📄 নিন্দনীয় ইলম
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের যেসব আয়াতে নিন্দনীয় ইলমের উল্লেখ করেছেন সেগুলো নিচে প্রদত্ত হলো।
প্রথম আয়াত:
وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ
তারা এমন ইলম অর্জন করে যা তাঁদের ক্ষতি বৈ উপকার করে না। তারা ভালো করে জানে, নিশ্চয়ই যারা জাদু অবলম্বন করে আখেরাতে তাদের কোনো অংশ নেই।
দ্বিতীয় আয়াত:
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
তাদের কাছে যখন তাদের রাসূলগণ স্প প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল, তখন তারা নিজেদের ইলমের দম্ভ প্রকাশ করেছিল। তারা যে বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিল, তাই তাদের গ্রাস করে নিয়েছিল।
তৃতীয় আয়াত:
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক বিষয়ের ইলম তাদের রয়েছে। অথচ আখেরাত সম্পর্কে তারা উদাসীন।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা (০২): ১০২
[২] সূরা মুমিন (৪০): ৮৩
[৩] সূরা রুম (৩০): ৭
📄 হাদীসের আলোকে ইলমের শ্রেণিবিভাগ
হাদীস শরীফেও ইলমকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উপকারী ও অনুপকারী। আল্লাহ তাআলা আমাদের অনুপকারী ইলম থেকে রক্ষা করুন এবং উপকারী ইলম দান করুন।
সহীহ মুসলিমে সাহাবী যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعْ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعْ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعْ، وَ مِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অনুপকারী ইলম, অবিনত অন্তর, অপরিতৃপ্ত আত্মা এবং অগ্রহণযোগ্য দোআ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
সুনানের চারও ইমাম তাদের গ্রন্থে বিভিন্ন সূত্রে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। যার কোনোটাতে আছে, এমন দোআ থেকে, যা শোনা হয় না। কোনো বর্ণনায় আছে, তোমার থেকে এই চারোটি বিষয় থেকে পানাহ চাই।
ইমাম নাসায়ী জাবের থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলতেন,
اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَ أَعُوْذُبِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে উপকারী ইলম প্রার্থনা করছি। এবং অনুপকারী ইলম থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
ইবনে মাজাহ যে শব্দে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন সেখানে আছে, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
اسَلُوْا اللهَ عِلْمًا نَافِعًا وَ تَعَوَذُوْا بِاللَّهِ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ
আল্লাহর কাছে উপকারী ইলমের প্রার্থনা করো। এবং অপকারী ইলম থেকে পানাহ চাও।
ইমাম তিরমিজী আবু হুরাইরা এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, রাসূল বলতেন,
اللَّهُمَّ انْفَعْنِي بِمَا عَلَّمْتَنِي وَعَلِّمْنِي مَا يَنْفَعُنِي، وَزِدْنِي عِلْمًا
হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তোমার প্রদত্ত ইলম দ্বারা উপকৃত করো, আমাকে উপকারকারী ইলম শিক্ষা দাও এবং আমার ইলম বৃদ্ধি করো।
ইমাম নাসায়ী আনাস থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল এভাবে দুআ করতেন,
اللَّهُمَّ انْفَعْنِي بِمَا عَلَّمْتَنِي، وَعَلِّمْنِي مَا يَنْفَعُنِي، وَارْزُقْنِي عِلْمًا تَنْفَعُنِي بِهِ
হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তোমার প্রদত্ত ইলম দ্বারা উপকৃত করো, আমাকে উপকারকারী ইলম শিক্ষা দাও এবং উপকারী ইলম প্রদান করো।
আবু নুয়াইম আনাস থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْئَلُكَ إِيْمَانًا دَائِمًا، فَرُبَّ إِيْمَانٍ غَيْرُ دَائِمٍ، وَأَسْئَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، فَرُبَّ عِلْمٍ غَيْرُ نَافِعٍ
হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে স্থায়ী ঈমান প্রার্থনা করছি। (কারণ,) অনেক ঈমান অস্থায়ী। এবং আপনার কাছে উপকারী ইলম প্রার্থনা করছি। (কারণ,) অনেক ইলম অনুপকারী।
