📄 রাজদরবারের প্রতি সালাফগণের অনীহা
এক
আব্দুর রহমান ইবনু যায়েদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা আলকামা রাহিমাহুল্লাহকে বললাম, আপনি যদি সালাত আদায়ের পর মসজিদে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন তাহলে আমরা আপনার সান্নিধ্যে বসতাম। আপনাকে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করে জেনে নিতাম! তিনি বললেন, লোকে বলবে— ‘ওই যে-লোকটা বসে আছে, তিনিই আলকামা’! এ ব্যাপারটা আমার খুব অপছন্দ!
একবার কতিপয় ঘনিষ্ঠজন এসে আর্জি পেশ করল—আপনি যদি আমীর-উমারাদের কাছে যেতেন?
তিনি বললেন, আমি যদি আমীর-উমারাদের কাছে যাই, তবে আমার আশঙ্কা হয় যে, তাদের দ্বারা আমার যতটা সম্মানহানি হবে, আমার দ্বারা তাদের তার চেয়েও বেশি মানহানি ঘটবে!
দুই
সুলাইমান আত-তাইমী থেকে বর্ণিত, ইমাম আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। একান্ত নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও সামনে সেগুলো উল্লেখ করি না—
(১) বিশেষ কারণে ডাকা না হলে কখনও রাজদরবারে না যাওয়া।
(২) দুই ব্যক্তির মধ্যকার বিষয়ে নাক না গলানো এবং আগ বাড়িয়ে কখনও সমাধানের চেষ্টা না করা।
(৩) যে আমার কাছ থেকে চলে যায়, কখনও তার দোষচর্চা না করা।
তিন
নুমান ইবনু যুবায়ের সানআনী বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ কিংবা আইয়ূব ইবনু ইয়াহইয়া ইমাম তাউস রাহিমাহুল্লাহর নিকট পাঁচশ বা সাতশ দিনার প্রেরণ করেন। সেই সঙ্গে দূতকে বলে দেন যে, তিনি যদি তোমার হাত থেকে এই হাদিয়া গ্রহণ করেন, তবে তোমাকে পুরস্কৃত করা হবে।
দূত যথাসময়ে হাদিয়া নিয়ে তাউসের শহরে গিয়ে উপস্থিত হয়। হাদিয়া গ্রহণ করার জন্য তাউসকে উপর্যুপরি বোঝানোর চেষ্টা করে; কিন্তু তাউস তার অনুরোধ ও আবদার নাকচ করে অন্য কাজে মশগুল হয়ে পড়েন। দূত তখন নিরাশ হয়ে ঘরের এক কোণে থলেটি ফেলে চলে আসে। রাজদরবারে এসে জানায় যে, তাউস হাদিয়া গ্রহণ করেছেন।
অনেকদিন পর। ইমাম তাউসের কোনো একটি বিষয়ে রাজদরবারের লোকজন অসন্তুষ্ট হয়। তারা এই মর্মে তাউসের কাছে একজন দূত প্রেরণ করে যে, আপনি আমাদের পক্ষ থেকে প্রেরিত হাদিয়াটি ফেরত দিন!
দূত ইমাম তাউসের কাছে গিয়ে বলে, শহরের আমীর আপনাকে যে-থলে দিয়েছিল সেটি ফেরত দিন। তিনি বলেন, আমি তার থেকে কোনো থলে বা হাদিয়া গ্রহণ করিনি। দূত খালি হাতে ফিরে আসে এবং আমীরকে বলে, তিনি নাকি কোনো হাদিয়া গ্রহণ করেননি।
হাজার হলেও তারা জানত যে, তাউস সত্যবাদী। তাই তারা প্রথম দূতকে আবার প্রেরণ করে। সে গিয়ে বলে, হে আব্দুর রহমান, কিছুদিন আগে যে-দিনারগুলো আপনার ঘরে ফেলে গিয়েছিলাম-সেগুলো কোথায়? তিনি বলেন, আমি কি সেটা গ্রহণ করেছি? দূত উত্তর দেয়, না।
অতঃপর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দূত যেখানে যেভাবে থলেটি রেখে গিয়েছিল, সেখানে ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। দূত থলেটি হাতে নিয়ে দেখে, থলের ওপর মাকড়সা জাল বুনে ফেলেছে। এরপর সেটা নিয়ে সে রাজদরবারে ফিরে আসে।
চার
ফুরাত ইবনুস সায়েব থেকে বর্ণিত, মাইমুন ইবনু মেহরান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিজেকে কখনও তিনটি বিষয় দ্বারা পরীক্ষা করো না-
(১) সৎকাজের আদেশ করার উদ্দেশ্যে কখনও রাজদরবারে যাবে না।
(২) কুরুচিপূর্ণ কোনো গান শুনবে না। কারণ, তুমি জানো না, গানের কোন অংশটা তোমার মনে গেঁথে যাবে।
(৩) কুরআন শেখানোর জন্য হলেও কখনও কোনো নারীর সাথে একাকী মিলিত হবে না।খ
পাঁচ
কাসীর ইবনু ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একবার খলীফা সুলাইমান ইবনু আব্দুল মালিক মদীনায় আগমন করেন। তখন মদীনার গভর্নর ছিলেন উমার ইবনু আব্দুল আযীয। বর্ণনাকারী বলেন-
খলীফা সবাইকে নিয়ে যোহরের সালাত আদায় করেন। অতঃপর বিশেষ কামরার দরজা খুলে দেওয়া হয়। তিনি মেহরাবের সাথে হেলান দিয়ে আগত লোকদের মুখোমুখি হয়ে বসেন। এসময় সফওয়ান ইবনু সুলাইমের ওপর তার দৃষ্টি পড়ে। তিনি উমার ইবনু আবদুল আযীযকে জিজ্ঞেস করেন, এই লোক কে? তার মতো এত সুন্দরভাবে সালাত আদায় করতে আমি আর কাউকে দেখিনি।
তিনি বললেন, এ হলো সফওয়ান ইবনু সুলাইম। খলীফা তার গোলামকে ডেকে বললেন, পাঁচশত দিনারের থলেটা নিয়ে এসো। থলে আনা হলে তিনি গোলামকে পুনরায় বলেন, তুমি থলেটি ওই সালাত আদায়কারীকে দিয়ে এসো।
খলীফার নির্দেশানুযায়ী গোলামটি সফওয়ান ইবনু সুলাইমের পাশে এসে বসে পড়ে। সফওয়ান তখনও সালাত পড়ছিলেন। সালাম ফেরানোর পর তিনি গোলামের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, আমার কাছে তোমার কোনো প্রয়োজন আছে?
সে বলল, আমীরুল মুমিনীন-সুলাইমান ইবনু আবদুল মালিক বলেছেন, আপনি যেন এই থলেটি গ্রহণ করেন এবং আপনার ও আপনার পরিবারের প্রয়োজনে ব্যয় করেন।
: সম্ভবত তুমি ভুল লোকের কাছে চলে এসেছ।
: আপনিই কি সফওয়ান ইবনু সুলাইম নন?
