📄 রমাদ্বানের প্রথম রাতে
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর নির্দেশনা -
রমাদ্বান মাসের চাঁদ দেখা দিলে উমার (রাঃ) মাগরিব সলাত আদায় করার পর সকলের উদ্দেশ্যে বলতেন,
- তোমরা বসো। নিশ্চয়ই রমাদ্বান মাসের সিয়াম তোমাদের উপর দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর কিয়ামুল লাইল তোমাদের উপর দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়, তবে তোমাদের কেউ যদি তা আদায় করতে সক্ষম হয় তবে তার করা উচিৎ। এটা তোমাদের জন্য অতিরিক্ত আমল যার ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে অবহিত করেছেন। কাজেই যদি কেউ রাতে কিয়ামুল লাইলে দাঁড়াতে না পারে, সে তাঁর বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক।
আর তোমরা এ ধরণের কথা বলা থেকে বিরত থাকো - 'অমুক আর অমুক যদি সিয়াম পালন করে তবে আমিও পালন করব, আর অমুক আর অমুক যদি রাতে সলাত আদায় করে তবে আমিও করব। অতএব, সিয়াম ও কিয়াম শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই করবে। আর তোমরা এও জানো যে, সলাতের পর পরবর্তী সলাতের জন্য অপেক্ষা করা সলাতের মধ্যেই থাকারই নামান্তর।'
তোমরা আল্লাহর ঘরে অনর্থক ও আজগুবি কথা বলা থেকে বিরত থাকো, তোমরা আল্লাহর ঘরে অনর্থক ও আজগুবি কথা বলা থেকে বিরত থাকো, তোমরা আল্লাহর ঘরে অনর্থক ও আজগুবি কথা বলা থেকে বিরত থাকো,
এই মাস আসার আগের কয়েকটি দিন তোমাদের কেউ রোজা রেখো না। এই মাস আসার আগের কয়েকটি দিন তোমাদের কেউ রোজা রেখো না। এই মাস আসার আগের কয়েকটি দিন তোমাদের কেউ রোজা রেখো না।
যতক্ষণ পর্যন্ত চাঁদ দেখা না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সিয়াম শুরু করো না, অতঃপর তা দেখা গেলে ত্রিশদিন পূর্ণ কর। আর পাহাড়ের বুকে আঁধার নেমে না আসা পর্যন্ত তোমার রোজা ভঙ্গ করো না (অর্থ্যাৎ সূর্যাস্ত না হওয়া পর্যন্ত।) (১)
রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু।
টিকাঃ
১। তথ্যসূত্রঃ আব্দুর রাজ্জাক আস-সানা'নী, আল-মুসান্নাফঃ ৭৭৪৮
📄 তিনটি জিনিস হলো
ঈমান
তিনটি জিনিস হলো ঈমান।
১। যখন কোন এক শীতের রাতে কারো নৈশকালীন নির্গমন (স্বপ্নদোষ) হয়, এরপর সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে - তখন শুধু আল্লাহই তাকে দেখতে পায় - অতঃপর সে গোসল করে পবিত্র হয়ে নেয়।
২। তীব্র গরমে যখন কোন বান্দা সিয়াম পালন করে।
৩। জনমানবহীন প্রান্তরে কোন এক বান্দা সলাত আদায় করে, যেখানে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই তাকে দেখতে পায়না।
টিকাঃ
তথ্যসূত্রঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণিত, ঈমাম আল-বায়হাক্বী সংকলিত, শুয়াবুল ঈমান - ৫১
📄 সালাফদের সিয়াম
রমাদ্বান মাসে উসমান (রাঃ) এর দিন কাটত সিয়াম পালন করে আর রাত পার হত সলাত ও সিজদায় পড়ে থেকে। (১) উসমান (রাঃ) যেদিন শহীদ হন সেদিনও তিনি সিয়ামরত অবস্থাতেই ছিলেন। (২)
রমাদ্বানের দিনগুলিতে উনারা আল্লাহর ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন, আজেবাজে কথাবার্তা থেকে মুক্ত থাকতেন।
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলতেন, তুমি যখন রোজা রাখবে তখন তোমার কান, চোখ, ও জিহবাকে অনর্থক কথাবার্তা ও খারাপ কাজকর্ম থেকে মুক্ত রাখবে। শান্ত থাকবে এবং রোজা থাকা অবস্থাকে রোজা না থাকার অবস্থার সাথে গুলিয়ে ফেলবে না। (৩)
সালাফে সলেহীন যেভাবে রমাদ্বানে খারাপ কাজকর্ম থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতেন, একইভাবে বেদ্বীন গুনাহগারদের সুহবত থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতেন। তাদের সাথে মিশতেন না। এমনকি আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রাঃ) এর একটি ঘটনা থেকে জানা যায়, তিনি এক বিয়ের দাওয়াতকে উপেক্ষা করেছিলেন শুধুমাত্র সেখানে শারিয়াহ বহির্ভূত কার্যকলাপ থাকার কারণে। সালাফগণ সকল প্রকার পাপাচার ও বিদআত থেকে মুক্ত থাকতেন। এভাবেই উনারা উনাদের আত্মা পবিত্র রাখতেন, বিশুদ্ধ রাখতেন। দুষ্ট লোকদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও দুনিয়াবী চলাফেরা উনাদের কখনই আকৃষ্ট ও মোহাবিষ্ট করতে পারত না। শুধুমাত্র নেককার লোকদের সুহবত ও সান্নিধ্যে থেকে ঈমান তরতাজা রাখতেন। উনাদের মধ্যে কিঞ্চিত পরিমাণ শারিয়াহ বহির্ভূত কোন বিষয়াদি পরিলক্ষিত হত না। ইফতারের সময় হলে উনারা গরীব দুঃখীদের মাঝে ছুটে চলে যেতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) গরীব দুঃখীদের মাঝে বসে তাদের সাথে ইফতার করতেন। ইফতার গ্রহণের সময় যদি কেউ এসে উনার কাছে এসে খাবার চাইত, তখন তিনি তার নিজের অংশটুকু তাঁকে দিয়ে দিতেন। ইমাম ইবন শিরিন (রহ) বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) ইফতারির সময় মাঝে মাঝে স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে সিয়াম ভঙ্গ করতেন। (৪)
ঈমাম সুয়ূতী (রহ) বলেন, এর মানে হল, ইফতারের সময়ে ইফতারি গ্রহণের আগে স্ত্রী সহবাস করতেন। এরপর মাগরিব সলাত আদায় করতেন। যাতে করে সলাত এবং অন্যান্য ইবাদাত পূর্ণ মনোযোগের সাথে সম্পন্ন করতে পারেন। কাজেই বিবাহিতরা চাইলে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) এর এই সুন্নাহর উপর জীবনে একবার হলেও আমল করতে পারেন। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন মাগরিবের সলাত আদায়ে খুব বেশী দেরি না হয়ে যায়। (৫)
কোন এক সালাফ তার মৃত্যুশয্যায় সিয়াম নিয়ে হৃদয় বিদারক একটি উক্তি করেছিলেন। বিদায় বেলায় তাঁকে কাঁদতে দেখে কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছিল, "আপনি কাঁদছেন কেন?" জবাবে তিনি বলেছিলেন, "কাঁদছি এ জন্য যে, অনেকের মত আমি আর রোজা করতে পারব না, অনেকের মত আল্লাহকে আর স্মরণ করতে পারব না, অনেকের মত আর সলাত আদায় করতে পারব না।"(৬)
টিকাঃ
১। সুনান আল বায়হাক্বীঃ ৪/৩০১
২। আল- হিলিয়াহঃ ১/৫৫
৩। ইবনে আবি শায়িবা, ২/২৪২
৪। আল হায়ছামী, আল মাজমা'আল যাওয়াইদ (৩/১৫৬), উমদাতুল ক্বারী, হাদিসঃ ১৯৫৫, সনদঃ হাসান。
৫। ঈমাম আত-ত্ববারাণী, মু'জাম আল-কাবির (১২/২৬৯) হাদিস নম্বরঃ ১৩০৮০, আল-উইশাহ ফী ফাওয়াইদ আন-নিকাহ
৬। সাইলেন্ট মোমেন্টসঃ দ্য ডেসক্রিপশন অব বিফোর এন্ড আফটার ডেথ আসপেক্টস। দারুস সালাম পাবলিশার্স, রিয়াদঃ২০০৪, পৃষ্ঠাঃ ৫৫
📄 রমাদ্বানে সালাফদের কুরআন তিলাওয়াত
একদিন রাসুল ও সাহাবা আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রাঃ) কে বললেন, "তুমি আমাকে কুরআন শুনাও"।
ইবনু মাস'উদ তখন নবীজি বললেন, "আমি আপনাকে কিভাবে কুরআন শুনাবো, অথচ আপনার উপরেই তো কুরআন নাযিল হয়।"
রাসূলুল্লাহ বললেন, "আমি তোমার নিকট থেকে কুরআন শুনতে ভালোবাসি।"
ইবনু মাস'উদ (রাঃ) অতঃপর সূরা আন-নিসা তিলাওয়াত শুরু করলেন। একচল্লিশ নম্বর আয়াতে পৌঁছালে নবী কারীম বললেন, 'থামো।' নবীজী এর চোখ অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠেছে। দু'চোখ বেয়ে অশ্রুমালা প্রবাহিত হচ্ছে।"(১)
প্রিয় পাঠক! সূরা আন-নিসার ৪১ নম্বর আয়াতে কি ছিল জানেন - যা শুনে রাসুল এর চক্ষু মুবারাক অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠেছিল? সেই আয়াতটিতে ছিলো
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
