📄 আলিমগণের প্রতি সালাফদের সম্মানপ্রদর্শন
এক
আবু ওয়ায়েল থেকে বর্ণিত, একবার আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা জনৈক ব্যক্তিকে দেখেন যে, সে টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরেছে। তাই তিনি লোকটিকে ডেকে বললেন, তুমি তোমার কাপড় টাখনুর ওপর উঠিয়ে নাও; কিন্তু সে বলল, আগে আপনি আপনার কাপড় উঠিয়ে নিন। তখন ইবনু মাসউদ বললেন, আমার টাখনুতে সমস্যা আছে। (ইমামতি করার সময় টাখনুর দিকে কারও চোখ পড়লে তার খারাপ লাগতে পারে। তাই ঢেকে রাখি।)
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু এই ঘটনা জানতে পেরে লোকটাকে ডেকে এনে শাস্তি দেন এবং বলেন, তোমার এত বড় সাহস! তুমি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের কথার পাল্টা জবাব দাও!
দুই
ইবনু সালামা থেকে বর্ণিত, একবার যায়েদ ইবনু সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমার নিকট আগমন করেন। তখন ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য উঠে দাঁড়ান এবং তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখেন। যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বলেন, হে রাসূলের চাচাত ভাই, আপনি ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিন। তখন তিনি বলেন, আমরা তো আমাদের উলামায়ে কেরাম এবং বড়দের সাথে এমন আচরণই করে থাকি।
তিন
ইবরাহীম ইবনু ইসহাক আল-হারবী থেকে বর্ণিত, আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন মক্কার এক মহিলার গোলাম। তিনি দেখতে ছিলেন কুচকুচে কালো। তাঁর নাক ছিল মটরশুঁটির মতো। একবার আমিরুল মুমিনীন-সুলাইমান ইবনু আব্দিল মালিক তাঁর ছেলেদের নিয়ে আতা ইবনু আবি রাবাহ-এর কাছে আগমন করেন। তিনি তখন সালাত আদায় করছিলেন। আমিরুল মুমিনীন তাঁর সালাত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকেন। সালাত শেষ হলে তিনি আগন্তুকদের দিকে ঘুরে বসেন।
কিন্তু এমন সময় মানুষ তাঁকে হজের বিভিন্ন মাসআলা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে। অগত্যা তিনি তাঁদের থেকে মুখ ফিরিয়ে সাধারণ মানুষের দিকে ঘুরে বসেন। তখন সুলাইমান তাঁর ছেলেদের উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমরা দাঁড়াও। তারা দাঁড়ালে আমিরুল মুমিনীন তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে পুত্রদ্বয়, তোমরা ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ত্রুটি বা শৈথিল্য প্রদর্শন করবে না। কেননা, এই কালো গোলামের সামনে আমার এই অপমান আমি কখনই ভুলতে পারবো না।
চার
আশআস ইবনু শু'বা আল-মুসাইয়িসী থেকে বর্ণিত, একবার খলীফা হারুনুর রশীদ রাক্কা শহরে আগমন করেন। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহও তখন রাক্কা শহরে অবস্থান করছিলেন। একদিন তাঁর সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষজন এসে রাক্কায় উপস্থিত হতে থাকে। তাদের জুতাগুলো এদিক-সেদিক পড়ে থাকে। তাদের পদচারণায় ধুলোবালি উৎক্ষিপ্ত হয়ে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। খলীফার এক বাঁদি সুউচ্চ প্রাসাদের ওপর থেকে এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। সে লোকজন ডেকে জিজ্ঞেস করে, কী হচ্ছে এখানে? এত মানুষের সমাগম কেন? তখন লোকজন বলে, খোরাসানের একজন প্রসিদ্ধ আলিম এখানে আগমন করেছেন। বাঁদি তখন বলে ওঠে, আল্লাহর কসম! এটা তো এমন এক রাজত্ব, হারুনুর রশিদের রাজত্ব যার সামনে কিছুই নয়। কারণ, হারুনুর রশিদের রাজ্যে তো পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক ব্যতীত এত জনসমাগম কখনও হয় না।
পাঁচ
রুসতাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আব্দুর রহমান ইবনু মাহদীকে বলতে শুনেছি, কোনো ব্যক্তি তার চেয়ে বড় কোনো আলিমের সাথে সাক্ষাৎ করলে সেই দিনটিকে যেন তার সৌভাগ্যের কারণ মনে করে।
তার সমপর্যায়ের কোনো আলিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেন তারা পরস্পরে জ্ঞানমূলক আলোচনা করে এবং তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে।
আর তার চেয়ে ছোট কোনো আলিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সে যেন বিনয়ী হয় এবং তাকে নানান বিষয়ে শিক্ষাদান করে।
এমন কোনো ব্যক্তি যেন ইমাম বা দলপ্রধান না হয়, যে কিনা যা শোনে তাই বর্ণনা করে, নির্বিচারে সবার কাছ থেকে ইলম অর্জন করে অথবা ব্যতিক্রমী ও দুর্লভ রওয়ায়াতগুলো বেশি বেশি বর্ণনা করে। ইমাম কেবল সেই হবে, যে একেবারে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে কোনো বিষয় আয়ত্ত করে থাকে।
ছয়
ইবনু বাশকুয়াল বলেন, আমি ইবনু আত্তাবের কিতাব থেকে বলছি, ইবরাহীম আল-হারবী একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান আলিম ছিলেন। তার কাছে যখন এই সংবাদ পৌঁছাল যে, তার শিষ্যরা তাকে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল থেকেও শ্রেষ্ঠতর মনে করছে এবং তার ওপর প্রাধান্য দিচ্ছে, তখন তিনি তাদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তারা এ কথা স্বীকার করে নিল। তখন তিনি বললেন, আমি যার সমপর্যায়ের নই এবং কখনও হতেও পারব না, সেই ব্যক্তির ওপর আমাকে প্রাধান্য দিয়ে তোমরা আমার ওপর জুলুম করেছ। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আর কখনও তোমাদের কোনো ইলম শিক্ষা দেব না। অতএব, আজকের পর থেকে তোমরা কেউ কখনই আমার কাছে আসবে না।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯১-৪৯২
১. সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৭
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৮৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/২০৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩৬৪
📄 কথাবার্তায় সালাফগণের শিষ্টাচার
এক
মাইমুন ইবনু মিহরান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার একলোক সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এসে বলল, জনাব, আমাকে কিছু নসীহত করুন। তিনি বললেন-
: কারও সাথে কথা বলো না।
: মানুষের মাঝে বসবাস করব, অথচ কথা বলব না—এটা তো অসম্ভব?
