📄 মুতাশাবিহাত সর্ম্পকে সালাফদের অবস্থান
এই বিষয়ে সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো সালাফে সালেহীনের অনুসৃত পদ্ধতি। তা হলো, সিফাত বা আল্লহর গুণাবলি ও এ-সংক্রান্ত হাদীসকে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা বা অবস্থা ও সাদৃশ্য বর্ণনা করা ছাড়াই যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সে অবস্থাথায় রেখে দেওয়া। তাদের কারও থেকে এর বিপরীত কিছু বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এর ক্ষেত্রে কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
এমনিভাবে এগুলোর অর্থ নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা এবং এগুলোর জন্য কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা কোনোটাই তাদের থেকে প্রমাণিত নয়। যদিও তাদের কেউ কেউ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এর যামানার কাছাকাছি। তাদের অনেকে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের অনুসরণে এমনটি করেছেন।
সুতরাং এই বিষয়ে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। বরং অনুসরণ করতে হবে ইসলামের মহান ইমামদের। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, মালেক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরী, আওযায়ী, মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস শাফেয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, আবু উবাইদ প্রমুখ।
এই সমস্ত ইমামদের কারও কথাতেই কালামশাস্ত্রবিদদের আলোচনা পাওয়া যায় না। দার্শনিকদের আলোচনা পাওয়া যাওয়া তো আরও দুরূহ ব্যাপার। আবু যুরআ রাযী বলেছেন, 'যাদের কাছে ইলম রয়েছে এবং তারা নিজের ইলমের হেফাজত করতে পারল না, তা প্রচার করার জন্য ইলমে কালামের মুখাপেক্ষী হলো তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হোয়ো না।'
টিকাঃ
[১] মুতাশাবিহ বলা হয় এমন-সব আয়াত ও হাদীসকে, যার অর্থ সাধারণভাবে বোধগম্য হয় না। -অনুবাদক
📄 ফুকাহা ও মুহাদ্দিসদের অনুসৃত নীতির পার্থক্য
এ-জাতীয় নতুন জ্ঞানের মধ্যে আরও আছে, আহলে রায় ফুকাহায়ে কেরামের উদ্ভাবিত বিভিন্ন বুদ্ধিজাত নিয়ম-নীতি ও কায়দা-কানুন। শাখাগত ফিকহী মাসআলাকে সেগুলোর আলোকে রচনা করা হয়ে থাকে। চাই তা সুন্নাহের সাথে মিলুক বা না মিলুক। যদিও সেসব বানানো কায়দা-কানুন কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সেই ব্যাখ্যাটা অন্যদের ব্যাখ্যার চেয়ে ভিন্ন হয়ে থাকে। এটি হলো সেই বিষয়, যার কারণে অনেক ইমাম হেজাজ ও ইরাকের আহলে রায় ফুকাহায়ে কেরামদের সমালোচনা করেছেন।
অপরদিকে মুহাদ্দিস ফুকাহায়ে কেরাম সহীহ হাদীসের অনুসরণ করে থাকেন। যেগুলোর ওপর সাহাবায়ে কেরাম ও তাদের পরবর্তীরা কিংবা তাদের মধ্য হতে এক জামাত আমল করেছেন। যেসব হাদীসের ওপর আমল করাকে সালাফরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিত্যাগ করেছেন সেগুলোর ওপর আমল করা জায়েয নয়। কেননা, সেগুলোর ওপর আমল করা যাবে না জানা আছে বিধায় তারা তা পরিত্যাগ করেছেন।
