📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 নব আবিষ্কৃত ইলম সম্পর্কে সতর্কতা

📄 নব আবিষ্কৃত ইলম সম্পর্কে সতর্কতা


সালাফদের পরে যে ইলমের উদ্ভব ঘটেছে সে সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, তাদের পরে অনেক নতুন জিনিসের জন্ম হয়েছে। হাদীস-সুন্নাহের অনুসরণের দিকে সম্বন্ধিত আহলে জাহের গোষ্ঠীই হাদীস-সুন্নাহের সবচেয়ে বেশি বিপরীত কাজ করে থাকে। কারণ, তারা ইমামদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সবকিছু নিজেদের বুঝমতো বোঝার কারণে তাদের থেকে আলাদা। উপরন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী ইমামরা যেসব বিষয় গ্রহণ করেননি সেগুলোও অনেক সময় গ্রহণ করে থাকে।
তবে এর সাথে দার্শনিক বা মুতাকাল্লিমিনদের আলোচনায় প্রবিষ্ট হওয়া কেবলই অকল্যাণ। যারা এতে লিপ্ত হয় তারা খুব অল্পই এদের আবর্জনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, 'যে কালামশাস্ত্র চর্চা করে সে একসময় জাহমিয়া হয়ে যায়।'
ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য সালাফরা কালামশাস্ত্রবিদদের থেকে সতর্ক করতেন। যদিও তারা সুন্নাহর স্বপক্ষে কাজ করে থাকে। কালামশাস্ত্র পছন্দকারীদের কথার মধ্যে তর্ক-বিতর্কের গভীরে যেতে অনাগ্রহী ব্যক্তিদের প্রতি যেসব নিন্দাবাদ দেখতে পাওয়া যায় এবং তাদের অজ্ঞ আখ্যা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় বা তাদের 'হাশাবী' বলে সম্বোধন করার প্রবণতা দৃষ্টিগোচর হয় অথবা বলা হয় যে, তারা আল্লাহর পরিচয় জানে না ও তার দ্বীন সম্পর্কে তেমন জ্ঞানী নয়, তো এ সবকিছুই হলো মূলত শয়তানের কাজ। এর থেকে আমরা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
পরবর্তী যুগে আবিষ্কার হওয়া জ্ঞানের মধ্যে আরও রয়েছে কেবল নিজস্ব মত, অভিরুচি ও কাশফের ভিত্তিতে মারেফত এবং আধ্যাত্মিক-কর্ম ইত্যাদি বাতেনী ইলমের আলোচনায় লিপ্ত হওয়া। এটি অত্যন্ত মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইমাম আহমাদ এর মতো মনীষী ইমামগণ একে খুবই অপছন্দ করেছেন।
আবু সুলাইমান বলতেন, মানুষের অনেক সূক্ষ্ম জ্ঞান-গবেষণা আমি পেয়েছি। সেগুলোর কোনোটিই কুরআন-সুন্নাহের মতো ন্যায়পরায়ণ দুই সাক্ষীর মাধ্যমে যাচাই করা ছাড়া আমি গ্রহণ করিনি।
জুনাইদ বলেছেন, আমাদের ইলম কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে গণ্ডিবদ্ধ। যে ব্যক্তি কুরআন না পড়ে শুধু হাদীস লিপিবদ্ধ করে, আমাদের এই ইলম-জগতে তার অনুসরণ করা হয় না।
এই অঙ্গনটি অনেক বিস্তৃত। অনেকে এর কারণে নিফাক ও ধর্মদ্রোহিতার সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অনেকে এই দাবিও করে বসেছে যে, ওলি-আওলিয়ারা নবীদের থেকেও বেশি সম্মানী। অথবা তারা নবীদের থেকে অমুখাপেক্ষী। এমনকি নবীরা যে শরীয়ত নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে তারা একে অবহেলা করেছে। সৃষ্টি ও স্রষ্টা এক হবার কুফুরীতত্ত্বের অবতারণা করেছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও শরীয়তের অবৈধ জিনিসকে বৈধ হবার দাবি করেছে। এভাবে তারা দ্বীনের ভেতর এমন অনেক কিছু প্রবেশ করিয়েছে, যার সাথে শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই।
তাদের কেউ কেউ ধারণা করেছে যে, মানুষের অন্তর বিগলিত হবার জন্য গান-বাজনা ও নৃত্য করা যাবে। আবার কেউ ধারণা করেছে, মনোজাগতিক চর্চার উদ্দেশ্যে হারাম দৃশ্য ও তার প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাবে। অন্য অনেকে ধারণা করেছে বিনয় অর্জন ও আত্মম্ভরিতা বর্জনের উপায় হলো ছেঁড়া-ফাটা কাপড় পরিধান করা। অথচ এসব বিষয়কে শরীয়ত অনুমোদন করে না। কারণ, এগুলো আল্লাহর স্মরণ ও সালাতের পথে প্রতিবন্ধক হয় এবং দ্বীনকে তামাশার বস্তুতে রূপান্তরিত করে।
সুতরাং উপকারী ইলম হলো কুরআন-সুন্নাহর নুসুসকে আয়ত্ত করা। সেগুলোর অর্থ অনুধাবন করা। কুরআন-হাদীসের অর্থ বোঝা, হারাম-হালালের মাসআলা নিয়ে আলোচনা করা এবং আধ্যাত্মিকতা ও মারেফতের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের থেকে বর্ণিত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। প্রথমেই বিশুদ্ধ বিষয়কে অশুদ্ধ বিষয় থেকে পৃথক করে তারপর তার অর্থ বোঝার বিষয়ে সচেষ্ট থাকা। এর মধ্যেই জ্ঞানীদের জন্য যথেষ্ট খোরাক রয়েছে এবং যারা উপকারী ইলম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় তাদের জন্য যাবতীয় কল্যাণকর উপাদান রয়েছে।

টিকাঃ
১. হাশাবী হলো একটা ভ্রান্ত ফিরকার নাম। যারা দেহবাদী আকীদায় বিশ্বাসী এবং আল্লাহ তাআলার জন্য বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত করে থাকে। এদের মুজাসসিমাও বলা হয়।
২. তাবাকাতুস সুফিয়্যা, পৃষ্ঠা: ৭৮
৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১০/২৫৫

