📘 সালাফদের সিয়াম 📄 দুর্ভাগা যারা?

📄 দুর্ভাগা যারা?


একদা রাসূলুল্লাহ মিম্বারে আরোহন করলেন। এরপর তিনি মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে পা রেখে বললেন- "আমীন!"
- এরপর তিনি দ্বিতীয় সিড়িতে পা রেখে বললেন 'আমীন'!
- এরপর তিনি তৃতীয় সিঁড়িতে পা রেখে বললেন ""আমিন!"
এভাবে তিনবার "আমীন" বলা দেখে মিম্বর থেকে নবীজি নামার পর সাহাবাগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার কাছে আজ এমন জিনিস শুনতে পেলাম যা আগে কখনও শুনতে পাইনি।"
তখন তিনি বললেন, "জিব্রীল (আঃ) এসেছিলেন। তিনি বললেন, "ঐ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হউক, যে রমাদ্বান পাওয়া সত্বেও তার গুনাহ মাফ করে নিতে পারেনি!"
আমি তখন বললাম- 'আমীন' অর্থাৎ হে আল্লাহ, কবুল করুন।"
দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখার পর জীব্রিল (আঃ) বললেন, "ঐ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হউক, যার কাছে আপনার নাম উচ্চারিত হয়েছে কিন্তু সে আপনার উপর দরূদ পাঠ করেনি।"
তখন আমি বললাম- 'আমীন, অর্থাৎ হে আল্লাহ, কবুল করুন।"
তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখার পর জিব্রীল (আঃ) বললেন, "ঐই ব্যক্তিও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হোক, যে ব্যক্তি তার বৃদ্ধ মা-বাবা দুইজনকে কিংবা একজনকে পেল, তা সত্ত্বেও তাদের সেবা করে জান্নাত হাসিল করতে পারল না।"
আমি তখন বললাম "আমিন, অর্থাৎ হে আল্লাহ, কবুল করুন। "(১)
প্রিয় ভাইয়েরা! আমরা এই হাদীস থেকে কি জানলাম? রাসূলুল্লাহ রমাদ্বান পেয়েও যারা নিজেদের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না তাদের বিরুদ্ধে জিবরীল (আঃ) এর দুআয় গলা মিলিয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছেন। আল্লাহু আকবর! রমাদ্বান পেয়েও যদি আপনার আর আমার গুনাহ মাফ করিয়ে না নিতে পারি, তাহলে আমার চাইতে দূর্ভাগা আর কেউ রইল না।
রমাদ্বানের প্রতি রাতেই সুমহান রব তার অগণিত বান্দাকে জাহান্নাম থেকে আজাদ করে দেন। আমরা কি সেই দলে নিজেদেরকে শামিল করতে পেরেছি? কখনো কি আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি চেয়েছি? কখনও কি হাত তুলে বলেছি "আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার", কখনও কি বলেছি, "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন আযাবি জাহান্নাম?"
রমাদ্বান মাসে শাইত্বন অনুপস্থিত থাকে। তাঁকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়। শাইত্বন অনুপস্থিত থাকার মাসেও যদি তাওবাহ করে গুনাহ মাফ করিয়ে না নিতে পারি, তাহলে আমার চাইতে অভাগা আর কে আছে এই জগতে? রমাদ্বান যখন চলে যায় তখন আফসোস হবে। রমাদ্বানের প্রতিটি সময় আমার জন্য সোনার হরিনের মত। প্রতিটি মুহুর্ত আমার জন্য অনেক মূল্যবান, দামী। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজের পুরাতন, নতুন, প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য, ছোট বড় সকল গুনাহর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। মহান আল্লাহ্ ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তাঁর ক্ষমার চাইতে আর কোন বড় ক্ষমা নেই। তাঁর রহমতের চাইতে বড় কোন রহমত নেই। তাঁর ভালোবাসার মত ভালো বান্দাকে আর কেউ বাসেনা। এমনকি একজন মা জননীও তাঁর সন্তানকে অতোটা ভালোবাসেন না, যতটুকু না আল্লাহ্ বাসেন।
ফুদাইল বিন ইয়াদ্ব (রহ) একদিন মাসজিদ যাবার পথে দেখলনে এক মহিলা তার সন্তানকে বেদম প্রহার করছে। ছেলেটি মারের চোটে চিৎকার চেঁচামিচি করছে। এক পর্যায়ে তাঁর মায়ের হাত থেকে ছুটে সে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। তার মা রেগেমেগে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল, যেন ফিরে এসে সে আর ঘরে প্রবেশ করতে না পারে।
ফুদাইল বিন ইয়াদ্ব (রহ) যখন মাসজিদ থেকে ফিরছিলেন তখন ছোট্ট ছেলেটিকে দেখলেন কান্নাকাটি শেষে দরজার সামনে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ছেলেটির বুক ভরা আশা, রাগ কমে গেলে তার মা এক সময় দরজা খুলে তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিবেন। ফুদ্ধাইল (রহ) দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলেন। কিছু সময় পর তার মায়ের হৃদয় নরম হলে, সে দরজা খুলে তাঁর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিল।
এ দৃশ্য দেখে ফুদ্ধাইল বিন ইয়াছ (রহঃ) কেঁদে ফেললেন। চোখের পানিতে উনার দাঁড়ি ভিজে গেল। তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,
"সুবহানাল্লাহ! বান্দা যদি ধৈর্য্যধারণ করে আল্লাহর দরজার সামনে আশায় বুক বেঁধে ফিকির জারি রাখে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তার রহমতের দরজা খুলে দিবেন।"(২)
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন,
কয়েকজন বন্দীকে রাসুল এর কাছে নিয়ে এসেছিলাম। বন্দীদের মধ্যে এক মহিলাও ছিল। সে তার সন্তানকে (এদিক-সেদিক) খুঁজছিল। যখন সে তাকে খুঁজে পেল, তখন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দুধপান করাতে লাগল। সন্তানের প্রতি মায়ের এই দরদ দেখে, রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে বললেন, "তোমাদের কি মনে হয়, এই মহিলা কি তার সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে পারবে? আমরা বললাম, "আল্লাহর কসম! এ মহিলা তা করতে পারবে না।"
রাসূল বললেন, এই মহিলা তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়াশীল আল্লাহ তার বান্দার প্রতি তার চাইতে অধিক দয়াশীল”। (৩) [সুবহানাল্লাহ]
অপর এক হাদীসে এসেছে, "আল্লাহ তার রহমতকে একশত ভাগ করেছেন। তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। আর পৃথিবীতে একভাগ অবতীর্ণ করেছেন। ঐ এক ভাগের কারণেই সৃষ্টজগৎ একে অন্যের উপর দয়া করে। এমনকি জন্তু তার বাচ্চার উপর থেকে পা তুলে নেয় এই ভয়ে যে, সে ব্যথা পাবে। "(৪)
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, "নিশ্চয়ই আল্লাহর একশটি রহমত আছে, যার মধ্য হতে একটি মাত্র রহমত তিনি মানব-দানব, পশু ও কীটপতঙ্গের মধ্যে অবতীর্ণ করেছেন। ঐ এক ভাগের কারণেই (সৃষ্টজীব) একে অপরকে মায়া করে, তার কারণেই একে অন্যকে দয়া করে এবং তার কারণেই হিংস্র জন্তুরা তাদের সন্তানকে মায়া করে থাকে। বাকী নিরানব্বইটি আল্লাহ আখেরাতের জন্য রেখে দিয়েছেন, যার দ্বারা তিনি কিয়ামতের দিন আপন বান্দাদের উপর রহম করবেন।"(৫)
কাজেই রবের রহমের ভান্ডার ফুরাবার নয়। সেখানে অফুরন্ত রহমত মজুদ আছে আমার মত পাপী ও জালিমের জন্য। শুধু আমিই কেন যেন আশা হারিয়ে ফেলেছি বোকার মত। ছোট্ট ছেলেটির মত ঘাপটি মেরে তাঁর দরজার সামনে গিয়ে ফিক্কির জারি করতে পারছি না। বলতে পারছি না "ইয়া আল্লাহ! আমি আর পারছি না! আমার মাথার উপরে পাপের পাহাড়, এই বুঝি ভেঙে পড়ল। রমাদ্বানের এই রহমতের হাওয়া আমার গায়েও লাগিয়ে দাও, আমায় তুমি ক্ষমা করো, আমায় কাছে টেনে নিয়ে তোমার রহমতের চাদরে ঢেকে নাও।"
প্রিয় ভাইয়েরা! বিশ্বাস করুন! এই চাওয়াটুকুই বাকী। রমাদ্বান মাসে আপনার এই আন্তরিক চাওয়াটুকু অপার কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারে। অভাগা, দুর্ভাগা ও হতভাগাদের কাতার থেকে সৌভাগ্যবানদের দলে শামিল করতে পারে।
ইন্নাল্লাহা গফুরুর রাহীম।

