📄 বিপদে সালাফগণের ধৈর্যধারণ
এক
শাহার ইবনু হাওশাবের সূত্রে ইমাম আ'মাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনু উমাইরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুকালে আমি তার পাশে বসা ছিলাম। তিনি একটু পর পর বেহুঁশ হয়ে পড়ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বললেন, হে আল্লাহ, তুমি আমার জীবন নিয়ে নাও। তোমার ইজ্জতের শপথ! নিশ্চয় আমি তোমাকে ভালোবাসি।
দুই
মুবাররিদ থেকে বর্ণিত, একদা হাসান ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হলো, আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন—আমার নিকট ধনাঢ্যতার চেয়ে দারিদ্র্য অধিক প্রিয়। সুস্থতার চেয়ে অসুস্থতা অধিক প্রিয়।
উত্তরে হাসান ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ তাআলা তার ওপর রহম করুন। তবে আমি বলি, যে-ব্যক্তি আল্লাহর সিদ্ধান্তে কল্যাণের আশা রাখে, তার ব্যক্তিগত কোনো চাহিদা থাকে না। আর এটাই আল্লাহর যাবতীয় সিদ্ধান্তে বান্দার সন্তুষ্টির পরিচায়ক।
তিন
ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত, ঈসা আলাইহিস সালাম তার অনুসারীদের বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে যে-ব্যক্তি বিপদে খুব বেশি ভেঙে পড়ে, দুনিয়ার প্রতি তার মোহ সবচেয়ে বেশি!
চার
ইমাম শাবী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, শূরাইহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি বিপদে আক্রান্ত হলে চারবার 'আলহামদু লিল্লাহ' বলি।
■ প্রথমবার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, বিপদটা এর চেয়ে বড়ও হতে পারত!
■ দ্বিতীয়বার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, আল্লাহ আমাকে ধৈর্য ধরার তাওফীক দিয়েছেন।
■ তৃতীয়বার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, বিপদের সময়— 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন'-পড়ার মহিমান্বিত সুযোগ পাই।
■ চতুর্থবার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, বিপদটা দ্বীনী কোনো বিষয়ে না হয়ে দুনিয়াবী বিষয়ে হওয়ায়।
পাঁচ
গাসসান ইবনু মুফাযযাল আল-গালাবী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমাদের কেউ একজন বলেন, একদা ইউনুস ইবনু উবাইদ-এর কাছে এক ভদ্রলোক আসে। নিজের অভাব-অনটন ও দুঃখ-দুর্দশার কথা তার সামনে তুলে ধরে। উত্তরে ইউনুস ইবনু উবাইদ বলেন, তোমার একটা চোখ কি এক লক্ষ দিরহামে বিক্রি করবে?
: না।
: তোমার কান?
: না!
: তোমার জিহ্বা?
: না।
: তোমার মস্তিষ্ক?
: না।
-এভাবে তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিয়ামতগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন। এরপর বলেন, আমি তো দেখছি, তুমি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক, অথচ তুমি নিজের অভাবের কথা বলে বেড়াচ্ছ?
ছয়
আশআস ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম ইবনু আউন বলেন, বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর যাবতীয় সিদ্ধান্তে পূর্ণ সন্তুষ্ট বলে বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ না সে চরম দুঃসময়েও আল্লাহর প্রতি সুসময়ের ন্যায় সন্তুষ্ট থাকতে পারবে।
তোমার অবস্থা তো এতটাই স্পর্শকাতর যে, মহান আল্লাহর কোনো ফায়সালা তোমার মনঃপুত না হলে, সহসাই তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়! এরপরও কীভাবে তুমি নিজের বিষয়ে তার কাছে সমাধান কামনা করো? এমনও তো হতে পারত, তোমার চাহিদা মাফিক ফায়সালা হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে! কিংবা অন্তত ক্ষতিগ্রস্ত হতে!
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও তোমার চাহিদা মাফিক ফায়সালা হলে তুমি সন্তুষ্ট হও! এটা কী ধরনের ইনসাফ? সত্যি তুমি নিজের ওপরই ইনসাফ করোনি। তুমি এখনও আল্লাহর যাবতীয় সিদ্ধান্তে পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারোনি।
আহমাদ ইবনু আসিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যুহাইর ইবনু নুআইম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ধৈর্য ও ভরসা ব্যতীত ঈমান পূর্ণ হয় না।’
যদি কারও মধ্যে ভরসা থাকে; আর ধৈর্য না থাকে তবে তার ঈমান পূর্ণ হবে না। অনুরূপ যদি কারও মধ্যে ধৈর্য থাকে; আর ভরসা না থাকে, তাহলেও তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে না। আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু এর একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই দুইটির উদাহরণ হলো জমিতে হালচাষের জন্য জোয়ালে বাঁধা দুটি বলদের মতো—যাদের একটি কোনো কারণে থেমে গেলে অপরটি আপনা আপনিই থেমে যায়।
উসমান ইবনুল হাইসাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বসরায় সাদ গোত্রের এক লোক বাস করতেন। তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদের সভাসদ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। একবার ছাদ থেকে পড়ে তার পা ভেঙে যায়। আবু কিলাবা তাকে দেখতে আসেন। অতঃপর সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, আমি আশা করি, এটা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে।
তিনি বললেন, ভাঙা পায়ে আবার কীসের কল্যাণ, আবু কিলাবা!
আবু কিলাবা বললেন, গোপন বিষয়ে আল্লাহই অধিক অবগত।
তিন দিন পর তার কাছে উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদের একটি পত্র আসে। তাতে এই মর্মে নির্দেশ দেওয়া হয় যে—
‘এক্ষুণি সবাইকে আল্লাহর রাসূলের দৌহিত্র—হুসাইন ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে।’
তিনি দূতকে বলেন, তুমি তো আমার অবস্থা দেখতেই পাচ্ছ। উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদকে আমার দুরবস্থার কথা বলো। এরপর সাত দিন যেতে-না-যেতেই হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর শহীদ হওয়ার সংবাদ আসে। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ আবু কিলাবার ওপর রহম করুন! তিনি সত্যই বলেছেন। পা ভাঙাটাই আমার জন্য কল্যাণকর ছিল!
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৪৬০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৬২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৫১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫০১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/২৯২
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩১১
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/৮
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৩৮
📄 দ্বীনী-দুর্যোগ মোকাবেলায় সালাফগণের ভূমিকা
এক
আবু উবাইদা ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আম্মার ইবনি ইয়াসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার মুশরিকরা আম্মার রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আটক করে। তারা তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিন্দা করতে এবং তাদের উপাস্যগুলোর প্রশংসা করতে বাধ্য করে। এই ঘটনার পরে আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হলে, আল্লাহর রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে তোমার? এমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?
