📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের কুরআন পাঠ

📄 সালাফগণের কুরআন পাঠ


এক
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন-
اقْرَأُ الْقُرْآنَ فِي شَهْرٍ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي عِشْرِينَ لَيْلَةً ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي خَمْسَ عَشْرَةَ قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةٌ، قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي عَشْرٍ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ فَاقْرَأْهُ فِي سَبْعٍ وَلَا تَزِدْ عَلَى ذَلِكَ
একমাসে পুরো কুরআন পাঠ সমাপ্ত করো। আমি বললাম, আমি এর চেয়ে অল্প সময়ে পাঠ করতে সক্ষম। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে বিশ দিনে সমাপ্ত করো। আমি বললাম, আমি এর চেয়েও কম সময়ে শেষ করার সামর্থ্য রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে সাত দিনে পাঠ শেষ করো এবং এর চেয়ে কম সময়ে শেষ করো না
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম যাহাবী লিখেছেন, বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বনিম্ন তিন দিনে কুরআন খতম করেছেন এবং এর কমে খতম করতে নিষেধ করেছেন।
তিন দিনে কুরআন পড়ে শেষ করার এই বিধান ততটুকু কুরআনের জন্য ছিল যতটুকু তখন নাজিল হয়েছিল। এই হুকুমের পর অবশিষ্ট কুরআন নাজিল হয়েছে।
সুতরাং, নিষেধের সর্বশেষ ধাপ হলো তিন দিনের কমে পূর্ণ কুরআন খতম করা অনুচিত। কেননা, এত কমে খতম করলে কুরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা-গবেষণার সুযোগ হয়ে ওঠে না। আর যদি সপ্তাহে একবার কুরআন খতম করে-ধীরে ধীরে এবং সুস্থিরভাবে তিলাওয়াত করে-তাহলে নিশ্চয় এটা হবে উত্তম আমল। কেননা, দ্বীন হলো সরল ও সহজাত বিষয়।
আল্লাহর শপথ! ধারাবাহিক নফল সালাত, চাশতের সালাত, তাহিয়্যাতুল মসজিদ, এবং সুন্নাহ সমর্থিত দুআ-আমল, ঘুমের আগে-পরের দুআ, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরের সালাতসমূহ, রাত্রিজাগরণ, উপকারী ইলম অর্জন, অর্জিত ইলমের প্রায়োগিক চর্চা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ, জনসাধারণকে হিদায়াতের পথ দেখানো, দ্বীন বোঝানো, অসৎলোকদের শাসানো, খুশু-খুযু, বিনয় ও নম্রতা, ঈমানের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয-ওয়াজিবসহ আদায় করা, কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, অধিক পরিমাণে দু'আ ও ইস্তিগফার করা, দান-সাদাকাহ করা, আত্মীয়তার বন্ধনে গুরুত্ব দেওয়া এবং এসকল কাজে বিনয় ও বিশুদ্ধ নিয়ত ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিরাতে তাহাজ্জুদের সালাতে এক-সপ্তমাংশ কুরআন পাঠ করা-অত্যন্ত মহৎ কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল; জান্নাতবাসী ও পরম সৌভাগ্যবানদের প্রধান ব্রত। আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও মুত্তাকীদের সাধনার বস্তু। এগুলো শরীয়তের রুচিসম্মত। সুতরাং, কুরআন খতমের পাশাপাশি এসবেরও প্রয়োজন আছে।
অতএব, যে আবিদ এক খতম কুরআন পড়তে তাড়াহুড়া করল, সে মূলত ইসলামের সরল ও সহজাত ধর্মমতের বিরোধিতা করল। এছাড়া কুরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা-গবেষণার পাশাপাশি যে-সব ইবাদতের কথা আমরা উল্লেখ করলাম, সেগুলো থেকেও বঞ্চিত হলো। আমাদের আদর্শ, আল্লাহর ওলী ও তাঁর রাসূলের প্রিয়ভাজন আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস যখন বয়ঃবৃদ্ধ হয়ে পড়েন তখন প্রায়ই বলতেন,
হায় আফসোস! যদি আমি যুবক বয়সে ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া ছাড় গ্রহণ করতাম!'

দুই
আল-মুসাইব ইবনু রাফি' রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'হাফিযে কুরআনের উচিত, রাতের বেলায় ইবাদত করা-যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। দিনে সিয়াম পালন করা-যখন মানুষ আহার করে। কুরআন নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকা-যখন মানুষ আনন্দে থাকে। যথাসম্ভব কান্নারত থাকা-যখন মানুষ হাসি-আনন্দে মেতে থাকে। নীরবতা অবলম্বন করা-যখন মানুষ অধিক মেলামেশা করে। হৃদয়ে খুশু-খুযু আনা-যখন মানুষ নানা বিষয়ে কল্পনা করে।
হাফিযে কুরআনের আরও উচিত হলো, সর্বদা কান্নারত, চিন্তাশীল, সহনশীল, প্রজ্ঞাবান ও শান্ত-সভ্য থাকা। রুক্ষ, অলস, হট্টগোলকারী ও বদমেজাজি হওয়া তাদের জন্য মোটেও উচিত নয়।'

তিন
কাতাদা ইবনু দিআমা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইউনুস ইবনু যুবায়ের রাহিমাহুল্লাহ বলেন-একবার কোনো এক সফরে আমরা জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিদায় জানাচ্ছিলাম। সে মুহূর্তে আমি তাকে বললাম, আমাদের কিছু নসীহত করুন। তিনি বললেন-
আমি প্রথমে আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে অসিয়ত করছি এবং অসিয়ত করছি কুরআনের ব্যাপারে। নিশ্চয় কুরআন আঁধার রাতের আলো। দিনের আলোয় পথপ্রদর্শক। সুতরাং, তোমরা কষ্ট-সাধনা করে হলেও কুরআনের ওপর আমল করো। যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হও, তাহলে তার মোকাবেলায় আগে সম্পদ পেশ করো। দ্বীন নয়। যদি বিপদ এর চেয়েও বড় হয়, তাহলে তোমার জান-মাল পেশ করো। তবুও তোমার দ্বীন নয়। নিশ্চয়ই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে, যার দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই নিতান্ত নিঃস্ব সে, যে তার দ্বীনকে খুঁইয়ে দিয়েছে। জেনে রেখো, জান্নাতে কোনো দারিদ্র্য নেই! আর জাহান্নামে কোনো ধনাঢ্যতা নেই।

চার
আবু ইমরান আল-যাওনী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একসময় আমরা কয়েকজন বালক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকতাম। আমরা তার নিকট কুরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছিলাম। এরপর কুরআন শিখেছিলাম। ফলে কুরআন তিলাওয়াত করলে আমাদের ঈমান ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকত!

পাঁচ
আতা ইবনুস সাইব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দির রহমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন-আমরা এমন কিছু মানুষের নিকট কুরআন শিখেছি, যারা আমাদের বলেছেন, তারা প্রথমে কুরআনের ১০টি আয়াত শিখতেন। এরপর সেই দশ আয়াতের মর্ম বুঝে তার ওপর আমল করার আগ পর্যন্ত অন্য দশ আয়াত শিখতেন না। ফলে আমরাও কুরআন শেখার পাশাপাশি আমলে অভ্যস্ত হয়েছি; কিন্তু আমাদের পর শীঘ্রই এমন কিছু লোকের আগমন ঘটবে, যারা কুরআনকে পানি পান করার মতো সহজে গিলতে থাকবে। অথচ তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না।

ছয়
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ফুযায়িল রাহিমাহুল্লাহর কুরআন পাঠ ছিল খুবই হৃদয়গ্রাহী, চিন্তা উদ্রেককারী ও ধীরস্থির। তার তিলাওয়াত শুনে মনে হতো তিনি যেন মানুষকে নসীহত করছেন। যখন তার তিলাওয়াতে জান্নাতের প্রসঙ্গ আসত, তখন বার বার তিনি আয়াতের পুনারাবৃত্তি করতেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ৫০৫৪; সহীহ মুসলিম: ১৮৪
১) সুনানু আবি দাউদ: ১৩৯০, ১৩৯১; সহীহ আবু দাউদ লি আলবানী: ১২৩৯, ১২৪০
১. সহীহ বুখারী: ৫০৫২ (আংশিক), সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৮৪
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪১৩
৩. বিশেষ নসীহত ও উপদেশ।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/২৬৯
৪. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৮

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের ইবাদত-মগ্নতা

📄 সালাফগণের ইবাদত-মগ্নতা


এক
আসিম আল-আহওয়াল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু উসমান আন-নাহদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমি আবু যর গিফারী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলাম, তিনি পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে তার বাহনের ওপর নুয়ে আছেন। ধারণা করলাম, তিনি হয়তো ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আবু যর, আপনি কি ঘুমাচ্ছিলেন? তিনি বললেন, না; আমি তো সালাত পড়ছিলাম।

দুই
আহনাফ রাহিমাহুল্লাহকে বলা হলো, আপনার তো বয়স হয়েছে। এ অবস্থায় সিয়াম পালন করলে আপনি আরও দুর্বল হয়ে পড়বেন।
উত্তরে তিনি বললেন, আমি তো এক দীর্ঘ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
প্রসিদ্ধ আছে, আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ সারারাত সালাতে নিরত থাকতেন। কখনও তিনি তার আঙুল আগুনের ওপর ঠেসে ধরে বলতেন, স্বাদ চেখে নাও। ভালোভাবে চেখে নাও! ওহে আহনাফ, কোন জিনিস তোমাকে অমুক অমুক দিনের কাজগুলো করতে উৎসাহিত করেছিল?

তিন
আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলেন-আমি বিখ্যাত সাহাবী তামিম আদ-দারীর নিকট এলাম। তিনি আমার সাথে আলাপ করলেন। একপর্যায়ে আমি তাকে বললাম, আপনি দৈনিক কতটুকু তিলাওয়াত করেন? তিনি বললেন, তুমি সম্ভবত ওই সকল লোকদের কেউ, যারা রাতে কুরআন তিলাওয়াত করে আর সকালবেলা বলে বেড়ায়-গতরাতে আমি পুরো কুরআন খতম করেছি। ওই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! মাত্র তিন রাকাত নফল সালাত আদায় করা-রাতভর পুরো কুরআন খতম করে সকালে তা মানুষের মাঝে বলে বেড়ানোর চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয়!
তার কথা শুনে আমি রাগতঃস্বরে বললাম, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আপনারা রাসূলের সঙ্গপ্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম। আপনাদের মধ্যে যারা জীবিত, তাদের উচিত-নীরবতা অবলম্বন করা। সুতরাং, যারা আপনাদের নিকট কিছু জানতে চায়, তাদের সাথে কঠোরতা করবেন না। ভর্ৎসনার পাত্র বানাবেন না।
আমাকে রাগান্বিত হতে দেখে তিনি কোমল হলেন। বললেন, প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র, তোমার কি ধারণা, যদি আমি শক্তিশালী মুমিন হতাম আর তুমি হতে দুর্বল, তবে কি তুমি আমার শক্তি-সামর্থ্যকে তোমার দুর্বলতার ওপর প্রয়োগ করতে? কখনও না। কিংবা তুমি যদি শক্তিশালী হও, আর আমি হই দুর্বল! তাহলে কি আমি তোমার শক্তি-সামর্থ্যকে আমার দুর্বলতার ওপর চাপিয়ে নেব? কখনও না! অতএব, তুমি তোমার সামর্থ্যের ওপর স্থির থাকো, আর আমি আমার সামর্থ্যের ওপর স্থির থাকি। নিজের প্রতি লক্ষ্য রেখে দ্বীনকে গ্রহণ করো! আর দ্বীনের প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেকে প্রস্তুত করো! যাতে সাধ্যমতো ইবাদতের ওপর টিকে থাকাটা তোমার জন্য সহজ হয়।