ইমাম আবু দাউদ সাহাবী বুরাইদা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল বলেছেন,
إِنَّ مِنَ البَيَانِ سِحْرًا، وَإِنَّ مِنَ الْعِلْمِ جَهْلًا
| নিশ্চয় কিছু কথা জাদু আর কিছু ইলম অজ্ঞতা
ইবনে সওহান 'কিছু ইলম অজ্ঞতা' এই কথার ব্যাখ্যায় বলেছেন,
এর মানে হলো, কোনো আলেমের একটা বিষয়ে ইলম না থাকা সত্ত্বেও তা জানার ভান করা। ফলে সেই বিষয়টা তার অজানাই থেকে যায়।
এর অন্য আরেকটি ব্যাখ্যা করা হয়। তা হলো, যে ইলম উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি করে তা একধরনের অজ্ঞতাই। কারণ, এমন ইলম থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। তাই এই দিক বিবেচনায় এটি সাধারণ অজ্ঞতার চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট। এর উদাহরণ হলো জাদু। যা দ্বীন-দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে ক্ষতিকর ইলম।
টিকাঃ
[১] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২২
[২] লেখক ইমাম নাসায়ী এর কথা বললেও হাদীসটি ঠিক এই শব্দে তাঁর কিতাবে নেই; বরং হুবহু এই শব্দে এটি বর্ণনা করেছেন ইবনে হিব্বান তার সহীহ গ্রন্থে। হাদীস নং: ৮২।
[১] সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ৩৮৪৩
[২] হাদীস নং: ৩৫৯৯
[৩] সুনানে কুবরা, হাদীস নং: ৭৮১৯
[৪] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৬/১৭৯
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৫০১২
📄 কিছু অনুপকারী ইলম
রাসূল থেকে অনুপকারী কিছু ইলমের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মারাসিলে আবু দাউদে যায়দ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, "রাসূল কে বলা হল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুকে কত্তো ইলমের অধিকারী!'
তিনি বললেন, 'কোন বিষয়ে?'
তারা বলল, 'মানুষের বংশধারা বিষয়ে।'
তখন তিনি বললেন, 'এটি অনুপকারী ইলম। যা না জানা থাকলেও তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। "
আবু নুয়াইম তাঁর রিয়াযাতুল মুতাআল্লিমীন গ্রন্থে বাকিয়্যা ইবনে জুরাইজ থেকে, তিনি আতা থেকে, তিনি আবু হুরাইরা থেকে হাদীসটি মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সেখানে আছে, তারা বলল, 'সে আরবদের বংশধারা, কবিতা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ইলম রাখে।'
এই হাদীসের শেষে আরও কিছু অংশ অতিরিক্ত আছে। তা হলো,
الْعِلْمُ ثَلَاثَةٌ مَا خَلَاهُنَّ فَهُوَ فَضْلُ: آيَةً مُحْكَمَةٌ، أَوْ سُنَّةٌ قَائِمَةً، أَوْ فَرِيضَةً عَادِلَةٌ
ইলম তিনটি জিনিস। এ ছাড়া বাকি সবই অতিরিক্ত বিষয়। এক. সুস্প আয়াত, দুই. প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, তিন, মৃত ব্যক্তির মীরাস তার ওয়ারিসদের মধ্যে ইনসাফ ভিত্তিক বণ্টন।
আবূ দাউদ ও ইবনে মাজাহ আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে মারফু সূত্রে অন্য আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তা হল,
العلم ثلاثة ما سوي ذلك فهو فضل: آية محكمة، أو سنة قائمة، أو فريضة عادلة
ইলম তিনটি জিনিস। এ ছাড়া বাকি সবই অতিরিক্ত বিষয়। এক: সুস্পষ্ট আয়াত, দুই: প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, তিন: মৃত ব্যক্তির মীরাস তার ওয়ারিসদের মধ্যে ইনসাফভিত্তিক বণ্টন।
এই হাদীসের সনদে আব্দুর রহমান ইফ্রিকী রয়েছেন। তাঁর দুর্বলতার বিষয়টি প্রসিদ্ধ।
আবু হুরাইরা এর সূত্রে রাসূল থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক হয় এই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জন করার নির্দেশ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন,
تَعَلَّمُوا مِنْ أَنْسَابِكُمْ مَا تَصِلُوْنَ بِهِ أَرْحَامَكُمْ
তোমরা সেই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় ইলম অর্জন করো, যার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক হয়।