উত্তরে তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অবস্থা খুবই খারাপ! অতঃপর তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন এবং এটাও বলেন যে, আপনার সমালোচনা এবং তাদের উপাস্যকুলের প্রশংসা না করলে তারা আমাকে কিছুতেই মুক্তি দিত না।
ঘটনা শোনার পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে চান, যখন তুমি আমার সমালোচনা করছিলে এবং তাদের উপাস্যদের প্রশংসা করছিলে, তখন তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন ছিল?
তিনি বলেন, আমার অন্তর তখন তাওহীদের বিশ্বাসে পরিপূর্ণ ছিল।
এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা যদি পুনরায় তোমাকে এভাবে বাধ্য করে তবে তুমিই তাদের সঙ্গে একই আচরণ করতে পারবে।
দুই
ইউনুস ইবনু জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সফরের বিদায় জানাচ্ছিলাম। সে মুহূর্তে আমি তাকে বললাম, আমাদের কিছু নসীহত করুন। তিনি বললেন-
আমি প্রথমে আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে তোমাদের অসিয়ত করছি এবং অসিয়ত করছি কুরআনের ব্যাপারে। নিশ্চয় কুরআন আঁধার রাতের আলো। দিনের আলোয় পথপ্রদর্শক। সুতরাং, তোমরা কষ্ট-সাধনা করে হলেও কুরআনের ওপর আমল করো। যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হও, তাহলে তার মোকাবেলায় আগে সম্পদ পেশ করো, দ্বীন নয়। যদি বিপদ এর চেয়েও বড় হয়, তাহলে তোমার জান-মাল পেশ করো, তবুও তোমার দ্বীন নয়। নিশ্চয়ই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে, যার দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই প্রকৃত নিঃস্ব সে, যে তার দ্বীন খুঁইয়ে বসেছে। জেনে রেখো, জান্নাতে কোনো অভাব থাকবে না! আর জাহান্নামে কোনো সচ্ছলতা থাকবে না।
তিন
একদা আবু বকর ইবনুল আইয়্যাশ রাহিমাহুল্লাহ হাসান ইবনুল হাসান রাহিমাহুল্লাহকে বলেন, আর কতকাল ফিতনায় ডুবে থাকবেন?
হাসান ইবনুল হাসান জানতে চান-আমি কোন ফিতনায় জড়িয়ে পড়েছি বলে মনে করছেন?
তিনি বলেন, আমি দেখলাম, লোকেরা আপনার হাতে চুমু দিচ্ছে! অথচ আপনি তাদের বাধা দিচ্ছেন না।
চার
আব্দুল্লাহ ইবনু কাসীর দিমাশকী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনি জাবির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা রজা ইবনু হাইওয়াহর নিকটে অবস্থান করছিলাম। তিনি নিয়ামতের শুকরিয়া সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। একপর্যায়ে বললেন, এমন কেউ নেই, যে নিয়ামতের পূর্ণ শুকরিয়া আদায় করতে পারে।
আমাদের পেছনে মাথায় পট্টি বাঁধা এক লোক বসা ছিল। সে বলল, আমীরুল মুমিনীনও নয়? (রজা ইবনু হাইওয়াহ কিছু বলেননি) আমরা বললাম, এখানে আলাদাভাবে আমীরুল মুমিনীনের প্রসঙ্গ আসছে কেন? তিনি তো সাধারণ একজন মানুষই!
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা ওই বিষয়টি এড়িয়ে গেলাম। একটুপর রজা ইবনু হাইওয়াহ আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন, লোকটি নেই। তিনি বুঝতে পারেন, লোকটি আজ নির্ঘাত বিপত্তি সৃষ্টি করবে। তাই তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, মাথায় পট্টি বাঁধা লোকটির কারণে তোমাদের রাজদরবারে ডাকা হবে। যদি তোমাদের ডাকা হয়, কসম করতে বলা হয়, তাহলে তোমরা কসম করে ফেলবে।
বর্ণনাকারী বলেন, একটু পরেই দেখি এক রাজসৈনিক উপস্থিত। সৈনিক রজা ইবনু হাইওয়াহকে নিয়ে রাজদরবারে উপস্থিত হয়। তিনি আমীরুল মুমিনীনের দিকে এগিয়ে যান। আমীরুল মুমিনীন রাগতস্বরে জিজ্ঞেস করেন, হে রজা, আপনার সামনে আমীরুল মুমিনীনের আলোচনা করা হয়েছিল। আপনি নাকি তার পক্ষে কথা বলেননি?
রজা ইবনু হাইওয়াহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন বিষয়ে আমীরুল মুমিনীন?
তিনি বললেন, আপনারা নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বলছিলেন, কেউ নাকি নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করছে না। আপনাদের তখন আমীরুল মুমিনীনের কথা বলা হয়েছিল। আপনি বলেছিলেন, তিনি তো একজন সাধারণ মানুষই!
: আমীরুল মুমিনীন, এটা অসম্ভব! এমনটা আমি বলিনি। (স্মর্তব্য, রজা ইবনু হাইওয়াহ কথাটি বলেননি, বলেছে অন্যরা)
: আল্লাহর কসম?
: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম!
তিনি বলেন, এরপর বাদশাহ ওই মামলা দায়ের করা লোকটার পিঠে ৭০টা চাবুক মারার আদেশ দেন। আমি যখন প্রাসাদ থেকে বের হচ্ছিলাম, তখন সে চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত। আমাকে দেখে সে বলে ওঠে, জনাব, আপনিই তো শাইখ রজা ইবনু হাইওয়াহ! আপনি কী করে আমাকে ফাঁদে ফেললেন? আমি বললাম, কোনো মুমিনের রক্তপাতের চেয়ে তোর পিঠে সত্তর ঘা চাবুক পড়াই উত্তম।
ইবনু জাবির বলেন, এরপর রজা ইবনু হাইওয়াহ কোনো মজলিসে বসলে আশপাশে তাকাতেন। বলতেন, তোমরা মাথায় পট্টি বাঁধা লোক থেকে দূরে থাকো।
পাঁচ
হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি ইমাম আহমাদ ও ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীনকে নিয়ে আফফান-এর নিকট উপস্থিত হই। আমরা যাওয়ার আগের দিন আমীর ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আফফানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠান। প্রথম যাকে 'খলকে কুরআন' সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তিনি হলেন আফফান। যাই হোক, ইমাম আহমাদ-সহ আমরা সকলে সেখানে উপস্থিত হলে ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীন আফফানকে বলেন, ইসহাক আপনাকে ডেকে কী জিজ্ঞেস করেছিল? আমাদের বিস্তারিত বলুন!
