📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 বিতর্কে সালাফদের অনীহা

📄 বিতর্কে সালাফদের অনীহা


সালাফরা আরও যেসব বিষয় অপছন্দ করেছেন তার মধ্যে আছে, হালাল-হারামের মাসআলা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া। ইসলামের মহান ইমামদের রীতি এমনটা ছিল না। পরবর্তীতে এসবের জন্ম হয়েছে। যেমন: শাফেয়ী ও হানাফীদের মাঝে সৃষ্টি হওয়া মতানৈক্যপূর্ণ মাসআলা ও এই বিষয়ে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থাবলি ও নানান ধরনের তর্ক-বিতর্ক।
এ সবগুলোই পরবর্তীতে সৃষ্ট, যার কোনো মৌলিক ভিত্তি নেই। এভাবে একটা সময় এসব বিষয় ইলম বলে আখ্যা পেয়েছে এবং মানুষকে এরচেয়ে আরও উপকারী ইলম থেকে বঞ্চিত করেছে। সে জন্যই সালাফে সালেহীন তর্ক-বিতর্কমূলক ইলমকে অপছন্দ করেছেন। হাদীসে এসেছে, রাসূল বলেছেন,
مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا
أُوتُوا الْجَدَلَ، ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ
তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হবার দরুনই কেবল মানুষ হেদায়াত পাবার পরও আবার গোমরাহ হয়ে যায়।
তারপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করেছেন,
مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
তারা আপনার সামনে যে উদাহরণই পেশ করে তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুত তারা হলো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।
কোনো এক সালাফ বলেছেন,
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার মঙ্গল চান, তখন তার জন্য আমল করার রাস্তা উন্মুক্ত করে দেন এবং বিবাদের দরজাকে বন্ধ করে দেন। আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তখন তার আমল করার দরজাকে বন্ধ করে দেন এবং বিবাদের দরজা খুলে দেন।
ইমাম মালেক বলেছেন,
বর্তমানে মানুষ যে অতিরিক্ত কথনে লিপ্ত, আমি এই অঞ্চলের (মদীনার) মানুষদের তা অপছন্দ করতে দেখেছি।
এই কথার মাধ্যমে তিনি মাসআলা-মাসায়েলের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বেশি কথা বলা ও বেশি ফতওয়া দেওয়াকে অপছন্দ করতেন। তিনি বলতেন,
অনেকে এমনভাবে কথা বলতে থাকে, যেন সে উত্তেজিত উট। এটা এমন ওটা অমন বলতে বলতে কথা চালিয়েই যেতে থাকে।
তিনি অধিক মাসআলার উত্তরপ্রদানকে অপছন্দ করে বলতেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي
তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলুন, রুহ আমার প্রভুর একটি আদেশ।
অর্থাৎ প্রশ্নে জিজ্ঞাসিত বিষয়ে রাসূল-এর কাছে কোনো জবাব আসেনি।
একবার ইমাম মালেক কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'বিবাদে লিপ্ত হবার জন্য কেউ সুন্নাহর ইলম অর্জন করতে পারবে?'
তিনি উত্তরে বললেন, 'না, বরং সে সঠিক বিষয়টি অবগত করাবে। যদি তার কথা গ্রহণ করা হয় তবে ভালো, অন্যথায় চুপ করে থাকবে।'
ইমাম মালেক থেকে এই কথাটিও বর্ণিত আছে যে, 'ইলমী বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ ইলমের নূর ছিনিয়ে নেয়।'
তিনি আরও বলেন, 'ইলমি বিষয়ে বিতর্ক অন্তরকে কঠিন করে দেয় এবং বিদ্বেষের জন্ম দেয়।'
অধিকাংশ জিজ্ঞাসিত মাসআলার বিষয়ে তিনি বলতেন, 'লা আদরি'। মানে হলো আমার জানা নাই।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলও এই বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করতেন। অহেতুক প্রশ্ন ও ঘটনা ঘটার আগেই সেই বিষয়ের মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার বিষয়ে শরীয়তেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই বিষয়ে এত বেশি পরিমাণ বর্ণনা পাওয়া যায়, যার উল্লেখ করলে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ৩২৫৩
২. সুরা ইসরা, (১৭): ৮৫

