📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফ কর্তৃক সময়ের মূল্যায়ন

📄 সালাফ কর্তৃক সময়ের মূল্যায়ন


এক
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি কুকুরকে উপহাস করা থেকে বিরত থাকি এই ভয়ে যে, আমি নিজেই তার মতো কুকুর হয়ে যেতে পারি।
আর কাউকে যখন দেখি, সে দুনিয়ার কাজও করে না এবং আখিরাতের কাজও করে না তখন আমি ভীষণ বিরক্ত হই。

দুই
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হে আদম-সন্তান, তুমি তো কতগুলো দিনের সমষ্টি। অতএব, একটি দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়া মানেই তোমার একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া。

তিন
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, আমি এমন অনেক জাতির সন্ধান জানি, যারা টাকা-পয়সার চেয়েও সময় ব্যয়ে অধিক কার্পণ্য করতেন।

চার
হাসান বসরী কর্তৃক তার শিষ্যদের প্রতি এমন আরও কিছু নসীহত ছিল, যা তাদের পার্থিব বিষয়ে বিমুখ করার পাশাপাশি পরকালীন বিষয়ে উৎসাহী করে তুলত। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
* পার্থিব জীবনের সামান্য ভোগসামগ্রী যেন তোমায় আকৃষ্ট না করে। নিজের ব্যাপারে খুব বেশিকিছু আশা করো না, তাহলে জীবনের সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।
* মৃত্যুক্ষণ খুব দ্রুতই ঘনিয়ে আসবে। তাই কোনো কাজ আগামীকালের জন্য রেখে দিয়ো না। কারণ, তুমি জানো না, ঠিক কখন তোমাকে আল্লাহর দরবারে ফিরে যেতে হবে。