: অবশ্যই, আমি সফওয়ান ইবনু সুলাইম।
: তাহলে আমাকে আপনার কাছেই পাঠানো হয়েছে।
: তুমি আবার যাও। নিশ্চিত হয়ে এসো।
দূত ফিরে যায়। তিনিও তৎক্ষণাৎ জুতা নিয়ে দ্রুত মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়েন। এরপর যতদিন খলীফা মদীনায় ছিলেন, ততদিন তাকে মদীনার কোথাও দেখা যায়নি।
ছয়
ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বসরার আমীর শহরের আলিমদের মাঝে কিছু হাদিয়া বণ্টন করেন। সেই সূত্রে মালিক ইবনু দিনারের নিকটও একটি অংশ পাঠান। এ সংবাদ জানতে পেরে মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসী মালিক ইবনু দিনারকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তাদের হাদিয়া-তুহফা গ্রহণ করেছেন? তিনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, এ প্রশ্ন আমাকে না করে আমার সাথীদের করুন। তারা বলল, হে আবু বকর, তিনি সেগুলোর বিনিময়ে কিছু গোলাম কিনে আজাদ করে দিয়েছেন।
অতঃপর মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসী মালিক ইবনু দিনারকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি—যখন আপনি হাদিয়া নিচ্ছিলেন, তখন আপনার অন্তর কি তার প্রতি একটুও ঝোঁকেনি?
তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! একটুও না। কারণ, আমি তো গাধার মতো। যা করি, মুনীবের ইচ্ছায় করি এবং তোমার মতো আমিও এক আল্লাহরই ইবাদত করি।
সাত
উবাইদ ইবনু জিনাদ থেকে বর্ণিত, আতা ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, খলীফা মনোনীত হওয়ার পর 'মাহদী' ইমাম সুফিয়ানকে ডেকে পাঠান। তিনি দরবারে প্রবেশ করার পর খলীফা তার আঙুল থেকে আংটি খুলে তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, হে আবু আব্দিল্লাহ, এই হলো রাজ সীলমোহর। আপনি এই উম্মতের ওপর কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক যে-আইন বাস্তবায়ন করতে চান, করুন।
তিনি আংটিটা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, আমীরুল মুমিনীন, অনুমতি দিলে আমি কিছু কথা বলতে চাই। তিনি বললেন, হ্যাঁ, বলুন।
ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী বললেন, শর্ত হচ্ছে, আগে আমার জানের নিরাপত্তা দিতে হবে। খলীফা বললেন, অবশ্যই, আপনি নির্ভয়ে বলুন।
অতঃপর তিনি বললেন, আমি যদি স্বেচ্ছায় না আসি, তাহলে কখনও আমাকে রাজদরবারে ডেকে পাঠাবেন না। স্বেচ্ছায় না চাইলে কোনোকিছু হাদিয়াও দেবেন না।
বর্ণনাকারী বলেন, এতে খলীফা মাহদী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে যান। তিনি তার ব্যাপারে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিলেন, এমন মুহূর্তে রাজলেখক পাশ থেকে বলে ওঠেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেননি?
খলীফা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই করেছি।
এরপর যখন তিনি রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসেন, লোকেরা তাকে ঘিরে ধরে এবং বলতে থাকে, এমন সুযোগ আপনি কেন হাতছাড়া করলেন? আপনি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক কিছু আইন বাস্তবায়ন করে দিতেন! তিনি তাদের কথা কানে নেননি। এরপর সে-রাতেই তিনি বসরায় পালিয়ে যান।
আট
হাসান ইবনুর রাবী' রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা নৌ-পথে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহর সাথে সফর করছিলাম। পথিমধ্যে তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়। তিনি আমাদের বলেন, আমার ছাতু খেতে ইচ্ছে করছে। তৎক্ষণাৎ খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, একজন দরবারী লোক ব্যতীত আর কারও কাছেই ছাতু নেই! আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে ব্যাপারটা জানালে তিনি তা খেতে অস্বীকার করেন এবং সে-অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করেন।
নয়
ফুযাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষ কারা?
তিনি বললেন, যারা আলিম।
: বাদশাহ কারা?
: যারা নির্মোহ ও আত্মসংযমী।
: নিম্নশ্রেনীর লোক কারা?
: যারা দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া কামায়।
দশ
আহমাদ ইবনু জামীল আল-মারযুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহর নিকট সংবাদ পৌঁছাল যে, ইসমাঈল ইবনু উলাইয়া রাষ্ট্রীয় যাকাত-সাদাকাহ উসূল করার দায়িত্ব পেয়েছেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক তার কাছে লিখে পাঠালেন—
...ওহে, তুমি তো গরীবের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য নিজের ইলমকে বাজপাখি বানিয়েছ; কৌশলে দ্বীন বেচে দুনিয়া ও তার স্বাদ গ্রহণকে হালাল করে নিয়েছ। একসময় তুমি (দুনিয়াদার) পাগলদের চিকিৎসক ছিলে। এখন তুমিই তাদের দলে ভিড়েছ! তুমি কি আজ ভুলে গেছ, ইবনু সীরীন, ইবনু আউন ও অন্যান্যদের উদ্ধৃতি? তুমি কি ভুলে গেছ, দরবারী লোকদের ব্যাপারে তোমার সতর্কতা ও সতর্কবাণী? যদি তুমি বলো, না, আমি এসব কিছুই ভুলিনি; বরং আমাকে বাধ্য করা হয়েছে, তবে আমি বলব, এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়! বরং ইলম বহনকারী গাধাটা ভূমিতে ধ্বসে গেছে।
ইসমাঈল ইবনু উলাইয়া এই চিঠি পাঠ করে ভীষণ অনুতপ্ত হন। ক্রন্দন করেন এবং দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন।
এগারো
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
...ভিটেমাটি বিক্রয় করে খাও; তবুও দ্বীন বিক্রি করো না! ... দুনিয়া-পাগল মানুষ হলো অন্ধের ন্যায়, ইলম তাকে কখনও আলোকিত করতে পারে না। ... কতই না নিকৃষ্ট সেই আলিম, যে রাজদরবারে আসা যাওয়া করে।
আল্লাহর কসম! যদি কখনও বাধ্য হয়ে আমাকে রাজদরবারে যেতেই হতো, তবে বের হবার পর নিজের মনকে যাচাই করে নিতাম। তখন অন্তরে একধরনের বিতৃষ্ণা অনুভব করতাম। তোমরা হয়তো খেয়াল করে থাকবে, প্রবৃত্তির চাহিদাপূরণে আমি বরাবরই কঠোর। আল্লাহর কসম! আমি কখনও বাদশাহদের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করিনি। এমনকি তাদের কাছে যাওয়ার সময় গায়ের কাপড়টাও পাল্টাইনি!
