📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 মানুষের অধিকার আদায়ে সালাফগণের নিষ্ঠা

📄 মানুষের অধিকার আদায়ে সালাফগণের নিষ্ঠা


এক
আউফ ইবনু হারিস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বলতে শুনেছি, উম্মু হাবিবা রাযিয়াল্লাহু আনহা আমাকে তার মৃত্যুশয্যায় ডেকে বলেন, আমাদের মাঝে এমন অনেক কিছুই ঘটেছিল, যা সাধারণত সতীনদের মধ্যে ঘটে থাকে। সুতরাং, সে-সবের জন্য আল্লাহ তাআলা তোমাকে এবং আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি বললাম, আল্লাহ আপনাকে পরিপূর্ণরূপে ক্ষমা করুন এবং সে-সবের পাপবোধ থেকে পরিত্রাণ দান করুন। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাকে খুশি করুন, যেভাবে তুমি আমাকে খুশি করেছ। এরপর উম্মু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে সংবাদ পাঠিয়ে তাকেও উপস্থিত করেন এবং তাকেও একই কথা বলেন।

দুই
লাইস ইবনু সাদ এবং অন্য এক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, একদা জনৈক শাসক ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমার নিকট লিখিত আবেদন করল যে, আপনার যত ইলম আছে, তা আমাকে লিখে দিন। ইবন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে লিখে দিলেন, ইলম তো অনেক আছে। তবে তোমার এত ইলমের দরকার নেই; বরং তুমি যদি অন্যায় রক্তপাত থেকে বেঁচে থাকতে পারো, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকে বিরত থাকতে পারো, মানুষকে অসম্মান করা থেকে জিহ্বা সংযত রাখতে পারো এবং মুসলিমদের জামাআতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারো, তবে তাই করো।

তিন
আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, উমার ইবনু আব্দিল আযীযের স্ত্রী-ফাতিমা আমাকে বলেন, আমি একবার উমার ইবনু আব্দিল আযীযের ঘরে প্রবেশ করে দেখি, তিনি অশ্রুভেজা চোখে, গালে হাত দিয়ে জায়নামাজে বসে আছেন। আমি বললাম, আমীরুল মুমিনীন, কিছু হয়েছে কি? তিনি বললেন, ফাতিমা, আমি তো উম্মতে মুহাম্মাদীর সকল দায়িত্ব নিয়েছি। আমি যখন হতদরিদ্র, ক্ষুধার্ত, রোগাক্রান্ত, বস্ত্রহীন, নির্যাতিত, নিপীড়িত, হতভাগ্য, অসহায়, বৃদ্ধ এবং উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে চিন্তা করি, তখন উপলব্ধি করি যে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন আমাকে এদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং ওই মামলায় আমার বিবাদী হবেন স্বয়ং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমি ভয় করছি যে, ওই মামলায় আমার পক্ষে কোনো দলিল থাকবে না। তাই আমি নিজের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এজন্যই কান্নাকাটি করছি।

চার
মুসা ইবনু উতবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইয়ায ইবনু গানাম যখন গভর্নর হলেন, তখন তার আত্মীয়দের মধ্য থেকে একটি দল উপঢৌকনের আশায় তার দরবারে এলো। তিনি সহাস্যচিত্তে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। মেহমান হিসেবে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। অনেক যত্নআত্তি করলেন। তারা কয়েকদিন সেখানে থাকল। একপর্যায়ে উপঢৌকনের ব্যাপারে ইয়ায-এর সাথে আলোচনা করল। তারা বলল, উপঢৌকনের আশায় এত কষ্ট করে এখানে এসেছে তারা। তারা ছিল পাঁচজন। ইয়ায তাদের প্রত্যেককে দশ দিনার করে উপহার দিলেন; কিন্তু তারা সেটা ফিরিয়ে দিল এবং রাগান্বিত হয়ে গালমন্দ করতে লাগল। তখন তিনি বললেন, শোনো, আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের আত্মীয়তা অস্বীকার করি না, তোমাদের অধিকারকেও না। আমি স্বীকার করি, তোমরা অনেক কষ্ট করে এখানে এসেছ; কিন্তু আল্লাহ সাক্ষী, আমার একটা গোলাম ও অন্যান্য তৈজসপত্র বিক্রি করে যা-কিছু পেয়েছি, সবই তোমাদের হাতে তুলে দিয়েছি। অতএব, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো। আমার অক্ষমতা বোঝার চেষ্টা করো।
তারা বলল, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা না করুন। তুমি হচ্ছো পুরো অর্ধ শামের গভর্নর, অথচ তুমি আমাদের এত সামান্য উপহার দিচ্ছ যে, এগুলো নিয়ে আমাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছানোই দুষ্কর। তিনি বললেন, তাহলে কি তোমরা আমাকে আল্লাহর মাল চুরি করতে বলছ? আল্লাহর কসম, আমি এক পয়সার খেয়ানত কিংবা আল্লাহর মালে সামান্যতম সীমালংঘন করার চেয়ে করাতের নিচে দু'ভাগ হয়ে যাওয়াই অধিক পছন্দ করি।
তারা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার ক্ষেত্রে না-হয় মেনে নিলাম; কিন্তু তুমি তো আমাদের কাজ দিতে পারো। আমরা অন্যদের মতো কাজ আঞ্জাম দেব। তুমি আমাদের জন্য ভাতা চালু করে দেবে। আর আমাদের অবস্থা তো জানো, ভাতা হিসেবে যা দেবে তার থেকে এক পয়সাও বাড়তি নেব না।
ইয়াজ বললেন, কসম আল্লাহর, আমি তোমাদের অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখি; কিন্তু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যখন সংবাদ যাবে, আমি আমার আত্মীয়দের প্রশাসনে নিয়োগ দিয়েছি, তখন তিনি আমাকে দোষারোপ করবেন। তিরস্কার করবেন। তারা বলল, কেন করবেন? তোমাকেও তো আবু উবায়দা নিয়োগ করেছে, অথচ তুমি আবু উবায়দার আত্মীয়। উমার তো তোমাকে বহাল রেখেছেন। তুমি আমাদের নিয়োগ করলে সেটাও তিনি বহাল রাখবেন। তিনি বললেন, উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আবু উবায়দা যতটা কাছের এবং সম্মানের লোক আমি ততটা নই। এবার নিন্দুকের দল সেখান থেকে বিদায় হলো!