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 সালাফরা কেন কম কথা বলতেন

📄 সালাফরা কেন কম কথা বলতেন


অজ্ঞতা ও অপারগতার কারণে এই উম্মতের মহান পূর্বসূরিরা তর্ক-বিতর্ক ও বিবাদ থেকে বিরত থাকতেন, এমনটা কখনোই নয়; বরং তারা আল্লাহর ভয় ও ইলমের খাতিরেই চুপ থাকতেন। আর তাদের পরবর্তীদের বেশি কথা বলা এই জন্য নয়, তাদের এমন কোনো বিশেষ ইলম অর্জিত ছিল, যা তাদের পূর্বযুগের মনীষীদের কাছে ছিল না। যার ফলে তারা বেশি কথা বলতেন। বরং পরহেজগারির কমতির কারণেই তারা বেশি কথা বলতে ভালোবাসতেন। যেমন বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী কিছু লোককে বিতর্ক করতে দেখে বললেন, 'এরা এমন লোক, ইবাদাতের প্রতি যাদের বিরক্তি সৃষ্টি হয়েছে। কথা বলা তাদের জন্য অনেক সহজ কাজ। তাই তারা এত বেশি কথা বলছে।'
অন্য বর্ণনায় আছে, 'বিতর্কের বিষয়ে আমি তোমার চেয়ে বেশি ইলম রাখি। কিন্তু আমি তোমার সাথে বিতর্ক করব না।'
ইবরাহীম নাখয়ী বলেন, 'আমি কখনো বিতর্কে জড়াইনি।'
আব্দুল কারীম জাযারী বলেন, 'পরহেজগার ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি কখনো বিতর্কে লিপ্ত হয় না।'
জাফর ইবনে মুহাম্মাদ বলেছেন, 'দ্বীনি বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে সাবধান থাকো। কেননা, এটি অন্তরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে এবং কপটতা সৃষ্টি করে।'
উমর ইবনে আব্দুল আযীয বলতেন, 'যখন তুমি ঝগড়া-বিবাদ শুনতে পাবে, তখন নিবৃত্ত থাকো।'
তিনি আরও বলেন, 'যে ব্যক্তির দ্বীন শেখার উদ্দেশ্য হবে বিবাদ করা, তার ব্যস্ততা বেড়ে যাবে।'
অন্যত্র তিনি বলেন, 'নিশ্চয় পূর্ববর্তী মনীষীরা অনেক ইলম রাখতেন। বিচক্ষণতার কারণে তারা চুপ থাকতেন। যদি তারা বিতর্ক করতে চাইতেন তবে তাদের সেই সাধ্য অনেক বেশি ছিল।
এই বিষয়ে সালাফদের থেকে আরও অনেক উক্তি পাওয়া যায়।
পরবর্তী অনেক লোকেরা এমনটা ধারণা করে ধোঁকা খেয়েছে যে, দ্বীনি মাসায়েলের ক্ষেত্রে অধিক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনাকারী ব্যক্তি তার তুলনায় বেশি ইলমের অধিকারী, যিনি এমনটি নন। এটা কেবলই মূর্খতা। আপনি আবু বকর, উমর, মুয়াজ ইবনে জাবাল, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, জায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মতো প্রবীণ সাহাবীদের দিকে লক্ষ করে দেখুন তারা কেমন ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এর তুলনায় তাদের কথার পরিমাণ অনেক কম। অথচ নিঃসন্দেহে তারা সকলেই তাঁর তুলনায় বেশি ইলমের অধিকারী ছিলেন। এমনিভাবে সাহাবীদের তুলনায় তাবেয়ীদের কথার পরিমাণ বেশি। অথচ সাহাবীরা তাদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী ছিলেন। এমনিভাবে তাবে-তাবেয়ীদের কথার পরিমাণ তাবেয়ীদের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ তাবেয়ীরা তাদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী ছিলেন। সুতরাং বোঝা গেল, ইলমের আধিক্য বেশি কথা বলতে পারা বা বেশি রেওয়ায়েত করতে পারা দিয়ে নির্ণীত হয় না। বরং এটি হলো অন্তরে স্থাপিত এক ধরনের নূর, যা দ্বারা বান্দা সত্য ও সঠিক বিষয় চিনতে পারে এবং এর মাধ্যমে সঠিক-বেঠিকের মধ্যকার পার্থক্য করে তাকে এমন সংক্ষিপ্ত ভাষায় প্রকাশ করতে পারে, যার দ্বারা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনে সে পুরোপুরি সক্ষম হয়।
রাসূলকে অল্প কথায় অধিক মর্ম প্রকাশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর জন্য কথাকে সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল। সে জন্যই বেশি কথা বলা ও প্রশ্নোত্তর করার বিষয়ে শরীয়তে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
রাসূল বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَبْعَثْ نَبِيًّا إِلَّا مُبَلِّغَا، وَإِنَّ
تَشْقِيقَ الْكَلَامِ مِنَ الشَّيْطَانِ
নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বাগ্মী করেই নবীদের প্রেরণ করেন। আর সাজিয়ে সাজিয়ে কথা বলা শয়তানের কাজ।
রাসূল-এর খুতবাগুলো তো মধ্যম মানের। তিনি এমনভাবে কথা বলতেন, যদি কেউ তা গণনা করতে চাইত তবে গণনা করতে পারত।
তিনি বলেছেন,
إِنَّ مِنَ البَيَانِ سِحْرًا
| নিশ্চয় কথার মধ্যে জাদু আছে।
তিনি হাদীসটি নিন্দার্থে বলেছেন, প্রশংসার্থে নয়। অথচ অনেকে এমনটিই ধারণা করেছে। যে হাদীসটির পূর্বাপর গভীরভাবে খেয়াল করবে, সে নিশ্চিতভাবে তা বুঝতে পারবে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে সুনানে তিরমিজীসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে মারফু হিসাবে একটি হাদীস উল্লেখ হয়েছে। তা হলো,
إِنَّ اللَّهَ لَيُبْغِضُ الْبَلِيغَ مِنَ الرِّجَالِ،
الَّذِي يَتَخَلَّلُ بِلِسَانِهِ تَخَلَّلَ الْبَقَرَةِ
আল্লাহ তাআলা সেসব লোককে ঘৃণা করেন, যারা বাষ্পটুত্ব প্রদর্শনের জন্য জিহ্বাকে দাঁতের সঙ্গে লাগিয়ে বিকট শব্দ করে, যেভাবে গরু তার জিহ্বা নেড়ে করে থাকে।
এই অর্থে আরও অনেক মারফু হাদীস রয়েছে। উমর, সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবীদের থেকেও এই বিষয়ে মারফু হাদীস পাওয়া যায়। সুতরাং এই বিশ্বাস রাখা জরুরি যে, যারা ইলমী বিষয়ে বেশি কথা বলে ও দীর্ঘ আলোচনা করে তারা কখনই অল্প কথায় অভ্যস্ত পূর্ববর্তী মনীষীদের তুলনায় অধিক ইলমের অধিকারী নন।
