📘 সালাফি দাওয়াতের মূলনীতি 📄 (ঘ) আমানত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ওযর পেশ করা

📄 (ঘ) আমানত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ওযর পেশ করা


আল্লাহ্ পথে আহবান করা ইসলামে ওয়াজিব। প্রত্যেক মুসলিমের উপর তা আমানত স্বরূপ, যিনি কিছু ইলম রাখেন এবং আল্লাহপাক ইসলামের প্রচার ও প্রসারকার্য যার জন্য সম্ভব করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে বহু দলীল রয়েছে। كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْনَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ 'তোমরাই হ'লে শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহ্ উপর বিশ্বাস রাখবে...' (আলে ইমরান ৩/১১০)।

এর অর্থ হ'ল মুসলিমরা কখনোই শ্রেষ্ঠ উম্মত হ'তে পারবে না, উপরোক্ত দায়িত্ব পালন না করা পর্যন্ত। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْনَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (آل عمران ১০৪)

'আর তোমাদের মধ্যে একটা দল থাকা চাই, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে ও অন্যায় থেকে নিষেধ করবে। বস্তুতঃ তারাই হ'ল সফলকাম' (আলে ইমরান ৩/১০৪)।

এখানে مِنْكُمْ ‘কিছু’ অর্থে নয় বরং ‘সার্বিক’ অর্থে এসেছে। অর্থাৎ তোমরা সকলে হবে এমন একটি উম্মত, যারা মানুষকে শুধু কল্যাণের পথে ডাকবে। যেমন আমরা বলে থাকি لیکن منكم رجل صالح ‘তোমাদের মধ্য থেকে একজন ভালো মানুষ হোক’। অর্থাৎ وَلْتَكُنْ أَنْتَ رَجُلاً صَالِحاً ‘তুমি একজন ভালো মানুষ হও’। এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَসْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَসْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ - (رَوَاهُ مُسْلِمٌ) 'তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কাউকে অপসন্দনীয় কাজ করতে দেখে, তাহ'লে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে। যদি না পারে, তাহ'লে যবান দিয়ে। সেটাও যদি না পারে, তাহ'লে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। আর সেটা হ'ল দুর্বলতম ঈমান’। এ বিষয়ে এ ধরনের বহু দলীল রয়েছে।

মুসলিম যখনই কাউকে আল্লাহর পথে ডাকে, তখনই সে উপরোক্ত আমানত আদায় করে এবং আল্লাহ্র সম্মুখে কৈফিয়তের হাত থেকে বেঁচে যায়। যেমন বনু ইসরাঈলের একটি দল শনিবারে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাদের মধ্যকার এক দল ঈমানদার লোক তাদেরকে সীমালংঘন করতে নিষেধ করেন এবং আল্লাহর গযবের ভয় দেখান। উত্তরে তারা বলেছিল «أَتَعِظُونَ قَوْمًا اللَّهُ مُهْلِكُهُمْ أَوْ مُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا সম্প্রদায়কে উপদেশ দিচ্ছ যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন? অথবা কঠিন শাস্তি দিবেন'? জবাবে তারা বলেছিল, قَالُوا مَعْذِرَةً إِلَى رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ 'তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ওযর পেশ করার জন্য। আর একারণে যাতে তারা (আল্লাহ্ নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে) সতর্ক হয়' (আ'রাফ ৭/১৬৪)।

অর্থাৎ আমরা দাওয়াত নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় আল্লাহর নিকট ওযর পেশ করার জন্য। যাতে আমরা আল্লাহর নিকট বলতে পারি যে, হে আল্লাহ! আমরা তোমার দেয়া আমানত সাধ্যপক্ষে আদায় করেছি। এর পরে যেসব ভাইদের নিকট থেকে আমরা নিরাশ হয়েছি, তারা আল্লাহর দিকে ফিরেও যেতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের জ্ঞান তো কেবল তাঁর নিকটেই আছে। সে কারণেই সালাফী তরীকায় দাওয়াত দানকারীকে অবশ্যই নিম্নোক্ত দু'টি বিষয়কে তার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।-
(১) (দাওয়াতের) আমানত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ্র নিকট ওযর পেশ করা।
(২) হঠকারী বান্দাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্ জন্য দলীল কায়েম করা। এরপর বাকী দু'টি উদ্দেশ্য আল্লাহর উপরে ন্যস্ত করতে হবে। চাইলে তিনি তাড়াতাড়ি সে দু'টি বাস্তবায়িত করবেন, চাইলে দেরীতে করবেন। সে দু'টি হ'ল: (১) মানুষের হেদায়াত পাওয়া এবং (২) তাঁর শরী'আত যমীনে কায়েম হওয়া।

