📄 ২য় মূলনীতি : ইত্তেবা
পূর্বে বর্ণিত রুকনগুলিসহ তাওহীদের পূর্ণ পরিচয় জানার পর সালাফী দাওয়াতের দ্বিতীয় মূলনীতি হ'ল ইত্তেবা বা অনুসরণ। সালাফী আক্বীদা মতে প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব হ'ল অনুসরণের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে একক হিসাবে মান্য করা। আর এটি হ'ল কালেমায়ে শাহাদাতের দ্বিতীয় অংশের দাবী। আর তা কখনোই পূর্ণ হ'তে পারে না নিম্নোক্ত বিষয়গুলি ব্যতীত।-
(১) একথা জানা যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় মহান প্রতিপালকের পক্ষ হ'তে বান্দাদের প্রতি একজন মুবাল্লিগ বা প্রচারক ছিলেন। তিনি দু'টি 'অহী' নিয়ে এসেছিলেন। একটি আল্লাহ্ কিতাব বা কুরআন। দ্বিতীয়টি তাঁর সুন্নাহ। যেমন তিনি এরশাদ করেন, أَلَا إِنِّى أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَه 'জেনে রেখ, আমি কুরআন ও তার মতই আর একটি বস্তু প্রাপ্ত হয়েছি'।
অতএব আল্লাহ্ কালামের মতই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কালাম (হাদীছ) আক্বীদা, আমল ও গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান। কেননা এটি এবং ওটি দু'টিই মহা পবিত্র আল্লাহ্ পক্ষ হ'তে প্রত্যাদিষ্ট। দ্বীনের ব্যাপার সমূহে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজের পক্ষ থেকে কোন আদেশ-নিষেধ বা হারাম-হালাল করেননি। বরং আল্লাহ্র নির্দেশ মতেই করেছেন। আর তিনি গায়েবের কোন খবর দেননি আল্লাহ্ অহি ছাড়া। যেমন আল্লাহ বলেন, وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوিলِ - لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ - ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ 'আর যদি সে (জিব্রীল বা মুহাম্মাদ) আমাদের নামে কোন কথা রচনা করত', 'তাহ'লে অবশ্যই আমরা তাকে ডান হাত দিয়ে ধরে ফেলতাম'। 'অতঃপর তার গর্দানের রগ কেটে দিতাম' (হা-ক্বাহ ৬৯/৪৪-৪৬)।
আর যখন সুন্নাহর বিষয়টি এমন, তখন তার মধ্যে শামিল রয়েছে শরী'আতের ওয়াজিব, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরূহ, মুবাহ সব রকমের ব্যবহারিক বিষয় সমূহ। অতএব যে ব্যক্তি কোন প্রমাণিত বিশুদ্ধ হাদীছের বিরোধিতা করল, সে যেন সরাসরি কুরআনের বিরোধিতা করল。
(২) দ্বীন হ'ল- একটি পদ্ধতি, একটি তরীকা ও একটি ব্যাপক (সামাজিক) রঙের নাম। কেবল আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একান্ত সম্পর্ক মাত্র নয়। এর অর্থ হ'ল, আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তাঁর রাসূল (ছাঃ) হ'লেন মানুষের সার্বিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের বিধানদাতা। অতএব ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ-তালাক, শাসন ও রাজনীতি এবং দণ্ডবিধি সমূহ প্রভৃতি বিষয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছকে অমান্য করা ছালাত, ছিয়াম, যাকাত, হজ্জ প্রভৃতিকে অমান্য করার ন্যায় গুনাহের কাজ。
(৩) পূর্বোক্ত দু'টি বিষয়ের আলোচনায় রাসূল (ছাঃ)-এর মর্যাদা এমন এক স্তরে উন্নীত হয়েছে, যার নিকটবর্তী হওয়া কোন মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। সেকারণ তার বিরোধিতায় দুনিয়ার কারু কোন কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। চাই তিনি ইমাম, ফক্বীহ, নেতা, রাজনীতিক, চিন্তাবিদ, সমাজ সংস্কারক যিনিই হৌন না কেন। যে ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর কথার পরেও অন্য কারু কোন কথা পেশ করল, সে ব্যক্তি মন্দ কাজ করল, সীমালংঘন করল ও যুলুম করল। সে ব্যক্তি কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতের বিরোধিতা করল。
(৪) ইত্তেবা বা অনুসরণ কখনোই পূর্ণাঙ্গ হবে না রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা ব্যতীত। যেমন তিনি এরশাদ করেন, لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ. মুমিন হ'তে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার নিকট অধিক প্রিয় হব তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষের চাইতে'।
আর এই ভালবাসার পরিচয় মিলবে সর্বদা তাঁর নির্দেশ মেনে চলার মধ্যে, তাঁর আনুগত্যের প্রতি দ্রুততা প্রদর্শনের মধ্যে, সকলের কথার আগে তাঁর কথাকে অগ্রাধিকার দানের মধ্যে, তাঁর অবস্থানস্থল ও যুদ্ধস্থল সমূহ এবং তাঁর সুন্নাত ও জীবন চরিত আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্যে। তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম বর্ষিত হৌক!