একটি ভ্রান্ত ধারণা
অনেক সময় আমরা মূর্খ লোকদের কথায় ধোঁকা খেয়ে যাই। তারা বিশ্বাস করে, পরবর্তীকালে যারা অধিকহারে কথা বলে গিয়েছেন তারা প্রাচীন যুগের সালাফদের চেয়ে বেশি ইলমের অধিকারী ছিলেন। তাদের অনেকে তো এমন ধারণাও করে যে, সে সাহাবা ও তাবেয়ীদের থেকেও বেশি ইলমের অধিকারী। কারণ, সে বেশি বয়ান করতে পারে ও কথা বলতে পারে। আবার কেউ কেউ বলে, সে অনুসরণীয় ইমামদের থেকেও বেশি ইলমসম্পন্ন। এটি সে মুখে না বললেও তার অবস্থান থেকে তা প্রতিভাত হয়। কারণ, অনুসরণীয় ফকীহ ইমামগণ তাঁদের পূর্ববর্তী আলেমদের তুলনায় বেশি কথা বলেছেন। সুতরাং তাঁদের পরে আগমনকারী ব্যক্তিরা যদি অতিকথনে সেসব ফকীহদের ছাড়িয়ে যাবার দরুন তাঁদের চেয়ে বেশি ইলমের অধিকারী বলে গণ্য হন, তাহলে তো নিশ্চিত করে বলা যায় যে, তারা সেসব সাহাবা ও তাবেয়ীদের থেকেও বেশি জ্ঞানী হবেন, যাদের কথার পরিমাণ ফকীহ ইমামদের থেকেও কম ছিল। যেমন: সুফিয়ান সাওরী, আওযায়ী, লাইস ইবনে সাআদ, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহিমাহুমুল্লাহ সহ তাঁদের সমপর্যায়ের অন্যান্য আলেমগণ এবং তাঁদের পূর্ববর্তী সাহাবা ও তাবেয়ীগণ। এদের প্রত্যেকেই তাঁদের পূর্বের লোকদের তুলনায় স্বল্পভাষী ছিলেন। এটা মূলত সালাফে সালেহীনের মর্যাদাকে খাটো করা। তাঁদের প্রতি মানুষের মনে মন্দ ধারণা সৃষ্টি করা। তাদের অজ্ঞ ও অল্প ইলমের অধিকারী সাব্যস্ত করা। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ সাহাবীদের বিষয়ে সত্যই বলেছেন যে, 'উম্মাহর মধ্যে তারা সবচেয়ে স্বচ্ছ মনের বাহক, সবচে গভীর জ্ঞানের ধারক এবং সবচে কম লৌকিকতা প্রদর্শনকারী। আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। এই কথার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী লোকেরা তাদের তুলনায় কম ইলমের অধিকারী ও বেশি লৌকিকতা প্রদর্শনকারী।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আরও বলেছেন,
তোমরা এমন একটা যামানায় আছো, যেখানে আলেমদের সংখ্যা বেশি, বক্তাদের সংখ্যা কম। অচিরেই তোমাদের পর এমন এক যামানা আসবে যখন আলেমদের সংখ্যা কম এবং বক্তাদের সংখ্যা বেশি হবে।
সুতরাং যার ইলম-জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং কথা বলার পরিমাণ কমে যায় তিনি প্রশংসিত। আর যার অবস্থা এর বিপরীত হয় সে নিন্দিত। রাসূল ইয়েমেনবাসীদের জন্য ঈমান ও ফিকহের দুয়া করেছেন। আর ইয়েমেনের অধিবাসীরা স্বল্পভাষী ও অধিক ইলমের অধিকারী। কিন্তু তাদের ইলম হলো উপকারী ইলম, যার অবস্থানস্থল হলো অন্তর। তারা জবানে কেবল ততটুকুই প্রকাশ করে যতটুকুর প্রয়োজন দেখা দেয়। এটাই হলো প্রকৃত ইলম ও ফিকহ।