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 ইলমের ফলাফল

📄 ইলমের ফলাফল


যে ব্যক্তি এসব বিষয়ে অবগত হয়ে স্বীয় উদ্দেশ্যকে আল্লাহর জন্য পরিশুদ্ধ করল এবং এই বিষয়ে তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল, তো অবশ্যই তিনি তাকে সাহায্য করবেন, সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন, তাওফীক দান করবেন এবং দ্বীনের বিশুদ্ধ বুঝ প্রদান করবেন। এরপরই এই ইলম কাঙ্ক্ষিত ফলাফল প্রদান করবেড়আর তা হলো আল্লাহকে ভয় করা। যেমন আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে কেবল আলেমরাই তাকে (সত্যিকারের) ভয় করে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন, আল্লাহকে ভয় পাওয়ার জন্য ইলমই যথে। আর তাঁর বিষয়ে ধোঁকায় পতিত হওয়ার জন্য অজ্ঞতাই যথে।
কোনো এক সালাফ বলেছেন, 'অধিক বিষয় বর্ণনা করা প্রকৃত ইলম নয়। বরং প্রকৃত ইলম হচ্ছে আল্লাহকে ভয় করা।'
অন্য আরেকজন বলেছেন, 'যে আল্লাহকে ভয় করে সে প্রকৃত আলেম। • আর যে তাঁর অবাধ্যতা করে সে প্রকৃত জাহেল।' এই বিষয়ে তাদের থেকে আরও বহু বক্তব্য পাওয়া যায়।
এর কারণ হলো, উপকারী ইলম দুইটা জিনিসকে নির্দেশ করে।
→ প্রথম হলো: আল্লাহর পরিচয়, তার উপযুক্ত সুন্দর নামসমূহ ও উচ্চতর গুণসমূহ এবং চমৎকার কর্মসমূহ। এটি তাঁর বড়ত্ব-মহত্ত্ব, ভয়-প্রতিপত্তি, ভালোবাসা-আকাঙ্ক্ষা, তাঁর ওপর ভরসা ও তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং বিপদাপদে সবর করাকে আবশ্যক করে।
→ দ্বিতীয় হলো: আকীদা-বিশ্বাস ও প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথাকাজের ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়ে অবগত হওয়া। যে এসব বিষয় জানবে তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টিপূর্ণ কাজে দ্রুত অগ্রসর হওয়া এবং তাঁর অসন্তুষ্টি ও অপছন্দের কাজ থেকে দূরে সরে থাকা জরুরি হয়ে পড়বে। যখন ইলম তার বাহকের জন্য এমন ফলাফল বয়ে আনবে তখন তাকে বলা হবে উপকারী ইলম। আর ইলম যখন উপকারী হবে এবং আল্লাহর বড়ত্ব তার অন্তরে গেঁথে যাবে তখন অন্তর এমনিতেই বিনয়াবনত হবে। প্রতিপত্তি, বড়ত্ব-মহত্ত্ব ও ভয়-ভালোবাসার দরুন আল্লাহর সামনে মাথানত করবে। আর যখন আল্লাহর সামনে অন্তর মাথানত করবে এবং তার জন্য বিনয়ের বশে ঝুঁকে পড়বে তখন দুনিয়ার সামান্য হালাল জিনিস দ্বারাই সে পরিতৃপ্ত হবে। অল্পে তুষ্টি ও দুনিয়া-বিমুখতা তার অবশ্যই লাভ হবে।
ধন-সম্পদ, পদ-পদবি, বিলাসী জীবনযাপন এগুলোর কারণে আল্লাহ তাআলা আখেরাতে বান্দার নেয়ামতের অংশ কমিয়ে দেন। যদিও সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হয়। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর সহ অন্যান্য সালাফরা তা বলেছেন এবং এই বিষয়ে রাসূল থেকেও বর্ণনা পাওয়া যায়। মূলত এসব প্রত্যেক ধ্বংসশীল বস্তুই অস্থায়ী।
এমন অবস্থায় উপনীত হলে বান্দা ও আল্লাহর মাঝে একটি বিশেষ পরিচয় ও মান-মর্যাদার বন্ধন রচিত হয়। ফলে তখন বান্দা যদি কিছু চায় আল্লাহ তাআলা তা দান করেন। যদি সে তাকে ডাকে তবে তার ডাকে তিনি সাড়া দেন। যেমন হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে,
مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ،
فَأَكُونَ أَنَا سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ،
وَلِسَانَهُ الَّذِي يَنْطِقُ بِهِ، وَقَلْبَهُ الَّذِي يَعْقِلُ بِهِ، فَإِذَا دَعَا
أَجَبْتُهُ، وَإِذَا سَأَلَنِي أَعْطَيْتُهُ، وَإِذَا اسْتَنْصَرَنِي نَصَرْتُهُ
বান্দা নফল ইবাদাতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। এমনকি একসময় আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শ্রবণ করে। তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে। তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে। তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে হাঁটে। যদি সে আমার কাছে চায় তবে অবশ্যই তাকে দান করি। আর যদি আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে আশ্রয় দিই। অন্য বর্ণনায় আছে, যদি আমাকে ডাকে আমি সাড়া দিই।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অসিয়্যাত করেছেন তাতে আছে,
احْفَظ اللهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظ اللهَ تَجِدْهُ أَمَامَكَ،
تَعَرَّفْ إِلَيْهِ فِي الرَّخَاءِ، يَعْرِفْكَ فِي الشَّدَّةِ
আল্লাহকে হেফাজত করো। তিনিও তোমায় হেফাজত করবেন। আল্লাহকে হেফাজত করো। তাহলে তাকে সম্মুখে পাবে। সুখের কালে তুমি আল্লাহর সাথে সদাচার করো। তিনি দুঃখের কালে তোমার সাথে সদাচারকরবেন।
এর মানে হলো, আল্লাহ ও তার বান্দার মধ্যে এর মাধ্যমে একধরনের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে সে আল্লাহকে সব সময় পাশে পায়। নিঃসঙ্গতার সময় কাছে অনুভব করে। তাকে স্মরণ করার এবং তার কাছে চাওয়ার ও তার খেদমত করার স্বাদ লাভ করে। এসব কেবল সেই ব্যক্তির ভাগ্যেই জোটে, যে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আল্লাহর আনুগত্য করে। যেমন উহাইব ইবনে ওয়ারদ কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'গুনাহগার ব্যক্তি কি ইবাদাতের স্বাদ পায়?'
তিনি বললেন, 'না, এমনকি যে ব্যক্তি গুনাহের ইচ্ছা করে সে-ও পায় না।'
যখন বান্দা ইবাদাতের মজা পায় তখন সে মূলত তার রবকে চিনতে পারে। এবং তার ও তার রবের মাঝে বিশেষ এক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে সে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন। তাকে ডাকলে তিনি ডাকে সাড়া দেন। যেমন সাওয়ানা ফুজাইল ইবনে আয়ায কে বললেন, 'আপনার ও আপনার রবের মাঝে কি এমন সম্পর্ক আছে, তাকে ডাকার সাথে সাথে তিনি সাড়া দেন?'
তিনি তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
বান্দা দুনিয়া ও কবরের জীবনে নানা রকম বিপদাপদ ও মুসিবতে পতিত হয়। যদি তার ও তার রবের মাঝে বিশেষ সম্পর্ক থাকে, তাহলে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে করা রাসূল-এর অসিয়্যাতে সেদিকেই ইশারা করা হয়েছে। যেখানে তিনি বলেছিলেন, "সুখের কালে তুমি আল্লাহর সাথে সদাচার করো। তিনি দুঃখের কালে তোমার সাথে সদাচার করবেন।"
মারুফ কারখী কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'মৃত্যু, কবর, হাশর, জান্নাত ও জাহান্নাম এগুলোর মধ্যে কোন জিনিস আপনাকে নির্জনতা অবলম্বনে বেশি উৎসাহিত করে?'
তিনি বললেন, 'এসব কিছুর কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। যদি তাঁর ও তোমার মাঝে পরিচয় থাকে তবে সেটাই এসবের জন্য যথেষ্ট হবে।'
সুতরাং উপকারী ইলম হলো যা বান্দা ও তার রবের মাঝে পরিচয় গড়ে তোলে। তাকে সেদিকে পথ দেখায়। এমনকি এক সময় সে নিজেই তাকে চিনে নিতে পারে। তার ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। তাকে এমনভাবে লজ্জা পেতে থাকে যেন তিনি তাকে দেখছেন। এ কারণেই সাহাবীদের অনেকেই বলেছেন, 'মানুষ থেকে সর্বপ্রথম যে ইলম তুলে নেওয়া হবে তা হলো বিনয় ও নম্রতা।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন, কিছু মানুষ কুরআন তেলাওয়াত করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তবে যদি সেটা অন্তরে গিয়ে মজবুতভাবে গেঁথে যায় তবে উপকার করবে।
হাসান বসরী বলেছেন, ইলম দুই প্রকার। এক. মৌখিক ইলম। এটি আল্লাহর দরবারে আদমসন্তানদের বিরুদ্ধে অবস্থান করবে। দুই. অন্তরের ইলম। এটিই হলো উপকারী ইলম।
সালাফে সালেহীনরা বলতেন, আলেম তিন ধরনের। এক, আল্লাহ ও তার বিধানাবলি উভয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। দুই, শুধু আল্লাহর সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। তার বিধানাবলি বিষয়ে জ্ঞান রাখে না। তিন, শুধু আল্লাহর বিধানাবলি সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। তার বিষয়ে জ্ঞান রাখে না।
এদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে প্রথম জন। যে আল্লাহকে ভয় করে এবং তার হুকুম-আহকাম সম্পর্কেও অবগত। মোটকথা, বান্দা ইলমের সহায়তায় তার রবকে খোঁজে এবং তার সাথে পরিচিত হয়। যখন আল্লাহর সাথে তার পরিচয় ঘটে তখন সে তাকে তার নিকটে দেখতে পায়। যখন সে তাকে নিকটে দেখতে পায় তখন তিনিও তাকে কাছে টেনে নেন এবং তার প্রার্থনায় সাড়া দেন। যেমন ইসরাইলী বর্ণনায় এসেছে,
হে আদমসন্তান, আমাকে খোঁজ করো তবেই আমাকে পাবে। যখন তুমি আমাকে পাবে তখন सबकुछই পাবে। আর যদি আমাকে হারাও তবে सबकुछই হারাবে। আমি তোমার কাছে सबकुछ থেকে বেশি প্রিয়।
জুন্নুন মিসরী রাতের বেলা এই কবিতাগুলো বার বার আবৃত্তি করতেন,
أطلبوا لأنفُسِكُم ... مِثْلَ مَا وَجَدتُ أَنا
قَد وَجَدتُ لِي سَكَناً ... لَيسَ فِي هَواهُ عَنا
إِن بَعُدتُ قَرَّبَنِي ... أَو قَرُبْتُ مِنهُ دَنا
নিজের জন্য তালাশ করো যা পেয়েছি আমি
নিরুপদ্রব শান্ত শীতল দারুণ একটি বাড়ি।
দূরে গেলে কাছে টানে কাছে যদি আসি
আরও বেশি নৈকট্যের গভীর জলে ভাসি।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল মারুফ কারখী এর ব্যাপারে বলতেন, 'তাঁর কাছে প্রকৃত ইলম তথা আল্লাহর ভয় রয়েছে।'
বোঝা গেল, প্রকৃত ইলম হচ্ছে আল্লাহর সম্পর্কে এমনভাবে অবগত হওয়া যা আবশ্যিকভাবে তাকে ভয় করতে, তাকে ভালোবাসতে, তার কাছাকাছি হতে এবং তার প্রতি আগ্রহী হতে সহায়তা করে। এরপর আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও বান্দার যেসব কথা-কাজ ও অবস্থা-বিশ্বাস তাকে সন্তুষ্ট করে সেসব বিষয়ে অবগত হওয়া। যার মাঝে এই দুইটি বিষয়ের বাস্তবায়ন ঘটবে তার ইলমই হবে উপকারী ইলম। এমন ব্যক্তি উপকারী ইলম লাভের পাশাপাশি বিনম্র অন্তর, পরিতুষ্ট মন এবং কবুলযোগ্য দুআও অর্জন করবে।

