📄 কিছু অনুপকারী ইলম
রাসূল থেকে অনুপকারী কিছু ইলমের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মারাসিলে আবু দাউদে যায়দ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, "রাসূল কে বলা হল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুকে কত্তো ইলমের অধিকারী!'
তিনি বললেন, 'কোন বিষয়ে?'
তারা বলল, 'মানুষের বংশধারা বিষয়ে।'
তখন তিনি বললেন, 'এটি অনুপকারী ইলম। যা না জানা থাকলেও তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। "
আবু নুয়াইম তাঁর রিয়াযাতুল মুতাআল্লিমীন গ্রন্থে বাকিয়্যা ইবনে জুরাইজ থেকে, তিনি আতা থেকে, তিনি আবু হুরাইরা থেকে হাদীসটি মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সেখানে আছে, তারা বলল, 'সে আরবদের বংশধারা, কবিতা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ইলম রাখে।'
এই হাদীসের শেষে আরও কিছু অংশ অতিরিক্ত আছে। তা হলো,
الْعِلْمُ ثَلَاثَةٌ مَا خَلَاهُنَّ فَهُوَ فَضْلُ: آيَةً مُحْكَمَةٌ، أَوْ سُنَّةٌ قَائِمَةً، أَوْ فَرِيضَةً عَادِلَةٌ
ইলম তিনটি জিনিস। এ ছাড়া বাকি সবই অতিরিক্ত বিষয়। এক. সুস্প আয়াত, দুই. প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, তিন, মৃত ব্যক্তির মীরাস তার ওয়ারিসদের মধ্যে ইনসাফ ভিত্তিক বণ্টন।
আবূ দাউদ ও ইবনে মাজাহ আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে মারফু সূত্রে অন্য আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তা হল,
العلم ثلاثة ما سوي ذلك فهو فضل: آية محكمة، أو سنة قائمة، أو فريضة عادلة
ইলম তিনটি জিনিস। এ ছাড়া বাকি সবই অতিরিক্ত বিষয়। এক: সুস্পষ্ট আয়াত, দুই: প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, তিন: মৃত ব্যক্তির মীরাস তার ওয়ারিসদের মধ্যে ইনসাফভিত্তিক বণ্টন।
এই হাদীসের সনদে আব্দুর রহমান ইফ্রিকী রয়েছেন। তাঁর দুর্বলতার বিষয়টি প্রসিদ্ধ।
আবু হুরাইরা এর সূত্রে রাসূল থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক হয় এই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জন করার নির্দেশ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন,
تَعَلَّمُوا مِنْ أَنْسَابِكُمْ مَا تَصِلُوْنَ بِهِ أَرْحَامَكُمْ
তোমরা সেই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় ইলম অর্জন করো, যার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক হয়।
হুমাইদ ইবনে যানজুইয়াহ আবু হুরাইরা থেকে মারফু সূত্রে অন্য সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সেটি হলো,
تَعَلَّمُوْا مِنْ أَنْسَابِكُمْ مَا تَصِلُوْنَ بِهِ أَرْحَامَكُمْ ثُمَّ انْتَهُوا، وَتَعَلَّمُوْا مِنَ الْعَرَبِيَّةِ مَا تَعْرِفُوْنَ بِهِ كِتَابَ اللهِ ثُمَّ انْتَهُوا،
তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে পারো এই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় ইলম অর্জন করে ক্ষান্ত হও। আল্লাহর কিতাব বুঝতে সক্ষম হও এই পরিমাণ আরবী ভাষার ইলম অর্জন করে বিরত হও। জলে-স্থলের অন্ধকারে পথ চলতে পারো এই পরিমাণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইলম অর্জন করে নিবৃত হও।
এই হাদীসের সনদে ইবনে লাহীয়া নামক রাবী আছে। (তিনি দুর্বল)
নুআইম ইবনে আবী হিন্দের বর্ণনায় এসেছে, উমর বলেছেন,
জলে-স্থলের অন্ধকারে পথ চলতে পারো এই পরিমাণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইলম অর্জন করে নিবৃত হও। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে পারো এই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় ইলম অর্জন করো। যেসব মহিলাদের তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে ও যাদের তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে তাদের সম্পর্কেও ইলম অর্জন করো। অতঃপর ক্ষান্ত হও।
