📄 আত্মমুখ্যতার প্রতি সালাফগণের অনীহা
এক
সাবিত আল-বুনানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত-আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে লোকসকল, আমি কুরাইশ গোত্রের লোক। সাদা-কালো নির্বিশেষে সকল রঙের মানুষই খোদাভীতির ক্ষেত্রে আমার চেয়ে অগ্রগামী! আমি তো কেবল খোদাভীরুদের বেশ-ভূষা ধারণ করি।[১]
দুই
মা'মার রাহিমাল্লাহ আইয়ুব, নাফি কিংবা অন্য কারও থেকে বর্ণনা করেন-একদা জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে 'হে সর্বোত্তম মানুষ' কিংবা 'হে সর্বোত্তম মানুষের সন্তান!' বলে সম্বোধন করে। প্রতিউত্তরে ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি সর্বোত্তম মানুষ নই এবং সর্বোত্তম মানুষের সন্তানও নই; বরং আমি আল্লাহর এক নগণ্য বান্দা। আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং তার প্রতি আশা রাখি। আল্লাহর শপথ! তোমরা যার পিছু নাও, তাকে ধ্বংস করেই ছাড়ো।[২]
তিন
জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণিত, মুতররিফ ইবনু আব্দিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সারারাত ইবাদত করে সকালে আত্মগর্ব করার চেয়ে সারারাত ঘুমে কাটিয়ে সকালে অনুতপ্ত হওয়া আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর শপথ! ওই ব্যক্তি কখনও সফলকাম হবে না, যে নিজেকে সর্বোত্তম জ্ঞান করে কিংবা নিজের ইবাদত নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগে।[১]
চার
ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা আমার পক্ষ থেকে তিনটি বিষয়ের ওপর আমলের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখো—
(১) প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকো। (২) অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো। (৩) আত্মমুগ্ধ হওয়া থেকে বিরত থাকো।[২]
পাঁচ
আবু ওয়াহাব আল-মারওয়াযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, অহংকার কী?
তিনি বললেন, মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আত্মগর্ব কী?
তিনি বললেন, 'কোনো ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করা যে, এটা শুধু তোমারই আছে, অন্য কারও নেই।' এরপর বললেন, 'সালাত আদায়কারীদের মধ্যে নিজের আমলের প্রতি মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে মন্দ আর কিছু আমি দেখিনি।'[৩]
ছয়
আহমাদ ইবনু আবিল হাওয়ারী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দিল্লাহ আনতাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও ইমাম ফুযাইল রাহিমাহুমাল্লাহ কোথাও মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করছিলেন। একপর্যায়ে সুফিয়ান আস-সাওরীর মন গলে যায়। তিনি কাঁদতে থাকেন। এরপর বলেন, আশা করি আজকের এই মজলিস আমাদের জন্য রহমত ও বরকত বয়ে আনবে। তখন ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর বান্দা, কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, না-জানি, এ মজলিস আমাদের জন্য উপকারী হওয়ার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়! তুমি যা ভালো মনে করেছ, তা-ই বলেছ, আমিও যা ভালো মনে করেছি, তাই বলেছি। এতে কি তুমি আমার নিকট নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করোনি? আর আমিও কি তোমার কাছে নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করিনি?
এ কথা শুনে সুফিয়ান আস-সাওরী আবার কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তুমি আমাকে সতর্ক করে (ধ্বংসের হাত থেকে) বাঁচিয়েছ। আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন।[১]
সাত
ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি তুমি তোমার আমলের ব্যাপারে গর্বের আশঙ্কা করো, তাহলে ভাবো-
■ যার সন্তুষ্টি কামনা করছ, তিনি কি সাধারণ কেউ?
■ যে নিয়ামতের আশা করছ, তা কি সহজলভ্য?
■ যে ভয়াবহ শাস্তির ভয় করছ, তা স্বাভাবিক কিছু?
যে এসব নিয়ে চিন্তা করবে, তার কাছে তার আমলগুলো খুবই নগণ্য মনে হবে।[২]
আট
রিশদীন ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাজ্জাজ ইবনু শাদ্দাদ থেকে বর্ণিত, তিনি খ্যাতনামা বিদ্বান উবাইদুল্লাহ ইবনু আবি জাফরকে বলতে শুনেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো মজলিসে কথা বলে এবং কথাগুলো তাকে চমৎকৃত করে তাহলে সে যেন তৎক্ষণাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং যখন চুপ থাকতে ইচ্ছে করে তখন যেন আবার কথা বলা শুরু করে। [১]
নয়
সাঈদ ইবনু আব্দির রহমান রাহিমাহুল্লাহ আবু হাযিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন-তিনি বলেন, বান্দা যদি কোনো উত্তম আমল করার পর আত্মগর্ব অনুভব করে তাহলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য এরচেয়ে ক্ষতিকর কোনো আমলই তৈরি করেননি! অপরদিকে বান্দা যদি কোনো গুনাহ করার পর অন্তর্জ্বালার শিকার হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য এরচেয়ে উপকারী ও কল্যাণকর কোনো কাজই সৃষ্টি করেননি।
কেননা, মানুষ যখন ভালো ও পুণ্যের কাজ করে তখন হয়তো সে তা নিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করে অথবা নিজেকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে। এতে আল্লাহ তাআলা তার বর্তমান ভালো কাজটির সাথে সাথে অতীতের ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেন।
অপরদিকে যদি কোনো ব্যক্তি মন্দ কাজ করার পর তার মধ্যে অনুশোচনা জাগে তাহলে হতে পারে, আল্লাহ তাআলা এই কাজের কারণে তার মধ্যে অনুতাপ ও অনুশোচনার স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে দেবেন। পরিশেষে সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে, সেই অনুতাপ ও অনুশোচনা তার হৃদয়ে আগের মতোই রয়ে যাবে। (এবং তার অসিলায় সে মুক্তি পেয়ে যাবে!)[২]
দশ
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহর জীবনী আলোচনার একপর্যায়ে তার একটি উক্তি উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেছেন- 'আমি সত্যের অনুসরণ করি। নিজেই ইজতিহাদ করে চলি। কোনো এক মাযহাবের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকি না।'
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, কেউ যদি ইজতিহাদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমাম তার এই যোগ্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন, তাহলে এমন ব্যক্তির জন্য তাকলীদ তথা কোনো মাযহাব অনুসরণের সুযোগ নেই।
পক্ষান্তরে যাদের এই পর্যায়ের ইজতিহাদী যোগ্যতা নেই; বরং কেবল ফিকহের কোনো কিতাব মুখস্থ করেছে কিংবা সমগ্র কুরআন অথবা তার কিয়দাংশ হিফয করেছে তাদের জন্য তো কখনই ইজতিহাদ করার অনুমতি নেই। সে কীভাবে ইজতিহাদ করবে? কী সমাধান দেবে? কীসের ভিত্তিতে দেবে? যার পাখাই গজায়নি, সে কী করে আকাশে উড়বে?
অবশ্য যে-ফকীহর সতর্কতা, বিচক্ষণতা, বোধগম্যতা, খোদাভীতি এবং হাদীসের জ্ঞান সর্বজন স্বীকৃত; সেই সঙ্গে শাখাগত মাসআলার সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ এবং হাদীস ও ফিকহের মূলনীতি বিষয়ক কিতাবগুলো যার মুখস্থ, পাশাপাশি হিফযুল করআন, তাফসীর ও তর্কশাস্ত্রেও যে সমান পারঙ্গম; সর্বোপরি আরবীভাষা সম্পর্কেও যে সম্যক অবগত তার জন্য 'ইজতিহাদুল মুকায়্যাদ' তথা নির্ধারিত পরিমণ্ডলে ইজতিহাদ করার অনুমতি রয়েছে। তিনি ইমামগণের দলিল সম্পর্কে গবেষণা করার যোগ্যতা রাখেন। যখন কোনো মাসআলায় তার নিকট সত্য উন্মোচিত হবে এবং এর ওপর কুরআন-সুন্নাহর কোনো দলিল থাকবে, পাশাপাশি প্রসিদ্ধ কোনো ইমামের আমলও পাওয়া যাবে। তখন তিনি তার নিকট উন্মোচিত ওই সত্যটারই অনুসরণ করবে। রুখসত বা ছাড়ের পথে হাঁটবেন না। সদা সতর্ক থাকবেন। এভাবে কোনো মাসআলার ওপর দলিল পাওয়া গেলে তার জন্য তাকলীদের কোনো সুযোগ নেই।
তবে যদি এই নব উদ্ভাবিত সত্য প্রকাশ করলে অন্যান্য ফকীহ ও মুফতীগণের পক্ষ থেকে গোলযোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে কিংবা সমাজে ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে তা গোপন রাখতে হবে। কোনোভাবেই তার আমল প্রকাশ করা যাবে না। কেননা, কখনও এর কারণে নিজের মনে গর্ববোধ জেগে উঠতে পারে এবং তা প্রকাশ করা নিজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
এমনটা হলে অবশ্যই একদিন তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, তখন ওই সত্যটার মাঝে অন্তরের একটি অনৈতিক চাহিদা ঢুকে পড়ে। এমন কত মানুষ আছে, যারা সত্য কথা বলে, সৎ কাজের আদেশ করে, এরপরও আল্লাহ তাআলা ফকীহগণকে দিয়ে তাদের দাবিয়ে রাখেন।
অনেক সময় অর্থদাতা, ভূমিদাতা ও সমাজ সেবকদের মধ্যে এই আত্মগর্ব সংক্রমক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সৈনিক, মুজাহিদ ও শাসকশ্রেণিও এই ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারে না। ফলে দেখা যায়, তারা শত্রুদের মুখোমুখি হচ্ছে, অথচ তাদের অন্তরে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন কল্পনাবিলাস ও সুপ্ত বাসনা। যেমন, বীরত্ব প্রকাশ করা, অহমিকা প্রদর্শন করা, স্বর্ণখচিত শিরস্ত্রাণ, পোশাক, অশ্ব ও যুদ্ধাস্ত্রে সুসজ্জিত হওয়া। এর সাথে আবার যোগ হয় সালাত পরিহার করার মন্দ প্রবণতা, শাসিতের প্রতি জুলুম ও মদ্যপানের হীন মানসিকতা। সুতরাং, কোত্থেকে তারা আল্লাহর সাহায্য পাবে? আর কেনই-বা তারা অপদস্থ ও পরাজিত হবে না!
