📄 আহমাদ ইবনু হাম্বল র. এর দরবারবিমুখতা
ইমাম আবূ বাকর মাররূযী র. বলেন: আমরা (সামাররা) শিবিরে ছিলাম। তখন ইসহাক ইবনু হাম্বল ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র.-কে খলীফার দরবারে গমনের জন্য অনুরোধ করছিলেন। তিনি বলছিলেন, 'আপনি গিয়ে খলীফাকে আদেশ-উপদেশ দিলে তিনি আপনার কথা শুনবেন, আশা করি। কারণ, ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ ৩৭ ও তো খোরাসানের শাসক ইবনু তাহিরের দরবারে যান। তাকে আদেশ-উপদেশ দেন।' ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র. জবাবে বলেন, 'ইসহাককে দিয়ে আমার সামনে যুক্তি দিচ্ছো? কিন্তু আমি তো তার কাজে সন্তুষ্ট নই। আমাকে দেখার মাঝে তার কোনো কল্যাণ নেই। তাকে দেখার মাঝেও আমার কোনো কল্যাণ নেই।'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র. বলতেন, 'খলীফার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেলে তাকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা আবশ্যক (কিন্তু সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য শাসকের দরবারে যাওয়া আবশ্যক নয়)।'
'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র.-এর ভাগিনা ইসমাঈল ইমাম আহমাদ র.-কে খলীফার দরবারে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন যুক্তি পেশ করলেন। তিনি প্রতিউত্তরে বললেন, 'তোমার মামা ('আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক) বলতেন, খলীফাদের ধারে-কাছেও যেয়ো না। যদি একান্তই যেতে হয়, তবে তাদের সঙ্গে সত্য কথা বলো। আমার আশঙ্কা, যদি আমি তাদের কাছে যাই, তবে সত্য বলতে পারবো না!' ৩৮
আহমাদ ইবনু হাম্বল র. বলেন, 'শাসকের কাছে যাওয়া ফিতনা। তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করা ফিতনা। আমরা দূরে থেকেও নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবতে পারছি না। কাছে গেলে কী হবে!'
ইবরাহীম ইবনু শাম্মাস বলেন, 'আমরা 'আবদুর রহমান ইবনু মাহদীর কাছে ছিলাম। এমন সময় আহমাদ র. আগমন করলেন। ইবনু মাহদী তার দিকে ইশারা করে বললেন-যে-ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরীর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান (তার মতো কাউকে) দেখতে চায়, তবে সে যেন ইনার দিকে তাকায়।'৩৯
মাররূযী বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদ র.-কে বলতে শুনেছি- 'যদি কুফার কোনো ব্যক্তিকে হাদীসে বিশেষজ্ঞ ও দরিদ্র জীবন-যাপন করতে দ্যাখো, তবে ভেবে নিয়ো, সে শ্রেষ্ঠ মানুষ।' এরপর তিনি বললেন, 'তারা আসহাবে কুরআন।'
মাররূযী বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলকে বললাম, 'এক (ক্ষমতাশালী) লোক জবরদখল করা একটি বাড়ি আমার বাবাকে দিয়েছে। ওটা কি আমি ওয়াকফ করে দেবো?' তিনি বললেন, 'না। যার বাড়ি তাকে ফেরত দাও।' ৪০
মাররূযী বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদ র.-কে বললাম, 'কারও যদি জায়গাজমি থাকে, সরকারি কর-উসুলকারী ব্যক্তি এলে তাকে আপ্যায়ন করা যাবে কি?' তিনি বললেন, 'যদি যুলুমের ভয় থাকে, তবে যাবে।' আমি জানতে চাইলাম, 'এটা কি ঘুষের ভেতরে পড়বে না?' তিনি বললেন, 'যদি যুলুম প্রতিহত করতে করা হয়, তবে সমস্যা নেই।'
ইমাম আহমাদ র.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো— 'কাযী সাওয়ারের মতো ব্যক্তিকে 'আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করুন'—এই কথা বলা যাবে কি?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাকে সংশোধন করলে তোমার আমার ক্ষতি কী?'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র. বলতেন—'যদি আমি খলীফার দরবারে যেতাম, তবে মুহাজির ও আনসারদের পরিবার-পরিজনের আগে অন্য কোনো প্রসঙ্গ তুলতাম না।'
যুহাইর ইবনু মুহাম্মাদ বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদকে (নির্যাতন পরবর্তী সময়ে) নৌকা থেকে বের হওয়ার পরে সর্বপ্রথম স্বাগত জানিয়েছি। তাঁর গায়ে তখন (খলীফাপ্রদত্ত) পোশাকটা ছিলো। সেটা পড়ে গেলো। তিনি সেটা টানতে লাগলেন। ওটা ছাড়া আর কিছুই তাঁর গায়ে ছিলো না।'
একবার (খলীফা মুতাওয়াককিলের) গভর্নর ইয়াহইয়া ইবনু খাকান ইমাম আহমাদ র.-এর কাছে এলেন। তার সঙ্গে সামান্য কিছু জিনিস ছিলো। ইমাম আহমাদের সেগুলোকে খুব কম মনে হলো। তখন আমি তাকে বললাম, 'মানুষ বলে, এগুলোর দাম এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা।' তিনি বললেন, 'তাই?' এরপর তিনি সেগুলো ইয়াহইয়ার হাতে তুলে দিলেন। ইয়াহইয়া দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'যদি আপনার কাছে আপনার সঙ্গী-সাথিদের জন্য কিছু আসে, আপনি সেটা গ্রহণ করবেন?' তিনি বললেন, 'না।' ইয়াহইয়া বললেন, 'ঠিক আছে, আমি এ-সব কথা খলীফাকে জানাবো।'
ইমাম মাররূযী র. বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলকে বললাম, 'আপনি ওগুলো গ্রহণ করে বণ্টন করে দিলে কী হতো?' তখন তার চেহারা মলিন হয়ে গেলো। তিনি বললেন, 'আমি কেন সেগুলো বণ্টন করবো? আমি কি বাদশার-উযির!'
