📄 ইত্তেবা দুর্বল হওয়ার কারণ সমূহ : (ক) তাক্বলীদকে জায়েয গণ্য করা
আফসোসের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, বর্তমান যুগে মুসলিমদের মধ্যে এই ইত্তেবা বা অনুসরণের দিকটি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার অনুভূতি প্রশমিত হয়ে গেছে। নিম্নোক্ত কারণগুলি এর জন্য দায়ী।-
১. তাক্বলীদকে জায়েয গণ্য করা (القول بجواز التقليد) :
প্রশাখাগত বিষয় সমূহে বিভিন্ন ফিক্বহী মাযহাবের জন্য পৃথক ফিক্হী মাসআলা সমূহ সংকলন করা এবং তা ছহীহ হাদীছের বিরোধী হৌক বা অনুকূলে হৌক, সে গুলির উপর আমল করে যাওয়ার জন্য ফৎওয়া দেওয়া। সাথে সাথে এ কথা বলা যে, এর মধ্যে যা কিছু আছে সবই সঠিক। যদিও সেগুলি মতভেদে পূর্ণ এবং পরস্পরে বিরোধী।
এর ফলশ্রুতি হিসাবে মানুষের মধ্যে ফিক্বহী মাসআলা সমূহের প্রতি একটা জড়তা সৃষ্টি হয় এবং কুরআন ও সুন্নাহর দলীল অন্বেষণ থেকে লোকেরা বিরত থাকে। আর একারণেই কুরআন ও ছহীহ হাদীছের ইলম ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।
📄 (খ) ইলম ও দলীল ছাড়া ফওয়া দেওয়া
২. ইলম ও দলীল ছাড়া ফৎওয়া দেওয়া (الإফতা بغير علم ودليل) :
'যেকোন মাযহাবের ফিক্বহী সিদ্ধান্ত সঠিক' এরূপ ফৎওয়া দানের ফলে মুফতীগণ প্রত্যেক ফৎওয়া তলবকারীকে ঐসব ফৎওয়াই দিয়ে থাকেন, যেগুলি তার অনুসৃত ফিক্বহী রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। বরং তাদের কেউ কেউ প্রত্যেক মাসআলায় প্রত্যেক মাযহাবের সবচেয়ে সহজ বিধানটি সন্ধান করেন। অতঃপর সেটি দিয়ে ফৎওয়া দেন। ফলে শরী'আত অনুযায়ী আমল করার বিষয়টিকে অপদস্থ করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট হয়। বরং উক্ত আমল এক প্রকার দূর হয়ে যায়। কারণ প্রত্যেক মাযহাবে এমন কিছু অতীব উদার কথা আছে, কুরআন ও হাদীছে যার বিপরীত এসেছে। এ বইয়ে যা বর্ণনার সুযোগ নেই। কিছু লোক এ ব্যাপারে আরও বেশী উদারতা দেখিয়ে থাকে। তারা যেকোন আলেমের যেকোন কথা অনুযায়ী ফৎওয়া দেয়। দূরের ও নিকটের অনেকেই জানেন যে, আধুনিক বহু সংখ্যক আলেম সূদ, মদ, মহিলাদের পোষাক ও তাদের অধিকার সমূহ এবং ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ বিষয়ে কি সব ফৎওয়া দিয়ে থাকেন। আমরা যদি এসব ও অন্যান্য বিষয়ে বাতিল ফৎওয়া সমূহ একত্রে জমা করি, তাহ'লে ইসলামকে পুরাপুরি ও ব্যাপকভাবে ধ্বংসকারী একাধিক ভলিউম গ্রন্থ রচিত হয়ে যাবে।
(খ) এসব বাতিল ফৎওয়া সমূহ কেবল ব্যবহারিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং আমলের সীমানা অতিক্রম করে তা আক্বীদা ও গায়েবী বিষয় সমূহের মধ্যেও প্রবেশ করেছে। ফলে সেখানেও লোকেরা নানা রকমের রায় ও ধ্যান-ধারণার বশীভূত হয়ে পড়েছে। বহু আলেম আক্বীদা ও গায়েবী বিষয় সমূহে বহু ছহীহ হাদীছ বাদ দিয়েছেন এবং এসব বিষয়ে তারা নিজ নিজ ধারণা-কল্পনা ও ইজতেহাদ মতে কথা বলেছেন, যেসব বিষয়ে কোন ইজতেহাদ চলে না। তারা স্ব স্ব যুগের অমুসলিম চিন্তাবিদদের রায় সমূহেরও আশ্রয় নিয়েছেন।
টিকাঃ
১৩. লেখকের تنزيه السنة والقرآن عن أن يكونا من أصول الضلال والكفران বইটিতে দ্রষ্টব্য।
📄 (গ) কুরআন ও সুন্নাহর পঠন-পাঠনের পথ রুদ্ধ করা
৩. কুরআন ও সুন্নাহর পঠন ও পাঠনের পথ রুদ্ধ করা (توعير طريق دراسة القرآن والسنة) :
