে বলেছিলেন, 'তুমি এই তরবারি নাও এবং লড়াই কর। যখন দেখবে আমার উম্মত আপোষে মতভেদ করছে এবং একে অপরকে মারছে, তখন তুমি তরবারিটিকে কোন শক্ত পাথরের উপর মেরে টুকরো টুকরো করে ফেল।.... মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ (রাঃ) তাই-ই করেছিলেন'। 'তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর। আপোষে ঝগড়া কর না। তাহ'লে তোমরা হীনবল হবে ও তোমাদের শক্তি উবে যাবে। তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন' (আনফাল ৮/৪৬)।

বুঝা গেল যে, হীনবল হওয়ার ও বিজয় না আসার একমাত্র কারণ হ'ল দলাদলি। বর্তমান যুগের মুসলিমদের অবস্থাও তাই। বিরাট সংখ্যক উম্মত ও বিপুল সম্ভাবনাময় উত্তরাধিকার থাকা সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহ আজ একটি দুর্বল ছিন্ন ভিন্ন ও পরাজিত জাতি। এই দুর্বলতার একমাত্র কারণ আপোষে দলাদলি ও কলহ-বিবাদ। মুসলিমদের মধ্যে এই ঝগড়া ও দলাদলি প্রবেশ করেছে অনেকগুলি দরজা দিয়ে। তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হ'ল।-
ক. আক্বীদা ও ঈমান বিষয়ক মতভেদ : প্রথমদিকে সামান্য কয়েকটি ছোট-খাট বিষয়ে এই মতভেদ শুরু হয়। যেমন (১) কবীরা গুনাহগার ব্যক্তি যদি বিনা তওবায় মারা যায়, সে কি কাফের হবে, না মুসলিম থাকবে? তার বিরুদ্ধে লড়াই করা চলবে কি চলবে না? মতভেদের এই পথে প্রথম সৃষ্টি হ'ল খারেজী দল এবং পরে মু'তাযিলা সম্প্রদায়। তারপর শুরু হ'ল (২) আল্লাহ্ নাম ও গুণাবলী সংক্রান্ত মতভেদ। আক্বীদাগত এই মতভেদ বিস্তৃত হয়ে বহু প্রশ্নের জন্ম দিল। যাতে মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন দল ও মতে বিভক্ত হয়ে গেল। আল্লামা শাহরাস্তানীর 'আল- মিলাল ওয়ান নিহাল', আব্দুল কাদের জুরজানীর 'আল-ফারকু বায়নাল ফিরাকু', আবুল হাসান আশ'আরীর 'ইখতেলাফুল মুসলিমীন ওয়া আক্বায়িদুল মুছাল্লীন প্রভৃতি কিতাবগুলিতে একটু নযর বুলালেই তুমি দেখতে পাবে, তৃতীয় শতাব্দী হিজরী সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই মুসলিমদের মধ্যে আক্বীদাগত দিক দিয়ে কত দলের আবির্ভাব ঘটেছিল। আর আক্বীদাগত বিরোধ স্বাভাবিকভাবেই আমল ও হৃদয়গত বিরোধে পরিণত হয়।
সালাফী দাওয়াতের কর্মীগণ প্রথম থেকেই আক্বীদাগত বিষয় সমূহে যাবতীয় বাজে তাবীল, স্বেচ্ছাচারিতা ও পক্ষপাতিত্ব দূরে নিক্ষেপ করে কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার প্রতি আহবান জানিয়ে আসছে। তাদের এই দাওয়াতের বরকতে অধিকাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী আক্বীদার ক্ষেত্রে হক পথের অনুসারী থাকে। বর্তমান যুগের সালাফী দাঈরাও তাদের দাওয়াত ও জিহাদে প্রথম যুগের সালাফী তরীকার উপর চলছেন। তারা উম্মতকে পূর্বের ন্যায় দাওয়াত দিচ্ছেন তাদের আক্বীদাগত বিষয়গুলি স্রেফ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করার জন্য। আর যাবতীয় বিদ'আতী আক্বীদা-বিশ্বাস, ইজতিহাদ ও গায়েবী ধ্যান-ধারণা সমূহ যেগুলি দাজ্জাল ও কালাম শাস্ত্রবিদরা অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহ সম্পর্কে চাপিয়ে দিয়েছে, সেগুলি দূরে ছুঁড়ে ফেলার জন্য। যাতে মুসলিম উম্মাহ একটি কালেমার উপর একত্রিত হয় এবং তাদের ঈমান ও অন্তর সমূহ এক হয়ে যায়।

