📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 রমাদ্বানঃ বৈশিষ্ট্য ও তার মর্যাদা

📄 রমাদ্বানঃ বৈশিষ্ট্য ও তার মর্যাদা


রব্বে কারিমের ইরশাদ করেন,
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ
তিনি তোমাদের রব, তিনি যা চান সৃষ্টি করেন এবং যাকে চান মনোনীত করেন। তাদের মাঝে কারোরই কোন ইখতিয়ার নেই। (৪)
রমাদ্বান মাস ঐ পবিত্র মাস যাকে আল্লাহ তাআলা সকল মাস হতে মর্যাদাবান করেছেন। এই বরকতময় মাসকে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ করার জন্য মনোনীত করেছেন। অবশ্য বছর জুড়ে আরও কিছু দিন বা আছে যেগুলোকে অন্যান্য সাধারণ দিনগুলোর তুলনায় ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময় করা হয়েছে। যেমন, জুলহিজ্জা মাসের শেষ দশক, আইয়ামে তাশরিক, দুই ঈদের দিন, আশুরার দিন এবং হারাম মাসগুলো। কিন্তু রমাদ্বান মাসের বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য হল এটি পূর্ণ এক মাসের ইবাদতের মাস। এ মাসের বৈশিষ্ট্যাবলী ও মর্যাদার দিকে দৃষ্টিপাত করলে নিম্নলিখিত শিরোনামগুলো হিরের মত ঝলমল করতে থাকে —
এই মুবারক মাসে কুরআনে হাকিম নাজিলের সূচনা ঘটে —
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ ، فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكْبَرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
রমাদ্বান মাস হল সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা'আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। (৫)
এ পবিত্র ও বরকতময় মাসে লাইলাতুল কদরে লওহে মাহফুজ থেকে আসমান এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়।
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
আমি একে নাযিল করেছি শবে-কদরে। (৬)
এটা তো ঐ পবিত্র মাস যে মাসে ঈমানের হালতে, সাওয়াবের আশায় রোজা রাখা হলে পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। (৭)
এটা ঐ বরকতময় মাস যাতে শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (৮)
এটা ঐ আলোকিত মাস যে মাসে জাহান্নামের দরজাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয় আর জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। (৯)
এটা ঐ সম্মানিত মাস যাতে রোজাদারকে রব্বে কায়েনাত দুই খুশি দান করেন। এক, ইফতারের সময়; দুই, রব্বুল ইযযতের সামনে হাজির হওয়ার সময় ।(১০)
এই মাসের মধ্যে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাস হতে অধিক মর্যাদাপূর্ণ।
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। (১১)
এটা ঐ প্রিয় মাস যাতে রোজাদারদের মুখের দুর্গন্ধ রব্বে কারিমের কাছে মেশক আম্বর ও কস্তুরি হতে অধিক পছন্দনীয়। (১২১)
এটা ঐ বরকতময় মাস যে মাসে উমরাহ করলে হজের বরাবর সাওয়াব হাসিল হয়। (১৩)
এই পবিত্র মাসে সিয়াম পালনকারীর জন্য তাঁর সিয়াম জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচার জন্য ঢাল হয়ে যায় এবং রোজাদারকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচানোর মাধ্যম হয়ে যায়। (১৪)
এটা ইবাদতের সেই মাস যে মাসে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের নৈকট্য হাসিল করার জন্য দুনিয়া ও দুনিয়ার অন্যান্য ব্যস্ততা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে মাসজিদে ই'তিকাফ করা হয়। যার ফজিলত অন্যান্য সাধারণ দিনে ইতিকাফ করার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। (১৫)
রমজান ঐ সম্মানিত মাস যে মাসে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ সা: জিবরীল (আঃ) এর সাথে মিলে কুরআনে কারিমে দাওর [একে অপরকে তিলাওয়াত করে শোনানো] দিতেন। (১৬)
রমজান ঐ আলোকিত মাস যার আলোকিত রাতে আল্লাহর বান্দারা একসাথে মিলে কিয়ামুল লাইল তথা তারাবীর সলাত আদায় করে থাকে। (১৭)
রমজান ঐ কল্যাণময় মাস যাতে নবী করিম দান করার ক্ষেত্রে অন্যান্য সাধারণ মাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যেত। আনাস (রা.) বলেছেন, 'আমি নবী করিম -এর চেয়ে কাউকে অধিকতর দয়ালু দেখিনি।'(১৮)
এরকমভাবে কুরআন ও হাদীসের আলোকে রমাদ্বানের গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক। অন্য যে কোন মাসের চেয়ে বহুলাংশে বেশী।
আমাদের সম্মানিত সালাফগণ ভাগ্য, কল্যাণ, ইজ্জত ও ইহতিরামে ভরপুর এই মাসে সকল প্রকার আমলে সালেহ করে কাটাতেন। এই বরকতময় মেহমানকে প্রফুল্লতা ও উদ্যমের সাথে স্বাগত জানাতেন।
চলুন আমরা পিছনে ফিরে যাই। সামান্য পিছনে ফিরে দেখি। সোনালি যুগের মানুষেরা কিভাবে রমাদ্বান মাস কাটিয়েছেন। সে দিকে একটু নজর দেই। নিজেরাও রমাদ্বানের প্রতিটি মুহুর্তকে তাকওয়া, সবর ও শোকর দ্বারা ভরপুর করে এ মাসটিকে কাজে লাগাই। ওয়ামা তাওফীকি ইল্লা বিল্লাহ।
* আসলাফ দ্বারা কাদেরকে উদ্দেশ্য?
আসলাফ হল সালাফ' এর বহুবচন। যার অর্থ হল, প্রথম। আর আসলাফ দ্বারা উদ্দেশ্য পূর্বেকার নেককার মানুষগণ।
ইসলামী শয়িয়তের পরিভাষায় আসলাফ দ্বারা ঐ সকল ব্যক্তিবর্গ উদ্দেশ্য যাদের যুগ নবি কারিম এর যুগের নিকটবর্তী যুগ। উদাহরণসরূপ সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইনে ইযাম, তাবে-তাবেইন।
নবী আকরাম এই তিন যুগের ব্যাপারে ইরশাদ করেন - “আমার উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম আমার প্রজন্ম। এরপর তৎসংলগ্ন প্রজন্ম (তাবেইনদের প্রজন্ম)। তারপর তৎসংলগ্ন প্রজন্ম (তাবে-তাবেইনর প্রজন্ম)।"(১৯)
রাসুলুল্লাহ এর এই হাদিস মোতাবেক সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন ও তাবে তাবেইন এই তিন শ্রেনীর মানুষ খায়রুল কুরুনের আলোকোজ্জ্বল ঝর্ণাধারা ও কেন্দ্রবিন্দু।
তাদের মধ্যে প্রথম হল সাহাবায়ে কিরামের যুগ, যাদের ব্যাপারে নবীজি ইরশাদ করেন-
فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء المهديين الراشدين تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ وإياكم ومحدثات الأمور فإن كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة
তোমাদের জন্য আবশ্যক হল আমার সুন্নত ও আমার খোলাফায়ে রাশিদিনের সুন্নতকে মজবুতভাবে, দাঁতের দ্বারা আঁকড়ে ধরা এবং নতুন নতুন আবিষ্কৃত বিষয় ও কাজ হতে বাঁচা। কেননা দ্বীনের মাঝে প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বিষয় ও কাজ বিদআত আর প্রত্যেক বিদআত গোমরাহি তথা পথভ্রষ্টতা। (২০)
কুরআন ও সুন্নতের ওপর আমল করার ক্ষেত্রে এই তিন যুগের ব্যক্তিগণ ইসলামের প্রথম সারিতে ছিলেন এবং তাঁরাই আমাদের জন্য রাহনুমা। এই মহান ব্যক্তিগণ হলেন তারা যাদেরকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন রিসালাতের সূর্য দ্বারা সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং নিকটবর্তী মাধ্যম দ্বারা তাদেরকে তার রহমত দান করেছেন। দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করেছেন।
এই তিন যুগের মানুষের দ্বীনের বুঝ ছিল স্বচ্ছ ও নির্ভেজাল। আসলাফদের ইলম অর্জনের ও দ্বীন পালনের চেষ্টা ও কোশেশ এতটাই খাঁটি ছিল যে, যেখানে বিদআত, খাহেশাত এবং বাতিল ও ভ্রান্ত-আকিদার ধুলোবালি লাগেনি। দ্বীনের প্রতি তাদের মুহব্বত, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী দ্বীনের বুঝ, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আমল, যুহুদ, আল্লাহভীতি এতটাই প্রবল ও খাঁটি ছিল যে সেখানে একফোঁটা পানিও ঢুকতে দেননি তাঁরা।
খায়রুল কুরুনের পর সে সকল লোক যারা তাদের জীবনকে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেইনদের রঙে রাঙিয়েছেন, ইবাদত ও মুআমালাতের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহকেই সামনে রেখেছেন, দুনিয়া থেকে দূরে থাকা ও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে আসলাফদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন - এই সকল ব্যক্তিদেরকে সালাফে সালিহীন নামে স্মরণ করা হয়ে থাকে।
উনাদের শত শত আমলের মাঝে আমরা আলোচ্য বইটিতে দেখব, রমাদ্বান মাস আসলে উনারা কী করতেন? কিভাবে কাটত তাদের সিয়াম পালন, রমাদ্বান উদযাপন। কতটা গুরুত্বের সাথে এই মহান মাসের সাথে উনারা নিজেদেরকে জড়িয়ে রেখেছেন।

