📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 সালাফদের শেষ দশক

📄 সালাফদের শেষ দশক


রমাদ্বান মাসের শেষ দশক মূলত ঐ দশক যাতে লাইলাতুল কদর রয়েছে। লাইলাতুল কদরের এক রাতের ইবাদত হাজার রাত ইবাদত করার চেয়েও বেশি ফজিলتপূর্ণ। যাতে মাগরিব থেকে নিয়ে ফজর পর্যন্ত শান্তি বর্ষণ হতে থাকে।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত, নবীজি ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কদরের রাত্রিতে ইমান ও সাওয়াবের আশায় দন্ডায়মান হবে তার পিছনের সকল গুনাহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (৭৪)
ইমাম শা'বি (রহ) লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে বলেন, "আমি এর দিনেও তেমনই ইবাদত করার চেষ্টা ও মেহনত করতে পছন্দ করি যেমন এর রাতগুলোতে করি। "(৭৫)
কোন কোন সালাফ লাইলাতুল কদরের আগমনকে এভাবে স্বাগতম জানাতেন যেভাবে সম্মানিত কোন মেহমানকে স্বাগতম জানানো হয়। কদরের রাতকে সামনে রেখে উনারা আত্মিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার পাশাপাশি শারীরিকভাবেও প্রস্তুত হওয়াকে পছন্দ করতেন।
ইবনু জারির (রহ) রমাদ্বানুল মুবারকের শেষ রাত্রিগুলোর প্রতি রাতেই গোসল করতেন। ইমাম নাখয়ি (রহ) শেষ দশকের প্রতি রাতেই গোসল করতেন। সালাফদের কেউ কেউ সে রাতে গোসল করে নিতেন যে রাত তাদের নিকট লাইলাতুল কদর হওয়ার বেশি সম্ভাব্য মনে হত। (৭৬)
সাবিত আল বুনানি (রহ) বলেন, সাহাবী তামিম আদ-দারি (রাঃ) এর কাছে এক অলংকার ছিল। তিনি এক হাজার দিরহাম দিয়ে সেটি ক্রয় করেছিলেন। যে দিন তার কাছে মনে হত আজ লাইলাতুল কদরের রাত, সেদিনি তিনি অলংকারটি পড়ে ইবাদাতে মশগুল হতেন। (৭৭)
হাবিব ইবন আবি মুহাম্মাদ (রহ) এবং তার স্ত্রী, উনারা দুজনেই আল্লাহ্ওয়ালা ও দুনিয়াবিমূখ ছিলেন। যখন রমাদ্বানের শেষ দশকে পৌঁছে যেতেন তিনি তখন তার স্ত্রী তাকে বলতেন, "রাত বিগত হল, অথচ আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ, পাথেয় খুবই কম। সালাফ-আস-সালিহীনদের কাফেলা আমাদের আগে চলে গেছে, আর আমরা এখনও পিছনে পড়ে আছি। (৭৮)
আহ! আজকাল এমন স্ত্রী কোথায়, যারা তাদের স্বামীদেরকে ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিবে। যারা স্বামীকে মনে করিয়ে দিবে, আখিরাতের দীর্ঘ ও অফুরন্ত জীবনের জন্য এই দুনিয়া থেকেই পাথেয় জমাতে হবে। হায়! যদি আজকালকার মহিলাদের অন্তরে এই অনুভূতি জাগ্রত হত, আর নবীজি এর ঐ দুআ অর্জনকারিণী হয়ে যেত -
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন,
আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর রহম করুন যে ব্যক্তি রাতে উঠে নফল আদায় করে, অতঃপর তার স্ত্রীকে জাগায় আর সেও নফল আদায় করে। আর স্ত্রী উঠতে আলসেমি করলে তাকে পানির ছিটা দিয়ে জাগায়। আল্লাহ রহম করুন ঐ মহিলার উপর যে মহিলা রাতে উঠে নফল আদায় করে এবং তার স্বামীকে জাগায় আর সেও নফল আদায় করে। আর যদি সে উঠতে অলসতা করে তাহলে সে তাকে পানির ছিটা দিয়ে জাগিয়ে দেয়। (৭৯)
সালাফ আস-সালিহীনগণ রমাদ্বান মাসে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে ইবাদত-বন্দেগী, তিলাওয়াত, কিয়ামুল-লাইল এবং দান খয়রাত করতেন। এতদসত্ত্বেও আশা ও ভয়ের মাঝে থাকতেন যে, তাদের আমল রব্বুল আ'লামিনের দরবারে কবুল হবে কিনা? উনারা জানতেন প্রত্যেক আমলের কবুলিয়‍্যাত নির্ভর করে ইখলাসের বা আন্তরিকতার উপর। আর ইখলাস এমনই এক অমূল্য, সুক্ষ্ম এবং দুষ্প্রাপ্য সম্পদ যাকে অর্জন করার জন্য সালাফগণ যারপরনাই চেষ্টা ও মেহনত করতেন। তবুও তাদের নিকট তা সামান্যই মনে হত।
কেননা বান্দার বড় বড় আমলও সামান্যতম রিয়া বা লৌকিকতা এবং গোপন তাকাব্বুর বা অহংকারের কারণে একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। এ কারণেই আমাদের সালাফগণ এত আমল করেও আল্লাহ তা'য়ালার সামনে হাজির হওয়ার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকতেন।