খ. আমলগত মতভেদ : বিভিন্ন ইবাদত ও ব্যবহারিক বিষয়ের এই মতভেদ যদিও প্রথমোক্ত আক্বীদাগত মতভেদের তুলনায় কম ক্ষতিকর, তথাপি তা কখনো কখনো বিরোধ ও বিভক্তির দিকে টেনে নিয়ে গেছে। সেকারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিরোধ মাত্রই অপসন্দ করতেন। এমনকি ছোট-খাট ফিক্বহী বিষয়েও। ওমর (রাঃ) ছোট-খাট বিরোধে পিটুনী দিতেন। একবার গোসলের একটি মাসআলায় তিনি বলেন, বীর্যপাত হ'লে গোসল ওয়াজিব হবে, না শুধুমাত্র স্ত্রী-পুরুষের অঙ্গ মিলিত হ'লেই গোসল ওয়াজিব হবে। তোমরা বিষয়টি আয়েশার নিকট থেকে জেনে এসো। আয়েশা (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হ'লে তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর ঐ হাদীছটি শুনিয়ে দিলেন যে, যখনই স্ত্রী-পুরুষের অঙ্গ পরস্পর মিলিত হবে, তখনই গোসল ওয়াজিব হবে। তখন ওমর (রাঃ) বলেন, যদি আমি শুনি যে এরপরে কেউ অন্যরকম ফৎওয়া দিয়েছে, আমি তাকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দেব'।

যখন শাখা-প্রশাখাগত সকল ব্যবহারিক বিষয়ে একজনের রায়ের উপর একমত হওয়া সম্ভব না হয়, সে অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা বিরোধপূর্ণ বিষয়কে কিতাব ও সুন্নাহ্ দিকে ফিরিয়ে নিতে বলেছেন (নিসা ৪/৫৯)। এটাই ছিল প্রথম যুগের তরীকা। ছাহাবায়ে কেরাম ও তাদের পরবর্তীদের মধ্যে অনেক সময় বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ ঘটেছে। কিন্তু কেউ নিজ নিজ রায়ের উপর যিদ করতেন না এবং তাদের বিরোধীয় বিষয়গুলিকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে নিতেন। এমনই অবস্থা ছিল চার ইমাম সহ সকল ইমাম ও ফক্বীহদের। তারা ফৎওয়া দিতেন। কিন্তু নিজ মতের উপর যিদ করতেন না। বরং তাদের ছাত্রদের বলতেন, তাদের কথা না ধরে যেখানেই হাদীছ পাবে সেখানেই তা গ্রহণ করতে'। তাদের কোন কথা দলীলের বিরোধী প্রমাণিত হ'লে, তারা তা ছেড়ে দেবার নির্দেশ দিতেন। এর ফলে উম্মতের ঐক্য বহুদিন পর্যন্ত বজায় ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে উম্মতের মধ্যে আবির্ভাব ঘটল এমন কিছু লোকের, যারা ইজতিহাদকে এবং সকল বিরোধীয় বিষয়ে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়াকে হারাম গণ্য করল এবং সরাসরি দলীল থেকে সমাধান গ্রহণ করার বিষয়টিকে বাতিল ঘোষণা করল এই যুক্তিতে যে, দলীল বুঝার ব্যাপারটি শেষ হয়ে গেছে। এভাবে চার ইমামের কথার বাইরে আমল করাকে তারা হারাম করে দিল। আব্বাসীয়দের পতন যুগে উম্মতের দুর্বলতম সময়ে যখন অনারব (আজমী) ও দাস শাসকরা ক্ষমতা পেল, যারা ভালভাবে আরবীও জানতো না এবং দ্বীনের কিছুই বুঝতো না, তাদের আমলে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল। তাক্বলীদ ও পক্ষপাতিত্বের আবির্ভাব হ'ল। মুক্বাল্লিদ ধর্মব্যবসায়ীরা ঐসব শাসকদের চারপাশে জমায়েত হয়ে তাদেরকে আহলে সুন্নাত ও সালাফীদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করতে থাকল। যারা জনসাধারণকে তাক্বলীদ তথা অন্ধ অনুসরণ ও পক্ষপাতদুষ্টতা ছেড়ে স্বাধীনভাবে ইজতিহাদের দিকে আহবান জানাচ্ছিলেন।