“সেদিন কেমন হবে, যেদিন আমরা প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী (নবী) আনবো এবং তোমাকে সকলের উপরে সাক্ষী বানাবো?”(২)
উক্ত ঘটনার ব্যাপারে হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, "উম্মতের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার উপর সাক্ষ্যদান ও তাদের উপর আযাবের কথা চিন্তা করে সেদিন নবীজি কেঁদে ফেলেছিলেন।"(৩)
ইবনুল বাত্ত্বাল (রহ.) বলেন, "এ আয়াত তিলোওয়াত শোনার সময় রাসূল এর সামনে কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য ভেসে উঠেছিল, এজন্য তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।"
অথচ আমরা কতবার কুরআন তিলাওয়াত শুনি, নিজেরাও তিলাওয়াত করি, কিন্তু আমাদের অন্তরে তার তাছির হয়না। আমাদের অন্তর কাঁদে না। কিয়ামতের বর্ণনা, হাশরের বর্ণনা, জাহান্নামের বর্ণনা শুনেও আমাদের কোন টেনশান হয়না। আমরা নির্বিকার, ভাবলেশহীন থাকি।
মহান আল্লাহ রমাদ্বান মাসে সালাফদের মত আমাদেরকে বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াতের, বোঝার ও তদ্বনুযায়ী আমল করার তাওফীক দিন।
সালাফদের জীবনচরিত নিয়ে গবেষণা করলে অবাক করা সব বিষয়াদি বের হয়ে আসে। কুরআনের প্রতি উনাদের ভালোবাসা ছিল অনেক বেশী। কুরআনকে উনারা শিশুবাচ্চার মত সবসময় বুকে আগলে ধরে রাখতেন।
আল আস-ওয়াদ (রহ) রমাদ্বানের প্রতি দুই রাতে কুরআন খতম করতেন। মাগরিব ও ইশা সলাতের মাঝের সময়টুকু তিনি ঘুমাতেন। রমাদ্বানের বাইরে অন্যান্য মাসে প্রতি ছয়রাতে একবার করে তিনি কুরআন খতম করতেন। (৪)
ক্বাতাদাহ (রহ) অন্যান্য মাসে সাত দিনে কুরআন খতম করতেন। আর রমাদ্বান মাসে তিনদিনে খতম করতেন। আর রমাদ্বানের শেষ দশ দিনে প্রতি রাতে একবার করে কুরআন খতম করতেন। (৫)
মুজাহিদ (রহ) রমাদ্বানের প্রতি রাতে একবার করে কুরআন খতম করতেন। (৬)
মুজাহিদ (রহ) বলেন, "আলি আল-আযাদী রমাদ্বানের প্রতি রাতে কুরআন খতম করতেন। "(৭)
আর রাবিয়ী ইবনু সুলাইমান (রহ) বলেন, "ঈমাম আশ-শাফেঈ (রহ) রমদ্বান মাসে ষাটবার কুরআন খতম করতেন। একবার দিনের বেলায়, আর আরেকবার রাতের বেলায়।"(৮)
আল-ক্বাসিম ইবনুল হাফিজ ইবন আসাকীর (রহ) বলেন, আমার আব্বা জামাআতে সলাত আদায় করতেন ও নিয়মিত সলাত আদায় করতেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে একবার করে কুরআন খতম করতেন, আর রমাদ্বানে প্রতিদিন একবার করে খতম করতেন। (৯)
কুরআন কয়দিনে খতম করা উচিৎ, এ ব্যাপারে ঈমাম নববী (রহ) কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,
"সর্বজনগৃহীত মত হল, এটা বিভিন্ন জনের জন্য বিভিন্ন রকমের। যে কুরআন তিলাওয়াতের সময় বুঝে বুঝে পড়তে চায়, তাহলে পড়ার গতি কমিয়ে যতটুকু পারুক বুঝে বুঝে এগিয়ে যাক। আবার যে ইলম বিতরণের কাজে ব্যস্ত থাকে বা দ্বীনের বিভিন্ন দাওয়াতী কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে, অথবা মুসলিমজাতির স্বার্থে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকে, তাহলে তাঁর ওপরে অর্পিত দায়িত্ব ও কাজকে অবজ্ঞা না করে যতটুকু পারুক তিলাওয়াত করবে। আর যদি সে এগুলোর কোনটিতেই সম্পৃক্ত না থাকে তাহলে তাঁর উচিৎ একঘেয়েমী না আসা পর্যন্ত বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াত করা।"(১০)
টিকাঃ
১। সহিহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৫৮২, সহিহ মুসলিম, হা: নং: ৮০০
২। সূরা আন-নিসা, আয়াত:৪১
৩। ফাতহুল বারী: ৯/৯১
৪। আবু নু'ইয়াইম, হিলিয়াতুল আল-আউলিয়াঃ ১-২৫০
৫। আস-সিয়ার (৫/২৭৬)
৬। আত-তিব্বে নববী (পৃষ্ঠাঃ ৭৪), সনদ সহীহ।
৭। তাহযীবুল কামাল (২/৯৮৩)
৮। আস-সিয়ার, (১০/৩৬)
৯। আস-সিয়ার (২০/৩৬)
১০। আত-তিব্বিয়ান, পৃষ্ঠাঃ ৭৬