চার
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কিত পূর্বোক্ত হাদীসের টিকায়। ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন, অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সিয়ামের ব্যাপারেও শিথিলতা অবলম্বন করার উপদেশ দেন। তিনি বলেন-
فَصُمْ يَوْمًا وَأَفْطِرْ يَوْمًا فَذَلِكَ صِيَامُ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامِ
তুমি একদিন সিয়াম পালন করো, অপরদিন আহার করো। সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে এটা দাউদ আলাইহিস সালামের বিশেষ রীতি।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাও বলেছেন-
إِنَّ أَفْضَلَ الصِّيَامِ صِيَامُ دَاوُدَ
সর্বোত্তম নফল সিয়াম হলো দাউদ আলাইহিস সালামের অনুসৃত সিয়াম।
এছাড়াও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাগাতার সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন।
অধিকন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের কিছু অংশে ইবাদত করে বাকি অংশে ঘুমানোর আদেশ করেছেন। তিনি বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
নিশ্চয়ই আমি রাতের কিছু অংশে ইবাদত করি আর কিছু অংশে নিদ্রা যাই। কখনও সিয়াম পালন করি। আবার কখনও আহার করি। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং, যে-ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত বলে বিবেচিত হবে না।২
যে-ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখে না, সুন্নতের তোয়াক্কা করে না, সে অবশ্যই অনুতপ্ত হবে। বৈরাগ্যবাদের অনুসারী হবে। তার মেজাজ বিগড়ে যাবে। মুমিন ও মুসলিমদের প্রতি দরদ ও কল্যাণকামিতায় মহানবীর যে আদর্শ-তা থেকে সে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে সর্বদা সর্বোত্তম আমলের শিক্ষা দান করেছেন। তিনি চিরকুমারত্ব ও বৈরাগ্যবাদ বরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। কেননা, তিনি এগুলোর উদ্দেশ্যে প্রেরিত হননি। তিনি নিষেধ করেছেন দিনের পর দিন সিয়াম পালনে এবং এক সাহরিতে টানা দু'দিন সিয়াম পালন করার ব্যাপারে। রামাদানের শেষ দশ দিন ব্যতীত সারারাত ইবাদত করা থেকেও তিনি নিষেধ করেছেন। নিষেধ করেছেন সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বিবাহে অনীহা এবং হালাল প্রাণীর গোশত ভক্ষণে অনাগ্রহ প্রকাশে।
সুতরাং, ইলম-বিহীন কেউ যদি এসব কাজ করে, তবে কিছু-না কিছু-প্রতিদান সে অবশ্যই পাবে; কিন্তু সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞাত কোনো আলিম যদি সুন্নাহ উপেক্ষা করে এসব করে, তবে তা হবে বাতুলতা ও বাড়াবাড়ি।
আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম আমল হলো-যার ওপর টিকে থাকা যায়-যদিও সেটা পরিমাণে অল্প হয়!
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের ও আপনাদের সকলকে তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন এবং তার বিরোধিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে হিফাযত করুন

পাঁচ
তারিক ইবনু শিহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, প্রত্যেক রাতে মানুষ তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
■ প্রথম শ্রেণি—রাতটা তাদের পক্ষে যায়; বিপক্ষে নয়।
■ দ্বিতীয় শ্রেণি—রাতটা তাদের বিপক্ষে যায়; পক্ষে নয়।
■ তৃতীয় শ্রেণি—রাতটা তাদের পক্ষেও যায় না; আবার বিপক্ষেও না।
আমি বললাম, কীভাবে কী? একটু বুঝিয়ে বলুন!
তিনি বললেন, রাত যাদের পক্ষে, বিপক্ষে নয়—তারা হলো ওই সমস্ত মানুষ, যারা রাতের অন্ধকার ও মানুষের অচেতনতাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। অতঃপর অজু করে সালাতে দাঁড়িয়ে যায়। এই রাত তাদের পক্ষে।
আর যে-সকল লোক রাতের আঁধার ও মানুষের অচৈতন্যের সুযোগে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়; রাত তাদের বিপক্ষে; পক্ষে নয়।
আর যারা ঘুমিয়ে পড়ে এবং সকাল হলে তাদের ঘুম ভাঙে; রাত তাদের পক্ষেও নয়; আবার বিপক্ষেও নয়।
তারিক ইবনু শিহাব বলেন, আমি মনে মনে সংকল্প করলাম, অবশ্যই এই লোকটির সাহচর্য লাভ করব এবং তার আমলের খোঁজ নেব। ইত্যবসরে একটি কাফেলা তৈরি হলো। ওই কাফেলায় সালমান ফারসীও ছিলেন। আমি তাদের সঙ্গী হলাম; কিন্তু সফরে তার বিশেষ কোনো আমল দেখলাম না। যদি আমি আটার খামিরা তৈরি করতাম, তাহলে তিনি রুটি বানাতেন। আর যদি আমি রুটি বানাতাম, তাহলে তিনি সেটা সেঁকতেন।
রাতের বেলা কাফেলা যাত্রায় বিরতি দেয়। আমি রাতের কিছু অংশে সালাত আদায়ে অভ্যস্ত ছিলাম। আমি যখন জাগ্রত হলাম, দেখলাম, তিনি ঘুমন্ত। মনে মনে বললাম, তিনি তো আল্লাহর রাসূলের সাহাবী। তার ঘুম আমার রাত্রিজাগরণ থেকেও শ্রেষ্ঠ। অতঃপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর আবার জাগ্রত হই। তখনও দেখলাম তিনি ঘুমে; কিন্তু যখন তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতেন, তখন এই দুআটি পড়তেন—
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ لا إله إلا الله وحدهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ، وله الحمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আমি আল্লাহ তাআলার গুণগান কীর্তন করছি, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার নিমিত্তে, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোনো মাবুদ নেই, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক। তার কোনো শরিক নেই। সার্বভৌমত্বের মালিক তিনি। সকল প্রশংসা তাঁর। তিনি সবকিছুর ওপর সামর্থ্যবান।
যখন ফজরের কিছু সময় বাকি, তখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অজু করলেন এবং চার রাকাত সালাত আদায় করলেন।
অতঃপর ফজরের সালাত আদায় করার পর তাকে বললাম, হে আল্লাহর বান্দা, রাতের কিছু অংশে আমি ইবাদত করেছি। আর আপনাকে দেখেছি, রাতভর ঘুমোতে। তিনি বললেন, হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি কি রাতের বেলা আমার মুখে কিছু শুনেছ! আমি বললাম, একটি দুআ পড়তে শুনেছি। তিনি বললেন, হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, এই দুআ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় পাপ মোচন করে দেয়।
হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, মধ্যপন্থা অনুসরণ করো, আর মধ্যপন্থা অনুসরণ করাই হলো সর্বোত্তম নীতি।

ছয়
আসাদ ইবনু ওদাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শাদ্দাদ ইবনু আউস রাহিমাহুল্লাহ যখন বিছানায় যেতেন, তখন শুধু এপাশ-ওপাশ করতেন। ঘুম আসত না তার। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ, জাহান্নামের আগুন আমার ঘুম হারাম করে দিয়েছে। অতঃপর বিছানা থেকে উঠে যেতেন এবং সকাল পর্যন্ত সালাতে কাটিয়ে দিতেন।

সাত
আসাদ ইবনু ওদাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শাদ্দাদ ইবনু আউস যখন বিছানায় যেতেন, তখন তিনি কেমন যেন জলন্ত কড়াইয়ের শস্যদানার ন্যায় ছটফট করতেন। আর বলতেন, হে আল্লাহ, তোমার জাহান্নামের ভয় আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এরপর সারারাত সালাতে কাটিয়ে দিতেন।

আট
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম বাগাভী রাহিমাহুল্লাহর সূত্রে বর্ণনা করেন, আবুল আহওয়াস বলেন, একবার মানসুর ইবনু মু'তামির-এর এক প্রতিবেশীর মেয়ে বলে, আব্বু, গতরাতে মানসুর চাচার বাড়ির ছাদে দাঁড় করানো যে-কাষ্ঠ খণ্ড দেখেছিলাম, সেটা কোথায়?
মেয়েটির বাবা বলেন, মা, ওটা তো তোমার মানসুর চাচা ছিলেন। তিনি সেখানে সারারাত সালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন।

নয়
নুআইম ইবনু হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক যখন কিতাবুর রিকাক অর্থাৎ আখিরাতের স্মরণ ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ীত্ব বিষয়ক হাদীসসমূহ পড়তেন, তখন জবাইকৃত গরুর ন্যায় ছটফট করতেন আর কাঁদতেন। এ সময় আমাদের কারও সাহস হতো না তাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করার-যতক্ষণ না তিনি স্বাভাবিক হতেন।

দশ
ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আসিম ইবনু ইসাম আল-বাইহাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একরাতে আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহর সাথে ছিলাম। তিনি আমার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে কিছু পানি এনে রাখেন। সকালবেলা পানি পূর্বাবস্থায় দেখে বলে ওঠেন, সুবহানাল্লাহ, লোকটা ইলমের গবেষণায় এত নিমগ্ন যে, সারারাত তার অজুরও প্রয়োজন হয়নি!

এগারো
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
যখন তুমি রাত্রিজাগরণে সক্ষম হবে না, দিনেও সিয়াম পালন করতে পারবে না, তখন বুঝে নেবে, তুমি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। তোমার পাপ তোমার হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে।

বারো
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ আহমাদ ইবনু আবি হাওয়ারী আস-সুফীর জীবনীতে কোনো এক কথা-প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন-
আমি বলি, প্রশংসনীয় পথ হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ ও তার শরীয়ত। আর তার দেখানো পথের মধ্যে রয়েছে-পরিমিত পরিমাণে হালাল রিযিক গ্রহণ করা এবং অপচয় থেকে বেঁচে থাকা। কেননা, কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
হে রাসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন।
এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
নিশ্চয়ই আমি রাতের কিছু অংশে ইবাদত করি আর কিছু অংশে নিদ্রা যাই। কখনও সিয়াম পালন করি। আবার কখনও সিয়াম পালন করা থেকে বিরত থাকি। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং, যে-ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয় বলে বিবেচিত হবে।
মোটকথা, ইসলাম সন্ন্যাসবাদ, বৈরাগ্যবাদ এবং এক সাহরীতে একাধারে দুই সিয়াম বা লাগাতার সিয়াম পালন করাকে সমর্থন করে না; বরং ইসলাম হলো-সরল ও সহজাত ধর্ম। অতএব, যখন সম্ভব হবে মুসলমান তখন ভালো খাবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঘোষণা করেছেন-
لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ
বিত্তশালী ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।
ইলম-বিহীন আবিদ যখন দুনিয়াবিমুখ হয়, যুহদ অবলম্বন করে, বিবাহ থেকে বিরত থাকে, আহার বর্জন করে, নির্জনে বাস করে এবং গুঁড়ো লবণ ও শুকনো রুটি খেয়ে জীবনধারণ করে তখন তার মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন আসে। সে মনে করে, তার অনুভূতিশক্তি তীক্ষ্ণ ও পরিচ্ছন্ন হয়েছে। নফসের নড়াচড়াগুলো ধরতে পারছে। অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অনাহার ও অনিদ্রার ফলে তার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা ও হাহাকার তৈরি হয়। এটাকেই সে মহান আল্লাহর বিশেষ সাড়া জ্ঞান করে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে; কিন্তু আল্লাহর কসম! বাস্তবিক পক্ষে এর আদৌ কোনো ভিত্তি নেই। এটা মূলত শয়তানের বিশেষ প্ররোচনা।
কিন্তু সে এটাকেই বুজুর্গী মনে করে আর ভাবে, সে যুহদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে। তার মর্যাদার উন্নতি হচ্ছে। আসলে শয়তান তাকে কাবু করে ফেলেছে। তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। ফলে সে অন্যান্য মুমিনদের তুচ্ছ ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে। তাদের পাপের কথা স্মরণ করে। আর নিজেকে মনে করে, বিরাট কিছু! অনেক বড় আবিদ। সামান্য কিছু হলে সে ভাবে, আল্লাহর ওলী হয়ে গেছে, তার কারামাত প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। আবার কখনও তার মনে সন্দেহ জাগে, তার ঈমান টলে যায়। এসব কারণে আমাদের শরীয়তে একাকিত্ব, ক্ষুধা, ও বৈরাগ্যবাদের কোনো স্থান নেই।
তবে হ্যাঁ, আত্মশুদ্ধির পথ অবলম্বন করা, সর্বদা যিকিরে নিমগ্ন থাকা, মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা না করা, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, কান্নাকাটি করা, গভীর চিন্তা-ফিকির ও ধীর-স্থিরতার সাথে কুরআন তিলাওয়াত করা, প্রবৃত্তি দমন করা, আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সম্মুখে নিজের ত্রুটি স্বীকার করা, সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে অধিক সিয়াম পালন করা, প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ পড়া, সর্বস্তরের মুসলিমদের সাথে বিনম্র আচরণ করা, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা, উদার ও সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকা, অভাবের সময়েও দান করা, সবসময় সত্য বলা-যদিও সেটা প্রিয়জনের কাছে তিক্ত হয়, সৎকাজের আদেশ করা, মানুষকে ক্ষমা করা, অজ্ঞদের এড়িয়ে চলা, ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা, বাইতুল্লাহর যিয়ারত করা, সর্বাবস্থায় হালালকে গ্রহণ করা, অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার পড়া-এসব কিছুই ওলী-আওলিয়া ও মুহাম্মাদী গুণে গুণান্বিত মানুষের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব-চরিত্র। আল্লাহ তাআলা তাদের ভালোবাসা হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের মৃত্যু নসীব করুন।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৭৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৯১-৯২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/৪৪৬
১. দেখুন: পৃষ্ঠা: ৯৯
২. সহীহ বুখারী: ১৯৭৬; সহীহ মুসলিম: ১১৫৯
৩. সহীহ মুসলিমে আছে, 'দাউদ আলাইহিস সালামের সিয়াম-পদ্ধতির চেয়ে সিয়াম পালনের উত্তম কোনো পদ্ধতি নেই।' সহীহ মুসলিম: ২/৮১৭। সহীহ বুখারীতে আছে, 'যে সর্বদা সিয়াম পালন করে, তার সিয়াম সিয়াম-ই না।' সহীহ বুখারী: ১৮৬
১. সিয়াম পালন করি না।
২. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৮৪-৮৫
১. সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৫৪৯-৫৫০
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৪০৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৯৪
৩. 'লোকটা' বলে তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২৯৮
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৮
২. সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১
৩. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১
১. সূরা তালাক, আয়াত: ৭
২. আমলকারী
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৮৯-৯১

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফকর্তৃক সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ

📄 সালাফকর্তৃক সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ


এক
উবাদা ইবনুল ওয়ালিদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে একদিন জুমআর দ্বিতীয় আযানের পর খতীব সাহেব দাঁড়িয়ে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এসময় উবাদা ইবনুস সামিত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে যান এবং একমুঠ মাটি নিয়ে খতীবের মুখে ছুঁড়ে মারেন। এতে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু রাগান্বিত হন। তখন তিনি মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'যখন আমরা রাসূলের সাথে আকাবায় উপস্থিত ছিলাম, তখন তুমি আমাদের সাথে ছিলে না। আমরা তখন তার হাতে এই মর্মে বাইআত করেছিলাম-সুখে থাকি কিংবা দুখে, স্বাধীন কিংবা পরাধীন, সুস্থ কিংবা অসুস্থ-সর্বাবস্থায় আমীরের নিরঙ্কুশ আনুগত্য করবো। এমনকি যদি আমাদের ওপর অন্যায্য কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবুও। অধিকন্তু আমরা হকদারের সাথে বিতণ্ডা করবো না। কোথাও কোনো অবস্থায়ই সত্যের পক্ষ ছাড়বো না। আর আল্লাহর ব্যাপারে কারও নিন্দাকে পরোয়া করবো না।
এরপর উবাদা ইবনুস সামিত বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
❝ إِذَا رَأَيْتُمُ الْمَدَّاحِينَ فَاحْتُوا فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَابَ ❞
যখন তোমরা কাউকে সামনাসামনি প্রশংসা করতে দেখো, তখন তার মুখে মাটি মেখে দাও

দুই
একবারের ঘটনা। বিশিষ্ট অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনার ইহুদী পল্লীতে গমন করেন। এক ইহুদী মহিলা তাকে সাওয়ারী থেকে নামতে সাহায্য করে; কিন্তু নামানোর পর সে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে যাচ্ছেতাই বলতে থাকে। এতে আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম রেগে যান এবং ইহুদী মহিলাকে ধরে মারতে থাকেন। একপর্যায়ে তাকে একেবারে মেরেই ফেলেন!
মামলাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত গড়ায়। আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, আল্লাহর কসম! সে আমাকে সাহায্য করেছে বটে; কিন্তু সে আমার আল্লাহকে গালি দিয়েছে। আমার প্রিয়নবী'র নামে যাচ্ছেতাই বলেছে। তাই আমি তাকে মেরে ফেলেছি।' রাসূল গম্ভীর হলেন। অতঃপর বললেন-
❝ أَبْعَدَهَا اللهُ قَدْ أَبْطَلْتُ دَمَهَا ❞
আল্লাহ ওই অভিশপ্ত ইহুদীকে ধ্বংস করুন! আর ইবনু উম্মি মাকতুম, শোনো! তোমার মুক্তিপণ মাফ!

তিন
ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু কাসীরের পিতা বলেন-একবার আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু 'জামরাতুল উসতা’ -এর নিকট বসা ছিলেন। এ সময় লোকেরা তার নিকট ভিড় করে বিভিন্ন ফতোয়া জিজ্ঞেস করে। হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলে-আমীরুল মুমিনীন কি আপনাকে ফতোয়া প্রদানে নিষেধ করেননি?
তিনি তার দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে বলেন, তুমি আমার ওপর তদারকি করতে এসেছ? অতঃপর তিনি স্বীয় ঘাড়ের দিকে ইশারা করে বলেন, যদি তোমরা আমার এখানে উন্মুক্ত তরবারি রাখো, তখনও যদি আমার মনে হয়-আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে শোনা একটি বাক্য প্রচার করতে সক্ষম, তবুও আমি তোমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পূর্বে তা প্রচার করে ছাড়ব।'

চার
বারকাহ শহরের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনু হুবলার জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন-
একবার বারকাহ শহরের আমীর তার নিকট এসে বললেন, আগামীকাল ঈদ হবে।
মুহাম্মাদ ইবনু হুবলা বললেন, কখনও নয়। যতক্ষণ না আমরা চাঁদ দেখব, ততক্ষণ ঈদের ব্যাপারে নিশ্চিত হব না এবং মানুষকে সিয়াম ভাঙার ব্যাপারে আদেশ দেব না। আপনি কি এই আদেশ দিয়ে তাদের গুনাহের বোঝা বহন করতে চান?
আমীর বললেন, বাদশাহ মানসুরের পয়গাম এসেছে। আগামীকাল ঈদ হবেই। আর এটা উবায়দিয়‍্যাদের রায়। তারা তারিখ হিসেবে ঈদ করে। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে চলে না।
সেদিন আর চাঁদ দেখা যায়নি। তবুও শহরের আমীর দামামা, পতাকা ও ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে বের হলেন; কিন্তু কাযী সাহেব স্বীয় সিদ্ধান্তে অনড়। তিনি বললেন, আমি বের হব না। ঈদের সালাতও পড়ব না।
শহরের আমীর এক লোককে খুতবা দিয়ে ঈদের সালাত পড়ানোর আদেশ দিলেন। এরপর তিনি বারকাহ শহরে যা ঘটেছে, তা বাদশাহ মানসুরের কাছে লিখে পাঠালেন। বাদশাহ মুহাম্মাদ ইবনু হুবলাকে তলব করলেন। তাকে হাজির করা হলে বাদশাহ তাকে বললেন, আপনি আপনার মত প্রত্যাহার করুন। তাহলে আপনাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে; কিন্তু বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনু হুবলা অনড়। তিনি একটুও নড়লেন না। নিজের কথার ওপর অটল রইলেন। বাদশাহ আদেশ করলেন, মৃত্যু অবধি তাকে যেন সূর্যের দিকে মুখ করে লটকে রাখা হয়। সঙ্গে সঙ্গে তার আদেশ পালন করা হয়। কঠিন পিপাসায় কাতর হয়ে মুহাম্মাদ ইবনু হুবলা পানি চান; কিন্তু তাকে একফোঁটা পানিও দেওয়া হয় না। এরপর তাকে শূলে চড়িয়ে শহীদ করে দেওয়া হয়! জালিমদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক।

পাঁচ
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যিয়াদ একবার হাকাম ইবনু আমরের নেতৃত্বে খোরাসান অভিযানে একদল সৈন্য প্রেরণ করে। আল্লাহর রহমতে তারা সেখানে বিজয়ী হন। প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তাদের হস্তগত হয়।
এ সংবাদ জানতে পেরে যিয়াদ সেনাপতি হাকাম ইবনু আমর বরাবর পত্র লেখে-
...হামদ ও সালাতের পর, আমীরুল মুমিনীনের নির্দেশ এই যে, সোনা ও রূপা তার জন্য সংরক্ষণ করা হবে। এগুলো মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করা যাবে না।
জবাবে সেনাপতি হাকাম লেখেন-
আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ...পর সমাচার এই যে, আপনি আমাকে আমীরুল মুমিনীনের পত্রের কথা স্মরণ করিয়ে চিঠি লিখেছেন; কিন্তু আমি আমীরুল মুমিনীনের পত্র পাওয়ার আগে আল্লাহর পত্র পেয়েছি। তার পত্র পাঠের আগে আল্লাহর পত্র পাঠ করেছি। আল্লাহর কসম! যদি কোনো বান্দার মাথার ওপর আসমান ভেঙে পড়ে কিংবা পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়; কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও সে আল্লাহ জাল্লা শানুহুকে ভয় করে তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার জন্য তা হতে মুক্তি ও সৌভাগ্যের পথ বের করে দেবেন। মাআস সালাম

ছয়
আবু মুনযির ইসমাইল ইবনু উমার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দুর রহমান আল-উমরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-নিশ্চয় গাফিলতের আলামত হলো, আল্লাহর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। যেমন, তুমি জানো যে, এ কাজে আল্লাহ্ রাগান্বিত হন, তথাপি তুমি সেই কাজটি করলে। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধে এমন কাউকে ভয় করবে না, যে তোমার উপকার কিংবা অনিষ্ট সাধনের ক্ষমতা রাখে না।
তিনি আরও বলেন-মাখলুকের ভয়ে যে-ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ছেড়ে দেয়, তার ভেতর থেকে আল্লাহর ভয় উঠিয়ে নেওয়া হয়। ফলে যদি সে তার সন্তান কিংবা তার অধীন কাউকে কোনোকিছুর আদেশ করে, তাহলে সে আদেশের কোনো ওজন থাকে না। কেউ তাকে গুরুত্বই দেয় না।

সাত
ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্বাসী খিলাফতের সূচনাকাল। আব্দুল্লাহ ইবনু আলী তখন খলীফা। একবার তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। বিষয়টা আমার কাছে বিরক্তিকর ঠেকে। তবুও যাই। দরবারে প্রবেশ করে দেখি, সবাই তার দুই দিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন-আমাদের অবস্থান ও কর্মতৎপরতা সম্বন্ধে আপনার কী অভিমত?
আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলি, আল্লাহ সুবনাহু ওয়া তাআলা আমীরকে সত্য পথে পরিচালিত করুন।
আমার আর দাউদ ইবনু আলী এর মাঝে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বলেন...
: আমি আপনাকে যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দিন!
ইমাম আওযায়ী বলেন—তার এই কথায় আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে যাই। মনে মনে বলি, যা বলব সত্য বলব। এতে মৃত্যু হলে হবে। আমি সে জন্যেও প্রস্তুত। অতঃপর আমি তার নিকট ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ-এর সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করি— 'সকল আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত'
এ সময় তার হাতে একটি লোহার দণ্ড ছিল। তিনি সেটা দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটছিলেন। তিনি আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—হে আবু আব্দির রহমান, আহলে বাইতদের হত্যার ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?
আমি বললাম, মুতররিফ ইবনু শিখখীর-এর সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান বলেন—আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الطَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ
কোনো মুসলিমের রক্তপাত বৈধ নয়, কেবল তিনটি কারণ ছাড়া। এক. বিবাহিত নারী-পুরুষের ব্যভিচার। দুই. প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ। তিন. ইসলাম ত্যাগ
এরপর জিজ্ঞেস করলেন, খিলাফত সম্পর্কে আপনার অভিমত বলুন! রাসূলের পক্ষ থেকে আমাদের—আহলে বাইত-এর প্রতি কোনো অসিয়ত ছিল কী?
আমি বললাম, যদি খিলাফতের ব্যাপারে আব্বাসীদের জন্য বা আহলে বাইতের জন্য রাসূলের কোনো অসিয়ত থাকত, তাহলে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার আগে কাউকে খলীফা হতে দিতেন না!
এবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে বনু উমাইয়্যার মাল ও সম্পদের ব্যাপারে আপনার কী রায়?
আমি বললাম, যদি তা তাদের জন্য হালাল হয়, আপনাদের জন্য অবশ্যই হারাম। আর যদি তাদের জন্যও হারাম হয়, তাহলে আপনাদের জন্য তো আরও বেশি হারাম!
এরপর খলীফা আমাকে ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আলী ছিলেন একজন প্রতাপশালী বাদশাহ। রক্তপাত ছিল তার নেশা। দাম্ভিকতায় তিনি ছিলেন সবার ঊর্ধ্বে! এতদসত্ত্বেও ইমাম আওযায়ী এভাবে বুক ফুলিয়ে তার সামনে সত্য উপস্থাপন করেছেন। দরবারী আলিমদের মতো আচরণ করেননি—যারা ক্ষমতাসীনদের অন্যায় ও অপরাধ সত্ত্বেও তাদের প্রশংসা করে। বাতিলকে হকের মোড়কে উপস্থাপন করে কিংবা সত্য প্রকাশের সক্ষমতা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চুপ মেরে বসে থাকে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন!

আট
ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার উমার ইবনু আব্দিল আযীয-এর পুত্র আব্দুল মালিক তার কাছে গিয়ে বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল। কথাগুলো আপনাকে একাকী বলতে চাই। তখন উমার ইবনু আবদুল আযীয-এর পাশে মাসলামা ইবনু আব্দিল মালিক উপবিষ্ট ছিলেন। উমার ইবনু আব্দিল আযীয জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি তোমার চাচার কাছ থেকেও গোপন করতে চাচ্ছ? তিনি বলেন, জি। অতঃপর মাসলামা সেখান থেকে উঠে যান। এবার তিনি তার সামনে বসে বলেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনার চোখের সামনে বিদআত চলছে, অথচ আপনি তা মিটাচ্ছেন না। আপনার সামনে সুন্নাত ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, অথচ আপনি সেটা পুনরুজ্জীবিত করছেন না। কাল হাশরের ময়দানে আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সম্মুখে আপনি কী জবাব দেবেন?
উমার ইবনু আবদুল আযীয বলেন, বৎস, ভিন্ন কোনো উদ্যেশ্য কি তোমাকে এসবের প্রতি উৎসুক করেছে, নাকি তুমি নিজ থেকে এসব বলছ?
আব্দুল মালিক বলেন, আল্লাহর কসম! আমি যা বলছি তা নিজ থেকেই বলছি। আপনি জানেন, আপনি জিজ্ঞাসিত হবেন, আপনি কী উত্তর দেবেন তখন?
উমার বলেন, আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন এবং এমন সন্তান হওয়ার কারণে উত্তম প্রতিদান দিন। আল্লাহর শপথ! আমি আশা করি, কল্যাণের ব্যাপারে তুমি আমার সাহায্যকারী হবে।
বৎস, তোমার স্বজাতি এই বিষয়টিকে সবখানে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে আছে। যখনই আমি তাদের থেকে এই বিষয়টা ছিনিয়ে নিতে যাব, তখনই উম্মাহর মধ্যে সীমাহীন রক্তপাত ঘটবে। আল্লাহর শপথ! কোনো মুসলিমের হিজামা পরিমাণ রক্ত ঝরানো আমার নিকট দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়েও অধিক ভয়াবহ!
প্রিয় বৎস, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, এমন একদিন আসবে, যেদিন তোমার পিতা এসব বিদআত মিটিয়ে দেবেন, আর সুন্নাহ জিন্দা করবেন? অপেক্ষা করো। আল্লাহ তাআলাই আমাদের মাঝে উত্তম ফায়সালা করবেন। আর নিশ্চয় তিনি সর্বোত্তম ফায়সালাকারী।

নয়
সাঈদ ইবনু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি মক্কার 'শাতওয়া' নামক স্থানে একটি গলিপথে অবস্থান করছিলাম। আমার পাশেই ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল আযীয আল-উমারী। এ সময় বাদশাহ হারুনুর রশীদ হজকার্য সম্পাদন করছিলেন। এমন সময় একজন এসে বলল, হে আবু আব্দির রহমান, ওই যে আমিরুল মুমিনীন! তিনি সায়ী করার জন্য লোকদের সরিয়ে রাস্তা খালি করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল আযীয লোকটিকে বললেন, আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে তোমাকে উত্তম বিনিময় না দিক! তুমি আমার ওপর এমন একটি বিষয় চাপিয়ে দিয়েছ, আমি যার মুখাপেক্ষী ছিলাম না। অতঃপর তিনি তার জুতা পরিধান করে সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন। আমিও তার পিছু পিছু গেলাম। তিনি খলীফা হারুনুর রশিদ এর দিকে এগিয়ে গেলেন। খলীফা তখন মারওয়া পাহাড় থেকে সাফা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে হাঁটছিলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন-হে হারুন, খলীফা তৎক্ষণাৎ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, বলুন হে আমার চাচা, আমি উপস্থিত।
: তুমি সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহণ করো।
অতঃপর তিনি সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন।
: এবার তুমি কাবা শরীফের দিকে দৃষ্টিপাত করো।
: জি, করেছি।
: সেখানে কী পরিমাণ লোক আছে?
: এমন কে আছে গুনতে পারে?
: আনুমানিক?
: এদের সংখ্যা একমাত্র আল্লাহই গণনা করতে পারেন।
: তুমি জেনে রাখো, হাশরের ময়দানে এদের প্রত্যেকে শুধু নিজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে; কিন্তু তুমি তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। সুতরাং, ভেবে দেখো তোমার পরিণতি কী হবে?
এরপর খলীফা হারুন কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়েন। লোকেরা তাকে একটির পর একটি রুমাল দিতে থাকে অশ্রু মোছার জন্য...
আল-উমারী বলেন—আরেকবার আমি তাকে ডেকেছিলাম। সে বলল, বলুন চাচাজান!
আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! যে তার নিজের সম্পদে অপচয় করে, সে অবশ্যই তার জবাবদিহিতায় পাকড়াও হবে। তাহলে যে-ব্যক্তি সকল মুসলিমের সম্পদে অপচয় করে, তার কী অবস্থা হবে?
এ কথা বলে তিনি চলে যান। আর বাদশাহ কাঁদতে থাকেন।

দশ
ইমাম আলী ইবনু আবি তাইয়্যিব নিশাপুরীর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন—
একবার তিনি সুলতান মাহমুদ গজনবীকে নসীহত করার উদ্দেশ্যে তার নিকট গমন করেন। এরপর বিনা অনুমতিতে দরবারে প্রবেশ করে কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই তাকে হাদীস শোনাতে আরম্ভ করেন। এতে সুলতান প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। গোলামকে নির্দেশ দেন, লোকটাকে আচ্ছামতো ধোলাই দাও! গোলাম তাকে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। উপস্থিত কিছু লোক ইমাম আলী ইবনু আবি তাইয়্যিবকে চিনত। তার ইলম ও ধার্মিকতার কথা জানত। তারা সুলতানকে তার পরিচয় খুলে বলে। এতে সুলতান ভীষণ অনুতপ্ত হন। তার নিকট ক্ষমা চান এবং তাকে কিছু উপহার-উপঢৌকন দেওয়ার নির্দেশ দেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণে অসম্মতি জানান।
এবার সুলতান বলেন, হে শাইখ, রাষ্ট্রশাসকের একটা প্রভাব আছে। তার দরবারের কিছু নিয়ম-নীতি আছে। সেগুলো মেনে চলতে হয়; কিন্তু আমি তো দেখছি, আপনি সে-সকল নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করছেন না। এখন আপনিই বলুন, এর কী সমাধান?
তিনি বলেন, আল্লাহ আমাদের সর্বোত্তম পর্যবেক্ষক। আমি তো এসেছি আপনাকে নসীহত করতে, রাসূলের হাদীস শোনাতে, অন্তরে ভয় সৃষ্টি করতে। কোনো রাষ্ট্রের নিয়মনীতি বাস্তবায়ন করতে আমি আসিনি!
এতে সুলতান মাহমুদ গজনবী লজ্জিত হন এবং তার সাথে আলিঙ্গন করেন।
ঘটনাটি ইয়াকুত আল-হামাভী রাহিমাহুল্লাহ তার তারীখুল উদাবা নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন। তিনি আরও লেখেন, সুলতান মাহমুদ গজনবী ৪৫৮ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে ইন্তেকাল করেন।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জিহাদের দিক থেকে সুলতান মাহমুদ গজনবীর মর্যাদা ও শান অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি হিন্দুস্তান-বিজেতা ছিলেন এবং অনেক দুর্জেয় স্থানসমূহ জয় করেছেন। তবে তার বেশকিছু দোষ-ত্রুটিও রয়েছে। উপর্যুক্ত ঘটনাটি সেগুলোর একটি। অবশ্য তিনি পরবর্তী সময়ে এর জন্য লজ্জিত হয়েছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
আমরা সকল অহংকারী ও দাম্ভিক বাদশাহদের হাত থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। আমরা তো এমন অনেক দাম্ভিক ও অহংকারী বাদশাও দেখছি, যারা জিহাদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। দেশে-দেশে ফিতনা-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
আফসোস এ সকল বান্দাদের জন্য!

এগারো
আব্দুর রহমান রুস্তাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইবনু মাহদীকে নতুন স্ত্রীর সঙ্গে বাসর শয্যারত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যে, তার জন্য কি কয়েক দিন নামাজের জামাআত পরিহার করার সুযোগ আছে?
তিনি বললেন, না! এক ওয়াক্তের জন্যও অনুমতি নেই!
অতঃপর যে-রাত্রিতে তার মেয়ের বাসর হলো, সেদিন ফজরের সময় তার নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি নিজের রুম থেকে বের হয়ে আযান দিলেন। মেয়ে-জামাতার দরজায় গিয়ে বাঁদিকে বললেন, তাদের দুজনকে বলো জামাআতে উপস্থিত হতে! নারী ও বাঁদিরা নামাজের জন্য বের হয়ে এলো। সবাই বলে উঠল, সুবহানাল্লাহ! আপনি এ কী শুরু করলেন?
তিনি বললেন, তারা যতক্ষণ-না বের হবে আমি থামব না; কিন্তু তারা দুজন জামাআতের পর বের হলো। এরপরও তিনি তাদের দুজনকে গলির বাহিরে এক মসজিদে পাঠিয়ে দিলেন।

বারো
মুকাতিল ইবনু সালিহ আল-খোরাসানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি হাম্মাদ ইবনু সালামার ঘরে প্রবেশ করি। তার ঘরে আসবাব-পত্র বলতে ছিল কেবল বসার একটি চাটাই, একটি কুরআন, একটি বইয়ের তাক এবং একটি অজুর পাত্র।
একদিন আমি তার ঘরে বসা ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ল। তিনি তার মেয়েকে ডেকে বললেন, দেখো তো, কে এসেছে?
সে বলে, খলীফা মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানের দূত এসেছে।
তিনি বললেন, তাকে বলে দাও—যেন ঘরে একা প্রবেশ করে। অতঃপর দূত ঘরে প্রবেশ করে বাদশাহর একটি পত্র বের করে দেয়। তাতে লেখা ছিল—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানের পক্ষ থেকে হাম্মাদ ইবনু সালামাকে। পর সমাচার এই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনার দিনটিকে অনুরূপ করুন, যেরূপ তিনি তার বন্ধু ও আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য করেছেন। একটি সমস্যা সংঘটিত হয়েছে। সমাধানের প্রয়োজন। যদি আপনি একটু আসতেন, তাহলে আপনার কাছ থেকে জেনে নিতাম। মাআস সালাম।
এবার হাম্মাদ ইবনু সালামা মেয়েকে বললেন, কলম ও কালি নিয়ে এসো এবং লেখো—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
...পর সমাচার এই যে, আল্লাহ আপনার দিনটিও অনুরূপ করুন, যেরূপ তিনি তার বন্ধু ও আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য করেছেন। নিশ্চয়ই আমরা যে সকল আলিমদের নিকট ইলম অর্জন করেছি, তারা কেউ আমাদের নিকট আসেননি। যদি কোনো মাসআলা জানার প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আসুন এবং আমাদের জিজ্ঞেস করুন। আর হ্যাঁ, যদি আপনি আসেন, তাহলে অবশ্যই একা আসবেন। পদাতিক কিংবা অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে আসবেন না। যদি তাদের নিয়ে আসেন, তবে আমি আপনার সমাধান দেব না। এতে আপনার যেমন কল্যাণ নেই, আমারও নেই! মাআস সালাম।
কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই তার ঘরে আবার কড়া নড়ল। তিনি মেয়েকে বললেন, দেখো তো দরজায় কে?
মেয়ে বলল, খলীফা মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান!
তিনি বললেন, তাকে বলে দাও, তিনি যেন ঘরে একা প্রবেশ করেন।
অতঃপর বাদশা ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সালাম দিয়ে আদবের সাথে তার সম্মুখে বসে পড়লেন। বিনয়ের সাথে বললেন, যখনই আমি আপনার দিকে তাকাই, তখনই কেমন যেন আমার ভেতর ভয় জেগে ওঠে! এটা কেন? হাম্মাদ ইবনু সালামাহ বললেন, আমি সাবিত আল-বুনানী থেকে শুনেছি, তিনি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে, তিনি শুনেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে। প্রিয় নবীজি বলেন—
إِنَّ الْعَالِمَ إِذَا أَرَادَ بِعِلْمِهِ وَجْهَ اللَّهِ هَابَهُ كُلُّ شَيْءٍ، وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَكْزَ بِهِ الْكُنُوزِ هَابَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ
কোনো আলিম যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইলম শেখেন, তখন সকল জিনিস তাকে ভয় করে। আর যখন কোনো আলিম দুনিয়ার ধন-দৌলত লাভের আশায় ইলম শেখে, তখন সে সকল জিনিসকে ভয় পায়。
এরপর খলীফা বললেন, এখানে ৪০ হাজার দিরহাম আছে। আপনি সেগুলো গ্রহণ করুন এবং আপনার অবস্থার উন্নয়ন করুন। তিনি বললেন, এগুলো যাদের থেকে জুলুম করে আনা হয়েছে তাদের ফিরিয়ে দাও। খলীফা বললেন, আল্লাহর শপথ! এগুলো আমি মীরাস-সূত্রে পেয়েছি। তিনি বললেন, আমার এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি এগুলো সরিয়ে নাও। আল্লাহ তোমার পাপের বোঝা সরিয়ে নেবেন। তিনি বললেন, তাহলে এগুলো লোকদের মাঝে বণ্টন করে দেন। তিনি বললেন, আমি ইনসাফের ভিত্তিতে বণ্টন করার পরও যদি কেউ বাদ পড়ে, তবে বলবে, আমি ইনসাফ করিনি। তারচেয়ে ভালো, তুমি এগুলো সরিয়ে নাও। আল্লাহ তোমার পাপের বোঝা সরিয়ে নেবেন।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৭; সহীহ বুখারী: ৭১৯৯; ফাতহুল বারী: ১৩/২০৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৬৩; সুনানু আবি দাউদ: ৪৩৬২; সহীহ আবু দাউদ লি-আলবানী : ৩৬৬৫
১. হজে শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপের মধ্যবর্তী স্তম্ভের নাম।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৬৪
৩. শিয়া সম্প্রদায়ের বিশেষ একটা উপদল।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৩৭৪
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৬৭২
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৮১
৩. আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাতী।
৪. খলীফার আরেক ভাই, যিনি তার পূর্বে খলীফা ছিলেন।
১. সহীহ বুখারী : ১; সহীহ মুসলিম: ১৯০৭
২. সহীহ বুখারী: ৬৮৭৮; সহীহ মুসলিম: ১৬৭৬
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/১২৪-১২৫
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১২৮
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৮২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৮/১৭৩, ১৭৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/২০৪
১. কানযুল উম্মাল: ৪৬১৩১; ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন: ২/১০৮৭
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩৬১

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 জিহাদের ময়দানে সালাফগণ

📄 জিহাদের ময়দানে সালাফগণ


এক
হাম্মাদ ইবনু সালামা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনা অভিমুখে রওনা হন, তখন পথিমধ্যে একদল কুরাইশ তাকে বাধা দিতে উদ্যত হলো। তিনি সওয়ারী থেকে নেমে দাঁড়ালেন এবং তৃণীরে রক্ষিত সবগুলো তির বের করে কুরাইশদের লক্ষ্য করে বললেন, হে কুরাইশগণ, তোমরা জানো, আমার তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। আল্লাহর শপথ করে বলছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তৃণীরে একটি তিরও থাকবে, ততক্ষণ তোমরা আমার ধারে-কাছেও আসতে পারবে না। তির শেষ হয়ে গেলে তলোয়ার চালাব। যতক্ষণ আমার প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ আমি তলোয়ার চালিয়ে যাব। তারপর তোমরা যা চাও করতে পারবে। আর যদি তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ কামনা করো, তাহলে শোনো, আমি তোমাদের মক্কায় রক্ষিত আমার ধন-সম্পদের সন্ধান বলে দিচ্ছি, তোমরা তা নিয়ে নাও এবং আমার রাস্তা ছেড়ে দাও।
তাতে কুরাইশ-দল রাজি হয়ে গেল। আর সুহাইব রুমী রাযিয়াল্লাহু আনহু নিরাপদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখে বললেন-
” رَبَحَ الْبَيْعُ أَبَا يَحْيَ
আবু ইয়াহয়া তোমার ব্যবসাটি লাভজনক হয়েছে।
অতঃপর এ আয়াতটি নাজিল হয়-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ
আর মানুষের মাঝে একশ্রেণির লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জান বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।

দুই
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধের ভয়াবহ মুহূর্তে আমি আম্মার ইবনু ইয়াসিরকে দেখলাম, একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে সজোরে চিৎকার করে বলছেন— 'ওহে মুসলিম সৈনিকগণ, তোমরা কি জান্নাত থেকে পালাচ্ছ? আমি আম্মার ইবনু ইয়াসির বলছি! তোমরা আমার সাথে এসো।'
আমি দেখলাম, তার কান কেটে গেছে। সামান্য চামড়া ঝুলে আছে। আর এদিকে তিনি পুরোদ্যোমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিন
সাদ ইবনু খাইসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু -এর জীবনীতে ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন আনসারদের বিশিষ্ট বারজন মুখপাত্রের একজন এবং দ্বিতীয় আকাবায় ৭০ জনের সাথে তিনিও শরীক ছিলেন।
বদর যুদ্ধে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ঘোষণা দেন এবং সাহাবীদের যুদ্ধের জন্য আহ্বান করেন, তখন তার বৃদ্ধ পিতা খাইসামা বলেন, পরিবারের দেখভাল করার জন্যে আমাদের দুজনের যে-কোনো একজনের বাড়িতে থাকা উচিত। সুতরাং, তুমি আমাকে আল্লাহর রাস্তায় যেতে দাও। আর তুমি পরিবারের সাথেই থাকো। ছেলে সাদ তা অস্বীকার করে বলেন, ব্যাপারটা যদি জান্নাতপ্রাপ্তির না হতো, তবে না হয় ছাড় দেওয়া যেত; কিন্তু এই সুবর্ণ সুযোগে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমিও রাখি।
পিতা-পুত্রের কেউ যখন কাউকে ছাড় দিচ্ছিলেন না, তখন তাদের মধ্যে লটারি হয়। লটারিতে ছেলের নাম আসে। তৎক্ষণাৎ তিনি যুদ্ধে বেরিয়ে পড়েন এবং শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে ধন্য হন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকেও তার এবং সাহাবীগণের দলে শামিল করে নিন।

চার
সাবিত আল-বুনানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইবনু আবি লাইলা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আমার রব, আমি তো অন্ধ। যুদ্ধে শরীক হওয়ার ব্যাপারে আমার দুর্বলতাকে ক্ষমা করুন। এর পরিপেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা ওহী নাজিল করেন-
غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ
ওজরগ্রস্ত ব্যক্তিরা নয়।
এরপরেও তিনি যুদ্ধে শরীক হতে চাইতেন এবং বলতেন, তোমরা আমার হাতে ইসলামের ঝান্ডা তুলে দাও এবং উভয় পক্ষের মাঝে দাঁড় করিয়ে দাও। আমি তো অন্ধ। তাই যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখতে পাব না। ফলে পালাতেও পারব না!

