📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 অনুপকারী ইলমের বিপদ

📄 অনুপকারী ইলমের বিপদ


উপকারী ইলম থেকে যে বঞ্চিত হবে সে এমন চারটি আপদে পতিত হবে, যার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তখন তার ইলমই তার বিপদের কারণ হবে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। ফলে তা তার কোনো উপকারে আসবে না। কারণ, তার অন্তরে স্বীয় রবের প্রতি কোনো ভয় নেই। তার মন দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট নয়; বরং সে লোভের বশবর্তী হয়ে আরও বেশি জিনিস কামনা করে। স্বীয় রবের আদেশ পালন না করার এবং তার অপছন্দের জিনিস থেকে দূরে না থাকার কারণে তার প্রার্থনাও কবুল করা হয় না।
এসব হলো সেই ইলমের আলোচনা যার থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব। তা হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত ইলম। আর যদি ইলম হয় অন্য কিছু থেকে অর্জিত, তবে তো সেটি সত্তাগতভাবেই অনুপকারী। এর থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। উপকারের চেয়ে বরং এর ক্ষতির দিকটাই প্রবল।
অনুপকারী ইলমের আলামত
অনুপকারী ইলমের আলামত হলো, যে এটি অর্জন করবে তার উদ্দেশ্য হবে দম্ভ-গর্ব, অহংকার-অহমিকা ও দুনিয়ার মান-মর্যাদা তলব করা। দুনিয়াবী বিষয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, উলামায়ে কেরামের সাথে বিবাদে জড়ানো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের সাথে বিতর্ক করা এবং মানুষের মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِذلِكَ فَالنَّارِ فالنار
যে ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করবে তার জন্য জাহান্নাম, জাহান্নাম।
এই ধরনের ইলমের বাহকেরা অনেক সময় আল্লাহর মারেফত লাভ ও তাকে তলব করার এবং অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হবার কথা বলে থাকেন। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে রাজা-বাদশাসহ অন্যান্য মানুষদের মনে জায়গা করে নেওয়া। তাদের অন্তরে নিজেদের ব্যাপারে সুধারণা সৃষ্টি করা। ভক্তবৃন্দের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করা। এসব বোঝার মাধ্যম হলো, ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের মতো ওলি হওয়ার প্রকাশ্য দাবি করা। যেমন কারামিতা-বাতেনী দলের লোকেরা এমন দাবি করেছিল। সালাফে সালেহীনের পথ ছিল এরচেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় নিজেদের ছোট ও তুচ্ছ মনে করতেন।
আমর বলেছেন, যে নিজেকে আলেম বলবে সে আসলে জাহেল। আর যে নিজেকে মুমিন বলবে সে মূলত কাফের। আর যে বলবে সে জান্নাতে থাকবে সে আসলে জাহান্নামে যাবে।
অনুপকারী ইলমের আরেকটি আলামত হলো, সত্যকে গ্রহণ না করা। তার প্রতি নিজেকে সঁপে না দেওয়া এবং যিনি সত্য বলছেন তার সামনে অহংকারপূর্ণ আচরণ করা। বিশেষ করে যদি তিনি হন মানুষের চোখে তার চেয়ে নিম্নমানের। এমনিভাবে মিথ্যাকে আঁকড়ে রাখা এই ভয়ে যে, সত্যকে মেনে নিলে মানুষের মনোযোগ তার থেকে সরে যাবে।
অনেক সময় এমন ব্যক্তি মানুষজনের সামনে মুখে মুখে নিজের বদনাম গায়। নিজেকে তুচ্ছ হিসাবে প্রকাশ করে। যাতে করে তার ব্যাপারে মানুষ ভাবে যে, সে তো নিজেকে অনেক ছোট মনে করে। এভাবে কৌশলে অন্যদের থেকে প্রশংসা আদায় করা হয়ে যাবে। এটা হলো এক প্রকারের সূক্ষ্ম লৌকিকতা। এই বিষয়ে তাবেয়ীনে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী উলামায়ে কেরাম সতর্ক করে গিয়েছেন।
লৌকিক বিনয়-প্রদর্শনকারী ব্যক্তির থেকে প্রশংসা বাক্য সাদরে গ্রহণ করা ও এর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করার বিষয়টিও পাওয়া যায়। যা পরিপূর্ণরূপে ইখলাস ও সততার পরিপন্থী। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে কপটতার আশঙ্কা করে। মন্দ-মৃত্যুর ভয়ে দিনাতিপাত করে। ফলে সে নিজের প্রশংসা ও সুনাম-সুখ্যাতি থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করে।
উপকারী ইলমের আলামত
এই কারণেই উপকারী ইলমের বাহক যারা তাদের আলামত হলো, তারা নিজেদের জন্য আলাদা কোনো সম্মান-প্রতিপত্তি কামনা করে না। অন্তরের অন্তস্তল থেকে প্রশংসা ও সুনামকে ঘৃণা করে। কারও ওপর অহংকারী ভাব প্রকাশ করে না। হাসান বসরী বলেছেন,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত, আখেরাতের প্রতি আসক্ত, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃসিম্পন্ন ও স্বীয় রবের ইবাদাতের ব্যাপারে যত্নবান।
তার থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় আছে,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে তারচেয়ে উন্নত ব্যক্তিকে হিংসা করে না, তারচেয়ে অনুন্নত ব্যক্তিকে বিদ্রূপ করে না, আল্লাহ তাকে যে ইলম দান করেছেন তার বিনিময় গ্রহণ করে না।
এই শেষ কথার অনুরূপ অর্থ আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন, 'আলেমের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে বিনয়ী হবার জন্য মাথায় মাটি রাখা।' এর কারণ হলো, রবের ব্যাপারে যে যত বেশি জানবে ও তার সাথে যত বেশি পরিচিত হবে ততই ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। তার প্রতি আনুগত্য ও বিনয় আরও বেশি পরিমাণে হবে।
উপকারী ইলমের আরেকটা আলামত হলো, এই ইলম তার বাহককে দুনিয়া থেকে পলায়ন করতে শেখাবে। যার সবচেয়ে উচ্চস্তর হলো, নেতৃত্ব এবং সুনাম-সুখ্যাতি। এগুলো থেকে দূরে থাকা এবং এসব জিনিস এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হলো উপকারী ইলমের আলামত। যদি কখনো অনিচ্ছায় দুনিয়াবী এসব বিষয়ে জড়িয়ে যায়, তাহলে এর বাহক শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। তার এমন অবস্থা হয়, তিনি এটাকে একটা ফাঁদ ও ছাড় বলে মনে করেন। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার সুনাম-সুখ্যাতি দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাবার ফলে নিজের ব্যাপারে এমন ভয় করতেন।
উপকারী ইলমের বাহক কখনো ইলমের দাবি করেন না এবং এ নিয়ে কারও সাথে গর্বও করেন না। অন্য কাউকে মূর্খ সাব্যস্ত করেন না। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সুন্নাহ ও আহলে সুন্নাহর বিরুদ্ধাচারণ করে তার কথা ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর জন্য রাগত স্বরে কথা বলেন। কারও ওপর নিজের বড়াই জাহের করার জন্য নয়।
উপকারী ও অনুপকারী ইলমের পার্থক্য
