📄 ফাতাওয়া প্রদানে সালাফগণের সতর্কতা
এক
নাফি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে একটি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার মাথা নিচু করে ফেললেন। কোনো জবাব দিলেন না। লোকটি মনে করল—তিনি হয়তো মাসআলাটি শোনেননি। তাই সে বলল, আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন! আপনি কি আমার মাসআলাটি শুনতে পেয়েছেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি; কিন্তু তোমরা কি মনে করো—যে-বিষয়ে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছ, তার উত্তর দেওয়ার পর সে-বিষয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না! আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন! একটু অপেক্ষা করো, আমি এই মাসআলাটি ভালো করে ভেবে দেখি। যদি এর কোনো সমাধান আমার জানা থাকে, তাহলে বলে দেব। আর যদি জানা না থাকে তাহলে বলব—আমার জানা নেই।
দুই
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নাফি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমার ও আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হজের মৌসুমে পৃথক পৃথক জ্ঞানমূলক আলোচনা সভার আয়োজন করতেন। ইলম পিপাসুরা তাতে ভিড় জমাতেন। আমি একেক সময় একেক মজলিসে বসতাম। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যে-কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার উত্তর প্রদান করতেন। আর যদি ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হতো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি উত্তর দিতেন না।
তিন
শুআইব ইবনু আবি হামযা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমরা শুনেছি, যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যখন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো, তিনি বলতেন, এমনটা কি আদৌ ঘটেছে? যদি তারা বলত ‘হ্যাঁ’! তাহলে তিনি তার জ্ঞান অনুযায়ী সমাধান পেশ করতেন। আর যদি তারা বলত—এখনও ঘটেনি, তাহলে তিনি বলতেন, আগে ঘটতে দাও!
চার
মুসা ইবনু উলাই ইবনি রবাহ রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করত, তাহলে তিনি বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো! এমনটা কি সত্যিই ঘটেছে? যদি সে বলত, ‘হ্যাঁ’! তবেই তিনি সে-বিষয়ে কথা বলতেন। অন্যথায় বিরত থাকতেন।
পাঁচ
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—পূর্ববর্তী কোনো একজন আলিমের মনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা উদিত হয়। তার মনে হয়, কথাটি বললে অনেক মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হবে; কিন্তু দেখা যায়, সুনাম-সুখ্যাতির ভয়ে তিনি কথাটি চেপে যান এবং সম্পূর্ণ চুপ থাকেন। এরপর যখন তার মনে হয়, এখন নীরব থাকাই ভালো তখন তিনি সেই কথাটি বলেন—'যে ফতোয়া প্রদানে অতি উৎসাহী, তার ইলম কম।'
ছয়
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো আলিম কোনো বিষয়ে জানা সত্ত্বেও তার জন্য একথা বলা জায়েয হবে কি— 'আমি জানি না'?
তিনি বললেন, যে-সব ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট প্রমাণ ও দলিল রয়েছে, সে-সব ক্ষেত্রে জায়েয হবে না। তবে যে-সব বিষয় গবেষণা-নির্ভর, সে-সব বিষয়ে অবশ্যই সেটা বলতে পারে এবং বলার অবকাশও আছে। কেননা, সে নিশ্চিত জানে না, তার গবেষণালব্ধ বিষয়টি ঠিক না ভুল!
সাত
বর্ণিত আছে, খলীফা যিয়াদাতুল্লাহ একবার একটি মাসআলা সম্পর্কে জানতে সুহনূন রাহিমাহুল্লাহর কাছে লোক পাঠান; কিন্তু সুহনূন কোনো জবাব না দিয়ে বার্তাবাহককে ফেরত পাঠান। মুহাম্মাদ ইবনু উবদুস তাকে বলল, আপনি শহর থেকে বেরিয়ে যান। গতকাল আপনি শহরের কাজীর পেছনে সালাত আদায়ে অস্বীকার করেছেন। আর আজ আমীরের প্রশ্ন প্রত্যাখ্যান করেছেন। সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ওই ব্যক্তির প্রশ্নের কীসের উত্তর, যে কিনা এগুলোকে হাসির খোরাক বানাতে চায়! যে চায়, আমার কথার সাথে অন্যের কথা মিলিয়ে স্বার্থ হাসিল করতে! যদি তার প্রশ্নের দ্বারা নিরেট দ্বীন বোঝা উদ্দেশ্য হতো, তাহলে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।
আট
আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনিল আযহার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার মুহাম্মাদ ইবনু হোসাইন আস-সিজযী আমার নিকট আগমন করেন। তিনি ইয়াযীদ ইবনু হারুন ও জাফর ইবনু আউন সম্পর্কে লিখেছিলেন। তিনি বলেন, হে আবু সাঈদ, আমার কাছে লোকেরা আসে। তারা আমাকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; কিন্তু অনেক সময় যথার্থ উত্তর না জানা সত্ত্বেও আমি আশঙ্কা করি যে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া আমার জন্য বৈধ হবে না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, কেননা, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَنْ سُيِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللَّهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে-ব্যক্তির কাছে কোনো বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সে তা গোপন করে রাখে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে আগুনের লাগام পরিয়ে দেবেন
উসমান ইবনু সাঈদ বললেন, এই হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে-সব ক্ষেত্রের কথা বলেছেন যে-সব ক্ষেত্রে তুমি জানো। পক্ষান্তরে যে-সব ক্ষেত্রে তোমার জানা নেই সে-সব ক্ষেত্রে চুপ থাকার অবকাশ আছে; বরং সেটাই উচিত।
আইয়ূব রাহিমাহুল্লাহ বলেন—কাসিম রাহিমাহুল্লাহকে বীর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি জানি না, বা আমার জানা নেই। লোকেরা তাকে পীড়াপীড়ি আরম্ভ করলে অবশেষে বাধ্য হয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা যে-সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছ, আমি তা জানি না। যদি জানতাম, তাহলে গোপন রাখতাম না। কেননা, জানা বিষয় লুকানো আমার জন্য বৈধ নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ বলেন, কাসিম রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমাকে যে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে আমি সেটা জানি না। আর যে-বিষয়ে জানা নেই, সে বিষয়ে কথা বলার চেয়ে শুধু আল্লাহকে সত্য জেনে অজ্ঞ-জীবনযাপন করাটাও শ্রেয়।
টিকাঃ
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫৬৬
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২২২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৮
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৬
১. মুসনাদে আহমাদ: ২/২৬৩; সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৫৮; সহীহ আবু দাউদ লি-আলবানী: ৩১০৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩২২
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮৯
📄 সালাফগণের কুরআন পাঠ
এক
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন-
اقْرَأُ الْقُرْآنَ فِي شَهْرٍ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي عِشْرِينَ لَيْلَةً ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي خَمْسَ عَشْرَةَ قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةٌ، قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي عَشْرٍ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ فَاقْرَأْهُ فِي سَبْعٍ وَلَا تَزِدْ عَلَى ذَلِكَ
একমাসে পুরো কুরআন পাঠ সমাপ্ত করো। আমি বললাম, আমি এর চেয়ে অল্প সময়ে পাঠ করতে সক্ষম। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে বিশ দিনে সমাপ্ত করো। আমি বললাম, আমি এর চেয়েও কম সময়ে শেষ করার সামর্থ্য রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে সাত দিনে পাঠ শেষ করো এবং এর চেয়ে কম সময়ে শেষ করো না
