📄 অপেক্ষার প্রহর
সাহাবায়ে কিরাম এবং সালাফে সালিহিনগণ রমাদ্বানের গুরুত্ব ও ফজিলত পুরোপুরি মনে প্রাণে ধারণ করতেন। সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইতেন না। কুরআনুল কারিম ও নবীজি এর হাদিসগুলোকে উনারা শুনতেন, বারবার পড়তেন। সাহাবায় আজমাইন (রাঃ) তো কাজেকর্মে রিসালাতের যুগে রমাদ্বানের আলোকিত রাতগুলো এবং আলোকিত ভোরগুলোকে নিজ চোখে দেখছেন।
আমাদের আসলাফগণ মাগফিরাতের এই মাসের ঠিক সেইভাবে অপেক্ষা করতেন যেভাবে একজন নববধূ তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কোন কোন আসলাফ রমাদ্বান আসার ছয়মাস আগে থেকেই দুআ করতেন, আল্লাহ তায়ালা যেন তাদেরকে রমাদ্বান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন। আবার রমাদ্বান চলে যাবার পর দুআ করেতেন, আল্লাহ তায়ালা যেন রমাদ্বানে কৃত আমলগুলোকে কবুল করে নেন। (২১)
আসলাফগণ অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন এবং তাবে-তাবেইনগণ পুরো বৎসরই রমাদ্বানের রহমত ও বরকত দ্বারা ফায়দা হাসিল করতে এতটাই মরিয়া ছিলেন। কখনও তারা রমাদ্বানের আগমনের কারণে খুশিমনে এর আদব বজায় রেখে, সম্মানের সাথে এর তাকাযা পূরণ করতেন আবার কখনও রমাদ্বান চলে যাওয়ার কারণে কৃত আমল ও সুলুক থেকে আহরিত সুবাসগুলোকে স্থিতিশীল ও অব্যাহত রাখার চেষ্টায় রত থাকতেন। রমাদ্বানের শিক্ষাই তো এটা। নিজেকে পরিশুদ্ধি এবং তাঁর উপরেই অটল থাকা।
সম্মানিত সালাফগণ নবী এর অনুসরণ ও অনুকরণের মাঝেই আসল মজা পেতেন। নবীজি নিজেও রজব ও শাবান মাসে রমাদ্বান মাসের অপেক্ষায় মগ্ন হয়ে যেতেন। রমাদ্বান মুবারকের সুক্ষ্মতা ও তার অবস্থাকে অনুভব করার জন্য প্রায় পুরো শাবান মাস রোজা রেখে কাটিয়ে দিতেন।
উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) রাসূল কে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে শাবান মাসে যে পরিমান সিয়াম পালন করতে দেখি অন্য মাসে তা দেখি না। এর কারণ কী? তিনি বললেন,
"রজব এবং রামাদ্বানের মধ্যবর্তী এ মাসটি সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে অথচ এটি এতো গুরুত্বপূর্ণ মাস যে, এ মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে মানুষের আমলসমূহ উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি চাই সিয়াম অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক। (২২)
আম্মাজান হযরত আ'ইশা সিদ্দিকা (রাঃ) শাবানে রাসুলুল্লাহ এর আমলের ব্যাপারে বলেন,
"রাসুলুল্লাহ এর নিকট সিয়াম পালনের জন্য শাবান মাস অন্য মাসের তুলনায় বেশি প্রিয় ছিল। অতঃপর তিনি এই মাসে এতো সিয়াম পালন করতে যে, এটিকে রমাদ্বানে সাথে মিলিয়ে দিতেন। (২০)
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আ'ইশা (রাঃ) বলেন, রাসূল যখন (নফল) সিয়াম রাখতে শুরু করতেন তখন আমরা বলতাম, তিনি সিয়াম রাখা আর বাদ দিবেন না। আবার যখন সিয়াম বাদ দিতেন তখন আমরা বলতাম, তিনি আর সিয়াম করবেন না। তবে তাঁকে রমাদ্বান ছাড়া পরিপূর্ণভাবে অন্য কোন মাসে সিয়াম রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোন মাসে এত বেশি সিয়াম রাখতে দেখিনি। "(২৪)
তবে উম্মতের জন্য নবীজি এর দয়া ও করুণা ছিল বিধায়, শাবান মাসের শেষের দিকে তিনি বিরতি দিতেন। অর্থ্যাৎ শাবানের প্রথমদিকে সিয়াম পালন করতেন আর শেষের দিকে ছেড়ে দিতেন। অন্যথায় সালাফে সালিহিন এবং সাধারণ মুসলমান শাবানকে রমাদ্বান বানিয়ে ফেলতেন।
অতঃপর রমাদ্বানুল মুবারকের আগমনে এতটাই খুশি ও আমেজ ছড়িয়ে পড়ত যে, চাঁদ দেখার জন্য সাহাবায়ে কিরাম ও সালাফে সালিহিনগণ পাহাড়ের দিকে ছুটে দৌঁড়াতেন। খোলা ময়দানেও চাঁদ দেখার জন্য একত্রিত হতেন। চাঁদ দেখে সাহাবায়ে কিরাম ও আমাদের সালাফগণের ঠোটে দুআ এসে যেত, যে দুআ নবীজি নতুন চাঁদ দেখার সময় পাঠ করতেন।
আর সে দুআ আটি ছিল -
اللهم أهله علينا باليمن والإيمان والسلامة والإسلام ربي وربك الله
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-যুমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি- রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।
অর্থ: হে আল্লাহ! চাঁদকে আমাদের জন্য শান্তি ও ইমান, সালামত ও ইসলামের সুরতে উদিত করুন। হে চাঁদ! তোমার আর আমার রব আল্লাহ, এই চাঁদ কল্যাণ ও হিদায়াতের। (২৫)
শুধু তাই নয়, রিসালাতের আলো চাঁদ দেখার পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবীজি চাঁদ দেখার জন্য চাঁদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকাকে অপছন্দ করতেন আর বলতেন, চাঁদ দেখে ফেলেছ এবার স্ব স্ব রাস্তা দেখো আর দুআ করতে থাকো।
ইমাম ইবন শায়বা (রহ) বলেন, যখন চাঁদ দেখ তখন চাঁদের দিকে মুখ উঠাবে না। বরং দেখার পর এতটুকু বলে দেওয়াই যথেষ্ট তোমার রব ও আমার রব আল্লাহ। (২৭)
উল্লেখ্য, যখন নতুন চাঁদ দেখা যেত তখন চন্দ্রপূজারীরা চাঁদের সামনে দাঁড়াত এবং তার সিজদা করত। আমাদের সালাফগণ এই বিষয়ের যথেষ্ঠ সতর্কতা অবলম্বন করতেন যাতে করে আহলে শিরক ও কুফরের সাথে সামঞ্জস্য না হয়ে যায়।
কেননা, নবীজি ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন কওমের সাথে সামঞ্জস্য রাখল যে ঐ কওমের অন্তর্ভুক্ত। (২৮)
টিকাঃ
২১। লাতায়েফুল মাআরেফ
২২। মুসনাদ আহমাদ ৫ম খন্ড ২০১ পৃষ্ঠা। সুনান নাসাঈ, কিতাবুস সিয়াম।
২৩। আবু দাউদ, কিতাবুস সিয়াম: ২৪৩
২৪। বুখারী, কিতাবুস সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম।
২৫। তিরমিজি: ৩৪৫১, আবু দাউদ: ৫০৯২]
২৬। তিরমিজি: ৩৬১৫, হাকিম: ৪/২৭৫, আহমদ: ১/১৬৩
২৭। মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা
২৮। আবু দাউদ: ৪০৩১
📄 মুবারক হো মাহে রমাদ্বান
কুরআনুল কারিমের রমাদ্বান মাসে নাজিল হওয়াতে এর মর্যাদা ও সম্মান অনেক গুণ উঁচুতে পৌঁছে গেছে। আল কুরআন - মানবজাতির পথের দিশা, আঁধারের আলো ও মানজিলে মাকসুদে পৌঁছার প্রদীপ, দয়াময়ের কালাম এবং বান্দার সাথে তাঁর রবের বার্তালাপের পবিত্র মাধ্যম। মুসলিমের দৃষ্টিতে সেই পাত্র, কাগজ, গিলাফ ও রিহালও সম্মানের বস্তু এবং চোখের শীতলতা যার মাঝে মুসহাফকে রাখা হয়। তাদের কাছে পবিত্র রমাদ্বান মাসের সম্মানও ঢের বেশী যে মাসে কুরআনুল কারিমকে নাজিল করা হয়েছে। রব্বে করিম সিয়ামকে ফরজ করে এই মাসের আদব ও সম্মানকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেছেন। সিয়াম পালনের সাথে কুরআনুল হাকিমের সম্পৃক্ততার কারণে এ মাসের নিম্নবর্ণিত দাবি রয়েছে -
- এর আগমনে খুশি প্রকাশ করা।
- সিয়াম, কিয়ামুল লাইল, কুরআন তিলাওয়াত, জিকর-আজকারের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া।
- বেশী বেশী নেকি অর্জন করা এবং প্রত্যেক গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
- মুসলিম ভাইবোনদেরকে নিজের উপর প্রাধান্য দেওয়া ও উদারতা দেখানো।
- সিয়াম অবস্থায় শাহওয়াত ও প্রবৃত্তি হতে বাঁচা।
এছাড়াও রমাদ্বানুল মুবারকের সম্মানের সবচেয়ে বড় বাহ্যিক দিক হল, যার উপর কোন শরয়ি ওজর থাকে তাকেও প্রকাশ্যে খাবার গ্রহণে বাধা দেওয়া। যেমন, রোগী, শিশু এবং গর্ভবতী ইত্যাদি। এমন লোকদের যদি খাবার গ্রহণের প্রয়োজন হয় তাহলে অন্যান্য লোকদের থেকে আড়ালে গিয়ে গ্রহণ করবে। সাহাবায়ে কিরামগণ রমাদ্বানের ইহতিরাম করা এবং দিনের বেলায় খানাপিনা থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, তাদের সাথে সাথে বাচ্চাদেরকেও রোজা রাখতে আদেশ দিতেন।
সাইয়িদা রুবাই বিনতু মুআওয়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন, "আমরা বাচ্চাদেরকেও রোজা রাখাতাম এবং তাদেরকে পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় এসে যেত। (২৯)
বাচ্চারা যদিও ফারায়েজসমূহ আদায় করার ওপর আদিষ্ট নয় তবুও তাদেরকে বাল্যকাল থেকেই ফারায়েজসমূহ আদায় করার অভ্যাস করানো উচিত।
সাইয়িদুনা আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর খেদমতে আরজ করলাম, আমাকে এমন কোন আমলের কথা বলে দিন যার বদৌলতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমাদের ওপর আবশ্যক হল, সিয়ামকে আঁকড়ে ধরা। কেননা এর মত কোন আমল নেই। এরপর আবু উমামা (রাঃ) এর ঘরে দিনেরবেলায় ধোঁয়া দেখা যেত না। তবে যদি তার ঘরে মেহমান এসে যেত। (৩০)
উল্লেখ্য, মেহমানের উপর সিয়াম পালন ফরজ না। তার ব্যাপারে অনুমতি আছে যে, সে রমাদ্বানে সফরের হালতে সিয়াম ছেড়ে দিবে এবং পরবর্তীতে সংখ্যানুপাতে তা পুরো করে নিবে। কিন্তু সে জনসম্মুখে খানাপিনা করবে না। এর ইজাজত নেই। এমতবস্থায় যদি কোন মেহমান এসে যায়, এবং সে সিয়াম পালন না করে থাকে, তাহলে মেজবানের উচিত কিছু রান্না করা থাকলে তাকে খাওয়ানো। অবশ্য যদি রান্না করা না থাকে তাহলে রান্না করাটা কষ্টের।
আজকাল আমাদের সমাজে লক্ষ্য করলে দেখা যায় বাচ্চারা কিংবা অন্যান্য ওজরওয়ালা লোকেরা জনসম্মুখেই খানাপিনা করে থাকে। দোকানপাট খোলা থাকে, হোটেলগুলোতেও খাবার দাবারের ব্যবস্থা জারি রাখা হয়। রমাদ্বানে জনসম্মুখে খানাপিনা পরিহার করা আবশ্যক কেন? এর মাঝে কি হিকমাহ লুকিয়ে থাকতে পারে?
* নিম্নবর্ণিত হিকমাহ নিহিত আছে-
রমাদ্বানে সিয়াম পালন করা এবং খানাপিনা থেকে বিরত থাকার বৈশিষ্ট্য এই মাসকে অন্যান্য মাস থেকে পৃথক করে দেয়। যদি এট বজায় না রাখা হয় তাহলে তো রমাদ্বানে অনন্যতা ও মর্যাদাই খতম হয়ে যায়।
প্রকাশ্যে খাওয়া দাওয়া পরহার করে মুসলিম সমাজে এটা প্রতিষ্ঠিত করা যে, আমি মুসলিম আর এই মাস আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করে সিয়াম সাধনা করার মাস।
যদি রমাদ্বানে দোকান পাট খোলা রাখা হয়, শিশু বাচ্চা ও মাজুর ব্যক্তি মানুষের সামনে প্রকাশ্যে খাবার খায় তাহলে দুর্বলদের মনে উৎসাহ এসে যাবে যে, সিয়ামের অতোটা গুরুত্ব নেই। সবাই খাচ্ছে। কাজেই, সিয়াম পালনের দরকার নেই।
যারা বাস্তবিকপক্ষেই মাজুর, সিয়াম পালনে অক্ষম - তাদের নিদেনপক্ষে জনসম্মুখে খানাপিনা পরিহার করে সিয়াম পালনকারীদের সাথে আত্মীকভাবে সাদৃশ্যতা বজায় রাখা উচিৎ।
রমজানুল মুবারক সার্বিকভাবে মুসলমাজাতির ইবাদত এবং এর পবিত্রতা রক্ষার মহত্ব দেওয়া হয়েছে এই জাতিকে। যে ব্যক্তি সিয়াম পালনে অক্ষম তার ব্যাপারেও জোর দেওয়া হয়েছে যে, সে-ও এই হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সদা প্রস্তুত থাকবে। তাই সবার সামনে খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকে রমাদ্বানের অন্যান্য আহকাম ও আদব পালনে ব্রতী হবে। সিয়াম পালনে অক্ষম ব্যক্তিরা সলাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, কিয়ামুল লাইল, বদান্যতা-উদারতা, দান সদাক্বা এবং অন্যান্য নেক আমলের প্রতি দরদী থাকবে। অন্যান্য সিয়াম পালনকারীদের মতো এই আমলগুলোর পাবন্দি করতে হবে।
রমাদ্বানের সিয়াম একটি ইজতিমায়ি ইবাদত, যা সকলেই আদায় করে। এজন্য প্রত্যেক দারিদ্র, রোগী ও মাথুর ব্যক্তিকেও এই ইবাদত আদায় করার জন্য সাধ্যমত অংশ নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রতিদান ও সুসংবাদ হাসিল করতে হবে।
রমাদ্বানুল মুবারকের এই বৈশিষ্ট্য এবং অনন্য মর্যাদা মুসলিমদের কাছ থেকে দাবি করে যে, তারা রমাদ্বান মাসের এই ইজতিমায়ি ইবাদতের মাধ্যমে ইজতিমায়ি এবং রুহানি ফায়দাসমূহ দ্বারা নিজেদেরকে উপকৃত করতে পারে।
আমাদের সালাফগণ রমাদ্বানের সকল হুকুম-আহকাম ও আদবগুলোকে পালন করার ক্ষেত্রে অগ্রজ ভূমিকা পালন করতেন। প্রতিটি হুকুম ঠিকঠিকভাবে আদায় করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।
এ ব্যাপারে একটি হাদিসে এসেছে। সাইয়িদুনা আদি ইবনু হাতেম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যখন -
حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود
অর্থাৎ, তোমরা পানাহার কর (রাত্রির) কালোরেখা হতে (ভোরের) সাদা রেখা যতক্ষণ স্পষ্টরুপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়"
এই আয়াত নাজিল হয় তখন আমি একটি কালো এবং সাদা রশি নিলাম। এবং উভয়টিকে বালিশের নিচে রেখে দিলাম এবং রাতে আমি এগুলোর একটির দিকে বারবার দেখতে থাকলাম। কিন্তু আমার নিকট কোন রং প্রকাশিত হল না। সকাল হলে আমি আল্লাহর রাসুল ﷺ এর নিকট গিয়ে এ বিষয়ে বললাম। তিনি বললেন, তোমার বালিশ তো অনেক বড় যে, উভয় দিগন্তকে এক করে ফেলেছে। অতঃপর বললেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য রাতের আঁধার এবং দিনের আলো। এমনিভাবে কিছু সাহাবায়ে কিরাম সাদা ও কালো রশি পায়ে বেঁধে নিতেন এবং দেখতেন যে দুটোর রং আলাদা আলাদা আসত কিনা?(৩১)
এই ছিল সাহাবায়ে কিরামের সিয়ামের ব্যাপারে সতর্কতার নমুনা। রাসূলে আকরাম সুন্দরভাবে খোলাসা করে দেওয়ার পর তাদের কাছে এর উদ্দেশ্য প্রতিভাত হয়।
এরপর থেকে সাহাবায়ে কিরাম এবং পরবর্তী সালাফগণও সাহরীর জন্য শুভ্র প্রভাতের প্রতি নজর রাখতেন এবং ইফতারের সময় দেখতেন, সূর্য ডুবে গিয়ে তার রক্তিম আভা কখন অদৃশ্য হয়ে যায়।
সিয়াম পালন করে নিজের ভিতরে দৈনতা অনুভব করা এই মহান ইবাদতের আদবের বরখেলাফ। মুসলিমের উচিৎ, তারা প্রত্যেক ইবাদতকে পরিপূর্ণ কর্মক্ষমতা, একাগ্রতা, প্রফুল্লতা ও প্রশান্তচিত্তে আদায় করবে। ইবাদতের কারণে তাদের চেহারায় হতাশার ছাপের বদলে যেন প্রাণবন্ত এক রূপ আসে। এমন যেন না হয় যে, সিয়াম পালনের কারণে তাঁর চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ লেগে আছে। বোঝা উচিৎ, সিয়াম আমাদের জন্য বোঝা নয় বরং রহমত। যার দুনিয়াবী আখিরাতমূখী কল্যাণ আছে।
আমাদের সালাফগণ এই বিষয়টির প্রতি বিষেশ গুরুত্বারোপ করতেন। এ কারণে সিয়ামাবস্থায় গোসল করা, চিরুণী লাগানো, চুলে তেল দেওয়া মিসওয়াক করা এবং আতর লাগানো সব জায়েয। যাতে মনের ভিতরে একট প্রফুল্লভাব চলে আসে।
বর্তমান যুগে বেশির ভাগ মুসলিম সিয়াম পালন করে বিছানায় শুয়ে পড়ে থাকেন। তাঁরা মনে করে যে, সিয়াম পালনের কারণে সে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারো কারো তো মুখের দিকেই চাওয়া যায় না। কেউ কেউ তো বলেই বেড়ায় যে, আমার রোজা লেগে গেছে, রোজায় ধরেছে, পিপাসা লেগেছে, আজকে তো তারাবিহই পড়তে পারিনি, উফ! কত গরম। ঠান্ডা পানি দেখে পানি পান করতে মনে চাচ্ছে... ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঠিক একইভাবে ইফতারের সময় বেশিরভাগ মানুষ ইফাতারী নিয়ে পড়ে থাকে। কঠিনভাবে বলতে গেলে, আল্লাহর এক আনুগত্যশীল বান্দার মেজাজ বা অবস্থা এমনটি হওয়া উচিত নয়। ইফতারের সময় পুরো আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশান্তির সাথে ইফতারি গ্রহণ করা উচিত। বাড়াবাড়ি ও তাড়াহুড়া করা উচিৎ নয়।
জামাআত দাঁড়িয়ে যাবার পরেও মাসজিদের দিকে দৌঁড়ে গিয়ে জামাআতে শামিল হওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে। যদি ইবাদতের মাঝেও হাঙ্গামা, তরাপ্রবণতা, মারামারি, আমি আগে ও আমারটা আগে এমন বিষয় শামিল হয়ে যায় তাহলে সে ইবাদত আর ইবাদত থাকে না।
টিকাঃ
২৯। সহিহ বুখারি: ১৯৬০
৩০। ইবনু হিব্বান: ৯২৯, হাকিম: ১/৪২১
৩১। বুখারি: ১৯১৬ (শামেলা ভার্সন)
📄 সালাফদের গ্রীষ্মকালীন এবং সফরকালীন সিয়াম
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা চন্দ্র-সূর্যের বিবর্তন এমন এক নিয়মে সাজিয়েছেন যে, কোন এলাকায় কখনও রাত লম্বা হয়, কখনও বা দিন লম্বা হয়। লম্বা দিনে গরমের মৌসুমে সিয়াম সাধনা খানিকটা কঠিন হয়ে যায়। পৃথিবীর কোনো অংশতো এমনও রয়েছে যেখানে প্রচন্ড গরম থাকে এবং ২১-২২ ঘন্টা দিন থাকে। তারপরেও মুসলিমজাতি অত্যন্ত আদব, ইখলাস এবং হিম্মতের সাথে সিয়াম পূর্ণ করে থাকে। ফালিল্লাহিল হামদ।
সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন, তাবে-তাবেইন তথা সলফে সলেহিনগণ তীব্র গরমের সিয়ামকেও অত্যন্ত মুহাব্বতের সাথে পালন করতেন। দিন যত লম্বা হয়, গরম তত বেশি লাগে। কাজেই সালাফগণ দীর্ঘক্ষণ সিয়াম পালন করে কুরআন তিলাওয়াত করার ফুরসত বেশি পেতেন। কুরআন তিলাওয়াতের সময় তাদের চোখের সামনে জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনের চিত্র ভেসে উঠত। কাজিএ দুনিয়াবী গরম তাদেরকে ভোগাতে পারত না। কালামে পাক তিলাওয়াত করার সময় তাদের অবস্থা এমন হত যে, জাহান্নামবাসীর চিৎকার তারা শুনতে পাচ্ছেন। জাহান্নামবাসী পিত্ত, রক্ত এবং পূজমিশ্রিত পানি পান করছে সেগুলোও তাঁরা দেখতে পাচ্ছে। তিলাওয়াত করতে করতে জাহান্নামের ভয়ে তাদের দম বন্ধ হয়ে আস্ত। জাহান্নামের ভয়ে তো কেউ কেউ হাসি-মশকরা ছেড়ে দিয়েছিল। কেউ কেউ আবার আতংকে বিছানায় খুব কষ্টে পিঠ ঠেকাতেন। কেউ কেউ শুধু জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবার আশায় ভুখাদেরকে খানা খাওয়াতেন নাঙ্গাদেরকে কাপড় পরাতেন, দাসদাসীদের আজাদ করে দিতেন। অবশ্যই তারা নবীজি এর হাদিসের উপর পরিপূর্ণ ইয়াকিন হাসিল করেছিলেন।
রাসুলে আকরাম ইরশাদ করেন, "রোজা হলো ঢাল ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার মজবুত দুর্গ।"(৩২)
অপর হাদীসে এসেছে, রোজা আগুন হতে বাঁচার জন্য ঢাল। যেমন তোমাদের মাঝে কোন ব্যক্তির ঢাল যুদ্ধে বাঁচায়। (৩৩)
আমাদের সালাফরা জানতেন যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কাছে সিয়াম পালন অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। হাদিসে কুদসিতে এসেছে,
প্রত্যেক আমলই বান্দার জন্য, সিয়াম ব্যতীত। কেননা সিয়াম আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব। সে আমার জন্যই খাদ্য ও পানীয় এবং শাহওয়াত থেতে দূরে থাকে। (৩৪)
এ ব্যাপারে আরেক হাদিসে এসেছে-
حدثنا إبراهيم بن موسى أخبرنا هشام بن يوسف عن ابن جريج قال أخبرني عطاء عن أبي صالح الزيات أنه سمع أبا هريرة رضي الله عنه يقول قال رسول الله صلى الله عليه وسلم قال الله كل عمل ابن آدم له إلا الصيام فإنه لي وأنا أجزي به والصيام جنة وإذا كان يوم صوم أحدكم فلا يرفث ولا يصخب فإن سابه أحد أو قاتله فليقل إني امرؤ صائم والذي نفس محمد بيده الخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك للصائم فرحتان يفرحهما إذا أفطر فرح وإذا لقي ربه فرح بصومه
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেন, আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, রোজা ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি আমলই তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা আমার জন্য। তাই আমি এর প্রতিদান দেব। রোজা ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবাং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন রোজাদার। যার কবজায় মুহাম্মদের প্রাণ তার শপথ! অবশ্যই রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের গন্ধের চাইতেও সুগন্ধি। রোজাদারের জন্য রয়েছে দুটি খুশি যা তাকে খুশি করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন রোজার বিনিময়ে আনন্দিত হবে। (৩৫)
রোজাদার ব্যক্তির ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট ম্লান হয়ে যায় মালিকের কাছ থেকে এমন প্রতিদানের প্রতিশ্রুতির জন্য। তাই তো ইফতারির সময় পানি দ্বারা শরীর ঠান্ডা করে নবীজি আল্লাহর কাছে আশা ব্যক্ত করে আদবের সুরে বলে উঠতেন যে,
« ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ »
উচ্চারণ: যাহাবায যামাউ, ওয়াব তাল্লাতিল উরুকু ও ছাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ্।
অর্থ: পিপাসা দূরীভূত হয়েছে, শিরা-উপশিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ প্রতিদানও নির্ধারিত হয়েছে। (০৬)
এই সকল শব্দের বুনন দিয়ে নবীজি রবের শুকরিয়া ও সবর আদায় করতেন এবং আশপাশে উপস্থিত ফিরিশতা এবং মানুষদেরকে এই আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করে সাক্ষী বানিয়ে রাখতেন।
সালাফগণ জানতেন, রোজা রেখে পিপাসা সহ্য করে যদি জান্নাতের রাইয়ান নাম দরজা দিয়ে প্রবেশ করার ইজাজত মিলে যায় তাহলে তো এটা অনেক বড় মুনাফার সওদা।
সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) তো সেই সৌভাগ্যের যুগও দেখেছেন যখন দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা ফরজ হওয়ার সময় গ্রীষ্মকালীন মওসুম ছিল। মক্কা মুকাররমা দশ হিজরির রমাদ্বানুল মুবারকে বিজিত হয়। তখন প্রচন্ড গরম ছিল। আরবের ঝলসে দেওয়া মরুভূমি এবং ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেড়া পাথুরে ও গরমে ঝলসে দেওয়া ভূমির সফর সম্মুখে ছিল। রাস্তায় কোন ছায়া ছিল না বললেই চলে। এতদসত্বেও সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম সিয়ামবস্থায় দুশমনদের মোকাবেলা করতে ঘর থেকে যুদ্ধের জন্য বের হয়েছিলেন। যখন নবিজি কাদিদ নামক স্থানে পৌঁছালেন তখন রোজা খুলে ফেললেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে হুকুম দিলেন রোজা খুলার জন্য। (০৭)
তদুপরি সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) জিহাদের সফরের সময় রোজা রাখার ব্যাপারে বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ এর সাথে তীব্র গরমের মাঝে বের হলাম। এমনকি আমাদের মাঝে কেউ কেউ গরমের তীব্রতার কারণে হাত মাথায় রাখত। আমাদের মাঝে কেউ রোজাদার কেউ ছিল না রাসুলুল্লাহ এবং আবদুল্লাহ ইবন (রাঃ) ব্যতীত। (৩৮)
সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, যারা জিহাদের ময়দানে সিয়ামাবস্থায় শাহাদাত বরণ করেছেন তাদেরকে গলায় লাগালেন। মুতার যুদ্ধে যখন যায়েদ বিন হারিসা (রাঃ) এবং জাফর তায়্যার (রাঃ) শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন তখন সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) আমির নিযুক্ত হন। রাসুলুল্লাহ ও নিজে যার তাগিদ দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) সেদিন সিয়ামরত ছিলেন। সূর্য অস্তমিত হওয়ার সময় তিনি মনে করলেন ইফতার করে নেই যাতে শরীরে শক্তি আসে, অতঃপর ময়দানে ফিরে যাওয়া যায়। ইফতারিতে তার সামনে গোশতের টুকরা আনা হয়। তিনি গোশত খেতে যাবেন, তাতে কোন আগ্রহ জন্মাল না। আগ্রহ জন্মাবেই বা কিভাবে? ওদিকে শাহাদাতের ময়দান তো তাদেরকে ডাকছিল। অগ্রবর্তীগণ তো ইতিমধ্যে তাদের শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে ফেলেছেন। তলোয়ার খাপ থেকে বের করার সময় খাপকেই ভেঙ্গে ফেলেন তিনি। শত্রুদের সারির ভিতর ঢুকে বীরদর্পে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে নিজের জীবনকে জীবনের মালিকের কাছে সোপর্দ করেন। (০৯)
আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) ও অন্যান্য বীর মুজাহিদ সাহাবা (রাঃ) আজমাঈন মনেপ্রাণে নবীজি এর এই হাদীসটি হৃদয়ে ধারণ করতেন –
"যে ব্যক্তি আল্লাহর রাহে একদিন সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে আসমান ও জমিনের দুরত্বের এক খন্দক বানিয়ে দিবেন। (80)
ফরজ সিয়াম তো পালন করা হয় আবশ্যকীয় এই কারণে। কিন্তু সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) এবং সম্মানিত সালাফগণ তো গরম মৌসুমেও নফল সিয়াম পালন করতে পছন্দ করতেন।
সাইয়িদুনা আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর ব্যাপারে বলা হয় যে, তিনি গরমকালেও নফল সিয়াম রাখতেন এবং শীতকালে নফল সিয়াম রাখতেন না। (৪১)
আম্মাজান আ'য়িশা (রাঃ), তিনিও প্রচন্ড গরমে নফল সিয়াম পালন করতেন। (৪২)
আবদুল্লাহু ইবন উমর (রাঃ) নফল সিয়াম পালন করতেন। প্রচন্ড গরমের তাপে বেহুশ হয়ে যেতেন। তবুও রোজা ভাঙতেন না। (৪০)
আবু দারদা (রাঃ) বলতেন, "কিয়ামতের দিনের কঠিন তাপ থেকে বাঁচার জন্য কঠিন গরমের দিনেও রোজা রাখো। কবরের আঁধারকে আলোকিত করার জন্য রাতের আঁধারে দুই রাকাআত নামাজ পড়ো। "(৪৪)
সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) গরমের দিনে সিয়াম পালনের আশা করতেন।
আমর বিন কায়স (রাঃ) একবার বসরা থেকে শামে গেলেন। মুআবিয়া (রাঃ) তখন সেখানকার খলিফা ছিলেন। শাম ছিল দারুল খিলাফা অর্থ্যাৎ রাজধানী। মুআবিয়া (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কোনকিছুর প্রয়োজন আছে কিনা, থাকলে আমাকে বলুন।"
তিনি বারবার তাঁর প্রয়োজনের ব্যাপারে জানতে চাইলেন। আমির বিন কায়স (রাঃ) প্রতিবারই তাঁর এই প্রস্তাবকে নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, "আমার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই।" অবশেষে মুআবিয়া (রাঃ) এর পীড়াপীড়িতে তিনি বলেন,
"আমাকে বসরার গরম আবহাওয়া ফিরিয়ে দিন। তাহলে হয়ত আমার সিয়াম পালন কঠিন হয়ে যাবে, আপনাদের শহরের রোজা অনেক হালকা। "(৪৫)
অথচ, আজকাল আমাদের সময়ে রমাদ্বান মাসে একটু গরম পড়লেই রোজাদারদের সংখ্যা কমে যায়। গরমের তীব্রতার কাছে জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা কম মনে হয়। এজন্য হয়ত এ মাসের গরম সহ্য করতে পারেনা। বিত্তশালীরা তো এয়ারকন্ডিশন রুমে রমাদ্বানের দিনগুলো আরামসে পার করে দেয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশির ভাগ লোকই এ কারণে রোজা রাখে না। আর রোজা রাখলেও, এমন একটা ভাব চোখেমুখে লেগে থাকে যে গরম তাদেরকে একদম শেষ করে দিয়েছে। হাপিত্যেশ করতে থাকে। গরমের দিনে সিয়াম পালন তাদের জন্য বিশাল এক সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মত মনে হয়।
কিন্তু সিয়ামের ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম ও সালাফগণের চিন্তা-চেতনা আমাদের চেয়ে একদম ভিন্ন ছিল। তারা শীতকালের সিয়ামকে হালকা মনে করতেন। আর গরমের দিনের সিয়ামকে কঠিন ও বেশি নেকী হাসিলের সুযোগ মনে করতেন। তাদের কাছে গরমকালের সিয়াম বেশি পছন্দনীয় ছিল।
আসলে সিয়াম হল আত্মিক বিষয়। ঈমানের বিষয়। দুনিয়ার সামান্য কষ্ট ভোগ করে আখিরাতের বড় কষ্ট থেকে নিজেকে মুক্ত করার বিষয়। রমাদ্বানে সালাফদেরকে গরম, ক্ষুধা ও পিপাসার মাঝেও বেশ প্রফুল্ল ও উজ্জীবিত দেখা যেত। তাদের উপরে বরকত, প্রশান্তি, আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ এবং তাওয়াজ্জুহ হাসিল হত।
তাদের ইমান ছিল আকাশছোঁয়া। আর আমাদের দুর্বল ইমানের কারণে সিয়াম পালন করা আজ আমাদের কাছে কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এমনকি সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর ক্রোধ দমন, সন্তুষ্টি অর্জন, জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুন থেকে বাঁচার মত সুপ্ত ও মূল্যবান নিআমতগুলোকে আমরা অনুভব করতে পারি না।
সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) সাথীদের সাথে কোন এক সফরে বের হলেন। রাস্তায় তার জন্য দস্তরখান বিছানো হল। এক রাখাল পথ দিয়ে যাচ্ছিল। ইবন উমর (রাঃ) তাকে ডাকলেন যাতে সেও তাদের সাথে খাবারে শরীক হতে পারে। রাখাল বলল, "আমি রোজাদার (নফল সিয়াম)।" ইবন উমর আশ্চার্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "এই প্রচন্ড গরমে, উত্তপ্ত মরু উপত্যকায় ভেড়া-বকরির পালের পিছনে দৌড়াতে দৌঁড়াতে তুমি রোজা কিভাবে রাখো?" রাখাল বলল, "আমি অতিবাহিত দিনগুলোর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করছি" (অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি মুহুর্তেকে গনিমত মনে করে নেকি হাসিলের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করছি, মৃত্যু যেখানে অবশ্যম্ভাবী)। রাখালের এ কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) এর বিস্ময় আরো বেড়ে গেল। তিনি তাকে বললেন, "তোমার একটা বকরি আমাদের কাছে বিক্রি করে দাও, এর গোশত তোমাকেও খাওয়াবো, আর তুমি এই মাংসের দ্বারা তোমার রোজাও ভাঙতে পারবে (নফল সিয়াম ভাঙার অনুমতি আছে)। আর আমরা তোমাকে ঐ বকরির মূল্যও দিয়ে দিব।" এ প্রস্তাব শুনে রাখাল বলল, "এই বকরির পাল আমার নয়, আমার মালিকের। এটা আমার কাছে আমানত।"
তখন আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) তাকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, "তুমি তোমার মালিককে বলবে, ঐ একটা বকরিকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। এ কথা শুনে রাখাল চিৎকার দিয়ে আকাশের দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে বলল, "তাহলে "আল্লাহ কোথায়।" (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা দেখছেন) ইবন উমর (রাঃ) তার এ কথায় প্রভাবিত হয়ে বারবার বলতে লাগলেন, "তাহলে আল্লাহ কোথায়।"
অতঃপর তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে এসে ঐ রাখালকে তার মালিকের কাছ থেকে কিনে নেন। রাখালের সাথে ঐ বকরির পালকেও তিনি কিনে নেন। অতঃপর তিনি তাঁকে আজাদ করে দেন এবং তাঁর সততায় মুগ্ধ হয়ে বকরিরগুলোকে পুরস্কার হিসেবে তাঁকে দিয়ে দেন। (৪৬)
আমাদের জন্য এই ঘটনায় চিন্তার খোড়াক রয়েছে। এরা হচ্ছে ঐ সকল লোক যারা মরুভূমির তীব্রে গরমের লম্বা দ্বিপ্রহরে পশু চড়াতো, কাজের তাগিদে প্রখর রোদ্রে চলাফেরা করতো, সাথে সাথে সিয়াম পালন করে আখিরাতের সামান হাসিল করতো। তারা দৈনন্দিন জীবনোপকরণের ফিকির করার পরও ইবাদতের ব্যাপারে উদাসীন হতো না। মহান আল্লাহ তাদের উপর শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন, আমীন।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, ঐ ব্যক্তির জন্য দিগুণ নেকি যে তার দুনিয়াবি মালিকের হক আদায় করে (তার আনুগত্য করে) এবং তার প্রকৃত মালিকের (তথা আল্লাহ তাআলার) হক আদায় করে তথা ইবাদত করে। (৪৭)
বনু উমাইয়া গোত্রের এক সরদার রাওহ বিন যামবা একবার উমরাহ করার জন্য সফর করেন। তার কাছে খানাপিনার জন্য পর্যাপ্ত খাবার মওজুদ ছিল। ফল-ফলাদি, বকরি ও মুরগির গোশতের কমতি ছিল না। এ কারণে তার দস্তরখান খাবার দাবারে ভরে যেত। তিনি তার দস্তরখান বিছিয়ে সাথে থাকা অন্যান্য লোকদেরকে তাঁর সাথে যোগ দিতে বললেন। এক গ্রাম্য বেদুইন তখন তাদের পাশ দিয়ে বকরি চড়াতে চড়াতে যাচ্ছিল। রাওহ বিন যামবা তাকে ডাকলেন। বললেন,
- "আসুন, খাবার গ্রহণ করুন।"
- "আপনার চেয়েও সম্মানিত ও প্রিয়জন আমাকে তাঁর দস্তরখানে খাবারের দাওয়াত দিয়েছেন।"
- "কে তিনি?"
- "সমগ্র জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ।"
- "আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কীভাবে দাওয়াত দিলেন?" (অবাক হয়ে রাওহ বিন যামবা)
- "আমি রোজা রেখেছি আর অতি শীঘ্রই আমি ইফতার করব।"
- "আজকে রোজা ভেঙে আমার দাওয়াত গ্রহণ করুন কাল না হয় আবার রেখে নিবেন।" (প্রস্তাবের সূরে রাওহ বিন যামবা)
- "আপনি কী আমার জীবনের গ্যারান্টি দিতে পারবেন?"
বেদুইন রাখালের এ কথা শুনে রাওহ বিন যামবা কেঁদে ফেললেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বললেন, আপনি আপনার জীবনকে হিফাজত করেছেন আর আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত নষ্ট করছি। (৪৮)
মুআজ বিন জাবাল (রাঃ) এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি সিয়ামের ব্যাপারে আশা ব্যক্ত করে বলেচ্ছিলেন, আফসোস! কঠিন রোজার মাঝে লাগা পিপাসাও খতম হয়ে যাবে। (৪৯)
সাহাবায়ে কিরাম জানতেন, সফরের মাঝে সিয়াম ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। সেই সাথে সিয়ামের প্রতিদান, বরকত ও সাওয়াবের ব্যাপারেও জানতেন। তদুপরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার এই বাণী সম্পর্কেও ছিল তাদের অগাধ কৃতজ্ঞতাবোধ -
وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার।
এ কারনেই আমাদের নিজেদের মধ্যে হিম্মত তৈরি করা এবং সফরে থাকাবস্থায় সিয়ামকে ছেড়ে না দিয়ে রেখে দেওয়াটাই উত্তম। সিয়াম পালনে কষ্ট ও ক্ষতির তুলনায় এর উপকার ও ফায়দা অনেক বেশী।
হামযা ইবন আমর আসলামি (রাঃ) অধিকাংশ সময় সফরে সিয়াম পালন করতেন। তিনি নবী করিম এর কাছে সফরে সিয়াম পালনের মাসআলা জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেন, চাইলে সিয়াম পালন করতে চাইলে ইফতার করতে পারো (না রেখে ভাঙতে পারো)। (৫১)
সালাফদের সিয়ামের ব্যাপারে ইখলাস ছিল চোখে পড়ার মত। সহজে উনারা সিয়াম কাযা করতেন না, বা চাইতেন না। কেননা, উনারা জানতেন সিয়াম আল্লাহর জন্য, আল্লাহই তার প্রতিদান দিবেন। সিয়াম হল ঢাল যা দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকা যাবে। সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে বিশেষ একটি দরজা, যার নাম রাইয়ান। এই দরজা দিয়ে শুধুমাত্র রোজাদারগণ প্রবেশ করতে পারবেন। এই সমস্ত সুযোগ সালাফগণ হেলায়ফেলায় ছেড়ে দিতেন না। বোনাস অফার হিসেবে গ্রহণ করতেন। এ জন্য সিয়ামের ব্যাপারে উনার এতটাই আন্তরিক ছিলেন। মহান আল্লাহ্ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। - আমীন।
টিকাঃ
৩২। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯২১৪, সহিহুল জামে: ৩৮৮। আলবানি হাসান বলেছেন。
৩৩। মুসনাদে আহমাদ: ১৫৮৪৪ (সহিহ)
৩৪। হাদীসে কুদসী
৩৫। বুখারি: ১৯০৪, মুসলিম শরিফেও রয়েছে: ১১৫১
৩৬। সুনানু আবি দাউদ: ২৩৫৭
৩৭। বুখারি: ১১১৩
৩৮। বুখারি: ১১৪৫, মুসলিম: ৩/১১২
৩৯। আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/১৩৮ থেকে ১৪৫
৪০। সহিহ সুনানুত তিরমিজি আলবানি: ১৩২৫-আবু উমামা আলবাহিলি বর্ণিত]
৪১। লাতায়েফুল মাআরেফ ও কিতাবুয যুহদ লিইবনিল মুবারক
৪২। প্রাগুক্ত
৪৩। লাতায়েফুল মাআরেফ: ৪৪৮
৪৪। লাতায়েফুল মাআরেফ ৪৪৮
৪৫। লাতায়েফুল মাআরেফ: ৪৪৭
৪৬। আল উলুম-ইমাম যাহাবি (রহ), ইমাম আলবানি মুখতাসারুল উলুম নামে সংকলন করেছেন। সনদ সহিহ।
৪৭। সহিহ বুখারি: ৯৭
৪৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৫০৭৪৯
৪৯। কিতাবুয যুহদ, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক
৫০। সূরা বাকারাহ, আয়াতঃ ১৮৪
৫১। সহিহ বুখারি, হাদীস ১৯৪৩
📄 রমাদ্বানে সালাফদের কুরআন অনুধাবন
রমাদ্বান মাসে সাহাবায়ে কিরাম ও অন্যান্য সালাফদের আমল সম্পর্কে যেসব বর্ণনা আমাদের কাছে পর্যন্ত পৌঁছেছে সেগুলোর প্রতি নজর দিলে বোঝা যায় যে, উনারা এ মাসে নেক আমল করার জন্য কোমর বেঁধে নিতেন। তবে, উনারা দুইটি ইবাদতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। যার একটি হল কুরআন তিলাওয়াত আর আরেকটি হল বদান্যতা।
* তিলাওয়াত ও বদান্যতা
সাহাবায়ে কিরামগণের চোখের মণি নবী করিম রমাদ্বানুল মুবারকে দুইটি আমলের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। সাইয়িদুনা আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন,
রাসূলুল্লাহ এর সামনে প্রত্যেক বছর রমাদ্বানে একবার কুরআন পড়া যেত। যে বছির তিনি ওফাতপ্রাপ্ত হন সে বছর দু'বার কুরআন খতম করা হয়। (৫২)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, "রাসূল সকল মানুষের চেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। আর রমাদান মাসে যখন জিবরীল (আঃ) তার সাথে সাক্ষাতে মিলিত হতেন তখন তিনি আরো দানশীল হয়ে উঠতেন। জিবরীলের সাক্ষাতে তিনি বেগবান বায়ুর চেয়েও বেশী দানশীল হয়ে উঠতেন। (৫৩)
কুরআনুল কারীম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বাণী। যা তিলাওয়াত করলে তাঁর সাথে বান্দার সম্পর্ক মজবুত হয়। নফস পরিশুদ্ধ হয়। আমলের মাঝে উদ্যমতা ও প্রফুল্লতা মিলে। প্রবৃত্তি ও খাহেশাতের জেদি ঘোড়ার পরিচয় কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। এমনকি কুরানের নূর নফসকে বশে নিয়ে আসে। সহজেই এর গলায় লাগাম লাগিয়ে দেয়। পূর্ণ একাগ্রতা, মনোযোগ ও আগ্রহের সাথে কুরআন তিলাওয়াত ও অনুধাবণ করলে, মনে হয় এ যেন খোদ আল্লাহ তা'য়ালার সাথে বান্দা কথা বলছে।
সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) এর মাঝে কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি এতটাই ঝোঁক ছিল যে, উনাদের শরীরে তীর বিধে গেলেও সে ব্যাপারে বেখায়াল থাকতেন। (৫৪)
তাঁরা জানতেন, কিয়ামত দিবসে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াতকারীর মাকাম ও মর্যাদা নৈকট্যশীল ও সম্মানিত ফিরিশতাদের সমান সমান হবে। (৫৫) তাছাড়া কুরআনুল কারীমের প্রতি হরফ তিলাওয়াতে দশ নেকীর পুরস্কার তো আছেই। (৫৫)
কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করলে আসমান হতে সাকিনা অবতীর্ণ হয়। কুরআন মাজীদ রাসূলে আকরাম এর অন্তরে অবতীর্ণ হয়। আর তিনি সেই অন্তরকেই নূরের মারকাজ বানান। এই উম্মাহর বুকেও কুরআনের প্রকৃত আছর ও প্রভাব অর্জিত হলে অন্তরের নূর চোখের পানি হয়ে গড়িয়ে পড়ে।
কুরআনুল হাকিম অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ এর তনুমন তাতে মশগুল হয়ে যেত। সাহাবায়ে কিরামগণও (রাঃ) জানতেন, আমাদেরকেও ঐ পবিত্র কালামকে বুকে ধারণ করে নিতে হবে, এবং পালঙ্কর্তার বিধি-নিষেধগুলো আমল করার জন্য অন্তরের দরজা উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
কুরআন মাজীদের প্রভাব ও ভীতির আলামত ছিল এই যে, এটা নাজিল হওয়ার সময় নবীজি এর ঘাম ছুটে যেত। কঠিন শীতের সময়েও শরীরের মাঝে কম্পন সৃষ্টি হত। তিলাওয়াত করার সময়েও একজন মুসলিমের অবস্থা এমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, যেমন ইরশাদ হচ্ছে-
ٱللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ ٱلْحَدِيثِ كِتَٰبًا مُّتَشَٰبِهًا مَّثَانِىَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ ٱلَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَىٰ ذِكْرِ ٱللَّهِۚ ذَٰلِكَ هُدَى ٱللَّهِ يَهْدِى بِهِۦ مَن يَشَآءُۚ وَمَن يُضْلِلِ ٱللَّهُ فَمَا لَهُۥ مِنْ هَادٍ
আল্লাহ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাযিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পূনঃপূনঃ পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথ নির্দেশ, এর মাধ্যমে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।
কুরআন নাজিলের সময় রাসূল দুনিয়া ও তার মাঝে যা কিছু আছে তাঁর সবকিছুকে ভুলে যেতেন। ভরা মজলিসে সাহাবাগণ (রাঃ) এর মাঝে থেকেও তিনি তাদেরকে ভুলে যেতেন।
অনুরূপভাবে এই ঐশী কালাম তিলাওয়াত করার সময় একজন মুসলিমের ভিতরেও ঐ পরিমাণ তৃপ্তি ও স্বাদ আসা চাই, যে স্বাদে সে দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে তা ভুলে যায়।
রমাদ্বানুল মুবারক আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ এক নিয়ামত। এই বিশেষ মাসে তিনি কুরআনুল কারীম নাজিল করেছেন। এটি এমন একটি বিশেষ মাস যে মাসে তাঁর জন্য সিয়াম, দান সদাক্বা, কিয়ামুল লাইলে কুরআন তিলাওয়াত, অথবা দিনের বেলায় ঘরে বসে তিলাওয়াত করা হয়। সবকিছু মিলে সবার মাঝে এক স্বর্গীয় সুখ সৃষ্টি হয়।
আমাদের সালাফগণ রামাদ্বানের একটি শিক্ষার ব্যাপারে পূর্ণ অবগত ছিলেন। এ মাসের কম খাওয়া, কম কথা বলা এবং কম ঘুমানোর মাধ্যমে ফিরিশতাদের সাথে উঠাবসা ও তাদের সাদৃশ্যতা অর্জন করা – এর জন্য রমাদ্বানুল কারীম ছাড়া আর কোন উত্তম মাস নেই। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম শিহাবুদ্দিন যুহরি (রহ) রমাদ্বান মাসকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, "এ হল কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করা এবং খানা খাওয়ানোর মাস।"(৫৮)
ইবন আবদিল হিকাম (রহ), ইমাম মালিক (রহ) এর ব্যাপারে বলতেন, "রমাদ্বানুল মুবারক আগমনের সাথে সাথে তিনি হাদিসের মজলিস এবং আহলুল ইলমের মজলিসে আর বসতেন না, মুসহাফ (কুরআন) খুলে তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করতেন। "(৫৯)
বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধ আরব লেখক ও প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আইদ্ব আল কারনি লিখেন, ইমাম মালিক (রহ) রমাদ্বানের চাঁদ দেখা গেলে তাঁর কিতাবগুলিকে উঠিয়ে রেখে কুরআন মাজীদ নিয়ে বসে যেতেন। সর্বদা অজু অবস্থায় থাকতেন। মাসজিদে বসে কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন হতেন। তিনি বলতেন, "এ হল কুরআনের মাস, এ মাসে কুরআনের সাথে কথা বলা ছাড়া আর কোন কথা নেই। "(৬০)
খেয়াল করুন, যে ইমাম মালিক (রহ) মাসজিদে নববিতে একাধারে হাদিসের দরস দিতেন, কোনদিন বাদ দিতেন না। যার দরসে হাজার হাজার মানুষ দরস গ্রহণ করার জন্য হাজির হতো। যিনি আহলুল ইলমদের অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদা দিতেন। যারা অন্যান্য শহর থেকে হাদিস শেখার জন্য আসতো, তিনি তাদেরকে নিজ ঘরে মেহমানদারি করতেন। এতকিছুর পরেও রমাদ্বান মাসে তিনি তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন হয়ে যেতেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালার নিকট বিনয়ী হওয়ার চেষ্টায় রত হতেন।
আইদ আবদুল্লাহ আল কারনি (হাফিজাহুল্লাহ) আরও লিখেন, "অধিকাংশ সালাফ রমাদ্বান মাস শুরু হয়ে গেলে মাসজিদের সাথে সম্পর্ক বাড়িয়ে দিতেন। জিকরে ইলাহি ও তিলাওয়াতে কুরআনে মশগুল হয়ে যেতেন। নিতান্তই কোন প্রয়োজন না পড়লে বাড়ির পথে পা বাড়াতেন না।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) রমাদ্বান মাস শুরু হয়ে গেলে ফতওয়া দেওয়া বন্ধ করে দিতেন। তিনি ঘরে বসে বসে জিকরে ইলাহি "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতে মশগুল হতেন। (৬১)
কুরআনুল কারিমের হাফিজ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সালাফগণ মুসহাফ খুলে খুলে তিলাওয়াতের প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। মুসহাফ খুলে তিলাওয়াতের মাধ্যমে কুরআনুল হাকীমের শব্দমালা এবং এর অন্তনির্হিত বিষয়াদি তাদাব্বুর করতেন। ফুলের মালার মত সেগুলোকে নিজেদের অন্তরে গেঁথে নিতেন। অবস্থা এমন হয়ে যেত যে, কোন প্রেমিক তার প্রেমাস্পদের স্বাক্ষাতের স্বাদ হাসিল করে ফেলেছে।
আহনাফ বিন কায়স (রহ), বিশিষ্ট তাবেয়ি যখন এই আয়াতটি শুনেন,
لَقَدْ أَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
আমি তোমাদের প্রতি একটি কিতাব অবর্তীর্ণ করেছি; এতে তোমাদের জন্যে উপদেশ রয়েছে। তোমরা কি বোঝ না? (৬২)
সাথে সাথে তিনি আঁতকে উঠেন। আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তিনি ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে কুরআন মাজীদের পাতায় পাতায় নিজের জন্য উপদেশ অনুসন্ধান করতে লাগলেন। কুরআনে বিভিন্ন ধরণের লোকদের বর্ণনা জানার পর, যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছলেন,
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়। (৬৩) তাৎক্ষনিক বলেলেন, "ব্যস, ব্যস! আমি আমার উপদেশ পেয়ে গেছি।"
এগুলো ছিল সালাফদের কুরআনুল হাকীমকে মনোযোগ সহকারে, মহব্বত এবং আগ্রহের সাথে তিলাওয়াত করার ফল। সাহাবায়ে কিরামগণ (রাঃ) কুরআন তিলাওয়াতের আগ্রহ ছিল আরো এক ধাঁচ উপরে। উনারা বেশির ভাগ তিনদিনে কুরআন খতম করতেন। কোন কোন সাহাবা (রাঃ) সাতদিনে আর কেউ কেউ চল্লিশ দিনে খতম করতেন। (৬৪)
আবু হুজাইফা (রাঃ) এর আযাদকৃত গোলাম সালিম (রাঃ) এত সুন্দর করে কুরআন তিলাওয়াত করতেন যে, এক রাতে আম্মাজান আ'ইশা (রাঃ) ইশার সলাতের পর ফিরে আসার সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনেছিলেন। রাসুলুল্লাহ কে এ ব্যাপারে অভিহিত করা হলে তিনিও আ'ইশা (রাঃ) এর সাথে দাঁড়িয়ে তাঁর তিলাওয়াত শুনেন। (৬৫)
আবু মুসা আশআরি (রাঃ) এর কুরআন তিলাওয়াতের দরদ ও মিষ্টতা দেখে হযরত আবদুল্লাহ বিন কায়স (রাঃ), বলেন, তাকে অন্তরে দাউদি দাউদি সুর) দেওয়া হয়েছে। (৬৬)
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) এত সুন্দর, সুলালায়িত কন্ঠে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করতেন যে, রাসুলুল্লাহ তাঁর তিলাওয়াত শুনে তাকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলেন, "যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদকে সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করতে চায়, সে যেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের মত কিরাত পড়ে।"(৬৭)
তাবিয়িন এবং তাবে-তাবিয়িনগণও কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত দ্বারা নিজেদের অন্তরে ইমান্দের স্বাদ ও সজীবতা ধরে রাখতেন। উনাদের অধিকাংশ রজনী সালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় অতিক্রান্ত হত। আর সে সলাতে থাকত লম্বা লম্বা তিলাওয়াতে সমাহার। যখন রমাদ্বান মাস এসে যেত, তখন উনাদের এই আমল বহুগুণে বেড়ে যেত।
আবদুর রাজ্জাক (রহ) বলেন, যখন রমাদ্বান মাস উপস্থিত হত, তখন ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ) সকল কথাবার্তা (দুনিয়াবী) ছেড়ে দিয়ে কুরআন কারিম তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করতেন। (৬৮)
ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী (রহ) বর্ণনা করেন, "কোন কোন সালাফ রমাদ্বান মাসে তিনদিনে কুরআনুল কারীম খতম করতেন। কোন কোন সালাফ সাতদিনে কুরআন পূর্ণ খতম করতেন। তাদের মধ্যে কাতাদাহ (রহ) উল্লেখযোগ্য। কোন কোন সালাফ দশদিনে পুরা কুরআন খতম করতেন। তাদের মধ্যে আবু দুজানা আল আত্তারি (রহ) উল্লেখযোগ্য।(৬৯)
আসওয়াদ বিন কায়স (রহ) রমাদ্বানের শেষ দশকের প্রতি দুইরাতে একবার করে কুরআনুল কারীম খতম করতেন, আর রমাদ্বানের প্রথম দশকে প্রতিদিন রাতে একবার কুরআন খতম করতেন।(৭০)
ইমাম ইবনু রজব (রহ) তার লাতায়েফুল মাআরেফ কিতাবে এই রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করার পর একটি আলোচনা আনেন। তিনি লিখেন, "তিনদিনের কম সময়ে কুরআন খতম করা বছরের অন্যানা দিনে নিষিদ্ধ।" অতঃপর তিনি যোগ করেন, "কোন কোন সালাফের নিকট রমাদ্বানের দিন ও রাত মিলিয়ে তিনদিনের কম সময়ে কুরআন খতম করার কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। নিষিদ্ধের ব্যাপারটা এই দিনগুলো বাদে অন্যান্য দিনের বেলায় প্রযোজ্য।"
রমাদ্বান মাসে কালামুল্লাহ তিলাওয়াতের স্বাদ ও আগ্রহ আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগেও পাওয়া যেত। লোকেরা সাহরীর পর সলাত আদায় করেই কুরআন মাজীদ খুলে পড়তে বসে যেত। আর যতটুকু সম্ভব তিলাওয়াত করে যেত। রমাদ্বানের দিনগুলোতে কুরআনের প্রতি আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা সবার আগ্রহ একরকমই ছিল। আমাদের বর্তমান সমাজেও এই বিষয়টি বড়ই শানদার ও মুহব্বতের সাথে জারি ছিল। কিন্তু আফসোস! নানারকমের মিডিয়ার আগ্রাসন আমাদের ঘরের শিশু, মা-বোন ও পুরুষদের কাছ থেকে এই আগ্রহ ও উদ্দীপনাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এখন তারা ঐ সকল ফাঁদে পড়ে বেশরম বেহায়া এবং অহেতুক জিনিসে মেতে থেকে নিজেদের দ্বীন ও ইমানকে হারিয়ে ফেলছে।
রমাদ্বান মাসে অধিকাংশ উলামা ও ফুজালাগণ অন্যান্য সকল ব্যস্ততা ছেড়ে দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত, অনুধাবন এবং দানশীলতায় মনোযোগী হতেন।
