📄 উত্তম ইলমের বর্ণনা
সবচেয়ে উত্তম ইলম হলো কুরআনের তাফসীর ও হাদীসের ইলম। এবং হারাম-হালাল বিষয়ক সেই ইলম, যা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও অনুসরণীয় ইমামদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তাদের থেকে প্রাপ্ত সেসব ইলম জেনেবুঝে আয়ত্ত করা ও সেগুলোর ফিকহ অর্জন করা হলো সবচেয়ে উত্তম। তাদের পরে নতুন করে যেসব ইলমের উদ্ভব হয়েছে সেগুলো অধিকহারে অর্জন করার মধ্যে তেমন কোনো মঙ্গল নেই। তবে যদি তা সালাফদের কথা বোঝার জন্য সহায়ক হয় তবে ভিন্ন কথা।
আর যেসব বিষয় তাদের কথার বিপরীত, তার অধিকাংশই ভ্রান্ত অথবা সেগুলোতে তেমন কোনো উপকার নেই। বরং তাদের কথার মধ্যেই আমাদের জন্য পর্যাপ্ত ও যথেষ্ট খোরাক রয়েছে। সেজন্যই দেখা যায়, পরবর্তীদের কথাতে যেসব তথ্য পাওয়া যায় সেগুলো সালাফদের কথাতে খুবই সংক্ষিপ্ত বাক্যে বিদ্যমান থাকে। এমনিভাবে পরবর্তীদের কথা-বার্তাতে যেসব ভ্রান্ত বিষয়ের উপস্থিতি রয়েছে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে সালাফদের কথাতে সেগুলোর প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাদের কথাতে এমন এমন চমৎকার ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় পাওয়া যায়, পরবর্তীদের কথাতে যার লেশমাত্র থাকে না। সুতরাং যে তাদের কথা থেকে ইলম নেবে না, সে এই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে। এর সাথে সে পরবর্তী লোকদের পতিত হওয়া গোমরাহিতেও নিপতিত হবে।
যে ব্যক্তি তাদের কথাগুলো সংকলন করতে আগ্রহী তার জন্য কর্তব্য হলো অশুদ্ধ বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বর্ণনা থেকে পৃথক করে নেওয়া। আর এটা জরাহ-তাদীল ও ইলালের জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে জানা সম্ভব। যে ব্যক্তির এই বিষয়ে জ্ঞান নেই সে এসব বর্ণনা করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। বরং সত্য-মিথ্যা সব তার কাছে মিশ্রিত হয়ে যাবে। ফলে তার কাছে থাকা ইলমও অনির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। যেমন আমরা দেখে থাকি যে, জরাহ-তাদীল ও ইলাল সম্পর্কে যার জানাশোনার পরিধি একেবারেই কম সে নবী ও সালাফদের থেকে যা বর্ণনা করে তার ওপর আস্থা রাখা যায় না। কারণ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ বর্ণনা বিষয়ে তার জ্ঞান না থাকার ফলে এমনও হতে পারে যে, তার বর্ণনা করা সকল বক্তব্যই বাতিলের খাতায় অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম আওযায়ী বলেছেন, 'প্রকৃত ইলম সেটাই যা সাহাবায়ে কেরাম প্রদান করেছেন। এর বাইরে যা আছে সেটা মূলত ইলম নয়। '
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তাবেয়ীদের বিষয়ে বলেছেন, 'তাদের কথা লিখে রাখা বা পরিত্যাগ করার ব্যাপারে তুমি স্বাধীন।'
ইবনে শিহাব যুহরী তাবেয়ীদের কথা লিখে রাখতেন। কিন্তু সালেহ ইবনে কায়সান লিখতেন না। পরবর্তী সময় তিনি এর জন্য লজ্জা বোধ করতেন।
টিকাঃ
১. ইলমুল জরাহ-তাদীল বলা হয় বর্ণনাকারীদের বিষয়ে বর্ণিত ভালোমন্দ মন্তব্যসমূহ জানার শাস্ত্রকে। আর ইলাল দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো বর্ণনাকারীদের ভুলের কারণে হাদীসের সনদ বা মতনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া গোপন ত্রুটি। যার কারণে হাদীস দুর্বল হযে যায়।
২. জামিউ বয়ানিল ইলম: ২/২৯
৩. তাকয়ীদুল ইলম, পৃষ্ঠা: ১০৬
📄 নব আবিষ্কৃত ইলম সম্পর্কে সতর্কতা
সালাফদের পরে যে ইলমের উদ্ভব ঘটেছে সে সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, তাদের পরে অনেক নতুন জিনিসের জন্ম হয়েছে। হাদীস-সুন্নাহের অনুসরণের দিকে সম্বন্ধিত আহলে জাহের গোষ্ঠীই হাদীস-সুন্নাহের সবচেয়ে বেশি বিপরীত কাজ করে থাকে। কারণ, তারা ইমামদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সবকিছু নিজেদের বুঝমতো বোঝার কারণে তাদের থেকে আলাদা। উপরন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী ইমামরা যেসব বিষয় গ্রহণ করেননি সেগুলোও অনেক সময় গ্রহণ করে থাকে।
তবে এর সাথে দার্শনিক বা মুতাকাল্লিমিনদের আলোচনায় প্রবিষ্ট হওয়া কেবলই অকল্যাণ। যারা এতে লিপ্ত হয় তারা খুব অল্পই এদের আবর্জনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, 'যে কালামশাস্ত্র চর্চা করে সে একসময় জাহমিয়া হয়ে যায়।'
ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য সালাফরা কালামশাস্ত্রবিদদের থেকে সতর্ক করতেন। যদিও তারা সুন্নাহর স্বপক্ষে কাজ করে থাকে। কালামশাস্ত্র পছন্দকারীদের কথার মধ্যে তর্ক-বিতর্কের গভীরে যেতে অনাগ্রহী ব্যক্তিদের প্রতি যেসব নিন্দাবাদ দেখতে পাওয়া যায় এবং তাদের অজ্ঞ আখ্যা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় বা তাদের 'হাশাবী' বলে সম্বোধন করার প্রবণতা দৃষ্টিগোচর হয় অথবা বলা হয় যে, তারা আল্লাহর পরিচয় জানে না ও তার দ্বীন সম্পর্কে তেমন জ্ঞানী নয়, তো এ সবকিছুই হলো মূলত শয়তানের কাজ। এর থেকে আমরা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