হে আল্লাহ, আপনি আপনার দ্বীনকে সাহায্য করুন। আপনার বান্দাদের দ্বীনের কাজ করার সামর্থ্য দিন।
যে-ব্যক্তি আমলের উদ্দেশ্যে ইলম অন্বেষণ করে, ইলম তার হৃদয়-ভূমিকে কোমল করে। সে তার নিজের কথা ভেবে ক্রন্দন করে। পক্ষান্তরে যে-ব্যক্তি মুদাররিস বা মুফতি হওয়ার উদ্দেশ্যে কিংবা দাম্ভিকতা প্রদর্শন ও অন্যকে হেয় করার মানসিকতা নিয়ে ইলম শেখে-সে নিজেই নিজেকে ধোঁকা দেয়, প্রতারিত করে এবং মানুষের সামনে নিজেকে ছোট করে। এই আত্মঅহমিকা তাকে ধ্বংস করে ছাড়ে এবং মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسُهَا
ওই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে তার আত্মা পবিত্র করেছে। আর ওই ব্যক্তি ব্যর্থ হয়েছে যে তার আত্মা কলুষিত করেছে।[১]
এখানে কলুষিত করার অর্থ হচ্ছে—আত্মাকে পাপাচার ও অবাধ্যতায় লিপ্ত রাখা।[২]
টিকাঃ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮১
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৬
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/১৯০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৪৪৯
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৮/৪০৭
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৯
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৪২
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১০
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৬৪
[১] যেমন, ইমাম আবু হানীফা, মালিক, আস-সাওরী, আওযায়ী, শাফিয়ী, আবু উবাইদ, আহমাদ বা ইসহাক রাহিমাহুমুল্লাহ।
[১] সূরা শামস, আয়াত: ৯ ও ১০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৮/১৯১-১৯২
📄 সালাফগণের দুনিয়াবিমুখতা
এক
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ রচিত যুহদ নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, উরওয়া ইবনু যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু শাম গমন করেন। সেখানে তার সাথে স্থানীয় আমীরগণ এবং উচ্চপদস্থ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সাক্ষাৎ করেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমার ভাই আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ কোথায়? তাকে যে দেখছি না! লোকেরা বলে, তিনি এখনই চলে আসবেন।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু নাকে রশি বাঁধা একটি উটনীর ওপর চড়ে আগমন করেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সালাম করেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত লোকদের বলেন, তোমরা যার যার কাজে ফিরে যাও। অতঃপর তিনি আবু উবায়দাকে সাথে নিয়ে তার বাড়িতে আসেন। ঘরে ঢুকে দেখেন, তার বাড়িতে কেবল একটি তরবারি, একটি ঢাল এবং সামান্য কিছু পাথেয় পড়ে আছে। উমার রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞেস করেন, ঘরে আরও কিছু আসবাবপত্র রাখলে না কেন? তিনি বলেন, আমীরুল মুমিনীন, দুনিয়ায় স্বল্প সময় বিশ্রামকারীর জন্য এটুকুই যথেষ্ট! [১]
দুই
মালিক আদ-দার[১] রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চারশ দিনার হাতে নিয়ে তার গোলামকে ডেকে বলেন, এটা আবু উবায়দার নিকট পৌঁছে দাও। আর তার ঘরের পাশে ওঁৎপেতে থাকো। দেখো, সে এগুলো দিয়ে কী করে?
অতঃপর গোলাম চারশ দিনার নিয়ে আবু উবায়দার কাছে যায় এবং তাকে বলে, আমিরুল মুমিনীন আপনাকে এগুলো উপহার দিয়েছেন। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ বলেন, আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দিন এবং তার ওপর রহম করুন। এরপর তিনি দাসিকে ডেকে বলেন, এদিকে এসো! এই সাত দিনার অমুককে দাও। এই পাঁচ দিনার অমুককে দাও... এভাবে তিনি সব দিনার ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়ে দেন। গোলাম ফিরে এসে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পুরো ঘটনা জানায়।
এদিকে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহu আনহুর নিকটও সমপরিমাণ দিনার প্রেরণ করেন। গোলাম তার কাছে সেগুলো পৌঁছে দিয়ে বলে, আমীরুল মুমিমীন এগুলো আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দিন। এরপর তিনি দাসিকে ডেকে বলেন, এগুলো অমুককে দাও, এগুলো অমুককে দাও... কিছুক্ষণ পর মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী এই ঘটনা জানতে পেরে বলেন, আল্লাহর শপথ! আমরাও তো গরীব। আমাদের জন্যেও কিছু রাখুন। ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। কেবল দুটি দিনার অবশিষ্ট ছিল। তিনি স্ত্রীর দিকে সেগুলোই ছুঁড়ে দেন।
গোলাম ফিরে এসে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পুরো ঘটনা শোনালে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং বলেন, এরা প্রত্যেকে একে অন্যের ভাই। [২]
তিন
তালহা রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তার পিতা বলেন, একবার 'হাযরামাউত' নামক শহর থেকে তার কাছে কিছু সম্পদ আসে। সম্পদের পরিমাণ প্রায় সাত লাখ দিরহাম। রাতে তিনি খুব ছটফট করতে থাকেন। তার স্ত্রী তাকে অস্থির দেখে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে আপনার? আপনি এত পেরেশান কেন? তিনি বলেন, আমি ভীষণ দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আচ্ছা, যে-ব্যক্তি তার ঘরে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ রেখে নিদ্রায় যায়, মহান রবের ব্যাপারে তার ধারণাটা কেমন?
স্ত্রী বলেন, সকাল হলে আপনি আপনার বন্ধু ও পরিচিতজনদের দেখা পাবেন। তখন কিছু পাত্র আর থলে আনিয়ে তাদের মাঝে এগুলো বণ্টন করে দেবেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ তোমার ওপর রহমত বর্ষণ করুন। নিশ্চয় তুমি যোগ্য পিতার যোগ্য মেয়ে।[১]
সকাল হলে তিনি বেশ-কিছু থলে ও পাত্র আনান। সব সম্পদ আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন। একটি পাত্র আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছেও পাঠান।
এসময় তার স্ত্রী বলেন, আবু মুহাম্মাদ, এই সম্পদে কি আমাদের কোনো অংশ আছে? তিনি বলেন, আজ সারাদিন কোথায় ছিলে? এখন সামান্য যা-কিছু আছে, তা তোমার! তার স্ত্রী বলেন, তখন মাত্র একটি থলে অবশিষ্ট ছিল। আর তাতে হাজার খানেক দিরহাম ছিল।[২]
চার
হুযাইল ইবনু শূরাহবিল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, যে-ব্যক্তি আখিরাতের সফলতা চায়, সে দুনিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যে-ব্যক্তি দুনিয়ার সফলতা চায়, সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওহে লোকসকল, তোমরা স্থায়ী আবাসস্থলের স্বার্থে অস্থায়ী আবাসস্থলের ক্ষতি মেনে নাও।[৩]
পাঁচ
আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের তুলনায় অধিক সময় দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করো এবং তাদের তুলনায় বেশি আমল করার চেষ্টা করো; এরপরও তারা তোমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ।
জিজ্ঞেস করা হলো, এটা কেন?
তিনি বললেন, এর কারণ হচ্ছে, তারা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি দুনিয়াবিমুখ এবং আখিরাতের প্রতি অধিক আগ্রহী ছিলেন। [১]
ছয়
বিলাল ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি আল্লাহর নিকট চিন্তার বিক্ষিপ্ততা এবং চিত্তের অস্থিরতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জিজ্ঞেস করা হলো, চিন্তার বিক্ষিপ্ততা ও চিত্তের অস্থিরতা কী? তিনি বললেন, প্রত্যেক জায়গায় নিজের কিছু সম্পদ গড়ে তোলা। [২]
সাত
ইমাম আ'মাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবুল বুখতারী বলেন, একবার আশআস ইবনু কায়িস ও জারীর ইবনু আব্দিল্লাহ সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাতে তার ছোট্ট কুটিরে প্রবেশ করেন। তারা তাকে সালামের মাধ্যমে অভিবাদন জানান এবং বলেন, আপনি তো আল্লাহর রাসূলের সাহাবী!
: তা আমার জানা নেই।
তারা উভয়ে জবাব শুনে দ্বিধায় পড়ে যান। সালমান ফারসী তাদের অবস্থা বুঝতে পেরে বলেন, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গী তো সে, যে তার সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করবে!
: আমরা আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে এসেছি।
: ও, তাহলে তার প্রেরিত হাদিয়া কোথায়?
: আমাদের সাথে তো তার কোনো হাদিয়া নেই!
: আল্লাহকে ভয় করো। আমানত আদায় করো। তার নিকট থেকে আমার কাছে কেউ হাদিয়া ছাড়া আসে না।
: দয়া করে আপনি আমাদের ওপর এমন অভিযোগ আনবেন না। আমাদের কাছে এমনিতেই কিছু সম্পদ আছে। প্রয়োজন হলে বলুন!
