📘 সালাফের দরবারবিমুখতা > 📄 বিবিধ বিষয়ে সালাফের অন্যান্য কিছু ঘটনা

📄 বিবিধ বিষয়ে সালাফের অন্যান্য কিছু ঘটনা


'উমার এক ব্যক্তিকে দু'আ করতে শুনলেন-'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে হিফাযত করুন।' তিনি তাকে বললেন, 'আমাদের ডানে ও বামে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরক্ষাদানকারী ফেরেশতা রয়েছেন। তাই (ওভাবে দু'আ করার দরকার নেই; বরং) এভাবে দু'আ করো-'হে আল্লাহ, আপনি ঈমানের হিফাযতের মাধ্যমে আমাদেরকে হিফাযত করুন।

সুফিয়ান বলেন, "উমার বলেছেন-'আমরা আমাদের সর্বোত্তম জীবন খুঁজে পেয়েছি সবরের মাঝে।'

সুফিয়ান র. বলেন, “উমার অনেক সময় এক দিরহামের কোনো জিনিস পছন্দ করেও সেটা এক বছর পরে কিনতেন!'

জারীর র. বলেন, 'আমি আমার দাদাকে বলতে শুনেছি-'যখন লোকদের কাছে 'উমার ইবনুল খাত্তাব -এর ওফাতের সংবাদ পৌঁছলো, সবাই বলতে লাগলো-কিয়ামত এসে গেছে!'

লোকেরা উসমান -কে বললো-'আপনি 'উমার ইবনুল খাত্তাবের মতো হন না কেন?' তিনি বললেন, 'আমি চাইলেই লোকমান আল হাকীমের মতো হতে পারবো!?'

মাররূযী বলেন, 'আমার এক সঙ্গীকে বলতে শুনেছি-আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম -কে বলেন, 'তুমি জানো, কেন তোমাকে 'খলীল' (প্রিয় বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছি?' তিনি বললেন, 'জানি না, হে প্রভু! আল্লাহ বলেন, 'আমি তোমার হৃদয়ে দেখেছি-তুমি চাও, মুসীবতে আক্রান্ত হয়ে তোমার সবর বৃদ্ধি পাক; অথচ ওসব মুসীবতে আক্রান্ত হতে মন চায় না।'

ইমাম আহমাদ র.-কে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন, যে-ভালোবাসায় দুনিয়ার লালসা না থাকে (তা-ই আল্লাহর জন্য ভালোবাসা।

আবুল 'আব্বাস আহমাদ ইবনু ইয়াযীদ খুযায়ী বলেন, 'যে-ভালোবাসা আল্লাহর জন্য নয়, সেটা স্থায়ী হয় না। কিন্তু যেটা আল্লাহর জন্য, সেটা স্থায়ী হয়। এর উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তির মতো, যে একটা পাথর খুঁড়ে ঘর বানালো-ফলে উপরে বৃষ্টি আর নিচে স্রোত থেকে নিরাপদ হয়ে গেলো; এই ঘর যেমন কখনো ভাঙবে না, আল্লাহর জন্য যে-ভালোবাসা, সেটাও কখনো নষ্ট হয় না। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। তিনি বলেন:

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

সালাফের দরবারবিমুখতা বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। [সুরা আলে 'ইমরান ৩১]

আবূ 'আবদুল্লাহ খোরাসানী উল্লেখ্য পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করতেন:

وكل صديق ليس في وده
فإني في وده غير واثق

যে-বন্ধুর। ভালোবাসা আল্লাহর জন্য নয়, এমন বন্ধুর ভালোবাসায় আমার আস্থা নেই।

বিশর ইবনু মানসূর বলেন, 'আমি উহাইব ইবনুল ওয়ারদের সঙ্গে 'উমার ইবনু মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদিরকে দেখতে গেলাম। তিনি অসুস্থ ছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর উহাইব 'উমারের ওপর হাত রেখে বললেন, "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'-সত্যনিষ্ঠ কেউ যদি পাহাড়ের ওপরও এটা পড়ে, পাহাড় সরে যাবে।'

মাআন ইবনু 'আবদুর রহমান বলেন, 'আমি যুবক অবস্থায় একদিন দু'আ করছিলাম। আমার হাতে পাথর ছিলো। এক ব্যক্তি আমাকে দেখে বললো, "আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি, হাতে পাথর রেখে আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা কোরো না।'

ইবরাহীম তাইমী বলেন, 'আমার পিতার একটি চাদর ছিলো। সামনে দিয়ে সেটা তার বুক পর্যন্ত লম্বা ছিলো আর পেছন দিয়ে নিতম্ব পর্যন্ত। আমি বললাম, 'আব্বাজান, আরেকটু লম্বা একটা চাদর নিতেন যদি!' তিনি বললেন, 'বৎস, এটা কেন বলছো? আমি তো মনে মনে এটা কামনা করি যে, জীবনে যতগুলো লোকমা মুখে দিয়েছি, সেটা যদি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষকে খাওয়ানো হতো, তা-ই ভালো হতো।'

আইউব সাখতিয়ানী র. বলতেন-'যে-ব্যক্তি তার গুরুর ভুল জানতে চায়, সে যেন অন্যের কাছে বসে।'

