📄 অনুবাদকের কথা
আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যখন চারদিকে শুধু ফিতনা আর ফিতনা। ডানেও ফিতনা, বামেও ফিতনা। সামনেও ফিতনা পেছনেও ফিতনা। এ যেন ফিতনার মহা সমুদ্র। সবাই সেখানে সাঁতার কাটছি। সমুদ্রের যেমন কোনো কূলকিনারা নেই, ফিতনারও তেমনই কোনো শেষ নেই।
এসব ফিতনার মধ্যে বর্তমান সময়ে যে বিষয়টা মহামারির আকার ধারণ করেছে এবং সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরা তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে আলেম-উলামা ও তালিবুল ইলমদেরও গ্রাস করছে তা হলো, পূর্বযুগের উলামায়ে কেরাম এবং সালাফে সালেহীনদের তুলনায় পরবর্তী যুগের আলেমদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া। তাদের বেশি জ্ঞানী ও অধিক ইলমের অধিকারী মনে করা।
এই ফিতনাটা আজকের যুগের নতুন কিছু নয়। পূর্বযুগেও এর অস্তিত্ব ছিল। যদিও সেটা এখনকার মতো এতটা শক্তিশালী ও প্রবল ছিল না। তারপরেও উলামায়ে কেরাম এই বিষয়ে কলম ধরেছেন। এই ফিতনা ডালপালা বিস্তার করার আগে অঙ্কুরেই তাকে বিনাশ করে দেবার চেষ্টা করেছেন। নিজেদের রচনায় বারংবার এই বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
সালাফে সালেহীন হলো মূলত আমাদের স্তম্ভ। এই স্তম্ভকে কোনোভাবেই দুর্বল হতে দেওয়া যাবে না। এই স্তম্ভকে দুর্বল হতে দেওয়ার মানেই হচ্ছে দ্বীনের দালানকে নড়বড়ে করে দেওয়া। তাছাড়া সালাফদের অনুসরণ হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ ও সতর্ক পথ। কারণ, তারা আমাদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি মুত্তাকী, পরহেজগার ও দ্বীনের গভীর ইলমের অধিকারী ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন, 'তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি কারও অনুসরণ করতে চায় তবে তার জন্য কর্তব্য হলো যারা গত হয়ে গিয়েছেন তাদের অনুসরণ করা। কারণ, জীবিতরা ফিতনা থেকে নিরাপদ নয়।'
ইবনে রজব হাম্বলী রচিত ফাদলু ইলমিস সালাফ আলা ইলমিল খালাফ এই বিষয়ে লিখিত একটি স্বতন্ত্র ছোট্ট পুস্তিকা। যার মধ্যে তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দলিল-প্রমাণের আলোকে সালাফদের শ্রেষ্ঠত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন। বর্তমান সময়ের আলেমদের যারা সালাফদের চেয়েও বেশি জ্ঞানী ভাবছেন এবং দ্বীনী বিষয়ে তাদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে সালাফদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ওপর প্রাধান্য দিতে চাচ্ছেন তাদের সমুচিত জবাব দিয়েছেন।
বক্ষ্যমাণ বইটি হলো তাঁর এই ছোট্ট পুস্তিকার বঙ্গানুবাদ। বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য আমরা তা অনুবাদ করে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। কারণ, আমাদের দেশেও ব্যাপক হারে এই ফিতনার বিস্তার ঘটছে। এই ফিতনাকে রোধ করার ক্ষেত্রে বইটি সামান্য হলেও ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কারণ, মূল বইয়ের পরতে পরতে রয়েছে লেখকের হৃদয়ের উত্তাপ ও রূহানী ঝলক। বইটি পাঠ করার সময় যা আমি নিজেই অনুভব করেছি। এবং বলা যায় এই অনুভবই আমাকে বইটি অনুবাদে উৎসাহ জুগিয়েছে। যদিও মূল বই আর অনূদিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দুই ভাষার ব্যবধান, তবুও অল্প পরিমাণে হলেও মূল বইয়ের আবেদন অনূদিত বইতেও পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বইটি পড়ে যদি একজন পাঠকও উপকৃত হন তাহলেও আমরা আমাদের কষ্টকে সার্থক মনে করব।
