📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 রমাদ্বানে সালাফদের কুরআন তিলাওয়াত

📄 রমাদ্বানে সালাফদের কুরআন তিলাওয়াত


একদিন রাসুল ও সাহাবা আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রাঃ) কে বললেন, "তুমি আমাকে কুরআন শুনাও"।
ইবনু মাস'উদ তখন নবীজি বললেন, "আমি আপনাকে কিভাবে কুরআন শুনাবো, অথচ আপনার উপরেই তো কুরআন নাযিল হয়।"
রাসূলুল্লাহ বললেন, "আমি তোমার নিকট থেকে কুরআন শুনতে ভালোবাসি।"
ইবনু মাস'উদ (রাঃ) অতঃপর সূরা আন-নিসা তিলাওয়াত শুরু করলেন। একচল্লিশ নম্বর আয়াতে পৌঁছালে নবী কারীম বললেন, 'থামো।' নবীজী এর চোখ অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠেছে। দু'চোখ বেয়ে অশ্রুমালা প্রবাহিত হচ্ছে।"(১)
প্রিয় পাঠক! সূরা আন-নিসার ৪১ নম্বর আয়াতে কি ছিল জানেন - যা শুনে রাসুল এর চক্ষু মুবারাক অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠেছিল? সেই আয়াতটিতে ছিলো
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
“সেদিন কেমন হবে, যেদিন আমরা প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী (নবী) আনবো এবং তোমাকে সকলের উপরে সাক্ষী বানাবো?”(২)
উক্ত ঘটনার ব্যাপারে হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, "উম্মতের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার উপর সাক্ষ্যদান ও তাদের উপর আযাবের কথা চিন্তা করে সেদিন নবীজি কেঁদে ফেলেছিলেন।"(৩)
ইবনুল বাত্ত্বাল (রহ.) বলেন, "এ আয়াত তিলোওয়াত শোনার সময় রাসূল এর সামনে কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য ভেসে উঠেছিল, এজন্য তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।"
অথচ আমরা কতবার কুরআন তিলাওয়াত শুনি, নিজেরাও তিলাওয়াত করি, কিন্তু আমাদের অন্তরে তার তাছির হয়না। আমাদের অন্তর কাঁদে না। কিয়ামতের বর্ণনা, হাশরের বর্ণনা, জাহান্নামের বর্ণনা শুনেও আমাদের কোন টেনশান হয়না। আমরা নির্বিকার, ভাবলেশহীন থাকি।
মহান আল্লাহ রমাদ্বান মাসে সালাফদের মত আমাদেরকে বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াতের, বোঝার ও তদ্বনুযায়ী আমল করার তাওফীক দিন।
সালাফদের জীবনচরিত নিয়ে গবেষণা করলে অবাক করা সব বিষয়াদি বের হয়ে আসে। কুরআনের প্রতি উনাদের ভালোবাসা ছিল অনেক বেশী। কুরআনকে উনারা শিশুবাচ্চার মত সবসময় বুকে আগলে ধরে রাখতেন।
আল আস-ওয়াদ (রহ) রমাদ্বানের প্রতি দুই রাতে কুরআন খতম করতেন। মাগরিব ও ইশা সলাতের মাঝের সময়টুকু তিনি ঘুমাতেন। রমাদ্বানের বাইরে অন্যান্য মাসে প্রতি ছয়রাতে একবার করে তিনি কুরআন খতম করতেন। (৪)
ক্বাতাদাহ (রহ) অন্যান্য মাসে সাত দিনে কুরআন খতম করতেন। আর রমাদ্বান মাসে তিনদিনে খতম করতেন। আর রমাদ্বানের শেষ দশ দিনে প্রতি রাতে একবার করে কুরআন খতম করতেন। (৫)
মুজাহিদ (রহ) রমাদ্বানের প্রতি রাতে একবার করে কুরআন খতম করতেন। (৬)
মুজাহিদ (রহ) বলেন, "আলি আল-আযাদী রমাদ্বানের প্রতি রাতে কুরআন খতম করতেন। "(৭)
আর রাবিয়ী ইবনু সুলাইমান (রহ) বলেন, "ঈমাম আশ-শাফেঈ (রহ) রমদ্বান মাসে ষাটবার কুরআন খতম করতেন। একবার দিনের বেলায়, আর আরেকবার রাতের বেলায়।"(৮)
আল-ক্বাসিম ইবনুল হাফিজ ইবন আসাকীর (রহ) বলেন, আমার আব্বা জামাআতে সলাত আদায় করতেন ও নিয়মিত সলাত আদায় করতেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে একবার করে কুরআন খতম করতেন, আর রমাদ্বানে প্রতিদিন একবার করে খতম করতেন। (৯)
কুরআন কয়দিনে খতম করা উচিৎ, এ ব্যাপারে ঈমাম নববী (রহ) কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,
"সর্বজনগৃহীত মত হল, এটা বিভিন্ন জনের জন্য বিভিন্ন রকমের। যে কুরআন তিলাওয়াতের সময় বুঝে বুঝে পড়তে চায়, তাহলে পড়ার গতি কমিয়ে যতটুকু পারুক বুঝে বুঝে এগিয়ে যাক। আবার যে ইলম বিতরণের কাজে ব্যস্ত থাকে বা দ্বীনের বিভিন্ন দাওয়াতী কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে, অথবা মুসলিমজাতির স্বার্থে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকে, তাহলে তাঁর ওপরে অর্পিত দায়িত্ব ও কাজকে অবজ্ঞা না করে যতটুকু পারুক তিলাওয়াত করবে। আর যদি সে এগুলোর কোনটিতেই সম্পৃক্ত না থাকে তাহলে তাঁর উচিৎ একঘেয়েমী না আসা পর্যন্ত বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াত করা।"(১০)