পাঁচ
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ একবার উমার ইবনু আবদিল আযীযের নিকট লম্বা এক চিঠি লেখেন। তাতে তার বেশকিছু সুন্দর উপদেশ ছিল। তন্মধ্যে একটি ছিল এমন- অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী যে-সময়টি তুমি যাপন করছ, সেটাই বর্তমান। আমি চাইলে তোমার এই বর্তমানকে সাজিয়ে দিতে পারি। তখন তুমি অতীত ও ভবিষ্যতের সুখ-দুঃখ সম্পূর্ণরূপে ভুলে যাবে।
এবার তবে শোনো, আমি তোমার জন্য যে-বর্তমানকে সাজিয়ে দিতে চেয়েছি, সেটা হলো দুনিয়া। এই দুনিয়াই তোমাকে জান্নাতের ব্যাপারে ধোঁকা দিচ্ছে। জাহান্নামের পথে পরিচালিত করছে। একটি উপমার সাহায্যে ব্যাপারটা একটু খোলাসা করি-
ধরো, আজ যদি তোমার কাছে একজন মেহমান আসে, তুমি তাকে যথাযথ সম্মান দেখাও, সম্মানজনক আপ্যায়ন করো, তার রুচি ও ইচ্ছাকে গুরুত্ব দাও এবং আন্তরিকতার সঙ্গে তাকে বিদায় জানাও তাহলে নিশ্চিতরূপেই সে তোমার অনুগ্রহের সাক্ষী হয়ে থাকবে। তোমার প্রশংসা করবে এবং তোমাকে সত্যায়ন করবে।
পক্ষান্তরে তুমি যদি তার মেহমানদারি না করো, তার সাথে যথাযথ সম্মানজনক আচরণ না করো তবে সে তোমার অসদাচরণের সাক্ষী হয়ে থাকবে। সর্বত্র তোমার দুর্নাম রটাবে। তাকে তোমার চক্ষুশূল মনে হবে।
ধরো, দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দুইভাই তোমার নিকট মেহমান হলো। প্রথমজন যখন এলো, তুমি তার সাথে ভালো ব্যবহার করলে না। ঠিকমতো তার মেহমানদারিও করলে না। এরপর অপর ভাই এসে বলল, আমার ভাইয়ের পর তোমার নিকট আমার আগমন ঘটেছে। এখন যদি তুমি আমার সাথে সদ্ব্যবহার করো, তবে ইতঃপূর্বে আমার ভাইয়ের সাথে করা অসদাচরণ মুছে যাবে। তুমি আগে যা করেছ, সব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হবে। নাও, আমার ভাইয়ের পর এবার আমার পালা। এখন যদি তুমি আমাকে মূল্যায়ন করো, তবে তুমি সফল হবে। অতএব, যা আগে বিনষ্ট করে ফেলেছ, তা ঠিক করার চেষ্টা করো।
যদি তুমি এই দ্বিতীয়বারও প্রথমবারের মতো আচরণ করো, তবে জীবন বিপন্ন করতে তোমার বিরুদ্ধে তাদের সাক্ষ্যই যথেষ্ট।
নিশ্চয়ই জীবনের বাকি অংশটুকু এক অমূল্য রতন। গোটা পৃথিবী একত্র করলেও জীবনের অবশিষ্ট একটি মাত্র দিনের সমতুল্য হবে না। সুতরাং, সময়ের অবমূল্যায় করো না। একজন মৃতব্যক্তির সম্মান কখনও তোমার চেয়ে বেশি নয়। কারণ, তোমার হাতে সময় আছে, তার হাতে নেই!
বিশ্বাস করো, কবরে শায়িত কোনো ব্যক্তিকে যদি বলা হয়, তুমি কোনটা চাও— দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ তোমার সন্তানদের দিয়ে দেওয়া হোক, নাকি ব্যক্তিগত আমলের জন্য তোমাকে মাত্র একটি দিন দেওয়া হোক—এই ইচ্ছাধিকার দেওয়া হলে নিঃসন্দেহে সে দ্বিতীয়টি গ্রহণ করবে। এভাবেই সে সমস্ত কিছুর বিপরীতে এই একটা মাত্র দিনকেই বেছে নেবে।
এমনকি যদি তাকে বলা হয়, তোমাকে মাত্র একটি মুহূর্ত আর তোমার সঙ্গীদেরকে কয়েক যুগ উপহার দেওয়া হবে, তাহলেও সে নিজের জন্য ওই একটি মুহূর্তকেই বেছে নেবে। এমনকি যদি বলা হয়, তার শুধুমাত্র একটি কালিমা বলার সুযোগ আছে, যা তার আমলনামায় লেখা হবে, আর তার বন্ধুদের জন্য এর অনেকগুণ বেশি লেখা হবে, তবে সে অবশ্যই ওই একটি কালিমাকেই বেছে নেবে।
অতএব, আজকের এই দিনটাকেই নিজের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নাও। এই সময়টার মূল্যায়ন করো। সেই কালিমাটাকে সম্মান করো-যেন মৃত্যুর সময় আফসোস করতে না হয়। এই উদাহরণের বাস্তব ক্ষেত্র হওয়া থেকে কখনও নিজেকে নিরাপদ মনে করো না। আল্লাহ তাআলা এই উপদেশ দ্বারা তোমাকে ও আমাকে উপকৃত করুন। আমাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু。

ছয়
রিকাম বলেন, একবার আমি আব্দুর রহমানের কাছে জানতে চাই, তিনি তার বাবাকে কী পরিমাণ প্রশ্ন করতেন এবং তার থেকে কী পরিমাণ হাদীস শ্রবণ করতেন? তিনি বলেন, প্রায়ই আব্বাজান যখন খেতে বসতেন, আমি তাকে পড়া শোনাতাম। এছাড়াও তিনি যখন হাঁটতে বের হতেন, হাম্মামে যেতেন কিংবা কোনোকিছু খোঁজার জন্য ঘরে প্রবেশ করতেন, তখনও আমি তাকে পড়া শোনাতাম。

সাত
ইমাম রাযী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুর রহমান ইবনু আবি হাতিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা একটানা সাত মাস মিসরে অবস্থান করি। এই দীর্ঘ সময়ে সেখানে আমরা কোনো ধরনের তরকারি বা ঝোল-জাতীয় কিছু খাইনি। সারাটা দিন বিভিন্ন শাইখের মজলিসে বসার জন্য বরাদ্দ ছিল। রাতের বেলায় তাদের বয়ান লিপিবদ্ধ করা এবং পরস্পর পর্যালোচনা করার জন্য নির্ধারিত ছিল। একদিন আমি এবং আমার বন্ধু এক শাইখের নিকট যাই। গিয়ে শুনতে পাই, তিনি খুব অসুস্থ।
সেখান থেকে ফেরার পথে খুব সুন্দর একটি মাছ দেখতে পাই। মাছটি আমাদের ভীষণ পছন্দ হয়। আমরা সেটি কিনে ফেলি। বাসায় এসে দেখি, আরেক মজলিসের সময় হয়ে গেছে। সেদিন আর রান্না করতে পারিনি। পরপর তিনদিন এভাবেই কেটে যায়। এদিকে মাছটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কাজেই সময় বের করতে না-পেরে মাছটি কাঁচা-ই খেয়ে ফেলি। কারণ, আমাদের হাতে এতটুকুও সময় ছিল না যে, কাউকে দিয়ে আমরা সেটা রান্না করিয়ে নিতে পারি।
এরপর তিনি বলেন, শরীরকে আরাম দিয়ে ইলম অর্জন করা কখনই সম্ভব নয়।