ফলে সালাফী দাঈগণ ঐসব লোকদের কাছ থেকে দারশ মন্দ পরিণতির সম্মুখীন হন। স্বার্থান্বেষী মুক্বাল্লিদ নেতারা সাধারণ লোকদের এই বলে ক্ষেপিয়ে তুলল যে, যারা মাসআলা-মাসায়েলের ব্যাপারে দলীল তলব করে এবং ইজতিহাদের কথা বলে, ওরা আসলে চার ইমামের ইলমকে দূরে নিক্ষেপ করতে চায়। এরা তাদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে ও তাঁদেরকে অসম্মান করে। সাধারণ লোক যারা ইমামদের ভালোবাসে ও তাদেরকে সম্মান করে, যারা তাক্বলীদী দাওয়াত ও সালাফী দাওয়াতের মধ্যে পার্থক্য বুঝে না, তাক্বলীদ ও ইজতিহাদ এবং দলীল থেকে সমাধান গ্রহণের বিষয়টি যাদের বোধগম্য নয়, তারা স্বাভাবিক কারণেই এ অপপ্রচারে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ফলে সালাফীদের উপর ত্রিমুখী হামলা নেমে আসে। (১) জাহিল অনারব সুলতানদের পক্ষ থেকে সরকারী নির্যাতন। (২) তাগূতদের ছত্রছায়ায় পেট পূজারী দুষ্ট আলেমগণ এবং (৩) মূর্খ জনসাধারণ। এভাবে বিরোধ চলতে থাকে। অবশেষে ওছমানীয় খেলাফত শেষ হয়ে যায় এবং ইউরোপ থেকে ফিরিংগীরা এসে ইসলামী সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। তখন মুসলিমরা নিজেদেরকে সকল জাতি থেকে পিছপা দেখতে পায় এবং কিতাব ও সুন্নাতের দিকে পুনরায় ফিরে যাওয়ার জন্য চিৎকার শুরু করে দেয়।

চারিদিকের ব্যাপক চিৎকার ধ্বনির মধ্যে আমরা আমাদের আমলগুলিকে কিতাব ও সুন্নাত অনুযায়ী করার জন্য সর্বদা চেষ্টিত থেকেছি। যদিও তখন আমাদের চারপাশে এমনসব লোক ছিল, যারা তাক্বলীদী গোঁড়ামী ও জড়তার মধ্যে জীবন যাপন করত। মুসলমানরা শারঈ বিধান ছাড়াই চলুক, এটাই তারা চাইত। তারা দ্বীনের নামে যেকোন কথাই গ্রহণ করা সিদ্ধ মনে করত। কেউ ধারণা করত যে, ইজতিহাদ বাতিল। দ্বীন সীমায়িত হয়ে গেছে চার ইমামের মধ্যে এবং তাঁদের অনুসরণ করাই মুসলিমদের উপর ওয়াজিব। কেউ সালাফী দাঈদের ইমামগণের শত্রু হিসাবে অপবাদ দিত। বরং চার ইমামের কোন একজনের অনুসরণকে মুসলমানদের উপর ওয়াজিব বলত। আর যে ব্যক্তি দলীলের অনুসরণ করবে এবং কিতাব ও সুন্নাতের দিকে ফিরে যাবে, সে হবে বাতিলপন্থী ও বিদ'আতী।

আমি বলি, মুসলিমদের মধ্যে উপরোক্ত আক্বীদার লোক চিরদিন ছিলেন। তারা লোকদের চিরকাল এ পথে আহবান জানিয়ে গেছেন। কারণ এটি নিশ্চিতভাবে জানা কথা যে, কোন একটি বিষয়ে ইমামদের একটি, দু'টি, তিনটি এমনকি চারটি মতও রয়েছে। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, এ বিষয়ে ইমাম শাফেঈ পূর্বে (ক্বাদীম) একথা বলেছিলেন, পরে (জাদীদ) একথা বলেছেন। এভাবে বিভিন্ন ফিক্বহী বিষয়ে ইমামদের মতভেদ খুবই স্পষ্ট। যদিও ব্যবহারিক বিধানগুলি একই ধরনের হওয়া ওয়াজিব ছিল। কিন্তু এসব বিষয়গুলিতেও যেখানে ফিক্বহ শাস্ত্রবিদ ইমামগণের মধ্যে মতভেদ আছে, সেখানে কিভাবে মুসলিম ঐক্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হ'তে পারে?