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৯২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৪০
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/৭৭
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৩৬৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১২০
২. বর্ণনাকারী বলেন, আমি আতা ইবনু মুসলিমকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কি তখন 'আমীরুল মুমিনীন' বলেই সম্বোধন করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯১ ৭/২৬২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪১১
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪০
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪০; সিয়ার আলামিন নুবালা: ৮/৪১১, ৪১২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১২/৬৫
📄 নারী-ফিতনা বিষয়ে সালাফগণের অবস্থান
এক
উসামা ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
❝ مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِي النَّاسِ فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ ❞
আমি আমার (ইন্তিকালের) পরে মানুষদের মধ্যে পুরুষদের জন্য নারীদের তুলনায় অধিকতর ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।
দুই
আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَابِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ
অবশ্যই দুনিয়াটা চাকচিক্যময়। মিষ্টি ফলের মতো আকর্ষণীয়। আল্লাহ তাআলা সেখানে তোমাদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। তিনি লক্ষ্য করছেন যে, তোমরা কীভাবে কাজ করছ? কী আমল করছ? তোমরা দুনিয়া ও নারীজাতি থেকে সতর্ক থেকো। কেননা, বনী ইসরাঈলের মাঝে প্রথম ফিতনা ছিল নারীকেন্দ্রিক।
তিন
রজা ইবনু হাইওয়াহ থেকে বর্ণিত, মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, বিভিন্ন সময়ে দারিদ্র্য ও দুরবস্থা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করা হয়েছে। তোমরা ধৈর্যধারণ করে তাতে সফল হয়েছ। অতি শীঘ্রই তোমাদের সুখ-সমৃদ্ধি দ্বারা পরীক্ষা করা হবে। আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করি নারীকেন্দ্রিক ফিতনার। তারা একসময় স্বর্ণের বালা পরবে, শামের পাতলা-মিহি পোশাক পরিধান করবে এবং ইয়ামানের নকশী চাদর গায়ে জড়াবে। তখন তারা ধনীদের ক্লান্তির কারণ হবে। দরিদ্রদের ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেবে।
চার
আলী ইবনু যায়েদ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শয়তান কোনো ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলে নারীর আশ্রয় গ্রহণ করে। নারীকে তার লক্ষ্যার্জনের অব্যর্থ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
এরপর সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব আমাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার নিজের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো নারী।
অথচ তার বয়স তখন চুরাশি। বার্ধক্যজনিত কারণে একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। অপর চোখেও নানাবিধ সমস্যা দেখা দিয়েছে।
পাঁচ
ইবরাহীম ইবনু হাসান আল-বাহিলী থেকে বর্ণিত, হাম্মাদ ইবনু যায়েد বলেন, 'ইউনুস ইবনু উবাইদ বলতেন, তোমরা আমার কাছ থেকে তিনটি বিষয় গ্রহণ করো—
(১) তোমাদের কেউ যেন কুরআন পাঠ করে শোনানোর উদ্দেশ্যেও রাজদরবারে যাতায়াত না করে।
(২) তোমাদের কেউ যেন কুরআন শেখানোর উদ্দেশ্যেও কোনো নারীর সাথে একান্তে মিলিত না হয়।
(৩) তোমাদের কেউ যেন কুরুচিপূর্ণ কোনো গায়কের সুর কানে না তোলে।'
ছয়
আব্বাস আদ্দুরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাদের এক সহপাঠী বর্ণনা করেন, সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ প্রায়ই নিম্নোক্ত পংক্তি দু'টি আবৃত্তি করতেন—
'...ওহে, হারামের পাত্র থেকে যা নিলে, তার স্বাদ শীঘ্রই ফুরিয়ে যাবে। শুধু থেকে যাবে পাপ আর লজ্জা।'
'... অসৎকাজের মন্দ পরিণাম ও ভয়াবহ শাস্তি রয়ে যাবে। এমন স্বাদে কোনো কল্যাণ নেই, যার শেষটা হলো জাহান্নাম।'
সাত
হুসাইন ইবনু মুতীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
'...অন্য সবকিছুর চেয়ে তোমার জীবনটাকে বেশি মূল্যায়ন করো। গুরুত্ব দাও। কারণ, সবকিছু ধার নেওয়া গেলেও জীবন কখনও ধার নেওয়া যায় না। এমনকি একবার শেষ হয়ে গেলে আর কখনও ফিরেও আসে না।
...হারামের চারণভূমির ধারে কাছেও যেয়ো না। তার মিষ্টতা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু তিক্ততা চিরস্থায়ী।'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, প্রকৃত বীরত্ব হলো স্রষ্টার ভয়ে বিশেষ সৃষ্টির মোহ ও আসক্তি ত্যাগ করতে পারা।
আট
মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সারী ইবনু দিনার মিশরের কোনো এক গ্রামে গিয়ে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে এক সুন্দরী রমণী ছিল। ওই গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ সবাই তার রূপে মুগ্ধ ছিল; কিন্তু সারী ইবনু দিনারের সেদিকে কোনো মনোযোগই ছিল না। বিষয়টি মহিলা জানতে পারে। সে প্রতিজ্ঞা করে, যে করেই হোক, তাকে প্রেমের জালে ফাঁসাতেই হবে!
পরিকল্পনা-মতো সে সারী ইবনু দিনারের ঘরে প্রবেশ করে। স্বল্প বসন, বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি ও রূপের ঝলক দেখিয়ে তাকে বিমোহিত করার চেষ্টা করে।
সারী ইবনু দিনার জিজ্ঞেস করেন, এখানে কেন এসেছ?
উত্তরে সে বলে, আপনার কি মখমলের বিছানা আর সৌখিনতার কোনো চাহিদা আছে?
সারী একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে আবৃত্তি করেন—
...কত পাপী পাপের স্বাদ নেয়। এরপর মারা যায়। নিঃসঙ্গ হয়ে যায় এবং দুর্ভোগের স্বাদ আস্বাদন করতে থাকে।
...পাপের স্বাদ ক্ষণিক বাদেই মিলিয়ে যায়। থেকে যায় তার কুফল ও অনিষ্ট—ঠিক যেমন ছিল তেমনই।
...হায় আফসোস! আল্লাহর শপথ! যে-বান্দা নিজেকে পাপে ডুবিয়ে রাখে, আল্লাহ তাকে সর্বদা দেখেন এবং শোনেন।'
নয়
আবুল ফারাজসহ আরও অনেকে বর্ণনা করেন, মক্কায় এক রূপবতী রমণী ছিল। তার স্বামীও ছিল। একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপে মুগ্ধ হয়ে স্বামীকে বলল, আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়, গোটা মক্কা নগরীতে এমন কোনো পুরুষ আছে, যে আমার রূপে পাগল হবে না?
: হ্যাঁ। আছে!
: কে সে!