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র. বলেন, 'ইবনু আউনের বেশ কিছু দোকান ছিলো। কিন্তু তিনি সেগুলো মুসলমানদের কাছে ভাড়া দিতেন না। তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, 'মুসলমানদেরকে পেরেশানিতে ফেলা অপছন্দ করি।'

হাবীব ইবনু সাঈদ বলেন, 'আমার নিজের একটি বিষয় নিজের কাছে ভালো লাগো। সেটা হলো, মানুষ আমাকে কে কী বললো, সেটার প্রতি কখনো ভ্রূক্ষেপ করি না।'

মুহাম্মাদ ইবনুন নজর হারেসী বলেন, 'আমি একটি কিতাবে পড়েছি। আল্লাহ তাআলা বলেন—'হে 'আদাম-সন্তান, মানুষ যদি তোমার ব্যাপারে আমি যা জানি, সেটা জানতো, তবে তোমাকে ছুড়ে ফেলতো। কিন্তু আমি সেগুলো গোপন রাখি, ক্ষমা করে দিই—যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার সঙ্গে কাউকে শরীক না করো।'

সফওয়ান র. বলেন, 'যদি আমার কাছে একটা রুটি আর সামান্য পানি পৌঁছে, তবে দুনিয়ার আর কিছু আমার দরকার নেই।'

মুতাররিফ ইবনু 'আবদুল্লাহ র. বলেন, 'যে-ব্যক্তির 'আমাল স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ, তার মুখও স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ হয়ে যায়। আর যার 'আমাল অসুন্দর, তার মুখও অসুন্দর।'

মুতাররিফ বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমি এমন কথা বলা থেকে আশ্রয় চাই, যা আপনি ব্যতীত অন্য কারও সন্তুষ্টির জন্য বলা হবে।'

মারূযী বলেন, 'একজন জ্ঞানী ব্যক্তি তার ছেলেকে উপদেশ দিলেন—'বৎস, মুখ ঠিক করো। মানুষের যখন বিপদ-আপদ আসে, তখন ভাইয়ের বাহন, কাপড়চোপড় ধার নিতে পারে, কিন্তু মুখ ধার নেওয়ার সুযোগ নেই।'

ইবনুস সাম্মাক র. একদিন মানুষের সামনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তার এক দাসী পাশের রুম থেকে সব শুনছিলো। বক্তব্য শেষ করে তিনি তার কাছে গিয়ে বললেন, 'কেমন শুনলে?' সে বললো, 'অনেক সুন্দর। কিন্তু আপনি (একই কথা) বারবার বলেন।' তিনি বললেন, 'আমি বারবার বলি, যাতে করে যারা (প্রথমে) না বোঝে, তারাও বুঝতে পারে।' দাসী বললো, 'এদের বুঝতে বুঝতে যারা প্রথমেই বুঝেছে, তারা তো বিরক্ত হয়ে যাবে।'

'উবাইদুল্লাহ ইবনুল হাসান বসরার মিম্বরে উঠে বলতেন :

أين القرون التي عن حظها غفلت
حتى سقاها بكأس الموت ساقيها

| কোথায় গেলো সে-সব জাতি, যারা তাদের ভাগ্য সম্পর্কে বেখবর ছিলো। একপর্যায়ে মৃত্যু-সাকী এসে তাদের মুখে মৃত্যুর পেয়ালা তুলে দিয়েছে।

কাব' র. বলেন, 'কোনো বান্দা আল্লাহর কাছে যত সম্মানিত হতে থাকে, তার বালা-মুসীবত তত বাড়তে থাকে। আর কোনো চোর যা চুরি করে, সেটা তার রিযিক থেকে কাটা হয়।'

হিশাম দাসতুওয়ায়ী যখনই কোনো লম্বা হাদীস কিংবা 'হাসান' হাদীস বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন, 'আমার ভয় হয়, এতে কিছু ঢুকে গেছে কি না! এই হাদীস বর্ণনা করেছেন, এমন কত মুহাদ্দিসের জিহ্বা মাটিতে খেয়ে ফেলেছে!'

আহমাদ ইবনু খুযায়ী বলতেন—আরবরা বলে থাকেন—'যে-ব্যক্তি উপদেশ ফিরিয়ে দেয়, সে লাঞ্ছনা খরিদ করে।'

আবূ হাযিম সালামা ইবনু দীনার বলেন, 'দ্বীন ও দুনিয়া দুটোই কঠিন হয়ে গেছে।' লোকেরা বললো, 'কীভাবে?' তিনি বলেন, 'দ্বীনের ক্ষেত্রে কাউকে সহায়ক পাবে না। আর দুনিয়ার যে-দিকেই হাত বাড়াবে, তোমার আগে কোনো দুনিয়াপাগলকে সেখানে দেখতে পাবে।'