রমাদ্বান মাস যখন শেষ দিনগুলোর দিকে চলে যেত, তখন সালাফগণ আফসোস করতেন। দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে অনুশোচনা করেতেন এই জন্য যে, গুনাহ মাফের মাসে যেসব আমল করা দরকার ছিল, তার কিছুই করা হয়ে উঠেনি। জানা নেই, আগামীতে এই মূল্যবান মাসটি নসিব হবে কিনা?
আবু কিলাবাহ (রহ) রমাদ্বানের শেষ দিনগুলোতে তার সুন্দরী দাসীদেরকে এই আশায় আজাদ করে দিতেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আ'লামিন তার এই আমলের কারণে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবেন। (৮০)
আমাদের সালাফগণ তাদের অন্তর্চক্ষু দিয়ে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত জাহান্নামের ভয়ানক দৃশ্য দেখতে পেতেন। এটা ছিল তাদের মজবুত ঈমানের পরিচয়। উনারা এটিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, জান্নাতের ঐ অসাধারণ ও অতুলনীয় দৃশ্য দেখার জন্য ভঙ্গুর দুনিয়ার তুচ্ছ স্বাদগুলোকে বাদ দিতে হবে। উনারা এসব থেকে দূরেও থাকতেন। আমাদের সালাফগণ জানতেন, জাহান্নামকে তার চতুর্দিক থেকে খাহেশাত ও দুনিয়াবি রঙ্গতামাশা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। দুনিয়ার এই সব রঙ্গতামাশা বান্দাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যায়। অভিশপ্ত শাইত্বন দুনিয়ার জীবনকে ছলনার খোলসে আবৃত করে দেখানোর চেষ্টা করে। অথচ বাস্তবতা হল, এই ছলনার ফাঁদে পা দিয়ে নফস ও শাইত্বনের অনুসরণ করে বান্দার ঠিকানা হ্য উত্তপ্ত জাহান্নামের আগুনে। সালাফগণ কুরআনের এই শিক্ষাকে বুকে লালন করে দুনিয়াবী সকল চাকচিক্য থেকে নিজেদেরকে দূরে রেখেছিলেন।
আমাদের সালাফগণ কুরআন ও হাদিসে জান্নাতের অপূর্ব দৃশ্যসমূহ অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে পেতেন। উনারা জানতেন, জান্নাতের উঁচু উঁচু প্রাসাদ, বালাখানা, মহল, আনতনয়না পবিত্র হুরগণ, দুধ-শরাবের ঝর্ণা সুস্বাদু ফলফলাদি, আর সবচাইতে বড় নিয়ামত রব্বে কারীমের স্বাক্ষাৎ- এগুলো শুধুমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ-নিষেধ মানার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। এজন্যই উনাদের এত দৌঁড়ঝাপ। নিজেদের আমল আরশের মালিকের কাছে পছন্দ হল কি না তাঁর জন্য তাদের এত চেষ্টা তদবির। মনে একটাই আশা আল্লাহকে খুশি করতে পারলে জান্নাতে তাদের অবস্থান পাকা।
আলী ইবন আবি তালিব (রাঃ) রমাদ্বানের শেষ রাতে আওয়াজ দিয়ে বলতেন, “সে কোথায় আছে, যার আমলগুলো কবুল হয়েছে। আমরা তাকে মুবারকবাদ জানাবো। সে কোথায় আছে যে রমাদ্বানের বরকত থেকে মাহরুম রয়ে গেছে। আমরা তাকে সান্তনা দিব। (৮১)
আলী (রাঃ) বোঝাতে চাইতেন, যখন আমার জানা নেই যে রমাদ্বানে আমার কৃত আমলগুলো কবুল হয়েছে কি না - তাহলে কীসের এত খুশি? কোন সে জ্ঞান আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে? কোন সে জ্ঞান আমাকে জান্নাত হাসিল করেছি বলে জানিয়েছে? আল্লাহর সামনে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত কে আমাকে জানাবে এসব।
কোন কোন সালাফ ঈদের দিনেও বিষণ্ণ থাকতেন। এই খুশির দিনেও চিন্তিত কেন জিজ্ঞেস করা হলে, উনারা বলতেন-
"আপনি সত্য বলেছেন, তবে আমিতো স্রেফ গোলাম আর আমাকে আমার মালিক আদেশ দিয়েছেন যেন আমি তার ইবাদত করি। আমি জানি না যে, তিনি আমার আমলগুলো কবুল করে নিয়েছেন কিনা?”(৮২)
জনাব উহাইব বিন ওয়ারদ (রহ) একদল লোককে ইদের দিন বেশ হাসাহাসি করতে দেখে ব্যথিত হৃদয়ে বললেন, "যদি তাদের রোজা কবুল হয়ে থাকে, তাহলে শুকরিয়া আদায়কারীদের পদ্ধতি এরকম নয়, আর যদি তাদের রোজা কবুল না হয়ে থাকে, তাহলে পেরেশানী প্রকাশের রীতিনীতি বা আচরণ এরকম নয়।" (৮৩)

