📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 অনুপকারী ইলম অর্জনের ক্ষতি

📄 অনুপকারী ইলম অর্জনের ক্ষতি


অনেক সময় এসব নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গবেষণা বিভিন্ন শহরে মুসলিমদের কেবলা সম্পর্কে মন্দ ধারণা সৃষ্টি করে। যেমন: এই জ্ঞান চর্চাকারীদের অনেকের ক্ষেত্রে এমনটা অতীতে ও বর্তমান যুগে ঘটেছে। এটা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা এমন বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে থাকে যে, কিছু শহরে সাহাবী ও তাবেয়ীদের সালাত ভুল হয়েছে। অথচ তা ভ্রান্ত কথা।
ইমাম আহমাদ রাশিচক্রের দশম মকর রাশির দ্বারা প্রমাণ গ্রহণকে অপছন্দ করে বলেছেন, হাদীসে এসেছে,
مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ قِبْلَةُ
| পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে হলো কিবলা।
অর্থাৎ তিনি মকর রাশিসহ অন্যান্য নক্ষত্রকে ধর্তব্যে আনেননি। ইবনে মাসউদ কাব এর এই কথার নিন্দা করেছেন যে, আকাশ ঘুরতে থাকে। ইমাম মালেক সহ অন্যরাও এর নিন্দা করেছেন। ইমাম আহমদ জ্যোতির্বিদদের এই কথার নিন্দা করেছেন যে, শহরসমূহে দ্বিপ্রহরে তারতম্য ঘটে থাকে।
অনেক সময় তারা নিন্দা করতেন এই কারণে যে, রাসূলরা এসব বিষয় নিয়ে কখনো কথা বলেননি। তা ছাড়া অনেক সময় এসব নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করাটা ফাসাদেরও কারণ হয়ে থাকে। কারণ, দেখা গেছে জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী অনেকে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর নিম্ন আকাশে অবতরণ করার হাদীসের বিষয়ে আপত্তি করে বলে থাকেন, 'রাতের এক-তৃতীয়াংশ একেক দেশে একেক সময়ে হয়ে থাকে। সুতরাং নির্দিষ্ট একটি সময়ে এই অবতরণ সম্ভব নয়।' অথচ এই ধরনের আপত্তির অপছন্দনীয়তা আমাদের কাছে আজানা নয়। যদি আল্লাহর রাসূল বা খুলাফায়ে রাশেদীন কাউকে এমন আপত্তি করতে শুনতেন তবে তার সাথে কথা না বাড়িয়ে বরং তাকে শাস্তিপ্রদানে উদ্যোগী হতেন এবং তাকে মুনাফিক হিসাবে আখ্যায়িত করতেন।
এমনিভাবে বংশধারার ইলমও খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয়। উমর ও অন্যান্য আরও অনেকের থেকে এই বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার কথা আমরা ইতিপূর্বে জেনে এসেছি। তবুও দেখা যায় সাহাবী ও তাবেয়ীদের একটা জামাত এই বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন এবং এর প্রতি যত্নশীল ছিলেন।
এমনিভাবে আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত গবেষণা এরচেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়। এর পেছনে পড়ে থাকলে অন্যান্য উপকারী ইলম থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
কাসেম ইবনে মুখাইমারা 'ইলমুন নাহব' বা আরবী ব্যাকরণবিদ্যাকে অপছন্দ করে বলেছেন, 'এটি ব্যস্ততা দিয়ে শুরু হয় এবং অবাধ্যতা দিয়ে শেষ হয়।' এর দ্বারা তিনি মূলত এই বিদ্যায় অধিক পরিমাণে ঝুঁকে পড়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এই কারণেই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আরবী ভাষা ও এর ব্যাকরণ বিষয়ে অতিমাত্রায় জানাকে অপছন্দ করতেন।
আবু উবাইদ এর অতিরিক্ত ব্যাকরণচর্চার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন,