টিকাঃ
১। সহিহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৫৮২, সহিহ মুসলিম, হা: নং: ৮০০
২। সূরা আন-নিসা, আয়াত:৪১
৩। ফাতহুল বারী: ৯/৯১
৪। আবু নু'ইয়াইম, হিলিয়াতুল আল-আউলিয়াঃ ১-২৫০
৫। আস-সিয়ার (৫/২৭৬)
৬। আত-তিব্বে নববী (পৃষ্ঠাঃ ৭৪), সনদ সহীহ।
৭। তাহযীবুল কামাল (২/৯৮৩)
৮। আস-সিয়ার, (১০/৩৬)
৯। আস-সিয়ার (২০/৩৬)
১০। আত-তিব্বিয়ান, পৃষ্ঠাঃ ৭৬

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 সিয়ামের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা

📄 সিয়ামের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা


- ঈমাম ইবন কুদামাহ আল মাকদিসী (রহ) (১)
আপনারা জানেন, সিয়াম হল এমন একটি বিশেষ আমল যার সাথে অন্য কোন আমলের তেমন মিল পাওয়া যায় না। সিয়ামের সাথে আল্লাহর সরাসরি সম্পর্ক। এ জন্যই হাদিসে কুদসীতে তিনি ইরশাদ করেছেন,
'নিশ্চয় রোজা আমার জন্য, আর এর প্রতিদান স্বয়ং আমিই দিব।(২)
আল্লাহর এই ওয়াদা থেকে বোঝা যায়, সিয়ামের মর্যাদা অনেক বেশী। যেভাবে কা'বা ঘরের মর্যাদা তাঁর (আল্লাহর) কাছে অনেক বেশী। যা কুরআনের এই আয়াত থেকে অনুধাবন করা যায়। মহান আল্লাহ্ ইব্রাহীম (আঃ) আদেশ করেছিলেন -
وَطَهِّرْ بيتي
"এবং আমার ঘরকে পাক সাফ রাখবে"।(৭৩)
নিঃসন্দেহে দুইটি কারণে সিয়ামের গুরুত্ব এত বেশী।
প্রথমতঃ সিয়াম একটি গোপন আমল। যা শুধুমাত্র আল্লাহ্ আর তাঁর বান্দার মধ্যে সংঘটিত হয়ে থাকে। কাজেই এখানে রিয়া বা লোক দেখানো কোন বিষয় প্রবেশ করতে পারে না।
দ্বিতীয়তঃ সিয়াম হল আল্লাহর শত্রুদের দমন করা বা অধীনস্থ করা। কিভাবে? সিয়ামের মাধ্যমে প্রবৃত্তির (যা কিনা আদম সন্তানকে ধোঁকা দিয়ে থাকে) গলায় লাগাম দেওয়া হয়। বেশী বেশী খানাপিনা প্রবৃত্তির খোঁড়াক বাড়িয়ে দেয়। খানাপিনা পরিহার করা ছাড়াও এরকম অনেক জানা অজানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি আছে যা থেকে সিয়ামের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।
সিয়ামের মুস্তাহাব বিষয়াদিঃ
সাহরী দেরী করে খাওয়া এবং খেজুর দিয়ে দ্রুত ইফতার করা পচ্ছন্দনীয়। এ মাসে বেশী বেশী দান সদাকা করাও একটি মুস্তাহাব আমল। বদান্যতা, বেশী বেশী নেক আমল ও দয়াদাক্ষিণ্যতা এ মাসে বাড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। আর তা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দেখানো তরিকা অনুযায়ী। রমাদ্বানে কুরআন তিলাওয়াত ও শেষ দশদিনে ই'তিকাফ করাও মুস্তাহাব। আর এই দশদিনে বেশী বেশী নেক আমলের প্রতি ঝুঁকে পড়া উচিৎ। সহীহ বর্ণনায় এসেছে মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, যখন রমাদ্বানের শেষ দশদিন এসে যেত, রাসূলুল্লাহ ﷺ কোমরের কাপড় শক্ত করে বেঁধে নিতেন। (৪)
