📄 (ক) খাঁটি মুসলিম তৈরী করা
ইসলামী শরী'আত সঠিক অর্থে এসেছে, প্রথমতঃ একজন মানুষকে মুসলিম হিসাবে গড়ে তোলার জন্য। আর মানুষ বলতে 'ইনসানে কামেল' বা পূর্ণ মানুষ বুঝায়। অতঃপর একজন মানুষ সে পুরুষ হৌক বা নারী হৌক, তাকে সত্যিকারের 'মুসলিম' হিসাবে গড়ে উঠতে হ'লে তার মধ্যে তিনটি শর্ত থাকতে হবে। তাওহীদ, ইত্তেবা ও তাযকিয়াহ। সত্যিকারের মুসলিম তিনিই, যিনি আল্লাহ্ একত্বের সাক্ষ্য দেন। যিনি আল্লাহ্র নির্দেশ সমূহ পালন ও নিষেধ সমূহ হ'তে সাধ্যমত বিরত থাকেন এবং এই আনুগত্যের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে যথাসম্ভব পরিশুদ্ধ রাখেন। উক্ত তারবিয়াত বা প্রশিক্ষণের এই পদ্ধতি সমূহ হ'ল সালাফী দাওয়াতের যথার্থ পদ্ধতি, যা ইতিপূর্বে 'মূলনীতি' শিরোনামে আমরা বর্ণনা করেছি।
এক্ষণে যখন আমরা কাউকে যথার্থ মুসলিম বলব, তখন ঐসব তথাকথিত মুসলিম নামধারী লোকেরা অবশ্যই আলাদা হয়ে যাবে, যারা কথায় ও আক্বীদায় শিরকের মধ্যে লিপ্ত। যারা আল্লাহ্ আয়াত সমূহকে পরিবর্তন করেছে, আল্লাহ্ বিধান ছেড়ে অন্যের দেওয়া বিধানের নিকট তাদের ফায়ছালা পেশ করেছে। যারা নবীর সুন্নাতের বিরুদ্ধে শত্রুতা করে ও তা নিয়ে ঠাট্টা করে। এসব লোকদেরকে মুসলিম হিসাবে গণ্য করা সিদ্ধ হবে না। আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছি আমাদের الحد الفاصل بين الإيمان والكفر ('ঈমান ও কুফরের পার্থক্যকারী সীমারেখা') বইয়ের মধ্যে।
ইসলামের মূল তাৎপর্য ব্যাখ্যার পর সালাফী দাওয়াতের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ'ল শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ। যেমন আল্লাহ্ নবী (ছাঃ) বলেন, وَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلاً خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ! 'আল্লাহ তোমার দ্বারা কোন একজন বান্দাকে হেদায়াত দান করেন, তাহ'লে সেটা হবে তোমার জন্য লাল উটের চাইতেও উত্তম'। ২৫ অতএব একজন ব্যক্তিকে ইসলামের পথ দেখানো একটি বড় ধরনের নে'মত ও মর্যাদামণ্ডিত সৎকর্ম। সেই ব্যক্তি কোন নেতা হৌক বা গোলাম, ফকীর হৌক বা ধনী, দুর্বল হৌক বা শক্তিশালী। আমাদের জন্য এই প্রমাণই যথেষ্ট যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর রাসূলকে এজন্য তিরষ্কার করেছিলেন যে, তিনি আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম নামক একজন অন্ধ ব্যক্তি (পরে ছাহাবী), যিনি তাঁর নিকট হেদায়াত পাবার আশায় এসেছিলেন, তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন এবং জনৈক কুরায়েশ নেতার দিকে মনোনিবেশ করে তাকেই দাওয়াত দিচ্ছিলেন ও দ্বীন বুঝাচ্ছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, عَبَسَ وَتَوَلَّى - أَنْ جاءَهُ الْأَعْمَى - وَما يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى - أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرى أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى - فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى - وَما عَلَيْكَ أَلَّا يَزَّكَّى - وَأَمَّا مَنْ جاءَكَ يَسْعَى - وَهُوَ يَخْشى - فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَّى - 'এজন্য যে, তার নিকটে একজন অন্ধ লোক এসেছে। তুমি কি জানো সে হয়তো পরিশুদ্ধ হ'ত। অথবা উপদেশ গ্রহণ করত। অতঃপর সে উপদেশ তার উপকারে আসত। অথচ যে ব্যক্তি বেপরওয়া তুমি তাকে নিয়েই ব্যস্ত আছ। অথচ ঐ ব্যক্তি পরিশুদ্ধ না হ'লে তাতে তোমার কোন দোষ নেই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তোমার নিকটে দৌড়ে এল, এমন অবস্থায় যে সে (আল্লাহকে) ভয় করে, অথচ তুমি তাকে অবজ্ঞা করলে' ('আবাসা ৮০/১-১০)।