তিনি ব্যাকরণ নিয়ে ব্যস্ত থেকে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বিমুখ হয়ে আছেন।
এই কারণেই বলা হয়ে থাকে, কথার মধ্যে ব্যাকরণের অবস্থান তেমন যেমন খাবারের মধ্যে লবণের অবস্থান। অর্থাৎ ব্যাকরণ সেই পরিমাণ দরকার, যতটুকু হলে কথার শুদ্ধতা রক্ষা করা যায়। যেভাবে ততটুকু লবণ তরকারিতে দেওয়া হয়ে থাকে, যতটুকু হলে খাবারের স্বাদ ঠিক থাকে। এরচেয়ে অতিরিক্ত হলে খাবার বিস্বাদ হয়ে যায়।
এমনিভাবে অঙ্কবিদ্যার ক্ষেত্রেও ততটুকু শেখা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনসহ অন্যান্য সম্পদের হিসাবনিকাশ করা যায়। কেবলই মস্তিষ্ককে শানিত করার জন্য এর পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যস্ত থাকা এর চেয়েও আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়।
সাহাবায়ে কেরামের পরে অনেক ধরনের জ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে এবং লোকেরা এর পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করে থাকে। তারা সেগুলোকে প্রকৃত জ্ঞান আখ্যায়িত করে মনে করে, এসব বিষয়ে জানা না থাকাটা হলো মূর্খতার পরিচায়ক। নিঃসন্দেহে এগুলো বিদআত বলে গণ্য হবে। হাদীসে এসব থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এর উদাহরণ হলো, মুতাজিলা গোষ্ঠী কর্তৃক উদ্ভাবিত কদর ও আল্লাহর জন্য উপমাপ্রদান বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক। অথচ হাদীস শরীফে কদর নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। সহীহ ইবনে হিব্বান ও মুস্তাদরাকে হাকেমে বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে মারফু সুত্রে বর্ণিত হয়েছে,
لَا يَزَالُ أَمْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ مُوَائِمًا أَوْ مُقَارِبًا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا فِي الْوِلْدَانِ وَالْقَدَرِ
এই উম্মতের অবস্থা ততদিন পর্যন্ত যথাযথ বা ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে, যতদিন তারা (গর্ভস্থ) সন্তানাদি ও কদর নিয়ে কথা না বলবে।
এই হাদীসটি মাওকুফ সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। অনেকে মাওকুফ হওয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম বাইহাকী সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন,
إِذَا ذُكِرَ أَصْحَابِي فَأَمْسِكُوا، وَإِذَا ذُكِرَ النُّجُومُ فَأَمْسِكُوا
যখন আমার সাহাবীর বদনাম করা হয় তখন নিষেধ করো। এবং যখন নক্ষত্রের আলোচনা করা হয় তখনো নিষেধ করো।
এটি আরও বেশ কয়েকটি সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবে সেগুলো ত্রুটিমুক্ত নয়।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি মায়মুন ইবনে মিহরানকে বলেছেন,
জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা থেকে সাবধান। কেননা, এটি মানুষকে গণকবিদ্যার দিকে ধাবিত করে। কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা থেকেও সাবধান। কেননা, এটি মানুষকে ধর্মদ্রোহিতার দিকে নিয়ে যায়। রাসূল-এর কোনো সাহাবীকে গালি দেওয়া থেকেও সাবধান থাকবে। অন্যথায় আল্লাহ তাআলা তোমাকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
আবু নুয়াইম এটি মারফু হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তা সঠিক নয়।