টিকাঃ
৪। সূরা কাসাস, আয়াতঃ ৬৮
৫। সূরা বাকারা, আয়াতঃ ১৮৫
৬। সূরা কদর, আয়াতঃ ১
৭। সহীহ বুখারি: ৩০১৪
৮। বুখারি: ৩২৭, মুসলিম: ১০৭৯
৯। সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৩৬৬
১০। বুখারি ১৯০৪, মুসলিম: ১১৫১
১১। সূরা কদর, আয়াতঃ ৩
১২। সহীহ বুখারি: ১৮০৫
১৩। বুখারি: ৭২৮, মুসলিম: ১৩৫৬, ইবনে মাজাহ: ২৯৯২
১৪। বুখারি: ১৮৯৩
১৫। বুখারী ও মুসলিম।
১৬। সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৯০২
১৭। মুআত্তা ইমাম মালিক, প্রথম খণ্ড, ১১০ পৃষ্ঠা, হাদিস: ২৮
১৮। সহীহ মুসলিম
১৯। বুখারি: ৩৬৫০, মুসলিম।
২০। আবু দাউদ: ৪৬০৭

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 অপেক্ষার প্রহর

📄 অপেক্ষার প্রহর


সাহাবায়ে কিরাম এবং সালাফে সালিহিনগণ রমাদ্বানের গুরুত্ব ও ফজিলত পুরোপুরি মনে প্রাণে ধারণ করতেন। সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইতেন না। কুরআনুল কারিম ও নবীজি এর হাদিসগুলোকে উনারা শুনতেন, বারবার পড়তেন। সাহাবায় আজমাইন (রাঃ) তো কাজেকর্মে রিসালাতের যুগে রমাদ্বানের আলোকিত রাতগুলো এবং আলোকিত ভোরগুলোকে নিজ চোখে দেখছেন।
আমাদের আসলাফগণ মাগফিরাতের এই মাসের ঠিক সেইভাবে অপেক্ষা করতেন যেভাবে একজন নববধূ তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কোন কোন আসলাফ রমাদ্বান আসার ছয়মাস আগে থেকেই দুআ করতেন, আল্লাহ তায়ালা যেন তাদেরকে রমাদ্বান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন। আবার রমাদ্বান চলে যাবার পর দুআ করেতেন, আল্লাহ তায়ালা যেন রমাদ্বানে কৃত আমলগুলোকে কবুল করে নেন। (২১)
আসলাফগণ অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন এবং তাবে-তাবেইনগণ পুরো বৎসরই রমাদ্বানের রহমত ও বরকত দ্বারা ফায়দা হাসিল করতে এতটাই মরিয়া ছিলেন। কখনও তারা রমাদ্বানের আগমনের কারণে খুশিমনে এর আদব বজায় রেখে, সম্মানের সাথে এর তাকাযা পূরণ করতেন আবার কখনও রমাদ্বান চলে যাওয়ার কারণে কৃত আমল ও সুলুক থেকে আহরিত সুবাসগুলোকে স্থিতিশীল ও অব্যাহত রাখার চেষ্টায় রত থাকতেন। রমাদ্বানের শিক্ষাই তো এটা। নিজেকে পরিশুদ্ধি এবং তাঁর উপরেই অটল থাকা।
সম্মানিত সালাফগণ নবী এর অনুসরণ ও অনুকরণের মাঝেই আসল মজা পেতেন। নবীজি নিজেও রজব ও শাবান মাসে রমাদ্বান মাসের অপেক্ষায় মগ্ন হয়ে যেতেন। রমাদ্বান মুবারকের সুক্ষ্মতা ও তার অবস্থাকে অনুভব করার জন্য প্রায় পুরো শাবান মাস রোজা রেখে কাটিয়ে দিতেন।
উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) রাসূল কে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে শাবান মাসে যে পরিমান সিয়াম পালন করতে দেখি অন্য মাসে তা দেখি না। এর কারণ কী? তিনি বললেন,
"রজব এবং রামাদ্বানের মধ্যবর্তী এ মাসটি সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে অথচ এটি এতো গুরুত্বপূর্ণ মাস যে, এ মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে মানুষের আমলসমূহ উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি চাই সিয়াম অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক। (২২)
আম্মাজান হযরত আ'ইশা সিদ্দিকা (রাঃ) শাবানে রাসুলুল্লাহ এর আমলের ব্যাপারে বলেন,
"রাসুলুল্লাহ এর নিকট সিয়াম পালনের জন্য শাবান মাস অন্য মাসের তুলনায় বেশি প্রিয় ছিল। অতঃপর তিনি এই মাসে এতো সিয়াম পালন করতে যে, এটিকে রমাদ্বানে সাথে মিলিয়ে দিতেন। (২০)
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আ'ইশা (রাঃ) বলেন, রাসূল যখন (নফল) সিয়াম রাখতে শুরু করতেন তখন আমরা বলতাম, তিনি সিয়াম রাখা আর বাদ দিবেন না। আবার যখন সিয়াম বাদ দিতেন তখন আমরা বলতাম, তিনি আর সিয়াম করবেন না। তবে তাঁকে রমাদ্বান ছাড়া পরিপূর্ণভাবে অন্য কোন মাসে সিয়াম রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোন মাসে এত বেশি সিয়াম রাখতে দেখিনি। "(২৪)
তবে উম্মতের জন্য নবীজি এর দয়া ও করুণা ছিল বিধায়, শাবান মাসের শেষের দিকে তিনি বিরতি দিতেন। অর্থ্যাৎ শাবানের প্রথমদিকে সিয়াম পালন করতেন আর শেষের দিকে ছেড়ে দিতেন। অন্যথায় সালাফে সালিহিন এবং সাধারণ মুসলমান শাবানকে রমাদ্বান বানিয়ে ফেলতেন।
অতঃপর রমাদ্বানুল মুবারকের আগমনে এতটাই খুশি ও আমেজ ছড়িয়ে পড়ত যে, চাঁদ দেখার জন্য সাহাবায়ে কিরাম ও সালাফে সালিহিনগণ পাহাড়ের দিকে ছুটে দৌঁড়াতেন। খোলা ময়দানেও চাঁদ দেখার জন্য একত্রিত হতেন। চাঁদ দেখে সাহাবায়ে কিরাম ও আমাদের সালাফগণের ঠোটে দুআ এসে যেত, যে দুআ নবীজি নতুন চাঁদ দেখার সময় পাঠ করতেন।
আর সে দুআ আটি ছিল -
اللهم أهله علينا باليمن والإيمان والسلامة والإسلام ربي وربك الله
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-যুমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি- রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।
অর্থ: হে আল্লাহ! চাঁদকে আমাদের জন্য শান্তি ও ইমান, সালামত ও ইসলামের সুরতে উদিত করুন। হে চাঁদ! তোমার আর আমার রব আল্লাহ, এই চাঁদ কল্যাণ ও হিদায়াতের। (২৫)
শুধু তাই নয়, রিসালাতের আলো চাঁদ দেখার পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবীজি চাঁদ দেখার জন্য চাঁদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকাকে অপছন্দ করতেন আর বলতেন, চাঁদ দেখে ফেলেছ এবার স্ব স্ব রাস্তা দেখো আর দুআ করতে থাকো।
ইমাম ইবন শায়বা (রহ) বলেন, যখন চাঁদ দেখ তখন চাঁদের দিকে মুখ উঠাবে না। বরং দেখার পর এতটুকু বলে দেওয়াই যথেষ্ট তোমার রব ও আমার রব আল্লাহ। (২৭)
উল্লেখ্য, যখন নতুন চাঁদ দেখা যেত তখন চন্দ্রপূজারীরা চাঁদের সামনে দাঁড়াত এবং তার সিজদা করত। আমাদের সালাফগণ এই বিষয়ের যথেষ্ঠ সতর্কতা অবলম্বন করতেন যাতে করে আহলে শিরক ও কুফরের সাথে সামঞ্জস্য না হয়ে যায়।
কেননা, নবীজি ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন কওমের সাথে সামঞ্জস্য রাখল যে ঐ কওমের অন্তর্ভুক্ত। (২৮)

টিকাঃ
২১। লাতায়েফুল মাআরেফ
২২। মুসনাদ আহমাদ ৫ম খন্ড ২০১ পৃষ্ঠা। সুনান নাসাঈ, কিতাবুস সিয়াম।
২৩। আবু দাউদ, কিতাবুস সিয়াম: ২৪৩
২৪। বুখারী, কিতাবুস সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম।
২৫। তিরমিজি: ৩৪৫১, আবু দাউদ: ৫০৯২]
২৬। তিরমিজি: ৩৬১৫, হাকিম: ৪/২৭৫, আহমদ: ১/১৬৩
২৭। মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা
২৮। আবু দাউদ: ৪০৩১