যদি আমরা বলি যে, আমরা অমুক ইমামের কথা সমর্থন করি, তাহ'লে এটাও হবে এক ধরনের যিদ। কেননা উক্ত ইমাম মা'ছুম বা ভুলের ঊর্ধ্বে নন যে, আমাদের সমস্ত ব্যাপারে তার দেওয়া সকল সিদ্ধান্ত অবনত মস্তকে মেনে চলতে হবে। যদি বলি সকলের সকল কথা মানতে হবে, তাহ'লে সেটাও হবে আর এক বিরোধ ও বিভেদের ঝামেলা। যেমন ইসলামী আদালতে যদি এমন একটি মামলা আসে যে, মনে করুন... একটি মেয়ে তার অলীর বিনা অনুমতিতে বিয়ে করেছে। এক্ষণে তার বিয়ে সিদ্ধ হবে, না অসিদ্ধ হবে? কোন মাযহাব অনুযায়ী তার বিয়ে সিদ্ধ, আবার কোন মাযহাব অনুযায়ী তার বিয়ে বাতিল। চাই তাদের মধ্যে মিলন ঘটুক বা না ঘটুক। তাহ'লে এমন অবস্থায় বিচারক কি রায় দিবেন?

যদি বলি যে, কোন একটি মাযহাবের রায়কে চূড়ান্ত বলে রায় দেওয়া হবে। তাহ'লে প্রশ্ন আসবে সেটা কি আপনার ইচ্ছামত? দ্বীনের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতার তো কোন স্থান নেই। আর যদি বলা হয় যে, না দলীলের ভিত্তিতে রায় চূড়ান্ত করা হবে। তাহ'লে তো সেটাই হ'ল সালাফী তরীকা। কেননা আমাদের মতে, যখন কোন বিষয়ে ইমামদের মতভেদ ঘটবে, সেখানে যে ইমামের রায় দলীলের যত নিকটবর্তী হবে, সেটাই গ্রহণযোগ্য হবে। মোটকথা দলীল অনুযায়ীই চিরকাল ফায়ছালা হবে। আর এটাই হ'ল ইসলামী ঐক্য সৃষ্টির একমাত্র মানদণ্ড। সালাফী দাওয়াতের এটি হ'ল একটি দিক। আর তা হ'ল যাবতীয় ব্যবহারিক বিষয়ে শারঈ বিধানের ঐক্য কামনা। এটা সম্ভব হবে চার ইমামের সকলের প্রতি ভালোবাসা বজায় রেখে সকলকে সমান নযরে দেখে যার যে কথাটি দলীলের দিক দিয়ে অধিক শক্তিশালী ও হক হবে, তার কথাটি কোনরূপ যিদ ছাড়াই গ্রহণ করা। আর এভাবেই তারা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমরাও সেদিকে দাওয়াত দিয়ে থাকি। বস্তুতঃ এটাই হ'ল বিধানগত ও ব্যবহারগত অনৈক্য থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

অতঃপর হক যেমন এক, অসংখ্য নয় এবং সালাফীরাও হকের সন্ধানী, ব্যক্তি পূজারী নন, সেকারণ তারা মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্যের হেফাযতকারী। সমাজে চিরদিন অনুসারী লোকের সংখ্যা অধিক থাকে। এক্ষণে প্রত্যেক লোকের যদি এক একটি অনুসারী দল থাকে, তাহ'লে দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যখন দলীয় নেতারা বিভিন্ন মতের হন, তখন স্বাভাবিকভাবে দলগুলিও বিভিন্ন মতের হয়ে যায়। এভাবেই মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে যখন পারস্পরিক যোগসূত্র হবে হক-এর মাধ্যমে ও হক-এর জন্য এবং ব্যক্তিকে পরিমাপ করা হবে হক-এর দ্বারা। আর তাদের কথার উপর পক্ষপাতিত্ব করা হবে না, তখন সেখানে মূলতঃ একটি দলই কায়েম হবে- জামা'আতুল হক বা সত্যের দল। যেখানে লোকেরা পরস্পরকে সম্মান করবে ও বিদ্বানদের কথা মেনে চলবে হকের প্রতি তাদের আনুগত্য ও অনুসরণের উপর ভিত্তি করে। এজন্যই আমরা বলি যে, সালাফী দাওয়াত হ'ল উম্মতের ঐক্যের দাওয়াত। যা ব্যবহারিক জীবনে একক বিধান চালু করতে চায় কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে। ইমামদের কথা তারা গ্রহণ করবে। কিন্তু কোন একজনের রায়ের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না। অতএব হে আমার জাতি! এই দাওয়াতের মধ্যে কোন ত্রুটি আছে কি?