: আচ্ছা, যদি কথা বলতেই হয়, তবে সত্য কথা বলবে অথবা চুপ থাকবে।
: আমাকে আরও কিছু নসীহত করুন।
: কখনও কারও ওপর রাগ করবে না।
: আমি এই সমস্যায় মারাত্মক রকম জর্জরিত। এতে আমার কোনোই নিয়ন্ত্রণ নেই।
: আচ্ছা, যদি রাগ করতেই হয়, তবে নিজের হাত ও মুখ নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
: আরও কিছু নসীহত করুন।
: মানুষের সাথে মেলামেশা করো না।
: মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকব, কিন্তু তাদের সাথে কথা বলব না—এটা তো অসম্ভব?
: আচ্ছা, যদি মেলামেশা করতেই হয়, তবে সর্বদা জিহ্বা সংযত রাখবে এবং সবার প্রতি আমানতদারী রক্ষা করে চলবে।'
দুই
মুআয ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহর নিকট বসা ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তৎক্ষণাৎ আরেক ব্যক্তি হাদীসটি রদ করেন। দুইজনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থা দেখে আতা বলেন, সুবহানাল্লাহ! এ কেমন আচরণ? এ কেমন ব্যবহার? আমিও তো এই লোকের হাদীস শুনছিলাম এবং চুপ থেকে তাকে এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে, আমি তার চেয়ে বেশিকিছু জানি না। অথচ বাস্তবে আমি হাদীসটির শুদ্ধাশুদ্ধি সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি জানি।
তিন
উসমান ইবনু আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, আমি একবার আতা রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, ধরুন, এক লোক কোনো এক গোত্রের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গোত্রের লোকেরা তার নামে নানান নিন্দামূলক কথা বলছিল। এখন ওই কথাগুলো কি ওই লোকটাকে বলা যাবে? তিনি বললেন, 'না, বলা যাবে না; কারণ, মজলিসের কথাগুলো হচ্ছে আমানত।'
চার
ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ বর্ণনা করেন, একবার উমার ইবনু আব্দিল আযীয রাহিমাহুল্লাহ আমাদের নিকট একটি চিঠি লেখেন। মাকহুল এবং আমি চিঠিটি সংরক্ষণ করি। চিঠিতে লেখা ছিল—
যে-ব্যক্তি মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করে, সে পার্থিব জীবনে খুব অল্পতেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। আর যে-ব্যক্তি নিজের কথাবার্তার হিসাব রাখে, তার অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা একেবারে কমে যায়। আসসালামু আলাইকুম।
পাঁচ
ইয়ালা ইবনু উবায়েদ বলেন, একবার আমরা মুহাম্মাদ ইবনু সাওকার নিকট যাই। তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বলেন, আজ আমি তোমাদের এমন একটি কথা বলব, যা হয়তো তোমাদের অনেক উপকারে আসবে। আমার জীবনে কথাটা প্রভৃত উপকার বয়ে এনেছে।
অতঃপর তিনি বলেন, আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ আমাদের বলেছেন, ভাইয়েরা, তোমাদের অগ্রজরা বেশি কথা বলা একদম পছন্দ করতেন না। তারা কুরআন তিলাওয়াত, সৎকাজে আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ এবং দৈনন্দিন জীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ছাড়া অতিরিক্ত কথাগুলো হিসেব করে কাগজে টুকে রাখতেন। তোমাদের ডানে ও বামে দুজন সম্মানিত ফেরেশতা উপবিষ্ট রয়েছেন। তোমরা যা বলছ, তারা সঙ্গে সঙ্গে তা লিপিবদ্ধ করে ফেলছেন। ব্যাপারটা কি তোমরা অস্বীকার করতে পারবে? তোমাদের কি লজ্জা হয় না? যদি তোমাদের কারও আমলনামা দিবালোকে খুলে দেখানো হয় তাহলে দেখা যাবে, তার বেশিরভাগ কথাই ছিল অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয়?