টিকাঃ
৭৪। বুখারি: ১৯০১
৭৫। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৮৮
৭৬। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৬৯
৭৭। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৬৯
৭৮। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৬৫
৭৯। আবু দাউদ: ১৩০৮, নাসায়ি: ৩/২০৫
৮০। লাতায়েফুল মাআরেফ: ৩০০
৮১। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৯৮
৮২। লাতায়েফুল মাআরেফ
৮৩। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৯৪

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


রমাদ্বানুল মুবারকের গুরুত্ব বুঝে সালাফ আস-সালিহীনদের তরিকা ও পদ্ধতি অনুযায়ী চলা আমাদের প্রয়োজন ও মেহনতের মূল লক্ষ্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও পরহেযগারীর ক্ষেত্রে আমাদের সালাফ আস-সালিহীনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করার তাওফিক দিন। তারাই তো ঐ কাফেলার পথিক যাদের ব্যাপারে আমরা প্রতি ওয়াক্তে সলাতে দাঁড়িয়ে দুআ করি,
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ - صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
"আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নিয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।"
আমিন।

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 রমাদ্বান কড়া নাড়ে

📄 রমাদ্বান কড়া নাড়ে


আলহামদুলিল্লাহ, রমাদ্বান মাস দরজায় কড়া নাড়ছে। এ মাসে আমরা পুরো উদ্যমে সলাত আদায় করব, কুরআন তিলাওয়াত করব, বেশী বেশী দান সদাক্বা করব, কোমর বেঁধে সিয়াম পালন করব, লাইলাতুল কদরের তালাশ করব, সাহরী ও ইফতার করব, ইতিকাফ করব, চোখের পানি ফেলে দুআ ও ইস্তিগফার করব। কতশত প্রস্তুতি হাতে নিয়েছি আমরা ই বি-ইযনিল্লাহি তায়ালা। কিন্তু, একটি গুরুত্বপূর্ণ আমলের ব্যাপারে আমরা বরাবরের মতই উদাসীন থাকব। আর সেটা হচ্ছে, যাদের সাথে আমাদের মনমালিন্য হয়েছে, আমরা তাদের সাথে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলব না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বেরাদার, বন্ধুবান্ধব, কলিগ, সহপাঠীদের সাথে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কগুলো জোড়া লাগাবো না। এগুলো অমিমাংসিত রেখেই রমাদ্বান শুরু করব। শাইত্বনের ধোঁকায় পড়ে হয়ত কোন এক কারণে পরিচিতজনদের সাথে আমাদের মনমালিন্য হয়েছিল, কোন এক কারণে তাঁদের সাথে ঝগড়া হয়েছিল কিন্তু সেই ভারী বোঝা এখনও বহন করে চলছি নিজের অজান্তে। যা কখনই ঠিক হচ্ছে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ একদা তার সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমি কী তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দিবো না যা সলাত, সিয়াম এবং সদাক্বার চাইতে উত্তম? উত্তর এলো, "হ্যাঁ।" তিনি তখন বললেন, إصلاح ذاتِ الْبَيْنِ "মানুষের মধ্যে মিমাংসা করে দেওয়া"।
আল্লাহ তায়ালার দরবারে আমাদের তওবাহ ও দুআ কবুল না হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটিও একটি কারণ – এক মুসলিমের সাথে আরেক মুসলিমের কলহের জের। একজনের সাথে আরেকজনের অমিমাংসিত হিসাব কিতাব। অনেক দিন ধরে জিইয়ে রাখা রাগ, ক্ষোভ, হিংসা, বিদ্বেষ। এগুলোর কারণে আল্লাহর দরবারে আমাদের তাওবাহ ও দুআ কবুল হয় না।
