📄 মায়ের সেবায় সালাফগণ
এক
মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উসমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে একেকটা খেজুরগাছের দাম ওঠে এক হাজার দিরহাম। এ সময় উসামা ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু একটি ভালো খেজুরগাছ শেকড় থেকে উপড়ে ফেলেন। এরপর সেটা চিড়ে তার মাথি বের করে মাকে খাওয়ান। লোকেরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, একেকটা খেজুরগাছের মূল্য যখন এক হাজার দিরহাম, তখন এই সামান্য মাথির জন্য পুরো গাছটাই বরবাদ করে দিলেন? তিনি বললেন, আমার আম্মা তা খেতে চেয়েছেন। তিনি আমার কাছে কিছু চাইবেন, আর আমি সক্ষমতা সত্ত্বেও তা পূর্ণ করব না, এমনটা হতে পারে না।
দুই
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনু মুনকাদির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার ভাই উমার রাত জেগে সালাত আদায় করে। অন্যান্য ইবাদতে নিমগ্ন থাকে। আমি তখন মায়ের পা দাবিয়ে দিই। আমার কাছে তার ওই রাতের চেয়ে আমার রাতটাই অধিক প্রিয়।
তিন
ইবনু আউন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন খুব বিনয় ও আদবের সাথে তার মায়ের কাছে বসা ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি তার এই অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যান এবং ব্যস্তসমস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, মুহাম্মাদের কী হয়েছে? শরীর খারাপ? নাকি অন্যকোনো সমস্যা? উপস্থিত একজন উত্তর দেয়, না, কিছু হয়নি। কোনো সমস্যাও নেই। তিনি যখন মায়ের নিকট অবস্থান করেন, তখন এভাবেই থাকেন।
চার
হিশাম ইবনু হাসসান থেকে বর্ণিত, হাফসা বিনতু সীরীন ও রাহিমাহাল্লাহ বলেন, মুহাম্মাদ যখন মায়ের ঘরে যেতেন, শ্রদ্ধা ও সম্মানের কারণে তখন মুখ ফুটে কোনো কথা বলতে পারতেন না।
পাঁচ
ইবনু আউন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, একবার তার মা তাকে ডাকলে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন; কিন্তু তাড়াহুড়ার কারণে তার আওয়াজ মায়ের আওয়াজের চেয়ে একটু ভারী শোনায়। এর প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তিনি দুটি গোলাম আযাদ করেন!
ছয়
হিশাম ইবনু হাসসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হুযাইল ইবনু হাফসা গ্রীষ্মকালে লাকড়ি ও কাঠখড়ি জোগাড় করতেন। এরপর সেগুলোর বাকল ছাড়াতেন। সাথে কিছু বাঁশও ফালিফালি করে কেটে রাখতেন।
তার মা হাফসা বিনতু সীরীন বলেন, শীতকাল শুরু হলে আমার খুব ঠান্ডা লাগত। এরপরও রাতজেগে সালাত আদায়ের চেষ্টা করতাম। আমি সালাতে দাঁড়ালে, হুযাইল আমার পেছনে একটি স্টোভ এনে তাতে কাঠখড়িগুলো পোড়াতে থাকত। ধোঁয়ার কারণে যেন আমার কোনো রকম কষ্ট না-হয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখত। এতে আমি উন্নতা অনুভব করতাম এবং পূর্ণ স্বস্তির সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত সালাতে কাটিয়ে দিতাম।
তিনি বলেন, সে চাইলে তার পরিবার নিয়েও সময়টা কাটাতে পারত। আমার মাঝেমাঝে ইচ্ছে হতো তাকে বলি, বাবা, তুমি তোমার পরিবারের কাছে যাও। তাদের সময় দাও; কিন্তু পরক্ষণেই ভাবতাম, সে যা করছে, করুক। এতেই হয়তো কল্যাণ নিহিত আছে। তাই বাধা দিতাম না। কিছু বলতামও না।
তিনি আরও বলেন, হুযাইলের মৃত্যুর পর আমি যথাসাধ্য ধৈর্যধারণের চেষ্টা করি। তবুও শোকের তীব্র রেশটা রয়েই যায়। এটা কিছুতেই দূর হচ্ছিল না। এরই মধ্যে একরাতে আমি সালাতে দাঁড়াই। গভীর তন্ময়ের সঙ্গে সূরা নাহল তিলাওয়াত করতে থাকি। যখন এই আয়াতটিতে এসে পৌঁছি-
وَلاَ تَشْتَرُوا بِعَهْدِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلاً إِنَّمَا عِندَ اللَّهِ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَمَا عِندَ اللَّهِ بَاقٍ وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
আর তোমরা স্বল্পমূল্যে আল্লাহর অঙ্গীকার বিক্রী করো না। আল্লাহর কাছে যা আছে, তোমাদের জন্য তাই উত্তম-যদি তোমরা তা জানতে! তোমাদের নিকট যা আছে তা ফুরিয়ে যায়। আর আল্লাহর নিকট যা আছে তা স্থায়ী। আর যারা সবর করেছে, তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদের উত্তম প্রতিদান দেব।
তিনি বলেন, আমি বার বার এ আয়াত পড়তে থাকি। ফলে আল্লাহ তাআলা পুত্র-শোকের যন্ত্রণা দূর করে দেন।
হিশাম বলেন, হুযাইল ইবনু হাফসার একটি উষ্ট্রী ছিল। উষ্ট্রীটি প্রচুর দুধ দিত।
হাফসা বিনতু সীরীন বলেন, প্রতিদিন সকালে সে দুধ দোহন করে আমার কাছে নিয়ে আসত। আমি বলতাম, বাবা, তুমি তো জানো, আমি দুধ পান করতে পারব না। কারণ, আমি রোজাদার। তিনি বলতেন, আম্মা, উটের উলানে রাতভর যে-দুধটা থাকে, সেটা খুবই ভালো। সুতরাং, আপনি যাকে চান, তা পান করাতে পারেন।
সাত
আব্দুর রহমান ইবনু আহমাদ থেকে বর্ণিত, তার পিতা বলেন, একবার জনৈক নারী বাকি রাহিমাহুল্লাহর নিকট গিয়ে নিবেদন করেন, 'শাইখ, আমার ছেলেটা বন্দি হয়ে আছে। তার মুক্তির কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। আমি তো হতাশ! দিশেহারা! দয়া করে আপনি যদি এমন কাউকে বলে দিতেন, যে তাকে ছাড়াতে পারে?'
