📘 সালাফি দাওয়াতের মূলনীতি > 📄 ১ম মূলনীতি : তাওহীদ

📄 ১ম মূলনীতি : তাওহীদ


যতই গোপন করা হোক, হক মানুষের কাছে একদিন না একদিন স্পষ্ট হয়েই থাকে। সৌন্দর্য যতই লুক্কায়িত থাকুক না কেন, একদিন তা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই থাকে। কিন্তু হক কবুলের পথে একাধিক বাধা আছে। যে বাধার ফলে মানুষ হক গ্রহণ করা হতে বিরত থাকে। হক সূর্যবৎ প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও তা বরণ করতে পারে না। প্রধান প্রধান বাধা নিম্নরূপঃ-

ঈমান বা বিশ্বাস না রাখা
হকের প্রতি ঈমান না রাখা হক গ্রহণের প্রধান বাধা। আল্লাহ, রসুল, কুরআন ও ইসলামের ব্যাপারে অবিশ্বাস রাখলে হক গৃহীত হওয়ার তো কোন প্রশ্নই আসে না। যার প্রতি বিশ্বাস নেই, সে আদরণীয় ও বরণীয় হয় কি ক'রে?
হক এসেছে বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহর তরফ থেকে। যে বিশ্বাস করবে, সে তা গ্রহণ করবে। আর যে অবিশ্বাস করবে, সে তা প্রত্যাখ্যান করবে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَقُلِ الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ فَمَن شَاء فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاء فَلْيَكْفُرْ إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا وَإِن يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاء كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ وَسَاءتْ مُرْتَفَقًا (۲۹) سورة الكهف
অর্থাৎ, বল, 'সত্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সমাগত; সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক ও যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক।' আমি সীমালংঘনকারীদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি অগ্নি, যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেওয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়; যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে; কত নিকৃষ্ট সেই পানীয় এবং কত নিকৃষ্ট সেই (অগ্নির) আশ্রয়স্থল। (সুরা কাহফ ২৯ আয়াত)
পক্ষান্তরে যারা অবিশ্বাসী, তারাও আসলে বাতিলে বিশ্বাসী। তাদের কাছে হক সমাদৃত নয়। পক্ষান্তরে বিশ্বাসিগণ সাদরে হক বরণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
{ذَلِكَ بِأَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَتَّبَعُوا الْبَاطِلَ وَأَنَّ الَّذِينَ آمَنُوا أَتَّبَعُوا الْحَقَّ مِن رَّبِّهِمْ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ لِلنَّاسِ أَمْثَالَهُمْ} (৩) سورة محمد
অর্থাৎ, এটা এই জন্য যে, যারা অবিশ্বাস করেছে, তারা মিথ্যার অনুসরণ করেছে এবং যারা বিশ্বাস করেছে, তারা তাদের প্রতিপালক হতে (আগত) সত্যের অনুসরণ করেছে। এভাবে আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। (সুরা মুহাম্মাদ ৩ আয়াত)

অজ্ঞতা
হক সম্বন্ধে অজ্ঞতা, হককে বাতিল বলে ভ্রম, হকপন্থীকে বাতিলপন্থী বলে ধারণা ইত্যাদি হক গ্রহণে একটি বড় বাধা।
হক ও বাতিলের মাঝে কোন সাদৃশ্য নেই, কোন সামঞ্জস্য নেই। অবশ্য যে উভয়ের পার্থক্য বুঝে না, তার কাছে তালগোল খেয়ে যায়। (যেমন যাদুকে কারামত মনে করে। হকপন্থীকে ওয়াহাবী ইত্যাদি নাম দিয়ে বাতিলপন্থী ধারণা করা।) ভেজাল খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে খাঁটি কিছু দিলে খাঁটিকেই ভেজাল অনুভূত হয়।
ওরা মনে করে, আমরা মূর্তিপূজা করি, তা আমাদের জন্য কিয়ামতে সুপারিশ করবে।
আমরা মূর্তিপূজা করি, তা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য দান করবে! আমরা মাযারে যাই, আল্লাহর ওলী আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে চেয়ে দেবেন! মহান আল্লাহ বলেন,
أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ هَذَا ذِكْرٌ مَن مَّعِيَ وَذِكْرٌ مِّن قَبْلِي بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ الْحَقَّ فَهُم مُّعْرِضُونَ (٢٤) وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ} (٢٥) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, ওরা কি তাঁকে ভিন্ন বহু উপাস্য গ্রহণ করেছে? বল, 'তোমরা তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর। এটিই আমার সঙ্গে যা আছে তাদের জন্য উপদেশ এবং এটিই উপদেশ ছিল পূর্ববর্তীদের জন্য। কিন্তু ওদের অধিকাংশই প্রকৃত সত্য জানে না। ফলে ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়।' আমি তোমার পূর্বে 'আমি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমারই উপাসনা কর'-এ প্রত্যাদেশ ছাড়া কোন রসূল প্রেরণ করিনি। (সূরা আম্বিয়া ২৪-২৫ আয়াত)
হক যখন এল এবং তার প্রমাণে কিছু অলৌকিক কর্মকাণ্ড প্রদর্শিত হল, তখন বাতিলপন্থীরা চোখ বন্ধ ক'রে যাদু বলে দিল! মুসা তাঁর জবাবে বলেছিলেন,
{أَتَقُولُونَ لِلْحَقِّ لَمَّا جَاءَكُمْ أَسِحْرٌ هَذَا وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُونَ) (۷۷) سورة يونس
অর্থাৎ, সত্য যখন তোমাদের কাছে পৌঁছল, তখন সে সম্পর্কে তোমরা কি বলছ, এটা কি যাদু? অথচ যাদুকররা তো সফলকাম হয় না! (সূরা ইউনুস ৭৭ আয়াত)
অনেকে না জেনে হকপন্থী নবীকে 'কবি' বলেছে, 'পাগল' বলেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
أَمْ لَمْ يَعْرِفُوا رَسُولَهُمْ فَهُم لَهُ مُنكِرُونَ (٦٩) أَمْ يَقُولُونَ بِهِ جَنَّةٌ بَلْ جَاءَهُم بِالْحَقِّ وَأَكْثَرُهُمْ لِلْحَقِّ كَارِهُونَ) (۷۰) سورة المؤمنون
অর্থাৎ, অথবা তারা কি তাদের রসূলকে চিনে না বলে তাকে অস্বীকার করে? অথবা তারা কি বলে যে, সে পাগল? বস্তুতঃ সে তাদের নিকট সত্য এনেছে। আর তাদের অধিকাংশ সত্যকে অপছন্দ করে। (সূরা মু'মিনূন ৬৯-৭০ আয়াত)
পক্ষান্তরে জ্ঞানী মানুষরা না জেনে মন্তব্য করেন না। হক তাঁদের সামনে পেশ করা হলে, তাঁরা তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন। সত্যতা প্রকাশ না পেলে চুপ থাকেন; সপক্ষে-বিপক্ষে কোন কথা বলেন না। পক্ষান্তরে অজ্ঞানীরাই অজানা বিষয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। বিশেষ ক'রে তা যদি তাদের চিরাচরিত প্রথা ও সংস্কারের বিরোধী হয় তাহলে।