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 মুবারক হো মাহে রমাদ্বান

📄 মুবারক হো মাহে রমাদ্বান


কুরআনুল কারিমের রমাদ্বান মাসে নাজিল হওয়াতে এর মর্যাদা ও সম্মান অনেক গুণ উঁচুতে পৌঁছে গেছে। আল কুরআন - মানবজাতির পথের দিশা, আঁধারের আলো ও মানজিলে মাকসুদে পৌঁছার প্রদীপ, দয়াময়ের কালাম এবং বান্দার সাথে তাঁর রবের বার্তালাপের পবিত্র মাধ্যম। মুসলিমের দৃষ্টিতে সেই পাত্র, কাগজ, গিলাফ ও রিহালও সম্মানের বস্তু এবং চোখের শীতলতা যার মাঝে মুসহাফকে রাখা হয়। তাদের কাছে পবিত্র রমাদ্বান মাসের সম্মানও ঢের বেশী যে মাসে কুরআনুল কারিমকে নাজিল করা হয়েছে। রব্বে করিম সিয়ামকে ফরজ করে এই মাসের আদব ও সম্মানকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেছেন। সিয়াম পালনের সাথে কুরআনুল হাকিমের সম্পৃক্ততার কারণে এ মাসের নিম্নবর্ণিত দাবি রয়েছে -
- এর আগমনে খুশি প্রকাশ করা।
- সিয়াম, কিয়ামুল লাইল, কুরআন তিলাওয়াত, জিকর-আজকারের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া।
- বেশী বেশী নেকি অর্জন করা এবং প্রত্যেক গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
- মুসলিম ভাইবোনদেরকে নিজের উপর প্রাধান্য দেওয়া ও উদারতা দেখানো।
- সিয়াম অবস্থায় শাহওয়াত ও প্রবৃত্তি হতে বাঁচা।
এছাড়াও রমাদ্বানুল মুবারকের সম্মানের সবচেয়ে বড় বাহ্যিক দিক হল, যার উপর কোন শরয়ি ওজর থাকে তাকেও প্রকাশ্যে খাবার গ্রহণে বাধা দেওয়া। যেমন, রোগী, শিশু এবং গর্ভবতী ইত্যাদি। এমন লোকদের যদি খাবার গ্রহণের প্রয়োজন হয় তাহলে অন্যান্য লোকদের থেকে আড়ালে গিয়ে গ্রহণ করবে। সাহাবায়ে কিরামগণ রমাদ্বানের ইহতিরাম করা এবং দিনের বেলায় খানাপিনা থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, তাদের সাথে সাথে বাচ্চাদেরকেও রোজা রাখতে আদেশ দিতেন।
সাইয়িদা রুবাই বিনতু মুআওয়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন, "আমরা বাচ্চাদেরকেও রোজা রাখাতাম এবং তাদেরকে পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় এসে যেত। (২৯)
বাচ্চারা যদিও ফারায়েজসমূহ আদায় করার ওপর আদিষ্ট নয় তবুও তাদেরকে বাল্যকাল থেকেই ফারায়েজসমূহ আদায় করার অভ্যাস করানো উচিত।
সাইয়িদুনা আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর খেদমতে আরজ করলাম, আমাকে এমন কোন আমলের কথা বলে দিন যার বদৌলতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমাদের ওপর আবশ্যক হল, সিয়ামকে আঁকড়ে ধরা। কেননা এর মত কোন আমল নেই। এরপর আবু উমামা (রাঃ) এর ঘরে দিনেরবেলায় ধোঁয়া দেখা যেত না। তবে যদি তার ঘরে মেহমান এসে যেত। (৩০)
উল্লেখ্য, মেহমানের উপর সিয়াম পালন ফরজ না। তার ব্যাপারে অনুমতি আছে যে, সে রমাদ্বানে সফরের হালতে সিয়াম ছেড়ে দিবে এবং পরবর্তীতে সংখ্যানুপাতে তা পুরো করে নিবে। কিন্তু সে জনসম্মুখে খানাপিনা করবে না। এর ইজাজত নেই। এমতবস্থায় যদি কোন মেহমান এসে যায়, এবং সে সিয়াম পালন না করে থাকে, তাহলে মেজবানের উচিত কিছু রান্না করা থাকলে তাকে খাওয়ানো। অবশ্য যদি রান্না করা না থাকে তাহলে রান্না করাটা কষ্টের।
আজকাল আমাদের সমাজে লক্ষ্য করলে দেখা যায় বাচ্চারা কিংবা অন্যান্য ওজরওয়ালা লোকেরা জনসম্মুখেই খানাপিনা করে থাকে। দোকানপাট খোলা থাকে, হোটেলগুলোতেও খাবার দাবারের ব্যবস্থা জারি রাখা হয়। রমাদ্বানে জনসম্মুখে খানাপিনা পরিহার করা আবশ্যক কেন? এর মাঝে কি হিকমাহ লুকিয়ে থাকতে পারে?
* নিম্নবর্ণিত হিকমাহ নিহিত আছে-
রমাদ্বানে সিয়াম পালন করা এবং খানাপিনা থেকে বিরত থাকার বৈশিষ্ট্য এই মাসকে অন্যান্য মাস থেকে পৃথক করে দেয়। যদি এট বজায় না রাখা হয় তাহলে তো রমাদ্বানে অনন্যতা ও মর্যাদাই খতম হয়ে যায়।
প্রকাশ্যে খাওয়া দাওয়া পরহার করে মুসলিম সমাজে এটা প্রতিষ্ঠিত করা যে, আমি মুসলিম আর এই মাস আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করে সিয়াম সাধনা করার মাস।
যদি রমাদ্বানে দোকান পাট খোলা রাখা হয়, শিশু বাচ্চা ও মাজুর ব্যক্তি মানুষের সামনে প্রকাশ্যে খাবার খায় তাহলে দুর্বলদের মনে উৎসাহ এসে যাবে যে, সিয়ামের অতোটা গুরুত্ব নেই। সবাই খাচ্ছে। কাজেই, সিয়াম পালনের দরকার নেই।
যারা বাস্তবিকপক্ষেই মাজুর, সিয়াম পালনে অক্ষম - তাদের নিদেনপক্ষে জনসম্মুখে খানাপিনা পরিহার করে সিয়াম পালনকারীদের সাথে আত্মীকভাবে সাদৃশ্যতা বজায় রাখা উচিৎ।