টিকাঃ
[১] সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ৩৪২
[১] এদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু বকর। তাঁর বিষয়ে রাসূল বলেছেন, إِنَّ أَبَا بَكْرٍ أَعْلَمُ قُرَيْشٍ بِأَنْسَابِهَا "নিশ্চয় আবু বকর কুরাইশদের মধ্যে বংশধারা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪৯০
[১] সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ৬৭২৪; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং: ৯৩
[২] মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৭/২০২, হাদীস নং: ১১৮৫১
[৩] তারীখে জুরজান: ৪২৯

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা নিষেধ হবার কারণ

📄 কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা নিষেধ হবার কারণ


কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা নিষেধ হবার কয়েকটি দিক হতে পারে।
→ কুরআনের এক অংশকে অপর অংশের মাধ্যমে বাতিল করা। ফলে এক আয়াতের মাধ্যমে কদরকে সাব্যস্তকারী দলিলকে বাদ দেওয়া হবে বা তার উল্টোটা করা হবে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়ার উদ্ভব হবে। এই বিষয়ে বর্ণিত আছে যে, রাসূল-এর যামানায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। ফলে তিনি রাগ হয়ে এমন করতে নিষেধ করে দেন। এটা মূলত কুরআন নিয়ে বিবাদ করারই অন্তর্ভুক্ত। এর থেকে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে।
→ শুধু বিবেক-বুদ্ধির ওপর অনুমান করে কদরের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনায় লিপ্ত হওয়া। যেমন, কাদরিয়া গোষ্ঠী বলে থাকে, 'যদি সবকিছু পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে এবং সেভাবেই সব সংঘঠিত হয়ে থাকে তারপর কাউকে শাস্তি প্রদান করা হয় তবে তা অবশ্যই জুলুম বলে বিবেচিত হবে।' এর বিপরীতে কাদরিয়া গোষ্ঠীর বিরোধিতাকারীরা বলে থাকে, 'আল্লাহ তাআলা বান্দাদের কাজ করতে বাধ্য করে থাকেন।'
→ কদর-রহস্যের সমুদ্রে ডুব দেওয়া। আলী সহ আরও অনেক সালাফ থেকে এই বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। কারণ, বান্দার পক্ষে এর নিগুঢ় রহস্য উদ্ঘাটন কখনো সম্ভব নয়। মুতাজিলা গোষ্ঠী ও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের উদ্ভাবিত আরেকটা জিনিস হলো, আল্লাহ তাআলার সত্তা ও গুণাবলি বিষয়ে বুদ্ধির সহায়তা নিয়ে কথা বলা। এটি কদর নিয়ে আলোচনা করার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর ও মারাত্মক। কারণ, কদর নিয়ে আলোচনা আল্লাহ তাআলার কর্ম সম্পর্কে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আর এটা তো পুরো তাঁর সত্তা ও গুণাবলি বিষয়ে আলোচনা।
দুইটি ভ্রান্ত ফিরকা
এই ধরনের লোকেরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:
→ যারা কিতাব-সুন্নাহতে বর্ণিত অধিকাংশ গুণাবলিকে অস্বীকার করে। যাতে করে সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার সাদৃশ্য না হয়। যেমন মুতাজিলা গোষ্ঠী বলে থাকে, 'আল্লাহকে যদি দেখা যায় তবে তো তিনি শারীরিক সত্তা হয়ে গেলেন। কারণ, দেখার জন্য যেকোনো একটা দিক সাব্যস্ত করা লাগবে।' এমনিভাবে তারা আরও বলে, 'যদি আল্লাহর জন্য শ্রবণযোগ্য কথা সাব্যস্ত করা হয় তাহলেও তিনি শারীরিক সত্তা হন।' এ-জাতীয় সাদৃশ্য থেকে বাঁচার জন্য তারা আল্লাহর জন্য 'ইস্তিওয়া' গুণকে সাব্যস্ত করে না। এটা মূলত জাহমিয়া ও মুতাজিলাদের রীতি। যাদের বিদআতী ও গোমরাহ হওয়ার বিষয়ে সালাফগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। হাদীস ও সুন্নাহর দিকে সম্বন্ধিত পরবর্তীদের অনেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করেছেন।
• যারা এসব গুণাবলিকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন এমন বুদ্ধিজাত প্রমাণের মাধ্যমে, যা কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত হয়নি। এক্ষেত্রে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান'৷ ও তার অনুসরণকারী নুহ ইবনে আবী মারয়ামের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। পরবর্তী ও পূর্ববর্তী অনেক মুহাদ্দিস তাদের অনুসরণ করেছেন। অথচ এটা কাররামিয়া গোষ্ঠীর রীতি। তাদের মধ্য থেকে কেউ এই গুণাবলি সাব্যস্ত করার জন্য 'জিসম' বা শরীরকে সাব্যস্ত করেছে। হয়তো প্রত্যক্ষভাবে নয়ত পরোক্ষভাবে।
আবার তাদের মধ্য হতে কেউ আল্লাহ তাআলার জন্য এমন গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন, যে বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহয় কোনো কিছু বর্ণিত হয়নি। যেমন: হরকত বা নড়াচড়া ও এ-জাতীয় আরও কিছু গুণ। এগুলো তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর ক্ষেত্রে সাব্যস্ত গুণাবলির জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিষয়।
বুদ্ধিজাত প্রমাণের মাধ্যমে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের জাহমিয়াদের বিপক্ষে দলিল পেশ করাকে সালাফগণ অপছন্দ করেছেন এবং তার খুব সমালোচনা করেছেন। অনেকে তো তাকে হত্যা করা বৈধ বলে মত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে ইমাম বুখারী এর উস্তাদ মাক্কী ইবনে ইবরাহীম এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