উপরোক্ত আয়াতগুলিতে ইসলামী দাওয়াতের উদ্দেশ্য ও নীতি-পদ্ধতি পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। এতে বুঝা গেল যে, আল্লাহ যেকোন ব্যক্তির অন্তরকে ইসলামের জন্য খুলে দিতে পারেন। তিনি যেমন ব্যক্তিই হন না কেন।
টিকাঃ
২৫. বুখারী হা/৩০০৯; মুসলিম হা/২৪০৬; মিশকাত হা/৬০৮০।
📄 (খ) এমন একটি মুসলিম সমাজ কায়েম করা যেখানে আল্লাহর কালেমা উন্নত থাকবে এবং কুফরীর কালেমা অবনমিত হবে
সালাফী দাওয়াতের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হ'ল এমন একটি মুসলিম সমাজ কায়েম করা, যা ঐ সমস্ত ইটগুলিকে (লোকগুলিকে) একত্রে জুড়ে দেবে, যারা আক্বীদা ও পদ্ধতিগত দিক দিয়ে ইসলামের বিশুদ্ধ ভিত্তির উপর লালিত হয়েছে। আর তা হ'ল এই যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ জন্য বিধান সমূহ রয়েছে বিভিন্ন ব্যবহারিক বিষয়ে। যেমন দণ্ডবিধি সমূহে, সাধারণ জনকল্যাণ বিষয়ে ও শাসন বিষয়ে। যেগুলি কখনোই চালু করা সম্ভব নয়, ততক্ষণ না সমাজ আল্লাহ্ দ্বীনকে কবুল করে এবং তাঁর প্রেরিত শরী'আতের সামনে মাথা নত করে। সত্যিকার অর্থে কোন মুসলিম শান্তি ও নিরাপত্তা বোধের সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না একটি মুসলিম সমাজের ছায়া ব্যতীত। যেখানে আল্লাহ্ বিধান অনুযায়ী হুকুম করা হয়, তাকে সম্মান করা হয় এবং তার নিদর্শন সমূহকে জীবন্ত করা হয়।
যখন থেকে কাফিররা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল সমূহের উপর জয়লাভ করেছে ও সেগুলিকে ছিন্নভিন্ন করেছে এবং সেখানে তারা আল্লাহ্ বিধান সমূহের স্থলে নিজেদের বিধান সমূহ ও জীবন যাপন পদ্ধতি চালু করেছে, তখন থেকেই সকল এলাকার মুসলিম জনসাধারণ এই আপতিত বিপদ থেকে মুক্তি চাচ্ছে এবং ছহীহ শুদ্ধ ইসলামী শাসন বিধানের ছায়াতলে শান্তির জীবন যাপনের জন্য দুর্বার আগ্রহ পোষণ করে আসছে। যেখানে শাসক ও শাসিতের মাঝে মহব্বতের সম্পর্ক বিরাজ করবে। যেখানে যুলুম থাকবে না। মানুষ তাদের সম্পদ ও ইয্যতের নিরাপত্তা পাবে। যেখানে ভালবাসা, ত্যাগ ও অকৃত্রিমতার জয়জয়কার থাকবে। যার মাধ্যমে মুসলিমদের হারানো সম্মান ও মর্যাদা ফিরে আসবে। যাবতীয় যুলুম, সীমালংঘন ও ফিৎনা-ফাসাদ দূর হয়ে যাবে, যা আজ অধিকাংশ দেশে মুসলমানদের উপর আপতিত হচ্ছে।
কিন্তু উক্ত উদ্দেশ্য হাছিলের লক্ষ্যে যে সকল দাওয়াতী পদ্ধতি চলছে, সেগুলি সবই বিভক্ত। সংস্কার ও প্রশিক্ষণের পদ্ধতিগুলি একটি একক লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে এ পথে যেসব ভীতিপ্রদ পরিণাম সমূহ দেখা দিচ্ছে, তা রুখতে কেউ সক্ষম হচ্ছে না। এ সকল পরিণামের মধ্যে উদাহরণ স্বরূপ ইসলামী জাতিগুলির মধ্যে দলবদ্ধভাবে (ইসলাম থেকে) ফিরে যাওয়া। আর এটা হচ্ছে মুসলিম সন্তানদের রীতিমত মস্তিষ্ক ধোলাইয়ের ফলে। যা ইসলাম বিরোধী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রভাবে হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে বড় ধরনের ইন্ধন যোগাচ্ছে বড় বড় প্রচার মাধ্যম সমূহ। যেসবের মালিকানা রয়েছে ইসলাম বিরোধীদের হাতে। আর শিক্ষানীতির মাধ্যমে, যা রচিত হয়ে থাকে সাম্রাজ্যবাদীদের হুকুমে তাদের নীল নকশা অনুযায়ী।
আমি বলতে চাই যে, ইসলামী সমাজ কায়েমের পথে বাধার যে জঞ্জাল সমূহ পতিত হয়েছে, সেগুলিকে দূর করা ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের দ্বারা সম্ভব হয়নি। অথচ তাঁরা সন্ধ্যা থেকে সকালের মধ্যেই একশ'-দু'শ, এক হাযার-দু'হাযার লোকের মাধ্যমে (ইসলামী সমাজ) কায়েমের স্বপ্ন দেখে থাকেন। তারা জানেন না যে, ব্যাপারটি এখন অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অতএব এখন প্রয়োজন কেবল জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) ও দীর্ঘ ধৈর্য। প্রয়োজন তা'লীম, তারবিয়াত ও ছহীহ-শুদ্ধ ইসলাম প্রচারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। প্রয়োজন আল্লাহ্ পথে দাওয়াতের ময়দানে সক্রিয় সকলের মধ্যে ইতিপূর্বে বর্ণিত সালাফী দাওয়াতের মূলনীতি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক সহযোগিতা।