যে ব্যক্তির ইলম অনুপকারী, মানুষের ওপর অহংকার করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। সে তাদের ওপর নিজের ইলমের বড়ত্ব জাহির করে এবং তাদের মূর্খ সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করে। নিজেকে বড় করে প্রকাশ করার জন্য তাদের খাটো করে। এটি খুবই নোংরা ও নিম্নমানের স্বভাব। এমন লোক অনেক সময় তার পূর্বেকার উলামায়ে কেরামকে মূর্খ, অসচেতন ও ভুলেভরা সাব্যস্ত করতে চায়। ফলে আবশ্যিকভাবেই নিজেকে সে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজেকে ভালো আর পূর্ববর্তী মানুষদের খারাপ ভাবে।
কিন্তু উপকারী ইলমের বাহক উলামায়ে কেরাম ঠিক এর বিপরীত হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের মন্দ আর পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামকে ভালো মনে করেন। আন্তরিকভাবেই তাদের মর্যাদার কথা স্বীকার করেন। নিজেদের অক্ষমতা এবং তাদের স্তরে পৌঁছা বা এর কাছাকাছি যাওয়ার অসম্ভবতাকে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেন।
ইমাম আবু হানীফা কত সুন্দর উত্তর দিয়েছেন যখন তাকে আলকামা আর আসওয়াদ রাহিমাহুমাল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি মর্যাদাবান? তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'আমরা তো তাদের নাম উচ্চারণেরও যোগ্য নই। মান-নির্ণয় তো অনেক দূরের বিষয়।'
ইবনুল মুবারক সালাফদের আলোচনা করার সময় এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন,
সালাফদের কথা যখন বলো তখন আমাদের কথা বলা থেকে বিরত থাকো; কারণ, সুস্থ চলন্ত মানুষ কখনো বসে থাকা ব্যক্তির মতো নয়।
অনুপকারী ইলমধারীর ভুল ধারণা
যাদের ইলম অনুপকারী তারা যখন পূর্ববর্তী কারও ওপর নিজের কথার ও বাক্চাতুর্যের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তখন সে এটাকে আল্লাহর দরবারে নিজের ইলমের মর্যাদা ভেবে বসে থাকে। কারণ, সে তার পূর্ববর্তীদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের জিনিস লাভ করেছে। তখন সে পূর্ববর্তীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। স্বল্পজ্ঞানের কারণে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবে। কিন্তু এই বেচারা জানে না যে, সালাফদের কম কথা বলাটা আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় ও তাকওয়ার কারণে ছিল। যদি তারা বেশি কথা বলতে চাইতেন তবে তা অনায়াসে পারতেন। যেমন আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস একবার কিছু লোককে দ্বীনী বিষয়ে তর্ক করতে শুনে বললেন,
তোমরা কি জানো না যে, আল্লাহর ভয় তাঁর কিছু বান্দাকে চুপ করিয়ে রেখেছে। তারা বোবাও নয়, বধিরও নয়। তারাই হলেন প্রকৃত ইলমের অধিকারী বাগ্মী ও মহান মনীষী। তবে আল্লাহর বড়ত্বের কথা ভেবে তাদের হৃদয়-মন ভীত ও তাদের জিহ্বা নিশ্চল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম তিরমিজী সাহাবী আবু উমামা থেকে রাসূল-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْبَذَاءُ
وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النَّفَاقِ
লজ্জা ও চুপ থাকা ঈমানের দুটি অংশ। আর অশ্লীলতা ও বেশি কথা বলা মুনাফিকির দুটি অংশ।
ইমাম তিরমিজী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকেম ও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান তার হাদীসগ্রন্থ সহীহ ইবনে হিব্বানে সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
الْبَيَانُ مِنَ اللهِ وَالْعِيُّ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلَيْسَ الْبَيَانُ
كَثْرَةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنَّ الْبَيَانَ الْفَضْلُ فِي الْحَقِّ،
وَلَيْسَ الْعِيُّ قِلَّةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنْ مَنْ سفه الحق
বলতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর চুপ করে থাকা শয়তানের পক্ষ থেকে। বেশি কথা বলাকে 'বলতে পারা' হিসাবে গণ্য করা হয় না। বরং বলতে পারার মানে হলো সত্য কথায় স্পবাদিতা অবলম্বন করা। এমনিভাবে কম কথা বলার মানে চুপ থাকা নয়; বরং এর মানে হলো সত্যকে আড়াল করা।
মারাসীলে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল-কুরজিতে আছে, রাসূল বলেছেন,
ثلاث ينقص بهن العبد في الدنيا و يدرك بهن في الآخرة
ما هو أعظم من ذلك الرحم و الحياء وعي اللسان
তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, যার কারণে দুনিয়াতে বান্দার ক্ষতি হলেও এর বিনিময়ে আখেরাতে সে এরচেয়ে বড় জিনিস লাভ করবে। সেগুলো হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক, লজ্জা এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা।
আওন ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,
তিনটি জিনিস ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। লজ্জা, সচ্চরিত্র এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা। এগুলো আখেরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করলেও দুনিয়াতে হ্রাস ঘটায়। আর আখেরাতে বৃদ্ধিকারী বস্তু দুনিয়াতে হ্রাস ঘটানো বস্তুর চেয়ে উত্তম।
দুর্বল সূত্রে এটি মারফু হাদীস হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন,
যদি কোনো ব্যক্তি কিছু মানুষের অভিমুখী হয়ে বসে এবং তারা তার মাঝে নীরবতা পরিলক্ষণ করে, অথচ তিনি বোবা নন, তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি একজন মুসলিম ফকীহ।
যে ব্যক্তি সালাফদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পেরেছে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব যে, তাদের চুপ থাকাটা অতিরিক্ত কথা ও তর্ক-বিতর্ককে পরিহার করার জন্য ছিল। সুতরাং যারা তাদের পথে চলবে, তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। আর যারা অন্যদের পথে চলবে এবং বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও তর্ক-বিতর্ক করার মধ্যে জড়াবে, তবে সালাফদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেবে এবং নিজেদের ত্রুটির কথা মেনে নেবে তাদের অবস্থাও ওদের কাছাকাছি হবে।
ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের দোষের স্বীকারোক্তি দেয় না সে হলো নির্বোধ।'
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনার কী দোষ আছে?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'বেশি কথা বলা।
আর যদি সে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত্রে মর্যাদার আর তার পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ত্রুটি ও অজ্ঞতার দাবি করে, তবে সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট এবং বিরাট বড় ক্ষতিগ্রস্ত।