বাকি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ঠিকাছে। তুমি এখন যাও। আমি ব্যাপারটা ভেবে দেখছি। এরপর তিনি মাথা নিচু করে ঠোঁট নাড়তে থাকেন।
কিছুদিন পর ওই নারী তার ছেলেকে সাথে নিয়ে বাকি রাহিমাহুল্লাহর কাছে আসে। ছেলেটা পুরো ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলে-
আমি বাদশাহর কয়েদখানায় ছিলাম। একবার আমি বিশেষ একটি আমলে মশগুল ছিলাম। তখন সহসাই আমার হাতের বেড়ি খুলে পড়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ছেলেটি এই অভাবনীয় ঘটনার সময় ও দিন-তারিখ উল্লেখ করে। তখন হিসেব করে দেখা যায়, শাইখ যখন মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে দুআ করছিলেন, ঠিক তখনই এই ঘটনা ঘটে।
ছেলেটি আরও বলে, এই ঘটনা দেখে আমাদের প্রহরায় নিয়োজিত লোকটি চিৎকার করে ওঠে। তার চেহারায় ভয় ও অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তৎক্ষণাৎ কামারকে ডেকে আমার হাতে আবারও বেড়ি পরানো হয়; কিন্তু পরানো শেষ হতেই অটোমেটিক বেড়ি খুলে পড়ে যায়। এতে সবাই হতভম্ব ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনন্যোপায় হয়ে তারা তাদের ধর্মগুরুর শরণাপন্ন হয়। ধর্মগুরু আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন?
আমি বলি, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তার দুআ কবুল হয়েছে। এটা তারই ফল। অন্য বর্ণনায় আছে, ধর্মগুরুরা বলেন-
আল্লাহ তোমাকে মুক্ত করেছেন। সুতরাং, তোমাকে এখন বন্দি করে রাখার সাধ্য কার? এরপর তারা আমাকে কিছু পাথেয় দিয়ে বিদায় জানায়।
টিকাঃ
১. তিনি রাসূলের পালকপুত্র যায়েদ ইবনু হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র। তার মা উম্মু আইমান ছিলেন রাসূলের পরিচারিকা।
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫২২
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৪৩
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৫
৩. মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনের বোন
৪. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৫
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৩৬৬
৬. মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন-এর ভাগিনা
১. সূরা নাহল, আয়াত: ৯৫-৯৬
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৫
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/২৯০
📄 বন্ধু ও সঙ্গীদের প্রতি সালাফগণের অনুগ্রহ ও সদ্ব্যবহার
এক
মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনি হাসান ইবনু শাকিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, হজের সময় 'মারও' শহরের কিছু অধিবাসী আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহর কাছে এসে তার সফরসঙ্গী হওয়ার আবেদন জানায়। তিনি তাদের বলেন, তোমরা সফরের খরচাদি নিয়ে এসো। তার নির্দেশ অনুসারে খরচাদি আনা হলে তিনি সেগুলো সিন্দুকে রেখে তালা ঝুলিয়ে দেন।
এরপর একটি বাহন ভাড়া করেন। তাদেরকে মারও থেকে বাগদাদে নিয়ে যান। নিজের অর্থায়নে তাদের সকল প্রয়োজন পুরা করেন। উন্নত ও উপাদেয় খাবারের ব্যবস্থা করেন। উৎকৃষ্ট মানের মিষ্টান্ন সরবরাহ করেন। অবশেষে তাদেরকে সাড়ম্বরে বাগদাদ থেকে মদীনা মুনাওয়ারা নিয়ে যান। এরপর প্রত্যেককে আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার পরিবার তোমাকে মদীনা থেকে কী নিয়ে যেতে বলেছে? প্রত্যেকে তার প্রয়োজনের কথা বললে তিনি নিজে সেগুলো ক্রয় করে দেন।
এরপর তিনি হজ পালনের জন্য তাদের মক্কায় নিয়ে আসেন। হজ পালন শেষ হলে প্রত্যেককে পুনরায় আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার পরিবার মক্কা থেকে কী কী জিনিস নিয়ে যেতে বলেছে? তারা তাদের পরিবারের চাহিদার কথা বললে তিনি নিজের অর্থায়নে সেগুলো তাদের কিনে দেন।
সবশেষে তাদের নিয়ে মক্কা থেকে মারও-এর উদ্দেশ্যে রওনা করেন। পথিমধ্যে তাদের জন্য অকাতরে ব্যয় করেন। তাদের ঘরবাড়ি সাজিয়ে দেন। তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাদের জন্য ভোজসভার আয়োজন করেন। সবাইকে কাপড়-চোপড় উপহার দেন। ভ্রমণ, পানাহার ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে তারা পরিতৃপ্ত হলে তিনি সিন্দুকটি আনতে বলেন এবং প্রত্যেককে তার থলে ফিরিয়ে দেন।
দুই