এই মাত্র যেসব দলগুলি নিয়ে আলোচনা করা হ'ল, তাদের ব্যাপারে তোমাকে বিস্মিত করবে এ বিষয়টি যে, এরা যদি কোন ইসলামী সমাজ বা ইসলামী শাসনের কল্পনা করেন, তবে তা কিন্তু ওছমানের খেলাফত কিংবা উমাইয়া বা আব্বাসীয় খেলাফত নয় বরং আবুবকর ও ওমরের খেলাফত কল্পনা করেন। এরূপ কল্পনা করা স্থূল অর্থে সুন্দর। কিন্তু ঐসব ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের ও সেদিকে কথিত দাওয়াত দানকারীদের চরিত্রে ও কর্মে, ব্যবহারে ও ইলমের মধ্যে এমন কিছু তুমি পাবে না, যা তাদেরকে এ ধরনের ইসলামী সমাজের নেতা হওয়া দূরের কথা, একজন সাধারণ সদস্য হওয়ারও যোগ্য বানাতে পারে। নিজের বড়ত্ব, আত্মকেন্দ্রিকতা, কৃপণতা, ভীরুতা, একনায়কত্ব, বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, বাতিল বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা প্রভৃতি ব্যাধিসমূহ ঐসব অত্যুৎসাহী নেতাদের মধ্যে দেখা যায়। এগুলো অপেক্ষাকৃত হালকা ব্যাধি। এর চাইতে আরও বড় ব্যাধি সমূহ রয়েছে, যেসবের উল্লেখ এখানে রুচি বিরোধী হবে। মোটকথা ইসলামী হুকুমত কায়েমের ঐসব কল্পনাবিলাসীরা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যকার দূরত্বের ন্যায় তাদের লক্ষ্যস্থল হ'তে অনেক দূরে, যা তারা দাবী করে থাকে। চারপাশের চলন্ত বিষয় সমূহের ব্যাপারে তাদের লজ্জাকর দ্রুততা ও অজ্ঞতা ছাড়াও।
এজন্যেই তাদের শক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের কর্মীদের সকল প্রচেষ্টা হাওয়ায় উবে যাচ্ছে। এরা এদের লক্ষ্যস্থল হ'তে দূরে ছিটকে পড়ার কারণ হ'ল এই যে, ইসলাম বুঝা ও সে অনুযায়ী আমল করার জন্য এরা কোন নির্দিষ্ট মূলনীতি রচনা করেনি। আর এর ফলে দাওয়াত দানকারী সদস্যগণ পরস্পরের প্রতি মারমুখী হয়ে ওঠে মোটামুটি তিনটি কারণে।-
(ক) প্রত্যেকেই স্বতন্ত্রভাবে ইজতিহাদ করার কারণে- যা তাদেরকে একটি একক মূলনীতিতে মযবৃতভাবে জমায়েত হ'তে দেয়নি।
(খ) কঠিন অথবা তিক্ত বাস্তবতার কারণে, যাকে মুসলিম উম্মাহ জিইয়ে রেখেছে। ফলে দেখা দিয়েছে বিভক্তি, ধ্বংস, নৈরাজ্য অতঃপর ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়া।
(গ) বর্তমানে বহু দল বেরিয়েছে। তাদের লোকজনও বেড়েছে। কিন্তু সাথে সাথে তাদের ঐক্য দ্রুত ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। কেননা আক্বীদা, শরী'আত এবং ইসলাম অনুযায়ী আমলের বুঝ হাছিল করার মূলনীতিগুলি তাদের নিকট স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন নয়।
সালাফী তরীকা উপরের সবকিছুর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে থাকে। আর এ কারনেই একটি দৃঢ় মূলনীতির উপর সে তার ভিত্তি স্থাপন করেছে। যাতে কিতাব, সুন্নাহ ও তাওহীদ বুঝা সহজ হয় এবং সত্যের নিকট পৌঁছা যায়। সে তার সদস্যদেরকে ইতিপূর্বে আলোচিত তাওহীদ, ইত্তেবা ও তাযকিয়াহ্ মূলনীতি অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যুগে ইসলামী বিশ্বের বর্তমান সমস্যাবলীর দিকেও নযর রাখে। যেসব বড় বড় মন্দ পরিণতি সমূহ মুসলিমদের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শাসনের ছায়াতলে পূর্ণভাবে ইসলামী জীবন শুরু করার পথে বাঁধা হয়ে আছে, সেগুলির যথাসাধ্য সংশোধনের চেষ্টা করে। ইসলামের জন্য আন্দোলনকারী সকল দলকে ঐক্যবদ্ধ করার সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে থাকে। তবে সবকিছুর মালিকানা আল্লাহর হাতে। তিনি বলেন, قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ - 'তুমি বল, হে আল্লাহ! তুমি রাজাধিরাজ। তুমি যাকে খুশী রাজত্ব দান কর ও যার কাছ থেকে খুশী রাজত্ব ছিনিয়ে নাও। তুমি যাকে খুশী সম্মানিত কর ও যাকে খুশী অপমানিত কর। তোমার হাতেই যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয় তুমি সকল কিছুর উপরে ক্ষমতাবান' (আলে ইমরান ৩/২৬)।