অন্ধানুকরণ, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব, তকলীদ
কেউ যদি বলে, 'আমার কাছে আমার মা-ই সবার চেয়ে সুন্দরী।' কেউ যদি বলে, 'আমার কাছে আমার ভাষাই বেশী সুন্দর।' কেউ যদি বলে, 'আমার কাছে আমার দেশটাই সবচেয়ে সুন্দর।' কেউ যদি বলে, 'আমার কাছে আমার দেশের লোকই সবচেয়ে ভাল।' কেউ যদি বলে, 'আমার কাছে আমার বাপ-দাদার পন্থাই সবার চেয়ে উত্তম।' কেউ যদি বলে, 'আমার কাছে আমার উস্তাযদের পন্থাই সবার চেয়ে উত্তম।' কেউ যদি বলে, 'আমার কাছে আমার নিজের ঘোলটাই মিষ্টি।' তাহলে সে আর কিভাবে হক গ্রহণ করতে পারে?
যে ব্যক্তি অন্ধভাবে কারো অনুকরণ করে, সে ব্যক্তির হক জানার আগ্রহটুকুও থাকতে পারে না।
যে ব্যক্তি চিরাচরিত প্রথার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়, সেও সত্যের কাছে পৌঁছতে সক্ষম নয়।
যে ব্যক্তি বিজাতির অন্ধানুকরণ করে, সে হক কিভাবে গ্রহণ করতে পারে? আল্লাহর রসুল বলেছেন, "অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির পথ অনুসরণ করবে বিঘত-বিঘত এবং হাত-হাত পরিমাণ (সম্পূর্ণরূপে)। এমনকি তারা যদি সাডার (গোসাপ জাতীয় একপ্রকার হালাল জন্তুর) গর্তে প্রবেশ করে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে (এবং তাদের কেউ যদি রাস্তার উপর (প্রকাশ্যে) স্ত্রী-সংগম করে, তবে তোমরাও তা করবে)!" সাহাবাগণ বললেন, 'আল্লাহর রসূল ইয়াহুদ ও খ্রিষ্টানরা?' তিনি বললেন "তবে আবার কারা?” (বুখারী, মুসলিম ও হাকেম)
কেউ চার মযহাবের এক মযহাবের তকলীদে বিশ্বাসী, বিধায় তিনি হক গ্রহণ করেন না, করতে পারেন না। তাঁর নিকট হক প্রকাশ পেলেও ওজর দেখিয়ে বলেন, 'কিন্তু আমাদের মযহাবে এটা নেই।' যদি বলা হয়, 'সহীহ হাদীসে এরূপ আছে', তাহলেও তিনি ঐ একই কথা বলবেন।
চার মযহাবের মধ্যে কোন এক মযহাবের তকলীদে বিশ্বাসীরা বলেন, 'ইজতিহাদের দরজা বন্ধ।'
তাঁরা বলেন, 'আমাদের ইমাম যা জানেন, সেটাই ঠিক।' তাঁরা বলেন, 'আমাদের মযহাবটাই সঠিক।' তাঁরা যেন দাবী করেন, 'আমাদের ইমাম সমস্ত সহীহ হাদীস জানতেন।' অথচ তা অসম্ভব।
তাঁরা দাবী করেন, 'এক মযহাবের তকলীদ করা ফরয হওয়ার ব্যাপারে ইজমা আছে।' অথচ এ কথা শুদ্ধ নয়।
তাঁরা অন্ধের মত অনুকরণ করেন। অর্থাৎ, সামনে যিনি আছেন, তিনি যেখানে পা রাখছেন, পশ্চাতে তিনিও অন্ধের মতই পা রেখে পথ চলছেন। তিনি চোখ খুলে তাকিয়ে পথ চলেন না। অর্থাৎ, চক্ষুম্মানের মত অনুসরণ করেন না। যাতে সামনে যিনি আছেন, তাঁর পা খালে পড়লেও তিনি অন্ততঃপক্ষে খালে পা না দিয়ে চলতে পারেন। বরং সামনের রাহবারের পা খালে পড়লে, তাঁর পাও খালে পড়া জরুরী মনে করেন। এমন অনুকরণকারীর দলীলী আলোর প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, কানার রাত-দিন সমান। আলো দেখালেও তিনি দেখতে পান না।
দাদুপন্থীরা পরম ভক্তির সাথে বাপ-দাদার অন্ধভাবে অনুকরণ করেন। উদাহরণ স্বরূপ এক ব্যক্তি বিড়াল বেঁধে ভাত খেত। অনেকে দেখে অবাক হয়। লোকটি বিড়াল বেঁধে ভাত খায় কেন? সাথে খেতে এলে সে তো তাড়াতে পারে, তাহলে তাকে বাঁধা কেন?
একজন তাকে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে সে বলল, 'আসলে আমার আব্বাজান এইভাবে বিড়াল বেঁধেই ভাত খেতেন, তাই আমিও খাচ্ছি। অবশ্য কারণ জানা নেই।' কোন এক মুরুব্বীকে প্রশ্ন ক'রে জানা গেল ঐ লোকের দাদাজান নাকি বিড়াল বেঁধে ভাত খেতেন এবং সেই ট্রেডিশন ওর বংশে চলে আসছে। তবে ওর দাদাজান অন্ধ ছিলেন। দাদীজান ভাত দিলে দাদাজানের পাত থেকে বিড়ালে মাছ-মাংস তুলে খেয়ে নিত। তাই ভাত দেওয়ার আগে বাড়ির বিড়ালটাকে বেঁধে দিত। তাই দেখে তার বংশের লোকেদের মাঝে উক্ত আচরণ অভ্যাসে পরিণত হয়!
অথচ এমন আচরণ মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ তার দাদাজান অন্ধ ছিলেন বলেই বিড়াল বেঁধে ভাত খেয়েছেন, কিন্তু সে তো আর অন্ধ নয়। বড় দুঃখের বিষয় যে, যুগে যুগে দাদুপন্থীরা ঐ বংশের লোকেদের মত একই আচরণ ক'রে আসছে। কুরআনে সেই আচরণ ও অভ্যাসের খণ্ডন করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ} (۱۷۰) سورة البقرة
অর্থাৎ, যখন তাদের বলা হয়, 'আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তার তোমরা অনুসরণ কর।' তারা বলে, '(না-না) বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে (মতামত ও ধর্মাদর্শে) পেয়েছি, তার অনুসরণ করব।' যদিও তাদের পিতৃপুরুষগণ কিছুই বুঝত না এবং তারা সৎ পথেও ছিল না। (সূরা বাক্বারাহ ১৭০ আয়াত)
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُولِ قَالُوا حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ} (١٠٤) سورة المائدة
অর্থাৎ, যখন তাদেরকে বলা হয়, 'আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে ও রসূলের দিকে এসো', তখন তারা বলে, 'আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি, তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।' যদিও তাদের পূর্বপুরুষগণ কিছুই জানত না এবং সৎপথপ্রাপ্তও ছিল না, তবুও? (সূরা মাইদাহ ১০৪ আয়াত)
এই কারণেই প্রত্যেক ইমাম অন্ধ-অনুকরণ করা হতে নিষেধ ক'রে গেছেন। তাঁরা সামনের দলীল দেখে ফায়সালা দিয়েছেন এবং বলে গেছেন, 'সহীহ হাদীসই আমার মযহাব।'
সুতরাং অন্ধভাবে অনুকরণ হবে একমাত্র রসুল-এর। দলীলের অভাবে সাময়িকভাবে কোন ইমামের অনুকরণ করা হলেও জেনে রাখতে হবে যে, পানি পাওয়া গেলে তায়াম্মুম বাতিল, কাবার সামনে কিবলা দেখার জন্য কম্পাসের দরকার নেই। সহীহ হাদীস জানা হয়ে গেলে আর কোন মযহাবের তকলীদ বৈধ নয়।
অসৎ আলেম-উলামার তকলীদ, শত্রুপক্ষের ভাড়াটিয়া আলেমদের অন্ধানুকরণ, গোঁড়া অন্ধ পক্ষপাতগ্রস্ত নিম আলেমদের অন্ধানুকরণ হক গ্রহণে অবশ্যই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
দেশগত বা ভাষাগত অন্ধ পক্ষপাতিত্বও হক গ্রহণের পথে অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক নেতাদের অনুকরণ পথভ্রষ্টতার কারণ হতে পারে। স্বামীর একনিষ্ঠ অনুকরণ স্ত্রীর ভ্রষ্টতার বড় কারণ হতে পারে।
সমাজের বৈষয়িক নেতা-মোড়লদের তকলীদও হককে হক বলে মেনে নেওয়ার রাস্তায় কাঁটা হতে পারে। বড়, বুযুর্গ ও নেতাদের অন্ধানুকরণ ক'রে যারা পথভ্রষ্ট, মহান আল্লাহ তাদের কথা আল-কুরআনের কয়েক স্থানেই আলোচনা করেছেন।
يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَ (٦٦) وَقَالُوا رَبَّnَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَ (٦٧) رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنْ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنَا كَبِيرًا ) (٦٨)
اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُونَنَا أَنْ نَكْفُرَ بِاللهِ وَنَجْعَلَ لَهُ أَندَاداً وَأَسَرُّوا النَّدَامَةَ لَّمَا رَأَوْا الْعَذَابَ وَجَعَلْنَا الأغلال في أعْنَاقِ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (۳۳) سورة سبأ
অর্থাৎ, অবিশ্বাসীরা বলে, 'আমরা এ কুরআনে কখনও বিশ্বাস করব না, এর পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও নয়।' আর তুমি যদি দেখতে, যখন সীমালংঘনকারীদেরকে তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে দন্ডায়মান করা হবে, তখন ওরা পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে, যারা দুর্বল (অনুসারী) ছিল তারা দাম্ভিক (অনুসৃত) দেরকে বলবে, 'তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই বিশ্বাসী হতাম।' যারা দাম্ভিক (অনুসৃত) ছিল তারা দুর্বল (অনুসারী) দেরকে বলবে, 'আমরা কি তোমাদের কাছে সৎপথের উপদেশ আসার পর তা গ্রহণ করতে তোমাদেরকে বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরাই তো অপরাধী ছিলে।' আর যারা দুর্বল (অনুসারী) ছিল তারা দাম্ভিক (অনুসৃত) দেরকে বলবে, 'প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিন-রাত আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে, যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর অংশী স্থাপন করি।' যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন মনে মনে অনুতপ্ত হবে। আমি অবিশ্বাসীদের গলদেশে বেড়ি পরাব। ওরা যা করত তারই প্রতিফল ওদেরকে দেওয়া হবে। (সুরা সবা" ৩১-৩৩ আয়াত)
إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنْ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوْا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ (١٦٦) وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا كَذَلِكَ يُرِيهِمْ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ حَسَرَاتِ عَلَيْهِمْ وَمَا هُمْ بِخَارِجِينَ مِنْ النَّار (١٦٧) سورة البقرة
অর্থাৎ, (স্মরণ কর,) যখন অনুসৃত ব্যক্তিবর্গরা অনুসারীদের প্রতি বিমুখ হবে এবং তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে ও তাদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। অনুসারীরা বলবে, 'হায়! যদি একটিবার (পৃথিবীতে) ফিরে যাবার সুযোগ আমাদের ঘটত, তাহলে আমরাও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, যেমন তারা আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল!' এভাবে আল্লাহ তাদের কার্যাবলীকে তাদের পরিতাপরূপে দেখাবেন। আর তারা কখনও আগুন হতে বের হতে পারবে না। (সুরা বাক্বারাহ ১৬৬-১৬৭ আয়াত)
وَبَرَزُوا اللَّهَ جَمِيعًا فَقَالَ الضُّعَفَاء لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنتُم مُّغْنُونَ عَنَّا مِنْ عَذَابِ اللَّهُ مِن شَيْءٍ قَالُوا لَوْ هَدَانَا اللهُ لَهَدَيْنَاكُمْ سَوَاء عَلَيْنَا أَجَزِعْنَا أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِن تَحِيصٍ ] (۲۱) سورة إبراهيم
وَلَوْ تَرَى إِذْ الظَّالِمُونَ مَوْقُوفُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضِ الْقَوْلَ يَقُولُ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لَوْلَا أَنتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِينَ (۳۱) قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا أَنَّحْنُ صَدَدْنَاكُمْ عَنْ الهُدَى بَعْدَ إِذْ جَاءَكُمْ بَلْ كُنتُمْ مُجْرِمِينَ (۳۲) وَقَالَ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا بَلْ مَكْرُ
অর্থাৎ, সবাই আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে; যারা অহংকার করত দুর্বলেরা তাদেরকে বলবে, 'আমরা তো তোমাদের অনুসারী ছিলাম; এখন তোমরা কি আল্লাহর শাস্তি হতে আমাদেরকে কিছুমাত্র রক্ষা করতে পারবে?' তারা বলবে, 'আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করলে আমরাও তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করতাম; এখন আমাদের ধৈর্যচ্যুত হওয়া অথবা ধৈর্যশীল হওয়া একই কথা; আমাদের কোন নিষ্কৃতি নেই।' (সূরা ইব্রাহীম ২১ আয়াত)
وَإِذْ يَتَحَاجُّونَ فِي النَّارِ فَيَقُولُ الضُّعَفَاءُ لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنتُمْ مُغْنُونَ عَنَّا نَصِيباً مِنْ النَّارِ (٤٧) قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُلٌّ فِيهَا إِنَّ اللَّهَ قَدْ حَكَمَ بَيْنَ الْعِبَادِ (٤٨)
অর্থাৎ, যখন ওরা জাহান্নামে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হবে, তখন দুর্বলেরা প্রবলদেরকে বলবে, 'আমরা তো তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম, এখন কি তোমরা আমাদের থেকে জাহান্নামের আগুনের কিয়দংশ নিবারণ করবে?' প্রবলেরা বলবে, 'আমরা সকলেই তো জাহান্নামে আছি, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর দাসদের মাঝে ফায়সালা ক'রে দিয়েছেন।' (সুরা মু'মিন ৪৭-৪৮ আয়াত)
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا رَبَّnَا أَرِنَا الَّذِيْنَ أَضَلانَا مِنْ الْجِنَّ وَالإِنْسِ نَجْعَلْهُمَا تَحْتَ أَقْدَامِنَا لِيَكُونَا من الأسْفَلِينَ (۲۹) سورة فصلت
অর্থাৎ, সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরা বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! যে সব জ্বিন ও মানুষ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দাও, আমরা তাদেরকে পদদলিত করব, যাতে ওরা লাঞ্ছিত হয়।' (সূরা হা-মীম সাজদাহ ২৯ আয়াত)
নেতা-মোড়লদের মুখ রাখতে গিয়েই মহানবী-এর পৃষ্ঠপোষক চাচা আবু তালেব হক গ্রহণ করতে পারেননি।
তাঁর যখন মৃত্যুর সময় হল, তখন মহানবী তাঁকে বললেন, "চাচাজান! আপনি কলেমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়ে নিন। আমি আল্লাহর দরবারে আপনার জন্য সাক্ষ্য দেব। এই কলেমা দলীল স্বরূপ পেশ ক'রে আপনার পরিত্রাণের জন্য সুপারিশ করব।”
কিন্তু পাশে বড় বড় নেতারা বসে ছিল। আবু জাহল, আব্দুল্লাহ বিন আবী উমাইয়া বলল, 'আপনি কি শেষ অবস্থায় বিধর্মী হয়ে মরবেন? আপনি কি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবেন?'
যতবার মহানবী তাঁর উপর পরিত্রাণের জন্য ঐ কালেমা পেশ করেন, ততবার তারা তা নাকচ ক'রে দেয়। ফলে কলেমা না পড়েই তাঁর জীবন-লীলা সাঙ্গ হয়। (বুখারী-মুসলিম)
খালেদ বিন অলীদকে বলা হল, 'তোমার জীবনে এত বছর কেটে গেল, অথচ ইসলামের নূর দেখতে পেলে না (এত দেরীতে দেখতে পেলে)?' উত্তরে তিনি বললেন, 'আমাদের সামনে এমন লোক ছিল, যাদের বিবেক-বুদ্ধি পাহাড়তুল্য জ্ঞান করতাম, তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। (তাই আমিও করিনি!)' তারা ছিল অলীদ বিন মুগীরাহ, আম্র বিন হিশাম, উতবা, শাইবা, আবু জাহল প্রভৃতি জাঁদরেলরাই ইসলামের আলো দেখতে দেয়নি।
ইসলামী জীবনেও কারো অন্ধানুকরণ বা ব্যক্তিপূজা করো না। মনে রেখো যে, মহানবী বলেছেন, "নিঃসন্দেহে আল্লাহ লোকদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইল্ম তুলে নেবেন না; বরং উলামা সম্প্রদায়কে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে ইল্ম তুলে নেবেন (অর্থাৎ, আলেম দুনিয়া থেকে শেষ হয়ে যাবে।) অবশেষে যখন কোন আলেম বাকি থাকবে না, তখন জনগণ মূর্খ অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরকে নেতা বানিয়ে নেবে এবং তাদেরকে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হবে, আর তারা না জেনে ফতোয়া দেবে, ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অপরকেও পথভ্রষ্ট করবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
ইবনে মাসউদ বলেন, 'তুমি আলেম হও অথবা তালেবে ইল্ম হও। আর পরানুগামী হয়ো না।' (ত্বাহাবী)
তোমার জীবনে যদি কোন আলেমকে বড় মনে কর, তাহলে তাঁর অন্ধানুকরণ নয়; বরং দলীল দেখে অনুসরণ করো। তিনি তোমার প্রিয় হলেও হক যেন তোমার নিকট অধিক প্রিয় হয়। ইমাম ইবনুল কাইয়েম (রাহিমাহুল্লাহ) শাইখুল ইসলাম ইসমাঈল আল-হারাবী প্রসঙ্গে যেমন বলেছিলেন, তুমিও তোমার শায়খুল ইসলাম সম্বন্ধে বলো,
شيخ الإسلام حبيب إلينا ، ولكن الحق أحب إلينا منه.
অর্থাৎ, শায়খুল ইসলাম আমাদের প্রিয় পাত্র; কিন্তু আমাদের নিকট 'হক' হল তাঁর চেয়েও বেশী প্রিয়। (মাদারিজুস সালিকীন ২/৩৭)