উলামাগণ "কাপড় শক্ত করে বেঁধে নেওয়া" এর ব্যাপারে দু'টি মত দিয়েছেন। এক, এই দশদিন স্ত্রীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য, (অর্থ্যাৎ স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকার জন্য)। দুই, নেক আমলের দিকে একান্তভাবে ঝুঁকে থাকা, আর সেদিকেই কঠোরভাবে মনোনিবেশ করার জন্য। তাঁরা এও বলেছেন যে, শেষের দশদিনে নবীজি ﷺ লাইলাতুল কদর তালাশে নিজেকে শতভাগ নিবেদন করতে এভাবে কোমরের কাপড় শক্ত করে বেঁধে নিতেন।
সিয়ামের অন্তর্নিহিত গুপ্তরহস্য ও এর বৈশিষ্টসমূহঃ
সংযমের দিক থেকে সিয়ামের তিনটি পর্যায় রয়েছে। সাধারণ সিয়াম, যথাযথ সিয়াম এবং পরিপূর্ণ সিয়াম। সাধারণ সিয়াম বলতে ঐ সিয়ামকে বুঝায় যার মাধ্যমে কেউ তাঁর উদর ও যৌনাঙ্গকে প্রবৃত্তির খোঁড়াক থেকে হিফাজতে রাখে। যথাযথ সিয়াম বলতে ঐ সিয়ামকে বুঝায় যার মাধ্যমে কেউ, তাঁর দৃষ্টি, জিহবা, হাত, পা, শ্রবণ, চক্ষুদ্বয়সহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে অশ্লীল ও ফাহেশা কাজকর্ম থেকে হিফাযতে রাখে। পরিপূর্ণ সিয়াম বলতে, ঐ সিয়ামকে বুঝায় যার মাধ্যমে দুনিয়াবী সকল বিষয়াদির ফিতনা থেকে অন্তর সংযম পালন করে এবং ঐসব চিন্তাভাবনা যা অন্তরকে কুলষিত করে আল্লাহর সাথে দুরত্ব সৃষ্টি করে সেগুলো থেকেও সংযম করে। সিয়ামের গুনাগুণের উপর ভিত্তি করে মহান আল্লাহ্ নির্দিষ্ট পর্যায়ের প্রতিদান বান্দার জন্য বরাদ্দ রেখেছেন। (৫)
যথাযথ সিয়ামের বৈশিষ্ট অনুযায়ী এটা প্রতীয়মান যে, কেউ তাঁর দৃষ্টি অবনত রাখল, নিষিদ্ধ, অপ্রয়োজনীয়, অপচ্ছন্দনীয় ও অনর্থক কথাবার্তা থেকে জবানকে সংযত রাখল এবং সেই সাথে শরীরের বাকী অঙ্গ প্রতঙ্গের হিফাযত করল। ঈমাম বুখারী (রহ) তাঁর সংকলনে একটি হাদিসে এনেছেন, "যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা বলা বা তার ওপর আমল করা ছাড়ল না, আল্লাহ তায়ালার জন্য ওই ব্যক্তির পানাহার বর্জন করার কোনো প্রয়োজন নেই।"(৬)
যথাযথ সিয়ামের আরেকটি বিশিষ্ট হল, এই সিয়াম পালনরত অবস্থায় কেউ রাতের বেলায় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করে না। বরং সে পরিমিত আহার করে। निश्चय আদম সন্তান তাঁর পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না।"(৭)
