📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 জিহাদের ময়দানে সালাফগণ

📄 জিহাদের ময়দানে সালাফগণ


এক
হাম্মাদ ইবনু সালামা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনা অভিমুখে রওনা হন, তখন পথিমধ্যে একদল কুরাইশ তাকে বাধা দিতে উদ্যত হলো। তিনি সওয়ারী থেকে নেমে দাঁড়ালেন এবং তৃণীরে রক্ষিত সবগুলো তির বের করে কুরাইশদের লক্ষ্য করে বললেন, হে কুরাইশগণ, তোমরা জানো, আমার তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। আল্লাহর শপথ করে বলছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তৃণীরে একটি তিরও থাকবে, ততক্ষণ তোমরা আমার ধারে-কাছেও আসতে পারবে না। তির শেষ হয়ে গেলে তলোয়ার চালাব। যতক্ষণ আমার প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ আমি তলোয়ার চালিয়ে যাব। তারপর তোমরা যা চাও করতে পারবে। আর যদি তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ কামনা করো, তাহলে শোনো, আমি তোমাদের মক্কায় রক্ষিত আমার ধন-সম্পদের সন্ধান বলে দিচ্ছি, তোমরা তা নিয়ে নাও এবং আমার রাস্তা ছেড়ে দাও।
তাতে কুরাইশ-দল রাজি হয়ে গেল। আর সুহাইব রুমী রাযিয়াল্লাহু আনহু নিরাপদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখে বললেন-
” رَبَحَ الْبَيْعُ أَبَا يَحْيَ
আবু ইয়াহয়া তোমার ব্যবসাটি লাভজনক হয়েছে।
অতঃপর এ আয়াতটি নাজিল হয়-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ
আর মানুষের মাঝে একশ্রেণির লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জান বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।

দুই
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধের ভয়াবহ মুহূর্তে আমি আম্মার ইবনু ইয়াসিরকে দেখলাম, একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে সজোরে চিৎকার করে বলছেন— 'ওহে মুসলিম সৈনিকগণ, তোমরা কি জান্নাত থেকে পালাচ্ছ? আমি আম্মার ইবনু ইয়াসির বলছি! তোমরা আমার সাথে এসো।'
আমি দেখলাম, তার কান কেটে গেছে। সামান্য চামড়া ঝুলে আছে। আর এদিকে তিনি পুরোদ্যোমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিন
সাদ ইবনু খাইসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু -এর জীবনীতে ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন আনসারদের বিশিষ্ট বারজন মুখপাত্রের একজন এবং দ্বিতীয় আকাবায় ৭০ জনের সাথে তিনিও শরীক ছিলেন।
বদর যুদ্ধে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ঘোষণা দেন এবং সাহাবীদের যুদ্ধের জন্য আহ্বান করেন, তখন তার বৃদ্ধ পিতা খাইসামা বলেন, পরিবারের দেখভাল করার জন্যে আমাদের দুজনের যে-কোনো একজনের বাড়িতে থাকা উচিত। সুতরাং, তুমি আমাকে আল্লাহর রাস্তায় যেতে দাও। আর তুমি পরিবারের সাথেই থাকো। ছেলে সাদ তা অস্বীকার করে বলেন, ব্যাপারটা যদি জান্নাতপ্রাপ্তির না হতো, তবে না হয় ছাড় দেওয়া যেত; কিন্তু এই সুবর্ণ সুযোগে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমিও রাখি।
পিতা-পুত্রের কেউ যখন কাউকে ছাড় দিচ্ছিলেন না, তখন তাদের মধ্যে লটারি হয়। লটারিতে ছেলের নাম আসে। তৎক্ষণাৎ তিনি যুদ্ধে বেরিয়ে পড়েন এবং শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে ধন্য হন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকেও তার এবং সাহাবীগণের দলে শামিল করে নিন।

চার
সাবিত আল-বুনানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইবনু আবি লাইলা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আমার রব, আমি তো অন্ধ। যুদ্ধে শরীক হওয়ার ব্যাপারে আমার দুর্বলতাকে ক্ষমা করুন। এর পরিপেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা ওহী নাজিল করেন-
غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ
ওজরগ্রস্ত ব্যক্তিরা নয়।
এরপরেও তিনি যুদ্ধে শরীক হতে চাইতেন এবং বলতেন, তোমরা আমার হাতে ইসলামের ঝান্ডা তুলে দাও এবং উভয় পক্ষের মাঝে দাঁড় করিয়ে দাও। আমি তো অন্ধ। তাই যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখতে পাব না। ফলে পালাতেও পারব না!

পাঁচ
হাম্মাদ ইবনু সালামা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সালাহ এক যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তার সাথে তার পুত্রও ছিল। তিনি পুত্রকে বললেন, হে আমার পুত্র, শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে যাও। শহীদ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করো। ছেলে প্রস্তুত হলেন। সম্মুখপানে এগিয়ে গেলেন। লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন। এরপর এগিয়ে গেলেন সালাহ। তাকেও শহীদ করে দেওয়া হলো।
যুদ্ধের পর সালাহর স্ত্রী মুআযাহর কাছে অন্যান্য নারীরা ভিড় জমাল। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা যদি আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে থাকো, তাহলে ঠিক আছে। অন্যথায় এখান থেকে চলে যেতে পারো।

ছয়
আসমা বিনতু আবি বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, যখন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সমুদয় সম্পদ নিয়ে তার সফরসঙ্গী হন। তার সাথে হিজরতে বেরিয়ে পড়েন। এর একটু পরেই দাদা আবু কুহাফা ঘরে ঢোকেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি তখন অন্ধ। ঘরে ঢুকে অত্যন্ত আহত কণ্ঠে আমাকে ডেকে বলেন, আবু বকর তো তোমাদের সহায়-সম্বলহীন করে তার জান-মাল নিয়ে কেটে পড়েছে। আমি বলি, কখনই না। তিনি আমাদের জন্য অনেক কিছুই রেখে গেছেন। এরপর আমি কিছু কঙ্কর নিই এবং একটি কাপড়ে জড়িয়ে ঘরের এককোণে রেখে দিই। এবার দাদাকে হাত ধরে সেখানে নিয়ে বলি, এখানে হাত রাখুন। তিনি কাপড়ের ওপর হাত রাখলে আমি বলি, দেখুন তিনি কতকিছু রেখে গেছেন। তখন তিনি বলেন, যদি সে তোমাদের জন্য এতকিছু রেখে যায়, তাহলে তো ঠিক আছে।

সাত
আসিম ইবনু বাহদালা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু ওয়াইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে খালিদ ইবনু ওয়ালীদ বলেন, যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাতের মৃত্যুকে আমি কত খুঁজেছি; কিন্তু ভাগ্যে জোটেনি। আজ বিছানায় পড়ে মারা যাচ্ছি।
ইসলাম গ্রহণের পর এমন কোনো আমল আমার নেই, যার দ্বারা মুক্তির আশা করতে পারি। তবে হ্যাঁ, প্রতিটি রাতে আমি যুদ্ধের সাজে সজ্জিত থাকতাম। আকাশ আমাকে অস্থির করে রাখত। কখন প্রভাত হবে, সূর্য উঠবে, আর আমরা শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব।
এরপর তিনি বলেন, আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমার ঘোড়া ও যুদ্ধাস্ত্রগুলো সযত্নে আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিয়ো।
বর্ণনাকারী বলেন, খালিদ ইবনু ওয়ালিদের মৃত্যুর পর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানাযার উদ্দেশ্য বের হন এবং বলেন, আজ খালিদের জন্য যদি ওয়ালীদ-গোত্র মাতম করে এবং বিলাপ না-করে নীরব অশ্রুপাত করে তবে এতে কোনো দোষ নেই। কোনো নিষেধ নেই।

আট
খালিদ ইবনু ওয়ালীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যদি কোনো একরাতে আমার জন্য বাসর সাজানো হয়, একেবারে আমার মনের মতো করে, আর আমিও বাসর-যাপনে উদগ্রীব থাকি তবে সে-রাতটির চেয়েও অধিক প্রিয় হবে—প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতে ঢাকা কোনো এক রাতে সৈন্যদল নিয়ে শত্রুপক্ষের ওপর আক্রমণের জন্য সকাল পর্যন্ত ওত পেতে থাকা।

নয়
সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুনাইনের যুদ্ধের দিন উম্মু সুলাইম রাযিয়াল্লাহু আনহা হাতে খঞ্জর তুলে নেন। আবু তালহা তাকে দেখে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ হলো উম্মু সুলাইম। সে খঞ্জর হাতে নিয়েছে। উম্মু সুলাইম বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, যদি কোনো মুশরিক আমার নাগালে এসে পড়ে, তাহলে এটা দিয়ে তার পেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেব।

দশ
যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সাদ ইবনু রবীআর খোঁজে পাঠান। তিনি আমাকে বলেন, যদি তুমি তাকে জীবিত পাও, তাহলে আমার পক্ষ থেকে সালাম দিয়ো এবং বলো-আল্লাহর রাসূল তোমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, কেমন আছ?
এরপর আমি শহীদদের মাঝে তাকে খুঁজতে থাকি। একসময় তাকে পেয়েও যাই। তিনি তখন মুমূর্ষু অবস্থায় অন্তিম মুহূর্ত অতিক্রম করছিলেন। তার গায়ে ৭০ টিরও বেশি আঘাত ছিল। আমি তাকে সবকিছু খুলে বলি। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক এবং তোমার ওপরও। তুমি তাকে বলে দিয়ো-ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি জান্নাতের সুঘ্রাণ পাচ্ছি! আর আমার স্বজাতি আনসারদের বলো-তোমাদের দেহে এক ফোঁটা রক্ত থাকতেও যদি রাসূলুল্লাহর গায়ে কোনো আঘাত লাগে তবে কাল কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সম্মুখে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
যায়েদ ইবনু সাবিত বলেন, এ কথা বলে তিনি শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাযিয়াল্লাহু আনহু।