বাধা সৃষ্টিকারী বিষয়, ব্যক্তি, শয়তান
অনেক বিষয় আছে, যা সরাসরি হক গ্রহণে বাধা দেয়, অনেক ব্যক্তি আছে, যারা নিজেদের প্রভাব ও ক্ষমতা বলে অপরকে হক গ্রহণে বাধা দান করে। আর শয়তান তাদের প্রধান, যে সর্বদা মানুষের পশ্চাতে থেকে হক গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
শয়তান তো এ কাজের জন্য মহান আল্লাহর কাছে অনুমতি নিয়ে বসে আছে। সে বলেছিল,
أَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ (١٤) قَالَ إِنَّكَ مِنْ المُنظَرِينَ (١٥) قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ المُسْتَقِيمَ (١٦) ثُمَّ لَا تِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ (۱۷) سورة الأعراف
অর্থাৎ, 'পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।' তিনি বললেন, 'যাদের অবকাশ দেওয়া হয়েছে, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে।' সে বলল, 'যাদের কারণে তুমি আমাকে ভ্রষ্ট করলে, আমিও তাদের জন্য তোমার সরল পথে নিশ্চয় ওঁৎ পেতে থাকব; অতঃপর আমি অবশ্যই তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, ডান ও বাম দিক হতে তাদের নিকট আসব এবং তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না।' (সূরা আ'রাফ ১৪-১৭ আয়াত)
মহান আল্লাহ বলেছিলেন,
اخْرُجْ مِنْهَا مَذْهُ وَمَا مَدْحُوراً لَمَنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ لأَمْلأَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكُمْ أَجْمَعِينَ (۱۸) الأعراف
অর্থাৎ, 'এ স্থান হতে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় বের হয়ে যাও, মানুষের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের দ্বারা জাহান্নام পূর্ণ করবই।' (ঐ ১৮ আয়াত)
তিনি আরো বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيداً (١١٦) إِنْ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِنْ يَدْعُونَ إِلا شَيْطَانَاً مَرِيداً (۱۱۷) لَعَنَهُ اللَّهُ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيباً مَفْرُوضاً (۱۱۸) وَلَأُضِلَّنَهُمْ وَلا مَيَنَّهُمْ وَلَا مُرَنَّهُمْ فَلَيْتَكُنَّ أَذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَا مُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللهُ وَمَنْ يَتَّخِذُ الشَّيْطَانَ وَلِيَا مِنْ دُونِ اللهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَاناً مُبِيناً (۱۱۹) يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ وَمَا يَعِدُهُمْ الشَّيْطَانُ إِلا غُرُوراً (۱۲۰) أُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَلَا يَجِدُونَ عَنْهَا مَحِيصاً (۱۲۱) وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارِ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَداً وَعْدَ اللهِ حَقًّا وَمَنْ أَصْدَقُ مِنْ اللهِ قيلا (۱۲۲) سورة النساء
শয়তানের পূজা করে। আল্লাহ তাকে (শয়তানকে) অভিসম্পাত করেছেন এবং সে (শয়তান) বলেছে, 'আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে (নিজের দলে) গ্রহণ করবই। এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবই; তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করবই, আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব ফলে তারা পশুর কর্ণচ্ছেদ করবেই এবং তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবেই।' আর যে আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, নিশ্চয় সে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে। আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ছলনা মাত্র। এ সকল লোকের বাসস্থান জাহান্নাম। তা হতে তারা নিষ্কৃতির উপায় পাবে না। যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদেরকে বেহেন্তে প্রবেশাধিকার দান করব; যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কে আছে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী? (সূরা নিসা ১১৬-১২২ আয়াত)
এই জন্যই মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক ক'রে বলেন,
وَلَا يَصُدَّنَّكُمُ الشَّيْطَانُ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ } (٦٢) سورة الزخرف
অর্থাৎ, শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই এ হতে নিবৃত্ত না করে, সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা যুখরুফ ৬২ আয়াত)
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبُهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِينِ
অর্থাৎ, শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবেই গ্রহণ কর। সে তো তার দলবলকে এ জন্য আহবান করে যে, ওরা যেন জাহান্নামী হয়। (সুরা ফাত্বির ৬ আয়াত)
এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা ধর্মের নামে মানুষের মনে স্থান গ্রহণ ক'রে তাকে হকপথে বাধা দেয়। হয় হক চিনতে দেয় না, না হয় চেনার পর তা গ্রহণ করতে দেয় না, উল্টে অসৎ উপায়ে তাদের মালও ভক্ষণ করে! মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عن سَبِيلِ اللهِ} (٣٤) سورة التوبة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! নিশ্চয় অনেক পন্ডিত-পুরোহিত মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায় উপায়ে ভক্ষণ করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি ক'রে থাকে। (সূরা তাওবাহ ৩৪ আয়াত)
তিনি আরো বলেন,
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা ক'রে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শির্ক) করে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়। তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে তারা কেবল নারীদেরকে আহবান (দেবীদের পূজা) করে এবং তারা কেবল বিদ্রোহী
اشْتَرَوْا بِآيَاتِ اللهِ ثَمَنًا قَلِيلاً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (٩) التوبة
অর্থাৎ, তারা আল্লাহর আয়াতকে নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করে ও তারা লোকদেরকে তাঁর পথ হতে নিবৃত্ত করে। নিশ্চয় তারা যা ক'রে থাকে, তা অতি জঘন্য। (ঐ ৯ আয়াত)
কিছু মুসলিম আছে, যারা মুসলিম হয়েও ইসলামকে পছন্দ করে না। অথচ তারা কোন স্বার্থে অন্য ধর্মেও ধর্মান্তরিত হয় না। এরা বরের ঘরের মাসি আর কনের ঘরের পিসি। এরা মানুষকে ইসলামের পথে বাধা দেয়। এরা ঘরের ঢেকি কুমিরের মত ইসলামের মহা সর্বনাশ করে। এরা নিজেদের আমলে, আচরণে, কথায় ও লেখনীতে মানুষের মনে ইসলামের প্রতি বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করে।
আর কাফের তো কাফেরই। মুশরিকও কাফেরই। আহলে কিতাবরাও তাই। তারা কি মানুষকে ইসলামের পথে বাধা দিতে কসুর করবে? কক্ষণই না। মহান আল্লাহ এদের অবস্থা বর্ণনা ক'রে বলেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّnْ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِباً أُوْلَئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَى رَبِّهِمْ وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ (۱۸) الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجاً وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ (۱۹) سورة هود
অর্থাৎ, আর ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে? ঐ লোকদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে পেশ করা হবে এবং সাক্ষী (ফিরিশ্তা)গণ বলবে, 'এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালক সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছিল। জেনে রেখো, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।' যারা অপরকে আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা প্রদান করে এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। আর তারাই পরকাল সম্বন্ধেও অবিশ্বাসী। (গুর হ্রদ ১৬-১৯ আয়াত)
অর্থাৎ, আল্লাহর পথে; যার মালিকানাধীন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে। কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ অবিশ্বাসীদের জন্য। যারা ইহজীবনকে পরজীবনের উপর প্রাধান্য দেয়, মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করে; তারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে। (সূরা ইব্রাহীম ২-৩ আয়াত)
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ آمَنَ تَبْغُونَهَا عِوَجًا وَأَنتُمْ شُهَدَاء وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ) (۹۹) سورة آل عمران
অর্থাৎ, বল, 'হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! তোমরা বিশ্বাসীদেরকে আল্লাহর পথে বাধা দান করছ কেন? তোমরা তার বক্রতা অন্বেষণ করছ; অথচ তোমরাই (এ বিষয়ে) সাক্ষী। আর আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্বন্ধে উদাসীন নন।' (সূরা আলে ইমরান ৯৯ আয়াত)
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ خَرَجُوا مِن دِيَارِهِم بَطَرًا وَرِئَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَاللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحيط) (٤٧) سورة الأنفال
অর্থাৎ, তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা গর্বভরে ও লোক দেখানোর জন্য নিজ গৃহ হতে বের হয়েছিল এবং লোককে আল্লাহর পথ হতে বাধা দান করছিল। তাদের সকল কীর্তিকলাপই আল্লাহর জ্ঞানায়ত্তে রয়েছে। (সূরা আনফাল ৪৭ আয়াত)
শুধু বাধাদানই নয়, গ্যারান্টির সাথে বাধাদান। 'আমার কথা শোনো, পরিত্রাণ পাবে। তোমার পাপভার আমি বহন করব!' 'এটাই সঠিক পথ, ভুল হলে আমি আছি!' 'আমার তরীকায় চল, পরকালে আমিই তোমাকে তরিয়ে নেব!' মহান আল্লাহ বলেন,
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا أَتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْتَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُمْ بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُم مِّن شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ (١٢)
অর্থাৎ, অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলে, 'তোমরা আমাদের পথ ধর; আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব!' কিন্তু ওরা তো তোমাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। ওরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।
পক্ষান্তরে অপরকে ভ্রষ্ট করার পাপভার অবশ্যই বহন করবে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ } (۱۳)
অর্থাৎ, ওরা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহন করবে এবং তার সঙ্গে আরও কিছু পাপের বোঝা এবং ওরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে। (সূরা আনকাবুত ১২-১৩ আয়াত)
لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ أَلَا سَاءَ مَا يَزِرُونَ) (٢٥) سورة النحل
অর্থাৎ, ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং তাদেরও পাপভার যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু বিভ্রান্ত করেছে। দেখ, তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট। (সূরা নাহল ২৫ আয়াত)
আর এমন কত শত মানুষ রয়েছে, যারা নিজেদের খেয়াল-খুশী মত বিনা ইলমে মানুষকে ভ্রষ্ট করে, হকপথে বাধা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন,
وَإِنَّ كَثِيرًا لَّيُضِلُّونَ بِأَهْوَائِهِم بِغَيْرِ عِلم إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِالْمُعْتَدِينَ} (۱۱۹) الأنعام
অর্থাৎ, অনেকে অজ্ঞানতাবশতঃ নিজেদের খেয়াল-খুশী দ্বারা অবশ্যই অন্যকে বিপথগামী করে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সীমা লংঘনকারীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। (সূরা আনআম ১১৯ আয়াত)
ইসলামের দুশমনরা ইসলামকে দ্রুত প্রসারিত হতে দেখে হিংসায় নানা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলিমদের নানা দোষ বের ক'রে এবং অনেক সময় অপবাদ রচনা ক'রে রটনার ব্যবস্থা ক'রে তারা আল্লাহর পথে মানুষকে বাধা প্রদান করছে। তাদের হাতে রয়েছে মিডিয়া। তাদের সাথে রয়েছে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ। এমনকি অধিকাংশ মুসলিমরাও তাদেরই তাবেদার। সুতরাং আল্লাহই সাহায্যস্থল। যে সকল অপবাদ দিয়ে দুশমনরা মানুষকে হকপথে বাধা দেয়, তার কিছু নিম্নরূপঃ-
* মুসলিমরা উগ্র, সন্ত্রাসী।
এটি একটি ভুল কথা। প্রত্যেক ধর্মের মানুষদের মধ্যেই কিছু না কিছু উগ্র লোক আছে। আর সন্ত্রাসের কোন জাত-ধর্ম নেই। অধিকাংশ সন্ত্রাস রাজনৈতিক বিষয়ীভূত। তাছাড়া কিছু মানুষের কর্ম দেখে গোটা জাতির উপর ব্যাপক মন্তব্য করা যায় না।
* মুসলিমরা নোংরা।
মুসলমানরা অখাদ্য খায়, চুরি-ডাকাতি করে, তারা মেচ্ছ ও ছোটলোক। মাথা ফাটাফাটি করে, মামলা-দাঙ্গা করে!
* মুসলিমরা খুনেরা-লুটেরা।
স্থানীয় পরিবেশ তথা কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড দেখে এই শ্রেণীর ধারণা ভুল। এক সময় বোম্বাইয়ের পথে ট্রেনে এক বাংলাদেশী শরণার্থী অমুসলিম মহিলার সাথে কথোপকথন হয়। কথায় কথায় তিনি আমার কাছে উক্ত অভিযোগ করেন। তিনি নাকি মুসলিমদের অত্যাচারে স্বদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। পরিশেষে কথার জেরে তিনি স্বীকার করলেন যে, মুসলিমদেরই সহযোগিতায় তাঁর পরিবার ভারত আসতে সক্ষম হয়।
বলা বাহুল্য, গ্রামে দু-একটি চোর থাকলে লোকে 'চোর-গ্রাম' বলে; কিন্তু তা অন্যায়। দু-একটি আলেম নৈতিকতার বাইরে থাকলে গোটা আলেম-সমাজকে ছোট নজরে দেখা অন্যায়। দু-একটা বিহারী কোন অন্যায় কাজ করলে পুরো বিহারকে অপরাধী করা অন্যায়। দলের দু-একটি লোক মদ্যপায়ী হলে গোটা দলকে মদ্যপায়ী বলা অন্যায়। তাছাড়া ইসলাম কি বলে, তা বিচার্য। মুসলিমরা কি করে, তা বিচার্য নয়।
কিছু মুসলিম সত্যই খারাপ, তারা আসলে নামধারী, জাতভাগ করলে তারা নিচু জাতে পড়ে। কিন্তু তাদের জন্য পুরো মুসলিম জাতির বদনাম করা জ্ঞানীর কাজ নয়। অতীব দুঃখের বিষয় যে, কাগজের ইসলাম ও বাস্তবের মুসলিম এক নয়। মুসলিম সমাজের অধিকাংশ মানুষের আমল নেই বলেই ইসলামের পূর্ণ সুন্দর রূপ মলিন হয়ে আছে। আমল নেই দেখেই আফশোস করে উর্দু কবি বলেছেন, 'ইসলাম দার কিতাব অ মুসলিম দার গোর।' অর্থাৎ, ইসলাম আছে কিতাবের মাঝে মুসলিম আছে গোরে। আর কবি নজরুলের ভাষায়, 'ইসলাম কেতাবে শুধু মুসলিম গোরস্থান।' তার মানে আসল ইসলাম কুরআন-হাদীসে সীমাবদ্ধ আছে এবং খাঁটি মুসলিম সাহাবা- তাবেঈনগণ গোরস্থানে সমাধিস্থ আছেন।
* ইসলাম তরবারি দ্বারা প্রচারিত হয়েছে।
ইসলামী ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ব্যক্তির উক্তি এটা। তবে তরবারির প্রয়োজন হয়েছে সে কথা ঠিক। প্রত্যেক জাতি ও দেশের জন্যই শক্তি আবশ্যকীয়। আত্মরক্ষা ও পূর্ণ প্রতিষ্ঠা শক্তি ছাড়া তো সম্ভব নয়। আজ কেন সেই জাতিকে মহা উন্নত মানা হয়, যার শক্তি সবচেয়ে বেশী? তাছাড়া শক্তির যথাপ্রয়োগ করা অন্যায় বা নৈতিকতা-বিরোধী নয়; যেমন সব জাতির লোকই তা ক'রে থাকে।
* ইসলাম প্রগতির অন্তরায়।
এটি একটি অপবাদ। প্রগতি বা বিজ্ঞানের পথে ইসলাম বাধা দেয় না। ইসলাম বাধা দেয় প্রগতির নামে দুর্গতির পথে।
* ইসলামে স্বাধীনতা নেই।
এ কথাটা অনেকটা সত্য। কারণ, ইসলাম মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ধর্ম। সেই ধর্ম পালন করতে হলে স্বাধীনতায় বাধা তো পড়বেই। তবে তা আসলে পরাধীনতা নয়, তা সুশৃঙ্খলতা। শৃঙ্খলতাকে কেউ পরাধীনতা বললে ভুল হবে। তাছাড়া এ জীবনে স্বাধীনতা কারো নেই। এমনকি পাগলেও স্বাধীনতা প্রয়োগ করলে তাকে মার খেতে হয়। নিজের স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে গিয়ে অপরের স্বাধীনতায় ব্যাঘাত ঘটলে তা অবশ্যই সভ্য সমাজে স্বীকৃত নয়। প্রত্যেক ধর্ম, জাতি ও দেশে সেই নিয়ম-শৃঙ্খলা আছে, যা মেনে চলা পরাধীনতা নয়। ইসলামও একটি জীবন-ব্যবস্থা, যা গ্রহণ করলে ঐ শ্রেণীর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। তাতে সকলের জীবন সুখী হয়।
* ইসলামে মানবাধিকার লংঘন হয়।
বিবাহিত ব্যভিচারীকে, মাদকদ্রব্য পাচারকারী প্রভৃতি সমাজবিরোধীদেরকে হত্যা, চোরের হাত কাটা প্রভৃতি আইন কার্যকর করলে অনেকের মতে তাতে মানবাধিকার লংঘন হয়। অথচ যাদের বিরুদ্ধে এ আইন প্রয়োগ করা হয়, তারাই আগে মানবাধিকার লংঘন করে। মানবের অধিকার বহাল করতে যে আইন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা রচনা করেছেন, তাতে 'মানবাধিকার লংঘন হয়' বলে অভিযোগ সত্যই দুঃখজনক।
* ইসলামে একাধিক বিবাহ।
প্রয়োজনে কেউ গার্লফ্রেন্ড ব্যবহার না ক'রে একাধিক বিবাহ করতে পারে। তবে তা শর্তহীনভাবে নয়। একাধিক স্ত্রী রাখার শর্ত আছে, তা পালন করতে না পারলে একাধিক বিবাহ বৈধ নয় ইসলামে।
* অবরোধ প্রথা ও নারী-স্বাধীনতা
আসলে অবরোধ প্রথা ইসলামের নয়। এটা ইসলামের উপর আরোপিত একটি মিথ্যা। নারীর হিফাযতের জন্য সৃষ্টিকর্তার আদেশক্রমে পর্দাপ্রথা আছে। নারী-স্বাধীনতা তথা যৌন-স্বাধীনতা নেই ইসলামে। প্রত্যেক মানুষও দামী জিনিসকে হিফাযতে রেখে রক্ষণাবেক্ষণ ক'রে থাকে। ছাল-ফাটা কলা কেউ কিনে না। যে চকোলেটের কাগজ খোলা সে চকোলেটকে বাচ্চারাও পছন্দ করে না।
* ইসলামে নারী-পুরুষ সমান নয়।
এ কথা ঠিকই। ইসলাম নারীকে পুরুষের সমান অধিকার দেয়নি; তবে যথার্থ অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে। কখনো নারীকে পুরুষের তিনগুণ বেশী অধিকার প্রদান করেছে। পুরুষকে নারী অপেক্ষা বেশী মর্যাদা দিয়েছে, তবে নারীর অমর্যাদা করেনি। ছোট বোন অপেক্ষা বড় বোনের মর্যাদা যদি বেশী বলা হয়, তাতে ছোট বোনের মর্যাদাক্ষুণ্ণ হওয়ার কথা নয়।
* কা'বা আসলে মন্দির ছিল, হাজরে আসওয়াদ শিবলিঙ্গ!
এ কথা বলে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হয়। মানুষকে বুঝানো হয় যে, মুসলিমরা আসলে জবরদখলকারী; যেমন ইয়াহুদীরা বায়তুল মাক্বদিসের জন্য বলে থাকে।
কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, জবর-দখলকৃত কোন স্থানে মুসলিমদের নামায হয় না। দ্বিতীয়তঃ আমার ইসলাম গ্রহণ করার পর আমি যদি আমার মন্দির বা গির্জা ভেঙ্গে মসজিদে পরিণত করি, তাহলে তাতে কার কি বলার আছে? যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, সেই মসজিদ তাদের বলে দাবী করা কি গা-জোরামি নয়?
আর মক্কার কৃষ্ণ-পাথর তো লিঙ্গের মত নয়। তবে এ হাস্যকর দাবী কেন? এ পাথরটি আসলে বেহেশতের পাথর। এর ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁরা এমন কথা বলে নিজেকে পরিহাসের পাত্র করেন না।
পক্ষান্তরে মুসলিমরা কোন দেশেই বহিরাগত জবরদখলকারী নয়। যেহেতু প্রত্যেকটি অমুসলিমই ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া দলের মানুষ। প্রতিটি শিশু ইসলামের প্রকৃতি নিয়ে জন্ম নেয়। সুতরাং যখন কোন অমুসলিম 'মুসলিম' হয়, তখন সে তার আসলত্বে ফিরে যায়। যেহেতু মানুষের ইতিহাসের সর্বযুগেই সৃষ্টিকর্তার ধর্ম ছিল একমাত্র ইসলাম। সারা বিশ্ব তাদেরই। পরবর্তীতে ধর্মচ্যুত হলে বিধর্মীদের হাতে যা যাবার তা চলে যায়। আর যখন তা কোন মুসলিম ফিরে পায়, তা নিজের জিনিস ফিরে পায়। সারা বিশ্ব ততদিন থাকবে, যতদিন একটি মুসলিমও বেঁচে থাকবে। মুসলিম শেষ তো বিশ্বের কাহিনীও শেষ।
মোট কথা, এই শ্রেণীর আরো কত শত মিথ্যা অভিযোগ ও দাবী উত্থাপন ক'রে এবং ইসলাম ও মুসলিমদের গাত্রে মিথ্যা কলঙ্ক লেপন ক'রে দুশমনরা মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে রাখতে চায়। এর ফলে কোন মুসলিমকে ইসলাম থেকে না ফিরানো গেলেও, অন্তঃতপক্ষে অমুসলিমকে ইসলাম থেকে বিরত রাখা হয়।
একজন দ্বীনের আহবায়ক বলেন, 'তিনি পশ্চিমা এক দেশের এক শহরে কোন এক হোটেলে অবস্থান করছিলেন। নামাযের সময়ে তিনি বাইরের এক হওযে ওযু ক'রে নামায পড়তেন। তিনি লক্ষ্য করতেন, তাঁর ওযু ক'রে উঠে যাওয়ার পর একটি কিশোর ওযুর পানিতে ভালভাবে কি যেন খুঁজছে। একদা তিনি কিশোরটির কাছে ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, "বাবা! তুমি ওখানে ওভাবে কি দেখছ?”
ছেলেটি বলল, "আমি শুনেছি, মুসলমানরা যখন ওযু করে, তখন তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে পোকা ঝরে পড়ে! তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য দেখছি।”
অতঃপর আমি তাকে বুঝিয়ে তার ভুল ভাঙ্গি।'
পাড়া-গ্রামে যখন আইসক্রিম বিক্রি করতে আসে, তখন সর্দি লাগার ভয়ে অথবা পয়সার অভাবে যে মায়েরা তাঁদের বাচ্চাদেরকে আইসক্রিম খেতে দিতে চান না, তাঁরা তাদেরকে মিথ্যা ক'রে বলেন, 'আইসক্রিম খেতে নাই, আইসক্রিমে পোকা আছে!' অতঃপর যদি কোন চালাক শিশু পীড়াপীড়ির পর আইসক্রিম হাতে পায়, তাহলে মাকে বলে, 'কই মা পোকা? তুমি যে বলছিলে।' তখন চালাক মাও বলে, 'কেরোসিন তেলে দিলে দেখা যায়!' তখন কেরোসিনে দিয়ে কি শিশু আইসক্রিমটা নষ্ট করতে চায়?
অনুরূপই ইসলাম-বিদ্বেষীদের অবস্থা। যেন-তেন-প্রকারেণ তারা মানুষকে ইসলাম ও হক থেকে দূরে রাখতে চায়। ইতিহাস বিকৃত ক'রে প্রচার করা হয়, মুসলিম-বিরোধী সাম্প্রদায়িক গল্প লেখা হয়। মুসলিম-বিদ্বেষমূলক নাটক, যাত্রা, ফিল্ম প্রভৃতি প্রদর্শিত হয়। ইসলামের সাদা কাপড়কে দাগদার করা হয়! মুসলিমদের ভিতরেও হক-বিরোধী বহু দল হকপন্থীদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালায়। যেমন:-
* ওরা নবীকে ভালবাসে না।
আসলে হকপন্থীরা ভালবাসাতে অতিরঞ্জন করে না এবং ভালবাসতে বিদআত করে না তথা নবীকে আল্লাহর আসনে তোলে না।
* ওরা নবীর উপর দরূদ পড়ে না।
আসলে হকপন্থীরা মনগড়া দরূদ পড়ে না, দরূদে কিয়াম করে না। নচেৎ দরূদ তো অবশ্যই পড়ে।
* ওরা আওলিয়াদের প্রতি আদব রাখে না।
আসলে হকপন্থীরা আওলিয়াগণকে 'গায়েব জানেন' বলে মনে করে না। তাঁদের কবরকে মাযারে পরিণত করে না, তাঁদেরকে সিজদা করে না ইত্যাদি। আর এ সব তাঁদের প্রতি বেআদবীর পরিচয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি যথার্থ আদবের পরিচয়।
*ওদের কোন ওলী-আল্লাহ নেই।
অর্থাৎ, ওদের কোন লোকের মাযার নেই, বাঁধানো কবর নেই। হক-বিরোধীদের নিকট মাযার-ওয়ালাই আল্লাহর ওলী। আর তাদের নিকট এ কথা অজানা না যে, ইসলামে মাযার নেই।
* ওদের কোন কারামত নেই।
ওরা গায়বী খবর বলতে পারে না। কারামত তো আল্লাহর হাতে। ইচ্ছা ক'রে কারামতি দেখানো যায় না। অবশ্য যাদু বা ম্যাজিক দেখানো যায়। আর গায়বী খবর বলবে কিভাবে? গায়বী খবর কোন অসীলা ছাড়া তো বলা যায় না। ওদের কারো নিকট ফিরিশাও আসে না, ওদের কেউ শয়তানও ব্যবহার করে না এবং যান্ত্রিক কোন মাধ্যমও ব্যবহার করে না। তাছাড়া গায়বী দাবী করা যে কুফরী।
* ওদের মযহাব খিয়ালের ও রিয়ালের।
দেশে এক রকম বলে, এখানে এক রকম। এটি একটি গায়ে ঝাল ধরানো মিথ্যা কথা। তাছাড়া তারা জানে যে, হকপন্থীরা সহীহ দলীল ছাড়া কথা বলে না, আবোল-তাবোল বিশ্বাস করে না। আর হকপন্থীদের ইসলাম রিয়ালের হলে, হকবিরোধীদের ইসলাম কি নিয়াযের ও ঈসালের নয়? হকপন্থীদের ইসলাম রসূলের তথা হকবিরোধীদের ইসলাম কি বুযুর্গদের নয়? তারা এ কথাও জানে যে, তাদের দেশেই এমন অনেক আলেম-উলামা আছেন, যাঁরা রিয়াল না খেয়েও হক কথা বলেন।
* ওরা আমেরিকাকে বা অমুক পার্টিকে সমর্থন করে, ও দেশে রাজতন্ত্র আছে।
এই বলে রাজনৈতিক কোন প্রবণতাকে ছুতা বানিয়ে বিরোধীরা হকপন্থীদের হকে জুতা মারে! দেশের নেতাদের কোন ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের সাথে সে দেশের রব্বানী আলেম-উলামার ফতোয়ার কি সম্পর্ক থাকতে পারে? বাড়িতে শখ ক'রে কুকুর পালা জায়েয নয়। কিন্তু পাহারাদারি ও শিকার করার কাজে কুকুর পালা জায়েয। রাজনৈতিক বিশেষ পরিস্থিতিতে আমেরিকান সৈন্যকে সউদী আরবে স্থান দেওয়া হলে সেখানকার উলামাদের ফতোয়া প্রত্যাখ্যানযোগ্য হবে, এমন যুক্তি তো জ্ঞানীদের হতে পারে না। মুফতী সাহেব নিজ জমির ফসল পাহারার জন্য অথবা কোন দুশমনের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য ঢালস্বরূপ যদি কোন কাফেরকে ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁর দ্বীনী ফতোয়া অমান্য হবে কোন যুক্তিতে?
* ও দেশের মুআযযিযনে সিগারেট মুখ থেকে ফেলে আযান দেয়!
এক শ্রেণীর হাজী আছেন, যাঁরা হজ্জের মর্ম বুঝেন না; কিন্তু হজ্জের দেশ তাঁদের মতের বিরোধী বলে সে দেশের দোষ খুব ভালভাবে লক্ষ্য করেন। এই শ্রেণীর এক হাজীকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হজ্জ কেমন করলেন গো?' বললেন, 'আর বলো না, সাল-ঘোরার মত পল্প ক'রে ঘুরতে হচ্ছে!' আর এক হাজীকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হজ্জ কেমন দেখলেন গো?' বললেন, 'আরে! ওখানে সব আরবী বলে। শুধু আযানটা আর নামাযটা বাংলায়!'
এই শ্রেণীর হাজীরা যাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে নামায পড়েন, তাঁরা তাঁদেরই দেশের। ফলে মনে করেন, 'হেথা যেমন, সেথাও তেমন। কোনো ফারাক নাহি।' যদি বলা হয়, সেখানে জোরে 'আমীন' বলতে শোনেন নি?' বলেন, 'হ্যাঁ। ওরা শাফী মযহাবের তো!'
'আর ফরয নামাযের পর জামাআতী মুনাজাত দেখলেন?'
'হ্যাঁ, ফাঁকে ফাঁকে কত লোকে মুনাজাত করছে! হারামের মুআযযিন আযান দিচ্ছে, কানে আঙ্গুল দেয় না। আর সিগারেট মুখ থেকে ফেলে সাথে সাথে আযান দিচ্ছে গো। অবাক কাণ্ড!'
'আপনি কি সিগারেট নিজের চোখে দেখেছেন, নাকি শুধু ধোঁয়া দেখেছেন?'
মাথা চুলকিয়ে বলেন, 'সিগারেট নাইবা দেখলাম। ধোঁয়া তো দেখেছি। ধোঁয়াটা কিসের তাহলে?'
ধূমপানের না হয়ে ধোঁয়া তো ধূপধুনোরও হতে পারে। কিন্তু না। সে ধারণা করলে বিদ্বেষ প্রকাশ পাবে না যে। বিরোধীদের প্রতি খারাপ ধারণাই হয়ে থাকে মানুষের।
* ও দেশের মুসলিমরা চৈতন রাখে!
এই শ্রেণীর মনে খিল-আটা হাজীরা আরো বলেন, 'ওরা আবার হকপন্থী? ও দেশের মুসলিমরা চৈতন রাখে!'
আসলে তামাণ্ডু হজ্জ করতে গিয়ে অনেকে উমরা শেষে মাথার অধিকাংশ চেঁছে ফেলে মাঝের অংশটা হজ্জ শেষে চাঁছবে বলে রেখে দেয়। অথচ নিয়ম হল উমরা শেষে চুল ছেঁটে হজ্জ শেষে নেড়া করা। কিন্তু কোন কোন অজ্ঞ আরবী হাজী তা করে বলেই কি, তাদের দেশের ফতোয়াও চৈতনধারীদের হয়ে গেল? বা-রে হাজী সাহেব!
* নবী-এর কবরে চাদর চড়ানো আছে!
মাযারী হাজীরা কবরে চাদর চড়ানোর দলীল খুঁজে পান মদীনায়। তাঁরা মনে করেন, রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে আল্লাহর নবী-এর এত্তা উঁচু কবর দেখতে পেয়েছেন! অথচ তাঁরা যা দেখতে পান, তা হল গিলাফে জড়ানো মা আয়েশার হুজরার দেওয়াল মাত্র। কবর আছে সেই হুজরার ভিতরে, যা বাঁধানোও নয়। কিন্তু পিপাসিতের মরীচিকায় জলভ্রম হতেই পারে। সতর্কতার বিষয় যে, ইন্টারনেটে দেওয়া চাদর-চড়ানো কবরে নববীর ছবি বাস্তব নয়।
* নবী-এর মাযারের পাশে 'কিয়াম' হয়!
এই শ্রেণীর হাজীরা নববী কবরের পাশে কিয়ামেরও দলীল খুঁজে পান! যেহেতু হাজীগণ সেখানে দাঁড়িয়ে নবীর প্রতি সালাম পেশ করেন। এইভাবে তাঁরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রণ ঘটান। যেমন তাঁরা শবেকদর ও শবেবরাতের মাঝে এবং নিয়ত করা ও নিয়ত পড়ার মাঝে তালগোল পাকিয়ে অজ্ঞ মানুষের কাছে পেশ ক'রে হক থেকে বিরত রাখেন। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
* সউদী আরবেও মীলাদ হয়। আমি করেছি!
হ্যাঁ করতে পারেন। এই মতো কত হুজুর গোপনে কত বিদআতীর বাড়িতে মীলাদ পড়েন, ঘর বন্ধ করেন, তাবীয-মাদুলী দিয়ে আসেন। কিন্তু সেটা তো আর সউদী আরবের লোকদের করার দলীল নয়। নচেৎ গোপনে না ক'রে প্রকাশ্যে ক'রে দেখতে পারেন।
আমি যদি বলি, 'মসজিদে নববীতে আমি ইমামতি ক'রে নামায পড়িয়েছি', তাহলে তাতে অনেকে অবাক হয়ে আমাকে মসজিদে নববীর ইমাম ভাবতে পারেন। কিন্তু আসলে একদিন ইউনিভার্সিটির বাস লেট করলে মসজিদে নববীতে আসরের নামায ছুটে গেল। আমার সাথীদেরকে নিয়ে আমি ইমামতি ক'রে নামাযটা পড়লাম।
কত অমুসলিম নির্জন কক্ষে অতি সংগোপনে ছবি পূজা করে। বাঁধানো ছবির সম্মুখভাগে আয়াতুল কুরসী লেখা এবং পশ্চাৎভাগে তার দেবীর ছবি ছাপা। সেই ছবিকেই সে ভক্তির সাথে পূজা করে। আর তার মানে তো এই নয় যে, সউদী আরবে মূর্তিপূজা হয়।
সুতরাং এই শ্রেণীর হেত্বাভাস প্রয়োগ ক'রে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া নিশ্চয়ই মুসলিমের কাজ নয়। পক্ষান্তরে জ্ঞানী মানুষ প্রকৃতত্ব খোঁজেন, হক অনুসন্ধান করেন, সত্যতা যাচাই করেন। ঐ শ্রেণীর কথায় ধোঁকা খেয়ে বোকা বনেন না।
আর এক শ্রেণীর জান্তা হাজী আছেন, তাঁরা তো সউদী আরবের ঘোর বিরোধী। যেহেতু তারা ওয়াহাবী! হজ্জ করতে এসে বই-পত্র হাতে পেলেও পড়েন না। কোন কোন হাজী বলেন, 'ঐ বই পড়লে কাফের হয়ে যাবে!'
কেউ বলেন, 'ওসব শয়তানদের লেখা বই। পড়লে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে!'
এক ভাই প্রতিবাদ ক'রে বললেন, 'হাজী সাহেব! ওরা যদি শয়তান না হয়, তাহলে আপনি শয়তান।'
বলেন, 'তা কি ক'রে?'
বলেছেন, "যে ব্যক্তি কাউকে 'কাফের' বলে ডাকে বা --যেহেতু আল্লাহর নবী 'আল্লাহর দুশমন' বলে, অথচ বাস্তবে যদি সে তা না হয়, তাহলে তার (বক্তার) উপর তা বর্তায়।"
--না, ওরা লা-মযহাবী ওয়াহাবী, ওরা কাফের।
--তাহলে এতগুলো টাকা খামাখা পানিতে ফেললেন?
--কেন?
--আপনার তো হজ্জই হয়নি।
--বড় মুফতী হে তুমি! কার ফতোয়ায় আমার হজ্জ হয়নি?
--আপনার নিজেরই ফতোয়ায়। আপনি না বলছেন, 'ওরা কাফের।' কা'বা শরীফের ইমামরাও কাফের ও শয়তান। আর তাদেরই পিছনে আপনি নামায পড়ে হজ্জ ক'রে এসেছেন। তাহলে সব বরবাদ নয় কি?
--তুমি দেখছি, সউদিয়ার দিক। হবে না কেন? তাদের নুন খাও তো, তাই তাদের গুণ গাইবে!
--আর আপনি নুন পান না বলে গুণ গাইবেন না। কিন্তু নিন্দা গাইবেন কেন? এ দেশেও বহু লোক আছে, যারা আরবের নুন খায় না, তবুও তারা তাদের নিন্দা গায় না। আবার এমন নিমকহারাম লোকও আছে, যারা সউদিয়ার নুনে ডুবে থেকেও তাদের নিন্দা গায়!
--তুমি দেখছি গরম হয়ে উঠছ। তুমি এত উগ্র কেন?
--উগ্র তো আপনাদের মত লোকেরাই সৃষ্টি করে। গা-জ্বালা কথা বললে কি গায়ে জ্বলন ধরবে না? যারা হক না চিনে হককে গালাগালি করে অথবা হকের গায়ের কালিমা লেপন ক'রে হকের বদনাম করে, তাদের কথা কি উস্কানিমূলক নয়?
এইভাবে কথা বাড়ে, একপক্ষ ক্ষান্ত হয়। জ্ঞানীরা হক গ্রহণ করে। আর অজ্ঞানীরা বাতিলের অন্ধকারেই হাবুডুবু খায়। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।