মাররূযী বলেন, 'আমার এক বন্ধু বলেছেন—'তিনি সান'আর দরজায় একটি পাথরের গায়ে হিমইয়ারী ভাষায় কিছু লেখা দেখতে পেলেন। একজন বৃদ্ধ সেখান থেকে যাচ্ছিলেন। তিনি লেখাগুলো পড়লেন। তাতে লেখা ছিলো—'তুমি তোমার মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জিততে পারবে না। তোমার সকল আশা পূর্ণ করতে পারবে না। তোমার রিযিকের বাইরে যেতে পারবে না। যেটা তোমার কপালে লেখা নেই, সেটা পাবে না। হে বান্দা, তারপরেও কেন দুনিয়ার পেছনে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছো? প্রত্যেকটি কাজের সময় নির্ধারিত রয়েছে। প্রত্যেক 'আমালে সাওয়াব আছে। আর হিসাবের পরে শান্তি রয়েছে।'

'উমারা ইবনু ইয়াহইয়া বলেন, 'আমি 'আবদুর রহমান ইবনু মাহদীকে বাতিলপন্থীদের কিছু বক্তব্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, 'বান্দার জন্য সবজান্তা-ভাব নেওয়া উচিত নয়। আলিম আমার কাছে চোখের মতো। মানুষ চোখ দিয়ে দুনিয়ার আকাশ দেখে। সবাই জানে— দ্বিতীয় আকাশ আছে, কিন্তু সেটা কেউ দেখে না; বরং চাইলেও দেখার ক্ষমতা রাখে না; কারও জন্য সেটা দেখার ভাব নেওয়াও উচিত না। একইভাবে চক্ষুষ্মান ব্যক্তি দৃষ্টিসীমার ভেতরে যা কিছু আছে, সেগুলো দেখতে পায়; এর বাইরের কিছু দেখতে পায় না। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির কথা, কাজ ও মতামতের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত। সীমার ভেতরে থাকা উচিত। যেটা জানা নেই, সে-ক্ষেত্রে লৌকিকতা পরিহার করা উচিত। হাদীসে এভাবে এসেছে—এটা বলেই ক্ষান্ত হবে।' এরপর তিনি কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:

﴿ وَمَا تَفَرَّقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَةُ ﴾

আহলে কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা) যে বিচ্ছিন্ন ও বিভ্রান্ত হয়েছে, তা তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরেই। [সূরা বাইয়্যিনাহ ৪]

এখানে আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, তারা তাদের 'ইলমের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো না। যতটুকু জানতো, ততটুকুর ভেতরে ছিলো না, বরং সীমালঙ্ঘন করলো। আল্লাহ বলেন:

﴿ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ ﴾

অথচ তাদেরকে এ-ছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে—তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে—এটাই সঠিক ধর্ম। [সূরা বাইয়্যিনাহ ৫]

মুহাম্মাদ ইবনু নজর হারেসী বলেন, 'যে-ব্যক্তি কোনো বিদআতীর সঙ্গে বসলো, সে আল্লাহর সুরক্ষা থেকে বের হয়ে গেলো।'

রওহ ইবনুল হারিস ইবনু হানাশ তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন—তিনি (তার দাদা) তার ছেলেকে বললেন, 'বৎস, যখন তোমাদের কেউ বিপদে আক্রান্ত হয়, তখন রাতে পবিত্র বিছানায় শুয়ে পড়বে। তার সঙ্গে স্ত্রী থাকবে না। এরপর সূরা 'আশ-শামছ' পড়বে সাতবার। সূরা 'আল-লাইল' পড়বে সাতবার। অতঃপর এই দু'আ পড়বে:

اللهم اجعل لي من أمري هذا فرجا

| হে আল্লাহ, আপনি আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।

এগুলো পড়ে ঘুমালে রাতের প্রথম কিংবা তৃতীয় কিংবা চতুর্থ অথবা শেষ প্রহরে এসে সমস্যা সমাধানের পথ বলে দেওয়া হবে।'

আবূ ইয়াযীদ বলেন, 'একদিন আমার শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা ছিলো। কীভাবে চিকিৎসা করবো ভেবে উঠতে পারছিলাম না। তখন আমি রাতে ওভাবে শুয়ে পড়লাম। রাতের প্রথম অংশেই দু'জন লোক এলেন স্বপ্নে। একজন আরেকজনকে বললেন, 'তার শরীরে হাত দাও।' তখন দ্বিতীয়জন আমার শরীরে হাত বুলাতে লাগলেন। মাথায় পৌঁছানোর পরে বললেন, 'এখানে শিঙ্গা লাগাও, কিন্তু চুল কেটো না। 'ঘিরা' দিয়ে করো।'

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "ঘিরা' কী জিনিস?' সবাই বললো, শিঙ্গা লাগানোর সময় ব্যবহৃত হয় এমন আঠালো বস্তু। তখন আমি শিঙ্গা লাগালে ভালো হয়ে গেলাম। সে-দিন থেকে আমি এই হাদীস যাকেই বর্ণনা করি আর সে 'আমাল করে, আল্লাহর দয়ায় আরোগ্য লাভ করে।' ১১৬

• আবুল 'আব্বাস হিলালী বলেন, 'এক ব্যক্তি যাহহাকের কাছে চিঠি লিখলেন:
আমি অনেক দূরে নির্জন একটা জায়গাতে থাকি। আপনি আমাকে রাসূলের সুন্নাহ থেকে এমন কিছু লিখে দিন, যেটাকে আদর্শ মেনে আমি জীবন যাপন করতে পারি।