: না, না! আমি হাদিয়া ছাড়া অন্যকিছু চাই না।
: আল্লাহর কসম! তিনি আপনার উদ্দেশ্যে কোনো হাদিয়া পাঠাননি। আসার সময় শুধু বলেছেন, তোমাদের মধ্যে রাসূলের এমন একজন সাহাবী রয়েছেন, রাসূল যখন তার সাথে একাকী সাক্ষাৎ করতেন তখন অন্য কারও সাক্ষাৎ কামনা করতেন না! যখন তোমরা তার কাছে যাবে তখন আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম পেশ কোরো।
: আরে! এই সালাম-ই তো সেই হাদিয়া। এরচেয়ে বড় কোনো হাদিয়া আছে নাকি? আমি তো এটাই চাইছিলাম![১]
আট
কাতাদা ইবনু দিআমা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বিখ্যাত তাবিয়ী আমির ইবনু আবদি কায়িস মুত্যুর পূর্বমুহূর্তে খুব কাঁদছিলেন। কাতাদা ইবনু দিআমা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, আমি মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাঁদছি না। দুনিয়ার প্রতি মায়ার কারণেও না। আমি তো কাঁদছি, দুপুরের পিপাসা [২] এবং রাতের কিয়াম [৩]-এর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে।[৪]
নয়
মুসা আত-তাইমী রাহিমাহুল্লাহ আব্দুর রহমান ইবনু আবান রাহিমাহুল্লাহর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, আমি এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি-দ্বীনদারী, রাজ্যশাসন ও সম্মানের মাঝে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আব্দুর রহমানের সমকক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে।
জনশ্রুতি আছে, আহলে বাইতেরা। কেউ দাসত্বের শিকার হলে তিনি তাকে কিনে নিতেন এবং তার অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করে আযাদ করে দিতেন। তিনি বলতেন, আমি এই দাসমুক্তির মাধ্যমে মূলত আল্লাহর কাছে মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।
পরবর্তী সময়ে তিনি তার এলাকার মসজিদে ঘুমন্ত অবস্থায় ইনতিকাল করেন। প্রসিদ্ধ আছে, তিনি আল্লাহওয়ালা ছিলেন। খুব ইবাদত করতেন। আলী ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনি আব্বাস তার ইবাদত ও কুরবানী দেখে বিমুগ্ধ হন এবং ভালো কাজে তার অনুসরণ করেন। [২]
দশ
ইবরাহীম ইবনু বাশশার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলী ইবনু ফুযাইল বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহকে বলেন-তুমি মানুষকে অল্পতুষ্টি ও দুনিয়াবিমুখতার ব্যাপারে আদেশ করো; অথচ নিজেই পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জন করো?
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, হে আবু আলী, আমি এমনটা করি, যাতে আমার সম্মান ঠিক থাকে। আমার ব্যক্তিত্ব কারও কাছে মুখাপেক্ষী না হয়ে পড়ে এবং এর মাধ্যমে যাতে আমি আমার প্রতিপালকের আনুগত্য করতে পারি।
তিনি বলেন, হে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, যদি এমনটিই হয়ে থাকে, তাহলে কতই না উত্তম তোমার সিদ্ধান্ত। [৩]
এগারো
যিয়াদ ইবনু মাহিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, শাদ্দাদ ইবনু আউস রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, তোমরা দেখে থাকবে, প্রত্যেক ভালোর কিছু মাধ্যম থাকে; আবার প্রত্যেক মন্দের পেছনেও কিছু কারণ থাকে। সকল ভালোই জান্নাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। আর সকল মন্দই জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। নিশ্চয় দুনিয়া হলো ক্ষণস্থায়ী ভোগ-সামগ্রী। এখান থেকে ভালো মানুষেরাও ভোগ করে, মন্দরাও ভোগ করে; কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী ও চিরসত্য। সেখানে কেবল প্রতাপশালী বাদশাহ আল্লাহ জাল্লা শানুহুর রাজত্ব। প্রতিটি আদর্শেরই অনুসারী থাকে। সুতরাং, তোমরা আখিরাতের অনুসারী হও। দুনিয়ার অনুসারী হয়ো না।[১২]
বারো
মুসলিম ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহর ভাগ্নে আব্দুল্লাহ বলেন, একবার আমি হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। তখন আমার মামা মুসলিম ইবনু সাদ আমাকে দশ হাজার দিরহাম দিয়ে বললেন, যখন তুমি মদীনায় যাবে, তখন মদীনার আহলে বাইতের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারকে এগুলো দেবে। অতঃপর আমি মদীনায় গেলাম। লোকদেরকে আহলে বাইতের সবচেয়ে দারিদ্র পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তারা আমাকে একটি বাড়ি দেখিয়ে বলল, এই পরিবারটি আহলে বাইতের মধ্যে সবচেয়ে গরীব এবং সবচেয়ে অভাবী। আমি সেই ঘরে কড়া নাড়লাম। ভেতর থেকে এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন-
: কে আপনি?
: আমি বাগদাদ থেকে এসেছি। আমাকে দশ হাজার দিরহাম দেওয়া হয়েছে—যেন সেগুলো মদীনার সবচেয়ে দরিদ্র ও অভাবী ‘আহলে বাইত’-এর নিকট পৌঁছে দিই। আর আমি জানতে পেরেছি, আপনাদের পরিবারটিই সবচেয়ে বেশি দরিদ্র ও অভাবী। সুতরাং, আপনি এগুলো গ্রহণ করুন।
: আল্লাহর বান্দা, তোমাকে যিনি দিরহামগুলো দিয়েছেন তিনি মদীনার সবচেয়ে গরীব আহলে বাইতকে দিতে বলেছেন। আর এখানে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবার হলো আমাদের পাশে থাকা পরিবারটি। তারা আমাদের চেয়েও অধিক অভাবী।
আমি তাদের ছেড়ে পাশের ঘরের দিকে গেলাম। তাদের দরজায় কড়া নাড়লাম। একজন নারী ভেতর থেকে পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। আমি আগের মতোই জবাব দিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহর বান্দা, আমরা এবং আমাদের প্রতিবেশী—উভয়েই খুব অভাবী। সবাই সংকটময় জীবনযাপন করছি। তুমি বরং আমাদের উভয়ের মাঝে দিরহামগুলো বণ্টন করে দাও। [১]
তেরো
ইবরাহীম ইবনু শাবীব ইবনি শাইবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এক জুমআর দিনে আমরা একটি ইলমী মজলিসে [২] বসা ছিলাম। এমন সময় কোথা থেকে যেন এক অপরিচিত লোক আগমন করেন! তার গায়ে একটি মাত্র কাপড়। সেটা দ্বারা পুরো শরীর পেঁচানো। তিনি আমাদের নিকট এসে বসেন। তারপর নতুন একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। আমরা সেটি নিয়েই আলোচনা করতে থাকি। আলোচনা শেষ হলে তিনি চলে যান।
পরবর্তী জুমআয় তিনি আবার আসেন। আমরা তার উপস্থাপনা, জ্ঞানমূলক আলোচনা, সুচিন্তিত মতামত ও ব্যক্তিত্ব-গুণে মুগ্ধ হয়ে পড়ি। তাকে ভালোবেসে ফেলি। তাকে তার বাসস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, আমি 'হারবিয়্যাহ'তে বাস করি। এরপর তার উপনাম জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, আবু আব্দুল্লাহ'। আমরা তার মজলিসে বসার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে পড়ি। তার আলোচনা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকি। কারণ, তার আলোচনা ছিল খুবই ফলপ্রসূ ও জ্ঞানমূলক।
এরপর কিছুদিন তার আসা-যাওয়া বন্ধ থাকে। আমরা পরস্পর বলাবলি করতে থাকি, কী হলো? তিনি আসছেন না কেন? তিনি আমাদের মজলিসগুলোর প্রাণ ছিলেন! তিনি চলে যাওয়ার পর থেকে মজলিসগুলো কেমন যেন প্রাণহীন হয়ে পড়েছে!
আমরা সিদ্ধান্ত নিই, সকাল হলে হারবিয়্যাহ-এলাকায় গিয়ে তাকে খুঁজব। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা কয়েকজন সেখানে যাই। আমরা আবু আব্দিল্লাহ সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত বোধ করছিলাম। এমন সময় দেখি, কয়েকজন বালক মক্তব থেকে বাড়ি ফিরছে। তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা আবু আব্দিল্লাহকে চেনো? তারা বলল, সম্ভবত আপনারা শিকারী লোকটির সন্ধান করছেন? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তারা বলল, তার এখনই চলে আসার সময় হয়েছে। আপনারা অপেক্ষা করুন।
এরপর আমরা এক জায়গায় বসে অপেক্ষা করতে থাকি। ইতোমধ্যে দূর থেকে তাকে আসতে দেখা যায়। তার গায়ে একটি লুঙ্গি। কাঁধে একটুকরো কাপড়। সাথে জবাই করা কিছু পাখি এবং কিছু জীবন্ত পাখি। তিনি আমাদের দেখে মুচকি হেসে বলেন, হঠাৎ আপনাদের আগমন? আমরা বললাম, আপনাকে হারিয়ে ফেলেছি। আপনি আমাদের মজলিসগুলো জমিয়ে রাখতেন। আপনি কেন আমাদের ফেলে এভাবে চলে এলেন? তিনি বললেন, আজ তাহলে আপনাদের বলি। আসলে আমার এক প্রতিবেশী আছেন। পূর্বে আমার গায়ে আপনারা যেই কাপড়টি দেখেছিলেন, প্রতি শুক্রবার ওই প্রতিবেশী থেকে কাপড়টি ধার নিয়ে যেতাম। লোকটি প্রবাসী। কিছুদিন হলো সে তার জন্মভূমিতে ফিরে গেছে। আর আমার এমন কোনো কাপড় নেই, যেটা পরে আপনাদের কাছে যেতে পারি। আচ্ছা যাই হোক, আমরা কি এভাবে বাহিরে দাঁড়িয়ে গল্প করব? আপনাদের কোনো আপত্তি না থাকলে, বাড়ির ভেতরে চলুন। আল্লাহ রিজিকে যা রেখেছেন, তা দিয়ে আপনাদের আপ্যায়ন করা হবে।
আমরা ইশারায় পরস্পরকে বললাম-চলো, ঘরে যাই। তিনি ঘরে গিয়ে প্রথমে কড়া নাড়েন। সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। এরপর আমাদের ভেতরে আসতে বলেন। আমরা ঘরে প্রবেশ করি। তিনি একটি মাদুর বিছিয়ে দিলে আমরা তাতে বসে পড়ি।
তিনি অন্তঃপুরে চলে যান। জবাই করা পাখিগুলো স্ত্রীর কাছে দিয়ে জীবিত পাখিগুলো নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার সময় বলে যান, আপনারা একটু আরাম করুন। ইন শা আল্লাহ, অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে আসবো। তিনি পাখিগুলো বিক্রি করে কিছু রুটি কিনে আনেন। এদিকে তার স্ত্রীও গোশত রান্না শুরু করে দেন।
রান্না শেষ হলে আমাদের সামনে গোস্ত-রুটি পরিবেশন করা হয়। আমরা খেতে থাকি। একটু পর তিনি লবণ ও পানি আনার জন্য বাইরে যান। আমরা তখন পরস্পর বলাবলি করছিলাম, তোমরা কি কখনও তার মতো কাউকে দেখেছ? তোমরা বসরা নগরীর একেকজন সরদার। তোমরা কি তার বিষয়টি নিয়ে ভাববে না? তার অবস্থা পরিবর্তনে সচেষ্ট হবে না? তখন আমাদের একজন বলল, আমি পাঁচশ' দিরহাম দেব। অন্যজন বলল, আমি আটশ' দিরহাম দেব। এভাবে একেক জন একেক ধরনের সংখ্যা লেখাতে থাকে এবং একজন সবগুলো দিরহাম জমা করার দায়িত্ব নেয়। হিসাব করে দেখা যায়, সবার থেকে সর্বমোট পাঁচ হাজার দিরহাম উঠবে। এরপর সবাই বলল, চলো! আমরা এখন উঠি। সব দিরহাম উঠিয়ে আমরা আবার আসব। চাইব, তিনি যেন তার অবস্থার উন্নতি ঘটান।
এরপর আমরা উঠে চলে যাই। সওয়ারীতে করে ‘মারবাদ’[১] বাজার অতিক্রম করার সময় বসরা নগরীর আমীর মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান তার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে আমাদের দেখে ফেলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ তার গোলামকে বলেন, দ্রুত ইবরাহীম ইবনু শাবীব ইবনি শাইবাকে ডেকে নিয়ে এসো।
আমি আসার পর তিনি জিজ্ঞেস করেন, ঘটনা কী? কোত্থেকে এলে? আমি তাকে সত্য ঘটনা বললাম। সব শুনে তিনি বললেন, ভালো কাজে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি অগ্রগামী। এরপর তিনি তার গোলামকে বললেন, আমার দিরহামের ব্যাগটা নিয়ে এসো। গোলাম সেটি নিয়ে এলে বললেন, এবার যাও, একজন গৃহকর্মী নিয়ে এসো। এরপর গৃহকর্মীকে বললেন, মুদ্রার এই থলেটা নিয়ে এই লোকটির সাথে যাও এবং আমার নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিয়ে এসো। আমি খুশিতে দ্রুত হাঁটতে শুরু করি। আবু আব্দিল্লাহর বাড়ি পৌঁছে তাকে সালাম দিই। তিনি সালামের উত্তর দিতে দিতে বেরিয়ে আসেন; কিন্তু গৃহকর্মী ও তার কাঁধে মুদ্রার থলে দেখে মুহূর্তেই তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়—যেন আমি তার মুখে কালি মেখে দিয়েছি।
তিনি অত্যন্ত রূঢ়ভাব নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, তোমার এবং আমার সাথে এগুলোর কী সম্পর্ক? তুমি কি আমাকে ফিতনায় ফেলতে চাইছ? আমি বললাম, আবু আব্দিল্লাহ! আপনি শান্ত হোন। একটু বসুন। আমি সব খুলে বলছি। এরপর তাকে বললাম, আপনি তো বসরার আমীর মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানকে চেনেন। তিনি খুবই প্রতাপশালী ও রাগী। যদি আমি এগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যাই তাহলে অবস্থা কী হবে—একটু ভেবে দেখেছেন? দয়া করে আল্লাহকে ভয় করুন। নিজেকে অযথা বিপদে ফেলবেন না।
এটা শুনে তার রাগ আরও বেড়ে যায়। তিনি আমার সামনে থেকে উঠে গিয়ে মুখের ওপর সজোরে দরজা বন্ধ করে দেন। আমি বাইরে পায়চারি করতে থাকি; কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলাম না—আমীরকে কী বলব? শেষে নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নিই, সত্যটাই বলব। যা হবার হবে।
আমীরের কাছে এসে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, নিশ্চয় লোকটা ‘হারুরী’।[২] এই গোলাম, তরবারিটা নিয়ে আয়। সে তরবারি নিয়ে এলে তিনি বললেন, তুই এই গোলামের সাথে যা। ওই লোকটার বাড়িতে গিয়ে তাকে হত্যা করে তার মাথাটা নিয়ে আয়!
ইবরাহীম ইবনু শাবীব ইবনি শাইবা বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ আমীরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। দয়া করে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর কসম! সে খারেজী নয়। আপনি সবর করুন। আমিই তাকে আপনার কাছে নিয়ে আসব। আমি কেবল তার মুক্তি চাইছি। তিনি বললেন, তাহলে তুমিই ওর জামিন!
আমি সেখান থেকে উঠে সোজা তার বাড়িতে গেলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। তার স্ত্রীর মাতম শুনতে পেলাম! তিনি দরজা খুলে পর্দার আড়ালে গিয়ে বললেন, জনাব! ভেতরে আসুন। আমি ভেতরে যাওয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন, আপনার আর আমার স্বামীর মাঝে কী ঘটেছিল?
বললাম, কেন? কী হয়েছে?
তার স্ত্রী বললেন, আপনি চলে যাওয়ার পর তিনি কূপের কাছে যান। পানি উঠিয়ে অজু করেন। এরপর এই দুআ করেন-
'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে উঠিয়ে নিন। আমাকে ফিতনায় ফেলবেন না।'
এই দুআটিই বার বার করছিলেন। কিছুক্ষণ পর তার কাছে গিয়ে দেখি, তিনি আর নেই। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছেন। তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন।
আমি বললাম, এ-তো বড় আশ্চর্যজনক ঘটনা! আপনি এই ঘটনা কাউকে বলবেন না। এরপর আমি দ্রুত আমীর মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানের কাছে যাই। সবকিছু শুনে তিনি বলেন, আমার বাহন প্রস্তুত করো। আমি তার জানাযায় শরীক হবো।
বর্ণনাকারী বলেন, এ খবর পুরো বসরা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। আবু আব্দিল্লাহর জানাযায় মুসল্লীদের ঢল নামে। তাতে বসরার আমীর ও বসরা নগরীর অসংখ্য মানুষ অংশগ্রহণ করেন। আল্লাহ তাকে রহম করুন।[১]
টিকাঃ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১৬
[১] তিনি উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর আযাদকৃত গোলাম। উমার ও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার পূর্ণ জীবনী রয়েছে তাবাকাত: ৫/৮-এ
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৫৬
[১] এই বিদূষী নারী হলেন আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা উম্মু কুলসুম।
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩১
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯৬
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪২০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩৪৮
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৫৪৯
[২] অর্থাৎ সিয়াম পালন।।
[৩] রাতের সালাত ও অন্যান্য নফল ইবাদত।
[৪] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯
[১] আহলে বাইত বলতে বোঝায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীবর্গ, তার বংশধরগণ, বানু হাশিম, বানু আব্দিল মুত্তালিব এবং তাদের আজাদকৃত দাসগণ।
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/১০
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৮৭
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ২/২০৬
[২] জ্ঞানমূলক আলোচনা সভা।
[১] বসরার প্রসিদ্ধ বাজার
[২] খারেজীদের একটি শাখাগোত্র
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/৯-১২
📄 নেতৃত্বের প্রতি সালাফগণের অনীহা
এক
আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'নেতৃত্ব গ্রহণের পূর্বে তোমরা দ্বীনের গভীর ইলম অর্জন করো। কেননা, যে-ব্যক্তি দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে, সে কখনও নেতৃত্ব কামনা করে না।'[১]
দুই
মুসা ইবনু উকবাহ রাহিমাহুল্লাহ তার মাগাযী নামক গ্রন্থে লেখেন- গাযওয়ায়ে আমর ইবনুল আস[২]-যুদ্ধে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রু পক্ষ থেকে প্রচণ্ড আক্রমণের আশঙ্কা করেন। তাই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্যের আবেদন করে পত্র লেখেন। প্রিয় নবীজির আহ্বানে উঁচু পর্যায়ের মুহাজির সাহাবীগণ এগিয়ে আসেন। তাদের মাঝে আবু বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-ও শরীক ছিলেন। সাহায্যকারী এ দলের আমীর বানানো হয় আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে।
এই সাহায্যকারী বাহিনী আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পৌঁছলে তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমি তোমাদের আমীর। মুহাজিরগণ বলেন, না; বরং আপনি আপনার দলের আমীর। আর আমাদের[১] আমীর হলেন আবু উবায়দা। আমর ইবনুল আস বলেন, তোমরা আমার সাহায্যে এসেছ। সুতরাং, আমার অধীনেই থাকবে। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন খুবই নরম প্রকৃতির একজন মানুষ এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী। তিনি ব্যাপারটি দেখে বললেন, আমর ইবনুল আস-ই নেতৃত্ব দেবেন। আর আমরা তার অধীনে থাকবো।[২]
তিন
হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার নাজরানের কিছু লোক এসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একজন বিশ্বস্ত নেতা নিয়োগের আবেদন করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাজরানবাসীকে লক্ষ্য করে বলেন-
GG لَأَبْعَثَنَّ إِلَيْكُمْ رَجُلًا أَمِينًا حَقَّ أَمِينٍ আমি তোমাদের নিকট এমন এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করব, যে আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত।
এ কথা শোনার পর সকল সাহাবী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রেরণ করেন।[৩]
চার
আমির ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার পিতা সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি ছাগলের পাল ছিল। একবার তার ছেলে উমার তার নিকট আসে। তিনি দূর থেকে তাকে দেখেই বলেন, আমি আল্লাহর নিকট এ অশ্বারোহীর অনিষ্ট হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অতঃপর সে তার কাছে এসে বলে, আব্বাজান! আপনি গ্রাম্য লোকদের মতো ছাগলের পাল নিয়ে সন্তুষ্ট! অথচ মদীনায় মানুষ নেতৃত্ব নিয়ে ঝগড়া করছে! তিনি তার বুকে আঘাত করে বলেন, চুপ! আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
GG إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুত্তাকী, অল্পেতুষ্ট ও নির্জনতা অবলম্বনকারী বান্দাকে ভালোবাসেন [১]
পাঁচ
মাসরুর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মজলিসে শূরার প্রধান নির্বাচিত করা হয়, তখন আমার দৃষ্টিতে তিনিই ছিলেন খলীফা হওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার। তার পরবর্তী পর্যায়ে ছিলেন, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু।
এসময় আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আমার সাথে সাক্ষাতে এসে বলেন, আল্লাহর ব্যাপারে তোমার মামা আব্দুর রহমান ইবনু আউফ এর কী ধারণা? যদি তিনি অন্য কাউকে খলীফা বানান, এ কথা জেনেও যে, তিনি নিজেই এ দায়িত্বের অধিক হকদার-তাহলে আল্লাহর নিকট তিনি কী জবাব দেবেন?
আমি আব্দুর রহমান ইবনু আউফের নিকট এসে ব্যাপারটি তুলে ধরি। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! যদি আমার গলায় ছুরি চালানো হয় এবং তা আমার কণ্ঠনালি ভেদ করে ফেলে-তবুও তা আমার নিকট খলীফা হওয়ার চেয়ে অধিক প্রিয়।[২]
ছয়
আব্দুর রহমান ইবনু আযহার রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, একবার উসমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাক দিয়ে অনর্গল রক্ত বের হতে থাকে। তিনি তার গোলাম হুমরানকে ডেকে বলেন, লিখে নাও, আমার পর খলীফা হবেন আব্দুর রহমান ইবনু আউফ। হুমরান তৎক্ষণাৎ তা লিখে ফেলে।
এই পত্র নিয়ে হুমরান আব্দুর রহমান ইবনু আউফের নিকট গিয়ে বলে, আপনার জন্য সুসংবাদ!
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কীসের সুসংবাদ?
সে বলল, খলীফাতুল মুসলিমীন উসমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মৃত্যুর পর আপনাকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করেছেন।
একথা শোনামাত্র আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাসূলের রওজা ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে যান এবং দু-হাত তুলে বলেন-
হে আল্লাহ, যদি উসমান তার পরে আমাকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে আপনি তার পূর্বেই আমাকে উঠিয়ে নিন।
এরপর মাত্র ছয় মাস তিনি জীবিত ছিলেন! রাযিয়াল্লাহু আনহু।[১]
সাত
একবার সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুর রহমান ইবনু আউফের নিকট এই বলে লোক পাঠান যে, আপনি মানুষের সামনে খলীফা হওয়ার দাবি করুন! আব্দুর রহমান ইবনু আউফ তখন মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন। একথা শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, ধ্বংস হও! উমারের পর যে-ই খলীফা হয়েছে, সে-ই মানুষের কাছে তিরস্কৃত হয়েছে।[২]
আট
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সর্বোত্তম আমল হলো-শূরার সিদ্ধান্তের সময় নিজেকে খিলাফতের প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং উম্মাহর জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা, যার পক্ষে বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিরা মত দিয়েছেন। তিনি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে গোটা উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্বটা দারুণভাবে আঞ্জাম দিয়েছেন। যদি তিনি পক্ষাবলম্বন করতেন, পক্ষপাতদুষ্ট হতেন-তাহলে নিজেই খলীফা হয়ে বসতেন; কিংবা তার চাচাতো ভাই সাদ ইবনু আবি ওক্কাসকেই খলীফা বানাতেন। [১]
নয়
আইয়্যাশ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইয়াযীদ ইবনু মুহাল্লাব খোরাসানের গভর্নর হওয়ার পর লোকদের বলেন, তোমরা আমাকে জ্ঞানে-গুণে শ্রেষ্ঠ কোনো ব্যক্তির সন্ধান দাও। লোকেরা তাকে আবু বুরদাহ আল-আশআরীর সন্ধান দেয়।
তিনি তৎক্ষণাৎ আবু বুরদাহ আল-আশআরীকে দরবারে ডেকে পাঠান। আবু বুরদাহ ছিলেন একেবারে ভুখা-নাঙ্গা ও দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট নিতান্ত সাধারণ একজন মানুষ; কিন্তু যখন ইয়াযীদ ইবনু মুহাল্লাব তার সাথে কথা বললেন, তখন তাকে লোকমুখে শোনা বৈশিষ্ট্যের চেয়ে উত্তম মনে হলো। তিনি বললেন, আমি আপনাকে আমার অমুক অমুক কাজের দায়িত্ব প্রদান করছি। আবু বুরদাহ অপারগতা প্রকাশ করলেন; কিন্তু গভর্নর তার ওজর আমলে নিলেন না। এবার তিনি বললেন, মহামান্য আমীর, আমি কি আপনাকে একটি হাদীস শোনাতে পারি, যে হাদীসটি আমি আমার পিতার কাছ থেকে শুনেছি, আর তিনি শুনেছেন সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে?
ইয়াযীদ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই।
তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ مَنْ تَوَلَّى عَمَلا وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَيْسَ لِذَلِكَ الْعَمَلِ بِأَهْلٍ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে-ব্যক্তি জানে, সে কোনো কাজের উপযুক্ত নয়; তথাপি সে ওই কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয় [১]
মাননীয় আমীর, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি যেই কাজের দিকে আমায় ডাকছেন, আমি তার উপযুক্ত নই।
ইয়াযীদ বললেন, আপনি আমাদেরকে আপনার ব্যাপারে উৎসাহ দেননি। এ পদ আপনি চেয়েও নেননি। সুতরাং, কথা না বাড়িয়ে কাজে যোগ দিন। কোনোভাবেই আমি আপনাকে ছাড়ছি না।
অগত্যা তিনি ইয়াযীদের প্রস্তাব মেনে নেন এবং দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর আমীরের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেন। তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। এবার তিনি বললেন, মাননীয় আমীর, আমি কি আপনাকে একটি হাদীস শোনাবো না, যে হাদীসটি আমি আমার পিতার কাছ থেকে শুনেছি, আর তিনি শুনেছেন সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে?
ইয়াযীদ বললেন, জি, অবশ্যই।
আবু বুরদাহ বললেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- GG مَلْعُونٌ مَنْ سَأَلَ بِوَجْهِ اللهِ ، وَمَلْعُونُ مَنْ سُبِلَ بِوَجْهِ اللهِ ثُمَّ مَنَعَ سَابِلَهُ ، مَا لَمْ يَسْأَلُ هَجْرًا
যে-ব্যক্তি আল্লাহর দোহাই দিয়ে কিছু চায়, সে অভিশপ্ত এবং সেও অভিশপ্ত, যার কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে কিছু চাওয়া হয়; কিন্তু সে চাহিদাকৃত বস্তুটা মন্দ না হওয়া সত্ত্বেও তাকে দেয় না।
মাননীয় আমীর, আমি আপনার কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে অব্যাহতি চাইছি। এবার আমীর তাকে অব্যাহতি দেন। [২]
দশ
ইউসুফ ইবনু আসবাত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত-সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মানুষের মাঝে নেতৃত্ব বিমুখতার যে-অভাব, তা অন্য কোনো বিষয়ে আমি দেখিনি। তুমি খেয়াল করলে দেখবে, মানুষ খাবার-দাবার, ধন-সম্পদ ও পোশাক-আশাকে অনীহা প্রকাশ করে। এড়িয়ে চলে; কিন্তু যদি তাকে নেতৃত্বের আহ্বান করা হয়, তাহলে তাকে আঁকড়ে ধরে; বরং তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। [১]
টিকাঃ
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৬
[২] এই যুদ্ধকে 'যা-তুস সালাসিল'ও বলা হয়। দেখুন- তারীখুত তাবারী: ৩/৩২; আল ইসাবাত: ৫/২৮৬ শামের নিকটবর্তী কোনো এক অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছিল।
[১] সাহায্যকারী দলের
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮-৯
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১১, এই হাদীসটি সহীহ বুখারী: ৩৭৪৫; সহীহ মুসলিম: ২৪২০- ছাড়াও আরও অনেক হাদীসগ্রন্থে এসেছে। আলোচ্য হাদীসের শিক্ষা হলো-সাহাবীগণ কখনই ক্ষমতার জন্য লালায়িত ছিলেন না। তবে রাসূলের মুখে এমন বিশ্বস্ততার সাক্ষ্যলাভে ধন্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সবার মনেই বিরাজ করত।
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১০২; সহীহ মুসলিম: ২৯৬৫; মুসনাদে আহমাদ: ১/১৬৮
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৮৭-৮৮; ইবনু সাদের আত-তাবাকাত: ৩/৪/৯৪-৯৫
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮৮
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮৭, বর্ণনাকারীগণ সবাই নির্ভরযোগ্য।
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮৬
[১] মুজামুল কাবীর-তাবারানী, ইবনু আসাকীর
[২] বর্ণনাটি আল্লামা বুয়ানী ইমাম আহমাদের সূত্রে তার মুসনাদে উল্লেখ করেছেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৩৪৫; বর্ণিত প্রথম হাদীসটির সনদে আব্দুল্লাহ ইবনু আইয়্যাশ ছাড়া সবাই গ্রহণযোগ্য। আবু হাতিম বলেন, আইয়্যাশের মুখস্থশক্তি দুর্বল। তবে তার লিখিত পত্র গ্রহণযোগ্য। ইমাম আবু দাউদ ও নাসায়ী তাকে যয়ীফ সাব্যস্ত করেছেন। শাওয়াহেদ-বর্ণনায় ইমাম মুসলিম তাকে এনেছেন। একক বর্ণনায় আনেননি। ঘটনাটি পরিপূর্ণরূপে এসেছে ইবনু আসাকীর-এর তারীখগ্রন্থে: ৩৮৭। আর দ্বিতীয় হাদীসটি আবু মুসা আশআরী থেকে ইমাম তাবারানী উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটি আল্লামা রুয়ানী ইমাম আহমাদের সূত্রে তার মুসনাদের ৪৯৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন。
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/২৬২
📄 ধর্মীয় বিষয়ে সালাফগণের দক্ষতা
এক
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, বুদ্ধিমান সে নয়, যে কেবল জানে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ! বরং বুদ্ধিমান তো সে, যে জানে, দুটি মন্দের মাঝে কোনটি তুলনামূলক ভালো!
দুই
আনবাসা আল-খাসআমী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি জাফর ইবনু মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, ধর্মীয় বিষয়ে বাক-বিতণ্ডা করা থেকে বিরত থাকো। কেননা, তা অন্তরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে এবং মুনাফিকির দিকে টেনে নিয়ে যায়।
তিন
হাফিয ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ তার আত-তামহীদ নামক বইয়ে লেখেন—
আব্দুল্লাহ আল-উমারী আল-আবিদ ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহর নিকট একটি পত্র লেখেন। তাতে তিনি ইমাম মালিককে নির্জনতা ও একাগ্রচিত্তে ইবাদত করার উপদেশ দেন。
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ তার জবাবে লেখেন- ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জীবিকা বণ্টনের মতো আমলসমূহ বণ্টন করে রেখেছেন। কারও জন্য সালাত সহজ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সিয়াম সহজ করা হয়নি। আবার কারও জন্য সাদাকাহ সহজ করা হয়েছে; কিন্তু সিয়াম সহজ করা হয়নি। আবার কারও জন্য জিহাদ সহজ করা হয়েছে। আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইলমের প্রচার-প্রসার করাও একপ্রকার জিহাদ। আলহামদু লিল্লাহ! মহান আল্লাহ আমার জন্য এটা সহজ করে দিয়েছেন এবং আমি এটা নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্টও। তাছাড়া আমার ধারণামতে, আপনার আর আমার কাজ পরস্পরবিরোধী নয়। আশা করি-আমরা উভয়ে সৎ ও কল্যাণের পথেই রয়েছি’
চার
ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ তার আল-ইলম নামক বইয়ে উল্লেখ করেন, বিখ্যাত আলিম ইবনু ওয়াহাব বলেন, ইলম শেখার আগে আমি ইবাদত শুরু করে দিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে শয়তান আমার মনে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়; আল্লাহ পিতা ছাড়া তাকে কীভাবে সৃষ্টি করলেন? ব্যাপারটা আমার মাথায় একেবারে জেঁকে বসে। তাই এক শাইখের নিকট বিষয়টি পেশ করলাম। তিনি বললেন, ইবনু ওয়াহাব! তুমি আগে ইলম শেখো।
এটাই ছিল আমার আলিম হয়ে ওঠার প্রধান কারণ!
পাঁচ
আবু ইয়াহইয়া জাকারিয়া আসসাজী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লামা মুযানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-একবার আমার মনে উদ্ভট কিছু প্রশ্নের আনাগোনা শুরু হয়। আমি ভাবতে থাকি, এই মুহূর্তে কেউ যদি আমার অন্তরে জেগে ওঠা প্রশ্নের সমাধান দিতে পারেন এবং তাওহীদের ব্যাপারে আমার চিন্তা পরিশুদ্ধ করতে পারেন-তাহলে তিনি হলেন ইমাম শাফিয়ী।
সুতরাং, আমি তার কাছে গেলাম। তিনি তখন মিসরের একটি মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমি বললাম, তাওহীদের ব্যাপারে আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। আমি জানতে পারলাম, এবিষয়ে আপনার জানাশোনা সবার চেয়ে ভালো। এখন আমার প্রশ্নের উত্তর কি আপনার কাছে পাব?
এতে তিনি খুব নারাজ হয়ে বললেন, তুমি জানো—এটা কোন শহর?
আমি বললাম, জি!
তিনি বললেন, এটা সেই শহর, যেখানে আল্লাহ ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছেন। কেউ কি তোমাকে বলেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব প্রশ্ন করতে আদেশ করেছেন?
: জি না!
: কোনো সাহাবী কি এ বিষয়ে কখনও আলাপ-আলোচনা করেছেন?
: জি না!
: তুমি কি জানো, আসমানে কতগুলো তারা আছে?
: জি না!
: তন্মধ্যে কোন তারাটা কোন গুণের? কোন পরিচয়ের? তার উদয়স্থল ও কক্ষপথ কোথায় এবং কী দিয়ে সেগুলোকে সৃষ্টি করা হয়েছে?
: জি না!
: যে সৃষ্টিকে তুমি নিজ চোখে দেখছ, তার সম্পর্কেই তুমি কিছু জানো না, আর সেই তুমিই কিনা তার স্রষ্টা তথা আল্লাহর ইলম সম্পর্কে কথা বলতে চাচ্ছ!
এরপর তিনি অজু সম্পর্কিত কিছু মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। আমি সেখানেও ভুল করলাম। এ সম্পর্কিত আরও চারটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। আমি সেগুলোরও সদুত্তর দিতে পারলাম না। এবার তিনি বললেন, দিনে অন্তত পাঁচবার যে-কাজটা করতে হয়, সে-ই কাজের ইলম হাসিল না করে তুমি পড়ে আছ আল্লাহর ইলম নিয়ে!
যখনই তোমার মনে এমন কোনো কিছুর উদয় হবে, তখনই আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে এবং তাঁর এই বাণীটি স্মরণ করবে—
وَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ..
তোমাদের উপাস্য হচ্ছেন এক আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই। তিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে আল্লাহর নিদর্শন রয়েছে।
সুতরাং, সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টার ব্যাপারে নির্দেশনা লাভ করবে। এমন ইলমের পেছনে পড়বে না, যে পর্যন্ত তোমার বিবেক-বুদ্ধি পৌঁছতে অক্ষম। মুযানী বলেন, তার این বক্তব্য শুনে আমি তাওবা করি।
ছয়
আবুল হাসান আব্দুল মালিক আল-মাইমুনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-এক ব্যক্তি আবু আব্দিল্লাহ-কে বলল, একবার আমি বাযযার-এর পিছু নিয়েছিলাম তাকে সতর্ক করব বলে। কারণ, আমি জানতে পেরেছিলাম, তিনি আল-আওয়াস থেকে আব্দুল্লাহর সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। হাদীসটি হলো-
مَا خَلَقَ اللهُ شَيْئًا أَعْظَمُ مِنْ آيَةِ الْكُرْسِيِّ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আসমান-জমিনের কোনো কিছুকেই আয়াতুল কুরসী থেকে বড় করে সৃষ্টি করেননি।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট' এ নিয়ে ফিতনার এই যুগে এমন হাদীস প্রচার না করাই উত্তম। মূল হাদীসটি হচ্ছে-
مَا خَلَقَ اللهُ مِنْ سَمَاءٍ وَلَا أَرْضٍ أَعْظَمُ مِنْ آيَةِ الْكُرْسِيِّ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সাত আসমান-জমিনের কোনোটিকেই আয়াতুল কুরসী থেকে বড় করে সৃষ্টি করেননি।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট'-এই ফিতনার যুগে যখন তারা এসব হাদীস বর্ণনা করবে, তখন সেখানে 'সৃষ্টি'র ক্রিয়াটি কেবল আসমান-জমিন ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে; কুরআনের ক্ষেত্রে নয়।
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, অনুরূপ মুহাদ্দিসগণের উচিত—এমন সব হাদীস প্রচার না করা, যার বাহ্যিক অর্থ দ্বারা প্রবৃত্তিপূজারী, ভ্রান্ত আকীদায় বিশ্বাসী ও সুন্নাতের দুশমনেরা ফায়দা লুটতে পারে এবং ওইসব হাদীসও বর্ণনা না করা, যাতে এমন গুণবাচক আলোচনা রয়েছে, যা অন্য কোনোভাবে প্রমাণিত নয়। কেননা, যখনই শ্রোতার চিন্তাশক্তির বাইরের হাদীস বর্ণনা করা হবে, তখনই তাতে কিছু লোক ফিতনার সম্মুখীন হবে।
সুতরাং, যেটা ইলম, সেটা প্রকাশ করতে হবে; তবে সম্পূর্ণ মূর্খ বা এমন লোকদের কাছে নয়-যারা এর উল্টোটা বুঝবে!
সাত
আল-মাররুযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি ইবরাহীম আল-হুসরীকে ইমাম আহমাদ-এর নিকট পাঠাই। তিনি বলেন, আমার আম্মা আপনাকে স্বপ্নে এমন এমন দেখেছেন এবং আপনার জান্নাতে প্রবেশের কথাও উল্লেখ করেছেন। তখন ইমাম আহমাদ বলেন, প্রিয় ভাই, সাহল ইবনু সালামাকেও লোকেরা এমন সংবাদ দিয়েছিল। অথচ তিনি রক্তপাতের পথে হেঁটেছেন। এরপর তিনি বলেন, আসলে স্বপ্ন প্রকৃত মুমিনকে আনন্দিত করে। প্রবঞ্চিত করে না।
আট
আবুল হুসাইন আল-আতাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইবরাহীম আল-হারবীকে তার নিকট উপস্থিত এক জামাআতকে লক্ষ্য করে বলতে শুনেছি, 'তোমাদের যুগে তোমরা কাকে সবচেয়ে গরীব মনে করো?
একজন বলল, যে প্রবাসে আছে সে-ই 'গরীব'।
অপরজন বলল, যে তার প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন সে-ই 'গরীব'।
ইবরাহীম আল-হারবী বললেন, বর্তমানে সবচেয়ে গরীব ওই ব্যক্তি, যে নিজে সৎকর্মশীল ও সৎকর্মশীলদের মাঝেই বসবাস করে। অধিকন্তু সে সৎকাজের আদেশ করলে লোকেরা তাকে সহায়তা করে; আর খারাপ কাজে বাধা প্রদান করলে লোকেরা তাকে সহযোগিতা করে। পার্থিব কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে লোকেরা তা পূরণ করে। অতঃপর একসময় সে-সকল লোক তাকে একা ফেলে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। তখন সে-ই সবচেয়ে গরীব।'
নয়
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ আব্বাসী খলীফা মু'তাযিদ বিল্লাহর জীবনীতে উল্লেখ করেন-
কাযী ইসমাঈল বলেন, একবার আমি খলীফা মু'তাযিদ বিল্লাহর দরবারে প্রবেশ করি। তিনি আমাকে একটি কিতাব দেন। আমি কিতাবটি নেড়েচেড়ে দেখি, তাতে আলিমগণের ত্রুটি-বিচ্যুতি জমা করা হয়েছে। তাদের সমালোচনা করা হয়েছে। আমি বলি, এর লেখক একজন ধর্মবিদ্বেষী।
খলীফা বলেন, কেন? এতে বর্ণিত হাদীস ও দলিল কি সঠিক নয়?
আমি বলি, অবশ্যই সঠিক; কিন্তু যে আলিম নেশাকে বৈধ বলেছেন, তিনি কিন্তু মুতআকে অবৈধ সাব্যস্ত করেছেন। যিনি মুতআকে বৈধ বলেছেন, তিনি কিন্তু গান-বাজনা হারাম বলেছেন। এমন কোনো আলিম নেই, যার কোথাও-না-কোথাও ভুল নেই; কিন্তু যে-ব্যক্তি আলিমগণের ভুলভ্রান্তি খুঁজে খুঁজে বের করে, তার দ্বীন বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। সব বরবাদ হয়ে যায়।
এরপর খলীফা মু'তাযিদ বিল্লাহ সেই কিতাবটি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।
দশ
ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি বারবাহারীকে বলতে শুনেছি, 'পরস্পরের প্রতি কল্যাণ কামনায় যে-মজলিসের আয়োজন করা হয়, তা উপকারিতা ও বদান্যতার দুয়ার খুলে দেয়। আর যে-মজলিস বিতর্ক-বাহাসের জন্য হয়, তা উপকারিতার দুয়ারকে বন্ধ করে দেয়।
এগারো
ইবনুল আরাবী আবুল হুসাইন আন-নূরীর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম যাহাবী বলেন, আবুল হুসাইন আন-নূরী যখন ইন্তেকাল করেন তখন লোকজন তার পাশে বসে বসে এমনকিছু অসার কথায় মেতে ওঠে, যেগুলো থেকে বিরত থাকাই ছিল উত্তম। কেননা, তারা বিষয়টা নিয়ে আন্দাজে ও ভবিষ্যদ্বাণীর মতো করে কথা বলছিল এবং অসার ও অমূলক কথাবার্তার বন্যা বইয়ে দিচ্ছিল।
সেই সোনালি যুগের মানুষগুলোর অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে তাদের পরে আগত-অনাগতদের অবস্থা কেমন হতে পারে! তিনি আরও বলেন, লোকজন 'জমা' নিয়ে আলোচনা করে। একেকজন এর একেকরকম ব্যাখ্যা দেয়। 'জমা'র মতো 'ফানা'র প্রকৃতি নিয়েও তারা মতভেদ করে। যদিও তারা বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রকম নামবাচক শব্দ ব্যবহার করে; তথাপি এগুলোর অর্থ, বাস্তবতা ও গতি-প্রকৃতি ছিল তাদের কাছে অস্পষ্ট। কারণ, একই নামের অধীনে অসংখ্য দিক ও অবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তিনি আরও বলেন, ইলমুল মারিফাত এক অথৈ সমুদ্র। এই শাস্ত্রের কোনো সীমারেখা কিংবা যতিচিহ্ন নেই।
এমনকি তিনি বলেন, এ বিষয়ে একজন খুব চমৎকার মন্তব্য করেছেন- 'যখন কাউকে দেখবে 'জমা' ও 'ফানা' নিয়ে প্রশ্নোত্তর করছে, তখন বুঝবে, সে একেবারে শূন্য ও জ্ঞানরিক্ত। সে এই শাস্ত্রের বিদ্বানও নয়, বিজ্ঞও নয়; কেননা, এই শাস্ত্রের বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞরা 'জমা' ও 'ফানা' সম্পর্কে কাউকে প্রশ্ন করেন না। কারণ, এটা বর্ণনা করে না বোঝা যায়, আর না বোঝানো যায়!
ইমাম যাহাবী বলেন, আল্লাহর শপথ! এই বিষয়ে তারা সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে নেমেছিলেন। গভীর থেকে গভীরে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। রহস্যের পর রহস্যের সমুদ্রে সাঁতার কেটেছিলেন; কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও বাস্তবে এই বিষয়ে তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত ছিল সম্পূর্ণ অনুমান-নির্ভর! এমনকি তারা যে 'ফানা ফিল্লাহ'-তথা আল্লাহর প্রেমে মিটে যাওয়া, জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়া এবং মাতাল হয়ে যাওয়ার দাবি করত, সে দাবিও ছিল মূলত কল্পনা ও ওয়াসওয়াসা মাত্র।
এদের মতো কথা না আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, না কোনো আল্লাহওয়ালা বলেছেন, আর না কোনো তাবিয়ী ইমাম বলেছেন। যদি কেউ এদের কাছে কখনও এসবের প্রমাণ চায় তবে তার ওপর দিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যাবে। তারা বলবে, তুমি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত!
যদি কেউ এদের হাতে নিজের লাগام ছেড়ে দেয় তাহলে তার ঈমানের বারোটা বাজবে। তাকে অন্যরকম এক অস্বস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সে তখন আবেদদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখবে, মুফাসসির ও মুহাদ্দিসদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবে। আর বলতে থাকবে-আরে! এরা তো নিষ্কর্মা, আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ!
তাসাওউফ, আত্মশুদ্ধি ও সুলুক তো তাকেই বলে, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত। যেমন, তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। তাকওয়া ও খোদাভীতিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন।
আল্লাহর পথে জিহাদ করেছিলেন। শরীয়তের যাবতীয় শিষ্টাচারে শোভিত ছিলেন। তারা বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কুরআনের আয়াত নিয়ে গভীর চিন্তা-ফিকির করতেন। খুশু-খযু সহকারে দীর্ঘসময় সালাত পড়তেন। সময়মতো সিয়াম, ইফতার ও দান-সাদাকাহ করতেন। অন্যকে প্রাধান্য দিতেন। জনসাধারণের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করতেন। মুমিনদের সম্মুখে নম্রতা ও কাফিরদের সামনে কঠোরতা প্রদর্শন করতেন। এতসব গুণাবলী আহরণ করার পরেও আল্লাহ তাআলা যাকে চান তাকেই সত্য পথের দিশা দেন।
সুতরাং, একজন আলিম যখন প্রকৃত তাসাওউফ থেকে বিরত থাকেন তখন তিনি শূন্য গৃহের মতো হয়ে পড়েন-ঠিক যেমন কোনো তাসাওউফপন্থী সুন্নাহর জ্ঞান আহরণ থেকে বিরত থাকলে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
বারো
আব্বাসী খলীফা মুসতানযিদ বিল্লাহর জীবনীতে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন-
যখন কোনো দেশের বাদশাহ বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও ধার্মিক হন, তখন রাষ্ট্রের সকল বিষয় তার দ্বারা যথাযথভাবে পরিচালিত হতে থাকে।
আর যদি তিনি দুর্বল মেধা ও ভঙ্গুর চিন্তাশক্তির অধিকারী হন; কিন্তু তার ধার্মিকতা ও দ্বীনদারী ঠিক থাকে, তাহলেও তার এই ধার্মিকতা ও দ্বীনদারী বিচক্ষণ উপদেষ্টাদের পরামর্শের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনায় সাহায্য করে এবং রাষ্ট্রের বিষয়গুলো তার দ্বারা যথাযথভাবে পরিচালিত হতে থাকে।
কিন্তু যদি তার দ্বীনদারী কম হয়, আর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা যথার্থ হয়, তাহলে দেশের জনগণ তার ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে। তার বিচক্ষণতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো পার্থিব দিক দিয়ে দেশ ও জনগণকে ভালো রাখা সম্ভব, কিন্তু পরকালের দিক দিয়ে কিছুতেই সম্ভব নয়।
আর যদি তার দ্বীন ও ধার্মিকতা এবং বিবেক ও বুদ্ধি-দুটিই অপূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে দেশের পতন অনিবার্য! প্রজাদের ধ্বংস অবধারিত। এমন বাদশাহর প্রজারা খুব কষ্টের শিকার হয়ে থাকে। তবে যদি প্রজাদের মাঝে তার সাহসিকতা, কঠোরতা, শাসনের ভয় ও হুকুমের প্রভাব থাকে-তাহলে সে ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যায়; কিন্তু যদি তিনি ভীতু, পাপাচারী, যালিম, নিষ্ঠুর ও মোটা বুদ্ধির অধিকারী হন-তাহলে তার বিপদ অত্যাসন্ন। এমন বাদশাহ শীঘ্রই পদস্থলিত হবে। যদি তাকে হত্যা করা নাও হয়, কারাগারের লৌহকপাটে আবদ্ধ করে রাখা হবে। এতে তার দুনিয়াও ধ্বংস হবে, আর আখিরাত তো আগেই বরবাদ হয়েছে! বরং তার এ ভুলের জন্য তাকে চরম লাঞ্ছিত ও অনুতপ্ত হতে হবে। আল্লাহর কসম! সেই লজ্জা ও লাঞ্ছনা, অনুতাপ ও অনুশোচনা তার কোনো কাজে আসবে না।
আজ আমরা একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত রাষ্ট্রনেতার অপেক্ষায় চরম হতাশায় দিনাতিপাত করছি। আমরা যদি চাই, আল্লাহ আমাদের জন্য একজন সৎ, যোগ্য ও ধর্মপরায়ণ রাষ্ট্রনেতার ব্যবস্থা করে দিন, তাহলে আমাদের উচিত হবে এই দুআটি বেশি বেশি করা-
হে আল্লাহ, আপনি রাজা ও প্রজা-উভয়কে সত্য পথে পরিচালিত করুন। আপনার বান্দাদের ওপর রহম করুন। তাদের সৎকাজের তাওফীক দিন। তাদের বাদশাহকে শক্তিশালী করুন। আর আপনার দেখানো পথের মাধ্যমে তাকে সাহায্য করুন!