এই বাস্তব যে, হকের অনুসারীরা সংখ্যালঘু ও বাতিলের অনুসারীরা সংখ্যাগুরু
মহান সৃষ্টিকর্তা ভাল-মন্দ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ভালর তুলনায় মন্দ মানুষ তিনি বেশী সৃষ্টি করেছেন। আর 'সৎ কম, অসৎ বেশী' এ ফায়সালা সৃষ্টির শুরু থেকেই হয়ে আছে। শয়তান যখন আদমকে সিজদা না ক'রে মালউন হল, তখনই সে অধিকাংশ মানুষকে নিজের দলে ক'রে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল। সে মহান আল্লাহকে বলেছিল,
অবশ্যই আয়ত্তে ক'রে নেব। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৬২ আয়াত)
﴿ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ﴾ (۱۷) سورة الأعراف
অর্থাৎ, অতঃপর আমি অবশ্যই তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, ডান ও বাম দিক হতে তাদের নিকট আসব এবং তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না। (সূরা আ'রাফ ১৭ আয়াত)
মহান আল্লাহ তার প্রতিজ্ঞার সত্যায়ন ক'রে বলেন,
﴿ وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴾ [سبأ: ٢٠]
অর্থাৎ, ওদের উপর ইবলীস তার অনুমান সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করল, ফলে ওদের মধ্যে একটি বিশ্বাসী দল ছাড়া সকলেই তার অনুসরণ করল। (সুরা সবা' ২০ আয়ত)
নূহ -এর যুগে সত্যের অনুসারী যে কম ছিল, তা তাঁর তুফান ও কিশ্তীর কাহিনীতেই বুঝা যায়।
অন্যান্য নবীদের যুগেও তাই। মহান আল্লাহ দাউদ-এর পরিবারকে বলেছিলেন,
اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِي الشَّكُورُ} (۱۳) سورة سبأ
অর্থাৎ, হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তোমরা কাজ করতে থাক। আমার দাসদের মধ্যে কৃতজ্ঞ অতি অল্পই। (ঐ ১৩ আয়াত)
আর দাউদ নিজেও বলেছিলেন,
﴿إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ} (٢٤) سورة ص
অর্থাৎ,করে না কেবল বিশ্বাসী ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ এবং তারা সংখ্যায় স্বল্প। (সুরা স্বা-দ ২৪ আয়াত)
মহান আল্লাহ বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ হক সম্বন্ধে অজ্ঞ।
وَلَوْ أَنَّنَا نَزَّلْنَا إِلَيْهِمُ الْمَلائِكَةَ وَكَلَّمَهُمُ الْمَوْتَى وَحَشَرْنَا عَلَيْهِمْ كُلَّ شَيْءٍ قُبُلاً مَّا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ} (۱۱۱) سورة الأنعام
أَرَأَيْتُكَ هَذَا الَّذِي كَرَّمْتَ عَلَيَّ لَئِنْ أَخَرْتُنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لأَحْتَنَكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلا
অর্থাৎ, বল, এই যাকে তুমি আমার উপর মর্যাদা দান করলে, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দাও, তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ছাড়া তার বংশধরকে
অর্থাৎ, আমি যদি তাদের নিকট ফিরিস্তা প্রেরণ করতাম এবং মৃতেরা তাদের সার্থে কথা বলত এবং সকল বস্তুকে তাদের সম্মুখে হাজির করতাম তবুও আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত তারা বিশ্বাস করত না। কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ। (সুরা আনআম ১১১ আয়াত)
بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ الْحَقَّ فَهُم مُّعْرِضُونَ) (٢٤) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, বরং ওদের অধিকাংশই প্রকৃত সত্য জানে না। ফলে ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। (সূরা আম্বিয়া ২৪ আয়াত)
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَةَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ} (٣٠) سورة الروم
অর্থাৎ, তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ কর; যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটিই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। (সূরা রুম ৩০ আয়াত)
তিনি বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ ভ্রষ্ট ও ভ্রষ্টকারী। তিনি তাঁর নবীকে বলেছিলেন,
وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ (١١٦) سورة الأنعام
অর্থাৎ, যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত ক'রে দেবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরণ করে এবং তারা কেবল অনুমানভিত্তিক কথাবার্তাই বলে থাকে। (সূরা আনআম ১১৬ আয়াত)
أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَamِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا}
অর্থাৎ, তুমি কি মনে কর যে, ওদের অধিকাংশ শোনে ও বুঝে? ওরা তো পশুরই মত; বরং ওরা আরও অধম। (সূরা ফুরক্বান ৪৪ আয়াত)
{وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ) (۱۰۳) سورة يوسف
অর্থাৎ, তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (সূরা ইউসুফ ১০৩ আয়াত)
তিনি বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ অবিশ্বাসী।
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِالله إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ) (١٠٦) سورة يوسف
অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু তাঁর অংশী স্থাপন করে। (ঐ ১০৬ আয়াত)
المر تلك آياتُ الْكِتَابِ وَالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ الْحَقُّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يُؤْمِنُونَ }
অর্থাৎ, আলিফ লাম মী-ম রা। এগুলি কুরআনের আয়াত; যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে তাই সত্য। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এতে বিশ্বাস করে না। (সূরা রা'দ ১ আয়াত)
يَعْرِفُونَ نِعْمَتَ اللهُ ثُمَّ يُنكَرُونَهَا وَأَكْثَرُهُمُ الْكَافِرُونَ) (۸۳) سورة النحل
অর্থাৎ, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ চিনে নেয়, অতঃপর তা অস্বীকার করে। আর তাদের অধিকাংশই অবিশ্বাসী। (সূরা নাহল ৮৩ আয়াত)
وَلَقَدْ صَرَّفْنَاهُ بَيْنَهُمْ لِيَذَّكَّرُوا فَأَبَى أَكْثَرُ النَّاسِ إِلَّا كُفُورًا} (٥٠) سورة الفرقان
অর্থাৎ, আমি তা ওদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিবৃত করেছি; যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক কেবল অবিশ্বাসই প্রকাশ করে। (সূরা ফুরক্বান ৫০ আয়াত)
অধিকাংশ মানুষ অকৃতজ্ঞ। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَا ظَنُّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أكْثَرَهُمْ لَا يَشْكُرُونَ) (٦٠) سورة يونس
অর্থাৎ, যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, কিয়ামত দিবস সম্বন্ধে তাদের কি ধারণা? বস্তুতঃ আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ, কিন্তু অধিকাংশ লোকই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। (সূরা ইউনুস ৬০ আয়াত)
অধিকাংশ মানুষ সত্যত্যাগী, পাপাচার। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَا وَجَدْنَا لأكثرهم مِّنْ عَهْدِ وَإِن وَجَدْنَا أَكْثَرَهُمْ لَفَاسِقِينَ } (١٠٢) سورة الأعراف
অর্থাৎ, আমি তাদের অধিকাংশকে প্রতিশ্রুতি পালনকারীরূপে পাইনি, বরং তাদের অধিকাংশকে সত্যত্যাগী রূপেই পেয়েছি। (সূরা আ'রাফ ১০২ আয়াত)
এ ছাড়া আরো আয়াত রয়েছে। আর মহানবী বলেছেন, "নিশ্চয় ইসলাম (প্রবাসীর মত অসহায়) অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়ে শুরুতে আগমন করেছে এবং অনুরূপ অল্প সংখ্যক মানুষ নিয়েই ভবিষ্যতে প্রত্যাগমন করবে যেমন শুরুতে আগমন করেছিল। সুতরাং সুসংবাদ ঐ মুষ্টিমেয় লোকেদের জন্য।” (মুসলিম)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, "--- সুতরাং শুভ সংবাদ ঐ (প্রবাসীর মত অসহায়) অল্প সংখ্যক লোকদের জন্য যারা মানুষ অসৎ হয়ে গেলে তাদেরকে সংস্কার ক'রে সঠিক পথে রাখতে সচেষ্ট হয়। (আবু আম্ম আদ্‌দা-নী)
রসূল দুআ করে বলেছেন, "শুভ সংবাদ ঐ (প্রবাসীর মত অসহায়) মুষ্টিমেয় লোকেদের জন্য; যারা বহু অসৎ লোকের মাঝে অল্পসংখ্যক সৎলোক। তাদের অনুগত লোকের চেয়ে অবাধ্য লোকের সংখ্যা অধিক।” (আহমাদ)
এটি একটি বাস্তব। মুসলিমদের সংখ্যা কম, মুসলিমদের মধ্যে হকপন্থীদের সংখ্যা কম। তা বলে এই ধারণা ভুল যে, সত্য ও হক হলে তার অনুগামী বেশী হতো।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, 'হকের অনুসারীই হল জামাআত; যদিও তুমি একা হও।' (ইবনে আসাকের, মিশকাত ১/৬১ টীকা নং ৫)