ছয়
ফাইয ইবনু ওয়াসিক বলেন, আমি ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, যদি পারো, তবে কখনও কারী কিংবা বক্তা হয়ো না। কারণ, তুমি যদি সুসাহিত্যিক হও, তবে লোকেরা বলবে, তার বাক্য কত সাহিত্যপূর্ণ! তার বক্তব্য কত সুন্দর! তার সুর ও সুর কত মধুর! তখন এসব কথা তোমাকে মুগ্ধ করবে। নিজেকে তুমি অনেক বড় কিছু ভাবতে থাকবে।
আর যদি তুমি সাহিত্যিক না হও, তোমার কন্ঠ সুন্দর না হয়, তাহলে তারা বলবে, সে ভালো করে কথাই বলতে পারে না! তার সুর একদম বিশ্রী! এসব কথা তোমাকে বিষণ্ণ করে তুলবে এবং তোমার জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তখন তুমি লোক-দেখানো কাজ করা শুরু করবে।
অবশ্য তুমি যদি কথা বলতে গিয়ে কারও প্রশংসা কিংবা নিন্দার পরোয়া না করো, তবেই শুধু কথা বলবে。
সাত
একবার ফুযাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ এবং জনৈক ব্যক্তির মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রশ্নোত্তর হয়। যথা-
: দুনিয়াবিমুখতা কী? : অল্পেতুষ্টি। : পরহেযগারী কী? : হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা। : ইবাদত কী? : ফরযসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা। : নম্রতা কী? : অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে নমনীয় থাকা।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি এমনই ছিলেন। বাহ্যিকভাবে অনেককেই খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচার-ব্যবহারে পরহেজগার মনে হয়; কিন্তু যখনই কেউ তার সাথে কথা বলে, তখন দেখা যায়, সে সত্য বলার চেষ্টা করলেও পরিপূর্ণ সত্য বলতে পারে না। কখনও বললেও প্রশংসা পাবার আশায় কথাকে চাকচিক্যময় করে উপস্থাপন করে। বড়ত্ব প্রকাশের জন্য জ্ঞানগর্ভ কথা বলে। প্রশংসিত হবার আশায় কথা বলার স্থানে নীরবতা অবলম্বন করে। প্রকৃত অর্থে এগুলো হচ্ছে আত্মিক রোগ। আর এসব রোগের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো জামাআতের সময় ব্যতীত লোকজন থেকে দূরে থাকা。
আট
আবু আব্দিল্লাহ আল-আনতাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ফুযাইল ও সুফিয়ান আস-সাওরী এক বৈঠকে মিলিত হন। তারা সেখানে নানান বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে সুফিয়ান আস-সাওরীর মধ্যে ভাবান্তর ঘটে। তিনি কাঁদতে থাকেন। অতঃপর বলেন, আমি আশা করি যে, আজকের এই বৈঠক আমাদের জন্য রহমত এবং বরকত বয়ে আনবে। উত্তরে ফুযাইল বলেন, কিন্তু হে আবু আব্দিল্লাহ, আমি তো রহমত এবং বরকতের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি করছি! তুমি কি তোমার সুন্দর কথার দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করোনি? আমি কি আমার ভালো কথার দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করিনি? তার মানে হলো, তুমি আমাকে আর আমি তোমাকে মুগ্ধ করেছি মাত্র! তাই নয় কি?
তখন সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ আবারও কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, আপনি আমাকে সতর্ক করে ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ তাআলাও আপনাকে রক্ষা করুন।
নয়
আবু বকর ইবনু আইয়্যাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, চুপ থাকার সর্বনিম্ন উপকার হচ্ছে- কলুষতা থেকে মুক্ত থাকা। অধিকন্তু বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।
আর বেশি কথা বলার সর্বনিম্ন ক্ষতি হচ্ছে প্রসিদ্ধি লাভ করা। আর নিজেকে বিপদ-আপদে নিপতিত করার জন্য এটাই যথেষ্ট।
দশ
আয়ায়া ইবনু কুলাইব থেকে বর্ণিত, আমি ইবনুস সাম্মাককে বলতে শুনেছি, জিহ্বার সাহায্যে তুমি সচরাচরই হিংস্রতা প্রদর্শন করে থাকো। চারপাশ দিয়ে যারাই গমন করে, তুমি তাদের নির্মমভাবে ভক্ষণ করো। তুমি লোকদের যুগ যুগ ধরে কষ্ট দিয়েছ। এমনকি তোমার এই হিংস্রতা থেকে কবরবাসীও রেহাই পায়নি। তুমি তাদেরও গীবত ও সমালোচনা করেছ। তাদের ওপর যখন বালা-মুসিবত এসেছে, তুমি তাদের জন্য শোক প্রকাশ করোনি। এই হিংস্রতা থেকে বাঁচার জন্য তোমাকে নিম্নোক্ত তিনটি উপায়ের কোনো একটি উপায় অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে—
(১) তুমি যখন তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করবে, যা তোমার মাঝেও বিদ্যমান, তখন চিন্তা করবে, একই বিষয়ে নিজের ও অন্যের সঙ্গে দ্বৈত আচরণের কারণে তোমার রব তোমার সাথে কেমন আচরণ করবেন?