টিকাঃ
১. সাহাবী যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল বলতেন, اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অনুপকারী ইলম, অবিনীত অন্তর, অপরিতৃপ্ত আত্মা এবং অগ্রহণযোগ্য দোআ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২২
২. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৫৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২৯০
৩. নিঃসন্দেহে এটি অদৃশ্যের বিষয়। যার সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
৪. কিতাবুয যুহদ, ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা: ২৬৭
৫. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১১৩
৬. মুসনাদে ইমাম আহমাদ, হাদীস নং: ২২৩১২; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২০২৭
৭. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২০১০
৮. আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৪২,১৪৩
৯. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৩/১২৪

উপকারী ইলম থেকে যে বঞ্চিত হবে সে এমন চারটি আপদে পতিত হবে, যার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তখন তার ইলমই তার বিপদের কারণ হবে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। ফলে তা তার কোনো উপকারে আসবে না। কারণ, তার অন্তরে স্বীয় রবের প্রতি কোনো ভয় নেই। তার মন দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট নয়; বরং সে লোভের বশবর্তী হয়ে আরও বেশি জিনিস কামনা করে। স্বীয় রবের আদেশ পালন না করার এবং তার অপছন্দের জিনিস থেকে দূরে না থাকার কারণে তার প্রার্থনাও কবুল করা হয় না।
এসব হলো সেই ইলমের আলোচনা যার থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব। তা হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত ইলম। আর যদি ইলম হয় অন্য কিছু থেকে অর্জিত, তবে তো সেটি সত্তাগতভাবেই অনুপকারী। এর থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। উপকারের চেয়ে বরং এর ক্ষতির দিকটাই প্রবল।
অনুপকারী ইলমের আলামত
অনুপকারী ইলমের আলামত হলো, যে এটি অর্জন করবে তার উদ্দেশ্য হবে দম্ভ-গর্ব, অহংকার-অহমিকা ও দুনিয়ার মান-মর্যাদা তলব করা। দুনিয়াবী বিষয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, উলামায়ে কেরামের সাথে বিবাদে জড়ানো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের সাথে বিতর্ক করা এবং মানুষের মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِذلِكَ فَالنَّارِ فالنار
যে ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করবে তার জন্য জাহান্নাম, জাহান্নাম।
এই ধরনের ইলমের বাহকেরা অনেক সময় আল্লাহর মারেফত লাভ ও তাকে তলব করার এবং অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হবার কথা বলে থাকেন। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে রাজা-বাদশাসহ অন্যান্য মানুষদের মনে জায়গা করে নেওয়া। তাদের অন্তরে নিজেদের ব্যাপারে সুধারণা সৃষ্টি করা। ভক্তবৃন্দের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করা। এসব বোঝার মাধ্যম হলো, ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের মতো ওলি হওয়ার প্রকাশ্য দাবি করা। যেমন কারামিতা-বাতেনী দলের লোকেরা এমন দাবি করেছিল। সালাফে সালেহীনের পথ ছিল এরচেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় নিজেদের ছোট ও তুচ্ছ মনে করতেন।
আমর বলেছেন, যে নিজেকে আলেম বলবে সে আসলে জাহেল। আর যে নিজেকে মুমিন বলবে সে মূলত কাফের। আর যে বলবে সে জান্নাতে থাকবে সে আসলে জাহান্নামে যাবে।
অনুপকারী ইলমের আরেকটি আলামত হলো, সত্যকে গ্রহণ না করা। তার প্রতি নিজেকে সঁপে না দেওয়া এবং যিনি সত্য বলছেন তার সামনে অহংকারপূর্ণ আচরণ করা। বিশেষ করে যদি তিনি হন মানুষের চোখে তার চেয়ে নিম্নমানের। এমনিভাবে মিথ্যাকে আঁকড়ে রাখা এই ভয়ে যে, সত্যকে মেনে নিলে মানুষের মনোযোগ তার থেকে সরে যাবে।
অনেক সময় এমন ব্যক্তি মানুষজনের সামনে মুখে মুখে নিজের বদনাম গায়। নিজেকে তুচ্ছ হিসাবে প্রকাশ করে। যাতে করে তার ব্যাপারে মানুষ ভাবে যে, সে তো নিজেকে অনেক ছোট মনে করে। এভাবে কৌশলে অন্যদের থেকে প্রশংসা আদায় করা হয়ে যাবে। এটা হলো এক প্রকারের সূক্ষ্ম লৌকিকতা। এই বিষয়ে তাবেয়ীনে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী উলামায়ে কেরাম সতর্ক করে গিয়েছেন।
লৌকিক বিনয়-প্রদর্শনকারী ব্যক্তির থেকে প্রশংসা বাক্য সাদরে গ্রহণ করা ও এর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করার বিষয়টিও পাওয়া যায়। যা পরিপূর্ণরূপে ইখলাস ও সততার পরিপন্থী। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে কপটতার আশঙ্কা করে। মন্দ-মৃত্যুর ভয়ে দিনাতিপাত করে। ফলে সে নিজের প্রশংসা ও সুনাম-সুখ্যাতি থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করে।
উপকারী ইলমের আলামত
এই কারণেই উপকারী ইলমের বাহক যারা তাদের আলামত হলো, তারা নিজেদের জন্য আলাদা কোনো সম্মান-প্রতিপত্তি কামনা করে না। অন্তরের অন্তস্তল থেকে প্রশংসা ও সুনামকে ঘৃণা করে। কারও ওপর অহংকারী ভাব প্রকাশ করে না। হাসান বসরী বলেছেন,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত, আখেরাতের প্রতি আসক্ত, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃসিম্পন্ন ও স্বীয় রবের ইবাদাতের ব্যাপারে যত্নবান।
তার থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় আছে,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে তারচেয়ে উন্নত ব্যক্তিকে হিংসা করে না, তারচেয়ে অনুন্নত ব্যক্তিকে বিদ্রূপ করে না, আল্লাহ তাকে যে ইলম দান করেছেন তার বিনিময় গ্রহণ করে না।
এই শেষ কথার অনুরূপ অর্থ আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন, 'আলেমের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে বিনয়ী হবার জন্য মাথায় মাটি রাখা।' এর কারণ হলো, রবের ব্যাপারে যে যত বেশি জানবে ও তার সাথে যত বেশি পরিচিত হবে ততই ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। তার প্রতি আনুগত্য ও বিনয় আরও বেশি পরিমাণে হবে।
উপকারী ইলমের আরেকটা আলামত হলো, এই ইলম তার বাহককে দুনিয়া থেকে পলায়ন করতে শেখাবে। যার সবচেয়ে উচ্চস্তর হলো, নেতৃত্ব এবং সুনাম-সুখ্যাতি। এগুলো থেকে দূরে থাকা এবং এসব জিনিস এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হলো উপকারী ইলমের আলামত। যদি কখনো অনিচ্ছায় দুনিয়াবী এসব বিষয়ে জড়িয়ে যায়, তাহলে এর বাহক শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। তার এমন অবস্থা হয়, তিনি এটাকে একটা ফাঁদ ও ছাড় বলে মনে করেন। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার সুনাম-সুখ্যাতি দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাবার ফলে নিজের ব্যাপারে এমন ভয় করতেন।