রমজানুল মুবারক সার্বিকভাবে মুসলমাজাতির ইবাদত এবং এর পবিত্রতা রক্ষার মহত্ব দেওয়া হয়েছে এই জাতিকে। যে ব্যক্তি সিয়াম পালনে অক্ষম তার ব্যাপারেও জোর দেওয়া হয়েছে যে, সে-ও এই হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সদা প্রস্তুত থাকবে। তাই সবার সামনে খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকে রমাদ্বানের অন্যান্য আহকাম ও আদব পালনে ব্রতী হবে। সিয়াম পালনে অক্ষম ব্যক্তিরা সলাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, কিয়ামুল লাইল, বদান্যতা-উদারতা, দান সদাক্বা এবং অন্যান্য নেক আমলের প্রতি দরদী থাকবে। অন্যান্য সিয়াম পালনকারীদের মতো এই আমলগুলোর পাবন্দি করতে হবে।
রমাদ্বানের সিয়াম একটি ইজতিমায়ি ইবাদত, যা সকলেই আদায় করে। এজন্য প্রত্যেক দারিদ্র, রোগী ও মাথুর ব্যক্তিকেও এই ইবাদত আদায় করার জন্য সাধ্যমত অংশ নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রতিদান ও সুসংবাদ হাসিল করতে হবে।
রমাদ্বানুল মুবারকের এই বৈশিষ্ট্য এবং অনন্য মর্যাদা মুসলিমদের কাছ থেকে দাবি করে যে, তারা রমাদ্বান মাসের এই ইজতিমায়ি ইবাদতের মাধ্যমে ইজতিমায়ি এবং রুহানি ফায়দাসমূহ দ্বারা নিজেদেরকে উপকৃত করতে পারে।
আমাদের সালাফগণ রমাদ্বানের সকল হুকুম-আহকাম ও আদবগুলোকে পালন করার ক্ষেত্রে অগ্রজ ভূমিকা পালন করতেন। প্রতিটি হুকুম ঠিকঠিকভাবে আদায় করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।
এ ব্যাপারে একটি হাদিসে এসেছে। সাইয়িদুনা আদি ইবনু হাতেম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যখন -
حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود
অর্থাৎ, তোমরা পানাহার কর (রাত্রির) কালোরেখা হতে (ভোরের) সাদা রেখা যতক্ষণ স্পষ্টরুপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়"
এই আয়াত নাজিল হয় তখন আমি একটি কালো এবং সাদা রশি নিলাম। এবং উভয়টিকে বালিশের নিচে রেখে দিলাম এবং রাতে আমি এগুলোর একটির দিকে বারবার দেখতে থাকলাম। কিন্তু আমার নিকট কোন রং প্রকাশিত হল না। সকাল হলে আমি আল্লাহর রাসুল ﷺ এর নিকট গিয়ে এ বিষয়ে বললাম। তিনি বললেন, তোমার বালিশ তো অনেক বড় যে, উভয় দিগন্তকে এক করে ফেলেছে। অতঃপর বললেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য রাতের আঁধার এবং দিনের আলো। এমনিভাবে কিছু সাহাবায়ে কিরাম সাদা ও কালো রশি পায়ে বেঁধে নিতেন এবং দেখতেন যে দুটোর রং আলাদা আলাদা আসত কিনা?(৩১)
এই ছিল সাহাবায়ে কিরামের সিয়ামের ব্যাপারে সতর্কতার নমুনা। রাসূলে আকরাম সুন্দরভাবে খোলাসা করে দেওয়ার পর তাদের কাছে এর উদ্দেশ্য প্রতিভাত হয়।
এরপর থেকে সাহাবায়ে কিরাম এবং পরবর্তী সালাফগণও সাহরীর জন্য শুভ্র প্রভাতের প্রতি নজর রাখতেন এবং ইফতারের সময় দেখতেন, সূর্য ডুবে গিয়ে তার রক্তিম আভা কখন অদৃশ্য হয়ে যায়।
সিয়াম পালন করে নিজের ভিতরে দৈনতা অনুভব করা এই মহান ইবাদতের আদবের বরখেলাফ। মুসলিমের উচিৎ, তারা প্রত্যেক ইবাদতকে পরিপূর্ণ কর্মক্ষমতা, একাগ্রতা, প্রফুল্লতা ও প্রশান্তচিত্তে আদায় করবে। ইবাদতের কারণে তাদের চেহারায় হতাশার ছাপের বদলে যেন প্রাণবন্ত এক রূপ আসে। এমন যেন না হয় যে, সিয়াম পালনের কারণে তাঁর চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ লেগে আছে। বোঝা উচিৎ, সিয়াম আমাদের জন্য বোঝা নয় বরং রহমত। যার দুনিয়াবী আখিরাতমূখী কল্যাণ আছে।
আমাদের সালাফগণ এই বিষয়টির প্রতি বিষেশ গুরুত্বারোপ করতেন। এ কারণে সিয়ামাবস্থায় গোসল করা, চিরুণী লাগানো, চুলে তেল দেওয়া মিসওয়াক করা এবং আতর লাগানো সব জায়েয। যাতে মনের ভিতরে একট প্রফুল্লভাব চলে আসে।
বর্তমান যুগে বেশির ভাগ মুসলিম সিয়াম পালন করে বিছানায় শুয়ে পড়ে থাকেন। তাঁরা মনে করে যে, সিয়াম পালনের কারণে সে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারো কারো তো মুখের দিকেই চাওয়া যায় না। কেউ কেউ তো বলেই বেড়ায় যে, আমার রোজা লেগে গেছে, রোজায় ধরেছে, পিপাসা লেগেছে, আজকে তো তারাবিহই পড়তে পারিনি, উফ! কত গরম। ঠান্ডা পানি দেখে পানি পান করতে মনে চাচ্ছে... ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঠিক একইভাবে ইফতারের সময় বেশিরভাগ মানুষ ইফাতারী নিয়ে পড়ে থাকে। কঠিনভাবে বলতে গেলে, আল্লাহর এক আনুগত্যশীল বান্দার মেজাজ বা অবস্থা এমনটি হওয়া উচিত নয়। ইফতারের সময় পুরো আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশান্তির সাথে ইফতারি গ্রহণ করা উচিত। বাড়াবাড়ি ও তাড়াহুড়া করা উচিৎ নয়।
জামাআত দাঁড়িয়ে যাবার পরেও মাসজিদের দিকে দৌঁড়ে গিয়ে জামাআতে শামিল হওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে। যদি ইবাদতের মাঝেও হাঙ্গামা, তরাপ্রবণতা, মারামারি, আমি আগে ও আমারটা আগে এমন বিষয় শামিল হয়ে যায় তাহলে সে ইবাদত আর ইবাদত থাকে না।