আট
কাসিম ইবনু আসাকীর সুলাইমান ইবনু আইয়ুব সম্পর্কে বলেন, তিনি জীবনের প্রতিটি সময়ের হিসাব রাখতেন। অপ্রয়োজনীয় কোনো কাজে এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করতেন না। হয়তো লিখতেন, ছাত্রদের পড়াতেন অথবা নিজে পড়তেন। আমি শুনেছি, যখন তিনি কলমের মাথা তীক্ষ্ণ করতেন, তখনো তার দুই ঠোঁট নড়তে থাকত।

নয়
আবুল ওয়াফা আলী ইবনু আকিল রাহিমাহুল্লাহ নিজের সম্পর্কে বলেন, আমার জীবনের এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট হোক—এটা আমি পছন্দ করি না। এমনকি বিশ্রামের সময় যখন আমার জিহ্বা জ্ঞানমূলক আলোচনা থেকে এবং আমার চোখ জ্ঞানমূলক কোনো বিষয় অধ্যয়ন থেকে বিরত থাকে, তখনও আমি আমার মস্তিষ্ক ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাই। আমি বিভিন্ন বিষয় ভাবতে থাকি। ফলে যখনই বিশ্রাম শেষে উঠি, জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত আমার সামনে উন্মোচিত হয়। লেখার মতো অজস্র বিষয় মাথায় এসে ভিড় করে।
আমি বিশ বছর বয়সে জ্ঞানের প্রতি যতটা আগ্রহী ছিলাম, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি আগ্রহী হয়েছি আশি বছর বয়সে।

দশ
তিনি আরও বলেন, অত্যধিক ব্যস্ততার দরুণ আমি আমার খাওয়ার সময়টাও খুব সংক্ষিপ্ত করতাম। প্রয়োজনে পানির সাথে ছাতু মিশিয়ে তা রুটির ওপর ছিটিয়ে দিতাম। কারণ, শুকনো রুটি চিবুতে অনেক সময় লাগত। এমনটা করতাম—যাতে পড়ালেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারি এবং অভূতপূর্ব জ্ঞানমূলক কোনো বিষয় লিখতে পারি।

এগারো
ইমাম ইবনুল জাওযীর উস্তায ইয়াহইয়া ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হুমাইরা রাহিমাহুল্লাহ অনেক বড় ফকীহ ও উযীর ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহম করুন। তিনি বলতেন, যা-কিছুর সংরক্ষণে তুমি সচেষ্ট হতে পারো, তন্মধ্যে 'সময়' হলো সবচে' মূল্যবান। অথচ আমি দেখছি, তা-ই সবচে' সহজে তোমার হাতে বরবাদ হচ্ছে!