উপকারী ইলমের বাহক কখনো ইলমের দাবি করেন না এবং এ নিয়ে কারও সাথে গর্বও করেন না। অন্য কাউকে মূর্খ সাব্যস্ত করেন না। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সুন্নাহ ও আহলে সুন্নাহর বিরুদ্ধাচারণ করে তার কথা ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর জন্য রাগত স্বরে কথা বলেন। কারও ওপর নিজের বড়াই জাহের করার জন্য নয়।
উপকারী ও অনুপকারী ইলমের পার্থক্য
যে ব্যক্তির ইলম অনুপকারী, মানুষের ওপর অহংকার করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। সে তাদের ওপর নিজের ইলমের বড়ত্ব জাহির করে এবং তাদের মূর্খ সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করে। নিজেকে বড় করে প্রকাশ করার জন্য তাদের খাটো করে। এটি খুবই নোংরা ও নিম্নমানের স্বভাব। এমন লোক অনেক সময় তার পূর্বেকার উলামায়ে কেরামকে মূর্খ, অসচেতন ও ভুলেভরা সাব্যস্ত করতে চায়। ফলে আবশ্যিকভাবেই নিজেকে সে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজেকে ভালো আর পূর্ববর্তী মানুষদের খারাপ ভাবে।
কিন্তু উপকারী ইলমের বাহক উলামায়ে কেরাম ঠিক এর বিপরীত হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের মন্দ আর পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামকে ভালো মনে করেন। আন্তরিকভাবেই তাদের মর্যাদার কথা স্বীকার করেন। নিজেদের অক্ষমতা এবং তাদের স্তরে পৌঁছা বা এর কাছাকাছি যাওয়ার অসম্ভবতাকে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেন।
ইমাম আবু হানীফা কত সুন্দর উত্তর দিয়েছেন যখন তাকে আলকামা আর আসওয়াদ রাহিমাহুমাল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি মর্যাদাবান? তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'আমরা তো তাদের নাম উচ্চারণেরও যোগ্য নই। মান-নির্ণয় তো অনেক দূরের বিষয়।'
ইবনুল মুবারক সালাফদের আলোচনা করার সময় এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন,
সালাফদের কথা যখন বলো তখন আমাদের কথা বলা থেকে বিরত থাকো; কারণ, সুস্থ চলন্ত মানুষ কখনো বসে থাকা ব্যক্তির মতো নয়।
অনুপকারী ইলমধারীর ভুল ধারণা
যাদের ইলম অনুপকারী তারা যখন পূর্ববর্তী কারও ওপর নিজের কথার ও বাক্চাতুর্যের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তখন সে এটাকে আল্লাহর দরবারে নিজের ইলমের মর্যাদা ভেবে বসে থাকে। কারণ, সে তার পূর্ববর্তীদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের জিনিস লাভ করেছে। তখন সে পূর্ববর্তীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। স্বল্পজ্ঞানের কারণে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবে। কিন্তু এই বেচারা জানে না যে, সালাফদের কম কথা বলাটা আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় ও তাকওয়ার কারণে ছিল। যদি তারা বেশি কথা বলতে চাইতেন তবে তা অনায়াসে পারতেন। যেমন আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস একবার কিছু লোককে দ্বীনী বিষয়ে তর্ক করতে শুনে বললেন,
তোমরা কি জানো না যে, আল্লাহর ভয় তাঁর কিছু বান্দাকে চুপ করিয়ে রেখেছে। তারা বোবাও নয়, বধিরও নয়। তারাই হলেন প্রকৃত ইলমের অধিকারী বাগ্মী ও মহান মনীষী। তবে আল্লাহর বড়ত্বের কথা ভেবে তাদের হৃদয়-মন ভীত ও তাদের জিহ্বা নিশ্চল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম তিরমিজী সাহাবী আবু উমামা থেকে রাসূল-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْبَذَاءُ
وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النَّفَاقِ
লজ্জা ও চুপ থাকা ঈমানের দুটি অংশ। আর অশ্লীলতা ও বেশি কথা বলা মুনাফিকির দুটি অংশ।
ইমাম তিরমিজী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকেম ও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান তার হাদীসগ্রন্থ সহীহ ইবনে হিব্বানে সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
الْبَيَانُ مِنَ اللهِ وَالْعِيُّ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلَيْسَ الْبَيَانُ
كَثْرَةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنَّ الْبَيَانَ الْفَضْلُ فِي الْحَقِّ،
وَلَيْسَ الْعِيُّ قِلَّةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنْ مَنْ سفه الحق
বলতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর চুপ করে থাকা শয়তানের পক্ষ থেকে। বেশি কথা বলাকে 'বলতে পারা' হিসাবে গণ্য করা হয় না। বরং বলতে পারার মানে হলো সত্য কথায় স্পবাদিতা অবলম্বন করা। এমনিভাবে কম কথা বলার মানে চুপ থাকা নয়; বরং এর মানে হলো সত্যকে আড়াল করা।
মারাসীলে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল-কুরজিতে আছে, রাসূল বলেছেন,
ثلاث ينقص بهن العبد في الدنيا و يدرك بهن في الآخرة
ما هو أعظم من ذلك الرحم و الحياء وعي اللسان
তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, যার কারণে দুনিয়াতে বান্দার ক্ষতি হলেও এর বিনিময়ে আখেরাতে সে এরচেয়ে বড় জিনিস লাভ করবে। সেগুলো হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক, লজ্জা এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা।
আওন ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,
তিনটি জিনিস ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। লজ্জা, সচ্চরিত্র এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা। এগুলো আখেরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করলেও দুনিয়াতে হ্রাস ঘটায়। আর আখেরাতে বৃদ্ধিকারী বস্তু দুনিয়াতে হ্রাস ঘটানো বস্তুর চেয়ে উত্তম।
দুর্বল সূত্রে এটি মারফু হাদীস হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন,
যদি কোনো ব্যক্তি কিছু মানুষের অভিমুখী হয়ে বসে এবং তারা তার মাঝে নীরবতা পরিলক্ষণ করে, অথচ তিনি বোবা নন, তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি একজন মুসলিম ফকীহ।
যে ব্যক্তি সালাফদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পেরেছে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব যে, তাদের চুপ থাকাটা অতিরিক্ত কথা ও তর্ক-বিতর্ককে পরিহার করার জন্য ছিল। সুতরাং যারা তাদের পথে চলবে, তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। আর যারা অন্যদের পথে চলবে এবং বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও তর্ক-বিতর্ক করার মধ্যে জড়াবে, তবে সালাফদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেবে এবং নিজেদের ত্রুটির কথা মেনে নেবে তাদের অবস্থাও ওদের কাছাকাছি হবে।
ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের দোষের স্বীকারোক্তি দেয় না সে হলো নির্বোধ।'
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনার কী দোষ আছে?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'বেশি কথা বলা।
আর যদি সে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত্রে মর্যাদার আর তার পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ত্রুটি ও অজ্ঞতার দাবি করে, তবে সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট এবং বিরাট বড় ক্ষতিগ্রস্ত।