তিনি বলেন, শুনুন, আবু জাকারিয়া, আমি আপনার ও আপনার সাথীদের কলঙ্কিত করিনি। কারণ, আমি তার প্রশ্নের কোনো জবাবই দিইনি।
: কীভাবে কী? খুলে বলুন!
: তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। এরপর আমার সামনে আরব উপদ্বীপ থেকে প্রেরিত খলীফা মামুনুর রশীদের চিঠি পড়ে শোনান। সেখানে লেখা ছিল, আফফানকে জিজ্ঞাসাবাদ করো। তাকে বলো যে, কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট? যদি তার কথা আমার মতের সাথে মিলে যায়, তাহলে তো ভালো। আর যদি সে কোনো উত্তর না দেয়, তাহলে তার ওপর যে-ভাতা চালু আছে সেটা বন্ধ করে দাও।'
চিঠি পড়া শেষ হলে, ইসহাক আমাকে বললেন, আপনার বক্তব্য কী? আমি সূরা ইখলাস শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলাম। এরপর বললাম, আপনার কী মনে হয় এটা সৃষ্ট বা মাখলুক?
তিনি বললেন, হে শাইখ, আমিরুল মুমিনীন বলেছেন, যদি আপনি তার মতের পক্ষে সাড়া না দেন, তবে যেন আপনার জন্য বরাদ্দকৃত ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আমি বললাম, (আল্লাহর বাণী) وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ
আকাশে রয়েছে তোমাদের রিস্ক ও প্রতিশ্রুত সবকিছু।
তিনি চুপ হয়ে গেলেন। এরপর আমি ফিরে এলাম।
এই ঘটনা শুনে ইমাম আহমাদ ও ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীন অত্যন্ত আনন্দিত হন।
ছয়
মুহাম্মাদ ইবনু সূওয়াইদ আত-তহ্হান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা আসিম ইবনু আলীর নিকটে অবস্থান করছিলাম। আবু উবাইদ, ইবরাহীম ইবনু আবিল লাইস-সহ আরও অনেকেই আমাদের সাথে উপস্থিত ছিলেন। তখন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালকে জেলখানায় প্রহার করা হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আসেম ইবনু আলী ইমাম আহমাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলে ওঠেন, কেউ কি আমার সঙ্গে গিয়ে এই লোকটাকে 'খলকে কুরআন'-এর বিষয়টি বুঝিয়ে বলবে?
বর্ণনাকারী বলেন, তার আহ্বানে কেউ সাড়া দেয় না। তখন ইবনু আবিল লাইস বলেন, হে আবুল হুসাইন, আমি আমার মেয়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কিছু অসিয়ত করতে চাই। তার কথা থেকে আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে, তিনি গায়ে কাফনের কাপড় জড়িয়ে মৃতের সুগন্ধি মেখে আসবেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি এসে বলতে লাগলেন, আমি তাদের কাছে গিয়েছিলাম। তারা সকলেই কান্নাকাটি করছে।
বর্ণনাকারী বলেন, এসময় ওয়াসিত থেকে আসিমের দুই কন্যার চিঠি আসে। তাতে লেখা ছিল-
আব্বাজান, আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, এই লোকটাই। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালকে ধরিয়ে দিয়েছে। তাকে প্রহার করেছে। কারণ, তিনি 'কুরআন মাখলুক' হওয়াকে স্বীকার করেন না। সুতরাং, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। না জেনে তার পক্ষ নেবেন না। তার ডাকে সাড়া দেবেন না। আল্লাহর কসম! তার ডাকে সাড়াদানের চেয়ে আমাদের নিকট আপনার মৃত্যু-সংবাদ অধিক প্রিয়।
সাত
আবু জাফর আল-আমবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালকে খলীফা মামুনুর রশীদের নিকট নিয়ে যাওয়ার সংবাদ শুনেই আমি ফোরাত নদী পার হয়ে তার কাছে পৌঁছি। তিনি তখন একটি মুসাফিরখানায় অবস্থান করছিলেন। আমি তাকে সালাম দিলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আবু জাফর, অনেক কষ্ট করে এলে!
আমি বললাম, শাইখ, বর্তমানে আপনি একজন অনুসৃত ব্যক্তিত্ব। মানুষ আপনার অনুসরণ করে। আপনাকে মানে। আল্লাহর শপথ! যদি আপনি খলীফা মামুনুর রশীদের পক্ষাবলম্বন করতেন এবং কুরআন মাখলুক হওয়ার পক্ষে মত দিতেন, তাহলে মানুষও তাই বিশ্বাস করত। এখন যেহেতু আপনি তাতে মত দেননি, তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সেহেতু অনেক মানুষ কুরআন মাখলুক হওয়াকে অস্বীকার করছে। খলীফা যদি আপনাকে হত্যা নাও করে, তবুও আপনি একদিন মারা যাবেন। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং, আল্লাহকে ভয় করুন। মৃত্যুর ভয়ে সত্য ত্যাগ করবেন না। খলীফার আহ্বানে সাড়া দেবেন না।
ইমাম আহমাদ কথাগুলো শুনে কাঁদতে থাকেন এবং বলেন, মা শা আল্লাহ! আবু জাফর, কথাগুলো আবারও বলো। আমি পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি আবারও বললেন, মা শা আল্লাহ!
আট
সালিহ ইবনু আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার আব্বাজান এবং মুহাম্মাদ ইবনু নূহকে বাগদাদ থেকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা তাদের পেছনে পেছনে আম্বার পর্যন্ত আসি। তখন আবু বকর আল-আহওয়াল আব্বাজানকে জিজ্ঞেস করেন, আবু আব্দিল্লাহ, যদি তারা আপনার ঘাড়ে তরবারি রাখে, তবে কি আপনি তাদের এই দাবি মেনে নেবেন যে, কুরআন মাখলুক? তিনি জবাবে বলেন, না।
প্রশ্নোত্তর শেষ হতেই তাদের সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপরের ঘটনা সম্পর্কে আব্বাকে বলতে শুনেছি-
একসময় আমরা বাগদাদ এবং রাক্কার মাঝামাঝি উন্মুক্ত প্রান্তরে গিয়ে পৌঁছাই। সেখান থেকে মাঝরাতে আমাদের সফর শুরু হয়। এসময় জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের মাঝে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল কে? আব্বাজানের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়-এই ব্যক্তি।
আব্বাজানের পরিচয় পেয়েই লোকটি চালককে উটের গতি কমাতে বলে। এরপর আব্বাজানকে উদ্দেশ্য করে বলে, শাইখ, এ ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ আছে যে, কুরআন মাখলুক না-হওয়ার মতাদর্শ পোষণের কারণে যদি আপনাকে হত্যা করা হয়, তবে আপনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন? অতঃপর আগন্তুক-আপনাকে আল্লাহর নিকট আমানত রাখছি-বলে চলে যায়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আগন্তুক কে?
আমাকে বলা হলো, সে আরবের রবীআ গোত্রের লোক। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে পশমের কাজ করে। মানুষ তাকে জাবির ইবনু আমীর নামে ডাকে এবং তাকে খুবই ভালো জানে।
নয়
ইবরাহীম ইবনু আব্দিল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন মাখলুক' সংক্রান্ত ফিতনার পর থেকে আজ অবধি তওক নামক খোলা ময়দানে এক গ্রাম্য-ব্যক্তির কথার চেয়ে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ কথা আর শুনিনি। সে বলেছিল-
'হে আহমাদ, যদি সত্যের পক্ষ নেওয়ায় আপনাকে হত্যা করা হয় তবে তো আপনি শহীদ। আর যদি প্রাণে বেঁচে যান, তবে সম্মানজনক জীবনের অধিকারী। সুতরাং, আপনি আপনার অন্তর দৃঢ় রাখুন।'
দশ
হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম আহমাদ বলেন, বয়সে নবীন হয়েও স্বীয় ইলম অনুপাতে আল্লাহর আদেশ পালনে মুহাম্মাদ ইবনু নূহ থেকে অধিক দৃঢ় অবস্থানে আর কাউকে দেখিনি। আমি আশা রাখি, তার মৃত্যু কল্যাণকর হবে। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, হে আবু আব্দিল্লাহ, আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহকে ভয় করুন।
আপনি আমার মতো সাধারণ কেউ নন। আপনি একজন সমাদৃত ও অনুসৃত ব্যক্তি। আপনাকে মানুষ মান্য করে। আপনার কথা শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়ে থাকে। সুতরাং, আল্লাহকে ভয় করুন। সত্যের ওপর অটল ও অবিচল থাকুন।
এরপর তিনি মারা যান। আমি তার জানাযা পড়াই এবং তাকে আনাহ নামক স্থানে দাফন করি।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৪১১; আল-হাকিম: ২/৩৫৭; ইমাম হাকিম এটাকে সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবীও তাতে একমত পোষণ করেন। তবাকাতে ইবনু সাদ: ৩/১৮; আল-হুইয়াহ: ১/১৪০; তাফসীরে তাবারী: ১৪/১২২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৪
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৫০০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৫৬১
২. কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট?
৩. উল্লেখ্য যে, খলীফা মামুনুর রশীদ ইমাম আফফান-এর নামে প্রতি মাসে ৫০০ দিরহামের ভাতা চালু করেছিলেন।
১. সূরা যারিয়াত, আয়াত: ২২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/২৪৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৯/২৬৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১১/২৩৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২৪১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১১/২৪২; আনাহ নামক জায়গাটি রাক্কা ও ফোরাত নদের পাশে প্রসিদ্ধ একটি স্থান। সেখানে একটি মজবুত কেল্লা রয়েছে।
📄 মুসলিম উম্মাহর গোলযোগে সালাফগণের কর্মপন্থা
এক
আবু হাযিম থেকে বর্ণিত, হুসাইন ইবনু খরীজাহ আল-আশজায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শহীদ করে দেওয়া হয় এবং মুসলমানদের মাঝে ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমি এই দুআটি পড়তাম-
হে আল্লাহ, আপনি আমার কাছে সত্য উন্মোচিত করে দিন-যাতে আমি তা আঁকড়ে ধরতে পারি।
একদিন আমি স্বপ্নে দেখি, দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে বিশাল একটি দেওয়াল আড়াল করে রেখেছে। আমি দেওয়ালটি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। কিছুদূর ওঠার পর একটি দল দেখতে পেলাম। তারা বলল, আমরা ফেরেশতা। জিজ্ঞেস করলাম, শহীদগণ কোথায়? তারা বলল, আরও উপরে উঠুন। এরপর আমি আরও একধাপ উপরে উঠলাম। সেখানে দেখলাম, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বললেন, আপনি আমার উম্মতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
উত্তরে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, আপনি জানেন না, আপনার চলে আসার পর তারা পৃথিবীতে কী সব কর্মকাণ্ড আরম্ভ করেছে! তারা অন্যায় রক্তপাত করছে। বড়দের হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। আহ! কেন তারা এই সংকটময় মুহূর্তে আমার বন্ধু সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাসের রীতি অনুসরণ করছে না!
বর্ণনাকারী বলেন, এই স্বপ্নের পর আমি সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গেলাম এবং তাকে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি খুব আনন্দিত হলেন। বললেন, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যার বন্ধু নয়, সে ক্ষতিগ্রস্ত। আমি বললাম, আপনি দুই দলের কোন পক্ষে?
তিনি বললেন, আমি তাদের কারও পক্ষে নই।
আমি বললাম, আচ্ছা, এই মুহূর্তে আমার ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কী?
তিনি বললেন, তোমার কি বকরী বা ছাগল আছে?
আমি বললাম, জি না!
তিনি বললেন, তাহলে বকরী কিনে নাও। আর সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকো- যতদিন না এ ফিতনা নির্মূল হয়।
দুই
ইমাম আ'মাশ থেকে বর্ণিত, যায়েদ ইবনু ওয়াহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন আমীরুল মুমিনীন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় ডেকে পাঠান, তখন লোকেরা ইবনু মাসউদের কাছে ভিড় করে। বলে, আপনি এখানেই থাকুন। কোথাও যাবেন না। ওখানে সমস্যা চলছে! আমরা আপনাকে সবদিক থেকে নিরাপত্তা দিয়ে রাখব।
তিনি বলেন, আমি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর আনুগত্যে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর যে-ফিতনা ও দুর্যোগ অত্যাসন্ন, আমি চাই না, আমাকে দিয়ে তার সূত্রপাত হোক।
এরপর তিনি লোকদের ফিরিয়ে দিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
তিন
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনি রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে-রাতে দুর্বৃত্তরা উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর আক্রমণ করে, সে-রাতে আমার পিতা আমর ইবনু রবীআ রাযিয়াল্লাহু আনহু সালাত পড়ে এই দুআ করেন-
হে আল্লাহ, ফিতনা থেকে আপনি আমাকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখুন, যেভাবে আপনার প্রিয় বান্দাদের বাঁচিয়ে রাখেন।
পরের দিন সকালেই তার মৃত্যু সংবাদ শোনা যায়!
চার
বিখ্যাত তাবিয়ী নাফি থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আলী ও মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমার সংকট চলাকালে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি বলেন-
'আবু আব্দির রহমান, আপনি একজন অনুসৃত ব্যক্তি। শামের অধিবাসীদের মাঝে আপনার প্রভাব আছে। আপনি তৈরি হয়ে নিন। আমি আপনাকে সেখানকার গভর্নর বানিয়ে পাঠাচ্ছি।'
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-র এই সিদ্ধান্ত শুনে আমি তাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বললাম, আপনি তো জানেন, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল। মদীনার প্রতিটি বালুকণায় তার অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমি স্মৃতি নিয়েই মদীনায় থেকে যেতে চাই। সুতরাং, আমাকে ক্ষমা করুন।
কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানান। অনন্যোপায় হয়ে আমি উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার সাহায্য চাই। তিনিও আমার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন। ফলে সে রাতেই আমি মক্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। ইত্যবসরে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জানানো হয় যে, আমি শামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছি। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু আমার পেছনে লোক পাঠান। লোকটি আস্তাবলের নিকট এসে তার পাগড়ি দ্বারা উটের মুখ বেঁধে দেয়-যাতে উট কোনো আওয়াজ করতে না-পারে আর সে খুব সহজেই আমাকে ধরতে পারে।
এদিকে হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলে পাঠান, সে শামে রওয়ানা হয়নি; বরং মক্কায় যাচ্ছে। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন চুপ হয়ে যান।
পাঁচ
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, চলমান এই ফিতনায় আমাদের অবস্থা ওই যাত্রীদলের মতো, যারা বড় কোনো সড়কে পথ চলছিল। পথের অলি-গলি সবই তাদের পরিচিত। হঠাৎ কালো মেঘ ও অন্ধকারে চারিদিক ছেয়ে যায়। যাত্রীরা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। কেউ ডানে, কেউ বামে। অবশেষে তারা পথ হারিয়ে ফেলে; কিন্তু আমরা সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকি। ঠিক যেভাবে আগে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটুও নড়ি না। এরপর যখন আল্লাহ তাআলা অন্ধকার দূর করে আলো দান করেন তখন দৃষ্টি মেলে দেখি যে, আমরা সেই আগের পথেই আছি। পরিচিত পথেই অবিচল রয়েছি এবং অবচেতনেই নতুন করে সে-পথে চলতে শুরু করেছি।
এই যে আজ কুরাইশের যুবকরা-কখনও দুনিয়ার জন্যে এবং কখনও নির্দিষ্ট কোনো শাসকের জন্য লড়ছে, মারছে এবং মরছে-আমার কাছে তাদের এসবের মূল্য আমার এই অ-পশমী জুতো জোড়ার সমানও নয়!
ছয়
সাল্লাম ইবনু মিসকীন থেকে বর্ণিত, হাসান ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমীরুল মুমিনীন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শহীদ করার পর ঘাতকেরা আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বলে, আপনি সর্দারের পুত্র। অনুসরণীয় ব্যক্তি।
সুতরাং, আপনি খিলাফতের জন্য এগিয়ে আসুন। আমরা আপনার হাতে বায়আত হব।
তিনি বলেন, অসম্ভব! আমি কারও শিঙ্গা পরিমাণ রক্ত ঝরাতেও প্রস্তুত নই।
তারা বলে, আপনি অবশ্যই খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। অন্যথায় আপনাকেও আবদ্ধ ঘরে হত্যা করা হবে। এতেও কোনো কাজ হয় না। তিনি আগের কথার পুনরাবৃত্তি করেন। হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাকে লোভ এবং ভয় সবই দেখানো হয়; কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা নিজেদের কার্যসিদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়।
সাত
মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন-
বিশাল একটি জনগোষ্ঠী মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করে। তারা তাকে ভালোবাসত, মুহাব্বত করত। তবে তাদের ভালোবাসা ও মুহাব্বতে সীমালঙ্ঘন ছিল। তারা তাকে শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেছিল। এদিকে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুও বদান্যতা, সহনশীলতা ও দান-দক্ষিণার মাধ্যমে তাদের মন জয় করে চলছিলেন। তার ভালোবাসা বুকে ধারণ করেই তারা শামে জন্মেছিল। নিজেদের সন্তানদেরও তার একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম ছাড়াও তাবিয়ী ও আলিমদের বিশাল একটা অংশ ছিল। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধীনে তারা ইরাকবাসীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। একটি দৃঢ় অবস্থানে নিজেদের দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে।
অনুরূপ আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনী ও প্রজাগণও তার ভালোবাসা ও অনুরাগ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। যারা তার বিরুদ্ধাচরণ করত, তাদের প্রতি যথাযথ বিদ্বেষ পোষণ করত। তার সমর্থনেও কিছু লোক সীমালঙ্ঘন করত। এসব কারণে তারাও দলীয়করণ ও সাম্প্রদায়িকতায় ঝুঁকে পড়েছিল।
আল্লাহর শপথ! ওই ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে-যে এমন অঞ্চলে বেড়ে উঠেছে, এখানকার লোকজন তার সমর্থনে সীমালঙ্ঘন করে কিংবা তার বিরুদ্ধাচরণে সীমা ছাড়িয়ে যায়? পূর্ণ ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা তার পক্ষে কীভাবে সম্ভব?
যাই হোক, আল্লাহর শুকরিয়া, আমরা এমন এক নিরাপদ সময় পেয়েছি, যখন ফিতনার সকল আঁধার দূরীভূত হয়েছে। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষের সত্যাসত্য এখন দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। উভয় দলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা এখন পূর্ণ অবগত। তাদের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর আমরা তাদের অপারগ মনে করব। তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতা নিয়ে তাদের ভালোবাসব।
খিলাফত প্রতিষ্ঠার বৈধ পদ্ধতিতে যারা কোনো প্রকার অন্যায় বা ভুল করেছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক থাকব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চাইলে তারা নাজাতপ্রাপ্ত হবেন। আমরা তাদের সম্পর্কে তাই বলব, যেমনটা কুরআন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে-
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا
হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই-যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে-তাদের ক্ষমা করুন। আর যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো রকম বিদ্বেষ রাখবেন না।
পাশাপাশি তাদের প্রতিও ভালোবাসা রাখব, যারা তখন পক্ষপাতমুক্ত ছিলেন। যেমন, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা, সাঈদ ইবনু যায়েদ প্রমুখ সালাফগণ।
তবে আমরা কিছুতেই খারিজীদের সমর্থন করি না। কেননা, তারা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। উভয় দলকে কাফির ফাতওয়া দিয়েছে। বাস্তবিকপক্ষে খারিজীরা হলো জাহান্নামের কুকুর! তারা দ্বীন থেকে তিরের গতিতে বেরিয়ে গেছে। এতদসত্ত্বেও আমরা সুনিশ্চিত করে বলব না যে, তারা অনন্ত কালের জন্য জাহান্নামবাসী হবে। কেননা, স্বীকৃত মূর্তিপূজক ও ক্রুশপূজকরাই কেবল অনন্ত কালের জন্য জাহান্নামবাসী হবে।
আট
ইমাম শাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদা মাসরুককে বলা হলো, আপনি তো দেখছি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার সমর্থন থেকে দূরে থাকছেন! তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমাদের কী অভিমত? যদি তোমরা একে অন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করো এবং সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও, আর এ সময় আসমান থেকে কোনো ফেরেশতা নেমে ঘোষণা করে-
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।
-তাহলে কি তোমাদের পারস্পরিক লড়াই বন্ধ হবে?
তারা বলল, হ্যাঁ।
তাদের 'হ্যাঁ'-বাচক উত্তর শুনে তিনি বললেন, তাহলে শুনে রাখো, আল্লাহর শপথ! আসমান থেকে সম্মানিত ফেরেশতা এই আদেশ নিয়ে নেমে এসেছিলেন-যা তোমাদের নবীর মুখে উচ্চারিত হয়েছে। আর এটা অকাট্য। শাশ্বত। কখনই রহিত হবে না।
নয়
হারিস আল-আযদীর সূত্রে সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইবনুল হানাফিয়্যা বলেন, আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির ওপর দয়া করুন, যে নিজেকে এই ফিতনা থেকে দূরে রেখেছে। হাত ও জিহ্বা সংযত রেখেছে। গৃহকোণে অবস্থান করেছে। দৈনন্দিন ইবাদত যথাযথভাবে পালন করেছে এবং প্রিয়জনদের স্নেহ-সান্নিধ্যে সময় পার করেছে। জেনে রেখো, উমাইয়্যা বংশের কর্মফল তাদের মাঝে মুসলমানদের তলোয়ারের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
মনে রেখো-
আল্লাহর যখন মর্জি হবে, তখন তিনি হকের পক্ষাবলম্বীদের জন্য কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন। সুতরাং, যে তা পাবে, আমাদের মতে সে ভাগ্যবান। আর যে এর আগেই মারা যাবে, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রভূত কল্যাণ প্রাপ্ত হবে। আর সেটাই অধিক কল্যাণকর ও স্থায়ী।
দশ
আবু আকীল বাশীর ইবনু উকবাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইয়াযীদ ইবনুশ শীখখীরকে জিজ্ঞেস করলাম, বিদ্রোহ দেখা দিলে ইমাম মুতাররিফ কী করতেন? তিনি বললেন, ইমাম মুতাররিফ তখন পাতালঘরে চলে যেতেন। ফিতনা নির্বাপিত হওয়া পর্যন্ত জুমআ এবং সালাতের জামাআতেও তিনি বিদ্রোহীদের কাছে ঘেঁষতেন না!
এগারো
আইয়ুব থেকে বর্ণিত, ইমাম মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ফিতনার সময় ধুম্রজালে আবর্তিত জিহাদের চেয়ে ঘরের খুঁটি আঁকড়ে বসে থাকা আমার নিকট অধিক শ্রেয়।
বারো
হুমাইদ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হারুরিয়ারা একবার মুতররিফ ইবনু আব্দুল্লাহর নিকট এসে তাকে তাদের দলে যুক্ত হওয়ার আহ্বান করে। তিনি বলেন,
হে লোকসকল, যদি আমার দুইটা জীবন থাকত, তাহলে একটা নিয়ে তোমাদের দলে যুক্ত হতাম, আর অপরটা নিয়ে পক্ষপাতমুক্ত থাকতাম। তোমরা যে-মতের পক্ষে আহ্বান করছ, সেটা সত্য হলে অপর জীবন নিয়েও তোমাদের অনুসরণ করতাম।
পক্ষান্তরে তোমাদের মতাদর্শ ভ্রান্ত হলে, সর্বোচ্চ একটা জীবন বৃtha যেত। অপর জীবন নিয়ে আমি সত্যের অনুসন্ধান করতাম! কিন্তু ভাইসব, জীবন তো আমার একটাই। অতএব, সেটা নিয়ে আমি ঘোর অনিশ্চয়তায় পড়তে চাই না।
টিকাঃ
১. আলী ও মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমা
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১২০
৩. কুফা নগরীতে
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৮৯
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩৩৫
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২২৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৭
১. হিজামা
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৯
৩. পক্ষপাতদুষ্ট মতামত থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি।
৪. খারেজীরা ব্যতীত
৫. শিয়াবাদে
১. সূরা হাশর, আয়াত: ১০
১. লেখক বলেন, আল্লাহ তাআলা ইমাম যাহাবীকে এমন চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্যের জন্য উত্তম বিনিময় দান করুন। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার ফিতনার মুহূর্তে সাধারণ মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে সারগর্ভ নির্দেশনা দিয়েছেন।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১২৮
৩. সূরা নিসা, আয়াত: ২৯
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৬৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১২৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯১
৪. খারেজীদের একটি শাখা।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯৫
📄 রাজদরবারের প্রতি সালাফগণের অনীহা
এক
আব্দুর রহমান ইবনু যায়েদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা আলকামা রাহিমাহুল্লাহকে বললাম, আপনি যদি সালাত আদায়ের পর মসজিদে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন তাহলে আমরা আপনার সান্নিধ্যে বসতাম। আপনাকে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করে জেনে নিতাম! তিনি বললেন, লোকে বলবে— ‘ওই যে-লোকটা বসে আছে, তিনিই আলকামা’! এ ব্যাপারটা আমার খুব অপছন্দ!
একবার কতিপয় ঘনিষ্ঠজন এসে আর্জি পেশ করল—আপনি যদি আমীর-উমারাদের কাছে যেতেন?
তিনি বললেন, আমি যদি আমীর-উমারাদের কাছে যাই, তবে আমার আশঙ্কা হয় যে, তাদের দ্বারা আমার যতটা সম্মানহানি হবে, আমার দ্বারা তাদের তার চেয়েও বেশি মানহানি ঘটবে!
দুই
সুলাইমান আত-তাইমী থেকে বর্ণিত, ইমাম আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। একান্ত নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও সামনে সেগুলো উল্লেখ করি না—
(১) বিশেষ কারণে ডাকা না হলে কখনও রাজদরবারে না যাওয়া।
(২) দুই ব্যক্তির মধ্যকার বিষয়ে নাক না গলানো এবং আগ বাড়িয়ে কখনও সমাধানের চেষ্টা না করা।
(৩) যে আমার কাছ থেকে চলে যায়, কখনও তার দোষচর্চা না করা।
তিন
নুমান ইবনু যুবায়ের সানআনী বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ কিংবা আইয়ূব ইবনু ইয়াহইয়া ইমাম তাউস রাহিমাহুল্লাহর নিকট পাঁচশ বা সাতশ দিনার প্রেরণ করেন। সেই সঙ্গে দূতকে বলে দেন যে, তিনি যদি তোমার হাত থেকে এই হাদিয়া গ্রহণ করেন, তবে তোমাকে পুরস্কৃত করা হবে।
দূত যথাসময়ে হাদিয়া নিয়ে তাউসের শহরে গিয়ে উপস্থিত হয়। হাদিয়া গ্রহণ করার জন্য তাউসকে উপর্যুপরি বোঝানোর চেষ্টা করে; কিন্তু তাউস তার অনুরোধ ও আবদার নাকচ করে অন্য কাজে মশগুল হয়ে পড়েন। দূত তখন নিরাশ হয়ে ঘরের এক কোণে থলেটি ফেলে চলে আসে। রাজদরবারে এসে জানায় যে, তাউস হাদিয়া গ্রহণ করেছেন।
অনেকদিন পর। ইমাম তাউসের কোনো একটি বিষয়ে রাজদরবারের লোকজন অসন্তুষ্ট হয়। তারা এই মর্মে তাউসের কাছে একজন দূত প্রেরণ করে যে, আপনি আমাদের পক্ষ থেকে প্রেরিত হাদিয়াটি ফেরত দিন!
দূত ইমাম তাউসের কাছে গিয়ে বলে, শহরের আমীর আপনাকে যে-থলে দিয়েছিল সেটি ফেরত দিন। তিনি বলেন, আমি তার থেকে কোনো থলে বা হাদিয়া গ্রহণ করিনি। দূত খালি হাতে ফিরে আসে এবং আমীরকে বলে, তিনি নাকি কোনো হাদিয়া গ্রহণ করেননি।
হাজার হলেও তারা জানত যে, তাউস সত্যবাদী। তাই তারা প্রথম দূতকে আবার প্রেরণ করে। সে গিয়ে বলে, হে আব্দুর রহমান, কিছুদিন আগে যে-দিনারগুলো আপনার ঘরে ফেলে গিয়েছিলাম-সেগুলো কোথায়? তিনি বলেন, আমি কি সেটা গ্রহণ করেছি? দূত উত্তর দেয়, না।
অতঃপর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দূত যেখানে যেভাবে থলেটি রেখে গিয়েছিল, সেখানে ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। দূত থলেটি হাতে নিয়ে দেখে, থলের ওপর মাকড়সা জাল বুনে ফেলেছে। এরপর সেটা নিয়ে সে রাজদরবারে ফিরে আসে।
চার
ফুরাত ইবনুস সায়েব থেকে বর্ণিত, মাইমুন ইবনু মেহরান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিজেকে কখনও তিনটি বিষয় দ্বারা পরীক্ষা করো না-
(১) সৎকাজের আদেশ করার উদ্দেশ্যে কখনও রাজদরবারে যাবে না।
(২) কুরুচিপূর্ণ কোনো গান শুনবে না। কারণ, তুমি জানো না, গানের কোন অংশটা তোমার মনে গেঁথে যাবে।
(৩) কুরআন শেখানোর জন্য হলেও কখনও কোনো নারীর সাথে একাকী মিলিত হবে না।খ
পাঁচ
কাসীর ইবনু ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একবার খলীফা সুলাইমান ইবনু আব্দুল মালিক মদীনায় আগমন করেন। তখন মদীনার গভর্নর ছিলেন উমার ইবনু আব্দুল আযীয। বর্ণনাকারী বলেন-
খলীফা সবাইকে নিয়ে যোহরের সালাত আদায় করেন। অতঃপর বিশেষ কামরার দরজা খুলে দেওয়া হয়। তিনি মেহরাবের সাথে হেলান দিয়ে আগত লোকদের মুখোমুখি হয়ে বসেন। এসময় সফওয়ান ইবনু সুলাইমের ওপর তার দৃষ্টি পড়ে। তিনি উমার ইবনু আবদুল আযীযকে জিজ্ঞেস করেন, এই লোক কে? তার মতো এত সুন্দরভাবে সালাত আদায় করতে আমি আর কাউকে দেখিনি।
তিনি বললেন, এ হলো সফওয়ান ইবনু সুলাইম। খলীফা তার গোলামকে ডেকে বললেন, পাঁচশত দিনারের থলেটা নিয়ে এসো। থলে আনা হলে তিনি গোলামকে পুনরায় বলেন, তুমি থলেটি ওই সালাত আদায়কারীকে দিয়ে এসো।
খলীফার নির্দেশানুযায়ী গোলামটি সফওয়ান ইবনু সুলাইমের পাশে এসে বসে পড়ে। সফওয়ান তখনও সালাত পড়ছিলেন। সালাম ফেরানোর পর তিনি গোলামের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, আমার কাছে তোমার কোনো প্রয়োজন আছে?
সে বলল, আমীরুল মুমিনীন-সুলাইমান ইবনু আবদুল মালিক বলেছেন, আপনি যেন এই থলেটি গ্রহণ করেন এবং আপনার ও আপনার পরিবারের প্রয়োজনে ব্যয় করেন।
: সম্ভবত তুমি ভুল লোকের কাছে চলে এসেছ।
: আপনিই কি সফওয়ান ইবনু সুলাইম নন?