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ থেকে মিসআর বর্ণনা করেছেন যে, উমর বলেছেন,
তোমরা জ্যোতির্বিদ্যার ততটুকু শেখো যার দ্বারা কেবলা ও রাস্তা চিনতে পারো।
ইবরাহীম নাখয়ী পথ খুঁজে পেতে সহায়ক হয় পরিমাণ জ্যোতির্বিদ্যা শেখার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা আছে বলে মনে করতেন না।
ইমাম আহমাদ ও ইসহাক চন্দ্রের কক্ষপথ সম্পর্কে ইলম অর্জন করা বৈধ হওয়ার মত পোষণ করতেন। ইসহাক আরও বলেছেন,
যেসব নক্ষত্রের মাধ্যমে পথ চিনতে সহজ হয় সেগুলোর নামের বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা যাবে।
তবে কাতাদাহ চন্দ্রের কক্ষপথ বিষয়ক জ্ঞান অর্জনকে অপছন্দ করতেন। আর ইবনে উআইনা এই বিষয়ে কোনো অনুমতিই দিতেন না। তাদের দুজন থেকে হারব এমনটি বর্ণনা করেছেন।
বিখ্যাত তাবেয়ী তাউস বলেছেন,
অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সংখ্যাতত্ত্ববিদ এমন রয়েছে, আল্লাহর দরবারে যাদের কোনো দাম নাই।
হারব এটি বর্ণনা করেছেন। হুমাইদ ইবনে যানজুয়াহ এটি তাউসের সূত্রে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন।
এই নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দাবাদ জ্ঞাপনকে সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরা হবে, যেখানে এগুলোর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। আর যেখানে কেবলই পথ চলার সুবিধার্থে এই ইলম অর্জন করা হয় সেখানে একে নিন্দনীয় ধরা হবে না। কারণ, প্রথমটা বিশ্বাস করা হারাম। এই বিষয়ে মারফু হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। রাসূল ইরশাদ করেছেন,
مَنْ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ النُّجُوْمِ فَقَدِ اقْتَبَسَ شُعبةً مِن السِّحْرِ
যে ব্যাক্তি জ্যোতির্বিদ্যার কোনো অংশের জ্ঞান অর্জন করল সে মূলত জাদুবিদ্যারই একটা অংশ শিখল।
ইবনে আব্বাস এর সূত্রে আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ সাহাবী কুবাইসা এর সূত্রে আরেকটি মারফু হাদীস উল্লেখ করেছেন। তা হলো,
العَافِيَةُ والطَّيَرَةُ والطرق مِنَ الْجِبْتِ والْعَافِيَة زجر الطير والطرق: الخط في الطريق
পাখির সাহায্যে কোনো কিছুর ভালো-মন্দ নির্ণয় করা, কোনো কিছুকে অশুভ লক্ষণ ভাবা এবং মাটিতে রেখা টেনে শুভ-অশুভ নির্ণয় করা কুফুরি।
'আত-তারক' হচ্ছে মাটিতে রেখা টানা। আর 'ইয়াফা' অর্থ হচ্ছে, কঙ্কর নিক্ষেপকরে শুভ-অশুভনির্ণয়করা।
সুতরাং নক্ষত্রের প্রভাব বিষয়ক জ্ঞান অর্জন হারাম ও বাতিল। এবং এই অনুযায়ী আমল করা, যেমন: নক্ষত্রের নৈকট্য অর্জন করার চেষ্টা করা ইত্যাদি হলো কুফুরী। পারতপক্ষে যে জ্ঞান অর্জন করা হয় পথ খুঁজে পাওয়া, কেবলা চেনা ও ঠিকঠাক রাস্তায় চলার জন্য, সেটা প্রয়োজন অনুপাতে শেখা হলে তখন তা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতে বৈধ। এর অতিরিক্ত শেখার তেমন কোনো দরকার নেই। এটি এরচেয়েও আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়।
টিকাঃ
[১] আল-জামি, ইবনু ওয়াহব: ৩১
[২] জামিউ বয়ানিল ইলম, ইবনে আবদুল বার, ২/২৩
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৮৮৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৫৪
[২] সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ১৯৭৯
[৩] শুয়াবুল ঈমান, বাইহাকী, হাদিস নং: ১৭২৩
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৯০৫
[২] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৯০৭
📄 অনুপকারী ইলম অর্জনের ক্ষতি