টিকাঃ
১। সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৪০৯
২। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন বিখ্যাত তাবেয়ী ফুযাইল বিন ইয়ায
৩। সহীহুল বুখারী
৪। সহিহ মুসলিম
৫। তিরমিযী

📘 সালাফদের সিয়াম 📄 রমাদ্বানের শেষের দশ রাতের আমল

📄 রমাদ্বানের শেষের দশ রাতের আমল


আইশা (রা) বলেন, রমাদ্বানে রাসূলুল্লাহ ঘুমাতেন, জাগতেন এবং সলাত আদায় করতেন। তবে, যখন শেষের দশদিন এসে যেত, তখন তিনি সারারাত জাগতেন, কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন, স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন, মাগরিব ও ইশার মাঝে গোসল করতেন, অতঃপর সাহরির সময় রাতের খাবার খেতেন। (১)
ঈমাম ইবনে জারীর (রহ.) বলেন, রমাদ্বানের শেষ দশ রাতের প্রতি রাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করা মুস্তাহাব। ঈমাম ইব্রাহীম আন-নাখাই (রহ.) রমাদ্বানের শেষ দশরাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করতেন।
হাফিয ইবনু রজব হাম্বলী (রহ.) বলতেন, রমাদ্বানের শেষ দশ রাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করা মুস্তাহাব। তিনি আরো বলতেন, এই দশরাতে শুধু গোসলই নয়, উত্তম পোষাক, আতর লাগানোও জুমুআর দিন ও ঈদের দিনের মত মুস্তাহাব। কেননা এই দশরাতের যে কোন রাতে লাইলাতুল কদর হয়ে যেতে পারে। (২)
ঈমাম ইবনে আবি আসিম (রহ.) বলেন, রাসূল রমাদ্বানের শেষ দশ রাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করতেন।
আনাস বিন মালিক (রাঃ) রমাদ্বানের ২৪ দিবাগত রাত্রিতে গোসল করতেন, গায়ে সুগন্ধি মাখতেন, সবচেয়ে সুন্দর পোষাক পরিধান করতেন। পরেরদিন সকালে পোষাক খুলে সুন্দর করে ভাঁজ করে তুলে রাখতেন। পরবর্তী রমাদ্বানের ঐ তারিখ না আসা পর্যন্ত তিনি ঐ পোষাক পরিধান করতেন না।
আইয়ুব আস-সাখতাইয়ান্নি (রাঃ) রমাদ্বানের ২৩ ও ২৪ দিবাগত রাত্রিতে গোসল দিতেন। নতুন পোষাক পরতেন। ধূপ জ্বালিয়ে পোষাক সুগন্ধযুক্ত করতেন।
হাম্মাদ ইবনু সালামাহ (রাঃ) বলেন, "ছাবিত বানানী এবং হুমায়েদ আত-তাউহীল উভয়েই লাইলাতুল কদরের তালাশে তাদের সবচেয়ে সুন্দর পোষাক পরিধান করত। সেরা সুগন্ধি মাখত। ধুপ জ্বালাত। মাসজিদে সুগন্ধি ছিটিয়ে দিত।"
সাহাবী তামিম আদ-দারী (রাঃ) ১০০০ হাজার দিরহাম দিয়ে নতুন পোষাক কিনেছিলেন। যে রাতে লাইলাতুল কদরের সম্ভাবনা দেখা দিত তিনি ঐ রাতে পোষাকটি পরিধান করতেন।
ইবনে জারীর (রহ) উপরের সালাফদের এই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, এটা প্রতিষ্ঠিত যে লাইলাতুল কদরের রাত্রিতে গোসল করা, সুন্দর পোষাক পরিধান করা, আতর ও সুগন্ধি মাখা মুস্তাহাব। জুমুআর দিন ও দুই ঈদের দিনের মত সুন্নাহ। (৩)