বিভিন্ন প্রকারের ভয়-ভীতির মাধ্যমে এটা করা হয়। যেমন আমরা অহরহ প্রত্যেক কর্কশভাষীর কাছে শুনছি যে, কুরআন ও সুন্নাহ্ পঠন-পাঠন ও তদনুযায়ী আমলকরণ বিভ্রান্তি বৈ কিছুই নয়। আমরা আরও শুনে থাকি যে, কুরআনের আয়াত ও হাদীছ সমূহকে সর্বপ্রথম ইমাম ও ফক্বীহদের কথার সম্মুখে পেশ করতে হবে। ভাবখানা এই, যেন মানুষের কথাই আসল দলীল, আল্লাহ ও তার রাসূলের কথা নয়। এ ধরনের ভয়-ভীতি ও আশংকা সৃষ্টি মানুষকে কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ বুঝ হাছিল করার পথ রুদ্ধ করেছে এবং জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে তাদেরকে আল্লাহ্র রাস্তা হ'তে বিরত রেখেছে। এটাকে তারা আল্লাহ্ পথের পথিকদের বাঁকা পথে নিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। এর দ্বারা তারা সরাসরি আল্লাহ্ কিতাবের বিরোধিতা করেছে, যা আমাদেরকে কেবল দলীল অনুসরণের হুকুম দিয়েছে ও সর্বদা চোখ খোলা রাখতে বলেছে। যা আমাদেরকে তাক্বলীদ বা অন্ধ অনুসরণ ও বিনা দলীলে বাপ-দাদার তরীকা অবলম্বন করা হ'তে নিষেধ করেছে। ঐসব লোকেরা রাসূল (ছাঃ)-এরও বিরোধিতা করেছে, যিনি কেবল হাদীছের তাবলীগের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مَقَالَتِي فَحَفِظَهَا فَأَدَّاهَا كَمَا سَمِعَهَا - 'আল্লাহ ঐ ব্যক্তির চেহারাকে আনন্দোচ্ছ্বল করবেন, যে ব্যক্তি আমার হাদীছ শুনল। অতঃপর তা মুখস্থ করল এবং যেমনভাবে শুনল ঠিক তেমনভাবে প্রচার করল'। অন্যত্র তিনি বলেন, بَلِّغُوْا عَنِّى وَلَوْ آيَةً 'একটি আয়াত জানা থাকলেও তা তোমরা আমার পক্ষ হ'তে প্রচার করে দাও'।
টিকাঃ
১৪. মুসনাদে বাযযার হা/৩৪১৬, সনদ হাসান; তিরমিযী হা/২৬৬৭; ইবনু মাজাহ হা/২৩০; মিশকাত হা/২৩০; ছহীহ আত-তারগীব হা/৯১।
১৫. বুখারী হা/৩৪৬১; মিশকাত হা/১৯৮।
📄 (ঘ) জীবনের বহু ক্ষেত্র হ’তে শরী‘আত অনুযায়ী আমল বন্ধ করা
৪. জীবনের বহু ক্ষেত্র হ'তে শরী'আত অনুযায়ী আমল বন্ধ করা (إيقاف العمل بالشريعة في كثير من نواحي الحياة) :
বর্তমান যুগে যারা ইসলাম কিছুটা বুঝেন, সেই সব মুসলিমের নিকট একথা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্র বাদে আমাদের জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্র হ'তে ইসলামকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন শাসনকার্য, রাজনীতি, দণ্ডবিধি সমূহ, শিক্ষা, সমাজ, সাহিত্য প্রভৃতি বৈষয়কি ক্ষেত্র সমূহ। এর কতগুলি কারণও আছে। যেমন (১) মুসলিম এলাকা সমূহ কাফেরদের হস্তগত হওয়া এবং সেখানে তাদের চিন্তাধারা ও আচরণ সমূহের অনুপ্রবেশ ও তার অন্ধ অনুকরণ করা। এতদ্ব্যতীত আরও একটি কারণ রয়েছে যা আমাদের আলোচনার মুখ্য বিষয়। তা হ'ল (২) ফিক্বহী ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। অর্থাৎ ঠিক সেই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা যেখানে ছিলেন ফিকুহ শাস্ত্রের ইমামগণ বহু যুগ পূর্বে। অথচ এরপরে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটেছে। যেসবের যথার্থ ইসলামী সমাধানের জন্য ফিক্বহী আন্দোলন অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শরী'আত গবেষণার ক্ষেত্রে এই জড়বদ্ধতা এবং রাজনীতি ইসলামী তরীকা হ'তে বিচ্যুত হওয়ার ফলে মুসলিমদের আন্দোলন বিকল হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে দৈনন্দিন জীবনে কিছু গ্রহণ ও কিছু বর্জনের মাঝে দিশেহারা করে ফেলে। অতঃপর স্বাভাবিকভাবেই তাদের উপর জয়লাভ করে সরকারী প্রশাসন যন্ত্রের ও তার অনুগত মিডিয়া সমূহের শক্তিশালী প্রভাব। আর এসব কিছুর মধ্যেই নমুনা ছিল ইসলামী শরী'আত ও রীতি-নীতিকে মুছে দেওয়ার এবং কালেমায়ে শাহাদাতের দ্বিতীয়াংশের প্রকৃত তাৎপর্যকে বিদায় করে দেওয়ার। যেখানে বলা হয়েছে, أَشْهَدُ أَنْ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ 'আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল'।