টিকাঃ
১. সাহাবী যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল বলতেন, اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অনুপকারী ইলম, অবিনীত অন্তর, অপরিতৃপ্ত আত্মা এবং অগ্রহণযোগ্য দোআ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২২
২. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৫৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২৯০
৩. নিঃসন্দেহে এটি অদৃশ্যের বিষয়। যার সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
৪. কিতাবুয যুহদ, ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা: ২৬৭
৫. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১১৩
৬. মুসনাদে ইমাম আহমাদ, হাদীস নং: ২২৩১২; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২০২৭
৭. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২০১০
৮. আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৪২,১৪৩
৯. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৩/১২৪

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 আলেমদের কর্তব্য

📄 আলেমদের কর্তব্য


মোটকথা, বর্তমানের এই নষ্ট যুগে একজন মানুষ হয়তো আল্লাহর কাছে আলেম হিসাবে পরিচিত হওয়াকে নিজের জন্য সন্তুষ্টিজনক মনে করবে। অথ বা সে তার যুগের মানুষদের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে পরিচিত করাতে উদ্‌গ্রীব হবে। যদি সে প্রথম অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহর অবগতিই তার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। কারণ, যার সাথে আল্লাহর পরিচয় থাকে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট হয়। আর যে মানুষের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে সে রাসূল-এর এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হবে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُبَاهِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ، أَوْ
لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ
النَّاسِ إِلَيْهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করে এর মাধ্যমে আলেমদের সাথে প্রতিযোগিতা করার বা মূর্খদের সাথে তর্ক করার উদ্দেশ্যে অথবা এর সহায়তায় নিজের দিকে মানুষের দৃআিকর্ষণ করাতে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে বানিয়েনিল।
উহাইব ইবনে ওয়ারদ বলেন, 'এমন অনেক আলেম আছে যাদের মানুষ আলেম বলে ডাকলেও আল্লাহর দরবারে সে জাহেলদের দলভুক্ত।'
সহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَنْ تسعر به النار ثلاثة، أَحَدُهُمْ مَنْ قَرَأُ القُرْآنَ وَ
تَعَلَّمَ الْعِلْمَ ليُقَالَ هُوَ قَارِئُ وَ هُوَ عَالِمٌ، وَيُقَالُ لَهُ: قد قِيلَ
ذلِكَ، ثُمَّ أَمرَبِه فَيُسْحَبُ على وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ...
যাদের মাধ্যমে সর্বপ্রথম জাহান্নামকে প্রজ্বলিত করা হবে, তারা তিন শ্রেণির লোক। এক. যে কুরআন পড়েছে এবং ইলম অর্জন করেছে এই উদ্দেশ্যে যে, তাকে কারী বা আলেম বলা হবে। তাকে ডেকে বলা হবে, তোমাকে তা বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে, তখন তাকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে...।
কিতাবের প্রতি ঈমান আনার এবং গরুর গোশতের সংস্পর্শে নিহত ব্যক্তির জীবিত হওয়ার মতো নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করার পরেও অন্তরের কাঠিন্যের দরুন আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদের যে নিন্দা করেছেন, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। আমাদের তাদের মতো হতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا
نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ
فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
যারা মুমিন তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদের পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।
অন্য জায়গায় তাদের অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে,
فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً
অতএব তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদের ওপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিয়েছি।
আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিলেন যে, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া ছিল আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকারভঙ্গের শাস্তি। তা হলো, তার আদেশ লঙ্ঘন করা এবং নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া। অথচ তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, তারা তা করবে না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ
তারা কালামকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা তা থেকে উপকার লাভ করার বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছে।
উল্লেখ করা হলো, তাদের অন্তর কঠিন হওয়া দুইটি জিনিসকে তাদের জন্য অত্যাবশ্যক করেছে। এক. কালামকে তার স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা। দুই. তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তা বিস্মৃত হওয়া। অর্থাৎ তাদের যে প্রজ্ঞা ও সুন্দর নসীহত প্রদান করা হয়েছিল তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করার ফলে সেটা তারা ভুলে গিয়েছে এবং তার ওপর আমল করা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার কারণে এই দুইটি বিষয় এই উম্মতের সেসব আলেমদের মধ্যেও পাওয়া যায়, যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। প্রথমটি হলো, কালামকে বিকৃত করা। কারণ, যে আমল ছাড়াই ফিকহের জ্ঞান হাসিল করে তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়। ফলে সে পরবর্তী সময় আর আমলের প্রতি তেমন মনোযোগী হতে পারে না। বরং সে কালামকে বিকৃত করা এবং কুরআন-সুন্নাহর শব্দাবলিকে তার আপন স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা ও সূক্ষ্ম কৌশলের মাধ্যমে একে দূরবর্তী রূপকার্থে প্রয়োগ করার প্রতি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যেখানে আল্লাহর কালামের শব্দকে আঘাত করতে সক্ষম হয় না সেখানে সুন্নাহের শব্দকে আঘাত করে থাকে। যারা সরাসরি নস বা মূল বক্তব্যকে আঁকড়ে ধরে এবং এর থেকে যে অর্থ বুঝে আসে তাকে সেই অর্থেই প্রয়োগ করে, তাদের নিন্দা করে। তাদের অজ্ঞ এবং 'হাশাবী' বলে আখ্যায়িত করে। এই বিষয়টি আকীদার মূলনীতি বিষয়ক কালামবিদদের মধ্যে এবং রায়পন্থী ফুকাহায়ে কেরাম ও দর্শনপন্থী সুফীদের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
রায়পন্থীরা তাদের কোনো শায়েখ থেকে নিজেদের কিতাবে উল্লেখ করেছে, প্রত্যেক ইলমের ফলাফল তার মর্যাদাকে প্রকাশ করে। সুতরাং যারা ইলমে তাফসীরের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের লক্ষ্য হলো, মানুষের কাছে ঘটনাবলি বর্ণনা করা এবং ওয়াজ করা। আর যারা নিজেদের রায় এবং ইলম নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা ফতওয়া প্রদান করে, বিচারকার্য পরিচালনা করে, হাকেম হয়, দরস প্রদান করে। এ সমস্ত ব্যক্তিদের তাদের সাথে মিল রয়েছে যাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে,
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং তারা পরকালের খবর রাখে না।
এই বিষয়ে তাদের সবচেয়ে বেশি প্ররোচিত করে দুনিয়ার প্রতি তাদের সীমাহীন ভালোবাসা ও সম্মান লাভের বাসনা। যদি তারা দুনিয়াবিরাগী হতো এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী হতো, রাসূল-এর ওপর আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত বিষয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য নিজেকে ও আল্লাহর বান্দাদের নসীহত করত এবং এসব বিষয়ে মানুষকে তাগাদা দিত, তাহলে অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ-ভীতি থেকে দূরে সরে যেত না। কুরআন-সুন্নাহতে যা আছে সরাসরি তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। যারা কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরে যেত তাদের সংখ্যা হতো খুবই অল্প।
আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিদের অস্তিত্ব বহাল রাখবেন, যারা কুরআন-সুন্নাহের নুসুস থেকে বহির্গত অর্থ অনুধাবন করে সেগুলোকে যথাস্থানে স্থাপন করে। এর মাধ্যমে মানুষদের উদ্ভাবিত বাতেনী শাখাগত বিষয় এবং সে সকল অবৈধ কূটকৌশলের প্রয়োজনও নিঃশেষিত হয়ে যায়, যার মাধ্যমে সুদসহ অন্যান্য হারাম জিনিসের রাস্তাকে উন্মুক্ত করা হয় এবং আহলে কিতাবদের মতো আল্লাহর হারাম করা জিনিসকে হালাল সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়।
মুমিনরা সত্য নিয়ে যে মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাআলা স্বীয় আদেশের মাধ্যমে সে বিষয়ে তাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যাকে চান সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন।
وصلي الله علي سيدنا محمد و اله و صحبه وسلم تسليما
كثيرا إلي يوم القيامة، و حسبنا الله و نعم الوكيل

টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২৬৫৪
২. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৮/১৫৭
৩. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৮২৭৭
৪. সুরা হাদীদ, (৫৭): ১৬
৫. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৬. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৭. একটা বাতিল ফিরকার নাম।
৮. সূরা রুম, (৩০): ০৭

মোটকথা, বর্তমানের এই নষ্ট যুগে একজন মানুষ হয়তো আল্লাহর কাছে আলেম হিসাবে পরিচিত হওয়াকে নিজের জন্য সন্তুষ্টিজনক মনে করবে। অথ বা সে তার যুগের মানুষদের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে পরিচিত করাতে উদ্‌গ্রীব হবে। যদি সে প্রথম অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহর অবগতিই তার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। কারণ, যার সাথে আল্লাহর পরিচয় থাকে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট হয়। আর যে মানুষের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে সে রাসূল-এর এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হবে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُبَاهِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ، أَوْ
لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ
النَّاسِ إِلَيْهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করে এর মাধ্যমে আলেমদের সাথে প্রতিযোগিতা করার বা মূর্খদের সাথে তর্ক করার উদ্দেশ্যে অথবা এর সহায়তায় নিজের দিকে মানুষের দৃআিকর্ষণ করাতে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে বানিয়েনিল।
উহাইব ইবনে ওয়ারদ বলেন, 'এমন অনেক আলেম আছে যাদের মানুষ আলেম বলে ডাকলেও আল্লাহর দরবারে সে জাহেলদের দলভুক্ত।'
সহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَنْ تسعر به النار ثلاثة، أَحَدُهُمْ مَنْ قَرَأُ القُرْآنَ وَ
تَعَلَّمَ الْعِلْمَ ليُقَالَ هُوَ قَارِئُ وَ هُوَ عَالِمٌ، وَيُقَالُ لَهُ: قد قِيلَ
ذلِكَ، ثُمَّ أَمرَبِه فَيُسْحَبُ على وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ...
যাদের মাধ্যমে সর্বপ্রথম জাহান্নামকে প্রজ্বলিত করা হবে, তারা তিন শ্রেণির লোক। এক. যে কুরআন পড়েছে এবং ইলম অর্জন করেছে এই উদ্দেশ্যে যে, তাকে কারী বা আলেম বলা হবে। তাকে ডেকে বলা হবে, তোমাকে তা বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে, তখন তাকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে...।
কিতাবের প্রতি ঈমান আনার এবং গরুর গোশতের সংস্পর্শে নিহত ব্যক্তির জীবিত হওয়ার মতো নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করার পরেও অন্তরের কাঠিন্যের দরুন আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদের যে নিন্দা করেছেন, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। আমাদের তাদের মতো হতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا
نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ
فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
যারা মুমিন তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদের পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।
অন্য জায়গায় তাদের অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে,
فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً
অতএব তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদের ওপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিয়েছি।
আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিলেন যে, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া ছিল আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকারভঙ্গের শাস্তি। তা হলো, তার আদেশ লঙ্ঘন করা এবং নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া। অথচ তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, তারা তা করবে না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ
তারা কালামকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা তা থেকে উপকার লাভ করার বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছে।
উল্লেখ করা হলো, তাদের অন্তর কঠিন হওয়া দুইটি জিনিসকে তাদের জন্য অত্যাবশ্যক করেছে। এক. কালামকে তার স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা। দুই. তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তা বিস্মৃত হওয়া। অর্থাৎ তাদের যে প্রজ্ঞা ও সুন্দর নসীহত প্রদান করা হয়েছিল তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করার ফলে সেটা তারা ভুলে গিয়েছে এবং তার ওপর আমল করা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার কারণে এই দুইটি বিষয় এই উম্মতের সেসব আলেমদের মধ্যেও পাওয়া যায়, যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। প্রথমটি হলো, কালামকে বিকৃত করা। কারণ, যে আমল ছাড়াই ফিকহের জ্ঞান হাসিল করে তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়। ফলে সে পরবর্তী সময় আর আমলের প্রতি তেমন মনোযোগী হতে পারে না। বরং সে কালামকে বিকৃত করা এবং কুরআন-সুন্নাহর শব্দাবলিকে তার আপন স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা ও সূক্ষ্ম কৌশলের মাধ্যমে একে দূরবর্তী রূপকার্থে প্রয়োগ করার প্রতি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যেখানে আল্লাহর কালামের শব্দকে আঘাত করতে সক্ষম হয় না সেখানে সুন্নাহের শব্দকে আঘাত করে থাকে। যারা সরাসরি নস বা মূল বক্তব্যকে আঁকড়ে ধরে এবং এর থেকে যে অর্থ বুঝে আসে তাকে সেই অর্থেই প্রয়োগ করে, তাদের নিন্দা করে। তাদের অজ্ঞ এবং 'হাশাবী' বলে আখ্যায়িত করে। এই বিষয়টি আকীদার মূলনীতি বিষয়ক কালামবিদদের মধ্যে এবং রায়পন্থী ফুকাহায়ে কেরাম ও দর্শনপন্থী সুফীদের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
রায়পন্থীরা তাদের কোনো শায়েখ থেকে নিজেদের কিতাবে উল্লেখ করেছে, প্রত্যেক ইলমের ফলাফল তার মর্যাদাকে প্রকাশ করে। সুতরাং যারা ইলমে তাফসীরের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের লক্ষ্য হলো, মানুষের কাছে ঘটনাবলি বর্ণনা করা এবং ওয়াজ করা। আর যারা নিজেদের রায় এবং ইলম নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা ফতওয়া প্রদান করে, বিচারকার্য পরিচালনা করে, হাকেম হয়, দরস প্রদান করে। এ সমস্ত ব্যক্তিদের তাদের সাথে মিল রয়েছে যাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে,
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং তারা পরকালের খবর রাখে না।
এই বিষয়ে তাদের সবচেয়ে বেশি প্ররোচিত করে দুনিয়ার প্রতি তাদের সীমাহীন ভালোবাসা ও সম্মান লাভের বাসনা। যদি তারা দুনিয়াবিরাগী হতো এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী হতো, রাসূল-এর ওপর আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত বিষয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য নিজেকে ও আল্লাহর বান্দাদের নসীহত করত এবং এসব বিষয়ে মানুষকে তাগাদা দিত, তাহলে অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ-ভীতি থেকে দূরে সরে যেত না। কুরআন-সুন্নাহতে যা আছে সরাসরি তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। যারা কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরে যেত তাদের সংখ্যা হতো খুবই অল্প।
আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিদের অস্তিত্ব বহাল রাখবেন, যারা কুরআন-সুন্নাহের নুসুস থেকে বহির্গত অর্থ অনুধাবন করে সেগুলোকে যথাস্থানে স্থাপন করে। এর মাধ্যমে মানুষদের উদ্ভাবিত বাতেনী শাখাগত বিষয় এবং সে সকল অবৈধ কূটকৌশলের প্রয়োজনও নিঃশেষিত হয়ে যায়, যার মাধ্যমে সুদসহ অন্যান্য হারাম জিনিসের রাস্তাকে উন্মুক্ত করা হয় এবং আহলে কিতাবদের মতো আল্লাহর হারাম করা জিনিসকে হালাল সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়।
মুমিনরা সত্য নিয়ে যে মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাআলা স্বীয় আদেশের মাধ্যমে সে বিষয়ে তাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যাকে চান সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন।
وصلي الله علي سيدنا محمد و اله و صحبه وسلم تسليما
كثيرا إلي يوم القيامة، و حسبنا الله و نعم الوكيل

টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২৬৫৪
২. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৮/১৫৭
৩. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৮২৭৭
৪. সুরা হাদীদ, (৫৭): ১৬
৫. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৬. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৭. একটা বাতিল ফিরকার নাম।
৮. সূরা রুম, (৩০): ০৭

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 লেখকের জীবনী

📄 লেখকের জীবনী


আল্লাহ তাআলা প্রতি শতাব্দীতেই এমন কিছু আলেমকে দুনিয়ার বুকে পাঠান যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর রক্ত-ঘামের বিনিময়ে ইসলাম নামক বটবৃক্ষ সতেজ ও সজীব থাকে। তারা নিরলস ছায়া দিয়ে যেতে থাকেন মানবসভ্যতাকে। নুয়ে পড়া মুসলিম জাতিকে তারা দান করেন নবচেতনা। সমাজের রগ-রেশায় তৈরি হওয়া কুপ্রথা আর কুসংস্কারকে তারা করেন বিদূরিত। ইলমের ময়দানকে করেন সঞ্জীবিত। হিজরী অষ্টম শতাব্দীতে আগমন করা এমনই একজন জগৎখ্যাত মনীষী আলেম হলেন ইবনে রজব হাম্বলী।
তাঁর নাম ও উপাধি
তাঁর পুরো নাম যাইনুদ্দীন আবদুর রহমান বিন আহমাদ বিন রজব বিন আলহুসাইন বিন মুহাম্মাদ বিন আবিল বারাকাত মাসউদ আসসুলামী আলবাগদাদী আদ্দিমাশকী আলহাম্বলী। তবে ইবনে রজব হাম্বলী উপাধিতেই তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর রচিত বই-পুস্তকে এবং তাকে নিয়ে লেখা অন্যদের লেখাতেও তিনি এই নামেই প্রসিদ্ধি পেয়েছেন।
জন্ম ও শিক্ষাদীক্ষা
৭৩৬ হিজরী মোতাবেক ১৩৩৫ ঈসায়ী সনে তিনি ইরাকের বাগদাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, ইসলামী শাস্ত্রের বিশিষ্ট বিদ্বান। বিশেষ করে হাদীসশাস্ত্রের। তার বাবাও বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বহু আলেমের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
ইবনে রজব এর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাঁর পরিবার দামেস্কে স্থানান্তরিত হয়। তখন তিনি জেরুসালেম সফর করেন এবং সেখানে আল-আলাঈ এর কাছে জ্ঞানার্জন করেন। এরপর তিনি বাগদাদে যান এবং সেখান থেকে মক্কা গমন করেন। মক্কায় তাঁর পিতা তাঁর শিক্ষার জন্য সুব্যবস্থা করে রাখেন। এরপর তিনি মিশর সফর করেন এবং এরপর আবার দামেস্কে ফিরে যান। সেখানে তিনি ছাত্রদের শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি ইবনুন নাকীব (মৃত্যু: ৭৬৯ হিজরী), আস সুবকী, আল ইরাকী (৮০৬ হিজরী), মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল খাব্বাজ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদ্বানের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি যুগবিখ্যাত আলেমে দ্বীন ইবনু কায়্যিমিল জাওযিয়্যাহ রহ. এর কাছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী ছিলেন ইলমপিপাসু মানুষ। যেখানেই ইলমের ঘ্রাণ পেয়েছেন ছুটে গিয়েছেন। ফলে তাঁর শিক্ষকবৃন্দের তালিকাটাও বেশ লম্বা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
→ আবুল আব্বাস আহমাদ। যিনি ইবনু কাযিল জাবাল নামে প্রসিদ্ধ। (৬৯৩-৭৭১ হি.) দামেস্কের সফরে তিনি তাঁর থেকে জ্ঞানার্জন করেন।
→ আহমাদ বিন আলী বিন মুহাম্মাদ বাগদাদী (৭০৭-৭৫০ হি.)
→ সফিউদ্দিন আবু আবদুল্লাহ (৭১২-৭৪৯ হি.) বাগদাদে অবস্থানকালে তিনি তাঁর কাছে হাদীস পড়েন।
→ আল্লামা আলাঈ (৬৯৪-৭৬১হি.)। ফিলিস্তিনের কুদসে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ ইযযুদ্দীন আবদুল আযীয বিন মুহাম্মাদ (৬৭১-৭৪০ হি.) মিশরে ও মক্কায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়।
→ সিরাজুদ্দীন আবু হাফস (৬৮৩-৭৫০ হি.)। তিনি ইরাকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। বাগদাদ শহরে তাঁর থেকে তিনি ইলমে হাদীস অর্জন করেন।
→ ইবনুল খাব্বায (৬৭৭-৭৫৪ হি.)। দামেস্কে তিনি তাঁর হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল (৬৭৪-৭৫৬ হি.)। তিনি ইবনুল মুলুক উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। মিশরে তাঁর থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ ইবনু কাইয়্যিমিল জাওযিইয়্যাহ (৬৯১-৭৫১ হি.)। দামেস্কে তাঁর সান্নিধ্য তিনি গ্রহণ করেন এবং এক বছরেরও বেশি সময় তাঁর সাথে থাকেন।
→ ইবুল হারাম কালানিসী (৬৮৩-৭৬৫ হি.)। মিশরের কায়রোতে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী নিজে ইলম অর্জন করার পাশাপাশি ইলম বিতরণেও অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। দরসপ্রদান এবং লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর ইলমকে ছড়িয়ে দিয়েছেন চারপাশে। নিম্নে তাঁর কিছু ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলো।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (৭৬৫-৮৪৪ হি.)। তিনি মিশরের মুফতী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
→ যাইনুদ্দীন আবু যর (৭৫৮-৮৪৬ হি.)। তিনি আল্লামা যারকাশী নামে প্রসিদ্ধ। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (জন্ম: ৭৬৫ হি.)। তিনি বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আলমাকদেসী (৭৭১-৮৫৫ হি.)। তিনি মক্কার বিচারক পদে কর্মরত ছিলেন।
→ ইযযুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বাহাউদ্দীন আলী আলমাকদেসী (৭৬৪-৮২০ হি.)।
তাঁর রচনাবলি
ইবনে রজব হাম্বলী জীবদ্দশায় প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার অনেকগুলো আজও সমান জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত। তাঁর রচিত কিছু বইপত্রের নাম উল্লেখ করা হলো:
→ ফাতহুল বারী শরহুল বুখারী। এটি বুখারী শরীফের একটি ভাষ্যগ্রন্থ। তিনি পূর্ণাঙ্গরূপে এটি রচনা করতে পারেননি। জানাযার অধ্যায় পর্যন্ত লেখার পর তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।
→ শরহু ইলালিত তিরমিজী। এটি ইমাম তিরমিজী রচিত কিতাবুল ইলালের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। যা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য।
→ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম। এটি ইমাম নববী রহ. কর্তৃক রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আলআরবাঈন এর একটি বৃহৎ ব্যাখ্যাগ্রন্থ। আজ পর্যন্ত চল্লিশ হাদীছের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসাবে এটি সমাদৃত হয়ে আসছে।
→ আলইস্তিখরাজ ফী আহকামিল খারাজ
→ আররদ্দু আলা মানিত্তাবা গাইরাল মাযাহিবিল আরবাআহ। যারা মাযহাব মানতে চায় না তাদের বিপক্ষে লিখিত। মাযহাব বিরোধিতার খণ্ডন নামে এটি বাংলা ভাষায় সম্প্রতি অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
→ লাতাইফুল মাআরিফ। এটি মূলত বারো মাসের আমল নিয়ে রচিত একটি চমৎকার গ্রন্থ। আমাদের দেশের বারো চান্দের ফজিলত এর সুন্দর বিকল্প হতে পারে এই বইটির অনুবাদ। এতে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বারো মাসের আমলগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
→ তাফসীরু সূরাতিল ইখলাস
→ তাফসীরু সূরাতিল ফালাক
→ তাফসীরু সূরাতিন নাসর
→ আহওয়ালুল কুবুর।
→ আততাখওয়ীফ মিনান্নার
→ আলফারকু বাইনান নাসীহাতি ওয়াত্তা'বীর
→ ফাদাইলুশ শাম
→ সীরাতু আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আযীয
→ রিসালাহ ফী শুআবিল ঈমান
→ যাম্মু কসওয়াতিল ক্বলব
→ সিফাতুন্নার ওয়া সিফাতুল জান্নাহ
→ যামুল খমার
→ মানাফিউল ইমাম আহমাদ
→ ফাইদাতু ইবনি রজব হাওলা হাদীসিন নুযুল।
এ ছাড়াও তিনি ছোট-বড় প্রচুর পুস্তিকা রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্য হতে ফাদলু ইলমিস সালাফ আলা ইলমিল খালাফ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি পুস্তিকা। যার অনুবাদই হলো আমাদের এই বইটি।
তাঁর ব্যাপারে মনীষীদের মন্তব্য
ইবনে কাযী শুহবাহ ইবনে রজব এর ব্যাপারে বলেন, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি একজন অদ্বিতীয় হাম্বলী ফকীহ হিসাবে প্রতিতি হওয়ার আগ পর্যন্ত হাম্বলী ফিকহের ওপর নিবি মনে বহু সময় দেন। হাদীসশাস্ত্রের বিভিন্ন অপূর্ণতা পূরণ করার জন্য ও জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেকে অনুগত করে নিয়েছিলেন। তিনি লেখালেখির জন্য নির্জনতাকে বেছে নিয়েছিলেন।
হাফিয ইবনে হাজার আল-আসকালানী রহ. তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি খুব উঁচু পর্যায়ের হাদীস শাস্ত্রবিদ ছিলেন। উসুলুল হাদীস, রিজালশাস্ত্র, হাদীসের সনদ-মতন এবং হাদীসের অর্থ ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে পারদর্শী ছিলেন।
ইমাম আবু মুফলিহ আল-হাম্বলী তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি ছিলেন শাইখ, অন্যতম শ্রে বিদ্বান, হাফিয এবং এমন একজন যিনি পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ। তিনি হাম্বলী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ রচনা করেছেন।
হাফেজ আবুল ফজল তাকিউদ্দীন ইবনে ফাহাদ মক্কী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি হাদীসের হাফেজ ও ইমাম, শ্রে ফকীহ, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ আলেমদের একজন, ইবাদাতগুযার ইমামদের অন্যতম, মুহাদ্দিসদের শিক্ষক এবং মুসলিমদের খতীব।
শিহাব ইবনে হাজ্জী তাঁর সম্পর্কে বলেন, তিনি হাদীসশাস্ত্রের অসাধারণ সমালোচক ও গবেষক ছিলেন। সমসাময়িকদের মাঝে হাদীসের সনদ এবং সনদের বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক পারদর্শী ছিলেন। আমাদের সমসাময়িক অধিকাংশ হাম্বলী আলেম তাঁর ছাত্র ছিলেন।
মৃত্যু
ইবনে রজব রহ. ৭৯৫ হিজরি সনের চতুর্থ রমযানের পবিত্র এক রাতে (১৩৯৩ ঈসায়ী) মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। মৃত্যুর পর দিন তাঁর জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং বাবুস সাগীর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

