📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফদের ভারসাম্যপূর্ণ রসিকতা

📄 সালাফদের ভারসাম্যপূর্ণ রসিকতা


এক
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদিন এক লোক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য একটি বাহনের ব্যবস্থা করে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ
আমি তোমাকে আরোহণ করার জন্য একটি উটনীর বাচ্চা দিতে পারি।
লোকটি বলল, উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? তখন আল্লাহর রাসূল বললেন—
وَهَلْ تَلِدُ الإِبِلَ إِلَّا النُّوقُ
আরে, প্রতিটি উটই তো কোনো-না-কোনো উটনীর বাচ্চা!

দুই
সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হলাম। তার সামনে তখন কিছু রুটি এবং খেজুর ছিল। তিনি বললেন-
اُدْنُ فَكُلْ
কাছে এসে বসো এবং খাও।
আমি খেজুর খাওয়া শুরু করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
تَأْكُلُ تَمْرًا وَبِكَ رَمَدُ
তোমার চোখ উঠেছে অথচ তুমি খেজুর খাচ্ছ?
আমি কোনো কিছু না ভেবেই বলে ফেললাম, আমি অপর পাশ দিয়ে চিবুচ্ছি। এ কথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে ফেললেন।

তিন
উসাইদ ইবনু হুযাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার তিনি লোকদের সাথে কথা-বার্তা বলছিলেন এবং মাঝে মাঝে রসিকতা করে তাদের হাসাচ্ছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কাঠের টুকরা দিয়ে তার পেটে খোঁচা দিলেন। উসাইদ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি এর প্রতিশোধ নিতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, প্রতিশোধ নাও। উসাইদ বললেন, আপনার গায়ে তো জামা আছে, অথচ আমার গায়ে জামা ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জামা খুলে নিলেন। তখন উসাইদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে তার একপাশে চুমু দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এটাই ছিল আমার প্রতিশোধ।

চার
মুআবিয়া ইবনু বাহয বর্ণনা করেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
" وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
মানুষকে হাসানোর জন্য যে-ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে, সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক!

পাঁচ
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সাহাবীগণ একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের সাথে রসিকতাও করেন! তখন রাসূল বললেন-
" إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا
হ্যাঁ। তবে আমি রসিকতায় সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলি না।

ছয়
মুহাম্মাদ ইবনু নুমান বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনু হাম্মাদ-এর চেয়ে বেশি ইবাদতকারী আর কাউকে দেখিনি। আমি মনে করি, তিনি কখনও হাসেন না। এ সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, মৃদু বা মুচকি হাসি খুবই উত্তম। উলামা-মাশাইখগণের মতে না হাসার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে-
(১) আদব, আল্লাহর ভয় এবং নিজের পরিণাম ও অসহায়ত্বের চিন্তা。
(২) অজ্ঞতা, অহংকার, কিংবা লৌকিকতা।
উল্লেখ্য যে, প্রথমটি প্রশংসনীয় আর দ্বিতীয়টি নিন্দনীয়।
অধিকন্তু যে-ব্যক্তি বেশি হাসে, সবার কাছে তার মর্যাদা কমে যায়। এক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই যে, বৃদ্ধ বয়সের চেয়ে যুবক বয়সের হাসিই বেশি প্রাসঙ্গিক।
তবে মুচকি হাসি ও হাস্যোজ্জ্বল চেহারাই শ্রেষ্ঠ এবং সবার কাছে আদরণীয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“ تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ
তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একপ্রকার সাদাকা।
জারির রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম আমার সাথে কখনই হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ছাড়া সাক্ষাৎ করেননি।
এটাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। তবে সর্বোচ্চ মর্যাদা তো সেই ব্যক্তির, যে রাতের বেলায় অধিক পরিমাণ ক্রন্দন করে এবং দিনের বেলায় হাস্যোজ্জ্বল থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“ إِنَّكُمْ لَنْ تَسَعُوا النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ ، فَلْيَسَعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ الْوَجْهِ
তোমরা কখনও তোমাদের সম্পদ দ্বারা মানুষকে তৃপ্ত করতে পারবে না। তাই তোমরা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দ্বারাই তাদের তৃপ্ত করার চেষ্টা করো।
এখানে একটি কথা না বললেই নয়। সেটা হচ্ছে, যে-ব্যক্তি ছোট্ট করে মুচকি হাসে, তার এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং বেশি বেশি আত্মসমালোচনা করা উচিত-যাতে করে তার এই অমলিন হাসি প্রবৃত্তির তাড়নায় কলুষিত না হয়।
যে-সকল লোক সর্বদা বিষণ্ণ থাকে, ভ্রু সংকুচিত করে রাখে, তাদের উচিত সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল থাকা। নিজের আচরণকে সুন্দর করা। বদ অভ্যাসের কারণে নিজেকে শাসন করা।
মোটকথা, যেকোনো অবস্থায় মধ্যপন্থা থেকে সরে যাওয়া নিন্দনীয়। কাজেই সকল ক্ষেত্রে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত রাখা, ইসলামী শিষ্টাচার নিজের মধ্যে ধারণ করা এবং চিন্তা ও আচরণের ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত আবশ্যক。