প্রথমটি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, إِنَّكَ لا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ 'নিশ্চয়ই তুমি হেদায়াত করতে পারো না যাকে তুমি পসন্দ কর। বরং আল্লাহই যাকে চান তাকে হেদায়াত দান করে থাকেন। আর তিনিই হেদায়াত প্রাপ্তদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত' (ক্বাছাছ ২৮/৫৬)।

দ্বিতীয়টি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُوْনَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْনَ - (النور) 'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা দান করবেন, যেমন তিনি দান করেছিলেন পূর্ববর্তীদেরকে। আর তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাদেরকে অবশ্যই ভীতির বদলে নিরাপত্তা দান করবেন। (শর্ত হ'ল) তারা কেবল আমারই দাসত্ব করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপরে যারা অবাধ্য হবে, তারাই হবে পাপাচারী' (নূর ২৪/৫৫)।

শাসন কর্তৃত্ব দান করা আল্লাহর কাজ। 'আল্লাহ স্বীয় কাজের উপর বিজয়ী। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না' (ইউসুফ ১২/২১)। এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা কেবল ঐসব লোকদেরই কাজ, যারা মানব সমাজে আল্লাহর রীতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নয়।

সেকারণ সালাফী দাওয়াতের পথে যিনি চলবেন, তিনি কখনোই নিরাশ হবেন না। তার প্রচেষ্টা সমূহ কখনোই বিফল হবে না। কেননা কমপক্ষে তিনি তো তার উদ্দেশ্যের অর্ধেকটা পূরণ করেছেন এবং বাকী অর্ধেকটার জন্য সর্বদা আল্লাহ্ অনুগ্রহের প্রত্যাশী আছেন। অর্থাৎ মানুষকে হেদায়াত দান ও ঈমানদারগণের হাতে যমীনের নেতৃত্ব প্রদান। ওটি আল্লাহ্র অনুগ্রহ। তিনি যাকে চান সেটা প্রদান করবেন। তিনি স্বীয় অনুগ্রহ প্রশস্তকারী ও সর্বজ্ঞ। শেষের অর্ধেকটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র কাজ। বান্দার কাজ নয়। আর সাহায্য কেবলমাত্র আল্লাহ্ পক্ষ থেকেই এসে থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدامَكُمْ 'হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তাহ'লে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন ও তোমাদের পাগুলিকে দৃঢ় করবেন' (মুহাম্মাদ ৪৭/৭)।

আমরা মহান আল্লাহকে সাহায্য করতে পারি এভাবে যে, আমরা প্রথমে সত্যিকার অর্থে মুমিন হব। আর সেটা সম্ভব হবে ঈমান ও আমলের পূর্ববর্ণিত তরীকার যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে। অতঃপর আমরা আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল উৎসর্গ করে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে আল্লাহকে ডাকব। আর যাতে আমরা জানি যে, যে ব্যক্তি সর্বাত্মক চেষ্টা করে, সে তার নিজের জন্যেই সেটা করে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জগদ্বাসীর সকল কাজ থেকে বেপরওয়া।

আমরা পূর্ব হ'তে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র সকল মানুষকে এই তরীকার পরিচিতি ও পূর্ণ ব্যাখ্যাসহ এই দাওয়াতের উপর ঈমান আনার আহবান জানাব। যাতে আমাদের ন্যায় তারাও জানতে পারে যে, ইসলাম বুঝা ও সে অনুযায়ী আমল করার জন্য এটাই হ'ল একমাত্র তরীকা। এর ফলে তারা ঈমানের মিষ্টতা ও স্বাদ অনুভব করবে। কেননা তখন তাদের ঈমান হবে দৃঢ় বিশ্বাস ও ইলমভিত্তিক, তাক্বলীদ (অন্ধ অনুকরণ), উচ্ছ্বাস বা মূর্খতা ভিত্তিক নয়। তাদের আমল হবে দৃঢ়চিত্ত আলেমের ন্যায়, নরমপন্থী কিংবা সাময়িক উত্তেজনায় বিগলিত ব্যক্তির মত নয়, যা খুব সত্বরই উবে যায় ও দুর্বল হয়ে পড়ে।

টিকাঃ
২৬. মুসলিম হা/৪৯; মিশকাত হা/৫১৩৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px