টিকাঃ
১. সূরা ফাতির, (৩৫): ২৮
২. কিতাবুয যুহদ, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, পৃষ্ঠা: ১৫
৩. সহীহুল বুখারী, হাদীস নং: ৬৫০২
৪. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৬১৯৩
৫. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৭৬৩
৬. আবু নুয়াইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪৪
৭. সুনানে দারেমী: ১/১০২
৮. দারেমী: ১/১০২; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী: ১/৩২৬
৯. কথাগুলোর কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি।

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 অনুপকারী ইলমের বিপদ

📄 অনুপকারী ইলমের বিপদ


উপকারী ইলম থেকে যে বঞ্চিত হবে সে এমন চারটি আপদে পতিত হবে, যার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তখন তার ইলমই তার বিপদের কারণ হবে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। ফলে তা তার কোনো উপকারে আসবে না। কারণ, তার অন্তরে স্বীয় রবের প্রতি কোনো ভয় নেই। তার মন দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট নয়; বরং সে লোভের বশবর্তী হয়ে আরও বেশি জিনিস কামনা করে। স্বীয় রবের আদেশ পালন না করার এবং তার অপছন্দের জিনিস থেকে দূরে না থাকার কারণে তার প্রার্থনাও কবুল করা হয় না।
এসব হলো সেই ইলমের আলোচনা যার থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব। তা হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত ইলম। আর যদি ইলম হয় অন্য কিছু থেকে অর্জিত, তবে তো সেটি সত্তাগতভাবেই অনুপকারী। এর থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। উপকারের চেয়ে বরং এর ক্ষতির দিকটাই প্রবল।
অনুপকারী ইলমের আলামত
অনুপকারী ইলমের আলামত হলো, যে এটি অর্জন করবে তার উদ্দেশ্য হবে দম্ভ-গর্ব, অহংকার-অহমিকা ও দুনিয়ার মান-মর্যাদা তলব করা। দুনিয়াবী বিষয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, উলামায়ে কেরামের সাথে বিবাদে জড়ানো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের সাথে বিতর্ক করা এবং মানুষের মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِذلِكَ فَالنَّارِ فالنار
যে ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করবে তার জন্য জাহান্নাম, জাহান্নাম।
এই ধরনের ইলমের বাহকেরা অনেক সময় আল্লাহর মারেফত লাভ ও তাকে তলব করার এবং অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হবার কথা বলে থাকেন। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে রাজা-বাদশাসহ অন্যান্য মানুষদের মনে জায়গা করে নেওয়া। তাদের অন্তরে নিজেদের ব্যাপারে সুধারণা সৃষ্টি করা। ভক্তবৃন্দের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করা। এসব বোঝার মাধ্যম হলো, ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের মতো ওলি হওয়ার প্রকাশ্য দাবি করা। যেমন কারামিতা-বাতেনী দলের লোকেরা এমন দাবি করেছিল। সালাফে সালেহীনের পথ ছিল এরচেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় নিজেদের ছোট ও তুচ্ছ মনে করতেন।
আমর বলেছেন, যে নিজেকে আলেম বলবে সে আসলে জাহেল। আর যে নিজেকে মুমিন বলবে সে মূলত কাফের। আর যে বলবে সে জান্নাতে থাকবে সে আসলে জাহান্নামে যাবে।
অনুপকারী ইলমের আরেকটি আলামত হলো, সত্যকে গ্রহণ না করা। তার প্রতি নিজেকে সঁপে না দেওয়া এবং যিনি সত্য বলছেন তার সামনে অহংকারপূর্ণ আচরণ করা। বিশেষ করে যদি তিনি হন মানুষের চোখে তার চেয়ে নিম্নমানের। এমনিভাবে মিথ্যাকে আঁকড়ে রাখা এই ভয়ে যে, সত্যকে মেনে নিলে মানুষের মনোযোগ তার থেকে সরে যাবে।
অনেক সময় এমন ব্যক্তি মানুষজনের সামনে মুখে মুখে নিজের বদনাম গায়। নিজেকে তুচ্ছ হিসাবে প্রকাশ করে। যাতে করে তার ব্যাপারে মানুষ ভাবে যে, সে তো নিজেকে অনেক ছোট মনে করে। এভাবে কৌশলে অন্যদের থেকে প্রশংসা আদায় করা হয়ে যাবে। এটা হলো এক প্রকারের সূক্ষ্ম লৌকিকতা। এই বিষয়ে তাবেয়ীনে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী উলামায়ে কেরাম সতর্ক করে গিয়েছেন।
লৌকিক বিনয়-প্রদর্শনকারী ব্যক্তির থেকে প্রশংসা বাক্য সাদরে গ্রহণ করা ও এর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করার বিষয়টিও পাওয়া যায়। যা পরিপূর্ণরূপে ইখলাস ও সততার পরিপন্থী। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে কপটতার আশঙ্কা করে। মন্দ-মৃত্যুর ভয়ে দিনাতিপাত করে। ফলে সে নিজের প্রশংসা ও সুনাম-সুখ্যাতি থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করে।
উপকারী ইলমের আলামত
এই কারণেই উপকারী ইলমের বাহক যারা তাদের আলামত হলো, তারা নিজেদের জন্য আলাদা কোনো সম্মান-প্রতিপত্তি কামনা করে না। অন্তরের অন্তস্তল থেকে প্রশংসা ও সুনামকে ঘৃণা করে। কারও ওপর অহংকারী ভাব প্রকাশ করে না। হাসান বসরী বলেছেন,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত, আখেরাতের প্রতি আসক্ত, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃসিম্পন্ন ও স্বীয় রবের ইবাদাতের ব্যাপারে যত্নবান।
তার থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় আছে,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে তারচেয়ে উন্নত ব্যক্তিকে হিংসা করে না, তারচেয়ে অনুন্নত ব্যক্তিকে বিদ্রূপ করে না, আল্লাহ তাকে যে ইলম দান করেছেন তার বিনিময় গ্রহণ করে না।
এই শেষ কথার অনুরূপ অর্থ আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন, 'আলেমের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে বিনয়ী হবার জন্য মাথায় মাটি রাখা।' এর কারণ হলো, রবের ব্যাপারে যে যত বেশি জানবে ও তার সাথে যত বেশি পরিচিত হবে ততই ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। তার প্রতি আনুগত্য ও বিনয় আরও বেশি পরিমাণে হবে।
উপকারী ইলমের আরেকটা আলামত হলো, এই ইলম তার বাহককে দুনিয়া থেকে পলায়ন করতে শেখাবে। যার সবচেয়ে উচ্চস্তর হলো, নেতৃত্ব এবং সুনাম-সুখ্যাতি। এগুলো থেকে দূরে থাকা এবং এসব জিনিস এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হলো উপকারী ইলমের আলামত। যদি কখনো অনিচ্ছায় দুনিয়াবী এসব বিষয়ে জড়িয়ে যায়, তাহলে এর বাহক শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। তার এমন অবস্থা হয়, তিনি এটাকে একটা ফাঁদ ও ছাড় বলে মনে করেন। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার সুনাম-সুখ্যাতি দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাবার ফলে নিজের ব্যাপারে এমন ভয় করতেন।
উপকারী ইলমের বাহক কখনো ইলমের দাবি করেন না এবং এ নিয়ে কারও সাথে গর্বও করেন না। অন্য কাউকে মূর্খ সাব্যস্ত করেন না। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সুন্নাহ ও আহলে সুন্নাহর বিরুদ্ধাচারণ করে তার কথা ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর জন্য রাগত স্বরে কথা বলেন। কারও ওপর নিজের বড়াই জাহের করার জন্য নয়।