টিকাঃ
১। ইবন আবী আসিম, ইবন রজব হাম্বলী (৭৯৫ হিজরি), এই হাদিসটিকে হাসান বলেছেন。
২। এই হাদীসের সনদের ব্যাপারে ইবনু রজব (রহ.) মুক্বারিব বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন。
৩। আবু আলিয়াহ ইবন আব্দুল্লাহ, লাতেয়েফ-আল-মা'রিফ থেকে নেওয়া ঘটনা।

📘 সালাফদের সিয়াম 📄 রমাদ্বানের শেষের দশকে লাইলাতুল কদরের তালাশ

📄 রমাদ্বানের শেষের দশকে লাইলাতুল কদরের তালাশ


শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহ)
৭০৬ হিজরি। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ (রহ) তখন কায়রোর এক কারাগারে বন্দী ছিলেন। তখন তাকে লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
যাবতীয় হামদ ও সানা একমাত্র আল্লাহর জন্য। রমাদ্বানের শেষ দশ রজনীতে রয়েছে লাইলাতুল কদর। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এরকম বর্ণনাই পাওয়া যায়। তিনি বলেন, "রমাদ্বানের শেষ দশরাতে তোমরা লাইলাতুল কদরের রাত তালাশ কর।" অন্য বর্ণনায় এসেছে, "এতএব তোমরা শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতসমুহে তা খোঁজ করবে।"(১)
তৎসত্ত্বেও বিজোড় রাত্রিগুলো গণনা করতে হবে কতটুকু সময় গত হয়েছে তাঁর হিসাবে, যেমন, একুশে রাত্রিতে, তেইশে রাত্রিতে, পঁচিশে রাত্রিতে, সাতাশে রাত্রিতে এবং ঊনত্রিশতম রাত্রিতে। তবে অন্যভাবেও গণনা করা যেতে পারে, কতদিন বাকী আছে তাঁর উপরে হিসাব করে। যেমন,
রাসূলুল্লাহ ﷺ, যখন নয় রাত্রি বাকী থাকে সেই রাত্রিতে, যখন সাত রাত্রি বাকী থাকে সেই রাত্রিতে, যখন পাঁচ রাত্রি বাকী থাকে সেই রাত্রিতে, যখন তিন রাত্রি বাকী থাকে সেই রাত্রিতে তালাশ করতে বলেছেন। (২)
অতএব মাস যদি ত্রিশদিনের হয়, তাহলে বিজোড় রাত্রিগুলোতে তালাশ করতে হবে। সেক্ষেত্রে বাইশতম রাত্রিতে নয় রাত্রি বাকী থাকে, চব্বিশতম রাত্রিতে সাত রাত্রি বাকী থাকে। আর আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) এর এক সহীহ বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এভাবেই তালাশ করেছেন। তবে যদি মাস ঊনত্রিশ দিনের হয় তাহলে গণনা করতে হবে কতদিন গত হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে।
সুতরাং, এই হচ্ছে পদ্ধতি। তবে মুমিনের জন্য মানানসই হল শেষের দশ রাত্রির প্রতি রাত্রিতেই তালাশ করা। যেমনটি রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "শেষের দশ রাত্রিতে তালাশ কর।"৩)
আর শেষের সাত রাত্রিতে এটি সংঘটিত হওয়ার ঘোর সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে সাতাশে রাত্রিতে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রবল। যেমনটি উবাই বিন কা'ব (রা) এর বর্ণনা থেকে জানা যায়। তিনি কসম খেয়ে বলেন, "আল্লাহর কসম আমি এ রাত (লাইলাতুল কদর) সম্পর্কে অধিক জানি। উনাকে যখন প্রশ্ন করা হল, আপনি কিভাবে জানলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, "আমার অধিক জ্ঞান হলো, এটি সে রাত যে রাতে রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আর এটি সাতাশ তারিখের রাত। বিভিন্ন আলামত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে যে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উঠবে কিন্তু তাতে আলোক রশ্মি থাকবে না।" (8)
অতএব, উবাই বিন কা'ব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ থেকে একটি নির্দিষ্ট দিনের কথা উল্লেখ করেছেন। এবং সে রাতের পরের দিনের সূর্য উঠবে কিন্তু তাতে আলোক রশ্মি খুব একটা থাকবে না, একদম ম্লান ও মলিন থাকবে, সূর্য তাঁর তেজস্বীরূপ হারাবে, সেদিনটি খুব গরম হবে না, বরং নাতিশীতোষ্ণ হবে। এই রাতের ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ কাউকে কাউকে স্বপ্নযোগে অথবা জাগ্রত অবস্থায় কোন আলোকরশ্মির মাধ্যমে জানিয়েও দিতে পারেন। অথবা সে দেখবে কেউ তাঁকে বলে দিচ্ছে, "আজকে লাইলাতুল কদর।" অথবা কারো হৃদয় স্বাক্ষ্য দিবে যে, আজকেই সেই মহামান্বিত লাইলাতুল কদরের রাত। আর এ ব্যাপারে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