: উবাইদ ইবনু উমাইর।
: তুমি যদি আমাকে অনুমতি দাও, তাহলে আমি তাকে আপন রূপের ছোঁয়ায় দুর্বল করে দেখাব।
: ঠিক আছে। চেষ্টা করে দেখতে পারো।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সে মহিলা মাসআলা জানার বাহানায় উবাইদ ইবনু উমাইরের কাছে যায়। তিনি তখন মসজিদুল হারামের এক কোণে বসা ছিলেন। সবাই চলে যাওয়ার পর একটু নির্জনতা তৈরি হলে সে তার কাছে গিয়ে বসে এবং তার চাঁদের মতো ঝলমলে চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে ফেলে। উবাইদ ইবনু উমাইর বলে ওঠেন, হে আল্লাহর বান্দী, পর্দা করো।
: জনাব, আমি তো আপনার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি। আপনি আমাকে গ্রহণ করুন।
: আমি তোমাকে কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করব। যদি তুমি সত্যি সত্যি উত্তর দাও, তবে তোমার প্রস্তাব নিয়ে ভেবে দেখবো!
: জি, জনাব, বলুন, আমি সত্যিটাই বলব।
: আচ্ছা, এই মুহূর্তে যদি মৃত্যুর ফেরেশতা তোমার জান কবজ করতে চলে আসে, আর আমি তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করি, তবে কি তুমি এতে আনন্দিত হবে?
: জি না!
: হুম। ঠিক বলেছ। আচ্ছা, ধরো আমি তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করলাম। তারপর যদি তোমাকে কবরে শোয়ানো হয়, আর ফেরেশতাগণ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তোমাকে বসায়, তখন কি প্রস্তাব গ্রহণ করার ব্যাপারটা তোমাকে কোনো আনন্দ দেবে?
: জি না!
: হুম। ঠিকই বলেছ। আচ্ছা, যদি মানুষের হাতে আমলনামা তুলে দেওয়া হয়; কিন্তু তুমি জানো না, তোমার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে নাকি বাম হাতে! তখন কি এই প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারটা তোমাকে আনন্দিত করবে?
: জি না!
: হুম। সত্য বলেছ। আচ্ছা, ধরো, যখন পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার সময় হবে; কিন্তু তুমি জানো না, সহজে তা উতরে যেতে পারবে কি না! তখন কি প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারটা তোমার কাছে আনন্দের বিষয় হবে?
: জি না!
: হুম। একদম ঠিক বলেছ। আচ্ছা, আর যদি তুমি বিচারের কাঠগড়ায় আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সম্মুখে দণ্ডায়মান হও, তখন কি প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারটা তোমাকে আনন্দিত করবে?
: জি না!
: হুম। একেবারে সত্য বলেছ। এবার উবাইদ ইবনু উমাইর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, আল্লাহর বান্দি, আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তোমাকে অনেক নিয়ামত দিয়েছেন। তিনি তোমার প্রতি সদয় আচরণ করেছেন।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সে তার স্বামীর কাছে ফিরে যায়। স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করে, কী হলো? কিছু করতে পেরেছ? উত্তরে সে বলল, তুমিও অকর্মা। আমরাও সবাই অকর্মা।
এরপর সে সালাত, সিয়াম ও ইবাদতে মশগুল হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তার স্বামী বলত, উবাইদ ইবনু উমাইর আমার স্ত্রীর ওপর এতটা প্রভাব ফেলেছিল যে, যে-নারী প্রতি রাতে আমার জন্য বাসরশয্যা করত, এখন সে পুরোদস্তুর 'সন্ন্যাসিনী' বনে গেছে।
দশ
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চোখকে অন্তরের আয়না বানিয়েছেন। যখন বান্দা তার চক্ষুকে নত রাখে, তখন অন্তর প্রবৃত্তি ও প্রবঞ্চনাকে দমিয়ে রাখে। আর যখন সে চোখকে ছেড়ে দেয়, এদিক-ওদিক তাকায়, তখন অন্তরও দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে। কামনা-বাসনা তাড়নায় নানান জায়গায় টু মারে!
তিনি আরও বলেন, বুখারী-মুসলিমের এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظَّهُ مِنَ الزِّنَا، أَدْرَكَ ذَلِكَ لا مَحَالَةَ ، فَزِنَا العَيْنِ النَّظَرُ، وَزِنَا اللَّسَانِ المَنْطِقُ ، وَالنَّفْسُ تَمَنَّى وَتَشْتَهِي ، وَالفَرْجُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ كُلَّهُ وَيُكَذِّبُهُ
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বনী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়াবে। চোখ যিনা করে। আর চোখের যিনা হচ্ছে অন্যায় দৃষ্টিপাত। জিহ্বা যিনা করে। আর জিহ্বার যিনা হচ্ছে অশ্লীল বাক্যালাপ। হাত যিনা করে। আর হাতের যিনা হচ্ছে অনৈতিক স্পর্শ। পা যিনা করে। আর পায়ের যিনা হচ্ছে অন্যায় পদক্ষেপ। অন্তরও যিনা করে। আর অন্তরের যিনা হচ্ছে কুপ্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা। যৌনাঙ্গ এসব যিনা বাস্তবায়ন করে অন্যথায় প্রত্যাখ্যান করে।
উল্লেখ্য যে, হাদীসে চোখের কথা সবার আগে বলা হয়েছে। কারণ, এ সকল যিনার শুরুটা হয় চোখের দ্বারা। চোখের যিনাই হলো হাত, পা, অন্তর ও লজ্জাস্থানের যিনার মূল। কথা বলাকে জিহ্বার যিনা হিসেবে অবহিত করে মূলত অশ্লীল কথা ও অন্যায় চুম্বনের ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর লজ্জাস্থানকে বলা হয়েছে, এসবের যিনা বাস্তবায়নকারী কিংবা প্রত্যাখ্যানকারী।
এই হাদীস থেকে বেশকিছু বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন-চোখের পাপ হলো অপাত্রে দৃষ্টিপাত করা। এটাই তার যিনা। সুতরাং, এতে ওই সকল লোকদের দাবি ভুল প্রমাণিত হয়, যারা বলে, বেগানা মেয়েদের দেখতে সমস্যা নেই-অন্তর ও মানসিকতা ঠিক থাকলেই চলবে!
এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
يا على لا تتبع النظرة النظرة، فإنَّ لك الأولى، وليس لك الآخرة
হে আলী, একবার দৃষ্টিপাতের পর তার পুনরাবৃত্তি করো না। কারণ, তোমার (অনিচ্ছাকৃত) প্রথম দৃষ্টিপাত তোমার পক্ষে। কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টিপাত তোমার বিপক্ষে
উপর্যুক্ত হাদীসের আলোকে অনেক বড় বড় আলিম একটি মাসআলা বলে থাকেন। মাসআলাটি হচ্ছে, কোনো নারীর প্রতি একবার দৃষ্টিপাতের পর অন্তরে ওই নারীর প্রতি আসক্তি তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। তখন অবচেতনেই তার মনে হতে থাকে যে, আরেক বার ভালোভাবে দেখে নাও। প্রথম দেখায় হয়তো ভালো লেগেছে; কিন্তু দ্বিতীয়বার তাকালে সেই ভালো লাগাটা আর থাকবে না। কিংবা এমন কিছু দৃষ্টিগোচর হবে, যা তার প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করবে। ফলে তাকে ভুলে যাওয়া সহজ হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমতাবস্থায় ওই ব্যক্তির জন্য দ্বিতীয়বার তাকানো কতটুকু শরীয়তসম্মত?