টিকাঃ
২৮. বুখারী হা/৩৩৫; মুসলিম হা/৫২১; মিশকাত হা/৫৭৪৭।
২৯. বুখারী হা/১৩; মুসলিম হা/৪৫; মিশকাত হা/৪৯৬১।
৩০. মুসলিম হা/২৫৮৬; বুখারী হা/৬০১১; মিশকাত হা/৪৯৫৩।
৩১. মুসলিম হা/১৬৭৯ (২৯) আবু বাকরাহ হ'তে; বুখারী হা/১৭৩৯, ৪৪০৫ ইবনু আব্বাস ও জারীর হ'তে; মিশকাত হা/৩৫৩৭।
৩২. বুখারী হা/৪৮; মুসলিম হা/৬৪; মিশকাত হা/৪৮১৪। এখানে কুফরী বলতে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ বুঝানো হয়েছে। প্রকৃত কুফরী নয়, যা মুমিনকে ঈমানের গণ্ডী থেকে বের করে দেয়।
৩৩. মুসলিম হা/২৫৬৭; মিশকাত হা/৫০০৭, আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে।
৩৪. বুখারী হা/৪৮৮৯; মুসলিম হা/২০৫৪; মিশকাত হা/৬২৫২, আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে।
৩৫. আহমাদ হা/১৮০০৮; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৬২।
৩৬. তিরমিযী হা/১০৯; মিশকাত হা/৪৪২।
৩৭. হাদীছ كَانَ الْمَاءِ مِنَ الْمَاءِ 'পানির বদলে পানি' (তিরমিযী হা/১১০) এবং إِذَا الْتَقَى الْحَتَانَانِ فَقَدْ وَجَبَ الْغُسْلُ 'যখন স্ত্রী ও পুরুষের অঙ্গ পরস্পরে মিলিত হবে, তখন গোসল ফরয হবে' (তিরমিযী হা/১০৯)। দু'টি ছহীহ হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, প্রথমটির অর্থ স্বপ্নদোষে পানি দেখতে পেলে গোসল করবে, নইলে নয়। কিন্তু উবাই বিন কা'ব সহ অনেক ছাহাবী মনে করেন উক্ত হাদীছটি হুকুম ইসলামের প্রথম যুগে ছিল, যা পরের হাদীছটি দ্বারা 'মনসূখ' বা হুকুম রহিত হয়েছে। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী মিলনের ফলে বীর্যপাত হ'লেই কেবল গোসল ফরয হবে, নইলে নয়। তখন ওমর (রাঃ) বিষয়টির ফায়ছালার জন্য আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট লোক পাঠালেন। তিনি এসে দ্বিতীয় হাদীছটি বললে ওমর (রাঃ) শেষেরটির উপর রায় দেন এবং এর উপরেই ছাহাবীগণের ইজমা হয় (বদরুদ্দীন 'আয়নী, নাখবুল আফকার ফী তানক্বীহি মাবানিল আখবার ফী শারহে মা'আনিল আছার (কাতার: ১ম সংস্করণ ১৪২৯ হি./২০০৮ খৃ.) ১/৪৮৪)।
৩৮. যেমন ইমাম আবু হানীফা (৮০-১৫০ হি.) বলেন, 'যখন ছহীহ হাদীছ পাবে, জেনো সেটাই আমার মাযহাব' (ইবনু 'আবেদীন, রাদ্দুল মুহতার (বৈরূত) ১/৬৭)। (২) ইমাম মালেক (৯৩-১৭৯হি.) বলেন- 'এমন কোন মানুষ নেই, যার সকল কথা গ্রহণীয় ও সকল নিষেধ বর্জনীয়, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যতীত'। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর কবরের দিকে ইশারা করে বলতেন, 'এই কবরবাসী ব্যতীত' (আল-মাদখাল আল-মুফাছছাল (জেদ্দা : ১ম সংস্করণ ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খৃ.) ১/৫৬)। (৩) ইমাম শাফেঈ (১৫০-২০৪ হি.) বলেন- 'যখন তোমরা আমার কোন কথা হাদীছের বিরোধী পাবে, তখন তোমরা হাদীছের উপর আমল কর এবং আমার কথা দেওয়ালে ছুঁড়ে মার'। (৪) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (১৬৪-২৪১ হি.) বলেন- 'তোমরা আমার তাক্বলীদ করো না এবং তাক্বলীদ করো না মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ, নাখঈ বা অন্য কারু। বরং আহকাম গ্রহণ কর, যেখান থেকে তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন, কিতাব ও সুন্নাহ থেকে' (শাহ ওয়ালিউল্লাহ, ইকুদুল জীদ পৃ. ১১০-১১; থিসিস ১৭৭ পৃ.)। (৫) চার ইমামের প্রত্যেকেই বলেছেন, 'যখন ছহীহ হাদীছ পাবে, সেটাই আমাদের মাযহাব' (আব্দুল ওয়াহহাব শা'রানী, কিতাবুল মীযান (দিল্লী) ১/৭৩)।