টিকাঃ
মাজমুউ'ল ফাতওয়া, ২৫/২৮৪-২৮৬), ইংরেজী অনুবাদ আবু তালহা দাউদ ইবন রোনাল্ড বারবাঙ্ক (রহ)
১। বুখারীঃ ২০১৬, মুসলিমঃ ১১৬৭/২১৭, আনু সাঈদ খুদরী ও আইশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
২। বুখারীঃ ২০২১, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত।
৩। বুখারীঃ ২০২০, মুসলিমঃ ১১৬৯, আইশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
৪। মুসলিমঃ ৭৬২

📘 সালাফদের সিয়াম 📄 শেষ ভালো যার সব ভাল তার

📄 শেষ ভালো যার সব ভাল তার


রমাদ্বানে আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত হওয়া শর্তসাপেক্ষ। এটা নির্ভর করে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে হিফাজতে থাকার উপর। জমহুর উলামাগণ বলেন, রমাদ্বানে গুনাহ থেকে মুক্তির বিষয়টি ছগিরা গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেননা সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন,
"দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাত, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআর সলাত, এবং এক রমাদ্বান থেকে আরেক রমাদ্বান এগুলো গুনাহ মুক্তির কারণ হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কবিরাহ গুনাহয় না লিপ্ত হয়।"
তবে, কোন কোন সালাফ এই মতের বিপক্ষে রায় দিয়েছে। ইবন মুনছির (রহ) লাইলাতুল কদরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আশা করা যায় এ রাতে ছগিরা ও কবিরা উভয় গুনাহকেই ক্ষমা করে দেওয়া হয়।"
তবে অধিকাংশ উলামা বলেছেন, কবির গুনাহর জন্য খাস দিলে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে। ইখলাসের সাথে ক্ষমা না চাইলে কবিরা গুনাহ ক্ষমা করা হবে না।
কাজেই লাইলাতুল কদর সম্পর্কিত সকল হাদীস একসাথে করলে, এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যদি কেউ সে রাতে ক্ষমা প্রার্থণা করে, যদিও ঐ রাত লাইলাতুল কদরের রাত না হয়, তবুও সে ক্ষমা পেয়ে যাবে।
রমাদ্বান মাসে সিয়াম পালন করলেও হাদীসের ঘোষণানুযায়ী বান্দার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। এটাও বর্ণিত আছে যে, সিয়াম পালনের জন্য বান্দাকে রমাদ্বানের শেষ রাতে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীস, ঈমাম আহমদ (রহ) তাঁর মুসনাদে সংকলন করেন, যেখানে বলা হয়েছে,
যারা সিয়াম পালন করে রমাদ্বানের শেষ রাত্রিতে তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা কি লাইলাতুল কদরের রাতে? রাসূলুল্লাহ উত্তরে বললেন, "না, নিশ্চয়ই শ্রমিককে তাঁর কাজ শেষে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।"
আয-যুহুরী (রহ) বলেন, ঈদুল ফিতরের দিন, লোকেরা যখন ঈদের সলাত আদায় করতে ঈদগাহ ময়দানে যায়, তখন মহান আল্লাহ্ তাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, "ওহ আমার বান্দারা! নিশ্চয়ই তোমরা আমার জন্য সিয়াম পালন করেছ, আমার জন্য সলাতে দাঁড়িয়েছ, যাও বাড়ি ফিরে যাও, তোমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হয়েছে।"
যে ব্যক্তি রোজা রাখে এবং আল্লাহর সকল ফরজ হুকুম আহকাম মেনে চলে তারাই একমাত্র আল্লাহর প্রকৃত বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত। আর যারা এসব ফরজ বিষয়ে অবহেলা ও শৈথিল্য প্রদর্শন করে, এবং আল্লাহর হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করে না, ধ্বংস তাদের জন্য অনিবার্য হয়ে যায়। যদি কেউ খামখেয়ালিপনায় দুনিয়াবী কার্যকলাপে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ আযাব।
সালাফগণ তাদের কর্মগুলোকে পরিশুদ্ধ করার পিছনে মেহনত করতেন, কিভাবে আমলে বিশুদ্ধতা আনা যায় তাঁর পিছনে শ্রম দিতেন। এরপর উনারা তাদের আমলগুলো কবুলের ব্যাপারে ফিকির জারি করতেন। এত আমল করার পরেও ভয় পেতেন, উনাদের আমল কবুল হবে কিনা। উনারা তো সেই সকল সোনা মানুষ যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় বিরাজ করত- এই জন্য যে, উনাদের ওপর আরোপিত হুকুম-আহকাম পালনে নিজেরা কতটুকু সচেষ্ট থাকতে পেরেছেন। আলী ইবন আবি তালিব (রাঃ) বলতেন, "তোমার আমল কবুল হবে কি না তাঁর ব্যাপারে চিন্তিত না হয়ে, বরং আমল কিভাবে সম্পন্ন করবে তার পিছনে মনোযোগ দাও। তোমরা কি আল্লাহর এই বাণী শুনোনি?