📄 (গ) আল্লাহর জন্য দলীল কায়েম করা
নবীদের প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অবিশ্বাসী এবং হঠকারীদের ভয় দেখানো। যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে তাদের কোন অজুহাত পেশের সুযোগ না থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَارُونَ وَسُلَيْمَانَ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا - وَرُسُلاً قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلاً لَمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَكْلِيمًا - رُسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا - 'নিশ্চয়ই আমরা তোমার প্রতি 'অহি' প্রেরণ করেছি, যেমন 'অহি' করেছিলাম নূহের নিকট এবং তার পরবর্তী নবীগণের নিকট। আর আমরা 'অহি' করেছি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তার বংশধরগণের প্রতি এবং ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূণ ও সুলায়মানের প্রতি। আর আমরা দাউদকে যবুর প্রদান করেছিলাম'। 'বহু রাসূল সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমরা তোমাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল সম্পর্কে বলিনি। আর আল্লাহ মূসার সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন করেছেন'। 'আমরা রাসূলগণকে জান্নাতের সুসংবাদ দানকারী ও জাহান্নামের ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি। যাতে রাসূলগণের পরে লোকদের জন্য আল্লাহ্ বিরুদ্ধে কোনরূপ অজুহাত দাঁড় করানোর সুযোগ না থাকে। আর আল্লাহ মহা পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়' (নিসা ৪/১৬৩-৬৫)।
রাসূলগণের মৃত্যুর পর তাদের অনুসারীগণ একই মিশন নিয়ে এগিয়ে চলেন, যাতে হঠকারীদের জন্য অভিযোগ করার মত কোন যুক্তি আর না থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, قُلْ هَذِهِ سَبِيْلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيْرَةِ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ 'তুমি বল, এটাই আমার পথ। আমি ও আমার অনুসারীগণ ডাকি আল্লাহ্র দিকে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে। আল্লাহ পবিত্র। আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই' (ইউসুফ ১২/১০৮)।
অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসারী কেবল তারাই হ'তে পারেন, যারা নবুঅত ও রিসালাত ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে তাঁর প্রতিনিধি হবেন। অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, আল্লাহ্র বিধান সমূহ চালু করা ও সেদিকে মানুষকে আহবান করা, জান্নাতের সুসংবাদ শুনানো ও জাহান্নামের ভয় দেখানো-এসবই ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর কাজ। অতএব তাঁর অনুসারী ও তাঁর তরীকার উপর যারা চলতে আগ্রহী, তাদের জন্য ঐ একই কাজ সমূহ করা ওয়াজিব হবে।