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯৮, জামি তিরমিযী: ১৯৯২
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪৪৩
২. সুনানু আবি দাউদ: ৫২২৪
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯০
২. জামি তিরমিযী: ১৯৯১
১. আল-আদাবুল মুফরাদ : ৮৯১
২. বাযযার: ১৯৭৭; আল-হুলইয়া: ১০/২৫; মুসতাদরাক: ১/১২৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/১৪০-১৪২

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


এই ছিল সালাফদের অবস্থা এবং তাদের আচার-ব্যবহার। ভেবে দেখুন, আজ আমাদের অবস্থা ও আচার-ব্যবহার কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? আমরা এমন সুমহান চরিত্র থেকে কত দূরে সরে গেছি?
কেউ যদি আমাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে, তবে সে অবশ্যই তাদের এবং আমাদের মাঝে বিরাট পার্থক্য খুঁজে পাবে। অবশ্য এর মধ্যেও যারা তাদের ভালোবাসে, তারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারে। তাদের মতো উত্তম চরিত্র অর্জনের জন্য নিরন্তর সাধনা করে যেতে পারে।
এই সুমহান আখলাক অর্জনের পথে যার প্রচেষ্টা আন্তরিক ও একনিষ্ঠ হয়, আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেন। তাকে সীরাতে মুস্তাকীমের পথ-প্রদ্রর্শন করেন। আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
যে-ব্যক্তি আমার পথে সাধনা করবে, আমি তাকে আমার পথসমূহ প্রদর্শন করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের সাথেই থাকেন
যদিও সালাফে-সালেহীনের পরবর্তী যুগে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হয়েছে, তবুও আমরা সংকল্প করতে পারি যে, আমরা তাদের ভালোবাসবো। তাদের মহান বলে জানবো।
যদিও আমাদের আমল-আখলাক তাদের স্পর্শ করারও উপযুক্ত নয়; তবুও আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট আশা রাখবো, যেন তিনি আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং হাশরের দিন তাদের সাথেই আমাদের পুনরুত্থিত করেন।
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-কর্তৃক রচিত সহীহুল বুখারীর হাদীসে স্বয়ং রাসূলের যবানিতে ওয়াদা করা হয়েছে-
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দিনক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-
❝ وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا
তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?
সে বলে, কিছুই না। তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি।
তার এই উত্তর শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি তাদের সাথেই থাকবে, যাদের তুমি ভালোবাসো।
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-আমি আর কোনো কিছুতেই এতটা আনন্দিত হইনি, যতটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই উক্তি দ্বারা হয়েছি-
❝ أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ
তুমি যাদের ভালোবাসো, তাদের সাথেই তোমার হাশর হবে।
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও বলেন, নিশ্চয়ই আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর এবং উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে ভালোবাসি। আমি আশা করি, কিয়ামতের দিন এই ভালোবাসার দরুন আমি তাদের সাথেই থাকব-যদিও আমি তাদের মতো আমল করতে পারি না।
হে আল্লাহ, আমরা আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমরা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবিয়ীদের ভালোবাসি। অতএব, আপনি আমাদেরকে তাদের দলভুক্ত করে নিন। তাদের দলভুক্ত হিসেবেই কিয়ামতের দিন আমাদের পুনরুত্থিত করুন-যদিও তাদের তুলনায় আমাদের আমল-আখলাক যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। নিশ্চয় আপনি বান্দার দুআ শ্রবণ করেন এবং তাদের মনের আশা পূরণ করেন।
হে আমাদের রব, আমাদের এবং আমাদের যে-সকল ভাই ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের ক্ষমা করুন। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো প্রকার বিদ্বেষ রাখবেন না। নিশ্চয়ই আপনি পরম করুণাময়, চির দয়ালু।
সবশেষে সকল প্রশংসা সেই মহান রবের-যিনি সারা জাহানের প্রতিপালক।

টিকাঃ
১. সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯
১. সহীহ বুখারী: ৩৬৮৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00