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
"আল্লাহ মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন" (আল মায়েদা, আয়াতঃ২৭)
ফুদ্বালা (রহ) বলেন, "আমি যদি জানতে পারি যে, আমার সরিষা দানা পরিমাণ কোন আমল আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন, তাহলে তা আমার কাছে দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে, তার চাইতে অধিক প্রিয় হবে।
কেননা আল্লাহ্ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, "আল্লাহ তো মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই গ্রহণ করেন"।
মালিক বিন দিনার (রহ) বলতেন, "আমল সম্পাদন করার চাইতে, আমল কবুলের বিষয়টি কঠিন, এই ভয়টা যেন থাকে।"
আতা আস-সুলামী (রহ) বলতেন, "আল্লাহভীরুদের ভয় এই যে, তাঁরা ভাবে, তাদের নেক আমলগুলো হয়তো আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করতে পারেননি।"
আব্দুল আযীয ইবনু আবী রুউয়াদ (রহ) বলেন, "আমি এমন অনেকজনের সাথে মিশেছি, যারা আমলের ব্যাপারে খুবই যত্মবান ছিলেন, তবুও আমল সম্পন্ন করার পর তাদের চোখেমুখে শুধু বিষণ্ণতার ছাপই দেখতে পেতাম, এই ভয়ে যে আল্লাহ্ তাদের আমল কবুল করবেন কি না?"
ঈদুল ফিতরের দিনে সালাফদের কার কারো চোখেমুখে বিষন্নতার ছাপ ফুটে উঠত। তাঁদেরকে যখন বলা হত, আজকে তো খুশি ও আনন্দের দিন। তাঁরা বলতেন, আপনি সত্যই বলেছেন, তবে আমি তো আল্লাহরই দাস! আমার রব আমাকে যে আমলের আদেশ দিয়েছিলেন আমি জানিনা তিনি তা আমার তরফ থেকে কবুল করেছেন কি না?
ঈদুল ফিতরের দিন ওয়াহব (রহ) একদল লোককে হাসাহাসি করতে দেখে বললেন, যদি তাদের সিয়াম কবুল হয়ে থাকে, তাহলে জেনে রেখো কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা এরকম নয়, আর যদি কবুল না হয়ে থাকে, তাহলে ভীতিগ্রস্তদের অবস্থা এরকম হতে পারে না।
হাসান আল বসরী (রহ) বলতেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা রমাদ্বানকে তাঁর সৃষ্টিকূলের জন্য উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছেন। এ মাসে তাঁরা আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। কেউ কেউ এই প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীর মুকুট পরিধান করে, কেউ কেউ পিছনে পড়ে রয়। সেদিনের দৃশ্য কতই না সুন্দর! যেদিন নেককারদের দেখা যাবে হাসিখুশি খেলতামাশায় আর বদকারদের দেখা যাবে পরাজিত ভুলণ্ঠিত অবস্থায়।
হযরত আলী (রাঃ) রমাদ্বানের শেষ দিনে সবাইকে ডেকে ডেকে বলতেন, "কোথায় সেই বিজয়ী, তাঁকে ডাকো অভিনন্দন জানাই। কোথায় সেই বিজেতা আসো তাঁকে শান্তনা দেই। হে বিজয়ী! আমরা তোমাকে অভিনন্দন জানাই! ওহে বিজেতা! আল্লাহ্ তোমার দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে দিন!"
বরকতময় এই রমাদ্বান মাস। এই মাসে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার উপায়ান্তর অনেক।
* রোজাদারদের ইফতার করানো।
* আল্লাহর কোন বান্দার দুঃখ তাড়ানো।
* অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ। হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি রমাদ্বানে আল্লাহকে স্মরণ করবে, তাঁর গুনাহর খাতা মাফ করে দেওয়া হবে, আর যে তাঁকে ডাকবে সে হতাশাগ্রস্থ হবে না।"
* ক্ষমা প্রার্থণা করা。
* রোজা রাখার সময় (সাহরী) ও রোজা ভাঙ্গার সময় (ইফতার) সময় বান্দার দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে শুধুমাত্র যারা প্রত্যাখ্যান করবে তাঁরা ব্যতীত। আশেপাশে থাকা লোকসকল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ওহ আবু হুরাইরা! কারা প্রত্যাখ্যান করবে? তিনি বললেন, যারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেনা তাঁরা ব্যতীত।"
* ফিরিশতারা সিয়াম পালনকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থণা করেন, যতক্ষণ না সে সিয়াম ভঙ্গ করে।
রমাদ্বান মাসজুড়ে এত এত ক্ষমা অর্জনের উপায় থাকতেও, যে ব্যক্তি এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায়ফেলায় কাটিয়ে দিবে, তাঁর চাইতে অভাগা এই দুনিয়ায় আর কেউ থাকতে পারে না। এ ধরণের লোকদের ধ্বংসের ব্যাপারে নবীজি তিনবার 'আমীন' বলে জিব্রীল (আঃ) এর সাথে গলা মিলিয়েছিলেন।