বারো
ইবনু নাফিস লিখতে বসার আগেই তার জন্য বেশ কয়েকটি কলম প্রস্তুত করে রাখা হতো। কলম প্রস্তুত হয়ে গেলে তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করে লেখা শুরু করতেন। যা লিখতেন, অন্তর থেকে লিখতেন। স্রোতের মতো তার কলম থেকে লেখা প্রবাহিত হতো। একটি কলম ভোঁতা হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে সেটি ফেলে অন্য একটি কলম নিয়ে লেখা শুরু করতেন—যাতে কলম প্রস্তুত করতে গিয়ে সময় ও মনোযোগ নষ্ট না হয়।
একবার তিনি বাবে যাহুমায় অবস্থিত একটি গোসলখানায় প্রবেশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই গোসল শুরু করেন; কিন্তু হঠাৎ কী ভেবে, গোসল না-করেই গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং তৎক্ষণাৎ দোয়াত-কালি ও খাতা আনতে বলেন। অতঃপর সেখানেই ধমনীর শিহরন সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন এবং যথারীতি শেষও করে ফেলেন। এরপর আবার গোসলখানায় গিয়ে গোসল শেষ করে আসেন।
ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ নিজের সম্পর্কে বলেন, আমি অনেক লোককে দেখেছি, যারা বেশি বেশি সাক্ষাৎ করার অভ্যাসবশত সর্বদা আমার সাথে সাথেই থাকত। তাদের এই বারবার আসাকে তারা খেদমত বলে মনে করত। তারা আমার মজলিসগুলোতে বসতে চাইত। এসব মজলিসে নানান ধরনের মানুষ সম্পর্কে নানান ধরনের আলোচনা করত। অপ্রয়োজনীয় কথা ও গীবতও তাদের আলোচনা থেকে বাদ পড়ত না।
আমাদের যুগে এই কাজটা অনেক লোকই করে। অনেক সময় সাক্ষাৎপ্রার্থী ব্যক্তিও এধরনের সমালোচনা ও গীবত শোনার জন্য লালায়িত থাকত। তারা একাকিত্ব পছন্দ করত না-বিশেষ করে, উৎসব এবং ঈদের দিনগুলোতে। তাদের দেখবে, তারা একে অপরের কাছে যায়। শুধু সম্ভাষণ এবং সালাম বিনিময়ের মধ্যেই ক্ষান্ত থাকে না; বরং এমন বিষয়ে কথা বলা শুরু করে, যা মূলত সময় নষ্ট করার নামান্তর। আমি ভেবে দেখেছি, সময় অত্যন্ত মূল্যবান। অতএব, এটা শুধুমাত্র ভালো কাজেই ব্যয় করা উচিত। তো আমি তাদের এই আলোচনা অপছন্দ করতে শুরু করলাম।
তাদের ব্যাপারে দুটি বিষয় ভেবে রেখেছি-
(১) যদি আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, তবে একা হয়ে পড়ব।
(২) আর যদি তাদেরকে তাদের মতো করেই গ্রহণ করি, তবে অনেক সময় নষ্ট হবে।
তাই আমি যথাসম্ভব তাদের সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। যখন আর এড়িয়ে যেতে পারতাম না, তখন একেবারে কম কথা বলতাম- যাতে তাদের হাত থেকে সহজে ছুটে যেতে পারি।
এরপর অনেক ভেবে-চিন্তে এমন কিছু কাজ প্রস্তুত করে রাখতে লাগলাম, যেগুলো কথা বলার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিবন্ধক নয়-যাতে করে তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে আমার সময় নষ্ট না হয়। যে-সমস্ত কাজ আমি সেসময়ের জন্য রাখতাম, সেগুলো হচ্ছে কাগজ কাটা, কলম ঠিক করা এবং বই বাঁধাই করা। এ সকল কাজ প্রয়োজনীয়; কিন্তু তাতে চিন্তা-ভাবনা ও মনোযোগের প্রয়োজন হয় না। ফলে আমি তাদের সাক্ষাতের সময় এই কাজগুলোতেই ব্যস্ত থাকতাম। এতে আমার এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট হতো না

টিকাঃ
১. এ অধ্যায়ে এমন কিছু উক্তি উঠে এসেছে, যা খুবই মূল্যবান। তবে সেগুলো ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা' ও 'সিফাতুস সাফওয়া’ তে খুঁজে পাইনি। তাই পাঠকের উপকারের কথা বিবেচনা করে পূর্বকথা অনুযায়ী উপযুক্ত দুই কিতাবের আলোচনায় সীমাবদ্ধকরণ সম্ভব হয়নি।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯৬
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৮৫
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৪/২২৫
২. হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১৫০
১. হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১৩৯
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/২৫১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৩/২৬৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৭/৬৪৬
৩. আল-মুনতাযাম: ৯/২১৪
১. যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলা: ১/১৭৭
২. যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলা: ১/১৮১
৩. যিনি তার সময়কার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার ওপর রহম করুন। আমীন。
১. সাইদুল খাতির: ১৮৪-১৮৫

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফদের ভারসাম্যপূর্ণ রসিকতা

📄 সালাফদের ভারসাম্যপূর্ণ রসিকতা


এক
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদিন এক লোক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য একটি বাহনের ব্যবস্থা করে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ
আমি তোমাকে আরোহণ করার জন্য একটি উটনীর বাচ্চা দিতে পারি।
লোকটি বলল, উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? তখন আল্লাহর রাসূল বললেন—
وَهَلْ تَلِدُ الإِبِلَ إِلَّا النُّوقُ
আরে, প্রতিটি উটই তো কোনো-না-কোনো উটনীর বাচ্চা!