পরবর্তী যুগে আবিষ্কার হওয়া জ্ঞানের মধ্যে আরও রয়েছে কেবল নিজস্ব মত, অভিরুচি ও কাশফের ভিত্তিতে মারেফত এবং আধ্যাত্মিক-কর্ম ইত্যাদি বাতেনী ইলমের আলোচনায় লিপ্ত হওয়া। এটি অত্যন্ত মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইমাম আহমাদ এর মতো মনীষী ইমামগণ একে খুবই অপছন্দ করেছেন।
আবু সুলাইমান বলতেন, মানুষের অনেক সূক্ষ্ম জ্ঞান-গবেষণা আমি পেয়েছি। সেগুলোর কোনোটিই কুরআন-সুন্নাহের মতো ন্যায়পরায়ণ দুই সাক্ষীর মাধ্যমে যাচাই করা ছাড়া আমি গ্রহণ করিনি।
জুনাইদ বলেছেন, আমাদের ইলম কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে গণ্ডিবদ্ধ। যে ব্যক্তি কুরআন না পড়ে শুধু হাদীস লিপিবদ্ধ করে, আমাদের এই ইলম-জগতে তার অনুসরণ করা হয় না।
এই অঙ্গনটি অনেক বিস্তৃত। অনেকে এর কারণে নিফাক ও ধর্মদ্রোহিতার সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অনেকে এই দাবিও করে বসেছে যে, ওলি-আওলিয়ারা নবীদের থেকেও বেশি সম্মানী। অথবা তারা নবীদের থেকে অমুখাপেক্ষী। এমনকি নবীরা যে শরীয়ত নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে তারা একে অবহেলা করেছে। সৃষ্টি ও স্রষ্টা এক হবার কুফুরীতত্ত্বের অবতারণা করেছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও শরীয়তের অবৈধ জিনিসকে বৈধ হবার দাবি করেছে। এভাবে তারা দ্বীনের ভেতর এমন অনেক কিছু প্রবেশ করিয়েছে, যার সাথে শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই।
তাদের কেউ কেউ ধারণা করেছে যে, মানুষের অন্তর বিগলিত হবার জন্য গান-বাজনা ও নৃত্য করা যাবে। আবার কেউ ধারণা করেছে, মনোজাগতিক চর্চার উদ্দেশ্যে হারাম দৃশ্য ও তার প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাবে। অন্য অনেকে ধারণা করেছে বিনয় অর্জন ও আত্মম্ভরিতা বর্জনের উপায় হলো ছেঁড়া-ফাটা কাপড় পরিধান করা। অথচ এসব বিষয়কে শরীয়ত অনুমোদন করে না। কারণ, এগুলো আল্লাহর স্মরণ ও সালাতের পথে প্রতিবন্ধক হয় এবং দ্বীনকে তামাশার বস্তুতে রূপান্তরিত করে।
সুতরাং উপকারী ইলম হলো কুরআন-সুন্নাহর নুসুসকে আয়ত্ত করা। সেগুলোর অর্থ অনুধাবন করা। কুরআন-হাদীসের অর্থ বোঝা, হারাম-হালালের মাসআলা নিয়ে আলোচনা করা এবং আধ্যাত্মিকতা ও মারেফতের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের থেকে বর্ণিত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। প্রথমেই বিশুদ্ধ বিষয়কে অশুদ্ধ বিষয় থেকে পৃথক করে তারপর তার অর্থ বোঝার বিষয়ে সচেষ্ট থাকা। এর মধ্যেই জ্ঞানীদের জন্য যথেষ্ট খোরাক রয়েছে এবং যারা উপকারী ইলম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় তাদের জন্য যাবতীয় কল্যাণকর উপাদান রয়েছে।
টিকাঃ
১. হাশাবী হলো একটা ভ্রান্ত ফিরকার নাম। যারা দেহবাদী আকীদায় বিশ্বাসী এবং আল্লাহ তাআলার জন্য বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত করে থাকে। এদের মুজাসসিমাও বলা হয়।
২. তাবাকাতুস সুফিয়্যা, পৃষ্ঠা: ৭৮
৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১০/২৫৫
📄 ইলমের ফলাফল
যে ব্যক্তি এসব বিষয়ে অবগত হয়ে স্বীয় উদ্দেশ্যকে আল্লাহর জন্য পরিশুদ্ধ করল এবং এই বিষয়ে তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল, তো অবশ্যই তিনি তাকে সাহায্য করবেন, সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন, তাওফীক দান করবেন এবং দ্বীনের বিশুদ্ধ বুঝ প্রদান করবেন। এরপরই এই ইলম কাঙ্ক্ষিত ফলাফল প্রদান করবেড়আর তা হলো আল্লাহকে ভয় করা। যেমন আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে কেবল আলেমরাই তাকে (সত্যিকারের) ভয় করে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন, আল্লাহকে ভয় পাওয়ার জন্য ইলমই যথে। আর তাঁর বিষয়ে ধোঁকায় পতিত হওয়ার জন্য অজ্ঞতাই যথে।
কোনো এক সালাফ বলেছেন, 'অধিক বিষয় বর্ণনা করা প্রকৃত ইলম নয়। বরং প্রকৃত ইলম হচ্ছে আল্লাহকে ভয় করা।'
অন্য আরেকজন বলেছেন, 'যে আল্লাহকে ভয় করে সে প্রকৃত আলেম। • আর যে তাঁর অবাধ্যতা করে সে প্রকৃত জাহেল।' এই বিষয়ে তাদের থেকে আরও বহু বক্তব্য পাওয়া যায়।
এর কারণ হলো, উপকারী ইলম দুইটা জিনিসকে নির্দেশ করে।
→ প্রথম হলো: আল্লাহর পরিচয়, তার উপযুক্ত সুন্দর নামসমূহ ও উচ্চতর গুণসমূহ এবং চমৎকার কর্মসমূহ। এটি তাঁর বড়ত্ব-মহত্ত্ব, ভয়-প্রতিপত্তি, ভালোবাসা-আকাঙ্ক্ষা, তাঁর ওপর ভরসা ও তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং বিপদাপদে সবর করাকে আবশ্যক করে।