যায়েদ ইবনু আসলাম তার পিতা আসলাম থেকে বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে বলেন, হে আবু খালিদ- আমি আমীরুল মুমিনীন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখেছি, তিনি তোমাকে যেভাবে সঙ্গে রাখতেন, সেভাবে তোমার অন্য কোনো সাথীকেই রাখতেন না। তিনি এমন কোনো সফরে বের হতেন না, যে সফরে তুমি তার সাথে ছিলে না। তুমি তার বিষয়ে আমাকে কিছু বলো। তখন আসলাম বললেন, তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর জন্য বটবৃক্ষের ন্যায় ছায়াদানকারী অভিভাবক। তিনি আমাদের বাহন প্রস্তুত করতেন। নিজেই তার মালামাল বাহনে তুলতেন। কোনো একরাতে আমরা অবসর বসে ছিলাম, অথচ তিনি আমাদের বাহনে জিনাও বাঁধছিলেন।
তিন
মুসআব ইবনু আহমাদ ইবনি মুসআব থেকে বর্ণিত, আবু মুহাম্মাদ আল-মারওয়াযী রাহিমাহুল্লাহ একবার বাগদাদ আগমন করেন। তার গন্তব্য ছিল মক্কা-মুকাররমা। আমি সেই সফরে তার সফরসঙ্গী হতে চাচ্ছিলাম। তাই আমি তার নিকট এসে সফরসঙ্গী হবার আবেদন করি; কিন্তু তিনি আমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবে টানা তিন বছর আমার সফরসঙ্গী হওয়ার আবেদন এবং তার প্রত্যাখ্যান চলতে থাকে। চতুর্থ বছর আবারও আবেদন জানালে তিনি বললেন-
: একটি শর্তের ভিত্তিতে তোমাকে সফরসঙ্গী করা যেতে পারে।
: আমাদের একজন আমীর হবে। অপরজন তার বিরোধিতা করতে পারবে না।
: আপনিই তো আমীর।
: না; বরং তুমি আমীর।
: আপনি তো বয়সে বড় ও গুণে মহৎ।
: তাহলে তুমি আমার অবাধ্য হবে না?
: আচ্ছা, ঠিক আছে।
উপর্যুক্ত শর্ত মেনে আমি তার সাথে রওনা হই। খাবার উপস্থিত হলে খাবার-গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি আমাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন; বরং পুরোটাই আমাকে দিচ্ছিলেন। আমি তার সামনে সামান্য খাবার পেশ করলেও তিনি বলতেন, আমি কি তোমাকে এই শর্তে সফরসঙ্গী করিনি যে, তুমি আমার অবাধ্য হবে না?
এভাবেই আমাদের সফর চলতে থাকে। ফলে আমি তার সঙ্গী হওয়ার কারণে লজ্জিত হই। কেননা, তিনি নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিলেন। সফররত অবস্থায় কোনো কোনোদিন আমরা প্রবল বৃষ্টির কবলে পড়তাম। তখন তিনি আমাকে বলতেন, আবু আহমাদ, আশেপাশে মাইলস্টোন আছে কি না, খোঁজ করো তো। এরপর আমাকে বলতেন, তুমি এর গোড়ায় বসে যাও। আমাকে বসিয়ে তিনি তার দুই হাত মাইলস্টোনের ওপর রেখে আমার ওপর ঝুঁকে থাকতেন এবং একটি চাদরে আবৃত হয়ে আমাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতেন।
ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, তার সাথে আর কখনই সফরে বের হব না। কারণ, এক্ষেত্রে তিনি নিজেকেই কষ্ট দিয়ে থাকেন। মক্কা পৌঁছানো পর্যন্ত এ রকমই চলতে থাকে। তার ওপর আল্লাহ তাআলার অবারিত রহমত বর্ষিত হোক।
চার
বিলাল ইবনু সাদ এমন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন-যিনি আমির ইবনু আব্দিল্লাহ তামীমীকে রোম শহরে দেখেছেন। তিনি বলেন, আমিরের কাছে একটি খচ্চর ছিল। তিনি এবং তার সঙ্গী-মুহাজিরগণ পালাক্রমে খচ্চরটিতে আরোহণ করতেন। বিলাল বলেন, যখন তিনি তার কোনো সহযোদ্ধাকে বিদায় জানাতেন, তাকে ভালো করে চিনে রাখতেন। এরপর যখনই কোনো সফরে তাদের সাথে দেখা হতো, অনেক খুশি হতেন এবং শর্ত দিতেন যে, তিনি তাদের খেদমত করবেন। তাদের দাওয়াত দেবেন এবং তাদের পেছনে নিজের শ্রম ব্যয় করবেন।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৫৫, ৩৫৬
২. আসলাম এর উপনাম। তিনি উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম ছিলেন।
৩. ঘোড়া বা উটের পিঠে বসার গদি বিশেষ। যা সাধারণত চামড়া, কাপড় বা সুতার হয়ে থাকে।
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪৮, ১৪৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৭
📄 মানুষের অধিকার আদায়ে সালাফগণের নিষ্ঠা
এক
আউফ ইবনু হারিস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বলতে শুনেছি, উম্মু হাবিবা রাযিয়াল্লাহু আনহা আমাকে তার মৃত্যুশয্যায় ডেকে বলেন, আমাদের মাঝে এমন অনেক কিছুই ঘটেছিল, যা সাধারণত সতীনদের মধ্যে ঘটে থাকে। সুতরাং, সে-সবের জন্য আল্লাহ তাআলা তোমাকে এবং আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি বললাম, আল্লাহ আপনাকে পরিপূর্ণরূপে ক্ষমা করুন এবং সে-সবের পাপবোধ থেকে পরিত্রাণ দান করুন। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাকে খুশি করুন, যেভাবে তুমি আমাকে খুশি করেছ। এরপর উম্মু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে সংবাদ পাঠিয়ে তাকেও উপস্থিত করেন এবং তাকেও একই কথা বলেন।
দুই