কাতাদাহ (রহ) বলতেন, "যে ব্যক্তি রমাদ্বান মাসে তাঁর গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না, তাহলে রমাদ্বানের বাইরে অন্য কোন সময়ে তাঁর গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারবে না।"
অর্থ্যাৎ, যদি কেউ রমাদ্বানের মত এমন সুবর্ণ সুযোগ ছেড়ে দেয়, তাহলে বাকী মাসগুলোতেও সে সুযোগ সন্ধানী হবে না, হেলায়ফেলায় কাটিয়ে দিবে। এ ব্যাপারে একটি হাদিস আছে, যেখানে বলা আছে, 'যে ব্যক্তি রমাদ্বানে ক্ষমা হাসিল করতে পারলো না, তাহলে কবে সে তা হাসিল করবে?"
কাজেই, এ মাসে যদি কেউ ক্ষমা না পেয়ে থাকে, তাহলে কবে ক্ষমা পাবে? লাইতুল কদরের মত হাজার মাসের চাইতে উত্তম এমন রাতে যদি কেউ ক্ষমা না পায়, তাহলে সে কবে পাবে? রমাদ্বান মাসে যদি কেউ নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে না পারে, তাহলে কবে করবে? অবহেলা আর অবজ্ঞার অসুখ থেকে কখন সে নিজেকে সুস্থ করে তুলবে?
অবশ্যই ঈদুল ফিতরের দিন এই উম্মাহর আনন্দের দিন। কেননা, রোজাদারেরা এ মাসেই ক্ষমা পেয়ে যায়, জাহান্নাম থেকে আজাদ হয়ে যায়। গুনাহগারের দল নেককারদের সাথে একাকার হয়ে যায়। এ দিনে এতসংখ্যক লোক জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায়, যা বছরের অন্য কোন দিনে পায় না। কাজেই, যে ব্যক্তি ঈদের দিনে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যায়, আনন্দ তো তাঁর জন্যই, আর যে জাহান্নাম থেকে আজাদি পায় না তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন আযাব। আল্লাহর ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি নির্ভর করে রমাদ্বানের দিনগুলোতে সিয়াম পালন এবং রাতের বেলায় সলাতে দণ্ডায়মান হওয়ার উপর। অতএব যে কারো উচিৎ রমাদ্বানে আল্লাহর তারিফ ও প্রশংসা করা, দিনে সিয়াম পালন করা, রাতে সলাت আদায় করা। তাঁর দয়া ভিক্ষা চাওয়া, গুনাহ থেকে বারবার ক্ষমা চাও, জাহান্নাম থেকে বেশী বেশী মুক্তি চাওয়া। অন্তরে তাঁর ভয়ভীতি লালন পালন করে তাঁর স্মরণে কাটিয়ে দেওয়া।
আল্লাহর ক্ষমা হাসিলের কিছু উপায়ঃ
* আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করলে ও মেনে নিলে, এর দ্বারা গুনাহ মাফ হয়। এর দ্বারা গুনাহ ধুয়ে মুছে যায়। কোন গুনাহই আর অবশিষ্ট থাকে না।
* বেশী বেশী ইস্তিগফার পাঠ, আল্লাহর ক্ষমা অর্জনের অনন্য উপায়। ইস্তেগফার মানেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়া। আর রোজাদের দোয়া কবুল হয়।
হাসান আল বসরী (রহ) বলেন, "বেশী বেশী ইস্তেগফার করো, নিঃসন্দেহে তুমি জানো না আল্লাহর রহমত তোমার ওপর কখন বর্ষিত হয়।"
লুকমান (আঃ) তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, "হে আমার ছেলে! তোমার জিহবাকে আল্লাহর ক্ষমা চাওয়াতে ব্যস্ত রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত সময় রয়েছে, যে সময়ে তিনি দোয়া ফিরিয়ে দেন না।"
এ ব্যাপারে শাইত্বনের বক্তব্যে এসেছে, 'আমি মানবজাতিকে গুনাহের মাধ্যমে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছি, আর তাঁরা আমাকে লা-ইলাহা-ইলাল্লাহ এবং ইস্তিগফারের মাধ্যমে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে।'
ইস্তিগফার হলো সকল আমলের উপসংহার। রমাদ্বানের সকল আমলের শেষে ইস্তিগফার হল মুক্তির দরজা। সিয়াম, সলাত, দুআ ইত্যাদি আমলের সাথে ইস্তিগফার, যার মাধ্যমে আল্লাহ্ বান্দাকে ক্ষমা করে দিবেন। এজন্যই রমাদ্বানে সকল আমলের শেষে আমাদের উচিৎ বেশী বেশী আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা।
উমার বিন আব্দুল আযীয (রহ) তাঁর গভর্ণর বরাবর চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, রমাদ্বান মাস যেন ইস্তিগফার ও সদাক্বা (সদাক্বাতুল ফিতর) দিয়ে শেষ হয়।
কেননা, নিঃসন্দেহে, সদাক্বাতুল ফিতর হল রমাদ্বানের বান্দার অনর্থক কথবার্তা ও ফাহেশা কার্যকর্মের কাফফারা এবং ইস্তিগফার হল আমলের ত্রুটি-বিচ্যুতি যার কারণে সিয়ামের ক্ষতি সাধিত হয়, তার কাফফারা।
উমার বিন আব্দুল আযীয (রহ) তাঁর চিঠিতে আরো লিখেন, তোমাদের পিতা আদম (আঃ) যে দুআ পড়ে ক্ষমা চেয়েছিল, তোমরাও পড়বে –
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
রব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তার্ হামনা লানাকু নান্না মিনাল খাসিরীন।