যদি সে রাতের প্রথমভাগে উদরপূর্তি করে খাবার গ্রহণ করে, তাহলে ইবাদাতের জন্য রাতের বাকী অংশকে সে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে না। প্রকারান্তরে, যদি সে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী সাহরী গ্রহণ করে, তাহলে ইফতারীর আগ পর্যন্ত সময়টিকে ইবাদাতের জন্য সে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে দিতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ আমাদের শরীরের অলসতা ও তন্দ্রাভাব নিয়ে আসে। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের কারণে সিয়ামের আহকাম ও উদ্দেশ্য ঠিকঠাক মত আদায় করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। সিয়ামের যে উদ্দেশ্য, নফসের সংযম করে না খেয়ে থাকার স্বাদ আস্বাদন করা - তা উপলব্ধি করার ফুরসৎ হয়ে উঠেনা।
মুস্তাহাব সিয়ামঃ
বছরের কিছু ফজিলতপূর্ণ দিন আছে যেগুলোতে সিয়াম পালন করা মুস্তাহাব। প্রতি বছরেই এরকম কিছু দিন আছে। যেমন, শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়াম, যা রমাদ্বানের পরের মাসে রাখতে হয়। আরাফাত দিবসের সিয়াম, আশুরা'র সিয়াম, জুলহাজ্জ্ব মাসের দশটি সিয়াম ও মুহাররামের সিয়াম। এ ছাড়াও রয়েছে আইয়ামে বিজ, অথবা মাসের যে কোন তিনদিন সিয়াম এবং সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সাপ্তাহিক সিয়াম।
আর প্রতিদিনের সিয়াম পালনের ব্যাপারে সহিহ মুসলিমে আবু কাতাদাহ মারফত একটি বর্ণনা এসেছে, যেখানে উমার (রাঃ) রাসূলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, যদি কেউ প্রতিদিন সিয়াম পালন করে তাঁর ব্যাপারটি কেমন? রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, সে সিয়াম পালন করেনি, আর না সে সিয়াম ভঙ্গ করেছে, অথবা সে সিয়াম পালন করেনি, সে সিয়াম ভঙ্গ করেনি। "(৮) এই বর্ণনাটি তাদের জন্য যারা লাগাতার সিয়াম পালন করতে চায়, এমনকি সিয়াম পালনের নিষিদ্ধ দিনগুলোতেও।
আরও কিছু নফল সিয়ামের বৈশিষ্টঃ
যাকে বুদ্ধি ও জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাঁর সিয়ামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অবশ্যই জানা থাকতে হবে। অতএব, তাঁর অবশ্যই এমন বোঝা বহন করা উচিৎ যার সামর্থ্য তাঁর আছে। ইবন মাস'উদ (রা) খুব কম সময়ই সিয়াম (নফল) পালন করতেন। তিনি বলতেন, "আমি যখন সিয়াম পালন করি, তখন সলাতে দাঁড়িয়ে দূর্বলতা অনুভব করি। আর আমি সলাতকে (নফল) সিয়ামের উপরে স্থান দেই।"
সাহাবা (রাঃ) আজমাঈনদের অনেকেই সিয়াম পালনরত অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতে দুর্বল হয়ে পড়তেন। এজন্য উনারা কুরআন তিলাওয়াতের ধারা বজায় রাখতে সিয়াম (নফল) কম রাখতেন। প্রত্যেক ব্যক্তিই তা স্ব স্ব অবস্থান থেকে জ্ঞান রাখে, তাঁর করণীয় কি। তদ্বনুযায়ী সে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে।