→ দ্বিতীয় হলো: আকীদা-বিশ্বাস ও প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথাকাজের ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়ে অবগত হওয়া। যে এসব বিষয় জানবে তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টিপূর্ণ কাজে দ্রুত অগ্রসর হওয়া এবং তাঁর অসন্তুষ্টি ও অপছন্দের কাজ থেকে দূরে সরে থাকা জরুরি হয়ে পড়বে। যখন ইলম তার বাহকের জন্য এমন ফলাফল বয়ে আনবে তখন তাকে বলা হবে উপকারী ইলম। আর ইলম যখন উপকারী হবে এবং আল্লাহর বড়ত্ব তার অন্তরে গেঁথে যাবে তখন অন্তর এমনিতেই বিনয়াবনত হবে। প্রতিপত্তি, বড়ত্ব-মহত্ত্ব ও ভয়-ভালোবাসার দরুন আল্লাহর সামনে মাথানত করবে। আর যখন আল্লাহর সামনে অন্তর মাথানত করবে এবং তার জন্য বিনয়ের বশে ঝুঁকে পড়বে তখন দুনিয়ার সামান্য হালাল জিনিস দ্বারাই সে পরিতৃপ্ত হবে। অল্পে তুষ্টি ও দুনিয়া-বিমুখতা তার অবশ্যই লাভ হবে।
ধন-সম্পদ, পদ-পদবি, বিলাসী জীবনযাপন এগুলোর কারণে আল্লাহ তাআলা আখেরাতে বান্দার নেয়ামতের অংশ কমিয়ে দেন। যদিও সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হয়। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর সহ অন্যান্য সালাফরা তা বলেছেন এবং এই বিষয়ে রাসূল থেকেও বর্ণনা পাওয়া যায়। মূলত এসব প্রত্যেক ধ্বংসশীল বস্তুই অস্থায়ী।
এমন অবস্থায় উপনীত হলে বান্দা ও আল্লাহর মাঝে একটি বিশেষ পরিচয় ও মান-মর্যাদার বন্ধন রচিত হয়। ফলে তখন বান্দা যদি কিছু চায় আল্লাহ তাআলা তা দান করেন। যদি সে তাকে ডাকে তবে তার ডাকে তিনি সাড়া দেন। যেমন হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে,
مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ،
فَأَكُونَ أَنَا سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ،
وَلِسَانَهُ الَّذِي يَنْطِقُ بِهِ، وَقَلْبَهُ الَّذِي يَعْقِلُ بِهِ، فَإِذَا دَعَا
أَجَبْتُهُ، وَإِذَا سَأَلَنِي أَعْطَيْتُهُ، وَإِذَا اسْتَنْصَرَنِي نَصَرْتُهُ
বান্দা নফল ইবাদাতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। এমনকি একসময় আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শ্রবণ করে। তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে। তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে। তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে হাঁটে। যদি সে আমার কাছে চায় তবে অবশ্যই তাকে দান করি। আর যদি আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে আশ্রয় দিই। অন্য বর্ণনায় আছে, যদি আমাকে ডাকে আমি সাড়া দিই।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অসিয়্যাত করেছেন তাতে আছে,
احْفَظ اللهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظ اللهَ تَجِدْهُ أَمَامَكَ،
تَعَرَّفْ إِلَيْهِ فِي الرَّخَاءِ، يَعْرِفْكَ فِي الشَّدَّةِ
আল্লাহকে হেফাজত করো। তিনিও তোমায় হেফাজত করবেন। আল্লাহকে হেফাজত করো। তাহলে তাকে সম্মুখে পাবে। সুখের কালে তুমি আল্লাহর সাথে সদাচার করো। তিনি দুঃখের কালে তোমার সাথে সদাচারকরবেন।
এর মানে হলো, আল্লাহ ও তার বান্দার মধ্যে এর মাধ্যমে একধরনের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে সে আল্লাহকে সব সময় পাশে পায়। নিঃসঙ্গতার সময় কাছে অনুভব করে। তাকে স্মরণ করার এবং তার কাছে চাওয়ার ও তার খেদমত করার স্বাদ লাভ করে। এসব কেবল সেই ব্যক্তির ভাগ্যেই জোটে, যে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আল্লাহর আনুগত্য করে। যেমন উহাইব ইবনে ওয়ারদ কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'গুনাহগার ব্যক্তি কি ইবাদাতের স্বাদ পায়?'
তিনি বললেন, 'না, এমনকি যে ব্যক্তি গুনাহের ইচ্ছা করে সে-ও পায় না।'
যখন বান্দা ইবাদাতের মজা পায় তখন সে মূলত তার রবকে চিনতে পারে। এবং তার ও তার রবের মাঝে বিশেষ এক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে সে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন। তাকে ডাকলে তিনি ডাকে সাড়া দেন। যেমন সাওয়ানা ফুজাইল ইবনে আয়ায কে বললেন, 'আপনার ও আপনার রবের মাঝে কি এমন সম্পর্ক আছে, তাকে ডাকার সাথে সাথে তিনি সাড়া দেন?'
তিনি তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
বান্দা দুনিয়া ও কবরের জীবনে নানা রকম বিপদাপদ ও মুসিবতে পতিত হয়। যদি তার ও তার রবের মাঝে বিশেষ সম্পর্ক থাকে, তাহলে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে করা রাসূল-এর অসিয়্যাতে সেদিকেই ইশারা করা হয়েছে। যেখানে তিনি বলেছিলেন, "সুখের কালে তুমি আল্লাহর সাথে সদাচার করো। তিনি দুঃখের কালে তোমার সাথে সদাচার করবেন।"
মারুফ কারখী কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'মৃত্যু, কবর, হাশর, জান্নাত ও জাহান্নাম এগুলোর মধ্যে কোন জিনিস আপনাকে নির্জনতা অবলম্বনে বেশি উৎসাহিত করে?'