আবুল 'আব্বাস বলেন, 'তখন আমি চিঠির জবাব লিখলাম :

আমার কাছে আপনার চিঠি এসে পৌঁছেছে। আমি চিঠি পড়ে আপনার বক্তব্য বুঝেছি। আপনার তলব মোতাবেক কিছু কথা লিখছি।
'আমালের ভেতর থেকে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে উত্তম হলো ফরয 'আমালগুলো। আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল বান্দাকে এই ফরয সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। এরপর যে-ব্যক্তি নফল 'আমাল করবে, আল্লাহ তআলা সে সম্পর্কে জানেন এবং তিনি সেটার প্রতিদান দেবেন। আল্লাহর হালালকৃত বিষয়গুলো সুস্পষ্ট-সুতরাং সেগুলো অনুসরণ করুন। তাঁর হারামকৃত বিষয়গুলোও স্পষ্ট-সুতরাং সেগুলো থেকে বেঁচে থাকুন। কিন্তু এ-দুটোর মাঝে রয়েছে সন্দেহপূর্ণ বিষয়াদি, যা হৃদয়ে খুতখুত তৈরি করে; সুতরাং সন্দেহ বাদ দিয়ে নিশ্চিত হয়ে কাজ করুন। কেননা, সন্দেহের ভেতরে ক্ষতি আর দৃঢ়তার ভেতরে কল্যাণ।

আবু 'আলী বলেন, 'আমি একদিন ইবনুল মুবারকের সঙ্গে বসা ছিলাম। এমন সময় সেখানে হামযা আল-বাযযায এলেন। এসে বললেন, 'আবূ 'আবদুর রহমান, বিশাল দুর্ঘটনা ঘটে গেছে!' তিনি বললেন, 'কী?' হামযা বললেন, 'আবূ রাওহের মেয়ে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উদ্দেশ্যে মুরতাদ হয়ে গেছে!' তখন ইবনুল মুবারক র. প্রচণ্ড রাগ করলেন; এমন রাগ করতে তাকে আগে কখনো দেখিনি। অতঃপর বললেন, 'নিঃসন্দেহে এত দিন পর্যন্ত সে যা 'আমাল করেছে, আল্লাহ তাআলা সব বাতিল করে দিয়েছেন। তবে তার গোনাহগুলো রয়ে গেছে।' এরপর বললেন, 'এটা 'কিতাবুল হিয়াল'-এর (কৌশলের বই) ফলাফল। আমার অনেক ইচ্ছা ছিলো কিতাবটি দেখবো, কিন্তু সুযোগ হয়নি।' পরে তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহকে সাক্ষ্য রেখে বলছি, স্ত্রীর স্বামীর কাছ থেকে ইচ্ছামতো আলাদা হওয়ার কৌশল হিসেবে এই কিতাবে যে-ব্যক্তি এই মাসআলাটি লিখেছে, সে কাফের। কেননা, আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে কাফের হওয়ার নির্দেশ দিই আর সে আমার কথা অনুযায়ী কাফের হয়, তবে আমিও কাফের হয়ে যাবো।'

আহনাফ ইবনু কায়িস থেকে বর্ণিত—'উমার বলেন, 'নেতা হওয়ার আগে গভীর জ্ঞান অর্জন করো।' ১১৭

যুহরী বলেন, 'আয়েশা -এর কাছে মারওয়ান ও ইবনু যুবাইর একত্র হলেন। মারওয়ান তখন লাবীদের একটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করলেন :

والمرأ إلا كالشهاب وضوئه
يحور رمادا بعد إذ هو ساطع

মানুষের উদাহরণ তো জ্বলজ্বলে তারকা ও তার আলোর মতো। কিছু দিন জ্বলে থাকে এরপর নিভে যায়।

'আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর বললেন, 'এর চেয়ে উত্তম কিছু বলতে পারতে :

فوض إلى الله الأمور إذا اعترت
وبالله لا بالأقربين فدافع

যখন মুসীবতে আক্রান্ত হও, তখন সব কিছু আল্লাহর কাছে সমর্পণ করো। আত্মীয়-স্বজন নয়, আল্লাহর শক্তিতে মোকাবেলা করো।

মারওয়ান বললেন:

وداو ضمير القلب بالبر والتقى
ولا يستوي قلباس قاس وخاشع

হৃদয়ের রোগ তাকওয়া ও ভালো কাজ দ্বারা চিকিৎসা করো।। রুক্ষ অন্তর আর আল্লাহর ভয়ে বিগলিত অন্তর— এ-দুটো কখনো সমান নয়।

'আবদুল্লাহ বললেন:

ولا يستوي عبدان عبد مكلم
عقت لأرحام الأقارب قاطع

সে দুই বান্দা কখনো সমান হতে পারে না, যাদের একজনের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেন আর দ্বিতীয়জন দাম্ভিক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।

মারওয়ান বললেন:

وعبد تجافى جنبه عن فراشه
يبيت يناجي ربه وهو راكع

আর এমন বান্দা, রাতে যার শরীর বিছানা থেকে পৃথক হয়ে যায়; নামাযে তার প্রভুর সঙ্গে কানাকানিতে ডুবে যায়।