উমর ইবনে আবদুল আযীয বলেছেন,
তোমাদের পূর্ববর্তীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মত তোমরা গ্রহণ করো। কারণ, তারা তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী।
মদীনাবাসীর আমলের সাথে যদি হাদীস না মেলে তবে ইমাম মালেক এর মত হলো, এমন ক্ষেত্রে মদীনাবাসীর আমলকেই গ্রহণ করা হবে। তবে অন্যান্য অধিকাংশ আলেমের মত হলো, এমন ক্ষেত্রেও হাদীসকেই গ্রহণ করা হবে।
টিকাঃ
১. এই বিষয়টি আরেকটু সবিস্তারে আলোচনার দাবি রাখে। নয়তো পাঠকমহলের ভুল বোঝার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু কিছু মুহাদ্দিসীনে কেরাম ও ফকীহদের হাদীস গ্রহণ-বর্জনের নীতিমালায় ভিন্নতা রয়েছে। সেই ভিন্নতার সূত্র ধরে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য রচিত হয়েছে। ফলে এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের প্রতি অভিযোগের তির ছোড়া হয়েছে। যা সর্বক্ষেত্রে সর্বাংশে যথার্থ নয়। এই বিষয়টি সবচে সুন্দরভারে তুলে ধরেছেন বিখ্যাত উসূলে হাদীস বিশারদ আল্লামা তাহের আলজাযায়েরী (১৩৩৮ হি.)। প্রথমে তিনি আল্লামা সামআনী থেকে একটা মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। তা হলো শুধু বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বর্ণনা হলেই তা সহীহ বলে স্বীকৃত হয় না। বরং এর জন্য দরকার গভীর বুঝ, ব্যাপক জানাশোনা ও অধিক হারে শ্রবণ ও আলোচনা-পর্যালোচনা।' এরপর তিনি এই বিষয়টিকে সবিস্তারে লম্বা আলোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের প্রয়োজনীয় অংশটি হুবহু তুলে ধরা হলো। "জেনে রাখুন, এই বিষয়টি (অর্থাৎ কেবল সনদ সহীহ হওয়াটাই কোনো হাদীস আমলযোগ্য হবার জন্য যথেষ্ট নয়) মর্যাদাময় হাদীসশাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই ক্ষেত্রে তিন রকমের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মানুষ পাওয়া যায়। এক. এমন মানুষেরা, যাদের মূল মনোযোগ থাকে কেবল সনদের দিকে লক্ষ করা। যখন দেখে সনদটি মুত্তাসিল তথা অবিচ্ছিন্ন এবং তার এই অবিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে কোনোরূপ সন্দেহেরও অবকাশ নেই এবং সনদের বর্ণনাকারীগণও বিশ্বস্ততার বিচারে উত্তীর্ণ তখন তারা হাদীসটিকে সহীহ বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। অন্য বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে না। ফলে দেখা যায় তারা কোনো একটা হাদীসকে সহীহ বলছে অথচ সেই হাদীসটি অন্য আরেকটি অগ্রগণ্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে বর্ণিত হাদীসের বিপরীত। এক্ষেত্রে তারা বলে থাকে, সবগুলোই সহীহ। আবার অনেক সময় বলে, একটা সহীহ অন্যটা অধিক সহীহ। অথচ অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয়সাধন সম্ভবপর হয় না। তো এমন ক্ষেত্রে যখন কেউ সিদ্ধান্ত প্রদান থেকে বিরত থাকে তখন তারা তাকে সুন্নাহবিরোধী বলে আখ্যায়িত করে থাকে। অনেক সময় তাকে বিপদে ফেলতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ এই