তিনি বললেন, 'এসব কিছুর কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। যদি তাঁর ও তোমার মাঝে পরিচয় থাকে তবে সেটাই এসবের জন্য যথেষ্ট হবে।'
সুতরাং উপকারী ইলম হলো যা বান্দা ও তার রবের মাঝে পরিচয় গড়ে তোলে। তাকে সেদিকে পথ দেখায়। এমনকি এক সময় সে নিজেই তাকে চিনে নিতে পারে। তার ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। তাকে এমনভাবে লজ্জা পেতে থাকে যেন তিনি তাকে দেখছেন। এ কারণেই সাহাবীদের অনেকেই বলেছেন, 'মানুষ থেকে সর্বপ্রথম যে ইলম তুলে নেওয়া হবে তা হলো বিনয় ও নম্রতা।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন, কিছু মানুষ কুরআন তেলাওয়াত করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তবে যদি সেটা অন্তরে গিয়ে মজবুতভাবে গেঁথে যায় তবে উপকার করবে।
হাসান বসরী বলেছেন, ইলম দুই প্রকার। এক. মৌখিক ইলম। এটি আল্লাহর দরবারে আদমসন্তানদের বিরুদ্ধে অবস্থান করবে। দুই. অন্তরের ইলম। এটিই হলো উপকারী ইলম।
সালাফে সালেহীনরা বলতেন, আলেম তিন ধরনের। এক, আল্লাহ ও তার বিধানাবলি উভয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। দুই, শুধু আল্লাহর সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। তার বিধানাবলি বিষয়ে জ্ঞান রাখে না। তিন, শুধু আল্লাহর বিধানাবলি সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। তার বিষয়ে জ্ঞান রাখে না।
এদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে প্রথম জন। যে আল্লাহকে ভয় করে এবং তার হুকুম-আহকাম সম্পর্কেও অবগত। মোটকথা, বান্দা ইলমের সহায়তায় তার রবকে খোঁজে এবং তার সাথে পরিচিত হয়। যখন আল্লাহর সাথে তার পরিচয় ঘটে তখন সে তাকে তার নিকটে দেখতে পায়। যখন সে তাকে নিকটে দেখতে পায় তখন তিনিও তাকে কাছে টেনে নেন এবং তার প্রার্থনায় সাড়া দেন। যেমন ইসরাইলী বর্ণনায় এসেছে,
হে আদমসন্তান, আমাকে খোঁজ করো তবেই আমাকে পাবে। যখন তুমি আমাকে পাবে তখন सबकुछই পাবে। আর যদি আমাকে হারাও তবে सबकुछই হারাবে। আমি তোমার কাছে सबकुछ থেকে বেশি প্রিয়।
জুন্নুন মিসরী রাতের বেলা এই কবিতাগুলো বার বার আবৃত্তি করতেন,
أطلبوا لأنفُسِكُم ... مِثْلَ مَا وَجَدتُ أَنا
قَد وَجَدتُ لِي سَكَناً ... لَيسَ فِي هَواهُ عَنا
إِن بَعُدتُ قَرَّبَنِي ... أَو قَرُبْتُ مِنهُ دَنا
নিজের জন্য তালাশ করো যা পেয়েছি আমি
নিরুপদ্রব শান্ত শীতল দারুণ একটি বাড়ি।
দূরে গেলে কাছে টানে কাছে যদি আসি
আরও বেশি নৈকট্যের গভীর জলে ভাসি।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল মারুফ কারখী এর ব্যাপারে বলতেন, 'তাঁর কাছে প্রকৃত ইলম তথা আল্লাহর ভয় রয়েছে।'
বোঝা গেল, প্রকৃত ইলম হচ্ছে আল্লাহর সম্পর্কে এমনভাবে অবগত হওয়া যা আবশ্যিকভাবে তাকে ভয় করতে, তাকে ভালোবাসতে, তার কাছাকাছি হতে এবং তার প্রতি আগ্রহী হতে সহায়তা করে। এরপর আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও বান্দার যেসব কথা-কাজ ও অবস্থা-বিশ্বাস তাকে সন্তুষ্ট করে সেসব বিষয়ে অবগত হওয়া। যার মাঝে এই দুইটি বিষয়ের বাস্তবায়ন ঘটবে তার ইলমই হবে উপকারী ইলম। এমন ব্যক্তি উপকারী ইলম লাভের পাশাপাশি বিনম্র অন্তর, পরিতুষ্ট মন এবং কবুলযোগ্য দুআও অর্জন করবে।
টিকাঃ
১. সূরা ফাতির, (৩৫): ২৮
২. কিতাবুয যুহদ, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, পৃষ্ঠা: ১৫
৩. সহীহুল বুখারী, হাদীস নং: ৬৫০২
৪. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৬১৯৩
৫. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৭৬৩
৬. আবু নুয়াইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪৪
৭. সুনানে দারেমী: ১/১০২
৮. দারেমী: ১/১০২; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী: ১/৩২৬
৯. কথাগুলোর কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি।
📄 অনুপকারী ইলমের বিপদ
উপকারী ইলম থেকে যে বঞ্চিত হবে সে এমন চারটি আপদে পতিত হবে, যার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তখন তার ইলমই তার বিপদের কারণ হবে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। ফলে তা তার কোনো উপকারে আসবে না। কারণ, তার অন্তরে স্বীয় রবের প্রতি কোনো ভয় নেই। তার মন দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট নয়; বরং সে লোভের বশবর্তী হয়ে আরও বেশি জিনিস কামনা করে। স্বীয় রবের আদেশ পালন না করার এবং তার অপছন্দের জিনিস থেকে দূরে না থাকার কারণে তার প্রার্থনাও কবুল করা হয় না।
এসব হলো সেই ইলমের আলোচনা যার থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব। তা হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত ইলম। আর যদি ইলম হয় অন্য কিছু থেকে অর্জিত, তবে তো সেটি সত্তাগতভাবেই অনুপকারী। এর থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। উপকারের চেয়ে বরং এর ক্ষতির দিকটাই প্রবল।
অনুপকারী ইলমের আলামত
অনুপকারী ইলমের আলামত হলো, যে এটি অর্জন করবে তার উদ্দেশ্য হবে দম্ভ-গর্ব, অহংকার-অহমিকা ও দুনিয়ার মান-মর্যাদা তলব করা। দুনিয়াবী বিষয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, উলামায়ে কেরামের সাথে বিবাদে জড়ানো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের সাথে বিতর্ক করা এবং মানুষের মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِذلِكَ فَالنَّارِ فالنار
যে ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করবে তার জন্য জাহান্নাম, জাহান্নাম।
এই ধরনের ইলমের বাহকেরা অনেক সময় আল্লাহর মারেফত লাভ ও তাকে তলব করার এবং অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হবার কথা বলে থাকেন। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে রাজা-বাদশাসহ অন্যান্য মানুষদের মনে জায়গা করে নেওয়া। তাদের অন্তরে নিজেদের ব্যাপারে সুধারণা সৃষ্টি করা। ভক্তবৃন্দের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করা। এসব বোঝার মাধ্যম হলো, ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের মতো ওলি হওয়ার প্রকাশ্য দাবি করা। যেমন কারামিতা-বাতেনী দলের লোকেরা এমন দাবি করেছিল। সালাফে সালেহীনের পথ ছিল এরচেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় নিজেদের ছোট ও তুচ্ছ মনে করতেন।
আমর বলেছেন, যে নিজেকে আলেম বলবে সে আসলে জাহেল। আর যে নিজেকে মুমিন বলবে সে মূলত কাফের। আর যে বলবে সে জান্নাতে থাকবে সে আসলে জাহান্নামে যাবে।