ইবনু যুবাইর বললেন :

وللخير أهل يُعرفون بهديهم
إذا جمعتهم في الخطوب الجوامع

বিপদ-আপদ যখন আসে, তখন ভালো মানুষ কারা, সেটা তাদের সুন্দর কর্ম দ্বারাই চেনা যায়।

মারওয়ান বললেন:

وللشر أهل يعرفون بشكلهم
تشير إليهم بالفجور الأصابع

আর খারাপ মানুষদেরকে তাদের বাহ্যিক আকৃতি দ্বারাই চেনা যায়। খারাপ কাজের ক্ষেত্রে সকল আঙুল তাদের দিকে ইঙ্গিত দেয়।

এটুকু আসার পরে 'আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইরের পালা ছিলো। কিন্তু তিনি চুপ থাকলেন। আয়েশা বললেন, 'কী ব্যাপার, থামলে কেন? আমি কোনো দিন এত সুন্দর আলোচনা দেখিনি। কিন্তু মারওয়ান কবি-বংশের মানুষ, যেটা তুমি নও।' তখন ইবনু 'আবদুল্লাহ মারওয়ানকে বললেন, 'তুমি আমাকে খোঁচা দিয়েছো।' মারওয়ান বললেন, 'বরং তুমি আরও বেশি খোঁচা দিয়েছো। আমি তোমার হাত চেয়েছি, তুমি পা দিয়েছো।'

ইবরাহীম ইবনু আবুল লাইস বলেন, 'আমি ইবনুল মুবারক র.-কে স্বপ্নে দেখলাম। তার জিহ্বায় জড়তা দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি তো শুদ্ধভাষী ছিলেন। এই জড়তা কীসের?' তিনি বললেন, 'আমি যে কবিতা পড়তাম, সেগুলো!'

এক ব্যক্তি ইবনুল মুবারক র.-এর কাছে এসে কবিতা আবৃত্তির বিধান জানতে চাইলো। বললো, 'আমি কবিতা পড়বো?' তিনি বললেন, 'কবিতা পোড়ো না।' লোকটি বললো, 'আপনি নিজে তা হলে পড়েন কীভাবে?' ইবনুল মুবারক র. বললেন, 'তোমাকে আমার ভালো দিকগুলো অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, নাকি খারাপ দিক?'

ইবুনল মুবারক র. বলেন, 'এক ব্যক্তি মানুষকে ইবনু জুরাইজের কিতাব পড়ে শুনাতেন। ইবনু জুরাইজও তখন উপস্থিত থাকতেন! একদিন সেই লোকটি অনুপস্থিত থাকলো। কিতাব পড়ার মতো কাউকে পাওয়া গেলো না। কারণ, ইবনু জুরাইজের ভাষাগত পাণ্ডিত্যের কারণে কেউ তার সামনে পড়তে সাহস করছিলো না। তখন আমি কিতাব নিয়ে পড়তে লাগলাম। ইবনু জুরাইজ আশ্চর্য হয়ে বললেন, 'খোরাসানী এভাবে পড়তে পারে!'

শা'বী র. ১১৮ বলতেন—'(দ্বীনের) এই 'ইলমের উপযুক্ত কেবল সেই ব্যক্তি, যার মাঝে দু'টি গুণ আছে: এক. আকল; দুই. ইবাদত। যদি আকলসম্পন্ন হয়, কিন্তু 'আবিদ না হয়, তবে তার 'আবিদ হওয়ার রাস্তা ধরতে হবে। আর যদি 'আবিদ হয়, কিন্তু আকলসম্পন্ন না হয়, তবে আকলসম্পন্ন হওয়া ছাড়া সে 'ইলম বহন করতে পারবে না।

শা'বী বলেন, 'আমার ভয় হয়, বর্তমান সময়ে এমন একদল মানুষ 'ইলম অর্জন করছে, যাদের মাঝে দুটো গুণের একটিও নেই!'

মাররূযী বলেন, 'আমি ইবরাহীম ইবনু দাঊদ আল-আহওয়ালের উল্লেখিত পঙ্ক্তিগুলো পেয়েছি:

خير ما استفتح العباد به
المنطق حمد الإله ربّ السما
وصلاة على النبي أبي القاسم
ذي النور خاتم الأنبيا
فابدأ بالحمد في الكلام فذكر
الله زين لمنطق البلغا
وله جل وجهه وتعالى
الحمد حقا على جميع البلى

যখনই কোনো কথা বলবে, আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে শুরু করো। কারণ, আকাশের মালিক আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে বক্তব্য শুরু করার চেয়ে আর উত্তম বিষয় নেই। আর দুরুদ ও সালাম আবুল কাসিম, নূরওয়ালা, খাতামুন নাবিয়্যীন (সর্বশেষ নবী)-এর ওপর। সুতরাং আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে কথা শুরু করো। কারণ, আল্লাহর যিকির সাহিত্যিকদের বক্তব্যের সৌন্দর্য। আর আল্লাহ তাআলার প্রশংসা সকল সৃষ্টিজীবের ওপর অবধারিত।

একজন বেদুঈন লোক সাল্লাম ইবনু আবী মুতীকে ১১৯ বক্তব্য দিতে দেখলেন। আরও দেখলেন, তিনি নিজে পড়ছেন, পড়াচ্ছেন, বুঝছেন, বোঝাচ্ছেন। লোকটি তখন বললো, 'কিয়ামতের দিন এই লোকটির হিসাব বড় কঠিন হবে!'