অতঃপর যাকে দাওয়াত দেওয়া হবে, তিনি হয় দাওয়াত কবুল করে হেদায়াত প্রাপ্ত হবেন এবং (সালাফী দাওয়াতের) প্রথম উদ্দেশ্য পূরণ করে খাঁটি মুসলিম হবেন। অথবা তিনি হঠকারিতা দেখাবেন ও অবিশ্বাস করবেন এবং (সালাফী দাওয়াতের) তৃতীয় উদেশ্য পূরণ করবেন। অর্থাৎ নিজের উপরে দলীল কায়েম করে নিবেন। তখন আল্লাহর বিরুদ্ধে তার কোন অভিযোগ (যেমন আমি জানতাম না বা আমাকে কেউ আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়নি ইত্যাদি) পেশ করার সুযোগ থাকবে না। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ বলেন, لَيْسَ عَلَيْكَ هُداهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشاءُ 'তাদেরকে হেদায়াত করার দায়িত্ব তোমার নয়। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়াত দান করে থাকেন' (বাক্বারাহ ২/২৭২)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلاغُ পৌঁছে দেওয়া ব্যতীত তোমার আর কোন কাজ নেই' (শূরা ৪২/৪৮)। তিনি আরও বলেন, إِنَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ 'তুমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র' (রা'দ ১৩/৭)।
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, দাওয়াত দেওয়াই হ'ল মূল কাজ। অন্য কিছু নয়। আর হেদায়াত দান করার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্ এখতিয়ারে। আল্লাহ একাজটি মেহেরবানী করে তার বান্দাদের মধ্য হ'তে যাকে খুশী তার হাত দিয়ে সম্পন্ন করেন। আল্লাহ আমাদেরকে তার ঐসকল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের হাত দিয়ে তিনি কল্যাণ জারি করতে চান। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
সালাফী দাওয়াতের এই তৃতীয় উদ্দেশ্যটির সার কথা হ'ল- যদি আল্লাহ্ পথে আহবানকারীর আহবানে কেউ সাড়া না দেয় এবং কেউ হেদায়াত প্রাপ্ত না হয়, তাহ'লে তিনি যেন এই ধারণা পোষণ না করেন যে, অযথা পণ্ডশ্রম হ'ল। বরং তিনি তার মূল দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহর জন্য দলীল কায়েম করেছেন। যেন উক্ত হঠকারী ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন তার প্রতিপালকের সম্মুখে কোন ওযর-আপত্তি তুলতে না পারে।
ইসলামের মূল দাওয়াত কালেমায়ে শাহাদাত ছাড়াও অন্যান্য স্তম্ভগুলির ব্যাপারেও দলীল কায়েম হবে। এক্ষণে যে ব্যক্তি কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করল এবং ছালাত ছাড়াই দাবী করল যে, সে কিয়ামতের দিন নাজাত পেয়ে যাবে, ঐ ব্যক্তির উপর বিভিন্ন আয়াত ও হাদীছ সমূহ দ্বারা দলীল কায়েম করা হবে। এমনিভাবে ইসলামের অন্যান্য আরকান-আহকাম, ওয়াজিবসমূহ ও সাধারণভাবে সকল নিষিদ্ধ বিষয় সমূহের ব্যাপারেও দলীল কায়েম হবে।
একইভাবে কোন মুসলিম হঠকারীর বিরুদ্ধেও দলীল কায়েম করা ওয়াজিব হবে, যদি সে কোন অপরিহার্য বিষয় পরিত্যাগ করে অথবা কোন নিষিদ্ধ কাজ করে বসে। কেননা এটাও আল্লাহ্ দ্বীনের প্রতি দাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত। এতদসহ সালাফী তরীকা ইসলামের মৌলিক বিষয়, তার শাখা-প্রশাখা সমূহ এবং শিষ্টাচার ও পসন্দনীয় বিষয় সমূহ বর্ণনা করার বিষয়ে অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যাতে করে যুগ সমূহের চাহিদা অনুযায়ী ইসলামের উপর পূর্ণভাবে আমল করা সম্ভব হয়। এটা এজন্য যে, সুন্নাত সমূহে অবহেলা করলে তা পরে ওয়াজিব সমূহে অলসতা ডেকে আনবে। আর ওয়াজিব সমূহে অলসতা ক্রমে তাওহীদ বিশ্বাসের মধ্যে ত্রুটি সৃষ্টি করবে। এমনিভাবে অন্যান্য বিষয় সমূহের। বস্তুতঃ ইলম ও আমলের দ্বারা ইসলামী শরী'আতের পুরোপুরি হেফাযত করা সালাফী দাওয়াতের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এজন্য সালাফী তরীকায় আমরা কোন একটি হালকা সুন্নাতকে বা ওয়াজিবকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে কসুর করি না। কেননা আমরা মনে করি যে, এসব শাখাগুলিই আসল বস্তুর সঙ্গে মিলবে। অর্থাৎ এসবের দ্বারাই ইসলাম তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ চেহারা নিয়ে যুগে যুগে প্রকাশিত হয়ে থাকে। আর এর ফলে মুসলিমদের সামাজিক ভাবমূর্তি স্পষ্ট ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত থাকে এবং তখনই আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবী ও বিশ্ববাসীর ওয়ারিছ বানান। অর্থাৎ তাদের উপর নেতৃত্ব সোপর্দ করে থাকেন।