অনেক সময় এসব নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গবেষণা বিভিন্ন শহরে মুসলিমদের কেবলা সম্পর্কে মন্দ ধারণা সৃষ্টি করে। যেমন: এই জ্ঞান চর্চাকারীদের অনেকের ক্ষেত্রে এমনটা অতীতে ও বর্তমান যুগে ঘটেছে। এটা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা এমন বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে থাকে যে, কিছু শহরে সাহাবী ও তাবেয়ীদের সালাত ভুল হয়েছে। অথচ তা ভ্রান্ত কথা।
ইমাম আহমাদ রাশিচক্রের দশম মকর রাশির দ্বারা প্রমাণ গ্রহণকে অপছন্দ করে বলেছেন, হাদীসে এসেছে,
مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ قِبْلَةُ
| পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে হলো কিবলা।
অর্থাৎ তিনি মকর রাশিসহ অন্যান্য নক্ষত্রকে ধর্তব্যে আনেননি। ইবনে মাসউদ কাব এর এই কথার নিন্দা করেছেন যে, আকাশ ঘুরতে থাকে। ইমাম মালেক সহ অন্যরাও এর নিন্দা করেছেন। ইমাম আহমদ জ্যোতির্বিদদের এই কথার নিন্দা করেছেন যে, শহরসমূহে দ্বিপ্রহরে তারতম্য ঘটে থাকে।
অনেক সময় তারা নিন্দা করতেন এই কারণে যে, রাসূলরা এসব বিষয় নিয়ে কখনো কথা বলেননি। তা ছাড়া অনেক সময় এসব নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করাটা ফাসাদেরও কারণ হয়ে থাকে। কারণ, দেখা গেছে জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী অনেকে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর নিম্ন আকাশে অবতরণ করার হাদীসের বিষয়ে আপত্তি করে বলে থাকেন, 'রাতের এক-তৃতীয়াংশ একেক দেশে একেক সময়ে হয়ে থাকে। সুতরাং নির্দিষ্ট একটি সময়ে এই অবতরণ সম্ভব নয়।' অথচ এই ধরনের আপত্তির অপছন্দনীয়তা আমাদের কাছে আজানা নয়। যদি আল্লাহর রাসূল বা খুলাফায়ে রাশেদীন কাউকে এমন আপত্তি করতে শুনতেন তবে তার সাথে কথা না বাড়িয়ে বরং তাকে শাস্তিপ্রদানে উদ্যোগী হতেন এবং তাকে মুনাফিক হিসাবে আখ্যায়িত করতেন।
এমনিভাবে বংশধারার ইলমও খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয়। উমর ও অন্যান্য আরও অনেকের থেকে এই বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার কথা আমরা ইতিপূর্বে জেনে এসেছি। তবুও দেখা যায় সাহাবী ও তাবেয়ীদের একটা জামাত এই বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন এবং এর প্রতি যত্নশীল ছিলেন।
এমনিভাবে আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত গবেষণা এরচেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়। এর পেছনে পড়ে থাকলে অন্যান্য উপকারী ইলম থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
কাসেম ইবনে মুখাইমারা 'ইলমুন নাহব' বা আরবী ব্যাকরণবিদ্যাকে অপছন্দ করে বলেছেন, 'এটি ব্যস্ততা দিয়ে শুরু হয় এবং অবাধ্যতা দিয়ে শেষ হয়।' এর দ্বারা তিনি মূলত এই বিদ্যায় অধিক পরিমাণে ঝুঁকে পড়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এই কারণেই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আরবী ভাষা ও এর ব্যাকরণ বিষয়ে অতিমাত্রায় জানাকে অপছন্দ করতেন।
আবু উবাইদ এর অতিরিক্ত ব্যাকরণচর্চার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন,
তিনি ব্যাকরণ নিয়ে ব্যস্ত থেকে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বিমুখ হয়ে আছেন।
এই কারণেই বলা হয়ে থাকে, কথার মধ্যে ব্যাকরণের অবস্থান তেমন যেমন খাবারের মধ্যে লবণের অবস্থান। অর্থাৎ ব্যাকরণ সেই পরিমাণ দরকার, যতটুকু হলে কথার শুদ্ধতা রক্ষা করা যায়। যেভাবে ততটুকু লবণ তরকারিতে দেওয়া হয়ে থাকে, যতটুকু হলে খাবারের স্বাদ ঠিক থাকে। এরচেয়ে অতিরিক্ত হলে খাবার বিস্বাদ হয়ে যায়।