'আমর ও ইবনু মাইমূন আল-'আওদী থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন, 'তিন ব্যক্তি 'ফাওয়াকির'। তিন ব্যক্তির দু'আ কবুল হয় না। তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
'ফাওয়াকির' তিনজন হলো: এক. এমন শাসক, যার প্রতি অনুগ্রহ করলে কৃতজ্ঞতা আদায় করে না; আর খারাপ আচরণ করলে ক্ষমা করে না। দুই. এমন প্রতিবেশী, যে কোনো ভালো দিক দেখলে প্রচার করে না; আর খারাপ দিক দেখলে গোপন রাখে না। তিন. এমন স্ত্রী, যার দিকে তাকালে চোখ শীতল হয় না; আর যার কাছ থেকে দূরে গেলে তার ওপর সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকা যায় না।

যাদের দু'আ কবুল হয় না, সে-তিনজন হলো: এক. এমন ব্যক্তি, যে কারও কাছ থেকে ঋণ নিলো, অথচ কাউকে সাক্ষী রাখলো না। দুই. এমন ব্যক্তি, যে আত্মীয় স্বজনের জন্য বদদু'আ করে। তিন. এমন ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীকে বলে—'হে আল্লাহ, আমাকে তার থেকে বাঁচাও।' তখন আল্লাহ তাকে বলেন, 'আমি তোমার কাছে তার দায়িত্ব দিয়েছি। রাখলে রাখো, ছাড়লে ছাড়ো।'

জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমন তিন ব্যক্তি হলো: এক. পিতার অবাধ্যতাকারী। দুই. মদ পানকারী। তিন. অনুগ্রহ করে খোঁটাদানকারী।

এক ব্যক্তি আবূস সাওয়ার আদাভীকে ১২০ গালিগালাজ করতো। তিনি তাকে বলতেন, 'তুমি যেমন বলছো, আমি যদি তেমনই হই, তবে তো নিশ্চিতভাবে আমি একজন খারাপ লোক।'

মুহাম্মাদ ইবনু রাশেদ থেকে বর্ণিত-তিনি বলেন, 'মাকহুল র. সূর্যাস্তের আগে ঘুমানো অপছন্দ করতেন। ওই সময় কাউকে ঘুমাতে দেখলে জাগিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন।'

ইমাম আহমাদ র. বলেন, 'আসরের পরে ঘুমানো অনুচিত। আকল চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।' ১২১

উরওয়া র. থেকে বর্ণিত-রাসূলের সাহাবীগণ এক মহিলাকে নিয়ে হাসতেন। একদিন মহিলাটি মৃত্যুবরণ করলো। তখন বিলাল বলেন, 'যাক, সে মরে গিয়ে বেঁচে গেছে।' নবীজী সা. এ-কথা শুনে বললেন, 'বেঁচে তো সে যাবে, যাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন।'

আনাস -এর কাছে একবার কিছু লোক ছিলেন-শেষ রাতে, সূর্যোদয়ের আগে। তিনি তখন বললেন, 'জান্নাতের দিনগুলো এমন হবে।' ১২২

শু'আইব ইবনুল হাবহাব বলেন, 'আমি মাঝে মাঝে আবু 'আলিয়ার কাছে সূর্যোদয়ের আগে আসতাম। তিনি বলতেন- 'জান্নাতের দিনগুলো এমন হবে।'

আউন ইবনু শাদ্দাদ বলেন, 'সূর্যের অস্তাচলের ওপারে একটি শুভ্র ভূখণ্ড রয়েছে। সেখানকার শুভ্রতাই আলো। ওখানে এমন একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যারা জানে না, ভূপৃষ্টে কখনো কেউ আল্লাহর অবাধ্য হয়েছে।' ১২৩

'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর বলেন, 'আল্লাহ তাআলা গোটা সৃষ্টিকে দশ ভাগে ভাগ করেছেন। নয় ভাগ ফেরেশতা বানিয়েছেন। এক ভাগ অন্য সব সৃষ্টি। ফেরেশতাদেরকে আবার দশ ভাগে ভাগ করেছেন। নয় ভাগ দিন-রাত আল্লাহর তাসবীহ পাঠে ব্যাপৃত আর বাকি এক ভাগ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে নিয়োজিত। আল্লাহ তাআলা জিন ও মানুষকে দশ ভাগে বিভক্ত করছেন। নয় ভাগ জিন আর এক ভাগ মানুষ। এ-কারণে একজন মানুষ জন্ম নিলে এর বিপরীতে নয়জন জিন জন্ম নেয়। মানুষকে আবার দশভাবে ভাগ করেছেন। নয় ভাগ ইয়াজুজ-মাজুজ আর এক ভাগ সাধারণ মানুষ। আল্লাহ তাআলার বাণী :

وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْحُبُكِ

| পথবিশিষ্ট আকাশের শপথ! [সুরা যারি'আত ৭]

