📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সত্যের প্রতি সালাফদের আনুগত্য

📄 সত্যের প্রতি সালাফদের আনুগত্য


এক
আবু ইদ্রিস আল-খাউলানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইয়াযীদ ইবনু উমাইর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সব মজলিসেই এই কথাটি বলতেন—
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। তাঁর নাম বরকতময়। ধ্বংস তাদের, যারা এ-বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে।
অতঃপর বর্ণনাকারী একটি হাদীস বর্ণনা করেন। হাদীসটিতে বলা হয়েছে— ‘আমি মুআয ইবনু জাবালকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে বলুন, জ্ঞানী ব্যক্তি কি কখনও ভ্রান্ত কথা বলতে পারে? তিনি বললেন, অবশ্যই! জ্ঞানীদের সে-সকল প্রসিদ্ধ কথা থেকে দূরে থাকো, যা ভ্রান্ত মনে হয়। তোমার কাজ হলো তাতে মজে না যাওয়া। কারণ, যখন জ্ঞানী ব্যক্তি সত্যটা জানতে পারবে, তখন হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবে এবং সত্যের অনুসরণ করবে। কেননা, সত্যের একটা নূর আছে।

দুই
আব্দুর রহমান ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি মাসউদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—একবার আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আবু আব্দির রহমান, আমাকে উপকারী কিছু কথা শিক্ষা দিন।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ তাকে বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না! সর্বদা কুরআনের সাথে লেগে থাকো। কেউ যদি তোমার কাছে সত্য নিয়ে আসে তবে সে তোমার শত্রু হলেও সত্যটি গ্রহণ করো। পক্ষান্তরে কেউ যদি তোমার কাছে মিথ্যা নিয়ে আসে তবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হলেও মিথ্যা বর্জন করো।

তিন
আবুল আহওয়াস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমাদের কেউ যেন দ্বীনের ব্যাপারে এমনভাবে কারও অনুসরণ না করে, যদি সে ঈমান আনে তবে সেও ঈমান আনবে। আর যদি সে কুফরী করে তাহলে সেও কুফরী করবে। যদি কারও অনুসরণ করতেই হয়, তাহলে যারা গত হয়েছেন তাদের অনুসরণ করো। কেননা, জীবিতদের কেউ-ই ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।

চার
আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তোমরা 'সুযোগসন্ধানী' হয়ো না। লোকেরা বলল, 'সুযোগসন্ধানী' কারা? তিনি বললেন, যারা বলে—আমরা মানুষের সাথে আছি—মানুষ যেদিকে, আমরাও সেদিকে। যদি তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়, তবে আমরাও হেদায়েতপ্রাপ্ত। আর যদি তারা পথভ্রষ্ট হয়, তবে আমরাও পথভ্রষ্ট!
সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজেকে শক্ত করে নেয়। সবাই কাফির হয়ে গেলেও যাতে সে কাফির না হয়!

পাঁচ
কাতাদা ইবনু দিআমা থেকে বর্ণিত, মুতররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা যায়েদ ইবনু সূহান-এর নিকট আসা-যাওয়া করতাম। তিনি বলতেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করো। মানুষকে সম্মান করো। নিশ্চয়ই একজন বান্দার জন্য তার প্রভু পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হলো দুইটি-
(১) আল্লাহকে ভয় করা।
(২) তাঁর প্রতি আশা রাখা!
একবার আমি তার নিকট উপস্থিত হয়ে দেখি, সবাই মিলে একটি অঙ্গীকারনামা লিখছে। তাতে একটি বাক্য এইভাবে লেখা-
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের প্রভু! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নবী! কুরআন আমাদের পথের দিশা। যে আমাদের পক্ষে আমরাও তার পক্ষে। আর যে আমাদের বিপক্ষে আমরাও তার বিপক্ষে। আমাদের অবস্থান তার বিরুদ্ধে।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যায়েদ ইবনু সূহান উক্ত অঙ্গীকারনামাটি কিতাব আকারে উপস্থিত সকলের নিকট এক এক করে পেশ করেন এবং প্রত্যেককে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেন, এই কিতাবের ব্যাপারে তুমি কি অঙ্গীকার করছ?
এভাবে যখন আমার পালা আসে তখন লোকেরা বলে, হে বৎস, তুমি কি এর পক্ষে স্বীকৃতি দিচ্ছ? আমি বলি, না। অতঃপর যায়েদ ইবনু সূহান উপস্থিত সবাইকে বলেন, আপনারা তার ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন না এবং দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
হে বৎস, এই কিতাব সম্পর্কে তুমি কী বলো? আমি বলি, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কিতাবের ব্যাপারে আমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন। সুতরাং, সেই কিতাব ছাড়া অন্য কোনো কিতাবের ব্যাপারে আমি নতুন করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে পারব না।
অতঃপর এক এক করে উপস্থিত সকলেই নিজেদের স্বীকৃতি থেকে ফিরে আসে। অন্যরাও নতুন করে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে। অথচ সংখ্যায় তারা ছিলেন প্রায় ত্রিশজন।

ছয়
রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা আমার কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ-বিরোধী কিছু পাবে তখন তোমরা আমার কথা বর্জন করে সুন্নাহ্ আঁকড়ে ধরবে।

সাত
রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, এক ব্যক্তি তাকে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ, আপনি কি এই হাদীসটি গ্রহণ করেন? তিনি বললেন, যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশুদ্ধ কোনো হাদীস বর্ণনা করবো, কিন্তু সেটা আমি নিজে গ্রহণ করব না, তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, তখন বুঝে নেবে—আমার বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেছে।

আট
হুমাইদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ একটি হাদীস বর্ণনা করেন। আমি বললাম, আপনি কি এই হাদীসটি মানেন? তিনি বললেন, তুমি কি কখনও আমাকে গির্জা থেকে বেরুতে দেখেছ? বা আমার গলায় কোনো রশি কিংবা তাবীজ-তুমার ঝুলতে দেখেছ যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস শুনব ও বর্ণনা করব, কিন্তু সেটা গ্রহণ করব না!

নয়
রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, আমি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করি; কিন্তু সেটা গ্রহণ না করি—তাহলে আসমান-জমিনের কে আমাকে আশ্রয় দেবে?

দশ
বিচারপতি শূরাইহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَنْ قُتِلَ لَهُ قَتِيلٌ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ إِمَّا أَنْ يُودَى أَوْ يُقَادَ
যখন কোনো লোককে হত্যা করা হবে, তখন নিহতের পরিবার দুটি বিকল্প ব্যবস্থার যে-কোনো একটি গ্রহণ করতে পারবে-এক. হত্যার বদলে হত্যা। দুই. রক্তপণ
আবু হানীফা ইবনু সাম্মাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইবনু আবি যিবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি হাদীসটি গ্রহণ করেন? তিনি আমার বুকে আঘাত করলেন এবং প্রচণ্ড ধমক দিলেন! আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তিনি বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করছি আর তুমি বলছ, সেটা আমি গ্রহণ করি কি না? অবশ্যই আমি গ্রহণ করি এবং এটা গ্রহণ করা আমার জন্য ফরজ! যে শুনবে তার ওপরও ফরজ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবার মধ্য হতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পথপ্রদর্শক হিসেবে মনোনীত করেছেন। তাকে সাহায্য করেছেন। সুতরাং, সকল সৃষ্টির জন্য আবশ্যক তার আনুগত্য করা। তাকে মান্য করা। কোনো মুসলমানের জন্য এর বিকল্প কোনো উপায় নেই।

এগারো
আবুল আয়না রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন খলীফা মাহদী হজ শেষে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন, তখন তাকে দেখে সেখানে উপস্থিত সকলে দাঁড়িয়ে গেলেন, কেবলমাত্র ইবনু আবি যিব বসে রইলেন। মুসাইয়্যিব ইবনু যুহাইর তাকে বললেন, ইনি আমিরুল মুমিনীন। তার সম্মানে দাঁড়ানো উচিত! তিনি বললেন, মানুষ কেবল তার প্রতিপালকের জন্যই দাঁড়ায়।
একথা শুনে খলীফা মাহদী বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। তার কথা শুনে আল্লাহর ভয়ে আমার শরীরের প্রতিটি পশম দাঁড়িয়ে গেছে।

বারো
ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে সত্যের ব্যাপারে আমার সাথে বাড়াবাড়ি করেছে, আমাকে বাধা দিয়েছে, সে আমার দৃষ্টিতে ছোট হয়ে গেছে। আর যে সত্যকে গ্রহণ করেছে তার প্রভাব আমার অন্তরে স্থান পেয়েছে এবং তার প্রতি ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তেরো
হাতিম আল-আসম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন কেউ আমার সাথে বিতর্কে জয়লাভ করে আর তার মতাদর্শ ঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তখন আমার খুব আনন্দ লাগে। কারণ, আমি তখন নিশ্চিন্ত হই যে, যাচাইয়ের পর ঠিকটাই জানতে পেরেছি। পক্ষান্তরে যখন কেউ হেরে যায় আর তার মতাদর্শ ভুল প্রমাণিত হয়, তখন খুব দুশ্চিন্তা হয়। কারণ, এতে আমার মতাদর্শ ভুল প্রমাণিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

টিকাঃ
১. তিনি মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছাত্র ছিলেন।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৫৭
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪১৯
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪২১
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪২১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১৯৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩৪
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩৪
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১০/৩৫
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৫০৪; কাছাকাছি শব্দে সহীহ মুসলিম: ১৩৫৫; সহীহ বুখারী: ৬৮৮০
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/১৪২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/১৪৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১০/৩৩
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৪৮৭

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 ফাতাওয়া প্রদানে সালাফগণের সতর্কতা

📄 ফাতাওয়া প্রদানে সালাফগণের সতর্কতা


এক
নাফি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে একটি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার মাথা নিচু করে ফেললেন। কোনো জবাব দিলেন না। লোকটি মনে করল—তিনি হয়তো মাসআলাটি শোনেননি। তাই সে বলল, আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন! আপনি কি আমার মাসআলাটি শুনতে পেয়েছেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি; কিন্তু তোমরা কি মনে করো—যে-বিষয়ে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছ, তার উত্তর দেওয়ার পর সে-বিষয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না! আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন! একটু অপেক্ষা করো, আমি এই মাসআলাটি ভালো করে ভেবে দেখি। যদি এর কোনো সমাধান আমার জানা থাকে, তাহলে বলে দেব। আর যদি জানা না থাকে তাহলে বলব—আমার জানা নেই।

দুই
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নাফি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমার ও আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হজের মৌসুমে পৃথক পৃথক জ্ঞানমূলক আলোচনা সভার আয়োজন করতেন। ইলম পিপাসুরা তাতে ভিড় জমাতেন। আমি একেক সময় একেক মজলিসে বসতাম। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যে-কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার উত্তর প্রদান করতেন। আর যদি ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হতো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি উত্তর দিতেন না।

তিন
শুআইব ইবনু আবি হামযা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমরা শুনেছি, যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যখন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো, তিনি বলতেন, এমনটা কি আদৌ ঘটেছে? যদি তারা বলত ‘হ্যাঁ’! তাহলে তিনি তার জ্ঞান অনুযায়ী সমাধান পেশ করতেন। আর যদি তারা বলত—এখনও ঘটেনি, তাহলে তিনি বলতেন, আগে ঘটতে দাও!

চার
মুসা ইবনু উলাই ইবনি রবাহ রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করত, তাহলে তিনি বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো! এমনটা কি সত্যিই ঘটেছে? যদি সে বলত, ‘হ্যাঁ’! তবেই তিনি সে-বিষয়ে কথা বলতেন। অন্যথায় বিরত থাকতেন।

পাঁচ
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—পূর্ববর্তী কোনো একজন আলিমের মনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা উদিত হয়। তার মনে হয়, কথাটি বললে অনেক মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হবে; কিন্তু দেখা যায়, সুনাম-সুখ্যাতির ভয়ে তিনি কথাটি চেপে যান এবং সম্পূর্ণ চুপ থাকেন। এরপর যখন তার মনে হয়, এখন নীরব থাকাই ভালো তখন তিনি সেই কথাটি বলেন—'যে ফতোয়া প্রদানে অতি উৎসাহী, তার ইলম কম।'

ছয়
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো আলিম কোনো বিষয়ে জানা সত্ত্বেও তার জন্য একথা বলা জায়েয হবে কি— 'আমি জানি না'?
তিনি বললেন, যে-সব ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট প্রমাণ ও দলিল রয়েছে, সে-সব ক্ষেত্রে জায়েয হবে না। তবে যে-সব বিষয় গবেষণা-নির্ভর, সে-সব বিষয়ে অবশ্যই সেটা বলতে পারে এবং বলার অবকাশও আছে। কেননা, সে নিশ্চিত জানে না, তার গবেষণালব্ধ বিষয়টি ঠিক না ভুল!

সাত
বর্ণিত আছে, খলীফা যিয়াদাতুল্লাহ একবার একটি মাসআলা সম্পর্কে জানতে সুহনূন রাহিমাহুল্লাহর কাছে লোক পাঠান; কিন্তু সুহনূন কোনো জবাব না দিয়ে বার্তাবাহককে ফেরত পাঠান। মুহাম্মাদ ইবনু উবদুস তাকে বলল, আপনি শহর থেকে বেরিয়ে যান। গতকাল আপনি শহরের কাজীর পেছনে সালাত আদায়ে অস্বীকার করেছেন। আর আজ আমীরের প্রশ্ন প্রত্যাখ্যান করেছেন। সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ওই ব্যক্তির প্রশ্নের কীসের উত্তর, যে কিনা এগুলোকে হাসির খোরাক বানাতে চায়! যে চায়, আমার কথার সাথে অন্যের কথা মিলিয়ে স্বার্থ হাসিল করতে! যদি তার প্রশ্নের দ্বারা নিরেট দ্বীন বোঝা উদ্দেশ্য হতো, তাহলে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।

আট
আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনিল আযহার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার মুহাম্মাদ ইবনু হোসাইন আস-সিজযী আমার নিকট আগমন করেন। তিনি ইয়াযীদ ইবনু হারুন ও জাফর ইবনু আউন সম্পর্কে লিখেছিলেন। তিনি বলেন, হে আবু সাঈদ, আমার কাছে লোকেরা আসে। তারা আমাকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; কিন্তু অনেক সময় যথার্থ উত্তর না জানা সত্ত্বেও আমি আশঙ্কা করি যে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া আমার জন্য বৈধ হবে না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, কেননা, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَنْ سُيِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللَّهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে-ব্যক্তির কাছে কোনো বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সে তা গোপন করে রাখে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে আগুনের লাগام পরিয়ে দেবেন
উসমান ইবনু সাঈদ বললেন, এই হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে-সব ক্ষেত্রের কথা বলেছেন যে-সব ক্ষেত্রে তুমি জানো। পক্ষান্তরে যে-সব ক্ষেত্রে তোমার জানা নেই সে-সব ক্ষেত্রে চুপ থাকার অবকাশ আছে; বরং সেটাই উচিত।

আইয়ূব রাহিমাহুল্লাহ বলেন—কাসিম রাহিমাহুল্লাহকে বীর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি জানি না, বা আমার জানা নেই। লোকেরা তাকে পীড়াপীড়ি আরম্ভ করলে অবশেষে বাধ্য হয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা যে-সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছ, আমি তা জানি না। যদি জানতাম, তাহলে গোপন রাখতাম না। কেননা, জানা বিষয় লুকানো আমার জন্য বৈধ নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ বলেন, কাসিম রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমাকে যে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে আমি সেটা জানি না। আর যে-বিষয়ে জানা নেই, সে বিষয়ে কথা বলার চেয়ে শুধু আল্লাহকে সত্য জেনে অজ্ঞ-জীবনযাপন করাটাও শ্রেয়।

টিকাঃ
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫৬৬
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২২২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৮
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৬
১. মুসনাদে আহমাদ: ২/২৬৩; সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৫৮; সহীহ আবু দাউদ লি-আলবানী: ৩১০৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩২২
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮৯

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের কুরআন পাঠ

📄 সালাফগণের কুরআন পাঠ


এক
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন-
اقْرَأُ الْقُرْآنَ فِي شَهْرٍ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي عِشْرِينَ لَيْلَةً ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي خَمْسَ عَشْرَةَ قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةٌ، قَالَ : فَاقْرَأْهُ فِي عَشْرٍ، قُلْتُ : إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ فَاقْرَأْهُ فِي سَبْعٍ وَلَا تَزِدْ عَلَى ذَلِكَ
একমাসে পুরো কুরআন পাঠ সমাপ্ত করো। আমি বললাম, আমি এর চেয়ে অল্প সময়ে পাঠ করতে সক্ষম। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে বিশ দিনে সমাপ্ত করো। আমি বললাম, আমি এর চেয়েও কম সময়ে শেষ করার সামর্থ্য রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে সাত দিনে পাঠ শেষ করো এবং এর চেয়ে কম সময়ে শেষ করো না
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম যাহাবী লিখেছেন, বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বনিম্ন তিন দিনে কুরআন খতম করেছেন এবং এর কমে খতম করতে নিষেধ করেছেন।
তিন দিনে কুরআন পড়ে শেষ করার এই বিধান ততটুকু কুরআনের জন্য ছিল যতটুকু তখন নাজিল হয়েছিল। এই হুকুমের পর অবশিষ্ট কুরআন নাজিল হয়েছে।
সুতরাং, নিষেধের সর্বশেষ ধাপ হলো তিন দিনের কমে পূর্ণ কুরআন খতম করা অনুচিত। কেননা, এত কমে খতম করলে কুরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা-গবেষণার সুযোগ হয়ে ওঠে না। আর যদি সপ্তাহে একবার কুরআন খতম করে-ধীরে ধীরে এবং সুস্থিরভাবে তিলাওয়াত করে-তাহলে নিশ্চয় এটা হবে উত্তম আমল। কেননা, দ্বীন হলো সরল ও সহজাত বিষয়।
আল্লাহর শপথ! ধারাবাহিক নফল সালাত, চাশতের সালাত, তাহিয়্যাতুল মসজিদ, এবং সুন্নাহ সমর্থিত দুআ-আমল, ঘুমের আগে-পরের দুআ, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরের সালাতসমূহ, রাত্রিজাগরণ, উপকারী ইলম অর্জন, অর্জিত ইলমের প্রায়োগিক চর্চা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ, জনসাধারণকে হিদায়াতের পথ দেখানো, দ্বীন বোঝানো, অসৎলোকদের শাসানো, খুশু-খুযু, বিনয় ও নম্রতা, ঈমানের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয-ওয়াজিবসহ আদায় করা, কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, অধিক পরিমাণে দু'আ ও ইস্তিগফার করা, দান-সাদাকাহ করা, আত্মীয়তার বন্ধনে গুরুত্ব দেওয়া এবং এসকল কাজে বিনয় ও বিশুদ্ধ নিয়ত ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিরাতে তাহাজ্জুদের সালাতে এক-সপ্তমাংশ কুরআন পাঠ করা-অত্যন্ত মহৎ কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল; জান্নাতবাসী ও পরম সৌভাগ্যবানদের প্রধান ব্রত। আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও মুত্তাকীদের সাধনার বস্তু। এগুলো শরীয়তের রুচিসম্মত। সুতরাং, কুরআন খতমের পাশাপাশি এসবেরও প্রয়োজন আছে।
অতএব, যে আবিদ এক খতম কুরআন পড়তে তাড়াহুড়া করল, সে মূলত ইসলামের সরল ও সহজাত ধর্মমতের বিরোধিতা করল। এছাড়া কুরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা-গবেষণার পাশাপাশি যে-সব ইবাদতের কথা আমরা উল্লেখ করলাম, সেগুলো থেকেও বঞ্চিত হলো। আমাদের আদর্শ, আল্লাহর ওলী ও তাঁর রাসূলের প্রিয়ভাজন আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস যখন বয়ঃবৃদ্ধ হয়ে পড়েন তখন প্রায়ই বলতেন,
হায় আফসোস! যদি আমি যুবক বয়সে ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া ছাড় গ্রহণ করতাম!'

দুই
আল-মুসাইব ইবনু রাফি' রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'হাফিযে কুরআনের উচিত, রাতের বেলায় ইবাদত করা-যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। দিনে সিয়াম পালন করা-যখন মানুষ আহার করে। কুরআন নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকা-যখন মানুষ আনন্দে থাকে। যথাসম্ভব কান্নারত থাকা-যখন মানুষ হাসি-আনন্দে মেতে থাকে। নীরবতা অবলম্বন করা-যখন মানুষ অধিক মেলামেশা করে। হৃদয়ে খুশু-খুযু আনা-যখন মানুষ নানা বিষয়ে কল্পনা করে।
হাফিযে কুরআনের আরও উচিত হলো, সর্বদা কান্নারত, চিন্তাশীল, সহনশীল, প্রজ্ঞাবান ও শান্ত-সভ্য থাকা। রুক্ষ, অলস, হট্টগোলকারী ও বদমেজাজি হওয়া তাদের জন্য মোটেও উচিত নয়।'

তিন
কাতাদা ইবনু দিআমা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইউনুস ইবনু যুবায়ের রাহিমাহুল্লাহ বলেন-একবার কোনো এক সফরে আমরা জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিদায় জানাচ্ছিলাম। সে মুহূর্তে আমি তাকে বললাম, আমাদের কিছু নসীহত করুন। তিনি বললেন-
আমি প্রথমে আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে অসিয়ত করছি এবং অসিয়ত করছি কুরআনের ব্যাপারে। নিশ্চয় কুরআন আঁধার রাতের আলো। দিনের আলোয় পথপ্রদর্শক। সুতরাং, তোমরা কষ্ট-সাধনা করে হলেও কুরআনের ওপর আমল করো। যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হও, তাহলে তার মোকাবেলায় আগে সম্পদ পেশ করো। দ্বীন নয়। যদি বিপদ এর চেয়েও বড় হয়, তাহলে তোমার জান-মাল পেশ করো। তবুও তোমার দ্বীন নয়। নিশ্চয়ই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে, যার দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই নিতান্ত নিঃস্ব সে, যে তার দ্বীনকে খুঁইয়ে দিয়েছে। জেনে রেখো, জান্নাতে কোনো দারিদ্র্য নেই! আর জাহান্নামে কোনো ধনাঢ্যতা নেই।

চার
আবু ইমরান আল-যাওনী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একসময় আমরা কয়েকজন বালক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকতাম। আমরা তার নিকট কুরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছিলাম। এরপর কুরআন শিখেছিলাম। ফলে কুরআন তিলাওয়াত করলে আমাদের ঈমান ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকত!

পাঁচ
আতা ইবনুস সাইব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দির রহমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন-আমরা এমন কিছু মানুষের নিকট কুরআন শিখেছি, যারা আমাদের বলেছেন, তারা প্রথমে কুরআনের ১০টি আয়াত শিখতেন। এরপর সেই দশ আয়াতের মর্ম বুঝে তার ওপর আমল করার আগ পর্যন্ত অন্য দশ আয়াত শিখতেন না। ফলে আমরাও কুরআন শেখার পাশাপাশি আমলে অভ্যস্ত হয়েছি; কিন্তু আমাদের পর শীঘ্রই এমন কিছু লোকের আগমন ঘটবে, যারা কুরআনকে পানি পান করার মতো সহজে গিলতে থাকবে। অথচ তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না।

ছয়
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ফুযায়িল রাহিমাহুল্লাহর কুরআন পাঠ ছিল খুবই হৃদয়গ্রাহী, চিন্তা উদ্রেককারী ও ধীরস্থির। তার তিলাওয়াত শুনে মনে হতো তিনি যেন মানুষকে নসীহত করছেন। যখন তার তিলাওয়াতে জান্নাতের প্রসঙ্গ আসত, তখন বার বার তিনি আয়াতের পুনারাবৃত্তি করতেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ৫০৫৪; সহীহ মুসলিম: ১৮৪
১) সুনানু আবি দাউদ: ১৩৯০, ১৩৯১; সহীহ আবু দাউদ লি আলবানী: ১২৩৯, ১২৪০
১. সহীহ বুখারী: ৫০৫২ (আংশিক), সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৮৪
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪১৩
৩. বিশেষ নসীহত ও উপদেশ।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৭৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/২৬৯
৪. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৮

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের ইবাদত-মগ্নতা

📄 সালাফগণের ইবাদত-মগ্নতা


এক
আসিম আল-আহওয়াল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু উসমান আন-নাহদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমি আবু যর গিফারী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলাম, তিনি পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে তার বাহনের ওপর নুয়ে আছেন। ধারণা করলাম, তিনি হয়তো ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আবু যর, আপনি কি ঘুমাচ্ছিলেন? তিনি বললেন, না; আমি তো সালাত পড়ছিলাম।

দুই
আহনাফ রাহিমাহুল্লাহকে বলা হলো, আপনার তো বয়স হয়েছে। এ অবস্থায় সিয়াম পালন করলে আপনি আরও দুর্বল হয়ে পড়বেন।
উত্তরে তিনি বললেন, আমি তো এক দীর্ঘ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
প্রসিদ্ধ আছে, আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ সারারাত সালাতে নিরত থাকতেন। কখনও তিনি তার আঙুল আগুনের ওপর ঠেসে ধরে বলতেন, স্বাদ চেখে নাও। ভালোভাবে চেখে নাও! ওহে আহনাফ, কোন জিনিস তোমাকে অমুক অমুক দিনের কাজগুলো করতে উৎসাহিত করেছিল?