লাইস ইবনু সাদ এবং অন্য এক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, একদা জনৈক শাসক ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমার নিকট লিখিত আবেদন করল যে, আপনার যত ইলম আছে, তা আমাকে লিখে দিন। ইবন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে লিখে দিলেন, ইলম তো অনেক আছে। তবে তোমার এত ইলমের দরকার নেই; বরং তুমি যদি অন্যায় রক্তপাত থেকে বেঁচে থাকতে পারো, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকে বিরত থাকতে পারো, মানুষকে অসম্মান করা থেকে জিহ্বা সংযত রাখতে পারো এবং মুসলিমদের জামাআতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারো, তবে তাই করো।
তিন
আতা ইবনু আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, উমার ইবনু আব্দিল আযীযের স্ত্রী-ফাতিমা আমাকে বলেন, আমি একবার উমার ইবনু আব্দিল আযীযের ঘরে প্রবেশ করে দেখি, তিনি অশ্রুভেজা চোখে, গালে হাত দিয়ে জায়নামাজে বসে আছেন। আমি বললাম, আমীরুল মুমিনীন, কিছু হয়েছে কি? তিনি বললেন, ফাতিমা, আমি তো উম্মতে মুহাম্মাদীর সকল দায়িত্ব নিয়েছি। আমি যখন হতদরিদ্র, ক্ষুধার্ত, রোগাক্রান্ত, বস্ত্রহীন, নির্যাতিত, নিপীড়িত, হতভাগ্য, অসহায়, বৃদ্ধ এবং উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে চিন্তা করি, তখন উপলব্ধি করি যে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন আমাকে এদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং ওই মামলায় আমার বিবাদী হবেন স্বয়ং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমি ভয় করছি যে, ওই মামলায় আমার পক্ষে কোনো দলিল থাকবে না। তাই আমি নিজের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এজন্যই কান্নাকাটি করছি।
চার
মুসা ইবনু উতবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইয়ায ইবনু গানাম যখন গভর্নর হলেন, তখন তার আত্মীয়দের মধ্য থেকে একটি দল উপঢৌকনের আশায় তার দরবারে এলো। তিনি সহাস্যচিত্তে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। মেহমান হিসেবে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। অনেক যত্নআত্তি করলেন। তারা কয়েকদিন সেখানে থাকল। একপর্যায়ে উপঢৌকনের ব্যাপারে ইয়ায-এর সাথে আলোচনা করল। তারা বলল, উপঢৌকনের আশায় এত কষ্ট করে এখানে এসেছে তারা। তারা ছিল পাঁচজন। ইয়ায তাদের প্রত্যেককে দশ দিনার করে উপহার দিলেন; কিন্তু তারা সেটা ফিরিয়ে দিল এবং রাগান্বিত হয়ে গালমন্দ করতে লাগল। তখন তিনি বললেন, শোনো, আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের আত্মীয়তা অস্বীকার করি না, তোমাদের অধিকারকেও না। আমি স্বীকার করি, তোমরা অনেক কষ্ট করে এখানে এসেছ; কিন্তু আল্লাহ সাক্ষী, আমার একটা গোলাম ও অন্যান্য তৈজসপত্র বিক্রি করে যা-কিছু পেয়েছি, সবই তোমাদের হাতে তুলে দিয়েছি। অতএব, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো। আমার অক্ষমতা বোঝার চেষ্টা করো।
তারা বলল, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা না করুন। তুমি হচ্ছো পুরো অর্ধ শামের গভর্নর, অথচ তুমি আমাদের এত সামান্য উপহার দিচ্ছ যে, এগুলো নিয়ে আমাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছানোই দুষ্কর। তিনি বললেন, তাহলে কি তোমরা আমাকে আল্লাহর মাল চুরি করতে বলছ? আল্লাহর কসম, আমি এক পয়সার খেয়ানত কিংবা আল্লাহর মালে সামান্যতম সীমালংঘন করার চেয়ে করাতের নিচে দু'ভাগ হয়ে যাওয়াই অধিক পছন্দ করি।
তারা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার ক্ষেত্রে না-হয় মেনে নিলাম; কিন্তু তুমি তো আমাদের কাজ দিতে পারো। আমরা অন্যদের মতো কাজ আঞ্জাম দেব। তুমি আমাদের জন্য ভাতা চালু করে দেবে। আর আমাদের অবস্থা তো জানো, ভাতা হিসেবে যা দেবে তার থেকে এক পয়সাও বাড়তি নেব না।
ইয়াজ বললেন, কসম আল্লাহর, আমি তোমাদের অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখি; কিন্তু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যখন সংবাদ যাবে, আমি আমার আত্মীয়দের প্রশাসনে নিয়োগ দিয়েছি, তখন তিনি আমাকে দোষারোপ করবেন। তিরস্কার করবেন। তারা বলল, কেন করবেন? তোমাকেও তো আবু উবায়দা নিয়োগ করেছে, অথচ তুমি আবু উবায়দার আত্মীয়। উমার তো তোমাকে বহাল রেখেছেন। তুমি আমাদের নিয়োগ করলে সেটাও তিনি বহাল রাখবেন। তিনি বললেন, উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আবু উবায়দা যতটা কাছের এবং সম্মানের লোক আমি ততটা নই। এবার নিন্দুকের দল সেখান থেকে বিদায় হলো!