অন্যান্য তরীকার লোকেরা দ্বীনের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং অন্যান্য বিষয়গুলিকে অবহেলা করেন। বরং নির্দিষ্ট কয়েকটি মুখ্য বিষয়ে উৎসাহ দেন ও অন্যান্যগুলি তারা ব্যাখ্যা করতে সংকোচ বোধ করেন। দ্বীনের প্রকৃত তাৎপর্য না বুঝার কারণেই তাদের পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে। কেননা দ্বীনের কোন একটি অংশ, বিষয় ও বিভাগ ছেড়ে দিলে যে বিষয়ে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, তা আপোষে শত্রুতা ও দুশমনী ডেকে আনবে। যেমন আল্লাহ বলেন, وَمِنَ الَّذِينَ قالُوا إِنَّا نَصاري أَخَذْنا مِيثاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنا بَيْنَهُمُ الْعَداوَةَ وَالْبَغْضاءَ إِلى يَوْمِ الْقِيامَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِما كانُوا يَصْنَعُونَ 'আর যারা বলে আমরা নাছারা, তাদের থেকে আমরা অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। অতঃপর তাদেরকে যা উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা তা বিস্মৃত হ'ল। ফলে আমরা তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ উসকে দিলাম কিয়ামত পর্যন্ত। আর অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন' (মায়েদাহ ৫/১৪)।
এমনিভাবে আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশের উপর বিশ্বাস ও কিছু অংশের উপর অবিশ্বাসের কারণে আল্লাহ ইহূদীদেরও নিন্দা করেছেন। তাদের এই কুফর বা অবিশ্বাসের অর্থ ছিল আমল ত্যাগ করা (অর্থাৎ আমল ত্যাগ করাই কুফরীর লক্ষণ)। মুসলিমদের মধ্যেও এই ব্যাধির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তারা আল্লাহ্ অনেক উপদেশ এবং রাসূল (ছাঃ)-এর বহু ওয়াজিব বিষয় ভুলে গেছে।
এ কারণেই সালাফী দাওয়াত ইসলামের যাবতীয় আরকান, আহকাম ও কর্মপদ্ধতিকে শামিলকারী একটি ব্যাপক দাওয়াত। আল্লাহ বলেন, يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلا تَتَّبِعُوا خُطُواتِ الشَّيْطانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ 'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন' (বাক্বারাহ ২/২০৮)।
অতএব শরী'আতের কিছু অংশ মানা ও কিছু অংশ বাদ দেওয়া শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের শামিল। অথচ এটাকেই বর্তমানে ইসলামী ময়দানে কর্মরত কিছু লোককে তাদের ধারণা মতে দাওয়াতের স্বার্থে হিকমত ও মাছলাহাতের দোহাই দিয়ে বহু ওয়াজিব পরিত্যাগ করা ও হারাম কাজে লিপ্ত হওয়াকে পুণ্য ভাবতে উদ্বুদ্ধ করছে।
মোটকথা আল্লাহ্ জন্য দলীল কায়েম করতে গেলে ইসলামের মূল ও শাখা সবকিছুই বর্ণনা করতে হবে। যেখানে সত্য প্রকাশে কোনরূপ অস্পষ্টতা থাকবে না। যাতে ক্বিয়ামতের মাঠে ওয়াজিব ত্যাগ করার ও হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার পক্ষে কারো কোনরূপ অজুহাত খাড়া করার অবকাশ না থাকে।
📄 (ঘ) আমানত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ওযর পেশ করা
আল্লাহ্ পথে আহবান করা ইসলামে ওয়াজিব। প্রত্যেক মুসলিমের উপর তা আমানত স্বরূপ, যিনি কিছু ইলম রাখেন এবং আল্লাহপাক ইসলামের প্রচার ও প্রসারকার্য যার জন্য সম্ভব করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে বহু দলীল রয়েছে। كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْনَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ 'তোমরাই হ'লে শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহ্ উপর বিশ্বাস রাখবে...' (আলে ইমরান ৩/১১০)।