বইটির আলোচনাকে সহজবোধ্য ও গোছানো আকারে উপস্থাপনের খাতিরে আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে প্রতিটি নতুন আলোচনা শুরু হবার প্রাক্কালে বিষয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ শিরোনাম যুক্ত করে দিয়েছি। আশা করি এটি পাঠককে আলোচনাগুলো সহজে মনে রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়তা করবে। সেই সাথে বইটির সৌন্দর্যকেও আরও বৃদ্ধি করবে। কোথাও কোথাও প্রয়োজন অনুভূত হওয়ায় আমরা লম্বা-চওড়া টীকা সংযুক্ত করেছি। এটিও পাঠকদের সংশ্লিষ্ট বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। কিংবা কোথাও ভুল বোঝার আশঙ্কা থাকলে তা থেকে রক্ষা করবে।
বইটিকে সর্বাঙ্গসুন্দর করার ক্ষেত্রে আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। তারপরও যদি কোথাও কোনো ভুল কারও চোখে ধরা পড়ে বা বইটি নিয়ে কারও কোনো ভালো পরামর্শ থাকে তবে অবশ্যই আমাদের জানাতে পারেন। আমরা সানন্দচিত্তে তা বিবেচনা করব এবং পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করে নেব। আল্লাহ তাআলা আমাদের ক্ষমা করুন এবং এই খিদমতকে কবুল করুন। আমীন।
📄 দ্বিতীয় মুদ্রণের কথা
'সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব' বইটি প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে। প্রকাশের পর এটি পাঠকমহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল এবং সবার কাছেই সমাদৃত হয়েছিল আলহামদুলিল্লাহ। যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এর দুইটি মুদ্রণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন বইটির আর পুনর্মুদ্রণ হয়নি। আল্লাহর মেহেরবানীতে এখন আবার নতুনসাজে একে প্রকাশ করা হচ্ছে। আল্লাহ বইটিকে কবুল করে নিন এবং এটি পুনর্মুদ্রণ হওয়ার পেছনে যাদের শ্রম আছে তাদের সবাইকে জাযায়ে খাইর দান করুন। আমীন।
📄 সালাফ কারা? কেন তাদের অনুসরণ করবেন?
সালাফে সালেহীন আমাদের চেতনার বাতিঘর। অন্ধকার পথে আলোর মশাল। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণের মাঝে আছে নবিজির রেখে যাওয়া সীরাতে মুস্তাকীমের ওপর অবিচল থাকার নিশ্চয়তা। সালাফদের কথামালা, তাদের জীবনী ও আদর্শের কথা বর্তমান সময়ে বেশ জোরেসোরে আলোচিত হচ্ছে। তাদের বই-পুস্তকও আগের তুলনায় অধিকহারে অনূদিত হচ্ছে বাংলাভাষায়। সালাফদের মর্যাদা আর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই বক্ষ্যমান পুস্তিকাটি। নতুন সংস্করণে তাই মনে হলো তাদের পরিচয় ও তাদের রেখে যাওয়া পথের অনুসরণের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে কিছু কথা তুলে ধরা দরকার। যাতে সালাফ বলতে কাদেরকে বোঝানো হচ্ছে এবং তাদের অনুসরণের কথা কেন বারবার বলা হচ্ছে সেই বিষয়ে পাঠক কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারেন।
সালাফ শব্দের পরিচিতি
সালাফ শব্দটি আরবী। যার শাব্দিক অর্থ হলো পূর্বপুরুষ, পূর্বসুরি। বিখ্যাত অভিধান প্রণেতা আল্লামা ইবনু মানযুর বলেন,
তোমার আগে আগমনকারী, বয়স ও মর্যাদায় তোমার চেয়ে উচ্চাসনে আছেন যেসব আত্মীয়-স্বজন ও পূর্বপুরুষ, তারাই হল সালাফ। (লিসানুল আরব: ৯/১৫৯)
ইসলামী পরিভাষায় সালাফ বলতে সাধারণত বুঝানো হয় প্রথম তিন যুগের ব্যক্তিবর্গকে। অর্থাৎ, সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবেতাবেয়ীদেরকে। তাঁরাই হলেন মূল সালাফ। এই বিষয়ে আমরা কয়েকজনের বক্তব্য দেখে নিতে পারি।
ইমাম বায়জুরী বলেন,