জবাব: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর। অন্তত দশটি কারণে এমনটা করা জায়েয হবে না-
(১) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দৃষ্টিকে অবনত রাখার আদেশ করেছেন। অতএব, বান্দার ওপর যা হারাম করেছেন, তাতে তিনি কোনো প্রতিকার রাখেননি।
(২) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হঠাৎ পড়ে যাওয়া দৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, দৃষ্টি নামিয়ে নাও। ফিরে তাকিয়ো না। অথচ তিনি জানতেন, প্রথম দৃষ্টিতে অন্তরে কী প্রভাব তৈরি হয়েছে। তবুও প্রতিকার হিসেবে দৃষ্টিকে সংযত করতে বলেছেন। পুনরায় তাকাতে বলেননি কিংবা অনুমতি দেননি।
(৩) তিনি সুস্পষ্ট বলেছেন, প্রথম দৃষ্টি তোমার পক্ষে অর্থাৎ ক্ষমাযোগ্য। আর দ্বিতীয় দৃষ্টি তোমার বিপক্ষে অর্থাৎ ক্ষমার অযোগ্য। সুতরাং, এমনটা অসম্ভব যে, যেটা পক্ষে সেটা হবে রোগ, আর যেটা বিপক্ষে সেটা হবে তার প্রতিষেধক!
(৪) এ কথা স্বীকৃত যে, প্রথম দৃষ্টিপাতেই যে-ভালো লাগা আসক্তিতে পরিণত হয়েছে, দ্বিতীয় দৃষ্টিপাতে সেটা কিছুতেই অবদমিত হবে না; বরং আরও বৃদ্ধি পাবে। অভিজ্ঞতা এমনই বলে।
(৫) প্রায়-সময় দ্বিতীয়বার তাকানোর কারণে পূর্বের অশান্তি ও অস্থিরতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়।
(৬) যখন কেউ দ্বিতীয়বার তাকানোর ইচ্ছে করে, ইবলিস তখন তার ওপর সওয়ার হয়। সে বাস্তবে যতটা না সুন্দর, তার চেয়ে বেশি সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এতে বিপদ আরও বাড়ে।
(৭) আর ওই বিপদে আল্লাহর কোনো সাহায্য থাকতে পারে না, যেটা তাঁর আদেশ ও আইন অমান্য করার কারণে হয়ে থাকে। হারাম জিনিস দিয়ে সমাধানের আশা করাই বৃথা; বরং তার থেকে দূরে থাকাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
(৮) প্রথম দৃষ্টি হলো ইবলিসের এক বিষাক্ত তির। আর এটা হলফ করেই বলা যায় যে, দ্বিতীয় তিরটা হবে আরও বেশি মারাত্মক। আরও বেশি বিষাক্ত।
(৯) এমন পরিস্থিতির শিকার ব্যক্তি মূলত প্রেমাস্পদ ও মহান আল্লাহর দ্বৈত ভালোবাসার মাঝখানে দণ্ডায়মান। এখন হয় সে আল্লাহকে ভালোবাসবে। না-হয় তাঁর আদেশ অমান্য করে অন্যকে ভালোবাসবে; কিন্তু সে কী করছে? সে চাচ্ছে দ্বিতীয়বার দেখে প্রথম দৃশ্যটা যাচাই করতে। এখন যদি তাকে পছন্দ হয়, তবে সে আল্লাহকে ছেড়ে দেবে। আর যদি অপছন্দও হয়, তবুও আল্লাহকে পাবে না। কারণ, সে ইতোমধ্যেই তাঁর আদেশ অমান্য করে ফেলেছে। এজন্য দ্বিতীয় দৃষ্টিপাতে না তার উদ্দেশ্য পূরণ হবে! আর না আল্লাহকে পাবে! তাছাড়া দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাতের মধ্য দিয়ে মূলত সে 'আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা, আল্লাহর জন্য কারও ভালোবাসা ত্যাগ করার' এই শাশ্বত নীতির বিরোধিতা করছে।
(১০) একটা উপমা দিলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে। ধরুন, আপনি একটি নতুন ঘোড়ায় সওয়ার হয়েছেন। ঘোড়াটা আপনাকে নিয়ে এমন এক সরু ও জটিল পথে ছুটছে, যেখান থেকে ঘুরে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। যখনই সে এমন পথে পা বাড়াবে, তখনই আপনি তার লাগام টেনে ধরবেন। যাতে সে এমন ভয়াবহ পথে ঢুকতে না পারে। আর যদি কয়েক কদম ঢুকেও যায়, দ্রুত তাকে থামাবেন। পেছনে ফিরে আসবে। তাহলে বিষয়টা সহজেই সমাধান হয়ে যাবে।
কিন্তু আপনি যদি তার লাগাম ছেড়ে দেন তাহলে সে আপনাকে নিয়ে ওই পথে প্রবেশ করে। গভীরে চলে যায়। এরপর আপনি লাগام টেনে ধরেন। পেছনে ফিরে আসার চেষ্টা করেন। লেজ ধরে পেছনের দিকে টানেন। তাহলে আপনার শ্রম বৃথা যাবে। সেখান থেকে ফিরে আসা আপনার জন্য একরকম জটিল বা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
এমতাবস্থায় কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি বলতে পারে, আরেকটু ভেতরে গেলেই ঘোড়াটা বেরিয়ে আসবে? মুক্তি পাবে?
দৃষ্টির ব্যাপারটিও মূলত এরকমই। দৃষ্টি যখন প্রথম দর্শনেই অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করে, তখন যদি সে দৃঢ় সংকল্প করে, ফিরে না তাকায়, তাহলে খুব সহজেই তা থেকে মুক্তি পেতে পারে। আর যদি ফিরে তাকায়, তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তার রূপ নিয়ে চিন্তা করে, শূন্য অন্তরে তাকে জায়গা দেয়, তাহলে তার চিত্রই সর্বদা ভেসে উঠবে। তার ভালোবাসা অন্তরে গেঁথে যাবে।
কোনো নারীর দিকে বারবার তাকানোর ব্যাপারটা হলো গাছে পানি দেওয়ার মতো। ভালোবাসার এই গাছ ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে। এমনকি এই বিষাক্ত ভালোবাসা ও অবৈধ প্রেম অন্তর নষ্ট করে ফেলে। আল্লাহ তাআলার আদেশের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। দুশ্চিন্তা ও হতাশা তাকে ঘিরে ধরে। ফলে সে আনুষঙ্গিক সকল ফিতনা ও পাপাচারে জড়িয়ে পড়ে।
আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসবের মূল কারণ হলো, চোখের দ্বারা 'স্বাদ' গ্রহণ করা। একবার তাকানোর পর দ্বিতীয়বার তাকানোর অভিলাষ পূর্ণ করা। অথচ যদি আপনি প্রথমবারেই চোখ নামিয়ে নেন, ফিরে না তাকান, তাহলেই কিন্তু মুক্তি পেতে পারেন। হৃদয়ে প্রশান্তি পেতে পারেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নোক্ত কথাটি একটু চিন্তা করে দেখুন-
❝ النَّظَرُ سَهْمُ مِنْ سِهَامِ إِبْلِيسَ مَسْمُومٌ ❞
দৃষ্টি হলো ইবলিসের বিষাক্ত তিরগুলার একটি
আর তিরের কাজ হলো অন্তরে গিয়ে গেঁথে যাওয়া এবং তাতে যে বিষ লাগানো আছে, তার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে দেওয়া। সুতরাং, এমতাবস্থায় যদি সে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তিরটি বের করে ফেলে তাহলে সে নিরাপদ। অন্যথায় এ তির তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
এগারো
ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, দৃষ্টি হিফাযত করার অনেক ফায়দা ও উপকারিতা রয়েছে—
প্রথমত আফসোসের যন্ত্রণা থেকে আত্মাকে মুক্ত রাখা যায়। কেননা, যে-ব্যক্তি যত্রতত্র দৃষ্টিপাত করে, তার আফসোস ও আত্মদংশন বাড়তেই থাকে। কেননা, দৃষ্টি আপনাকে এমন জিনিস দেখাবে, যার প্রতি আপনার আকর্ষণ ও আগ্রহ বাড়তেই থাকবে; কিন্তু আপনি সেই চাহিদা না নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, আর না পছন্দের বিষয়টা নাগালে পাবেন! আর এটা নিশ্চয়ই চূড়ান্ত রকম পীড়াদায়ক!
আসমায়ী বলেন, তাওয়াফের মধ্যে এক বাদীকে দেখলাম, মাংসাশী গাভীর মতোই হৃষ্টপুষ্ট। আমি বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিলাম আর তার কমনীয়তা, কান্তিময়তা উপভোগ করছিলাম।
বাঁদিটি আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার কী হয়েছে?
বললাম, তাকালে তোমার সমস্যা কী?
তখন বাঁদিটি বলল, আপনি প্রবৃত্তির তাড়নায় বারবার আমার দিকে দৃষ্টি ফেরাচ্ছেন। আপনি কি জানেন, একদিন এই লাগামহীন দৃষ্টি আপনাকে ক্লান্ত করে তুলবে। কেননা, আপনি এমন কিছু দেখছেন, যা আপনি না অর্জন করতে পারবেন; আর না ভুলে থাকতে পারবেন!
লাগামহীন দৃষ্টি আত্মাকে ঠিক সেভাবে ছেদন করে, যেভাবে তির শিকারকে বধ করে। কখনও যদি তা আত্মাকে পুরোপুরি বধ নাও করে, তবু কিছুটা ক্ষত তো অবশ্যই তৈরি করে। কেননা, অন্যায় দৃষ্টিপাত শুকনো ঘাসে আগুনের ফুলকি ছোড়ার মতো। তা পুরো ঘাসের স্তূপকে ভস্ম না করতে পারলেও কিয়দাংশ তো অবশ্যই জ্বালিয়ে দেয়!
বস্তুত অন্যায় দৃষ্টিপাত বিষাক্ত তিরের মতো। প্রতিবার দৃষ্টিপাতের মধ্য দিয়ে মানুষ অবচেতনেই সেই বিষাক্ত তির দ্বারা তার চিন্তা-চেতনা ও অন্তরাত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে।
টিকাঃ
১. আমাদের কথা ছিল, 'সিয়ারু আলামিন নুবালা ও সিফাতুস সাফওয়ার ঘটনাবলির মধ্যেই সীমিতকরণের; কিন্তু এই অধ্যায়টি একটু ভিন্ন।
২. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৪৩৯
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৮৪১
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৯৭
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/২৯৩
২. ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ রচিত রওযাতুল মুহিব্বীন ওয়া নুযহাতুল মুশতাকীন: ৩৩০
১. ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ রচিত রওযাতুল মুহিব্বীন ওয়া নুযহাতুল মুশতাকীন: ৩৩৯
২. ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ রচিত রওযাতুল মুহিব্বীন ওয়া নুযহাতুল মুশতাকীন : ৩৩০
১. ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ রচিত রওযাতুল মুহিব্বীন ওয়া নুযহাতুল মুশতাকীন: ৩৪০
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬২৪৩
১. অর্থাৎ, ক্ষমাযোগ্য।
২. ক্ষমার অযোগ্য।
৩. সুনানু আবি দাউদ: ২১৪৯; জামি তিরমিযী: ২৭৭৮
১. মুসতাদরক: ৪/৪১৪
১. রওযাতুল মুহিব্বীন ওয়া নুযহাতুল মুশতাকীন: ৯২-৯৫
১. রওযাতুল মুহিব্বীন ওয়া নুযহাতুল মুশতাকীন: ৯৭; ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, দৃষ্টি নত রাখার আরও অনেক উপকারিতা আছে। পাঠকের আগ্রহ থাকলে ওই কিতাবের ১০২ থেকে ১০৫ নং পৃষ্ঠা দেখতে পারেন।
📄 মায়ের সেবায় সালাফগণ
এক
মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উসমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে একেকটা খেজুরগাছের দাম ওঠে এক হাজার দিরহাম। এ সময় উসামা ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু একটি ভালো খেজুরগাছ শেকড় থেকে উপড়ে ফেলেন। এরপর সেটা চিড়ে তার মাথি বের করে মাকে খাওয়ান। লোকেরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, একেকটা খেজুরগাছের মূল্য যখন এক হাজার দিরহাম, তখন এই সামান্য মাথির জন্য পুরো গাছটাই বরবাদ করে দিলেন? তিনি বললেন, আমার আম্মা তা খেতে চেয়েছেন। তিনি আমার কাছে কিছু চাইবেন, আর আমি সক্ষমতা সত্ত্বেও তা পূর্ণ করব না, এমনটা হতে পারে না।
দুই
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনু মুনকাদির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার ভাই উমার রাত জেগে সালাত আদায় করে। অন্যান্য ইবাদতে নিমগ্ন থাকে। আমি তখন মায়ের পা দাবিয়ে দিই। আমার কাছে তার ওই রাতের চেয়ে আমার রাতটাই অধিক প্রিয়।
তিন
ইবনু আউন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন খুব বিনয় ও আদবের সাথে তার মায়ের কাছে বসা ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি তার এই অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যান এবং ব্যস্তসমস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, মুহাম্মাদের কী হয়েছে? শরীর খারাপ? নাকি অন্যকোনো সমস্যা? উপস্থিত একজন উত্তর দেয়, না, কিছু হয়নি। কোনো সমস্যাও নেই। তিনি যখন মায়ের নিকট অবস্থান করেন, তখন এভাবেই থাকেন।
চার
হিশাম ইবনু হাসসান থেকে বর্ণিত, হাফসা বিনতু সীরীন ও রাহিমাহাল্লাহ বলেন, মুহাম্মাদ যখন মায়ের ঘরে যেতেন, শ্রদ্ধা ও সম্মানের কারণে তখন মুখ ফুটে কোনো কথা বলতে পারতেন না।
পাঁচ
ইবনু আউন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, একবার তার মা তাকে ডাকলে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন; কিন্তু তাড়াহুড়ার কারণে তার আওয়াজ মায়ের আওয়াজের চেয়ে একটু ভারী শোনায়। এর প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তিনি দুটি গোলাম আযাদ করেন!