টিকাঃ
[১] লেখক মূলত আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তা হলো, একবার রাসূল দুই ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পেলেন যারা একটি আয়াত নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল। তখন তিনি রাগত চেহারায় আমাদের কাছে এসে বললেন, "কেবল আল্লাহর কিতাব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হবার কারণেই তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৬৬৬
[২] অর্থাৎ বান্দা হলো পুতুলের মতো। তার নিজের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বলতে কিছু নেই। তাকে যেভাবে নাচানো হয় সে সেভাবে নাচে।
[১] মুকাতিল ইবনে সুলিমান ছিলেন তাফসীরের বড় একজন ইমাম। কিন্তু তিনি 'মুশাব্বিহা' ফিরকার অন্যতম নেতা ছিলেন। যারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করত। সে জন্যই অনেকে তার কঠোর সমালোচনা করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা এ এর কাছে তার কথা বর্ণনা করা হলে তিনি তার বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, 'সে বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির মতো সাব্যস্ত করেছে।' (তাহযিবুল কামাল, ২৮/৪৪৩) -অনুবাদক

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 মুতাশাবিহাত সর্ম্পকে সালাফদের অবস্থান

📄 মুতাশাবিহাত সর্ম্পকে সালাফদের অবস্থান


এই বিষয়ে সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো সালাফে সালেহীনের অনুসৃত পদ্ধতি। তা হলো, সিফাত বা আল্লহর গুণাবলি ও এ-সংক্রান্ত হাদীসকে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা বা অবস্থা ও সাদৃশ্য বর্ণনা করা ছাড়াই যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সে অবস্থাথায় রেখে দেওয়া। তাদের কারও থেকে এর বিপরীত কিছু বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এর ক্ষেত্রে কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
এমনিভাবে এগুলোর অর্থ নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা এবং এগুলোর জন্য কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা কোনোটাই তাদের থেকে প্রমাণিত নয়। যদিও তাদের কেউ কেউ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এর যামানার কাছাকাছি। তাদের অনেকে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের অনুসরণে এমনটি করেছেন।
সুতরাং এই বিষয়ে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। বরং অনুসরণ করতে হবে ইসলামের মহান ইমামদের। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, মালেক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরী, আওযায়ী, মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস শাফেয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, আবু উবাইদ প্রমুখ।
এই সমস্ত ইমামদের কারও কথাতেই কালামশাস্ত্রবিদদের আলোচনা পাওয়া যায় না। দার্শনিকদের আলোচনা পাওয়া যাওয়া তো আরও দুরূহ ব্যাপার। আবু যুরআ রাযী বলেছেন, 'যাদের কাছে ইলম রয়েছে এবং তারা নিজের ইলমের হেফাজত করতে পারল না, তা প্রচার করার জন্য ইলমে কালামের মুখাপেক্ষী হলো তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হোয়ো না।'

টিকাঃ
[১] মুতাশাবিহ বলা হয় এমন-সব আয়াত ও হাদীসকে, যার অর্থ সাধারণভাবে বোধগম্য হয় না। -অনুবাদক

📘 সালাফদের ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব > 📄 ফুকাহা ও মুহাদ্দিসদের অনুসৃত নীতির পার্থক্য