হুমাইদ ইবনে যানজুইয়াহ আবু হুরাইরা থেকে মারফু সূত্রে অন্য সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সেটি হলো,
تَعَلَّمُوْا مِنْ أَنْسَابِكُمْ مَا تَصِلُوْنَ بِهِ أَرْحَامَكُمْ ثُمَّ انْتَهُوا، وَتَعَلَّمُوْا مِنَ الْعَرَبِيَّةِ مَا تَعْرِفُوْنَ بِهِ كِتَابَ اللهِ ثُمَّ انْتَهُوا،
তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে পারো এই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় ইলম অর্জন করে ক্ষান্ত হও। আল্লাহর কিতাব বুঝতে সক্ষম হও এই পরিমাণ আরবী ভাষার ইলম অর্জন করে বিরত হও। জলে-স্থলের অন্ধকারে পথ চলতে পারো এই পরিমাণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইলম অর্জন করে নিবৃত হও।
এই হাদীসের সনদে ইবনে লাহীয়া নামক রাবী আছে। (তিনি দুর্বল)
নুআইম ইবনে আবী হিন্দের বর্ণনায় এসেছে, উমর বলেছেন,
জলে-স্থলের অন্ধকারে পথ চলতে পারো এই পরিমাণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইলম অর্জন করে নিবৃত হও। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে পারো এই পরিমাণ বংশধারা সম্পর্কীয় ইলম অর্জন করো। যেসব মহিলাদের তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে ও যাদের তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে তাদের সম্পর্কেও ইলম অর্জন করো। অতঃপর ক্ষান্ত হও।
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ থেকে মিসআর বর্ণনা করেছেন যে, উমর বলেছেন,
তোমরা জ্যোতির্বিদ্যার ততটুকু শেখো যার দ্বারা কেবলা ও রাস্তা চিনতে পারো।
ইবরাহীম নাখয়ী পথ খুঁজে পেতে সহায়ক হয় পরিমাণ জ্যোতির্বিদ্যা শেখার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা আছে বলে মনে করতেন না।
ইমাম আহমাদ ও ইসহাক চন্দ্রের কক্ষপথ সম্পর্কে ইলম অর্জন করা বৈধ হওয়ার মত পোষণ করতেন। ইসহাক আরও বলেছেন,
যেসব নক্ষত্রের মাধ্যমে পথ চিনতে সহজ হয় সেগুলোর নামের বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা যাবে।
তবে কাতাদাহ চন্দ্রের কক্ষপথ বিষয়ক জ্ঞান অর্জনকে অপছন্দ করতেন। আর ইবনে উআইনা এই বিষয়ে কোনো অনুমতিই দিতেন না। তাদের দুজন থেকে হারব এমনটি বর্ণনা করেছেন।
বিখ্যাত তাবেয়ী তাউস বলেছেন,
অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সংখ্যাতত্ত্ববিদ এমন রয়েছে, আল্লাহর দরবারে যাদের কোনো দাম নাই।
হারব এটি বর্ণনা করেছেন। হুমাইদ ইবনে যানজুয়াহ এটি তাউসের সূত্রে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন।
এই নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দাবাদ জ্ঞাপনকে সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরা হবে, যেখানে এগুলোর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। আর যেখানে কেবলই পথ চলার সুবিধার্থে এই ইলম অর্জন করা হয় সেখানে একে নিন্দনীয় ধরা হবে না। কারণ, প্রথমটা বিশ্বাস করা হারাম। এই বিষয়ে মারফু হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। রাসূল ইরশাদ করেছেন,
مَنْ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ النُّجُوْمِ فَقَدِ اقْتَبَسَ شُعبةً مِن السِّحْرِ
যে ব্যাক্তি জ্যোতির্বিদ্যার কোনো অংশের জ্ঞান অর্জন করল সে মূলত জাদুবিদ্যারই একটা অংশ শিখল।
ইবনে আব্বাস এর সূত্রে আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ সাহাবী কুবাইসা এর সূত্রে আরেকটি মারফু হাদীস উল্লেখ করেছেন। তা হলো,
العَافِيَةُ والطَّيَرَةُ والطرق مِنَ الْجِبْتِ والْعَافِيَة زجر الطير والطرق: الخط في الطريق
পাখির সাহায্যে কোনো কিছুর ভালো-মন্দ নির্ণয় করা, কোনো কিছুকে অশুভ লক্ষণ ভাবা এবং মাটিতে রেখা টেনে শুভ-অশুভ নির্ণয় করা কুফুরি।
'আত-তারক' হচ্ছে মাটিতে রেখা টানা। আর 'ইয়াফা' অর্থ হচ্ছে, কঙ্কর নিক্ষেপকরে শুভ-অশুভনির্ণয়করা।
