📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের আল্লাহভীতি

📄 সালাফগণের আল্লাহভীতি


এক
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায় মজলিসে বলতেন, রাত ও দিনের আবর্তনে তোমাদের হায়াতের স্বল্প সময়টুকুও ফুরিয়ে যাচ্ছে। তোমাদের ভালোমন্দ সব আমল সংরক্ষিত হচ্ছে। হঠাৎ মৃত্যু এসে হাজির হবে। অতএব, যে-ব্যক্তি কল্যাণের চারা রোপণ করছে, সে শীঘ্রই এর কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে আনন্দিত হবে। আর যে মন্দের চারা রোপণ করছে, সে শীঘ্রই লাঞ্ছিত হবে।

প্রত্যেক চাষীর জন্য তাই অপেক্ষা করছে, যা সে রোপণ করেছে। যে ধীরগামী, তার ভাগ্য তাকে অতিক্রম করবে না। যে লোভী, যা তার ভাগ্যে নেই তা কখনই লাভ করতে পারবে না। যাকে কল্যাণ দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছে। যাকে মন্দ থেকে বাঁচানো হয়েছে, আল্লাহ তাআলাই তাকে বাঁচিয়েছেন।

যারা মুত্তাকী, তারাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান। যারা ফকীহ, তারাই অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাদের সাক্ষাৎ নফল ইবাদতের সমতুল্য।[১]

দুই
আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদলের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রার সময় বলতেন—কত সাদা পোশাক পরিহিত লোক আছে, যাদের দ্বীন কলুষিত। কত সম্মানিত ব্যক্তি আছে, যারা দ্বীনের ব্যাপারে অপদস্থ। তোমরা তোমাদের পুরাতন পাপগুলো নতুন পুণ্য দ্বারা মিটিয়ে দাও।[১]

তিন
ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় অঝোরে কাঁদছিলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, সফর অনেক লম্বা। পাথেয় যৎসামান্য। প্রতিটি ঘাঁটি কন্টকাকীর্ণ। অধিকন্তু, এই ঘাঁটিগুলো ওপারে অপেক্ষা করছে—হয়তো জান্নাত; নয়তো জাহান্নাম![২]

চার
উবাইদুল্লাহ ইবনুস সারী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আমার এমন একটা গুনাহ সম্পর্কে জানি, যা আমার ওপর ঋণের বোঝার মতো চেপে আছে। জিজ্ঞেস করা হলো, কী সেই গুনাহ? তিনি বললেন, আমি প্রায় চল্লিশ বছর যাবত একজনকে ‘হে নিঃসু’ বলে ডেকেছি।

উবাইদুল্লাহ ইবনুস সারী বলেন, আমি এই ঘটনা আবু সুলাইমান আদ-দারানীকে বললে তিনি বলেন, তাদের গুনাহ কম ছিল। তাই তাদের মনে থাকত, কোন গুনাহ কোথায় হয়েছে? কিন্তু আমার আর তোমার গুনাহ এত বেশি যে, কোথায় কখন কোন গুনাহ করেছি, তার কিছুই মনে নেই। [৩]

পাঁচ
আতা আল-খুরাসানী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমি দুনিয়ার ব্যাপারে তোমাদের নসীহত করব না। তোমরা তো এমনিতেই দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করো এবং দুনিয়ার প্রতি লালায়িত থাকো। তাই আমি আখিরাতের ব্যাপারে তোমাদের নসীহত করব। তোমরা অস্থায়ী বাসস্থানের পরিবর্তে স্থায়ী বাসস্থানের কথা চিন্তা করো।

■ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে হবে জেনেই দুনিয়া গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর শপথ, অবশ্যই তোমাদের দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে হবে।

■ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে জেনেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকো। কেননা, আল্লাহর শপথ, অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ তোমাদের আস্বাদন করতে হবে।

■ আখিরাতে অবতরণ করবে জেনেই আখিরাতের জন্য প্রস্তুত থাকো। কেননা, আল্লাহর শপথ, খুব শীঘ্রই তোমাদের আখিরাতে অবতরণ করতে হবে।

মনে রাখবে, আখিরাত সকল মানুষের বসতবাড়ি। মানুষের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে সফরে বের হয় আর তার সাথে কোনো পাথেয় থাকে না। যে-ব্যক্তি তার সফরের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে, সে সফরে সুখী হয়। আনন্দ উদযাপন করে। কষ্ট ভোগ করে না।

পক্ষান্তরে যে সফরে বের হয়, কিন্তু কোনো পাথেয় নেয় না, সে অবশ্যই লজ্জিত হয়। ক্ষুধা লাগলে খাদ্য পায় না। রোদ উঠলে ছায়া পায় না। পিপাসা লাগলে পানি পায় না। দুনিয়ার সফর হলো খুবই স্বল্প সময়ের। সুতরাং, বুদ্ধিমান তো সে-ই, যে এমন সফরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে, যে সফর কখনও শেষ হবে না। আর সে সফর হচ্ছে আখিরাতের সফর।[১]

ছয়
কাবিসা ইবনু কায়িস আল-আম্বরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সন্ধ্যাবেলা যাহহাক ইবনু মুযাহিম খুব কাঁদতেন। কারণ, জিজ্ঞেস করা হলে বলতেন, আমি জানি না, আজ সারাদিনে আমার কোন কোন আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়েছে। তাই কাঁদছি।) [২]

সাত
কিনানা ইবনু জাবালা আস-সুলামী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, বকর ইবনু আব্দিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন তুমি বয়সে তোমার চেয়ে বড় কাউকে দেখবে, তখন ভাববে, এ ব্যক্তি ঈমান ও সৎ আমলের দিক থেকে তোমার চেয়ে অগ্রগামী। তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর যখন বয়সে তোমার চেয়ে ছোট কাউকে দেখবে, তখন মনে করবে, গুনাহ এবং অবাধ্যতায় তুমি তার চেয়ে অগ্রগামী। সুতরাং, সে-ও তোমার চেয়ে উত্তম। তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর যখন তুমি তোমার সমবয়সী ও সমসাময়িকদের দেখবে, তারা তোমাকে সম্মান দেখাচ্ছে এবং তোমার প্রশংসা করছে তখন মনে করবে, তারা যা করছে, সেটা তাদের দয়া ও অনুগ্রহ। পক্ষান্তরে তারা যদি তোমাকে সম্মান না দেখায় এবং তোমার প্রশংসা না করে, তাহলে মনে করবে, এটা তোমার পাপাচারের ফল এবং এটাই তোমার প্রাপ্য।[১]

আট
কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ-র সাথে মাঝে মাঝে সফরে বের হতাম। তখন প্রায়ই আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকত—এই লোকটির মধ্যে এমন কী আছে, যার কারণে তার মর্যাদা ও সুখ্যাতি আমাদের চেয়ে এত বেশি? আমরাও তো তার মতো সালাত আদায় করি, হজ পালন করি, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি; তবে কেন তার এবং আমাদের মাঝে এত ব্যবধান? এত পার্থক্য?

এরপর খুব শীঘ্রই আমি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই—
একবার আমরা গভীর রাতে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হই। পথিমধ্যে একটি ঘরে খাবারের জন্য বসি। হঠাৎ বাতিটা নিভে যায়। আমাদের সঙ্গীরা বাতি জ্বালানোর জন্য চেষ্টা করতে থাকে। কিছুক্ষণের জন্য পুরো ঘর অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সঙ্গীদের কয়েকজন ঘরের বাইরে গিয়ে বাতি জ্বালানোর উপায় খুঁজতে থাকে। এতে কিছুক্ষণ সময় লেগে যায়। তারপর তারা বাতি জ্বালিয়ে ঘরে আসে। হঠাৎ করে ঘর আলোকিত হওয়ায় আমরা দেখতে পাই, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের চেহারা ও দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে একাকার!