আল্লাহ তাআলা প্রতি শতাব্দীতেই এমন কিছু আলেমকে দুনিয়ার বুকে পাঠান যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর রক্ত-ঘামের বিনিময়ে ইসলাম নামক বটবৃক্ষ সতেজ ও সজীব থাকে। তারা নিরলস ছায়া দিয়ে যেতে থাকেন মানবসভ্যতাকে। নুয়ে পড়া মুসলিম জাতিকে তারা দান করেন নবচেতনা। সমাজের রগ-রেশায় তৈরি হওয়া কুপ্রথা আর কুসংস্কারকে তারা করেন বিদূরিত। ইলমের ময়দানকে করেন সঞ্জীবিত। হিজরী অষ্টম শতাব্দীতে আগমন করা এমনই একজন জগৎখ্যাত মনীষী আলেম হলেন ইবনে রজব হাম্বলী।
তাঁর নাম ও উপাধি
তাঁর পুরো নাম যাইনুদ্দীন আবদুর রহমান বিন আহমাদ বিন রজব বিন আলহুসাইন বিন মুহাম্মাদ বিন আবিল বারাকাত মাসউদ আসসুলামী আলবাগদাদী আদ্দিমাশকী আলহাম্বলী। তবে ইবনে রজব হাম্বলী উপাধিতেই তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর রচিত বই-পুস্তকে এবং তাকে নিয়ে লেখা অন্যদের লেখাতেও তিনি এই নামেই প্রসিদ্ধি পেয়েছেন।
জন্ম ও শিক্ষাদীক্ষা
৭৩৬ হিজরী মোতাবেক ১৩৩৫ ঈসায়ী সনে তিনি ইরাকের বাগদাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, ইসলামী শাস্ত্রের বিশিষ্ট বিদ্বান। বিশেষ করে হাদীসশাস্ত্রের। তার বাবাও বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বহু আলেমের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
ইবনে রজব এর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাঁর পরিবার দামেস্কে স্থানান্তরিত হয়। তখন তিনি জেরুসালেম সফর করেন এবং সেখানে আল-আলাঈ এর কাছে জ্ঞানার্জন করেন। এরপর তিনি বাগদাদে যান এবং সেখান থেকে মক্কা গমন করেন। মক্কায় তাঁর পিতা তাঁর শিক্ষার জন্য সুব্যবস্থা করে রাখেন। এরপর তিনি মিশর সফর করেন এবং এরপর আবার দামেস্কে ফিরে যান। সেখানে তিনি ছাত্রদের শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি ইবনুন নাকীব (মৃত্যু: ৭৬৯ হিজরী), আস সুবকী, আল ইরাকী (৮০৬ হিজরী), মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল খাব্বাজ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদ্বানের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি যুগবিখ্যাত আলেমে দ্বীন ইবনু কায়্যিমিল জাওযিয়্যাহ রহ. এর কাছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী ছিলেন ইলমপিপাসু মানুষ। যেখানেই ইলমের ঘ্রাণ পেয়েছেন ছুটে গিয়েছেন। ফলে তাঁর শিক্ষকবৃন্দের তালিকাটাও বেশ লম্বা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
→ আবুল আব্বাস আহমাদ। যিনি ইবনু কাযিল জাবাল নামে প্রসিদ্ধ। (৬৯৩-৭৭১ হি.) দামেস্কের সফরে তিনি তাঁর থেকে জ্ঞানার্জন করেন।
→ আহমাদ বিন আলী বিন মুহাম্মাদ বাগদাদী (৭০৭-৭৫০ হি.)
→ সফিউদ্দিন আবু আবদুল্লাহ (৭১২-৭৪৯ হি.) বাগদাদে অবস্থানকালে তিনি তাঁর কাছে হাদীস পড়েন।
→ আল্লামা আলাঈ (৬৯৪-৭৬১হি.)। ফিলিস্তিনের কুদসে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ ইযযুদ্দীন আবদুল আযীয বিন মুহাম্মাদ (৬৭১-৭৪০ হি.) মিশরে ও মক্কায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়।
→ সিরাজুদ্দীন আবু হাফস (৬৮৩-৭৫০ হি.)। তিনি ইরাকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। বাগদাদ শহরে তাঁর থেকে তিনি ইলমে হাদীস অর্জন করেন।
→ ইবনুল খাব্বায (৬৭৭-৭৫৪ হি.)। দামেস্কে তিনি তাঁর হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল (৬৭৪-৭৫৬ হি.)। তিনি ইবনুল মুলুক উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। মিশরে তাঁর থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেন এবং অনেক বেশি উপকৃত হন।
→ ইবনু কাইয়্যিমিল জাওযিইয়্যাহ (৬৯১-৭৫১ হি.)। দামেস্কে তাঁর সান্নিধ্য তিনি গ্রহণ করেন এবং এক বছরেরও বেশি সময় তাঁর সাথে থাকেন।
→ ইবুল হারাম কালানিসী (৬৮৩-৭৬৫ হি.)। মিশরের কায়রোতে তিনি তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
ইবনে রজব হাম্বলী নিজে ইলম অর্জন করার পাশাপাশি ইলম বিতরণেও অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। দরসপ্রদান এবং লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর ইলমকে ছড়িয়ে দিয়েছেন চারপাশে। নিম্নে তাঁর কিছু ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলো।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (৭৬৫-৮৪৪ হি.)। তিনি মিশরের মুফতী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
→ যাইনুদ্দীন আবু যর (৭৫৮-৮৪৬ হি.)। তিনি আল্লামা যারকাশী নামে প্রসিদ্ধ। দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী এর কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন।
→ মুহিব্বুদ্দীন আবুল ফদল (জন্ম: ৭৬৫ হি.)। তিনি বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং দামেস্কে ইবনে রজব হাম্বলী থেকে ইলম অর্জন করেন।
→ কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আলমাকদেসী (৭৭১-৮৫৫ হি.)। তিনি মক্কার বিচারক পদে কর্মরত ছিলেন।
→ ইযযুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বাহাউদ্দীন আলী আলমাকদেসী (৭৬৪-৮২০ হি.)।
তাঁর রচনাবলি
ইবনে রজব হাম্বলী জীবদ্দশায় প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার অনেকগুলো আজও সমান জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত। তাঁর রচিত কিছু বইপত্রের নাম উল্লেখ করা হলো:
→ ফাতহুল বারী শরহুল বুখারী। এটি বুখারী শরীফের একটি ভাষ্যগ্রন্থ। তিনি পূর্ণাঙ্গরূপে এটি রচনা করতে পারেননি। জানাযার অধ্যায় পর্যন্ত লেখার পর তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।
→ শরহু ইলালিত তিরমিজী। এটি ইমাম তিরমিজী রচিত কিতাবুল ইলালের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। যা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য।
→ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম। এটি ইমাম নববী রহ. কর্তৃক রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আলআরবাঈন এর একটি বৃহৎ ব্যাখ্যাগ্রন্থ। আজ পর্যন্ত চল্লিশ হাদীছের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসাবে এটি সমাদৃত হয়ে আসছে।
→ আলইস্তিখরাজ ফী আহকামিল খারাজ
→ আররদ্দু আলা মানিত্তাবা গাইরাল মাযাহিবিল আরবাআহ। যারা মাযহাব মানতে চায় না তাদের বিপক্ষে লিখিত। মাযহাব বিরোধিতার খণ্ডন নামে এটি বাংলা ভাষায় সম্প্রতি অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
→ লাতাইফুল মাআরিফ। এটি মূলত বারো মাসের আমল নিয়ে রচিত একটি চমৎকার গ্রন্থ। আমাদের দেশের বারো চান্দের ফজিলত এর সুন্দর বিকল্প হতে পারে এই বইটির অনুবাদ। এতে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বারো মাসের আমলগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
→ তাফসীরু সূরাতিল ইখলাস
→ তাফসীরু সূরাতিল ফালাক
→ তাফসীরু সূরাতিন নাসর
→ আহওয়ালুল কুবুর।
→ আততাখওয়ীফ মিনান্নার
→ আলফারকু বাইনান নাসীহাতি ওয়াত্তা'বীর
→ ফাদাইলুশ শাম
→ সীরাতু আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আযীয
→ রিসালাহ ফী শুআবিল ঈমান
→ যাম্মু কসওয়াতিল ক্বলব
→ সিফাতুন্নার ওয়া সিফাতুল জান্নাহ
→ যামুল খমার
→ মানাফিউল ইমাম আহমাদ
→ ফাইদাতু ইবনি রজব হাওলা হাদীসিন নুযুল।
এ ছাড়াও তিনি ছোট-বড় প্রচুর পুস্তিকা রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্য হতে ফাদলু ইলমিস সালাফ আলা ইলমিল খালাফ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি পুস্তিকা। যার অনুবাদই হলো আমাদের এই বইটি।
তাঁর ব্যাপারে মনীষীদের মন্তব্য
ইবনে কাযী শুহবাহ ইবনে রজব এর ব্যাপারে বলেন, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি একজন অদ্বিতীয় হাম্বলী ফকীহ হিসাবে প্রতিতি হওয়ার আগ পর্যন্ত হাম্বলী ফিকহের ওপর নিবি মনে বহু সময় দেন। হাদীসশাস্ত্রের বিভিন্ন অপূর্ণতা পূরণ করার জন্য ও জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেকে অনুগত করে নিয়েছিলেন। তিনি লেখালেখির জন্য নির্জনতাকে বেছে নিয়েছিলেন।
হাফিয ইবনে হাজার আল-আসকালানী রহ. তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি খুব উঁচু পর্যায়ের হাদীস শাস্ত্রবিদ ছিলেন। উসুলুল হাদীস, রিজালশাস্ত্র, হাদীসের সনদ-মতন এবং হাদীসের অর্থ ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে পারদর্শী ছিলেন।
ইমাম আবু মুফলিহ আল-হাম্বলী তাঁর ব্যাপারে বলেন, তিনি ছিলেন শাইখ, অন্যতম শ্রে বিদ্বান, হাফিয এবং এমন একজন যিনি পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ। তিনি হাম্বলী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ রচনা করেছেন।
হাফেজ আবুল ফজল তাকিউদ্দীন ইবনে ফাহাদ মক্কী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি হাদীসের হাফেজ ও ইমাম, শ্রে ফকীহ, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ আলেমদের একজন, ইবাদাতগুযার ইমামদের অন্যতম, মুহাদ্দিসদের শিক্ষক এবং মুসলিমদের খতীব।
শিহাব ইবনে হাজ্জী তাঁর সম্পর্কে বলেন, তিনি হাদীসশাস্ত্রের অসাধারণ সমালোচক ও গবেষক ছিলেন। সমসাময়িকদের মাঝে হাদীসের সনদ এবং সনদের বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক পারদর্শী ছিলেন। আমাদের সমসাময়িক অধিকাংশ হাম্বলী আলেম তাঁর ছাত্র ছিলেন।
মৃত্যু
ইবনে রজব রহ. ৭৯৫ হিজরি সনের চতুর্থ রমযানের পবিত্র এক রাতে (১৩৯৩ ঈসায়ী) মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। মৃত্যুর পর দিন তাঁর জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং বাবুস সাগীর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00