এর অর্থ হ'ল মুসলিমরা কখনোই শ্রেষ্ঠ উম্মত হ'তে পারবে না, উপরোক্ত দায়িত্ব পালন না করা পর্যন্ত। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْনَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (آل عمران ১০৪)
'আর তোমাদের মধ্যে একটা দল থাকা চাই, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে ও অন্যায় থেকে নিষেধ করবে। বস্তুতঃ তারাই হ'ল সফলকাম' (আলে ইমরান ৩/১০৪)।
এখানে مِنْكُمْ ‘কিছু’ অর্থে নয় বরং ‘সার্বিক’ অর্থে এসেছে। অর্থাৎ তোমরা সকলে হবে এমন একটি উম্মত, যারা মানুষকে শুধু কল্যাণের পথে ডাকবে। যেমন আমরা বলে থাকি لیکن منكم رجل صالح ‘তোমাদের মধ্য থেকে একজন ভালো মানুষ হোক’। অর্থাৎ وَلْتَكُنْ أَنْتَ رَجُلاً صَالِحاً ‘তুমি একজন ভালো মানুষ হও’। এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَসْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَসْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ - (رَوَاهُ مُسْلِمٌ) 'তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কাউকে অপসন্দনীয় কাজ করতে দেখে, তাহ'লে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে। যদি না পারে, তাহ'লে যবান দিয়ে। সেটাও যদি না পারে, তাহ'লে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। আর সেটা হ'ল দুর্বলতম ঈমান’। এ বিষয়ে এ ধরনের বহু দলীল রয়েছে।
মুসলিম যখনই কাউকে আল্লাহর পথে ডাকে, তখনই সে উপরোক্ত আমানত আদায় করে এবং আল্লাহ্র সম্মুখে কৈফিয়তের হাত থেকে বেঁচে যায়। যেমন বনু ইসরাঈলের একটি দল শনিবারে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাদের মধ্যকার এক দল ঈমানদার লোক তাদেরকে সীমালংঘন করতে নিষেধ করেন এবং আল্লাহর গযবের ভয় দেখান। উত্তরে তারা বলেছিল «أَتَعِظُونَ قَوْمًا اللَّهُ مُهْلِكُهُمْ أَوْ مُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا সম্প্রদায়কে উপদেশ দিচ্ছ যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন? অথবা কঠিন শাস্তি দিবেন'? জবাবে তারা বলেছিল, قَالُوا مَعْذِرَةً إِلَى رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ 'তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ওযর পেশ করার জন্য। আর একারণে যাতে তারা (আল্লাহ্ নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে) সতর্ক হয়' (আ'রাফ ৭/১৬৪)।
অর্থাৎ আমরা দাওয়াত নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় আল্লাহর নিকট ওযর পেশ করার জন্য। যাতে আমরা আল্লাহর নিকট বলতে পারি যে, হে আল্লাহ! আমরা তোমার দেয়া আমানত সাধ্যপক্ষে আদায় করেছি। এর পরে যেসব ভাইদের নিকট থেকে আমরা নিরাশ হয়েছি, তারা আল্লাহর দিকে ফিরেও যেতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের জ্ঞান তো কেবল তাঁর নিকটেই আছে। সে কারণেই সালাফী তরীকায় দাওয়াত দানকারীকে অবশ্যই নিম্নোক্ত দু'টি বিষয়কে তার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।-
(১) (দাওয়াতের) আমানত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ্র নিকট ওযর পেশ করা।
(২) হঠকারী বান্দাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্ জন্য দলীল কায়েম করা। এরপর বাকী দু'টি উদ্দেশ্য আল্লাহর উপরে ন্যস্ত করতে হবে। চাইলে তিনি তাড়াতাড়ি সে দু'টি বাস্তবায়িত করবেন, চাইলে দেরীতে করবেন। সে দু'টি হ'ল: (১) মানুষের হেদায়াত পাওয়া এবং (২) তাঁর শরী'আত যমীনে কায়েম হওয়া।