পাঁচ
হাম্মাদ ইবনু সালামা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সালাহ এক যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তার সাথে তার পুত্রও ছিল। তিনি পুত্রকে বললেন, হে আমার পুত্র, শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে যাও। শহীদ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করো। ছেলে প্রস্তুত হলেন। সম্মুখপানে এগিয়ে গেলেন। লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন। এরপর এগিয়ে গেলেন সালাহ। তাকেও শহীদ করে দেওয়া হলো।
যুদ্ধের পর সালাহর স্ত্রী মুআযাহর কাছে অন্যান্য নারীরা ভিড় জমাল। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা যদি আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে থাকো, তাহলে ঠিক আছে। অন্যথায় এখান থেকে চলে যেতে পারো।

ছয়
আসমা বিনতু আবি বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, যখন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সমুদয় সম্পদ নিয়ে তার সফরসঙ্গী হন। তার সাথে হিজরতে বেরিয়ে পড়েন। এর একটু পরেই দাদা আবু কুহাফা ঘরে ঢোকেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি তখন অন্ধ। ঘরে ঢুকে অত্যন্ত আহত কণ্ঠে আমাকে ডেকে বলেন, আবু বকর তো তোমাদের সহায়-সম্বলহীন করে তার জান-মাল নিয়ে কেটে পড়েছে। আমি বলি, কখনই না। তিনি আমাদের জন্য অনেক কিছুই রেখে গেছেন। এরপর আমি কিছু কঙ্কর নিই এবং একটি কাপড়ে জড়িয়ে ঘরের এককোণে রেখে দিই। এবার দাদাকে হাত ধরে সেখানে নিয়ে বলি, এখানে হাত রাখুন। তিনি কাপড়ের ওপর হাত রাখলে আমি বলি, দেখুন তিনি কতকিছু রেখে গেছেন। তখন তিনি বলেন, যদি সে তোমাদের জন্য এতকিছু রেখে যায়, তাহলে তো ঠিক আছে।

সাত
আসিম ইবনু বাহদালা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু ওয়াইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে খালিদ ইবনু ওয়ালীদ বলেন, যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাতের মৃত্যুকে আমি কত খুঁজেছি; কিন্তু ভাগ্যে জোটেনি। আজ বিছানায় পড়ে মারা যাচ্ছি।
ইসলাম গ্রহণের পর এমন কোনো আমল আমার নেই, যার দ্বারা মুক্তির আশা করতে পারি। তবে হ্যাঁ, প্রতিটি রাতে আমি যুদ্ধের সাজে সজ্জিত থাকতাম। আকাশ আমাকে অস্থির করে রাখত। কখন প্রভাত হবে, সূর্য উঠবে, আর আমরা শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব।
এরপর তিনি বলেন, আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমার ঘোড়া ও যুদ্ধাস্ত্রগুলো সযত্নে আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিয়ো।
বর্ণনাকারী বলেন, খালিদ ইবনু ওয়ালিদের মৃত্যুর পর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানাযার উদ্দেশ্য বের হন এবং বলেন, আজ খালিদের জন্য যদি ওয়ালীদ-গোত্র মাতম করে এবং বিলাপ না-করে নীরব অশ্রুপাত করে তবে এতে কোনো দোষ নেই। কোনো নিষেধ নেই।

আট
খালিদ ইবনু ওয়ালীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যদি কোনো একরাতে আমার জন্য বাসর সাজানো হয়, একেবারে আমার মনের মতো করে, আর আমিও বাসর-যাপনে উদগ্রীব থাকি তবে সে-রাতটির চেয়েও অধিক প্রিয় হবে—প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতে ঢাকা কোনো এক রাতে সৈন্যদল নিয়ে শত্রুপক্ষের ওপর আক্রমণের জন্য সকাল পর্যন্ত ওত পেতে থাকা।

নয়
সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুনাইনের যুদ্ধের দিন উম্মু সুলাইম রাযিয়াল্লাহু আনহা হাতে খঞ্জর তুলে নেন। আবু তালহা তাকে দেখে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ হলো উম্মু সুলাইম। সে খঞ্জর হাতে নিয়েছে। উম্মু সুলাইম বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, যদি কোনো মুশরিক আমার নাগালে এসে পড়ে, তাহলে এটা দিয়ে তার পেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেব।

দশ
যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সাদ ইবনু রবীআর খোঁজে পাঠান। তিনি আমাকে বলেন, যদি তুমি তাকে জীবিত পাও, তাহলে আমার পক্ষ থেকে সালাম দিয়ো এবং বলো-আল্লাহর রাসূল তোমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, কেমন আছ?
এরপর আমি শহীদদের মাঝে তাকে খুঁজতে থাকি। একসময় তাকে পেয়েও যাই। তিনি তখন মুমূর্ষু অবস্থায় অন্তিম মুহূর্ত অতিক্রম করছিলেন। তার গায়ে ৭০ টিরও বেশি আঘাত ছিল। আমি তাকে সবকিছু খুলে বলি। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক এবং তোমার ওপরও। তুমি তাকে বলে দিয়ো-ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি জান্নাতের সুঘ্রাণ পাচ্ছি! আর আমার স্বজাতি আনসারদের বলো-তোমাদের দেহে এক ফোঁটা রক্ত থাকতেও যদি রাসূলুল্লাহর গায়ে কোনো আঘাত লাগে তবে কাল কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সম্মুখে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
যায়েদ ইবনু সাবিত বলেন, এ কথা বলে তিনি শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাযিয়াল্লাহু আনহু।

এগারো
যিরার ইবনু আমর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু রাফি' রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার রোমানদের উদ্দেশ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফার নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র সৈন্যদল প্রেরণ করেন। ঘটনাক্রমে রোমান সৈন্যরা আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফাকে তার সাথী-সঙ্গীসহ বন্দি করে ফেলে এবং তাদের বাদশাহর নিকট নিয়ে যায়। তারা আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফার দিকে ইঙ্গিত করে বলে, এই লোকটি মুহাম্মদের সাহাবী ও তার অনুসারী।
রোমের বাদশাহ আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফাকে বলেন, তুমি কি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করবে? যদি করো, তবে তোমাকে আমি আমার অর্ধেক রাজ্যের মালিক বানিয়ে দেব! তিনি বলেন, যদি তুমি আমাকে তোমার মালিকানাধীন সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে দাও এবং আরব-অনারবের যা-কিছু তোমার নয়, তারও মালিক বানিয়ে দাও, তবুও আমি এক মুহূর্তের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্ম ত্যাগ করব না!
বাদশাহ বলেন, তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করব!
আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা বলেন, তোমার যা ইচ্ছে করো!
অতঃপর বাদশাহ তাকে শূলে চড়ানোর আদেশ দেয়; কিন্তু তিরন্দাজদের বলে দেয়, তার শরীরের একদম পাশ ঘেঁষে একটি তির নিক্ষেপ করবে, আর তাকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানাবে। তারা তাই করল; কিন্তু এবারও আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা সম্মত হলেন না। তাকে শূলী থেকে নামানো হলো।
অতঃপর বড় একটি ডেগ আনা হলো। তাতে পানি ঢালা হলো, আর নিচে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে আর প্রচণ্ড তাপে ডেগের পানি টগবট করে ফুটছে! এবার দুজন মুসলিম বন্দিকে আনা হলো। তাদের একজনকে তাতে নিক্ষেপ করা হলো। মুহূর্তেই তার লাশ কঙ্কাল হয়ে ভেসে উঠল। বাদশাহ আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাকে এ দৃশ্য দেখিয়ে বললেন, এবারও কি তুমি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করবে না? তিনি আবারও অস্বীকার করলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি কাঁদতে লাগলেন। বাদশাহকে জানানো হলো যে, তিনি কাঁদছেন। বাদশাহ ভাবলেন, হয়তো এবার তার মন কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তিনি তাকে ডেকে বললেন, কেন কাঁদছ?
তিনি বললেন, জীবন তো মাত্র একটাই। যদি তুমি একবার আমাকে আগুনে ফেলে দাও, তো শেষ! আমার আফসোস হয়, যদি শরীরের পশম পরিমাণ আমার জীবন থাকত! তবে আমি প্রতিটা জীবন আল্লাহর জন্য আগুনে উৎসর্গ করতে পারতাম!
বাদশাহ তাকে বললেন, তুমি কি আমার মাথায় একটা চুমু দিতে পারবে? তাহলে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেব! আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফা বললেন, আর আমার সাথী-সঙ্গী?
: তাদেরকেও মুক্তি দেওয়া হবে।
তারপর তিনি বাদশার মাথায় একটা চুমু দিলেন এবং সকল সৈনিকদের সঙ্গে নিয়ে উমার ইবনুল খাত্তাব-এর নিকট ফিরে এলেন। রোম বাদশাহর সাথে যা যা ঘটেছিল তার পূর্ণ বিবরণ দিলেন। এরপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফার মাথায় চুমু খাওয়া। আর আমিই সেটার সূচনা করছি।' এ বলে তিনি তার মাথায় চুমু দেন।

বারো
আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার এই আয়াতের তিলাওয়াত করেন—
اِنْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا
তোমরা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বের হও।
অতঃপর বলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের যুদ্ধের জন্য আহ্বান করেছেন। আমাদের যুবক, বৃদ্ধ সকলকে যুদ্ধে যাওয়ার আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং, তোমরা আমাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে দাও। তখন তার ছেলেরা বলল, আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। আপনি তো রাসূলের যুগে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থেকে যুদ্ধ করেছেন। আবু বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমার সাথেও যুদ্ধে শরীক হয়েছেন। এখন না হয় আপনার পক্ষ থেকে আমরাই যুদ্ধ করলাম!
বর্ণনাকারী বলেন, এরপরও তিনি সমুদ্রযুদ্ধে শরিক হন এবং সেখানেই শহীদ হন। সাত দিন পর্যন্ত তাকে দাফন করার মতো কোনো দ্বীপ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না; কিন্তু এই সাত দিনে তার দেহে সামান্যতম পচনও ধরেনি!

তেরো
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার মুসলমানদের একটি সৈন্যদল জিহাদে বের হয়। আমি তাদের আমীর ছিলাম। আমরা ইস্কান্দারিয়ায় গিয়ে পৌঁছি। সেখানকার বাদশাহ আমাদের বলেন, তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে পাঠাও; আমি তার সাথে মতবিনিময় করব।
ঠিক করলাম, আমিই যাব। তারপর একজন দোভাষী সঙ্গে নিয়ে বের হলাম। তিনিও একজন দোভাষী নিলেন। আমাদের জন্য দুটি আসন রাখা হলো। আমরা সেখানে উপবিষ্ট হলাম। অতঃপর বাদশাহ বললেন, তোমরা কারা? কী তোমাদের পরিচয়?
আমি বলতে শুরু করলাম—
'আমরা আরব। কাঁটাযুক্ত গাছ ও পাথুরে ভূমির অধিবাসী। আমরা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। একসময় মানুষের জন্য দুনিয়া সঙ্কীর্ণ করে দিতাম। অতিষ্ঠ করে তুলতাম তাদের। মৃত বস্তু ও রক্ত ছিল আমাদের খাবার। সবলেরা দুর্বলের ওপর হামলে পড়ত। এক কথায়, আমরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট পন্থায় জীবন যাপন করতাম।
এরপর আমাদের মধ্য থেকেই এমন এক ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন—যিনি নেতা বা ধনিক-শ্রেণির কেউ ছিলেন না। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর প্রেরিত দূত। তিনি আমাদের এমন সব কাজের আদেশ দেন, যা আমরা কখনও শুনিনি এবং যে-সবে লিপ্ত ছিলাম তা থেকে বারণ করেন। আর অমনি আমরা তার বিরুদ্ধে লেগে গেলাম। তার ওপর মিথ্যারোপ করতে লাগলাম। তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলাম। এসময় অন্য গোত্রের কিছু লোক তার সাথে দেখা করে। তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তারা এই বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, আমরা আপনাকে সর্বাত্মক সাহায্য করব। আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। অতঃপর তিনি হিজরত করে তাদের শহরে চলে যান। তাদের সাথে মিলিত হন। এবার আমরা তার দিকে ধেয়ে আসি। তার সাথে আমাদের যুদ্ধ হয়। তিনি আমাদের ওপর বিজয় লাভ করেন। এরপর তিনি আরব উপদ্বীপের অন্যান্য দেশেও অভিযান চালান। সেখানেও বিজয়ী হন। যদি এখানে অনুপস্থিত আরবরা তোমাদের জীবনাচার সম্পর্কে জানত, তাহলে প্রত্যেকেই তোমাদের কাছে চলে আসত!'
বাদশাহ হেসে বললেন, তোমাদের রাসূল সত্য বলেছেন। আমাদের কাছেও ইতিপূর্বে অনেক রাসূল এসেছেন। আমরা তাদের মতের ওপরই ছিলাম; কিন্তু একসময় আমাদের মাঝে এমন কিছু বাদশাহর আবির্ভাব ঘটে, যারা নবীগণের আদেশ ছেড়ে দেয়। মনগড়া কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যদি তোমরা তোমাদের নবীর আদেশ আঁকড়ে ধরো, মনেপ্রাণে গ্রহণ করো, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাদের কোনোদিন হারাতে পারবে না। আর যদি তোমরা আমাদের মতো আচরণ করো,
নবীর আদেশ ছেড়ে দাও, তো জেনে রেখো, তোমাদের সংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশি নয়! তোমাদের সমরাস্ত্র ও যুদ্ধশক্তি আমাদের চেয়ে অধিক নয়!

চৌদ্দ
আবু আকীল আব্দুর রহমান ইবনু সা'লাবার জীবনীতে উল্লেখ আছে, তিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। জাফর ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আসলাম বলেন-
ইয়ামামার যুদ্ধের ঘটনা। মুসলিমরা যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন, তখন তাদের মধ্যে প্রথম যিনি আহত হন, তিনি হলেন আবু আকীল। শত্রুপক্ষের একটি তির এসে তার বাম কাঁধ ও বুকের মাঝখানে বিঁধে। তিনি তিরটা টেনে বের করে ফেলেন। এই আঘাত যুদ্ধের শুরু লগ্নেই তাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে তাকে ধরাধরি করে তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হয়।
অতঃপর যুদ্ধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে মুসলমানরা পরাজয় বরণ করে। পিছপা হতে হতে নিজেদের তাঁবুগুলোও অতিক্রম করে ফেলে। এ সময় মাআন ইবনু আদী চিৎকার করে বলেন, 'হে আনসারগণ, তোমরা পলায়ন করো না। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহকে ভয় করো। তোমাদের শত্রুদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।'
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আবু আকীল উঠে বসলেন। চিৎকারকারী কী বলছে, তা শোনার চেষ্টা করলেন। আমি তাকে বললাম, যুদ্ধে সাহায্যের জন্য তিনি আনসারদের ডাকছেন। আবু আকীল বললেন, আমি আনসার। আমি তার ডাকে সাড়া দেব, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আবু আকীল নিজেকে শক্ত করে বাঁধলেন। ডানহাতে তরবারি উঠিয়ে নিলেন। এরপর বলতে লাগলেন, ওহে আনসার সাহাবীগণ, হুনাইন যুদ্ধের ন্যায় আরও একবার একত্র হও। আক্রমণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন। মনে রেখো, মুসলমানদের জন্য আল্লাহর সাহায্য আছে। শত্রুদের কোনো সাহায্য নেই।
অতঃপর সকল মুসলিম সৈনিক ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর দুশমনদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটি বাগানের ভেতর তাদের সাথে প্রচণ্ড লড়াই হয়। উভয় পক্ষের তরবারি গর্জে ওঠে।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি আবু আকীলের দিকে তাকালাম। তার আহত হাতটি কাঁধ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। তা জমিনে পড়ে আছে। তাতে মারাত্মক পর্যায়ের প্রায় ১৪টি আঘাত লেগেছে। আর এদিকে আল্লাহর দুশমন শত্রুদের প্রধান মুসাইলামাকে হত্যা করা হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি আবু আকীলের কাছে গেলাম। তিনি তখন জীবনের অন্তিম মুহূর্তে। আমি বললাম, হে আবু আকীল, তিনি খুব ক্ষীণস্বরে বললেন, ভাই, যুদ্ধের কী অবস্থা? বললাম, 'সুসংবাদ! আল্লাহর দুশমন মারা গেছে। মুসলমানদের বিজয় হয়েছে'। এরপর তিনি তার তর্জনী আঙুলি আকাশের দিকে উঁচিয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন এবং শাহাদাত বরণ করলেন। আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করুন।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, মদীনায় আসার পর আমি পুরো ঘটনা উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খুলে বলি। তিনি সব শুনে বলেন, 'আল্লাহ তার ওপর রহম করুন। সে সবসময় শাহাদাতের অপেক্ষায় থাকত। শহীদী মৃত্যুর তামান্না বুকে লালন করত। আমার জানা মতে, সে ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মাঝে সর্বোত্তম! এবং ইসলামের শুরু যুগের মুসলিম। রাযিয়াল্লাহু আনহু।'

পনেরো
ওয়াসিলাহ ইবনুল আসকা রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে উল্লেখ আছে, মুহাম্মাদ ইবনু সাদ বলেন, একবার ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসেন। তার সাথে ফজরের সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীগণের দিকে ফিরে বসেন এবং সবাইকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে ওয়াসিলাহ-এর প্রতি তার দৃষ্টি আটকে যায়। তিনি তাকে সম্বোধন করে বলেন—
: কে তুমি?
ওয়াসিলাহ নিজের পরিচয় দেন।
: কেন এসেছ?
: আমি আপনার হাতে বাইআত হতে চাই।
: যা তুমি পছন্দ করো কিংবা অপছন্দ করো, সব বিষয়েই বাইআত হবে?
: জি হ্যাঁ।
: তোমার সাধ্যের মধ্যে যা আছে, সব মানবে?
: জি হ্যাঁ।
অতঃপর তিনি বাইআত হন এবং ইসলামের সুশীতল ছায়ায় প্রবেশ করেন।
যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাবুক-যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেদিন ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরিবারের নিকট আসেন। তার পিতা আল-আসকার সাথে সাক্ষাৎ করেন। পিতা তাকে জিজ্ঞেস করেন—
: তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?
: জি।
: আল্লাহর কসম! আমি আর কোনোদিন তোমার সাথে কথা বলব না।
অতঃপর তিনি তার চাচার কাছে আসেন। তাকে অভিবাদন জানান। তিনিও তাকে জিজ্ঞেস করেন—
: তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?
: জি।
বর্ণনাকারী বলেন, চাচা তার পিতার চেয়ে কিছুটা হালকা তিরস্কার করে বলেন, কোনো বিষয়ে বড়দের না জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া তোমার জন্য উচিত হয়নি।
ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বোন তাদের কথোপকথন শুনতে পান। তিনি ওয়াসিলাহর কাছে এসে ইসলামী পদ্ধতিতে সালাম পেশ করেন। ওয়াসিলাহ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন-
: মানে কী বোন!
: আমি তোমাদের সব কথাবার্তা শুনেছি। আমিও ইসলাম গ্রহণ করেছি।
: তাহলে তুমি তোমার ভাইকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে দাও। নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সফরে আছেন।
বোন তার ভাইকে প্রস্তুত করে দেন এবং তিনি রাসূলের সাথে এসে মিলিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতোমধ্যে রওয়ানা হয়ে গেছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারাও ধীরে-সুস্থে বেরিয়ে পড়ছেন।
বনু কাইনুকার বাজারে গিয়ে ওয়াসিলাহ হাঁক ছাড়েন, আমি তাবুকে যেতে চাই; কিন্তু আমার কোনো বাহন নেই। অতএব, যে আমাকে বাহন দেবে, আমার যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তার।
ওয়াসিলাহ বলেন, কাব ইবনু উযরাহ আমার ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, আমি তোমাকে রাত ও দিনের নির্দিষ্ট একাংশে সওয়ারে ওঠাব। অপরাংশে আমি। পালা হবে বরাবর। তবে বিনিময়ে তোমার যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আমার। আমি বললাম, আমি রাজী।
ওয়াসিলাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিক। তিনি আমাকে বাহনে চড়িয়েছেন। তার সাথে রেখে আমাকে খাইয়েছেন। আমার জন্য কষ্ট সয়েছেন। একপর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে আকয়াদির ইবনু আব্দিল মালিকের বিরুদ্ধে 'দাউমাতুল জান্দাল' -এ একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। আমি ও কাব তাতে শরীক ছিলাম। সেখানে আমাদের বেশকিছু গনীমত হস্তগত হয়। খালিদ তা আমাদের মাঝে বণ্টন করে দেন। আমার ভাগে ছয়টি শক্তিশালী উটনী পড়ে। আমি সেগুলো নিয়ে কাব ইবনু উযরাহ-র তাঁবুর নিকট গিয়ে বলি, ভাই, বেরিয়ে আসুন। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। দেখুন, আপনার উটনীগুলো। নিজ হিফাযতে নিয়ে নেন।
তিনি বেরিয়ে এসে এসব দেখে মুচকি হেসে বলেন, আল্লাহ তোমার এসবে বরকত দিন। আমি তোমাকে এই কারণে বাহন দিইনি যে, তোমার থেকে কিছু নেব।

ষোলো
আব্দুল্লাহ ইবনু কায়স থেকে বর্ণিত, আবু উমাইয়‍্যা আল-গিফারী বলেন, আমরা কোনো এক যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছিলাম, হঠাৎ শত্রুবাহিনী এসে উপস্থিত হয়। মুজাহিদদের সতর্ক করা হলে তারা দ্রুততার সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। এমন সময় আমি লক্ষ্য করি, আমার সামনে একলোক দাঁড়ানো। আমার ঘোড়ার সম্মুখভাগ তার ঘোড়ার ঠিক লেজ বরাবর। লোকটি নিজেকে নিজে সম্বোধন করে বলছে, হে আত্মা, তুমি কি অমুক অমুক যুদ্ধে উপস্থিত হওনি? তখন কি তুমি আমাকে বলোনি, তোমার পরিবার ও ছেলে-মেয়ে রয়েছে। ফলে তোমার কথা শুনে আমি ফিরে গিয়েছিলাম? আল্লাহর শপথ! আজ তোমাকে আমি আমার আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করব। আল্লাহ তাআলা হয় তোমাকে কবুল করবেন; নয়তো ছুড়ে ফেলবেন।
তখন আমি মনে মনে বলি, আজ আমি তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করব! তাই আমি যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। মুজাহিদগণ শত্রুদলের ওপর আক্রমণ করল। সে ছিল মুজাহিদদের প্রথম কাতারে-একেবারে সম্মুখভাগে। তারপর শত্রুরা মুজাহিদদের ওপর পাল্টা আক্রমণ করলে তারা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে; কিন্তু সে ছত্রভঙ্গ সৈন্যদের রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মুজাহিদরা আবার শত্রুদের ওপর জোরদার হামলা করল। তখনও সে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। তারপর শত্রুরা আবার মুজাহিদদের ওপর আক্রমণ করলে তারা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আর সে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে থাকে। আবু উমাইয়‍্যাহ আল-গিফারী বলেন-
আল্লাহর শপথ! আমি দেখেছি যে, সে প্রথম সারিতে থেকে আক্রমণ করছে আর মুজাহিদরা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হলে পশ্চাতে থেকে তাদের রক্ষা করছে। এভাবেই চলতে থাকে। অবশেষে সে শহীদ হয়ে লুটিয়ে পড়ে! আমি গুনে দেখি, তার দেহে ও ঘোড়ার পিঠে ষাট বা তার চেয়েও বেশি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

সতেরো
আলা ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি সালাহ রাহিমাহুল্লাহকে বলেন, হে আবুস সাহবা, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমাকে একটা মৌচাক দেওয়া হয়েছে, আর তোমাকে দেওয়া হয়েছে দুইটা। তিনি বলেন, হ্যাঁ। কারণ, আমি ও আমার ছেলে উভয়ে শহীদ হবো।
অতঃপর ইয়াযীদ ইবনু যিয়াদের নেতৃত্বে তুর্কিদের বিরুদ্ধে সিজিস্তানে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাতে সালাহ ও তার ছেলে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে মুজাহিদ বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সালাহ তার ছেলেকে বলেন, আমার পুত্র, তুমি তোমার মায়ের কাছে ফিরে যাও। ছেলে বলে, আব্বা, আপনি সৌভাগ্য অর্জনে ছুটছেন, আর আমাকে বলছেন ফিরে যেতে! এ কখনও হতে পারে না। এবার তিনি পুত্রকে বলেন, ঠিক আছে, তুমি শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে যাও। সে এগিয়ে যায় এবং লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যায়। সালাহ রাহিমাহুল্লাহ তার দেহটা তুলে শত্রুদের দিকে জোরে নিক্ষেপ করেন। এতে তারা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তিনি সামনে এগিয়ে যান। এরপর দাঁড়িয়ে দুআ করেন এবং লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।

আঠারো
আসমায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি কুতাইবা ইবনু মুসলিমের নেতৃত্বে তুর্কিদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কুতাইবাহ ইবনু মুসলিম যোদ্ধাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান; কিন্তু তুর্কিরা ছিল অধিক শক্তিশালী। ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসিকে খুঁজতে থাকেন। একজন বলে, তিনি ওই যে উত্তর দিকে একটি ধনুকে ভর দিয়ে বসে আছেন, আর আসমানের দিকে তাকিয়ে আঙুল নাড়ছেন। কুতাইবা ইবনু মুসলিম বলেন—আল্লাহর শপথ! তার ওই আঙুল নাড়ানো আমার কাছে হাজার হাজার দুর্ধর্ষ যুবক যোদ্ধার তরবারি চালানোর চেয়ে অধিক প্রিয়।

উনিশ
হাইওয়াহ আল-মিসরী রাহিমাহুল্লাহ একবার মিসরের কোনো এক প্রতিনিধিকে বলেছিলেন, 'জনাব, আমাদের ভূমি কখনও সামরিক শক্তি থেকে মুক্ত করবেন না। কারণ, আমরা কিবতীদের মাঝে বাস করি, জানি না, কখন তারা চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলে। আমরা হাবশীদের সাথে থাকি, জানা নেই, কখন তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করে বসে। রোমানদের নিকটেই বসবাস করি, জানা নেই, কখন তারা আমাদের সীমানায় ঢুকে পড়ে। জানি না, কখন বর্বর জাতি বিদ্রোহ করে বসে। তাই আমরা সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকি!'

বিশ
হাতিম আল-আসাম্ম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জিহাদের ময়দানে একবার আমরা শাকীক রাহিমাহুল্লাহ-সহ আরও অনেকের সাথে তুর্কি শত্রুদের মুখোমুখি হয়েছিলাম। সেদিন চোখের সামনে কত মস্তক ভূপাতিত হয়েছে, কত তলোয়ার মানুষকে কচুকাটা করেছে এবং কত বর্শা দেহকে ঝাঁঝরা করেছে—তার কোনো ইয়ত্তা নেই। শাকীক রাহিমাহুল্লাহ সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে আমাকে বলেন—
তোমার কেমন লাগছে? বাসররাত কি এমন কেটেছে তোমার? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! কখনও নয়। তিনি বললেন, কিন্তু আমার কাছে এই পরিবেশ বাসর-রজনী বলেই মনে হচ্ছে!
কিছুক্ষণ পরই তিনি দুই সারির মাঝখানে শত্রুদের সামনে নিজের ঢালকে বালিশ বানিয়ে তাতে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের ঘোরে তিনি নাক ডাকতে থাকেন! এসময় এক তুর্কি এসে আমাকে ঘায়েল করে ফেলে। সে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হয়। তার বেল্টের মাঝে সে খঞ্জর তালাশ করছিল। এসময় হঠাৎ কোথা থেকে যেন এক অজ্ঞাত তির এসে তার গলায় বিদ্ধ হয়। আর মুহূর্তেই সে প্রাণ হারায়।

একুশ
আবু বকর আন নাবুলুসীর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন—আবু যর আল-হাফিয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উবাইদিয়্যারা। আবু বকর আন নাবুলুসীকে বন্দি করে। অতঃপর তাদের স্বভাব অনুযায়ী তারা তাকে শূলীতে চড়ায়। আমি ইমাম দারাকুতনীকে দেখেছি, এই ঘটনা স্মরণ হলে তিনি খুব কাঁদতেন আর বলতেন, যখন তার দেহ থেকে চামড়া আলাদা করা হচ্ছিল, তিনি তখন পড়ছিলেন—
كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُورًا
এটা তো কিতাবে লিখিত আছে।২।
আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মিশরের অধিপতি আবু তামীমের কমান্ডার জাওহার আবু বকর আন নাবুলুসীকে বন্দি করে নিয়ে আসে। তাকে বিভিন্ন তাঁবুতে রাখা হতো। আবু তামীম তাকে জিজ্ঞেস করে, শুনলাম তুমি নাকি বলে থাকো, যার কাছে দশটি তির আছে, সে যেন একটি তির রোমের দিকে নিক্ষেপ করে। আর বাকি নয়টি তির যেন সে আমাদের দিকেই নিক্ষেপ করে! তিনি বলেন, 'না, আমি এমনটি বলিনি; আমি বলেছি-যার কাছে দশটি তির আছে, সে যেন নয়টিই তোমাদের দিকে ছোড়ে। যদি পারে, তবে দশম তিরটিও যেন তোমাদের দিকেই নিক্ষেপ করে। কারণ, তোমরা ধর্ম বিকৃত করেছ। সৎ লোকদের হত্যা করেছ এবং নিজেদের উপাস্যের নূর বলে দাবি করেছ।'
এবার আবু তামীম খাপ থেকে তরবারি বের করে এবং তাকে হত্যা করে। অতঃপর এক ইহুদীকে নির্দেশ দেয় যেন তার দেহ থেকে চামড়া আলাদা করে ফেলে!

বাইশ
নূরুদ্দীন মাহমুদ জঙ্গী রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন-'নূরুদ্দীন জঙ্গী সম্পর্কে সাবত আল-জাওজীর বর্ণনায় মাজদুদ্দীন ইবনুল আসীর মন্তব্য করেন, সাবত আল-জাওজীর মতে, নূরুদ্দীন মাহমুদ জঙ্গী রেশম ও স্বর্ণ ব্যবহার করতেন না এবং দেশে তিনি মদ বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছিলেন; কিন্তু আমি বলি—তিনি রাজকীয় পোশাক পরিধান করতেন এবং স্বর্ণের ফিতাও ব্যবহার করতেন।'
ইবনুল আসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি অধিক পরিমাণে সিয়াম পালন করতেন। এছাড়াও রাত-দিনে তার বিশেষ কিছু আমল ছিল। তবে তিনি পোলো খেলা খুব পছন্দ করতেন। একবার এক খোদাভীরু ফকীর তার এই খেলাধুলার নিন্দা করলে তিনি তার কাছে লিখে পাঠান—
‘আল্লাহর শপথ! আমাদের উদ্দেশ্য খেলাধুলা নয়; বরং সীমান্ত রক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কারণ, এ খেলায় প্রচুর আওয়াজ হয়, আর তাতে ঘোড়াগুলো আক্রমণ ও দ্রুত প্রস্থানে অভ্যস্ত হয়।'
তাকে একটি মিসরীয় স্বর্ণের পাগড়ি উপহার দেওয়া হয়। তিনি সেটা সুফী ইবনু হামাওয়াইকে দিয়ে দেন। পরে সেটা এক হাজার দিনারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

তেইশ
নূরুদ্দীন মাহমুদ জঙ্গী সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার কুতুব নিশাপুরী তাকে বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি যুদ্ধে গিয়ে নিজেকে বিপদে ফেলবেন না। যদি যুদ্ধের ময়দানে আপনার কিছু হয়ে যায়, তবে মুসলমানদের পক্ষে তরবারি ধরার মতো আর কেউ থাকবে না! উত্তরে তিনি বললেন, কে এই মাহমুদ? আল্লাহ তাআলাই আমার পূর্বে দেশকে হেফাযত করেছেন। আর তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।

চব্বিশ
আব্দুর রহমান ইবনু মাগরা আদ-দাওসী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বনু কুযাআর এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন—
কাদেসিয়ার যুদ্ধে যখন সৈন্যবাহিনী জড়ো হয় তখন খানসা বিনতু আমর আন-নাখইয়‍্যাহ নিজের চার পুত্রকে ডেকে বলেন, আমার পুত্রগণ, তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছ। অতঃপর হিজরত করেছ। আল্লাহর শপথ! না তোমাদের দেশ তোমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে; আর না দুর্ভিক্ষের আঘাতে তোমরা পর্যুদস্ত হয়েছ। এমনকি লোভ-লালসাও তোমাদের কুপোকাত করতে পারেনি।
আল্লাহর শপথ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই-নিশ্চয়ই তোমরা এক পিতা ও এক মায়ের সন্তান। জেনে রাখো, মা হিসেবে আমি কখনও তোমাদের পিতার খিয়ানত করিনি এবং তোমাদের মামাদের কলঙ্কিত করিনি! তোমাদের বংশ পরিচয় বিকৃত করিনি, তোমাদের হক পদদলিত করিনি এবং তোমাদের অধিকারে কাউকে হস্তক্ষেপের বৈধতাও দিইনি!
আমার দাবী, আগামীকাল যখন প্রভাত প্রস্ফুটিত হবে, সবাই আল্লাহ তাআলার নিকট বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও সাহায্য প্রার্থনা করবে। খুব ভোরে ময়দানে নেমে পড়বে, ইন শা আল্লাহ। যখন দেখবে, লড়াইয়ের ময়দান উনুনের পানির মতো টগবগ করছে, তখন তোমরা নির্ভয়ে সেই উনুনে ঝাঁপিয়ে পড়বে! বীরের বেশে গোটা শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ-যুদ্ধ' খেলায় মেতে উঠবে। তবেই তোমরা গনীমত, নিরাপত্তা, সফলতা এবং শাশ্বত ও চিরস্থায়ী আবাসন লাভে ধন্য হবে।
অতঃপর সন্তানরা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়। তারা ছিল মায়ের নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল। মায়ের নসীহত ও উপদেশ সম্পর্কে সম্যক অবগত।

টিকাঃ
১. সুহাইব-এর উপনাম।
২. সূরা বাকারা, আয়াত : ২০৭
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/৩২; তবাকাতে ইবনু সাদ : ৩/১৭১; মুসতাদরাক লিল-হাকিম : ৩/৩৯৭
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৪২২
৫. উপনাম আবু আব্দিল্লাহ।
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৬৮
২. সূরা নিসা, আয়াত: ৯৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৬৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৪৯৮
২. প্রায় পাঁচ বা ছয় হাজার স্বর্ণমুদ্রা
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২৯০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৮১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৭৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩০৪
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩১৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/১৪
২. সূরা তাওবা, আয়াত: ৪২
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩৪
১. মদীনার
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৭০-৭১
১. বাগানটির নাম, হাদীকাতুল মাওত।
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৬৬-৪৬৭
১. তাবাকাতুল কুবরা লি-ইবনু সাদ: ১/২৩২
১. এটি একটি জায়গার নাম। যা ইরাক থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথে পড়ে।
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৬৭৪-৬৭৬
২. আবু উমাইয়্যা আল-গিফারী
১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/৪২১
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৪৯৯
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১২১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৪০৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/৩১৪
১. শিয়াদের একটি শাখা
২. সূরা ইসরা, আয়াত: ৫৮
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৬/১৪৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৫৩৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৫৩৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00