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় জুলুম করেছি, যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন তবে অবশ্য আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।"
তোমরা নূহ (আঃ) যে দুআ করেছিল, সেই দু'আও পড়বে
وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
ওয়া ইল্লা তাগফিরলী, ওয়া তারহামনী, আকুম্মিনাল খসিরীন
"আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।"
আর তোমরা মুসা (আঃ) এর মত বলবে,
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفسي فَاغْفِر لى فَغَفَرَ لَهُ ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
রব্বি ইন্নি যলামতু নাফসী ফাগফিরলী ফাগফারালাহু, ইন্নাহু হুয়াল গাফুরুর রাহীম
হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের উপর জুলুম করে ফেলেছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন।
অতঃপর তোমরা নবী ইউনুস (আঃ) এর মত বলবে
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জলিমীন।
আপনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। আমি আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। অবশ্যই আমি পাপী।
সিয়াম হল জাহান্নামে থেকে বাঁচার জন্য ঢাল যতক্ষণ না কেউ অনর্থক ও আজেবাজে কথার দ্বারা এই ঢালকে ভেঙে ফেলে। ইস্তিগফার সেই ঢালকে বহাল তবিয়তে রাখে। রাসূলুল্লাহ্ আম্মাজান আইশা (রাঃ) কে লাইলাতুল কদরের রাত্রিতে ইস্তিগফারের জন্য একটি বিশেষ দুআ শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
কেননা, ঈমানদারগণ রমাদ্বান মাসজুড়ে দিনে রোজা রাখে আর রাতে সলাতে দণ্ডায়মান হয়, যখন মাস শেষ হতে থাকে আর লাইলাতুল কদরের সময় আসতে থাকে, তখন যে কেউ এই দুআ পড়ে সারা মাসের ঘাটতি বা কমতির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করতে পারে।
ইয়াহইয়া বিন মুয়ায (রহ) বলেন,
"বুদ্ধিমান তো সেই লোক যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর ক্ষমা হাসিল করা। বুদ্ধিমান তো সে নয় যে শুধু মুখে মুখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আর তাঁর অন্তর গুনাহর সাথে জড়িয়ে থাকে, রমাদ্বানের পর পুনরায় গুনাহতে ফিরে যাওয়ার মানসিকতা রাখে। তাঁর সিয়াম প্রত্যাখ্যাত এবং তা তাঁর মুখে ওপর ছুঁড়ে ফেলা হয়।"
সাহাবী কা'ব (রাঃ) বলেন,
"যে ব্যক্তি রমাদ্বানে রোজা রেখে মনে মনে বলল, এই মাস শেষ হলেই আমি ফের আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হব, তাহলে সেই লোকের সিয়াম বাতিল। আর যে ব্যক্তি রমাদ্বানে রোজা রেখে মনে মনে বলল, এ মাস শেষ হয়ে গেলেও আমি আল্লাহর অবাধ্যতা করব না, তাহলে কোন প্রশ্ন ব্যতিরেকে ঐ লোকের ঠিকানা জান্নাতে হবে।"
হে আল্লাহর বান্দারা! নিঃসন্দেহে আর অল্প কিছুদিনের মাঝেই রমাদ্বান মাস চলে যাবে। যে ব্যক্তি রমাদ্বান মাস ভালোভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে, তাঁর সামনের দিনগুলো ভালোভাবেই কাটবে। আর এখনও যাদের মধ্যে ঘাটতি বা কমতি আছে, তাদের উচিৎ ভালোভাবে মাসটি শেষ করে দেওয়া। কেননা, শেষ ভাল যার, সব ভালো তাঁর। রমাদ্বানের বাকী দিনগুলো হেলায়ফেলায় কাটিয়ে না দিয়ে এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করুন। এই মাসকে বিদায় দিন সর্বোত্তম উপায়ে, শান্তির সাথে।
মুমিনের অন্তর এ মাসের বিদায় ঘনিয়ে এলে কাঁদে, হা-হুতাশ করে। এর চলে যাওয়া দেখে শোকে বিহবল হয়ে পড়ে। আপনজন কেউ বিদায় নিলে যেমন অনুভূত হয়, ঠিক তেমনি রমাদ্বান চলে যাওয়াতেও তাঁর কষ্ট অনুভূত হয়। রমাদ্বান চলে যাওয়াতে এই যদি হয় মুমিনের অবস্থা, তাহলে যারা দিনরাত অবহেলা আর অবজ্ঞায় কাটিয়ে দিয়েছে তাদের অবস্থা কি? একজন অবহেলাকারীর মেকি কান্না তখন আর কি কাজে আসবে তাঁর জন্য? এই মিসকিনদের কত করে বোঝানো হয়েছে, কিন্তু তাঁরা বুঝতে চায়নি। পরিশুদ্ধির জন্য তাঁদেরকে হাজারবার নসিহত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাতে তাঁরা সাড়া দেয়নি। চোখের সামনে কতজনকে দেখেছে আমল কুড়িয়ে নিতে, তবুও সে নির্বিকার থেকেছে। আল্লাহর কত অবাধ্য বান্দাকে অনুগত হতে দেখেছে, তবুও সে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। আর এখন এসে সে বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে মেকী কান্না করছে। নিজের ভুলের অপনোদন করতে চাচ্ছে। যার কোন প্রতিকার এখন আর নেই। (১) (অনুবাদ সমাপ্ত)