(২) তুমি যখন কোনো বিষয়ে কারও সমালোচনা করবে, তখন ভাববে এই বিষয়টি তোমার মধ্যে তার চেয়েও বেশি মাত্রায় বিদ্যমান। এটা করতে পারলে অন্যের গীবত ও সমালোচনা থেকে বেঁচে থাকা অধিকতর সহজ হবে।
(৩) তুমি যখন কোনো বিষয়ে অন্যের সমালোচনা করবে তখন ভাববে, আল্লাহ তাআলা আপন দয়ায় তোমাকে এই দোষ থেকে মুক্ত রেখেছেন। সুতরাং, এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তুমিও তাকে সমালোচনা থেকে মুক্ত রাখবে। তুমি কি নীতিবাক্যটি শোনোনি— ‘কারও ত্রুটি দেখলে তার প্রতি দয়াপরবশ হয়ো। সেই সঙ্গে ওই সত্তার প্রশংসা করো—যিনি তোমায় মুক্তি দিয়েছেন’।
এগারো
বকর ইবনু মুনীর বলেন, আমি আবু আব্দিল্লাহ বুখারীকে বলতে শুনেছি, আশা করি, আমি আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় হাজির হব যে, কারও গীবত করার ব্যাপারে আমি হিসাবের সম্মুখীন হব না।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি সত্যই বলেছেন। কারণ, জারহ ও তাদীলের ক্ষেত্রে কেউ যদি তার শব্দ-চয়ন ও বাক্য-বিন্যাসের প্রতি গভীর দৃষ্টি দেয়, তাহলে খুব সহজেই তার তাকওয়াপূর্ণ সমালোচনা-রীতি অনুধাবন করতে পারবে। সেই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারবে যে, তিনি যাদের দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য ন্যায়-নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। একারণে অধিকাংশ সময় সমালোচনার ক্ষেত্রে বলেছেন, ‘মুনকারুল হাদীস, সাকাতু আনহু, ফীহি নযরুন’ ইত্যাদি। খুব কম ক্ষেত্রেই তিনি কাউকে কাযযাব (মিথ্যুক) অথবা হাদীস রচনাকারী বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অধিকন্তু তিনি এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, আমি যখন কারও ক্ষেত্রে বলি, তার হাদীস বর্ণনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তখনই মূলত সে সবার কাছে অভিযুক্ত হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, তার পূর্বোক্ত বক্তব্য-আমি আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় হাজির হব যে, কারও গীবত করার ব্যাপারে আমি হিসাবের সম্মুখীন হব না-এর সারমর্ম এটিই。
বারো
সাহল ইবনু আব্দিল্লাহ তাসতারী থেকে বর্ণিত, সিদ্দীকীন তথা সত্যবাদীদের উল্লেখযোগ্য অভ্যাস হচ্ছে-তারা কখনও আল্লাহর নামে শপথ করেন না। কারও গীবত করেন না। তাদের নিকট কাউকে গীবত করতেও দেন না। তৃপ্তি সহকারে ভক্ষণ করেন না। ওয়াদা করে কখনও তা ভঙ্গ করেন না। হাস্যরসেও খুব একটা লিপ্ত হন না।
টিকাঃ
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫৪৯
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১৪
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/১৩৩
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৯
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৫০১
১. গীবত করো।
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৭৬
৩. জারহ ও তাদীল বলতে হাদীস বর্ণনাকারীগণের গ্রহণযোগ্যতা এবং অগ্রহণযোগ্যতা নির্ণয়করণ বোঝায়।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৪৩৯-৪৪১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩৩২
📄 সালাফ কর্তৃক সময়ের মূল্যায়ন
এক
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি কুকুরকে উপহাস করা থেকে বিরত থাকি এই ভয়ে যে, আমি নিজেই তার মতো কুকুর হয়ে যেতে পারি।
আর কাউকে যখন দেখি, সে দুনিয়ার কাজও করে না এবং আখিরাতের কাজও করে না তখন আমি ভীষণ বিরক্ত হই。
দুই
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হে আদম-সন্তান, তুমি তো কতগুলো দিনের সমষ্টি। অতএব, একটি দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়া মানেই তোমার একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া。
তিন
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, আমি এমন অনেক জাতির সন্ধান জানি, যারা টাকা-পয়সার চেয়েও সময় ব্যয়ে অধিক কার্পণ্য করতেন।