দুই
সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হলাম। তার সামনে তখন কিছু রুটি এবং খেজুর ছিল। তিনি বললেন-
اُدْنُ فَكُلْ
কাছে এসে বসো এবং খাও।
আমি খেজুর খাওয়া শুরু করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
تَأْكُلُ تَمْرًا وَبِكَ رَمَدُ
তোমার চোখ উঠেছে অথচ তুমি খেজুর খাচ্ছ?
আমি কোনো কিছু না ভেবেই বলে ফেললাম, আমি অপর পাশ দিয়ে চিবুচ্ছি। এ কথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে ফেললেন।

তিন
উসাইদ ইবনু হুযাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার তিনি লোকদের সাথে কথা-বার্তা বলছিলেন এবং মাঝে মাঝে রসিকতা করে তাদের হাসাচ্ছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কাঠের টুকরা দিয়ে তার পেটে খোঁচা দিলেন। উসাইদ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি এর প্রতিশোধ নিতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, প্রতিশোধ নাও। উসাইদ বললেন, আপনার গায়ে তো জামা আছে, অথচ আমার গায়ে জামা ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জামা খুলে নিলেন। তখন উসাইদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে তার একপাশে চুমু দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এটাই ছিল আমার প্রতিশোধ।

চার
মুআবিয়া ইবনু বাহয বর্ণনা করেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
" وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
মানুষকে হাসানোর জন্য যে-ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে, সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক!

পাঁচ
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সাহাবীগণ একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের সাথে রসিকতাও করেন! তখন রাসূল বললেন-
" إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا
হ্যাঁ। তবে আমি রসিকতায় সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলি না।

ছয়
মুহাম্মাদ ইবনু নুমান বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনু হাম্মাদ-এর চেয়ে বেশি ইবাদতকারী আর কাউকে দেখিনি। আমি মনে করি, তিনি কখনও হাসেন না। এ সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, মৃদু বা মুচকি হাসি খুবই উত্তম। উলামা-মাশাইখগণের মতে না হাসার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে-
(১) আদব, আল্লাহর ভয় এবং নিজের পরিণাম ও অসহায়ত্বের চিন্তা。
(২) অজ্ঞতা, অহংকার, কিংবা লৌকিকতা।
উল্লেখ্য যে, প্রথমটি প্রশংসনীয় আর দ্বিতীয়টি নিন্দনীয়।
অধিকন্তু যে-ব্যক্তি বেশি হাসে, সবার কাছে তার মর্যাদা কমে যায়। এক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই যে, বৃদ্ধ বয়সের চেয়ে যুবক বয়সের হাসিই বেশি প্রাসঙ্গিক।
তবে মুচকি হাসি ও হাস্যোজ্জ্বল চেহারাই শ্রেষ্ঠ এবং সবার কাছে আদরণীয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“ تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ
তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একপ্রকার সাদাকা।
জারির রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম আমার সাথে কখনই হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ছাড়া সাক্ষাৎ করেননি।
এটাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। তবে সর্বোচ্চ মর্যাদা তো সেই ব্যক্তির, যে রাতের বেলায় অধিক পরিমাণ ক্রন্দন করে এবং দিনের বেলায় হাস্যোজ্জ্বল থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“ إِنَّكُمْ لَنْ تَسَعُوا النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ ، فَلْيَسَعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ الْوَجْهِ
তোমরা কখনও তোমাদের সম্পদ দ্বারা মানুষকে তৃপ্ত করতে পারবে না। তাই তোমরা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দ্বারাই তাদের তৃপ্ত করার চেষ্টা করো।
এখানে একটি কথা না বললেই নয়। সেটা হচ্ছে, যে-ব্যক্তি ছোট্ট করে মুচকি হাসে, তার এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং বেশি বেশি আত্মসমালোচনা করা উচিত-যাতে করে তার এই অমলিন হাসি প্রবৃত্তির তাড়নায় কলুষিত না হয়।
যে-সকল লোক সর্বদা বিষণ্ণ থাকে, ভ্রু সংকুচিত করে রাখে, তাদের উচিত সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল থাকা। নিজের আচরণকে সুন্দর করা। বদ অভ্যাসের কারণে নিজেকে শাসন করা।
মোটকথা, যেকোনো অবস্থায় মধ্যপন্থা থেকে সরে যাওয়া নিন্দনীয়। কাজেই সকল ক্ষেত্রে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত রাখা, ইসলামী শিষ্টাচার নিজের মধ্যে ধারণ করা এবং চিন্তা ও আচরণের ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত আবশ্যক。

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯৮, জামি তিরমিযী: ১৯৯২
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪৪৩
২. সুনানু আবি দাউদ: ৫২২৪
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯০
২. জামি তিরমিযী: ১৯৯১
১. আল-আদাবুল মুফরাদ : ৮৯১
২. বাযযার: ১৯৭৭; আল-হুলইয়া: ১০/২৫; মুসতাদরাক: ১/১২৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/১৪০-১৪২

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


এই ছিল সালাফদের অবস্থা এবং তাদের আচার-ব্যবহার। ভেবে দেখুন, আজ আমাদের অবস্থা ও আচার-ব্যবহার কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? আমরা এমন সুমহান চরিত্র থেকে কত দূরে সরে গেছি?
কেউ যদি আমাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে, তবে সে অবশ্যই তাদের এবং আমাদের মাঝে বিরাট পার্থক্য খুঁজে পাবে। অবশ্য এর মধ্যেও যারা তাদের ভালোবাসে, তারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারে। তাদের মতো উত্তম চরিত্র অর্জনের জন্য নিরন্তর সাধনা করে যেতে পারে।
এই সুমহান আখলাক অর্জনের পথে যার প্রচেষ্টা আন্তরিক ও একনিষ্ঠ হয়, আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেন। তাকে সীরাতে মুস্তাকীমের পথ-প্রদ্রর্শন করেন। আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
যে-ব্যক্তি আমার পথে সাধনা করবে, আমি তাকে আমার পথসমূহ প্রদর্শন করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের সাথেই থাকেন
যদিও সালাফে-সালেহীনের পরবর্তী যুগে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হয়েছে, তবুও আমরা সংকল্প করতে পারি যে, আমরা তাদের ভালোবাসবো। তাদের মহান বলে জানবো।
যদিও আমাদের আমল-আখলাক তাদের স্পর্শ করারও উপযুক্ত নয়; তবুও আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট আশা রাখবো, যেন তিনি আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং হাশরের দিন তাদের সাথেই আমাদের পুনরুত্থিত করেন।
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-কর্তৃক রচিত সহীহুল বুখারীর হাদীসে স্বয়ং রাসূলের যবানিতে ওয়াদা করা হয়েছে-
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দিনক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-
❝ وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا
তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?
সে বলে, কিছুই না। তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি।
তার এই উত্তর শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি তাদের সাথেই থাকবে, যাদের তুমি ভালোবাসো।
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-আমি আর কোনো কিছুতেই এতটা আনন্দিত হইনি, যতটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই উক্তি দ্বারা হয়েছি-
❝ أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ
তুমি যাদের ভালোবাসো, তাদের সাথেই তোমার হাশর হবে।
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও বলেন, নিশ্চয়ই আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর এবং উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে ভালোবাসি। আমি আশা করি, কিয়ামতের দিন এই ভালোবাসার দরুন আমি তাদের সাথেই থাকব-যদিও আমি তাদের মতো আমল করতে পারি না।
হে আল্লাহ, আমরা আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমরা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবিয়ীদের ভালোবাসি। অতএব, আপনি আমাদেরকে তাদের দলভুক্ত করে নিন। তাদের দলভুক্ত হিসেবেই কিয়ামতের দিন আমাদের পুনরুত্থিত করুন-যদিও তাদের তুলনায় আমাদের আমল-আখলাক যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। নিশ্চয় আপনি বান্দার দুআ শ্রবণ করেন এবং তাদের মনের আশা পূরণ করেন।
হে আমাদের রব, আমাদের এবং আমাদের যে-সকল ভাই ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের ক্ষমা করুন। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো প্রকার বিদ্বেষ রাখবেন না। নিশ্চয়ই আপনি পরম করুণাময়, চির দয়ালু।
সবশেষে সকল প্রশংসা সেই মহান রবের-যিনি সারা জাহানের প্রতিপালক।

টিকাঃ
১. সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯
১. সহীহ বুখারী: ৩৬৮৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00