উপকারী ও অনুপকারী ইলমের পার্থক্য
যে ব্যক্তির ইলম অনুপকারী, মানুষের ওপর অহংকার করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। সে তাদের ওপর নিজের ইলমের বড়ত্ব জাহির করে এবং তাদের মূর্খ সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করে। নিজেকে বড় করে প্রকাশ করার জন্য তাদের খাটো করে। এটি খুবই নোংরা ও নিম্নমানের স্বভাব। এমন লোক অনেক সময় তার পূর্বেকার উলামায়ে কেরামকে মূর্খ, অসচেতন ও ভুলেভরা সাব্যস্ত করতে চায়। ফলে আবশ্যিকভাবেই নিজেকে সে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজেকে ভালো আর পূর্ববর্তী মানুষদের খারাপ ভাবে।
কিন্তু উপকারী ইলমের বাহক উলামায়ে কেরাম ঠিক এর বিপরীত হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের মন্দ আর পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামকে ভালো মনে করেন। আন্তরিকভাবেই তাদের মর্যাদার কথা স্বীকার করেন। নিজেদের অক্ষমতা এবং তাদের স্তরে পৌঁছা বা এর কাছাকাছি যাওয়ার অসম্ভবতাকে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেন।
ইমাম আবু হানীফা কত সুন্দর উত্তর দিয়েছেন যখন তাকে আলকামা আর আসওয়াদ রাহিমাহুমাল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি মর্যাদাবান? তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'আমরা তো তাদের নাম উচ্চারণেরও যোগ্য নই। মান-নির্ণয় তো অনেক দূরের বিষয়।'
ইবনুল মুবারক সালাফদের আলোচনা করার সময় এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন,
সালাফদের কথা যখন বলো তখন আমাদের কথা বলা থেকে বিরত থাকো; কারণ, সুস্থ চলন্ত মানুষ কখনো বসে থাকা ব্যক্তির মতো নয়।
অনুপকারী ইলমধারীর ভুল ধারণা
যাদের ইলম অনুপকারী তারা যখন পূর্ববর্তী কারও ওপর নিজের কথার ও বাক্চাতুর্যের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তখন সে এটাকে আল্লাহর দরবারে নিজের ইলমের মর্যাদা ভেবে বসে থাকে। কারণ, সে তার পূর্ববর্তীদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের জিনিস লাভ করেছে। তখন সে পূর্ববর্তীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। স্বল্পজ্ঞানের কারণে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবে। কিন্তু এই বেচারা জানে না যে, সালাফদের কম কথা বলাটা আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় ও তাকওয়ার কারণে ছিল। যদি তারা বেশি কথা বলতে চাইতেন তবে তা অনায়াসে পারতেন। যেমন আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস একবার কিছু লোককে দ্বীনী বিষয়ে তর্ক করতে শুনে বললেন,
তোমরা কি জানো না যে, আল্লাহর ভয় তাঁর কিছু বান্দাকে চুপ করিয়ে রেখেছে। তারা বোবাও নয়, বধিরও নয়। তারাই হলেন প্রকৃত ইলমের অধিকারী বাগ্মী ও মহান মনীষী। তবে আল্লাহর বড়ত্বের কথা ভেবে তাদের হৃদয়-মন ভীত ও তাদের জিহ্বা নিশ্চল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম তিরমিজী সাহাবী আবু উমামা থেকে রাসূল-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْبَذَاءُ
وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النَّفَاقِ
লজ্জা ও চুপ থাকা ঈমানের দুটি অংশ। আর অশ্লীলতা ও বেশি কথা বলা মুনাফিকির দুটি অংশ।
ইমাম তিরমিজী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকেম ও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান তার হাদীসগ্রন্থ সহীহ ইবনে হিব্বানে সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
الْبَيَانُ مِنَ اللهِ وَالْعِيُّ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلَيْسَ الْبَيَانُ
كَثْرَةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنَّ الْبَيَانَ الْفَضْلُ فِي الْحَقِّ،
وَلَيْسَ الْعِيُّ قِلَّةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنْ مَنْ سفه الحق
বলতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর চুপ করে থাকা শয়তানের পক্ষ থেকে। বেশি কথা বলাকে 'বলতে পারা' হিসাবে গণ্য করা হয় না। বরং বলতে পারার মানে হলো সত্য কথায় স্পবাদিতা অবলম্বন করা। এমনিভাবে কম কথা বলার মানে চুপ থাকা নয়; বরং এর মানে হলো সত্যকে আড়াল করা।
মারাসীলে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল-কুরজিতে আছে, রাসূল বলেছেন,
ثلاث ينقص بهن العبد في الدنيا و يدرك بهن في الآخرة
ما هو أعظم من ذلك الرحم و الحياء وعي اللسان
তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, যার কারণে দুনিয়াতে বান্দার ক্ষতি হলেও এর বিনিময়ে আখেরাতে সে এরচেয়ে বড় জিনিস লাভ করবে। সেগুলো হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক, লজ্জা এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা।
আওন ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,
তিনটি জিনিস ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। লজ্জা, সচ্চরিত্র এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা। এগুলো আখেরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করলেও দুনিয়াতে হ্রাস ঘটায়। আর আখেরাতে বৃদ্ধিকারী বস্তু দুনিয়াতে হ্রাস ঘটানো বস্তুর চেয়ে উত্তম।
দুর্বল সূত্রে এটি মারফু হাদীস হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন,
যদি কোনো ব্যক্তি কিছু মানুষের অভিমুখী হয়ে বসে এবং তারা তার মাঝে নীরবতা পরিলক্ষণ করে, অথচ তিনি বোবা নন, তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি একজন মুসলিম ফকীহ।
যে ব্যক্তি সালাফদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পেরেছে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব যে, তাদের চুপ থাকাটা অতিরিক্ত কথা ও তর্ক-বিতর্ককে পরিহার করার জন্য ছিল। সুতরাং যারা তাদের পথে চলবে, তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। আর যারা অন্যদের পথে চলবে এবং বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও তর্ক-বিতর্ক করার মধ্যে জড়াবে, তবে সালাফদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেবে এবং নিজেদের ত্রুটির কথা মেনে নেবে তাদের অবস্থাও ওদের কাছাকাছি হবে।
ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের দোষের স্বীকারোক্তি দেয় না সে হলো নির্বোধ।'
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনার কী দোষ আছে?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'বেশি কথা বলা।
আর যদি সে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত্রে মর্যাদার আর তার পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ত্রুটি ও অজ্ঞতার দাবি করে, তবে সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট এবং বিরাট বড় ক্ষতিগ্রস্ত।