টিকাঃ
১। এই গুরুত্বপূর্ণ রিসালাহটি ঈমাম মুয়াফফাক উদ্দীন কুদামাহ আল মাকদিসী (রহ) এর মুখতাসার মিনহাজুল ক্বাসিদীন (পৃষ্ঠা ৩৮-৪১) থেকে অনূদিত। ইংরেজী অনুবাদ, ইসমাইল ইবন আল আরকাম
২। বুখারীঃ ৪/১১৮, মুসলিমঃ ১১৫১
৩। সূরা হাজ্জঃ ২৬
৪। বুখারীঃ (৪/৩২২) ও মুসলিমঃ ১১৪৭
৫। অনুবাদকের নোটঃ এখানে আরো কিছু মন্তব্য প্রয়োজন। এই পর্যায়গুলো মূলত সংযমের উপরে ভিত্তি করে কুদামাহ আল মাকদিসী (রহ) ব্যাখ্যা করেছেন। সিয়ামের ক্ষেত্রে সংযমের এই তিনটি পর্যায় পরিপূর্ণ এর হুকুম-আহকাম আদায় করতে হয়। তবে সংযমের এই পর্যায়ের কমবেশী হওয়ার জন্য সিয়াম কাযা করা বা পুনরায় করে দিতে হবে না। কেননা, বান্দা সিয়াম পালন করেছে। আর শেষের পর্যায়গুলো মূলত সিয়ামের গুণাগুণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। যদি দ্বিতীয় পর্যায় হাসিল না হয়, তাহলে তৃতীয় পর্যায়ের সিয়ামের তুলনায় এই সিয়ামের মূল্য বান্দার কাছে কম বলে বিবেচিত হয়। তবে সয়াম হয়ে যায়। এ জন্য বলা হয়ে থাকে, ইচ্ছাকৃত পানাহার ও যৌনাচারে সিয়াম বাতিল হয়ে যায়, তবে অন্যান্য ফাহেশা কাজ যেমন মিথ্যা বলা, নজরের হিফাজত না করা, এগুলোতে সিয়াম বাতিল হয় না, তবে, এতে গুনাহ হয়।
৬। বুখারীঃ ৪/৯৯)
৭। আহমাদ ৪/১৩২; নাসাঈ, আল-কুবরা, ৮/৫০৯; তিরমিযী ২৩৮০; ইবন মাজাহ: ৩৩৪৯। মুস্তাদরাকে হাকিম ৪/১২১। আর যাহাবী তা সমর্থন করেছেন।
৮। সহিহ মুসলিম