অনুপকারী ইলমের আরেকটি আলামত হলো, সত্যকে গ্রহণ না করা। তার প্রতি নিজেকে সঁপে না দেওয়া এবং যিনি সত্য বলছেন তার সামনে অহংকারপূর্ণ আচরণ করা। বিশেষ করে যদি তিনি হন মানুষের চোখে তার চেয়ে নিম্নমানের। এমনিভাবে মিথ্যাকে আঁকড়ে রাখা এই ভয়ে যে, সত্যকে মেনে নিলে মানুষের মনোযোগ তার থেকে সরে যাবে।
অনেক সময় এমন ব্যক্তি মানুষজনের সামনে মুখে মুখে নিজের বদনাম গায়। নিজেকে তুচ্ছ হিসাবে প্রকাশ করে। যাতে করে তার ব্যাপারে মানুষ ভাবে যে, সে তো নিজেকে অনেক ছোট মনে করে। এভাবে কৌশলে অন্যদের থেকে প্রশংসা আদায় করা হয়ে যাবে। এটা হলো এক প্রকারের সূক্ষ্ম লৌকিকতা। এই বিষয়ে তাবেয়ীনে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী উলামায়ে কেরাম সতর্ক করে গিয়েছেন।
লৌকিক বিনয়-প্রদর্শনকারী ব্যক্তির থেকে প্রশংসা বাক্য সাদরে গ্রহণ করা ও এর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করার বিষয়টিও পাওয়া যায়। যা পরিপূর্ণরূপে ইখলাস ও সততার পরিপন্থী। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে কপটতার আশঙ্কা করে। মন্দ-মৃত্যুর ভয়ে দিনাতিপাত করে। ফলে সে নিজের প্রশংসা ও সুনাম-সুখ্যাতি থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করে।
উপকারী ইলমের আলামত
এই কারণেই উপকারী ইলমের বাহক যারা তাদের আলামত হলো, তারা নিজেদের জন্য আলাদা কোনো সম্মান-প্রতিপত্তি কামনা করে না। অন্তরের অন্তস্তল থেকে প্রশংসা ও সুনামকে ঘৃণা করে। কারও ওপর অহংকারী ভাব প্রকাশ করে না। হাসান বসরী বলেছেন,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত, আখেরাতের প্রতি আসক্ত, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃসিম্পন্ন ও স্বীয় রবের ইবাদাতের ব্যাপারে যত্নবান।
তার থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় আছে,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে তারচেয়ে উন্নত ব্যক্তিকে হিংসা করে না, তারচেয়ে অনুন্নত ব্যক্তিকে বিদ্রূপ করে না, আল্লাহ তাকে যে ইলম দান করেছেন তার বিনিময় গ্রহণ করে না।
এই শেষ কথার অনুরূপ অর্থ আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন, 'আলেমের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে বিনয়ী হবার জন্য মাথায় মাটি রাখা।' এর কারণ হলো, রবের ব্যাপারে যে যত বেশি জানবে ও তার সাথে যত বেশি পরিচিত হবে ততই ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। তার প্রতি আনুগত্য ও বিনয় আরও বেশি পরিমাণে হবে।
উপকারী ইলমের আরেকটা আলামত হলো, এই ইলম তার বাহককে দুনিয়া থেকে পলায়ন করতে শেখাবে। যার সবচেয়ে উচ্চস্তর হলো, নেতৃত্ব এবং সুনাম-সুখ্যাতি। এগুলো থেকে দূরে থাকা এবং এসব জিনিস এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হলো উপকারী ইলমের আলামত। যদি কখনো অনিচ্ছায় দুনিয়াবী এসব বিষয়ে জড়িয়ে যায়, তাহলে এর বাহক শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। তার এমন অবস্থা হয়, তিনি এটাকে একটা ফাঁদ ও ছাড় বলে মনে করেন। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার সুনাম-সুখ্যাতি দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাবার ফলে নিজের ব্যাপারে এমন ভয় করতেন।
উপকারী ইলমের বাহক কখনো ইলমের দাবি করেন না এবং এ নিয়ে কারও সাথে গর্বও করেন না। অন্য কাউকে মূর্খ সাব্যস্ত করেন না। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সুন্নাহ ও আহলে সুন্নাহর বিরুদ্ধাচারণ করে তার কথা ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর জন্য রাগত স্বরে কথা বলেন। কারও ওপর নিজের বড়াই জাহের করার জন্য নয়।
উপকারী ও অনুপকারী ইলমের পার্থক্য
যে ব্যক্তির ইলম অনুপকারী, মানুষের ওপর অহংকার করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। সে তাদের ওপর নিজের ইলমের বড়ত্ব জাহির করে এবং তাদের মূর্খ সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করে। নিজেকে বড় করে প্রকাশ করার জন্য তাদের খাটো করে। এটি খুবই নোংরা ও নিম্নমানের স্বভাব। এমন লোক অনেক সময় তার পূর্বেকার উলামায়ে কেরামকে মূর্খ, অসচেতন ও ভুলেভরা সাব্যস্ত করতে চায়। ফলে আবশ্যিকভাবেই নিজেকে সে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজেকে ভালো আর পূর্ববর্তী মানুষদের খারাপ ভাবে।
কিন্তু উপকারী ইলমের বাহক উলামায়ে কেরাম ঠিক এর বিপরীত হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের মন্দ আর পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামকে ভালো মনে করেন। আন্তরিকভাবেই তাদের মর্যাদার কথা স্বীকার করেন। নিজেদের অক্ষমতা এবং তাদের স্তরে পৌঁছা বা এর কাছাকাছি যাওয়ার অসম্ভবতাকে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেন।
ইমাম আবু হানীফা কত সুন্দর উত্তর দিয়েছেন যখন তাকে আলকামা আর আসওয়াদ রাহিমাহুমাল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি মর্যাদাবান? তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'আমরা তো তাদের নাম উচ্চারণেরও যোগ্য নই। মান-নির্ণয় তো অনেক দূরের বিষয়।'
ইবনুল মুবারক সালাফদের আলোচনা করার সময় এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন,
সালাফদের কথা যখন বলো তখন আমাদের কথা বলা থেকে বিরত থাকো; কারণ, সুস্থ চলন্ত মানুষ কখনো বসে থাকা ব্যক্তির মতো নয়।
অনুপকারী ইলমধারীর ভুল ধারণা
যাদের ইলম অনুপকারী তারা যখন পূর্ববর্তী কারও ওপর নিজের কথার ও বাক্চাতুর্যের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তখন সে এটাকে আল্লাহর দরবারে নিজের ইলমের মর্যাদা ভেবে বসে থাকে। কারণ, সে তার পূর্ববর্তীদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের জিনিস লাভ করেছে। তখন সে পূর্ববর্তীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। স্বল্পজ্ঞানের কারণে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবে। কিন্তু এই বেচারা জানে না যে, সালাফদের কম কথা বলাটা আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় ও তাকওয়ার কারণে ছিল। যদি তারা বেশি কথা বলতে চাইতেন তবে তা অনায়াসে পারতেন। যেমন আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস একবার কিছু লোককে দ্বীনী বিষয়ে তর্ক করতে শুনে বললেন,