চার
হাসান বসরী কর্তৃক তার শিষ্যদের প্রতি এমন আরও কিছু নসীহত ছিল, যা তাদের পার্থিব বিষয়ে বিমুখ করার পাশাপাশি পরকালীন বিষয়ে উৎসাহী করে তুলত। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
* পার্থিব জীবনের সামান্য ভোগসামগ্রী যেন তোমায় আকৃষ্ট না করে। নিজের ব্যাপারে খুব বেশিকিছু আশা করো না, তাহলে জীবনের সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।
* মৃত্যুক্ষণ খুব দ্রুতই ঘনিয়ে আসবে। তাই কোনো কাজ আগামীকালের জন্য রেখে দিয়ো না। কারণ, তুমি জানো না, ঠিক কখন তোমাকে আল্লাহর দরবারে ফিরে যেতে হবে。
পাঁচ
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ একবার উমার ইবনু আবদিল আযীযের নিকট লম্বা এক চিঠি লেখেন। তাতে তার বেশকিছু সুন্দর উপদেশ ছিল। তন্মধ্যে একটি ছিল এমন- অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী যে-সময়টি তুমি যাপন করছ, সেটাই বর্তমান। আমি চাইলে তোমার এই বর্তমানকে সাজিয়ে দিতে পারি। তখন তুমি অতীত ও ভবিষ্যতের সুখ-দুঃখ সম্পূর্ণরূপে ভুলে যাবে।
এবার তবে শোনো, আমি তোমার জন্য যে-বর্তমানকে সাজিয়ে দিতে চেয়েছি, সেটা হলো দুনিয়া। এই দুনিয়াই তোমাকে জান্নাতের ব্যাপারে ধোঁকা দিচ্ছে। জাহান্নামের পথে পরিচালিত করছে। একটি উপমার সাহায্যে ব্যাপারটা একটু খোলাসা করি-
ধরো, আজ যদি তোমার কাছে একজন মেহমান আসে, তুমি তাকে যথাযথ সম্মান দেখাও, সম্মানজনক আপ্যায়ন করো, তার রুচি ও ইচ্ছাকে গুরুত্ব দাও এবং আন্তরিকতার সঙ্গে তাকে বিদায় জানাও তাহলে নিশ্চিতরূপেই সে তোমার অনুগ্রহের সাক্ষী হয়ে থাকবে। তোমার প্রশংসা করবে এবং তোমাকে সত্যায়ন করবে।
পক্ষান্তরে তুমি যদি তার মেহমানদারি না করো, তার সাথে যথাযথ সম্মানজনক আচরণ না করো তবে সে তোমার অসদাচরণের সাক্ষী হয়ে থাকবে। সর্বত্র তোমার দুর্নাম রটাবে। তাকে তোমার চক্ষুশূল মনে হবে।
ধরো, দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দুইভাই তোমার নিকট মেহমান হলো। প্রথমজন যখন এলো, তুমি তার সাথে ভালো ব্যবহার করলে না। ঠিকমতো তার মেহমানদারিও করলে না। এরপর অপর ভাই এসে বলল, আমার ভাইয়ের পর তোমার নিকট আমার আগমন ঘটেছে। এখন যদি তুমি আমার সাথে সদ্ব্যবহার করো, তবে ইতঃপূর্বে আমার ভাইয়ের সাথে করা অসদাচরণ মুছে যাবে। তুমি আগে যা করেছ, সব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হবে। নাও, আমার ভাইয়ের পর এবার আমার পালা। এখন যদি তুমি আমাকে মূল্যায়ন করো, তবে তুমি সফল হবে। অতএব, যা আগে বিনষ্ট করে ফেলেছ, তা ঠিক করার চেষ্টা করো।
যদি তুমি এই দ্বিতীয়বারও প্রথমবারের মতো আচরণ করো, তবে জীবন বিপন্ন করতে তোমার বিরুদ্ধে তাদের সাক্ষ্যই যথেষ্ট।
নিশ্চয়ই জীবনের বাকি অংশটুকু এক অমূল্য রতন। গোটা পৃথিবী একত্র করলেও জীবনের অবশিষ্ট একটি মাত্র দিনের সমতুল্য হবে না। সুতরাং, সময়ের অবমূল্যায় করো না। একজন মৃতব্যক্তির সম্মান কখনও তোমার চেয়ে বেশি নয়। কারণ, তোমার হাতে সময় আছে, তার হাতে নেই!
বিশ্বাস করো, কবরে শায়িত কোনো ব্যক্তিকে যদি বলা হয়, তুমি কোনটা চাও— দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ তোমার সন্তানদের দিয়ে দেওয়া হোক, নাকি ব্যক্তিগত আমলের জন্য তোমাকে মাত্র একটি দিন দেওয়া হোক—এই ইচ্ছাধিকার দেওয়া হলে নিঃসন্দেহে সে দ্বিতীয়টি গ্রহণ করবে। এভাবেই সে সমস্ত কিছুর বিপরীতে এই একটা মাত্র দিনকেই বেছে নেবে।
এমনকি যদি তাকে বলা হয়, তোমাকে মাত্র একটি মুহূর্ত আর তোমার সঙ্গীদেরকে কয়েক যুগ উপহার দেওয়া হবে, তাহলেও সে নিজের জন্য ওই একটি মুহূর্তকেই বেছে নেবে। এমনকি যদি বলা হয়, তার শুধুমাত্র একটি কালিমা বলার সুযোগ আছে, যা তার আমলনামায় লেখা হবে, আর তার বন্ধুদের জন্য এর অনেকগুণ বেশি লেখা হবে, তবে সে অবশ্যই ওই একটি কালিমাকেই বেছে নেবে।