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 দুর্ভাগা যারা?

📄 দুর্ভাগা যারা?


একদা রাসূলুল্লাহ মিম্বারে আরোহন করলেন। এরপর তিনি মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে পা রেখে বললেন- "আমীন!"
- এরপর তিনি দ্বিতীয় সিড়িতে পা রেখে বললেন 'আমীন'!
- এরপর তিনি তৃতীয় সিঁড়িতে পা রেখে বললেন ""আমিন!"
এভাবে তিনবার "আমীন" বলা দেখে মিম্বর থেকে নবীজি নামার পর সাহাবাগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার কাছে আজ এমন জিনিস শুনতে পেলাম যা আগে কখনও শুনতে পাইনি।"
তখন তিনি বললেন, "জিব্রীল (আঃ) এসেছিলেন। তিনি বললেন, "ঐ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হউক, যে রমাদ্বান পাওয়া সত্বেও তার গুনাহ মাফ করে নিতে পারেনি!"
আমি তখন বললাম- 'আমীন' অর্থাৎ হে আল্লাহ, কবুল করুন।"
দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখার পর জীব্রিল (আঃ) বললেন, "ঐ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হউক, যার কাছে আপনার নাম উচ্চারিত হয়েছে কিন্তু সে আপনার উপর দরূদ পাঠ করেনি।"
তখন আমি বললাম- 'আমীন, অর্থাৎ হে আল্লাহ, কবুল করুন।"
তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখার পর জিব্রীল (আঃ) বললেন, "ঐই ব্যক্তিও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হোক, যে ব্যক্তি তার বৃদ্ধ মা-বাবা দুইজনকে কিংবা একজনকে পেল, তা সত্ত্বেও তাদের সেবা করে জান্নাত হাসিল করতে পারল না।"
আমি তখন বললাম "আমিন, অর্থাৎ হে আল্লাহ, কবুল করুন। "(১)
প্রিয় ভাইয়েরা! আমরা এই হাদীস থেকে কি জানলাম? রাসূলুল্লাহ রমাদ্বান পেয়েও যারা নিজেদের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না তাদের বিরুদ্ধে জিবরীল (আঃ) এর দুআয় গলা মিলিয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছেন। আল্লাহু আকবর! রমাদ্বান পেয়েও যদি আপনার আর আমার গুনাহ মাফ করিয়ে না নিতে পারি, তাহলে আমার চাইতে দূর্ভাগা আর কেউ রইল না।
রমাদ্বানের প্রতি রাতেই সুমহান রব তার অগণিত বান্দাকে জাহান্নাম থেকে আজাদ করে দেন। আমরা কি সেই দলে নিজেদেরকে শামিল করতে পেরেছি? কখনো কি আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি চেয়েছি? কখনও কি হাত তুলে বলেছি "আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার", কখনও কি বলেছি, "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন আযাবি জাহান্নাম?"
রমাদ্বান মাসে শাইত্বন অনুপস্থিত থাকে। তাঁকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়। শাইত্বন অনুপস্থিত থাকার মাসেও যদি তাওবাহ করে গুনাহ মাফ করিয়ে না নিতে পারি, তাহলে আমার চাইতে অভাগা আর কে আছে এই জগতে? রমাদ্বান যখন চলে যায় তখন আফসোস হবে। রমাদ্বানের প্রতিটি সময় আমার জন্য সোনার হরিনের মত। প্রতিটি মুহুর্ত আমার জন্য অনেক মূল্যবান, দামী। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজের পুরাতন, নতুন, প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য, ছোট বড় সকল গুনাহর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। মহান আল্লাহ্ ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তাঁর ক্ষমার চাইতে আর কোন বড় ক্ষমা নেই। তাঁর রহমতের চাইতে বড় কোন রহমত নেই। তাঁর ভালোবাসার মত ভালো বান্দাকে আর কেউ বাসেনা। এমনকি একজন মা জননীও তাঁর সন্তানকে অতোটা ভালোবাসেন না, যতটুকু না আল্লাহ্ বাসেন।
ফুদাইল বিন ইয়াদ্ব (রহ) একদিন মাসজিদ যাবার পথে দেখলনে এক মহিলা তার সন্তানকে বেদম প্রহার করছে। ছেলেটি মারের চোটে চিৎকার চেঁচামিচি করছে। এক পর্যায়ে তাঁর মায়ের হাত থেকে ছুটে সে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। তার মা রেগেমেগে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল, যেন ফিরে এসে সে আর ঘরে প্রবেশ করতে না পারে।