আমি তখন মনে মনে বলি, এই যে ভীতি! এই যে ভয়! এই কারণেই তিনি আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ! অধিক মর্যাদাবান! হয়তো বাতি নিভে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট অন্ধকার তাকে আখিরাতের অন্ধকারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।[২]

নয়
হুসাইন ইবনুল হাসান আল-মাররুযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, দিনটি কেমন কাটল আপনার? তিনি বললেন—যার প্রতিপালক তার কাছে ফরয আদায়ের আশা করেন, যার নবী তাকে সুন্নত পালনের আহ্বান করেন, যার দুই কাঁধের ফেরেশতা তাকে আমল বিশুদ্ধ করার কথা বলেন, অন্তর যাকে তার প্রবৃত্তির চাহিদাপূরণে প্রলুব্ধ করে, শয়তান যাকে অশ্লীল কাজ করতে কুমন্ত্রণা দেয়, মালাকুল মাওত [১] যার আত্মা নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমান, যার কাছে তার পরিবার ভরণপোষণের আশায় রয়েছে, তার দিন আর কেমন কাটিতে পারে?[২]

দশ
ইবনু খুবাইক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হুযাইফা আল-মারআশী একবার আমাকে বললেন, চারটি জিনিসের প্রতি লক্ষ্য রেখো—এক. তোমার চক্ষুদ্বয়, দুই. মুখ, তিন. প্রবৃত্তি, চার. অন্তর।

* তোমার চোখের ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন তা হারাম জিনিসে দৃষ্টিপাত না করে।

* তোমার মুখের ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন তা কপট কথা না বলে।

* তোমার প্রবৃত্তির ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন সে মন্দ কিছু কামনা না করে।

* তোমার অন্তরের ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন তার মাঝে কোনো মুসলমানের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না থাকে।

সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত এই চারটি বৈশিষ্ট্য তোমার মাঝে না আসবে, ততক্ষণ তোমার মাথার ওপর ছাই পড়ুক।[৩]

এগারো
শাইখ কাফফাল সম্পর্কে কাযী হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি আমার উসতায। তিনি যখন পড়াতেন, বেশির ভাগ সময়জুড়েই খুব কাঁদতেন। এরপর মাথা তুলে বলতেন, যে-উদ্দেশ্যে আমাদের প্রেরণ করা হয়েছে, সে-ব্যাপারে আমরা কতই-না বেখবর! আমরা আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কতই-না গাফেল![১]

বারো
মুখাওওয়াল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন বাহিম আল-আজালী আমার কাছে এসে বললেন, আমি হজের সফরে বের হব। তোমার আত্মীয় বা বন্ধুমহলে এমন কেউ কি আছে, যাকে তুমি আমার সফরসঙ্গী হিসাবে পছন্দ করো? আমি বললাম, হ্যাঁ।

অতঃপর আমি আমার মহল্লার এক লোকের কাছে গেলাম। লোকটি খুবই দ্বীনদার ও পরহেজগার। আমি তাদের দুইজনের মাঝে পরিচয় করিয়ে দিলাম। তারা একসাথে সফরে যেতে সম্মত হলো। একপর্যায়ে বাহিম আল-আজালী তার পরিবারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলে মহল্লার ওই লোক এসে আমাকে বলল, হে মুখাওওয়াল, তোমার এই বন্ধুকে আমার থেকে দূরে রাখো। আমার জন্য অন্য কোনো সফরসঙ্গী তালাশ করো।

: সর্বনাশ! কী সব বলছ, তুমি? কী হয়েছে? আল্লাহর কসম! পুরো কুফা নগরীতে তার মতো সচ্চরিত্রবান ও সহনশীল আর কেউ নেই। আমি তার সাথে সমুদ্র-সফর করেছি। তাকে উত্তম সঙ্গী হিসেবে পেয়েছি।

: সমস্যাটা এখানে নয়; বরং সে ক্লান্তিহীন অবিরাম ক্রন্দন করে। তার এই ক্রন্দন আমার পুরো সফর মাটি করে দেবে।

: যখন আল্লাহর কথা স্মরণ হয় এবং হৃদয় বিগলিত হয়, তখন সে এভাবে কাঁদতে থাকে। তাছাড়া তুমি কি কখনও কাঁদো না?

: হ্যাঁ, অবশ্যই কাঁদি; কিন্তু আমি জানতে পেরেছি, সে মাত্রাতিরিক্ত কাঁদে।

: ঠিক আছে, তুমি তার সঙ্গে সফর করো। আশা করি, তার দ্বারা তুমি উপকৃত হতে পারবে।

: হুম! আমি ইস্তিখারা করে দেখি।

যেদিন তারা সফরের উদ্দেশ্যে বের হবে, সেদিন তাদের জন্য একটি উট আনা হলো। উটের পিঠে সফরের পাথেয় বেঁধে দেওয়া হচ্ছিল। এমন সময় বাহিম আল-আজালী হাতের ওপর খুঁতনি ঠেকিয়ে দেওয়ালের ছায়ায় বসে ছিলেন। আর এত বেশি কাঁদছিলেন যে, তার গাল, দাড়ি ও বুক অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছিল। আল্লাহর কসম! আমি দেখেছি, তার অশ্রু মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিল!

আমার সাথীটি আমাকে বলল, মুখাওওয়াল! তোমার বন্ধুর কান্না শুরু হয়ে গেছে। এ ব্যক্তি আমার সফরসঙ্গী হতে পারবে না।

আমি বললাম, তুমি তার সাথে সফর করো। হয়তো তার পরিবারের কথা কিংবা দীর্ঘ সফরে তাদের বিচ্ছেদের কথা মনে পড়েছে। তাই সে কাঁদছে।

আমাদের এই আলাপ বাহিম শুনে ফেলেন। তিনি বলেন, হে আমার ভাই, আল্লাহর শপথ, আমি মোটেও এই জন্য কাঁদছি না। আমি তো কাঁদছি দুনিয়ার এই সফর দেখে আখিরাতের সফরের কথা মনে পড়ে গেল, তাই!

মুখাওওয়াল বলেন, এরপর তার কান্নার আওয়াজ আরও বেড়ে যায়।

তখন মহল্লার লোকটি আমাকে বলে, আল্লাহর শপথ! আমার প্রতি তোমার কোনোরূপ শত্রুতা এবং ঘৃণা নেই! কেন তুমি আমাকে বাহিমের সাথে জুড়ে দিচ্ছ? বাহিমের সফরসঙ্গী তো হওয়া উচিত দাউদ আত-তায়ী, সালাম আবুল আহওয়াস এবং এদের মতো কেউ। যাতে তারা পরস্পরে মিলে কাঁদতে পারে-যতক্ষণ না তাদের মন প্রশান্ত হয় কিংবা তারা সকলে মারা যায়।

আমি তাকে সফরসঙ্গী হিসেবে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলাম এবং বললাম, ধৈর্য ধরো! হয়তো এটাই হবে তোমার জীবনের সর্বোত্তম সফর।

সে বলল, একবার আমি হজের দীর্ঘ সফরে বেরিয়েছিলাম। তখন আমার সঙ্গী ছিল ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন উন্নত রুচিবোধসম্পন্ন। কখনও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতেন না। কাঁদতেন না। আমি এমন সফরসঙ্গী জীবনে একবারই পেয়েছি। আর সম্ভবত সেটাই আমার জীবনের সেরা সফর ছিল।

মুখাওওয়াল বলেন, আমাদের এই আলাপ-আলোচনা বাহিম জানতেন না। যদি জানতেন, তাহলে কিছুতেই তার সাথে সফরে বের হতেন না।

অবশেষে তারা বেরিয়ে পড়লেন এবং হজ সম্পন্ন করে ফিরে এলেন। তাদের উভয়কে সফরসঙ্গী নয়; বরং ভাইয়ের মতো লাগছিল। আমি আমার প্রতিবেশীর নিকট গেলাম। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী অবস্থা?

তিনি বললেন, প্রিয় ভাই, আল্লাহ তোমাকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন! আমি তো মনে করি, এই লোকটি বিশ্ববাসীর জন্য এই সময়ের আবু বকর! আল্লাহর শপথ! খরচ বহনে সে আমার চেয়ে অগ্রগামী ছিল। অথচ সে ছিল নিঃস্ব; আমি ছিলাম সচ্ছল। খেদমতের ব্যাপারেও সে আমার থেকে ওপরে ছিল। অথচ আমি ছিলাম শক্তিশালী যুবক; আর সে ছিল দুর্বল বৃদ্ধ। রান্নাবান্নার ক্ষেত্রেও সে ছিল আমার আগে। সে আমার জন্য রান্না করত। অথচ আমি সিয়াম রাখতাম না, কিন্তু সে নিয়মিত সিয়াম পালন করত।

আমি বললাম, তার মাত্রাতিরিক্ত কাঁদার যে-ব্যাপারটি তুমি অপছন্দ করতে, সেটার কী অবস্থা? সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি সেটাকে মানিয়ে নিয়েছিলাম। এমনকি আমার অন্তর নরম হয়ে গিয়েছিল এবং তার সাথে আমিও ক্রন্দন করতাম। এতে করে অন্যান্য সফরসঙ্গীদের কষ্ট হতো; কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারাও ব্যাপারটা মানিয়ে নেয় এবং যখন আমাদের কাঁদতে শুনত, তখন তারাও কান্না আরম্ভ করত। আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, আমাদের সবার তো লক্ষ্য একটিই। তাহলে কেন তারা আমাদের থেকে এত বেশি কান্নাকাটি করছে? আল্লাহর কসম! এরপর তারাও কাঁদত, আমরাও কাঁদতাম!