শাস্ত্রের বিচক্ষণ ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, কেবল সনদ সহীহ হওয়া মতন সহীহ হওয়াকে অত্যাবশ্যক করে না। সে জন্যই তারা বলেছেন, শুধু সনদ সহীহ দেখেই কোনো হাদীসকে সহীহ বলে দেওয়া কারও জন্য বৈধ নয় যতক্ষণ না সে এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ হবেন। কারণ, আশঙ্কা রয়ে যায় যে, হাদীসটির এমন গোপন ত্রুটি থাকতে পারে যা তার কাছে অজানা। এই জাতীয় মুহাদ্দিসদের বাড়াবাড়ি অনেক সময় এই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, (অনেক সময়) তারা অগ্রহণযোগ্য দুর্বল হাদীস গ্রহণ করাকে মানুষের জন্য জরুরি সাব্যস্ত করে। এভাবে তারা মানুষকে বিপদে ফেলে দেয়। এরাই হল মূলত সীমালঙ্ঘনকারী গোষ্ঠী। এদের অধিকাংশই হয়ে থাকে মুহাদ্দিসদের মধ্য হতে। যাদের মধ্যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকে অনুপস্থিত... (তাওযীহুন নজর ইলা উসুলিল আসার, ১/১৯০-৯১, আগ্রহী পাঠক পুরো আলোচনাটা দেখে নিতে পারেন। আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সাথে যতটুকু সম্পৃক্ত আমরা শুধু সেটুকুই উদ্ধৃত করলাম।) তো সনদের বাইরে আরও অন্য জিনিসগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে ফুকাহায়ে কেরামের জামাত বেশি মনোযোগী। তারা কেবল সনদের ওপর নির্ভর করেই কোনো হাদীস আমলযোগ্য হবার ঘোষণা দেন না। ফলে দেখা যায় মুহাদ্দিসদের মধ্য হতে অনেকে তাদের প্রতি সহীহ হাদীসের বিরোধিতা করার অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন। দৃষ্টিভঙ্গিগত এই মতপার্থক্য প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। যা এখানে করা সম্ভব নয়। আগ্রহীগণ বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়ুন: শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রচিত হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১/৪৭৮-৫০৩ পৃ.; ড. মুহাম্মাদ আবদুল লতীফ রচিত তারীখুল ফিকহিল ইসলামী, ১৭-৫৩ পৃ.; ড. মুস্তফা সাইদ রচিত দিরাসাতুন তারীখিইয়াতুন লিল ফিকহি ওয়া উসূলিহী, ৪৯-১০৫ পৃ.
২. এটাই ছিল সালাফে সালেহীনের রীতি। যেসব হাদীসের ওপর সাহাবা-তাবেয়ীরা আমল করতেন না তারা সেগুলো পরিহার করতেন। এই বিষয়ে কাযী ইয়ায তার বিখ্যাত গ্রন্থ তারতীবুল মাদারিক এর মধ্যে অনেকগুলো বর্ণনা এনেছেন। সেখান থেকে কিছু উদ্ধৃত করছি। এক. দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছেন, 'আমি আল্লাহর নামে সে ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছি যে আমলের বিপরীত হাদীস বর্ণনা করে।' দুই. ইমাম মালেক বলেন, অনেক তাবেয়ী আলেম হাদীস বর্ণনা করতেন। সেগুলো অন্যদের থেকেও যখন তাদের কাছে পৌঁছত তখন তারা বলত, 'এগুলো আমাদের অজানা নয়। তবে আমল এর বিপরীত চলে আসছে।' (তারতীবুল মাদারিক, ১/৬৬) উল্লেখ্য, এখানে আমল বলতে খাইরুল কুরুন থেকে প্রজন্মপরম্পরায় চলে আসা আমল বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে আবিষ্কৃত কোনো আমল নয়। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে হলে যে গ্রন্থগুলো পড়তে পারেন তা হলো: ১. তারীখুল মাযাহিবিল ইসলামিইয়া, ইমাম আবু যুহরা ২. রিসালাতুল ইমাম লাইস ইবনে সাদ ইলাল ইমাম মালেক ৩. আসারুল হাদীসিশ শরীফ, শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ ৪. অনুবাদকের রচিত 'আলআমালুল মুতাওয়ারাস ওয়া আসারুহু ফি নকদিল হাদীস' (অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি)