তিনি বলেন, 'এখানে আকাশ বলতে ষষ্ঠ আকাশ উদ্দেশ্য। আর হারাম বলতে আরশের আশেপাশের অঞ্চল উদ্দেশ্য।' ১২৪

ইসহাক ইবনু রাহওয়াই বলেন, 'ইয়াহইয়া ইবনু 'আদামের সঙ্গে 'শর্তে বিক্রি'র একটি মাসআলা নিয়ে আমার আলোচনা হলো। তিনি আমাকে বললেন, 'ফুকাহাদের কে কে এই কথা বলেছেন?' আমি বললাম, 'সুফিয়ান ইবনু 'উয়াইনা, 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, 'আবদুর রহমান ইবনু মাহদী এবং আহমাদ ইবনু হাম্বল।' তিনি বলেন, আহমাদ র.-এর নাম উল্লেখ করেছি, যাতে তিনি তর্কের সাহস না পান!

ওয়াকী' বলেন, 'বসরার লোকজন আমাদেরকে বললো-'আসুন আমাদের আর আপনাদের লোকদের মাঝে তুলনা করি।' তারা বললো, 'আমাদের আছেন আইউব, ইউনুস, ইবনু আউন।' আমরা বললাম, 'আমাদের আছেন সুফিয়ান, মানসূর, মিসআর।' দেখা গেলো, এই ছয়জনের মাঝে সবচেয়ে বড় ও ভারী হলেন সুফিয়ান।

সুফিয়ান সাওরী র. মাক্কাতে ইউনুস, ইবনু আউন, আইউব, তাইমী প্রমুখকে নিয়ে গর্ব করতেন। তাকে বলা হলো-'আপনার শহরের লোকদের নামই নিচ্ছেন কেবল?' তিনি বললেন, 'আমরা সবাই ইরাকের।'

মাররূযী বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদকে আইউব, ইউনুস, ইবনু আউন, তাইমীর কথা আলোচনা করতে দেখলাম। এরপর তিনি বললেন, 'দুনিয়াতে তাদের মতো কেউ আছে?'

'ঈসা বলেছেন, 'কত কাল আর মুসাফিরকে পথ বাতলে দিয়ে নিজে বসে থাকবে? কথা কম বলো, কাজ বেশি করো।' ১২৫

বিশর ইবনু হারিসকে ১২৬ বলা হলো-'অনেক সময় দেহগড়নে অনেক গাড় ট্টাগোট্টা কেতাদুরস্ত লোক দেখা যায়, কিন্তু কাজের বেলায় তারা থাকে শূন্য; এটা কেন হয়?' তিনি বললেন, 'বাইরে কোঁচা লম্বা, ভেতরে অষ্টরম্ভা।'

মা'মার বলেন, 'আবূ তাউসের ছেলের মতো আর কোনো ফকীহের ছেলেকে দেখিনি।' কেউ বললো, 'উরওয়ার ছেলে হিশাম?' তিনি বললেন, 'তার চেয়ে উত্তম ছিলো না; তার সমানও ছিলো না।'

তাউস একজন ভিক্ষুককে দেখলেন-তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো আর তার হাতে ময়লা ছিলো। তাউস তাকে লক্ষ করে বললেন, 'এই দরিদ্রতা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানলাম, কিন্তু হাতে ময়লা থাকার যুক্তি কী?'

ইয়ামান থেকে আবূ বাকর -এর কাছে তিনটি তরবারি এলো। তার মধ্যে একটি ছিলো স্বর্ণ কিংবা মূল্যবান ধাতু দিয়ে মোড়ানো। আবূ বাকর -এর ছেলে 'আবদুল্লাহ পিতার কাছে তরবারিটি চাইলেন। আবূ বাকর তাকে সেটা দেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন, সেই মুহূর্তে 'উমার ইবনুল খাত্তাব বলে উঠলেন, 'তরবারিটি আমাকে দিন।' আবূ বাকর বললেন, 'হ্যাঁ, আপনিই এটার সবচেয়ে বেশি যোগ্য।' 'উমার তরবারি নিয়ে বাড়িতে গেলেন। ওটা থেকে অলংকারগুলো খুলে একটি ছোট্ট থলিতে রাখলেন। এরপর তরবারি ও থলিটা নিয়ে আবূ বাকর -এর কাছে গেলেন। অলংকারের থলিটা আবূ বাকরের হাতে দিয়ে বললেন, 'এগুলো আপনার কাজে লাগাবেন।' আর আবু বাকরের ছেলে 'আবদুল্লাহর হাতে তরবারিটা দিলেন। অতঃপর বললেন, 'আবূ বাকর, আল্লাহর শপথ, আপনার প্রতি হিংসাবশত আমি এ-সব করিনি; আপনাকে ভালোবেসে করেছি। তখন আবূ বাকর কাঁদলেন। বললেন, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন; আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।'

এক ব্যক্তি হাসান র.-এর কাছে এসে বললো, 'আবূ সা'ঈদ, কুকুরের ব্যাপারে এসেছে যে, প্রত্যেক দিন তার মালিকের 'আমালনামা থেকে এক কিরাত কমতে থাকে-এটা কি ঠিক আছে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, এভাবে এসেছে।' লোকটি বললো, 'কী কারণে?' তিনি বললেন, 'মুসলমানদেরকে ভয় দেখানোর কারণে।'