মুখাওওয়াল বলেন, অতঃপর আমি তার নিকট থেকে উঠে বাহিমের কাছে গেলাম। তাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার সফরসঙ্গীকে কেমন লাগল? তিনি বললেন, সে খুবই উত্তমসঙ্গী। আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে। দীর্ঘ সময় কুরআন তিলাওয়াত করে। বেশি বেশি ক্রন্দন করে। আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন![১]

টিকাঃ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯৭
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮১
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৬৯৪
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৬
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৫১
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৫০
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৮
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৫৪
[১] মৃত্যুর ফেরেশতা
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২২৭
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৬৮
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৭/৪০৭
[১] আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনার দুআ।
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৭৯-১৮৩

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সুনাম-সুখ্যাতির প্রতি সালাফগণের অনীহা

📄 সুনাম-সুখ্যাতির প্রতি সালাফগণের অনীহা


এক
হাবীব ইবনু আবি সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। কিছু মানুষ তার পেছনে পেছনে হাঁটছিল। তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আমার কাছে তোমাদের কোনো প্রয়োজন আছে? তারা বলল, না; কিন্তু আমরা আপনার সাথে কিছুক্ষণ হাঁটতে চাই। তিনি বললেন, তোমরা ফিরে যাও। কারও পেছনে পেছনে হাঁটা, এটা অনুসারীদের জন্য অপমান। আর অনুসৃত ব্যক্তির জন্য ফিতনা।[১][২]

দুই
হারিস ইবনু সুওয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলতেন, আমি আমার সম্পর্কে যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে (আমার প্রতি ঘৃণাবশত) তোমরা আমার মাথায় মাটি ছুড়ে মারতে।[৩]

তিন
বিসতম ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রাহিমাহুল্লাহ যখন দেখতেন, কেউ তার সাথে সাথে হাঁটছে, তখন তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন। আর বলতেন, ভাই, আমার কাছে কি আপনার কোনো প্রয়োজন আছে?
যদি কোনো প্রয়োজন থাকত, তাহলে তিনি তা পূরণ করতেন। এরপরও যদি লোকটি তার সাথে হাঁটতে থাকত, তখন বলতেন, আপনার আর কোনো প্রয়োজন আছে কি?[১]

চার
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে নিয়ে একটি কূপের নিকট আসেন। মানুষ সেখান থেকে পানি উঠিয়ে পান করছিল। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকও পানি পান করার জন্য কূপের নিকটে যান; কিন্তু লোকেরা তাকে চিনতে না পারায় তার সাথেও ধাক্কাধাক্কি করে।

অতঃপর তিনি ভিড় থেকে বের হয়ে এসে বলেন, এটাই জীবন। অর্থাৎ যেখানে আমাদের কেউ চিনবে না, সেখানে আমাদের কেউ সম্মানও করবে না।

হাসান বলেন, আমরা একবার কুফায় অবস্থান করছিলাম। তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সামনে 'কিতাবুল মানাসিক' পড়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে এমন একটি হাদীস সামনে আসে যেটির শেষে লেখা ছিল—আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, 'এটিই আমাদের মত।' তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক জিজ্ঞেস করেন, 'আমার এই উক্তি কে লিখেছে?' আমি বললাম, 'এই কিতাব যার—তিনিই লিখেছেন।' আমার এ কথা শুনে তিনি পাঠদান শেষ হওয়া পর্যন্ত তার হাত দিয়ে খুঁটে খুঁটে সেই লেখাটুকু তুলতে থাকেন। সেই সঙ্গে পাঠদানও অব্যাহত রাখেন। এরপর বলেন, 'আমি এমন কে যে, আমার কথা কিতাবে লিখতে হবে?' [৩]

পাঁচ
হুসাইন ইবনুল হাসান আল-মাররুযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, নিজেকে সবসময় সুনাম-সুখ্যাতির আড়ালে রাখার চেষ্টা করবে। সেই সঙ্গে তুমি যে সুনাম-সুখ্যাতি পছন্দ করো না—সেটা বলে বেড়ানো থেকে বিরত থাকবে। নিশ্চয় যে নিজেকে 'যাহিদ[১]' বলে দাবি করে, সে 'যুহদ'-এর চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে যায়। কেননা, 'যাহিদ' বলে বেড়ানোর অর্থই হলো মানুষের প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য কামনা করা![২]

ছয়
ইবনু মুহাইরিয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি ফুযালা ইবনু উবাইদকে বললাম, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, কিছু গুণ আছে, সেগুলো অর্জন করতে পারলে আল্লাহ এর দ্বারা তোমাকে উপকৃত করবেন। (১) সম্ভব হলে এমনভাবে থাকার চেষ্টা করবে যে, তুমি মানুষকে চিনবে; কিন্তু মানুষ তোমাকে চিনবে না। (২) তুমি শুধু শুনবে, কিছু বলবে না। (৩) তুমি অন্যের মজলিসে বসবে, কিন্তু তোমার মজলিসে কেউ বসবে না।[৩]

সাত
জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি আবু আব্দিল্লাহ[]-এর চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ দেখতে পাই। কারণ, জিজ্ঞেস করলে জানা যায়, কেউ একজন তাঁর প্রশংসা করে বলেছিল, আল্লাহ তাআলা ইসলামের পক্ষ থেকে আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন'। তার এই দুআর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বরং আল্লাহ তাআলা আমার পক্ষ থেকে ইসলামকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আমি এমন কে যে, মহান আল্লাহ আমাকে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রতিদান দেবেন।[১]

আট
মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মসজিদে নববীতে একটি খুঁটি ছিল। আমি রাতের বেলা খুঁটিটির পাশে সালাত পড়তাম। তাতে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতাম। একবারের ঘটনা, মদীনায় সে-বছর মারাত্মক খরা দেখা দেয়। বৃষ্টির জন্য খোলা মাঠে এসে মানুষ প্রার্থনা করে; কিন্তু বৃষ্টি নামে না। এরপর সেই রাতে আমি ইশার সালাত আদায় করে মসজিদে নববীর ওই খুঁটির নিকট এসে হেলান দিয়ে বসি। এমন সময় একলোক আসেন। দেখতে কালো। একটা হলদে রঙের চাদর জড়ানো। ছোট একটা কাপড় তার কাঁধে চাপানো। সে আমার এবং আমার সামনে থাকা খুঁটির মাঝে এসে দাঁড়ায় এবং আমাকে পেছনে ফেলে দুই রাকাত সালাত আদায় করে। এরপর ওপরের দিকে দু'হাত তুলে কায়মনোবাক্যে বলে-
হে আমার প্রভু, আজ তোমার নবীর সম্মানিত শহরের মানুষেরা ময়দানে নেমেছিল, বৃষ্টি প্রার্থনা করেছিল; কিন্তু তুমি বৃষ্টি বর্ষণ করোনি। আমি তোমাকে দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি তাদের ওপর অবশ্যই বৃষ্টি বর্ষণ করো!

ইবনুল মুনকাদির বলেন, আমি মনে মনে বললাম, লোকটা পাগল নাকি! অতঃপর সে হাত নামাতেই আকাশে মেঘের গর্জন শুনতে পেলাম। আর এমন মুষলধারে বর্ষণ হলো যে, বাড়িতে পরিবারের লোকদের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।

এদিকে লোকটা বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে পেয়ে আল্লাহ তাআলার প্রশংসায় এমন কিছু বাক্য বলে-যা আমি ইতিপূর্বে কখনও শুনিনি। এরপর সে বলে, হে আমার রব, আমি এমন কে যে, আমার আহ্বানে সাড়া দিলে? কিন্তু হ্যাঁ, আমি কেবল তোমার প্রশংসা করেছি এবং তোমারই আশ্রয় চেয়েছি।

অতঃপর সে উঠে দাঁড়ায়। যে-কাপড়টা সে লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করেছিল সেটাকে খুলে গোটা শরীরে জড়িয়ে নেয় এবং তার পিঠে ঝুলে থাকা কাপড়টা বিছিয়ে তার ওপর সালাত পড়তে শুরু করে। এভাবে ফজরের আগ পর্যন্ত সালাত পড়তে থাকে।
সুবহে সাদিকের আগ দিয়ে বিতরের সালাত পড়ে।

এরপর ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করে এবং সবশেষে সাধারণ মানুষের সাথে সাথে ফজরের জামাআতে অংশগ্রহণ করে। তার সাথে আমিও জামাআতে অংশগ্রহণ করি।

ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর সে উঠে বেরিয়ে যায়। আমিও তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকি। একপর্যায়ে সে মসজিদের গেইট পর্যন্ত চলে আসে এবং কাপড় কিছুটা ওপরে উঠিয়ে পানির ওপর দিয়ে চলতে থাকে। আমিও তার মতো চলতে থাকি; কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে কোথায় যেন হারিয়ে যায়; তাকে আর খুঁজে পাই না।

দ্বিতীয় রাতে মসজিদে নববীতে ইশার সালাত আদায় করে ওই খুঁটির পাশে এসে বসি। খুঁটিটিকে বালিশের মতো ব্যবহার করে শুই। এ সময় লোকটি আবার আগমন করে। যে-কাপড়টা সে লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করছিল সেটাকে ভালো করে গোটা শরীরে জড়িয়ে নেয়। আর কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা কাপড়টা বিছিয়ে তার ওপর সালাত পড়তে শুরু করে। এভাবে ফজরের আগ পর্যন্ত সালাত আদায় করতে থাকে। এরপর বিতরের সালাতের পর ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করে। সবশেষে মানুষের সাথে সাথে ফজরের জামাআতে অংশগ্রহণ করে। তার সাথে আমিও জামাআতে অংশগ্রহণ করি।

ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর সে উঠে বেরিয়ে যায়। আমিও তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকি। একপর্যায়ে সে একটি ঘরে প্রবেশ করে। মদীনায় বসবাস করার দরুন আমি ঘরটি ভালো করেই চিনতাম। ঘরটি দেখে আমি মসজিদে নববীতে ফিরে আসি।

সূর্যোদয়ের পর নফল সালাত আদায় করি। তারপর সেই ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা করি। সেখানে গিয়ে দেখি, সে বসে বসে মোজা সেলাই করছে। অর্থাৎ পেশায় সে একজন মুচি। আমাকে দেখেই সে চিনে ফেলল এবং ঈষৎ হেসে বলল— 'হে আবু আব্দিল্লাহ, তোমাকে স্বাগতম! তোমার কি সেলাইযোগ্য কোনো মোজা আছে? থাকলে দিতে পারো।'

আমি তার পাশে বসতে বসতে বললাম, তুমি কি প্রথম রাতে আমার সাথে থাকা সেই ব্যক্তি নও? এ কথা শুনতে-ই তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। চিৎকার করে বলল, ওহে ইবনুল মুনকাদির! ওইটার সাথে তোমার কী সম্পর্ক? এ কথা বলে সে প্রচন্ড রেগে গেল!

অতঃপর আমি তাকে এই বলে বেরিয়ে গেলাম যে, আল্লাহর শপথ! আমি এখনই তোমার এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি!

তৃতীয় রাত। আমি এশার সালাত মসজিদে নববীতে পড়ে ওই খুঁটির নিকট এসে হেলান দিয়ে বসে আছি; কিন্তু আজ আর ওই লোকটি এলো না। আমি মনে মনে বললাম, ইন্না লিল্লাহ! আমি কোনো সমস্যা করে ফেলিনি তো? সকালবেলা তার ঘরে গিয়ে দেখলাম, ঘরের দরজা খোলা এবং ঘর একেবারেই খালি। সেখানে মানুষ তো দূরের কথা; কোনো তৈজসপত্রও নেই।

ঘরের মালিক আমাকে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ, গতকাল তোমার এবং তার মাঝে কী হয়েছিল? আমি বললাম, কেন? কী হয়েছে তার? সে বলল, তুমি চলে যাওয়ার পর সে ঘরে ঢোকে তার চাদরটি মেঝেতে বিছায়। এরপর চামড়া, জুতা, মোজা এবং সেলাইয়ের যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু সেখানে রাখে। অতঃপর চাদরটি পেঁচিয়ে পিঠে করে নিয়ে চলে যায়। জানি না, সে কোথায় গেছে!

মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির বলেন, মদীনার এমন কোনো ঘর নেই—যেটাতে আমি তার অনুসন্ধান করিনি; কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পাইনি। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন![১]

টিকাঃ
[১] বিপদের কারণ/পরীক্ষার বস্তু।
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৬
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৬, ৪০৭
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৩
[২] তিনি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের ছাত্র। সাহান ইবনু রবী'আ, সাহান ইবনু আরাফা, হাসান ইবনু ঈসা, এদের কোনো একজন হবেন। দেখুন—সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৮০
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৬ ৪/১৩৫
[১] মোহবিমুখ
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৩৭
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১১৬
[৪] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২২৫
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৯০-১৯২

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 আত্মমুখ্যতার প্রতি সালাফগণের অনীহা

📄 আত্মমুখ্যতার প্রতি সালাফগণের অনীহা


এক
সাবিত আল-বুনানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত-আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে লোকসকল, আমি কুরাইশ গোত্রের লোক। সাদা-কালো নির্বিশেষে সকল রঙের মানুষই খোদাভীতির ক্ষেত্রে আমার চেয়ে অগ্রগামী! আমি তো কেবল খোদাভীরুদের বেশ-ভূষা ধারণ করি।[১]

দুই
মা'মার রাহিমাল্লাহ আইয়ুব, নাফি কিংবা অন্য কারও থেকে বর্ণনা করেন-একদা জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে 'হে সর্বোত্তম মানুষ' কিংবা 'হে সর্বোত্তম মানুষের সন্তান!' বলে সম্বোধন করে। প্রতিউত্তরে ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি সর্বোত্তম মানুষ নই এবং সর্বোত্তম মানুষের সন্তানও নই; বরং আমি আল্লাহর এক নগণ্য বান্দা। আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং তার প্রতি আশা রাখি। আল্লাহর শপথ! তোমরা যার পিছু নাও, তাকে ধ্বংস করেই ছাড়ো।[২]

তিন
জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণিত, মুতররিফ ইবনু আব্দিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সারারাত ইবাদত করে সকালে আত্মগর্ব করার চেয়ে সারারাত ঘুমে কাটিয়ে সকালে অনুতপ্ত হওয়া আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।

ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর শপথ! ওই ব্যক্তি কখনও সফলকাম হবে না, যে নিজেকে সর্বোত্তম জ্ঞান করে কিংবা নিজের ইবাদত নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগে।[১]

চার
ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা আমার পক্ষ থেকে তিনটি বিষয়ের ওপর আমলের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখো—

(১) প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকো। (২) অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো। (৩) আত্মমুগ্ধ হওয়া থেকে বিরত থাকো।[২]

পাঁচ
আবু ওয়াহাব আল-মারওয়াযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, অহংকার কী?

তিনি বললেন, মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আত্মগর্ব কী?

তিনি বললেন, 'কোনো ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করা যে, এটা শুধু তোমারই আছে, অন্য কারও নেই।' এরপর বললেন, 'সালাত আদায়কারীদের মধ্যে নিজের আমলের প্রতি মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে মন্দ আর কিছু আমি দেখিনি।'[৩]

ছয়
আহমাদ ইবনু আবিল হাওয়ারী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দিল্লাহ আনতাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও ইমাম ফুযাইল রাহিমাহুমাল্লাহ কোথাও মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করছিলেন। একপর্যায়ে সুফিয়ান আস-সাওরীর মন গলে যায়। তিনি কাঁদতে থাকেন। এরপর বলেন, আশা করি আজকের এই মজলিস আমাদের জন্য রহমত ও বরকত বয়ে আনবে। তখন ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর বান্দা, কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, না-জানি, এ মজলিস আমাদের জন্য উপকারী হওয়ার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়! তুমি যা ভালো মনে করেছ, তা-ই বলেছ, আমিও যা ভালো মনে করেছি, তাই বলেছি। এতে কি তুমি আমার নিকট নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করোনি? আর আমিও কি তোমার কাছে নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করিনি?

এ কথা শুনে সুফিয়ান আস-সাওরী আবার কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তুমি আমাকে সতর্ক করে (ধ্বংসের হাত থেকে) বাঁচিয়েছ। আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন।[১]
সাত
ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি তুমি তোমার আমলের ব্যাপারে গর্বের আশঙ্কা করো, তাহলে ভাবো-

■ যার সন্তুষ্টি কামনা করছ, তিনি কি সাধারণ কেউ?

■ যে নিয়ামতের আশা করছ, তা কি সহজলভ্য?

■ যে ভয়াবহ শাস্তির ভয় করছ, তা স্বাভাবিক কিছু?

যে এসব নিয়ে চিন্তা করবে, তার কাছে তার আমলগুলো খুবই নগণ্য মনে হবে।[২]

আট
রিশদীন ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাজ্জাজ ইবনু শাদ্দাদ থেকে বর্ণিত, তিনি খ্যাতনামা বিদ্বান উবাইদুল্লাহ ইবনু আবি জাফরকে বলতে শুনেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো মজলিসে কথা বলে এবং কথাগুলো তাকে চমৎকৃত করে তাহলে সে যেন তৎক্ষণাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং যখন চুপ থাকতে ইচ্ছে করে তখন যেন আবার কথা বলা শুরু করে। [১]

নয়
সাঈদ ইবনু আব্দির রহমান রাহিমাহুল্লাহ আবু হাযিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন-তিনি বলেন, বান্দা যদি কোনো উত্তম আমল করার পর আত্মগর্ব অনুভব করে তাহলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য এরচেয়ে ক্ষতিকর কোনো আমলই তৈরি করেননি! অপরদিকে বান্দা যদি কোনো গুনাহ করার পর অন্তর্জ্বালার শিকার হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য এরচেয়ে উপকারী ও কল্যাণকর কোনো কাজই সৃষ্টি করেননি।

কেননা, মানুষ যখন ভালো ও পুণ্যের কাজ করে তখন হয়তো সে তা নিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করে অথবা নিজেকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে। এতে আল্লাহ তাআলা তার বর্তমান ভালো কাজটির সাথে সাথে অতীতের ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেন।

অপরদিকে যদি কোনো ব্যক্তি মন্দ কাজ করার পর তার মধ্যে অনুশোচনা জাগে তাহলে হতে পারে, আল্লাহ তাআলা এই কাজের কারণে তার মধ্যে অনুতাপ ও অনুশোচনার স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে দেবেন। পরিশেষে সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে, সেই অনুতাপ ও অনুশোচনা তার হৃদয়ে আগের মতোই রয়ে যাবে। (এবং তার অসিলায় সে মুক্তি পেয়ে যাবে!)[২]

দশ
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহর জীবনী আলোচনার একপর্যায়ে তার একটি উক্তি উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেছেন- 'আমি সত্যের অনুসরণ করি। নিজেই ইজতিহাদ করে চলি। কোনো এক মাযহাবের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকি না।'

ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, কেউ যদি ইজতিহাদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমাম তার এই যোগ্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন, তাহলে এমন ব্যক্তির জন্য তাকলীদ তথা কোনো মাযহাব অনুসরণের সুযোগ নেই।

পক্ষান্তরে যাদের এই পর্যায়ের ইজতিহাদী যোগ্যতা নেই; বরং কেবল ফিকহের কোনো কিতাব মুখস্থ করেছে কিংবা সমগ্র কুরআন অথবা তার কিয়দাংশ হিফয করেছে তাদের জন্য তো কখনই ইজতিহাদ করার অনুমতি নেই। সে কীভাবে ইজতিহাদ করবে? কী সমাধান দেবে? কীসের ভিত্তিতে দেবে? যার পাখাই গজায়নি, সে কী করে আকাশে উড়বে?

অবশ্য যে-ফকীহর সতর্কতা, বিচক্ষণতা, বোধগম্যতা, খোদাভীতি এবং হাদীসের জ্ঞান সর্বজন স্বীকৃত; সেই সঙ্গে শাখাগত মাসআলার সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ এবং হাদীস ও ফিকহের মূলনীতি বিষয়ক কিতাবগুলো যার মুখস্থ, পাশাপাশি হিফযুল করআন, তাফসীর ও তর্কশাস্ত্রেও যে সমান পারঙ্গম; সর্বোপরি আরবীভাষা সম্পর্কেও যে সম্যক অবগত তার জন্য 'ইজতিহাদুল মুকায়্যাদ' তথা নির্ধারিত পরিমণ্ডলে ইজতিহাদ করার অনুমতি রয়েছে। তিনি ইমামগণের দলিল সম্পর্কে গবেষণা করার যোগ্যতা রাখেন। যখন কোনো মাসআলায় তার নিকট সত্য উন্মোচিত হবে এবং এর ওপর কুরআন-সুন্নাহর কোনো দলিল থাকবে, পাশাপাশি প্রসিদ্ধ কোনো ইমামের আমলও পাওয়া যাবে। তখন তিনি তার নিকট উন্মোচিত ওই সত্যটারই অনুসরণ করবে। রুখসত বা ছাড়ের পথে হাঁটবেন না। সদা সতর্ক থাকবেন। এভাবে কোনো মাসআলার ওপর দলিল পাওয়া গেলে তার জন্য তাকলীদের কোনো সুযোগ নেই।

তবে যদি এই নব উদ্ভাবিত সত্য প্রকাশ করলে অন্যান্য ফকীহ ও মুফতীগণের পক্ষ থেকে গোলযোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে কিংবা সমাজে ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে তা গোপন রাখতে হবে। কোনোভাবেই তার আমল প্রকাশ করা যাবে না। কেননা, কখনও এর কারণে নিজের মনে গর্ববোধ জেগে উঠতে পারে এবং তা প্রকাশ করা নিজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

এমনটা হলে অবশ্যই একদিন তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, তখন ওই সত্যটার মাঝে অন্তরের একটি অনৈতিক চাহিদা ঢুকে পড়ে। এমন কত মানুষ আছে, যারা সত্য কথা বলে, সৎ কাজের আদেশ করে, এরপরও আল্লাহ তাআলা ফকীহগণকে দিয়ে তাদের দাবিয়ে রাখেন।

অনেক সময় অর্থদাতা, ভূমিদাতা ও সমাজ সেবকদের মধ্যে এই আত্মগর্ব সংক্রমক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সৈনিক, মুজাহিদ ও শাসকশ্রেণিও এই ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারে না। ফলে দেখা যায়, তারা শত্রুদের মুখোমুখি হচ্ছে, অথচ তাদের অন্তরে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন কল্পনাবিলাস ও সুপ্ত বাসনা। যেমন, বীরত্ব প্রকাশ করা, অহমিকা প্রদর্শন করা, স্বর্ণখচিত শিরস্ত্রাণ, পোশাক, অশ্ব ও যুদ্ধাস্ত্রে সুসজ্জিত হওয়া। এর সাথে আবার যোগ হয় সালাত পরিহার করার মন্দ প্রবণতা, শাসিতের প্রতি জুলুম ও মদ্যপানের হীন মানসিকতা। সুতরাং, কোত্থেকে তারা আল্লাহর সাহায্য পাবে? আর কেনই-বা তারা অপদস্থ ও পরাজিত হবে না!

হে আল্লাহ, আপনি আপনার দ্বীনকে সাহায্য করুন। আপনার বান্দাদের দ্বীনের কাজ করার সামর্থ্য দিন।

যে-ব্যক্তি আমলের উদ্দেশ্যে ইলম অন্বেষণ করে, ইলম তার হৃদয়-ভূমিকে কোমল করে। সে তার নিজের কথা ভেবে ক্রন্দন করে। পক্ষান্তরে যে-ব্যক্তি মুদাররিস বা মুফতি হওয়ার উদ্দেশ্যে কিংবা দাম্ভিকতা প্রদর্শন ও অন্যকে হেয় করার মানসিকতা নিয়ে ইলম শেখে-সে নিজেই নিজেকে ধোঁকা দেয়, প্রতারিত করে এবং মানুষের সামনে নিজেকে ছোট করে। এই আত্মঅহমিকা তাকে ধ্বংস করে ছাড়ে এবং মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسُهَا

ওই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে তার আত্মা পবিত্র করেছে। আর ওই ব্যক্তি ব্যর্থ হয়েছে যে তার আত্মা কলুষিত করেছে।[১]

এখানে কলুষিত করার অর্থ হচ্ছে—আত্মাকে পাপাচার ও অবাধ্যতায় লিপ্ত রাখা।[২]

টিকাঃ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮১
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৬
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/১৯০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৪৪৯
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৮/৪০৭
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৯
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৪২
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১০
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৬৪
[১] যেমন, ইমাম আবু হানীফা, মালিক, আস-সাওরী, আওযায়ী, শাফিয়ী, আবু উবাইদ, আহমাদ বা ইসহাক রাহিমাহুমুল্লাহ।
[১] সূরা শামস, আয়াত: ৯ ও ১০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৮/১৯১-১৯২

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের দুনিয়াবিমুখতা

📄 সালাফগণের দুনিয়াবিমুখতা


এক
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ রচিত যুহদ নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, উরওয়া ইবনু যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু শাম গমন করেন। সেখানে তার সাথে স্থানীয় আমীরগণ এবং উচ্চপদস্থ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সাক্ষাৎ করেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমার ভাই আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ কোথায়? তাকে যে দেখছি না! লোকেরা বলে, তিনি এখনই চলে আসবেন।

বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু নাকে রশি বাঁধা একটি উটনীর ওপর চড়ে আগমন করেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সালাম করেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত লোকদের বলেন, তোমরা যার যার কাজে ফিরে যাও। অতঃপর তিনি আবু উবায়দাকে সাথে নিয়ে তার বাড়িতে আসেন। ঘরে ঢুকে দেখেন, তার বাড়িতে কেবল একটি তরবারি, একটি ঢাল এবং সামান্য কিছু পাথেয় পড়ে আছে। উমার রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞেস করেন, ঘরে আরও কিছু আসবাবপত্র রাখলে না কেন? তিনি বলেন, আমীরুল মুমিনীন, দুনিয়ায় স্বল্প সময় বিশ্রামকারীর জন্য এটুকুই যথেষ্ট! [১]

দুই
মালিক আদ-দার[১] রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চারশ দিনার হাতে নিয়ে তার গোলামকে ডেকে বলেন, এটা আবু উবায়দার নিকট পৌঁছে দাও। আর তার ঘরের পাশে ওঁৎপেতে থাকো। দেখো, সে এগুলো দিয়ে কী করে?

অতঃপর গোলাম চারশ দিনার নিয়ে আবু উবায়দার কাছে যায় এবং তাকে বলে, আমিরুল মুমিনীন আপনাকে এগুলো উপহার দিয়েছেন। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ বলেন, আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দিন এবং তার ওপর রহম করুন। এরপর তিনি দাসিকে ডেকে বলেন, এদিকে এসো! এই সাত দিনার অমুককে দাও। এই পাঁচ দিনার অমুককে দাও... এভাবে তিনি সব দিনার ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়ে দেন। গোলাম ফিরে এসে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পুরো ঘটনা জানায়।

এদিকে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহu আনহুর নিকটও সমপরিমাণ দিনার প্রেরণ করেন। গোলাম তার কাছে সেগুলো পৌঁছে দিয়ে বলে, আমীরুল মুমিমীন এগুলো আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দিন। এরপর তিনি দাসিকে ডেকে বলেন, এগুলো অমুককে দাও, এগুলো অমুককে দাও... কিছুক্ষণ পর মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী এই ঘটনা জানতে পেরে বলেন, আল্লাহর শপথ! আমরাও তো গরীব। আমাদের জন্যেও কিছু রাখুন। ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। কেবল দুটি দিনার অবশিষ্ট ছিল। তিনি স্ত্রীর দিকে সেগুলোই ছুঁড়ে দেন।

গোলাম ফিরে এসে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পুরো ঘটনা শোনালে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং বলেন, এরা প্রত্যেকে একে অন্যের ভাই। [২]

তিন
তালহা রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তার পিতা বলেন, একবার 'হাযরামাউত' নামক শহর থেকে তার কাছে কিছু সম্পদ আসে। সম্পদের পরিমাণ প্রায় সাত লাখ দিরহাম। রাতে তিনি খুব ছটফট করতে থাকেন। তার স্ত্রী তাকে অস্থির দেখে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে আপনার? আপনি এত পেরেশান কেন? তিনি বলেন, আমি ভীষণ দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আচ্ছা, যে-ব্যক্তি তার ঘরে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ রেখে নিদ্রায় যায়, মহান রবের ব্যাপারে তার ধারণাটা কেমন?

স্ত্রী বলেন, সকাল হলে আপনি আপনার বন্ধু ও পরিচিতজনদের দেখা পাবেন। তখন কিছু পাত্র আর থলে আনিয়ে তাদের মাঝে এগুলো বণ্টন করে দেবেন।

তিনি বলেন, আল্লাহ তোমার ওপর রহমত বর্ষণ করুন। নিশ্চয় তুমি যোগ্য পিতার যোগ্য মেয়ে।[১]

সকাল হলে তিনি বেশ-কিছু থলে ও পাত্র আনান। সব সম্পদ আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন। একটি পাত্র আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছেও পাঠান।

এসময় তার স্ত্রী বলেন, আবু মুহাম্মাদ, এই সম্পদে কি আমাদের কোনো অংশ আছে? তিনি বলেন, আজ সারাদিন কোথায় ছিলে? এখন সামান্য যা-কিছু আছে, তা তোমার! তার স্ত্রী বলেন, তখন মাত্র একটি থলে অবশিষ্ট ছিল। আর তাতে হাজার খানেক দিরহাম ছিল।[২]

চার
হুযাইল ইবনু শূরাহবিল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, যে-ব্যক্তি আখিরাতের সফলতা চায়, সে দুনিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যে-ব্যক্তি দুনিয়ার সফলতা চায়, সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওহে লোকসকল, তোমরা স্থায়ী আবাসস্থলের স্বার্থে অস্থায়ী আবাসস্থলের ক্ষতি মেনে নাও।[৩]

পাঁচ
আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের তুলনায় অধিক সময় দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করো এবং তাদের তুলনায় বেশি আমল করার চেষ্টা করো; এরপরও তারা তোমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ।
জিজ্ঞেস করা হলো, এটা কেন?

তিনি বললেন, এর কারণ হচ্ছে, তারা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি দুনিয়াবিমুখ এবং আখিরাতের প্রতি অধিক আগ্রহী ছিলেন। [১]

ছয়
বিলাল ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি আল্লাহর নিকট চিন্তার বিক্ষিপ্ততা এবং চিত্তের অস্থিরতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জিজ্ঞেস করা হলো, চিন্তার বিক্ষিপ্ততা ও চিত্তের অস্থিরতা কী? তিনি বললেন, প্রত্যেক জায়গায় নিজের কিছু সম্পদ গড়ে তোলা। [২]

সাত
ইমাম আ'মাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবুল বুখতারী বলেন, একবার আশআস ইবনু কায়িস ও জারীর ইবনু আব্দিল্লাহ সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাতে তার ছোট্ট কুটিরে প্রবেশ করেন। তারা তাকে সালামের মাধ্যমে অভিবাদন জানান এবং বলেন, আপনি তো আল্লাহর রাসূলের সাহাবী!
: তা আমার জানা নেই।

তারা উভয়ে জবাব শুনে দ্বিধায় পড়ে যান। সালমান ফারসী তাদের অবস্থা বুঝতে পেরে বলেন, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গী তো সে, যে তার সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করবে!
: আমরা আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে এসেছি।
: ও, তাহলে তার প্রেরিত হাদিয়া কোথায়?
: আমাদের সাথে তো তার কোনো হাদিয়া নেই!
: আল্লাহকে ভয় করো। আমানত আদায় করো। তার নিকট থেকে আমার কাছে কেউ হাদিয়া ছাড়া আসে না।

: দয়া করে আপনি আমাদের ওপর এমন অভিযোগ আনবেন না। আমাদের কাছে এমনিতেই কিছু সম্পদ আছে। প্রয়োজন হলে বলুন!
: না, না! আমি হাদিয়া ছাড়া অন্যকিছু চাই না।

: আল্লাহর কসম! তিনি আপনার উদ্দেশ্যে কোনো হাদিয়া পাঠাননি। আসার সময় শুধু বলেছেন, তোমাদের মধ্যে রাসূলের এমন একজন সাহাবী রয়েছেন, রাসূল যখন তার সাথে একাকী সাক্ষাৎ করতেন তখন অন্য কারও সাক্ষাৎ কামনা করতেন না! যখন তোমরা তার কাছে যাবে তখন আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম পেশ কোরো।

: আরে! এই সালাম-ই তো সেই হাদিয়া। এরচেয়ে বড় কোনো হাদিয়া আছে নাকি? আমি তো এটাই চাইছিলাম![১]

আট
কাতাদা ইবনু দিআমা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বিখ্যাত তাবিয়ী আমির ইবনু আবদি কায়িস মুত্যুর পূর্বমুহূর্তে খুব কাঁদছিলেন। কাতাদা ইবনু দিআমা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, আমি মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাঁদছি না। দুনিয়ার প্রতি মায়ার কারণেও না। আমি তো কাঁদছি, দুপুরের পিপাসা [২] এবং রাতের কিয়াম [৩]-এর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে।[৪]

নয়
মুসা আত-তাইমী রাহিমাহুল্লাহ আব্দুর রহমান ইবনু আবান রাহিমাহুল্লাহর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, আমি এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি-দ্বীনদারী, রাজ্যশাসন ও সম্মানের মাঝে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আব্দুর রহমানের সমকক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে।
জনশ্রুতি আছে, আহলে বাইতেরা। কেউ দাসত্বের শিকার হলে তিনি তাকে কিনে নিতেন এবং তার অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করে আযাদ করে দিতেন। তিনি বলতেন, আমি এই দাসমুক্তির মাধ্যমে মূলত আল্লাহর কাছে মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।

পরবর্তী সময়ে তিনি তার এলাকার মসজিদে ঘুমন্ত অবস্থায় ইনতিকাল করেন। প্রসিদ্ধ আছে, তিনি আল্লাহওয়ালা ছিলেন। খুব ইবাদত করতেন। আলী ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনি আব্বাস তার ইবাদত ও কুরবানী দেখে বিমুগ্ধ হন এবং ভালো কাজে তার অনুসরণ করেন। [২]

দশ
ইবরাহীম ইবনু বাশশার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলী ইবনু ফুযাইল বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহকে বলেন-তুমি মানুষকে অল্পতুষ্টি ও দুনিয়াবিমুখতার ব্যাপারে আদেশ করো; অথচ নিজেই পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জন করো?

আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, হে আবু আলী, আমি এমনটা করি, যাতে আমার সম্মান ঠিক থাকে। আমার ব্যক্তিত্ব কারও কাছে মুখাপেক্ষী না হয়ে পড়ে এবং এর মাধ্যমে যাতে আমি আমার প্রতিপালকের আনুগত্য করতে পারি।

তিনি বলেন, হে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, যদি এমনটিই হয়ে থাকে, তাহলে কতই না উত্তম তোমার সিদ্ধান্ত। [৩]

এগারো
যিয়াদ ইবনু মাহিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, শাদ্দাদ ইবনু আউস রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, তোমরা দেখে থাকবে, প্রত্যেক ভালোর কিছু মাধ্যম থাকে; আবার প্রত্যেক মন্দের পেছনেও কিছু কারণ থাকে। সকল ভালোই জান্নাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। আর সকল মন্দই জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। নিশ্চয় দুনিয়া হলো ক্ষণস্থায়ী ভোগ-সামগ্রী। এখান থেকে ভালো মানুষেরাও ভোগ করে, মন্দরাও ভোগ করে; কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী ও চিরসত্য। সেখানে কেবল প্রতাপশালী বাদশাহ আল্লাহ জাল্লা শানুহুর রাজত্ব। প্রতিটি আদর্শেরই অনুসারী থাকে। সুতরাং, তোমরা আখিরাতের অনুসারী হও। দুনিয়ার অনুসারী হয়ো না।[১২]

বারো
মুসলিম ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহর ভাগ্নে আব্দুল্লাহ বলেন, একবার আমি হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। তখন আমার মামা মুসলিম ইবনু সাদ আমাকে দশ হাজার দিরহাম দিয়ে বললেন, যখন তুমি মদীনায় যাবে, তখন মদীনার আহলে বাইতের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারকে এগুলো দেবে। অতঃপর আমি মদীনায় গেলাম। লোকদেরকে আহলে বাইতের সবচেয়ে দারিদ্র পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তারা আমাকে একটি বাড়ি দেখিয়ে বলল, এই পরিবারটি আহলে বাইতের মধ্যে সবচেয়ে গরীব এবং সবচেয়ে অভাবী। আমি সেই ঘরে কড়া নাড়লাম। ভেতর থেকে এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন-

: কে আপনি?

: আমি বাগদাদ থেকে এসেছি। আমাকে দশ হাজার দিরহাম দেওয়া হয়েছে—যেন সেগুলো মদীনার সবচেয়ে দরিদ্র ও অভাবী ‘আহলে বাইত’-এর নিকট পৌঁছে দিই। আর আমি জানতে পেরেছি, আপনাদের পরিবারটিই সবচেয়ে বেশি দরিদ্র ও অভাবী। সুতরাং, আপনি এগুলো গ্রহণ করুন।

: আল্লাহর বান্দা, তোমাকে যিনি দিরহামগুলো দিয়েছেন তিনি মদীনার সবচেয়ে গরীব আহলে বাইতকে দিতে বলেছেন। আর এখানে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবার হলো আমাদের পাশে থাকা পরিবারটি। তারা আমাদের চেয়েও অধিক অভাবী।

আমি তাদের ছেড়ে পাশের ঘরের দিকে গেলাম। তাদের দরজায় কড়া নাড়লাম। একজন নারী ভেতর থেকে পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। আমি আগের মতোই জবাব দিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহর বান্দা, আমরা এবং আমাদের প্রতিবেশী—উভয়েই খুব অভাবী। সবাই সংকটময় জীবনযাপন করছি। তুমি বরং আমাদের উভয়ের মাঝে দিরহামগুলো বণ্টন করে দাও। [১]

তেরো
ইবরাহীম ইবনু শাবীব ইবনি শাইবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এক জুমআর দিনে আমরা একটি ইলমী মজলিসে [২] বসা ছিলাম। এমন সময় কোথা থেকে যেন এক অপরিচিত লোক আগমন করেন! তার গায়ে একটি মাত্র কাপড়। সেটা দ্বারা পুরো শরীর পেঁচানো। তিনি আমাদের নিকট এসে বসেন। তারপর নতুন একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। আমরা সেটি নিয়েই আলোচনা করতে থাকি। আলোচনা শেষ হলে তিনি চলে যান।

পরবর্তী জুমআয় তিনি আবার আসেন। আমরা তার উপস্থাপনা, জ্ঞানমূলক আলোচনা, সুচিন্তিত মতামত ও ব্যক্তিত্ব-গুণে মুগ্ধ হয়ে পড়ি। তাকে ভালোবেসে ফেলি। তাকে তার বাসস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, আমি 'হারবিয়্যাহ'তে বাস করি। এরপর তার উপনাম জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, আবু আব্দুল্লাহ'। আমরা তার মজলিসে বসার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে পড়ি। তার আলোচনা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকি। কারণ, তার আলোচনা ছিল খুবই ফলপ্রসূ ও জ্ঞানমূলক।

এরপর কিছুদিন তার আসা-যাওয়া বন্ধ থাকে। আমরা পরস্পর বলাবলি করতে থাকি, কী হলো? তিনি আসছেন না কেন? তিনি আমাদের মজলিসগুলোর প্রাণ ছিলেন! তিনি চলে যাওয়ার পর থেকে মজলিসগুলো কেমন যেন প্রাণহীন হয়ে পড়েছে!

আমরা সিদ্ধান্ত নিই, সকাল হলে হারবিয়্যাহ-এলাকায় গিয়ে তাকে খুঁজব। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা কয়েকজন সেখানে যাই। আমরা আবু আব্দিল্লাহ সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত বোধ করছিলাম। এমন সময় দেখি, কয়েকজন বালক মক্তব থেকে বাড়ি ফিরছে। তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা আবু আব্দিল্লাহকে চেনো? তারা বলল, সম্ভবত আপনারা শিকারী লোকটির সন্ধান করছেন? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তারা বলল, তার এখনই চলে আসার সময় হয়েছে। আপনারা অপেক্ষা করুন।

এরপর আমরা এক জায়গায় বসে অপেক্ষা করতে থাকি। ইতোমধ্যে দূর থেকে তাকে আসতে দেখা যায়। তার গায়ে একটি লুঙ্গি। কাঁধে একটুকরো কাপড়। সাথে জবাই করা কিছু পাখি এবং কিছু জীবন্ত পাখি। তিনি আমাদের দেখে মুচকি হেসে বলেন, হঠাৎ আপনাদের আগমন? আমরা বললাম, আপনাকে হারিয়ে ফেলেছি। আপনি আমাদের মজলিসগুলো জমিয়ে রাখতেন। আপনি কেন আমাদের ফেলে এভাবে চলে এলেন? তিনি বললেন, আজ তাহলে আপনাদের বলি। আসলে আমার এক প্রতিবেশী আছেন। পূর্বে আমার গায়ে আপনারা যেই কাপড়টি দেখেছিলেন, প্রতি শুক্রবার ওই প্রতিবেশী থেকে কাপড়টি ধার নিয়ে যেতাম। লোকটি প্রবাসী। কিছুদিন হলো সে তার জন্মভূমিতে ফিরে গেছে। আর আমার এমন কোনো কাপড় নেই, যেটা পরে আপনাদের কাছে যেতে পারি। আচ্ছা যাই হোক, আমরা কি এভাবে বাহিরে দাঁড়িয়ে গল্প করব? আপনাদের কোনো আপত্তি না থাকলে, বাড়ির ভেতরে চলুন। আল্লাহ রিজিকে যা রেখেছেন, তা দিয়ে আপনাদের আপ্যায়ন করা হবে।