ছয়
হিশাম ইবনু হাসসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হুযাইল ইবনু হাফসা গ্রীষ্মকালে লাকড়ি ও কাঠখড়ি জোগাড় করতেন। এরপর সেগুলোর বাকল ছাড়াতেন। সাথে কিছু বাঁশও ফালিফালি করে কেটে রাখতেন।
তার মা হাফসা বিনতু সীরীন বলেন, শীতকাল শুরু হলে আমার খুব ঠান্ডা লাগত। এরপরও রাতজেগে সালাত আদায়ের চেষ্টা করতাম। আমি সালাতে দাঁড়ালে, হুযাইল আমার পেছনে একটি স্টোভ এনে তাতে কাঠখড়িগুলো পোড়াতে থাকত। ধোঁয়ার কারণে যেন আমার কোনো রকম কষ্ট না-হয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখত। এতে আমি উন্নতা অনুভব করতাম এবং পূর্ণ স্বস্তির সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত সালাতে কাটিয়ে দিতাম।
তিনি বলেন, সে চাইলে তার পরিবার নিয়েও সময়টা কাটাতে পারত। আমার মাঝেমাঝে ইচ্ছে হতো তাকে বলি, বাবা, তুমি তোমার পরিবারের কাছে যাও। তাদের সময় দাও; কিন্তু পরক্ষণেই ভাবতাম, সে যা করছে, করুক। এতেই হয়তো কল্যাণ নিহিত আছে। তাই বাধা দিতাম না। কিছু বলতামও না।
তিনি আরও বলেন, হুযাইলের মৃত্যুর পর আমি যথাসাধ্য ধৈর্যধারণের চেষ্টা করি। তবুও শোকের তীব্র রেশটা রয়েই যায়। এটা কিছুতেই দূর হচ্ছিল না। এরই মধ্যে একরাতে আমি সালাতে দাঁড়াই। গভীর তন্ময়ের সঙ্গে সূরা নাহল তিলাওয়াত করতে থাকি। যখন এই আয়াতটিতে এসে পৌঁছি-
وَلاَ تَشْتَرُوا بِعَهْدِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلاً إِنَّمَا عِندَ اللَّهِ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَمَا عِندَ اللَّهِ بَاقٍ وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
আর তোমরা স্বল্পমূল্যে আল্লাহর অঙ্গীকার বিক্রী করো না। আল্লাহর কাছে যা আছে, তোমাদের জন্য তাই উত্তম-যদি তোমরা তা জানতে! তোমাদের নিকট যা আছে তা ফুরিয়ে যায়। আর আল্লাহর নিকট যা আছে তা স্থায়ী। আর যারা সবর করেছে, তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদের উত্তম প্রতিদান দেব।
তিনি বলেন, আমি বার বার এ আয়াত পড়তে থাকি। ফলে আল্লাহ তাআলা পুত্র-শোকের যন্ত্রণা দূর করে দেন।
হিশাম বলেন, হুযাইল ইবনু হাফসার একটি উষ্ট্রী ছিল। উষ্ট্রীটি প্রচুর দুধ দিত।
হাফসা বিনতু সীরীন বলেন, প্রতিদিন সকালে সে দুধ দোহন করে আমার কাছে নিয়ে আসত। আমি বলতাম, বাবা, তুমি তো জানো, আমি দুধ পান করতে পারব না। কারণ, আমি রোজাদার। তিনি বলতেন, আম্মা, উটের উলানে রাতভর যে-দুধটা থাকে, সেটা খুবই ভালো। সুতরাং, আপনি যাকে চান, তা পান করাতে পারেন।
সাত
আব্দুর রহমান ইবনু আহমাদ থেকে বর্ণিত, তার পিতা বলেন, একবার জনৈক নারী বাকি রাহিমাহুল্লাহর নিকট গিয়ে নিবেদন করেন, 'শাইখ, আমার ছেলেটা বন্দি হয়ে আছে। তার মুক্তির কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। আমি তো হতাশ! দিশেহারা! দয়া করে আপনি যদি এমন কাউকে বলে দিতেন, যে তাকে ছাড়াতে পারে?'
বাকি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ঠিকাছে। তুমি এখন যাও। আমি ব্যাপারটা ভেবে দেখছি। এরপর তিনি মাথা নিচু করে ঠোঁট নাড়তে থাকেন।
কিছুদিন পর ওই নারী তার ছেলেকে সাথে নিয়ে বাকি রাহিমাহুল্লাহর কাছে আসে। ছেলেটা পুরো ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলে-
আমি বাদশাহর কয়েদখানায় ছিলাম। একবার আমি বিশেষ একটি আমলে মশগুল ছিলাম। তখন সহসাই আমার হাতের বেড়ি খুলে পড়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ছেলেটি এই অভাবনীয় ঘটনার সময় ও দিন-তারিখ উল্লেখ করে। তখন হিসেব করে দেখা যায়, শাইখ যখন মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে দুআ করছিলেন, ঠিক তখনই এই ঘটনা ঘটে।
ছেলেটি আরও বলে, এই ঘটনা দেখে আমাদের প্রহরায় নিয়োজিত লোকটি চিৎকার করে ওঠে। তার চেহারায় ভয় ও অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তৎক্ষণাৎ কামারকে ডেকে আমার হাতে আবারও বেড়ি পরানো হয়; কিন্তু পরানো শেষ হতেই অটোমেটিক বেড়ি খুলে পড়ে যায়। এতে সবাই হতভম্ব ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনন্যোপায় হয়ে তারা তাদের ধর্মগুরুর শরণাপন্ন হয়। ধর্মগুরু আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন?