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম যাহাবী লিখেছেন, বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বনিম্ন তিন দিনে কুরআন খতম করেছেন এবং এর কমে খতম করতে নিষেধ করেছেন।
তিন দিনে কুরআন পড়ে শেষ করার এই বিধান ততটুকু কুরআনের জন্য ছিল যতটুকু তখন নাজিল হয়েছিল। এই হুকুমের পর অবশিষ্ট কুরআন নাজিল হয়েছে।
সুতরাং, নিষেধের সর্বশেষ ধাপ হলো তিন দিনের কমে পূর্ণ কুরআন খতম করা অনুচিত। কেননা, এত কমে খতম করলে কুরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা-গবেষণার সুযোগ হয়ে ওঠে না। আর যদি সপ্তাহে একবার কুরআন খতম করে-ধীরে ধীরে এবং সুস্থিরভাবে তিলাওয়াত করে-তাহলে নিশ্চয় এটা হবে উত্তম আমল। কেননা, দ্বীন হলো সরল ও সহজাত বিষয়।
আল্লাহর শপথ! ধারাবাহিক নফল সালাত, চাশতের সালাত, তাহিয়্যাতুল মসজিদ, এবং সুন্নাহ সমর্থিত দুআ-আমল, ঘুমের আগে-পরের দুআ, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরের সালাতসমূহ, রাত্রিজাগরণ, উপকারী ইলম অর্জন, অর্জিত ইলমের প্রায়োগিক চর্চা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ, জনসাধারণকে হিদায়াতের পথ দেখানো, দ্বীন বোঝানো, অসৎলোকদের শাসানো, খুশু-খুযু, বিনয় ও নম্রতা, ঈমানের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয-ওয়াজিবসহ আদায় করা, কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, অধিক পরিমাণে দু'আ ও ইস্তিগফার করা, দান-সাদাকাহ করা, আত্মীয়তার বন্ধনে গুরুত্ব দেওয়া এবং এসকল কাজে বিনয় ও বিশুদ্ধ নিয়ত ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিরাতে তাহাজ্জুদের সালাতে এক-সপ্তমাংশ কুরআন পাঠ করা-অত্যন্ত মহৎ কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল; জান্নাতবাসী ও পরম সৌভাগ্যবানদের প্রধান ব্রত। আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও মুত্তাকীদের সাধনার বস্তু। এগুলো শরীয়তের রুচিসম্মত। সুতরাং, কুরআন খতমের পাশাপাশি এসবেরও প্রয়োজন আছে।
অতএব, যে আবিদ এক খতম কুরআন পড়তে তাড়াহুড়া করল, সে মূলত ইসলামের সরল ও সহজাত ধর্মমতের বিরোধিতা করল। এছাড়া কুরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা-গবেষণার পাশাপাশি যে-সব ইবাদতের কথা আমরা উল্লেখ করলাম, সেগুলো থেকেও বঞ্চিত হলো। আমাদের আদর্শ, আল্লাহর ওলী ও তাঁর রাসূলের প্রিয়ভাজন আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস যখন বয়ঃবৃদ্ধ হয়ে পড়েন তখন প্রায়ই বলতেন,
হায় আফসোস! যদি আমি যুবক বয়সে ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া ছাড় গ্রহণ করতাম!'
দুই
আল-মুসাইব ইবনু রাফি' রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'হাফিযে কুরআনের উচিত, রাতের বেলায় ইবাদত করা-যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। দিনে সিয়াম পালন করা-যখন মানুষ আহার করে। কুরআন নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকা-যখন মানুষ আনন্দে থাকে। যথাসম্ভব কান্নারত থাকা-যখন মানুষ হাসি-আনন্দে মেতে থাকে। নীরবতা অবলম্বন করা-যখন মানুষ অধিক মেলামেশা করে। হৃদয়ে খুশু-খুযু আনা-যখন মানুষ নানা বিষয়ে কল্পনা করে।
হাফিযে কুরআনের আরও উচিত হলো, সর্বদা কান্নারত, চিন্তাশীল, সহনশীল, প্রজ্ঞাবান ও শান্ত-সভ্য থাকা। রুক্ষ, অলস, হট্টগোলকারী ও বদমেজাজি হওয়া তাদের জন্য মোটেও উচিত নয়।'
তিন
কাতাদা ইবনু দিআমা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইউনুস ইবনু যুবায়ের রাহিমাহুল্লাহ বলেন-একবার কোনো এক সফরে আমরা জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিদায় জানাচ্ছিলাম। সে মুহূর্তে আমি তাকে বললাম, আমাদের কিছু নসীহত করুন। তিনি বললেন-
আমি প্রথমে আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে অসিয়ত করছি এবং অসিয়ত করছি কুরআনের ব্যাপারে। নিশ্চয় কুরআন আঁধার রাতের আলো। দিনের আলোয় পথপ্রদর্শক। সুতরাং, তোমরা কষ্ট-সাধনা করে হলেও কুরআনের ওপর আমল করো। যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হও, তাহলে তার মোকাবেলায় আগে সম্পদ পেশ করো। দ্বীন নয়। যদি বিপদ এর চেয়েও বড় হয়, তাহলে তোমার জান-মাল পেশ করো। তবুও তোমার দ্বীন নয়। নিশ্চয়ই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে, যার দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই নিতান্ত নিঃস্ব সে, যে তার দ্বীনকে খুঁইয়ে দিয়েছে। জেনে রেখো, জান্নাতে কোনো দারিদ্র্য নেই! আর জাহান্নামে কোনো ধনাঢ্যতা নেই।
চার
আবু ইমরান আল-যাওনী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একসময় আমরা কয়েকজন বালক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকতাম। আমরা তার নিকট কুরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছিলাম। এরপর কুরআন শিখেছিলাম। ফলে কুরআন তিলাওয়াত করলে আমাদের ঈমান ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকত!
পাঁচ
আতা ইবনুস সাইব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দির রহমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন-আমরা এমন কিছু মানুষের নিকট কুরআন শিখেছি, যারা আমাদের বলেছেন, তারা প্রথমে কুরআনের ১০টি আয়াত শিখতেন। এরপর সেই দশ আয়াতের মর্ম বুঝে তার ওপর আমল করার আগ পর্যন্ত অন্য দশ আয়াত শিখতেন না। ফলে আমরাও কুরআন শেখার পাশাপাশি আমলে অভ্যস্ত হয়েছি; কিন্তু আমাদের পর শীঘ্রই এমন কিছু লোকের আগমন ঘটবে, যারা কুরআনকে পানি পান করার মতো সহজে গিলতে থাকবে। অথচ তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না।
ছয়
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ফুযায়িল রাহিমাহুল্লাহর কুরআন পাঠ ছিল খুবই হৃদয়গ্রাহী, চিন্তা উদ্রেককারী ও ধীরস্থির। তার তিলাওয়াত শুনে মনে হতো তিনি যেন মানুষকে নসীহত করছেন। যখন তার তিলাওয়াতে জান্নাতের প্রসঙ্গ আসত, তখন বার বার তিনি আয়াতের পুনারাবৃত্তি করতেন।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ৫০৫৪; সহীহ মুসলিম: ১৮৪
১) সুনানু আবি দাউদ: ১৩৯০, ১৩৯১; সহীহ আবু দাউদ লি আলবানী: ১২৩৯, ১২৪০
১. সহীহ বুখারী: ৫০৫২ (আংশিক), সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৮৪
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪১৩
৩. বিশেষ নসীহত ও উপদেশ।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/২৬৯
৪. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৮
📄 সালাফগণের ইবাদত-মগ্নতা
এক
আসিম আল-আহওয়াল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু উসমান আন-নাহদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমি আবু যর গিফারী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলাম, তিনি পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে তার বাহনের ওপর নুয়ে আছেন। ধারণা করলাম, তিনি হয়তো ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আবু যর, আপনি কি ঘুমাচ্ছিলেন? তিনি বললেন, না; আমি তো সালাত পড়ছিলাম।
দুই
আহনাফ রাহিমাহুল্লাহকে বলা হলো, আপনার তো বয়স হয়েছে। এ অবস্থায় সিয়াম পালন করলে আপনি আরও দুর্বল হয়ে পড়বেন।
উত্তরে তিনি বললেন, আমি তো এক দীর্ঘ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
প্রসিদ্ধ আছে, আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ সারারাত সালাতে নিরত থাকতেন। কখনও তিনি তার আঙুল আগুনের ওপর ঠেসে ধরে বলতেন, স্বাদ চেখে নাও। ভালোভাবে চেখে নাও! ওহে আহনাফ, কোন জিনিস তোমাকে অমুক অমুক দিনের কাজগুলো করতে উৎসাহিত করেছিল?