সুতরাং নক্ষত্রের প্রভাব বিষয়ক জ্ঞান অর্জন হারাম ও বাতিল। এবং এই অনুযায়ী আমল করা, যেমন: নক্ষত্রের নৈকট্য অর্জন করার চেষ্টা করা ইত্যাদি হলো কুফুরী। পারতপক্ষে যে জ্ঞান অর্জন করা হয় পথ খুঁজে পাওয়া, কেবলা চেনা ও ঠিকঠাক রাস্তায় চলার জন্য, সেটা প্রয়োজন অনুপাতে শেখা হলে তখন তা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতে বৈধ। এর অতিরিক্ত শেখার তেমন কোনো দরকার নেই। এটি এরচেয়েও আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়।
টিকাঃ
[১] আল-জামি, ইবনু ওয়াহব: ৩১
[২] জামিউ বয়ানিল ইলম, ইবনে আবদুল বার, ২/২৩
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৮৮৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৫৪
[২] সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ১৯৭৯
[৩] শুয়াবুল ঈমান, বাইহাকী, হাদিস নং: ১৭২৩
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৯০৫
[২] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৯০৭
📄 অনুপকারী ইলম অর্জনের ক্ষতি
অনেক সময় এসব নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গবেষণা বিভিন্ন শহরে মুসলিমদের কেবলা সম্পর্কে মন্দ ধারণা সৃষ্টি করে। যেমন: এই জ্ঞান চর্চাকারীদের অনেকের ক্ষেত্রে এমনটা অতীতে ও বর্তমান যুগে ঘটেছে। এটা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা এমন বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে থাকে যে, কিছু শহরে সাহাবী ও তাবেয়ীদের সালাত ভুল হয়েছে। অথচ তা ভ্রান্ত কথা।
ইমাম আহমাদ রাশিচক্রের দশম মকর রাশির দ্বারা প্রমাণ গ্রহণকে অপছন্দ করে বলেছেন, হাদীসে এসেছে,
مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ قِبْلَةُ
| পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে হলো কিবলা।
অর্থাৎ তিনি মকর রাশিসহ অন্যান্য নক্ষত্রকে ধর্তব্যে আনেননি। ইবনে মাসউদ কাব এর এই কথার নিন্দা করেছেন যে, আকাশ ঘুরতে থাকে। ইমাম মালেক সহ অন্যরাও এর নিন্দা করেছেন। ইমাম আহমদ জ্যোতির্বিদদের এই কথার নিন্দা করেছেন যে, শহরসমূহে দ্বিপ্রহরে তারতম্য ঘটে থাকে।
অনেক সময় তারা নিন্দা করতেন এই কারণে যে, রাসূলরা এসব বিষয় নিয়ে কখনো কথা বলেননি। তা ছাড়া অনেক সময় এসব নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করাটা ফাসাদেরও কারণ হয়ে থাকে। কারণ, দেখা গেছে জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী অনেকে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর নিম্ন আকাশে অবতরণ করার হাদীসের বিষয়ে আপত্তি করে বলে থাকেন, 'রাতের এক-তৃতীয়াংশ একেক দেশে একেক সময়ে হয়ে থাকে। সুতরাং নির্দিষ্ট একটি সময়ে এই অবতরণ সম্ভব নয়।' অথচ এই ধরনের আপত্তির অপছন্দনীয়তা আমাদের কাছে আজানা নয়। যদি আল্লাহর রাসূল বা খুলাফায়ে রাশেদীন কাউকে এমন আপত্তি করতে শুনতেন তবে তার সাথে কথা না বাড়িয়ে বরং তাকে শাস্তিপ্রদানে উদ্যোগী হতেন এবং তাকে মুনাফিক হিসাবে আখ্যায়িত করতেন।
এমনিভাবে বংশধারার ইলমও খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয়। উমর ও অন্যান্য আরও অনেকের থেকে এই বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার কথা আমরা ইতিপূর্বে জেনে এসেছি। তবুও দেখা যায় সাহাবী ও তাবেয়ীদের একটা জামাত এই বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন এবং এর প্রতি যত্নশীল ছিলেন।
এমনিভাবে আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত গবেষণা এরচেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়। এর পেছনে পড়ে থাকলে অন্যান্য উপকারী ইলম থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
কাসেম ইবনে মুখাইমারা 'ইলমুন নাহব' বা আরবী ব্যাকরণবিদ্যাকে অপছন্দ করে বলেছেন, 'এটি ব্যস্ততা দিয়ে শুরু হয় এবং অবাধ্যতা দিয়ে শেষ হয়।' এর দ্বারা তিনি মূলত এই বিদ্যায় অধিক পরিমাণে ঝুঁকে পড়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এই কারণেই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আরবী ভাষা ও এর ব্যাকরণ বিষয়ে অতিমাত্রায় জানাকে অপছন্দ করতেন।
আবু উবাইদ এর অতিরিক্ত ব্যাকরণচর্চার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন,
তিনি ব্যাকরণ নিয়ে ব্যস্ত থেকে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বিমুখ হয়ে আছেন।
এই কারণেই বলা হয়ে থাকে, কথার মধ্যে ব্যাকরণের অবস্থান তেমন যেমন খাবারের মধ্যে লবণের অবস্থান। অর্থাৎ ব্যাকরণ সেই পরিমাণ দরকার, যতটুকু হলে কথার শুদ্ধতা রক্ষা করা যায়। যেভাবে ততটুকু লবণ তরকারিতে দেওয়া হয়ে থাকে, যতটুকু হলে খাবারের স্বাদ ঠিক থাকে। এরচেয়ে অতিরিক্ত হলে খাবার বিস্বাদ হয়ে যায়।
এমনিভাবে অঙ্কবিদ্যার ক্ষেত্রেও ততটুকু শেখা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনসহ অন্যান্য সম্পদের হিসাবনিকাশ করা যায়। কেবলই মস্তিষ্ককে শানিত করার জন্য এর পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যস্ত থাকা এর চেয়েও আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষকে বিমুখ করে দেয়।
সাহাবায়ে কেরামের পরে অনেক ধরনের জ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে এবং লোকেরা এর পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করে থাকে। তারা সেগুলোকে প্রকৃত জ্ঞান আখ্যায়িত করে মনে করে, এসব বিষয়ে জানা না থাকাটা হলো মূর্খতার পরিচায়ক। নিঃসন্দেহে এগুলো বিদআত বলে গণ্য হবে। হাদীসে এসব থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এর উদাহরণ হলো, মুতাজিলা গোষ্ঠী কর্তৃক উদ্ভাবিত কদর ও আল্লাহর জন্য উপমাপ্রদান বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক। অথচ হাদীস শরীফে কদর নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। সহীহ ইবনে হিব্বান ও মুস্তাদরাকে হাকেমে বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে মারফু সুত্রে বর্ণিত হয়েছে,
لَا يَزَالُ أَمْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ مُوَائِمًا أَوْ مُقَارِبًا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا فِي الْوِلْدَانِ وَالْقَدَرِ
এই উম্মতের অবস্থা ততদিন পর্যন্ত যথাযথ বা ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে, যতদিন তারা (গর্ভস্থ) সন্তানাদি ও কদর নিয়ে কথা না বলবে।
এই হাদীসটি মাওকুফ সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। অনেকে মাওকুফ হওয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম বাইহাকী সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন,
إِذَا ذُكِرَ أَصْحَابِي فَأَمْسِكُوا، وَإِذَا ذُكِرَ النُّجُومُ فَأَمْسِكُوا
যখন আমার সাহাবীর বদনাম করা হয় তখন নিষেধ করো। এবং যখন নক্ষত্রের আলোচনা করা হয় তখনো নিষেধ করো।
এটি আরও বেশ কয়েকটি সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবে সেগুলো ত্রুটিমুক্ত নয়।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি মায়মুন ইবনে মিহরানকে বলেছেন,
জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা থেকে সাবধান। কেননা, এটি মানুষকে গণকবিদ্যার দিকে ধাবিত করে। কদর নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করা থেকেও সাবধান। কেননা, এটি মানুষকে ধর্মদ্রোহিতার দিকে নিয়ে যায়। রাসূল-এর কোনো সাহাবীকে গালি দেওয়া থেকেও সাবধান থাকবে। অন্যথায় আল্লাহ তাআলা তোমাকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
আবু নুয়াইম এটি মারফু হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তা সঠিক নয়।
টিকাঃ
[১] সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং: ৩৪২
[১] এদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু বকর। তাঁর বিষয়ে রাসূল বলেছেন, إِنَّ أَبَا بَكْرٍ أَعْلَمُ قُرَيْشٍ بِأَنْسَابِهَا "নিশ্চয় আবু বকর কুরাইশদের মধ্যে বংশধারা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪৯০
[১] সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ৬৭২৪; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং: ৯৩
[২] মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৭/২০২, হাদীস নং: ১১৮৫১
[৩] তারীখে জুরজান: ৪২৯