তেরো
ইমাম ওয়াকী ইবনুল জাররাহর 'বিচ্যুতি' সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন-
ইমাম ওয়াকী ইবনুল জাররাহ মারাত্মক একটি ভুল বিষয়ে জড়িয়ে পড়েন। অবশ্য তার উদ্দেশ্য সৎ ছিল। তিনি সে-বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করলেই পারতেন; কিন্তু সেটা আর হয়নি। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
كَفى بالمرء إِثْمًا أَنْ يُحَدِثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
কারও পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাইবাছাই ছাড়া) তা-ই বলে বেড়ায়
সুতরাং, বান্দা যেন তার প্রভুকে ভয় করে এবং আপন গোনাহের ব্যাপারে সতর্ক থাকে।
এরপর ইমাম যাহাবী ওয়াকী ইবনুল জাররাহ-এর উক্ত বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করে বলেন-আলী ইবনু খশরুম বলেন, আমাদের কাছে ওয়াকী ইবনুল জাররাহ বলেছেন, তিনি শুনেছেন ইসমাঈল ইবনু আবি খালিদ থেকে, তিনি শুনেছেন আব্দুল্লাহ আল-বাহাই থেকে।
আব্দুল্লাহ আল-বাহাই বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। রাসূলের দিকে ঝুঁকে তার কপালে চুমু খান। এরপর বলেন, আমার মাতা-পিতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক। আপনার জীবন-মৃত্যু কতই না উত্তম ছিল!
অতঃপর আব্দুল্লাহ আল-বাহাই বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক-দিন এক-রাত এভাবেই রেখে দেওয়া হয়। এতে তার পেট মুবারক ফেঁপে ওঠে, আঙুল ফুলে যায়।
আলী ইবনু খশরুম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ওয়াকী ইবনুল জাররাহ এ হাদীস মক্কায় অবস্থানকালে বর্ণনা করেন। এতে কুরাইশ বংশের লোকেরা তার ওপর ক্ষেপে যান। তারা তাকে শূলে চড়ানোর সংকল্প করেন। এমনকি সবকিছুর বন্দোবস্তও করে ফেলেন। এমন সময় ইমাম সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ এসে বলেন, আরে! আরে! তোমরা এসব কী করছ? আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি তো ইরাকের অন্যতম প্রসিদ্ধ ফকীহ এবং ফকীহের সন্তান। আর এ হাদীস তো খুবই প্রসিদ্ধ।'
ইমাম সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ বলেন, আমি নিজেও এ হাদীস কখনও শুনিনি; কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল তাকে শূলে চড়ানো থেকে বাঁচানো।
আলী ইবনু খশরুম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হাদীসটি ওয়াকী ইবনুল জাররাহ থেকে তখন শুনেছি, যখন লোকেরা তাকে শূলে চড়াতে উদ্যত হয়েছিল। ঠিক ওই মুহূর্তেও তার সাহসিকতা ও দৃঢ়তা দেখে আমি অবাক হয়েছি। তিনি নাকি তার স্বপক্ষে দলিল দিতে গিয়ে এও বলেছেন যে, 'সাহাবীগণের একটি বড় জামাআত-তাদের মাঝে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন-তারা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা যাননি। তাই আল্লাহ তাআলা তার মৃত্যুর কিছু আলামত তাদের প্রত্যক্ষ করিয়েছেন।
ঘটনাটি আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আলী ইবনি রাযীন আল-বাশানী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আলী ইবনু খশরুম। উক্ত হাদীস ওয়াকী ইবনুল জাররাহ থেকে কুতাইবা ইবনু সাঈদও বর্ণনা করেছেন।
নিঃসন্দেহে এটি ওয়াকী ইবনুল জাররাহ-এর পদস্খলন। অন্যথায় এমন পরিত্যাজ্য ও সনদ-বিচ্ছিন্ন হাদীস প্রচার করায় তার কোনো স্বার্থ-ই থাকতে পারে না! বস্তুত তার মন একটি ভুলের দিকে তাকে টেনে নিয়ে গেছে। আর যারা তার বিরোধিতা করেছে, তারাও ছিলেন অপারগ; বরং তারা এমনটা করায় প্রতিদানও পাবেন। নবুওয়াতের মর্যাদারক্ষায় তারা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। কারণ, তারা ভেবেছিলেন, একটি ভুল ও পরিত্যাজ্য হাদীসের প্রসার হচ্ছে এবং এর দ্বারা নবুওয়্যাতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে।
চৌদ্দ
যাকারিয়া আস-সাজী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আবদিল হাকাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বলেছেন, হে মুহাম্মাদ, যদি কেউ তোমার কাছে জানতে চায়, কুরআন সাধারণ একটি মাখলুক নাকি আল্লাহর বিশেষ একটি গুণ, তাহলে তুমি কোনো উত্তর দিয়ো না। কেননা, কেউ যদি তোমাকে রক্তপণ সম্পর্কে প্রশ্ন করে, আর তুমি এক দিরহাম বা তার ছয়ভাগের একভাগের সমপরিমাণ বলো তাহলে সে বলবে-তুমি 'ভুল করেছ!' পক্ষান্তরে যদি তোমাকে কালামুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে আর তুমি ভুল করো, তাহলে বলবে, তুমি কাফির হয়ে গেছ।
পনেরো
রবী'আ থেকে বর্ণিত, ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্ক-বাহাস অন্তর পাষাণ করে দেয় এবং অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে!
ষোলো
তাহির ইবনু খলল্ফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহতাদী বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসিক বলেন, যখন আমার পিতা কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতেন, তখন সেখানে আমাদের উপস্থিত রাখতেন। একবার খেযাব লাগানো বয়োবৃদ্ধ এক কয়েদীকে উপস্থিত করা হয়। তার বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য আমার পিতা আবু আব্দিল্লাহ ও তার সঙ্গী ইবনু আবি দুআদকে ডেকে পাঠান। এরপর সেই বয়োবৃদ্ধ কয়েদীকে দরবারে উপস্থিত করা হলে সে বলে, আমীরুল মুমিনীন, আসসালামু আলাইকুম।
উত্তরে আমার পিতা বলেন, তোমার সালামের কোনো জবাব হবে না!
সে বলে, হে আমীরুল মুমিনীন, যে আপনাকে আদব শিখিয়েছে, সে খুব বাজে আদব শিখিয়েছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَإِذَا حُمِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
আর যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হবে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে। অথবা জবাবে তাই দেবে।
ইবনু আবি দুআদ ততক্ষণে দরবারে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি বলেন, আমীরুল মুমিনীন, তার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।
: ঠিক আছে! বলুন।
: হে শাইখ, কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট! মাখলুক না গায়রে মাখলুক?
: আমার সাথে ইনসাফের আচরণ করা হয়নি। তাছাড়া আমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে।
: ঠিক আছে! তাহলে আপনিই আগে বলুন!
: কুরআনের ব্যাপারে আপনি কী বলেন? কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট?
: কুরআন মাখলুক। কুরআন সৃষ্ট।
: বিষয়টি কি এমন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন? কিংবা আবু বকর, উমার ও খুলাফায়ে রাশেদীন? নাকি তারাও জানতেন না?
: বিষয়টি এমন যে, তারা এটি জানতেন না।
: সুবহানাল্লাহ! যে বিষয়টা রাসূল জানতেন না, সেটা আপনি জেনে গেছেন? এবার ইবনু আবি দুআদ লজ্জিত হয়ে বললেন,
: আমাকে ক্ষমা করবেন। আসলে তারা ব্যাপারটা জানতেন।
: তাহলে তারা জানতেন; কিন্তু মানুষকে এর দিকে আহ্বান করেননি? দাওয়াত দেননি?
: হ্যাঁ
: তাহলে যা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, তা কি তোমার পক্ষে সম্ভব নয়?
মুহতাদী বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসিক বলেন, আমার পিতা এমন সময় তাদের আলোচনায় শরীক হন, যখন শাইখ বলছিলেন, বিষয়টি কি এমন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন? কিংবা আবু বকর, উমার ও খোলাফায়ে রাশেদীন? নাকি তারাও জানতেন না?
তখন তিনি চারশ দিনার উপহারসহ শাইখকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়ার আদেশ করেন।
এই ঘটনার পর ইবনু আবি দুআদ আব্বার কাছে ছোট হয়ে যান। এরপর আর কোনোদিন আব্বা তাকে ডাকেননি।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৭৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/২৬৪
৩. ঘটনাটি মুখস্থ লিখছি। মূল পাণ্ডুলিপি এখন আমার কাছে নেই।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/১১৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৯/২২৪
১. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৬৩-১৬৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৩১
৩. ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ
১. আদ্দুররুল মানসুর: ১/৩৩২
২. কথাটি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাণী থেকে সংকলিত। দেখুন: সহীহ মুসলিমের ভূমিকা: ১/১১
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৫৭৮
৪. তিনি একজন নেককার আবিদ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২২৭
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩৬২
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৪৬৫
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৯১
৩. 'জমা', 'ফানা ফিল্লাহ'-এসব মারেফাত সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এগুলোর অর্থ ও অবয়ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। সম্পাদক।
১. শরীয়তের বিমূর্ত রূপরেখাকে যারা বিবর্তিত করে কিংবা ইসলামের মৌলিক বিধানাবলী পালন না করে তরীকতের নামে শরীয়ত বহির্ভূত পথে হাঁটে, এখানে কেবল তাদের কথাই বলা হয়েছে।
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৪০৯-৪১০
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৪১৮
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯২; সহীহ আবি দাউদ লি-আলবানী: ৪১৭৭
১. বিস্তারিত দেখুন--আল-কামিল লি-ইবনু আদী : ৬৫৪
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৯/১৫৯-১৬০
৩. আকীদা শাস্ত্রে এই বিষয়টি 'খালকু কুরআন' নামে সমধিক পরিচিত।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১০/২৮
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/২৮
২. বিশিষ্ট আব্বাসি খলীফা
৩. সূরা নিসা, আয়াত: ৮৬
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৩১২