টিকাঃ
২৯। সহিহ বুখারি: ১৯৬০
৩০। ইবনু হিব্বান: ৯২৯, হাকিম: ১/৪২১
৩১। বুখারি: ১৯১৬ (শামেলা ভার্সন)

📘 সালাফদের সিয়াম > 📄 সালাফদের গ্রীষ্মকালীন এবং সফরকালীন সিয়াম

📄 সালাফদের গ্রীষ্মকালীন এবং সফরকালীন সিয়াম


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা চন্দ্র-সূর্যের বিবর্তন এমন এক নিয়মে সাজিয়েছেন যে, কোন এলাকায় কখনও রাত লম্বা হয়, কখনও বা দিন লম্বা হয়। লম্বা দিনে গরমের মৌসুমে সিয়াম সাধনা খানিকটা কঠিন হয়ে যায়। পৃথিবীর কোনো অংশতো এমনও রয়েছে যেখানে প্রচন্ড গরম থাকে এবং ২১-২২ ঘন্টা দিন থাকে। তারপরেও মুসলিমজাতি অত্যন্ত আদব, ইখলাস এবং হিম্মতের সাথে সিয়াম পূর্ণ করে থাকে। ফালিল্লাহিল হামদ।
সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন, তাবে-তাবেইন তথা সলফে সলেহিনগণ তীব্র গরমের সিয়ামকেও অত্যন্ত মুহাব্বতের সাথে পালন করতেন। দিন যত লম্বা হয়, গরম তত বেশি লাগে। কাজেই সালাফগণ দীর্ঘক্ষণ সিয়াম পালন করে কুরআন তিলাওয়াত করার ফুরসত বেশি পেতেন। কুরআন তিলাওয়াতের সময় তাদের চোখের সামনে জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনের চিত্র ভেসে উঠত। কাজিএ দুনিয়াবী গরম তাদেরকে ভোগাতে পারত না। কালামে পাক তিলাওয়াত করার সময় তাদের অবস্থা এমন হত যে, জাহান্নামবাসীর চিৎকার তারা শুনতে পাচ্ছেন। জাহান্নামবাসী পিত্ত, রক্ত এবং পূজমিশ্রিত পানি পান করছে সেগুলোও তাঁরা দেখতে পাচ্ছে। তিলাওয়াত করতে করতে জাহান্নামের ভয়ে তাদের দম বন্ধ হয়ে আস্ত। জাহান্নামের ভয়ে তো কেউ কেউ হাসি-মশকরা ছেড়ে দিয়েছিল। কেউ কেউ আবার আতংকে বিছানায় খুব কষ্টে পিঠ ঠেকাতেন। কেউ কেউ শুধু জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবার আশায় ভুখাদেরকে খানা খাওয়াতেন নাঙ্গাদেরকে কাপড় পরাতেন, দাসদাসীদের আজাদ করে দিতেন। অবশ্যই তারা নবীজি এর হাদিসের উপর পরিপূর্ণ ইয়াকিন হাসিল করেছিলেন।
রাসুলে আকরাম ইরশাদ করেন, "রোজা হলো ঢাল ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার মজবুত দুর্গ।"(৩২)
অপর হাদীসে এসেছে, রোজা আগুন হতে বাঁচার জন্য ঢাল। যেমন তোমাদের মাঝে কোন ব্যক্তির ঢাল যুদ্ধে বাঁচায়। (৩৩)
আমাদের সালাফরা জানতেন যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কাছে সিয়াম পালন অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। হাদিসে কুদসিতে এসেছে,
প্রত্যেক আমলই বান্দার জন্য, সিয়াম ব্যতীত। কেননা সিয়াম আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব। সে আমার জন্যই খাদ্য ও পানীয় এবং শাহওয়াত থেতে দূরে থাকে। (৩৪)
এ ব্যাপারে আরেক হাদিসে এসেছে-
حدثنا إبراهيم بن موسى أخبرنا هشام بن يوسف عن ابن جريج قال أخبرني عطاء عن أبي صالح الزيات أنه سمع أبا هريرة رضي الله عنه يقول قال رسول الله صلى الله عليه وسلم قال الله كل عمل ابن آدم له إلا الصيام فإنه لي وأنا أجزي به والصيام جنة وإذا كان يوم صوم أحدكم فلا يرفث ولا يصخب فإن سابه أحد أو قاتله فليقل إني امرؤ صائم والذي نفس محمد بيده الخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك للصائم فرحتان يفرحهما إذا أفطر فرح وإذا لقي ربه فرح بصومه
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেন, আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, রোজা ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি আমলই তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা আমার জন্য। তাই আমি এর প্রতিদান দেব। রোজা ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবাং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন রোজাদার। যার কবজায় মুহাম্মদের প্রাণ তার শপথ! অবশ্যই রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের গন্ধের চাইতেও সুগন্ধি। রোজাদারের জন্য রয়েছে দুটি খুশি যা তাকে খুশি করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন রোজার বিনিময়ে আনন্দিত হবে। (৩৫)
রোজাদার ব্যক্তির ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট ম্লান হয়ে যায় মালিকের কাছ থেকে এমন প্রতিদানের প্রতিশ্রুতির জন্য। তাই তো ইফতারির সময় পানি দ্বারা শরীর ঠান্ডা করে নবীজি আল্লাহর কাছে আশা ব্যক্ত করে আদবের সুরে বলে উঠতেন যে,
« ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ »
উচ্চারণ: যাহাবায যামাউ, ওয়াব তাল্লাতিল উরুকু ও ছাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ্।
অর্থ: পিপাসা দূরীভূত হয়েছে, শিরা-উপশিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ প্রতিদানও নির্ধারিত হয়েছে। (০৬)
এই সকল শব্দের বুনন দিয়ে নবীজি রবের শুকরিয়া ও সবর আদায় করতেন এবং আশপাশে উপস্থিত ফিরিশতা এবং মানুষদেরকে এই আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করে সাক্ষী বানিয়ে রাখতেন।
সালাফগণ জানতেন, রোজা রেখে পিপাসা সহ্য করে যদি জান্নাতের রাইয়ান নাম দরজা দিয়ে প্রবেশ করার ইজাজত মিলে যায় তাহলে তো এটা অনেক বড় মুনাফার সওদা।
সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) তো সেই সৌভাগ্যের যুগও দেখেছেন যখন দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা ফরজ হওয়ার সময় গ্রীষ্মকালীন মওসুম ছিল। মক্কা মুকাররমা দশ হিজরির রমাদ্বানুল মুবারকে বিজিত হয়। তখন প্রচন্ড গরম ছিল। আরবের ঝলসে দেওয়া মরুভূমি এবং ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেড়া পাথুরে ও গরমে ঝলসে দেওয়া ভূমির সফর সম্মুখে ছিল। রাস্তায় কোন ছায়া ছিল না বললেই চলে। এতদসত্বেও সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম সিয়ামবস্থায় দুশমনদের মোকাবেলা করতে ঘর থেকে যুদ্ধের জন্য বের হয়েছিলেন। যখন নবিজি কাদিদ নামক স্থানে পৌঁছালেন তখন রোজা খুলে ফেললেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে হুকুম দিলেন রোজা খুলার জন্য। (০৭)