ফুদাইল বিন ইয়াদ্ব (রহ) যখন মাসজিদ থেকে ফিরছিলেন তখন ছোট্ট ছেলেটিকে দেখলেন কান্নাকাটি শেষে দরজার সামনে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ছেলেটির বুক ভরা আশা, রাগ কমে গেলে তার মা এক সময় দরজা খুলে তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিবেন। ফুদ্ধাইল (রহ) দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলেন। কিছু সময় পর তার মায়ের হৃদয় নরম হলে, সে দরজা খুলে তাঁর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিল।
এ দৃশ্য দেখে ফুদ্ধাইল বিন ইয়াছ (রহঃ) কেঁদে ফেললেন। চোখের পানিতে উনার দাঁড়ি ভিজে গেল। তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,
"সুবহানাল্লাহ! বান্দা যদি ধৈর্য্যধারণ করে আল্লাহর দরজার সামনে আশায় বুক বেঁধে ফিকির জারি রাখে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তার রহমতের দরজা খুলে দিবেন।"(২)
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন,
কয়েকজন বন্দীকে রাসুল এর কাছে নিয়ে এসেছিলাম। বন্দীদের মধ্যে এক মহিলাও ছিল। সে তার সন্তানকে (এদিক-সেদিক) খুঁজছিল। যখন সে তাকে খুঁজে পেল, তখন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দুধপান করাতে লাগল। সন্তানের প্রতি মায়ের এই দরদ দেখে, রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে বললেন, "তোমাদের কি মনে হয়, এই মহিলা কি তার সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে পারবে? আমরা বললাম, "আল্লাহর কসম! এ মহিলা তা করতে পারবে না।"
রাসূল বললেন, এই মহিলা তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়াশীল আল্লাহ তার বান্দার প্রতি তার চাইতে অধিক দয়াশীল”। (৩) [সুবহানাল্লাহ]
অপর এক হাদীসে এসেছে, "আল্লাহ তার রহমতকে একশত ভাগ করেছেন। তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। আর পৃথিবীতে একভাগ অবতীর্ণ করেছেন। ঐ এক ভাগের কারণেই সৃষ্টজগৎ একে অন্যের উপর দয়া করে। এমনকি জন্তু তার বাচ্চার উপর থেকে পা তুলে নেয় এই ভয়ে যে, সে ব্যথা পাবে। "(৪)
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, "নিশ্চয়ই আল্লাহর একশটি রহমত আছে, যার মধ্য হতে একটি মাত্র রহমত তিনি মানব-দানব, পশু ও কীটপতঙ্গের মধ্যে অবতীর্ণ করেছেন। ঐ এক ভাগের কারণেই (সৃষ্টজীব) একে অপরকে মায়া করে, তার কারণেই একে অন্যকে দয়া করে এবং তার কারণেই হিংস্র জন্তুরা তাদের সন্তানকে মায়া করে থাকে। বাকী নিরানব্বইটি আল্লাহ আখেরাতের জন্য রেখে দিয়েছেন, যার দ্বারা তিনি কিয়ামতের দিন আপন বান্দাদের উপর রহম করবেন।"(৫)
কাজেই রবের রহমের ভান্ডার ফুরাবার নয়। সেখানে অফুরন্ত রহমত মজুদ আছে আমার মত পাপী ও জালিমের জন্য। শুধু আমিই কেন যেন আশা হারিয়ে ফেলেছি বোকার মত। ছোট্ট ছেলেটির মত ঘাপটি মেরে তাঁর দরজার সামনে গিয়ে ফিক্কির জারি করতে পারছি না। বলতে পারছি না "ইয়া আল্লাহ! আমি আর পারছি না! আমার মাথার উপরে পাপের পাহাড়, এই বুঝি ভেঙে পড়ল। রমাদ্বানের এই রহমতের হাওয়া আমার গায়েও লাগিয়ে দাও, আমায় তুমি ক্ষমা করো, আমায় কাছে টেনে নিয়ে তোমার রহমতের চাদরে ঢেকে নাও।"
প্রিয় ভাইয়েরা! বিশ্বাস করুন! এই চাওয়াটুকুই বাকী। রমাদ্বান মাসে আপনার এই আন্তরিক চাওয়াটুকু অপার কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারে। অভাগা, দুর্ভাগা ও হতভাগাদের কাতার থেকে সৌভাগ্যবানদের দলে শামিল করতে পারে।
ইন্নাল্লাহা গফুরুর রাহীম।