পাঁচ
সুলাইমান আত-তাইমী থেকে বর্ণিত, ইমাম আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার তিনটি গুণ আছে, যা আমি যোগ্য লোক ছাড়া অন্য কাউকে বলি না—
(১) আমাকে ডেকে নেওয়া ছাড়া আমি কখনই বাদশার দরবারে যাই না।
(২) দুজন ব্যক্তি কথা বলতে থাকলে তাদের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি তাদের মাঝে প্রবেশ করি না।
(৩) কোনো ব্যক্তি আমার সামনে থেকে চলে গেলে আমি তার ভাল বৈ মন্দ আলোচনা করি না।

ছয়
তিনি আরও বলেন, যখন কেউ আমার সাথে বিতর্ক করতে আসে, তখন আমি বেশকিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখি-
যদি সে আমার চেয়ে বড় কেউ হয়, তাহলে আমি তাকে সম্মান করি। যদি আমার চেয়ে ছোট হয়, তবে আমি তার ওপর আমার সম্মান তুলে ধরি। আর যদি সে আমার সমপর্যায়ের হয়, তাহলে নিজেকে প্রাধান্য দিই। তিনি আরও বলেন, আমি সহনশীল নই; কিন্তু আমি সহনশীলতার ভান করে থাকি।

সাত
হিশাম ইবনু উকবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি আহনাফ ইবনু কায়েসকে দেখলাম, তিনি এক গোত্রের রক্তপণ আদায় সংক্রান্ত সালিশে উপস্থিত হয়েছেন। বাদীপক্ষকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তোমাদের দাবি উত্থাপন করো। তারা বলল, আমরা হত্যার ক্ষতিপূরণস্বরূপ দুইটি রক্তমূল্য চাই। তিনি বললেন, আচ্ছা পাবে।
অতঃপর সবাই শান্ত হয়ে বসলে তিনি বললেন, তোমরা যা চেয়েছ, আমি তা তোমাদের দিচ্ছি; কিন্তু শুনে রাখো, হত্যার ক্ষতিপূরণস্বরূপ আল্লাহ একটি রক্তমূল্যের ফয়সালা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এই ফয়সালা দিয়েছেন। আরবদের মাঝেও এক রক্তমূল্যের প্রচলন রয়েছে। আজ তো তোমরা বাদী! আমার আশঙ্কা হয়, ভবিষ্যতে যদি কখনও তোমরা বিবাদী হও, তখন তারাও সেই বিধান অনুসারেই বিচার চাইবে, যে-বিধান আজ তোমরা উদ্ভাবন করে চলেছ।
একথা শুনে তারা বলল, আচ্ছা, তাহলে এক রক্তমূল্যই দিন।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২২৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২২৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/১৩১-১৩
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৬৯-২৭০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৯২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৯২
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৯৩

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 ভুল সংশোধনে সালাফদের নীতি

📄 ভুল সংশোধনে সালাফদের নীতি


এক
উরওয়া বর্ণনা করেন, মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বলেছেন, একবার তিনি মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আসেন। ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করেন। অতঃপর মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে একান্ত আলাপচারিতায় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, মিসওয়ার, আমার নেতৃত্ব নিয়ে তোমার কী কী আপত্তি রয়েছে? মিসওয়ার বলেন, আচ্ছা বাদ দিন। সেগুলো নিয়ে এখন আলাপ করার প্রয়োজন নেই। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, না। দয়া করে তুমি আমাকে সে-সব বিষয় সম্পর্কে অবহিত করো, যে-সব বিষয়ে তুমি আমার নিন্দা করো।
মিসওয়ার বলেন, তখন আমি যতগুলো বিষয়ে তার নিন্দা করি, তিরস্কার করি, সবগুলো তাকে বলে দিই। মুআবিয়া বলেন, আমি স্বীকার করি যে, আমি গুনাহ থেকে মুক্ত নই; কিন্তু তুমি কি আমার সে-সব কাজ বিবেচনা করবে না, যেগুলো আমি কেবল জনকল্যাণে করেছি? নাকি শুধু আমার দোষগুলো নিয়েই পড়ে থাকবে আর অনুগ্রহগুলো এড়িয়ে যাবে? অথচ পুণ্যময় কাজের সওয়াব দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়!
মিসওয়ার বলেন, সাধারণত দোষগুলোই তো আলোচনা করা হয়! তখন তিনি বললেন, আমি যে-সকল পাপ করেছি, সেগুলো আমি আল্লাহর কাছে স্বীকার করি;
কিন্তু তুমি ভেবে দেখো তো, তোমার কি এমন কোনো পাপ নেই, যেটা মাফ না করলে তুমি ধ্বংস হবে বলে আশঙ্কা করো? মিসওয়ার বললেন, হ্যাঁ আছে। তখন তিনি বললেন, তাহলে শুনে রাখো, আল্লাহ তাআলা ক্ষমার আশার ক্ষেত্রে তোমাকে আমার চেয়ে অধিক হকদার বানাননি।
আল্লার কসম! আমি তোমার চেয়ে অনেক বেশি জনকল্যাণমূলক কাজ করেছি। যখনই আমার কাছে আল্লাহ বা গাইরুল্লাহকে বেছে নেওয়ার সুযোগ এসেছে, আমি সর্বদা আল্লাহকেই বেছে নিয়েছি। আমি এমন এক ধর্মের অনুসারী, যেখানে আমল কবুল করা হয়। সাওয়াব দ্বারা তার প্রতিদান দেওয়া হয় এবং শুধুমাত্র সে-সব পাপের শাস্তি দেওয়া হয়, যেগুলো ক্ষমা করা হয়নি। মিসওয়ার বলেন, এক কথায় তিনি আমাকে বাকরুদ্ধ করে দেন।
উরওয়া বলেন, আমি মিসওয়ারকে দেখেছি, যখনই মুআবিয়া সম্পর্কে আলোচনা করতেন, তার জন্য দুআ করতেন。