আমরা ইশারায় পরস্পরকে বললাম-চলো, ঘরে যাই। তিনি ঘরে গিয়ে প্রথমে কড়া নাড়েন। সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। এরপর আমাদের ভেতরে আসতে বলেন। আমরা ঘরে প্রবেশ করি। তিনি একটি মাদুর বিছিয়ে দিলে আমরা তাতে বসে পড়ি।

তিনি অন্তঃপুরে চলে যান। জবাই করা পাখিগুলো স্ত্রীর কাছে দিয়ে জীবিত পাখিগুলো নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার সময় বলে যান, আপনারা একটু আরাম করুন। ইন শা আল্লাহ, অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে আসবো। তিনি পাখিগুলো বিক্রি করে কিছু রুটি কিনে আনেন। এদিকে তার স্ত্রীও গোশত রান্না শুরু করে দেন।

রান্না শেষ হলে আমাদের সামনে গোস্ত-রুটি পরিবেশন করা হয়। আমরা খেতে থাকি। একটু পর তিনি লবণ ও পানি আনার জন্য বাইরে যান। আমরা তখন পরস্পর বলাবলি করছিলাম, তোমরা কি কখনও তার মতো কাউকে দেখেছ? তোমরা বসরা নগরীর একেকজন সরদার। তোমরা কি তার বিষয়টি নিয়ে ভাববে না? তার অবস্থা পরিবর্তনে সচেষ্ট হবে না? তখন আমাদের একজন বলল, আমি পাঁচশ' দিরহাম দেব। অন্যজন বলল, আমি আটশ' দিরহাম দেব। এভাবে একেক জন একেক ধরনের সংখ্যা লেখাতে থাকে এবং একজন সবগুলো দিরহাম জমা করার দায়িত্ব নেয়। হিসাব করে দেখা যায়, সবার থেকে সর্বমোট পাঁচ হাজার দিরহাম উঠবে। এরপর সবাই বলল, চলো! আমরা এখন উঠি। সব দিরহাম উঠিয়ে আমরা আবার আসব। চাইব, তিনি যেন তার অবস্থার উন্নতি ঘটান।

এরপর আমরা উঠে চলে যাই। সওয়ারীতে করে ‘মারবাদ’[১] বাজার অতিক্রম করার সময় বসরা নগরীর আমীর মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান তার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে আমাদের দেখে ফেলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ তার গোলামকে বলেন, দ্রুত ইবরাহীম ইবনু শাবীব ইবনি শাইবাকে ডেকে নিয়ে এসো।

আমি আসার পর তিনি জিজ্ঞেস করেন, ঘটনা কী? কোত্থেকে এলে? আমি তাকে সত্য ঘটনা বললাম। সব শুনে তিনি বললেন, ভালো কাজে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি অগ্রগামী। এরপর তিনি তার গোলামকে বললেন, আমার দিরহামের ব্যাগটা নিয়ে এসো। গোলাম সেটি নিয়ে এলে বললেন, এবার যাও, একজন গৃহকর্মী নিয়ে এসো। এরপর গৃহকর্মীকে বললেন, মুদ্রার এই থলেটা নিয়ে এই লোকটির সাথে যাও এবং আমার নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিয়ে এসো। আমি খুশিতে দ্রুত হাঁটতে শুরু করি। আবু আব্দিল্লাহর বাড়ি পৌঁছে তাকে সালাম দিই। তিনি সালামের উত্তর দিতে দিতে বেরিয়ে আসেন; কিন্তু গৃহকর্মী ও তার কাঁধে মুদ্রার থলে দেখে মুহূর্তেই তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়—যেন আমি তার মুখে কালি মেখে দিয়েছি।

তিনি অত্যন্ত রূঢ়ভাব নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, তোমার এবং আমার সাথে এগুলোর কী সম্পর্ক? তুমি কি আমাকে ফিতনায় ফেলতে চাইছ? আমি বললাম, আবু আব্দিল্লাহ! আপনি শান্ত হোন। একটু বসুন। আমি সব খুলে বলছি। এরপর তাকে বললাম, আপনি তো বসরার আমীর মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানকে চেনেন। তিনি খুবই প্রতাপশালী ও রাগী। যদি আমি এগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যাই তাহলে অবস্থা কী হবে—একটু ভেবে দেখেছেন? দয়া করে আল্লাহকে ভয় করুন। নিজেকে অযথা বিপদে ফেলবেন না।

এটা শুনে তার রাগ আরও বেড়ে যায়। তিনি আমার সামনে থেকে উঠে গিয়ে মুখের ওপর সজোরে দরজা বন্ধ করে দেন। আমি বাইরে পায়চারি করতে থাকি; কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলাম না—আমীরকে কী বলব? শেষে নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নিই, সত্যটাই বলব। যা হবার হবে।

আমীরের কাছে এসে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, নিশ্চয় লোকটা ‘হারুরী’।[২] এই গোলাম, তরবারিটা নিয়ে আয়। সে তরবারি নিয়ে এলে তিনি বললেন, তুই এই গোলামের সাথে যা। ওই লোকটার বাড়িতে গিয়ে তাকে হত্যা করে তার মাথাটা নিয়ে আয়!

ইবরাহীম ইবনু শাবীব ইবনি শাইবা বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ আমীরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। দয়া করে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর কসম! সে খারেজী নয়। আপনি সবর করুন। আমিই তাকে আপনার কাছে নিয়ে আসব। আমি কেবল তার মুক্তি চাইছি। তিনি বললেন, তাহলে তুমিই ওর জামিন!

আমি সেখান থেকে উঠে সোজা তার বাড়িতে গেলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। তার স্ত্রীর মাতম শুনতে পেলাম! তিনি দরজা খুলে পর্দার আড়ালে গিয়ে বললেন, জনাব! ভেতরে আসুন। আমি ভেতরে যাওয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন, আপনার আর আমার স্বামীর মাঝে কী ঘটেছিল?

বললাম, কেন? কী হয়েছে?

তার স্ত্রী বললেন, আপনি চলে যাওয়ার পর তিনি কূপের কাছে যান। পানি উঠিয়ে অজু করেন। এরপর এই দুআ করেন-
'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে উঠিয়ে নিন। আমাকে ফিতনায় ফেলবেন না।'

এই দুআটিই বার বার করছিলেন। কিছুক্ষণ পর তার কাছে গিয়ে দেখি, তিনি আর নেই। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছেন। তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন।

আমি বললাম, এ-তো বড় আশ্চর্যজনক ঘটনা! আপনি এই ঘটনা কাউকে বলবেন না। এরপর আমি দ্রুত আমীর মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানের কাছে যাই। সবকিছু শুনে তিনি বলেন, আমার বাহন প্রস্তুত করো। আমি তার জানাযায় শরীক হবো।

বর্ণনাকারী বলেন, এ খবর পুরো বসরা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। আবু আব্দিল্লাহর জানাযায় মুসল্লীদের ঢল নামে। তাতে বসরার আমীর ও বসরা নগরীর অসংখ্য মানুষ অংশগ্রহণ করেন। আল্লাহ তাকে রহম করুন।[১]

টিকাঃ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/১৬
[১] তিনি উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর আযাদকৃত গোলাম। উমার ও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার পূর্ণ জীবনী রয়েছে তাবাকাত: ৫/৮-এ
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৫৬
[১] এই বিদূষী নারী হলেন আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা উম্মু কুলসুম।
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩১
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯৬
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪২০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৩৪৮
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৫৪৯
[২] অর্থাৎ সিয়াম পালন।।
[৩] রাতের সালাত ও অন্যান্য নফল ইবাদত।
[৪] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/১৯
[১] আহলে বাইত বলতে বোঝায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীবর্গ, তার বংশধরগণ, বানু হাশিম, বানু আব্দিল মুত্তালিব এবং তাদের আজাদকৃত দাসগণ।
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/১০
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৮৭
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ২/২০৬
[২] জ্ঞানমূলক আলোচনা সভা।
[১] বসরার প্রসিদ্ধ বাজার
[২] খারেজীদের একটি শাখাগোত্র
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/৯-১২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00