পাঁচ
সুলাইমান আত-তাইমী থেকে বর্ণিত, ইমাম আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার তিনটি গুণ আছে, যা আমি যোগ্য লোক ছাড়া অন্য কাউকে বলি না—
(১) আমাকে ডেকে নেওয়া ছাড়া আমি কখনই বাদশার দরবারে যাই না।
(২) দুজন ব্যক্তি কথা বলতে থাকলে তাদের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি তাদের মাঝে প্রবেশ করি না।
(৩) কোনো ব্যক্তি আমার সামনে থেকে চলে গেলে আমি তার ভাল বৈ মন্দ আলোচনা করি না।
ছয়
তিনি আরও বলেন, যখন কেউ আমার সাথে বিতর্ক করতে আসে, তখন আমি বেশকিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখি-
যদি সে আমার চেয়ে বড় কেউ হয়, তাহলে আমি তাকে সম্মান করি। যদি আমার চেয়ে ছোট হয়, তবে আমি তার ওপর আমার সম্মান তুলে ধরি। আর যদি সে আমার সমপর্যায়ের হয়, তাহলে নিজেকে প্রাধান্য দিই। তিনি আরও বলেন, আমি সহনশীল নই; কিন্তু আমি সহনশীলতার ভান করে থাকি।
সাত
হিশাম ইবনু উকবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি আহনাফ ইবনু কায়েসকে দেখলাম, তিনি এক গোত্রের রক্তপণ আদায় সংক্রান্ত সালিশে উপস্থিত হয়েছেন। বাদীপক্ষকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তোমাদের দাবি উত্থাপন করো। তারা বলল, আমরা হত্যার ক্ষতিপূরণস্বরূপ দুইটি রক্তমূল্য চাই। তিনি বললেন, আচ্ছা পাবে।
অতঃপর সবাই শান্ত হয়ে বসলে তিনি বললেন, তোমরা যা চেয়েছ, আমি তা তোমাদের দিচ্ছি; কিন্তু শুনে রাখো, হত্যার ক্ষতিপূরণস্বরূপ আল্লাহ একটি রক্তমূল্যের ফয়সালা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এই ফয়সালা দিয়েছেন। আরবদের মাঝেও এক রক্তমূল্যের প্রচলন রয়েছে। আজ তো তোমরা বাদী! আমার আশঙ্কা হয়, ভবিষ্যতে যদি কখনও তোমরা বিবাদী হও, তখন তারাও সেই বিধান অনুসারেই বিচার চাইবে, যে-বিধান আজ তোমরা উদ্ভাবন করে চলেছ।
একথা শুনে তারা বলল, আচ্ছা, তাহলে এক রক্তমূল্যই দিন।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২২৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২২৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/১৩১-১৩
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৬৯-২৭০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৯২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৯২
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৯৩
📄 ভুল সংশোধনে সালাফদের নীতি
এক
উরওয়া বর্ণনা করেন, মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বলেছেন, একবার তিনি মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আসেন। ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করেন। অতঃপর মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে একান্ত আলাপচারিতায় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, মিসওয়ার, আমার নেতৃত্ব নিয়ে তোমার কী কী আপত্তি রয়েছে? মিসওয়ার বলেন, আচ্ছা বাদ দিন। সেগুলো নিয়ে এখন আলাপ করার প্রয়োজন নেই। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, না। দয়া করে তুমি আমাকে সে-সব বিষয় সম্পর্কে অবহিত করো, যে-সব বিষয়ে তুমি আমার নিন্দা করো।
মিসওয়ার বলেন, তখন আমি যতগুলো বিষয়ে তার নিন্দা করি, তিরস্কার করি, সবগুলো তাকে বলে দিই। মুআবিয়া বলেন, আমি স্বীকার করি যে, আমি গুনাহ থেকে মুক্ত নই; কিন্তু তুমি কি আমার সে-সব কাজ বিবেচনা করবে না, যেগুলো আমি কেবল জনকল্যাণে করেছি? নাকি শুধু আমার দোষগুলো নিয়েই পড়ে থাকবে আর অনুগ্রহগুলো এড়িয়ে যাবে? অথচ পুণ্যময় কাজের সওয়াব দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়!