টিকাঃ
১। সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৪০৯
২। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন বিখ্যাত তাবেয়ী ফুযাইল বিন ইয়ায
৩। সহীহুল বুখারী
৪। সহিহ মুসলিম
৫। তিরমিযী

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 রমাদ্বানের শেষের দশ রাতের আমল

📄 রমাদ্বানের শেষের দশ রাতের আমল


আইশা (রা) বলেন, রমাদ্বানে রাসূলুল্লাহ ঘুমাতেন, জাগতেন এবং সলাত আদায় করতেন। তবে, যখন শেষের দশদিন এসে যেত, তখন তিনি সারারাত জাগতেন, কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন, স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন, মাগরিব ও ইশার মাঝে গোসল করতেন, অতঃপর সাহরির সময় রাতের খাবার খেতেন। (১)
ঈমাম ইবনে জারীর (রহ.) বলেন, রমাদ্বানের শেষ দশ রাতের প্রতি রাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করা মুস্তাহাব। ঈমাম ইব্রাহীম আন-নাখাই (রহ.) রমাদ্বানের শেষ দশরাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করতেন।
হাফিয ইবনু রজব হাম্বলী (রহ.) বলতেন, রমাদ্বানের শেষ দশ রাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করা মুস্তাহাব। তিনি আরো বলতেন, এই দশরাতে শুধু গোসলই নয়, উত্তম পোষাক, আতর লাগানোও জুমুআর দিন ও ঈদের দিনের মত মুস্তাহাব। কেননা এই দশরাতের যে কোন রাতে লাইলাতুল কদর হয়ে যেতে পারে। (২)
ঈমাম ইবনে আবি আসিম (রহ.) বলেন, রাসূল রমাদ্বানের শেষ দশ রাতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করতেন।
আনাস বিন মালিক (রাঃ) রমাদ্বানের ২৪ দিবাগত রাত্রিতে গোসল করতেন, গায়ে সুগন্ধি মাখতেন, সবচেয়ে সুন্দর পোষাক পরিধান করতেন। পরেরদিন সকালে পোষাক খুলে সুন্দর করে ভাঁজ করে তুলে রাখতেন। পরবর্তী রমাদ্বানের ঐ তারিখ না আসা পর্যন্ত তিনি ঐ পোষাক পরিধান করতেন না।
আইয়ুব আস-সাখতাইয়ান্নি (রাঃ) রমাদ্বানের ২৩ ও ২৪ দিবাগত রাত্রিতে গোসল দিতেন। নতুন পোষাক পরতেন। ধূপ জ্বালিয়ে পোষাক সুগন্ধযুক্ত করতেন।
হাম্মাদ ইবনু সালামাহ (রাঃ) বলেন, "ছাবিত বানানী এবং হুমায়েদ আত-তাউহীল উভয়েই লাইলাতুল কদরের তালাশে তাদের সবচেয়ে সুন্দর পোষাক পরিধান করত। সেরা সুগন্ধি মাখত। ধুপ জ্বালাত। মাসজিদে সুগন্ধি ছিটিয়ে দিত।"
সাহাবী তামিম আদ-দারী (রাঃ) ১০০০ হাজার দিরহাম দিয়ে নতুন পোষাক কিনেছিলেন। যে রাতে লাইলাতুল কদরের সম্ভাবনা দেখা দিত তিনি ঐ রাতে পোষাকটি পরিধান করতেন।
ইবনে জারীর (রহ) উপরের সালাফদের এই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, এটা প্রতিষ্ঠিত যে লাইলাতুল কদরের রাত্রিতে গোসল করা, সুন্দর পোষাক পরিধান করা, আতর ও সুগন্ধি মাখা মুস্তাহাব। জুমুআর দিন ও দুই ঈদের দিনের মত সুন্নাহ। (৩)

টিকাঃ
১। ইবন আবী আসিম, ইবন রজব হাম্বলী (৭৯৫ হিজরি), এই হাদিসটিকে হাসান বলেছেন。
২। এই হাদীসের সনদের ব্যাপারে ইবনু রজব (রহ.) মুক্বারিব বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন。
৩। আবু আলিয়াহ ইবন আব্দুল্লাহ, লাতেয়েফ-আল-মা'রিফ থেকে নেওয়া ঘটনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00