রসুল ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি এমন আমল করে যা দেখে মানুষ মনে করে যে, সে জান্নাতবাসী হবে, অথচ সে জাহান্নামী। আবার কোন কোন মানুষের আমল দেখে মানুষ মনে করে যে, সে জাহান্নামী হবে, অথচ সে জান্নাতী। কেননা সর্বশেষ আমলের উপরই ফলাফল নির্ভরশীল। (২)
ইবনুল যাওজি (রহ) বলেছেন,
إن الخيل إذا شارفت نهاية المضمار بذلت قصارى جهدها لتفوز بالسباق فلا تكن الخيل أفطن منك إفإنما الأعمال بالخواتيم .. فإنك إذا لم تحسن الاستقبال لعلك تحسن الوداع
"যখন রেসের ঘোড়া বুঝতে পারে আর অল্পক্ষণ বাদেই পথ শেষ হয়ে যাবে তখন সে তার সর্বশক্তি দিয়ে রেস জিততে উদ্যত হয়; রেসের ঘোড়া যেন তোমার চাইতে চালাক না হয়; প্রকৃতপক্ষে, আমল বিচার করা হয় তা কিভাবে শেষ হয় তার মাধ্যমে; সুতরাং যদি ভালোভাবে রামাদ্বান শুরু নাও করতে পারো শেষদিকেরটা যেন ভালোয় ভালোয় বিদায় করতে পারো"।(৩)
ইবনে তাইমিয়াহ (রহ) বলেছেন,
العبرة بكمال النهايات لا بنقص البدايات
"কোন জিনিসের শেষ কত পরিপূর্ণভাবে হয়েছে সেটাতেই রয়েছে শিক্ষা, শুরুর ভুল-ত্রুটির মধ্যে কোন শিক্ষা নেই।"
হাসান আল-বাসরী (রহ) একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, "যতটুকু (সময়) বাকী আছে তার মধ্যে তোমার আমল বাড়িয়ে নাও এবং তোমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে যতটুকু (সময়) গত হয়েছে তার জন্য; যতটুকু সময় পাও তার জন্য জীবন ঢেলে দাও, কারণ তুমি জানো না কখন তোমার আত্মা আল্লাহর রহমতের দিকে ধাবিত হবে।"(৫)
সুতরাং এই অন্তিম মুহুর্তে আমাদের সবারই উচিৎ রমাদ্বানের প্রতিটি দিনকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রতিটি দিনকে জীবনের শেষ দিন মনে করে আল্লাহর নাফরমানী থেকে দূরে থাকা। এবং নিজেকে সৎআমলের দিকে ধাবিত করা। শপিংএ ব্যস্ত না থেকে নিজেকে প্রতিপালকের দিকে ন্যস্ত করা। মাত্র দশটা দিন, শেষের এই দশটা রাত, হতে পারে আপনার ও আমার দিন বদলের রাত।
শেষের এই দশ দিনে আমরা যে সব আমল করতে পারি ইন শা আল্লাহ -
- সলাত (ফরজ, সুন্নাহ ও কিয়ামুল লাইল ও অন্যান্য নফল সলাত)
- কুরআন তিলাওয়াত
- তাসবীহ, তাহলীল ও তাহমীদ
- দরূদ
- দান-সদাক্বা (বেশী বেশী)
- এদিক সেদিক বেহুদা ঘোরাফেরা না করা।
- সময় মত ইফতার ও সাহরী করা।
- মাসজিদে একদম সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে ফরজ স্বলাত আদায় করা।
- খোশ গল্প ও আড্ডাবাজী ত্যাগ করা।
- দুনিয়াবিমুখ হয়ে আল্লাহমুখী হওয়া।
- ফেসবুক, ইন্টারেন্ট, ইউটিউব ও অনলাইনে বেহুদা সময় না কাটানো।
- ঈদ শপিং আগেভাগেই করে রাখা, এই দশটিন শুধুমাত্র ইবাদাতের জন্য বরাদ্দ রাখা।
- বেশী বেশী দুআ করা।
- ইস্তিগফার তথা বেশী বেশী ক্ষমা প্রার্থণা করা।
হে মহান আল্লাহ্! রামাদ্বানের বাকী দিনগুলিতে আমাদেরকে বেশী বেশী আমলে সালেহ করার তাউফীক দিন। সেই সাথে মৃত্যুর পূর্বে বেশি বেশি নেক আমল করার ফুরসৎ দান করেন। আপনার সন্তুষ্টি নিয়ে প্রত্যাবর্তন করার ব্যবস্থা করে দেন। (আমীন)

টিকাঃ
১। এই অধ্যায়টি ঈমাম ইবনু রজব হাম্বলী (রহ) এর লাতায়েফুল মা'রিফ এর শেষ অধ্যায় থেকে অনূদিত। শাইখ আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মাদ বিন কাসিম এই অধ্যায়টিকে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরেছেন। সেই সাথে ইবনু তাইমিয়াহ (রহ) এর "মাজমুউ আল ফাতোয়া" থেকেও কিছু অংশ তিনি যোগ করেছেন। আর একদম শেষের অংশ আমি অধমের (রাজিব হাসান) পক্ষ থেকে এখানে যোগ করা হয়েছে।
২। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৯৩, শারহুস সুন্নাহ, হাদীস নং ৭৯ বর্ণনাকারী: সাহল ইবনে সা'দ (রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু)
৩। https://www.islamicboard.com/fasting-ramadhan-amp-eid-ul-fitr/134326258-horses.html
৪ https://www.islamicboard.com/fasting-ramadhan-amp-eid-ul-fitr/134326258-horses.html
৫ https://www.islamicboard.com/fasting-ramadhan-amp-eid-ul-fitr/-134340303regret-wasting-ramadan.html

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية