📄 নেতৃত্বের প্রতি সালাফগণের অনীহা
এক
আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'নেতৃত্ব গ্রহণের পূর্বে তোমরা দ্বীনের গভীর ইলম অর্জন করো। কেননা, যে-ব্যক্তি দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে, সে কখনও নেতৃত্ব কামনা করে না।'[১]
দুই
মুসা ইবনু উকবাহ রাহিমাহুল্লাহ তার মাগাযী নামক গ্রন্থে লেখেন- গাযওয়ায়ে আমর ইবনুল আস[২]-যুদ্ধে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রু পক্ষ থেকে প্রচণ্ড আক্রমণের আশঙ্কা করেন। তাই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্যের আবেদন করে পত্র লেখেন। প্রিয় নবীজির আহ্বানে উঁচু পর্যায়ের মুহাজির সাহাবীগণ এগিয়ে আসেন। তাদের মাঝে আবু বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-ও শরীক ছিলেন। সাহায্যকারী এ দলের আমীর বানানো হয় আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে।
এই সাহায্যকারী বাহিনী আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পৌঁছলে তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমি তোমাদের আমীর। মুহাজিরগণ বলেন, না; বরং আপনি আপনার দলের আমীর। আর আমাদের[১] আমীর হলেন আবু উবায়দা। আমর ইবনুল আস বলেন, তোমরা আমার সাহায্যে এসেছ। সুতরাং, আমার অধীনেই থাকবে। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন খুবই নরম প্রকৃতির একজন মানুষ এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী। তিনি ব্যাপারটি দেখে বললেন, আমর ইবনুল আস-ই নেতৃত্ব দেবেন। আর আমরা তার অধীনে থাকবো।[২]
তিন
হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার নাজরানের কিছু লোক এসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একজন বিশ্বস্ত নেতা নিয়োগের আবেদন করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাজরানবাসীকে লক্ষ্য করে বলেন-
GG لَأَبْعَثَنَّ إِلَيْكُمْ رَجُلًا أَمِينًا حَقَّ أَمِينٍ আমি তোমাদের নিকট এমন এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করব, যে আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত।
এ কথা শোনার পর সকল সাহাবী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রেরণ করেন।[৩]
চার
আমির ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার পিতা সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি ছাগলের পাল ছিল। একবার তার ছেলে উমার তার নিকট আসে। তিনি দূর থেকে তাকে দেখেই বলেন, আমি আল্লাহর নিকট এ অশ্বারোহীর অনিষ্ট হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অতঃপর সে তার কাছে এসে বলে, আব্বাজান! আপনি গ্রাম্য লোকদের মতো ছাগলের পাল নিয়ে সন্তুষ্ট! অথচ মদীনায় মানুষ নেতৃত্ব নিয়ে ঝগড়া করছে! তিনি তার বুকে আঘাত করে বলেন, চুপ! আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
GG إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুত্তাকী, অল্পেতুষ্ট ও নির্জনতা অবলম্বনকারী বান্দাকে ভালোবাসেন [১]
পাঁচ
মাসরুর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মজলিসে শূরার প্রধান নির্বাচিত করা হয়, তখন আমার দৃষ্টিতে তিনিই ছিলেন খলীফা হওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার। তার পরবর্তী পর্যায়ে ছিলেন, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু।
এসময় আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আমার সাথে সাক্ষাতে এসে বলেন, আল্লাহর ব্যাপারে তোমার মামা আব্দুর রহমান ইবনু আউফ এর কী ধারণা? যদি তিনি অন্য কাউকে খলীফা বানান, এ কথা জেনেও যে, তিনি নিজেই এ দায়িত্বের অধিক হকদার-তাহলে আল্লাহর নিকট তিনি কী জবাব দেবেন?
আমি আব্দুর রহমান ইবনু আউফের নিকট এসে ব্যাপারটি তুলে ধরি। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! যদি আমার গলায় ছুরি চালানো হয় এবং তা আমার কণ্ঠনালি ভেদ করে ফেলে-তবুও তা আমার নিকট খলীফা হওয়ার চেয়ে অধিক প্রিয়।[২]
ছয়
আব্দুর রহমান ইবনু আযহার রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, একবার উসমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাক দিয়ে অনর্গল রক্ত বের হতে থাকে। তিনি তার গোলাম হুমরানকে ডেকে বলেন, লিখে নাও, আমার পর খলীফা হবেন আব্দুর রহমান ইবনু আউফ। হুমরান তৎক্ষণাৎ তা লিখে ফেলে।
এই পত্র নিয়ে হুমরান আব্দুর রহমান ইবনু আউফের নিকট গিয়ে বলে, আপনার জন্য সুসংবাদ!
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কীসের সুসংবাদ?
সে বলল, খলীফাতুল মুসলিমীন উসমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মৃত্যুর পর আপনাকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করেছেন।
একথা শোনামাত্র আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাসূলের রওজা ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে যান এবং দু-হাত তুলে বলেন-
হে আল্লাহ, যদি উসমান তার পরে আমাকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে আপনি তার পূর্বেই আমাকে উঠিয়ে নিন।
এরপর মাত্র ছয় মাস তিনি জীবিত ছিলেন! রাযিয়াল্লাহু আনহু।[১]
সাত
একবার সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুর রহমান ইবনু আউফের নিকট এই বলে লোক পাঠান যে, আপনি মানুষের সামনে খলীফা হওয়ার দাবি করুন! আব্দুর রহমান ইবনু আউফ তখন মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন। একথা শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, ধ্বংস হও! উমারের পর যে-ই খলীফা হয়েছে, সে-ই মানুষের কাছে তিরস্কৃত হয়েছে।[২]
আট
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সর্বোত্তম আমল হলো-শূরার সিদ্ধান্তের সময় নিজেকে খিলাফতের প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং উম্মাহর জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা, যার পক্ষে বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিরা মত দিয়েছেন। তিনি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে গোটা উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্বটা দারুণভাবে আঞ্জাম দিয়েছেন। যদি তিনি পক্ষাবলম্বন করতেন, পক্ষপাতদুষ্ট হতেন-তাহলে নিজেই খলীফা হয়ে বসতেন; কিংবা তার চাচাতো ভাই সাদ ইবনু আবি ওক্কাসকেই খলীফা বানাতেন। [১]
নয়
আইয়্যাশ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইয়াযীদ ইবনু মুহাল্লাব খোরাসানের গভর্নর হওয়ার পর লোকদের বলেন, তোমরা আমাকে জ্ঞানে-গুণে শ্রেষ্ঠ কোনো ব্যক্তির সন্ধান দাও। লোকেরা তাকে আবু বুরদাহ আল-আশআরীর সন্ধান দেয়।
তিনি তৎক্ষণাৎ আবু বুরদাহ আল-আশআরীকে দরবারে ডেকে পাঠান। আবু বুরদাহ ছিলেন একেবারে ভুখা-নাঙ্গা ও দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট নিতান্ত সাধারণ একজন মানুষ; কিন্তু যখন ইয়াযীদ ইবনু মুহাল্লাব তার সাথে কথা বললেন, তখন তাকে লোকমুখে শোনা বৈশিষ্ট্যের চেয়ে উত্তম মনে হলো। তিনি বললেন, আমি আপনাকে আমার অমুক অমুক কাজের দায়িত্ব প্রদান করছি। আবু বুরদাহ অপারগতা প্রকাশ করলেন; কিন্তু গভর্নর তার ওজর আমলে নিলেন না। এবার তিনি বললেন, মহামান্য আমীর, আমি কি আপনাকে একটি হাদীস শোনাতে পারি, যে হাদীসটি আমি আমার পিতার কাছ থেকে শুনেছি, আর তিনি শুনেছেন সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে?
ইয়াযীদ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই।
তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ مَنْ تَوَلَّى عَمَلا وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَيْسَ لِذَلِكَ الْعَمَلِ بِأَهْلٍ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে-ব্যক্তি জানে, সে কোনো কাজের উপযুক্ত নয়; তথাপি সে ওই কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয় [১]
মাননীয় আমীর, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি যেই কাজের দিকে আমায় ডাকছেন, আমি তার উপযুক্ত নই।
ইয়াযীদ বললেন, আপনি আমাদেরকে আপনার ব্যাপারে উৎসাহ দেননি। এ পদ আপনি চেয়েও নেননি। সুতরাং, কথা না বাড়িয়ে কাজে যোগ দিন। কোনোভাবেই আমি আপনাকে ছাড়ছি না।
অগত্যা তিনি ইয়াযীদের প্রস্তাব মেনে নেন এবং দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর আমীরের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেন। তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। এবার তিনি বললেন, মাননীয় আমীর, আমি কি আপনাকে একটি হাদীস শোনাবো না, যে হাদীসটি আমি আমার পিতার কাছ থেকে শুনেছি, আর তিনি শুনেছেন সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে?
ইয়াযীদ বললেন, জি, অবশ্যই।
আবু বুরদাহ বললেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- GG مَلْعُونٌ مَنْ سَأَلَ بِوَجْهِ اللهِ ، وَمَلْعُونُ مَنْ سُبِلَ بِوَجْهِ اللهِ ثُمَّ مَنَعَ سَابِلَهُ ، مَا لَمْ يَسْأَلُ هَجْرًا
যে-ব্যক্তি আল্লাহর দোহাই দিয়ে কিছু চায়, সে অভিশপ্ত এবং সেও অভিশপ্ত, যার কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে কিছু চাওয়া হয়; কিন্তু সে চাহিদাকৃত বস্তুটা মন্দ না হওয়া সত্ত্বেও তাকে দেয় না।
মাননীয় আমীর, আমি আপনার কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে অব্যাহতি চাইছি। এবার আমীর তাকে অব্যাহতি দেন। [২]
দশ
ইউসুফ ইবনু আসবাত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত-সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মানুষের মাঝে নেতৃত্ব বিমুখতার যে-অভাব, তা অন্য কোনো বিষয়ে আমি দেখিনি। তুমি খেয়াল করলে দেখবে, মানুষ খাবার-দাবার, ধন-সম্পদ ও পোশাক-আশাকে অনীহা প্রকাশ করে। এড়িয়ে চলে; কিন্তু যদি তাকে নেতৃত্বের আহ্বান করা হয়, তাহলে তাকে আঁকড়ে ধরে; বরং তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। [১]
টিকাঃ
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৬
[২] এই যুদ্ধকে 'যা-তুস সালাসিল'ও বলা হয়। দেখুন- তারীখুত তাবারী: ৩/৩২; আল ইসাবাত: ৫/২৮৬ শামের নিকটবর্তী কোনো এক অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছিল।
[১] সাহায্যকারী দলের
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮-৯
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১১, এই হাদীসটি সহীহ বুখারী: ৩৭৪৫; সহীহ মুসলিম: ২৪২০- ছাড়াও আরও অনেক হাদীসগ্রন্থে এসেছে। আলোচ্য হাদীসের শিক্ষা হলো-সাহাবীগণ কখনই ক্ষমতার জন্য লালায়িত ছিলেন না। তবে রাসূলের মুখে এমন বিশ্বস্ততার সাক্ষ্যলাভে ধন্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সবার মনেই বিরাজ করত।
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১০২; সহীহ মুসলিম: ২৯৬৫; মুসনাদে আহমাদ: ১/১৬৮
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৮৭-৮৮; ইবনু সাদের আত-তাবাকাত: ৩/৪/৯৪-৯৫
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮৮
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮৭, বর্ণনাকারীগণ সবাই নির্ভরযোগ্য।
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮৬
[১] মুজামুল কাবীর-তাবারানী, ইবনু আসাকীর
[২] বর্ণনাটি আল্লামা বুয়ানী ইমাম আহমাদের সূত্রে তার মুসনাদে উল্লেখ করেছেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৩৪৫; বর্ণিত প্রথম হাদীসটির সনদে আব্দুল্লাহ ইবনু আইয়্যাশ ছাড়া সবাই গ্রহণযোগ্য। আবু হাতিম বলেন, আইয়্যাশের মুখস্থশক্তি দুর্বল। তবে তার লিখিত পত্র গ্রহণযোগ্য। ইমাম আবু দাউদ ও নাসায়ী তাকে যয়ীফ সাব্যস্ত করেছেন। শাওয়াহেদ-বর্ণনায় ইমাম মুসলিম তাকে এনেছেন। একক বর্ণনায় আনেননি। ঘটনাটি পরিপূর্ণরূপে এসেছে ইবনু আসাকীর-এর তারীখগ্রন্থে: ৩৮৭। আর দ্বিতীয় হাদীসটি আবু মুসা আশআরী থেকে ইমাম তাবারানী উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটি আল্লামা রুয়ানী ইমাম আহমাদের সূত্রে তার মুসনাদের ৪৯৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন。
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/২৬২
📄 ধর্মীয় বিষয়ে সালাফগণের দক্ষতা
এক
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, বুদ্ধিমান সে নয়, যে কেবল জানে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ! বরং বুদ্ধিমান তো সে, যে জানে, দুটি মন্দের মাঝে কোনটি তুলনামূলক ভালো!
দুই
আনবাসা আল-খাসআমী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি জাফর ইবনু মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, ধর্মীয় বিষয়ে বাক-বিতণ্ডা করা থেকে বিরত থাকো। কেননা, তা অন্তরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে এবং মুনাফিকির দিকে টেনে নিয়ে যায়।
তিন
হাফিয ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ তার আত-তামহীদ নামক বইয়ে লেখেন—
আব্দুল্লাহ আল-উমারী আল-আবিদ ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহর নিকট একটি পত্র লেখেন। তাতে তিনি ইমাম মালিককে নির্জনতা ও একাগ্রচিত্তে ইবাদত করার উপদেশ দেন。
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ তার জবাবে লেখেন- ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জীবিকা বণ্টনের মতো আমলসমূহ বণ্টন করে রেখেছেন। কারও জন্য সালাত সহজ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সিয়াম সহজ করা হয়নি। আবার কারও জন্য সাদাকাহ সহজ করা হয়েছে; কিন্তু সিয়াম সহজ করা হয়নি। আবার কারও জন্য জিহাদ সহজ করা হয়েছে। আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইলমের প্রচার-প্রসার করাও একপ্রকার জিহাদ। আলহামদু লিল্লাহ! মহান আল্লাহ আমার জন্য এটা সহজ করে দিয়েছেন এবং আমি এটা নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্টও। তাছাড়া আমার ধারণামতে, আপনার আর আমার কাজ পরস্পরবিরোধী নয়। আশা করি-আমরা উভয়ে সৎ ও কল্যাণের পথেই রয়েছি’
চার
ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ তার আল-ইলম নামক বইয়ে উল্লেখ করেন, বিখ্যাত আলিম ইবনু ওয়াহাব বলেন, ইলম শেখার আগে আমি ইবাদত শুরু করে দিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে শয়তান আমার মনে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়; আল্লাহ পিতা ছাড়া তাকে কীভাবে সৃষ্টি করলেন? ব্যাপারটা আমার মাথায় একেবারে জেঁকে বসে। তাই এক শাইখের নিকট বিষয়টি পেশ করলাম। তিনি বললেন, ইবনু ওয়াহাব! তুমি আগে ইলম শেখো।
এটাই ছিল আমার আলিম হয়ে ওঠার প্রধান কারণ!
পাঁচ
আবু ইয়াহইয়া জাকারিয়া আসসাজী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লামা মুযানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-একবার আমার মনে উদ্ভট কিছু প্রশ্নের আনাগোনা শুরু হয়। আমি ভাবতে থাকি, এই মুহূর্তে কেউ যদি আমার অন্তরে জেগে ওঠা প্রশ্নের সমাধান দিতে পারেন এবং তাওহীদের ব্যাপারে আমার চিন্তা পরিশুদ্ধ করতে পারেন-তাহলে তিনি হলেন ইমাম শাফিয়ী।
সুতরাং, আমি তার কাছে গেলাম। তিনি তখন মিসরের একটি মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমি বললাম, তাওহীদের ব্যাপারে আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। আমি জানতে পারলাম, এবিষয়ে আপনার জানাশোনা সবার চেয়ে ভালো। এখন আমার প্রশ্নের উত্তর কি আপনার কাছে পাব?
এতে তিনি খুব নারাজ হয়ে বললেন, তুমি জানো—এটা কোন শহর?
আমি বললাম, জি!
তিনি বললেন, এটা সেই শহর, যেখানে আল্লাহ ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছেন। কেউ কি তোমাকে বলেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব প্রশ্ন করতে আদেশ করেছেন?
: জি না!
: কোনো সাহাবী কি এ বিষয়ে কখনও আলাপ-আলোচনা করেছেন?
: জি না!
: তুমি কি জানো, আসমানে কতগুলো তারা আছে?
: জি না!
: তন্মধ্যে কোন তারাটা কোন গুণের? কোন পরিচয়ের? তার উদয়স্থল ও কক্ষপথ কোথায় এবং কী দিয়ে সেগুলোকে সৃষ্টি করা হয়েছে?
: জি না!
: যে সৃষ্টিকে তুমি নিজ চোখে দেখছ, তার সম্পর্কেই তুমি কিছু জানো না, আর সেই তুমিই কিনা তার স্রষ্টা তথা আল্লাহর ইলম সম্পর্কে কথা বলতে চাচ্ছ!
এরপর তিনি অজু সম্পর্কিত কিছু মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। আমি সেখানেও ভুল করলাম। এ সম্পর্কিত আরও চারটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। আমি সেগুলোরও সদুত্তর দিতে পারলাম না। এবার তিনি বললেন, দিনে অন্তত পাঁচবার যে-কাজটা করতে হয়, সে-ই কাজের ইলম হাসিল না করে তুমি পড়ে আছ আল্লাহর ইলম নিয়ে!
যখনই তোমার মনে এমন কোনো কিছুর উদয় হবে, তখনই আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে এবং তাঁর এই বাণীটি স্মরণ করবে—
وَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ..
তোমাদের উপাস্য হচ্ছেন এক আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই। তিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে আল্লাহর নিদর্শন রয়েছে।
সুতরাং, সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টার ব্যাপারে নির্দেশনা লাভ করবে। এমন ইলমের পেছনে পড়বে না, যে পর্যন্ত তোমার বিবেক-বুদ্ধি পৌঁছতে অক্ষম। মুযানী বলেন, তার این বক্তব্য শুনে আমি তাওবা করি।
ছয়
আবুল হাসান আব্দুল মালিক আল-মাইমুনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-এক ব্যক্তি আবু আব্দিল্লাহ-কে বলল, একবার আমি বাযযার-এর পিছু নিয়েছিলাম তাকে সতর্ক করব বলে। কারণ, আমি জানতে পেরেছিলাম, তিনি আল-আওয়াস থেকে আব্দুল্লাহর সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। হাদীসটি হলো-
مَا خَلَقَ اللهُ شَيْئًا أَعْظَمُ مِنْ آيَةِ الْكُرْسِيِّ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আসমান-জমিনের কোনো কিছুকেই আয়াতুল কুরসী থেকে বড় করে সৃষ্টি করেননি।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট' এ নিয়ে ফিতনার এই যুগে এমন হাদীস প্রচার না করাই উত্তম। মূল হাদীসটি হচ্ছে-
مَا خَلَقَ اللهُ مِنْ سَمَاءٍ وَلَا أَرْضٍ أَعْظَمُ مِنْ آيَةِ الْكُرْسِيِّ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সাত আসমান-জমিনের কোনোটিকেই আয়াতুল কুরসী থেকে বড় করে সৃষ্টি করেননি।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট'-এই ফিতনার যুগে যখন তারা এসব হাদীস বর্ণনা করবে, তখন সেখানে 'সৃষ্টি'র ক্রিয়াটি কেবল আসমান-জমিন ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে; কুরআনের ক্ষেত্রে নয়।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, অনুরূপ মুহাদ্দিসগণের উচিত—এমন সব হাদীস প্রচার না করা, যার বাহ্যিক অর্থ দ্বারা প্রবৃত্তিপূজারী, ভ্রান্ত আকীদায় বিশ্বাসী ও সুন্নাতের দুশমনেরা ফায়দা লুটতে পারে এবং ওইসব হাদীসও বর্ণনা না করা, যাতে এমন গুণবাচক আলোচনা রয়েছে, যা অন্য কোনোভাবে প্রমাণিত নয়। কেননা, যখনই শ্রোতার চিন্তাশক্তির বাইরের হাদীস বর্ণনা করা হবে, তখনই তাতে কিছু লোক ফিতনার সম্মুখীন হবে।
সুতরাং, যেটা ইলম, সেটা প্রকাশ করতে হবে; তবে সম্পূর্ণ মূর্খ বা এমন লোকদের কাছে নয়-যারা এর উল্টোটা বুঝবে!
সাত
আল-মাররুযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি ইবরাহীম আল-হুসরীকে ইমাম আহমাদ-এর নিকট পাঠাই। তিনি বলেন, আমার আম্মা আপনাকে স্বপ্নে এমন এমন দেখেছেন এবং আপনার জান্নাতে প্রবেশের কথাও উল্লেখ করেছেন। তখন ইমাম আহমাদ বলেন, প্রিয় ভাই, সাহল ইবনু সালামাকেও লোকেরা এমন সংবাদ দিয়েছিল। অথচ তিনি রক্তপাতের পথে হেঁটেছেন। এরপর তিনি বলেন, আসলে স্বপ্ন প্রকৃত মুমিনকে আনন্দিত করে। প্রবঞ্চিত করে না।
আট
আবুল হুসাইন আল-আতাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইবরাহীম আল-হারবীকে তার নিকট উপস্থিত এক জামাআতকে লক্ষ্য করে বলতে শুনেছি, 'তোমাদের যুগে তোমরা কাকে সবচেয়ে গরীব মনে করো?
একজন বলল, যে প্রবাসে আছে সে-ই 'গরীব'।
অপরজন বলল, যে তার প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন সে-ই 'গরীব'।
ইবরাহীম আল-হারবী বললেন, বর্তমানে সবচেয়ে গরীব ওই ব্যক্তি, যে নিজে সৎকর্মশীল ও সৎকর্মশীলদের মাঝেই বসবাস করে। অধিকন্তু সে সৎকাজের আদেশ করলে লোকেরা তাকে সহায়তা করে; আর খারাপ কাজে বাধা প্রদান করলে লোকেরা তাকে সহযোগিতা করে। পার্থিব কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে লোকেরা তা পূরণ করে। অতঃপর একসময় সে-সকল লোক তাকে একা ফেলে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। তখন সে-ই সবচেয়ে গরীব।'
নয়
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ আব্বাসী খলীফা মু'তাযিদ বিল্লাহর জীবনীতে উল্লেখ করেন-
কাযী ইসমাঈল বলেন, একবার আমি খলীফা মু'তাযিদ বিল্লাহর দরবারে প্রবেশ করি। তিনি আমাকে একটি কিতাব দেন। আমি কিতাবটি নেড়েচেড়ে দেখি, তাতে আলিমগণের ত্রুটি-বিচ্যুতি জমা করা হয়েছে। তাদের সমালোচনা করা হয়েছে। আমি বলি, এর লেখক একজন ধর্মবিদ্বেষী।
খলীফা বলেন, কেন? এতে বর্ণিত হাদীস ও দলিল কি সঠিক নয়?
আমি বলি, অবশ্যই সঠিক; কিন্তু যে আলিম নেশাকে বৈধ বলেছেন, তিনি কিন্তু মুতআকে অবৈধ সাব্যস্ত করেছেন। যিনি মুতআকে বৈধ বলেছেন, তিনি কিন্তু গান-বাজনা হারাম বলেছেন। এমন কোনো আলিম নেই, যার কোথাও-না-কোথাও ভুল নেই; কিন্তু যে-ব্যক্তি আলিমগণের ভুলভ্রান্তি খুঁজে খুঁজে বের করে, তার দ্বীন বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। সব বরবাদ হয়ে যায়।
এরপর খলীফা মু'তাযিদ বিল্লাহ সেই কিতাবটি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।
দশ
ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি বারবাহারীকে বলতে শুনেছি, 'পরস্পরের প্রতি কল্যাণ কামনায় যে-মজলিসের আয়োজন করা হয়, তা উপকারিতা ও বদান্যতার দুয়ার খুলে দেয়। আর যে-মজলিস বিতর্ক-বাহাসের জন্য হয়, তা উপকারিতার দুয়ারকে বন্ধ করে দেয়।
এগারো
ইবনুল আরাবী আবুল হুসাইন আন-নূরীর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম যাহাবী বলেন, আবুল হুসাইন আন-নূরী যখন ইন্তেকাল করেন তখন লোকজন তার পাশে বসে বসে এমনকিছু অসার কথায় মেতে ওঠে, যেগুলো থেকে বিরত থাকাই ছিল উত্তম। কেননা, তারা বিষয়টা নিয়ে আন্দাজে ও ভবিষ্যদ্বাণীর মতো করে কথা বলছিল এবং অসার ও অমূলক কথাবার্তার বন্যা বইয়ে দিচ্ছিল।
সেই সোনালি যুগের মানুষগুলোর অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে তাদের পরে আগত-অনাগতদের অবস্থা কেমন হতে পারে! তিনি আরও বলেন, লোকজন 'জমা' নিয়ে আলোচনা করে। একেকজন এর একেকরকম ব্যাখ্যা দেয়। 'জমা'র মতো 'ফানা'র প্রকৃতি নিয়েও তারা মতভেদ করে। যদিও তারা বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রকম নামবাচক শব্দ ব্যবহার করে; তথাপি এগুলোর অর্থ, বাস্তবতা ও গতি-প্রকৃতি ছিল তাদের কাছে অস্পষ্ট। কারণ, একই নামের অধীনে অসংখ্য দিক ও অবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তিনি আরও বলেন, ইলমুল মারিফাত এক অথৈ সমুদ্র। এই শাস্ত্রের কোনো সীমারেখা কিংবা যতিচিহ্ন নেই।
এমনকি তিনি বলেন, এ বিষয়ে একজন খুব চমৎকার মন্তব্য করেছেন- 'যখন কাউকে দেখবে 'জমা' ও 'ফানা' নিয়ে প্রশ্নোত্তর করছে, তখন বুঝবে, সে একেবারে শূন্য ও জ্ঞানরিক্ত। সে এই শাস্ত্রের বিদ্বানও নয়, বিজ্ঞও নয়; কেননা, এই শাস্ত্রের বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞরা 'জমা' ও 'ফানা' সম্পর্কে কাউকে প্রশ্ন করেন না। কারণ, এটা বর্ণনা করে না বোঝা যায়, আর না বোঝানো যায়!
ইমাম যাহাবী বলেন, আল্লাহর শপথ! এই বিষয়ে তারা সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে নেমেছিলেন। গভীর থেকে গভীরে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। রহস্যের পর রহস্যের সমুদ্রে সাঁতার কেটেছিলেন; কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও বাস্তবে এই বিষয়ে তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত ছিল সম্পূর্ণ অনুমান-নির্ভর! এমনকি তারা যে 'ফানা ফিল্লাহ'-তথা আল্লাহর প্রেমে মিটে যাওয়া, জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়া এবং মাতাল হয়ে যাওয়ার দাবি করত, সে দাবিও ছিল মূলত কল্পনা ও ওয়াসওয়াসা মাত্র।
এদের মতো কথা না আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, না কোনো আল্লাহওয়ালা বলেছেন, আর না কোনো তাবিয়ী ইমাম বলেছেন। যদি কেউ এদের কাছে কখনও এসবের প্রমাণ চায় তবে তার ওপর দিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যাবে। তারা বলবে, তুমি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত!
যদি কেউ এদের হাতে নিজের লাগام ছেড়ে দেয় তাহলে তার ঈমানের বারোটা বাজবে। তাকে অন্যরকম এক অস্বস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সে তখন আবেদদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখবে, মুফাসসির ও মুহাদ্দিসদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবে। আর বলতে থাকবে-আরে! এরা তো নিষ্কর্মা, আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ!
তাসাওউফ, আত্মশুদ্ধি ও সুলুক তো তাকেই বলে, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত। যেমন, তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। তাকওয়া ও খোদাভীতিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন।
আল্লাহর পথে জিহাদ করেছিলেন। শরীয়তের যাবতীয় শিষ্টাচারে শোভিত ছিলেন। তারা বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কুরআনের আয়াত নিয়ে গভীর চিন্তা-ফিকির করতেন। খুশু-খযু সহকারে দীর্ঘসময় সালাত পড়তেন। সময়মতো সিয়াম, ইফতার ও দান-সাদাকাহ করতেন। অন্যকে প্রাধান্য দিতেন। জনসাধারণের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করতেন। মুমিনদের সম্মুখে নম্রতা ও কাফিরদের সামনে কঠোরতা প্রদর্শন করতেন। এতসব গুণাবলী আহরণ করার পরেও আল্লাহ তাআলা যাকে চান তাকেই সত্য পথের দিশা দেন।
সুতরাং, একজন আলিম যখন প্রকৃত তাসাওউফ থেকে বিরত থাকেন তখন তিনি শূন্য গৃহের মতো হয়ে পড়েন-ঠিক যেমন কোনো তাসাওউফপন্থী সুন্নাহর জ্ঞান আহরণ থেকে বিরত থাকলে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
বারো
আব্বাসী খলীফা মুসতানযিদ বিল্লাহর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন-
যখন কোনো দেশের বাদশাহ বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও ধার্মিক হন, তখন রাষ্ট্রের সকল বিষয় তার দ্বারা যথাযথভাবে পরিচালিত হতে থাকে।
আর যদি তিনি দুর্বল মেধা ও ভঙ্গুর চিন্তাশক্তির অধিকারী হন; কিন্তু তার ধার্মিকতা ও দ্বীনদারী ঠিক থাকে, তাহলেও তার এই ধার্মিকতা ও দ্বীনদারী বিচক্ষণ উপদেষ্টাদের পরামর্শের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনায় সাহায্য করে এবং রাষ্ট্রের বিষয়গুলো তার দ্বারা যথাযথভাবে পরিচালিত হতে থাকে।
কিন্তু যদি তার দ্বীনদারী কম হয়, আর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা যথার্থ হয়, তাহলে দেশের জনগণ তার ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে। তার বিচক্ষণতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো পার্থিব দিক দিয়ে দেশ ও জনগণকে ভালো রাখা সম্ভব, কিন্তু পরকালের দিক দিয়ে কিছুতেই সম্ভব নয়।
আর যদি তার দ্বীন ও ধার্মিকতা এবং বিবেক ও বুদ্ধি-দুটিই অপূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে দেশের পতন অনিবার্য! প্রজাদের ধ্বংস অবধারিত। এমন বাদশাহর প্রজারা খুব কষ্টের শিকার হয়ে থাকে। তবে যদি প্রজাদের মাঝে তার সাহসিকতা, কঠোরতা, শাসনের ভয় ও হুকুমের প্রভাব থাকে-তাহলে সে ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যায়; কিন্তু যদি তিনি ভীতু, পাপাচারী, যালিম, নিষ্ঠুর ও মোটা বুদ্ধির অধিকারী হন-তাহলে তার বিপদ অত্যাসন্ন। এমন বাদশাহ শীঘ্রই পদস্থলিত হবে। যদি তাকে হত্যা করা নাও হয়, কারাগারের লৌহকপাটে আবদ্ধ করে রাখা হবে। এতে তার দুনিয়াও ধ্বংস হবে, আর আখিরাত তো আগেই বরবাদ হয়েছে! বরং তার এ ভুলের জন্য তাকে চরম লাঞ্ছিত ও অনুতপ্ত হতে হবে। আল্লাহর কসম! সেই লজ্জা ও লাঞ্ছনা, অনুতাপ ও অনুশোচনা তার কোনো কাজে আসবে না।
আজ আমরা একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত রাষ্ট্রনেতার অপেক্ষায় চরম হতাশায় দিনাতিপাত করছি। আমরা যদি চাই, আল্লাহ আমাদের জন্য একজন সৎ, যোগ্য ও ধর্মপরায়ণ রাষ্ট্রনেতার ব্যবস্থা করে দিন, তাহলে আমাদের উচিত হবে এই দুআটি বেশি বেশি করা-
হে আল্লাহ, আপনি রাজা ও প্রজা-উভয়কে সত্য পথে পরিচালিত করুন। আপনার বান্দাদের ওপর রহম করুন। তাদের সৎকাজের তাওফীক দিন। তাদের বাদশাহকে শক্তিশালী করুন। আর আপনার দেখানো পথের মাধ্যমে তাকে সাহায্য করুন!
তেরো
ইমাম ওয়াকী ইবনুল জাররাহর 'বিচ্যুতি' সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন-
ইমাম ওয়াকী ইবনুল জাররাহ মারাত্মক একটি ভুল বিষয়ে জড়িয়ে পড়েন। অবশ্য তার উদ্দেশ্য সৎ ছিল। তিনি সে-বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করলেই পারতেন; কিন্তু সেটা আর হয়নি। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
كَفى بالمرء إِثْمًا أَنْ يُحَدِثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
কারও পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাইবাছাই ছাড়া) তা-ই বলে বেড়ায়
সুতরাং, বান্দা যেন তার প্রভুকে ভয় করে এবং আপন গোনাহের ব্যাপারে সতর্ক থাকে।
এরপর ইমাম যাহাবী ওয়াকী ইবনুল জাররাহ-এর উক্ত বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করে বলেন-আলী ইবনু খশরুম বলেন, আমাদের কাছে ওয়াকী ইবনুল জাররাহ বলেছেন, তিনি শুনেছেন ইসমাঈল ইবনু আবি খালিদ থেকে, তিনি শুনেছেন আব্দুল্লাহ আল-বাহাই থেকে।
আব্দুল্লাহ আল-বাহাই বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। রাসূলের দিকে ঝুঁকে তার কপালে চুমু খান। এরপর বলেন, আমার মাতা-পিতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক। আপনার জীবন-মৃত্যু কতই না উত্তম ছিল!
অতঃপর আব্দুল্লাহ আল-বাহাই বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক-দিন এক-রাত এভাবেই রেখে দেওয়া হয়। এতে তার পেট মুবারক ফেঁপে ওঠে, আঙুল ফুলে যায়।
আলী ইবনু খশরুম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ওয়াকী ইবনুল জাররাহ এ হাদীস মক্কায় অবস্থানকালে বর্ণনা করেন। এতে কুরাইশ বংশের লোকেরা তার ওপর ক্ষেপে যান। তারা তাকে শূলে চড়ানোর সংকল্প করেন। এমনকি সবকিছুর বন্দোবস্তও করে ফেলেন। এমন সময় ইমাম সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ এসে বলেন, আরে! আরে! তোমরা এসব কী করছ? আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি তো ইরাকের অন্যতম প্রসিদ্ধ ফকীহ এবং ফকীহের সন্তান। আর এ হাদীস তো খুবই প্রসিদ্ধ।'
ইমাম সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ বলেন, আমি নিজেও এ হাদীস কখনও শুনিনি; কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল তাকে শূলে চড়ানো থেকে বাঁচানো।
আলী ইবনু খশরুম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হাদীসটি ওয়াকী ইবনুল জাররাহ থেকে তখন শুনেছি, যখন লোকেরা তাকে শূলে চড়াতে উদ্যত হয়েছিল। ঠিক ওই মুহূর্তেও তার সাহসিকতা ও দৃঢ়তা দেখে আমি অবাক হয়েছি। তিনি নাকি তার স্বপক্ষে দলিল দিতে গিয়ে এও বলেছেন যে, 'সাহাবীগণের একটি বড় জামাআত-তাদের মাঝে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন-তারা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা যাননি। তাই আল্লাহ তাআলা তার মৃত্যুর কিছু আলামত তাদের প্রত্যক্ষ করিয়েছেন।
ঘটনাটি আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আলী ইবনি রাযীন আল-বাশানী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আলী ইবনু খশরুম। উক্ত হাদীস ওয়াকী ইবনুল জাররাহ থেকে কুতাইবা ইবনু সাঈদও বর্ণনা করেছেন।
নিঃসন্দেহে এটি ওয়াকী ইবনুল জাররাহ-এর পদস্খলন। অন্যথায় এমন পরিত্যাজ্য ও সনদ-বিচ্ছিন্ন হাদীস প্রচার করায় তার কোনো স্বার্থ-ই থাকতে পারে না! বস্তুত তার মন একটি ভুলের দিকে তাকে টেনে নিয়ে গেছে। আর যারা তার বিরোধিতা করেছে, তারাও ছিলেন অপারগ; বরং তারা এমনটা করায় প্রতিদানও পাবেন। নবুওয়াতের মর্যাদারক্ষায় তারা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। কারণ, তারা ভেবেছিলেন, একটি ভুল ও পরিত্যাজ্য হাদীসের প্রসার হচ্ছে এবং এর দ্বারা নবুওয়্যাতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে।
চৌদ্দ
যাকারিয়া আস-সাজী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আবদিল হাকাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বলেছেন, হে মুহাম্মাদ, যদি কেউ তোমার কাছে জানতে চায়, কুরআন সাধারণ একটি মাখলুক নাকি আল্লাহর বিশেষ একটি গুণ, তাহলে তুমি কোনো উত্তর দিয়ো না। কেননা, কেউ যদি তোমাকে রক্তপণ সম্পর্কে প্রশ্ন করে, আর তুমি এক দিরহাম বা তার ছয়ভাগের একভাগের সমপরিমাণ বলো তাহলে সে বলবে-তুমি 'ভুল করেছ!' পক্ষান্তরে যদি তোমাকে কালামুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে আর তুমি ভুল করো, তাহলে বলবে, তুমি কাফির হয়ে গেছ।
পনেরো
রবী'আ থেকে বর্ণিত, ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্ক-বাহাস অন্তর পাষাণ করে দেয় এবং অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে!
ষোলো
তাহির ইবনু খলল্ফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহতাদী বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসিক বলেন, যখন আমার পিতা কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতেন, তখন সেখানে আমাদের উপস্থিত রাখতেন। একবার খেযাব লাগানো বয়োবৃদ্ধ এক কয়েদীকে উপস্থিত করা হয়। তার বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য আমার পিতা আবু আব্দিল্লাহ ও তার সঙ্গী ইবনু আবি দুআদকে ডেকে পাঠান। এরপর সেই বয়োবৃদ্ধ কয়েদীকে দরবারে উপস্থিত করা হলে সে বলে, আমীরুল মুমিনীন, আসসালামু আলাইকুম।
উত্তরে আমার পিতা বলেন, তোমার সালামের কোনো জবাব হবে না!
সে বলে, হে আমীরুল মুমিনীন, যে আপনাকে আদব শিখিয়েছে, সে খুব বাজে আদব শিখিয়েছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَإِذَا حُمِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
আর যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হবে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে। অথবা জবাবে তাই দেবে।
ইবনু আবি দুআদ ততক্ষণে দরবারে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি বলেন, আমীরুল মুমিনীন, তার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।
: ঠিক আছে! বলুন।
: হে শাইখ, কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট! মাখলুক না গায়রে মাখলুক?
: আমার সাথে ইনসাফের আচরণ করা হয়নি। তাছাড়া আমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে।
: ঠিক আছে! তাহলে আপনিই আগে বলুন!
: কুরআনের ব্যাপারে আপনি কী বলেন? কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট?
: কুরআন মাখলুক। কুরআন সৃষ্ট।
: বিষয়টি কি এমন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন? কিংবা আবু বকর, উমার ও খুলাফায়ে রাশেদীন? নাকি তারাও জানতেন না?
: বিষয়টি এমন যে, তারা এটি জানতেন না।
: সুবহানাল্লাহ! যে বিষয়টা রাসূল জানতেন না, সেটা আপনি জেনে গেছেন? এবার ইবনু আবি দুআদ লজ্জিত হয়ে বললেন,
: আমাকে ক্ষমা করবেন। আসলে তারা ব্যাপারটা জানতেন।
: তাহলে তারা জানতেন; কিন্তু মানুষকে এর দিকে আহ্বান করেননি? দাওয়াত দেননি?
: হ্যাঁ
: তাহলে যা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, তা কি তোমার পক্ষে সম্ভব নয়?
মুহতাদী বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসিক বলেন, আমার পিতা এমন সময় তাদের আলোচনায় শরীক হন, যখন শাইখ বলছিলেন, বিষয়টি কি এমন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন? কিংবা আবু বকর, উমার ও খোলাফায়ে রাশেদীন? নাকি তারাও জানতেন না?
তখন তিনি চারশ দিনার উপহারসহ শাইখকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়ার আদেশ করেন।
এই ঘটনার পর ইবনু আবি দুআদ আব্বার কাছে ছোট হয়ে যান। এরপর আর কোনোদিন আব্বা তাকে ডাকেননি।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৭৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/২৬৪
৩. ঘটনাটি মুখস্থ লিখছি। মূল পাণ্ডুলিপি এখন আমার কাছে নেই।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/১১৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/২২৪
১. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৬৩-১৬৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩১
৩. ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ
১. আদ্দুররুল মানসুর: ১/৩৩২
২. কথাটি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাণী থেকে সংকলিত। দেখুন: সহীহ মুসলিমের ভূমিকা: ১/১১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৫৭৮
৪. তিনি একজন নেককার আবিদ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২২৭
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩৬২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৪৬৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৯১
৩. 'জমা', 'ফানা ফিল্লাহ'-এসব মারেফাত সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এগুলোর অর্থ ও অবয়ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। সম্পাদক।
১. শরীয়তের বিমূর্ত রূপরেখাকে যারা বিবর্তিত করে কিংবা ইসলামের মৌলিক বিধানাবলী পালন না করে তরীকতের নামে শরীয়ত বহির্ভূত পথে হাঁটে, এখানে কেবল তাদের কথাই বলা হয়েছে।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৪০৯-৪১০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৪১৮
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯২; সহীহ আবি দাউদ লি-আলবানী: ৪১৭৭
১. বিস্তারিত দেখুন--আল-কামিল লি-ইবনু আদী : ৬৫৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৯/১৫৯-১৬০
৩. আকীদা শাস্ত্রে এই বিষয়টি 'খালকু কুরআন' নামে সমধিক পরিচিত।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১০/২৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/২৮
২. বিশিষ্ট আব্বাসি খলীফা
৩. সূরা নিসা, আয়াত: ৮৬
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৩১২
📄 সত্যের প্রতি সালাফদের আনুগত্য
এক
আবু ইদ্রিস আল-খাউলানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইয়াযীদ ইবনু উমাইর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সব মজলিসেই এই কথাটি বলতেন—
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। তাঁর নাম বরকতময়। ধ্বংস তাদের, যারা এ-বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে।
অতঃপর বর্ণনাকারী একটি হাদীস বর্ণনা করেন। হাদীসটিতে বলা হয়েছে— ‘আমি মুআয ইবনু জাবালকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে বলুন, জ্ঞানী ব্যক্তি কি কখনও ভ্রান্ত কথা বলতে পারে? তিনি বললেন, অবশ্যই! জ্ঞানীদের সে-সকল প্রসিদ্ধ কথা থেকে দূরে থাকো, যা ভ্রান্ত মনে হয়। তোমার কাজ হলো তাতে মজে না যাওয়া। কারণ, যখন জ্ঞানী ব্যক্তি সত্যটা জানতে পারবে, তখন হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবে এবং সত্যের অনুসরণ করবে। কেননা, সত্যের একটা নূর আছে।
দুই
আব্দুর রহমান ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি মাসউদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—একবার আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আবু আব্দির রহমান, আমাকে উপকারী কিছু কথা শিক্ষা দিন।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ তাকে বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না! সর্বদা কুরআনের সাথে লেগে থাকো। কেউ যদি তোমার কাছে সত্য নিয়ে আসে তবে সে তোমার শত্রু হলেও সত্যটি গ্রহণ করো। পক্ষান্তরে কেউ যদি তোমার কাছে মিথ্যা নিয়ে আসে তবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হলেও মিথ্যা বর্জন করো।
তিন
আবুল আহওয়াস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমাদের কেউ যেন দ্বীনের ব্যাপারে এমনভাবে কারও অনুসরণ না করে, যদি সে ঈমান আনে তবে সেও ঈমান আনবে। আর যদি সে কুফরী করে তাহলে সেও কুফরী করবে। যদি কারও অনুসরণ করতেই হয়, তাহলে যারা গত হয়েছেন তাদের অনুসরণ করো। কেননা, জীবিতদের কেউ-ই ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।
চার
আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তোমরা 'সুযোগসন্ধানী' হয়ো না। লোকেরা বলল, 'সুযোগসন্ধানী' কারা? তিনি বললেন, যারা বলে—আমরা মানুষের সাথে আছি—মানুষ যেদিকে, আমরাও সেদিকে। যদি তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়, তবে আমরাও হেদায়েতপ্রাপ্ত। আর যদি তারা পথভ্রষ্ট হয়, তবে আমরাও পথভ্রষ্ট!
সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজেকে শক্ত করে নেয়। সবাই কাফির হয়ে গেলেও যাতে সে কাফির না হয়!
পাঁচ
কাতাদা ইবনু দিআমা থেকে বর্ণিত, মুতররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা যায়েদ ইবনু সূহান-এর নিকট আসা-যাওয়া করতাম। তিনি বলতেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করো। মানুষকে সম্মান করো। নিশ্চয়ই একজন বান্দার জন্য তার প্রভু পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হলো দুইটি-
(১) আল্লাহকে ভয় করা।
(২) তাঁর প্রতি আশা রাখা!
একবার আমি তার নিকট উপস্থিত হয়ে দেখি, সবাই মিলে একটি অঙ্গীকারনামা লিখছে। তাতে একটি বাক্য এইভাবে লেখা-
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের প্রভু! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নবী! কুরআন আমাদের পথের দিশা। যে আমাদের পক্ষে আমরাও তার পক্ষে। আর যে আমাদের বিপক্ষে আমরাও তার বিপক্ষে। আমাদের অবস্থান তার বিরুদ্ধে।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যায়েদ ইবনু সূহান উক্ত অঙ্গীকারনামাটি কিতাব আকারে উপস্থিত সকলের নিকট এক এক করে পেশ করেন এবং প্রত্যেককে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেন, এই কিতাবের ব্যাপারে তুমি কি অঙ্গীকার করছ?
এভাবে যখন আমার পালা আসে তখন লোকেরা বলে, হে বৎস, তুমি কি এর পক্ষে স্বীকৃতি দিচ্ছ? আমি বলি, না। অতঃপর যায়েদ ইবনু সূহান উপস্থিত সবাইকে বলেন, আপনারা তার ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন না এবং দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
হে বৎস, এই কিতাব সম্পর্কে তুমি কী বলো? আমি বলি, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কিতাবের ব্যাপারে আমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন। সুতরাং, সেই কিতাব ছাড়া অন্য কোনো কিতাবের ব্যাপারে আমি নতুন করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে পারব না।
অতঃপর এক এক করে উপস্থিত সকলেই নিজেদের স্বীকৃতি থেকে ফিরে আসে। অন্যরাও নতুন করে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে। অথচ সংখ্যায় তারা ছিলেন প্রায় ত্রিশজন।
ছয়
রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা আমার কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ-বিরোধী কিছু পাবে তখন তোমরা আমার কথা বর্জন করে সুন্নাহ্ আঁকড়ে ধরবে।
সাত
রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, এক ব্যক্তি তাকে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ, আপনি কি এই হাদীসটি গ্রহণ করেন? তিনি বললেন, যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশুদ্ধ কোনো হাদীস বর্ণনা করবো, কিন্তু সেটা আমি নিজে গ্রহণ করব না, তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, তখন বুঝে নেবে—আমার বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেছে।
আট
হুমাইদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ একটি হাদীস বর্ণনা করেন। আমি বললাম, আপনি কি এই হাদীসটি মানেন? তিনি বললেন, তুমি কি কখনও আমাকে গির্জা থেকে বেরুতে দেখেছ? বা আমার গলায় কোনো রশি কিংবা তাবীজ-তুমার ঝুলতে দেখেছ যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস শুনব ও বর্ণনা করব, কিন্তু সেটা গ্রহণ করব না!
নয়
রবী'আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি, আমি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করি; কিন্তু সেটা গ্রহণ না করি—তাহলে আসমান-জমিনের কে আমাকে আশ্রয় দেবে?
দশ
বিচারপতি শূরাইহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَنْ قُتِلَ لَهُ قَتِيلٌ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ إِمَّا أَنْ يُودَى أَوْ يُقَادَ
যখন কোনো লোককে হত্যা করা হবে, তখন নিহতের পরিবার দুটি বিকল্প ব্যবস্থার যে-কোনো একটি গ্রহণ করতে পারবে-এক. হত্যার বদলে হত্যা। দুই. রক্তপণ
আবু হানীফা ইবনু সাম্মাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইবনু আবি যিবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি হাদীসটি গ্রহণ করেন? তিনি আমার বুকে আঘাত করলেন এবং প্রচণ্ড ধমক দিলেন! আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তিনি বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করছি আর তুমি বলছ, সেটা আমি গ্রহণ করি কি না? অবশ্যই আমি গ্রহণ করি এবং এটা গ্রহণ করা আমার জন্য ফরজ! যে শুনবে তার ওপরও ফরজ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবার মধ্য হতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পথপ্রদর্শক হিসেবে মনোনীত করেছেন। তাকে সাহায্য করেছেন। সুতরাং, সকল সৃষ্টির জন্য আবশ্যক তার আনুগত্য করা। তাকে মান্য করা। কোনো মুসলমানের জন্য এর বিকল্প কোনো উপায় নেই।
এগারো
আবুল আয়না রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন খলীফা মাহদী হজ শেষে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন, তখন তাকে দেখে সেখানে উপস্থিত সকলে দাঁড়িয়ে গেলেন, কেবলমাত্র ইবনু আবি যিব বসে রইলেন। মুসাইয়্যিব ইবনু যুহাইর তাকে বললেন, ইনি আমিরুল মুমিনীন। তার সম্মানে দাঁড়ানো উচিত! তিনি বললেন, মানুষ কেবল তার প্রতিপালকের জন্যই দাঁড়ায়।
একথা শুনে খলীফা মাহদী বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। তার কথা শুনে আল্লাহর ভয়ে আমার শরীরের প্রতিটি পশম দাঁড়িয়ে গেছে।
বারো
ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে সত্যের ব্যাপারে আমার সাথে বাড়াবাড়ি করেছে, আমাকে বাধা দিয়েছে, সে আমার দৃষ্টিতে ছোট হয়ে গেছে। আর যে সত্যকে গ্রহণ করেছে তার প্রভাব আমার অন্তরে স্থান পেয়েছে এবং তার প্রতি ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তেরো
হাতিম আল-আসম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন কেউ আমার সাথে বিতর্কে জয়লাভ করে আর তার মতাদর্শ ঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তখন আমার খুব আনন্দ লাগে। কারণ, আমি তখন নিশ্চিন্ত হই যে, যাচাইয়ের পর ঠিকটাই জানতে পেরেছি। পক্ষান্তরে যখন কেউ হেরে যায় আর তার মতাদর্শ ভুল প্রমাণিত হয়, তখন খুব দুশ্চিন্তা হয়। কারণ, এতে আমার মতাদর্শ ভুল প্রমাণিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
টিকাঃ
১. তিনি মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছাত্র ছিলেন।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৫৭
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪১৯
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪২১
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪২১
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১৯৩
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩৪
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩৪
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১০/৩৫
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৫০৪; কাছাকাছি শব্দে সহীহ মুসলিম: ১৩৫৫; সহীহ বুখারী: ৬৮৮০
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/১৪২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/১৪৩
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১০/৩৩
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৪৮৭
📄 ফাতাওয়া প্রদানে সালাফগণের সতর্কতা
এক
নাফি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে একটি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার মাথা নিচু করে ফেললেন। কোনো জবাব দিলেন না। লোকটি মনে করল—তিনি হয়তো মাসআলাটি শোনেননি। তাই সে বলল, আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন! আপনি কি আমার মাসআলাটি শুনতে পেয়েছেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি; কিন্তু তোমরা কি মনে করো—যে-বিষয়ে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছ, তার উত্তর দেওয়ার পর সে-বিষয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না! আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন! একটু অপেক্ষা করো, আমি এই মাসআলাটি ভালো করে ভেবে দেখি। যদি এর কোনো সমাধান আমার জানা থাকে, তাহলে বলে দেব। আর যদি জানা না থাকে তাহলে বলব—আমার জানা নেই।
দুই
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নাফি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমার ও আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হজের মৌসুমে পৃথক পৃথক জ্ঞানমূলক আলোচনা সভার আয়োজন করতেন। ইলম পিপাসুরা তাতে ভিড় জমাতেন। আমি একেক সময় একেক মজলিসে বসতাম। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যে-কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার উত্তর প্রদান করতেন। আর যদি ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হতো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি উত্তর দিতেন না।
তিন
শুআইব ইবনু আবি হামযা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমরা শুনেছি, যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যখন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো, তিনি বলতেন, এমনটা কি আদৌ ঘটেছে? যদি তারা বলত ‘হ্যাঁ’! তাহলে তিনি তার জ্ঞান অনুযায়ী সমাধান পেশ করতেন। আর যদি তারা বলত—এখনও ঘটেনি, তাহলে তিনি বলতেন, আগে ঘটতে দাও!
চার
মুসা ইবনু উলাই ইবনি রবাহ রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, যায়েদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করত, তাহলে তিনি বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো! এমনটা কি সত্যিই ঘটেছে? যদি সে বলত, ‘হ্যাঁ’! তবেই তিনি সে-বিষয়ে কথা বলতেন। অন্যথায় বিরত থাকতেন।
পাঁচ
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—পূর্ববর্তী কোনো একজন আলিমের মনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা উদিত হয়। তার মনে হয়, কথাটি বললে অনেক মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হবে; কিন্তু দেখা যায়, সুনাম-সুখ্যাতির ভয়ে তিনি কথাটি চেপে যান এবং সম্পূর্ণ চুপ থাকেন। এরপর যখন তার মনে হয়, এখন নীরব থাকাই ভালো তখন তিনি সেই কথাটি বলেন—'যে ফতোয়া প্রদানে অতি উৎসাহী, তার ইলম কম।'
ছয়
সুহনূন রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো আলিম কোনো বিষয়ে জানা সত্ত্বেও তার জন্য একথা বলা জায়েয হবে কি— 'আমি জানি না'?
তিনি বললেন, যে-সব ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট প্রমাণ ও দলিল রয়েছে, সে-সব ক্ষেত্রে জায়েয হবে না। তবে যে-সব বিষয় গবেষণা-নির্ভর, সে-সব বিষয়ে অবশ্যই সেটা বলতে পারে এবং বলার অবকাশও আছে। কেননা, সে নিশ্চিত জানে না, তার গবেষণালব্ধ বিষয়টি ঠিক না ভুল!
সাত
বর্ণিত আছে, খলীফা যিয়াদাতুল্লাহ একবার একটি মাসআলা সম্পর্কে জানতে সুহনূন রাহিমাহুল্লাহর কাছে লোক পাঠান; কিন্তু সুহনূন কোনো জবাব না দিয়ে বার্তাবাহককে ফেরত পাঠান। মুহাম্মাদ ইবনু উবদুস তাকে বলল, আপনি শহর থেকে বেরিয়ে যান। গতকাল আপনি শহরের কাজীর পেছনে সালাত আদায়ে অস্বীকার করেছেন। আর আজ আমীরের প্রশ্ন প্রত্যাখ্যান করেছেন। সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ওই ব্যক্তির প্রশ্নের কীসের উত্তর, যে কিনা এগুলোকে হাসির খোরাক বানাতে চায়! যে চায়, আমার কথার সাথে অন্যের কথা মিলিয়ে স্বার্থ হাসিল করতে! যদি তার প্রশ্নের দ্বারা নিরেট দ্বীন বোঝা উদ্দেশ্য হতো, তাহলে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।
আট
আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনিল আযহার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার মুহাম্মাদ ইবনু হোসাইন আস-সিজযী আমার নিকট আগমন করেন। তিনি ইয়াযীদ ইবনু হারুন ও জাফর ইবনু আউন সম্পর্কে লিখেছিলেন। তিনি বলেন, হে আবু সাঈদ, আমার কাছে লোকেরা আসে। তারা আমাকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; কিন্তু অনেক সময় যথার্থ উত্তর না জানা সত্ত্বেও আমি আশঙ্কা করি যে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া আমার জন্য বৈধ হবে না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, কেননা, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَنْ سُيِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللَّهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে-ব্যক্তির কাছে কোনো বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সে তা গোপন করে রাখে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে আগুনের লাগام পরিয়ে দেবেন
উসমান ইবনু সাঈদ বললেন, এই হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে-সব ক্ষেত্রের কথা বলেছেন যে-সব ক্ষেত্রে তুমি জানো। পক্ষান্তরে যে-সব ক্ষেত্রে তোমার জানা নেই সে-সব ক্ষেত্রে চুপ থাকার অবকাশ আছে; বরং সেটাই উচিত।
আইয়ূব রাহিমাহুল্লাহ বলেন—কাসিম রাহিমাহুল্লাহকে বীর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি জানি না, বা আমার জানা নেই। লোকেরা তাকে পীড়াপীড়ি আরম্ভ করলে অবশেষে বাধ্য হয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা যে-সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছ, আমি তা জানি না। যদি জানতাম, তাহলে গোপন রাখতাম না। কেননা, জানা বিষয় লুকানো আমার জন্য বৈধ নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ বলেন, কাসিম রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমাকে যে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে আমি সেটা জানি না। আর যে-বিষয়ে জানা নেই, সে বিষয়ে কথা বলার চেয়ে শুধু আল্লাহকে সত্য জেনে অজ্ঞ-জীবনযাপন করাটাও শ্রেয়।
টিকাঃ
১. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫৬৬
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২২২
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৮
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪৩৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৫
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১২/৬৬
১. মুসনাদে আহমাদ: ২/২৬৩; সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৫৮; সহীহ আবু দাউদ লি-আলবানী: ৩১০৬
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩২২
৩. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৮৯