তিন
আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলেন-আমি বিখ্যাত সাহাবী তামিম আদ-দারীর নিকট এলাম। তিনি আমার সাথে আলাপ করলেন। একপর্যায়ে আমি তাকে বললাম, আপনি দৈনিক কতটুকু তিলাওয়াত করেন? তিনি বললেন, তুমি সম্ভবত ওই সকল লোকদের কেউ, যারা রাতে কুরআন তিলাওয়াত করে আর সকালবেলা বলে বেড়ায়-গতরাতে আমি পুরো কুরআন খতম করেছি। ওই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! মাত্র তিন রাকাত নফল সালাত আদায় করা-রাতভর পুরো কুরআন খতম করে সকালে তা মানুষের মাঝে বলে বেড়ানোর চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয়!
তার কথা শুনে আমি রাগতঃস্বরে বললাম, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আপনারা রাসূলের সঙ্গপ্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম। আপনাদের মধ্যে যারা জীবিত, তাদের উচিত-নীরবতা অবলম্বন করা। সুতরাং, যারা আপনাদের নিকট কিছু জানতে চায়, তাদের সাথে কঠোরতা করবেন না। ভর্ৎসনার পাত্র বানাবেন না।
আমাকে রাগান্বিত হতে দেখে তিনি কোমল হলেন। বললেন, প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র, তোমার কি ধারণা, যদি আমি শক্তিশালী মুমিন হতাম আর তুমি হতে দুর্বল, তবে কি তুমি আমার শক্তি-সামর্থ্যকে তোমার দুর্বলতার ওপর প্রয়োগ করতে? কখনও না। কিংবা তুমি যদি শক্তিশালী হও, আর আমি হই দুর্বল! তাহলে কি আমি তোমার শক্তি-সামর্থ্যকে আমার দুর্বলতার ওপর চাপিয়ে নেব? কখনও না! অতএব, তুমি তোমার সামর্থ্যের ওপর স্থির থাকো, আর আমি আমার সামর্থ্যের ওপর স্থির থাকি। নিজের প্রতি লক্ষ্য রেখে দ্বীনকে গ্রহণ করো! আর দ্বীনের প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেকে প্রস্তুত করো! যাতে সাধ্যমতো ইবাদতের ওপর টিকে থাকাটা তোমার জন্য সহজ হয়।
চার
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কিত পূর্বোক্ত হাদীসের টিকায়। ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন, অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সিয়ামের ব্যাপারেও শিথিলতা অবলম্বন করার উপদেশ দেন। তিনি বলেন-
فَصُمْ يَوْمًا وَأَفْطِرْ يَوْمًا فَذَلِكَ صِيَامُ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامِ
তুমি একদিন সিয়াম পালন করো, অপরদিন আহার করো। সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে এটা দাউদ আলাইহিস সালামের বিশেষ রীতি।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাও বলেছেন-
إِنَّ أَفْضَلَ الصِّيَامِ صِيَامُ دَاوُدَ
সর্বোত্তম নফল সিয়াম হলো দাউদ আলাইহিস সালামের অনুসৃত সিয়াম।
এছাড়াও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাগাতার সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন।
অধিকন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের কিছু অংশে ইবাদত করে বাকি অংশে ঘুমানোর আদেশ করেছেন। তিনি বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
নিশ্চয়ই আমি রাতের কিছু অংশে ইবাদত করি আর কিছু অংশে নিদ্রা যাই। কখনও সিয়াম পালন করি। আবার কখনও আহার করি। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং, যে-ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত বলে বিবেচিত হবে না।২
যে-ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখে না, সুন্নতের তোয়াক্কা করে না, সে অবশ্যই অনুতপ্ত হবে। বৈরাগ্যবাদের অনুসারী হবে। তার মেজাজ বিগড়ে যাবে। মুমিন ও মুসলিমদের প্রতি দরদ ও কল্যাণকামিতায় মহানবীর যে আদর্শ-তা থেকে সে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে সর্বদা সর্বোত্তম আমলের শিক্ষা দান করেছেন। তিনি চিরকুমারত্ব ও বৈরাগ্যবাদ বরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। কেননা, তিনি এগুলোর উদ্দেশ্যে প্রেরিত হননি। তিনি নিষেধ করেছেন দিনের পর দিন সিয়াম পালনে এবং এক সাহরিতে টানা দু'দিন সিয়াম পালন করার ব্যাপারে। রামাদানের শেষ দশ দিন ব্যতীত সারারাত ইবাদত করা থেকেও তিনি নিষেধ করেছেন। নিষেধ করেছেন সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বিবাহে অনীহা এবং হালাল প্রাণীর গোশত ভক্ষণে অনাগ্রহ প্রকাশে।
সুতরাং, ইলম-বিহীন কেউ যদি এসব কাজ করে, তবে কিছু-না কিছু-প্রতিদান সে অবশ্যই পাবে; কিন্তু সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞাত কোনো আলিম যদি সুন্নাহ উপেক্ষা করে এসব করে, তবে তা হবে বাতুলতা ও বাড়াবাড়ি।
আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম আমল হলো-যার ওপর টিকে থাকা যায়-যদিও সেটা পরিমাণে অল্প হয়!
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের ও আপনাদের সকলকে তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন এবং তার বিরোধিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে হিফাযত করুন
পাঁচ
তারিক ইবনু শিহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, প্রত্যেক রাতে মানুষ তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
■ প্রথম শ্রেণি—রাতটা তাদের পক্ষে যায়; বিপক্ষে নয়।
■ দ্বিতীয় শ্রেণি—রাতটা তাদের বিপক্ষে যায়; পক্ষে নয়।
■ তৃতীয় শ্রেণি—রাতটা তাদের পক্ষেও যায় না; আবার বিপক্ষেও না।
আমি বললাম, কীভাবে কী? একটু বুঝিয়ে বলুন!
তিনি বললেন, রাত যাদের পক্ষে, বিপক্ষে নয়—তারা হলো ওই সমস্ত মানুষ, যারা রাতের অন্ধকার ও মানুষের অচেতনতাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। অতঃপর অজু করে সালাতে দাঁড়িয়ে যায়। এই রাত তাদের পক্ষে।
আর যে-সকল লোক রাতের আঁধার ও মানুষের অচৈতন্যের সুযোগে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়; রাত তাদের বিপক্ষে; পক্ষে নয়।
আর যারা ঘুমিয়ে পড়ে এবং সকাল হলে তাদের ঘুম ভাঙে; রাত তাদের পক্ষেও নয়; আবার বিপক্ষেও নয়।
তারিক ইবনু শিহাব বলেন, আমি মনে মনে সংকল্প করলাম, অবশ্যই এই লোকটির সাহচর্য লাভ করব এবং তার আমলের খোঁজ নেব। ইত্যবসরে একটি কাফেলা তৈরি হলো। ওই কাফেলায় সালমান ফারসীও ছিলেন। আমি তাদের সঙ্গী হলাম; কিন্তু সফরে তার বিশেষ কোনো আমল দেখলাম না। যদি আমি আটার খামিরা তৈরি করতাম, তাহলে তিনি রুটি বানাতেন। আর যদি আমি রুটি বানাতাম, তাহলে তিনি সেটা সেঁকতেন।
রাতের বেলা কাফেলা যাত্রায় বিরতি দেয়। আমি রাতের কিছু অংশে সালাত আদায়ে অভ্যস্ত ছিলাম। আমি যখন জাগ্রত হলাম, দেখলাম, তিনি ঘুমন্ত। মনে মনে বললাম, তিনি তো আল্লাহর রাসূলের সাহাবী। তার ঘুম আমার রাত্রিজাগরণ থেকেও শ্রেষ্ঠ। অতঃপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর আবার জাগ্রত হই। তখনও দেখলাম তিনি ঘুমে; কিন্তু যখন তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতেন, তখন এই দুআটি পড়তেন—
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ لا إله إلا الله وحدهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ، وله الحمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আমি আল্লাহ তাআলার গুণগান কীর্তন করছি, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার নিমিত্তে, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোনো মাবুদ নেই, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক। তার কোনো শরিক নেই। সার্বভৌমত্বের মালিক তিনি। সকল প্রশংসা তাঁর। তিনি সবকিছুর ওপর সামর্থ্যবান।
যখন ফজরের কিছু সময় বাকি, তখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অজু করলেন এবং চার রাকাত সালাত আদায় করলেন।
অতঃপর ফজরের সালাত আদায় করার পর তাকে বললাম, হে আল্লাহর বান্দা, রাতের কিছু অংশে আমি ইবাদত করেছি। আর আপনাকে দেখেছি, রাতভর ঘুমোতে। তিনি বললেন, হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি কি রাতের বেলা আমার মুখে কিছু শুনেছ! আমি বললাম, একটি দুআ পড়তে শুনেছি। তিনি বললেন, হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, এই দুআ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় পাপ মোচন করে দেয়।
হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, মধ্যপন্থা অনুসরণ করো, আর মধ্যপন্থা অনুসরণ করাই হলো সর্বোত্তম নীতি।
ছয়
আসাদ ইবনু ওদাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শাদ্দাদ ইবনু আউস রাহিমাহুল্লাহ যখন বিছানায় যেতেন, তখন শুধু এপাশ-ওপাশ করতেন। ঘুম আসত না তার। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ, জাহান্নামের আগুন আমার ঘুম হারাম করে দিয়েছে। অতঃপর বিছানা থেকে উঠে যেতেন এবং সকাল পর্যন্ত সালাতে কাটিয়ে দিতেন।
সাত
আসাদ ইবনু ওদাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শাদ্দাদ ইবনু আউস যখন বিছানায় যেতেন, তখন তিনি কেমন যেন জলন্ত কড়াইয়ের শস্যদানার ন্যায় ছটফট করতেন। আর বলতেন, হে আল্লাহ, তোমার জাহান্নামের ভয় আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এরপর সারারাত সালাতে কাটিয়ে দিতেন।
আট
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম বাগাভী রাহিমাহুল্লাহর সূত্রে বর্ণনা করেন, আবুল আহওয়াস বলেন, একবার মানসুর ইবনু মু'তামির-এর এক প্রতিবেশীর মেয়ে বলে, আব্বু, গতরাতে মানসুর চাচার বাড়ির ছাদে দাঁড় করানো যে-কাষ্ঠ খণ্ড দেখেছিলাম, সেটা কোথায়?
মেয়েটির বাবা বলেন, মা, ওটা তো তোমার মানসুর চাচা ছিলেন। তিনি সেখানে সারারাত সালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন।
নয়
নুআইম ইবনু হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক যখন কিতাবুর রিকাক অর্থাৎ আখিরাতের স্মরণ ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ীত্ব বিষয়ক হাদীসসমূহ পড়তেন, তখন জবাইকৃত গরুর ন্যায় ছটফট করতেন আর কাঁদতেন। এ সময় আমাদের কারও সাহস হতো না তাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করার-যতক্ষণ না তিনি স্বাভাবিক হতেন।
দশ
ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আসিম ইবনু ইসাম আল-বাইহাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একরাতে আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহর সাথে ছিলাম। তিনি আমার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে কিছু পানি এনে রাখেন। সকালবেলা পানি পূর্বাবস্থায় দেখে বলে ওঠেন, সুবহানাল্লাহ, লোকটা ইলমের গবেষণায় এত নিমগ্ন যে, সারারাত তার অজুরও প্রয়োজন হয়নি!
এগারো
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
যখন তুমি রাত্রিজাগরণে সক্ষম হবে না, দিনেও সিয়াম পালন করতে পারবে না, তখন বুঝে নেবে, তুমি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। তোমার পাপ তোমার হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে।
বারো
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ আহমাদ ইবনু আবি হাওয়ারী আস-সুফীর জীবনীতে কোনো এক কথা-প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন-
আমি বলি, প্রশংসনীয় পথ হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ ও তার শরীয়ত। আর তার দেখানো পথের মধ্যে রয়েছে-পরিমিত পরিমাণে হালাল রিযিক গ্রহণ করা এবং অপচয় থেকে বেঁচে থাকা। কেননা, কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
হে রাসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন।
এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
নিশ্চয়ই আমি রাতের কিছু অংশে ইবাদত করি আর কিছু অংশে নিদ্রা যাই। কখনও সিয়াম পালন করি। আবার কখনও সিয়াম পালন করা থেকে বিরত থাকি। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং, যে-ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয় বলে বিবেচিত হবে।
মোটকথা, ইসলাম সন্ন্যাসবাদ, বৈরাগ্যবাদ এবং এক সাহরীতে একাধারে দুই সিয়াম বা লাগাতার সিয়াম পালন করাকে সমর্থন করে না; বরং ইসলাম হলো-সরল ও সহজাত ধর্ম। অতএব, যখন সম্ভব হবে মুসলমান তখন ভালো খাবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঘোষণা করেছেন-
لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ
বিত্তশালী ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।
ইলম-বিহীন আবিদ যখন দুনিয়াবিমুখ হয়, যুহদ অবলম্বন করে, বিবাহ থেকে বিরত থাকে, আহার বর্জন করে, নির্জনে বাস করে এবং গুঁড়ো লবণ ও শুকনো রুটি খেয়ে জীবনধারণ করে তখন তার মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন আসে। সে মনে করে, তার অনুভূতিশক্তি তীক্ষ্ণ ও পরিচ্ছন্ন হয়েছে। নফসের নড়াচড়াগুলো ধরতে পারছে। অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অনাহার ও অনিদ্রার ফলে তার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা ও হাহাকার তৈরি হয়। এটাকেই সে মহান আল্লাহর বিশেষ সাড়া জ্ঞান করে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে; কিন্তু আল্লাহর কসম! বাস্তবিক পক্ষে এর আদৌ কোনো ভিত্তি নেই। এটা মূলত শয়তানের বিশেষ প্ররোচনা।
কিন্তু সে এটাকেই বুজুর্গী মনে করে আর ভাবে, সে যুহদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে। তার মর্যাদার উন্নতি হচ্ছে। আসলে শয়তান তাকে কাবু করে ফেলেছে। তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। ফলে সে অন্যান্য মুমিনদের তুচ্ছ ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে। তাদের পাপের কথা স্মরণ করে। আর নিজেকে মনে করে, বিরাট কিছু! অনেক বড় আবিদ। সামান্য কিছু হলে সে ভাবে, আল্লাহর ওলী হয়ে গেছে, তার কারামাত প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। আবার কখনও তার মনে সন্দেহ জাগে, তার ঈমান টলে যায়। এসব কারণে আমাদের শরীয়তে একাকিত্ব, ক্ষুধা, ও বৈরাগ্যবাদের কোনো স্থান নেই।
তবে হ্যাঁ, আত্মশুদ্ধির পথ অবলম্বন করা, সর্বদা যিকিরে নিমগ্ন থাকা, মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা না করা, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, কান্নাকাটি করা, গভীর চিন্তা-ফিকির ও ধীর-স্থিরতার সাথে কুরআন তিলাওয়াত করা, প্রবৃত্তি দমন করা, আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সম্মুখে নিজের ত্রুটি স্বীকার করা, সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে অধিক সিয়াম পালন করা, প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ পড়া, সর্বস্তরের মুসলিমদের সাথে বিনম্র আচরণ করা, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা, উদার ও সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকা, অভাবের সময়েও দান করা, সবসময় সত্য বলা-যদিও সেটা প্রিয়জনের কাছে তিক্ত হয়, সৎকাজের আদেশ করা, মানুষকে ক্ষমা করা, অজ্ঞদের এড়িয়ে চলা, ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা, বাইতুল্লাহর যিয়ারত করা, সর্বাবস্থায় হালালকে গ্রহণ করা, অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার পড়া-এসব কিছুই ওলী-আওলিয়া ও মুহাম্মাদী গুণে গুণান্বিত মানুষের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব-চরিত্র। আল্লাহ তাআলা তাদের ভালোবাসা হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের মৃত্যু নসীব করুন।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৭৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৯১-৯২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/৪৪৬
১. দেখুন: পৃষ্ঠা: ৯৯
২. সহীহ বুখারী: ১৯৭৬; সহীহ মুসলিম: ১১৫৯
৩. সহীহ মুসলিমে আছে, 'দাউদ আলাইহিস সালামের সিয়াম-পদ্ধতির চেয়ে সিয়াম পালনের উত্তম কোনো পদ্ধতি নেই।' সহীহ মুসলিম: ২/৮১৭। সহীহ বুখারীতে আছে, 'যে সর্বদা সিয়াম পালন করে, তার সিয়াম সিয়াম-ই না।' সহীহ বুখারী: ১৮৬
১. সিয়াম পালন করি না।
২. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৮৪-৮৫
১. সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৫৪৯-৫৫০
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৪০৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৯৪
৩. 'লোকটা' বলে তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২৯৮
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৮
২. সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১
৩. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১
১. সূরা তালাক, আয়াত: ৭
২. আমলকারী
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৮৯-৯১
📄 সালাফকর্তৃক সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ
এক
উবাদা ইবনুল ওয়ালিদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে একদিন জুমআর দ্বিতীয় আযানের পর খতীব সাহেব দাঁড়িয়ে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এসময় উবাদা ইবনুস সামিত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে যান এবং একমুঠ মাটি নিয়ে খতীবের মুখে ছুঁড়ে মারেন। এতে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু রাগান্বিত হন। তখন তিনি মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'যখন আমরা রাসূলের সাথে আকাবায় উপস্থিত ছিলাম, তখন তুমি আমাদের সাথে ছিলে না। আমরা তখন তার হাতে এই মর্মে বাইআত করেছিলাম-সুখে থাকি কিংবা দুখে, স্বাধীন কিংবা পরাধীন, সুস্থ কিংবা অসুস্থ-সর্বাবস্থায় আমীরের নিরঙ্কুশ আনুগত্য করবো। এমনকি যদি আমাদের ওপর অন্যায্য কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবুও। অধিকন্তু আমরা হকদারের সাথে বিতণ্ডা করবো না। কোথাও কোনো অবস্থায়ই সত্যের পক্ষ ছাড়বো না। আর আল্লাহর ব্যাপারে কারও নিন্দাকে পরোয়া করবো না।
এরপর উবাদা ইবনুস সামিত বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
❝ إِذَا رَأَيْتُمُ الْمَدَّاحِينَ فَاحْتُوا فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَابَ ❞
যখন তোমরা কাউকে সামনাসামনি প্রশংসা করতে দেখো, তখন তার মুখে মাটি মেখে দাও
দুই
একবারের ঘটনা। বিশিষ্ট অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনার ইহুদী পল্লীতে গমন করেন। এক ইহুদী মহিলা তাকে সাওয়ারী থেকে নামতে সাহায্য করে; কিন্তু নামানোর পর সে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে যাচ্ছেতাই বলতে থাকে। এতে আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম রেগে যান এবং ইহুদী মহিলাকে ধরে মারতে থাকেন। একপর্যায়ে তাকে একেবারে মেরেই ফেলেন!
মামলাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত গড়ায়। আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, আল্লাহর কসম! সে আমাকে সাহায্য করেছে বটে; কিন্তু সে আমার আল্লাহকে গালি দিয়েছে। আমার প্রিয়নবী'র নামে যাচ্ছেতাই বলেছে। তাই আমি তাকে মেরে ফেলেছি।' রাসূল গম্ভীর হলেন। অতঃপর বললেন-
❝ أَبْعَدَهَا اللهُ قَدْ أَبْطَلْتُ دَمَهَا ❞
আল্লাহ ওই অভিশপ্ত ইহুদীকে ধ্বংস করুন! আর ইবনু উম্মি মাকতুম, শোনো! তোমার মুক্তিপণ মাফ!
তিন
ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু কাসীরের পিতা বলেন-একবার আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু 'জামরাতুল উসতা’ -এর নিকট বসা ছিলেন। এ সময় লোকেরা তার নিকট ভিড় করে বিভিন্ন ফতোয়া জিজ্ঞেস করে। হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলে-আমীরুল মুমিনীন কি আপনাকে ফতোয়া প্রদানে নিষেধ করেননি?
তিনি তার দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে বলেন, তুমি আমার ওপর তদারকি করতে এসেছ? অতঃপর তিনি স্বীয় ঘাড়ের দিকে ইশারা করে বলেন, যদি তোমরা আমার এখানে উন্মুক্ত তরবারি রাখো, তখনও যদি আমার মনে হয়-আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে শোনা একটি বাক্য প্রচার করতে সক্ষম, তবুও আমি তোমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পূর্বে তা প্রচার করে ছাড়ব।'
চার
বারকাহ শহরের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনু হুবলার জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন-
একবার বারকাহ শহরের আমীর তার নিকট এসে বললেন, আগামীকাল ঈদ হবে।
মুহাম্মাদ ইবনু হুবলা বললেন, কখনও নয়। যতক্ষণ না আমরা চাঁদ দেখব, ততক্ষণ ঈদের ব্যাপারে নিশ্চিত হব না এবং মানুষকে সিয়াম ভাঙার ব্যাপারে আদেশ দেব না। আপনি কি এই আদেশ দিয়ে তাদের গুনাহের বোঝা বহন করতে চান?