ইসলামকে বুঝা ও তদনুযায়ী আমল করার জন্য সালাফী তরীকা তার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে- জনসাধারণ্যে প্রচলিত এইসব পরিণতিগুলিকে অবদমিত করতে, যা রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ ও জনগণের মধ্যে প্রতিবন্ধক হিসাবে রয়েছে। সেকারণ এই দাওয়াত সর্বদা মানুষকে তাক্বলীদ হারাম করার দিকে আহবান করে এবং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এ কথা ওয়াজিব মনে করে যে, সে যেন তার প্রত্যেকটি প্রশ্নের জবাবের জন্য কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলীল তলব করে। এর দ্বারা যেন কেউ এটা না বুঝেন যে, আমরা প্রত্যেককে মুজতাহিদ হওয়া ওয়াজিব বলছি। তা নয়। বরং আমরা প্রত্যেককে এ কথা বলি যে, তিনি যেন দলীলের অনুসারী হন। তিনি যেন তার প্রতিপালকের কিতাব ও তার নবীর সুন্নাহ থেকে প্রমাণের সন্ধানী হন। আর এর মাধ্যমেই কেবল উম্মতের সকল দল এক হ'তে পারে, কিতাব ও সুন্নাহ্ চর্চা বৃদ্ধি পেতে পারে, ইলমী পরিবেশ উন্নত হ'তে পারে এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃসূলভ সহানুভূতি বৃদ্ধি পেতে পারে। এ অবস্থায় কেউ মুসলিম উম্মাহকে সহজে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। কেননা প্রত্যেক ফৎওয়া তলবকারীর জন্য তখন কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ড দাঁড় করানো হবে। কেবল এ অবস্থায় মুসলিম উম্মাহ্র নিকট রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মর্যাদা ও তাঁর অনুসরণের গুরুত্ব যথার্থভাবে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে। আর এভাবেই কেবল সম্ভব হবে ঐসব লোকদের মুখে লাগাম পরানো, যারা হর-হামেশা বিনা দলীলে ফৎওয়া দিতে অভ্যস্ত। কেননা তখন তারা জানবে যে, লোকেরা উপযুক্ত দলীল-প্রমাণ ছাড়া কিছুই আর গ্রহণ করবে না। ফলে ঐ ব্যক্তি যখন নিজের রায় থেকে কোন কথা বলবে, তখন স্পষ্ট বলে দেবে যে, এটা আমার রায়। এতে ভুল হবার সম্ভাবনা আছে। আর যখন বলবে যে, এটি শরী'আতের হুকুম, তখন জনসাধারণ তার নিকটে আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের বাণী থেকে প্রমাণ চাইবে। পূর্বের দু'টি কাজের মাধ্যমে (অর্থাৎ তাক্বলীদ হারাম করা ও দলীলের অনুসরণ করা) এবং অন্য বিষয়ের (যেমন দাওয়াত ও সংগঠনের) মাধ্যমে জনসাধারণের নিকট কুরআন ও হাদীছ চর্চার একটি নতুন ময়দানের আবির্ভাব ঘটবে। উম্মতের মধ্যে নবজীবনের সূত্রপাত হবে। (শারঈ ইলমের) জ্যোতি সর্বত্র বিকশিত হবে। তার সামনে সর্বদা দিগদর্শন স্পষ্ট থাকবে। ফলে যেখানেই সে যাক না কেন বিভ্রান্ত হবে না বা (অন্য আদর্শের) লোকেরা তাকে লাগামহারা পশুর মত পিছে পিছে ঘুরাতে পারবে না, যেটা আল্লাহ চান সেটা ব্যতীত। যখন আমরা এভাবে কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক ফিকুহকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারব, তখন আমরা বর্তমান নাস্তিক্যবাদী স্রোতকে বন্ধ করে দিতে পারব। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাবলীর জবাবে আমরা অমুক বা অমুকের কথা পেশ না করে সরাসরি আল্লাহ্র বা তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর কথা পেশ করব। যদি তারা তা মনোযোগ সহকারে শোনে, তাহ'লে তারা মুসলিম হবে। আর যদি অস্বীকার করে ও প্রত্যাখ্যান করে, তাহ'লে তারা কাফের হবে। এভাবে রাস্তা সমূহ পরিষ্কার হয়ে যায় এবং বেঁচে থাকেন তিনিই, যিনি দলীল সহ বাঁচেন। আর ধ্বংস হয় সেই, যে দলীল ছাড়া বাঁচতে চায়।