দুই
মাইমুন ইবনু মিহরান রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসকে বলতে শুনেছি, কোনো ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারলে আমি তাকে তিন স্তরের যে কোনো একটি স্তরে রাখি-
* যদি সে আমার চেয়ে বড় কেউ হয়, তবে আমি তাকে সম্মান করি।
* যদি আমার সমসাময়িক কেউ হয়, তবে আমি নিজেকে তার ওপর প্রাধান্য দিই।
* আর যদি সে আমার চেয়ে ছোট হয়, তবে তার কথার দিকে ভ্রুক্ষেপই করি না।
এটাই আমার স্বভাব। যদি এটা কারও পছন্দ না হয়, তাহলে সে আমার থেকে দূরে থাকতে পারে।
আবু কিলাবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমার কাছে কারও নিন্দনীয় দোষ বা অপ্রীতিকর কাজের সংবাদ এলে তার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করো। যদি কোনো কারণ খুঁজে না পাও, তবে নিজেকে বোঝাও যে, হয়তো এর পেছনে আমার ভাইয়ের কোনো যৌক্তিক অজুহাত আছে, যেটা আমার জানা নেই।

রজা ইবনু হাইওয়া রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যে-ব্যক্তি বেছে বেছে এমন লোকদের বন্ধু বানায়, যাদের মধ্যে কোনো দোষ নেই, তার বন্ধু-তালিকা একেবারেই সংক্ষিপ্ত হয়।
যে-ব্যক্তি তার বন্ধুদের কাছ থেকে সব সময় ভালো ব্যবহারের আশা করে, তার রাগ দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আর যে-ব্যক্তি কথায় কথায় সবার নিন্দা করে বা দোষ ধরে, তার শত্রু বৃদ্ধি পায়।

আবু ইয়াকুব আল-মাদানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান ইবনু হাসান এবং আলী ইবনু হুসাইনের মধ্যে কিছুটা সমস্যা চলছিল। সেই সূত্রে একদিন হাসান ইবনু হাসান আলী ইবনু হুসাইন-এর কাছে আসেন। আলী তখন সহচরদের সাথে মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হাসান এসে তাকে ভালোমন্দ অনেক কথা শুনিয়ে যান; কিন্তু আলী তার কোনো কথারই উত্তর দেন না। ফলে একরকম বিরক্ত হয়েই হাসান সেখান থেকে প্রস্থান করেন।
রাতের বেলা হাসানের বাড়িতে যান আলী। দরজায় টোকা দিতেই হাসান বেরিয়ে আসেন। আলী বলেন, 'প্রিয় ভাই, তুমি আমাকে আজ যা যা বলেছ, সে বিষয়ে যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আর যদি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। আসসালামু আলাইকুম!'
এ কথা বলেই তিনি ফিরে চলেন। এদিকে হাসান তার পিছু পিছু ছুটতে থাকেন। এক সময় আলীর নাগাল পেয়ে তাকে পেছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন এবং কাঁপা কাঁপা সুরে বললেন, আমি শপথ করছি যে, আপনি যে-সব বিষয় পছন্দ করেননি, তা আমি আর কখনই পুনরাবৃত্তি করব না। তখন আলী বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি আমাকে যা যা বলেছ, সেগুলোর জন্য আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।

ছয়
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই দুনিয়া একটি তুচ্ছ বিষয়। তুচ্ছ ব্যক্তিরাই দুনিয়ার দিকে ধাবিত হয়। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো সে, যে অন্যায়ভাবে দুনিয়া গ্রহণ করে, অকারণে কামনা করে এবং অপাত্রে ব্যয় করে।

সাত
মালিক ইবনু আনাস থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এমন কোনো ভদ্র আলিম অথবা সম্মানিত ব্যক্তি নেই, যার মধ্যে কোনো দোষ নেই; কিন্তু মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই আছে, যাদের দোষগুলো আলোচনা না করাই শ্রেয়। তারা হচ্ছে ওই সকল লোক, যাদের দোষের তুলনায় গুণ বেশি। এত বেশি যে, তাদের গুণগুলো দোষগুলোকে ঢেকে রেখেছে।

আট
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ কাতাদা ইবনু দিআমা আস-সাদুসীর জীবনীতে উল্লেখ করেন— তিনি সর্বসম্মতিক্রমে সে-সব বর্ণনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ছিলেন, যেগুলো তিনি নিজ কানে শুনেছেন বলে প্রমাণিত। কারণ, হাদীস বর্ণনায় তিনি একজন মুদাল্লিস হিসেবে প্রসিদ্ধ।
তিনি কাদরিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। আমরা আল্লাহর নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি।
এতদসত্ত্বেও কেউ তার সত্যবাদিতা, ন্যায়-পরায়ণতা ও স্মরণশক্তি সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করেনি। আল্লাহ তাআলা হয়তো সে-সব ব্যক্তিবর্গের বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন, যারা আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব এবং পবিত্রতা প্রমাণের জন্য বিদআত-সদৃশ কাজ করেছেন এবং নিজেদের শ্রম ব্যয় করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রজ্ঞাময়, ন্যায়পরায়ণ এবং বান্দার ব্যাপারে সূক্ষ্মদর্শী। তিনি যা করেন, সে ব্যাপারে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না।
কোনো ইমামের যথাযথ সিদ্ধান্ত প্রসিদ্ধি লাভ করলে, ন্যায়-নিষ্ঠা ও সত্যপ্রীতি সুবিদিত হলে, সুগভীর জ্ঞানের কথা মানুষের মুখে মুখে চর্চিত হতে থাকলে এবং তার সততা, বুদ্ধিমত্তা ও স্মরণশক্তি প্রবাদে পরিণত হলে আমরা কিছুতেই তাকে ভ্রান্ত বলব না। আবার একেবারে ছেড়েও দেব না। তার গুণগুলো উপেক্ষা করব না। আবার তার বিদআত ও ভুলগুলোর অনুসরণও করব না। অধিকন্তু আমরা তার জন্য ক্ষমার দুআ ও আশা করব。

নয়
আলী ইবনুল মাদীনী থেকে বর্ণিত, আমি সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, ইবনু আইয়্যাশ আল-মানতাওয়াফ একবার উমার ইবনু যরের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগেন। যত্রতত্র তার দোষ বলে বেড়ান। তাকে গালমন্দ করেন। এমতাবস্থায় একদিন উমার তার সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, হে প্রিয়, আমাকে গালমন্দ করার ক্ষেত্রে বেশি বাড়াবাড়ি করো না। সংশোধনের কিছুটা জায়গাও রেখো। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ তাআলার যতটা আনুগত্য করি, তার তুলনায় আল্লাহর অবাধ্য বান্দার সাথে সামঞ্জস্য কম রাখি।

দশ
আবদান ইবনু উসমান থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কোনো ব্যক্তির দোষের চেয়ে গুণ অনেক বেশি থাকলে তার দোষগুলো আলোচনা করা উচিত নয়। অনুরূপ কোনো ব্যক্তির গুণের তুলনায় দোষ অনেক বেশি থাকলে তার গুণ আলোচনা করা উচিত নয়।

এগারো
ইউনুস আস সাদাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহুর চেয়ে অধিক জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান আর কাউকে দেখিনি। একবার একটি মাসআলা নিয়ে তার সাথে আমার বিতর্ক হয়। বিতর্কের পর তিনি আমার সাথে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন এবং হাত ধরে বলেন, আবু মুসা, আমরা যদি কোনো মাসআলার ক্ষেত্রে একমত নাও হতে পারি, তবুও কি আমাদের ভাই ভাই হয়ে থাকা উচিত নয়?

তেরো
ইউনুস ইবনু আব্দিল আ'লা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদা ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, ইউনুস, তোমার কোনো বন্ধুর থেকে অপ্রীতিকর কোনো আচরণ প্রকাশ পেলে অথবা সংবাদ এলে, তার প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ বা তার থেকে বন্ধুত্ব ছিন্ন করার ব্যাপারে সাবধান থাকবে। কেননা, এমন করলে তুমি সে-সব লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, যারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সম্পর্ক ও বিশ্বাস নষ্ট করে ফেলে।
কাজেই সম্পর্ক ও বিশ্বাস অটুট রাখতে চাইলে, সেই বন্ধুর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করবে। তাকে জিজ্ঞেস করবে, 'তোমার ব্যাপারে যে-সংবাদ এসেছে, তা কি সত্য? সে যদি সংবাদ অস্বীকার করে, তবে তাকে বলবে যে, 'তুমি সত্যবাদী। তুমি পবিত্র।' এর বেশি কিছু বলার দরকার নেই। যে ব্যক্তি সংবাদ দিয়েছে, তার নাম বলার তো মোটেই অবকাশ নেই।
পক্ষান্তরে সে যদি অভিযোগ স্বীকার করে, তাহলে তার কৃত আচরণের জন্য যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে এবং তাকে অক্ষম মনে করবে। যদি কোনো কারণ খুঁজে বের করতে না পারো, তবে তাকে বলবে যে, তোমার ব্যাপারে আমার কাছে যে সংবাদ এসেছে, সে ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কী? সে যদি কোনো কারণ উল্লেখ করে, তবে তা গ্রহণ করবে। আর যদি কোনো কারণ উল্লেখ করতে না পারে এবং তাকে দোষী সাব্যস্ত করা ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকে, তবেই কেবল তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারবে।
এরপর তোমার সামনে দুটি পথ খোলা থাকবে। তুমি চাইলে কোনোরকম বাড়াবাড়ি না করে তার সাথে যথোপযুক্ত আচরণ করতে পারো। আবার চাইলে ক্ষমাও করে দিতে পারো। তবে মনে রাখবে, ক্ষমা করা তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী এবং অতি সম্মানজনক।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ
অন্যায়ের প্রতিদান সমপরিমাণ অন্যায় দ্বারা দেওয়া যেতে পারে। তারপরও যে-ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয় এবং আপসে নিষ্পত্তি করে, তার প্রতিদান মহান আল্লাহ দান করবেন
এখন যদি তার দোষ অনুযায়ী আচরণ করতে দ্বিধায় ভুগে থাকো, তবে তোমার প্রতি ইতিপূর্বে তার যত অনুগ্রহ ছিল, সেগুলো স্মরণ করবে এবং তার এই দোষের প্রতিদানে তার প্রতি অনুগ্রহ করবে; কিন্তু খবরদার, এই অপরাধের কারণে তার পূর্ববর্তী অনুগ্রহ উপেক্ষা করবে না। কেননা, সেটা স্পষ্টতই কৃতঘ্নতা ও জুলুম।
আর মনে রাখবে, কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলে সেটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। কারণ, বন্ধুত্ব করা কঠিন, টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন; কিন্তু ত্যাগ করা খুবই সহজ।

চৌদ্দ
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ স্পেনের শাসক 'নাসির লি দ্বীনীল্লাহ'-এর জীবনীতে লেখেন, আমি পূর্ববর্তীদের জীবন-চরিতের সঙ্গে তার জীবন-চরিতও উল্লেখ করেছি। তবুও বেশকিছু প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের জন্য তার জীবনীর কিয়দাংশ পুনরাবৃত্তি করছি-
যে-ব্যক্তি জিহাদের ময়দানে বীরত্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে রাখে, তার ত্রুটিগুলো সবার কাছে সহজ ও ক্ষমার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। পক্ষান্তরে যে-ব্যক্তি জিহাদ পরিত্যাগ করে, প্রজাদের ওপর জুলুম করে এবং রাজকোষ লুট করে, তার সামান্য অপরাধও ক্ষমার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। অধিকন্তু মহান আল্লাহও তাকে পাকড়াও করার অপেক্ষায় থাকেন।

পনেরো
হুসাইন ইবনু জুনাইদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীনকে বলতে শুনেছি, আমরা এমন এক প্রজন্মের সমালোচনা করছি, যারা হয়তো আরও দুইশ বছর আগেই জান্নাতে গিয়ে তাদের বাহনের জিন খুলে রেখেছেন।
ইবনু মাহরাওয়াই বলেন, আমি একদিন আব্দুর রহমান ইবনু আবি হাতিমের কাছে যাই। তিনি তখন ছাত্রদের 'আল-জারহ ওয়াত তাদীল'। -এর একটি কিতাব পড়াচ্ছিলেন। আমি তাকে ইয়াহইয়ার উপর্যুক্ত কথাটি শোনালে তিনি কেঁদে ফেলেন। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে কিতাবখানা নিচে পড়ে যায়। এরপরও তিনি কাঁদতেই থাকেন এবং কথাটি আবারও শুনতে চান।

ষোলো
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ ইবনিশ শাফিয়ীর জীবনীতে লেখেন—
গোঁড়া শিয়া, হানাবেলা, আশায়েরাহ, মুরজিয়া, জাহমিয়া ও কাররামিয়াদের উৎপাতে সারা দুনিয়ায় আজ তোলপাড় চলছে। তাদের সংখ্যাও দিনদিন বৃদ্ধি।
পাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেক দুনিয়াবিমুখ আবেদ ও আলিমও আছে। তন্মধ্যে তাওহীদের বিশ্বাসীদের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। কুমন্ত্রণা ও বিদআত থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় চাই। সুন্নাহ ও সুন্নাহর অনুসারীদের ভালোবাসি। আমরা তাদের আলিমদের আল্লাহর আনুগত্য ও প্রশংসনীয় গুণাবলির জন্য ভালোবাসি। গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাকৃত বিদআতও আমরা পছন্দ করি না। কারণ, সুন্নাহসম্মত স্বীকৃত আমলই গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়ে থাকে!

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৫১-১৫৩
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭৫৪
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৩৮
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৫৮
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৯৪
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮১
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮১
৪. যিনি হাদীস বর্ণনা করার সময় উক্ত হাদীস যে-শাইখের কাছ থেকে শুনেছেন তার নাম সরাসরি উল্লেখ না করে সে-শাইখ হাদীসটি যার কাছ থেকে শুনেছেন তার নাম উল্লেখ করেন—এমন ব্যক্তিকে হাদীসের পরিভাষায় ‘মুদাল্লিস’ বলা হয়।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/২৭১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৩৮৮-৩৮৯
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৯৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/১৬
১. সূরা শূরা, আয়াত: ৪০
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৫২-২৫৩
৩. যদিও প্রকৃত ব্যাপারটি মহান আল্লাহর হাতেই ন্যস্ত থাকে।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৫৬৪
২. ইমাম যাহাবী বলেন, সম্ভবত কথাটা 'একশ বছর' হবে। কারণ, ইয়াহইয়ার সময় থেকে তাদের পর্যন্ত দুইশ বছর অতিবাহিত হয়নি।
৩. আল-জারহ ওয়াত তাদীল বলতে হাদীস বর্ণনাকারীগণের গ্রহণযোগ্যতা এবং অগ্রহণযোগ্যতা নির্ণয়করণ বোঝায়।
৪. ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি সম্ভবত পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করছিলেন। অন্যথায় দুর্বল রাবীদের ক্ষেত্রে পরহেজগার সমালোচকের কথা তো দ্বীনের জন্য কল্যাণকামিতা এবং সুন্নাহর জন্য প্রতীরক্ষাস্বরূপ!
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/১৬৮
৬. মোটাদাগে হাম্বলী ও আশয়ারীরা আহলুস সুন্নাহ'র অন্তর্ভুক্ত। এখানে তাদের নির্দিষ্ট একটি অংশকে বোঝানো হয়েছে, যারা সুস্পষ্টভাবে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৪৫-৪৬

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 আলিমগণের প্রতি সালাফদের সম্মানপ্রদর্শন

📄 আলিমগণের প্রতি সালাফদের সম্মানপ্রদর্শন


এক
আবু ওয়ায়েল থেকে বর্ণিত, একবার আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা জনৈক ব্যক্তিকে দেখেন যে, সে টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরেছে। তাই তিনি লোকটিকে ডেকে বললেন, তুমি তোমার কাপড় টাখনুর ওপর উঠিয়ে নাও; কিন্তু সে বলল, আগে আপনি আপনার কাপড় উঠিয়ে নিন। তখন ইবনু মাসউদ বললেন, আমার টাখনুতে সমস্যা আছে। (ইমামতি করার সময় টাখনুর দিকে কারও চোখ পড়লে তার খারাপ লাগতে পারে। তাই ঢেকে রাখি।)
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু এই ঘটনা জানতে পেরে লোকটাকে ডেকে এনে শাস্তি দেন এবং বলেন, তোমার এত বড় সাহস! তুমি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের কথার পাল্টা জবাব দাও!

দুই
ইবনু সালামা থেকে বর্ণিত, একবার যায়েদ ইবনু সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমার নিকট আগমন করেন। তখন ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য উঠে দাঁড়ান এবং তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখেন। যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বলেন, হে রাসূলের চাচাত ভাই, আপনি ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিন। তখন তিনি বলেন, আমরা তো আমাদের উলামায়ে কেরাম এবং বড়দের সাথে এমন আচরণই করে থাকি।

তিন
ইবরাহীম ইবনু ইসহাক আল-হারবী থেকে বর্ণিত, আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন মক্কার এক মহিলার গোলাম। তিনি দেখতে ছিলেন কুচকুচে কালো। তাঁর নাক ছিল মটরশুঁটির মতো। একবার আমিরুল মুমিনীন-সুলাইমান ইবনু আব্দিল মালিক তাঁর ছেলেদের নিয়ে আতা ইবনু আবি রাবাহ-এর কাছে আগমন করেন। তিনি তখন সালাত আদায় করছিলেন। আমিরুল মুমিনীন তাঁর সালাত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকেন। সালাত শেষ হলে তিনি আগন্তুকদের দিকে ঘুরে বসেন।
কিন্তু এমন সময় মানুষ তাঁকে হজের বিভিন্ন মাসআলা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে। অগত্যা তিনি তাঁদের থেকে মুখ ফিরিয়ে সাধারণ মানুষের দিকে ঘুরে বসেন। তখন সুলাইমান তাঁর ছেলেদের উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমরা দাঁড়াও। তারা দাঁড়ালে আমিরুল মুমিনীন তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে পুত্রদ্বয়, তোমরা ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ত্রুটি বা শৈথিল্য প্রদর্শন করবে না। কেননা, এই কালো গোলামের সামনে আমার এই অপমান আমি কখনই ভুলতে পারবো না।

চার
আশআস ইবনু শু'বা আল-মুসাইয়িসী থেকে বর্ণিত, একবার খলীফা হারুনুর রশীদ রাক্কা শহরে আগমন করেন। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহও তখন রাক্কা শহরে অবস্থান করছিলেন। একদিন তাঁর সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষজন এসে রাক্কায় উপস্থিত হতে থাকে। তাদের জুতাগুলো এদিক-সেদিক পড়ে থাকে। তাদের পদচারণায় ধুলোবালি উৎক্ষিপ্ত হয়ে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। খলীফার এক বাঁদি সুউচ্চ প্রাসাদের ওপর থেকে এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। সে লোকজন ডেকে জিজ্ঞেস করে, কী হচ্ছে এখানে? এত মানুষের সমাগম কেন? তখন লোকজন বলে, খোরাসানের একজন প্রসিদ্ধ আলিম এখানে আগমন করেছেন। বাঁদি তখন বলে ওঠে, আল্লাহর কসম! এটা তো এমন এক রাজত্ব, হারুনুর রশিদের রাজত্ব যার সামনে কিছুই নয়। কারণ, হারুনুর রশিদের রাজ্যে তো পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক ব্যতীত এত জনসমাগম কখনও হয় না।

পাঁচ
রুসতাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আব্দুর রহমান ইবনু মাহদীকে বলতে শুনেছি, কোনো ব্যক্তি তার চেয়ে বড় কোনো আলিমের সাথে সাক্ষাৎ করলে সেই দিনটিকে যেন তার সৌভাগ্যের কারণ মনে করে।
তার সমপর্যায়ের কোনো আলিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেন তারা পরস্পরে জ্ঞানমূলক আলোচনা করে এবং তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে।
আর তার চেয়ে ছোট কোনো আলিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সে যেন বিনয়ী হয় এবং তাকে নানান বিষয়ে শিক্ষাদান করে।
এমন কোনো ব্যক্তি যেন ইমাম বা দলপ্রধান না হয়, যে কিনা যা শোনে তাই বর্ণনা করে, নির্বিচারে সবার কাছ থেকে ইলম অর্জন করে অথবা ব্যতিক্রমী ও দুর্লভ রওয়ায়াতগুলো বেশি বেশি বর্ণনা করে। ইমাম কেবল সেই হবে, যে একেবারে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে কোনো বিষয় আয়ত্ত করে থাকে।

ছয়
ইবনু বাশকুয়াল বলেন, আমি ইবনু আত্তাবের কিতাব থেকে বলছি, ইবরাহীম আল-হারবী একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান আলিম ছিলেন। তার কাছে যখন এই সংবাদ পৌঁছাল যে, তার শিষ্যরা তাকে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল থেকেও শ্রেষ্ঠতর মনে করছে এবং তার ওপর প্রাধান্য দিচ্ছে, তখন তিনি তাদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তারা এ কথা স্বীকার করে নিল। তখন তিনি বললেন, আমি যার সমপর্যায়ের নই এবং কখনও হতেও পারব না, সেই ব্যক্তির ওপর আমাকে প্রাধান্য দিয়ে তোমরা আমার ওপর জুলুম করেছ। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আর কখনও তোমাদের কোনো ইলম শিক্ষা দেব না। অতএব, আজকের পর থেকে তোমরা কেউ কখনই আমার কাছে আসবে না।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯১-৪৯২
১. সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৭
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৮৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/২০৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩৬৪

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 কথাবার্তায় সালাফগণের শিষ্টাচার

📄 কথাবার্তায় সালাফগণের শিষ্টাচার


এক
মাইমুন ইবনু মিহরান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার একলোক সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এসে বলল, জনাব, আমাকে কিছু নসীহত করুন। তিনি বললেন-
: কারও সাথে কথা বলো না।
: মানুষের মাঝে বসবাস করব, অথচ কথা বলব না—এটা তো অসম্ভব?
: আচ্ছা, যদি কথা বলতেই হয়, তবে সত্য কথা বলবে অথবা চুপ থাকবে।
: আমাকে আরও কিছু নসীহত করুন।
: কখনও কারও ওপর রাগ করবে না।
: আমি এই সমস্যায় মারাত্মক রকম জর্জরিত। এতে আমার কোনোই নিয়ন্ত্রণ নেই।
: আচ্ছা, যদি রাগ করতেই হয়, তবে নিজের হাত ও মুখ নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
: আরও কিছু নসীহত করুন।
: মানুষের সাথে মেলামেশা করো না।
: মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকব, কিন্তু তাদের সাথে কথা বলব না—এটা তো অসম্ভব?
: আচ্ছা, যদি মেলামেশা করতেই হয়, তবে সর্বদা জিহ্বা সংযত রাখবে এবং সবার প্রতি আমানতদারী রক্ষা করে চলবে।'

দুই
মুআয ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহর নিকট বসা ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তৎক্ষণাৎ আরেক ব্যক্তি হাদীসটি রদ করেন। দুইজনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থা দেখে আতা বলেন, সুবহানাল্লাহ! এ কেমন আচরণ? এ কেমন ব্যবহার? আমিও তো এই লোকের হাদীস শুনছিলাম এবং চুপ থেকে তাকে এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে, আমি তার চেয়ে বেশিকিছু জানি না। অথচ বাস্তবে আমি হাদীসটির শুদ্ধাশুদ্ধি সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি জানি।

তিন
উসমান ইবনু আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, আমি একবার আতা রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, ধরুন, এক লোক কোনো এক গোত্রের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গোত্রের লোকেরা তার নামে নানান নিন্দামূলক কথা বলছিল। এখন ওই কথাগুলো কি ওই লোকটাকে বলা যাবে? তিনি বললেন, 'না, বলা যাবে না; কারণ, মজলিসের কথাগুলো হচ্ছে আমানত।'

চার
ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ বর্ণনা করেন, একবার উমার ইবনু আব্দিল আযীয রাহিমাহুল্লাহ আমাদের নিকট একটি চিঠি লেখেন। মাকহুল এবং আমি চিঠিটি সংরক্ষণ করি। চিঠিতে লেখা ছিল—
যে-ব্যক্তি মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করে, সে পার্থিব জীবনে খুব অল্পতেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। আর যে-ব্যক্তি নিজের কথাবার্তার হিসাব রাখে, তার অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা একেবারে কমে যায়। আসসালামু আলাইকুম।

পাঁচ
ইয়ালা ইবনু উবায়েদ বলেন, একবার আমরা মুহাম্মাদ ইবনু সাওকার নিকট যাই। তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বলেন, আজ আমি তোমাদের এমন একটি কথা বলব, যা হয়তো তোমাদের অনেক উপকারে আসবে। আমার জীবনে কথাটা প্রভৃত উপকার বয়ে এনেছে।
অতঃপর তিনি বলেন, আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ আমাদের বলেছেন, ভাইয়েরা, তোমাদের অগ্রজরা বেশি কথা বলা একদম পছন্দ করতেন না। তারা কুরআন তিলাওয়াত, সৎকাজে আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ এবং দৈনন্দিন জীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ছাড়া অতিরিক্ত কথাগুলো হিসেব করে কাগজে টুকে রাখতেন। তোমাদের ডানে ও বামে দুজন সম্মানিত ফেরেশতা উপবিষ্ট রয়েছেন। তোমরা যা বলছ, তারা সঙ্গে সঙ্গে তা লিপিবদ্ধ করে ফেলছেন। ব্যাপারটা কি তোমরা অস্বীকার করতে পারবে? তোমাদের কি লজ্জা হয় না? যদি তোমাদের কারও আমলনামা দিবালোকে খুলে দেখানো হয় তাহলে দেখা যাবে, তার বেশিরভাগ কথাই ছিল অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয়?

ছয়
ফাইয ইবনু ওয়াসিক বলেন, আমি ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, যদি পারো, তবে কখনও কারী কিংবা বক্তা হয়ো না। কারণ, তুমি যদি সুসাহিত্যিক হও, তবে লোকেরা বলবে, তার বাক্য কত সাহিত্যপূর্ণ! তার বক্তব্য কত সুন্দর! তার সুর ও সুর কত মধুর! তখন এসব কথা তোমাকে মুগ্ধ করবে। নিজেকে তুমি অনেক বড় কিছু ভাবতে থাকবে।
আর যদি তুমি সাহিত্যিক না হও, তোমার কন্ঠ সুন্দর না হয়, তাহলে তারা বলবে, সে ভালো করে কথাই বলতে পারে না! তার সুর একদম বিশ্রী! এসব কথা তোমাকে বিষণ্ণ করে তুলবে এবং তোমার জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তখন তুমি লোক-দেখানো কাজ করা শুরু করবে।
অবশ্য তুমি যদি কথা বলতে গিয়ে কারও প্রশংসা কিংবা নিন্দার পরোয়া না করো, তবেই শুধু কথা বলবে。

সাত
একবার ফুযাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ এবং জনৈক ব্যক্তির মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রশ্নোত্তর হয়। যথা-
: দুনিয়াবিমুখতা কী? : অল্পেতুষ্টি। : পরহেযগারী কী? : হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা। : ইবাদত কী? : ফরযসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা। : নম্রতা কী? : অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে নমনীয় থাকা।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি এমনই ছিলেন। বাহ্যিকভাবে অনেককেই খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচার-ব্যবহারে পরহেজগার মনে হয়; কিন্তু যখনই কেউ তার সাথে কথা বলে, তখন দেখা যায়, সে সত্য বলার চেষ্টা করলেও পরিপূর্ণ সত্য বলতে পারে না। কখনও বললেও প্রশংসা পাবার আশায় কথাকে চাকচিক্যময় করে উপস্থাপন করে। বড়ত্ব প্রকাশের জন্য জ্ঞানগর্ভ কথা বলে। প্রশংসিত হবার আশায় কথা বলার স্থানে নীরবতা অবলম্বন করে। প্রকৃত অর্থে এগুলো হচ্ছে আত্মিক রোগ। আর এসব রোগের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো জামাআতের সময় ব্যতীত লোকজন থেকে দূরে থাকা。

আট
আবু আব্দিল্লাহ আল-আনতাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ফুযাইল ও সুফিয়ান আস-সাওরী এক বৈঠকে মিলিত হন। তারা সেখানে নানান বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে সুফিয়ান আস-সাওরীর মধ্যে ভাবান্তর ঘটে। তিনি কাঁদতে থাকেন। অতঃপর বলেন, আমি আশা করি যে, আজকের এই বৈঠক আমাদের জন্য রহমত এবং বরকত বয়ে আনবে। উত্তরে ফুযাইল বলেন, কিন্তু হে আবু আব্দিল্লাহ, আমি তো রহমত এবং বরকতের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি করছি! তুমি কি তোমার সুন্দর কথার দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করোনি? আমি কি আমার ভালো কথার দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করিনি? তার মানে হলো, তুমি আমাকে আর আমি তোমাকে মুগ্ধ করেছি মাত্র! তাই নয় কি?
তখন সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ আবারও কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, আপনি আমাকে সতর্ক করে ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ তাআলাও আপনাকে রক্ষা করুন।

নয়
আবু বকর ইবনু আইয়্যাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, চুপ থাকার সর্বনিম্ন উপকার হচ্ছে- কলুষতা থেকে মুক্ত থাকা। অধিকন্তু বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।
আর বেশি কথা বলার সর্বনিম্ন ক্ষতি হচ্ছে প্রসিদ্ধি লাভ করা। আর নিজেকে বিপদ-আপদে নিপতিত করার জন্য এটাই যথেষ্ট।

দশ
আয়ায়া ইবনু কুলাইব থেকে বর্ণিত, আমি ইবনুস সাম্মাককে বলতে শুনেছি, জিহ্বার সাহায্যে তুমি সচরাচরই হিংস্রতা প্রদর্শন করে থাকো। চারপাশ দিয়ে যারাই গমন করে, তুমি তাদের নির্মমভাবে ভক্ষণ করো। তুমি লোকদের যুগ যুগ ধরে কষ্ট দিয়েছ। এমনকি তোমার এই হিংস্রতা থেকে কবরবাসীও রেহাই পায়নি। তুমি তাদেরও গীবত ও সমালোচনা করেছ। তাদের ওপর যখন বালা-মুসিবত এসেছে, তুমি তাদের জন্য শোক প্রকাশ করোনি। এই হিংস্রতা থেকে বাঁচার জন্য তোমাকে নিম্নোক্ত তিনটি উপায়ের কোনো একটি উপায় অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে—
(১) তুমি যখন তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করবে, যা তোমার মাঝেও বিদ্যমান, তখন চিন্তা করবে, একই বিষয়ে নিজের ও অন্যের সঙ্গে দ্বৈত আচরণের কারণে তোমার রব তোমার সাথে কেমন আচরণ করবেন?
(২) তুমি যখন কোনো বিষয়ে কারও সমালোচনা করবে, তখন ভাববে এই বিষয়টি তোমার মধ্যে তার চেয়েও বেশি মাত্রায় বিদ্যমান। এটা করতে পারলে অন্যের গীবত ও সমালোচনা থেকে বেঁচে থাকা অধিকতর সহজ হবে।
(৩) তুমি যখন কোনো বিষয়ে অন্যের সমালোচনা করবে তখন ভাববে, আল্লাহ তাআলা আপন দয়ায় তোমাকে এই দোষ থেকে মুক্ত রেখেছেন। সুতরাং, এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তুমিও তাকে সমালোচনা থেকে মুক্ত রাখবে। তুমি কি নীতিবাক্যটি শোনোনি— ‘কারও ত্রুটি দেখলে তার প্রতি দয়াপরবশ হয়ো। সেই সঙ্গে ওই সত্তার প্রশংসা করো—যিনি তোমায় মুক্তি দিয়েছেন’।

এগারো
বকর ইবনু মুনীর বলেন, আমি আবু আব্দিল্লাহ বুখারীকে বলতে শুনেছি, আশা করি, আমি আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় হাজির হব যে, কারও গীবত করার ব্যাপারে আমি হিসাবের সম্মুখীন হব না।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি সত্যই বলেছেন। কারণ, জারহ ও তাদীলের ক্ষেত্রে কেউ যদি তার শব্দ-চয়ন ও বাক্য-বিন্যাসের প্রতি গভীর দৃষ্টি দেয়, তাহলে খুব সহজেই তার তাকওয়াপূর্ণ সমালোচনা-রীতি অনুধাবন করতে পারবে। সেই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারবে যে, তিনি যাদের দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য ন্যায়-নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। একারণে অধিকাংশ সময় সমালোচনার ক্ষেত্রে বলেছেন, ‘মুনকারুল হাদীস, সাকাতু আনহু, ফীহি নযরুন’ ইত্যাদি। খুব কম ক্ষেত্রেই তিনি কাউকে কাযযাব (মিথ্যুক) অথবা হাদীস রচনাকারী বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অধিকন্তু তিনি এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, আমি যখন কারও ক্ষেত্রে বলি, তার হাদীস বর্ণনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তখনই মূলত সে সবার কাছে অভিযুক্ত হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, তার পূর্বোক্ত বক্তব্য-আমি আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় হাজির হব যে, কারও গীবত করার ব্যাপারে আমি হিসাবের সম্মুখীন হব না-এর সারমর্ম এটিই。

বারো
সাহল ইবনু আব্দিল্লাহ তাসতারী থেকে বর্ণিত, সিদ্দীকীন তথা সত্যবাদীদের উল্লেখযোগ্য অভ্যাস হচ্ছে-তারা কখনও আল্লাহর নামে শপথ করেন না। কারও গীবত করেন না। তাদের নিকট কাউকে গীবত করতেও দেন না। তৃপ্তি সহকারে ভক্ষণ করেন না। ওয়াদা করে কখনও তা ভঙ্গ করেন না। হাস্যরসেও খুব একটা লিপ্ত হন না।

টিকাঃ
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫৪৯
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১৪
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/১৩৩
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২১৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৯
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৫০১
১. গীবত করো।
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৭৬
৩. জারহ ও তাদীল বলতে হাদীস বর্ণনাকারীগণের গ্রহণযোগ্যতা এবং অগ্রহণযোগ্যতা নির্ণয়করণ বোঝায়।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৪৩৯-৪৪১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00