টিকাঃ
১. সাহাবী যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল বলতেন, اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অনুপকারী ইলম, অবিনীত অন্তর, অপরিতৃপ্ত আত্মা এবং অগ্রহণযোগ্য দোআ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২২
২. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৫৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২৯০
৩. নিঃসন্দেহে এটি অদৃশ্যের বিষয়। যার সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
৪. কিতাবুয যুহদ, ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা: ২৬৭
৫. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১১৩
৬. মুসনাদে ইমাম আহমাদ, হাদীস নং: ২২৩১২; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২০২৭
৭. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২০১০
৮. আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৪২,১৪৩
৯. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৩/১২৪

উপকারী ইলম থেকে যে বঞ্চিত হবে সে এমন চারটি আপদে পতিত হবে, যার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তখন তার ইলমই তার বিপদের কারণ হবে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। ফলে তা তার কোনো উপকারে আসবে না। কারণ, তার অন্তরে স্বীয় রবের প্রতি কোনো ভয় নেই। তার মন দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট নয়; বরং সে লোভের বশবর্তী হয়ে আরও বেশি জিনিস কামনা করে। স্বীয় রবের আদেশ পালন না করার এবং তার অপছন্দের জিনিস থেকে দূরে না থাকার কারণে তার প্রার্থনাও কবুল করা হয় না।
এসব হলো সেই ইলমের আলোচনা যার থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব। তা হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত ইলম। আর যদি ইলম হয় অন্য কিছু থেকে অর্জিত, তবে তো সেটি সত্তাগতভাবেই অনুপকারী। এর থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। উপকারের চেয়ে বরং এর ক্ষতির দিকটাই প্রবল।
অনুপকারী ইলমের আলামত
অনুপকারী ইলমের আলামত হলো, যে এটি অর্জন করবে তার উদ্দেশ্য হবে দম্ভ-গর্ব, অহংকার-অহমিকা ও দুনিয়ার মান-মর্যাদা তলব করা। দুনিয়াবী বিষয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, উলামায়ে কেরামের সাথে বিবাদে জড়ানো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের সাথে বিতর্ক করা এবং মানুষের মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِذلِكَ فَالنَّارِ فالنار
যে ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করবে তার জন্য জাহান্নাম, জাহান্নাম।
এই ধরনের ইলমের বাহকেরা অনেক সময় আল্লাহর মারেফত লাভ ও তাকে তলব করার এবং অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হবার কথা বলে থাকেন। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে রাজা-বাদশাসহ অন্যান্য মানুষদের মনে জায়গা করে নেওয়া। তাদের অন্তরে নিজেদের ব্যাপারে সুধারণা সৃষ্টি করা। ভক্তবৃন্দের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করা। এসব বোঝার মাধ্যম হলো, ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের মতো ওলি হওয়ার প্রকাশ্য দাবি করা। যেমন কারামিতা-বাতেনী দলের লোকেরা এমন দাবি করেছিল। সালাফে সালেহীনের পথ ছিল এরচেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় নিজেদের ছোট ও তুচ্ছ মনে করতেন।
আমর বলেছেন, যে নিজেকে আলেম বলবে সে আসলে জাহেল। আর যে নিজেকে মুমিন বলবে সে মূলত কাফের। আর যে বলবে সে জান্নাতে থাকবে সে আসলে জাহান্নামে যাবে।
অনুপকারী ইলমের আরেকটি আলামত হলো, সত্যকে গ্রহণ না করা। তার প্রতি নিজেকে সঁপে না দেওয়া এবং যিনি সত্য বলছেন তার সামনে অহংকারপূর্ণ আচরণ করা। বিশেষ করে যদি তিনি হন মানুষের চোখে তার চেয়ে নিম্নমানের। এমনিভাবে মিথ্যাকে আঁকড়ে রাখা এই ভয়ে যে, সত্যকে মেনে নিলে মানুষের মনোযোগ তার থেকে সরে যাবে।
অনেক সময় এমন ব্যক্তি মানুষজনের সামনে মুখে মুখে নিজের বদনাম গায়। নিজেকে তুচ্ছ হিসাবে প্রকাশ করে। যাতে করে তার ব্যাপারে মানুষ ভাবে যে, সে তো নিজেকে অনেক ছোট মনে করে। এভাবে কৌশলে অন্যদের থেকে প্রশংসা আদায় করা হয়ে যাবে। এটা হলো এক প্রকারের সূক্ষ্ম লৌকিকতা। এই বিষয়ে তাবেয়ীনে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী উলামায়ে কেরাম সতর্ক করে গিয়েছেন।
লৌকিক বিনয়-প্রদর্শনকারী ব্যক্তির থেকে প্রশংসা বাক্য সাদরে গ্রহণ করা ও এর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করার বিষয়টিও পাওয়া যায়। যা পরিপূর্ণরূপে ইখলাস ও সততার পরিপন্থী। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে কপটতার আশঙ্কা করে। মন্দ-মৃত্যুর ভয়ে দিনাতিপাত করে। ফলে সে নিজের প্রশংসা ও সুনাম-সুখ্যাতি থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করে।
উপকারী ইলমের আলামত
এই কারণেই উপকারী ইলমের বাহক যারা তাদের আলামত হলো, তারা নিজেদের জন্য আলাদা কোনো সম্মান-প্রতিপত্তি কামনা করে না। অন্তরের অন্তস্তল থেকে প্রশংসা ও সুনামকে ঘৃণা করে। কারও ওপর অহংকারী ভাব প্রকাশ করে না। হাসান বসরী বলেছেন,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত, আখেরাতের প্রতি আসক্ত, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃসিম্পন্ন ও স্বীয় রবের ইবাদাতের ব্যাপারে যত্নবান।
তার থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় আছে,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে তারচেয়ে উন্নত ব্যক্তিকে হিংসা করে না, তারচেয়ে অনুন্নত ব্যক্তিকে বিদ্রূপ করে না, আল্লাহ তাকে যে ইলম দান করেছেন তার বিনিময় গ্রহণ করে না।
এই শেষ কথার অনুরূপ অর্থ আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন, 'আলেমের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে বিনয়ী হবার জন্য মাথায় মাটি রাখা।' এর কারণ হলো, রবের ব্যাপারে যে যত বেশি জানবে ও তার সাথে যত বেশি পরিচিত হবে ততই ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। তার প্রতি আনুগত্য ও বিনয় আরও বেশি পরিমাণে হবে।
উপকারী ইলমের আরেকটা আলামত হলো, এই ইলম তার বাহককে দুনিয়া থেকে পলায়ন করতে শেখাবে। যার সবচেয়ে উচ্চস্তর হলো, নেতৃত্ব এবং সুনাম-সুখ্যাতি। এগুলো থেকে দূরে থাকা এবং এসব জিনিস এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হলো উপকারী ইলমের আলামত। যদি কখনো অনিচ্ছায় দুনিয়াবী এসব বিষয়ে জড়িয়ে যায়, তাহলে এর বাহক শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। তার এমন অবস্থা হয়, তিনি এটাকে একটা ফাঁদ ও ছাড় বলে মনে করেন। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার সুনাম-সুখ্যাতি দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাবার ফলে নিজের ব্যাপারে এমন ভয় করতেন।