আমি বলি, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তার দুআ কবুল হয়েছে। এটা তারই ফল। অন্য বর্ণনায় আছে, ধর্মগুরুরা বলেন-
আল্লাহ তোমাকে মুক্ত করেছেন। সুতরাং, তোমাকে এখন বন্দি করে রাখার সাধ্য কার? এরপর তারা আমাকে কিছু পাথেয় দিয়ে বিদায় জানায়।
টিকাঃ
১. তিনি রাসূলের পালকপুত্র যায়েদ ইবনু হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র। তার মা উম্মু আইমান ছিলেন রাসূলের পরিচারিকা।
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫২২
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৪৩
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৫
৩. মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনের বোন
৪. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৫
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৩৬৬
৬. মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন-এর ভাগিনা
১. সূরা নাহল, আয়াত: ৯৫-৯৬
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৫
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/২৯০
📄 বন্ধু ও সঙ্গীদের প্রতি সালাফগণের অনুগ্রহ ও সদ্ব্যবহার
এক
মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনি হাসান ইবনু শাকিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, হজের সময় 'মারও' শহরের কিছু অধিবাসী আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহর কাছে এসে তার সফরসঙ্গী হওয়ার আবেদন জানায়। তিনি তাদের বলেন, তোমরা সফরের খরচাদি নিয়ে এসো। তার নির্দেশ অনুসারে খরচাদি আনা হলে তিনি সেগুলো সিন্দুকে রেখে তালা ঝুলিয়ে দেন।
এরপর একটি বাহন ভাড়া করেন। তাদেরকে মারও থেকে বাগদাদে নিয়ে যান। নিজের অর্থায়নে তাদের সকল প্রয়োজন পুরা করেন। উন্নত ও উপাদেয় খাবারের ব্যবস্থা করেন। উৎকৃষ্ট মানের মিষ্টান্ন সরবরাহ করেন। অবশেষে তাদেরকে সাড়ম্বরে বাগদাদ থেকে মদীনা মুনাওয়ারা নিয়ে যান। এরপর প্রত্যেককে আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার পরিবার তোমাকে মদীনা থেকে কী নিয়ে যেতে বলেছে? প্রত্যেকে তার প্রয়োজনের কথা বললে তিনি নিজে সেগুলো ক্রয় করে দেন।
এরপর তিনি হজ পালনের জন্য তাদের মক্কায় নিয়ে আসেন। হজ পালন শেষ হলে প্রত্যেককে পুনরায় আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার পরিবার মক্কা থেকে কী কী জিনিস নিয়ে যেতে বলেছে? তারা তাদের পরিবারের চাহিদার কথা বললে তিনি নিজের অর্থায়নে সেগুলো তাদের কিনে দেন।
সবশেষে তাদের নিয়ে মক্কা থেকে মারও-এর উদ্দেশ্যে রওনা করেন। পথিমধ্যে তাদের জন্য অকাতরে ব্যয় করেন। তাদের ঘরবাড়ি সাজিয়ে দেন। তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাদের জন্য ভোজসভার আয়োজন করেন। সবাইকে কাপড়-চোপড় উপহার দেন। ভ্রমণ, পানাহার ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে তারা পরিতৃপ্ত হলে তিনি সিন্দুকটি আনতে বলেন এবং প্রত্যেককে তার থলে ফিরিয়ে দেন।
দুই
যায়েদ ইবনু আসলাম তার পিতা আসলাম থেকে বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে বলেন, হে আবু খালিদ- আমি আমীরুল মুমিনীন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখেছি, তিনি তোমাকে যেভাবে সঙ্গে রাখতেন, সেভাবে তোমার অন্য কোনো সাথীকেই রাখতেন না। তিনি এমন কোনো সফরে বের হতেন না, যে সফরে তুমি তার সাথে ছিলে না। তুমি তার বিষয়ে আমাকে কিছু বলো। তখন আসলাম বললেন, তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর জন্য বটবৃক্ষের ন্যায় ছায়াদানকারী অভিভাবক। তিনি আমাদের বাহন প্রস্তুত করতেন। নিজেই তার মালামাল বাহনে তুলতেন। কোনো একরাতে আমরা অবসর বসে ছিলাম, অথচ তিনি আমাদের বাহনে জিনাও বাঁধছিলেন।
তিন
মুসআব ইবনু আহমাদ ইবনি মুসআব থেকে বর্ণিত, আবু মুহাম্মাদ আল-মারওয়াযী রাহিমাহুল্লাহ একবার বাগদাদ আগমন করেন। তার গন্তব্য ছিল মক্কা-মুকাররমা। আমি সেই সফরে তার সফরসঙ্গী হতে চাচ্ছিলাম। তাই আমি তার নিকট এসে সফরসঙ্গী হবার আবেদন করি; কিন্তু তিনি আমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবে টানা তিন বছর আমার সফরসঙ্গী হওয়ার আবেদন এবং তার প্রত্যাখ্যান চলতে থাকে। চতুর্থ বছর আবারও আবেদন জানালে তিনি বললেন-
: একটি শর্তের ভিত্তিতে তোমাকে সফরসঙ্গী করা যেতে পারে।
: আমাদের একজন আমীর হবে। অপরজন তার বিরোধিতা করতে পারবে না।
: আপনিই তো আমীর।
: না; বরং তুমি আমীর।
: আপনি তো বয়সে বড় ও গুণে মহৎ।
: তাহলে তুমি আমার অবাধ্য হবে না?
: আচ্ছা, ঠিক আছে।
উপর্যুক্ত শর্ত মেনে আমি তার সাথে রওনা হই। খাবার উপস্থিত হলে খাবার-গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি আমাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন; বরং পুরোটাই আমাকে দিচ্ছিলেন। আমি তার সামনে সামান্য খাবার পেশ করলেও তিনি বলতেন, আমি কি তোমাকে এই শর্তে সফরসঙ্গী করিনি যে, তুমি আমার অবাধ্য হবে না?
এভাবেই আমাদের সফর চলতে থাকে। ফলে আমি তার সঙ্গী হওয়ার কারণে লজ্জিত হই। কেননা, তিনি নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিলেন। সফররত অবস্থায় কোনো কোনোদিন আমরা প্রবল বৃষ্টির কবলে পড়তাম। তখন তিনি আমাকে বলতেন, আবু আহমাদ, আশেপাশে মাইলস্টোন আছে কি না, খোঁজ করো তো। এরপর আমাকে বলতেন, তুমি এর গোড়ায় বসে যাও। আমাকে বসিয়ে তিনি তার দুই হাত মাইলস্টোনের ওপর রেখে আমার ওপর ঝুঁকে থাকতেন এবং একটি চাদরে আবৃত হয়ে আমাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতেন।
ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, তার সাথে আর কখনই সফরে বের হব না। কারণ, এক্ষেত্রে তিনি নিজেকেই কষ্ট দিয়ে থাকেন। মক্কা পৌঁছানো পর্যন্ত এ রকমই চলতে থাকে। তার ওপর আল্লাহ তাআলার অবারিত রহমত বর্ষিত হোক।
চার
বিলাল ইবনু সাদ এমন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন-যিনি আমির ইবনু আব্দিল্লাহ তামীমীকে রোম শহরে দেখেছেন। তিনি বলেন, আমিরের কাছে একটি খচ্চর ছিল। তিনি এবং তার সঙ্গী-মুহাজিরগণ পালাক্রমে খচ্চরটিতে আরোহণ করতেন। বিলাল বলেন, যখন তিনি তার কোনো সহযোদ্ধাকে বিদায় জানাতেন, তাকে ভালো করে চিনে রাখতেন। এরপর যখনই কোনো সফরে তাদের সাথে দেখা হতো, অনেক খুশি হতেন এবং শর্ত দিতেন যে, তিনি তাদের খেদমত করবেন। তাদের দাওয়াত দেবেন এবং তাদের পেছনে নিজের শ্রম ব্যয় করবেন।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৫৫, ৩৫৬
২. আসলাম এর উপনাম। তিনি উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম ছিলেন।
৩. ঘোড়া বা উটের পিঠে বসার গদি বিশেষ। যা সাধারণত চামড়া, কাপড় বা সুতার হয়ে থাকে।
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪৮, ১৪৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৭