তোমরা কি জানো না যে, আল্লাহর ভয় তাঁর কিছু বান্দাকে চুপ করিয়ে রেখেছে। তারা বোবাও নয়, বধিরও নয়। তারাই হলেন প্রকৃত ইলমের অধিকারী বাগ্মী ও মহান মনীষী। তবে আল্লাহর বড়ত্বের কথা ভেবে তাদের হৃদয়-মন ভীত ও তাদের জিহ্বা নিশ্চল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম তিরমিজী সাহাবী আবু উমামা থেকে রাসূল-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْبَذَاءُ
وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النَّفَاقِ
লজ্জা ও চুপ থাকা ঈমানের দুটি অংশ। আর অশ্লীলতা ও বেশি কথা বলা মুনাফিকির দুটি অংশ।
ইমাম তিরমিজী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকেম ও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান তার হাদীসগ্রন্থ সহীহ ইবনে হিব্বানে সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
الْبَيَانُ مِنَ اللهِ وَالْعِيُّ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلَيْسَ الْبَيَانُ
كَثْرَةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنَّ الْبَيَانَ الْفَضْلُ فِي الْحَقِّ،
وَلَيْسَ الْعِيُّ قِلَّةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنْ مَنْ سفه الحق
বলতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর চুপ করে থাকা শয়তানের পক্ষ থেকে। বেশি কথা বলাকে 'বলতে পারা' হিসাবে গণ্য করা হয় না। বরং বলতে পারার মানে হলো সত্য কথায় স্পবাদিতা অবলম্বন করা। এমনিভাবে কম কথা বলার মানে চুপ থাকা নয়; বরং এর মানে হলো সত্যকে আড়াল করা।
মারাসীলে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল-কুরজিতে আছে, রাসূল বলেছেন,
ثلاث ينقص بهن العبد في الدنيا و يدرك بهن في الآخرة
ما هو أعظم من ذلك الرحم و الحياء وعي اللسان
তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, যার কারণে দুনিয়াতে বান্দার ক্ষতি হলেও এর বিনিময়ে আখেরাতে সে এরচেয়ে বড় জিনিস লাভ করবে। সেগুলো হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক, লজ্জা এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা।
আওন ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,
তিনটি জিনিস ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। লজ্জা, সচ্চরিত্র এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা। এগুলো আখেরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করলেও দুনিয়াতে হ্রাস ঘটায়। আর আখেরাতে বৃদ্ধিকারী বস্তু দুনিয়াতে হ্রাস ঘটানো বস্তুর চেয়ে উত্তম।
দুর্বল সূত্রে এটি মারফু হাদীস হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন,
যদি কোনো ব্যক্তি কিছু মানুষের অভিমুখী হয়ে বসে এবং তারা তার মাঝে নীরবতা পরিলক্ষণ করে, অথচ তিনি বোবা নন, তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি একজন মুসলিম ফকীহ।
যে ব্যক্তি সালাফদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পেরেছে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব যে, তাদের চুপ থাকাটা অতিরিক্ত কথা ও তর্ক-বিতর্ককে পরিহার করার জন্য ছিল। সুতরাং যারা তাদের পথে চলবে, তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। আর যারা অন্যদের পথে চলবে এবং বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও তর্ক-বিতর্ক করার মধ্যে জড়াবে, তবে সালাফদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেবে এবং নিজেদের ত্রুটির কথা মেনে নেবে তাদের অবস্থাও ওদের কাছাকাছি হবে।
ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের দোষের স্বীকারোক্তি দেয় না সে হলো নির্বোধ।'
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনার কী দোষ আছে?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'বেশি কথা বলা।
আর যদি সে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত্রে মর্যাদার আর তার পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ত্রুটি ও অজ্ঞতার দাবি করে, তবে সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট এবং বিরাট বড় ক্ষতিগ্রস্ত।
টিকাঃ
১. সাহাবী যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল বলতেন, اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অনুপকারী ইলম, অবিনীত অন্তর, অপরিতৃপ্ত আত্মা এবং অগ্রহণযোগ্য দোআ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২২
২. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৫৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২৯০
৩. নিঃসন্দেহে এটি অদৃশ্যের বিষয়। যার সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
৪. কিতাবুয যুহদ, ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা: ২৬৭
৫. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১১৩
৬. মুসনাদে ইমাম আহমাদ, হাদীস নং: ২২৩১২; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২০২৭
৭. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২০১০
৮. আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৪২,১৪৩
৯. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৩/১২৪
উপকারী ইলম থেকে যে বঞ্চিত হবে সে এমন চারটি আপদে পতিত হবে, যার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তখন তার ইলমই তার বিপদের কারণ হবে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। ফলে তা তার কোনো উপকারে আসবে না। কারণ, তার অন্তরে স্বীয় রবের প্রতি কোনো ভয় নেই। তার মন দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট নয়; বরং সে লোভের বশবর্তী হয়ে আরও বেশি জিনিস কামনা করে। স্বীয় রবের আদেশ পালন না করার এবং তার অপছন্দের জিনিস থেকে দূরে না থাকার কারণে তার প্রার্থনাও কবুল করা হয় না।
এসব হলো সেই ইলমের আলোচনা যার থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব। তা হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত ইলম। আর যদি ইলম হয় অন্য কিছু থেকে অর্জিত, তবে তো সেটি সত্তাগতভাবেই অনুপকারী। এর থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। উপকারের চেয়ে বরং এর ক্ষতির দিকটাই প্রবল।
অনুপকারী ইলমের আলামত