মিসওয়ার বলেন, সাধারণত দোষগুলোই তো আলোচনা করা হয়! তখন তিনি বললেন, আমি যে-সকল পাপ করেছি, সেগুলো আমি আল্লাহর কাছে স্বীকার করি;
কিন্তু তুমি ভেবে দেখো তো, তোমার কি এমন কোনো পাপ নেই, যেটা মাফ না করলে তুমি ধ্বংস হবে বলে আশঙ্কা করো? মিসওয়ার বললেন, হ্যাঁ আছে। তখন তিনি বললেন, তাহলে শুনে রাখো, আল্লাহ তাআলা ক্ষমার আশার ক্ষেত্রে তোমাকে আমার চেয়ে অধিক হকদার বানাননি।
আল্লার কসম! আমি তোমার চেয়ে অনেক বেশি জনকল্যাণমূলক কাজ করেছি। যখনই আমার কাছে আল্লাহ বা গাইরুল্লাহকে বেছে নেওয়ার সুযোগ এসেছে, আমি সর্বদা আল্লাহকেই বেছে নিয়েছি। আমি এমন এক ধর্মের অনুসারী, যেখানে আমল কবুল করা হয়। সাওয়াব দ্বারা তার প্রতিদান দেওয়া হয় এবং শুধুমাত্র সে-সব পাপের শাস্তি দেওয়া হয়, যেগুলো ক্ষমা করা হয়নি। মিসওয়ার বলেন, এক কথায় তিনি আমাকে বাকরুদ্ধ করে দেন।
উরওয়া বলেন, আমি মিসওয়ারকে দেখেছি, যখনই মুআবিয়া সম্পর্কে আলোচনা করতেন, তার জন্য দুআ করতেন。
দুই
মাইমুন ইবনু মিহরান রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসকে বলতে শুনেছি, কোনো ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারলে আমি তাকে তিন স্তরের যে কোনো একটি স্তরে রাখি-
* যদি সে আমার চেয়ে বড় কেউ হয়, তবে আমি তাকে সম্মান করি।
* যদি আমার সমসাময়িক কেউ হয়, তবে আমি নিজেকে তার ওপর প্রাধান্য দিই।
* আর যদি সে আমার চেয়ে ছোট হয়, তবে তার কথার দিকে ভ্রুক্ষেপই করি না।
এটাই আমার স্বভাব। যদি এটা কারও পছন্দ না হয়, তাহলে সে আমার থেকে দূরে থাকতে পারে।
আবু কিলাবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমার কাছে কারও নিন্দনীয় দোষ বা অপ্রীতিকর কাজের সংবাদ এলে তার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করো। যদি কোনো কারণ খুঁজে না পাও, তবে নিজেকে বোঝাও যে, হয়তো এর পেছনে আমার ভাইয়ের কোনো যৌক্তিক অজুহাত আছে, যেটা আমার জানা নেই।
রজা ইবনু হাইওয়া রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যে-ব্যক্তি বেছে বেছে এমন লোকদের বন্ধু বানায়, যাদের মধ্যে কোনো দোষ নেই, তার বন্ধু-তালিকা একেবারেই সংক্ষিপ্ত হয়।
যে-ব্যক্তি তার বন্ধুদের কাছ থেকে সব সময় ভালো ব্যবহারের আশা করে, তার রাগ দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আর যে-ব্যক্তি কথায় কথায় সবার নিন্দা করে বা দোষ ধরে, তার শত্রু বৃদ্ধি পায়।
আবু ইয়াকুব আল-মাদানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান ইবনু হাসান এবং আলী ইবনু হুসাইনের মধ্যে কিছুটা সমস্যা চলছিল। সেই সূত্রে একদিন হাসান ইবনু হাসান আলী ইবনু হুসাইন-এর কাছে আসেন। আলী তখন সহচরদের সাথে মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হাসান এসে তাকে ভালোমন্দ অনেক কথা শুনিয়ে যান; কিন্তু আলী তার কোনো কথারই উত্তর দেন না। ফলে একরকম বিরক্ত হয়েই হাসান সেখান থেকে প্রস্থান করেন।
রাতের বেলা হাসানের বাড়িতে যান আলী। দরজায় টোকা দিতেই হাসান বেরিয়ে আসেন। আলী বলেন, 'প্রিয় ভাই, তুমি আমাকে আজ যা যা বলেছ, সে বিষয়ে যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আর যদি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। আসসালামু আলাইকুম!'
এ কথা বলেই তিনি ফিরে চলেন। এদিকে হাসান তার পিছু পিছু ছুটতে থাকেন। এক সময় আলীর নাগাল পেয়ে তাকে পেছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন এবং কাঁপা কাঁপা সুরে বললেন, আমি শপথ করছি যে, আপনি যে-সব বিষয় পছন্দ করেননি, তা আমি আর কখনই পুনরাবৃত্তি করব না। তখন আলী বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি আমাকে যা যা বলেছ, সেগুলোর জন্য আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।
ছয়
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই দুনিয়া একটি তুচ্ছ বিষয়। তুচ্ছ ব্যক্তিরাই দুনিয়ার দিকে ধাবিত হয়। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো সে, যে অন্যায়ভাবে দুনিয়া গ্রহণ করে, অকারণে কামনা করে এবং অপাত্রে ব্যয় করে।
সাত
মালিক ইবনু আনাস থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এমন কোনো ভদ্র আলিম অথবা সম্মানিত ব্যক্তি নেই, যার মধ্যে কোনো দোষ নেই; কিন্তু মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই আছে, যাদের দোষগুলো আলোচনা না করাই শ্রেয়। তারা হচ্ছে ওই সকল লোক, যাদের দোষের তুলনায় গুণ বেশি। এত বেশি যে, তাদের গুণগুলো দোষগুলোকে ঢেকে রেখেছে।
আট
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ কাতাদা ইবনু দিআমা আস-সাদুসীর জীবনীতে উল্লেখ করেন— তিনি সর্বসম্মতিক্রমে সে-সব বর্ণনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ছিলেন, যেগুলো তিনি নিজ কানে শুনেছেন বলে প্রমাণিত। কারণ, হাদীস বর্ণনায় তিনি একজন মুদাল্লিস হিসেবে প্রসিদ্ধ।
তিনি কাদরিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। আমরা আল্লাহর নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি।