এমনিভাবে অঙ্কবিদ্যার ক্ষেত্রেও ততটুকু শেখা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনসহ অন্যান্য সম্পদের হিসাবনিকাশ করা যায়। কেবলই মস্তিষ্ককে শানিত করার জন্য এর পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যস্ত থাকা এর চেয়েও আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়।
সাহাবায়ে কেরামের পরে অনেক ধরনের জ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে এবং লোকেরা এর পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করে থাকে। তারা সেগুলোকে প্রকৃত জ্ঞান আখ্যায়িত করে মনে করে, এসব বিষয়ে জানা না থাকাটা হলো মূর্খতার পরিচায়ক। নিঃসন্দেহে এগুলো বিদআত বলে গণ্য হবে। হাদীসে এসব থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এর উদাহরণ হলো, মুতাজিলা গোষ্ঠী কর্তৃক উদ্ভাবিত কদর ও আল্লাহর জন্য উপমাপ্রদান বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক। অথচ হাদীস শরীফে কদর নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। সহীহ ইবনে হিব্বান ও মুস্তাদরাকে হাকেমে বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে মারফু সুত্রে বর্ণিত হয়েছে,
لَا يَزَالُ أَمْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ مُوَائِمًا أَوْ مُقَارِبًا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا فِي الْوِلْدَانِ وَالْقَدَرِ
এই উম্মতের অবস্থা ততদিন পর্যন্ত যথাযথ বা ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে, যতদিন তারা (গর্ভস্থ) সন্তানাদি ও কদর নিয়ে কথা না বলবে।
এই হাদীসটি মাওকুফ সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। অনেকে মাওকুফ হওয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম বাইহাকী সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন,
إِذَا ذُكِرَ أَصْحَابِي فَأَمْسِكُوا، وَإِذَا ذُكِرَ النُّجُومُ فَأَمْسِكُوا
যখন আমার সাহাবীর বদনাম করা হয় তখন নিষেধ করো। এবং যখন নক্ষত্রের আলোচনা করা হয় তখনো নিষেধ করো।
এটি আরও বেশ কয়েকটি সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবে সেগুলো ত্রুটিমুক্ত নয়।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি মায়মুন ইবনে মিহরানকে বলেছেন,
জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা থেকে সাবধান। কেননা, এটি মানুষকে গণকবিদ্যার দিকে ধাবিত করে। কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা থেকেও সাবধান। কেননা, এটি মানুষকে ধর্মদ্রোহিতার দিকে নিয়ে যায়। রাসূল-এর কোনো সাহাবীকে গালি দেওয়া থেকেও সাবধান থাকবে। অন্যথায় আল্লাহ তাআলা তোমাকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
আবু নুয়াইম এটি মারফু হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তা সঠিক নয়।
টিকাঃ
[১] সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ৩৪২
[১] এদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু বকর। তাঁর বিষয়ে রাসূল বলেছেন, إِنَّ أَبَا بَكْرٍ أَعْلَمُ قُرَيْشٍ بِأَنْسَابِهَا "নিশ্চয় আবু বকর কুরাইশদের মধ্যে বংশধারা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪৯০
[১] সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ৬৭২৪; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং: ৯৩
[২] মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৭/২০২, হাদীস নং: ১১৮৫১
[৩] তারীখে জুরজান: ৪২৯
📄 কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা নিষেধ হবার কারণ
কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা নিষেধ হবার কয়েকটি দিক হতে পারে।