তিন
আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলেন-আমি বিখ্যাত সাহাবী তামিম আদ-দারীর নিকট এলাম। তিনি আমার সাথে আলাপ করলেন। একপর্যায়ে আমি তাকে বললাম, আপনি দৈনিক কতটুকু তিলাওয়াত করেন? তিনি বললেন, তুমি সম্ভবত ওই সকল লোকদের কেউ, যারা রাতে কুরআন তিলাওয়াত করে আর সকালবেলা বলে বেড়ায়-গতরাতে আমি পুরো কুরআন খতম করেছি। ওই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! মাত্র তিন রাকাত নফল সালাত আদায় করা-রাতভর পুরো কুরআন খতম করে সকালে তা মানুষের মাঝে বলে বেড়ানোর চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয়!
তার কথা শুনে আমি রাগতঃস্বরে বললাম, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আপনারা রাসূলের সঙ্গপ্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম। আপনাদের মধ্যে যারা জীবিত, তাদের উচিত-নীরবতা অবলম্বন করা। সুতরাং, যারা আপনাদের নিকট কিছু জানতে চায়, তাদের সাথে কঠোরতা করবেন না। ভর্ৎসনার পাত্র বানাবেন না।
আমাকে রাগান্বিত হতে দেখে তিনি কোমল হলেন। বললেন, প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র, তোমার কি ধারণা, যদি আমি শক্তিশালী মুমিন হতাম আর তুমি হতে দুর্বল, তবে কি তুমি আমার শক্তি-সামর্থ্যকে তোমার দুর্বলতার ওপর প্রয়োগ করতে? কখনও না। কিংবা তুমি যদি শক্তিশালী হও, আর আমি হই দুর্বল! তাহলে কি আমি তোমার শক্তি-সামর্থ্যকে আমার দুর্বলতার ওপর চাপিয়ে নেব? কখনও না! অতএব, তুমি তোমার সামর্থ্যের ওপর স্থির থাকো, আর আমি আমার সামর্থ্যের ওপর স্থির থাকি। নিজের প্রতি লক্ষ্য রেখে দ্বীনকে গ্রহণ করো! আর দ্বীনের প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেকে প্রস্তুত করো! যাতে সাধ্যমতো ইবাদতের ওপর টিকে থাকাটা তোমার জন্য সহজ হয়।

চার
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কিত পূর্বোক্ত হাদীসের টিকায়। ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন, অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সিয়ামের ব্যাপারেও শিথিলতা অবলম্বন করার উপদেশ দেন। তিনি বলেন-
فَصُمْ يَوْمًا وَأَفْطِرْ يَوْمًا فَذَلِكَ صِيَامُ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامِ
তুমি একদিন সিয়াম পালন করো, অপরদিন আহার করো। সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে এটা দাউদ আলাইহিস সালামের বিশেষ রীতি।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাও বলেছেন-
إِنَّ أَفْضَلَ الصِّيَامِ صِيَامُ دَاوُدَ
সর্বোত্তম নফল সিয়াম হলো দাউদ আলাইহিস সালামের অনুসৃত সিয়াম।
এছাড়াও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাগাতার সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন।
অধিকন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের কিছু অংশে ইবাদত করে বাকি অংশে ঘুমানোর আদেশ করেছেন। তিনি বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
নিশ্চয়ই আমি রাতের কিছু অংশে ইবাদত করি আর কিছু অংশে নিদ্রা যাই। কখনও সিয়াম পালন করি। আবার কখনও আহার করি। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং, যে-ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত বলে বিবেচিত হবে না।২
যে-ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখে না, সুন্নতের তোয়াক্কা করে না, সে অবশ্যই অনুতপ্ত হবে। বৈরাগ্যবাদের অনুসারী হবে। তার মেজাজ বিগড়ে যাবে। মুমিন ও মুসলিমদের প্রতি দরদ ও কল্যাণকামিতায় মহানবীর যে আদর্শ-তা থেকে সে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে সর্বদা সর্বোত্তম আমলের শিক্ষা দান করেছেন। তিনি চিরকুমারত্ব ও বৈরাগ্যবাদ বরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। কেননা, তিনি এগুলোর উদ্দেশ্যে প্রেরিত হননি। তিনি নিষেধ করেছেন দিনের পর দিন সিয়াম পালনে এবং এক সাহরিতে টানা দু'দিন সিয়াম পালন করার ব্যাপারে। রামাদানের শেষ দশ দিন ব্যতীত সারারাত ইবাদত করা থেকেও তিনি নিষেধ করেছেন। নিষেধ করেছেন সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বিবাহে অনীহা এবং হালাল প্রাণীর গোশত ভক্ষণে অনাগ্রহ প্রকাশে।
সুতরাং, ইলম-বিহীন কেউ যদি এসব কাজ করে, তবে কিছু-না কিছু-প্রতিদান সে অবশ্যই পাবে; কিন্তু সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞাত কোনো আলিম যদি সুন্নাহ উপেক্ষা করে এসব করে, তবে তা হবে বাতুলতা ও বাড়াবাড়ি।
আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম আমল হলো-যার ওপর টিকে থাকা যায়-যদিও সেটা পরিমাণে অল্প হয়!
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের ও আপনাদের সকলকে তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন এবং তার বিরোধিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে হিফাযত করুন

পাঁচ
তারিক ইবনু শিহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, প্রত্যেক রাতে মানুষ তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
■ প্রথম শ্রেণি—রাতটা তাদের পক্ষে যায়; বিপক্ষে নয়।
■ দ্বিতীয় শ্রেণি—রাতটা তাদের বিপক্ষে যায়; পক্ষে নয়।
■ তৃতীয় শ্রেণি—রাতটা তাদের পক্ষেও যায় না; আবার বিপক্ষেও না।
আমি বললাম, কীভাবে কী? একটু বুঝিয়ে বলুন!
তিনি বললেন, রাত যাদের পক্ষে, বিপক্ষে নয়—তারা হলো ওই সমস্ত মানুষ, যারা রাতের অন্ধকার ও মানুষের অচেতনতাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। অতঃপর অজু করে সালাতে দাঁড়িয়ে যায়। এই রাত তাদের পক্ষে।
আর যে-সকল লোক রাতের আঁধার ও মানুষের অচৈতন্যের সুযোগে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়; রাত তাদের বিপক্ষে; পক্ষে নয়।
আর যারা ঘুমিয়ে পড়ে এবং সকাল হলে তাদের ঘুম ভাঙে; রাত তাদের পক্ষেও নয়; আবার বিপক্ষেও নয়।
তারিক ইবনু শিহাব বলেন, আমি মনে মনে সংকল্প করলাম, অবশ্যই এই লোকটির সাহচর্য লাভ করব এবং তার আমলের খোঁজ নেব। ইত্যবসরে একটি কাফেলা তৈরি হলো। ওই কাফেলায় সালমান ফারসীও ছিলেন। আমি তাদের সঙ্গী হলাম; কিন্তু সফরে তার বিশেষ কোনো আমল দেখলাম না। যদি আমি আটার খামিরা তৈরি করতাম, তাহলে তিনি রুটি বানাতেন। আর যদি আমি রুটি বানাতাম, তাহলে তিনি সেটা সেঁকতেন।
রাতের বেলা কাফেলা যাত্রায় বিরতি দেয়। আমি রাতের কিছু অংশে সালাত আদায়ে অভ্যস্ত ছিলাম। আমি যখন জাগ্রত হলাম, দেখলাম, তিনি ঘুমন্ত। মনে মনে বললাম, তিনি তো আল্লাহর রাসূলের সাহাবী। তার ঘুম আমার রাত্রিজাগরণ থেকেও শ্রেষ্ঠ। অতঃপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর আবার জাগ্রত হই। তখনও দেখলাম তিনি ঘুমে; কিন্তু যখন তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতেন, তখন এই দুআটি পড়তেন—
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ لا إله إلا الله وحدهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ، وله الحمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আমি আল্লাহ তাআলার গুণগান কীর্তন করছি, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার নিমিত্তে, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোনো মাবুদ নেই, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক। তার কোনো শরিক নেই। সার্বভৌমত্বের মালিক তিনি। সকল প্রশংসা তাঁর। তিনি সবকিছুর ওপর সামর্থ্যবান।
যখন ফজরের কিছু সময় বাকি, তখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অজু করলেন এবং চার রাকাত সালাত আদায় করলেন।
অতঃপর ফজরের সালাত আদায় করার পর তাকে বললাম, হে আল্লাহর বান্দা, রাতের কিছু অংশে আমি ইবাদত করেছি। আর আপনাকে দেখেছি, রাতভর ঘুমোতে। তিনি বললেন, হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি কি রাতের বেলা আমার মুখে কিছু শুনেছ! আমি বললাম, একটি দুআ পড়তে শুনেছি। তিনি বললেন, হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, এই দুআ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় পাপ মোচন করে দেয়।
হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, মধ্যপন্থা অনুসরণ করো, আর মধ্যপন্থা অনুসরণ করাই হলো সর্বোত্তম নীতি।

ছয়
আসাদ ইবনু ওদাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শাদ্দাদ ইবনু আউস রাহিমাহুল্লাহ যখন বিছানায় যেতেন, তখন শুধু এপাশ-ওপাশ করতেন। ঘুম আসত না তার। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ, জাহান্নামের আগুন আমার ঘুম হারাম করে দিয়েছে। অতঃপর বিছানা থেকে উঠে যেতেন এবং সকাল পর্যন্ত সালাতে কাটিয়ে দিতেন।

সাত
আসাদ ইবনু ওদাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শাদ্দাদ ইবনু আউস যখন বিছানায় যেতেন, তখন তিনি কেমন যেন জলন্ত কড়াইয়ের শস্যদানার ন্যায় ছটফট করতেন। আর বলতেন, হে আল্লাহ, তোমার জাহান্নামের ভয় আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এরপর সারারাত সালাতে কাটিয়ে দিতেন।

আট
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম বাগাভী রাহিমাহুল্লাহর সূত্রে বর্ণনা করেন, আবুল আহওয়াস বলেন, একবার মানসুর ইবনু মু'তামির-এর এক প্রতিবেশীর মেয়ে বলে, আব্বু, গতরাতে মানসুর চাচার বাড়ির ছাদে দাঁড় করানো যে-কাষ্ঠ খণ্ড দেখেছিলাম, সেটা কোথায়?
মেয়েটির বাবা বলেন, মা, ওটা তো তোমার মানসুর চাচা ছিলেন। তিনি সেখানে সারারাত সালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন।

নয়
নুআইম ইবনু হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক যখন কিতাবুর রিকাক অর্থাৎ আখিরাতের স্মরণ ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ীত্ব বিষয়ক হাদীসসমূহ পড়তেন, তখন জবাইকৃত গরুর ন্যায় ছটফট করতেন আর কাঁদতেন। এ সময় আমাদের কারও সাহস হতো না তাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করার-যতক্ষণ না তিনি স্বাভাবিক হতেন।

দশ
ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আসিম ইবনু ইসাম আল-বাইহাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একরাতে আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহর সাথে ছিলাম। তিনি আমার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে কিছু পানি এনে রাখেন। সকালবেলা পানি পূর্বাবস্থায় দেখে বলে ওঠেন, সুবহানাল্লাহ, লোকটা ইলমের গবেষণায় এত নিমগ্ন যে, সারারাত তার অজুরও প্রয়োজন হয়নি!

এগারো
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
যখন তুমি রাত্রিজাগরণে সক্ষম হবে না, দিনেও সিয়াম পালন করতে পারবে না, তখন বুঝে নেবে, তুমি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। তোমার পাপ তোমার হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে।

বারো
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ আহমাদ ইবনু আবি হাওয়ারী আস-সুফীর জীবনীতে কোনো এক কথা-প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন-
আমি বলি, প্রশংসনীয় পথ হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ ও তার শরীয়ত। আর তার দেখানো পথের মধ্যে রয়েছে-পরিমিত পরিমাণে হালাল রিযিক গ্রহণ করা এবং অপচয় থেকে বেঁচে থাকা। কেননা, কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
হে রাসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন।
এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
নিশ্চয়ই আমি রাতের কিছু অংশে ইবাদত করি আর কিছু অংশে নিদ্রা যাই। কখনও সিয়াম পালন করি। আবার কখনও সিয়াম পালন করা থেকে বিরত থাকি। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং, যে-ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয় বলে বিবেচিত হবে।
মোটকথা, ইসলাম সন্ন্যাসবাদ, বৈরাগ্যবাদ এবং এক সাহরীতে একাধারে দুই সিয়াম বা লাগাতার সিয়াম পালন করাকে সমর্থন করে না; বরং ইসলাম হলো-সরল ও সহজাত ধর্ম। অতএব, যখন সম্ভব হবে মুসলমান তখন ভালো খাবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঘোষণা করেছেন-
لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ
বিত্তশালী ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।
ইলম-বিহীন আবিদ যখন দুনিয়াবিমুখ হয়, যুহদ অবলম্বন করে, বিবাহ থেকে বিরত থাকে, আহার বর্জন করে, নির্জনে বাস করে এবং গুঁড়ো লবণ ও শুকনো রুটি খেয়ে জীবনধারণ করে তখন তার মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন আসে। সে মনে করে, তার অনুভূতিশক্তি তীক্ষ্ণ ও পরিচ্ছন্ন হয়েছে। নফসের নড়াচড়াগুলো ধরতে পারছে। অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অনাহার ও অনিদ্রার ফলে তার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা ও হাহাকার তৈরি হয়। এটাকেই সে মহান আল্লাহর বিশেষ সাড়া জ্ঞান করে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে; কিন্তু আল্লাহর কসম! বাস্তবিক পক্ষে এর আদৌ কোনো ভিত্তি নেই। এটা মূলত শয়তানের বিশেষ প্ররোচনা।
কিন্তু সে এটাকেই বুজুর্গী মনে করে আর ভাবে, সে যুহদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে। তার মর্যাদার উন্নতি হচ্ছে। আসলে শয়তান তাকে কাবু করে ফেলেছে। তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। ফলে সে অন্যান্য মুমিনদের তুচ্ছ ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে। তাদের পাপের কথা স্মরণ করে। আর নিজেকে মনে করে, বিরাট কিছু! অনেক বড় আবিদ। সামান্য কিছু হলে সে ভাবে, আল্লাহর ওলী হয়ে গেছে, তার কারামাত প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। আবার কখনও তার মনে সন্দেহ জাগে, তার ঈমান টলে যায়। এসব কারণে আমাদের শরীয়তে একাকিত্ব, ক্ষুধা, ও বৈরাগ্যবাদের কোনো স্থান নেই।
তবে হ্যাঁ, আত্মশুদ্ধির পথ অবলম্বন করা, সর্বদা যিকিরে নিমগ্ন থাকা, মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা না করা, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, কান্নাকাটি করা, গভীর চিন্তা-ফিকির ও ধীর-স্থিরতার সাথে কুরআন তিলাওয়াত করা, প্রবৃত্তি দমন করা, আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সম্মুখে নিজের ত্রুটি স্বীকার করা, সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে অধিক সিয়াম পালন করা, প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ পড়া, সর্বস্তরের মুসলিমদের সাথে বিনম্র আচরণ করা, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা, উদার ও সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকা, অভাবের সময়েও দান করা, সবসময় সত্য বলা-যদিও সেটা প্রিয়জনের কাছে তিক্ত হয়, সৎকাজের আদেশ করা, মানুষকে ক্ষমা করা, অজ্ঞদের এড়িয়ে চলা, ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা, বাইতুল্লাহর যিয়ারত করা, সর্বাবস্থায় হালালকে গ্রহণ করা, অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার পড়া-এসব কিছুই ওলী-আওলিয়া ও মুহাম্মাদী গুণে গুণান্বিত মানুষের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব-চরিত্র। আল্লাহ তাআলা তাদের ভালোবাসা হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের মৃত্যু নসীব করুন।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৭৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৯১-৯২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/৪৪৬
১. দেখুন: পৃষ্ঠা: ৯৯
২. সহীহ বুখারী: ১৯৭৬; সহীহ মুসলিম: ১১৫৯
৩. সহীহ মুসলিমে আছে, 'দাউদ আলাইহিস সালামের সিয়াম-পদ্ধতির চেয়ে সিয়াম পালনের উত্তম কোনো পদ্ধতি নেই।' সহীহ মুসলিম: ২/৮১৭। সহীহ বুখারীতে আছে, 'যে সর্বদা সিয়াম পালন করে, তার সিয়াম সিয়াম-ই না।' সহীহ বুখারী: ১৮৬
১. সিয়াম পালন করি না।
২. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৮৪-৮৫
১. সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৫৪৯-৫৫০
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৪০৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৯৪
৩. 'লোকটা' বলে তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২৯৮
১. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৮
২. সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১
৩. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১
১. সূরা তালাক, আয়াত: ৭
২. আমলকারী
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৮৯-৯১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00