তদুপরি সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) জিহাদের সফরের সময় রোজা রাখার ব্যাপারে বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ এর সাথে তীব্র গরমের মাঝে বের হলাম। এমনকি আমাদের মাঝে কেউ কেউ গরমের তীব্রতার কারণে হাত মাথায় রাখত। আমাদের মাঝে কেউ রোজাদার কেউ ছিল না রাসুলুল্লাহ এবং আবদুল্লাহ ইবন (রাঃ) ব্যতীত। (৩৮)
সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, যারা জিহাদের ময়দানে সিয়ামাবস্থায় শাহাদাত বরণ করেছেন তাদেরকে গলায় লাগালেন। মুতার যুদ্ধে যখন যায়েদ বিন হারিসা (রাঃ) এবং জাফর তায়‍্যার (রাঃ) শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন তখন সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) আমির নিযুক্ত হন। রাসুলুল্লাহ ও নিজে যার তাগিদ দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) সেদিন সিয়ামরত ছিলেন। সূর্য অস্তমিত হওয়ার সময় তিনি মনে করলেন ইফতার করে নেই যাতে শরীরে শক্তি আসে, অতঃপর ময়দানে ফিরে যাওয়া যায়। ইফতারিতে তার সামনে গোশতের টুকরা আনা হয়। তিনি গোশত খেতে যাবেন, তাতে কোন আগ্রহ জন্মাল না। আগ্রহ জন্মাবেই বা কিভাবে? ওদিকে শাহাদাতের ময়দান তো তাদেরকে ডাকছিল। অগ্রবর্তীগণ তো ইতিমধ্যে তাদের শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে ফেলেছেন। তলোয়ার খাপ থেকে বের করার সময় খাপকেই ভেঙ্গে ফেলেন তিনি। শত্রুদের সারির ভিতর ঢুকে বীরদর্পে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে নিজের জীবনকে জীবনের মালিকের কাছে সোপর্দ করেন। (০৯)
আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) ও অন্যান্য বীর মুজাহিদ সাহাবা (রাঃ) আজমাঈন মনেপ্রাণে নবীজি এর এই হাদীসটি হৃদয়ে ধারণ করতেন –
"যে ব্যক্তি আল্লাহর রাহে একদিন সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে আসমান ও জমিনের দুরত্বের এক খন্দক বানিয়ে দিবেন। (80)
ফরজ সিয়াম তো পালন করা হয় আবশ্যকীয় এই কারণে। কিন্তু সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) এবং সম্মানিত সালাফগণ তো গরম মৌসুমেও নফল সিয়াম পালন করতে পছন্দ করতেন।
সাইয়িদুনা আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর ব্যাপারে বলা হয় যে, তিনি গরমকালেও নফল সিয়াম রাখতেন এবং শীতকালে নফল সিয়াম রাখতেন না। (৪১)
আম্মাজান আ'য়িশা (রাঃ), তিনিও প্রচন্ড গরমে নফল সিয়াম পালন করতেন। (৪২)
আবদুল্লাহু ইবন উমর (রাঃ) নফল সিয়াম পালন করতেন। প্রচন্ড গরমের তাপে বেহুশ হয়ে যেতেন। তবুও রোজা ভাঙতেন না। (৪০)
আবু দারদা (রাঃ) বলতেন, "কিয়ামতের দিনের কঠিন তাপ থেকে বাঁচার জন্য কঠিন গরমের দিনেও রোজা রাখো। কবরের আঁধারকে আলোকিত করার জন্য রাতের আঁধারে দুই রাকাআত নামাজ পড়ো। "(৪৪)
সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) গরমের দিনে সিয়াম পালনের আশা করতেন।
আমর বিন কায়স (রাঃ) একবার বসরা থেকে শামে গেলেন। মুআবিয়া (রাঃ) তখন সেখানকার খলিফা ছিলেন। শাম ছিল দারুল খিলাফা অর্থ্যাৎ রাজধানী। মুআবিয়া (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কোনকিছুর প্রয়োজন আছে কিনা, থাকলে আমাকে বলুন।"
তিনি বারবার তাঁর প্রয়োজনের ব্যাপারে জানতে চাইলেন। আমির বিন কায়স (রাঃ) প্রতিবারই তাঁর এই প্রস্তাবকে নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, "আমার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই।" অবশেষে মুআবিয়া (রাঃ) এর পীড়াপীড়িতে তিনি বলেন,
"আমাকে বসরার গরম আবহাওয়া ফিরিয়ে দিন। তাহলে হয়ত আমার সিয়াম পালন কঠিন হয়ে যাবে, আপনাদের শহরের রোজা অনেক হালকা। "(৪৫)
অথচ, আজকাল আমাদের সময়ে রমাদ্বান মাসে একটু গরম পড়লেই রোজাদারদের সংখ্যা কমে যায়। গরমের তীব্রতার কাছে জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা কম মনে হয়। এজন্য হয়ত এ মাসের গরম সহ্য করতে পারেনা। বিত্তশালীরা তো এয়ারকন্ডিশন রুমে রমাদ্বানের দিনগুলো আরামসে পার করে দেয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশির ভাগ লোকই এ কারণে রোজা রাখে না। আর রোজা রাখলেও, এমন একটা ভাব চোখেমুখে লেগে থাকে যে গরম তাদেরকে একদম শেষ করে দিয়েছে। হাপিত্যেশ করতে থাকে। গরমের দিনে সিয়াম পালন তাদের জন্য বিশাল এক সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মত মনে হয়।
কিন্তু সিয়ামের ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম ও সালাফগণের চিন্তা-চেতনা আমাদের চেয়ে একদম ভিন্ন ছিল। তারা শীতকালের সিয়ামকে হালকা মনে করতেন। আর গরমের দিনের সিয়ামকে কঠিন ও বেশি নেকী হাসিলের সুযোগ মনে করতেন। তাদের কাছে গরমকালের সিয়াম বেশি পছন্দনীয় ছিল।
আসলে সিয়াম হল আত্মিক বিষয়। ঈমানের বিষয়। দুনিয়ার সামান্য কষ্ট ভোগ করে আখিরাতের বড় কষ্ট থেকে নিজেকে মুক্ত করার বিষয়। রমাদ্বানে সালাফদেরকে গরম, ক্ষুধা ও পিপাসার মাঝেও বেশ প্রফুল্ল ও উজ্জীবিত দেখা যেত। তাদের উপরে বরকত, প্রশান্তি, আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ এবং তাওয়াজ্জুহ হাসিল হত।
তাদের ইমান ছিল আকাশছোঁয়া। আর আমাদের দুর্বল ইমানের কারণে সিয়াম পালন করা আজ আমাদের কাছে কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এমনকি সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর ক্রোধ দমন, সন্তুষ্টি অর্জন, জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুন থেকে বাঁচার মত সুপ্ত ও মূল্যবান নিআমতগুলোকে আমরা অনুভব করতে পারি না।
সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) সাথীদের সাথে কোন এক সফরে বের হলেন। রাস্তায় তার জন্য দস্তরখান বিছানো হল। এক রাখাল পথ দিয়ে যাচ্ছিল। ইবন উমর (রাঃ) তাকে ডাকলেন যাতে সেও তাদের সাথে খাবারে শরীক হতে পারে। রাখাল বলল, "আমি রোজাদার (নফল সিয়াম)।" ইবন উমর আশ্চার্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "এই প্রচন্ড গরমে, উত্তপ্ত মরু উপত্যকায় ভেড়া-বকরির পালের পিছনে দৌড়াতে দৌঁড়াতে তুমি রোজা কিভাবে রাখো?" রাখাল বলল, "আমি অতিবাহিত দিনগুলোর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করছি" (অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি মুহুর্তেকে গনিমত মনে করে নেকি হাসিলের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করছি, মৃত্যু যেখানে অবশ্যম্ভাবী)। রাখালের এ কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) এর বিস্ময় আরো বেড়ে গেল। তিনি তাকে বললেন, "তোমার একটা বকরি আমাদের কাছে বিক্রি করে দাও, এর গোশত তোমাকেও খাওয়াবো, আর তুমি এই মাংসের দ্বারা তোমার রোজাও ভাঙতে পারবে (নফল সিয়াম ভাঙার অনুমতি আছে)। আর আমরা তোমাকে ঐ বকরির মূল্যও দিয়ে দিব।" এ প্রস্তাব শুনে রাখাল বলল, "এই বকরির পাল আমার নয়, আমার মালিকের। এটা আমার কাছে আমানত।"
তখন আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) তাকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, "তুমি তোমার মালিককে বলবে, ঐ একটা বকরিকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। এ কথা শুনে রাখাল চিৎকার দিয়ে আকাশের দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে বলল, "তাহলে "আল্লাহ কোথায়।" (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা দেখছেন) ইবন উমর (রাঃ) তার এ কথায় প্রভাবিত হয়ে বারবার বলতে লাগলেন, "তাহলে আল্লাহ কোথায়।"
অতঃপর তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে এসে ঐ রাখালকে তার মালিকের কাছ থেকে কিনে নেন। রাখালের সাথে ঐ বকরির পালকেও তিনি কিনে নেন। অতঃপর তিনি তাঁকে আজাদ করে দেন এবং তাঁর সততায় মুগ্ধ হয়ে বকরিরগুলোকে পুরস্কার হিসেবে তাঁকে দিয়ে দেন। (৪৬)
আমাদের জন্য এই ঘটনায় চিন্তার খোড়াক রয়েছে। এরা হচ্ছে ঐ সকল লোক যারা মরুভূমির তীব্রে গরমের লম্বা দ্বিপ্রহরে পশু চড়াতো, কাজের তাগিদে প্রখর রোদ্রে চলাফেরা করতো, সাথে সাথে সিয়াম পালন করে আখিরাতের সামান হাসিল করতো। তারা দৈনন্দিন জীবনোপকরণের ফিকির করার পরও ইবাদতের ব্যাপারে উদাসীন হতো না। মহান আল্লাহ তাদের উপর শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন, আমীন।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, ঐ ব্যক্তির জন্য দিগুণ নেকি যে তার দুনিয়াবি মালিকের হক আদায় করে (তার আনুগত্য করে) এবং তার প্রকৃত মালিকের (তথা আল্লাহ তাআলার) হক আদায় করে তথা ইবাদত করে। (৪৭)
বনু উমাইয়া গোত্রের এক সরদার রাওহ বিন যামবা একবার উমরাহ করার জন্য সফর করেন। তার কাছে খানাপিনার জন্য পর্যাপ্ত খাবার মওজুদ ছিল। ফল-ফলাদি, বকরি ও মুরগির গোশতের কমতি ছিল না। এ কারণে তার দস্তরখান খাবার দাবারে ভরে যেত। তিনি তার দস্তরখান বিছিয়ে সাথে থাকা অন্যান্য লোকদেরকে তাঁর সাথে যোগ দিতে বললেন। এক গ্রাম্য বেদুইন তখন তাদের পাশ দিয়ে বকরি চড়াতে চড়াতে যাচ্ছিল। রাওহ বিন যামবা তাকে ডাকলেন। বললেন,
- "আসুন, খাবার গ্রহণ করুন।"
- "আপনার চেয়েও সম্মানিত ও প্রিয়জন আমাকে তাঁর দস্তরখানে খাবারের দাওয়াত দিয়েছেন।"
- "কে তিনি?"
- "সমগ্র জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ।"
- "আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কীভাবে দাওয়াত দিলেন?" (অবাক হয়ে রাওহ বিন যামবা)
- "আমি রোজা রেখেছি আর অতি শীঘ্রই আমি ইফতার করব।"
- "আজকে রোজা ভেঙে আমার দাওয়াত গ্রহণ করুন কাল না হয় আবার রেখে নিবেন।" (প্রস্তাবের সূরে রাওহ বিন যামবা)
- "আপনি কী আমার জীবনের গ্যারান্টি দিতে পারবেন?"
বেদুইন রাখালের এ কথা শুনে রাওহ বিন যামবা কেঁদে ফেললেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বললেন, আপনি আপনার জীবনকে হিফাজত করেছেন আর আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত নষ্ট করছি। (৪৮)
মুআজ বিন জাবাল (রাঃ) এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি সিয়ামের ব্যাপারে আশা ব্যক্ত করে বলেচ্ছিলেন, আফসোস! কঠিন রোজার মাঝে লাগা পিপাসাও খতম হয়ে যাবে। (৪৯)
সাহাবায়ে কিরাম জানতেন, সফরের মাঝে সিয়াম ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। সেই সাথে সিয়ামের প্রতিদান, বরকত ও সাওয়াবের ব্যাপারেও জানতেন। তদুপরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার এই বাণী সম্পর্কেও ছিল তাদের অগাধ কৃতজ্ঞতাবোধ -
وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার।
এ কারনেই আমাদের নিজেদের মধ্যে হিম্মত তৈরি করা এবং সফরে থাকাবস্থায় সিয়ামকে ছেড়ে না দিয়ে রেখে দেওয়াটাই উত্তম। সিয়াম পালনে কষ্ট ও ক্ষতির তুলনায় এর উপকার ও ফায়দা অনেক বেশী।
হামযা ইবন আমর আসলামি (রাঃ) অধিকাংশ সময় সফরে সিয়াম পালন করতেন। তিনি নবী করিম এর কাছে সফরে সিয়াম পালনের মাসআলা জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেন, চাইলে সিয়াম পালন করতে চাইলে ইফতার করতে পারো (না রেখে ভাঙতে পারো)। (৫১)
সালাফদের সিয়ামের ব্যাপারে ইখলাস ছিল চোখে পড়ার মত। সহজে উনারা সিয়াম কাযা করতেন না, বা চাইতেন না। কেননা, উনারা জানতেন সিয়াম আল্লাহর জন্য, আল্লাহই তার প্রতিদান দিবেন। সিয়াম হল ঢাল যা দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকা যাবে। সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে বিশেষ একটি দরজা, যার নাম রাইয়ান। এই দরজা দিয়ে শুধুমাত্র রোজাদারগণ প্রবেশ করতে পারবেন। এই সমস্ত সুযোগ সালাফগণ হেলায়ফেলায় ছেড়ে দিতেন না। বোনাস অফার হিসেবে গ্রহণ করতেন। এ জন্য সিয়ামের ব্যাপারে উনার এতটাই আন্তরিক ছিলেন। মহান আল্লাহ্ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। - আমীন।