→ কুরআনের এক অংশকে অপর অংশের মাধ্যমে বাতিল করা। ফলে এক আয়াতের মাধ্যমে কদরকে সাব্যস্তকারী দলিলকে বাদ দেওয়া হবে বা তার উল্টোটা করা হবে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়ার উদ্ভব হবে। এই বিষয়ে বর্ণিত আছে যে, রাসূল-এর যামানায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। ফলে তিনি রাগ হয়ে এমন করতে নিষেধ করে দেন। এটা মূলত কুরআন নিয়ে বিবাদ করারই অন্তর্ভুক্ত। এর থেকে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে।
→ শুধু বিবেক-বুদ্ধির ওপর অনুমান করে কদরের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনায় লিপ্ত হওয়া। যেমন, কাদরিয়া গোষ্ঠী বলে থাকে, 'যদি সবকিছু পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে এবং সেভাবেই সব সংঘঠিত হয়ে থাকে তারপর কাউকে শাস্তি প্রদান করা হয় তবে তা অবশ্যই জুলুম বলে বিবেচিত হবে।' এর বিপরীতে কাদরিয়া গোষ্ঠীর বিরোধিতাকারীরা বলে থাকে, 'আল্লাহ তাআলা বান্দাদের কাজ করতে বাধ্য করে থাকেন।'
→ কদর-রহস্যের সমুদ্রে ডুব দেওয়া। আলী সহ আরও অনেক সালাফ থেকে এই বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। কারণ, বান্দার পক্ষে এর নিগুঢ় রহস্য উদ্ঘাটন কখনো সম্ভব নয়। মুতাজিলা গোষ্ঠী ও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের উদ্ভাবিত আরেকটা জিনিস হলো, আল্লাহ তাআলার সত্তা ও গুণাবলি বিষয়ে বুদ্ধির সহায়তা নিয়ে কথা বলা। এটি কদর নিয়ে আলোচনা করার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর ও মারাত্মক। কারণ, কদর নিয়ে আলোচনা আল্লাহ তাআলার কর্ম সম্পর্কে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আর এটা তো পুরো তাঁর সত্তা ও গুণাবলি বিষয়ে আলোচনা।
দুইটি ভ্রান্ত ফিরকা
এই ধরনের লোকেরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:
→ যারা কিতাব-সুন্নাহতে বর্ণিত অধিকাংশ গুণাবলিকে অস্বীকার করে। যাতে করে সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার সাদৃশ্য না হয়। যেমন মুতাজিলা গোষ্ঠী বলে থাকে, 'আল্লাহকে যদি দেখা যায় তবে তো তিনি শারীরিক সত্তা হয়ে গেলেন। কারণ, দেখার জন্য যেকোনো একটা দিক সাব্যস্ত করা লাগবে।' এমনিভাবে তারা আরও বলে, 'যদি আল্লাহর জন্য শ্রবণযোগ্য কথা সাব্যস্ত করা হয় তাহলেও তিনি শারীরিক সত্তা হন।' এ-জাতীয় সাদৃশ্য থেকে বাঁচার জন্য তারা আল্লাহর জন্য 'ইস্তিওয়া' গুণকে সাব্যস্ত করে না। এটা মূলত জাহমিয়া ও মুতাজিলাদের রীতি। যাদের বিদআতী ও গোমরাহ হওয়ার বিষয়ে সালাফগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। হাদীস ও সুন্নাহর দিকে সম্বন্ধিত পরবর্তীদের অনেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করেছেন।
• যারা এসব গুণাবলিকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন এমন বুদ্ধিজাত প্রমাণের মাধ্যমে, যা কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত হয়নি। এক্ষেত্রে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান'৷ ও তার অনুসরণকারী নুহ ইবনে আবী মারয়ামের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। পরবর্তী ও পূর্ববর্তী অনেক মুহাদ্দিস তাদের অনুসরণ করেছেন। অথচ এটা কাররামিয়া গোষ্ঠীর রীতি। তাদের মধ্য থেকে কেউ এই গুণাবলি সাব্যস্ত করার জন্য 'জিসম' বা শরীরকে সাব্যস্ত করেছে। হয়তো প্রত্যক্ষভাবে নয়ত পরোক্ষভাবে।
আবার তাদের মধ্য হতে কেউ আল্লাহ তাআলার জন্য এমন গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন, যে বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহয় কোনো কিছু বর্ণিত হয়নি। যেমন: হরকত বা নড়াচড়া ও এ-জাতীয় আরও কিছু গুণ। এগুলো তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর ক্ষেত্রে সাব্যস্ত গুণাবলির জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিষয়।