ফুযাইল ইবনু 'ইয়ায বলেন, 'মুমিন কম কথা বলে, কাজ বেশি করে। আর মুনাফিক কথা বেশি বলে, কাজ কম করে।'

আল্লাহর অনুগ্রহে সমাপ্ত

টিকাঃ
১১৫. ভূনিকাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম মাররূযী র. এর মূল আরবী বইয়ে শাসকের সঙ্গে সালাফের সম্পর্ক- এর বাইরেও কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক এমন নয়; বরং সালাফের তাকওয়া ও যুহদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যার দ্বারা তাদের শাসকবিমুখতার চিত্রগুলো আরও সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। পাশাপাশি মূল গ্রন্থের অঙ্গ-সৌষ্ঠব সুরক্ষিত রাখতে আমরা এখানে সেসব ঘটনা সংযোজিত করে দিলাম।
১১৬. সুন্দর ও সুস্থ রুচির কবিতা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। সাহাবীদের কয়েকজন পুরোদস্তুর কবি ছিলেন। তারা নবীজী -এর সামনে কবিতা পড়েছেন এবং নবীজী তাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন, দু'আ করেছেন। নবীজী কিছু কিছু পঙ্ক্তি আবৃত্তি করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ইসলামে কবিতার প্রতি বরং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কবিতার পরিবর্তে কুরআন-সুন্নাহ, 'ইবাদাত ও অন্যান্য উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকতে বলা হয়েছে। সে-হিসেবে সালাফের অনেক বুযুর্গ ব্যক্তিগণ কবিতা পছন্দ করতেন না।
১১৭. মুসনাদু দারিমী ২৫৬; বুখারী মুআল্লাকান ২/২১৮; ওয়াকীর যুহদ ১০২
১১৮. সুন্দর ও সুস্থ রুচির কবিতা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। সাহাবীদের কয়েকজন পুরোদস্তুর কবি ছিলেন। তারা নবীজী -এর সামনে কবিতা পড়েছেন এবং নবীজী তাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন, দু'আ করেছেন। নবীজী কিছু কিছু পঙ্ক্তি আবৃত্তি করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ইসলামে কবিতার প্রতি বরং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কবিতার পরিবর্তে কুরআন-সুন্নাহ, 'ইবাদাত ও অন্যান্য উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকতে বলা হয়েছে। সে-হিসেবে সালাফের অনেক বুযুর্গ ব্যক্তিগণ কবিতা পছন্দ করতেন না।
১১৯. বসরার বড় ইমাম ও খতীব। ফকীহ ও মুহাদ্দিস। ইমাম বুখারী, মুসলিমসহ অন্যান্য ইমামগণ তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
১২০. বসরার বিখ্যাত মুহাদ্দিস। 'আলিম ও 'আবিদ ছিলেন। বুখারীসহ অন্যান্য ইমামগণ তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
১২১. যদিও এ-ব্যাপারে বিশুদ্ধ কোনো হাদীস নেই। তবে সালাফে সালিহীনের অনেক ইমামগণ এটাকে মাকরূহ বলেছেন। কারণ, অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসা-বিজ্ঞানের আলোকে এতে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় যে, আসরের পরে ঘুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, তা হলে এটাকে মাকরূহ বলা যাবে না।
১২২. অর্থাৎ জান্নাতে রাত-দিন বলতে কিছু থাকবে না, সূর্য ও চাঁদ থাকবে না। পৃথিবীতে সূর্যোদয়ের আগে যে-শান্ত-স্নিগ্ধ আলোক-আভা বিরাজমান থাকে, জান্নাতের সকল মুহূর্ত তেমনই হবে।
১২৩. এ-বক্তব্যের কোনো প্রমাণ নেই। কুরআন-হাদীস থেকে এর কোনো সমর্থনও পাওয়া যায় না। কারণ, মানুষের দ্বারা আল্লাহর অবাধ্যতা সংঘটিত হয়, এটিই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম। এটি সম্ভবত ইসরায়িলী বর্ণনা।
১২৪. তাফসীর ও হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণনাটি পাওয়া গেলেও এটি রাসূল -এর হাদীস নয়। তবে বক্তব্যের ধারা-বিবরণীতে বোঝা যায়, এটা ইসরায়িলী বর্ণনা; সত্যও হতে পারে, মিথ্যাও হতে পারে।
১২৫. ইবনুল জাওযীর সিফাতুস সাফওয়াহ ৩/১৭৫।
১২৬. তৃতীয় শতাব্দীর তাসাওউফের ইমাম বিশর আল হাফী (১৭৯-২২৭ হি.)। ফুযাইল ইবনু 'ইয়াযের শাগরিদ। অত্যন্ত দুনিয়াবিরাগ বুযুর্গ ছিলেন। খালি পায়ে হাঁটতেন। তাই একপর্যায়ে তার উপাধি হয়ে যায় হাফি। আবু 'আবদুর রহমান সুলামীসহ উম্মাহর বড় বড় ইমাম ও বুযুর্গগণ তার প্রশংসা করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00