📄 বিতর্কে সালাফদের অনীহা
সালাফরা আরও যেসব বিষয় অপছন্দ করেছেন তার মধ্যে আছে, হালাল-হারামের মাসআলা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া। ইসলামের মহান ইমামদের রীতি এমনটা ছিল না। পরবর্তীতে এসবের জন্ম হয়েছে। যেমন: শাফেয়ী ও হানাফীদের মাঝে সৃষ্টি হওয়া মতানৈক্যপূর্ণ মাসআলা ও এই বিষয়ে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থাবলি ও নানান ধরনের তর্ক-বিতর্ক।
এ সবগুলোই পরবর্তীতে সৃষ্ট, যার কোনো মৌলিক ভিত্তি নেই। এভাবে একটা সময় এসব বিষয় ইলম বলে আখ্যা পেয়েছে এবং মানুষকে এরচেয়ে আরও উপকারী ইলম থেকে বঞ্চিত করেছে। সে জন্যই সালাফে সালেহীন তর্ক-বিতর্কমূলক ইলমকে অপছন্দ করেছেন। হাদীসে এসেছে, রাসূল বলেছেন,
مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا
أُوتُوا الْجَدَلَ، ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ
তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হবার দরুনই কেবল মানুষ হেদায়াত পাবার পরও আবার গোমরাহ হয়ে যায়।
তারপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করেছেন,
مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
তারা আপনার সামনে যে উদাহরণই পেশ করে তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুত তারা হলো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।
কোনো এক সালাফ বলেছেন,
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার মঙ্গল চান, তখন তার জন্য আমল করার রাস্তা উন্মুক্ত করে দেন এবং বিবাদের দরজাকে বন্ধ করে দেন। আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তখন তার আমল করার দরজাকে বন্ধ করে দেন এবং বিবাদের দরজা খুলে দেন।
ইমাম মালেক বলেছেন,
বর্তমানে মানুষ যে অতিরিক্ত কথনে লিপ্ত, আমি এই অঞ্চলের (মদীনার) মানুষদের তা অপছন্দ করতে দেখেছি।
এই কথার মাধ্যমে তিনি মাসআলা-মাসায়েলের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বেশি কথা বলা ও বেশি ফতওয়া দেওয়াকে অপছন্দ করতেন। তিনি বলতেন,
অনেকে এমনভাবে কথা বলতে থাকে, যেন সে উত্তেজিত উট। এটা এমন ওটা অমন বলতে বলতে কথা চালিয়েই যেতে থাকে।
তিনি অধিক মাসআলার উত্তরপ্রদানকে অপছন্দ করে বলতেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي
তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলুন, রুহ আমার প্রভুর একটি আদেশ।
অর্থাৎ প্রশ্নে জিজ্ঞাসিত বিষয়ে রাসূল-এর কাছে কোনো জবাব আসেনি।
একবার ইমাম মালেক কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'বিবাদে লিপ্ত হবার জন্য কেউ সুন্নাহর ইলম অর্জন করতে পারবে?'