উপকারী ইলমের বাহক কখনো ইলমের দাবি করেন না এবং এ নিয়ে কারও সাথে গর্বও করেন না। অন্য কাউকে মূর্খ সাব্যস্ত করেন না। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সুন্নাহ ও আহলে সুন্নাহর বিরুদ্ধাচারণ করে তার কথা ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর জন্য রাগত স্বরে কথা বলেন। কারও ওপর নিজের বড়াই জাহের করার জন্য নয়।
উপকারী ও অনুপকারী ইলমের পার্থক্য
যে ব্যক্তির ইলম অনুপকারী, মানুষের ওপর অহংকার করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। সে তাদের ওপর নিজের ইলমের বড়ত্ব জাহির করে এবং তাদের মূর্খ সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করে। নিজেকে বড় করে প্রকাশ করার জন্য তাদের খাটো করে। এটি খুবই নোংরা ও নিম্নমানের স্বভাব। এমন লোক অনেক সময় তার পূর্বেকার উলামায়ে কেরামকে মূর্খ, অসচেতন ও ভুলেভরা সাব্যস্ত করতে চায়। ফলে আবশ্যিকভাবেই নিজেকে সে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজেকে ভালো আর পূর্ববর্তী মানুষদের খারাপ ভাবে।
কিন্তু উপকারী ইলমের বাহক উলামায়ে কেরাম ঠিক এর বিপরীত হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের মন্দ আর পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামকে ভালো মনে করেন। আন্তরিকভাবেই তাদের মর্যাদার কথা স্বীকার করেন। নিজেদের অক্ষমতা এবং তাদের স্তরে পৌঁছা বা এর কাছাকাছি যাওয়ার অসম্ভবতাকে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেন।
ইমাম আবু হানীফা কত সুন্দর উত্তর দিয়েছেন যখন তাকে আলকামা আর আসওয়াদ রাহিমাহুমাল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি মর্যাদাবান? তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'আমরা তো তাদের নাম উচ্চারণেরও যোগ্য নই। মান-নির্ণয় তো অনেক দূরের বিষয়।'
ইবনুল মুবারক সালাফদের আলোচনা করার সময় এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন,
সালাফদের কথা যখন বলো তখন আমাদের কথা বলা থেকে বিরত থাকো; কারণ, সুস্থ চলন্ত মানুষ কখনো বসে থাকা ব্যক্তির মতো নয়।
অনুপকারী ইলমধারীর ভুল ধারণা
যাদের ইলম অনুপকারী তারা যখন পূর্ববর্তী কারও ওপর নিজের কথার ও বাক্চাতুর্যের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তখন সে এটাকে আল্লাহর দরবারে নিজের ইলমের মর্যাদা ভেবে বসে থাকে। কারণ, সে তার পূর্ববর্তীদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের জিনিস লাভ করেছে। তখন সে পূর্ববর্তীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। স্বল্পজ্ঞানের কারণে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবে। কিন্তু এই বেচারা জানে না যে, সালাফদের কম কথা বলাটা আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় ও তাকওয়ার কারণে ছিল। যদি তারা বেশি কথা বলতে চাইতেন তবে তা অনায়াসে পারতেন। যেমন আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস একবার কিছু লোককে দ্বীনী বিষয়ে তর্ক করতে শুনে বললেন,
তোমরা কি জানো না যে, আল্লাহর ভয় তাঁর কিছু বান্দাকে চুপ করিয়ে রেখেছে। তারা বোবাও নয়, বধিরও নয়। তারাই হলেন প্রকৃত ইলমের অধিকারী বাগ্মী ও মহান মনীষী। তবে আল্লাহর বড়ত্বের কথা ভেবে তাদের হৃদয়-মন ভীত ও তাদের জিহ্বা নিশ্চল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম তিরমিজী সাহাবী আবু উমামা থেকে রাসূল-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْبَذَاءُ
وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النَّفَاقِ
লজ্জা ও চুপ থাকা ঈমানের দুটি অংশ। আর অশ্লীলতা ও বেশি কথা বলা মুনাফিকির দুটি অংশ।
ইমাম তিরমিজী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকেম ও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান তার হাদীসগ্রন্থ সহীহ ইবনে হিব্বানে সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
الْبَيَانُ مِنَ اللهِ وَالْعِيُّ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلَيْسَ الْبَيَانُ
كَثْرَةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنَّ الْبَيَانَ الْفَضْلُ فِي الْحَقِّ،
وَلَيْسَ الْعِيُّ قِلَّةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنْ مَنْ سفه الحق
বলতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর চুপ করে থাকা শয়তানের পক্ষ থেকে। বেশি কথা বলাকে 'বলতে পারা' হিসাবে গণ্য করা হয় না। বরং বলতে পারার মানে হলো সত্য কথায় স্পবাদিতা অবলম্বন করা। এমনিভাবে কম কথা বলার মানে চুপ থাকা নয়; বরং এর মানে হলো সত্যকে আড়াল করা।
মারাসীলে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল-কুরজিতে আছে, রাসূল বলেছেন,
ثلاث ينقص بهن العبد في الدنيا و يدرك بهن في الآخرة
ما هو أعظم من ذلك الرحم و الحياء وعي اللسان
তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, যার কারণে দুনিয়াতে বান্দার ক্ষতি হলেও এর বিনিময়ে আখেরাতে সে এরচেয়ে বড় জিনিস লাভ করবে। সেগুলো হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক, লজ্জা এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা।
আওন ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,
তিনটি জিনিস ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। লজ্জা, সচ্চরিত্র এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা। এগুলো আখেরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করলেও দুনিয়াতে হ্রাস ঘটায়। আর আখেরাতে বৃদ্ধিকারী বস্তু দুনিয়াতে হ্রাস ঘটানো বস্তুর চেয়ে উত্তম।
দুর্বল সূত্রে এটি মারফু হাদীস হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন,
যদি কোনো ব্যক্তি কিছু মানুষের অভিমুখী হয়ে বসে এবং তারা তার মাঝে নীরবতা পরিলক্ষণ করে, অথচ তিনি বোবা নন, তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি একজন মুসলিম ফকীহ।
যে ব্যক্তি সালাফদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পেরেছে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব যে, তাদের চুপ থাকাটা অতিরিক্ত কথা ও তর্ক-বিতর্ককে পরিহার করার জন্য ছিল। সুতরাং যারা তাদের পথে চলবে, তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। আর যারা অন্যদের পথে চলবে এবং বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও তর্ক-বিতর্ক করার মধ্যে জড়াবে, তবে সালাফদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেবে এবং নিজেদের ত্রুটির কথা মেনে নেবে তাদের অবস্থাও ওদের কাছাকাছি হবে।
ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের দোষের স্বীকারোক্তি দেয় না সে হলো নির্বোধ।'
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনার কী দোষ আছে?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'বেশি কথা বলা।
আর যদি সে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত্রে মর্যাদার আর তার পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ত্রুটি ও অজ্ঞতার দাবি করে, তবে সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট এবং বিরাট বড় ক্ষতিগ্রস্ত।