অপর এক হাদীসে রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন,
"মানুষের আমলনামা প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, অতঃপর আল্লাহ সকল মুসলিমকে ক্ষমা করে দেন, তারা ব্যতীত যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে, আর দুই ব্যক্তি যারা নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়। আরো বলা হয়েছে, যতক্ষণ না তারা নিজেদের মধ্যে মিমাংসা করে নেয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করা হয় না। (২৯)
কাজেই, আমরা যা জলঘোলা করার ছিল, তা করে ফেলেছি। দিনে দিনে অনেক দিন হয়েছে। কালে কালে অনেক কাল হয়েছে। এবার দীল নরম করার পালা। ঠান্ডা মাথায় নিজের আসল লাভ ক্ষতি নিয়ে চিন্তা করার পালা। আমাদের সামনে এমন একটি মাস আসতে যাচ্ছে, যখন আমরা পাগলের মত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকব, কবরের আযাব থেকে মাফ চাইতে থাকব, জান্নাত চাইতে থাকব, জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাইব, কিন্তু আমাদের সকল দু'আই আল্লাহ্ ফিরিয়ে দিবেন শুধুমাত্র এই একটি কারণে। আর তা হল, মুসলিম ভাইবোনদের সাথে বিবাদ মিটমাট না করা। প্রিয় ভাই, আমাকে বলুন, তুচ্ছ এই দুনিয়াবী অহংকার, রাগ ও জিদের কারণে আল্লাহর রহম থেকে কে বঞ্চিত হতে চায়?
ভাই, বলি শুনুন, কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে যদি আপনার এরকম কোন ঝামেলা থেকে থাকে, তাহলে তার সাথে আজকেই এসব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলুন। মনমালিন্য, রাগারাগি, ঝগড়াঝাটি প্রলম্বিত না করে আজকেই এর একটি সুরাহা করুন। এই চোরাবালির ফাঁদে নিজের আমল হারিয়ে ফেলবেন না। আপনার নিজের এরকম কোন ঝামেলা না থাকলে, পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে থাকলে আজকেই তা মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। ধরুন -
- পিতা ও পুত্রের মধ্যে,
- স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে,
- ভাইদের ও বোনদের মধ্যে,
- ব্যবসায়ীক পার্টনারদের মধ্যে,
- মাসজিদ কমিটির সদস্যদের মধ্যে,
- অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে
দেরী না করে মিমাংসা করে ফেলুন, মিটমাট করিয়ে দিন, যাতে করে আপনাদের মধ্যে এরকম কোন ঝামেলা আর না থাকে। বিশ্বাস করুন, আপনার এক কদম এগিয়ে আসার কারণে মহান আল্লাহ্ আপনার জন্য উত্তম প্রতিদানের ব্যবস্থা করবেন। এই আমলের মাধ্যমে আপনি জান্নাত হাসিল করতে পারবেন বি-ইযনিল্লাহি তায়ালা।
রমাদ্বান কড়া নাড়ছে। যার সাথে আপনার ঝামেলা হয়েছে তাঁর দরজায় কড়া নাড়ুন। তাঁর সামনে গিয়ে হাসিমুখে লম্বা একটা সালাম দিয়ে তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিন। দেখা করা সম্ভব না হলে মোবাইল ফোনটি হাতে তুলে নিন। তার সাথে এক মিনিট কথা বলুন। নরম ভাষায় তাঁর কাছে ক্ষমা চান। দেখবেন বরফ গলে যাবে। অথবা ধরুন দোষ তাঁরই, তবুও তাঁর সাথে কথা বলে মিটমাট করে ফেলুন। বরফ ভেঙে ফেলুন।
আল্লাহর রহমত হাসিল করুন। বারাকাল্লাহু ফীক।