📘 সালাফি দাওয়াতের মূলনীতি 📄 (গ) ইসলামের বুঝকে সহজবোধ্য করা

📄 (গ) ইসলামের বুঝকে সহজবোধ্য করা


আল্লাহ তা'আলা ইসলামী দ্বীনকে ও তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন এবং যেহেতু মানুষের মধ্যে মেধা ও বুঝের তারতম্য আছে, সেকারণ আল্লাহ রব্বুল 'আলামীন স্বীয় প্রেরিত দ্বীনকে কেবল ব্যবহারগত দিক দিয়েই নয়, বরং জ্ঞানগত দিক দিয়েও সহজ করে দিয়েছেন। অতএব দ্বীনের বুনিয়াদী সত্যগুলি উপলব্ধি করা খুবই সহজ। চাই তা আক্বীদা-বিশ্বাসগত হৌক কিংবা জ্ঞানগত ও বিধানগত হৌক। যেমন তাওহীদের বিষয়টি অল্প কথায় ও স্বল্প সময়ের বৈঠকেই বুঝা সম্ভব ঐ ব্যক্তির জন্য, যিনি কুরআন ও সুন্নাহ্ জ্ঞানে প্রকৃত জ্ঞানী। তেমনিভাবে ইসলামের পাঁচটি বুনিয়াদী ফরযের হুকুম-আহকাম মোটামুটিভাবে যেকোন স্বল্পবুদ্ধির লোক অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে নিতে পারে। যেমন ওযূ ও ছালাতের নিয়ম-কানুন, ছিয়াম ও হজ্জের বিধি-বিধান সমূহ, যাকাতের মাসায়েল প্রভৃতি আয়ত্ত করতে যে কারু পক্ষেই এক-দু'ঘণ্টা বা আরও স্বল্প সময়ে শিখে নেওয়া সম্ভব হয়। যদি সেটি কোন বিদ্বান ব্যক্তি শিক্ষা দেন।

মোটকথা ইসলাম বুঝ ও জ্ঞানের দিক দিয়ে এবং আমলের দিক দিয়ে একটি সহজ জীবন পদ্ধতি। কোন দিক দিয়েই এতে কোন কাঠিন্য নেই। যেমন আল্লাহ বলেন, 'কুরআনকে উপদেশের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব আছে কি কেউ উপদেশ গ্রহণকারী?' (ক্বামার ৫৪/১৭)। ইসলামী শরী'আতের ভিত্তি হিসাবে আল-কুরআন যে যিকর বা চিন্তা-গবেষণার জন্য খুবই সহজ, অত্র আয়াত তার স্পষ্ট দলীল। আর যিকর ইল্ম ও আমলকে শামিল করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই এই দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি এই দ্বীনকে কঠিন করে, দ্বীন তাকে পরাজিত করে। অতএব তোমরা মধ্যপন্থার উপরে দৃঢ় থাক ও সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য সন্ধান কর'। ইসলাম বুঝা ও তার উপর আমল করা যে সহজ, উক্ত হাদীছ তার অন্যতম দলীল।

কিন্তু এই সহজ-সরল দ্বীন আজ মানুষের নিকট অবোধ্য করে তোলা হয়েছে এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ হ'তে সরাসরি ফায়েদা হাছিলের পথ লোকদের জন্য রুদ্ধ করা হয়েছে। ফলে ইসলাম এখন রূপকথার গল্প সমূহের মত হয়ে গেছে। এর কারণ হ'ল ইসলাম বিষয়ক শাখা-প্রশাখা সমূহের জন্য বিভিন্ন পরিভাষার ছড়াছড়ি। ইলম ও মা'রেফাতের (নামে আলাদা পরিভাষা) সৃষ্টি হ'ল, যাতে ইসলামের কিছুই নেই। যদিও আমরা ওগুলিকে উপরোক্ত নামে নামকরণ করেছি। কুরআন ও সুন্নাহ বুঝার মাধ্যম তথা আরবী ভাষার ব্যাকরণ ও উছুলে ফিক্বহ বিষয়ে দারুশ বাড়াবাড়ি শুরু হ'ল। ফলে উপরোক্ত বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিগণও তাদের মূল লক্ষ্য কুরআন ও হাদীছ বুঝার ক্ষেত্রে অপারগ হয়ে পড়লেন। এমনকি ইসলামের অন্যান্য শাখা-প্রশাখাগুলি সম্পর্কেও তারা অজ্ঞ হয়ে রইলেন। এমনকি আমরা আরবী সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেও দেখছি যে, কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে কিছুই জ্ঞান রাখেন না, সামান্য কিছু ব্যতীত। তেমনিভাবে উছুলে ফিক্বহে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তি তাওহীদ ভাল বুঝেন না। এমনকি তিনি ওযূর নিয়মটাও ভালভাবে জানেন না। জানেন না কুরআন ও সুন্নাহ হ'তে কোন বিষয়ের সঠিক সমাধান বের করতে। বরং তার চাইতে কঠিন ও তিক্ত বিষয় হ'ল এই যে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বর্তমানে এমন সব আলেম তৈরী করছে, যারা মিম্বরে ও স্টেজে দাঁড়িয়ে লোকদের নিকট উচ্চকণ্ঠে বক্তৃতা করেন। কিন্তু ছহীহ ও মওযু' হাদীছ এবং বানাওয়াট কথাসমূহের পার্থক্য বুঝেন না। এভাবে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি ইসলামী শিক্ষার বিভিন্ন শাখার উপরে পৃথক পৃথক বিশেষজ্ঞ তৈরী করছে, যারা ইসলামের সামষ্টিক জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছেন।