বুদ্ধিজাত প্রমাণের মাধ্যমে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের জাহমিয়াদের বিপক্ষে দলিল পেশ করাকে সালাফগণ অপছন্দ করেছেন এবং তার খুব সমালোচনা করেছেন। অনেকে তো তাকে হত্যা করা বৈধ বলে মত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে ইমাম বুখারী এর উস্তাদ মাক্কী ইবনে ইবরাহীম এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
টিকাঃ
[১] লেখক মূলত আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তা হলো, একবার রাসূল দুই ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পেলেন যারা একটি আয়াত নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল। তখন তিনি রাগত চেহারায় আমাদের কাছে এসে বললেন, "কেবল আল্লাহর কিতাব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হবার কারণেই তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৬৬৬
[২] অর্থাৎ বান্দা হলো পুতুলের মতো। তার নিজের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বলতে কিছু নেই। তাকে যেভাবে নাচানো হয় সে সেভাবে নাচে।
[১] মুকাতিল ইবনে সুলিমান ছিলেন তাফসীরের বড় একজন ইমাম। কিন্তু তিনি 'মুশাব্বিহা' ফিরকার অন্যতম নেতা ছিলেন। যারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করত। সে জন্যই অনেকে তার কঠোর সমালোচনা করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা এ এর কাছে তার কথা বর্ণনা করা হলে তিনি তার বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, 'সে বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির মতো সাব্যস্ত করেছে।' (তাহযিবুল কামাল, ২৮/৪৪৩) -অনুবাদক
📄 মুতাশাবিহাত সর্ম্পকে সালাফদের অবস্থান
এই বিষয়ে সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো সালাফে সালেহীনের অনুসৃত পদ্ধতি। তা হলো, সিফাত বা আল্লহর গুণাবলি ও এ-সংক্রান্ত হাদীসকে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা বা অবস্থা ও সাদৃশ্য বর্ণনা করা ছাড়াই যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সে অবস্থাথায় রেখে দেওয়া। তাদের কারও থেকে এর বিপরীত কিছু বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এর ক্ষেত্রে কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
এমনিভাবে এগুলোর অর্থ নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা এবং এগুলোর জন্য কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা কোনোটাই তাদের থেকে প্রমাণিত নয়। যদিও তাদের কেউ কেউ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এর যামানার কাছাকাছি। তাদের অনেকে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের অনুসরণে এমনটি করেছেন।
সুতরাং এই বিষয়ে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। বরং অনুসরণ করতে হবে ইসলামের মহান ইমামদের। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, মালেক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরী, আওযায়ী, মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস শাফেয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, আবু উবাইদ প্রমুখ।
এই সমস্ত ইমামদের কারও কথাতেই কালামশাস্ত্রবিদদের আলোচনা পাওয়া যায় না। দার্শনিকদের আলোচনা পাওয়া যাওয়া তো আরও দুরূহ ব্যাপার। আবু যুরআ রাযী বলেছেন, 'যাদের কাছে ইলম রয়েছে এবং তারা নিজের ইলমের হেফাজত করতে পারল না, তা প্রচার করার জন্য ইলমে কালামের মুখাপেক্ষী হলো তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হোয়ো না।'
টিকাঃ
[১] মুতাশাবিহ বলা হয় এমন-সব আয়াত ও হাদীসকে, যার অর্থ সাধারণভাবে বোধগম্য হয় না। -অনুবাদক