অনুপকারী ইলমের আলামত হলো, যে এটি অর্জন করবে তার উদ্দেশ্য হবে দম্ভ-গর্ব, অহংকার-অহমিকা ও দুনিয়ার মান-মর্যাদা তলব করা। দুনিয়াবী বিষয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, উলামায়ে কেরামের সাথে বিবাদে জড়ানো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের সাথে বিতর্ক করা এবং মানুষের মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِذلِكَ فَالنَّارِ فالنار
যে ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করবে তার জন্য জাহান্নাম, জাহান্নাম।
এই ধরনের ইলমের বাহকেরা অনেক সময় আল্লাহর মারেফত লাভ ও তাকে তলব করার এবং অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হবার কথা বলে থাকেন। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে রাজা-বাদশাসহ অন্যান্য মানুষদের মনে জায়গা করে নেওয়া। তাদের অন্তরে নিজেদের ব্যাপারে সুধারণা সৃষ্টি করা। ভক্তবৃন্দের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করা। এসব বোঝার মাধ্যম হলো, ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের মতো ওলি হওয়ার প্রকাশ্য দাবি করা। যেমন কারামিতা-বাতেনী দলের লোকেরা এমন দাবি করেছিল। সালাফে সালেহীনের পথ ছিল এরচেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় নিজেদের ছোট ও তুচ্ছ মনে করতেন।
আমর বলেছেন, যে নিজেকে আলেম বলবে সে আসলে জাহেল। আর যে নিজেকে মুমিন বলবে সে মূলত কাফের। আর যে বলবে সে জান্নাতে থাকবে সে আসলে জাহান্নামে যাবে।
অনুপকারী ইলমের আরেকটি আলামত হলো, সত্যকে গ্রহণ না করা। তার প্রতি নিজেকে সঁপে না দেওয়া এবং যিনি সত্য বলছেন তার সামনে অহংকারপূর্ণ আচরণ করা। বিশেষ করে যদি তিনি হন মানুষের চোখে তার চেয়ে নিম্নমানের। এমনিভাবে মিথ্যাকে আঁকড়ে রাখা এই ভয়ে যে, সত্যকে মেনে নিলে মানুষের মনোযোগ তার থেকে সরে যাবে।
অনেক সময় এমন ব্যক্তি মানুষজনের সামনে মুখে মুখে নিজের বদনাম গায়। নিজেকে তুচ্ছ হিসাবে প্রকাশ করে। যাতে করে তার ব্যাপারে মানুষ ভাবে যে, সে তো নিজেকে অনেক ছোট মনে করে। এভাবে কৌশলে অন্যদের থেকে প্রশংসা আদায় করা হয়ে যাবে। এটা হলো এক প্রকারের সূক্ষ্ম লৌকিকতা। এই বিষয়ে তাবেয়ীনে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী উলামায়ে কেরাম সতর্ক করে গিয়েছেন।
লৌকিক বিনয়-প্রদর্শনকারী ব্যক্তির থেকে প্রশংসা বাক্য সাদরে গ্রহণ করা ও এর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করার বিষয়টিও পাওয়া যায়। যা পরিপূর্ণরূপে ইখলাস ও সততার পরিপন্থী। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে কপটতার আশঙ্কা করে। মন্দ-মৃত্যুর ভয়ে দিনাতিপাত করে। ফলে সে নিজের প্রশংসা ও সুনাম-সুখ্যাতি থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করে।
উপকারী ইলমের আলামত
এই কারণেই উপকারী ইলমের বাহক যারা তাদের আলামত হলো, তারা নিজেদের জন্য আলাদা কোনো সম্মান-প্রতিপত্তি কামনা করে না। অন্তরের অন্তস্তল থেকে প্রশংসা ও সুনামকে ঘৃণা করে। কারও ওপর অহংকারী ভাব প্রকাশ করে না। হাসান বসরী বলেছেন,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত, আখেরাতের প্রতি আসক্ত, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃসিম্পন্ন ও স্বীয় রবের ইবাদাতের ব্যাপারে যত্নবান।
তার থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় আছে,
ফকীহ ওই ব্যক্তি, যে তারচেয়ে উন্নত ব্যক্তিকে হিংসা করে না, তারচেয়ে অনুন্নত ব্যক্তিকে বিদ্রূপ করে না, আল্লাহ তাকে যে ইলম দান করেছেন তার বিনিময় গ্রহণ করে না।
এই শেষ কথার অনুরূপ অর্থ আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন, 'আলেমের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে বিনয়ী হবার জন্য মাথায় মাটি রাখা।' এর কারণ হলো, রবের ব্যাপারে যে যত বেশি জানবে ও তার সাথে যত বেশি পরিচিত হবে ততই ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। তার প্রতি আনুগত্য ও বিনয় আরও বেশি পরিমাণে হবে।
উপকারী ইলমের আরেকটা আলামত হলো, এই ইলম তার বাহককে দুনিয়া থেকে পলায়ন করতে শেখাবে। যার সবচেয়ে উচ্চস্তর হলো, নেতৃত্ব এবং সুনাম-সুখ্যাতি। এগুলো থেকে দূরে থাকা এবং এসব জিনিস এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হলো উপকারী ইলমের আলামত। যদি কখনো অনিচ্ছায় দুনিয়াবী এসব বিষয়ে জড়িয়ে যায়, তাহলে এর বাহক শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। তার এমন অবস্থা হয়, তিনি এটাকে একটা ফাঁদ ও ছাড় বলে মনে করেন। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার সুনাম-সুখ্যাতি দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাবার ফলে নিজের ব্যাপারে এমন ভয় করতেন।
উপকারী ইলমের বাহক কখনো ইলমের দাবি করেন না এবং এ নিয়ে কারও সাথে গর্বও করেন না। অন্য কাউকে মূর্খ সাব্যস্ত করেন না। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সুন্নাহ ও আহলে সুন্নাহর বিরুদ্ধাচারণ করে তার কথা ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর জন্য রাগত স্বরে কথা বলেন। কারও ওপর নিজের বড়াই জাহের করার জন্য নয়।
উপকারী ও অনুপকারী ইলমের পার্থক্য
যে ব্যক্তির ইলম অনুপকারী, মানুষের ওপর অহংকার করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। সে তাদের ওপর নিজের ইলমের বড়ত্ব জাহির করে এবং তাদের মূর্খ সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করে। নিজেকে বড় করে প্রকাশ করার জন্য তাদের খাটো করে। এটি খুবই নোংরা ও নিম্নমানের স্বভাব। এমন লোক অনেক সময় তার পূর্বেকার উলামায়ে কেরামকে মূর্খ, অসচেতন ও ভুলেভরা সাব্যস্ত করতে চায়। ফলে আবশ্যিকভাবেই নিজেকে সে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজেকে ভালো আর পূর্ববর্তী মানুষদের খারাপ ভাবে।
কিন্তু উপকারী ইলমের বাহক উলামায়ে কেরাম ঠিক এর বিপরীত হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের মন্দ আর পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামকে ভালো মনে করেন। আন্তরিকভাবেই তাদের মর্যাদার কথা স্বীকার করেন। নিজেদের অক্ষমতা এবং তাদের স্তরে পৌঁছা বা এর কাছাকাছি যাওয়ার অসম্ভবতাকে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেন।
ইমাম আবু হানীফা কত সুন্দর উত্তর দিয়েছেন যখন তাকে আলকামা আর আসওয়াদ রাহিমাহুমাল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি মর্যাদাবান? তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'আমরা তো তাদের নাম উচ্চারণেরও যোগ্য নই। মান-নির্ণয় তো অনেক দূরের বিষয়।'