এগারো
যিরার ইবনু আমর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু রাফি' রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার রোমানদের উদ্দেশ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফার নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র সৈন্যদল প্রেরণ করেন। ঘটনাক্রমে রোমান সৈন্যরা আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফাকে তার সাথী-সঙ্গীসহ বন্দি করে ফেলে এবং তাদের বাদশাহর নিকট নিয়ে যায়। তারা আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফার দিকে ইঙ্গিত করে বলে, এই লোকটি মুহাম্মদের সাহাবী ও তার অনুসারী।
রোমের বাদশাহ আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফাকে বলেন, তুমি কি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করবে? যদি করো, তবে তোমাকে আমি আমার অর্ধেক রাজ্যের মালিক বানিয়ে দেব! তিনি বলেন, যদি তুমি আমাকে তোমার মালিকানাধীন সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে দাও এবং আরব-অনারবের যা-কিছু তোমার নয়, তারও মালিক বানিয়ে দাও, তবুও আমি এক মুহূর্তের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্ম ত্যাগ করব না!
বাদশাহ বলেন, তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করব!
আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা বলেন, তোমার যা ইচ্ছে করো!
অতঃপর বাদশাহ তাকে শূলে চড়ানোর আদেশ দেয়; কিন্তু তিরন্দাজদের বলে দেয়, তার শরীরের একদম পাশ ঘেঁষে একটি তির নিক্ষেপ করবে, আর তাকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানাবে। তারা তাই করল; কিন্তু এবারও আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা সম্মত হলেন না। তাকে শূলী থেকে নামানো হলো।
অতঃপর বড় একটি ডেগ আনা হলো। তাতে পানি ঢালা হলো, আর নিচে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে আর প্রচণ্ড তাপে ডেগের পানি টগবট করে ফুটছে! এবার দুজন মুসলিম বন্দিকে আনা হলো। তাদের একজনকে তাতে নিক্ষেপ করা হলো। মুহূর্তেই তার লাশ কঙ্কাল হয়ে ভেসে উঠল। বাদশাহ আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাকে এ দৃশ্য দেখিয়ে বললেন, এবারও কি তুমি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করবে না? তিনি আবারও অস্বীকার করলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি কাঁদতে লাগলেন। বাদশাহকে জানানো হলো যে, তিনি কাঁদছেন। বাদশাহ ভাবলেন, হয়তো এবার তার মন কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তিনি তাকে ডেকে বললেন, কেন কাঁদছ?
তিনি বললেন, জীবন তো মাত্র একটাই। যদি তুমি একবার আমাকে আগুনে ফেলে দাও, তো শেষ! আমার আফসোস হয়, যদি শরীরের পশম পরিমাণ আমার জীবন থাকত! তবে আমি প্রতিটা জীবন আল্লাহর জন্য আগুনে উৎসর্গ করতে পারতাম!
বাদশাহ তাকে বললেন, তুমি কি আমার মাথায় একটা চুমু দিতে পারবে? তাহলে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেব! আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফা বললেন, আর আমার সাথী-সঙ্গী?
: তাদেরকেও মুক্তি দেওয়া হবে।
তারপর তিনি বাদশার মাথায় একটা চুমু দিলেন এবং সকল সৈনিকদের সঙ্গে নিয়ে উমার ইবনুল খাত্তাব-এর নিকট ফিরে এলেন। রোম বাদশাহর সাথে যা যা ঘটেছিল তার পূর্ণ বিবরণ দিলেন। এরপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফার মাথায় চুমু খাওয়া। আর আমিই সেটার সূচনা করছি।' এ বলে তিনি তার মাথায় চুমু দেন।

বারো
আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার এই আয়াতের তিলাওয়াত করেন—
اِنْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا
তোমরা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বের হও।
অতঃপর বলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের যুদ্ধের জন্য আহ্বান করেছেন। আমাদের যুবক, বৃদ্ধ সকলকে যুদ্ধে যাওয়ার আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং, তোমরা আমাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে দাও। তখন তার ছেলেরা বলল, আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। আপনি তো রাসূলের যুগে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থেকে যুদ্ধ করেছেন। আবু বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমার সাথেও যুদ্ধে শরীক হয়েছেন। এখন না হয় আপনার পক্ষ থেকে আমরাই যুদ্ধ করলাম!
বর্ণনাকারী বলেন, এরপরও তিনি সমুদ্রযুদ্ধে শরিক হন এবং সেখানেই শহীদ হন। সাত দিন পর্যন্ত তাকে দাফন করার মতো কোনো দ্বীপ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না; কিন্তু এই সাত দিনে তার দেহে সামান্যতম পচনও ধরেনি!

তেরো
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার মুসলমানদের একটি সৈন্যদল জিহাদে বের হয়। আমি তাদের আমীর ছিলাম। আমরা ইস্কান্দারিয়ায় গিয়ে পৌঁছি। সেখানকার বাদশাহ আমাদের বলেন, তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে পাঠাও; আমি তার সাথে মতবিনিময় করব।
ঠিক করলাম, আমিই যাব। তারপর একজন দোভাষী সঙ্গে নিয়ে বের হলাম। তিনিও একজন দোভাষী নিলেন। আমাদের জন্য দুটি আসন রাখা হলো। আমরা সেখানে উপবিষ্ট হলাম। অতঃপর বাদশাহ বললেন, তোমরা কারা? কী তোমাদের পরিচয়?
আমি বলতে শুরু করলাম—
'আমরা আরব। কাঁটাযুক্ত গাছ ও পাথুরে ভূমির অধিবাসী। আমরা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। একসময় মানুষের জন্য দুনিয়া সঙ্কীর্ণ করে দিতাম। অতিষ্ঠ করে তুলতাম তাদের। মৃত বস্তু ও রক্ত ছিল আমাদের খাবার। সবলেরা দুর্বলের ওপর হামলে পড়ত। এক কথায়, আমরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট পন্থায় জীবন যাপন করতাম।
এরপর আমাদের মধ্য থেকেই এমন এক ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন—যিনি নেতা বা ধনিক-শ্রেণির কেউ ছিলেন না। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর প্রেরিত দূত। তিনি আমাদের এমন সব কাজের আদেশ দেন, যা আমরা কখনও শুনিনি এবং যে-সবে লিপ্ত ছিলাম তা থেকে বারণ করেন। আর অমনি আমরা তার বিরুদ্ধে লেগে গেলাম। তার ওপর মিথ্যারোপ করতে লাগলাম। তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলাম। এসময় অন্য গোত্রের কিছু লোক তার সাথে দেখা করে। তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তারা এই বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, আমরা আপনাকে সর্বাত্মক সাহায্য করব। আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। অতঃপর তিনি হিজরত করে তাদের শহরে চলে যান। তাদের সাথে মিলিত হন। এবার আমরা তার দিকে ধেয়ে আসি। তার সাথে আমাদের যুদ্ধ হয়। তিনি আমাদের ওপর বিজয় লাভ করেন। এরপর তিনি আরব উপদ্বীপের অন্যান্য দেশেও অভিযান চালান। সেখানেও বিজয়ী হন। যদি এখানে অনুপস্থিত আরবরা তোমাদের জীবনাচার সম্পর্কে জানত, তাহলে প্রত্যেকেই তোমাদের কাছে চলে আসত!'
বাদশাহ হেসে বললেন, তোমাদের রাসূল সত্য বলেছেন। আমাদের কাছেও ইতিপূর্বে অনেক রাসূল এসেছেন। আমরা তাদের মতের ওপরই ছিলাম; কিন্তু একসময় আমাদের মাঝে এমন কিছু বাদশাহর আবির্ভাব ঘটে, যারা নবীগণের আদেশ ছেড়ে দেয়। মনগড়া কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যদি তোমরা তোমাদের নবীর আদেশ আঁকড়ে ধরো, মনেপ্রাণে গ্রহণ করো, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাদের কোনোদিন হারাতে পারবে না। আর যদি তোমরা আমাদের মতো আচরণ করো,
নবীর আদেশ ছেড়ে দাও, তো জেনে রেখো, তোমাদের সংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশি নয়! তোমাদের সমরাস্ত্র ও যুদ্ধশক্তি আমাদের চেয়ে অধিক নয়!

চৌদ্দ
আবু আকীল আব্দুর রহমান ইবনু সা'লাবার জীবনীতে উল্লেখ আছে, তিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। জাফর ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আসলাম বলেন-
ইয়ামামার যুদ্ধের ঘটনা। মুসলিমরা যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন, তখন তাদের মধ্যে প্রথম যিনি আহত হন, তিনি হলেন আবু আকীল। শত্রুপক্ষের একটি তির এসে তার বাম কাঁধ ও বুকের মাঝখানে বিঁধে। তিনি তিরটা টেনে বের করে ফেলেন। এই আঘাত যুদ্ধের শুরু লগ্নেই তাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে তাকে ধরাধরি করে তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হয়।
অতঃপর যুদ্ধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে মুসলমানরা পরাজয় বরণ করে। পিছপা হতে হতে নিজেদের তাঁবুগুলোও অতিক্রম করে ফেলে। এ সময় মাআন ইবনু আদী চিৎকার করে বলেন, 'হে আনসারগণ, তোমরা পলায়ন করো না। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহকে ভয় করো। তোমাদের শত্রুদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।'
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আবু আকীল উঠে বসলেন। চিৎকারকারী কী বলছে, তা শোনার চেষ্টা করলেন। আমি তাকে বললাম, যুদ্ধে সাহায্যের জন্য তিনি আনসারদের ডাকছেন। আবু আকীল বললেন, আমি আনসার। আমি তার ডাকে সাড়া দেব, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আবু আকীল নিজেকে শক্ত করে বাঁধলেন। ডানহাতে তরবারি উঠিয়ে নিলেন। এরপর বলতে লাগলেন, ওহে আনসার সাহাবীগণ, হুনাইন যুদ্ধের ন্যায় আরও একবার একত্র হও। আক্রমণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন। মনে রেখো, মুসলমানদের জন্য আল্লাহর সাহায্য আছে। শত্রুদের কোনো সাহায্য নেই।
অতঃপর সকল মুসলিম সৈনিক ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর দুশমনদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটি বাগানের ভেতর তাদের সাথে প্রচণ্ড লড়াই হয়। উভয় পক্ষের তরবারি গর্জে ওঠে।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি আবু আকীলের দিকে তাকালাম। তার আহত হাতটি কাঁধ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। তা জমিনে পড়ে আছে। তাতে মারাত্মক পর্যায়ের প্রায় ১৪টি আঘাত লেগেছে। আর এদিকে আল্লাহর দুশমন শত্রুদের প্রধান মুসাইলামাকে হত্যা করা হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি আবু আকীলের কাছে গেলাম। তিনি তখন জীবনের অন্তিম মুহূর্তে। আমি বললাম, হে আবু আকীল, তিনি খুব ক্ষীণস্বরে বললেন, ভাই, যুদ্ধের কী অবস্থা? বললাম, 'সুসংবাদ! আল্লাহর দুশমন মারা গেছে। মুসলমানদের বিজয় হয়েছে'। এরপর তিনি তার তর্জনী আঙুলি আকাশের দিকে উঁচিয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন এবং শাহাদাত বরণ করলেন। আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করুন।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, মদীনায় আসার পর আমি পুরো ঘটনা উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খুলে বলি। তিনি সব শুনে বলেন, 'আল্লাহ তার ওপর রহম করুন। সে সবসময় শাহাদাতের অপেক্ষায় থাকত। শহীদী মৃত্যুর তামান্না বুকে লালন করত। আমার জানা মতে, সে ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মাঝে সর্বোত্তম! এবং ইসলামের শুরু যুগের মুসলিম। রাযিয়াল্লাহু আনহু।'

পনেরো
ওয়াসিলাহ ইবনুল আসকা রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে উল্লেখ আছে, মুহাম্মাদ ইবনু সাদ বলেন, একবার ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসেন। তার সাথে ফজরের সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীগণের দিকে ফিরে বসেন এবং সবাইকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে ওয়াসিলাহ-এর প্রতি তার দৃষ্টি আটকে যায়। তিনি তাকে সম্বোধন করে বলেন—
: কে তুমি?
ওয়াসিলাহ নিজের পরিচয় দেন।
: কেন এসেছ?
: আমি আপনার হাতে বাইআত হতে চাই।
: যা তুমি পছন্দ করো কিংবা অপছন্দ করো, সব বিষয়েই বাইআত হবে?
: জি হ্যাঁ।
: তোমার সাধ্যের মধ্যে যা আছে, সব মানবে?
: জি হ্যাঁ।
অতঃপর তিনি বাইআত হন এবং ইসলামের সুশীতল ছায়ায় প্রবেশ করেন।
যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাবুক-যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেদিন ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরিবারের নিকট আসেন। তার পিতা আল-আসকার সাথে সাক্ষাৎ করেন। পিতা তাকে জিজ্ঞেস করেন—
: তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?
: জি।
: আল্লাহর কসম! আমি আর কোনোদিন তোমার সাথে কথা বলব না।
অতঃপর তিনি তার চাচার কাছে আসেন। তাকে অভিবাদন জানান। তিনিও তাকে জিজ্ঞেস করেন—
: তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?
: জি।
বর্ণনাকারী বলেন, চাচা তার পিতার চেয়ে কিছুটা হালকা তিরস্কার করে বলেন, কোনো বিষয়ে বড়দের না জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া তোমার জন্য উচিত হয়নি।
ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বোন তাদের কথোপকথন শুনতে পান। তিনি ওয়াসিলাহর কাছে এসে ইসলামী পদ্ধতিতে সালাম পেশ করেন। ওয়াসিলাহ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন-
: মানে কী বোন!
: আমি তোমাদের সব কথাবার্তা শুনেছি। আমিও ইসলাম গ্রহণ করেছি।
: তাহলে তুমি তোমার ভাইকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে দাও। নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সফরে আছেন।
বোন তার ভাইকে প্রস্তুত করে দেন এবং তিনি রাসূলের সাথে এসে মিলিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতোমধ্যে রওয়ানা হয়ে গেছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারাও ধীরে-সুস্থে বেরিয়ে পড়ছেন।
বনু কাইনুকার বাজারে গিয়ে ওয়াসিলাহ হাঁক ছাড়েন, আমি তাবুকে যেতে চাই; কিন্তু আমার কোনো বাহন নেই। অতএব, যে আমাকে বাহন দেবে, আমার যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তার।
ওয়াসিলাহ বলেন, কাব ইবনু উযরাহ আমার ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, আমি তোমাকে রাত ও দিনের নির্দিষ্ট একাংশে সওয়ারে ওঠাব। অপরাংশে আমি। পালা হবে বরাবর। তবে বিনিময়ে তোমার যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আমার। আমি বললাম, আমি রাজী।
ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিক। তিনি আমাকে বাহনে চড়িয়েছেন। তার সাথে রেখে আমাকে খাইয়েছেন। আমার জন্য কষ্ট সয়েছেন। একপর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে আকয়াদির ইবনু আব্দিল মালিকের বিরুদ্ধে 'দাউমাতুল জান্দাল' -এ একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। আমি ও কাব তাতে শরীক ছিলাম। সেখানে আমাদের বেশকিছু গনীমত হস্তগত হয়। খালিদ তা আমাদের মাঝে বণ্টন করে দেন। আমার ভাগে ছয়টি শক্তিশালী উটনী পড়ে। আমি সেগুলো নিয়ে কাব ইবনু উযরাহ-র তাঁবুর নিকট গিয়ে বলি, ভাই, বেরিয়ে আসুন। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। দেখুন, আপনার উটনীগুলো। নিজ হিফাযতে নিয়ে নেন।
তিনি বেরিয়ে এসে এসব দেখে মুচকি হেসে বলেন, আল্লাহ তোমার এসবে বরকত দিন। আমি তোমাকে এই কারণে বাহন দিইনি যে, তোমার থেকে কিছু নেব।

ষোলো
আব্দুল্লাহ ইবনু কায়স থেকে বর্ণিত, আবু উমাইয়‍্যা আল-গিফারী বলেন, আমরা কোনো এক যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছিলাম, হঠাৎ শত্রুবাহিনী এসে উপস্থিত হয়। মুজাহিদদের সতর্ক করা হলে তারা দ্রুততার সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। এমন সময় আমি লক্ষ্য করি, আমার সামনে একলোক দাঁড়ানো। আমার ঘোড়ার সম্মুখভাগ তার ঘোড়ার ঠিক লেজ বরাবর। লোকটি নিজেকে নিজে সম্বোধন করে বলছে, হে আত্মা, তুমি কি অমুক অমুক যুদ্ধে উপস্থিত হওনি? তখন কি তুমি আমাকে বলোনি, তোমার পরিবার ও ছেলে-মেয়ে রয়েছে। ফলে তোমার কথা শুনে আমি ফিরে গিয়েছিলাম? আল্লাহর শপথ! আজ তোমাকে আমি আমার আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করব। আল্লাহ তাআলা হয় তোমাকে কবুল করবেন; নয়তো ছুড়ে ফেলবেন।
তখন আমি মনে মনে বলি, আজ আমি তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করব! তাই আমি যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। মুজাহিদগণ শত্রুদলের ওপর আক্রমণ করল। সে ছিল মুজাহিদদের প্রথম কাতারে-একেবারে সম্মুখভাগে। তারপর শত্রুরা মুজাহিদদের ওপর পাল্টা আক্রমণ করলে তারা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে; কিন্তু সে ছত্রভঙ্গ সৈন্যদের রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মুজাহিদরা আবার শত্রুদের ওপর জোরদার হামলা করল। তখনও সে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। তারপর শত্রুরা আবার মুজাহিদদের ওপর আক্রমণ করলে তারা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আর সে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে থাকে। আবু উমাইয়‍্যাহ আল-গিফারী বলেন-
আল্লাহর শপথ! আমি দেখেছি যে, সে প্রথম সারিতে থেকে আক্রমণ করছে আর মুজাহিদরা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হলে পশ্চাতে থেকে তাদের রক্ষা করছে। এভাবেই চলতে থাকে। অবশেষে সে শহীদ হয়ে লুটিয়ে পড়ে! আমি গুনে দেখি, তার দেহে ও ঘোড়ার পিঠে ষাট বা তার চেয়েও বেশি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

সতেরো
আলা ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি সালাহ রাহিমাহুল্লাহকে বলেন, হে আবুস সাহবা, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমাকে একটা মৌচাক দেওয়া হয়েছে, আর তোমাকে দেওয়া হয়েছে দুইটা। তিনি বলেন, হ্যাঁ। কারণ, আমি ও আমার ছেলে উভয়ে শহীদ হবো।
অতঃপর ইয়াযীদ ইবনু যিয়াদের নেতৃত্বে তুর্কিদের বিরুদ্ধে সিজিস্তানে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাতে সালাহ ও তার ছেলে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে মুজাহিদ বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সালাহ তার ছেলেকে বলেন, আমার পুত্র, তুমি তোমার মায়ের কাছে ফিরে যাও। ছেলে বলে, আব্বা, আপনি সৌভাগ্য অর্জনে ছুটছেন, আর আমাকে বলছেন ফিরে যেতে! এ কখনও হতে পারে না। এবার তিনি পুত্রকে বলেন, ঠিক আছে, তুমি শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে যাও। সে এগিয়ে যায় এবং লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যায়। সালাহ রাহিমাহুল্লাহ তার দেহটা তুলে শত্রুদের দিকে জোরে নিক্ষেপ করেন। এতে তারা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তিনি সামনে এগিয়ে যান। এরপর দাঁড়িয়ে দুআ করেন এবং লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।

আঠারো
আসমায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি কুতাইবা ইবনু মুসলিমের নেতৃত্বে তুর্কিদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কুতাইবাহ ইবনু মুসলিম যোদ্ধাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান; কিন্তু তুর্কিরা ছিল অধিক শক্তিশালী। ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসিকে খুঁজতে থাকেন। একজন বলে, তিনি ওই যে উত্তর দিকে একটি ধনুকে ভর দিয়ে বসে আছেন, আর আসমানের দিকে তাকিয়ে আঙুল নাড়ছেন। কুতাইবা ইবনু মুসলিম বলেন—আল্লাহর শপথ! তার ওই আঙুল নাড়ানো আমার কাছে হাজার হাজার দুর্ধর্ষ যুবক যোদ্ধার তরবারি চালানোর চেয়ে অধিক প্রিয়।

উনিশ
হাইওয়াহ আল-মিসরী রাহিমাহুল্লাহ একবার মিসরের কোনো এক প্রতিনিধিকে বলেছিলেন, 'জনাব, আমাদের ভূমি কখনও সামরিক শক্তি থেকে মুক্ত করবেন না। কারণ, আমরা কিবতীদের মাঝে বাস করি, জানি না, কখন তারা চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলে। আমরা হাবশীদের সাথে থাকি, জানা নেই, কখন তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করে বসে। রোমানদের নিকটেই বসবাস করি, জানা নেই, কখন তারা আমাদের সীমানায় ঢুকে পড়ে। জানি না, কখন বর্বর জাতি বিদ্রোহ করে বসে। তাই আমরা সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকি!'

বিশ
হাতিম আল-আসাম্ম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জিহাদের ময়দানে একবার আমরা শাকীক রাহিমাহুল্লাহ-সহ আরও অনেকের সাথে তুর্কি শত্রুদের মুখোমুখি হয়েছিলাম। সেদিন চোখের সামনে কত মস্তক ভূপাতিত হয়েছে, কত তলোয়ার মানুষকে কচুকাটা করেছে এবং কত বর্শা দেহকে ঝাঁঝরা করেছে—তার কোনো ইয়ত্তা নেই। শাকীক রাহিমাহুল্লাহ সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে আমাকে বলেন—
তোমার কেমন লাগছে? বাসররাত কি এমন কেটেছে তোমার? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! কখনও নয়। তিনি বললেন, কিন্তু আমার কাছে এই পরিবেশ বাসর-রজনী বলেই মনে হচ্ছে!
কিছুক্ষণ পরই তিনি দুই সারির মাঝখানে শত্রুদের সামনে নিজের ঢালকে বালিশ বানিয়ে তাতে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের ঘোরে তিনি নাক ডাকতে থাকেন! এসময় এক তুর্কি এসে আমাকে ঘায়েল করে ফেলে। সে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হয়। তার বেল্টের মাঝে সে খঞ্জর তালাশ করছিল। এসময় হঠাৎ কোথা থেকে যেন এক অজ্ঞাত তির এসে তার গলায় বিদ্ধ হয়। আর মুহূর্তেই সে প্রাণ হারায়।

একুশ
আবু বকর আন নাবুলুসীর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন—আবু যর আল-হাফিয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উবাইদিয়্যারা। আবু বকর আন নাবুলুসীকে বন্দি করে। অতঃপর তাদের স্বভাব অনুযায়ী তারা তাকে শূলীতে চড়ায়। আমি ইমাম দারাকুতনীকে দেখেছি, এই ঘটনা স্মরণ হলে তিনি খুব কাঁদতেন আর বলতেন, যখন তার দেহ থেকে চামড়া আলাদা করা হচ্ছিল, তিনি তখন পড়ছিলেন—
كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُورًا
এটা তো কিতাবে লিখিত আছে।২।
আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মিশরের অধিপতি আবু তামীমের কমান্ডার জাওহার আবু বকর আন নাবুলুসীকে বন্দি করে নিয়ে আসে। তাকে বিভিন্ন তাঁবুতে রাখা হতো। আবু তামীম তাকে জিজ্ঞেস করে, শুনলাম তুমি নাকি বলে থাকো, যার কাছে দশটি তির আছে, সে যেন একটি তির রোমের দিকে নিক্ষেপ করে। আর বাকি নয়টি তির যেন সে আমাদের দিকেই নিক্ষেপ করে! তিনি বলেন, 'না, আমি এমনটি বলিনি; আমি বলেছি-যার কাছে দশটি তির আছে, সে যেন নয়টিই তোমাদের দিকে ছোড়ে। যদি পারে, তবে দশম তিরটিও যেন তোমাদের দিকেই নিক্ষেপ করে। কারণ, তোমরা ধর্ম বিকৃত করেছ। সৎ লোকদের হত্যা করেছ এবং নিজেদের উপাস্যের নূর বলে দাবি করেছ।'
এবার আবু তামীম খাপ থেকে তরবারি বের করে এবং তাকে হত্যা করে। অতঃপর এক ইহুদীকে নির্দেশ দেয় যেন তার দেহ থেকে চামড়া আলাদা করে ফেলে!

বাইশ
নূরুদ্দীন মাহমুদ জঙ্গী রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন-'নূরুদ্দীন জঙ্গী সম্পর্কে সাবত আল-জাওজীর বর্ণনায় মাজদুদ্দীন ইবনুল আসীর মন্তব্য করেন, সাবত আল-জাওজীর মতে, নূরুদ্দীন মাহমুদ জঙ্গী রেশম ও স্বর্ণ ব্যবহার করতেন না এবং দেশে তিনি মদ বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছিলেন; কিন্তু আমি বলি—তিনি রাজকীয় পোশাক পরিধান করতেন এবং স্বর্ণের ফিতাও ব্যবহার করতেন।'
ইবনুল আসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি অধিক পরিমাণে সিয়াম পালন করতেন। এছাড়াও রাত-দিনে তার বিশেষ কিছু আমল ছিল। তবে তিনি পোলো খেলা খুব পছন্দ করতেন। একবার এক খোদাভীরু ফকীর তার এই খেলাধুলার নিন্দা করলে তিনি তার কাছে লিখে পাঠান—
‘আল্লাহর শপথ! আমাদের উদ্দেশ্য খেলাধুলা নয়; বরং সীমান্ত রক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কারণ, এ খেলায় প্রচুর আওয়াজ হয়, আর তাতে ঘোড়াগুলো আক্রমণ ও দ্রুত প্রস্থানে অভ্যস্ত হয়।'
তাকে একটি মিসরীয় স্বর্ণের পাগড়ি উপহার দেওয়া হয়। তিনি সেটা সুফী ইবনু হামাওয়াইকে দিয়ে দেন। পরে সেটা এক হাজার দিনারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

তেইশ
নূরুদ্দীন মাহমুদ জঙ্গী সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার কুতুব নিশাপুরী তাকে বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি যুদ্ধে গিয়ে নিজেকে বিপদে ফেলবেন না। যদি যুদ্ধের ময়দানে আপনার কিছু হয়ে যায়, তবে মুসলমানদের পক্ষে তরবারি ধরার মতো আর কেউ থাকবে না! উত্তরে তিনি বললেন, কে এই মাহমুদ? আল্লাহ তাআলাই আমার পূর্বে দেশকে হেফাযত করেছেন। আর তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।

চব্বিশ
আব্দুর রহমান ইবনু মাগরা আদ-দাওসী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বনু কুযাআর এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন—
কাদেসিয়ার যুদ্ধে যখন সৈন্যবাহিনী জড়ো হয় তখন খানসা বিনতু আমর আন-নাখইয়‍্যাহ নিজের চার পুত্রকে ডেকে বলেন, আমার পুত্রগণ, তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছ। অতঃপর হিজরত করেছ। আল্লাহর শপথ! না তোমাদের দেশ তোমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে; আর না দুর্ভিক্ষের আঘাতে তোমরা পর্যুদস্ত হয়েছ। এমনকি লোভ-লালসাও তোমাদের কুপোকাত করতে পারেনি।
আল্লাহর শপথ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই-নিশ্চয়ই তোমরা এক পিতা ও এক মায়ের সন্তান। জেনে রাখো, মা হিসেবে আমি কখনও তোমাদের পিতার খিয়ানত করিনি এবং তোমাদের মামাদের কলঙ্কিত করিনি! তোমাদের বংশ পরিচয় বিকৃত করিনি, তোমাদের হক পদদলিত করিনি এবং তোমাদের অধিকারে কাউকে হস্তক্ষেপের বৈধতাও দিইনি!
আমার দাবী, আগামীকাল যখন প্রভাত প্রস্ফুটিত হবে, সবাই আল্লাহ তাআলার নিকট বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও সাহায্য প্রার্থনা করবে। খুব ভোরে ময়দানে নেমে পড়বে, ইন শা আল্লাহ। যখন দেখবে, লড়াইয়ের ময়দান উনুনের পানির মতো টগবগ করছে, তখন তোমরা নির্ভয়ে সেই উনুনে ঝাঁপিয়ে পড়বে! বীরের বেশে গোটা শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ-যুদ্ধ' খেলায় মেতে উঠবে। তবেই তোমরা গনীমত, নিরাপত্তা, সফলতা এবং শাশ্বত ও চিরস্থায়ী আবাসন লাভে ধন্য হবে।
অতঃপর সন্তানরা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়। তারা ছিল মায়ের নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল। মায়ের নসীহত ও উপদেশ সম্পর্কে সম্যক অবগত।

টিকাঃ
১. সুহাইব-এর উপনাম।
২. সূরা বাকারা, আয়াত : ২০৭
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/৩২; তবাকাতে ইবনু সাদ : ৩/১৭১; মুসতাদরাক লিল-হাকিম : ৩/৩৯৭
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৪২২
৫. উপনাম আবু আব্দিল্লাহ।
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৬৮
২. সূরা নিসা, আয়াত: ৯৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৬৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৪৯৮
২. প্রায় পাঁচ বা ছয় হাজার স্বর্ণমুদ্রা
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২৯০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৮১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৭৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩০৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩১৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/১৪
২. সূরা তাওবা, আয়াত: ৪২
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩৪
১. মদীনার
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৭০-৭১
১. বাগানটির নাম, হাদীকাতুল মাওত।
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৬৬-৪৬৭
১. তাবাকাতুল কুবরা লি-ইবনু সাদ: ১/২৩২
১. এটি একটি জায়গার নাম। যা ইরাক থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথে পড়ে।
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৬৭৪-৬৭৬
২. আবু উমাইয়্যা আল-গিফারী
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/৪২১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৪৯৯
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১২১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৪০৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/৩১৪
১. শিয়াদের একটি শাখা
২. সূরা ইসরা, আয়াত: ৫৮
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৬/১৪৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৫৩৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৫৩৫

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 বিপদে সালাফগণের ধৈর্যধারণ

📄 বিপদে সালাফগণের ধৈর্যধারণ


এক
শাহার ইবনু হাওশাবের সূত্রে ইমাম আ'মাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনু উমাইরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুকালে আমি তার পাশে বসা ছিলাম। তিনি একটু পর পর বেহুঁশ হয়ে পড়ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বললেন, হে আল্লাহ, তুমি আমার জীবন নিয়ে নাও। তোমার ইজ্জতের শপথ! নিশ্চয় আমি তোমাকে ভালোবাসি।

দুই
মুবাররিদ থেকে বর্ণিত, একদা হাসান ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হলো, আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন—আমার নিকট ধনাঢ্যতার চেয়ে দারিদ্র্য অধিক প্রিয়। সুস্থতার চেয়ে অসুস্থতা অধিক প্রিয়।
উত্তরে হাসান ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ তাআলা তার ওপর রহম করুন। তবে আমি বলি, যে-ব্যক্তি আল্লাহর সিদ্ধান্তে কল্যাণের আশা রাখে, তার ব্যক্তিগত কোনো চাহিদা থাকে না। আর এটাই আল্লাহর যাবতীয় সিদ্ধান্তে বান্দার সন্তুষ্টির পরিচায়ক।

তিন
ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত, ঈসা আলাইহিস সালাম তার অনুসারীদের বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে যে-ব্যক্তি বিপদে খুব বেশি ভেঙে পড়ে, দুনিয়ার প্রতি তার মোহ সবচেয়ে বেশি!

চার
ইমাম শাবী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, শূরাইহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি বিপদে আক্রান্ত হলে চারবার 'আলহামদু লিল্লাহ' বলি।
■ প্রথমবার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, বিপদটা এর চেয়ে বড়ও হতে পারত!
■ দ্বিতীয়বার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, আল্লাহ আমাকে ধৈর্য ধরার তাওফীক দিয়েছেন।
■ তৃতীয়বার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, বিপদের সময়— 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন'-পড়ার মহিমান্বিত সুযোগ পাই।
■ চতুর্থবার আলহামদু লিল্লাহ বলি এ কারণে যে, বিপদটা দ্বীনী কোনো বিষয়ে না হয়ে দুনিয়াবী বিষয়ে হওয়ায়।

পাঁচ
গাসসান ইবনু মুফাযযাল আল-গালাবী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমাদের কেউ একজন বলেন, একদা ইউনুস ইবনু উবাইদ-এর কাছে এক ভদ্রলোক আসে। নিজের অভাব-অনটন ও দুঃখ-দুর্দশার কথা তার সামনে তুলে ধরে। উত্তরে ইউনুস ইবনু উবাইদ বলেন, তোমার একটা চোখ কি এক লক্ষ দিরহামে বিক্রি করবে?
: না।
: তোমার কান?
: না!
: তোমার জিহ্বা?
: না।
: তোমার মস্তিষ্ক?
: না।
-এভাবে তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিয়ামতগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন। এরপর বলেন, আমি তো দেখছি, তুমি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক, অথচ তুমি নিজের অভাবের কথা বলে বেড়াচ্ছ?

ছয়
আশআস ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম ইবনু আউন বলেন, বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর যাবতীয় সিদ্ধান্তে পূর্ণ সন্তুষ্ট বলে বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ না সে চরম দুঃসময়েও আল্লাহর প্রতি সুসময়ের ন্যায় সন্তুষ্ট থাকতে পারবে।
তোমার অবস্থা তো এতটাই স্পর্শকাতর যে, মহান আল্লাহর কোনো ফায়সালা তোমার মনঃপুত না হলে, সহসাই তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়! এরপরও কীভাবে তুমি নিজের বিষয়ে তার কাছে সমাধান কামনা করো? এমনও তো হতে পারত, তোমার চাহিদা মাফিক ফায়সালা হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে! কিংবা অন্তত ক্ষতিগ্রস্ত হতে!
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও তোমার চাহিদা মাফিক ফায়সালা হলে তুমি সন্তুষ্ট হও! এটা কী ধরনের ইনসাফ? সত্যি তুমি নিজের ওপরই ইনসাফ করোনি। তুমি এখনও আল্লাহর যাবতীয় সিদ্ধান্তে পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারোনি।
আহমাদ ইবনু আসিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যুহাইর ইবনু নুআইম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ধৈর্য ও ভরসা ব্যতীত ঈমান পূর্ণ হয় না।’
যদি কারও মধ্যে ভরসা থাকে; আর ধৈর্য না থাকে তবে তার ঈমান পূর্ণ হবে না। অনুরূপ যদি কারও মধ্যে ধৈর্য থাকে; আর ভরসা না থাকে, তাহলেও তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে না। আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু এর একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই দুইটির উদাহরণ হলো জমিতে হালচাষের জন্য জোয়ালে বাঁধা দুটি বলদের মতো—যাদের একটি কোনো কারণে থেমে গেলে অপরটি আপনা আপনিই থেমে যায়।

উসমান ইবনুল হাইসাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বসরায় সাদ গোত্রের এক লোক বাস করতেন। তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদের সভাসদ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। একবার ছাদ থেকে পড়ে তার পা ভেঙে যায়। আবু কিলাবা তাকে দেখতে আসেন। অতঃপর সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, আমি আশা করি, এটা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে।
তিনি বললেন, ভাঙা পায়ে আবার কীসের কল্যাণ, আবু কিলাবা!
আবু কিলাবা বললেন, গোপন বিষয়ে আল্লাহই অধিক অবগত।
তিন দিন পর তার কাছে উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদের একটি পত্র আসে। তাতে এই মর্মে নির্দেশ দেওয়া হয় যে—
‘এক্ষুণি সবাইকে আল্লাহর রাসূলের দৌহিত্র—হুসাইন ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে।’
তিনি দূতকে বলেন, তুমি তো আমার অবস্থা দেখতেই পাচ্ছ। উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদকে আমার দুরবস্থার কথা বলো। এরপর সাত দিন যেতে-না-যেতেই হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর শহীদ হওয়ার সংবাদ আসে। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ আবু কিলাবার ওপর রহম করুন! তিনি সত্যই বলেছেন। পা ভাঙাটাই আমার জন্য কল্যাণকর ছিল!

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৪৬০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৬২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫৫১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৫০১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/২৯২
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩১১
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/৮
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৩৮

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 দ্বীনী-দুর্যোগ মোকাবেলায় সালাফগণের ভূমিকা

📄 দ্বীনী-দুর্যোগ মোকাবেলায় সালাফগণের ভূমিকা


এক
আবু উবাইদা ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আম্মার ইবনি ইয়াসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার মুশরিকরা আম্মার রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আটক করে। তারা তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিন্দা করতে এবং তাদের উপাস্যগুলোর প্রশংসা করতে বাধ্য করে। এই ঘটনার পরে আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হলে, আল্লাহর রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে তোমার? এমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?
উত্তরে তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অবস্থা খুবই খারাপ! অতঃপর তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন এবং এটাও বলেন যে, আপনার সমালোচনা এবং তাদের উপাস্যকুলের প্রশংসা না করলে তারা আমাকে কিছুতেই মুক্তি দিত না।
ঘটনা শোনার পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে চান, যখন তুমি আমার সমালোচনা করছিলে এবং তাদের উপাস্যদের প্রশংসা করছিলে, তখন তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন ছিল?
তিনি বলেন, আমার অন্তর তখন তাওহীদের বিশ্বাসে পরিপূর্ণ ছিল।
এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা যদি পুনরায় তোমাকে এভাবে বাধ্য করে তবে তুমিই তাদের সঙ্গে একই আচরণ করতে পারবে।

দুই
ইউনুস ইবনু জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সফরের বিদায় জানাচ্ছিলাম। সে মুহূর্তে আমি তাকে বললাম, আমাদের কিছু নসীহত করুন। তিনি বললেন-
আমি প্রথমে আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে তোমাদের অসিয়ত করছি এবং অসিয়ত করছি কুরআনের ব্যাপারে। নিশ্চয় কুরআন আঁধার রাতের আলো। দিনের আলোয় পথপ্রদর্শক। সুতরাং, তোমরা কষ্ট-সাধনা করে হলেও কুরআনের ওপর আমল করো। যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হও, তাহলে তার মোকাবেলায় আগে সম্পদ পেশ করো, দ্বীন নয়। যদি বিপদ এর চেয়েও বড় হয়, তাহলে তোমার জান-মাল পেশ করো, তবুও তোমার দ্বীন নয়। নিশ্চয়ই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে, যার দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই প্রকৃত নিঃস্ব সে, যে তার দ্বীন খুঁইয়ে বসেছে। জেনে রেখো, জান্নাতে কোনো অভাব থাকবে না! আর জাহান্নামে কোনো সচ্ছলতা থাকবে না।

তিন
একদা আবু বকর ইবনুল আইয়্যাশ রাহিমাহুল্লাহ হাসান ইবনুল হাসান রাহিমাহুল্লাহকে বলেন, আর কতকাল ফিতনায় ডুবে থাকবেন?
হাসান ইবনুল হাসান জানতে চান-আমি কোন ফিতনায় জড়িয়ে পড়েছি বলে মনে করছেন?
তিনি বলেন, আমি দেখলাম, লোকেরা আপনার হাতে চুমু দিচ্ছে! অথচ আপনি তাদের বাধা দিচ্ছেন না।

চার
আব্দুল্লাহ ইবনু কাসীর দিমাশকী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনি জাবির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা রজা ইবনু হাইওয়াহর নিকটে অবস্থান করছিলাম। তিনি নিয়ামতের শুকরিয়া সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। একপর্যায়ে বললেন, এমন কেউ নেই, যে নিয়ামতের পূর্ণ শুকরিয়া আদায় করতে পারে।
আমাদের পেছনে মাথায় পট্টি বাঁধা এক লোক বসা ছিল। সে বলল, আমীরুল মুমিনীনও নয়? (রজা ইবনু হাইওয়াহ কিছু বলেননি) আমরা বললাম, এখানে আলাদাভাবে আমীরুল মুমিনীনের প্রসঙ্গ আসছে কেন? তিনি তো সাধারণ একজন মানুষই!
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা ওই বিষয়টি এড়িয়ে গেলাম। একটুপর রজা ইবনু হাইওয়াহ আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন, লোকটি নেই। তিনি বুঝতে পারেন, লোকটি আজ নির্ঘাত বিপত্তি সৃষ্টি করবে। তাই তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, মাথায় পট্টি বাঁধা লোকটির কারণে তোমাদের রাজদরবারে ডাকা হবে। যদি তোমাদের ডাকা হয়, কসম করতে বলা হয়, তাহলে তোমরা কসম করে ফেলবে।
বর্ণনাকারী বলেন, একটু পরেই দেখি এক রাজসৈনিক উপস্থিত। সৈনিক রজা ইবনু হাইওয়াহকে নিয়ে রাজদরবারে উপস্থিত হয়। তিনি আমীরুল মুমিনীনের দিকে এগিয়ে যান। আমীরুল মুমিনীন রাগতস্বরে জিজ্ঞেস করেন, হে রজা, আপনার সামনে আমীরুল মুমিনীনের আলোচনা করা হয়েছিল। আপনি নাকি তার পক্ষে কথা বলেননি?
রজা ইবনু হাইওয়াহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন বিষয়ে আমীরুল মুমিনীন?
তিনি বললেন, আপনারা নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বলছিলেন, কেউ নাকি নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করছে না। আপনাদের তখন আমীরুল মুমিনীনের কথা বলা হয়েছিল। আপনি বলেছিলেন, তিনি তো একজন সাধারণ মানুষই!
: আমীরুল মুমিনীন, এটা অসম্ভব! এমনটা আমি বলিনি। (স্মর্তব্য, রজা ইবনু হাইওয়াহ কথাটি বলেননি, বলেছে অন্যরা)
: আল্লাহর কসম?
: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম!
তিনি বলেন, এরপর বাদশাহ ওই মামলা দায়ের করা লোকটার পিঠে ৭০টা চাবুক মারার আদেশ দেন। আমি যখন প্রাসাদ থেকে বের হচ্ছিলাম, তখন সে চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত। আমাকে দেখে সে বলে ওঠে, জনাব, আপনিই তো শাইখ রজা ইবনু হাইওয়াহ! আপনি কী করে আমাকে ফাঁদে ফেললেন? আমি বললাম, কোনো মুমিনের রক্তপাতের চেয়ে তোর পিঠে সত্তর ঘা চাবুক পড়াই উত্তম।
ইবনু জাবির বলেন, এরপর রজা ইবনু হাইওয়াহ কোনো মজলিসে বসলে আশপাশে তাকাতেন। বলতেন, তোমরা মাথায় পট্টি বাঁধা লোক থেকে দূরে থাকো।

পাঁচ
হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি ইমাম আহমাদ ও ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীনকে নিয়ে আফফান-এর নিকট উপস্থিত হই। আমরা যাওয়ার আগের দিন আমীর ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আফফানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠান। প্রথম যাকে 'খলকে কুরআন' সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তিনি হলেন আফফান। যাই হোক, ইমাম আহমাদ-সহ আমরা সকলে সেখানে উপস্থিত হলে ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীন আফফানকে বলেন, ইসহাক আপনাকে ডেকে কী জিজ্ঞেস করেছিল? আমাদের বিস্তারিত বলুন!
তিনি বলেন, শুনুন, আবু জাকারিয়া, আমি আপনার ও আপনার সাথীদের কলঙ্কিত করিনি। কারণ, আমি তার প্রশ্নের কোনো জবাবই দিইনি।
: কীভাবে কী? খুলে বলুন!
: তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। এরপর আমার সামনে আরব উপদ্বীপ থেকে প্রেরিত খলীফা মামুনুর রশীদের চিঠি পড়ে শোনান। সেখানে লেখা ছিল, আফফানকে জিজ্ঞাসাবাদ করো। তাকে বলো যে, কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট? যদি তার কথা আমার মতের সাথে মিলে যায়, তাহলে তো ভালো। আর যদি সে কোনো উত্তর না দেয়, তাহলে তার ওপর যে-ভাতা চালু আছে সেটা বন্ধ করে দাও।'
চিঠি পড়া শেষ হলে, ইসহাক আমাকে বললেন, আপনার বক্তব্য কী? আমি সূরা ইখলাস শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলাম। এরপর বললাম, আপনার কী মনে হয় এটা সৃষ্ট বা মাখলুক?
তিনি বললেন, হে শাইখ, আমিরুল মুমিনীন বলেছেন, যদি আপনি তার মতের পক্ষে সাড়া না দেন, তবে যেন আপনার জন্য বরাদ্দকৃত ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আমি বললাম, (আল্লাহর বাণী) وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ
আকাশে রয়েছে তোমাদের রিস্ক ও প্রতিশ্রুত সবকিছু।
তিনি চুপ হয়ে গেলেন। এরপর আমি ফিরে এলাম।
এই ঘটনা শুনে ইমাম আহমাদ ও ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীন অত্যন্ত আনন্দিত হন।

ছয়
মুহাম্মাদ ইবনু সূওয়াইদ আত-তহ্হান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমরা আসিম ইবনু আলীর নিকটে অবস্থান করছিলাম। আবু উবাইদ, ইবরাহীম ইবনু আবিল লাইস-সহ আরও অনেকেই আমাদের সাথে উপস্থিত ছিলেন। তখন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালকে জেলখানায় প্রহার করা হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আসেম ইবনু আলী ইমাম আহমাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলে ওঠেন, কেউ কি আমার সঙ্গে গিয়ে এই লোকটাকে 'খলকে কুরআন'-এর বিষয়টি বুঝিয়ে বলবে?
বর্ণনাকারী বলেন, তার আহ্বানে কেউ সাড়া দেয় না। তখন ইবনু আবিল লাইস বলেন, হে আবুল হুসাইন, আমি আমার মেয়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কিছু অসিয়ত করতে চাই। তার কথা থেকে আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে, তিনি গায়ে কাফনের কাপড় জড়িয়ে মৃতের সুগন্ধি মেখে আসবেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি এসে বলতে লাগলেন, আমি তাদের কাছে গিয়েছিলাম। তারা সকলেই কান্নাকাটি করছে।
বর্ণনাকারী বলেন, এসময় ওয়াসিত থেকে আসিমের দুই কন্যার চিঠি আসে। তাতে লেখা ছিল-
আব্বাজান, আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, এই লোকটাই। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালকে ধরিয়ে দিয়েছে। তাকে প্রহার করেছে। কারণ, তিনি 'কুরআন মাখলুক' হওয়াকে স্বীকার করেন না। সুতরাং, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। না জেনে তার পক্ষ নেবেন না। তার ডাকে সাড়া দেবেন না। আল্লাহর কসম! তার ডাকে সাড়াদানের চেয়ে আমাদের নিকট আপনার মৃত্যু-সংবাদ অধিক প্রিয়।

সাত
আবু জাফর আল-আমবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালকে খলীফা মামুনুর রশীদের নিকট নিয়ে যাওয়ার সংবাদ শুনেই আমি ফোরাত নদী পার হয়ে তার কাছে পৌঁছি। তিনি তখন একটি মুসাফিরখানায় অবস্থান করছিলেন। আমি তাকে সালাম দিলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আবু জাফর, অনেক কষ্ট করে এলে!
আমি বললাম, শাইখ, বর্তমানে আপনি একজন অনুসৃত ব্যক্তিত্ব। মানুষ আপনার অনুসরণ করে। আপনাকে মানে। আল্লাহর শপথ! যদি আপনি খলীফা মামুনুর রশীদের পক্ষাবলম্বন করতেন এবং কুরআন মাখলুক হওয়ার পক্ষে মত দিতেন, তাহলে মানুষও তাই বিশ্বাস করত। এখন যেহেতু আপনি তাতে মত দেননি, তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সেহেতু অনেক মানুষ কুরআন মাখলুক হওয়াকে অস্বীকার করছে। খলীফা যদি আপনাকে হত্যা নাও করে, তবুও আপনি একদিন মারা যাবেন। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং, আল্লাহকে ভয় করুন। মৃত্যুর ভয়ে সত্য ত্যাগ করবেন না। খলীফার আহ্বানে সাড়া দেবেন না।
ইমাম আহমাদ কথাগুলো শুনে কাঁদতে থাকেন এবং বলেন, মা শা আল্লাহ! আবু জাফর, কথাগুলো আবারও বলো। আমি পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি আবারও বললেন, মা শা আল্লাহ!