মাওলানা শাহ আবদুর রহিম রায়পুরি (রহ) এর আমলের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, উনার মজলিসে রমাদ্বান মাসে প্রায় সারাদিনই কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত হত। ইফতার শেষে মাগরিবের পর চা পান করতে যতক্ষণ সময় লাগে, তিনি ততটুকু সময় বিরতি দিতেন। এমনকি এ মাসে তিনি ডাক বন্ধ করে দিতেন এবং অন্যান্যদের সাথে সাক্ষাত করাও বাদ দিতেন।
মাওলানা আবদুল মান্নান নুরপুরি (রহ) রমাদ্বানের প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ সলাতে দুইপারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। চলাফেরায় কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত করে জিহ্বাকে তরতাজা রাখতেন। তিনি তার এক ছাত্রের সাথে একদিন কোন এক জায়গায় মেহমান হলেন। বিশ্রামের জন্য তাকে কোন এক কামরায় জায়গা করে দেওয়া হল। যুহরের আগে এক ছাত্র তাকে ডাকতে গিয়ে দেখলেন, তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছেন। সলাতের পর আবারো তিনি ঐ কামরায় চলে আসেন। ঐ ছাত্র আসরের সলাতের সময় তাঁকে ডাকতে গিয়ে দেখল, তখনও তিনি তিলাওয়াত করছিলেন। আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়েও তিনি তিলাওয়াতের মাঝেই কাটান। (৭১)
বর্তমানে কুরআন তিলাওয়াতের উদ্দীপনা ও আগ্রহ আমাদের মাঝে নেই বললেই চলে। অবশ্য ইতিকাফকারী ব্যক্তির জন্য অনেক সুবিধা আছে।
তিনদিনে কুরআন খতম করার সুযোগ তাঁর হাতে থাকে। রমাদ্বানে আমাদের সমাজে কুরআন তিলাওয়াতের পরিমাণ বেড়ে যায় ঠিক, কিন্তু তা হয় খেয়ালখুশি মোতাবেক। কেউ কেউ দৈনিক একপারা তিলাওয়াত করে। কেউ কেউ একটু বেশী, আবার কেউ কেউ এর চাইতে কম। আবার সে তিলাওয়াতে তাড়াহুড়া অনেক বেশী থাকে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যত তাড়াতাড়ি শেষ করা যায় তাতেই খুশি। অথচ কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতের উদ্দেশ্য একে তাড়াতাড়ি খতম করা না, বরং তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করে একে বুঝার চেষ্টা করা। কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করে রব্ব কারিমের সাথে সম্পর্ককে মজবুত করা।
রাসূলুল্লাহ কুরআনুল কারীমের এক একটি হরফকে স্পষ্ট করে তিলাওয়াত করতেন। (৭২)
আম্মাজান উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
রাসুলুল্লাহ এক একটি আয়াতকে আলাদা করে পড়তেন এবং প্রত্যেক আয়াতে থামতেন। 'আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন' পড়ে থেমে যেতেন অতঃপর 'আররাহমানির রাহিম' পড়তেন। তারপর 'মালিকি ইয়াওমিদ্দিন পড়তেন'।"(৭৩)
কেউ কেউ আবার তারাবিতে কুরআন তিলাওয়াত শোনাকেই যথেষ্ঠ মনে করেন। হাফিজুল কুরআনগণ দৈনিক নিজের নির্ধারিত পারা মুখস্থ করা এবং তারাবিতে শোনানোকেই গণিমত মনে করেন। অথচ এরা অধিকাংশ ঝড়ের গতিতে তিলাওয়াত করে থাকেন। অবস্থ এমন হয় যে, মুক্তাদি প্রথম আয়াত শুনে বোঝার চেষ্টা করছেন, ততক্ষণে ইমাম সাহেব দুই- তিন আয়াত সামনে চলে গেছেন। তবে সবাই একরকম নয়। কিছু কিছু হাফিজুল কুরআন অত্যন্ত সুন্দর করে তারতীলের সাথে থেমে থেমে কুরআন তিলাওয়াত করেন। কুরআন তিলাওয়াতের উদ্দেশ্যই তো এটি।
অন্যদিকে এমনও মুসলিম আছে যারা রমাদ্বান মাসে ক্যাসেট, সিডি, মোবাইল কিংবা টিভি চ্যানেলে কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত অথবা কিছু কিছু সূরাহ বারবার তিলাওয়াত শুনাকেই যথেষ্ঠ মনে করেন।
এমন অনেকেই আছে যারা রমাদ্বান মাসে কুরআনের তাফসীর করান। এর জন্য বিশেষ দৌঁড়ঝাপ করতে হয় তাদের। সময় নির্দিষ্টকরণ, সেচ্ছাসেবকদেরকে জমায়েত করা, আসা যাওয়ার জন্য সহজতার ইন্তেজাম, মাইকের ব্যপস্থাপনা, ইফতারের বন্দোবস্ত করা, গরম থাকলে পাখা, এয়ার-কুলার বা ইয়ার-কন্ডিশনযুক্ত কামরার ব্যপস্থাপনা, রেকর্ড করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া, ইত্যাদি।
সাধারণতঃ এক্ষেত্রে অনেকেই শুধুমাত্র কুরআনের তরজমা বা কুরআনের মর্মকথা বলে দেওয়াকেই যথেষ্ঠ মনে করেন। অথচ কোন কোন স্থানে তাফসীরের অনুষ্ঠান পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে থাকে। ফলাফল এই হয় যে, তাফসীর মাহফিলের আয়োজক এবং তাতে অংশ গ্রহণকারী সকলে কুরআন তাদরীসের কাজ করেন, কিন্তু যে হাদিসগুলোতে তিলাওয়াত অথবা কিরাআতের আলোচনা এসেছে, সেগুলো খুব কমই আলোচনা করে থাকনে।
প্রকৃতপক্ষে রমাদ্বানুল মুবারকে তাফসীরুল কুরআনের মাধ্যমে মানুষদেরকে মাখলুক থেকে বিছিন্ন করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের যে ইহতিমাম আমাদের সালাফগণ করেছেন, তার সাথে বর্তমানের আয়োজনগুলোর কোন মিল নেই। বরং উল্টোটা পরিলক্ষিত হয়। মানুষের সাথে পরস্পর মেলামেশা এবং কুরআন শিক্ষা ও তাফসীর বয়ানের বিষয়টাই যেন মূখ্য হয়ে উঠে। যদিও এই পদ্ধতিরও কিছু ফায়দা রয়েছে। যেমন, লোকেরা সিয়াম পালন করে অহেতুক কাজে সময় নষ্ট করার চাইতে, কুরআন থেকে কিছু না কিছু জানতে পারে।
আসলে তাফসীরের যে মেহনত আমাদের সমাজে রমাদ্বান মাসে করা হয় মূলত তা রমাদ্বানের বাইরে অন্যান্য দিনগুলোতে করা উচিত, হতে পারে রজব বা শাবান মাসে। আর রমাদ্বান মাসটাকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য বান্দার বরাদ্দ করা উচিৎ। ইনফিরাদি (একাকি) ইবাদত, আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা, এবং কোলাহল ফেলে শুধুমাত্র তার দিকেই ধাবিত হওয়াটাই উদ্দেশ্য ও মাকসাদ হওয়া উচিত।
মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দিন, আমীন।
টিকাঃ
৫২। বুখারি: কিতাবু বাদইল ওহি: ৬, হাদিসঃ ৪৯৯৮
৫৩। বুখারি: ৯০২, মুসলিম: ২৩০৮
৫৪। দেখুন ইকবাল কিলানি রচিত ফাজায়েলে কুরআন মাজিদের ভূমিকা, গাযওয়ায়ে জাতুর রিকা
৫৫। মুসলিম: ১৮৬২
৫৬। তিরমিজি: ২৩২৭
৫৭। সুরা আযযুমার, আয়াতঃ ২৩
৫৮। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৪৫
৫৯। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৪৫
৬০। রমজান মাহে গুফরান-উর্দু তরজমা: ১৪৬
৬১। রমজান মাহে গুফরান-উর্দু তরজমা: ১৪২
৬২। সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াতঃ ১০
৬৩। সুরা তাওবা: ১০২
৬৪। ইবন মাজাহ: ১১০৫
৬৫। ইবন মাজাহ: ১১০০
৬৬। ইবন মাজাহ: ১১০২
৬৭। ইবন মাজাহ: ১১৪
৬৮। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৪৫
৬৯। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৪৫
৭০। লাতায়েফুল মাআরেফ: ২৪৫
৭১। মাহনামা আলমুকাররম, আবদুল মান্নান নূরপুরি সংখ্যা
৭২। তিরমিজি: ২৯২৭
৭৩। আবু দাউদ: ৩৪৮৭