এই চিন্তা যে, হকের অনুসারীরা দুর্বল ও ক্ষুদ্র জ্ঞানের এবং বাতিলের অনুসারীরা সবল ও অধিক জ্ঞানী।
যে দলে পার্থিব শিক্ষিত লোক বেশী আছে, বিজ্ঞানী ও ডাক্তার আছে সেই দলকে হকপন্থী মনে করা ভুল। কারণ, পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা দ্বীন-বিষয়ক হক-নাহক চেনা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ } (৭) سورة الروم
অর্থাৎ, ওরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, অথচ পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে ওরা উদাসীন। (সুরা রুম ৭ আয়াত)
সুতরাং যারা মনে করবে যে, যে দলে বিজ্ঞানী আছে, সে দলই হকপন্থী, তারা আসলে ভুল করবে। অনুরূপ যারা মনে করবে যে, আমাদের জামাআতের হুজুর বেশী জানেন, অন্য জামাআতের হুজুররা বেশী জানে না, তারাও আসলে ভুল করবে। অনুরূপ শক্তি ও লাঠির জোর যাদের বেশী আছে, তারাই যে হকপন্থী, তাও নয়। হক জানতে হয় দলীল দ্বারা, লাঠি দ্বারা নয়। হক চিনতে হয় হক দেখে, শক্তি দেখে নয়।

নেক ও বুযুর্গ লোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি
কোন লোক বড় আবেদ হলেও, তিনি কিন্তু হকপন্থী হওয়ার দলীল নন। অমুক সাহেব নদীর এই বাঁধের উপর দিয়ে হেঁটে গেছেন, তাই এ বাঁধ ভাঙ্গে না! অমুক সাহেব সারা সারা রাত জেগে এক পায়ে দাঁড়িয়ে কা'বা-চত্বরে কুরআন তিলাঅত করেছেন! অমুক সাহেব এক ওযুতে এতদিন নামায পড়েছেন! অমুক সাহেব এক রাতে পঞ্চাশবার কুরআন খতম করেছেন! অমুক সাহেব এতবার আল্লাহকে দেখেছেন! অমুক সাহেবের হাতে এত শত লোক মুসলমান হয়েছে! অতএব তাঁরা হকপন্থী---এ কথা নির্ভুল নয়। কারণ, তাঁরা যা করেছেন, প্রথমতঃ জানতে হবে, তা সুন্নতী তরীকা কি না? আর তা হলেও বেশী বেশী ইবাদত করলেই তাঁদের সব কথা যে হক, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বরং সহীহ দলীলই তোমাকে বাতলে দেবে, হকপথে কে আছে।

স্বার্থপরতা
মুসলমান হলে জমি-সম্পত্তি খোয়া যাবে। হক গ্রহণ করলে গদি ও নেতৃত্ব যাওয়ার ভয় আছে। রাজনৈতিক স্বার্থ, ব্যক্তিগত স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থ হকের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
উরস বন্ধ করলে টাকা আসবে কেমনে? মাযার ভাঙলে টাকা আসার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যাঙ্কের সুদ হারাম মানলে এত টাকা চলে যাবে!!
সুতরাং সত্যের পথে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু কুরবানী ও উৎসর্গ করতে হবে। সত্য গ্রহণের ইচ্ছা থাকলে বিসর্জন দিতে হবে সকল প্রকার লোভ-লালসা, মায়া-মমতা ও স্বার্থপরতাকে। কারণ, এমনও হতে পারে যে, সত্য গ্রহণ করলে ত্যাগ করতে হবে কিছু পার্থিব স্বার্থ, অথবা পদ ও গদি, অথবা একান্ত আপন জন আত্মীয়-স্বজনকে (যদি তারা এ সত্য গ্রহণে সহানুগামী না হয় তবে), বিসর্জন দিতে হতে পারে চাকুরী, সুন্দর বাড়ি, জমি-জায়গা, সহায়-সম্পদ প্রভৃতি, ত্যাগ করতে হতে পারে স্বজাতি ও স্বদেশকে। সমস্ত মায়ার বন্ধন ছিন্ন ক'রে সর্বপ্রকার আকর্ষণ এড়িয়ে হাজারো বাধা-বিঘ্ন উল্লংঘন করে, শত-সহস্র আপদ-বিপদের মাঠ-ময়দান পার হয়ে, বিভিন্ন প্রহসন ও অত্যাচারের নদী-জঙ্গল অতিক্রম ক'রে তবেই সত্যের রাজপথ লাভ হতে পারে। সুতরাং যে বীর নারী-পুরুষ শুধু সত্যের খাতিরে এসব কিছুকে অগ্রাহ্য ক'রে বিপদের পথ চলতে ভয় করে না, সেই পায় সত্যের আলো।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ الله حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغْرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ
অর্থাৎ, “হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং ধোকাবাজ (শয়তান) যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে ধোকায় না ফেলে। (সূরা ফাত্বির ৫ আয়াত)
তিনি আরো বলেন, “হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের পিতা ও ভাই যদি ঈমান (বিশ্বাস) অপেক্ষা কুফরী (অবিশ্বাস) কে শ্রেয় জ্ঞান করে, তবে ওদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা ওদেরকে অভিভাবক করে; তারাই অপরাধী। বল, 'তোমাদের পিতা-পুত্র, ভ্রাতৃবৃন্দ, পত্নী-পরিজন, অর্জিত ধন-সম্পদসমূহ এবং সেই ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার অচল হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং প্রিয় বাসস্থানসমূহ যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তদীয় রসুল ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর আদেশ পাঠানো পর্যন্ত অপেক্ষা কর। বস্তুতঃ আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা তাওবাহ ২৩-২৪ আয়াত)

আত্মীয়তা ও প্রেমের বন্ধন
অনেক সময় মানুষ হক জেনেও হক গ্রহণ করতে পারে না এই জন্য যে, সে তার পিতা-মাতাকে হারিয়ে ফেলবে অথবা প্রেমময়ী স্ত্রী ও সন্তানদেরকে হারিয়ে ফেলবে। কারণ, তারা হকপথ পছন্দ করে না। ফলে মায়ার টানে নিজেকেও নাহক কারাগারে বন্দী রাখে। তারা যদি জাহান্নামের দিকে যেতে চায়, তাহলে সেও যেতে চায়।
অবৈধ ভালবাসার জেরে কোন যুবক কোন অমুসলিম যুবতীর হৃদয়-কোণে বন্দী হয়ে গেছে। সে হক ছেড়ে বাতিল গ্রহণ ক'রে প্রেম জীবিত রাখে!
কোন যুবতী কোন অমুসলিম যুবকের প্রেমজালে আবদ্ধ হয়ে গেছে, সেও হককে বলিদান দিয়ে অবৈধ প্রেমের দেবীকে সন্তুষ্ট করে! অথচ মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكِ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُوْلَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُوَ إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ}
অর্থাৎ, অংশীবাদী রমণী যে পর্যন্ত না (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস করে, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। অংশীবাদী নারী তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও নিশ্চয় (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাসী তার থেকেও উত্তম। (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস না করা পর্যন্ত অংশীবাদী পুরুষের সাথে (তোমাদের কন্যার) বিবাহ দিও না। অংশীবাদী পুরুষ তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাস তার থেকেও উত্তম। কারণ, ওরা তোমাদের আগুনের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় ইচ্ছায় বেহেপ্ত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। (সূরা বাক্বারাহ ২২১ আয়াত)
তা হলে কি হয়, আসলে তারা তো এ সব সামাজিক বন্ধন মানে না। তারা প্রগতিশীল আলোকপ্রাপ্ত যুবক-যুবতী, তারা মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ। তারা হক-নাহক দেখবে কেন? তারা যে তাগুতী আইনকেই হক বলে মানে।
পক্ষান্তরে যাঁদের নিকট হকের কদর আছে, তাঁরা হকের উপর কোন কিছুকে প্রাধান্য দেন না। তাঁরা বরং প্রেমের পাঁঠাকেই হকের জন্য বলি দেন। মহান আল্লাহ বলেন,
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيْدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُوْلَئِكَ حزب الله انا ، ألا ! إِنَّ حزب الله هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (۲۲) سورة الـ سورة المجادلة
অর্থাৎ, তুমি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় পাবে না, যারা ভালবাসে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে; হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা তাদের জাতি-গোত্র। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ হতে রূহ (জ্যোতি ও বিজয়) দ্বারা। তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো যে, আল্লাহর দলই সফলকাম। (সুরা মুজাদালাহ ২২ আয়াত)
বরং হকপন্থী হওয়ার পরেও যদি কেউ বাতিলপন্থীদের সাথে হাত মিলাতে চায়, তাহলে তাতেও নিষেধ রয়েছে সৃষ্টিকর্তার। তিনি বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاء إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الإِيمَانِ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (۲۳) قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتَجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبُّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادِ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ) (٢٤) سورة التوبة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতৃগণ যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে পছন্দ করে, তাহলে তাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবক করবে, তারাই হবে অত্যাচারী। বল, তোমাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, স্ত্রী ও আত্মীয়গণ, অর্জিত ধনরাশি এবং সেই ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার অচল হওয়ার ভয় কর এবং প্রিয় বাসস্থানসমূহ যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর আদেশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। বস্তুতঃ আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। (সূরা তাওবাহ ২৩-২৪ আয়াত)