সালাফ দ্বারা উদ্দেশ্য অগ্রজ নবীগণ, সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ ও তাবা-তাবেয়ীগণ। (শারহু জাওহারাতুত তাওহীদ: ১১১)
ইমাম গাযালী বলেন, 'সালাফ'-এর পরিচয় এভাবে দেন,
অর্থাৎ সাহাবী ও তাবেয়ীগণ। (ইলযামুল আওয়াম আন ইলমিল কালাম : ৬২)
আল্লামা সালেহ উসাইমিন বলেন-
সালাফ অর্থ অগ্রজ। যে যার অগ্রজ সে তার সালাফ। তবে সালাফ শব্দ প্রয়োগ করা হলে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, উত্তম তিন যুগ তথা সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবেতাবেয়ীগণ। (ফাতওয়া নূর আলাদ দারব: ১৭৫)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল, পারিভাষিক অর্থে 'সালাফ' বলতে বুঝায় সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবেতাবেয়ীগণকে। এই বিষয়ে রাসূল ﷺ-এর একটি হাদিসকে দলিল হিসেবে পেশ করা হয়। যেখানে তিনি বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
সবচে উত্তম মানুষেরা হলো আমার যুগের মানুষ। অতপর যারা তাদের পরে আগমন করবে। অতপর যারা তাদেরও পরে আসবে। (সহীহ বুখারী : ২৬৫২)
ইমাম নববী এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন,
এই হাদীসে আমার যুগ দ্বারা উদ্দেশ্য সাহাবীদের যুগ, তারপরের যুগ হলো তাবেয়ীদের যুগ, তারপরের যুগ হলো তাবেতাবেয়ীদের যুগ। (শরহু মুসলিম: ১৬/৮৫)
তবে পরবর্তীতে যেসব উলামায়ে কেরাম প্রথম তিন যুগের পুণ্যবান এই জামাআতের দেখানো পথে চলেছেন, তাদের আদর্শকে ধারণ করেছেন, লালন করেছেন, তাদেরকেও সালাফদের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। তারা দ্বিতীয় পর্যায়ের সালাফ। সময়ের বিচারে যিনি প্রথম তিন যুগের যত কাছাকাছি, তার সালাফ হওয়াটা ততবেশি স্বীকৃত ও জোরাল।
এই বিষয়ে আল্লামা সাফারিইনী এর একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন,
সালাফের নীতি-আদর্শ দ্বারা বোঝানো হয়, সাহাবা, পূন্যবান তাবেয়ীগণ, তাবেতাবেয়ীগণ ও ইমাম হিসেবে স্বীকৃত উম্মাহের সেসব ব্যক্তিবর্গের মতাদর্শকে, দ্বীনের মধ্যে যাদের মর্যাদা প্রসিদ্ধ এবং প্রজন্ম পরম্পরায় মানুষেরা যাদের কথাকে গ্রহণ করে নিয়েছ; যাদের মধ্যে বিদআত ছিল না অথবা তারা খারেজী, রাফেযী, কাদরিয়া, মুরজিয়া, জাবরিয়া, জাহমিয়া, মুতাযিলা, কাররামিয়া প্রভৃতি মন্দ উপাধীতেও ভূষিত ছিলেন না। (লাওয়ামিউল আনওয়ার: ১/২০)
সালাফদের অনুসরণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
যুগে যুগে ইসলামের মধ্যে অনেক ভ্রান্ত চিন্তা ভাবনা ও বিচ্যুত মত-পথের আবির্ভাব হয়েছে। হযরত উসমান-এর শাহাদাতের সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত ভাবে চালু রয়েছে। এসব ভ্রান্তি থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সালাফদের দেখানো পথের অনুসরণ করা। তারা যেমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন তার অনুকরণ করা। অন্যথায় সীরাতে মুস্তাকিম থেকে ছিটকে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
পবিত্র কুরআনুল কারীম যথাযথভাবে অনুধাবনের জন্য যেমন রাসূল ﷺ-এর হাদীসকে সামনে রাখতে হয়, তেমনি হাদীসকে বুঝার জন্য সাহাবায়ে কেরামের বুঝ ও অনুধাবনকে সাথে রাখতে হয়। অন্যথায় হাদীস বোঝায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনুধাবন যথার্থ হয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে গুমরাহ হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
বিষয়টিকে সহজে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ
হে নবী, আপনি কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। (সূরা তাওবা : ৭৩)
এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে কাফির ও মুনাফিক এই দুই শ্রেণীর বিরুদ্ধে জিহাদ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর পুরো জীবনী ও সাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আমরা মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই না। রাসূল ﷺ-এর জীবদ্দশায় তিনি সুস্পষ্টভাবে জানতেন কারা কারা মুনাফিক। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে তাকে সবিস্তার অবগতি দান করেছিলেন। তবুও তিনি কখনও তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হননি। যদিও প্রথম শ্রেণি তথা কাফিরদের বিরুদ্ধে অসংখ্যবার জিহাদের ময়দানে মুখোমুখি হয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। রাসূল ﷺ-এর সাহাবীরাও জানতেন, মুসলিম বেশধরা লোকদের মধ্যে কারা মুনাফিকির খাতায় নাম লিখিয়েছে। হাদীস থেকে জানা যায়, নবী আলাইহিস সালাম খোদ এই বিষয়ে তাদের অনেককে বিস্তারিত বলে গিয়েছেন। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর তিরোধানের পর সাহাবী-যুগের পুরো সময়কালে স্বতন্ত্রভাবে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার কোনো দৃষ্টান্ত নেই।
সুতরাং আমাদেরকেও এ আয়াত রাসূল ﷺ ও সাহাবীদের বুঝের অনুগামী হয়ে বুঝতে হবে। তাহলেই আমরা সত্য ও সঠিক পথের অনুসারী বলে বিবেচিত হব। পক্ষান্তরে কেউ যদি এই আয়াতকে নিজের মতো করে বুঝতে যায়, তবে তার পদস্খলন হওয়া অবশ্যম্ভাবী। কারণ সে কাফেরদের মত তার দৃষ্টিতে যারা মুনাফিক, তাদের বিরুদ্ধেও সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে বসবে। এর মাধ্যমে তার বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হওয়াটা চূড়ান্ত হবে। সেজন্য দ্বীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের মতামতকে মূল্য না দিয়ে সাহাবা-তাবেয়ী ও তাবেতাবেঈদের অনুসৃত পথ বেছে নেওয়া হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
এটি শুধু যুক্তির কথা নয়; বরং কুরআন-হাদীস ও বিভিন্ন মনীষীদের কথা থেকেও বিষয়টি প্রমাণিত। এখানে এই ধরনের কিছু উল্লেখযোগ্য দলিল নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্য হতে যারা অগ্রগামী এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন বাগ-বাগিচা, যার তলদেশ দিয়ে প্রস্রবণসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহা সফলতা। (সুরা তাওবা ৯:১০০)
বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন,
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
সবচে উত্তম মানুষেরা হলো আমার যুগের মানুষ। অতপর যারা তাদের পরে আগমন করবে। অতপর যারা তাদেরও পরে আসবে। (সহীহ বুখারী : ২৬৫২)
এই হাদিসে প্রথম তিন যুগের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর দ্বারাই বুঝে আসে, এই যামানার উলামায়ে কিরামের দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের জন্য শিরোধার্য।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন,
إنَّ بني إسرائيل تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةٌ، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً
নিশ্চয়ই বনী ইসরাইল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে। আর আমার উম্মত বিভক্ত হবে তিহাত্তর দলে। তাদের সকলেই জাহান্নামে, একটি দল ছাড়া।
সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, 'তারা কারা ইয়া রাসূলাল্লাহ!'