টিকাঃ
৩২। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯২১৪, সহিহুল জামে: ৩৮৮। আলবানি হাসান বলেছেন。
৩৩। মুসনাদে আহমাদ: ১৫৮৪৪ (সহিহ)
৩৪। হাদীসে কুদসী
৩৫। বুখারি: ১৯০৪, মুসলিম শরিফেও রয়েছে: ১১৫১
৩৬। সুনানু আবি দাউদ: ২৩৫৭
৩৭। বুখারি: ১১১৩
৩৮। বুখারি: ১১৪৫, মুসলিম: ৩/১১২
৩৯। আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/১৩৮ থেকে ১৪৫
৪০। সহিহ সুনানুত তিরমিজি আলবানি: ১৩২৫-আবু উমামা আলবাহিলি বর্ণিত]
৪১। লাতায়েফুল মাআরেফ ও কিতাবুয যুহদ লিইবনিল মুবারক
৪২। প্রাগুক্ত
৪৩। লাতায়েফুল মাআরেফ: ৪৪৮
৪৪। লাতায়েফুল মাআরেফ ৪৪৮
৪৫। লাতায়েফুল মাআরেফ: ৪৪৭
৪৬। আল উলুম-ইমাম যাহাবি (রহ), ইমাম আলবানি মুখতাসারুল উলুম নামে সংকলন করেছেন। সনদ সহিহ।
৪৭। সহিহ বুখারি: ৯৭
৪৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৫০৭৪৯
৪৯। কিতাবুয যুহদ, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক
৫০। সূরা বাকারাহ, আয়াতঃ ১৮৪
৫১। সহিহ বুখারি, হাদীস ১৯৪৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00