বন্ধুত্ব ও সংসর্গ
বন্ধুত্ব অনেক সময়ে বিপজ্জনক হয়। যেহেতু বন্ধু সাধারণতঃ বন্ধুর ধর্মে, মতে ও পথে চলে। সুতরাং বন্ধু ভ্রষ্ট হলে, মানুষও ভ্রষ্ট হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাই তো এই শ্রেণীর লোকেরা কিয়ামতে পস্তাবে। মহান আল্লাহ বলেন,
{يَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلاً (۲۷) يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا (۲۸) لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنْ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولا (۲۹)}
অর্থাৎ, সীমালংঘনকারী সেদিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, 'হায়! আমি যদি রসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম। হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। আমাকে অবশ্যই সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ (কুরআন) পৌঁছনোর পর। আর শয়তান তো মানুষকে বিপদকালে পরিত্যাগই করে।' (সূরা ফুরক্বান ২৭-২৯ আয়াত)
আল্লাহর রসূল বলেন, "সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হল, কস্তুরী বহনকারী (আতরওয়ালা) ও হাঁপরে ফুৎকারকারী (কামারের) ন্যায়। কস্তুরী বহনকারী (আতরওয়ালা) হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে অথবা তার কাছ থেকে সুবাস লাভ করবে। আর হাঁপরে ফুৎকারকারী (কামার) হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।” (বুখারী, মুসলিম)

পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা
মানুষের পরিবেশ অনেক সময় মানুষকে হকপথে চলতে বাধা সৃষ্টি করে। বাড়ির পরিবেশ, সমাজের পরিবেশ, দেশের পরিবেশ, স্কুল-কলেজের পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ মানুষকে হক মানতে দেয় না, হকপথে চলতে দেয় না। পরিবেশের গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে উন্নাসিকতার সাথে অনেকে চলতে থাকে। অথচ পরিবেশের তাসীরে সে যে খারাপ থেকে যাচ্ছে---তা খেয়ালও করে না। হক জানার পরেও হক গ্রহণ করে না। অনেকে তওবা করার পরেও পরিবেশ না পাল্টানোর ফলে পুনরায় ভ্রষ্টতায় ফিরে যায়। ডান পা তুলে কাদা ধুয়ে বাম পা ধুতে গিয়ে ডান পা-টিকে আবার কাদাতেই রাখে। এইভাবে পা ধোয়ার কোন লাভ হয় না।
হাদীসে শত খুনীর লোকটার ব্যাপারে বলা হয়েছিল, "তোমার তওবা আছে! তোমার ও তওবার মাঝে কে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশে চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে, যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ও দেশ পাপের দেশ।” (বুখারী, মুসলিম)

প্রত্যেক দলের দাবী, হকপন্থী আমরাই।
দুনিয়ার রীতিই এই। তা না হলে বাতিল উৎখাত হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ زَيْرًا كُلَّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ} (٥٣) سورة المؤمنون
অর্থাৎ, কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে বহু ভাগে বিভক্ত করেছে; প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে, তা নিয়েই আনন্দিত। (সূরা মু'মিনুন ৫৩ আয়াত)
{فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفاً فَطْرَةَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (۳۰) مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُونُوا مِنْ الْمُشْرِكِينَ (۳۱) مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ} (۳۲)
অর্থাৎ, তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ কর; যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটিই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। তোমরা বিশুদ্ধ-চিত্তে তাঁর অভিমুখী হও; তাঁকে ভয় কর। যথাযথভাবে নামায পড় এবং অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে; প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত। (সূরা রুম ৩০-৩২ আয়াত)
প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীই বলে, 'আমার ধর্মটাই ঠিক।' অবশ্য অনেকে বলে, 'আমারটাও ঠিক, তোমারটাও ঠিক।' অনেকে বলে, 'কোন ধর্মই ঠিক নয়।'
পক্ষান্তরে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মহীনতা নয়; বরং ধর্মভীরুতাই জরুরী। কারণ, 'ধর্মহীন সমাজ কম্পাসহীন জলজাহাজের মত।' তবে সে ধর্ম হবে সকল মানুষের জন্য এক। আর তা হবে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রেরিত ও মনোনীত। যে ধর্ম সমস্ত ধর্মের মহাপুরুষদেরকে স্বীকার করবে এবং সকলের জন্য একক আইন-কানুন হবে, ইউনিফর্ম সিভিল কোড হবে।
এদিকে মুসলিমদের ভিতরে, শীয়ারা বলে, 'আমরা হকের উপর আছি।' কবরপূজারীরা বলে, 'আমরাই সুন্নী, আহলে সুন্নাহ! আশেকে রসূল!' তাবলীগী, জামাআতী, দেওবন্দী, ব্রেলবী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী, সবাই বলে, লায়লী আমার! কিন্তু লায়লী কাউকে চেনে না।
অথচ ইসলামে ঐক্য সাধনের জন্য একটি মাত্র দলের প্রচলন থাকা প্রয়োজন। যে দলের নিশান হবে তওহীদী পতাকা। যে পতাকার তলে ছিলেন সাহাবা তথা সলফে সালেহীনগণ। বিভিন্ন দল নয়, বরং সেই একটি দল থেকেই নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রনেতা। যেহেতু ইসলামে দলাদলি নেই।
বলা বাহুল্য, মুসলিমদের মাঝে ফির্কাবন্দীও অনেকের হিদায়াতের অন্তরায় হয়।

হৃদয়ের ব্যাধি ও বক্রতা
যে হৃদয় ব্যাধিগ্রস্ত, যে অন্তর ভাইরাস সংক্রমিত, যে মন বক্র ও অসরল, সে হৃদয়-মনে কি হক আশ্রয় পেতে পারবে? যে ঘরে কুকুর থাকে, সে ঘরে রহমতের ফিরিস্তা প্রবেশ করেন না। যে ঘরে কপটতার নোংরামি আছে, সে ঘরে কি হকের পবিত্রতা স্থান পাবে? বরং অপবিত্রতার উপর আরো অপবিত্রতা বৃদ্ধি পাবে। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِحْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ}
অর্থাৎ, পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, এই সূরা তাদের অপবিত্রতার সাথে আরো অপবিত্রতা বর্ধিত করেছে এবং তারা কাফের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। (সূরা তাওবাহ ১২৫ আয়াত)
{فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضاً وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ}
অর্থাৎ, তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন ও তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাচারী। (সূরা বাক্বারাহ ১০ আয়াত)
এই শ্রেণীর মানুষ সম্বন্ধে তিনি বলেন, "ওদের মধ্যে মীমাংসা ক'রে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দিকে ওদেরকে আহবান করা হলে ওদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সিদ্ধান্ত ওদের স্বপক্ষে হবে মনে করলে ওরা বিনীতভাবে রসূলের নিকট ছুটে আসে। ওদের অন্তরে কি ব্যাধি আছে, না ওরা সংশয় পোষণ করে? না ওরা ভয় করে যে আল্লাহ ও তাঁর রসূল ওদের প্রতি যুলুম করবেন? বরং ওরাই তো সীমালংঘনকারী।” (সূরা নূর ৪৮-৫০ আয়াত)
অনুরূপ যে মনে জং ও বক্রতা আছে, সে মনেও হিদায়াত নিষ্ক্রিয়। বরং বিপরীতভাবে তাতে টেরামিই কাজ করে। মহান আল্লাহ বলেন,
{هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاء الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاء تَأْوِيلِهِ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبَّnَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُوا الْأَلْبَابِ }
অর্থাৎ, তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন; যার কিছু আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, এগুলি কিতাবের মূল অংশ; যার অন্যগুলি রূপক; যাদের মনে বক্রতা আছে, তারা ফিতনা (বিশৃংখলা) সৃষ্টি ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যা রূপক তার অনুসরণ করে। বস্তুতঃ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা সুবিজ্ঞ তারা বলে, 'আমরা এ বিশ্বাস করি। সমস্তই আমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে আগত।' বস্তুতঃ বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। (সুরা আলে ইমরান ৭ আয়াত)
হিদায়াতের জায়গায় যে বক্রতা অবলম্বন করে, মহান আল্লাহ তার বক্রতা আরো বৃদ্ধি করেন। তিনি বলেছেন,
{فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (٥) سورة الصف
অর্থাৎ, অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র ক'রে দিলেন। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (সূরা স্বাফ ৫ আয়াত)
মহান আল্লাহ কুরআনকে মুত্তাক্বীদের জন্য হিদায়াত করেছেন। আর যালেমদের জন্য আরো ক্ষতিকর বানিয়েছেন। সত্যিই তো চোখের পাতা মেলে দিনের আলো না দেখলে, সূর্যের কি দোষ? আমরা না জাগলে কি সকাল কখনও হবে?

হকপন্থীর পূর্ব জীবনের বা তার কোন আত্মীয়র ভুলের জের ধরে হক কবল না করা।
কোন হকপন্থী যদি পূর্ব জীবনে মানবীয় দুর্বলতার ফলে কোন ভুল বা পাপ ক'রে থাকে এবং পরবর্তীতে অনুতপ্ত হয়ে সঠিক পথে ফিরে আসে, তাহলে তার নিকট থেকে কি হক গ্রহণ করা যাবে না।
হকপন্থী প্রথম জীবনে মূর্তিপূজক বা মাযারী ছিল, পরে তওবা করলে কি তার নিকট থেকে হক গ্রহণ করা যাবে না?
হকপন্থী প্রথম জীবনে কোন চুরিতে ধরা পড়েছিল, তা বলে কি তার হকটাও বাতিল হয়ে যাবে?
কোন গায়র-মাহরাম শিশু-কন্যাকে যদি কোন পুরুষ কোলে-পিঠে ন্যাংটা অবস্থায় মানুষ করে, অতঃপর যুবতী হয়ে সে যদি শরীয়ত মেনে তাকে পর্দা করে, তাহলে তাতে কি তার দোষ হবে?
হকপন্থী যদি বয়সে ছোট হয়; ছেলে তুল্য হয়, তাহলে কি তার নিকট থেকে হক গ্রহণ করতে প্রেস্টিজে লাগবে?
মুসা -কে ফিরআউন শিশু অবস্থায় লালন করেছিল। পরবর্তীকালে বড় হয়ে যখন তিনি তাকে হিদায়াত করতে এলেন, তখন সে বলেছিল,
{قَالَ أَلَمْ نُرَبِّكَ فِينَا وَلِيدًا وَلَبِثْتَ فِينَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِينَ (۱۸) وَفَعَلْتَ فِعْلَتَكَ الَّتِي فَعَلْتَ وَأَنْتَ مِنَ الْكَافِرِينَ) (۱۹)
অর্থাৎ, আমরা কি তোমাকে শিশু অবস্থায় আমাদের তত্ত্বাবধানে লালন-পালন করিনি এবং তুমি কি তোমার জীবনের বহু বছর আমাদের মধ্যে কাটাও নি? তুমি তো যা অপরাধ করার তা করেছ, আর তুমি হলে অকৃতজ্ঞ।
মুসা তার জবাবে বলেছিলেন,
{قَالَ فَعَلْتُهَا إِذًا وَأَنَا مِنَ الضَّالِّينَ (۲۰) فَفَرَرْتُ مِنْكُمْ لَمَّا خِفْتُكُمْ فَوَهَبَ لِي رَبِّي حُكْمًا وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُرْسَلِينَ) (۲۱) سورة الشعراء
অর্থাৎ, আমি সে অপরাধ করেছিলাম, যখন আমি বিভ্রান্ত ছিলাম। অতঃপর আমি যখন তোমাদের ভয়ে ভীত হলাম, তখন আমি তোমাদের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর আমার প্রতিপালক আমাকে প্রজ্ঞা দান করেছেন এবং আমাকে রসূল করেছেন। (সূরা শুআরা ১৮-২১ আয়াত)
কিন্তু ফিরআউন তাঁকে পাগল বলল, জেলে দেওয়ার হুমকি দেখাল, আরো কত কি? বলা বাহুল্য, এই সূত্রে হক প্রত্যাখ্যান করা ফিরআউনী নীতি। আজও অনেকে সেই নীতি অবলম্বন করে।
অনেকে আবার হকপন্থীর নিজের কৃতকর্ম নয়, বরং তার কোন আত্মীয়র কৃতকর্মের জের ধরে তার নিকট থেকে হক মানতে চায় না। বলে, 'তোর বাবা তো চোর ছিল, তুই আবার আমাদেরকে কি হাদীস শুনাবি? তোর ভাই তো ব্যভিচার ক'রে বেড়ায়, তুই আবার আমাদেরকে কিসের হিদায়াত করবি? তোর ছেলে তো বেনামাযী, তুই আবার আমাদেরকে কিসের হিদায়াত দিবি? তোর স্ত্রী তো তোর পশ্চাতে বেপর্দায় ঘোরাফেরা করে, তোর কথা আবার কে শুনবে? আগে ঘর সামাল, তারপর পর সামালবি?'
তাই যদি হয়, অর্থাৎ, ঘর যদি কেউ সামালতে না পারে, ঘর যদি তার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়, তাহলে সে কি বাতিলপন্থী হয়ে যায়? তার হকও কি বাতিলে পরিণত হয়ে যায়? এখন যদি নূহ ও লুত নবীর কওম বলে, 'তুমি আগে তোমার স্ত্রী সামলাও, তবেই তোমার উপর ঈমান আনব।' ইব্রাহীম নবীর কওম যদি তাঁকে বলে, 'তুমি আগে বাপকে হিদায়াত কর, তবে আমরা তোমার হিদায়াত মানব।' নূহ নবীকে তাঁর কওম যদি বলে, 'তোমার ছেলে কাফের, তুমি আমাদেরকে আবার কি হিদায়াত করবে?' শেষনবীকে তাঁর কওম যদি বলে, 'তুমি তোমার চাচাকে মুসলমান করতে পারলে না, তোমার কথা আমরা কেন মানব?' তাহলে কি ভুল হবে না ভাইটি?