টিকাঃ
১. সাহাবী যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল বলতেন, اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অনুপকারী ইলম, অবিনীত অন্তর, অপরিতৃপ্ত আত্মা এবং অগ্রহণযোগ্য দোআ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২২
২. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৫৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২৯০
৩. নিঃসন্দেহে এটি অদৃশ্যের বিষয়। যার সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
৪. কিতাবুয যুহদ, ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা: ২৬৭
৫. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১১৩
৬. মুসনাদে ইমাম আহমাদ, হাদীস নং: ২২৩১২; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২০২৭
৭. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২০১০
৮. আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৪২,১৪৩
৯. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৩/১২৪

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 আলেমদের কর্তব্য

📄 আলেমদের কর্তব্য


মোটকথা, বর্তমানের এই নষ্ট যুগে একজন মানুষ হয়তো আল্লাহর কাছে আলেম হিসাবে পরিচিত হওয়াকে নিজের জন্য সন্তুষ্টিজনক মনে করবে। অথ বা সে তার যুগের মানুষদের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে পরিচিত করাতে উদ্‌গ্রীব হবে। যদি সে প্রথম অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহর অবগতিই তার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। কারণ, যার সাথে আল্লাহর পরিচয় থাকে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট হয়। আর যে মানুষের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে সে রাসূল-এর এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হবে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُبَاهِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ، أَوْ
لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ
النَّاسِ إِلَيْهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করে এর মাধ্যমে আলেমদের সাথে প্রতিযোগিতা করার বা মূর্খদের সাথে তর্ক করার উদ্দেশ্যে অথবা এর সহায়তায় নিজের দিকে মানুষের দৃআিকর্ষণ করাতে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে বানিয়েনিল।
উহাইব ইবনে ওয়ারদ বলেন, 'এমন অনেক আলেম আছে যাদের মানুষ আলেম বলে ডাকলেও আল্লাহর দরবারে সে জাহেলদের দলভুক্ত।'
সহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَنْ تسعر به النار ثلاثة، أَحَدُهُمْ مَنْ قَرَأُ القُرْآنَ وَ
تَعَلَّمَ الْعِلْمَ ليُقَالَ هُوَ قَارِئُ وَ هُوَ عَالِمٌ، وَيُقَالُ لَهُ: قد قِيلَ
ذلِكَ، ثُمَّ أَمرَبِه فَيُسْحَبُ على وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ...
যাদের মাধ্যমে সর্বপ্রথম জাহান্নামকে প্রজ্বলিত করা হবে, তারা তিন শ্রেণির লোক। এক. যে কুরআন পড়েছে এবং ইলম অর্জন করেছে এই উদ্দেশ্যে যে, তাকে কারী বা আলেম বলা হবে। তাকে ডেকে বলা হবে, তোমাকে তা বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে, তখন তাকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে...।
কিতাবের প্রতি ঈমান আনার এবং গরুর গোশতের সংস্পর্শে নিহত ব্যক্তির জীবিত হওয়ার মতো নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করার পরেও অন্তরের কাঠিন্যের দরুন আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদের যে নিন্দা করেছেন, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। আমাদের তাদের মতো হতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا
نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ
فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
যারা মুমিন তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদের পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।
অন্য জায়গায় তাদের অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে,
فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً
অতএব তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদের ওপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিয়েছি।
আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিলেন যে, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া ছিল আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকারভঙ্গের শাস্তি। তা হলো, তার আদেশ লঙ্ঘন করা এবং নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া। অথচ তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, তারা তা করবে না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ
তারা কালামকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা তা থেকে উপকার লাভ করার বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছে।
উল্লেখ করা হলো, তাদের অন্তর কঠিন হওয়া দুইটি জিনিসকে তাদের জন্য অত্যাবশ্যক করেছে। এক. কালামকে তার স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা। দুই. তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তা বিস্মৃত হওয়া। অর্থাৎ তাদের যে প্রজ্ঞা ও সুন্দর নসীহত প্রদান করা হয়েছিল তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করার ফলে সেটা তারা ভুলে গিয়েছে এবং তার ওপর আমল করা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার কারণে এই দুইটি বিষয় এই উম্মতের সেসব আলেমদের মধ্যেও পাওয়া যায়, যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। প্রথমটি হলো, কালামকে বিকৃত করা। কারণ, যে আমল ছাড়াই ফিকহের জ্ঞান হাসিল করে তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়। ফলে সে পরবর্তী সময় আর আমলের প্রতি তেমন মনোযোগী হতে পারে না। বরং সে কালামকে বিকৃত করা এবং কুরআন-সুন্নাহর শব্দাবলিকে তার আপন স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা ও সূক্ষ্ম কৌশলের মাধ্যমে একে দূরবর্তী রূপকার্থে প্রয়োগ করার প্রতি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যেখানে আল্লাহর কালামের শব্দকে আঘাত করতে সক্ষম হয় না সেখানে সুন্নাহের শব্দকে আঘাত করে থাকে। যারা সরাসরি নস বা মূল বক্তব্যকে আঁকড়ে ধরে এবং এর থেকে যে অর্থ বুঝে আসে তাকে সেই অর্থেই প্রয়োগ করে, তাদের নিন্দা করে। তাদের অজ্ঞ এবং 'হাশাবী' বলে আখ্যায়িত করে। এই বিষয়টি আকীদার মূলনীতি বিষয়ক কালামবিদদের মধ্যে এবং রায়পন্থী ফুকাহায়ে কেরাম ও দর্শনপন্থী সুফীদের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
রায়পন্থীরা তাদের কোনো শায়েখ থেকে নিজেদের কিতাবে উল্লেখ করেছে, প্রত্যেক ইলমের ফলাফল তার মর্যাদাকে প্রকাশ করে। সুতরাং যারা ইলমে তাফসীরের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের লক্ষ্য হলো, মানুষের কাছে ঘটনাবলি বর্ণনা করা এবং ওয়াজ করা। আর যারা নিজেদের রায় এবং ইলম নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা ফতওয়া প্রদান করে, বিচারকার্য পরিচালনা করে, হাকেম হয়, দরস প্রদান করে। এ সমস্ত ব্যক্তিদের তাদের সাথে মিল রয়েছে যাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে,
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং তারা পরকালের খবর রাখে না।
এই বিষয়ে তাদের সবচেয়ে বেশি প্ররোচিত করে দুনিয়ার প্রতি তাদের সীমাহীন ভালোবাসা ও সম্মান লাভের বাসনা। যদি তারা দুনিয়াবিরাগী হতো এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী হতো, রাসূল-এর ওপর আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত বিষয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য নিজেকে ও আল্লাহর বান্দাদের নসীহত করত এবং এসব বিষয়ে মানুষকে তাগাদা দিত, তাহলে অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ-ভীতি থেকে দূরে সরে যেত না। কুরআন-সুন্নাহতে যা আছে সরাসরি তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। যারা কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরে যেত তাদের সংখ্যা হতো খুবই অল্প।
আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিদের অস্তিত্ব বহাল রাখবেন, যারা কুরআন-সুন্নাহের নুসুস থেকে বহির্গত অর্থ অনুধাবন করে সেগুলোকে যথাস্থানে স্থাপন করে। এর মাধ্যমে মানুষদের উদ্ভাবিত বাতেনী শাখাগত বিষয় এবং সে সকল অবৈধ কূটকৌশলের প্রয়োজনও নিঃশেষিত হয়ে যায়, যার মাধ্যমে সুদসহ অন্যান্য হারাম জিনিসের রাস্তাকে উন্মুক্ত করা হয় এবং আহলে কিতাবদের মতো আল্লাহর হারাম করা জিনিসকে হালাল সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়।
মুমিনরা সত্য নিয়ে যে মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাআলা স্বীয় আদেশের মাধ্যমে সে বিষয়ে তাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যাকে চান সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন।
وصلي الله علي سيدنا محمد و اله و صحبه وسلم تسليما
كثيرا إلي يوم القيامة، و حسبنا الله و نعم الوكيل

টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২৬৫৪
২. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৮/১৫৭
৩. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৮২৭৭
৪. সুরা হাদীদ, (৫৭): ১৬
৫. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৬. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৭. একটা বাতিল ফিরকার নাম।
৮. সূরা রুম, (৩০): ০৭

মোটকথা, বর্তমানের এই নষ্ট যুগে একজন মানুষ হয়তো আল্লাহর কাছে আলেম হিসাবে পরিচিত হওয়াকে নিজের জন্য সন্তুষ্টিজনক মনে করবে। অথ বা সে তার যুগের মানুষদের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে পরিচিত করাতে উদ্‌গ্রীব হবে। যদি সে প্রথম অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহর অবগতিই তার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। কারণ, যার সাথে আল্লাহর পরিচয় থাকে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট হয়। আর যে মানুষের সামনে নিজেকে আলেম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে সে রাসূল-এর এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হবে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُبَاهِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ، أَوْ
لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ
النَّاسِ إِلَيْهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করে এর মাধ্যমে আলেমদের সাথে প্রতিযোগিতা করার বা মূর্খদের সাথে তর্ক করার উদ্দেশ্যে অথবা এর সহায়তায় নিজের দিকে মানুষের দৃআিকর্ষণ করাতে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে বানিয়েনিল।
উহাইব ইবনে ওয়ারদ বলেন, 'এমন অনেক আলেম আছে যাদের মানুষ আলেম বলে ডাকলেও আল্লাহর দরবারে সে জাহেলদের দলভুক্ত।'
সহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَنْ تسعر به النار ثلاثة، أَحَدُهُمْ مَنْ قَرَأُ القُرْآنَ وَ
تَعَلَّمَ الْعِلْمَ ليُقَالَ هُوَ قَارِئُ وَ هُوَ عَالِمٌ، وَيُقَالُ لَهُ: قد قِيلَ
ذلِكَ، ثُمَّ أَمرَبِه فَيُسْحَبُ على وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ...
যাদের মাধ্যমে সর্বপ্রথম জাহান্নামকে প্রজ্বলিত করা হবে, তারা তিন শ্রেণির লোক। এক. যে কুরআন পড়েছে এবং ইলম অর্জন করেছে এই উদ্দেশ্যে যে, তাকে কারী বা আলেম বলা হবে। তাকে ডেকে বলা হবে, তোমাকে তা বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে, তখন তাকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে...।
কিতাবের প্রতি ঈমান আনার এবং গরুর গোশতের সংস্পর্শে নিহত ব্যক্তির জীবিত হওয়ার মতো নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করার পরেও অন্তরের কাঠিন্যের দরুন আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদের যে নিন্দা করেছেন, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। আমাদের তাদের মতো হতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا
نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ
فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
যারা মুমিন তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদের পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।
অন্য জায়গায় তাদের অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে,
فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً
অতএব তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদের ওপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিয়েছি।
আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিলেন যে, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া ছিল আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকারভঙ্গের শাস্তি। তা হলো, তার আদেশ লঙ্ঘন করা এবং নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া। অথচ তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, তারা তা করবে না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ
তারা কালামকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা তা থেকে উপকার লাভ করার বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছে।
উল্লেখ করা হলো, তাদের অন্তর কঠিন হওয়া দুইটি জিনিসকে তাদের জন্য অত্যাবশ্যক করেছে। এক. কালামকে তার স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা। দুই. তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তা বিস্মৃত হওয়া। অর্থাৎ তাদের যে প্রজ্ঞা ও সুন্দর নসীহত প্রদান করা হয়েছিল তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করার ফলে সেটা তারা ভুলে গিয়েছে এবং তার ওপর আমল করা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার কারণে এই দুইটি বিষয় এই উম্মতের সেসব আলেমদের মধ্যেও পাওয়া যায়, যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। প্রথমটি হলো, কালামকে বিকৃত করা। কারণ, যে আমল ছাড়াই ফিকহের জ্ঞান হাসিল করে তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়। ফলে সে পরবর্তী সময় আর আমলের প্রতি তেমন মনোযোগী হতে পারে না। বরং সে কালামকে বিকৃত করা এবং কুরআন-সুন্নাহর শব্দাবলিকে তার আপন স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা ও সূক্ষ্ম কৌশলের মাধ্যমে একে দূরবর্তী রূপকার্থে প্রয়োগ করার প্রতি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যেখানে আল্লাহর কালামের শব্দকে আঘাত করতে সক্ষম হয় না সেখানে সুন্নাহের শব্দকে আঘাত করে থাকে। যারা সরাসরি নস বা মূল বক্তব্যকে আঁকড়ে ধরে এবং এর থেকে যে অর্থ বুঝে আসে তাকে সেই অর্থেই প্রয়োগ করে, তাদের নিন্দা করে। তাদের অজ্ঞ এবং 'হাশাবী' বলে আখ্যায়িত করে। এই বিষয়টি আকীদার মূলনীতি বিষয়ক কালামবিদদের মধ্যে এবং রায়পন্থী ফুকাহায়ে কেরাম ও দর্শনপন্থী সুফীদের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
রায়পন্থীরা তাদের কোনো শায়েখ থেকে নিজেদের কিতাবে উল্লেখ করেছে, প্রত্যেক ইলমের ফলাফল তার মর্যাদাকে প্রকাশ করে। সুতরাং যারা ইলমে তাফসীরের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের লক্ষ্য হলো, মানুষের কাছে ঘটনাবলি বর্ণনা করা এবং ওয়াজ করা। আর যারা নিজেদের রায় এবং ইলম নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা ফতওয়া প্রদান করে, বিচারকার্য পরিচালনা করে, হাকেম হয়, দরস প্রদান করে। এ সমস্ত ব্যক্তিদের তাদের সাথে মিল রয়েছে যাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে,
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং তারা পরকালের খবর রাখে না।
এই বিষয়ে তাদের সবচেয়ে বেশি প্ররোচিত করে দুনিয়ার প্রতি তাদের সীমাহীন ভালোবাসা ও সম্মান লাভের বাসনা। যদি তারা দুনিয়াবিরাগী হতো এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী হতো, রাসূল-এর ওপর আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত বিষয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য নিজেকে ও আল্লাহর বান্দাদের নসীহত করত এবং এসব বিষয়ে মানুষকে তাগাদা দিত, তাহলে অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ-ভীতি থেকে দূরে সরে যেত না। কুরআন-সুন্নাহতে যা আছে সরাসরি তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। যারা কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরে যেত তাদের সংখ্যা হতো খুবই অল্প।
আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিদের অস্তিত্ব বহাল রাখবেন, যারা কুরআন-সুন্নাহের নুসুস থেকে বহির্গত অর্থ অনুধাবন করে সেগুলোকে যথাস্থানে স্থাপন করে। এর মাধ্যমে মানুষদের উদ্ভাবিত বাতেনী শাখাগত বিষয় এবং সে সকল অবৈধ কূটকৌশলের প্রয়োজনও নিঃশেষিত হয়ে যায়, যার মাধ্যমে সুদসহ অন্যান্য হারাম জিনিসের রাস্তাকে উন্মুক্ত করা হয় এবং আহলে কিতাবদের মতো আল্লাহর হারাম করা জিনিসকে হালাল সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়।
মুমিনরা সত্য নিয়ে যে মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাআলা স্বীয় আদেশের মাধ্যমে সে বিষয়ে তাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যাকে চান সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন।
وصلي الله علي سيدنا محمد و اله و صحبه وسلم تسليما
كثيرا إلي يوم القيامة، و حسبنا الله و نعم الوكيل

টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২৬৫৪
২. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৮/১৫৭
৩. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৮২৭৭
৪. সুরা হাদীদ, (৫৭): ১৬
৫. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৬. সূরা মায়েদা, (০৫): ১৩
৭. একটা বাতিল ফিরকার নাম।
৮. সূরা রুম, (৩০): ০৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00