এতদসত্ত্বেও কেউ তার সত্যবাদিতা, ন্যায়-পরায়ণতা ও স্মরণশক্তি সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করেনি। আল্লাহ তাআলা হয়তো সে-সব ব্যক্তিবর্গের বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন, যারা আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব এবং পবিত্রতা প্রমাণের জন্য বিদআত-সদৃশ কাজ করেছেন এবং নিজেদের শ্রম ব্যয় করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রজ্ঞাময়, ন্যায়পরায়ণ এবং বান্দার ব্যাপারে সূক্ষ্মদর্শী। তিনি যা করেন, সে ব্যাপারে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না।
কোনো ইমামের যথাযথ সিদ্ধান্ত প্রসিদ্ধি লাভ করলে, ন্যায়-নিষ্ঠা ও সত্যপ্রীতি সুবিদিত হলে, সুগভীর জ্ঞানের কথা মানুষের মুখে মুখে চর্চিত হতে থাকলে এবং তার সততা, বুদ্ধিমত্তা ও স্মরণশক্তি প্রবাদে পরিণত হলে আমরা কিছুতেই তাকে ভ্রান্ত বলব না। আবার একেবারে ছেড়েও দেব না। তার গুণগুলো উপেক্ষা করব না। আবার তার বিদআত ও ভুলগুলোর অনুসরণও করব না। অধিকন্তু আমরা তার জন্য ক্ষমার দুআ ও আশা করব。
নয়
আলী ইবনুল মাদীনী থেকে বর্ণিত, আমি সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, ইবনু আইয়্যাশ আল-মানতাওয়াফ একবার উমার ইবনু যরের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগেন। যত্রতত্র তার দোষ বলে বেড়ান। তাকে গালমন্দ করেন। এমতাবস্থায় একদিন উমার তার সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, হে প্রিয়, আমাকে গালমন্দ করার ক্ষেত্রে বেশি বাড়াবাড়ি করো না। সংশোধনের কিছুটা জায়গাও রেখো। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ তাআলার যতটা আনুগত্য করি, তার তুলনায় আল্লাহর অবাধ্য বান্দার সাথে সামঞ্জস্য কম রাখি।
দশ
আবদান ইবনু উসমান থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কোনো ব্যক্তির দোষের চেয়ে গুণ অনেক বেশি থাকলে তার দোষগুলো আলোচনা করা উচিত নয়। অনুরূপ কোনো ব্যক্তির গুণের তুলনায় দোষ অনেক বেশি থাকলে তার গুণ আলোচনা করা উচিত নয়।
এগারো
ইউনুস আস সাদাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহুর চেয়ে অধিক জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান আর কাউকে দেখিনি। একবার একটি মাসআলা নিয়ে তার সাথে আমার বিতর্ক হয়। বিতর্কের পর তিনি আমার সাথে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন এবং হাত ধরে বলেন, আবু মুসা, আমরা যদি কোনো মাসআলার ক্ষেত্রে একমত নাও হতে পারি, তবুও কি আমাদের ভাই ভাই হয়ে থাকা উচিত নয়?
তেরো
ইউনুস ইবনু আব্দিল আ'লা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদা ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, ইউনুস, তোমার কোনো বন্ধুর থেকে অপ্রীতিকর কোনো আচরণ প্রকাশ পেলে অথবা সংবাদ এলে, তার প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ বা তার থেকে বন্ধুত্ব ছিন্ন করার ব্যাপারে সাবধান থাকবে। কেননা, এমন করলে তুমি সে-সব লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, যারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সম্পর্ক ও বিশ্বাস নষ্ট করে ফেলে।
কাজেই সম্পর্ক ও বিশ্বাস অটুট রাখতে চাইলে, সেই বন্ধুর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করবে। তাকে জিজ্ঞেস করবে, 'তোমার ব্যাপারে যে-সংবাদ এসেছে, তা কি সত্য? সে যদি সংবাদ অস্বীকার করে, তবে তাকে বলবে যে, 'তুমি সত্যবাদী। তুমি পবিত্র।' এর বেশি কিছু বলার দরকার নেই। যে ব্যক্তি সংবাদ দিয়েছে, তার নাম বলার তো মোটেই অবকাশ নেই।
পক্ষান্তরে সে যদি অভিযোগ স্বীকার করে, তাহলে তার কৃত আচরণের জন্য যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে এবং তাকে অক্ষম মনে করবে। যদি কোনো কারণ খুঁজে বের করতে না পারো, তবে তাকে বলবে যে, তোমার ব্যাপারে আমার কাছে যে সংবাদ এসেছে, সে ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কী? সে যদি কোনো কারণ উল্লেখ করে, তবে তা গ্রহণ করবে। আর যদি কোনো কারণ উল্লেখ করতে না পারে এবং তাকে দোষী সাব্যস্ত করা ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকে, তবেই কেবল তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারবে।
এরপর তোমার সামনে দুটি পথ খোলা থাকবে। তুমি চাইলে কোনোরকম বাড়াবাড়ি না করে তার সাথে যথোপযুক্ত আচরণ করতে পারো। আবার চাইলে ক্ষমাও করে দিতে পারো। তবে মনে রাখবে, ক্ষমা করা তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী এবং অতি সম্মানজনক।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ
অন্যায়ের প্রতিদান সমপরিমাণ অন্যায় দ্বারা দেওয়া যেতে পারে। তারপরও যে-ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয় এবং আপসে নিষ্পত্তি করে, তার প্রতিদান মহান আল্লাহ দান করবেন