আট
সালিহ ইবনু আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার আব্বাজান এবং মুহাম্মাদ ইবনু নূহকে বাগদাদ থেকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা তাদের পেছনে পেছনে আম্বার পর্যন্ত আসি। তখন আবু বকর আল-আহওয়াল আব্বাজানকে জিজ্ঞেস করেন, আবু আব্দিল্লাহ, যদি তারা আপনার ঘাড়ে তরবারি রাখে, তবে কি আপনি তাদের এই দাবি মেনে নেবেন যে, কুরআন মাখলুক? তিনি জবাবে বলেন, না।
প্রশ্নোত্তর শেষ হতেই তাদের সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপরের ঘটনা সম্পর্কে আব্বাকে বলতে শুনেছি-
একসময় আমরা বাগদাদ এবং রাক্কার মাঝামাঝি উন্মুক্ত প্রান্তরে গিয়ে পৌঁছাই। সেখান থেকে মাঝরাতে আমাদের সফর শুরু হয়। এসময় জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের মাঝে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল কে? আব্বাজানের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়-এই ব্যক্তি।
আব্বাজানের পরিচয় পেয়েই লোকটি চালককে উটের গতি কমাতে বলে। এরপর আব্বাজানকে উদ্দেশ্য করে বলে, শাইখ, এ ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ আছে যে, কুরআন মাখলুক না-হওয়ার মতাদর্শ পোষণের কারণে যদি আপনাকে হত্যা করা হয়, তবে আপনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন? অতঃপর আগন্তুক-আপনাকে আল্লাহর নিকট আমানত রাখছি-বলে চলে যায়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আগন্তুক কে?
আমাকে বলা হলো, সে আরবের রবীআ গোত্রের লোক। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে পশমের কাজ করে। মানুষ তাকে জাবির ইবনু আমীর নামে ডাকে এবং তাকে খুবই ভালো জানে।

নয়
ইবরাহীম ইবনু আব্দিল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন মাখলুক' সংক্রান্ত ফিতনার পর থেকে আজ অবধি তওক নামক খোলা ময়দানে এক গ্রাম্য-ব্যক্তির কথার চেয়ে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ কথা আর শুনিনি। সে বলেছিল-
'হে আহমাদ, যদি সত্যের পক্ষ নেওয়ায় আপনাকে হত্যা করা হয় তবে তো আপনি শহীদ। আর যদি প্রাণে বেঁচে যান, তবে সম্মানজনক জীবনের অধিকারী। সুতরাং, আপনি আপনার অন্তর দৃঢ় রাখুন।'

দশ
হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম আহমাদ বলেন, বয়সে নবীন হয়েও স্বীয় ইলম অনুপাতে আল্লাহর আদেশ পালনে মুহাম্মাদ ইবনু নূহ থেকে অধিক দৃঢ় অবস্থানে আর কাউকে দেখিনি। আমি আশা রাখি, তার মৃত্যু কল্যাণকর হবে। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, হে আবু আব্দিল্লাহ, আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহকে ভয় করুন।
আপনি আমার মতো সাধারণ কেউ নন। আপনি একজন সমাদৃত ও অনুসৃত ব্যক্তি। আপনাকে মানুষ মান্য করে। আপনার কথা শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়ে থাকে। সুতরাং, আল্লাহকে ভয় করুন। সত্যের ওপর অটল ও অবিচল থাকুন।
এরপর তিনি মারা যান। আমি তার জানাযা পড়াই এবং তাকে আনাহ নামক স্থানে দাফন করি।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৪১১; আল-হাকিম: ২/৩৫৭; ইমাম হাকিম এটাকে সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবীও তাতে একমত পোষণ করেন। তবাকাতে ইবনু সাদ: ৩/১৮; আল-হুইয়াহ: ১/১৪০; তাফসীরে তাবারী: ১৪/১২২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৪
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৫০০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৫৬১
২. কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট?
৩. উল্লেখ্য যে, খলীফা মামুনুর রশীদ ইমাম আফফান-এর নামে প্রতি মাসে ৫০০ দিরহামের ভাতা চালু করেছিলেন।
১. সূরা যারিয়াত, আয়াত: ২২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/২৪৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৯/২৬৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১১/২৩৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২৪১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১১/২৪২; আনাহ নামক জায়গাটি রাক্কা ও ফোরাত নদের পাশে প্রসিদ্ধ একটি স্থান। সেখানে একটি মজবুত কেল্লা রয়েছে।

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 মুসলিম উম্মাহর গোলযোগে সালাফগণের কর্মপন্থা

📄 মুসলিম উম্মাহর গোলযোগে সালাফগণের কর্মপন্থা


এক
আবু হাযিম থেকে বর্ণিত, হুসাইন ইবনু খরীজাহ আল-আশজায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শহীদ করে দেওয়া হয় এবং মুসলমানদের মাঝে ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমি এই দুআটি পড়তাম-
হে আল্লাহ, আপনি আমার কাছে সত্য উন্মোচিত করে দিন-যাতে আমি তা আঁকড়ে ধরতে পারি।
একদিন আমি স্বপ্নে দেখি, দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে বিশাল একটি দেওয়াল আড়াল করে রেখেছে। আমি দেওয়ালটি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। কিছুদূর ওঠার পর একটি দল দেখতে পেলাম। তারা বলল, আমরা ফেরেশতা। জিজ্ঞেস করলাম, শহীদগণ কোথায়? তারা বলল, আরও উপরে উঠুন। এরপর আমি আরও একধাপ উপরে উঠলাম। সেখানে দেখলাম, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বললেন, আপনি আমার উম্মতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
উত্তরে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, আপনি জানেন না, আপনার চলে আসার পর তারা পৃথিবীতে কী সব কর্মকাণ্ড আরম্ভ করেছে! তারা অন্যায় রক্তপাত করছে। বড়দের হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। আহ! কেন তারা এই সংকটময় মুহূর্তে আমার বন্ধু সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাসের রীতি অনুসরণ করছে না!
বর্ণনাকারী বলেন, এই স্বপ্নের পর আমি সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গেলাম এবং তাকে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি খুব আনন্দিত হলেন। বললেন, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যার বন্ধু নয়, সে ক্ষতিগ্রস্ত। আমি বললাম, আপনি দুই দলের কোন পক্ষে?
তিনি বললেন, আমি তাদের কারও পক্ষে নই।
আমি বললাম, আচ্ছা, এই মুহূর্তে আমার ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কী?
তিনি বললেন, তোমার কি বকরী বা ছাগল আছে?
আমি বললাম, জি না!
তিনি বললেন, তাহলে বকরী কিনে নাও। আর সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকো- যতদিন না এ ফিতনা নির্মূল হয়।

দুই
ইমাম আ'মাশ থেকে বর্ণিত, যায়েদ ইবনু ওয়াহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন আমীরুল মুমিনীন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় ডেকে পাঠান, তখন লোকেরা ইবনু মাসউদের কাছে ভিড় করে। বলে, আপনি এখানেই থাকুন। কোথাও যাবেন না। ওখানে সমস্যা চলছে! আমরা আপনাকে সবদিক থেকে নিরাপত্তা দিয়ে রাখব।
তিনি বলেন, আমি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর আনুগত্যে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর যে-ফিতনা ও দুর্যোগ অত্যাসন্ন, আমি চাই না, আমাকে দিয়ে তার সূত্রপাত হোক।
এরপর তিনি লোকদের ফিরিয়ে দিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

তিন
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনি রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে-রাতে দুর্বৃত্তরা উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর আক্রমণ করে, সে-রাতে আমার পিতা আমর ইবনু রবীআ রাযিয়াল্লাহু আনহু সালাত পড়ে এই দুআ করেন-
হে আল্লাহ, ফিতনা থেকে আপনি আমাকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখুন, যেভাবে আপনার প্রিয় বান্দাদের বাঁচিয়ে রাখেন।
পরের দিন সকালেই তার মৃত্যু সংবাদ শোনা যায়!

চার
বিখ্যাত তাবিয়ী নাফি থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আলী ও মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমার সংকট চলাকালে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি বলেন-
'আবু আব্দির রহমান, আপনি একজন অনুসৃত ব্যক্তি। শামের অধিবাসীদের মাঝে আপনার প্রভাব আছে। আপনি তৈরি হয়ে নিন। আমি আপনাকে সেখানকার গভর্নর বানিয়ে পাঠাচ্ছি।'
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-র এই সিদ্ধান্ত শুনে আমি তাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বললাম, আপনি তো জানেন, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল। মদীনার প্রতিটি বালুকণায় তার অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমি স্মৃতি নিয়েই মদীনায় থেকে যেতে চাই। সুতরাং, আমাকে ক্ষমা করুন।
কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানান। অনন্যোপায় হয়ে আমি উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার সাহায্য চাই। তিনিও আমার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন। ফলে সে রাতেই আমি মক্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। ইত্যবসরে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জানানো হয় যে, আমি শামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছি। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু আমার পেছনে লোক পাঠান। লোকটি আস্তাবলের নিকট এসে তার পাগড়ি দ্বারা উটের মুখ বেঁধে দেয়-যাতে উট কোনো আওয়াজ করতে না-পারে আর সে খুব সহজেই আমাকে ধরতে পারে।
এদিকে হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলে পাঠান, সে শামে রওয়ানা হয়নি; বরং মক্কায় যাচ্ছে। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন চুপ হয়ে যান।

পাঁচ
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, চলমান এই ফিতনায় আমাদের অবস্থা ওই যাত্রীদলের মতো, যারা বড় কোনো সড়কে পথ চলছিল। পথের অলি-গলি সবই তাদের পরিচিত। হঠাৎ কালো মেঘ ও অন্ধকারে চারিদিক ছেয়ে যায়। যাত্রীরা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। কেউ ডানে, কেউ বামে। অবশেষে তারা পথ হারিয়ে ফেলে; কিন্তু আমরা সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকি। ঠিক যেভাবে আগে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটুও নড়ি না। এরপর যখন আল্লাহ তাআলা অন্ধকার দূর করে আলো দান করেন তখন দৃষ্টি মেলে দেখি যে, আমরা সেই আগের পথেই আছি। পরিচিত পথেই অবিচল রয়েছি এবং অবচেতনেই নতুন করে সে-পথে চলতে শুরু করেছি।
এই যে আজ কুরাইশের যুবকরা-কখনও দুনিয়ার জন্যে এবং কখনও নির্দিষ্ট কোনো শাসকের জন্য লড়ছে, মারছে এবং মরছে-আমার কাছে তাদের এসবের মূল্য আমার এই অ-পশমী জুতো জোড়ার সমানও নয়!

ছয়
সাল্লাম ইবনু মিসকীন থেকে বর্ণিত, হাসান ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমীরুল মুমিনীন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শহীদ করার পর ঘাতকেরা আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বলে, আপনি সর্দারের পুত্র। অনুসরণীয় ব্যক্তি।
সুতরাং, আপনি খিলাফতের জন্য এগিয়ে আসুন। আমরা আপনার হাতে বায়আত হব।
তিনি বলেন, অসম্ভব! আমি কারও শিঙ্গা পরিমাণ রক্ত ঝরাতেও প্রস্তুত নই।
তারা বলে, আপনি অবশ্যই খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। অন্যথায় আপনাকেও আবদ্ধ ঘরে হত্যা করা হবে। এতেও কোনো কাজ হয় না। তিনি আগের কথার পুনরাবৃত্তি করেন। হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাকে লোভ এবং ভয় সবই দেখানো হয়; কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা নিজেদের কার্যসিদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়।

সাত
মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন-
বিশাল একটি জনগোষ্ঠী মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করে। তারা তাকে ভালোবাসত, মুহাব্বত করত। তবে তাদের ভালোবাসা ও মুহাব্বতে সীমালঙ্ঘন ছিল। তারা তাকে শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেছিল। এদিকে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুও বদান্যতা, সহনশীলতা ও দান-দক্ষিণার মাধ্যমে তাদের মন জয় করে চলছিলেন। তার ভালোবাসা বুকে ধারণ করেই তারা শামে জন্মেছিল। নিজেদের সন্তানদেরও তার একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম ছাড়াও তাবিয়ী ও আলিমদের বিশাল একটা অংশ ছিল। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধীনে তারা ইরাকবাসীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। একটি দৃঢ় অবস্থানে নিজেদের দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে।
অনুরূপ আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনী ও প্রজাগণও তার ভালোবাসা ও অনুরাগ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। যারা তার বিরুদ্ধাচরণ করত, তাদের প্রতি যথাযথ বিদ্বেষ পোষণ করত। তার সমর্থনেও কিছু লোক সীমালঙ্ঘন করত। এসব কারণে তারাও দলীয়করণ ও সাম্প্রদায়িকতায় ঝুঁকে পড়েছিল।
আল্লাহর শপথ! ওই ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে-যে এমন অঞ্চলে বেড়ে উঠেছে, এখানকার লোকজন তার সমর্থনে সীমালঙ্ঘন করে কিংবা তার বিরুদ্ধাচরণে সীমা ছাড়িয়ে যায়? পূর্ণ ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা তার পক্ষে কীভাবে সম্ভব?
যাই হোক, আল্লাহর শুকরিয়া, আমরা এমন এক নিরাপদ সময় পেয়েছি, যখন ফিতনার সকল আঁধার দূরীভূত হয়েছে। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষের সত্যাসত্য এখন দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। উভয় দলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা এখন পূর্ণ অবগত। তাদের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর আমরা তাদের অপারগ মনে করব। তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতা নিয়ে তাদের ভালোবাসব।
খিলাফত প্রতিষ্ঠার বৈধ পদ্ধতিতে যারা কোনো প্রকার অন্যায় বা ভুল করেছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক থাকব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চাইলে তারা নাজাতপ্রাপ্ত হবেন। আমরা তাদের সম্পর্কে তাই বলব, যেমনটা কুরআন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে-
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا
হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই-যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে-তাদের ক্ষমা করুন। আর যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো রকম বিদ্বেষ রাখবেন না।
পাশাপাশি তাদের প্রতিও ভালোবাসা রাখব, যারা তখন পক্ষপাতমুক্ত ছিলেন। যেমন, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা, সাঈদ ইবনু যায়েদ প্রমুখ সালাফগণ।
তবে আমরা কিছুতেই খারিজীদের সমর্থন করি না। কেননা, তারা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। উভয় দলকে কাফির ফাতওয়া দিয়েছে। বাস্তবিকপক্ষে খারিজীরা হলো জাহান্নামের কুকুর! তারা দ্বীন থেকে তিরের গতিতে বেরিয়ে গেছে। এতদসত্ত্বেও আমরা সুনিশ্চিত করে বলব না যে, তারা অনন্ত কালের জন্য জাহান্নামবাসী হবে। কেননা, স্বীকৃত মূর্তিপূজক ও ক্রুশপূজকরাই কেবল অনন্ত কালের জন্য জাহান্নামবাসী হবে।

আট
ইমাম শাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদা মাসরুককে বলা হলো, আপনি তো দেখছি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার সমর্থন থেকে দূরে থাকছেন! তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমাদের কী অভিমত? যদি তোমরা একে অন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করো এবং সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও, আর এ সময় আসমান থেকে কোনো ফেরেশতা নেমে ঘোষণা করে-
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।
-তাহলে কি তোমাদের পারস্পরিক লড়াই বন্ধ হবে?
তারা বলল, হ্যাঁ।
তাদের 'হ্যাঁ'-বাচক উত্তর শুনে তিনি বললেন, তাহলে শুনে রাখো, আল্লাহর শপথ! আসমান থেকে সম্মানিত ফেরেশতা এই আদেশ নিয়ে নেমে এসেছিলেন-যা তোমাদের নবীর মুখে উচ্চারিত হয়েছে। আর এটা অকাট্য। শাশ্বত। কখনই রহিত হবে না।

নয়
হারিস আল-আযদীর সূত্রে সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইবনুল হানাফিয়্যা বলেন, আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির ওপর দয়া করুন, যে নিজেকে এই ফিতনা থেকে দূরে রেখেছে। হাত ও জিহ্বা সংযত রেখেছে। গৃহকোণে অবস্থান করেছে। দৈনন্দিন ইবাদত যথাযথভাবে পালন করেছে এবং প্রিয়জনদের স্নেহ-সান্নিধ্যে সময় পার করেছে। জেনে রেখো, উমাইয়্যা বংশের কর্মফল তাদের মাঝে মুসলমানদের তলোয়ারের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
মনে রেখো-
আল্লাহর যখন মর্জি হবে, তখন তিনি হকের পক্ষাবলম্বীদের জন্য কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন। সুতরাং, যে তা পাবে, আমাদের মতে সে ভাগ্যবান। আর যে এর আগেই মারা যাবে, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রভূত কল্যাণ প্রাপ্ত হবে। আর সেটাই অধিক কল্যাণকর ও স্থায়ী।

দশ
আবু আকীল বাশীর ইবনু উকবাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইয়াযীদ ইবনুশ শীখখীরকে জিজ্ঞেস করলাম, বিদ্রোহ দেখা দিলে ইমাম মুতাররিফ কী করতেন? তিনি বললেন, ইমাম মুতাররিফ তখন পাতালঘরে চলে যেতেন। ফিতনা নির্বাপিত হওয়া পর্যন্ত জুমআ এবং সালাতের জামাআতেও তিনি বিদ্রোহীদের কাছে ঘেঁষতেন না!

এগারো
আইয়ুব থেকে বর্ণিত, ইমাম মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ফিতনার সময় ধুম্রজালে আবর্তিত জিহাদের চেয়ে ঘরের খুঁটি আঁকড়ে বসে থাকা আমার নিকট অধিক শ্রেয়।

বারো
হুমাইদ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হারুরিয়ারা একবার মুতররিফ ইবনু আব্দুল্লাহর নিকট এসে তাকে তাদের দলে যুক্ত হওয়ার আহ্বান করে। তিনি বলেন,
হে লোকসকল, যদি আমার দুইটা জীবন থাকত, তাহলে একটা নিয়ে তোমাদের দলে যুক্ত হতাম, আর অপরটা নিয়ে পক্ষপাতমুক্ত থাকতাম। তোমরা যে-মতের পক্ষে আহ্বান করছ, সেটা সত্য হলে অপর জীবন নিয়েও তোমাদের অনুসরণ করতাম।
পক্ষান্তরে তোমাদের মতাদর্শ ভ্রান্ত হলে, সর্বোচ্চ একটা জীবন বৃtha যেত। অপর জীবন নিয়ে আমি সত্যের অনুসন্ধান করতাম! কিন্তু ভাইসব, জীবন তো আমার একটাই। অতএব, সেটা নিয়ে আমি ঘোর অনিশ্চয়তায় পড়তে চাই না।

টিকাঃ
১. আলী ও মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমা
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১২০
৩. কুফা নগরীতে
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৮৯
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩৩৫
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২২৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৭
১. হিজামা
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৯
৩. পক্ষপাতদুষ্ট মতামত থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি।
৪. খারেজীরা ব্যতীত
৫. শিয়াবাদে
১. সূরা হাশর, আয়াত: ১০
১. লেখক বলেন, আল্লাহ তাআলা ইমাম যাহাবীকে এমন চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্যের জন্য উত্তম বিনিময় দান করুন। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার ফিতনার মুহূর্তে সাধারণ মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে সারগর্ভ নির্দেশনা দিয়েছেন।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১২৮
৩. সূরা নিসা, আয়াত: ২৯
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৬৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১২৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯১
৪. খারেজীদের একটি শাখা।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00