তিনি উত্তরে বললেন, 'না, বরং সে সঠিক বিষয়টি অবগত করাবে। যদি তার কথা গ্রহণ করা হয় তবে ভালো, অন্যথায় চুপ করে থাকবে।'
ইমাম মালেক থেকে এই কথাটিও বর্ণিত আছে যে, 'ইলমী বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ ইলমের নূর ছিনিয়ে নেয়।'
তিনি আরও বলেন, 'ইলমি বিষয়ে বিতর্ক অন্তরকে কঠিন করে দেয় এবং বিদ্বেষের জন্ম দেয়।'
অধিকাংশ জিজ্ঞাসিত মাসআলার বিষয়ে তিনি বলতেন, 'লা আদরি'। মানে হলো আমার জানা নাই।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলও এই বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করতেন। অহেতুক প্রশ্ন ও ঘটনা ঘটার আগেই সেই বিষয়ের মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার বিষয়ে শরীয়তেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই বিষয়ে এত বেশি পরিমাণ বর্ণনা পাওয়া যায়, যার উল্লেখ করলে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ৩২৫৩
২. সুরা ইসরা, (১৭): ৮৫
📄 সালাফরা কেন কম কথা বলতেন
অজ্ঞতা ও অপারগতার কারণে এই উম্মতের মহান পূর্বসূরিরা তর্ক-বিতর্ক ও বিবাদ থেকে বিরত থাকতেন, এমনটা কখনোই নয়; বরং তারা আল্লাহর ভয় ও ইলমের খাতিরেই চুপ থাকতেন। আর তাদের পরবর্তীদের বেশি কথা বলা এই জন্য নয়, তাদের এমন কোনো বিশেষ ইলম অর্জিত ছিল, যা তাদের পূর্বযুগের মনীষীদের কাছে ছিল না। যার ফলে তারা বেশি কথা বলতেন। বরং পরহেজগারির কমতির কারণেই তারা বেশি কথা বলতে ভালোবাসতেন। যেমন বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী কিছু লোককে বিতর্ক করতে দেখে বললেন, 'এরা এমন লোক, ইবাদাতের প্রতি যাদের বিরক্তি সৃষ্টি হয়েছে। কথা বলা তাদের জন্য অনেক সহজ কাজ। তাই তারা এত বেশি কথা বলছে।'
অন্য বর্ণনায় আছে, 'বিতর্কের বিষয়ে আমি তোমার চেয়ে বেশি ইলম রাখি। কিন্তু আমি তোমার সাথে বিতর্ক করব না।'
ইবরাহীম নাখয়ী বলেন, 'আমি কখনো বিতর্কে জড়াইনি।'
আব্দুল কারীম জাযারী বলেন, 'পরহেজগার ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি কখনো বিতর্কে লিপ্ত হয় না।'
জাফর ইবনে মুহাম্মাদ বলেছেন, 'দ্বীনি বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে সাবধান থাকো। কেননা, এটি অন্তরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে এবং কপটতা সৃষ্টি করে।'
উমর ইবনে আব্দুল আযীয বলতেন, 'যখন তুমি ঝগড়া-বিবাদ শুনতে পাবে, তখন নিবৃত্ত থাকো।'
তিনি আরও বলেন, 'যে ব্যক্তির দ্বীন শেখার উদ্দেশ্য হবে বিবাদ করা, তার ব্যস্ততা বেড়ে যাবে।'
অন্যত্র তিনি বলেন, 'নিশ্চয় পূর্ববর্তী মনীষীরা অনেক ইলম রাখতেন। বিচক্ষণতার কারণে তারা চুপ থাকতেন। যদি তারা বিতর্ক করতে চাইতেন তবে তাদের সেই সাধ্য অনেক বেশি ছিল।
এই বিষয়ে সালাফদের থেকে আরও অনেক উক্তি পাওয়া যায়।