টিকাঃ
১. আল্লামা আজুরী, শরীয়ত, পৃষ্ঠা: ৫৮
২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/১৯৮
৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৩২৫
৪. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৬৩
৫. সহীহুল বুখারী: ৫১৪৬
৬. তিরমিজী, হাদীস নং: ২৮৫৩; আবু দাউদ, হাদীস নং: ৫০০৫
৭. জামিউ বয়ানিল ইলম: ২/৯৭
৮. আল-ইলম, আবি খায়সামা, পৃষ্ঠা: ১০৯

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 উত্তম ইলমের বর্ণনা

📄 উত্তম ইলমের বর্ণনা


সবচেয়ে উত্তম ইলম হলো কুরআনের তাফসীর ও হাদীসের ইলম। এবং হারাম-হালাল বিষয়ক সেই ইলম, যা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও অনুসরণীয় ইমামদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তাদের থেকে প্রাপ্ত সেসব ইলম জেনেবুঝে আয়ত্ত করা ও সেগুলোর ফিকহ অর্জন করা হলো সবচেয়ে উত্তম। তাদের পরে নতুন করে যেসব ইলমের উদ্ভব হয়েছে সেগুলো অধিকহারে অর্জন করার মধ্যে তেমন কোনো মঙ্গল নেই। তবে যদি তা সালাফদের কথা বোঝার জন্য সহায়ক হয় তবে ভিন্ন কথা।
আর যেসব বিষয় তাদের কথার বিপরীত, তার অধিকাংশই ভ্রান্ত অথবা সেগুলোতে তেমন কোনো উপকার নেই। বরং তাদের কথার মধ্যেই আমাদের জন্য পর্যাপ্ত ও যথেষ্ট খোরাক রয়েছে। সেজন্যই দেখা যায়, পরবর্তীদের কথাতে যেসব তথ্য পাওয়া যায় সেগুলো সালাফদের কথাতে খুবই সংক্ষিপ্ত বাক্যে বিদ্যমান থাকে। এমনিভাবে পরবর্তীদের কথা-বার্তাতে যেসব ভ্রান্ত বিষয়ের উপস্থিতি রয়েছে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে সালাফদের কথাতে সেগুলোর প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাদের কথাতে এমন এমন চমৎকার ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় পাওয়া যায়, পরবর্তীদের কথাতে যার লেশমাত্র থাকে না। সুতরাং যে তাদের কথা থেকে ইলম নেবে না, সে এই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে। এর সাথে সে পরবর্তী লোকদের পতিত হওয়া গোমরাহিতেও নিপতিত হবে।
যে ব্যক্তি তাদের কথাগুলো সংকলন করতে আগ্রহী তার জন্য কর্তব্য হলো অশুদ্ধ বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বর্ণনা থেকে পৃথক করে নেওয়া। আর এটা জরাহ-তাদীল ও ইলালের জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে জানা সম্ভব। যে ব্যক্তির এই বিষয়ে জ্ঞান নেই সে এসব বর্ণনা করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। বরং সত্য-মিথ্যা সব তার কাছে মিশ্রিত হয়ে যাবে। ফলে তার কাছে থাকা ইলমও অনির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। যেমন আমরা দেখে থাকি যে, জরাহ-তাদীল ও ইলাল সম্পর্কে যার জানাশোনার পরিধি একেবারেই কম সে নবী ও সালাফদের থেকে যা বর্ণনা করে তার ওপর আস্থা রাখা যায় না। কারণ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ বর্ণনা বিষয়ে তার জ্ঞান না থাকার ফলে এমনও হতে পারে যে, তার বর্ণনা করা সকল বক্তব্যই বাতিলের খাতায় অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম আওযায়ী বলেছেন, 'প্রকৃত ইলম সেটাই যা সাহাবায়ে কেরাম প্রদান করেছেন। এর বাইরে যা আছে সেটা মূলত ইলম নয়। '
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তাবেয়ীদের বিষয়ে বলেছেন, 'তাদের কথা লিখে রাখা বা পরিত্যাগ করার ব্যাপারে তুমি স্বাধীন।'
ইবনে শিহাব যুহরী তাবেয়ীদের কথা লিখে রাখতেন। কিন্তু সালেহ ইবনে কায়সান লিখতেন না। পরবর্তী সময় তিনি এর জন্য লজ্জা বোধ করতেন।

টিকাঃ
১. ইলমুল জরাহ-তাদীল বলা হয় বর্ণনাকারীদের বিষয়ে বর্ণিত ভালোমন্দ মন্তব্যসমূহ জানার শাস্ত্রকে। আর ইলাল দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো বর্ণনাকারীদের ভুলের কারণে হাদীসের সনদ বা মতনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া গোপন ত্রুটি। যার কারণে হাদীস দুর্বল হযে যায়।
২. জামিউ বয়ানিল ইলম: ২/২৯
৩. তাকয়ীদুল ইলম, পৃষ্ঠা: ১০৬

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 নব আবিষ্কৃত ইলম সম্পর্কে সতর্কতা

📄 নব আবিষ্কৃত ইলম সম্পর্কে সতর্কতা


সালাফদের পরে যে ইলমের উদ্ভব ঘটেছে সে সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, তাদের পরে অনেক নতুন জিনিসের জন্ম হয়েছে। হাদীস-সুন্নাহের অনুসরণের দিকে সম্বন্ধিত আহলে জাহের গোষ্ঠীই হাদীস-সুন্নাহের সবচেয়ে বেশি বিপরীত কাজ করে থাকে। কারণ, তারা ইমামদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সবকিছু নিজেদের বুঝমতো বোঝার কারণে তাদের থেকে আলাদা। উপরন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী ইমামরা যেসব বিষয় গ্রহণ করেননি সেগুলোও অনেক সময় গ্রহণ করে থাকে।
তবে এর সাথে দার্শনিক বা মুতাকাল্লিমিনদের আলোচনায় প্রবিষ্ট হওয়া কেবলই অকল্যাণ। যারা এতে লিপ্ত হয় তারা খুব অল্পই এদের আবর্জনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, 'যে কালামশাস্ত্র চর্চা করে সে একসময় জাহমিয়া হয়ে যায়।'
ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য সালাফরা কালামশাস্ত্রবিদদের থেকে সতর্ক করতেন। যদিও তারা সুন্নাহর স্বপক্ষে কাজ করে থাকে। কালামশাস্ত্র পছন্দকারীদের কথার মধ্যে তর্ক-বিতর্কের গভীরে যেতে অনাগ্রহী ব্যক্তিদের প্রতি যেসব নিন্দাবাদ দেখতে পাওয়া যায় এবং তাদের অজ্ঞ আখ্যা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় বা তাদের 'হাশাবী' বলে সম্বোধন করার প্রবণতা দৃষ্টিগোচর হয় অথবা বলা হয় যে, তারা আল্লাহর পরিচয় জানে না ও তার দ্বীন সম্পর্কে তেমন জ্ঞানী নয়, তো এ সবকিছুই হলো মূলত শয়তানের কাজ। এর থেকে আমরা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
পরবর্তী যুগে আবিষ্কার হওয়া জ্ঞানের মধ্যে আরও রয়েছে কেবল নিজস্ব মত, অভিরুচি ও কাশফের ভিত্তিতে মারেফত এবং আধ্যাত্মিক-কর্ম ইত্যাদি বাতেনী ইলমের আলোচনায় লিপ্ত হওয়া। এটি অত্যন্ত মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইমাম আহমাদ এর মতো মনীষী ইমামগণ একে খুবই অপছন্দ করেছেন।
আবু সুলাইমান বলতেন, মানুষের অনেক সূক্ষ্ম জ্ঞান-গবেষণা আমি পেয়েছি। সেগুলোর কোনোটিই কুরআন-সুন্নাহের মতো ন্যায়পরায়ণ দুই সাক্ষীর মাধ্যমে যাচাই করা ছাড়া আমি গ্রহণ করিনি।
জুনাইদ বলেছেন, আমাদের ইলম কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে গণ্ডিবদ্ধ। যে ব্যক্তি কুরআন না পড়ে শুধু হাদীস লিপিবদ্ধ করে, আমাদের এই ইলম-জগতে তার অনুসরণ করা হয় না।
এই অঙ্গনটি অনেক বিস্তৃত। অনেকে এর কারণে নিফাক ও ধর্মদ্রোহিতার সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অনেকে এই দাবিও করে বসেছে যে, ওলি-আওলিয়ারা নবীদের থেকেও বেশি সম্মানী। অথবা তারা নবীদের থেকে অমুখাপেক্ষী। এমনকি নবীরা যে শরীয়ত নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে তারা একে অবহেলা করেছে। সৃষ্টি ও স্রষ্টা এক হবার কুফুরীতত্ত্বের অবতারণা করেছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও শরীয়তের অবৈধ জিনিসকে বৈধ হবার দাবি করেছে। এভাবে তারা দ্বীনের ভেতর এমন অনেক কিছু প্রবেশ করিয়েছে, যার সাথে শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই।
তাদের কেউ কেউ ধারণা করেছে যে, মানুষের অন্তর বিগলিত হবার জন্য গান-বাজনা ও নৃত্য করা যাবে। আবার কেউ ধারণা করেছে, মনোজাগতিক চর্চার উদ্দেশ্যে হারাম দৃশ্য ও তার প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাবে। অন্য অনেকে ধারণা করেছে বিনয় অর্জন ও আত্মম্ভরিতা বর্জনের উপায় হলো ছেঁড়া-ফাটা কাপড় পরিধান করা। অথচ এসব বিষয়কে শরীয়ত অনুমোদন করে না। কারণ, এগুলো আল্লাহর স্মরণ ও সালাতের পথে প্রতিবন্ধক হয় এবং দ্বীনকে তামাশার বস্তুতে রূপান্তরিত করে।
সুতরাং উপকারী ইলম হলো কুরআন-সুন্নাহর নুসুসকে আয়ত্ত করা। সেগুলোর অর্থ অনুধাবন করা। কুরআন-হাদীসের অর্থ বোঝা, হারাম-হালালের মাসআলা নিয়ে আলোচনা করা এবং আধ্যাত্মিকতা ও মারেফতের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের থেকে বর্ণিত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। প্রথমেই বিশুদ্ধ বিষয়কে অশুদ্ধ বিষয় থেকে পৃথক করে তারপর তার অর্থ বোঝার বিষয়ে সচেষ্ট থাকা। এর মধ্যেই জ্ঞানীদের জন্য যথেষ্ট খোরাক রয়েছে এবং যারা উপকারী ইলম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় তাদের জন্য যাবতীয় কল্যাণকর উপাদান রয়েছে।

টিকাঃ
১. হাশাবী হলো একটা ভ্রান্ত ফিরকার নাম। যারা দেহবাদী আকীদায় বিশ্বাসী এবং আল্লাহ তাআলার জন্য বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত করে থাকে। এদের মুজাসসিমাও বলা হয়।
২. তাবাকাতুস সুফিয়্যা, পৃষ্ঠা: ৭৮
৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১০/২৫৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00