অতএব, আজকের এই দিনটাকেই নিজের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নাও। এই সময়টার মূল্যায়ন করো। সেই কালিমাটাকে সম্মান করো-যেন মৃত্যুর সময় আফসোস করতে না হয়। এই উদাহরণের বাস্তব ক্ষেত্র হওয়া থেকে কখনও নিজেকে নিরাপদ মনে করো না। আল্লাহ তাআলা এই উপদেশ দ্বারা তোমাকে ও আমাকে উপকৃত করুন। আমাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু。
ছয়
রিকাম বলেন, একবার আমি আব্দুর রহমানের কাছে জানতে চাই, তিনি তার বাবাকে কী পরিমাণ প্রশ্ন করতেন এবং তার থেকে কী পরিমাণ হাদীস শ্রবণ করতেন? তিনি বলেন, প্রায়ই আব্বাজান যখন খেতে বসতেন, আমি তাকে পড়া শোনাতাম। এছাড়াও তিনি যখন হাঁটতে বের হতেন, হাম্মামে যেতেন কিংবা কোনোকিছু খোঁজার জন্য ঘরে প্রবেশ করতেন, তখনও আমি তাকে পড়া শোনাতাম。
সাত
ইমাম রাযী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুর রহমান ইবনু আবি হাতিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা একটানা সাত মাস মিসরে অবস্থান করি। এই দীর্ঘ সময়ে সেখানে আমরা কোনো ধরনের তরকারি বা ঝোল-জাতীয় কিছু খাইনি। সারাটা দিন বিভিন্ন শাইখের মজলিসে বসার জন্য বরাদ্দ ছিল। রাতের বেলায় তাদের বয়ান লিপিবদ্ধ করা এবং পরস্পর পর্যালোচনা করার জন্য নির্ধারিত ছিল। একদিন আমি এবং আমার বন্ধু এক শাইখের নিকট যাই। গিয়ে শুনতে পাই, তিনি খুব অসুস্থ।
সেখান থেকে ফেরার পথে খুব সুন্দর একটি মাছ দেখতে পাই। মাছটি আমাদের ভীষণ পছন্দ হয়। আমরা সেটি কিনে ফেলি। বাসায় এসে দেখি, আরেক মজলিসের সময় হয়ে গেছে। সেদিন আর রান্না করতে পারিনি। পরপর তিনদিন এভাবেই কেটে যায়। এদিকে মাছটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কাজেই সময় বের করতে না-পেরে মাছটি কাঁচা-ই খেয়ে ফেলি। কারণ, আমাদের হাতে এতটুকুও সময় ছিল না যে, কাউকে দিয়ে আমরা সেটা রান্না করিয়ে নিতে পারি।
এরপর তিনি বলেন, শরীরকে আরাম দিয়ে ইলম অর্জন করা কখনই সম্ভব নয়।
আট
কাসিম ইবনু আসাকীর সুলাইমান ইবনু আইয়ুব সম্পর্কে বলেন, তিনি জীবনের প্রতিটি সময়ের হিসাব রাখতেন। অপ্রয়োজনীয় কোনো কাজে এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করতেন না। হয়তো লিখতেন, ছাত্রদের পড়াতেন অথবা নিজে পড়তেন। আমি শুনেছি, যখন তিনি কলমের মাথা তীক্ষ্ণ করতেন, তখনো তার দুই ঠোঁট নড়তে থাকত।
নয়
আবুল ওয়াফা আলী ইবনু আকিল রাহিমাহুল্লাহ নিজের সম্পর্কে বলেন, আমার জীবনের এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট হোক—এটা আমি পছন্দ করি না। এমনকি বিশ্রামের সময় যখন আমার জিহ্বা জ্ঞানমূলক আলোচনা থেকে এবং আমার চোখ জ্ঞানমূলক কোনো বিষয় অধ্যয়ন থেকে বিরত থাকে, তখনও আমি আমার মস্তিষ্ক ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাই। আমি বিভিন্ন বিষয় ভাবতে থাকি। ফলে যখনই বিশ্রাম শেষে উঠি, জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত আমার সামনে উন্মোচিত হয়। লেখার মতো অজস্র বিষয় মাথায় এসে ভিড় করে।
আমি বিশ বছর বয়সে জ্ঞানের প্রতি যতটা আগ্রহী ছিলাম, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি আগ্রহী হয়েছি আশি বছর বয়সে।
দশ
তিনি আরও বলেন, অত্যধিক ব্যস্ততার দরুণ আমি আমার খাওয়ার সময়টাও খুব সংক্ষিপ্ত করতাম। প্রয়োজনে পানির সাথে ছাতু মিশিয়ে তা রুটির ওপর ছিটিয়ে দিতাম। কারণ, শুকনো রুটি চিবুতে অনেক সময় লাগত। এমনটা করতাম—যাতে পড়ালেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারি এবং অভূতপূর্ব জ্ঞানমূলক কোনো বিষয় লিখতে পারি।
এগারো
ইমাম ইবনুল জাওযীর উস্তায ইয়াহইয়া ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হুমাইরা রাহিমাহুল্লাহ অনেক বড় ফকীহ ও উযীর ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহম করুন। তিনি বলতেন, যা-কিছুর সংরক্ষণে তুমি সচেষ্ট হতে পারো, তন্মধ্যে 'সময়' হলো সবচে' মূল্যবান। অথচ আমি দেখছি, তা-ই সবচে' সহজে তোমার হাতে বরবাদ হচ্ছে!
বারো
ইবনু নাফিস লিখতে বসার আগেই তার জন্য বেশ কয়েকটি কলম প্রস্তুত করে রাখা হতো। কলম প্রস্তুত হয়ে গেলে তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করে লেখা শুরু করতেন। যা লিখতেন, অন্তর থেকে লিখতেন। স্রোতের মতো তার কলম থেকে লেখা প্রবাহিত হতো। একটি কলম ভোঁতা হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে সেটি ফেলে অন্য একটি কলম নিয়ে লেখা শুরু করতেন—যাতে কলম প্রস্তুত করতে গিয়ে সময় ও মনোযোগ নষ্ট না হয়।
একবার তিনি বাবে যাহুমায় অবস্থিত একটি গোসলখানায় প্রবেশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই গোসল শুরু করেন; কিন্তু হঠাৎ কী ভেবে, গোসল না-করেই গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং তৎক্ষণাৎ দোয়াত-কালি ও খাতা আনতে বলেন। অতঃপর সেখানেই ধমনীর শিহরন সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন এবং যথারীতি শেষও করে ফেলেন। এরপর আবার গোসলখানায় গিয়ে গোসল শেষ করে আসেন।
ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ নিজের সম্পর্কে বলেন, আমি অনেক লোককে দেখেছি, যারা বেশি বেশি সাক্ষাৎ করার অভ্যাসবশত সর্বদা আমার সাথে সাথেই থাকত। তাদের এই বারবার আসাকে তারা খেদমত বলে মনে করত। তারা আমার মজলিসগুলোতে বসতে চাইত। এসব মজলিসে নানান ধরনের মানুষ সম্পর্কে নানান ধরনের আলোচনা করত। অপ্রয়োজনীয় কথা ও গীবতও তাদের আলোচনা থেকে বাদ পড়ত না।
আমাদের যুগে এই কাজটা অনেক লোকই করে। অনেক সময় সাক্ষাৎপ্রার্থী ব্যক্তিও এধরনের সমালোচনা ও গীবত শোনার জন্য লালায়িত থাকত। তারা একাকিত্ব পছন্দ করত না-বিশেষ করে, উৎসব এবং ঈদের দিনগুলোতে। তাদের দেখবে, তারা একে অপরের কাছে যায়। শুধু সম্ভাষণ এবং সালাম বিনিময়ের মধ্যেই ক্ষান্ত থাকে না; বরং এমন বিষয়ে কথা বলা শুরু করে, যা মূলত সময় নষ্ট করার নামান্তর। আমি ভেবে দেখেছি, সময় অত্যন্ত মূল্যবান। অতএব, এটা শুধুমাত্র ভালো কাজেই ব্যয় করা উচিত। তো আমি তাদের এই আলোচনা অপছন্দ করতে শুরু করলাম।
তাদের ব্যাপারে দুটি বিষয় ভেবে রেখেছি-
(১) যদি আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, তবে একা হয়ে পড়ব।
(২) আর যদি তাদেরকে তাদের মতো করেই গ্রহণ করি, তবে অনেক সময় নষ্ট হবে।
তাই আমি যথাসম্ভব তাদের সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। যখন আর এড়িয়ে যেতে পারতাম না, তখন একেবারে কম কথা বলতাম- যাতে তাদের হাত থেকে সহজে ছুটে যেতে পারি।
এরপর অনেক ভেবে-চিন্তে এমন কিছু কাজ প্রস্তুত করে রাখতে লাগলাম, যেগুলো কথা বলার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিবন্ধক নয়-যাতে করে তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে আমার সময় নষ্ট না হয়। যে-সমস্ত কাজ আমি সেসময়ের জন্য রাখতাম, সেগুলো হচ্ছে কাগজ কাটা, কলম ঠিক করা এবং বই বাঁধাই করা। এ সকল কাজ প্রয়োজনীয়; কিন্তু তাতে চিন্তা-ভাবনা ও মনোযোগের প্রয়োজন হয় না। ফলে আমি তাদের সাক্ষাতের সময় এই কাজগুলোতেই ব্যস্ত থাকতাম। এতে আমার এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট হতো না
টিকাঃ
১. এ অধ্যায়ে এমন কিছু উক্তি উঠে এসেছে, যা খুবই মূল্যবান। তবে সেগুলো ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা' ও 'সিফাতুস সাফওয়া’ তে খুঁজে পাইনি। তাই পাঠকের উপকারের কথা বিবেচনা করে পূর্বকথা অনুযায়ী উপযুক্ত দুই কিতাবের আলোচনায় সীমাবদ্ধকরণ সম্ভব হয়নি।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯৬
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৮৫
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৪/২২৫
২. হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১৫০
১. হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১৩৯
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/২৫১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৩/২৬৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৭/৬৪৬
৩. আল-মুনতাযাম: ৯/২১৪
১. যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলা: ১/১৭৭
২. যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলা: ১/১৮১
৩. যিনি তার সময়কার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার ওপর রহম করুন। আমীন。
১. সাইদুল খাতির: ১৮৪-১৮৫
📄 সালাফদের ভারসাম্যপূর্ণ রসিকতা
এক
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদিন এক লোক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য একটি বাহনের ব্যবস্থা করে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ
আমি তোমাকে আরোহণ করার জন্য একটি উটনীর বাচ্চা দিতে পারি।
লোকটি বলল, উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? তখন আল্লাহর রাসূল বললেন—
وَهَلْ تَلِدُ الإِبِلَ إِلَّا النُّوقُ
আরে, প্রতিটি উটই তো কোনো-না-কোনো উটনীর বাচ্চা!
দুই
সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হলাম। তার সামনে তখন কিছু রুটি এবং খেজুর ছিল। তিনি বললেন-
اُدْنُ فَكُلْ
কাছে এসে বসো এবং খাও।
আমি খেজুর খাওয়া শুরু করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
تَأْكُلُ تَمْرًا وَبِكَ رَمَدُ
তোমার চোখ উঠেছে অথচ তুমি খেজুর খাচ্ছ?
আমি কোনো কিছু না ভেবেই বলে ফেললাম, আমি অপর পাশ দিয়ে চিবুচ্ছি। এ কথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে ফেললেন।
তিন
উসাইদ ইবনু হুযাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার তিনি লোকদের সাথে কথা-বার্তা বলছিলেন এবং মাঝে মাঝে রসিকতা করে তাদের হাসাচ্ছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কাঠের টুকরা দিয়ে তার পেটে খোঁচা দিলেন। উসাইদ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি এর প্রতিশোধ নিতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, প্রতিশোধ নাও। উসাইদ বললেন, আপনার গায়ে তো জামা আছে, অথচ আমার গায়ে জামা ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জামা খুলে নিলেন। তখন উসাইদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে তার একপাশে চুমু দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এটাই ছিল আমার প্রতিশোধ।
চার
মুআবিয়া ইবনু বাহয বর্ণনা করেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
" وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
মানুষকে হাসানোর জন্য যে-ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে, সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক!
পাঁচ
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সাহাবীগণ একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের সাথে রসিকতাও করেন! তখন রাসূল বললেন-
" إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا
হ্যাঁ। তবে আমি রসিকতায় সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলি না।
ছয়
মুহাম্মাদ ইবনু নুমান বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনু হাম্মাদ-এর চেয়ে বেশি ইবাদতকারী আর কাউকে দেখিনি। আমি মনে করি, তিনি কখনও হাসেন না। এ সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, মৃদু বা মুচকি হাসি খুবই উত্তম। উলামা-মাশাইখগণের মতে না হাসার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে-
(১) আদব, আল্লাহর ভয় এবং নিজের পরিণাম ও অসহায়ত্বের চিন্তা。
(২) অজ্ঞতা, অহংকার, কিংবা লৌকিকতা।
উল্লেখ্য যে, প্রথমটি প্রশংসনীয় আর দ্বিতীয়টি নিন্দনীয়।
অধিকন্তু যে-ব্যক্তি বেশি হাসে, সবার কাছে তার মর্যাদা কমে যায়। এক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই যে, বৃদ্ধ বয়সের চেয়ে যুবক বয়সের হাসিই বেশি প্রাসঙ্গিক।
তবে মুচকি হাসি ও হাস্যোজ্জ্বল চেহারাই শ্রেষ্ঠ এবং সবার কাছে আদরণীয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“ تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ
তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একপ্রকার সাদাকা।
জারির রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম আমার সাথে কখনই হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ছাড়া সাক্ষাৎ করেননি।
এটাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। তবে সর্বোচ্চ মর্যাদা তো সেই ব্যক্তির, যে রাতের বেলায় অধিক পরিমাণ ক্রন্দন করে এবং দিনের বেলায় হাস্যোজ্জ্বল থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“ إِنَّكُمْ لَنْ تَسَعُوا النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ ، فَلْيَسَعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ الْوَجْهِ
তোমরা কখনও তোমাদের সম্পদ দ্বারা মানুষকে তৃপ্ত করতে পারবে না। তাই তোমরা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দ্বারাই তাদের তৃপ্ত করার চেষ্টা করো।
এখানে একটি কথা না বললেই নয়। সেটা হচ্ছে, যে-ব্যক্তি ছোট্ট করে মুচকি হাসে, তার এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং বেশি বেশি আত্মসমালোচনা করা উচিত-যাতে করে তার এই অমলিন হাসি প্রবৃত্তির তাড়নায় কলুষিত না হয়।
যে-সকল লোক সর্বদা বিষণ্ণ থাকে, ভ্রু সংকুচিত করে রাখে, তাদের উচিত সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল থাকা। নিজের আচরণকে সুন্দর করা। বদ অভ্যাসের কারণে নিজেকে শাসন করা।
মোটকথা, যেকোনো অবস্থায় মধ্যপন্থা থেকে সরে যাওয়া নিন্দনীয়। কাজেই সকল ক্ষেত্রে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত রাখা, ইসলামী শিষ্টাচার নিজের মধ্যে ধারণ করা এবং চিন্তা ও আচরণের ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত আবশ্যক。
টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯৮, জামি তিরমিযী: ১৯৯২
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪৪৩
২. সুনানু আবি দাউদ: ৫২২৪
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯০
২. জামি তিরমিযী: ১৯৯১
১. আল-আদাবুল মুফরাদ : ৮৯১
২. বাযযার: ১৯৭৭; আল-হুলইয়া: ১০/২৫; মুসতাদরাক: ১/১২৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/১৪০-১৪২