📄 ই‘তিকাফ করা এবং সর্বদা মাসজিদে থাকা
রমাদ্বানের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হল, আল্লাহ তা'আলার ইত্বাআত করার জন্য সর্বদা মাসজিদে অবস্থান করা। এবং আল্লাহ তা'য়ালার সাথে মুনাজাত করা তথা একান্তে আলাপ করা। রাসুল এর বিবি আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"রাসূল রমাদ্বানের শেষ দশকে আল্লাহ তা'য়ালা তার ওফাত দানের আগ পর্যন্ত ইতিকাফ করেছেন, এবং তারপর তার বিবিগণ ইতিকাফ করেছেন।"(৫৪)
আম্মাজান আয়িশা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, তিনি জিবরীল (আঃ) এর ব্যাপারে বলেন,
নবি এর উপর কুরআন প্রত্যেক বছর একবার পেশ করা হয়, কিন্তু যে বছর তাঁকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে সে বছর তাকে দুইবার পেশ করা হয়। প্রত্যেক বছর তিনি দশদিন ইতিকাফ করতেন, কিন্তু যে বছর তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয় সে বছর তিনি বিশদিন ইতিকাফ করেন।(৫৫)
ইবনু হাজার আসকালানি (রহ) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইরশাদ করেন, "বিশদিন দ্বারা উদ্দেশ্য মাঝের দশদিন ও শেষের দশদিন। "(৫৬)
টিকাঃ
৫৪। বুখারি: ২০২৬, মুসলিম: ১১৭২
৫৫। বুখারি: ৪৯৯৮
৫৬। ফাতহুল বারী: ৯/৪৬
📄 রমাদ্বানে মু'মিনের মুজাহাদা
ইবনু রজব (রহ) বলেন,
"জেনে রাখা উচিত, রমাদ্বান মাসে মুমিনগণ জমায়েত হয় অন্তরের দুইটি মুজাহাদার জন্য। এক, দিনে সিয়াম পালন, আর রাতে কিয়ামুল লাইলের দণ্ডায়মান হওয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি এই দুই জিহাদ ও মুজাহাদাকে একত্রিত করবে, এগুলোর হুকুম পুরিপূর্ণভাবে আদায় করবে এবং এ'দুয়ের উপর সবর করবে তাহলে তাকে অগণিত আজর (প্রতিদান) দেওয়া হবে।" (৫৬)
কুরআন এবং সিয়াম কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেন,
الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة يقول الصيام أي رب منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفعني فيه ويقول القرآن منعته النوم بالليل فشفعني فيه قال فيشفعان
"সিয়াম এবং কুরআন কিয়ামতের দিবসে বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার এবং স্ত্রী সম্ভোগ হতে দূরে রেখেছি, সুতরাং আপনি তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে দূরে রেখেছি, সুতরাং তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূল বলেন, তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে। "(৫৭)
আমি আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তাঁর সুন্দরনামসমূহ ও সর্বোচ্চ গুণাবলীর দ্বারা প্রার্থণা করছি, তিনি যেন সকল মুসলিমকে প্রতিটি কল্যাণ কাজ এবং তিনি যাতে রাজিখুশি থাকেন তা করার তাওফীক দান করেন।
এবং নবী এর অনুসরণ করার তাওফীক দান করেন, যেমনটি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা পছন্দ করেন।
আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবাগণের উপর এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর সকল অনুসারীদের উপর রহমত বর্ষণ করুন।
আমীন।
টিকাঃ
৫৬। লাতায়েফুল মা'আরেফ: ৩১৮
৫৭। মুসনাদ আহমাদ: ৬১২৬, হাকিম: ১/৫৫৪
📄 গুরুত্ব কথা
নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র, শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। আমরা তাঁরই সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থণা করি। আমাদের নফসের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তাআলা যাকে হিদায়াত দেন তাকে পথচ্যুতকারী কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তাকে পথে ফিরাবার কেউ নেই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও প্রেরিত রাসুল। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু'জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্চা করে থাক এবং আত্মীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (১)
অপর এক আয়াতের ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (২)
অন্য এক আয়াতের তিনি ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। (৩)
মহান আল্লাহ্ কুরআনুল কারীমের এই আয়াতগুলোতে তাকওয়ার বা অন্তরে আল্লাহর ভয়ের ব্যাপারে বলেছেন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশনা। যার অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই তাঁর আসলে কোন ভয় নেই। যে তাকওয়ার দিক থেকে যত মিস্কিন তাঁর অবাধ্যতার পরিণام তত বেশী। তাকওয়া বাড়ানোর উপায়ের মধ্যে সিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল।
টিকাঃ
১। সুরা আন-নিসা, আয়াতঃ ১
২। সুরা আলে ইমরান: ১০২
৩। সুরা আহযাব: ৭০-৭১
📄 লেখিকার আরজ
রমাদ্বানুল মুবারক সম্পর্কে অনেক বই, কিতাব ও পুস্তিকা ছাপা হয়েছে। প্রতি বছরই নতুন আঙ্গিকে ছাপা হয়ে থাকে। সবার কথা ভেবে আমিও শুরু করলাম এই নেক কাজে নিজেকে অংশীদার করতে। চাঁদ দেখা, সিয়ামের সংক্ষিপ্ত মাসায়েল, ইফতার, সাহরী, ইতিকাফ, মেয়েলি বিষয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, এবং নতুন নতুন স্বাস্থ্যগত বা ডাক্তারি মাসআলা - এগুলোর ব্যাপারে অনেক কিতাব লেখা হয়েছে। কিন্তু আমার অন্তরের খাহেশ ছিল, সলফে সালিহীন রমাদ্বান মাস কিভাবে কাটিয়েছেন, কিভাবে সিয়াম পালন করতেন, কিয়ামুল লাইলের কতোটা গুরুত্ব দিতেন তা সবার সামনে নিয়ে আসার। কেননা এই সম্মানিত তবকাই তো আমাদের রাহনুমা। পথ চলার পাথেয়। নিজেদের ইবাদত এবং আমলকে বিশুদ্ধভাবে সাজাতে হলে বারবার তাদের দিকেই ফিরে যেতে হবে। মহান আল্লাহ্ তাদের উপর রহম করুন। আমীন।
আলোচ্য সংক্ষিপ্ত এই বইটিতে সালাফদের যে বিষয়গুলো নিয়ে আসা হয়েছে তা বিশুদ্ধ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অবশ্য সালাফদের কিছু ঘটনার ব্যাপারে তাহকিক করা সম্ভব হয় নি। তবে আমি আশাবাদী ইন শা আল্লাহ ওগুলোও সহিহ হবে। আসল মাকসাদ হল আসলাফদের দৃষ্টান্ত সামনে রেখে নিজেদের আমলে ইখলাস বৃদ্ধি করা।
আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাদের অনুসরণের মাঝে কামিয়াবি দান করেন এবং আমাদের রোজার মাস এবং রোজাও আল্লাহ তাআলার কাছে ওজনদার এবং মূল্যবান হয়।
কল্যাণকামী
উম্মে আবদ মুনিব
রজব: ১৪৩৪ হিজরি