অহংকার, ঔদ্ধত্য
কারো মধ্যে অহংকার থাকলে, সে কি হক মানতে পারে? অহংকার মানেই হল, 'আমি বড়, আমি সবার থেকে ভাল। আমিই সর্বেসর্বা। আমি ছাড়া আবার আছে কে? হম কিসী সে কম নেহী।' অহংকার মানে, সত্য প্রত্যাখ্যান করা ও অপরকে তুচ্ছজ্ঞান করা।
সৃষ্টির ইতিহাসে সর্বপ্রথম হিংসা ও অহংকার প্রদর্শন ক'রে হক প্রত্যাখ্যান করেছে ইবলীস।
{قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتُهُ مِنْ طِينٍ (۱۲) قَالَ فَاهْبِطُ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ) (۱۳)
অর্থাৎ, (আদমকে সৃষ্টি করার পর তাঁকে সিজদা করতে আদেশ করলে সকল ফিরিস্তা সিজদা করেছিলেন। কিন্তু ইবলীস করেনি। তখন মহান আল্লাহ) বললেন, 'আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম, তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল যে, তুমি সিজদাহ করলে না?' সে বলল, 'আমি তার (আদম) অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তুমি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছ এবং ওকে সৃষ্টি করেছ কাদামাটি দ্বারা।' তিনি বললেন, 'এ স্থান হতে নেমে যাও। এখানে থেকে অহংকার করবে, এ হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও। তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত।' (সুরা আ'রাফ ১২-১৩ আয়াত)
সামুদ জাতি স্বালেহ নবীর জন্য অহংকারের সাথে বলেছিল,
{أَلْقِيَ الذِّكْرُ عَلَيْهِ مِن بَيْنَنَا بَلْ هُوَ كَذَّابٌ أَشرُ (٢٥) سورة القمر
অর্থাৎ, আমাদের মধ্যে কি ওরই প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে? বরং সে তো একজন মিথ্যাবাদী, দান্তিক। (সূরা ক্বামার ২৫ আয়াত)
মক্কার মোড়লরা বলেছিল,
{لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظيم} (۳۱) سورة الزخرف
অর্থাৎ, ওরা বলে, 'এ কুরআন কেন অবর্তীর্ণ করা হল না দু'টি জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির ওপর?' (সূরা যুখরুফ ৩১ আয়াত)
{أَأُنزِلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ من بَيْنِنَا بَلْ هُمْ فِي شَكٍّ مِّن ذِكْرِي بَلْ لَمَّا يَذُوقُوا عَذَابِ }
অর্থাৎ, আমরা এত লোক থাকতে কি তারই ওপর কুরআন অবতীর্ণ করা হল?' (মহান আল্লাহ বলেন,) ওরা তো প্রকৃতপক্ষে আমার কুরআনে সন্দিহান, ওরা এখনও আমার শান্তি আস্বাদন করেনি। (সুরা স্বা-দ৮ আয়াত)
যেমন আল্লাহর নিদর্শনাবলী উপেক্ষা করেছিল উদ্ধত ফিরআউন। মুসা a-এর মাধ্যমে একাধিক নিদর্শন প্রত্যক্ষ ও সত্য মনে করেও তা শুধু অহংকারবশে মেনে নেয়নি। “----ওরা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়। অতঃপর যখন ওদের নিকট আমার (আল্লাহর) উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ এল তখন ওরা বলল, 'এ তো সুস্পষ্ট যাদু! ওরা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলিকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও ওদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে স্বীকার করেছিল। দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল? (সূরা নামল ১২-১৪ আয়াত)
এমন অহংকারে সত্য অগ্রাহ্যকারীদের অবস্থা পরকালে কি হবে, তা তো বলাই বাহুল্য। কুরআন মাজীদে এক শ্রেণীর উদ্ধত মানুষের কথা উল্লেখ ক'রে বলা হয়েছে, "ওরা (ভ্রষ্ট ও ভ্রষ্টকারী) সকলেই সেদিন শাস্তির শরীক হবে। অপরাধীদের প্রতি আমি এইরূপ করে থাকি। ওদের নিকট 'আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই' বলা হলে ওরা অহংকারে অগ্রাহ্য করত এবং বলত, 'আমরা কি এক উম্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যসমূহকে বর্জন করব?' বরং (মুহাম্মাদ) তো সত্য নিয়ে এসেছিল এবং সমস্ত রসূলদের সত্যতা স্বীকার করেছিল। তোমরা অবশ্যই মর্মন্তুদ শাস্তি ভোগ করবে।” (সূরা স্বাফফাত ৩৩-৩৮- আয়াত)
যারা অহংকার ও গর্ব প্রদর্শন করে, তারা কখনই সৎপথের দিশা পায় না। "যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল প্রমাণ না থাকলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতন্ডায় লিপ্ত হয়, তাদের একাজ আল্লাহ এবং বিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষের বিষয়। আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়ে মোহর মেরে দেন। (সুরা মু'মিন ৩৫ আয়াত)
"যারা আগত কোন দলীল ছাড়াই আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাদের অন্তরে আছে কেবল অহংকার; যা অর্জনে তারা সফল হবে না।” (ঐ ৫৬ আয়াত)
পক্ষান্তরে যারা সত্য জানার জন্য নমনীয়তা ও বিনয় প্রদর্শন করে, তারা অচিরে সত্যের সাক্ষাৎ পায়। যেমন যুগে-যুগে বহু পন্ডিত, পুরোহিত, যাজক ও পাদ্রী সত্যের সন্ধান পেয়ে বিনয়ের সাথে সাগ্রহে সত্য গ্রহণ ক'রে ধন্য হয়েছেন। এই শ্রেণীর মানুষদের প্রশংসা করে কুরআন বলে, "--- এবং যখন তারা রসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা শ্রবণ করে তখন যে (আগত) সত্য তারা উপলব্ধি করেছে তার দরুন তুমি তাদের চক্ষুকে অশ্রু-বিগলিত দেখবে। তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বিশ্বাস করলাম। অতএব তুমি আমাদেরকে (সত্যের) সমর্থকদের দলভুক্ত কর। আর আমরা যখন প্রত্যাশা করি যে, আল্লাহ আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন তখন আল্লাহতে ও আমাদের নিকট আগত সত্যে আমাদের বিশ্বাস স্থাপন না করার কি কারণ থাকতে পারে?' অতঃপর তাদের একথার জন্য আল্লাহ তাদের পুরস্কার নির্দিষ্ট করেছেন বেহেশ্ৎ; যার পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত। যারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এটাই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান।” (সূরা মাইদাহ ৮-৩-৮-৫ আয়াত)
বহু মানুষ অহংকারের সাথে নিজেকে উচ্চ বংশের এবং সত্যের সন্ধানদাতাকে নীচ বংশের ধারণা ক'রে 'সারকুঁড়ে পদ্মফুল' বলে নাক সিঁটকিয়ে তার নিকট থেকে সত্য গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হয়।
অথবা হকপন্থীকে বয়সে ছোট বা অনুগৃহীত ভেবে তার নিকট থেকে হক গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হয় না।
অথচ হক যেখানেই থাক, যে পরিবেশেই থাক সেখান হতেই তা বরণীয় ও গ্রহণীয়। হীরার টুকরা যদি নর্দমায় পড়ে থাকে, তাহলে জ্ঞানী মানুষের কাছে নর্দমার গন্ধে তা অবহেলিত হয় না। বরং তা সাদরে কুড়িয়ে নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করে। মনে যে বাঞ্ছনীয়---তার আত্মীয়-স্বজন খারাপ হলেও---মানুষ তাকে পেয়ে ধন্য হয়। একটি গোলাপ-ফুল, তার রঙ যাই হোক না কেন, তার সৌন্দর্য বড় রোমাঞ্চকর।

হকপন্থীর প্রতি ব্যক্তিগত হিংসা, আক্রোশ, বিদ্বেষ বা শত্রুতা
সত্য তথা সত্যের ধারক ও বাহকের প্রতি কোনরূপ হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করলে সত্যের নাগাল পাওয়া যায় না। কারণ, হিংসুকের মনে সর্বদা প্রতিপক্ষের ক্ষতি ও ধ্বংস-কামনাই থাকে। সুতরাং হিংসা বর্জন না করতে পারলে সত্যানুসন্ধ্যানী সত্যের নাগাল পাবে না। সত্যের ধারক ও বাহক গরীব শ্রেণীর হলে অথবা উচ্চবংশীয় বা স্বজাতীয় না হলে ধনী ও উচ্চবংশীয় যদি তার প্রতি হিংসা করে, তবে তো সত্যানুসন্ধানী চিরকাল মিথ্যার বন্যাতেই হাবুডুবু খেতে থাকবে এবং ক্ষতি করবে নিজেরই। এই তত্ত্ব কুরআন মাজীদে কয়েক স্থানে বর্ণিত হয়েছেঃ-
"তা কত নিকৃষ্ট যার বিনিময়ে তারা তাদের আত্মকে বিক্রয় করেছে আর তা এই যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন ঈর্ষান্বিত হয়ে তা তারা প্রত্যাখ্যান করত শুধু এই কারণে যে, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ (সত্য ও নবুওত দান) করেন। সুতরাং তারা ক্রোধের উপর ক্রোধের পাত্র হল। অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা বাকারহ ৯০ আয়াত)
“--অথবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে (মুহাম্মাদ ও তাঁর অনুবর্তীদেরকে) যা দিয়েছেন সে জন্য কি তারা তাদের প্রতি ঈর্ষা করে? ইব্রাহীমের বংশধরকেও তো ধর্মগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা প্রদান করেছিলাম এবং দান করেছিলাম বিশাল রাজ্য। অতঃপর কিছু লোক তাতে (যবুর, তওরাত, ইঞ্জিলে) বিশ্বাস করেছিল এবং কিছু তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। বস্তুতঃ দগ্ধ করার জন্য দোযখই যথেষ্ট। যারা আমার আয়াতসমূহে অবিশ্বাস করে তাদেরকে আগুনে দগ্ধ করবই। যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হয়ে যাবে তখনই ওর স্থলে নতুন চর্ম সৃষ্টি করব; যাতে তারা (চিরস্থায়ী) শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আর যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদেরকে আমি বেহেশ্বে প্রবেশ করাব; যার পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সেখানে রয়েছে তাদের জন্য পবিত্রা সঙ্গিনী। আর তাদেরকে চিরস্নিগ্ধ ছায়ায় স্থান দান করব।” (সূরা নিসা ৫৪-৫৭)
ছোট-বড় ধনী-গরীব, সম্ভ্রান্ত-অসম্ভ্রান্ত প্রভৃতি সত্য-মিথ্যার কোন মাপকাঠি নয়। গরীবকে ধনী হতে দেখে ও অসম্ভ্রান্তকে মানী হতে দেখে হিংসানলে দগ্ধীভূত হয়ে কেউ যদি হক গ্রহণ না করে, তাহলে হিংসুক তো নিজের ছাড়া আর কারো ক্ষতি করবে না। মহানবী -এর সভায় গরীব দেখে ধনীরা বলেছিল, "আমাদের মধ্য হতে আল্লাহ এদের প্রতিই কি অনুগ্রহ করলেন?” (সূরা আনআম ৫৩ আয়াত)
বলা বাহুল্য, তারা সত্য গ্রহণ করতে পারেনি---কেবল হিংসা ও অহংকারের ফলে।
হকপন্থীর প্রতি ব্যক্তিগত বা বংশগত হিংসা থাকলে, হকও হিংসার শিকার হয়ে যায়। তখন সে চায় হকপন্থীও যেন হকচ্যুত হয়; যেমন আহলে কিতাব চেয়েছিল এবং আজও চায়। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّnَ لَهُمُ الْحَقِّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ }
অর্থাৎ, হিংসামূলক মনোভাববশতঃ তাদের নিকট সত্য প্রকাশিত হবার পরও, গ্রন্থধারীদের মধ্যে অনেকেই আকাঙ্ক্ষা করে যে, বিশ্বাসের পর (মুসলিম হওয়ার পর) আবার তোমাদেরকে যদি অবিশ্বাসী (কাফের) রূপে ফিরিয়ে দিতে পারত। সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর ও উপেক্ষা কর; যতক্ষণ না আল্লাহ কোন নির্দেশ দেন, আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। (সূরা বাক্বারাহ ১০৯ আয়াত)

খেয়াল-খুশীর অনুসরণ
প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশী তথা স্বেচ্ছারিতার পূজারী না হওয়া। কারণ সকল বুদ্ধিমত্তা ও সত্যানুসন্ধিৎসা প্রবৃত্তির হাতে এমনই বন্দী থাকে যেমন কোন বেশ্যার হাতে যুবক। অতএব মানুষের মাঝে এমন সত্যপ্রিয়তা এবং সত্য জানার প্রবল বাসনা ও তীব্র ইচ্ছা থাকতে হবে যে, সত্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি পরাভূত হবে। নচেৎ সত্যের বিরুদ্ধে প্রবৃত্তি ও মনের প্রবণতা কাজ করলে সত্যের মহিমা ধরা দেবে না। বরং বড় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি হলেও প্রবৃত্তিবশে জেনে-শুনে সত্য প্রত্যাখ্যান ক'রে বসবে। প্রবৃত্তি পূজা সত্যের পথে এমন এক বড় ডাকাত যে, মানুষ তার ফলে সে পথে চলতে মোটেই প্রেরণা পায় না। এ জন্যই আল্লাহ পাক বলেন,
{ فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّnِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (٥٠) سورة القصص
অর্থাৎ, অতঃপর ওরা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয় তাহলে জানবে যে, ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার চাইতে অধিক বিভ্রান্ত আর কে? (সুরা ক্বাসাস ৫০ আয়াত)
তিনি অন্যত্র বলেন,
{ وَلَوِ اتَّبَعَ الْحَقُّ أَهْوَاءَهُمْ لَفَسَدَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ بَلْ أَتَيْنَاهُم بِذِكْرِهِمْ فَهُمْ عَن ذِكْرِهِم مُّعْرِضُونَ} (۷۱) سورة المؤمنون
অর্থাৎ, সত্য যদি ওদের কামনা-বাসনার অনুগামী হত তাহলে আকাশমন্ডলী, পৃথিবী এবং এতদুভয়ে অবস্থিত সমস্ত কিছুই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত। পক্ষান্তরে আমি ওদেরকে উপদেশ দিয়েছি, কিন্তু ওরা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (সুরা মুন্দুিন ৭১ আয়াত)
তিনি আরো বলেন,
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بصره غشَاوَةً فَمَن يَهْدِيه من بَعْد الله أَفَلَا تَذَكَّرُونَ) (۲۳) سورة الجاثية
অর্থাৎ, (হে নবী!) তুমি কি এমন ব্যক্তিকে দেখেছ, যে নিজের খেয়াল-খুশীকে মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছে? কিন্তু (সে যখন এইরূপ করেছে তখন) আল্লাহও তাকে (হেদায়াতের উপযুক্ত নয়) জেনেই পথভ্রষ্ট করেছেন, তার অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর টেনে দিয়েছেন আবরণ। অতএব আল্লাহ তাকে বিভ্রান্ত করার পর কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” (সূরা জাসিয়া ২৩ আয়াত)
খেয়াল-খুশীর বশেই মানুষ কত শত উপাস্য বানিয়ে নেয়, খেয়াল-খুশী মতে তাদের নাম দেয়। ধারণা ক'রেই তারা ধরে নেয় যে, তাদের কর্মকাণ্ডই হক। অথচ হক তাদের নিকট থেকে বহু ক্রোশ দূরে। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءِ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّnَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنفُsُ وَلَقَدْ جَاءَهُم مِّن رَّبِّهِمُ الْهُدَى} (۲۳) سورة النجم
অর্থাৎ, এগুলো কতক নাম মাত্র যা তোমাদের পূর্বপুরুষরা ও তোমরা রেখে নিয়েছ, যার সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল প্রেরণ করেননি। তারা তো কেবল অনুমান এবং মনের খেয়াল-খুশীরই অনুসরণ করে, অথচ অবশ্যই তাদের নিকট তাদের প্রতিপালকের তরফ হতে পথ-নির্দেশ এসেছে। (সুরা নাজম ২৩ আয়াত)
وَمَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّnَّ وَإِنَّ الظَّnَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا) (۲۸)
অর্থাৎ, অথচ এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু অনুমানের অনুসরণ করে। আর সত্যের মুকাবিলায় অনুমানের কোনই মূল্য নেই। (ঐ ২৮ আয়াত)
মনের কামনা-বাসনা ও খেয়াল-খুশীর অনুগামী হলে মানুষ সত্য-বিচ্যুত হতে পারে। এই জন্য মহান আল্লাহ তাঁর নবী দাউদ-কে বলেছিলেন,
يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلُّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ}
অর্থাৎ, হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, করলে এ তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ পরিত্যাগ করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, কারণ তারা বিচার দিনকে ভুলে থাকে। (সুরা স্বা-দ ২৬ আয়াত)
যে খেয়াল-পূজারী, সে কি আর সত্যের অনুগামী হতে পারে? হকের নাগাল পেতে স্বেচ্ছাচারিতা বর্জন করা জরুরী। নচেৎ সত্য তোমাকে ছোঁয়া দেবে না ভাইটি!