📄 ফুকাহা ও মুহাদ্দিসদের অনুসৃত নীতির পার্থক্য


এ-জাতীয় নতুন জ্ঞানের মধ্যে আরও আছে, আহলে রায় ফুকাহায়ে কেরামের উদ্ভাবিত বিভিন্ন বুদ্ধিজাত নিয়ম-নীতি ও কায়দা-কানুন। শাখাগত ফিকহী মাসআলাকে সেগুলোর আলোকে রচনা করা হয়ে থাকে। চাই তা সুন্নাহের সাথে মিলুক বা না মিলুক। যদিও সেসব বানানো কায়দা-কানুন কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সেই ব্যাখ্যাটা অন্যদের ব্যাখ্যার চেয়ে ভিন্ন হয়ে থাকে। এটি হলো সেই বিষয়, যার কারণে অনেক ইমাম হেজাজ ও ইরাকের আহলে রায় ফুকাহায়ে কেরামদের সমালোচনা করেছেন।
অপরদিকে মুহাদ্দিস ফুকাহায়ে কেরাম সহীহ হাদীসের অনুসরণ করে থাকেন। যেগুলোর ওপর সাহাবায়ে কেরাম ও তাদের পরবর্তীরা কিংবা তাদের মধ্য হতে এক জামাত আমল করেছেন। যেসব হাদীসের ওপর আমল করাকে সালাফরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিত্যাগ করেছেন সেগুলোর ওপর আমল করা জায়েয নয়। কেননা, সেগুলোর ওপর আমল করা যাবে না জানা আছে বিধায় তারা তা পরিত্যাগ করেছেন।
উমর ইবনে আবদুল আযীয বলেছেন,
তোমাদের পূর্ববর্তীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মত তোমরা গ্রহণ করো। কারণ, তারা তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী।
মদীনাবাসীর আমলের সাথে যদি হাদীস না মেলে তবে ইমাম মালেক এর মত হলো, এমন ক্ষেত্রে মদীনাবাসীর আমলকেই গ্রহণ করা হবে। তবে অন্যান্য অধিকাংশ আলেমের মত হলো, এমন ক্ষেত্রেও হাদীসকেই গ্রহণ করা হবে।

