📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের সততা ও নিষ্ঠা

📄 সালাফগণের সততা ও নিষ্ঠা


এক
বকর ইবনু মায়িয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বিখ্যাত তাবিয়ী রাবী' ইবনু খুসাইমকে একবারের বেশি কখনই তার এলাকার মসজিদে নফল সালাত আদায় করতে দেখা যায়নি![১]

দুই
সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাকে রাবী' ইবনু খুসাইমের দাসি বলেছেন, রাবী' ইবনু খুসাইম সকল আমল গোপনে করতেন। এমনকি তিনি কুরআন তিলাওয়াত করার সময় কেউ তার সাক্ষাতে এলে তিনি তৎক্ষণাৎ পরনের কাপড় দিয়ে কুরআন ঢেকে ফেলতেন; যেন লৌকিকতার ব্যাধিতে তিনি আক্রান্ত না হন এবং তার প্রতি সাক্ষাৎপ্রার্থীর সুধারণা না জন্মে।[২]

তিন
মুনযির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাবী' ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ বলেন-যে আমল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয় না, তা কোনো কাজে আসে না। (সাময়িক কিছু ফলাফল দেখা গেলেও প্রয়োজনের সময় তার কোনো কার্যকারিতা থাকে না।) [১]

চার
আবু হামযা আস-সুমালী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আলী ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ রাতে রুটি-ভর্তি ঝুলি পিঠে নিয়ে লোকালয়ে বের হতেন। সেগুলো গরীবদের মাঝে বিতরণ করতেন আর বলতেন, নিশ্চয় গোপন দান আল্লাহর ক্রোধাগ্নি নির্বাপিত করে।

উল্লেখ্য, উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির- 'নিশ্চয় গোপন দান আল্লাহর ক্রোধাগ্নি নির্বাপিত করে'-অংশটি মূলত হাদীসের ভাষ্য। বিভিন্ন সনদে হাদীসটি মারফু হিসেবে প্রমাণিত। তবে এর একটি সনদও পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত নয়। আলবানী রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীসের সকল সনদ একত্র করে একে সহীহ বলেছেন। [২]

পাঁচ
আমর ইবনু সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আলী ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহর ইন্তিকালের পর লোকেরা তাকে গোসল দিতে গিয়ে দেখে, তার পিঠ জুড়ে শুধু কালো দাগ আর কালো দাগ। তারা উপস্থিত লোকদের এই দাগের কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, তিনি রাতের বেলা আটার বস্তা পিঠে নিয়ে মদীনার অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন এবং গরীবদের মাঝে তা বিলিয়ে দিতেন। অনবরত এই বস্তা বহনের কারণেই তার পিঠে কালো দাগ পড়ে গেছে।[৩]

ছয়
ইবনু আয়িশা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- ‘আমার পিতা বলেছেন, আমি মদীনার অধিবাসীদের বলতে শুনেছি, আলী ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহর মৃত্যুর পর আমরা গোপন সাদাকার ব্যাপারটি প্রায় হারিয়ে ফেলেছি’।[১][২]

সাত
আবু আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আবু মালিক আমাকে বললেন, আবু আইয়ুব, নফসের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। আমি মনে করি, দুনিয়ায় মুমিনের দুশ্চিন্তা কখনোই শেষ হবার নয়। আল্লাহর কসম! আখিরাত যদি মুমিনের জন্য প্রভূত কল্যাণ ও আনন্দ বয়ে না আনে তাহলে সে দুটি সংকটে নিপতিত হবে-এক. দুনিয়ার দুশ্চিন্তা, দুই. আখিরাতের কষ্ট।

আবু আইয়ুব বলেন, আমি বললাম, আমার পিতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক! আচ্ছা, আখিরাত মুমিনের জন্য কেন কল্যাণ বয়ে আনবে না? সে তো জীবদ্দশায় অনেক কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও মহান আল্লাহর ইবাদত করে! আবু মালিক বললেন, আবু আইয়ুব, সেটা তো বুঝলাম; কিন্তু তার আমলগুলো আল্লাহর কাছে কবুল হচ্ছে কি না-তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? যদি না থাকে, তাহলে সে কীভাবে আখিরাতের কল্যাণ ও নিরাপত্তা লাভ করবে?

তারপর তিনি আরও বললেন, দুনিয়ায় এমন কত মানুষই তো আছে, যারা মনে করে, তারা আত্মার সংশোধন করে ফেলেছে, নিষ্ঠার সঙ্গে মহান আল্লাহর হাতে নিজেদের সঁপে দিয়েছে, নিজেদের সংকল্প পরিশুদ্ধ করেছে এবং বিশুদ্ধভাবে আমল করেছে-অথচ কিয়ামতের দিন দেখা যাবে, নিষ্ঠার অভাবের কারণে তাদের সমস্ত আমল একত্র করে তাদের মুখের ওপরে ছুড়ে মারা হবে।[৩]

আট
হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি একশ্রেণির মানুষ দেখেছি, যারা কথায় কথায় বলে, 'যদি ভাগ্যে থাকে তাহলে হবে।' তাদের এ কথার উদ্দেশ্য যদি হয় দুনিয়াবিমুখতা, তাহলে তাদের উচিত হবে, আল্লাহকে ভয় করা এবং এদিকে লক্ষ্য রাখা যে, তাদের দুনিয়াবিমুখতা যেন কিছুতেই পরিবার ও সাধারণ মানুষের কষ্টের কারণ না হয়। অর্থাৎ তাদের দুনিয়াবিমুখ চলাফেরা, জীবন-যাপন ও কাজ-কর্মের কারণে যেন অন্যরা কষ্টের মুখোমুখি না হয়। অতএব, দুনিয়াবিমুখতা প্রকাশ করার চেয়ে গোপন রাখাই উত্তম।

নয়
জাফর ইবনু বুরকান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইউনুস ইবনু উবাইদ রাহিমাহুল্লাহর সততা, নিষ্ঠা, ধার্মিকতা ও শ্রেষ্ঠত্ব সুবিদিত ছিল। তাই আমি একদিন তার কাছে এই মর্মে পত্র প্রেরণ করি যে—
প্রিয় ভাই, আমি আপনার সততা, নিষ্ঠা ও ধার্মিকতা সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তাই আপনার কাছে এই পত্রটি লিখতে উৎসাহিত হয়েছি। আশা করছি, পত্রের উত্তরে আপনি আমাকে আপনার দ্বীনী অবস্থা সম্পর্কে লিখে পাঠাবেন।

এরপর তিনি আমার কাছে ফিরতি-পত্রে লেখেন—
আমি আপনার পত্র পেয়েছি। আপনি অনুরোধ করেছেন, আমি যেন আমার দ্বীনী অবস্থা আপনাকে লিখে পাঠাই। আমার দ্বীনী অবস্থা জানাতে আপনাকে একটি বিষয় বলি। আমি প্রায়ই আমার নফসের সঙ্গে দরবার করি। তাকে বলি, 'তুমি মানুষের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করো। মানুষের জন্য তা-ই অপছন্দ করবে, যা নিজের জন্য অপছন্দ করো।' কিন্তু সে এতে অপারগতা প্রকাশ করে।

এরপর আমি তাকে বলি, 'তুমি মানুষের নেতিবাচক সমালোচনা বর্জন করবে। যদি কারও ব্যাপারে আলোচনা করতেই হয়, তবে ইতিবাচক আলোচনা করবে।' কিন্তু সে এতেও অপারগতা প্রকাশ করে এবং বলে, 'বসরায় প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে দুপুরবেলা সিয়াম রাখা, মানুষের সমালোচনা ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে অনেক সহজ।' প্রিয় ভাই, এই হলো আমার দ্বীনী অবস্থা![১]

দশ
আব্দুল্লাহ ইবনু সিনান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক এবং মুতামির ইবনু সুলাইমানের সাথে তারাসুসে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ মানুষের শোরগোল শোনা গেল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, কাফির ও মুসলিমদের দুই বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক এবং অন্যান্য সৈন্যরাও বেরিয়ে পড়েছেন। শত্রুপক্ষ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য উভয় দল-ই এখন মুখোমুখি। যুদ্ধের স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী একজন রোমান সৈন্য বেরিয়ে এসে মল্লযুদ্ধের প্রতি মুসলিমদের আহ্বান করল। জনৈক মুসলিম সৈনিক তার দিকে এগিয়ে গেল। শত্রুপক্ষের সৈন্যটি খুবই শক্তিশালী ছিল। সে মুসলিম সৈনিককে শহীদ করে ফেলল। এভাবে একের পর এক ছয়জনকে শহীদ করে ফেলল। ফলে স্বভাবতই তার দম্ভ ও অহমিকা অনেকগুণ বেড়ে গেল। সৈন্যদের দুই সারির মাঝে সে চক্কর দিতে থাকল আর যুদ্ধের জন্য আহ্বান করতে থাকল; কিন্তু ততক্ষণে মুসলিম সৈনিকরা তাকে কাবু করার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। আব্দুল্লাহ ইবনু সিনান বলেন, এ সময় আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, প্রিয় ভাই, আমি যদি শহীদ হয়ে যাই, তাহলে আমার অমুক অমুক কাজগুলো করে দিয়ো। এই কথা বলে তিনি ঘোড়া হাঁকালেন। কাফির সৈন্যটির সাথে তুমুল প্রতিরোধ-যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন। একপর্যায়ে দাম্ভিক কাফির সৈন্যটিকে ভূপাতিত করে তাকে হত্যা করে ফেললেন। এরপর পরবর্তী মল্লযুদ্ধের জন্য তিনি কাফিরদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। ধারবাহিকভাবে তারা ছয়জন এগিয়ে এলো এবং এভাবে একে একে ছয়জন কাফিরকে-ই হত্যা করেন। এরপরও তিনি যুদ্ধের জন্য আহ্বান করতেই থাকেন; কিন্তু কেউ-ই আর তার সাথে লড়াই করার সাহস করেনি। ততক্ষণে কাফিরদের সবার মাঝেই ভীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। এদিকে আমরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে অদৃশ্য যান।

পরবর্তী সময়ে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বলেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, আমি জীবিত থাকতে এই ঘটনা যদি কাউকে বলো...'-এতটুকু বলেই তিনি থেমে যান। (তবে তার বর্ণনাভঙ্গি থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, তিনি জীবদ্দশায় যুদ্ধের ময়দানে তার বীরত্বের ঘটনা কাউকে জানাতে চাননি। তাই প্রচ্ছন্নভাবে এই ঘটনা বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, ঘটনাটি তার জীবদ্দশায় প্রকাশ হয়ে পড়লে মানুষ তার প্রশংসা করত, তাকে বীর বলত। এজন্যই তিনি বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছেন।)[১]

এগারো
যুবায়ের ইবনু নুফাইর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, প্রায়ই দেখতাম, আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পড়ে মুনাফিকী থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম, আবু দারদা, আপনি এত বিচলিত হচ্ছেন কেন? কোথায় আপনি আর কোথায় মুনাফিকী? তিনি বললেন, তোমরা আমাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করো না! আল্লাহর শপথ! যে কোনো মুহূর্তে মানুষ দ্বীন থেকে বেরিয়ে যেতে পারে; ইসলামের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যেতে পারে।[২]

বারো
হারুন ইবনু রিআব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমরা কুরাইশ বংশের অমুক লোককে খুঁজে বের করো। আমি তাকে এমন একটি কথা বলেছিলাম, যা থেকে সে ধারণা করতে পারে যে, আমি তার সঙ্গে আমার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছি। আমি চাই না, এক তৃতীয়াংশ মুনাফিকী নিয়ে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হই![৩] তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি তার কাছে আমার কন্যার বিবাহ দিলাম।[৪]

তেরো
মুসা ইবনুল মুয়াল্লা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'শোনো মুসা, তিনটি বৈশিষ্ট্য এমন রয়েছে, যদি সেগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে পার, তবে আকাশ থেকে বর্ষিত কল্যাণে সুনিশ্চিতরূপে তোমারও একটা অংশ থাকবে।
(১) তুমি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করবে।
(২) নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করবে।
(৩) খাবার গ্রহণের সময় যথাসম্ভব হালাল-হারাম যাচাই করে নেবে।' [১]

চৌদ্দ
এক গল্পকার মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহর প্রতিবেশী ছিলেন। একদিন তিনি আক্ষেপ করে বলেন-
■ কেন যে মানুষের অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত হয় না! ■ চক্ষুগুলো তাঁর ভয়ে অশ্রু ঝরায় না! ■ দেহগুলো তাঁর ভয়ে কেঁপে ওঠে না!

মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি তাকে প্রবোধ দিয়ে বলেন, জনাব, আমরা সকলেই এই সমস্যায় জর্জরিত। বস্তুত যার হৃদয় থেকে আল্লাহর স্মরণ মুছে যায়, তার অবস্থা এমনই হয়। [২]

পনেরো
খালিদ ইবনু সফওয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি মাসলামা ইবনু আব্দিল মালিকের সাথে সাক্ষাৎ করি। তিনি বলেন, খালিদ, আমাকে হাসান বসরী সম্পর্কে কিছু বলো। আমি বললাম, অবশ্যই বলব। আমি তার নিকট-প্রতিবেশী। তার মজলিসের নিয়মিত সদস্য। সেই সূত্রে আমি তার সম্পর্কে যথেষ্ট জানি। তিনি সাধারণ মানুষ থেকে অনেকটা আলাদা। সাধারণ মানুষের কথায় ও কাজে কোনো মিল থাকে না। বলে একরকম করে আরেক রকম; কিন্তু তিনি এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তার ভেতর-বাহির এক। যা বলেন, তাই করেন। কোনো কিছু শুরু করলে শেষ করে ছাড়েন। আর কোনোকিছুর বিরোধিতা করলে সেটাকে উৎখাত করে তবেই ক্ষান্ত হন। কোনো কাজের আদেশ করলে তিনিই সর্বাগ্রে সেটা বাস্তবায়ন করেন। আবার কোনো ব্যাপারে নিষেধ করলে তিনিই সর্বাগ্রে সেটা পরিত্যাগ করেন। আমি তাকে দেখেছি, তিনি কখনই কোনো মানুষের শরণাপন্ন হন না; কিন্তু মানুষ তার শরণাপন্ন হয়!

এটুকু শুনেই মাসলামা ইবনু আব্দিল মালিক বলে ওঠেন, ব্যস, যথেষ্ট! ওই জাতি কী করে পথভ্রষ্ট হবে, যাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি বসবাস করে?[১]

ষোলো
আউন ইবনু উমারা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হিশাম আদ-দাসতুয়ায়ীকে বলতে শুনেছি, আল্লাহর শপথ! আমি এ কথা বলতে পারব না যে, নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি দিনও আমি হাদীস অন্বেষণ করতে বেরিয়েছি![২] অথচ সালাফগণ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই জ্ঞান অন্বেষণ করেছেন। ফলে তারা মর্যাদার উচ্চশিখরে আরোহণ করতে পেরেছেন। উম্মাহর ইমাম হয়েছেন।

কিন্তু তাদের থেকে এমন একদল মানুষ ইলম অর্জন করেছেন, যারা প্রাথমিক পর্যায়ে গতানুগতিকভাবে ইলম অর্জন করতেন। এর পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সদিচ্ছা বা সংকল্প কাজ করত না; বরং শুরুতে তারা কেবল জ্ঞানসত্তার পরিতৃপ্তির জন্যই ইলম শিখতেন। অতঃপর এর ওপর অটল থাকতেন। মাঝেমধ্যে আত্ম-সমালোচনা করতেন। এতে করে ইলম শেখার মাঝপথে ইলমই তাদেরকে নিষ্ঠা ও বিশুদ্ধ নিয়তের দিকে ধাবিত করত। ইমাম, ফকিহ, মুজাহিদসহ আরও অনেকেই এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

তারা বলেন, আমরা জ্ঞানপিপাসার পরিতৃপ্তির জন্য ইলম অন্বেষণ করতাম। ফলে সঙ্গত কারণেই আমাদের মধ্যে বড় কোনো নিয়ত বা মহান কোনো উদ্দেশ্য কাজ করত না। অবশ্য পরে আল্লাহ তাআলা আমাদের বড় ও বিশুদ্ধ নিয়ত দান করতেন।

তাদের কেউ কেউ বলেন, আমরা প্রথম প্রথম আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্যকিছুর উদ্দেশ্যে জ্ঞান অর্জন করতাম; কিন্তু জ্ঞান অর্জন করতে করতে একসময় জ্ঞানই আমাদের আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা থেকে বিরত রাখত। আমাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করে দিত। এটাও প্রশংসনীয়। এভাবে জ্ঞান অর্জন করে তারা মানুষের মাঝে তা ছড়িয়ে দিতেন।

এরপর এমন কিছু লোক এলো, যারা দুনিয়ার মোহে পড়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ইলম শিখত-যেন মানুষ তাদের প্রশংসা করে ও আলিম বলে। তারা যেমন নিয়ত করেছে, তেমনই প্রতিদান পাবে। আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষ কোনো প্রতিদান পাবে না। কারণ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
GG
مَنْ غَزَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَهُوَ لا يَنْوِى فِي غَزَاتِهِ إِلَّا عِقَالًا فَلَهُ مَا نَوَى
যে-ব্যক্তি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণ করে, তার ভাগ্যে তা-ই জুটবে-যা সে নিয়ত করেছে।[১]

আপনি হয়তো দেখে থাকবেন, এ সকল লোক জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয় না। তাদের জ্ঞান তাদের মাঝে কোনো প্রভাব ফেলে না। তাদের ইলমের কারণে তাদের আমলেও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসে না। অথচ প্রকৃত আলিম ও জ্ঞানী তো সে-ই, যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাকে ভয় করে।

এরপর এমন কিছু লোক এলো, যারা ইলম শিখত; কিন্তু এর দ্বারা রাষ্ট্রীয় পদ-পদবীতে আসীন হয়ে মানুষের ওপর জুলুম করত। ইলম অনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকত। অশ্লীলতা ও পাপকর্মে জড়িয়ে যেত। এদের ধ্বংস হোক। এরা আলিম নামের কলঙ্ক!

তাদের কেউ কেউ তার ইলমের ব্যাপারে আল্লাহকে মোটেও ভয় করত না; বরং ইলম দ্বারা বিভিন্ন অপকৌশল খুঁজত। হারামকে হালাল করার অবৈধ পন্থা ও বাহানা তালাশ করত। সব জায়গায় শিথিলতার ফতোয়া দিত এবং এমন সব হাদীস প্রচার করত, যেগুলো সনদের বিচারে খুবই দুর্বল ও পরিত্যাজ্য।

তাদের কেউ কেউ তো আবার আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করার দুঃসাহসও প্রদর্শন করত। জাল হাদীস বানিয়ে প্রচার করত। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করেছেন।

পূর্ববর্তীগণ অনেক জ্ঞানের কথা বর্ণনা করেছেন। তারা ইলমের সকল শাখায় দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাদের পরে যারা এসেছে তাদের ইলম ও আমলে বিরাট ঘাটতি ছিল। তাদের পরবর্তীদের অবস্থা ছিল আরও মারাত্মক। তারা যৎসামান্য জ্ঞান অর্জন করেই নিজেদের মহামনীষী বলে দাবি করত।

তাদের মাথায় কখনও এ প্রশ্নটা আসত না যে, ইলমের দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পেরেছে কি না? আর আসবেই বা কী করে, তারা তো এমন কোনো শাইখের সাক্ষাতেই যায়নি, যারা প্রকৃত অর্থেই অনুসরণীয়—আস্থার সঙ্গে যাদের মান্য করা যায়। ফলে তারা নীচু শ্রেণির মানুষে পরিণত হয়েছে।

এই শ্রেণির মধ্য হতে যারা শিক্ষক হন, তাদের কাজ হলো মোটামোটা ও দামিদামি বই দিয়ে ঘর সাজিয়ে রাখা। এরপর সময় সুযোগ হলে তাতে চোখ বুলিয়ে যাওয়া। পূর্ববর্তীদের ইলম বিকৃত করে উপস্থাপন করা। এ ধরনের কাজ থেকে আমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও মুক্তি কামনা করছি। এজন্যে আমাদের সালাফদের কেউ কেউ বিনয়ের সাথে বলে গেছেন—
আমি আলিম নই; কখনও কোনো আলিমকে দেখিওনি [১]

সতেরো
মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ রাক্কা শহরে ঘনঘন যাতায়াত করতেন। সেখানকার একটি মুসাফিরখানায় অবস্থান করতেন। বিশেষ কোনো প্রয়োজনে একজন যুবক সেখানে নিয়মিত আসত এবং যথারীতি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহর কাছ থেকে হাদীস শুনত।

মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা বলেন, একবার আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাক্কা শহরে গেলেন; কিন্তু সেই যুবককে দেখলেন না। সেবার তার তাড়া ছিল। তাই তিনি সৈন্যদলের সাথে বেরিয়ে পড়লেন। পরবর্তী সময়ে যখন যুদ্ধ থেকে তিনি ফিরে আসলেন, তখন আবার রাক্কায় গেলেন এবং ওই যুবকটি সম্পর্কে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল, সে তার ঋণের কারণে বন্দি হয়ে আছে। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক জিজ্ঞেস করলেন, তার ঋণের পরিমাণ কত? লোকেরা বলল, দশ হাজার দিরহাম!

অতঃপর তিনি পাওনাদারকে খুঁজতে লাগলেন এবং তাকে পেয়েও গেলেন। এক রাতে তিনি ওই পাওনাদারের বাড়িতে গেলেন। তাকে ডাকলেন। মেপে মেপে দশ হাজার দিরহাম তাকে দিয়ে দিলেন। আর তার থেকে শপথ নিলেন যে, আমি (আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক) যতদিন জীবিত থাকব ততদিন তুমি এ ঘটনা কাউকে বলবে না। আর সকাল হলে যুবককে মুক্ত করে দেবে।

রাতেই আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক সফরে বেরিয়ে যান। ওদিকে যুবককেও মুক্তি দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক এখানে ছিলেন। তিনি তোমাকে স্মরণ করেছেন; কিন্তু এখন তিনি এখানে নেই, চলে গেছেন। যুবকটি তার সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তার বাহনের পদচিহ্ন দেখে দেখে চলতে থাকে। রাক্কা থেকে দুই কিংবা তিন মনজিল[১] দূরে গিয়ে তিনি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সাথে মিলিত হন। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক তাকে দেখেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে ওঠেন-

: আরে, কোথায় ছিলে এতদিন? মুসাফিরখানায় যে তোমায় দেখলাম না? : জি, শাইখ, কিছু ঋণের কারণে আমি বন্দি ছিলাম। : তাহলে মুক্তি পেলে কী করে? : কোনো এক ব্যক্তি আমার ঋণ আদায় করে দিয়েছেন। তাতে আমি মুক্ত হয়েছি; কিন্তু তার সম্পর্কে কিছুই জানি না। : শোনো, তুমি বরং আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া করো। তিনি তোমার ঋণ পরিশোধের বন্দোবস্ত করেছেন।

যতদিন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক জীবিত ছিলেন, ততদিন ওই পাওনাদার এই ঘটনা কাউকে বলেননি।[২]

আঠারো
আবু জাফর আল-হাযযা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাকে বলতে শুনেছি, 'যদি তোমার ভেতর ও বাহির এক হয়, তাহলে সেটা ন্যায় ও সাম্য। আর যদি ভেতরটা বাহির থেকে সুন্দর হয়, তাহলে সেটা উত্তম এবং শ্রেষ্ঠ; কিন্তু যদি তোমার বাহিরটা ভেতরের চেয়ে সুন্দর হয়, তাহলে সেটা অন্যায়।'[১]

উনিশ
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদা ইমাম হামদুন ইবনু আহমাদকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আমাদের কথার চেয়ে সালাফদের কথা বেশি উপকারী হওয়ার কারণ কী?' উত্তরে তিনি বলেন, 'কারণ, তারা কথা বলতেন ইসলামের সম্মান রক্ষার জন্য, নিজেদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আর আমরা কথা বলি নিজেদের সম্মান বাড়ানোর জন্য, দুনিয়ার অর্থ-সম্পদ লাভ করার জন্য এবং মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য।'[২]

বিশ
নযর ইবনু শুমাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন—একবার বসরার প্রধান রেশম-উৎপাদন কেন্দ্রে হঠাৎ করেই রেশমের দাম বেড়ে যায়। আর সেখানে দাম বাড়লে, বসরার সমস্ত বাজারেই তার প্রভাব পড়ে। ইউনুস ইবনু উবাইদ নামে একজন রেশম-ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি এই ব্যাপারটা জানতেন এবং দরের ওঠানামা সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতেন। তাই তিনি এক ব্যক্তির কাছ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা মূল্যের রেশম কেনেন। পরবর্তী সময়ে বিক্রেতার সঙ্গে দেখা হলে তিনি বলেন, তুমি কি জানতে, তোমার কাছ থেকে পণ্য ক্রয়কালে অমুক অমুক স্থানে এর দাম বেড়ে গিয়েছিল? লোকটি বলে, না। তবে যদি জানতাম, তাহলে আমি এই দামে বিক্রি করতাম না। ইউনুস ইবনু উবাইদ বলেন, ঠিক আছে। তুমি মুদ্রাগুলো নিয়ে এসো। আর এই নাও তোমার মালপত্র। এরপর লোকটি মুদ্রা ফেরত দিয়ে মাল বুঝে নিয়ে চলে যায়।[৩]

একুশ
বিশর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি হাদীস বর্ণনা করছেন না যে? উত্তরে তিনি বলেন, আমার এখন হাদীস বর্ণনা করতে ইচ্ছে করছে; কিন্তু এটা যেহেতু এখন আমার মনের ইচ্ছে, তাই হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকছি।[১]

বাইশ
ফুযাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ সাধারণ মানুষের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন-হে হতভাগ্য, তুমি সবসময় পাপাচার করো অথচ নিজেকে মনে করো সৎকর্মশীল! তুমি মূর্খ, অথচ নিজেকে মনে করো জ্ঞানী! তুমি কৃপণ, অথচ নিজেকে মনে করো দানশীল! তুমি নির্বোধ, অথচ নিজেকে মনে করো বুদ্ধিমান! তোমার জীবন কত সংক্ষিপ্ত, অথচ তোমার আশা কত দীর্ঘ![২][৩]

তেইশ
ইউসুফ ইবনু আহমাদ আস-সিরাজী রাহিমাহুল্লাহ তার আরবায়ীনাল বুলদানগ্রন্থে লেখেন-

একবার আমি আমার বিশিষ্ট একজন শিক্ষকের[৪] সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হই। তিনি কিরমান দেশের শেষ প্রান্তে বসবাস করতেন। আল্লাহর সাহায্যে আমি সেখানে পৌঁছি। তাকে সালাম করি। তার হাতে ও কপালে চুমু খাই। এরপর তার সামনেই বসে পড়ি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার এই দীর্ঘ সফরের উদ্দেশ্য কী? আমি বলি, আপনার সাক্ষাৎলাভ।

আল্লাহর পরে আপনিই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। আমি আপনার সনদে যত হাদীস শুনেছি, সব লিখে রেখেছি। আমি আপনার কাছে এসেছি, আপনার সান্নিধ্যের বরকত লাভের জন্য এবং সরাসরি আপনার মুখ থেকে হাদীস শুনে সনদের মান উন্নত করার জন্য।

তিনি বলেন, আল্লাহ তোমাকে এবং আমাকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করার তাওফীক দান করুন। আমাদের কষ্ট, চেষ্টা ও ইচ্ছাকে তাঁর জন্য নিবেদিত ও একনিষ্ঠ করুন। যদি তুমি আমার প্রকৃত অবস্থা জানতে এবং আমার ভেতরটা বুঝতে, তাহলে ঘৃণায় সালামটুকুও দিতে না! আমার সামনেও বসতে না!

এই বলে তিনি কাঁদতে থাকেন। দীর্ঘক্ষণ কাঁদেন। তার কান্না দেখে উপস্থিত সবাই কেঁদে ফেলে। এরপর সজল চোখে বলেন, হে আল্লাহ, আমাদের প্রকৃত অবস্থা পর্দাবৃত করে রাখুন। পর্দার আড়ালেই আমাদের ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করুন।

অতঃপর বলেন, হে বৎস, আমিও আমার পিতার সাথে আস-সহীহ গ্রন্থটি সরাসরি শোনার জন্য হারাত থেকে বৃশানজের শাইখ আদ-দাউদীর কাছে গিয়েছি। তখন আমার বয়স দশ বছরও হয়নি। চলার পথে আমার পিতা আমার দুই হাতে দুইটা পাথর ধরিয়ে দিয়ে বলেন, এগুলো হাতে নিয়েই চলো।

পিতার শাসনের ভয়ে সেগুলো হাতে নিয়েই হেঁটেছি। আমি হেঁটেছি আর তিনি আমাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। যখন দেখেছেন, পাথর বহন আমার জন্য অধিক কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি আমাকে একটা পাথর ফেলে দিতে আদেশ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি ফেলে দিয়েছি। এতে আমার বোঝা হালকা হয়েছে। পথ চলা সহজ হয়েছে। এরপর আবার হাঁটতে শুরু করেছি। ক্লান্তি অনুভব করা পর্যন্ত হেঁটেই চলেছি। আমি ক্লান্ত হয়ে গেলে তিনি বলেছেন, তোমার কষ্ট হচ্ছে? আমি ভয়ে ভয়ে বলেছি, না, না! আমার কষ্ট হচ্ছে না। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, তাহলে এত ধীরে হাঁটছ কেন?

তারপর আমি তার সামনে সামনে ঘণ্টাখানেক দ্রুত হেঁটেছি। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে যখন একেবারে অক্ষম হয়ে পড়েছি তখন তিনি বাকি পাথরটিও ফেলে দিতে বলেছেন। এরপর পড়ে যাওয়া হওয়া পর্যন্ত একাধারে হেঁটেছি। ক্লান্তির কারণে আর হাঁটতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি আমাকে তার পিঠে উঠিয়ে নিয়েছেন।

এভাবে চলতে চলতে একপর্যায়ে আমরা কৃষক এবং অন্যান্য শ্রেণি ও পেশার মানুষের একটা বড় কাফেলার সাক্ষাৎ পাই। তারা আমার আব্বাকে বলে, শাইখ ঈসা, আমাদের যথেষ্ট বাহন আছে। আপনি এই বাচ্চাকে আমাদের কাছে দিন। আমরা তাকে এবং আপনাকে বৃশানজ পর্যন্ত পৌঁছে দেব! আব্বা বলেন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই! আল্লাহর রাসূলের হাদীস শিখতে যাব বাহনে চড়ে? না, না! আমরা পায়ে হেঁটেই যাব! যদি এই ছেলে ক্লান্ত হয়ে যায়, তাহলে তাকে কাঁধে তুলে নেব। কারণ, সে তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বহন করবে। এতে আশা করি, আমারও সাওয়াব হবে।

এখন আমার বয়স অনেক হয়েছে, সমসাময়িক কেউ আর দুনিয়ায় নেই। তাই এখন নানান দেশ থেকে আমার কাছে লোক আসে। সাক্ষাৎ করে।

অতঃপর শাইখ আমাদের সহপাঠী আব্দুল বাকী ইবনু আব্দিল জাব্বার আল-হারাবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আগন্তুককে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করো। আমি বললাম, শাইখ, আবুল জাহমের কিতাবের কিছু অংশ পাঠ করা আমার নিকট মিষ্টান্ন খাওয়ার চেয়ে অধিক প্রিয়। তিনি মুচকি হেসে বলেন, আগে খেয়ে নাও। পেটে খাবার ঢুকলে পরেই না কথা বের হবে! এরপর আমাদের খাবার পরিবেশন করা হয়। তাতে রুচিকর মিষ্টান্ন ছিল। আমরা তৃপ্তিসহকারে সেগুলো গ্রহণ করি।

এরপর আমার কাছে থাকা পাণ্ডুলিপিটা বের করি এবং শাইখকেও তার মূল পাণ্ডুলিপি বের করার অনুরোধ করি। তিনি পাণ্ডলিপি উপস্থিত করে বলেন, ভয় পেয়ো না। বেশি উৎসুক হয়ো না। যারা আমার থেকে হাদীস শুনেছে, তাদের অনেককেই আমি নিজে কবরে শায়িত করেছি। তুমি বরং আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করো। আমি পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনাই। এতে আমার খুব ভালো লাগে। আল্লাহ তাআলা আস-সহীহ-সহ আরও কিছু হাদীসের কিতাব কয়েকবার শোনার সুযোগ করে দিয়েছেন।

এরপর থেকে তার ইন্তেকাল পর্যন্ত আমি তার সান্নিধ্য ও সেবায় তার নিকট অবস্থান করতে থাকি। তিনি জিলহজ মাসের মঙ্গলবার রাতে বাগদাদ শহরে ইন্তেকাল করেন। [১]

টিকাঃ
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৬১
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৬১
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৬১
[২] আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ: ১৯০৮; সিফাতুস সাফওয়া: ২/৯৬
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ২/৯৬
[১] অর্থাৎ তিনি গোপনে দান করতেন। তার পরে আর কেউ তেমন গোপন দান করত না।
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ২/৯৬
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩৬০
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১৯
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩০৩
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪০৮-৪০৯
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৩৮৩, ইমাম যাহাবী বলেছেন, বর্ণনাটির সনদ সহীহ।
[৩] উল্লেখ্য, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মুনাফিকের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের একটি।
[৪] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৩৯৬
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৬৯
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১২২
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৫৭৬
[২] ইমাম যাহাবীও নিজের ব্যাপারে উপর্যুক্ত অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, আমার পক্ষেও আল্লাহর নামে কসম করে একথা বলা সম্ভব নয় যে, আমি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই হাদীস অন্বেষণ করেছি।
[১] মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩১৫, হাদীস নং : ২২৬৯২; সুনানু দারিমী: ২/৬৫৪; সুনানুন নাসায়ী: ৬/২৪; হাদীসটি উবাদা ইবনুস সামিত রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফু সনদে বর্ণিত।
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/১৫২-১৫৩
[১] ৩২/৪৮ মাইল
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪১, ১৪২
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৩৪
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২২২
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/২৯৩
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৪৭০
[২] ইমাম যাহাবী বলেন, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! তিনি সত্য বলেছেন। তুমি জালিম, অথচ নিজেকে মাজলুম ভাবছ! তুমি হারাম খাও, অথচ ভাবছ, হারাম থেকে বেঁচে সতর্ক জীবনযাপন করছ! তুমি পাপিষ্ঠ, অথচ নিজেকে ন্যায়নিষ্ঠ ভাবছ! দুনিয়া পাওয়ার উদ্দেশ্যে জ্ঞান অর্জন করছ, আর মনে করছ তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জ্ঞান অর্জন করছ!
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৭০
[৪] এই শিক্ষক একজন বিশিষ্ট পরিব্রাজক ছিলেন। তৎকালে তিনি সর্বোন্নত সনদে হাদীস বর্ণনা করতেন।
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২০/৩০৭, ৩০৮

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সালাফগণের আল্লাহভীতি

📄 সালাফগণের আল্লাহভীতি


এক
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায় মজলিসে বলতেন, রাত ও দিনের আবর্তনে তোমাদের হায়াতের স্বল্প সময়টুকুও ফুরিয়ে যাচ্ছে। তোমাদের ভালোমন্দ সব আমল সংরক্ষিত হচ্ছে। হঠাৎ মৃত্যু এসে হাজির হবে। অতএব, যে-ব্যক্তি কল্যাণের চারা রোপণ করছে, সে শীঘ্রই এর কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে আনন্দিত হবে। আর যে মন্দের চারা রোপণ করছে, সে শীঘ্রই লাঞ্ছিত হবে।

প্রত্যেক চাষীর জন্য তাই অপেক্ষা করছে, যা সে রোপণ করেছে। যে ধীরগামী, তার ভাগ্য তাকে অতিক্রম করবে না। যে লোভী, যা তার ভাগ্যে নেই তা কখনই লাভ করতে পারবে না। যাকে কল্যাণ দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছে। যাকে মন্দ থেকে বাঁচানো হয়েছে, আল্লাহ তাআলাই তাকে বাঁচিয়েছেন।

যারা মুত্তাকী, তারাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান। যারা ফকীহ, তারাই অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাদের সাক্ষাৎ নফল ইবাদতের সমতুল্য।[১]

দুই
আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদলের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রার সময় বলতেন—কত সাদা পোশাক পরিহিত লোক আছে, যাদের দ্বীন কলুষিত। কত সম্মানিত ব্যক্তি আছে, যারা দ্বীনের ব্যাপারে অপদস্থ। তোমরা তোমাদের পুরাতন পাপগুলো নতুন পুণ্য দ্বারা মিটিয়ে দাও।[১]

তিন
ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় অঝোরে কাঁদছিলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, সফর অনেক লম্বা। পাথেয় যৎসামান্য। প্রতিটি ঘাঁটি কন্টকাকীর্ণ। অধিকন্তু, এই ঘাঁটিগুলো ওপারে অপেক্ষা করছে—হয়তো জান্নাত; নয়তো জাহান্নাম![২]

চার
উবাইদুল্লাহ ইবনুস সারী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আমার এমন একটা গুনাহ সম্পর্কে জানি, যা আমার ওপর ঋণের বোঝার মতো চেপে আছে। জিজ্ঞেস করা হলো, কী সেই গুনাহ? তিনি বললেন, আমি প্রায় চল্লিশ বছর যাবত একজনকে ‘হে নিঃসু’ বলে ডেকেছি।

উবাইদুল্লাহ ইবনুস সারী বলেন, আমি এই ঘটনা আবু সুলাইমান আদ-দারানীকে বললে তিনি বলেন, তাদের গুনাহ কম ছিল। তাই তাদের মনে থাকত, কোন গুনাহ কোথায় হয়েছে? কিন্তু আমার আর তোমার গুনাহ এত বেশি যে, কোথায় কখন কোন গুনাহ করেছি, তার কিছুই মনে নেই। [৩]

পাঁচ
আতা আল-খুরাসানী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমি দুনিয়ার ব্যাপারে তোমাদের নসীহত করব না। তোমরা তো এমনিতেই দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করো এবং দুনিয়ার প্রতি লালায়িত থাকো। তাই আমি আখিরাতের ব্যাপারে তোমাদের নসীহত করব। তোমরা অস্থায়ী বাসস্থানের পরিবর্তে স্থায়ী বাসস্থানের কথা চিন্তা করো।

■ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে হবে জেনেই দুনিয়া গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর শপথ, অবশ্যই তোমাদের দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে হবে।

■ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে জেনেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকো। কেননা, আল্লাহর শপথ, অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ তোমাদের আস্বাদন করতে হবে।

■ আখিরাতে অবতরণ করবে জেনেই আখিরাতের জন্য প্রস্তুত থাকো। কেননা, আল্লাহর শপথ, খুব শীঘ্রই তোমাদের আখিরাতে অবতরণ করতে হবে।

মনে রাখবে, আখিরাত সকল মানুষের বসতবাড়ি। মানুষের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে সফরে বের হয় আর তার সাথে কোনো পাথেয় থাকে না। যে-ব্যক্তি তার সফরের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে, সে সফরে সুখী হয়। আনন্দ উদযাপন করে। কষ্ট ভোগ করে না।

পক্ষান্তরে যে সফরে বের হয়, কিন্তু কোনো পাথেয় নেয় না, সে অবশ্যই লজ্জিত হয়। ক্ষুধা লাগলে খাদ্য পায় না। রোদ উঠলে ছায়া পায় না। পিপাসা লাগলে পানি পায় না। দুনিয়ার সফর হলো খুবই স্বল্প সময়ের। সুতরাং, বুদ্ধিমান তো সে-ই, যে এমন সফরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে, যে সফর কখনও শেষ হবে না। আর সে সফর হচ্ছে আখিরাতের সফর।[১]

ছয়
কাবিসা ইবনু কায়িস আল-আম্বরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সন্ধ্যাবেলা যাহহাক ইবনু মুযাহিম খুব কাঁদতেন। কারণ, জিজ্ঞেস করা হলে বলতেন, আমি জানি না, আজ সারাদিনে আমার কোন কোন আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়েছে। তাই কাঁদছি।) [২]

সাত
কিনানা ইবনু জাবালা আস-সুলামী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, বকর ইবনু আব্দিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন তুমি বয়সে তোমার চেয়ে বড় কাউকে দেখবে, তখন ভাববে, এ ব্যক্তি ঈমান ও সৎ আমলের দিক থেকে তোমার চেয়ে অগ্রগামী। তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর যখন বয়সে তোমার চেয়ে ছোট কাউকে দেখবে, তখন মনে করবে, গুনাহ এবং অবাধ্যতায় তুমি তার চেয়ে অগ্রগামী। সুতরাং, সে-ও তোমার চেয়ে উত্তম। তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর যখন তুমি তোমার সমবয়সী ও সমসাময়িকদের দেখবে, তারা তোমাকে সম্মান দেখাচ্ছে এবং তোমার প্রশংসা করছে তখন মনে করবে, তারা যা করছে, সেটা তাদের দয়া ও অনুগ্রহ। পক্ষান্তরে তারা যদি তোমাকে সম্মান না দেখায় এবং তোমার প্রশংসা না করে, তাহলে মনে করবে, এটা তোমার পাপাচারের ফল এবং এটাই তোমার প্রাপ্য।[১]

আট
কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ-র সাথে মাঝে মাঝে সফরে বের হতাম। তখন প্রায়ই আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকত—এই লোকটির মধ্যে এমন কী আছে, যার কারণে তার মর্যাদা ও সুখ্যাতি আমাদের চেয়ে এত বেশি? আমরাও তো তার মতো সালাত আদায় করি, হজ পালন করি, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি; তবে কেন তার এবং আমাদের মাঝে এত ব্যবধান? এত পার্থক্য?

এরপর খুব শীঘ্রই আমি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই—
একবার আমরা গভীর রাতে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হই। পথিমধ্যে একটি ঘরে খাবারের জন্য বসি। হঠাৎ বাতিটা নিভে যায়। আমাদের সঙ্গীরা বাতি জ্বালানোর জন্য চেষ্টা করতে থাকে। কিছুক্ষণের জন্য পুরো ঘর অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সঙ্গীদের কয়েকজন ঘরের বাইরে গিয়ে বাতি জ্বালানোর উপায় খুঁজতে থাকে। এতে কিছুক্ষণ সময় লেগে যায়। তারপর তারা বাতি জ্বালিয়ে ঘরে আসে। হঠাৎ করে ঘর আলোকিত হওয়ায় আমরা দেখতে পাই, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের চেহারা ও দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে একাকার!

আমি তখন মনে মনে বলি, এই যে ভীতি! এই যে ভয়! এই কারণেই তিনি আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ! অধিক মর্যাদাবান! হয়তো বাতি নিভে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট অন্ধকার তাকে আখিরাতের অন্ধকারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।[২]

নয়
হুসাইন ইবনুল হাসান আল-মাররুযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, দিনটি কেমন কাটল আপনার? তিনি বললেন—যার প্রতিপালক তার কাছে ফরয আদায়ের আশা করেন, যার নবী তাকে সুন্নত পালনের আহ্বান করেন, যার দুই কাঁধের ফেরেশতা তাকে আমল বিশুদ্ধ করার কথা বলেন, অন্তর যাকে তার প্রবৃত্তির চাহিদাপূরণে প্রলুব্ধ করে, শয়তান যাকে অশ্লীল কাজ করতে কুমন্ত্রণা দেয়, মালাকুল মাওত [১] যার আত্মা নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমান, যার কাছে তার পরিবার ভরণপোষণের আশায় রয়েছে, তার দিন আর কেমন কাটিতে পারে?[২]

দশ
ইবনু খুবাইক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হুযাইফা আল-মারআশী একবার আমাকে বললেন, চারটি জিনিসের প্রতি লক্ষ্য রেখো—এক. তোমার চক্ষুদ্বয়, দুই. মুখ, তিন. প্রবৃত্তি, চার. অন্তর।

* তোমার চোখের ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন তা হারাম জিনিসে দৃষ্টিপাত না করে।

* তোমার মুখের ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন তা কপট কথা না বলে।

* তোমার প্রবৃত্তির ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন সে মন্দ কিছু কামনা না করে।

* তোমার অন্তরের ব্যাপারে সতর্ক থেকো—যেন তার মাঝে কোনো মুসলমানের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না থাকে।

সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত এই চারটি বৈশিষ্ট্য তোমার মাঝে না আসবে, ততক্ষণ তোমার মাথার ওপর ছাই পড়ুক।[৩]

এগারো
শাইখ কাফফাল সম্পর্কে কাযী হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি আমার উসতায। তিনি যখন পড়াতেন, বেশির ভাগ সময়জুড়েই খুব কাঁদতেন। এরপর মাথা তুলে বলতেন, যে-উদ্দেশ্যে আমাদের প্রেরণ করা হয়েছে, সে-ব্যাপারে আমরা কতই-না বেখবর! আমরা আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কতই-না গাফেল![১]

বারো
মুখাওওয়াল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন বাহিম আল-আজালী আমার কাছে এসে বললেন, আমি হজের সফরে বের হব। তোমার আত্মীয় বা বন্ধুমহলে এমন কেউ কি আছে, যাকে তুমি আমার সফরসঙ্গী হিসাবে পছন্দ করো? আমি বললাম, হ্যাঁ।

অতঃপর আমি আমার মহল্লার এক লোকের কাছে গেলাম। লোকটি খুবই দ্বীনদার ও পরহেজগার। আমি তাদের দুইজনের মাঝে পরিচয় করিয়ে দিলাম। তারা একসাথে সফরে যেতে সম্মত হলো। একপর্যায়ে বাহিম আল-আজালী তার পরিবারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলে মহল্লার ওই লোক এসে আমাকে বলল, হে মুখাওওয়াল, তোমার এই বন্ধুকে আমার থেকে দূরে রাখো। আমার জন্য অন্য কোনো সফরসঙ্গী তালাশ করো।

: সর্বনাশ! কী সব বলছ, তুমি? কী হয়েছে? আল্লাহর কসম! পুরো কুফা নগরীতে তার মতো সচ্চরিত্রবান ও সহনশীল আর কেউ নেই। আমি তার সাথে সমুদ্র-সফর করেছি। তাকে উত্তম সঙ্গী হিসেবে পেয়েছি।

: সমস্যাটা এখানে নয়; বরং সে ক্লান্তিহীন অবিরাম ক্রন্দন করে। তার এই ক্রন্দন আমার পুরো সফর মাটি করে দেবে।

: যখন আল্লাহর কথা স্মরণ হয় এবং হৃদয় বিগলিত হয়, তখন সে এভাবে কাঁদতে থাকে। তাছাড়া তুমি কি কখনও কাঁদো না?

: হ্যাঁ, অবশ্যই কাঁদি; কিন্তু আমি জানতে পেরেছি, সে মাত্রাতিরিক্ত কাঁদে।

: ঠিক আছে, তুমি তার সঙ্গে সফর করো। আশা করি, তার দ্বারা তুমি উপকৃত হতে পারবে।

: হুম! আমি ইস্তিখারা করে দেখি।

যেদিন তারা সফরের উদ্দেশ্যে বের হবে, সেদিন তাদের জন্য একটি উট আনা হলো। উটের পিঠে সফরের পাথেয় বেঁধে দেওয়া হচ্ছিল। এমন সময় বাহিম আল-আজালী হাতের ওপর খুঁতনি ঠেকিয়ে দেওয়ালের ছায়ায় বসে ছিলেন। আর এত বেশি কাঁদছিলেন যে, তার গাল, দাড়ি ও বুক অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছিল। আল্লাহর কসম! আমি দেখেছি, তার অশ্রু মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিল!

আমার সাথীটি আমাকে বলল, মুখাওওয়াল! তোমার বন্ধুর কান্না শুরু হয়ে গেছে। এ ব্যক্তি আমার সফরসঙ্গী হতে পারবে না।

আমি বললাম, তুমি তার সাথে সফর করো। হয়তো তার পরিবারের কথা কিংবা দীর্ঘ সফরে তাদের বিচ্ছেদের কথা মনে পড়েছে। তাই সে কাঁদছে।

আমাদের এই আলাপ বাহিম শুনে ফেলেন। তিনি বলেন, হে আমার ভাই, আল্লাহর শপথ, আমি মোটেও এই জন্য কাঁদছি না। আমি তো কাঁদছি দুনিয়ার এই সফর দেখে আখিরাতের সফরের কথা মনে পড়ে গেল, তাই!

মুখাওওয়াল বলেন, এরপর তার কান্নার আওয়াজ আরও বেড়ে যায়।

তখন মহল্লার লোকটি আমাকে বলে, আল্লাহর শপথ! আমার প্রতি তোমার কোনোরূপ শত্রুতা এবং ঘৃণা নেই! কেন তুমি আমাকে বাহিমের সাথে জুড়ে দিচ্ছ? বাহিমের সফরসঙ্গী তো হওয়া উচিত দাউদ আত-তায়ী, সালাম আবুল আহওয়াস এবং এদের মতো কেউ। যাতে তারা পরস্পরে মিলে কাঁদতে পারে-যতক্ষণ না তাদের মন প্রশান্ত হয় কিংবা তারা সকলে মারা যায়।

আমি তাকে সফরসঙ্গী হিসেবে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলাম এবং বললাম, ধৈর্য ধরো! হয়তো এটাই হবে তোমার জীবনের সর্বোত্তম সফর।

সে বলল, একবার আমি হজের দীর্ঘ সফরে বেরিয়েছিলাম। তখন আমার সঙ্গী ছিল ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন উন্নত রুচিবোধসম্পন্ন। কখনও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতেন না। কাঁদতেন না। আমি এমন সফরসঙ্গী জীবনে একবারই পেয়েছি। আর সম্ভবত সেটাই আমার জীবনের সেরা সফর ছিল।

মুখাওওয়াল বলেন, আমাদের এই আলাপ-আলোচনা বাহিম জানতেন না। যদি জানতেন, তাহলে কিছুতেই তার সাথে সফরে বের হতেন না।

অবশেষে তারা বেরিয়ে পড়লেন এবং হজ সম্পন্ন করে ফিরে এলেন। তাদের উভয়কে সফরসঙ্গী নয়; বরং ভাইয়ের মতো লাগছিল। আমি আমার প্রতিবেশীর নিকট গেলাম। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী অবস্থা?

তিনি বললেন, প্রিয় ভাই, আল্লাহ তোমাকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন! আমি তো মনে করি, এই লোকটি বিশ্ববাসীর জন্য এই সময়ের আবু বকর! আল্লাহর শপথ! খরচ বহনে সে আমার চেয়ে অগ্রগামী ছিল। অথচ সে ছিল নিঃস্ব; আমি ছিলাম সচ্ছল। খেদমতের ব্যাপারেও সে আমার থেকে ওপরে ছিল। অথচ আমি ছিলাম শক্তিশালী যুবক; আর সে ছিল দুর্বল বৃদ্ধ। রান্নাবান্নার ক্ষেত্রেও সে ছিল আমার আগে। সে আমার জন্য রান্না করত। অথচ আমি সিয়াম রাখতাম না, কিন্তু সে নিয়মিত সিয়াম পালন করত।

আমি বললাম, তার মাত্রাতিরিক্ত কাঁদার যে-ব্যাপারটি তুমি অপছন্দ করতে, সেটার কী অবস্থা? সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি সেটাকে মানিয়ে নিয়েছিলাম। এমনকি আমার অন্তর নরম হয়ে গিয়েছিল এবং তার সাথে আমিও ক্রন্দন করতাম। এতে করে অন্যান্য সফরসঙ্গীদের কষ্ট হতো; কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারাও ব্যাপারটা মানিয়ে নেয় এবং যখন আমাদের কাঁদতে শুনত, তখন তারাও কান্না আরম্ভ করত। আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, আমাদের সবার তো লক্ষ্য একটিই। তাহলে কেন তারা আমাদের থেকে এত বেশি কান্নাকাটি করছে? আল্লাহর কসম! এরপর তারাও কাঁদত, আমরাও কাঁদতাম!

মুখাওওয়াল বলেন, অতঃপর আমি তার নিকট থেকে উঠে বাহিমের কাছে গেলাম। তাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার সফরসঙ্গীকে কেমন লাগল? তিনি বললেন, সে খুবই উত্তমসঙ্গী। আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে। দীর্ঘ সময় কুরআন তিলাওয়াত করে। বেশি বেশি ক্রন্দন করে। আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন![১]

টিকাঃ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৯৭
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮১
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৬৯৪
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৬
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৫১
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৫০
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৮
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৫৪
[১] মৃত্যুর ফেরেশতা
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২২৭
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৬৮
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৭/৪০৭
[১] আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনার দুআ।
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৭৯-১৮৩

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 সুনাম-সুখ্যাতির প্রতি সালাফগণের অনীহা

📄 সুনাম-সুখ্যাতির প্রতি সালাফগণের অনীহা


এক
হাবীব ইবনু আবি সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। কিছু মানুষ তার পেছনে পেছনে হাঁটছিল। তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আমার কাছে তোমাদের কোনো প্রয়োজন আছে? তারা বলল, না; কিন্তু আমরা আপনার সাথে কিছুক্ষণ হাঁটতে চাই। তিনি বললেন, তোমরা ফিরে যাও। কারও পেছনে পেছনে হাঁটা, এটা অনুসারীদের জন্য অপমান। আর অনুসৃত ব্যক্তির জন্য ফিতনা।[১][২]

দুই
হারিস ইবনু সুওয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলতেন, আমি আমার সম্পর্কে যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে (আমার প্রতি ঘৃণাবশত) তোমরা আমার মাথায় মাটি ছুড়ে মারতে।[৩]

তিন
বিসতম ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রাহিমাহুল্লাহ যখন দেখতেন, কেউ তার সাথে সাথে হাঁটছে, তখন তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন। আর বলতেন, ভাই, আমার কাছে কি আপনার কোনো প্রয়োজন আছে?
যদি কোনো প্রয়োজন থাকত, তাহলে তিনি তা পূরণ করতেন। এরপরও যদি লোকটি তার সাথে হাঁটতে থাকত, তখন বলতেন, আপনার আর কোনো প্রয়োজন আছে কি?[১]

চার
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে নিয়ে একটি কূপের নিকট আসেন। মানুষ সেখান থেকে পানি উঠিয়ে পান করছিল। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকও পানি পান করার জন্য কূপের নিকটে যান; কিন্তু লোকেরা তাকে চিনতে না পারায় তার সাথেও ধাক্কাধাক্কি করে।

অতঃপর তিনি ভিড় থেকে বের হয়ে এসে বলেন, এটাই জীবন। অর্থাৎ যেখানে আমাদের কেউ চিনবে না, সেখানে আমাদের কেউ সম্মানও করবে না।

হাসান বলেন, আমরা একবার কুফায় অবস্থান করছিলাম। তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সামনে 'কিতাবুল মানাসিক' পড়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে এমন একটি হাদীস সামনে আসে যেটির শেষে লেখা ছিল—আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, 'এটিই আমাদের মত।' তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক জিজ্ঞেস করেন, 'আমার এই উক্তি কে লিখেছে?' আমি বললাম, 'এই কিতাব যার—তিনিই লিখেছেন।' আমার এ কথা শুনে তিনি পাঠদান শেষ হওয়া পর্যন্ত তার হাত দিয়ে খুঁটে খুঁটে সেই লেখাটুকু তুলতে থাকেন। সেই সঙ্গে পাঠদানও অব্যাহত রাখেন। এরপর বলেন, 'আমি এমন কে যে, আমার কথা কিতাবে লিখতে হবে?' [৩]

পাঁচ
হুসাইন ইবনুল হাসান আল-মাররুযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, নিজেকে সবসময় সুনাম-সুখ্যাতির আড়ালে রাখার চেষ্টা করবে। সেই সঙ্গে তুমি যে সুনাম-সুখ্যাতি পছন্দ করো না—সেটা বলে বেড়ানো থেকে বিরত থাকবে। নিশ্চয় যে নিজেকে 'যাহিদ[১]' বলে দাবি করে, সে 'যুহদ'-এর চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে যায়। কেননা, 'যাহিদ' বলে বেড়ানোর অর্থই হলো মানুষের প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য কামনা করা![২]

ছয়
ইবনু মুহাইরিয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি ফুযালা ইবনু উবাইদকে বললাম, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, কিছু গুণ আছে, সেগুলো অর্জন করতে পারলে আল্লাহ এর দ্বারা তোমাকে উপকৃত করবেন। (১) সম্ভব হলে এমনভাবে থাকার চেষ্টা করবে যে, তুমি মানুষকে চিনবে; কিন্তু মানুষ তোমাকে চিনবে না। (২) তুমি শুধু শুনবে, কিছু বলবে না। (৩) তুমি অন্যের মজলিসে বসবে, কিন্তু তোমার মজলিসে কেউ বসবে না।[৩]

সাত
জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি আবু আব্দিল্লাহ[]-এর চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ দেখতে পাই। কারণ, জিজ্ঞেস করলে জানা যায়, কেউ একজন তাঁর প্রশংসা করে বলেছিল, আল্লাহ তাআলা ইসলামের পক্ষ থেকে আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন'। তার এই দুআর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বরং আল্লাহ তাআলা আমার পক্ষ থেকে ইসলামকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আমি এমন কে যে, মহান আল্লাহ আমাকে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রতিদান দেবেন।[১]

আট
মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মসজিদে নববীতে একটি খুঁটি ছিল। আমি রাতের বেলা খুঁটিটির পাশে সালাত পড়তাম। তাতে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতাম। একবারের ঘটনা, মদীনায় সে-বছর মারাত্মক খরা দেখা দেয়। বৃষ্টির জন্য খোলা মাঠে এসে মানুষ প্রার্থনা করে; কিন্তু বৃষ্টি নামে না। এরপর সেই রাতে আমি ইশার সালাত আদায় করে মসজিদে নববীর ওই খুঁটির নিকট এসে হেলান দিয়ে বসি। এমন সময় একলোক আসেন। দেখতে কালো। একটা হলদে রঙের চাদর জড়ানো। ছোট একটা কাপড় তার কাঁধে চাপানো। সে আমার এবং আমার সামনে থাকা খুঁটির মাঝে এসে দাঁড়ায় এবং আমাকে পেছনে ফেলে দুই রাকাত সালাত আদায় করে। এরপর ওপরের দিকে দু'হাত তুলে কায়মনোবাক্যে বলে-
হে আমার প্রভু, আজ তোমার নবীর সম্মানিত শহরের মানুষেরা ময়দানে নেমেছিল, বৃষ্টি প্রার্থনা করেছিল; কিন্তু তুমি বৃষ্টি বর্ষণ করোনি। আমি তোমাকে দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি তাদের ওপর অবশ্যই বৃষ্টি বর্ষণ করো!

ইবনুল মুনকাদির বলেন, আমি মনে মনে বললাম, লোকটা পাগল নাকি! অতঃপর সে হাত নামাতেই আকাশে মেঘের গর্জন শুনতে পেলাম। আর এমন মুষলধারে বর্ষণ হলো যে, বাড়িতে পরিবারের লোকদের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।

এদিকে লোকটা বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে পেয়ে আল্লাহ তাআলার প্রশংসায় এমন কিছু বাক্য বলে-যা আমি ইতিপূর্বে কখনও শুনিনি। এরপর সে বলে, হে আমার রব, আমি এমন কে যে, আমার আহ্বানে সাড়া দিলে? কিন্তু হ্যাঁ, আমি কেবল তোমার প্রশংসা করেছি এবং তোমারই আশ্রয় চেয়েছি।

অতঃপর সে উঠে দাঁড়ায়। যে-কাপড়টা সে লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করেছিল সেটাকে খুলে গোটা শরীরে জড়িয়ে নেয় এবং তার পিঠে ঝুলে থাকা কাপড়টা বিছিয়ে তার ওপর সালাত পড়তে শুরু করে। এভাবে ফজরের আগ পর্যন্ত সালাত পড়তে থাকে।
সুবহে সাদিকের আগ দিয়ে বিতরের সালাত পড়ে।

এরপর ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করে এবং সবশেষে সাধারণ মানুষের সাথে সাথে ফজরের জামাআতে অংশগ্রহণ করে। তার সাথে আমিও জামাআতে অংশগ্রহণ করি।

ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর সে উঠে বেরিয়ে যায়। আমিও তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকি। একপর্যায়ে সে মসজিদের গেইট পর্যন্ত চলে আসে এবং কাপড় কিছুটা ওপরে উঠিয়ে পানির ওপর দিয়ে চলতে থাকে। আমিও তার মতো চলতে থাকি; কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে কোথায় যেন হারিয়ে যায়; তাকে আর খুঁজে পাই না।

দ্বিতীয় রাতে মসজিদে নববীতে ইশার সালাত আদায় করে ওই খুঁটির পাশে এসে বসি। খুঁটিটিকে বালিশের মতো ব্যবহার করে শুই। এ সময় লোকটি আবার আগমন করে। যে-কাপড়টা সে লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করছিল সেটাকে ভালো করে গোটা শরীরে জড়িয়ে নেয়। আর কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা কাপড়টা বিছিয়ে তার ওপর সালাত পড়তে শুরু করে। এভাবে ফজরের আগ পর্যন্ত সালাত আদায় করতে থাকে। এরপর বিতরের সালাতের পর ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করে। সবশেষে মানুষের সাথে সাথে ফজরের জামাআতে অংশগ্রহণ করে। তার সাথে আমিও জামাআতে অংশগ্রহণ করি।

ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর সে উঠে বেরিয়ে যায়। আমিও তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকি। একপর্যায়ে সে একটি ঘরে প্রবেশ করে। মদীনায় বসবাস করার দরুন আমি ঘরটি ভালো করেই চিনতাম। ঘরটি দেখে আমি মসজিদে নববীতে ফিরে আসি।

সূর্যোদয়ের পর নফল সালাত আদায় করি। তারপর সেই ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা করি। সেখানে গিয়ে দেখি, সে বসে বসে মোজা সেলাই করছে। অর্থাৎ পেশায় সে একজন মুচি। আমাকে দেখেই সে চিনে ফেলল এবং ঈষৎ হেসে বলল— 'হে আবু আব্দিল্লাহ, তোমাকে স্বাগতম! তোমার কি সেলাইযোগ্য কোনো মোজা আছে? থাকলে দিতে পারো।'

আমি তার পাশে বসতে বসতে বললাম, তুমি কি প্রথম রাতে আমার সাথে থাকা সেই ব্যক্তি নও? এ কথা শুনতে-ই তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। চিৎকার করে বলল, ওহে ইবনুল মুনকাদির! ওইটার সাথে তোমার কী সম্পর্ক? এ কথা বলে সে প্রচন্ড রেগে গেল!

অতঃপর আমি তাকে এই বলে বেরিয়ে গেলাম যে, আল্লাহর শপথ! আমি এখনই তোমার এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি!

তৃতীয় রাত। আমি এশার সালাত মসজিদে নববীতে পড়ে ওই খুঁটির নিকট এসে হেলান দিয়ে বসে আছি; কিন্তু আজ আর ওই লোকটি এলো না। আমি মনে মনে বললাম, ইন্না লিল্লাহ! আমি কোনো সমস্যা করে ফেলিনি তো? সকালবেলা তার ঘরে গিয়ে দেখলাম, ঘরের দরজা খোলা এবং ঘর একেবারেই খালি। সেখানে মানুষ তো দূরের কথা; কোনো তৈজসপত্রও নেই।

ঘরের মালিক আমাকে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ, গতকাল তোমার এবং তার মাঝে কী হয়েছিল? আমি বললাম, কেন? কী হয়েছে তার? সে বলল, তুমি চলে যাওয়ার পর সে ঘরে ঢোকে তার চাদরটি মেঝেতে বিছায়। এরপর চামড়া, জুতা, মোজা এবং সেলাইয়ের যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু সেখানে রাখে। অতঃপর চাদরটি পেঁচিয়ে পিঠে করে নিয়ে চলে যায়। জানি না, সে কোথায় গেছে!

মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির বলেন, মদীনার এমন কোনো ঘর নেই—যেটাতে আমি তার অনুসন্ধান করিনি; কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পাইনি। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন![১]

টিকাঃ
[১] বিপদের কারণ/পরীক্ষার বস্তু।
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৬
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৬, ৪০৭
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৪৩
[২] তিনি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের ছাত্র। সাহান ইবনু রবী'আ, সাহান ইবনু আরাফা, হাসান ইবনু ঈসা, এদের কোনো একজন হবেন। দেখুন—সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৩৮০
[৩] সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৬ ৪/১৩৫
[১] মোহবিমুখ
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৩৭
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১১৬
[৪] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/২২৫
[১] সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৯০-১৯২

📘 সালাফদের জীবনকথা > 📄 আত্মমুখ্যতার প্রতি সালাফগণের অনীহা

📄 আত্মমুখ্যতার প্রতি সালাফগণের অনীহা


এক
সাবিত আল-বুনানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত-আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে লোকসকল, আমি কুরাইশ গোত্রের লোক। সাদা-কালো নির্বিশেষে সকল রঙের মানুষই খোদাভীতির ক্ষেত্রে আমার চেয়ে অগ্রগামী! আমি তো কেবল খোদাভীরুদের বেশ-ভূষা ধারণ করি।[১]

দুই
মা'মার রাহিমাল্লাহ আইয়ুব, নাফি কিংবা অন্য কারও থেকে বর্ণনা করেন-একদা জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে 'হে সর্বোত্তম মানুষ' কিংবা 'হে সর্বোত্তম মানুষের সন্তান!' বলে সম্বোধন করে। প্রতিউত্তরে ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি সর্বোত্তম মানুষ নই এবং সর্বোত্তম মানুষের সন্তানও নই; বরং আমি আল্লাহর এক নগণ্য বান্দা। আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং তার প্রতি আশা রাখি। আল্লাহর শপথ! তোমরা যার পিছু নাও, তাকে ধ্বংস করেই ছাড়ো।[২]

তিন
জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণিত, মুতররিফ ইবনু আব্দিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সারারাত ইবাদত করে সকালে আত্মগর্ব করার চেয়ে সারারাত ঘুমে কাটিয়ে সকালে অনুতপ্ত হওয়া আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।

ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর শপথ! ওই ব্যক্তি কখনও সফলকাম হবে না, যে নিজেকে সর্বোত্তম জ্ঞান করে কিংবা নিজের ইবাদত নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগে।[১]

চার
ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা আমার পক্ষ থেকে তিনটি বিষয়ের ওপর আমলের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখো—

(১) প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকো। (২) অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো। (৩) আত্মমুগ্ধ হওয়া থেকে বিরত থাকো।[২]

পাঁচ
আবু ওয়াহাব আল-মারওয়াযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, অহংকার কী?

তিনি বললেন, মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আত্মগর্ব কী?

তিনি বললেন, 'কোনো ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করা যে, এটা শুধু তোমারই আছে, অন্য কারও নেই।' এরপর বললেন, 'সালাত আদায়কারীদের মধ্যে নিজের আমলের প্রতি মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে মন্দ আর কিছু আমি দেখিনি।'[৩]

ছয়
আহমাদ ইবনু আবিল হাওয়ারী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু আব্দিল্লাহ আনতাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও ইমাম ফুযাইল রাহিমাহুমাল্লাহ কোথাও মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করছিলেন। একপর্যায়ে সুফিয়ান আস-সাওরীর মন গলে যায়। তিনি কাঁদতে থাকেন। এরপর বলেন, আশা করি আজকের এই মজলিস আমাদের জন্য রহমত ও বরকত বয়ে আনবে। তখন ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর বান্দা, কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, না-জানি, এ মজলিস আমাদের জন্য উপকারী হওয়ার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়! তুমি যা ভালো মনে করেছ, তা-ই বলেছ, আমিও যা ভালো মনে করেছি, তাই বলেছি। এতে কি তুমি আমার নিকট নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করোনি? আর আমিও কি তোমার কাছে নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করিনি?

এ কথা শুনে সুফিয়ান আস-সাওরী আবার কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তুমি আমাকে সতর্ক করে (ধ্বংসের হাত থেকে) বাঁচিয়েছ। আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন।[১]
সাত
ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি তুমি তোমার আমলের ব্যাপারে গর্বের আশঙ্কা করো, তাহলে ভাবো-

■ যার সন্তুষ্টি কামনা করছ, তিনি কি সাধারণ কেউ?

■ যে নিয়ামতের আশা করছ, তা কি সহজলভ্য?

■ যে ভয়াবহ শাস্তির ভয় করছ, তা স্বাভাবিক কিছু?

যে এসব নিয়ে চিন্তা করবে, তার কাছে তার আমলগুলো খুবই নগণ্য মনে হবে।[২]

আট
রিশদীন ইবনু সাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাজ্জাজ ইবনু শাদ্দাদ থেকে বর্ণিত, তিনি খ্যাতনামা বিদ্বান উবাইদুল্লাহ ইবনু আবি জাফরকে বলতে শুনেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো মজলিসে কথা বলে এবং কথাগুলো তাকে চমৎকৃত করে তাহলে সে যেন তৎক্ষণাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং যখন চুপ থাকতে ইচ্ছে করে তখন যেন আবার কথা বলা শুরু করে। [১]

নয়
সাঈদ ইবনু আব্দির রহমান রাহিমাহুল্লাহ আবু হাযিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন-তিনি বলেন, বান্দা যদি কোনো উত্তম আমল করার পর আত্মগর্ব অনুভব করে তাহলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য এরচেয়ে ক্ষতিকর কোনো আমলই তৈরি করেননি! অপরদিকে বান্দা যদি কোনো গুনাহ করার পর অন্তর্জ্বালার শিকার হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য এরচেয়ে উপকারী ও কল্যাণকর কোনো কাজই সৃষ্টি করেননি।

কেননা, মানুষ যখন ভালো ও পুণ্যের কাজ করে তখন হয়তো সে তা নিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করে অথবা নিজেকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে। এতে আল্লাহ তাআলা তার বর্তমান ভালো কাজটির সাথে সাথে অতীতের ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেন।

অপরদিকে যদি কোনো ব্যক্তি মন্দ কাজ করার পর তার মধ্যে অনুশোচনা জাগে তাহলে হতে পারে, আল্লাহ তাআলা এই কাজের কারণে তার মধ্যে অনুতাপ ও অনুশোচনার স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে দেবেন। পরিশেষে সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে, সেই অনুতাপ ও অনুশোচনা তার হৃদয়ে আগের মতোই রয়ে যাবে। (এবং তার অসিলায় সে মুক্তি পেয়ে যাবে!)[২]

দশ
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহর জীবনী আলোচনার একপর্যায়ে তার একটি উক্তি উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেছেন- 'আমি সত্যের অনুসরণ করি। নিজেই ইজতিহাদ করে চলি। কোনো এক মাযহাবের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকি না।'

ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, কেউ যদি ইজতিহাদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমাম তার এই যোগ্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন, তাহলে এমন ব্যক্তির জন্য তাকলীদ তথা কোনো মাযহাব অনুসরণের সুযোগ নেই।

পক্ষান্তরে যাদের এই পর্যায়ের ইজতিহাদী যোগ্যতা নেই; বরং কেবল ফিকহের কোনো কিতাব মুখস্থ করেছে কিংবা সমগ্র কুরআন অথবা তার কিয়দাংশ হিফয করেছে তাদের জন্য তো কখনই ইজতিহাদ করার অনুমতি নেই। সে কীভাবে ইজতিহাদ করবে? কী সমাধান দেবে? কীসের ভিত্তিতে দেবে? যার পাখাই গজায়নি, সে কী করে আকাশে উড়বে?

অবশ্য যে-ফকীহর সতর্কতা, বিচক্ষণতা, বোধগম্যতা, খোদাভীতি এবং হাদীসের জ্ঞান সর্বজন স্বীকৃত; সেই সঙ্গে শাখাগত মাসআলার সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ এবং হাদীস ও ফিকহের মূলনীতি বিষয়ক কিতাবগুলো যার মুখস্থ, পাশাপাশি হিফযুল করআন, তাফসীর ও তর্কশাস্ত্রেও যে সমান পারঙ্গম; সর্বোপরি আরবীভাষা সম্পর্কেও যে সম্যক অবগত তার জন্য 'ইজতিহাদুল মুকায়্যাদ' তথা নির্ধারিত পরিমণ্ডলে ইজতিহাদ করার অনুমতি রয়েছে। তিনি ইমামগণের দলিল সম্পর্কে গবেষণা করার যোগ্যতা রাখেন। যখন কোনো মাসআলায় তার নিকট সত্য উন্মোচিত হবে এবং এর ওপর কুরআন-সুন্নাহর কোনো দলিল থাকবে, পাশাপাশি প্রসিদ্ধ কোনো ইমামের আমলও পাওয়া যাবে। তখন তিনি তার নিকট উন্মোচিত ওই সত্যটারই অনুসরণ করবে। রুখসত বা ছাড়ের পথে হাঁটবেন না। সদা সতর্ক থাকবেন। এভাবে কোনো মাসআলার ওপর দলিল পাওয়া গেলে তার জন্য তাকলীদের কোনো সুযোগ নেই।

তবে যদি এই নব উদ্ভাবিত সত্য প্রকাশ করলে অন্যান্য ফকীহ ও মুফতীগণের পক্ষ থেকে গোলযোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে কিংবা সমাজে ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে তা গোপন রাখতে হবে। কোনোভাবেই তার আমল প্রকাশ করা যাবে না। কেননা, কখনও এর কারণে নিজের মনে গর্ববোধ জেগে উঠতে পারে এবং তা প্রকাশ করা নিজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

এমনটা হলে অবশ্যই একদিন তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, তখন ওই সত্যটার মাঝে অন্তরের একটি অনৈতিক চাহিদা ঢুকে পড়ে। এমন কত মানুষ আছে, যারা সত্য কথা বলে, সৎ কাজের আদেশ করে, এরপরও আল্লাহ তাআলা ফকীহগণকে দিয়ে তাদের দাবিয়ে রাখেন।

অনেক সময় অর্থদাতা, ভূমিদাতা ও সমাজ সেবকদের মধ্যে এই আত্মগর্ব সংক্রমক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সৈনিক, মুজাহিদ ও শাসকশ্রেণিও এই ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারে না। ফলে দেখা যায়, তারা শত্রুদের মুখোমুখি হচ্ছে, অথচ তাদের অন্তরে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন কল্পনাবিলাস ও সুপ্ত বাসনা। যেমন, বীরত্ব প্রকাশ করা, অহমিকা প্রদর্শন করা, স্বর্ণখচিত শিরস্ত্রাণ, পোশাক, অশ্ব ও যুদ্ধাস্ত্রে সুসজ্জিত হওয়া। এর সাথে আবার যোগ হয় সালাত পরিহার করার মন্দ প্রবণতা, শাসিতের প্রতি জুলুম ও মদ্যপানের হীন মানসিকতা। সুতরাং, কোত্থেকে তারা আল্লাহর সাহায্য পাবে? আর কেনই-বা তারা অপদস্থ ও পরাজিত হবে না!

হে আল্লাহ, আপনি আপনার দ্বীনকে সাহায্য করুন। আপনার বান্দাদের দ্বীনের কাজ করার সামর্থ্য দিন।

যে-ব্যক্তি আমলের উদ্দেশ্যে ইলম অন্বেষণ করে, ইলম তার হৃদয়-ভূমিকে কোমল করে। সে তার নিজের কথা ভেবে ক্রন্দন করে। পক্ষান্তরে যে-ব্যক্তি মুদাররিস বা মুফতি হওয়ার উদ্দেশ্যে কিংবা দাম্ভিকতা প্রদর্শন ও অন্যকে হেয় করার মানসিকতা নিয়ে ইলম শেখে-সে নিজেই নিজেকে ধোঁকা দেয়, প্রতারিত করে এবং মানুষের সামনে নিজেকে ছোট করে। এই আত্মঅহমিকা তাকে ধ্বংস করে ছাড়ে এবং মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسُهَا

ওই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে তার আত্মা পবিত্র করেছে। আর ওই ব্যক্তি ব্যর্থ হয়েছে যে তার আত্মা কলুষিত করেছে।[১]

এখানে কলুষিত করার অর্থ হচ্ছে—আত্মাকে পাপাচার ও অবাধ্যতায় লিপ্ত রাখা।[২]

টিকাঃ
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৮১
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৬
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/১৯০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৪৪৯
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৮/৪০৭
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৩৯
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১০/৪২
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/১০
[২] সিফাতুস সাফওয়া: ২/১৬৪
[১] যেমন, ইমাম আবু হানীফা, মালিক, আস-সাওরী, আওযায়ী, শাফিয়ী, আবু উবাইদ, আহমাদ বা ইসহাক রাহিমাহুমুল্লাহ।
[১] সূরা শামস, আয়াত: ৯ ও ১০
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৮/১৯১-১৯২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00