গোঁড়ামি, অনুদারতা
হকের পরশ পেতে মানুষকে উদার হতে হবে। নচেৎ কোন গোঁড়া ও অনুদার মানুষকে হক তার পরশ দেয় না। 'আপোস মানব, তবে তাল গাছটি আমার' বললে কি কোন সত্য সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব? কোন হঠকারী যদি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে চুল বরাবর না হঠে, তাহলে সত্যের ফায়সালা পাবে কিভাবে? "দ্বার বন্ধ ক'রে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি, সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি।"
গোঁড়ামির সাথে যারা তাদের পুরনো জিনিসকে ধরে রাখে, রক্ষণশীলতার বেড়ায় থেকে যারা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ রাখে, তারা কি অপরের নিকট থেকে হক গ্রহণ করতে পারে? 'জেগে যারা ঘুমিয়ে থাকে, তাদের যেমন ঘুম ভাঙ্গে না, বুঝেও যারা বুঝ মানে না, তাদের তেমনি বুঝ আসে না।' তাদের মতটাই নির্ভুল ধারণা ক'রে ভনিতা প্রয়োগ করে। যেটা করে, সেটাকেই অপরিহার্য মনে করে। অথচ তা অজরুরী বা উত্তম হতে পারে। কিন্তু তারা সেটা অবশ্যকর্তব্য ভেবে আমল করে এবং তার অন্যথা করাকে হারাম ধারণা করে। চোখ বন্ধ ক'রে যে কোন হাদীসের উপর আমল করে। কোন হাদীসকে 'যয়ীফ' বলে চিহ্নিত করলেও ধানাই-পানাই ক'রে যয়ীফ হাদীসের উপর আমল বৈধ প্রমাণ করার অপচেষ্টা করে। কোন আমলকে 'বিদআত' বললে অবশেষে 'বিদআতে হাসানা'র নামে আমল অব্যাহত রাখে। কোন আমলের দলীল পাকা না হলে, 'আমার উস্তাদজীই আমার দলীল' বলে জেদ ধরে! এইভাবে গোঁড়া মানুষ নিজ বিবেক-বুদ্ধির গোড়া চিমটে ধরে থাকে। সুতরাং সে হকের দিশা কি ক'রে পাবে বল? 'যারা অন্তরে অন্দরে থাকে অন্ধ রে,
ফিরে নাকো দৃষ্টি তাদের কোন মন্তরে।'

নানা সন্দেহ
মানুষ হক সম্বন্ধে সন্দিহান থাকলে হক গ্রহণ করতে পারে না। শোনা, পড়া ও দেখার বিভিন্ন প্রচার-মাধ্যমে বিভিন্ন বক্তা তথা ধর্মনেতাদের মতভেদের কথা জেনে লোকে সন্দেহ ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে। তারা যেন বলছে, 'নানা মুনির নানা মত, আমরা কার অনুসরণ করব? (কার কথা মানব?)' 'অসংখ্য হরিণ দেখে গোলক-ধাঁধায় পড়ে, না জানে শিকারী কোন্‌ন্টিরে শিকার করে।'
যে ধর্ম বা মযহাবের মানুষ শক্তিমত্তা, ধনবত্তা, বুদ্ধিমত্তা, পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ, তারাই কি হকের উপর আছে? অবশ্যই না। হক ও সত্য জানার মানদণ্ড বা মাপকাঠি তা নয়। যেমন, ব্যক্তির মাধ্যমে সত্যকে চিনতে চাওয়া ভুল। সঠিক হল সত্যের মাপকাঠিতেই ব্যক্তিকে চেনা। হকের অনুসারী দুর্বল ও দরিদ্র হলেও হক সর্বক্ষেত্রে সবল ও বরণীয়।
আমার এক উস্তায ডঃ যিয়াউর রহমান আ'যমী হক দেখে হক চিনেছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর আপনজনেরা তাতে প্রতিবাদ জানিয়ে নানা প্রলোভন ও প্রচেষ্টার বলে স্বধর্মে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু তবুও তিনি হক থেকে এতটুকু বিচলিত হননি। তাঁকে বলা হয়েছিল, 'ধর্ম পরিবর্তন করার ইচ্ছা যদি তোমার একান্তই ছিল, তাহলে ইসলাম কেন? ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলেই তো পারতে। আজ সারা বিশ্বে তাকিয়ে দেখ, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানেরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থ-সম্পদের দিক থেকে কত উন্নত ও সমৃদ্ধ। আর মুসলিমদের অবস্থা তো অধঃপতনের অতল তলে। তাদের ব্যবহার ও পরিবেশ দেখেও কি তাদের ধর্মেই দীক্ষিত হতে উদ্বুদ্ধ হলে?'
আমার উস্তায বলেন, এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েও আমি সকলের সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেছিলাম, 'আমি আসলে মুসলমান ও তাদের পরিবেশ দেখে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হইনি। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি কেবল ইসলামের সৌন্দর্য দেখেই।'
এই হল জ্ঞানী মানুষের কাজ। পক্ষান্তরে অনেক পিপাসিত সুশীতল স্বচ্ছ পানযোগ্য পানির ওপর ভুলক্রমে মরা ভাসতে দেখে পানি পান করে না। অনেকে ইসলামকে হক জানা সত্ত্বেও মুসলিমদের নোংরা পরিবেশ দেখে ইসলাম গ্রহণ করে না। এরা আসলে কিন্তু জ্ঞানী নয়।
অনেকে হকপন্থীদের নানা মতভেদ ও মযহাব দেখে হক গ্রহণ করে না। যেহেতু চুন খেয়ে তাদের গাল তেঁতেছে, তাই দই দেখেও ভয় হয়!
অনেকে ধারণা করে, যে ধর্ম বা মযহাবের মানুষের কাছে অলৌকিক কর্মকাণ্ড, দৃষ্টি ও চিত্তাকর্ষক বিষয় আছে, তারাই সত্যের অনুসারী!
অনেকে ধারণা করে, সব ধর্ম সমান। তারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী, বিধায় হক গ্রহণ করে না। তারা ভাবে, যে কোন একটি ধর্ম মানলেই তো হবে। সত্যতা ও সৎচরিত্রতা বজায় রেখে যে কোন একটি ধর্মের অনুসরণ ক'রে মানুষ পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। অথচ তাদের সৃষ্টিকর্তার ঘোষণা হল,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ) (٨٥)
অর্থাৎ, যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম অন্বেষণ করবে, তার পক্ষ হতে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। আর সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত। (সূরা আলে ইমরান ৮৫ আয়াত)
অনেকে বলে, রাম-রহীমে পার্থক্যটা কি? ওরা মূর্তিপূজা করে, এরাও মাযার পূজা করে। ওরা বলে ইচ্ছাময়ী মায়ের ইচ্ছা, এরাও বলে বাবা অমুক সাহেবের ইচ্ছা। ওরা যেমন পাদরী-পুরোহিতকে উপাস্য জ্ঞান করে, এরাও তেমনি পীরবাবাকে আল্লাহর আসন দান করে। ওদের যেমন দুর্গা আছে, এদের তেমনি দর্গা আছে। ওদের যেমন ঠাকুরথান আছে, এদের তেমনি পীরের থান আছে। ওদের দেওয়ালী হয়, এদের শবেবরাত হয়। তাহলে ইসলাম গ্রহণ ক'রে লাভটাই বা কি? সব ধর্ম তো একাকার।
কথা ঠিকই। কিন্তু মুসলিমদের আমল ও পরিবেশ তো আর ইসলাম নয়। এই ইসলাম সেই ইসলাম নয়। আসল ইসলামই বাঞ্ছিত, নকল ইসলাম নয়।
মুসলিমদের অনেক মযহাব রয়েছে, যে কোন একটি মযহাব মেনে চললেই বেহেস্ত পাওয়া যাবে। অথচ মহানবী বলেন, "নিশ্চয় ইয়াহুদী একাত্তর দলে এবং খ্রিষ্টান বাহাত্তর দলে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। আর এই উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। যার মধ্যে একটি ছাড়া বাকী সব ক'টি জাহান্নামী হবে।" অতঃপর ঐ একটি দল প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বললেন, "তারা হল জামাআত। যে জামাআত আমি ও আমার সাহাবা যে মতাদর্শের উপর আছি তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।” (সুনান আরবাআহ, মিশকাত ১৭১- ১৭২, সিলসিলাহ সহীহাহ ২০৩, ১৪৯২নং)
অনেকে হকের আহবায়ককেই সন্দেহ ক'রে বসে; ভাবে, এই দাওয়াতে তাঁর কোন স্বার্থ উদ্ধার মতলব আছে। তিনি হয়তো দেশের রাজা বা নেতা হতে চান। তিনি হয়তো টাকা-পয়সা কামাবার একটা ধান্দা বানিয়ে নিয়েছেন। তিনি হয়তো বড় যাদুকর। তিনি হয়তো গণক। তিনি হয়তো বড় কবি। তাঁর নিকট হয়তো শয়তান আসে। তিনি হয়তো পাগল।
যেমন আম্বিয়াগণের ব্যাপারে এ সকল সন্দেহ উত্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানেও অনেকে হকপন্থী আহবায়কের জন্য অপবাদ দিয়ে বলে থাকেঃ-
পেট চালাবার ধান্দা! অমুক সংস্থার দালাল। মদদপুষ্ট মাথা। রিয়ালের ইসলাম। ইত্যাদি। সুতরাং 'হাসবুনাল্লাহু অনি'মাল অকীল।'

লজ্জা, সংকোচ, ভয়
অনেকে হক জেনে হক গ্রহণ করে না, যাতে নিজের অপমান না হয়। এতদিন যা করণীয় বলে ক'রে এলাম, আজ তা বর্জনীয় বলি কি ক'রে? সমাজের লোকে কি বলবে? তাতে তার ওজন হাল্কা হয়ে যাবে তো। অথচ হক গ্রহণে মানীর মান কমে না, বরং মান বর্ধমান হয়। লোকের চোখে তাঁর কদর বাড়ে। পক্ষান্তরে প্রেস্টিজ বাঁচাবার জন্য 'হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না'-এর মত গদ্দিনশীন হয়ে থাকলে, শিক্ষিত সমাজে নিন্দনীয় হতে হয়।
বড় বড় ইমামগণ ফতোয়া বদলেছেন। আজ এক ফতোয়া দিয়ে কাল তা প্রত্যাহার ক'রে নিয়েছেন। দলীল যেদিকে ঘুরিয়েছে, তাঁরা সেদিকেই ঘুরেছেন। আর তাতে তাঁদের মান এতটুকু কমে যায়নি।
মুহাদ্দিসগণও রায় বদলেছেন। আজ এক হাদীসকে সহীহ, কাল তা যয়ীফ অথবা তার বিপরীত বলেছেন। তবেই না মানুষ হকপন্থী হতে পারবে।
পক্ষান্তরে মান রাখতে লজ্জার খাতিরে, মানুষের চোখে ছোট হওয়ার ভয়ে যারা হককে 'হক' বলে বরণ করে না, তারা কি ভ্রষ্ট ও ভ্রষ্টকারী নয়?
কবি বলেন,
"করিতে পারি না কাজ, সদা ভয়, সদা লাজ,
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,
পাছে লোকে কিছু বলে!
আড়ালে আড়ালে থাকি, নীরবে আপনা ঢাকি
সম্মুখে চরণ নাহি চলে,
পাছে লোকে কিছু বলে!
হৃদয়ে বুদবুদ-মত উঠে শুভ্র চিন্তা কত
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
কাঁদে প্রাণ যবে, আঁখি সযতনে শুষ্ক রাখি
নির্মল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
একটি স্নেহের কথা প্রশমিতে পারে ব্যথা
চলে যায় উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
মহৎ উদ্দেশ্য যবে একসাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে!
বিধাতা দিয়েছেন প্রাণ, থাকি সদা ম্রিয়মান,
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে!"
বড় অপরাধী তারা, যারা হক মানতে লোকের কথার ভয় করে, অথচ মহান আল্লাহকে ভয় করে না!
সাধারণভাবে সত্যের অপলাপ করা আহলে কিতাবের কাজ। মহান আল্লাহ তাদেরকে নিষেধ ক'রে বলেছিলেন,
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (٤٢) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না। (সূরা বাক্বারাহ ৪২ আয়াত)
লজ্জার খাতিরে অথবা মানুষের কথার ভয়ে সত্য গোপন রাখতে নিষেধ ক'রে মহান আল্লাহ তাঁর নবী-কে বলেছেন,
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّه مَفْعُولًا } (৩৭) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলেছিলে, 'তুমি তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।' আর তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছিলে, আল্লাহ তা প্রকাশ ক'রে দিচ্ছেন; তুমি লোককে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত। অতঃপর যায়েদ যখন তার (স্ত্রী যয়নাবের) সাথে বিবাহ-সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তোমার সাথে তার বিবাহ দিলাম; যাতে বিশ্বাসীদের পোষ্যপুত্রগণ নিজ স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলে সে সব রমণীকে বিবাহ করায় তাদের কোন বিঘ্ন না থাকে। আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে। (সূরা আহযাব ৩৭ আয়াত)
মহানবী কোন কোন কথা লজ্জায় সাহাবাগণকে বলতে পারতেন না, কিন্তু মহান আল্লাহ হক বলতে লজ্জা করেননি। তিনি বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَن يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَاظِرِينَ إِنَاهُ وَلَكِنْ إِذَا دُعِيتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنسِينَ لِحَدِيث إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيُّ فَيَسْتَحْيِي مِنكُمْ وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ} (৫৩) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের অনুমতি না দেওয়া হলে তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না ক'রে ভোজনের জন্য নবী-গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমাদেরকে আহবান করা হলে তোমরা প্রবেশ কর এবং ভোজন-শেষে তোমরা চলে যাও; তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। কারণ এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক; সে তোমাদেরকে উঠে যাবার জন্য বলতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। (ঐ ৫৩ আয়াত)
বলা বাহুল্য, সংকোচ, লজ্জা বা ভয়ের কারণে হক বরণ করা হতে বিরত থাকা জ্ঞানী মানুষের কাজ নয়। সুতরাং গদি যাওয়ার ভয়, কারো ডান্ডা খাওয়ার ভয় অথবা আন্ডা খাওয়া বন্ধ হওয়ার ভয় যেন কোন জ্ঞানীর হক গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি না করে। মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ الله يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (৫৪) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ধর্ম হতে ফিরে গেলে আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে, তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভয় করবে না, এ আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়। (সূরা মাইদাহ ৫৪ আয়াত)

হক তিক্ত হলে গ্রহণ করতে বাধা সৃষ্টি হয়।
অনেক সময় সত্য তিক্ত। তবুও তা ভালোবাসা যেতে পারে এবং যারা সত্যকে ভালোবেসে বরণ করে, তারাই মুক্তি পায়। হতে পারে হক মৌমাছির মত; তার পেটে থাকে মধু, আর লেজে থাকে হুল। তবুও মধু লাভের জন্য হুলের বিধন সহ্য করতে হবে। ওষুধ যদি তেঁতো বলে রোগী না খায়, তাহলে সে কি নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় না? অতএব মুক্তি লাভ করতে যদি তিক্ত হক বরণ করতেই হয়, তাতে ক্ষতি কি ভাইটি?
সত্য রূঢ় হলেও তা প্রিয়; সত্য তার প্রেমিককে মুক্ত করে। সত্য চিরকালই কঠোর, রূঢ় এবং তিক্ত; কিন্তু শাশ্বত ও চিরন্তন। এ বিশ্বের মাঝে তুমি বহু কথা শুনবে, বহু কথা পড়বে; কিন্তু মানবে শুধু উত্তম কথা, যা হক কথা। আর তাহলেই তুমি আল্লাহর কাছে জ্ঞানী। মহান আল্লাহ বলেন,
فَبَشِّرْ عِبَادِ، الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُولُوا الْأَلْبَابِ (۱۷-۱۸) سورة الزمر
অর্থাৎ, অতএব সুসংবাদ দাও আমার দাসদেরকে- যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং যা উত্তম তার অনুসরণ করে। ওরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং ওরাই বুদ্ধিমান। (সূরা যুমার ১৭-১৮- আয়াত)
আবুদ দারদা বলেন, যে হক বলে ও তার উপর আমল করে, সে তার থেকে উত্তম নয়, যে হক শোনে ও তা গ্রহণ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00