এমনিভাবে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি কিছু ধর্মীয় পুরোহিত সৃষ্টির কাজে পরস্পরে অংশগ্রহণ করেছে। তারা লোকদের কাছ থেকে দ্বীন গোপন করেছে ঐসব আলেমদের মাধ্যমে যারা নিজেদেরকে দ্বীনের 'অছি' বা তত্ত্বাবধায়ক বলে দাবী করেন। যখন তুমি তাদের কাছে কোন একটি বিষয় বুঝার জন্য দলীল সন্ধানের উদ্দেশ্যে আসবে, তখন তারা বলবেন, 'আমাদের সঙ্গে তর্ক করো না। আমাদের কথা মেনে নাও, দলীল জিজ্ঞেস করো না'। এটা এজন্য যে, তারা তোমার জ্ঞান চক্ষুকে বন্ধ করে দিতে চায় এবং মানুষকে অজ্ঞ রেখে অন্ধের মত তাদের পিছনে ঘুরাতে চায়।

সালাফী দাওয়াতের প্রধান প্রচেষ্টা হ'ল মানুষের জন্য ইসলামের বুঝকে সহজ করে দেওয়া। আর তা হ'ল সমস্ত মানুষের নিকট কিতাব ও সুন্নাহর শিক্ষা ও জ্ঞান সহজ ও স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়ার সমস্ত পথ খুলে দেয়া। যাতে এই জ্ঞান সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। মানুষ যেন কুরআন ও সুন্নাহ্র সাথে যুক্ত হয় এবং তা অনুধাবন করে ও তার বুঝ হাছিল করে। সেই সাথে দ্বীন ও আমলের বুঝ যেন কেবলমাত্র বিশেষ পোষাকের ও বিশেষ চাল-চলনের একদল লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং ইসলামের জ্ঞান হবে সকলের জন্য উন্মুক্ত। যেমন মুক্ত বায়ু থেকে আমরা নিঃশ্বাস নিয়ে থাকি।

আল্লাহ্র রহমতে এর প্রভাব আমরা আমাদের ভাইদের মধ্যে দেখতে পাই। যখনি তারা সালাফী পদ্ধতি অনুযায়ী ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করেন, তখনি অল্পদিনের মধ্যেই তারা যথেষ্ট জ্ঞানী বনে যান। আক্বীদা, ব্যবহারিক জ্ঞান ও আচরণের দিক দিয়ে দ্বীনের মোটামুটি বিষয়গুলি সম্পর্কে পরিষ্কার ও সম্যক জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার কারণে এবং দৈনিক তার ইলম বৃদ্ধির প্রচেষ্টার কারণে। অবশ্য তার জন্য চিকিৎসককে তার চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারকে তার পেশা ও ব্যবসায়ীকে তার ব্যবসা ছাড়তে হয় না। এটা এজন্যই সম্ভব হয় যে, সালাফী পদ্ধতি শিক্ষার্থীকে তার দ্বীন বুঝবার বিভিন্ন পথ-পন্থার সন্ধান দেয়। ফলে তিনি ইসলামের মূলনীতি সমূহ এবং আক্বীদা ও আহকাম বিষয়ের মূল সূত্রগুলি অবহিত হন। অবহিত হন কিভাবে একজন ব্যক্তি তাক্বলীদের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তার অধিকারী হ'তে পারেন। কিভাবে আলেমদের কথার উপর গোঁড়ামি না করেও তাদেরকে সম্মান দেখানো যায়। অবহিত হন কিভাবে হক গ্রহণ করতে হয়, যেখান থেকেই তা পাওয়া যাক না কেন, যদি তা দলীল দ্বারা শক্তিশালী হয়। কিভাবে বাতিলকে পরিত্যাগ করতে হয়, যে সূত্র থেকেই তা পাওয়া যাক না কেন, যদি তার বাতিল হওয়ার দলীল পাওয়া যায়। এভাবেই ইসলাম খুব সহজে বোধগম্য হয়।

এই সহজবোধ্যতা বিগত যুগে যত না যরূরী ছিল, বর্তমান যুগে তা আরও অধিক যরূরী এবং আমাদের জন্য অধিক প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা এ যুগের মানুষ তাদের সমস্ত জীবনটাই বলতে গেলে দুনিয়াবী শিক্ষা অর্জনের মধ্যে লিপ্ত রাখে। আধুনিক সভ্যতা তাদেরকে ধ্বংস করার পিছনে সর্বদা লেগে আছে। লোকেরা পার্থিব জীবন-জীবিকার পিছনে তাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত রেখেছে। আর সে কারণেই সালাফী শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ পদ্ধতি। কেননা এটি মানুষের কাছ থেকে খুব কম সময় নেয় এবং তাকে সর্বাধিক ফায়েদা প্রদান করে। ফলে একজন ব্যক্তিকে তার সমস্ত জীবন শেষ করতে হয় না কোন মাসআলায় হাশিয়া, টীকা-টিপ্পনী, শাখা-প্রশাখা ও অন্যান্য অনর্থক বিষয় সমূহ জানার জন্য। যা তার দ্বীনের বা দুনিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। বরং সালাফী দাওয়াত প্রধানতঃ দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলির দিকে মনোনিবেশ করে। অতঃপর ঈমান ও আক্বীদা শুদ্ধ করার জন্য তাকে তাওহীদের মূলনীতিগুলি শিক্ষা দেয়। অতঃপর আমল শুদ্ধ করার জন্য ও সৎকর্মশীল হওয়ার জন্য ইবাদতের মূলনীতিগুলি শিক্ষা দেয়। অমনিভাবে আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের জন্য শুদ্ধিতার মূলনীতিগুলি তা'লীম দেয়। সবকিছুই হয় কিতাব ও সুন্নাহ থেকে। যেন একজন সালাফী তার যাবতীয় কাজকর্ম আল্লাহ ও রাসূলের কালাম অনুযায়ী করতে অভ্যস্ত হয়। আল্লাহ্র যে কালামকে তিনি 'রূহ' ও 'নূর' এবং রাসূলের যে কালামকে তিনি 'হিকমত' ও 'হেদায়াত' নামে অভিহিত করেছেন।

তৃতীয় এই বিষয়টিই হ'ল সালাফী তরীকায় পদচারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য। যা নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর তরীকা। যা তিনি অতি অল্প আয়াসে ও স্বল্প প্রচেষ্টায় সমস্ত উম্মতকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর ছাহাবীগণও সেটা করে গিয়েছেন। যেমন ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'ছাহাবীগণ ছিলেন এই উম্মতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী, গভীর জ্ঞানী ও সর্বাপেক্ষা কম ভানকারী'। এভাবে আমরা মনে করি সালাফী উত্তরসুরীগণ তাদের প্রথম যুগের নেতৃবৃন্দের ন্যায় উপরোক্ত বিশেষ গুণ সমূহের অধিকারী হবে।

سبحانك اللهم وبحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك وأتوب إليك، اللهم اغفر لي ولوالدي وللمؤمنين يوم يقوم الحساب -

টিকাঃ
৩৯. নাসাঈ হা/৫০৩৪; বুখারী হা/৩৯; মিশকাত হা/১২৪৬।
৪০. রাযীন, মিশকাত হা/১৯৩; ইবনু আব্দিল বার, জামে'উ বায়ানিল 'ইলমি ওয়া ফাযলিহী ২/৯৭ পৃ. ১৮১০; সনদ মুনক্বাতি' হ'লেও ইবনু ওমর (রাঃ) হ'তে 'হাসান' সনদে একই মর্মে বর্ণিত 'আছার' দ্বারা প্রমাণিত (আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ১/৩০৫ পৃ.); হেদায়াতুর রুওয়াত হা/১৯১, টীকা-২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px