টিকাঃ
১১. আবুদাউদ হা/৪৬০৪; আহমাদ হা/১৭২১৩; মিশকাত হা/১৬৩ 'কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা' অনুচ্ছেদ।
১২. বুখারী হা/১৫; মুসলিম হা/৪৪; মিশকাত হা/৭ আনাস (রাঃ) হ'তে। মাননীয় লেখক এখানে أَحَبُّ إِلَيْهِ مِنْ نَفْسِهِ আমি তার নিকট তার নিজের জীবনের চাইতে প্রিয় হব' লিখেছেন। তবে সেটি উপরোক্ত হাদীছে নয়, বরং আব্দুল্লাহ বিন হিশাম (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত অন্য হাদীছে এসেছে (আহমাদ হা/১৮০৭৬)।
📄 ইত্তেবা দুর্বল হওয়ার কারণ সমূহ : (ক) তাক্বলীদকে জায়েয গণ্য করা
আফসোসের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, বর্তমান যুগে মুসলিমদের মধ্যে এই ইত্তেবা বা অনুসরণের দিকটি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার অনুভূতি প্রশমিত হয়ে গেছে। নিম্নোক্ত কারণগুলি এর জন্য দায়ী।-
১. তাক্বলীদকে জায়েয গণ্য করা (القول بجواز التقليد) :
প্রশাখাগত বিষয় সমূহে বিভিন্ন ফিক্বহী মাযহাবের জন্য পৃথক ফিক্হী মাসআলা সমূহ সংকলন করা এবং তা ছহীহ হাদীছের বিরোধী হৌক বা অনুকূলে হৌক, সে গুলির উপর আমল করে যাওয়ার জন্য ফৎওয়া দেওয়া। সাথে সাথে এ কথা বলা যে, এর মধ্যে যা কিছু আছে সবই সঠিক। যদিও সেগুলি মতভেদে পূর্ণ এবং পরস্পরে বিরোধী।
এর ফলশ্রুতি হিসাবে মানুষের মধ্যে ফিক্বহী মাসআলা সমূহের প্রতি একটা জড়তা সৃষ্টি হয় এবং কুরআন ও সুন্নাহর দলীল অন্বেষণ থেকে লোকেরা বিরত থাকে। আর একারণেই কুরআন ও ছহীহ হাদীছের ইলম ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।
📄 (খ) ইলম ও দলীল ছাড়া ফওয়া দেওয়া
২. ইলম ও দলীল ছাড়া ফৎওয়া দেওয়া (الإফতা بغير علم ودليل) :
'যেকোন মাযহাবের ফিক্বহী সিদ্ধান্ত সঠিক' এরূপ ফৎওয়া দানের ফলে মুফতীগণ প্রত্যেক ফৎওয়া তলবকারীকে ঐসব ফৎওয়াই দিয়ে থাকেন, যেগুলি তার অনুসৃত ফিক্বহী রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। বরং তাদের কেউ কেউ প্রত্যেক মাসআলায় প্রত্যেক মাযহাবের সবচেয়ে সহজ বিধানটি সন্ধান করেন। অতঃপর সেটি দিয়ে ফৎওয়া দেন। ফলে শরী'আত অনুযায়ী আমল করার বিষয়টিকে অপদস্থ করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট হয়। বরং উক্ত আমল এক প্রকার দূর হয়ে যায়। কারণ প্রত্যেক মাযহাবে এমন কিছু অতীব উদার কথা আছে, কুরআন ও হাদীছে যার বিপরীত এসেছে। এ বইয়ে যা বর্ণনার সুযোগ নেই। কিছু লোক এ ব্যাপারে আরও বেশী উদারতা দেখিয়ে থাকে। তারা যেকোন আলেমের যেকোন কথা অনুযায়ী ফৎওয়া দেয়। দূরের ও নিকটের অনেকেই জানেন যে, আধুনিক বহু সংখ্যক আলেম সূদ, মদ, মহিলাদের পোষাক ও তাদের অধিকার সমূহ এবং ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ বিষয়ে কি সব ফৎওয়া দিয়ে থাকেন। আমরা যদি এসব ও অন্যান্য বিষয়ে বাতিল ফৎওয়া সমূহ একত্রে জমা করি, তাহ'লে ইসলামকে পুরাপুরি ও ব্যাপকভাবে ধ্বংসকারী একাধিক ভলিউম গ্রন্থ রচিত হয়ে যাবে।