পরবর্তী অনেক লোকেরা এমনটা ধারণা করে ধোঁকা খেয়েছে যে, দ্বীনি মাসায়েলের ক্ষেত্রে অধিক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনাকারী ব্যক্তি তার তুলনায় বেশি ইলমের অধিকারী, যিনি এমনটি নন। এটা কেবলই মূর্খতা। আপনি আবু বকর, উমর, মুয়াজ ইবনে জাবাল, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, জায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মতো প্রবীণ সাহাবীদের দিকে লক্ষ করে দেখুন তারা কেমন ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এর তুলনায় তাদের কথার পরিমাণ অনেক কম। অথচ নিঃসন্দেহে তারা সকলেই তাঁর তুলনায় বেশি ইলমের অধিকারী ছিলেন। এমনিভাবে সাহাবীদের তুলনায় তাবেয়ীদের কথার পরিমাণ বেশি। অথচ সাহাবীরা তাদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী ছিলেন। এমনিভাবে তাবে-তাবেয়ীদের কথার পরিমাণ তাবেয়ীদের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ তাবেয়ীরা তাদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী ছিলেন। সুতরাং বোঝা গেল, ইলমের আধিক্য বেশি কথা বলতে পারা বা বেশি রেওয়ায়েত করতে পারা দিয়ে নির্ণীত হয় না। বরং এটি হলো অন্তরে স্থাপিত এক ধরনের নূর, যা দ্বারা বান্দা সত্য ও সঠিক বিষয় চিনতে পারে এবং এর মাধ্যমে সঠিক-বেঠিকের মধ্যকার পার্থক্য করে তাকে এমন সংক্ষিপ্ত ভাষায় প্রকাশ করতে পারে, যার দ্বারা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনে সে পুরোপুরি সক্ষম হয়।
রাসূলকে অল্প কথায় অধিক মর্ম প্রকাশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর জন্য কথাকে সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল। সে জন্যই বেশি কথা বলা ও প্রশ্নোত্তর করার বিষয়ে শরীয়তে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
রাসূল বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَبْعَثْ نَبِيًّا إِلَّا مُبَلِّغَا، وَإِنَّ
تَشْقِيقَ الْكَلَامِ مِنَ الشَّيْطَانِ
নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বাগ্মী করেই নবীদের প্রেরণ করেন। আর সাজিয়ে সাজিয়ে কথা বলা শয়তানের কাজ।
রাসূল-এর খুতবাগুলো তো মধ্যম মানের। তিনি এমনভাবে কথা বলতেন, যদি কেউ তা গণনা করতে চাইত তবে গণনা করতে পারত।
তিনি বলেছেন,
إِنَّ مِنَ البَيَانِ سِحْرًا
| নিশ্চয় কথার মধ্যে জাদু আছে।
তিনি হাদীসটি নিন্দার্থে বলেছেন, প্রশংসার্থে নয়। অথচ অনেকে এমনটিই ধারণা করেছে। যে হাদীসটির পূর্বাপর গভীরভাবে খেয়াল করবে, সে নিশ্চিতভাবে তা বুঝতে পারবে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে সুনানে তিরমিজীসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে মারফু হিসাবে একটি হাদীস উল্লেখ হয়েছে। তা হলো,
إِنَّ اللَّهَ لَيُبْغِضُ الْبَلِيغَ مِنَ الرِّجَالِ،
الَّذِي يَتَخَلَّلُ بِلِسَانِهِ تَخَلَّلَ الْبَقَرَةِ
আল্লাহ তাআলা সেসব লোককে ঘৃণা করেন, যারা বাষ্পটুত্ব প্রদর্শনের জন্য জিহ্বাকে দাঁতের সঙ্গে লাগিয়ে বিকট শব্দ করে, যেভাবে গরু তার জিহ্বা নেড়ে করে থাকে।
এই অর্থে আরও অনেক মারফু হাদীস রয়েছে। উমর, সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবীদের থেকেও এই বিষয়ে মারফু হাদীস পাওয়া যায়। সুতরাং এই বিশ্বাস রাখা জরুরি যে, যারা ইলমী বিষয়ে বেশি কথা বলে ও দীর্ঘ আলোচনা করে তারা কখনই অল্প কথায় অভ্যস্ত পূর্ববর্তী মনীষীদের তুলনায় অধিক ইলমের অধিকারী নন।
একটি ভ্রান্ত ধারণা
অনেক সময় আমরা মূর্খ লোকদের কথায় ধোঁকা খেয়ে যাই। তারা বিশ্বাস করে, পরবর্তীকালে যারা অধিকহারে কথা বলে গিয়েছেন তারা প্রাচীন যুগের সালাফদের চেয়ে বেশি ইলমের অধিকারী ছিলেন। তাদের অনেকে তো এমন ধারণাও করে যে, সে সাহাবা ও তাবেয়ীদের থেকেও বেশি ইলমের অধিকারী। কারণ, সে বেশি বয়ান করতে পারে ও কথা বলতে পারে। আবার কেউ কেউ বলে, সে অনুসরণীয় ইমামদের থেকেও বেশি ইলমসম্পন্ন। এটি সে মুখে না বললেও তার অবস্থান থেকে তা প্রতিভাত হয়। কারণ, অনুসরণীয় ফকীহ ইমামগণ তাঁদের পূর্ববর্তী আলেমদের তুলনায় বেশি কথা বলেছেন। সুতরাং তাঁদের পরে আগমনকারী ব্যক্তিরা যদি অতিকথনে সেসব ফকীহদের ছাড়িয়ে যাবার দরুন তাঁদের চেয়ে বেশি ইলমের অধিকারী বলে গণ্য হন, তাহলে তো নিশ্চিত করে বলা যায় যে, তারা সেসব সাহাবা ও তাবেয়ীদের থেকেও বেশি জ্ঞানী হবেন, যাদের কথার পরিমাণ ফকীহ ইমামদের থেকেও কম ছিল। যেমন: সুফিয়ান সাওরী, আওযায়ী, লাইস ইবনে সাআদ, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহিমাহুমুল্লাহ সহ তাঁদের সমপর্যায়ের অন্যান্য আলেমগণ এবং তাঁদের পূর্ববর্তী সাহাবা ও তাবেয়ীগণ। এদের প্রত্যেকেই তাঁদের পূর্বের লোকদের তুলনায় স্বল্পভাষী ছিলেন। এটা মূলত সালাফে সালেহীনের মর্যাদাকে খাটো করা। তাঁদের প্রতি মানুষের মনে মন্দ ধারণা সৃষ্টি করা। তাদের অজ্ঞ ও অল্প ইলমের অধিকারী সাব্যস্ত করা। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ সাহাবীদের বিষয়ে সত্যই বলেছেন যে, 'উম্মাহর মধ্যে তারা সবচেয়ে স্বচ্ছ মনের বাহক, সবচে গভীর জ্ঞানের ধারক এবং সবচে কম লৌকিকতা প্রদর্শনকারী। আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। এই কথার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী লোকেরা তাদের তুলনায় কম ইলমের অধিকারী ও বেশি লৌকিকতা প্রদর্শনকারী।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আরও বলেছেন,
তোমরা এমন একটা যামানায় আছো, যেখানে আলেমদের সংখ্যা বেশি, বক্তাদের সংখ্যা কম। অচিরেই তোমাদের পর এমন এক যামানা আসবে যখন আলেমদের সংখ্যা কম এবং বক্তাদের সংখ্যা বেশি হবে।
সুতরাং যার ইলম-জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং কথা বলার পরিমাণ কমে যায় তিনি প্রশংসিত। আর যার অবস্থা এর বিপরীত হয় সে নিন্দিত। রাসূল ইয়েমেনবাসীদের জন্য ঈমান ও ফিকহের দুয়া করেছেন। আর ইয়েমেনের অধিবাসীরা স্বল্পভাষী ও অধিক ইলমের অধিকারী। কিন্তু তাদের ইলম হলো উপকারী ইলম, যার অবস্থানস্থল হলো অন্তর। তারা জবানে কেবল ততটুকুই প্রকাশ করে যতটুকুর প্রয়োজন দেখা দেয়। এটাই হলো প্রকৃত ইলম ও ফিকহ।
টিকাঃ
১. আল্লামা আজুরী, শরীয়ত, পৃষ্ঠা: ৫৮
২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/১৯৮
৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৩২৫
৪. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ১১/১৬৩
৫. সহীহুল বুখারী: ৫১৪৬
৬. তিরমিজী, হাদীস নং: ২৮৫৩; আবু দাউদ, হাদীস নং: ৫০০৫
৭. জামিউ বয়ানিল ইলম: ২/৯৭
৮. আল-ইলম, আবি খায়সামা, পৃষ্ঠা: ১০৯