তিনি জবাব দিলেন,
مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
আমি ও আমার সাহাবীরা যেই পথে আছি (সেই পথে যারা থাকবে তারা জাহান্নামে যবে না। (তিরমিযী: ২৬৪১)
ইরবাস বিন সারিয়া রা. বলেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন,
منْ يَعِشُ مِنْكُمْ يَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّهَا ضَلَالَةٌ فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَعَلَيْهِ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ
তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু বিভেদ-বিসম্বাদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) নতুন নতুন বিষয় আবিস্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গোমরাহী। তোমাদের মধ্যে কেউ সেই যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নতে ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফা রাশেদীনের সুন্নতে অবিচল থাকে। তোমরা এসব সুন্নতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। (তিরমিযী: ২৬৭৬)
উপরোক্ত দুই হাদীস দ্বারা বুঝে আসে, বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার যুগে সাহাবীদের দেখানো পথেই মুক্তি নিহিত। এর বাইরে অন্য কোন পথ বেছে নিলে গোমরাহিতে পতিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
রাসূল ﷺ-এর বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন,
তোমাদের মধ্যে যারা কাউকে অনুসরণ করতে চায় তারা যাতে পরকালে পাড়ি জমানো ব্যক্তিদের অনুসরণ করে। কারণ জীবিত ব্যক্তিরা ফিতনার আশঙ্কা থেকে মুক্ত নয়। এরাই হলো মুহাম্মদ ﷺ-এর সাথীবৃন্দ। তারা এই উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে স্বচ্ছ অন্তরের অধিকারী। সবচে গভীর ইলমের অধিকারী। সবচেয়ে কম লৌকিকতাসম্পন্ন। তারা এমন ব্যক্তিবর্গ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর সাহচর্যের ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন করেছেন। সুতরাং তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করে তাদের দেখানো পথকে আঁকড়ে ধরো। কারণ তারা সঠিক হেদায়াতের পথে প্রতিষ্ঠিত। (জামিউ বায়ানিল ইলম, ইবনু রজব: ২/৮৭)
বিশিষ্ট সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান বলেন,
যদি তোমরা তাদের (সালাফদের) অনুসরণ করো, তবে তোমরা অনেক অগ্রসর হবে। আর যদি ডানেবামে সরে যাও তাহলে অনেক বেশি পথভ্রষ্ট হবে। (জামিউ বায়ানিল ইলম, ইবনু রজব: ২/২৯)
ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
সুন্নাহ ও সালাফদের পথ আঁকড়ে ধরা তোমার কর্তব্য। (দ্বীনী বিষয়ে) সব ধরনের নবআবিষ্কৃত বিষয় থেকে সাবধান থাকবে। কারণ তা বিদআত। (সওনুল মানতিক, সুযুতী: ৩২২)
ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
সালাফদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা তোমার কর্তব্য। যদিও লোকেরা তোমাকে পরিত্যাগ করে। (আল-মাদখাল ইলাস সুনান, বাইহাকী : ২৩৩)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সালাফদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার তাওফীক দান করুন। তাদের রেখে যাওয়া ইলমকে মূল্যায়ন করা এবং সেগুলোকে মান্য করার যোগ্যতা দান করুন, আমীন।
📄 ইলমের শ্রেণিবিভাগ
কখনো আল্লাহ তাআলা তার কিতাবে ইলমকে প্রশংসনীয় ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন। এটি হলো উপকারী ইলম। আবার কখনো নিন্দনীয় ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন। এটি হলো অনুপকারী ইলম। উপকারী ইলমবিষয়ক আয়াতসমূহ পবিত্র কুরানে আল্লাহ তাআলা উপকারী ইলমকে বিভিন্ন আয়াতে কারিমায় তুলে ধরেছেন। নিচে সেগুলো উপস্থাপিত হলো।
প্রথম আয়াত:
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
বলুন, যাদের ইলম আছে আর যাদের ইলম নেই তারা কি সমান।
দ্বিতীয় আয়াত:
شَهِدَ اللهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ
আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ইলমের অধিকারী ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গও সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
তৃতীয় আয়াত:
وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا
বলুন, হে আমার রব, আমার ইলম বাড়িয়ে দাও।
চতুর্থ আয়াত:
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে কেবল ইলমের অধিকারী ব্যক্তিরাই আল্লাহকে ভয় করে।
পঞ্চম আয়াত:
যেখানে আদম আলাইহিস সালামের ঘটনা আল্লাহ তাআলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে সব ধরনের নামসমূহ শিক্ষা দিয়ে সেগুলো যখন ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করা হলো তখন তারা বলেছিল,
سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
আপনি তো মহান! আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন এর বাইরে আমাদের কোনো ইলম নেই। নিশ্চয়ই আপনি মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
পঞ্চম আয়াত:
যেখানে আল্লাহ তাআলা মুসা আ. এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। মুসা আ. খিযির আ.কে উদ্দেশ করে বলেছিলেন,
هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا
আমি কি আপনার অনুসরণ করব এই শর্তে যে, আপনাকে যে সঠিক পথের ইলম দেওয়া হয়েছে তা থেকে আপনি আমাকে শিক্ষা দেবেন?
টিকাঃ
[১] সূরা যুমার (৩৯): ৯
[২] সূরা আল ইমরান (০৩): ১৮
[৩] সূরা ত্বহা (২০): ১১৮
[১] সূরা ফাতির (৩৫): ২৮
[২] সূরা বাকারা (০২): ৩২
[৩] সূরা কাহাফ (১৮): ৬৬