প্রথমটি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, إِنَّكَ لا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ 'নিশ্চয়ই তুমি হেদায়াত করতে পারো না যাকে তুমি পসন্দ কর। বরং আল্লাহই যাকে চান তাকে হেদায়াত দান করে থাকেন। আর তিনিই হেদায়াত প্রাপ্তদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত' (ক্বাছাছ ২৮/৫৬)।
দ্বিতীয়টি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُوْনَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْনَ - (النور) 'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা দান করবেন, যেমন তিনি দান করেছিলেন পূর্ববর্তীদেরকে। আর তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাদেরকে অবশ্যই ভীতির বদলে নিরাপত্তা দান করবেন। (শর্ত হ'ল) তারা কেবল আমারই দাসত্ব করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপরে যারা অবাধ্য হবে, তারাই হবে পাপাচারী' (নূর ২৪/৫৫)।
শাসন কর্তৃত্ব দান করা আল্লাহর কাজ। 'আল্লাহ স্বীয় কাজের উপর বিজয়ী। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না' (ইউসুফ ১২/২১)। এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা কেবল ঐসব লোকদেরই কাজ, যারা মানব সমাজে আল্লাহর রীতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নয়।
সেকারণ সালাফী দাওয়াতের পথে যিনি চলবেন, তিনি কখনোই নিরাশ হবেন না। তার প্রচেষ্টা সমূহ কখনোই বিফল হবে না। কেননা কমপক্ষে তিনি তো তার উদ্দেশ্যের অর্ধেকটা পূরণ করেছেন এবং বাকী অর্ধেকটার জন্য সর্বদা আল্লাহ্ অনুগ্রহের প্রত্যাশী আছেন। অর্থাৎ মানুষকে হেদায়াত দান ও ঈমানদারগণের হাতে যমীনের নেতৃত্ব প্রদান। ওটি আল্লাহ্র অনুগ্রহ। তিনি যাকে চান সেটা প্রদান করবেন। তিনি স্বীয় অনুগ্রহ প্রশস্তকারী ও সর্বজ্ঞ। শেষের অর্ধেকটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র কাজ। বান্দার কাজ নয়। আর সাহায্য কেবলমাত্র আল্লাহ্ পক্ষ থেকেই এসে থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدامَكُمْ 'হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তাহ'লে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন ও তোমাদের পাগুলিকে দৃঢ় করবেন' (মুহাম্মাদ ৪৭/৭)।
আমরা মহান আল্লাহকে সাহায্য করতে পারি এভাবে যে, আমরা প্রথমে সত্যিকার অর্থে মুমিন হব। আর সেটা সম্ভব হবে ঈমান ও আমলের পূর্ববর্ণিত তরীকার যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে। অতঃপর আমরা আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল উৎসর্গ করে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে আল্লাহকে ডাকব। আর যাতে আমরা জানি যে, যে ব্যক্তি সর্বাত্মক চেষ্টা করে, সে তার নিজের জন্যেই সেটা করে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জগদ্বাসীর সকল কাজ থেকে বেপরওয়া।
আমরা পূর্ব হ'তে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র সকল মানুষকে এই তরীকার পরিচিতি ও পূর্ণ ব্যাখ্যাসহ এই দাওয়াতের উপর ঈমান আনার আহবান জানাব। যাতে আমাদের ন্যায় তারাও জানতে পারে যে, ইসলাম বুঝা ও সে অনুযায়ী আমল করার জন্য এটাই হ'ল একমাত্র তরীকা। এর ফলে তারা ঈমানের মিষ্টতা ও স্বাদ অনুভব করবে। কেননা তখন তাদের ঈমান হবে দৃঢ় বিশ্বাস ও ইলমভিত্তিক, তাক্বলীদ (অন্ধ অনুকরণ), উচ্ছ্বাস বা মূর্খতা ভিত্তিক নয়। তাদের আমল হবে দৃঢ়চিত্ত আলেমের ন্যায়, নরমপন্থী কিংবা সাময়িক উত্তেজনায় বিগলিত ব্যক্তির মত নয়, যা খুব সত্বরই উবে যায় ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
টিকাঃ
২৬. মুসলিম হা/৪৯; মিশকাত হা/৫১৩৭।