: অবশ্যই, আমি সফওয়ান ইবনু সুলাইম।
: তাহলে আমাকে আপনার কাছেই পাঠানো হয়েছে।
: তুমি আবার যাও। নিশ্চিত হয়ে এসো।
দূত ফিরে যায়। তিনিও তৎক্ষণাৎ জুতা নিয়ে দ্রুত মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়েন। এরপর যতদিন খলীফা মদীনায় ছিলেন, ততদিন তাকে মদীনার কোথাও দেখা যায়নি।
ছয়
ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বসরার আমীর শহরের আলিমদের মাঝে কিছু হাদিয়া বণ্টন করেন। সেই সূত্রে মালিক ইবনু দিনারের নিকটও একটি অংশ পাঠান। এ সংবাদ জানতে পেরে মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসী মালিক ইবনু দিনারকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তাদের হাদিয়া-তুহফা গ্রহণ করেছেন? তিনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, এ প্রশ্ন আমাকে না করে আমার সাথীদের করুন। তারা বলল, হে আবু বকর, তিনি সেগুলোর বিনিময়ে কিছু গোলাম কিনে আজাদ করে দিয়েছেন।
অতঃপর মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসী মালিক ইবনু দিনারকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি—যখন আপনি হাদিয়া নিচ্ছিলেন, তখন আপনার অন্তর কি তার প্রতি একটুও ঝোঁকেনি?
তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! একটুও না। কারণ, আমি তো গাধার মতো। যা করি, মুনীবের ইচ্ছায় করি এবং তোমার মতো আমিও এক আল্লাহরই ইবাদত করি।
সাত
উবাইদ ইবনু জিনাদ থেকে বর্ণিত, আতা ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, খলীফা মনোনীত হওয়ার পর 'মাহদী' ইমাম সুফিয়ানকে ডেকে পাঠান। তিনি দরবারে প্রবেশ করার পর খলীফা তার আঙুল থেকে আংটি খুলে তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, হে আবু আব্দিল্লাহ, এই হলো রাজ সীলমোহর। আপনি এই উম্মতের ওপর কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক যে-আইন বাস্তবায়ন করতে চান, করুন।
তিনি আংটিটা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, আমীরুল মুমিনীন, অনুমতি দিলে আমি কিছু কথা বলতে চাই। তিনি বললেন, হ্যাঁ, বলুন।
ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী বললেন, শর্ত হচ্ছে, আগে আমার জানের নিরাপত্তা দিতে হবে। খলীফা বললেন, অবশ্যই, আপনি নির্ভয়ে বলুন।
অতঃপর তিনি বললেন, আমি যদি স্বেচ্ছায় না আসি, তাহলে কখনও আমাকে রাজদরবারে ডেকে পাঠাবেন না। স্বেচ্ছায় না চাইলে কোনোকিছু হাদিয়াও দেবেন না।
বর্ণনাকারী বলেন, এতে খলীফা মাহদী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে যান। তিনি তার ব্যাপারে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিলেন, এমন মুহূর্তে রাজলেখক পাশ থেকে বলে ওঠেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেননি?
খলীফা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই করেছি।
এরপর যখন তিনি রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসেন, লোকেরা তাকে ঘিরে ধরে এবং বলতে থাকে, এমন সুযোগ আপনি কেন হাতছাড়া করলেন? আপনি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক কিছু আইন বাস্তবায়ন করে দিতেন! তিনি তাদের কথা কানে নেননি। এরপর সে-রাতেই তিনি বসরায় পালিয়ে যান।
আট
হাসান ইবনুর রাবী' রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা নৌ-পথে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহর সাথে সফর করছিলাম। পথিমধ্যে তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়। তিনি আমাদের বলেন, আমার ছাতু খেতে ইচ্ছে করছে। তৎক্ষণাৎ খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, একজন দরবারী লোক ব্যতীত আর কারও কাছেই ছাতু নেই! আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে ব্যাপারটা জানালে তিনি তা খেতে অস্বীকার করেন এবং সে-অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করেন।
নয়
ফুযাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষ কারা?
তিনি বললেন, যারা আলিম।
: বাদশাহ কারা?
: যারা নির্মোহ ও আত্মসংযমী।
: নিম্নশ্রেনীর লোক কারা?
: যারা দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া কামায়।
দশ
আহমাদ ইবনু জামীল আল-মারযুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহর নিকট সংবাদ পৌঁছাল যে, ইসমাঈল ইবনু উলাইয়া রাষ্ট্রীয় যাকাত-সাদাকাহ উসূল করার দায়িত্ব পেয়েছেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক তার কাছে লিখে পাঠালেন—
...ওহে, তুমি তো গরীবের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য নিজের ইলমকে বাজপাখি বানিয়েছ; কৌশলে দ্বীন বেচে দুনিয়া ও তার স্বাদ গ্রহণকে হালাল করে নিয়েছ। একসময় তুমি (দুনিয়াদার) পাগলদের চিকিৎসক ছিলে। এখন তুমিই তাদের দলে ভিড়েছ! তুমি কি আজ ভুলে গেছ, ইবনু সীরীন, ইবনু আউন ও অন্যান্যদের উদ্ধৃতি? তুমি কি ভুলে গেছ, দরবারী লোকদের ব্যাপারে তোমার সতর্কতা ও সতর্কবাণী? যদি তুমি বলো, না, আমি এসব কিছুই ভুলিনি; বরং আমাকে বাধ্য করা হয়েছে, তবে আমি বলব, এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়! বরং ইলম বহনকারী গাধাটা ভূমিতে ধ্বসে গেছে।
ইসমাঈল ইবনু উলাইয়া এই চিঠি পাঠ করে ভীষণ অনুতপ্ত হন। ক্রন্দন করেন এবং দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন।
এগারো
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
...ভিটেমাটি বিক্রয় করে খাও; তবুও দ্বীন বিক্রি করো না! ... দুনিয়া-পাগল মানুষ হলো অন্ধের ন্যায়, ইলম তাকে কখনও আলোকিত করতে পারে না। ... কতই না নিকৃষ্ট সেই আলিম, যে রাজদরবারে আসা যাওয়া করে।
আল্লাহর কসম! যদি কখনও বাধ্য হয়ে আমাকে রাজদরবারে যেতেই হতো, তবে বের হবার পর নিজের মনকে যাচাই করে নিতাম। তখন অন্তরে একধরনের বিতৃষ্ণা অনুভব করতাম। তোমরা হয়তো খেয়াল করে থাকবে, প্রবৃত্তির চাহিদাপূরণে আমি বরাবরই কঠোর। আল্লাহর কসম! আমি কখনও বাদশাহদের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করিনি। এমনকি তাদের কাছে যাওয়ার সময় গায়ের কাপড়টাও পাল্টাইনি!
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৯২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৪০
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/৭৭
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৩৬৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১২০
২. বর্ণনাকারী বলেন, আমি আতা ইবনু মুসলিমকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কি তখন 'আমীরুল মুমিনীন' বলেই সম্বোধন করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯১ ৭/২৬২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪১১
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪০
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪০; সিয়ার আলামিন নুবালা: ৮/৪১১, ৪১২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১২/৬৫