টিকাঃ
১. এই বিষয়টি আরেকটু সবিস্তারে আলোচনার দাবি রাখে। নয়তো পাঠকমহলের ভুল বোঝার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু কিছু মুহাদ্দিসীনে কেরাম ও ফকীহদের হাদীস গ্রহণ-বর্জনের নীতিমালায় ভিন্নতা রয়েছে। সেই ভিন্নতার সূত্র ধরে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য রচিত হয়েছে। ফলে এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের প্রতি অভিযোগের তির ছোড়া হয়েছে। যা সর্বক্ষেত্রে সর্বাংশে যথার্থ নয়। এই বিষয়টি সবচে সুন্দরভারে তুলে ধরেছেন বিখ্যাত উসূলে হাদীস বিশারদ আল্লামা তাহের আলজাযায়েরী (১৩৩৮ হি.)। প্রথমে তিনি আল্লামা সামআনী থেকে একটা মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। তা হলো শুধু বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বর্ণনা হলেই তা সহীহ বলে স্বীকৃত হয় না। বরং এর জন্য দরকার গভীর বুঝ, ব্যাপক জানাশোনা ও অধিক হারে শ্রবণ ও আলোচনা-পর্যালোচনা।' এরপর তিনি এই বিষয়টিকে সবিস্তারে লম্বা আলোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের প্রয়োজনীয় অংশটি হুবহু তুলে ধরা হলো। "জেনে রাখুন, এই বিষয়টি (অর্থাৎ কেবল সনদ সহীহ হওয়াটাই কোনো হাদীস আমলযোগ্য হবার জন্য যথেষ্ট নয়) মর্যাদাময় হাদীসশাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই ক্ষেত্রে তিন রকমের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মানুষ পাওয়া যায়। এক. এমন মানুষেরা, যাদের মূল মনোযোগ থাকে কেবল সনদের দিকে লক্ষ করা। যখন দেখে সনদটি মুত্তাসিল তথা অবিচ্ছিন্ন এবং তার এই অবিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে কোনোরূপ সন্দেহেরও অবকাশ নেই এবং সনদের বর্ণনাকারীগণও বিশ্বস্ততার বিচারে উত্তীর্ণ তখন তারা হাদীসটিকে সহীহ বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। অন্য বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে না। ফলে দেখা যায় তারা কোনো একটা হাদীসকে সহীহ বলছে অথচ সেই হাদীসটি অন্য আরেকটি অগ্রগণ্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে বর্ণিত হাদীসের বিপরীত। এক্ষেত্রে তারা বলে থাকে, সবগুলোই সহীহ। আবার অনেক সময় বলে, একটা সহীহ অন্যটা অধিক সহীহ। অথচ অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয়সাধন সম্ভবপর হয় না। তো এমন ক্ষেত্রে যখন কেউ সিদ্ধান্ত প্রদান থেকে বিরত থাকে তখন তারা তাকে সুন্নাহবিরোধী বলে আখ্যায়িত করে থাকে। অনেক সময় তাকে বিপদে ফেলতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ এই শাস্ত্রের বিচক্ষণ ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, কেবল সনদ সহীহ হওয়া মতন সহীহ হওয়াকে অত্যাবশ্যক করে না। সে জন্যই তারা বলেছেন, শুধু সনদ সহীহ দেখেই কোনো হাদীসকে সহীহ বলে দেওয়া কারও জন্য বৈধ নয় যতক্ষণ না সে এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ হবেন। কারণ, আশঙ্কা রয়ে যায় যে, হাদীসটির এমন গোপন ত্রুটি থাকতে পারে যা তার কাছে অজানা। এই জাতীয় মুহাদ্দিসদের বাড়াবাড়ি অনেক সময় এই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, (অনেক সময়) তারা অগ্রহণযোগ্য দুর্বল হাদীস গ্রহণ করাকে মানুষের জন্য জরুরি সাব্যস্ত করে। এভাবে তারা মানুষকে বিপদে ফেলে দেয়। এরাই হল মূলত সীমালঙ্ঘনকারী গোষ্ঠী। এদের অধিকাংশই হয়ে থাকে মুহাদ্দিসদের মধ্য হতে। যাদের মধ্যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকে অনুপস্থিত... (তাওযীহুন নজর ইলা উসুলিল আসার, ১/১৯০-৯১, আগ্রহী পাঠক পুরো আলোচনাটা দেখে নিতে পারেন। আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সাথে যতটুকু সম্পৃক্ত আমরা শুধু সেটুকুই উদ্ধৃত করলাম।) তো সনদের বাইরে আরও অন্য জিনিসগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে ফুকাহায়ে কেরামের জামাত বেশি মনোযোগী। তারা কেবল সনদের ওপর নির্ভর করেই কোনো হাদীস আমলযোগ্য হবার ঘোষণা দেন না। ফলে দেখা যায় মুহাদ্দিসদের মধ্য হতে অনেকে তাদের প্রতি সহীহ হাদীসের বিরোধিতা করার অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন। দৃষ্টিভঙ্গিগত এই মতপার্থক্য প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। যা এখানে করা সম্ভব নয়। আগ্রহীগণ বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়ুন: শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রচিত হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১/৪৭৮-৫০৩ পৃ.; ড. মুহাম্মাদ আবদুল লতীফ রচিত তারীখুল ফিকহিল ইসলামী, ১৭-৫৩ পৃ.; ড. মুস্তফা সাইদ রচিত দিরাসাতুন তারীখিইয়াতুন লিল ফিকহি ওয়া উসূলিহী, ৪৯-১০৫ পৃ.
২. এটাই ছিল সালাফে সালেহীনের রীতি। যেসব হাদীসের ওপর সাহাবা-তাবেয়ীরা আমল করতেন না তারা সেগুলো পরিহার করতেন। এই বিষয়ে কাযী ইয়ায তার বিখ্যাত গ্রন্থ তারতীবুল মাদারিক এর মধ্যে অনেকগুলো বর্ণনা এনেছেন। সেখান থেকে কিছু উদ্ধৃত করছি। এক. দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছেন, 'আমি আল্লাহর নামে সে ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছি যে আমলের বিপরীত হাদীস বর্ণনা করে।' দুই. ইমাম মালেক বলেন, অনেক তাবেয়ী আলেম হাদীস বর্ণনা করতেন। সেগুলো অন্যদের থেকেও যখন তাদের কাছে পৌঁছত তখন তারা বলত, 'এগুলো আমাদের অজানা নয়। তবে আমল এর বিপরীত চলে আসছে।' (তারতীবুল মাদারিক, ১/৬৬) উল্লেখ্য, এখানে আমল বলতে খাইরুল কুরুন থেকে প্রজন্মপরম্পরায় চলে আসা আমল বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে আবিষ্কৃত কোনো আমল নয়। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে হলে যে গ্রন্থগুলো পড়তে পারেন তা হলো: ১. তারীখুল মাযাহিবিল ইসলামিইয়া, ইমাম আবু যুহরা ২. রিসালাতুল ইমাম লাইস ইবনে সাদ ইলাল ইমাম মালেক ৩. আসারুল হাদীসিশ শরীফ, শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ ৪. অনুবাদকের রচিত 'আলআমালুল মুতাওয়ারাস ওয়া আসারুহু ফি নকদিল হাদীস' (অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00