টিকাঃ
১। মুসনাদে আহমদ, আবু দারদা (রাঃ) এর বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত
২। সহিহ মুসলিম, আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণিত বিশুদ্ধ সূত্রে

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 রমাদ্বান আসার আগে

📄 রমাদ্বান আসার আগে


রমাদ্বানের মূল উদ্দেশ্য কি শুধু বাজার করা? খাওয়া দাওয়া? আমাদের এই বাজারকেন্দ্রিক ব্যস্ততা আর গৃহস্থালীর কেতাদুরস্ততা আমাদেরকে রমাদ্বানের প্রকৃত প্রস্তুতি থেকে দূরে রাখছে না তো? শুধু কি উদরপূর্তিই রমাদ্বানের মূল উদ্দেশ্য?
না, একদম না। রমাদ্বানের মূল উদ্দেশ্য এসব না। বরং নবী করিম ﷺ রজব ও শাবান মাস থেকেই রমাদ্বানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। আত্মিক ও শারীরিক প্রস্তুতি নিতেন। রমাদ্বান আসার পূর্বমূহুর্তে সালাফগণও একইভাবে প্রস্তুতি নিতেন। আমরাও ঠিক একইভাবে নিজেদেরকে ঢেলে সাজাতে পারি। এজন্য রমাদ্বানের আসল উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিম্নলিখিত দশটি প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি বি-ইযনিল্লাহি তায়ালা -
১। আন্তরিক তাওবাহঃ তাওবাহ সবসময়কার জন্য। নবীজি ﷺ দিনে সত্তরবারের অধিক তাওবাহ করতেন। আমাদেরও বেশী বেশী তাওবাহ করা উচিৎ। রামাদ্বান আসার আগে নিজের কৃত গুনাহের জন্য বেশী বেশী তাওবাহ ও ইস্তিগফার করা, রমাদ্বানে একদম পুতঃপবিত্র আর প্রশান্ত আত্মা নিয়ে রহমত হাসিলের উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল হওয়া। বেলা শেষে এসবই মূখ্য।
মহান আল্লাহ্ বলেন, أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবাহ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।”(১)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ কর; কেননা আমি আল্লাহর কাছে দৈনিক একশতবার তাওবাহ করে থাকি।”(২)
২। দুআঃ সালাফদের কেউ কেউ রমাদ্বান আসার ছয়মাস আগে থেকেই দুআ করতেন। আল্লাহর কাছে কাঁদতেন যেন তিনি তাঁদেরকে রমাদ্বান পর্যন্ত জীবিত রাখেন। প্রতিটি মুসলিমের উচিৎ বেশী বেশী দুআ করা যেন মহান আল্লাহ্ তাঁদেরকে রমাদ্বান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। সুস্থ শরীরে আর দৃঢ় প্রত্যয়ে পুরোটা রমাদ্বান ইবাদাত বন্দেগীতে কাটানোর সামর্থ্য যেন তিনি দেন, আর প্রতিটি আমল কবুল যেন তিনি করে নেন, আমিন।
৩। প্রফুল্ল চিত্তঃ রমাদ্বানকে কখনই বোঝা মনে না করা বরং এই নিয়ামতকে রহমান আল্লাহর তরফ থেকে উপহার বা বিশেষ নিয়ামত মনে করা। সারাটি মাস জুড়ে জান্নাতের দরজা খুলে রাখা হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে রাখা হয়- এই উম্মতের জন্য এটা কতটা নিয়ামতের, কতটা সম্মানের, তা বেশী বেশী অনুধাবন করা। রমাদ্বান কুরআন নাযিলের মাস। রমাদান ক্ষমার মাস। রহমতের মাস। নাজাতের মাস। তাকওয়া অর্জনের মাস। নিজেকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার মাস। এ জন্য আল্লাহর দয়া ও মেহেরবানীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা আমাদের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। কখনই এ মাসটিকে অবহেলা, অবজ্ঞা ও হেলায়ফেলায় কাটিয়ে দেওয়া উচিৎ নয়।
মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ
"বল, আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই (ইসলাম ও কুরআনের) প্রতি তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা সঞ্চয় করেছ।"(৩)
৪। বিগত বছরের ক্বাযা সিয়াম পালনঃ রমাদ্বান আসার আগে, শাবান মাসে আগের ক্বাযা সিয়ামগুলো করে ফেলা। আম্মাজান আয়িশা (রাঃ) আগের বছরের ক্বাযা সিয়ামগুলো শাবান মাস ছাড়া করতে পারতেন না। (৪) হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, মা আয়িশা (রাঃ) শাবান মাসে বিগত ক্বাযা রোজা করার গুরুত্ব এ জন্যই বুঝিয়েছেন যেন তা, রমাদ্বান পর্যন্ত তা প্রলম্বিত না হয়। (৫)
৫। রমাদ্বানের বিভিন্ন মাসলা-মাসায়েল সম্পর্কে জানা। রমাদ্বানের গুরুত্ব অনুধাবন করা।
৬। দুনিয়াবী যতরকমের ব্যস্ততা আছে তা রমাদ্বান মাস আসার আগে আগেই শেষ করে ফেলা। রমাদ্বান মাস একনিষ্ঠ হয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদাতে সচেষ্ট থাকা।
৭। পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে মাশোয়ারা করা। ছোট ছোট মজলিস করা। রমাদ্বানের আহকাম, বিধিবিধান, গুরুত্ব, ফজিলত ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা। পরিবারের ছোটদের সিয়াম পালনে উৎসাহিত করা।
৮। ইসলামিক কিতাবাদি সংগ্রহ করা, নিজে পড়া, মাসজিদের ঈমামদের মাঝে বিতরণ করা যেন, সেখান থেকে উনারা খুতবা বা তাফসীর মাহফিলে সবাইকে নসিহত করতে পারেন।
৯। শাবান মাসে বেশী বেশী সিয়াম পালন করে শারীরিক আর মানুষিকভাবে নিজেকে রমাদ্বানের একদম ফিট করে তোলা।
১০। আল কুরআনঃ সালামাহ ইবনে কুহাঈল (রা:) বলেন, শাবান হলো কুরআন তিলাওয়াতকারীদের মাস। শাবান শুরু হলেই আমর ইবনে কায়েস (রা:) তার দোকান বন্ধ করে দিতেন আর কুরআন তিলোওয়াতের জন্য সময় বের করে নিতেন। (৬)
আবু বকর আল-বাল্কি (রহঃ) খুব চমৎকার উক্তি করেছেন। তিনি বলেন, রজব হলো বীজ বপনের মাস, শাবান হলো সেচের মাস আর রমাদ্বান হলো ফসল কর্তনের মাস। তিনি আরো বলেন, রজব মাস হলো বাতাস বওয়ার মাস, শাবান হলো সেই বাতাসে মেঘের ঘনঘটার মাস আর রামাদ্বান হলো বৃষ্টি নামার মাস। (৭)
যদি কেউ রজবে বীজ না বপে তাহলে কোথায় সে পানি সেচ দিবে আর কিভাবেই বা তার ফসল পাকবে?

টিকাঃ
১। আন-নুর আয়াতঃ৩১
২। সহীহ মুসলিম - ৬৬১৩
৩। সূরা ইউনুস, আয়াতঃ৫৮
৪। বুখারীঃ১৮৪৯ ও মুসলিমঃ ১১৪৬
৫। বুখারীর হাদিসের ব্যাখ্যায় তাঁর ফাতহুল বারীতে উল্লেখ করেন。
৬। লাতাইফ-আল-মা'রিফ, ইবনু রজব (রহ)
৭। লাতাইফ-আল-মা'রিফ, পৃষ্ঠাঃ ২১৮, আল-মাক্তাবতুল ইসলাম সংস্করণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00