আমীর বললেন, বাদশাহ মানসুরের পয়গাম এসেছে। আগামীকাল ঈদ হবেই। আর এটা উবায়দিয়্যাদের রায়। তারা তারিখ হিসেবে ঈদ করে। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে চলে না।
সেদিন আর চাঁদ দেখা যায়নি। তবুও শহরের আমীর দামামা, পতাকা ও ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে বের হলেন; কিন্তু কাযী সাহেব স্বীয় সিদ্ধান্তে অনড়। তিনি বললেন, আমি বের হব না। ঈদের সালাতও পড়ব না।
শহরের আমীর এক লোককে খুতবা দিয়ে ঈদের সালাত পড়ানোর আদেশ দিলেন। এরপর তিনি বারকাহ শহরে যা ঘটেছে, তা বাদশাহ মানসুরের কাছে লিখে পাঠালেন। বাদশাহ মুহাম্মাদ ইবনু হুবলাকে তলব করলেন। তাকে হাজির করা হলে বাদশাহ তাকে বললেন, আপনি আপনার মত প্রত্যাহার করুন। তাহলে আপনাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে; কিন্তু বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনু হুবলা অনড়। তিনি একটুও নড়লেন না। নিজের কথার ওপর অটল রইলেন। বাদশাহ আদেশ করলেন, মৃত্যু অবধি তাকে যেন সূর্যের দিকে মুখ করে লটকে রাখা হয়। সঙ্গে সঙ্গে তার আদেশ পালন করা হয়। কঠিন পিপাসায় কাতর হয়ে মুহাম্মাদ ইবনু হুবলা পানি চান; কিন্তু তাকে একফোঁটা পানিও দেওয়া হয় না। এরপর তাকে শূলে চড়িয়ে শহীদ করে দেওয়া হয়! জালিমদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক।
পাঁচ
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যিয়াদ একবার হাকাম ইবনু আমরের নেতৃত্বে খোরাসান অভিযানে একদল সৈন্য প্রেরণ করে। আল্লাহর রহমতে তারা সেখানে বিজয়ী হন। প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তাদের হস্তগত হয়।
এ সংবাদ জানতে পেরে যিয়াদ সেনাপতি হাকাম ইবনু আমর বরাবর পত্র লেখে-
...হামদ ও সালাতের পর, আমীরুল মুমিনীনের নির্দেশ এই যে, সোনা ও রূপা তার জন্য সংরক্ষণ করা হবে। এগুলো মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করা যাবে না।
জবাবে সেনাপতি হাকাম লেখেন-
আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ...পর সমাচার এই যে, আপনি আমাকে আমীরুল মুমিনীনের পত্রের কথা স্মরণ করিয়ে চিঠি লিখেছেন; কিন্তু আমি আমীরুল মুমিনীনের পত্র পাওয়ার আগে আল্লাহর পত্র পেয়েছি। তার পত্র পাঠের আগে আল্লাহর পত্র পাঠ করেছি। আল্লাহর কসম! যদি কোনো বান্দার মাথার ওপর আসমান ভেঙে পড়ে কিংবা পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়; কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও সে আল্লাহ জাল্লা শানুহুকে ভয় করে তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার জন্য তা হতে মুক্তি ও সৌভাগ্যের পথ বের করে দেবেন। মাআস সালাম
ছয়
আবু মুনযির ইসমাইল ইবনু উমার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দুর রহমান আল-উমরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-নিশ্চয় গাফিলতের আলামত হলো, আল্লাহর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। যেমন, তুমি জানো যে, এ কাজে আল্লাহ্ রাগান্বিত হন, তথাপি তুমি সেই কাজটি করলে। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধে এমন কাউকে ভয় করবে না, যে তোমার উপকার কিংবা অনিষ্ট সাধনের ক্ষমতা রাখে না।
তিনি আরও বলেন-মাখলুকের ভয়ে যে-ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ছেড়ে দেয়, তার ভেতর থেকে আল্লাহর ভয় উঠিয়ে নেওয়া হয়। ফলে যদি সে তার সন্তান কিংবা তার অধীন কাউকে কোনোকিছুর আদেশ করে, তাহলে সে আদেশের কোনো ওজন থাকে না। কেউ তাকে গুরুত্বই দেয় না।
সাত
ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্বাসী খিলাফতের সূচনাকাল। আব্দুল্লাহ ইবনু আলী তখন খলীফা। একবার তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। বিষয়টা আমার কাছে বিরক্তিকর ঠেকে। তবুও যাই। দরবারে প্রবেশ করে দেখি, সবাই তার দুই দিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন-আমাদের অবস্থান ও কর্মতৎপরতা সম্বন্ধে আপনার কী অভিমত?
আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলি, আল্লাহ সুবনাহু ওয়া তাআলা আমীরকে সত্য পথে পরিচালিত করুন।
আমার আর দাউদ ইবনু আলী এর মাঝে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বলেন...
: আমি আপনাকে যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দিন!
ইমাম আওযায়ী বলেন—তার এই কথায় আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে যাই। মনে মনে বলি, যা বলব সত্য বলব। এতে মৃত্যু হলে হবে। আমি সে জন্যেও প্রস্তুত। অতঃপর আমি তার নিকট ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ-এর সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করি— 'সকল আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত'
এ সময় তার হাতে একটি লোহার দণ্ড ছিল। তিনি সেটা দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটছিলেন। তিনি আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—হে আবু আব্দির রহমান, আহলে বাইতদের হত্যার ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?
আমি বললাম, মুতররিফ ইবনু শিখখীর-এর সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান বলেন—আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الطَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ
কোনো মুসলিমের রক্তপাত বৈধ নয়, কেবল তিনটি কারণ ছাড়া। এক. বিবাহিত নারী-পুরুষের ব্যভিচার। দুই. প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ। তিন. ইসলাম ত্যাগ
এরপর জিজ্ঞেস করলেন, খিলাফত সম্পর্কে আপনার অভিমত বলুন! রাসূলের পক্ষ থেকে আমাদের—আহলে বাইত-এর প্রতি কোনো অসিয়ত ছিল কী?
আমি বললাম, যদি খিলাফতের ব্যাপারে আব্বাসীদের জন্য বা আহলে বাইতের জন্য রাসূলের কোনো অসিয়ত থাকত, তাহলে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার আগে কাউকে খলীফা হতে দিতেন না!
এবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে বনু উমাইয়্যার মাল ও সম্পদের ব্যাপারে আপনার কী রায়?
আমি বললাম, যদি তা তাদের জন্য হালাল হয়, আপনাদের জন্য অবশ্যই হারাম। আর যদি তাদের জন্যও হারাম হয়, তাহলে আপনাদের জন্য তো আরও বেশি হারাম!
এরপর খলীফা আমাকে ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আলী ছিলেন একজন প্রতাপশালী বাদশাহ। রক্তপাত ছিল তার নেশা। দাম্ভিকতায় তিনি ছিলেন সবার ঊর্ধ্বে! এতদসত্ত্বেও ইমাম আওযায়ী এভাবে বুক ফুলিয়ে তার সামনে সত্য উপস্থাপন করেছেন। দরবারী আলিমদের মতো আচরণ করেননি—যারা ক্ষমতাসীনদের অন্যায় ও অপরাধ সত্ত্বেও তাদের প্রশংসা করে। বাতিলকে হকের মোড়কে উপস্থাপন করে কিংবা সত্য প্রকাশের সক্ষমতা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চুপ মেরে বসে থাকে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন!
আট
ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার উমার ইবনু আব্দিল আযীয-এর পুত্র আব্দুল মালিক তার কাছে গিয়ে বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল। কথাগুলো আপনাকে একাকী বলতে চাই। তখন উমার ইবনু আবদুল আযীয-এর পাশে মাসলামা ইবনু আব্দিল মালিক উপবিষ্ট ছিলেন। উমার ইবনু আব্দিল আযীয জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি তোমার চাচার কাছ থেকেও গোপন করতে চাচ্ছ? তিনি বলেন, জি। অতঃপর মাসলামা সেখান থেকে উঠে যান। এবার তিনি তার সামনে বসে বলেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনার চোখের সামনে বিদআত চলছে, অথচ আপনি তা মিটাচ্ছেন না। আপনার সামনে সুন্নাত ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, অথচ আপনি সেটা পুনরুজ্জীবিত করছেন না। কাল হাশরের ময়দানে আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সম্মুখে আপনি কী জবাব দেবেন?
উমার ইবনু আবদুল আযীয বলেন, বৎস, ভিন্ন কোনো উদ্যেশ্য কি তোমাকে এসবের প্রতি উৎসুক করেছে, নাকি তুমি নিজ থেকে এসব বলছ?
আব্দুল মালিক বলেন, আল্লাহর কসম! আমি যা বলছি তা নিজ থেকেই বলছি। আপনি জানেন, আপনি জিজ্ঞাসিত হবেন, আপনি কী উত্তর দেবেন তখন?
উমার বলেন, আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন এবং এমন সন্তান হওয়ার কারণে উত্তম প্রতিদান দিন। আল্লাহর শপথ! আমি আশা করি, কল্যাণের ব্যাপারে তুমি আমার সাহায্যকারী হবে।
বৎস, তোমার স্বজাতি এই বিষয়টিকে সবখানে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে আছে। যখনই আমি তাদের থেকে এই বিষয়টা ছিনিয়ে নিতে যাব, তখনই উম্মাহর মধ্যে সীমাহীন রক্তপাত ঘটবে। আল্লাহর শপথ! কোনো মুসলিমের হিজামা পরিমাণ রক্ত ঝরানো আমার নিকট দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়েও অধিক ভয়াবহ!
প্রিয় বৎস, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, এমন একদিন আসবে, যেদিন তোমার পিতা এসব বিদআত মিটিয়ে দেবেন, আর সুন্নাহ জিন্দা করবেন? অপেক্ষা করো। আল্লাহ তাআলাই আমাদের মাঝে উত্তম ফায়সালা করবেন। আর নিশ্চয় তিনি সর্বোত্তম ফায়সালাকারী।
নয়
সাঈদ ইবনু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি মক্কার 'শাতওয়া' নামক স্থানে একটি গলিপথে অবস্থান করছিলাম। আমার পাশেই ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল আযীয আল-উমারী। এ সময় বাদশাহ হারুনুর রশীদ হজকার্য সম্পাদন করছিলেন। এমন সময় একজন এসে বলল, হে আবু আব্দির রহমান, ওই যে আমিরুল মুমিনীন! তিনি সায়ী করার জন্য লোকদের সরিয়ে রাস্তা খালি করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল আযীয লোকটিকে বললেন, আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে তোমাকে উত্তম বিনিময় না দিক! তুমি আমার ওপর এমন একটি বিষয় চাপিয়ে দিয়েছ, আমি যার মুখাপেক্ষী ছিলাম না। অতঃপর তিনি তার জুতা পরিধান করে সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন। আমিও তার পিছু পিছু গেলাম। তিনি খলীফা হারুনুর রশিদ এর দিকে এগিয়ে গেলেন। খলীফা তখন মারওয়া পাহাড় থেকে সাফা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে হাঁটছিলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন-হে হারুন, খলীফা তৎক্ষণাৎ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, বলুন হে আমার চাচা, আমি উপস্থিত।
: তুমি সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহণ করো।
অতঃপর তিনি সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন।
: এবার তুমি কাবা শরীফের দিকে দৃষ্টিপাত করো।
: জি, করেছি।
: সেখানে কী পরিমাণ লোক আছে?
: এমন কে আছে গুনতে পারে?
: আনুমানিক?
: এদের সংখ্যা একমাত্র আল্লাহই গণনা করতে পারেন।
: তুমি জেনে রাখো, হাশরের ময়দানে এদের প্রত্যেকে শুধু নিজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে; কিন্তু তুমি তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। সুতরাং, ভেবে দেখো তোমার পরিণতি কী হবে?
এরপর খলীফা হারুন কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়েন। লোকেরা তাকে একটির পর একটি রুমাল দিতে থাকে অশ্রু মোছার জন্য...
আল-উমারী বলেন—আরেকবার আমি তাকে ডেকেছিলাম। সে বলল, বলুন চাচাজান!
আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! যে তার নিজের সম্পদে অপচয় করে, সে অবশ্যই তার জবাবদিহিতায় পাকড়াও হবে। তাহলে যে-ব্যক্তি সকল মুসলিমের সম্পদে অপচয় করে, তার কী অবস্থা হবে?
এ কথা বলে তিনি চলে যান। আর বাদশাহ কাঁদতে থাকেন।
দশ
ইমাম আলী ইবনু আবি তাইয়্যিব নিশাপুরীর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন—
একবার তিনি সুলতান মাহমুদ গজনবীকে নসীহত করার উদ্দেশ্যে তার নিকট গমন করেন। এরপর বিনা অনুমতিতে দরবারে প্রবেশ করে কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই তাকে হাদীস শোনাতে আরম্ভ করেন। এতে সুলতান প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। গোলামকে নির্দেশ দেন, লোকটাকে আচ্ছামতো ধোলাই দাও! গোলাম তাকে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। উপস্থিত কিছু লোক ইমাম আলী ইবনু আবি তাইয়্যিবকে চিনত। তার ইলম ও ধার্মিকতার কথা জানত। তারা সুলতানকে তার পরিচয় খুলে বলে। এতে সুলতান ভীষণ অনুতপ্ত হন। তার নিকট ক্ষমা চান এবং তাকে কিছু উপহার-উপঢৌকন দেওয়ার নির্দেশ দেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণে অসম্মতি জানান।
এবার সুলতান বলেন, হে শাইখ, রাষ্ট্রশাসকের একটা প্রভাব আছে। তার দরবারের কিছু নিয়ম-নীতি আছে। সেগুলো মেনে চলতে হয়; কিন্তু আমি তো দেখছি, আপনি সে-সকল নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করছেন না। এখন আপনিই বলুন, এর কী সমাধান?
তিনি বলেন, আল্লাহ আমাদের সর্বোত্তম পর্যবেক্ষক। আমি তো এসেছি আপনাকে নসীহত করতে, রাসূলের হাদীস শোনাতে, অন্তরে ভয় সৃষ্টি করতে। কোনো রাষ্ট্রের নিয়মনীতি বাস্তবায়ন করতে আমি আসিনি!
এতে সুলতান মাহমুদ গজনবী লজ্জিত হন এবং তার সাথে আলিঙ্গন করেন।
ঘটনাটি ইয়াকুত আল-হামাভী রাহিমাহুল্লাহ তার তারীখুল উদাবা নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন। তিনি আরও লেখেন, সুলতান মাহমুদ গজনবী ৪৫৮ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে ইন্তেকাল করেন।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জিহাদের দিক থেকে সুলতান মাহমুদ গজনবীর মর্যাদা ও শান অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি হিন্দুস্তান-বিজেতা ছিলেন এবং অনেক দুর্জেয় স্থানসমূহ জয় করেছেন। তবে তার বেশকিছু দোষ-ত্রুটিও রয়েছে। উপর্যুক্ত ঘটনাটি সেগুলোর একটি। অবশ্য তিনি পরবর্তী সময়ে এর জন্য লজ্জিত হয়েছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
আমরা সকল অহংকারী ও দাম্ভিক বাদশাহদের হাত থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। আমরা তো এমন অনেক দাম্ভিক ও অহংকারী বাদশাও দেখছি, যারা জিহাদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। দেশে-দেশে ফিতনা-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
আফসোস এ সকল বান্দাদের জন্য!
এগারো
আব্দুর রহমান রুস্তাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইবনু মাহদীকে নতুন স্ত্রীর সঙ্গে বাসর শয্যারত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যে, তার জন্য কি কয়েক দিন নামাজের জামাআত পরিহার করার সুযোগ আছে?
তিনি বললেন, না! এক ওয়াক্তের জন্যও অনুমতি নেই!
অতঃপর যে-রাত্রিতে তার মেয়ের বাসর হলো, সেদিন ফজরের সময় তার নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি নিজের রুম থেকে বের হয়ে আযান দিলেন। মেয়ে-জামাতার দরজায় গিয়ে বাঁদিকে বললেন, তাদের দুজনকে বলো জামাআতে উপস্থিত হতে! নারী ও বাঁদিরা নামাজের জন্য বের হয়ে এলো। সবাই বলে উঠল, সুবহানাল্লাহ! আপনি এ কী শুরু করলেন?
তিনি বললেন, তারা যতক্ষণ-না বের হবে আমি থামব না; কিন্তু তারা দুজন জামাআতের পর বের হলো। এরপরও তিনি তাদের দুজনকে গলির বাহিরে এক মসজিদে পাঠিয়ে দিলেন।
বারো
মুকাতিল ইবনু সালিহ আল-খোরাসানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি হাম্মাদ ইবনু সালামার ঘরে প্রবেশ করি। তার ঘরে আসবাব-পত্র বলতে ছিল কেবল বসার একটি চাটাই, একটি কুরআন, একটি বইয়ের তাক এবং একটি অজুর পাত্র।
একদিন আমি তার ঘরে বসা ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ল। তিনি তার মেয়েকে ডেকে বললেন, দেখো তো, কে এসেছে?
সে বলে, খলীফা মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানের দূত এসেছে।
তিনি বললেন, তাকে বলে দাও—যেন ঘরে একা প্রবেশ করে। অতঃপর দূত ঘরে প্রবেশ করে বাদশাহর একটি পত্র বের করে দেয়। তাতে লেখা ছিল—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানের পক্ষ থেকে হাম্মাদ ইবনু সালামাকে। পর সমাচার এই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনার দিনটিকে অনুরূপ করুন, যেরূপ তিনি তার বন্ধু ও আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য করেছেন। একটি সমস্যা সংঘটিত হয়েছে। সমাধানের প্রয়োজন। যদি আপনি একটু আসতেন, তাহলে আপনার কাছ থেকে জেনে নিতাম। মাআস সালাম।
এবার হাম্মাদ ইবনু সালামা মেয়েকে বললেন, কলম ও কালি নিয়ে এসো এবং লেখো—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
...পর সমাচার এই যে, আল্লাহ আপনার দিনটিও অনুরূপ করুন, যেরূপ তিনি তার বন্ধু ও আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য করেছেন। নিশ্চয়ই আমরা যে সকল আলিমদের নিকট ইলম অর্জন করেছি, তারা কেউ আমাদের নিকট আসেননি। যদি কোনো মাসআলা জানার প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আসুন এবং আমাদের জিজ্ঞেস করুন। আর হ্যাঁ, যদি আপনি আসেন, তাহলে অবশ্যই একা আসবেন। পদাতিক কিংবা অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে আসবেন না। যদি তাদের নিয়ে আসেন, তবে আমি আপনার সমাধান দেব না। এতে আপনার যেমন কল্যাণ নেই, আমারও নেই! মাআস সালাম।
কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই তার ঘরে আবার কড়া নড়ল। তিনি মেয়েকে বললেন, দেখো তো দরজায় কে?
মেয়ে বলল, খলীফা মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান!
তিনি বললেন, তাকে বলে দাও, তিনি যেন ঘরে একা প্রবেশ করেন।
অতঃপর বাদশা ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সালাম দিয়ে আদবের সাথে তার সম্মুখে বসে পড়লেন। বিনয়ের সাথে বললেন, যখনই আমি আপনার দিকে তাকাই, তখনই কেমন যেন আমার ভেতর ভয় জেগে ওঠে! এটা কেন? হাম্মাদ ইবনু সালামাহ বললেন, আমি সাবিত আল-বুনানী থেকে শুনেছি, তিনি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে, তিনি শুনেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে। প্রিয় নবীজি বলেন—
إِنَّ الْعَالِمَ إِذَا أَرَادَ بِعِلْمِهِ وَجْهَ اللَّهِ هَابَهُ كُلُّ شَيْءٍ، وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَكْزَ بِهِ الْكُنُوزِ هَابَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ
কোনো আলিম যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইলম শেখেন, তখন সকল জিনিস তাকে ভয় করে। আর যখন কোনো আলিম দুনিয়ার ধন-দৌলত লাভের আশায় ইলম শেখে, তখন সে সকল জিনিসকে ভয় পায়。
এরপর খলীফা বললেন, এখানে ৪০ হাজার দিরহাম আছে। আপনি সেগুলো গ্রহণ করুন এবং আপনার অবস্থার উন্নয়ন করুন। তিনি বললেন, এগুলো যাদের থেকে জুলুম করে আনা হয়েছে তাদের ফিরিয়ে দাও। খলীফা বললেন, আল্লাহর শপথ! এগুলো আমি মীরাস-সূত্রে পেয়েছি। তিনি বললেন, আমার এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি এগুলো সরিয়ে নাও। আল্লাহ তোমার পাপের বোঝা সরিয়ে নেবেন। তিনি বললেন, তাহলে এগুলো লোকদের মাঝে বণ্টন করে দেন। তিনি বললেন, আমি ইনসাফের ভিত্তিতে বণ্টন করার পরও যদি কেউ বাদ পড়ে, তবে বলবে, আমি ইনসাফ করিনি। তারচেয়ে ভালো, তুমি এগুলো সরিয়ে নাও। আল্লাহ তোমার পাপের বোঝা সরিয়ে নেবেন।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৭; সহীহ বুখারী: ৭১৯৯; ফাতহুল বারী: ১৩/২০৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৬৩; সুনানু আবি দাউদ: ৪৩৬২; সহীহ আবু দাউদ লি-আলবানী : ৩৬৬৫
১. হজে শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপের মধ্যবর্তী স্তম্ভের নাম।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৬৪
৩. শিয়া সম্প্রদায়ের বিশেষ একটা উপদল।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৩৭৪
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৬৭২
২. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৮১
৩. আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাতী।
৪. খলীফার আরেক ভাই, যিনি তার পূর্বে খলীফা ছিলেন।
১. সহীহ বুখারী : ১; সহীহ মুসলিম: ১৯০৭
২. সহীহ বুখারী: ৬৮৭৮; সহীহ মুসলিম: ১৬৭৬
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/১২৪-১২৫
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১২৮
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৮২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৮/১৭৩, ১৭৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/২০৪
১. কানযুল উম্মাল: ৪৬১৩১; ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন: ২/১০৮৭
২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩৬১