📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 লেখকের জীবনী

📄 লেখকের জীবনী


আল্লাহ তাআলা প্রতি শতাব্দীতেই এমন কিছু আলেমকে দুনিয়ার বুকে পাঠান যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর রক্ত-ঘামের বিনিময়ে ইসলাম নামক বটবৃক্ষ সতেজ ও সজীব থাকে। তারা নিরলস ছায়া দিয়ে যেতে থাকেন মানবসভ্যতাকে। নুয়ে পড়া মুসলিম জাতিকে তারা দান করেন নবচেতনা। সমাজের রগ-রেশায় তৈরি হওয়া কুপ্রথা আর কুসংস্কারকে তারা করেন বিদূরিত। ইলমের ময়দানকে করেন সঞ্জীবিত। হিজরী অষ্টম শতাব্দীতে আগমন করা এমনই একজন জগৎখ্যাত মনীষী আলেম হলেন ইবনে রজব হাম্বলী।
তাঁর নাম ও উপাধি
তাঁর পুরো নাম যাইনুদ্দীন আবদুর রহমান বিন আহমাদ বিন রজব বিন আলহুসাইন বিন মুহাম্মাদ বিন আবিল বারাকাত মাসউদ আসসুলামী আলবাগদাদী আদ্দিমাশকী আলহাম্বলী। তবে ইবনে রজব হাম্বলী উপাধিতেই তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর রচিত বই-পুস্তকে এবং তাকে নিয়ে লেখা অন্যদের লেখাতেও তিনি এই নামেই প্রসিদ্ধি পেয়েছেন।
জন্ম ও শিক্ষাদীক্ষা
৭৩৬ হিজরী মোতাবেক ১৩৩৫ ঈসায়ী সনে তিনি ইরাকের বাগদাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, ইসলামী শাস্ত্রের বিশিষ্ট বিদ্বান। বিশেষ করে হাদীসশাস্ত্রের। তার বাবাও বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বহু আলেমের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
ইবনে রজব এর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাঁর পরিবার দামেস্কে স্থানান্তরিত হয়। তখন তিনি জেরুসালেম সফর করেন এবং সেখানে আল-আলাঈ এর কাছে জ্ঞানার্জন করেন। এরপর তিনি বাগদাদে যান এবং সেখান থেকে মক্কা গমন করেন। মক্কায় তাঁর পিতা তাঁর শিক্ষার জন্য সুব্যবস্থা করে রাখেন। এরপর তিনি মিশর সফর করেন এবং এরপর আবার দামেস্কে ফিরে যান। সেখানে তিনি ছাত্রদের শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি ইবনুন নাকীব (মৃত্যু: ৭৬৯ হিজরী), আস সুবকী, আল ইরাকী (৮০৬ হিজরী), মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল খাব্বাজ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদ্বানের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি যুগবিখ্যাত আলেমে দ্বীন ইবনু কায়্যিমিল জাওযিয়্যাহ রহ. এর কাছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী ছিলেন ইলমপিপাসু মানুষ। যেখানেই ইলমের ঘ্রাণ পেয়েছেন ছুটে গিয়েছেন। ফলে তাঁর শিক্ষকবৃন্দের তালিকাটাও বেশ লম্বা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
→ আবুল আব্বাস আহমাদ। যিনি ইবনু কাযিল জাবাল নামে প্রসিদ্ধ। (৬৯৩-৭৭১ হি.) দামেস্কের সফরে তিনি তাঁর থেকে জ্ঞানার্জন করেন।
→ আহমাদ বিন আলী বিন মুহাম্মাদ বাগদাদী (৭০৭-৭৫০ হি.)
→ সফিউদ্দিন আবু আবদুল্লাহ (৭১২-৭৪৯ হি.) বাগদাদে অবস্থানকালে তিনি তাঁর কাছে হাদীস পড়েন।
→ আল্লামা আলাঈ (৬৯৪-৭৬১হি.)। ফিলিস্তিনের কুদসে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ ইযযুদ্দীন আবদুল আযীয বিন মুহাম্মাদ (৬৭১-৭৪০ হি.) মিশরে ও মক্কায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়।
→ সিরাজুদ্দীন আবু হাফস (৬৮৩-৭৫০ হি.)। তিনি ইরাকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। বাগদাদ শহরে তাঁর থেকে তিনি ইলমে হাদীস অর্জন করেন।
→ ইবনুল খাব্বায (৬৭৭-৭৫৪ হি.)। দামেস্কে তিনি তাঁর হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল (৬৭৪-৭৫৬ হি.)। তিনি ইবনুল মুলুক উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। মিশরে তাঁর থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ ইবনু কাইয়্যিমিল জাওযিইয়্যাহ (৬৯১-৭৫১ হি.)। দামেস্কে তাঁর সান্নিধ্য তিনি গ্রহণ করেন এবং এক বছরেরও বেশি সময় তাঁর সাথে থাকেন।
→ ইবুল হারাম কালানিসী (৬৮৩-৭৬৫ হি.)। মিশরের কায়রোতে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী নিজে ইলম অর্জন করার পাশাপাশি ইলম বিতরণেও অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। দরসপ্রদান এবং লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর ইলমকে ছড়িয়ে দিয়েছেন চারপাশে। নিম্নে তাঁর কিছু ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলো।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (৭৬৫-৮৪৪ হি.)। তিনি মিশরের মুফতী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
→ যাইনুদ্দীন আবু যর (৭৫৮-৮৪৬ হি.)। তিনি আল্লামা যারকাশী নামে প্রসিদ্ধ। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (জন্ম: ৭৬৫ হি.)। তিনি বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আলমাকদেসী (৭৭১-৮৫৫ হি.)। তিনি মক্কার বিচারক পদে কর্মরত ছিলেন।
→ ইযযুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বাহাউদ্দীন আলী আলমাকদেসী (৭৬৪-৮২০ হি.)।
তাঁর রচনাবলি
ইবনে রজব হাম্বলী জীবদ্দশায় প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার অনেকগুলো আজও সমান জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত। তাঁর রচিত কিছু বইপত্রের নাম উল্লেখ করা হলো:
→ ফাতহুল বারী শরহুল বুখারী। এটি বুখারী শরীফের একটি ভাষ্যগ্রন্থ। তিনি পূর্ণাঙ্গরূপে এটি রচনা করতে পারেননি। জানাযার অধ্যায় পর্যন্ত লেখার পর তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।
→ শরহু ইলালিত তিরমিজী। এটি ইমাম তিরমিজী রচিত কিতাবুল ইলালের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। যা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য।
→ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম। এটি ইমাম নববী রহ. কর্তৃক রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আলআরবাঈন এর একটি বৃহৎ ব্যাখ্যাগ্রন্থ। আজ পর্যন্ত চল্লিশ হাদীছের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসাবে এটি সমাদৃত হয়ে আসছে।
→ আলইস্তিখরাজ ফী আহকামিল খারাজ
→ আররদ্দু আলা মানিত্তাবা গাইরাল মাযাহিবিল আরবাআহ। যারা মাযহাব মানতে চায় না তাদের বিপক্ষে লিখিত। মাযহাব বিরোধিতার খণ্ডন নামে এটি বাংলা ভাষায় সম্প্রতি অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
→ লাতাইফুল মাআরিফ। এটি মূলত বারো মাসের আমল নিয়ে রচিত একটি চমৎকার গ্রন্থ। আমাদের দেশের বারো চান্দের ফজিলত এর সুন্দর বিকল্প হতে পারে এই বইটির অনুবাদ। এতে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বারো মাসের আমলগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
→ তাফসীরু সূরাতিল ইখলাস
→ তাফসীরু সূরাতিল ফালাক
→ তাফসীরু সূরাতিন নাসর
→ আহওয়ালুল কুবুর।
→ আততাখওয়ীফ মিনান্নার
→ আলফারকু বাইনান নাসীহাতি ওয়াত্তা'বীর
→ ফাদাইলুশ শাম
→ সীরাতু আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আযীয
→ রিসালাহ ফী শুআবিল ঈমান
→ যাম্মু কসওয়াতিল ক্বলব
→ সিফাতুন্নার ওয়া সিফাতুল জান্নাহ
→ যামুল খমার
→ মানাফিউল ইমাম আহমাদ
→ ফাইদাতু ইবনি রজব হাওলা হাদীসিন নুযুল।
এ ছাড়াও তিনি ছোট-বড় প্রচুর পুস্তিকা রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্য হতে ফাদলু ইলমিস সালাফ আলা ইলমিল খালাফ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি পুস্তিকা। যার অনুবাদই হলো আমাদের এই বইটি।
তাঁর ব্যাপারে মনীষীদের মন্তব্য
ইবনে কাযী শুহবাহ ইবনে রজব এর ব্যাপারে বলেন, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি একজন অদ্বিতীয় হাম্বলী ফকীহ হিসাবে প্রতিতি হওয়ার আগ পর্যন্ত হাম্বলী ফিকহের ওপর নিবি মনে বহু সময় দেন। হাদীসশাস্ত্রের বিভিন্ন অপূর্ণতা পূরণ করার জন্য ও জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেকে অনুগত করে নিয়েছিলেন। তিনি লেখালেখির জন্য নির্জনতাকে বেছে নিয়েছিলেন।
হাফিয ইবনে হাজার আল-আসকালানী রহ. তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি খুব উঁচু পর্যায়ের হাদীস শাস্ত্রবিদ ছিলেন। উসুলুল হাদীস, রিজালশাস্ত্র, হাদীসের সনদ-মতন এবং হাদীসের অর্থ ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে পারদর্শী ছিলেন।
ইমাম আবু মুফলিহ আল-হাম্বলী তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি ছিলেন শাইখ, অন্যতম শ্রে বিদ্বান, হাফিয এবং এমন একজন যিনি পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ। তিনি হাম্বলী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ রচনা করেছেন।
হাফেজ আবুল ফজল তাকিউদ্দীন ইবনে ফাহাদ মক্কী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি হাদীসের হাফেজ ও ইমাম, শ্রে ফকীহ, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ আলেমদের একজন, ইবাদাতগুযার ইমামদের অন্যতম, মুহাদ্দিসদের শিক্ষক এবং মুসলিমদের খতীব।
শিহাব ইবনে হাজ্জী তাঁর সম্পর্কে বলেন, তিনি হাদীসশাস্ত্রের অসাধারণ সমালোচক ও গবেষক ছিলেন। সমসাময়িকদের মাঝে হাদীসের সনদ এবং সনদের বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক পারদর্শী ছিলেন। আমাদের সমসাময়িক অধিকাংশ হাম্বলী আলেম তাঁর ছাত্র ছিলেন।
মৃত্যু
ইবনে রজব রহ. ৭৯৫ হিজরি সনের চতুর্থ রমযানের পবিত্র এক রাতে (১৩৯৩ ঈসায়ী) মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। মৃত্যুর পর দিন তাঁর জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং বাবুস সাগীর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

আল্লাহ তাআলা প্রতি শতাব্দীতেই এমন কিছু আলেমকে দুনিয়ার বুকে পাঠান যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর রক্ত-ঘামের বিনিময়ে ইসলাম নামক বটবৃক্ষ সতেজ ও সজীব থাকে। তারা নিরলস ছায়া দিয়ে যেতে থাকেন মানবসভ্যতাকে। নুয়ে পড়া মুসলিম জাতিকে তারা দান করেন নবচেতনা। সমাজের রগ-রেশায় তৈরি হওয়া কুপ্রথা আর কুসংস্কারকে তারা করেন বিদূরিত। ইলমের ময়দানকে করেন সঞ্জীবিত। হিজরী অষ্টম শতাব্দীতে আগমন করা এমনই একজন জগৎখ্যাত মনীষী আলেম হলেন ইবনে রজব হাম্বলী।
তাঁর নাম ও উপাধি
তাঁর পুরো নাম যাইনুদ্দীন আবদুর রহমান বিন আহমাদ বিন রজব বিন আলহুসাইন বিন মুহাম্মাদ বিন আবিল বারাকাত মাসউদ আসসুলামী আলবাগদাদী আদ্দিমাশকী আলহাম্বলী। তবে ইবনে রজব হাম্বলী উপাধিতেই তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর রচিত বই-পুস্তকে এবং তাকে নিয়ে লেখা অন্যদের লেখাতেও তিনি এই নামেই প্রসিদ্ধি পেয়েছেন।
জন্ম ও শিক্ষাদীক্ষা
৭৩৬ হিজরী মোতাবেক ১৩৩৫ ঈসায়ী সনে তিনি ইরাকের বাগদাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, ইসলামী শাস্ত্রের বিশিষ্ট বিদ্বান। বিশেষ করে হাদীসশাস্ত্রের। তার বাবাও বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বহু আলেমের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
ইবনে রজব এর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাঁর পরিবার দামেস্কে স্থানান্তরিত হয়। তখন তিনি জেরুসালেম সফর করেন এবং সেখানে আল-আলাঈ এর কাছে জ্ঞানার্জন করেন। এরপর তিনি বাগদাদে যান এবং সেখান থেকে মক্কা গমন করেন। মক্কায় তাঁর পিতা তাঁর শিক্ষার জন্য সুব্যবস্থা করে রাখেন। এরপর তিনি মিশর সফর করেন এবং এরপর আবার দামেস্কে ফিরে যান। সেখানে তিনি ছাত্রদের শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি ইবনুন নাকীব (মৃত্যু: ৭৬৯ হিজরী), আস সুবকী, আল ইরাকী (৮০৬ হিজরী), মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল খাব্বাজ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদ্বানের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি যুগবিখ্যাত আলেমে দ্বীন ইবনু কায়্যিমিল জাওযিয়্যাহ রহ. এর কাছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী ছিলেন ইলমপিপাসু মানুষ। যেখানেই ইলমের ঘ্রাণ পেয়েছেন ছুটে গিয়েছেন। ফলে তাঁর শিক্ষকবৃন্দের তালিকাটাও বেশ লম্বা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
→ আবুল আব্বাস আহমাদ। যিনি ইবনু কাযিল জাবাল নামে প্রসিদ্ধ। (৬৯৩-৭৭১ হি.) দামেস্কের সফরে তিনি তাঁর থেকে জ্ঞানার্জন করেন।
→ আহমাদ বিন আলী বিন মুহাম্মাদ বাগদাদী (৭০৭-৭৫০ হি.)
→ সফিউদ্দিন আবু আবদুল্লাহ (৭১২-৭৪৯ হি.) বাগদাদে অবস্থানকালে তিনি তাঁর কাছে হাদীস পড়েন।
→ আল্লামা আলাঈ (৬৯৪-৭৬১হি.)। ফিলিস্তিনের কুদসে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ ইযযুদ্দীন আবদুল আযীয বিন মুহাম্মাদ (৬৭১-৭৪০ হি.) মিশরে ও মক্কায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়।
→ সিরাজুদ্দীন আবু হাফস (৬৮৩-৭৫০ হি.)। তিনি ইরাকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। বাগদাদ শহরে তাঁর থেকে তিনি ইলমে হাদীস অর্জন করেন।
→ ইবনুল খাব্বায (৬৭৭-৭৫৪ হি.)। দামেস্কে তিনি তাঁর হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল (৬৭৪-৭৫৬ হি.)। তিনি ইবনুল মুলুক উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। মিশরে তাঁর থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ ইবনু কাইয়্যিমিল জাওযিইয়্যাহ (৬৯১-৭৫১ হি.)। দামেস্কে তাঁর সান্নিধ্য তিনি গ্রহণ করেন এবং এক বছরেরও বেশি সময় তাঁর সাথে থাকেন।
→ ইবুল হারাম কালানিসী (৬৮৩-৭৬৫ হি.)। মিশরের কায়রোতে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী নিজে ইলম অর্জন করার পাশাপাশি ইলম বিতরণেও অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। দরসপ্রদান এবং লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর ইলমকে ছড়িয়ে দিয়েছেন চারপাশে। নিম্নে তাঁর কিছু ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলো।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (৭৬৫-৮৪৪ হি.)। তিনি মিশরের মুফতী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
→ যাইনুদ্দীন আবু যর (৭৫৮-৮৪৬ হি.)। তিনি আল্লামা যারকাশী নামে প্রসিদ্ধ। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (জন্ম: ৭৬৫ হি.)। তিনি বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আলমাকদেসী (৭৭১-৮৫৫ হি.)। তিনি মক্কার বিচারক পদে কর্মরত ছিলেন।
→ ইযযুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বাহাউদ্দীন আলী আলমাকদেসী (৭৬৪-৮২০ হি.)।
তাঁর রচনাবলি
ইবনে রজব হাম্বলী জীবদ্দশায় প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার অনেকগুলো আজও সমান জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত। তাঁর রচিত কিছু বইপত্রের নাম উল্লেখ করা হলো:
→ ফাতহুল বারী শরহুল বুখারী। এটি বুখারী শরীফের একটি ভাষ্যগ্রন্থ। তিনি পূর্ণাঙ্গরূপে এটি রচনা করতে পারেননি। জানাযার অধ্যায় পর্যন্ত লেখার পর তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।