ইবনুল মুবারক সালাফদের আলোচনা করার সময় এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন,
সালাফদের কথা যখন বলো তখন আমাদের কথা বলা থেকে বিরত থাকো; কারণ, সুস্থ চলন্ত মানুষ কখনো বসে থাকা ব্যক্তির মতো নয়।
অনুপকারী ইলমধারীর ভুল ধারণা
যাদের ইলম অনুপকারী তারা যখন পূর্ববর্তী কারও ওপর নিজের কথার ও বাক্চাতুর্যের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তখন সে এটাকে আল্লাহর দরবারে নিজের ইলমের মর্যাদা ভেবে বসে থাকে। কারণ, সে তার পূর্ববর্তীদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের জিনিস লাভ করেছে। তখন সে পূর্ববর্তীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। স্বল্পজ্ঞানের কারণে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবে। কিন্তু এই বেচারা জানে না যে, সালাফদের কম কথা বলাটা আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় ও তাকওয়ার কারণে ছিল। যদি তারা বেশি কথা বলতে চাইতেন তবে তা অনায়াসে পারতেন। যেমন আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস একবার কিছু লোককে দ্বীনী বিষয়ে তর্ক করতে শুনে বললেন,
তোমরা কি জানো না যে, আল্লাহর ভয় তাঁর কিছু বান্দাকে চুপ করিয়ে রেখেছে। তারা বোবাও নয়, বধিরও নয়। তারাই হলেন প্রকৃত ইলমের অধিকারী বাগ্মী ও মহান মনীষী। তবে আল্লাহর বড়ত্বের কথা ভেবে তাদের হৃদয়-মন ভীত ও তাদের জিহ্বা নিশ্চল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম তিরমিজী সাহাবী আবু উমামা থেকে রাসূল-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْبَذَاءُ
وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النَّفَاقِ
লজ্জা ও চুপ থাকা ঈমানের দুটি অংশ। আর অশ্লীলতা ও বেশি কথা বলা মুনাফিকির দুটি অংশ।
ইমাম তিরমিজী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকেম ও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান তার হাদীসগ্রন্থ সহীহ ইবনে হিব্বানে সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
الْبَيَانُ مِنَ اللهِ وَالْعِيُّ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلَيْسَ الْبَيَانُ
كَثْرَةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنَّ الْبَيَانَ الْفَضْلُ فِي الْحَقِّ،
وَلَيْسَ الْعِيُّ قِلَّةَ الْكَلَامِ، وَلَكِنْ مَنْ سفه الحق
বলতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর চুপ করে থাকা শয়তানের পক্ষ থেকে। বেশি কথা বলাকে 'বলতে পারা' হিসাবে গণ্য করা হয় না। বরং বলতে পারার মানে হলো সত্য কথায় স্পবাদিতা অবলম্বন করা। এমনিভাবে কম কথা বলার মানে চুপ থাকা নয়; বরং এর মানে হলো সত্যকে আড়াল করা।
মারাসীলে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল-কুরজিতে আছে, রাসূল বলেছেন,
ثلاث ينقص بهن العبد في الدنيا و يدرك بهن في الآخرة
ما هو أعظم من ذلك الرحم و الحياء وعي اللسان
তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, যার কারণে দুনিয়াতে বান্দার ক্ষতি হলেও এর বিনিময়ে আখেরাতে সে এরচেয়ে বড় জিনিস লাভ করবে। সেগুলো হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক, লজ্জা এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা।
আওন ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,
তিনটি জিনিস ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। লজ্জা, সচ্চরিত্র এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা। এগুলো আখেরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করলেও দুনিয়াতে হ্রাস ঘটায়। আর আখেরাতে বৃদ্ধিকারী বস্তু দুনিয়াতে হ্রাস ঘটানো বস্তুর চেয়ে উত্তম।
দুর্বল সূত্রে এটি মারফু হাদীস হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।
কোনো কোনো সালাফ বলেছেন,
যদি কোনো ব্যক্তি কিছু মানুষের অভিমুখী হয়ে বসে এবং তারা তার মাঝে নীরবতা পরিলক্ষণ করে, অথচ তিনি বোবা নন, তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি একজন মুসলিম ফকীহ।
যে ব্যক্তি সালাফদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পেরেছে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব যে, তাদের চুপ থাকাটা অতিরিক্ত কথা ও তর্ক-বিতর্ককে পরিহার করার জন্য ছিল। সুতরাং যারা তাদের পথে চলবে, তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। আর যারা অন্যদের পথে চলবে এবং বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও তর্ক-বিতর্ক করার মধ্যে জড়াবে, তবে সালাফদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেবে এবং নিজেদের ত্রুটির কথা মেনে নেবে তাদের অবস্থাও ওদের কাছাকাছি হবে।
ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের দোষের স্বীকারোক্তি দেয় না সে হলো নির্বোধ।'
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনার কী দোষ আছে?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'বেশি কথা বলা।
আর যদি সে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত্রে মর্যাদার আর তার পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ত্রুটি ও অজ্ঞতার দাবি করে, তবে সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট এবং বিরাট বড় ক্ষতিগ্রস্ত।
টিকাঃ
১. সাহাবী যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল বলতেন, اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অনুপকারী ইলম, অবিনীত অন্তর, অপরিতৃপ্ত আত্মা এবং অগ্রহণযোগ্য দোআ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২২
২. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৫৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২৯০
৩. নিঃসন্দেহে এটি অদৃশ্যের বিষয়। যার সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
৪. কিতাবুয যুহদ, ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা: ২৬৭
৫. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১১৩
৬. মুসনাদে ইমাম আহমাদ, হাদীস নং: ২২৩১২; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ২০২৭
৭. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ২০১০
৮. আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৪২,১৪৩
৯. হিলয়াতুল আউলিয়া, আবু নুয়াইম: ৩/১২৪