এখন যদি তার দোষ অনুযায়ী আচরণ করতে দ্বিধায় ভুগে থাকো, তবে তোমার প্রতি ইতিপূর্বে তার যত অনুগ্রহ ছিল, সেগুলো স্মরণ করবে এবং তার এই দোষের প্রতিদানে তার প্রতি অনুগ্রহ করবে; কিন্তু খবরদার, এই অপরাধের কারণে তার পূর্ববর্তী অনুগ্রহ উপেক্ষা করবে না। কেননা, সেটা স্পষ্টতই কৃতঘ্নতা ও জুলুম।
আর মনে রাখবে, কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলে সেটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। কারণ, বন্ধুত্ব করা কঠিন, টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন; কিন্তু ত্যাগ করা খুবই সহজ।
চৌদ্দ
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ স্পেনের শাসক 'নাসির লি দ্বীনীল্লাহ'-এর জীবনীতে লেখেন, আমি পূর্ববর্তীদের জীবন-চরিতের সঙ্গে তার জীবন-চরিতও উল্লেখ করেছি। তবুও বেশকিছু প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের জন্য তার জীবনীর কিয়দাংশ পুনরাবৃত্তি করছি-
যে-ব্যক্তি জিহাদের ময়দানে বীরত্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে রাখে, তার ত্রুটিগুলো সবার কাছে সহজ ও ক্ষমার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। পক্ষান্তরে যে-ব্যক্তি জিহাদ পরিত্যাগ করে, প্রজাদের ওপর জুলুম করে এবং রাজকোষ লুট করে, তার সামান্য অপরাধও ক্ষমার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। অধিকন্তু মহান আল্লাহও তাকে পাকড়াও করার অপেক্ষায় থাকেন।
পনেরো
হুসাইন ইবনু জুনাইদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীনকে বলতে শুনেছি, আমরা এমন এক প্রজন্মের সমালোচনা করছি, যারা হয়তো আরও দুইশ বছর আগেই জান্নাতে গিয়ে তাদের বাহনের জিন খুলে রেখেছেন।
ইবনু মাহরাওয়াই বলেন, আমি একদিন আব্দুর রহমান ইবনু আবি হাতিমের কাছে যাই। তিনি তখন ছাত্রদের 'আল-জারহ ওয়াত তাদীল'। -এর একটি কিতাব পড়াচ্ছিলেন। আমি তাকে ইয়াহইয়ার উপর্যুক্ত কথাটি শোনালে তিনি কেঁদে ফেলেন। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে কিতাবখানা নিচে পড়ে যায়। এরপরও তিনি কাঁদতেই থাকেন এবং কথাটি আবারও শুনতে চান।
ষোলো
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ ইবনিশ শাফিয়ীর জীবনীতে লেখেন—
গোঁড়া শিয়া, হানাবেলা, আশায়েরাহ, মুরজিয়া, জাহমিয়া ও কাররামিয়াদের উৎপাতে সারা দুনিয়ায় আজ তোলপাড় চলছে। তাদের সংখ্যাও দিনদিন বৃদ্ধি।
পাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেক দুনিয়াবিমুখ আবেদ ও আলিমও আছে। তন্মধ্যে তাওহীদের বিশ্বাসীদের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। কুমন্ত্রণা ও বিদআত থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় চাই। সুন্নাহ ও সুন্নাহর অনুসারীদের ভালোবাসি। আমরা তাদের আলিমদের আল্লাহর আনুগত্য ও প্রশংসনীয় গুণাবলির জন্য ভালোবাসি। গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাকৃত বিদআতও আমরা পছন্দ করি না। কারণ, সুন্নাহসম্মত স্বীকৃত আমলই গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়ে থাকে!
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৫১-১৫৩
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭৫৪
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৩৮
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৫৮
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৯৪
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮১
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮১
৪. যিনি হাদীস বর্ণনা করার সময় উক্ত হাদীস যে-শাইখের কাছ থেকে শুনেছেন তার নাম সরাসরি উল্লেখ না করে সে-শাইখ হাদীসটি যার কাছ থেকে শুনেছেন তার নাম উল্লেখ করেন—এমন ব্যক্তিকে হাদীসের পরিভাষায় ‘মুদাল্লিস’ বলা হয়।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/২৭১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৩৮৮-৩৮৯
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৯৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/১৬
১. সূরা শূরা, আয়াত: ৪০
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৫২-২৫৩
৩. যদিও প্রকৃত ব্যাপারটি মহান আল্লাহর হাতেই ন্যস্ত থাকে।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৫৬৪
২. ইমাম যাহাবী বলেন, সম্ভবত কথাটা 'একশ বছর' হবে। কারণ, ইয়াহইয়ার সময় থেকে তাদের পর্যন্ত দুইশ বছর অতিবাহিত হয়নি।
৩. আল-জারহ ওয়াত তাদীল বলতে হাদীস বর্ণনাকারীগণের গ্রহণযোগ্যতা এবং অগ্রহণযোগ্যতা নির্ণয়করণ বোঝায়।
৪. ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি সম্ভবত পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করছিলেন। অন্যথায় দুর্বল রাবীদের ক্ষেত্রে পরহেজগার সমালোচকের কথা তো দ্বীনের জন্য কল্যাণকামিতা এবং সুন্নাহর জন্য প্রতীরক্ষাস্বরূপ!
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/১৬৮
৬. মোটাদাগে হাম্বলী ও আশয়ারীরা আহলুস সুন্নাহ'র অন্তর্ভুক্ত। এখানে তাদের নির্দিষ্ট একটি অংশকে বোঝানো হয়েছে, যারা সুস্পষ্টভাবে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৪৫-৪৬