→ শরহু ইলালিত তিরমিজী। এটি ইমাম তিরমিজী রচিত কিতাবুল ইলালের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। যা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য।
→ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম। এটি ইমাম নববী রহ. কর্তৃক রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আলআরবাঈন এর একটি বৃহৎ ব্যাখ্যাগ্রন্থ। আজ পর্যন্ত চল্লিশ হাদীছের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসাবে এটি সমাদৃত হয়ে আসছে।
→ আলইস্তিখরাজ ফী আহকামিল খারাজ
→ আররদ্দু আলা মানিত্তাবা গাইরাল মাযাহিবিল আরবাআহ। যারা মাযহাব মানতে চায় না তাদের বিপক্ষে লিখিত। মাযহাব বিরোধিতার খণ্ডন নামে এটি বাংলা ভাষায় সম্প্রতি অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
→ লাতাইফুল মাআরিফ। এটি মূলত বারো মাসের আমল নিয়ে রচিত একটি চমৎকার গ্রন্থ। আমাদের দেশের বারো চান্দের ফজিলত এর সুন্দর বিকল্প হতে পারে এই বইটির অনুবাদ। এতে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বারো মাসের আমলগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
→ তাফসীরু সূরাতিল ইখলাস
→ তাফসীরু সূরাতিল ফালাক
→ তাফসীরু সূরাতিন নাসর
→ আহওয়ালুল কুবুর।
→ আততাখওয়ীফ মিনান্নার
→ আলফারকু বাইনান নাসীহাতি ওয়াত্তা'বীর
→ ফাদাইলুশ শাম
→ সীরাতু আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আযীয
→ রিসালাহ ফী শুআবিল ঈমান
→ যাম্মু কসওয়াতিল ক্বলব
→ সিফাতুন্নার ওয়া সিফাতুল জান্নাহ
→ যামুল খমার
→ মানাফিউল ইমাম আহমাদ
→ ফাইদাতু ইবনি রজব হাওলা হাদীসিন নুযুল।
এ ছাড়াও তিনি ছোট-বড় প্রচুর পুস্তিকা রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্য হতে ফাদলু ইলমিস সালাফ আলা ইলমিল খালাফ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি পুস্তিকা। যার অনুবাদই হলো আমাদের এই বইটি।
তাঁর ব্যাপারে মনীষীদের মন্তব্য
ইবনে কাযী শুহবাহ ইবনে রজব এর ব্যাপারে বলেন, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি একজন অদ্বিতীয় হাম্বলী ফকীহ হিসাবে প্রতিতি হওয়ার আগ পর্যন্ত হাম্বলী ফিকহের ওপর নিবি মনে বহু সময় দেন। হাদীসশাস্ত্রের বিভিন্ন অপূর্ণতা পূরণ করার জন্য ও জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেকে অনুগত করে নিয়েছিলেন। তিনি লেখালেখির জন্য নির্জনতাকে বেছে নিয়েছিলেন।
হাফিয ইবনে হাজার আল-আসকালানী রহ. তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি খুব উঁচু পর্যায়ের হাদীস শাস্ত্রবিদ ছিলেন। উসুলুল হাদীস, রিজালশাস্ত্র, হাদীসের সনদ-মতন এবং হাদীসের অর্থ ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে পারদর্শী ছিলেন।
ইমাম আবু মুফলিহ আল-হাম্বলী তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি ছিলেন শাইখ, অন্যতম শ্রে বিদ্বান, হাফিয এবং এমন একজন যিনি পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ। তিনি হাম্বলী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ রচনা করেছেন।
হাফেজ আবুল ফজল তাকিউদ্দীন ইবনে ফাহাদ মক্কী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি হাদীসের হাফেজ ও ইমাম, শ্রে ফকীহ, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ আলেমদের একজন, ইবাদাতগুযার ইমামদের অন্যতম, মুহাদ্দিসদের শিক্ষক এবং মুসলিমদের খতীব।
শিহাব ইবনে হাজ্জী তাঁর সম্পর্কে বলেন, তিনি হাদীসশাস্ত্রের অসাধারণ সমালোচক ও গবেষক ছিলেন। সমসাময়িকদের মাঝে হাদীসের সনদ এবং সনদের বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক পারদর্শী ছিলেন। আমাদের সমসাময়িক অধিকাংশ হাম্বলী আলেম তাঁর ছাত্র ছিলেন।
মৃত্যু
ইবনে রজব রহ. ৭৯৫ হিজরি সনের চতুর্থ রমযানের পবিত্র এক রাতে (১৩৯৩ ঈসায়ী) মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। মৃত্যুর পর দিন তাঁর জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং বাবুস সাগীর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00