(খ) এসব বাতিল ফৎওয়া সমূহ কেবল ব্যবহারিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং আমলের সীমানা অতিক্রম করে তা আক্বীদা ও গায়েবী বিষয় সমূহের মধ্যেও প্রবেশ করেছে। ফলে সেখানেও লোকেরা নানা রকমের রায় ও ধ্যান-ধারণার বশীভূত হয়ে পড়েছে। বহু আলেম আক্বীদা ও গায়েবী বিষয় সমূহে বহু ছহীহ হাদীছ বাদ দিয়েছেন এবং এসব বিষয়ে তারা নিজ নিজ ধারণা-কল্পনা ও ইজতেহাদ মতে কথা বলেছেন, যেসব বিষয়ে কোন ইজতেহাদ চলে না। তারা স্ব স্ব যুগের অমুসলিম চিন্তাবিদদের রায় সমূহেরও আশ্রয় নিয়েছেন।
টিকাঃ
১৩. লেখকের تنزيه السنة والقرآن عن أن يكونا من أصول الضلال والكفران বইটিতে দ্রষ্টব্য।
📄 (গ) কুরআন ও সুন্নাহর পঠন-পাঠনের পথ রুদ্ধ করা
৩. কুরআন ও সুন্নাহর পঠন ও পাঠনের পথ রুদ্ধ করা (توعير طريق دراسة القرآن والسنة) :
বিভিন্ন প্রকারের ভয়-ভীতির মাধ্যমে এটা করা হয়। যেমন আমরা অহরহ প্রত্যেক কর্কশভাষীর কাছে শুনছি যে, কুরআন ও সুন্নাহ্ পঠন-পাঠন ও তদনুযায়ী আমলকরণ বিভ্রান্তি বৈ কিছুই নয়। আমরা আরও শুনে থাকি যে, কুরআনের আয়াত ও হাদীছ সমূহকে সর্বপ্রথম ইমাম ও ফক্বীহদের কথার সম্মুখে পেশ করতে হবে। ভাবখানা এই, যেন মানুষের কথাই আসল দলীল, আল্লাহ ও তার রাসূলের কথা নয়। এ ধরনের ভয়-ভীতি ও আশংকা সৃষ্টি মানুষকে কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ বুঝ হাছিল করার পথ রুদ্ধ করেছে এবং জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে তাদেরকে আল্লাহ্র রাস্তা হ'তে বিরত রেখেছে। এটাকে তারা আল্লাহ্ পথের পথিকদের বাঁকা পথে নিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। এর দ্বারা তারা সরাসরি আল্লাহ্ কিতাবের বিরোধিতা করেছে, যা আমাদেরকে কেবল দলীল অনুসরণের হুকুম দিয়েছে ও সর্বদা চোখ খোলা রাখতে বলেছে। যা আমাদেরকে তাক্বলীদ বা অন্ধ অনুসরণ ও বিনা দলীলে বাপ-দাদার তরীকা অবলম্বন করা হ'তে নিষেধ করেছে। ঐসব লোকেরা রাসূল (ছাঃ)-এরও বিরোধিতা করেছে, যিনি কেবল হাদীছের তাবলীগের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مَقَالَتِي فَحَفِظَهَا فَأَدَّاهَا كَمَا سَمِعَهَا - 'আল্লাহ ঐ ব্যক্তির চেহারাকে আনন্দোচ্ছ্বল করবেন, যে ব্যক্তি আমার হাদীছ শুনল। অতঃপর তা মুখস্থ করল এবং যেমনভাবে শুনল ঠিক তেমনভাবে প্রচার করল'। অন্যত্র তিনি বলেন, بَلِّغُوْا عَنِّى وَلَوْ آيَةً 'একটি আয়াত জানা থাকলেও তা তোমরা আমার পক্ষ হ'তে প্রচার করে দাও'।
টিকাঃ
১৪. মুসনাদে বাযযার হা/৩৪১৬, সনদ হাসান; তিরমিযী হা/২৬৬৭; ইবনু মাজাহ হা/২৩০; মিশকাত হা/২৩০; ছহীহ আত-তারগীব হা/৯১।
১৫. বুখারী হা/৩৪৬১; মিশকাত হা/১৯৮।