খলীফার দূত ইয়াকুব ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র.-এর কাছে এসে বললেন, 'আমার পুত্র আপনার কাছে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে আসবে, আপনি তাকে এক-দুটো হাদীস বর্ণনা করবেন।' তিনি বললেন, 'না, সে আসবে না।' ইয়াকুব বেরিয়ে যাওয়ার পরে ইমাম বললেন, 'তার নাক তো আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তাকে কীসের হাদীস বর্ণনা করবো! আমি হাদীস বর্ণনা করে আমার গলায় রশি পরাবো?'
টিকাঃ
৩৭. খোরাসানের হাফিযে হাদীস ইমাম ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ (১৬১-২৩৮ হি.)। ফুযাইল ইবনু 'ইয়ায, সুফিয়ান ইবনু 'উয়াইনা, 'আবদুর রহমান ইবনু মাহদী প্রমুখের মতো মনীষীর কাছ থেকে 'ইলম অর্জন করেন। বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসা'ঈ প্রমুখ ইমামের উসতায! দুনিয়াবিরাগতা, খোদাভীতি ও পরহেযগারিতার ক্ষেত্রে তার জুড়ি ছিলো না।
৩৮. এটি তিনি বিনয়ের কারণে এবং শাসকের দরবারে না-যাওয়ার জন্য বলেছেন; নতুবা শাসকের সামনে সত্য উচ্চারণে, হকের ঝাণ্ডা বুলন্দ রাখার জন্য শাসকের অমানবিক দমন-পীড়ন সহ্য করার ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদ র. হলেন মুসলিম-উম্মাহর চির আদর্শপুরুষ।
৩৯. মুসলিম-উম্মাহর বিখ্যাত ইমাম ও মুহাদ্দিস। একটি অতি সাধারণ ঘর থেকে ও সাধারণ একজন মানুষের ঔরসে জন্ম নিয়ে তিনি পরবর্তীতে আহলুস সুন্নাহর ইমাম হয়ে গেছেন। তার প্রসিদ্ধ শাইখদের মাঝে একজন হলেন ইমাম সফিয়ান সাওরী। 'ইবাদাত ও যুহদের ক্ষেত্রে তিনি অনন্য ছিলেন। ১৯৮ হিজরীতে ওফাত পান।
৪০. কারণ, সম্পদটি ছিলো হারাম পন্থায় অর্জিত। উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করলেও সেটা হারামই থাকবে।
📄 তাউস ইবনু কাইসান র. এর দরবারবিমুখতা
ইমাম তাউস ৪১ র.-এর ছেলে বর্ণনা করেন-'একবার আমি আমার পিতাকে বললাম, 'আপনারা সবাই একত্র হয়ে বাদশার দরবারে গিয়ে তাকে নসীহত করলে সমস্যা কী?' কয়েকদিন পরে আমরা এক জায়গাতে ছিলাম। হঠাৎ সেখানে গভর্নর সাহেব এসে উপস্থিত হলেন। তিনি আমাদের কক্ষে এলেন এবং সালাম দিলেন, কিন্তু আব্বাজান তার সঙ্গে কোনো কথা বললেন না। মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকালেনও না। গভর্নর বের হয়ে গেলে আমি তার পেছনে পেছনে বের হলাম; বলতে লাগলাম- 'আব্বাজান আপনাকে চিনতে পারেননি।' তিনি জবাবে বললেন, 'তোমার আব্বাজান আমাকে চিনেছেন বলেই এমন আচরণ করেছেন।' এরপর আমি যখন আব্বাজানের কাছে ফিরে এলাম তিনি বললেন, 'বেটা, সে-দিন তুমি আমাকে কী বলেছিলে আর. আজকে নিজে কী করলে! নিজের জিহ্বাটাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে না! সামনে পেয়ে তোষামোদি করলে!'
শাসকের প্রতি তাউস র. অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। কিন্তু একসময় তারা তাঁকে একটি দায়িত্ব দেয়। তিনি এটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করলেন। ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করতে লাগলেন। শাসক-সম্প্রদায় এটা জানতে পেরে তাকে সম্পদের হিসাব দিতে বললো। তিনি তাদেরকে একটি চিঠি ধরিয়ে দিলেন। তাতে লেখা ছিলো-'বণ্টন করে দিয়েছি।'
তাউস র. মাক্কা থেকে এলেন। তখন সেখানে নতুন একজন আমীর এলো। তাঊসের সঙ্গীগণ আমীরের ব্যাপারে তার কাছে অনেক প্রশংসা করে বললেন, 'যদি তাকে একটু দেখতে যেতেন!' তিনি বললেন, 'তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।' তারা বললেন, 'আপনার ব্যাপারে তার পক্ষ থেকে ক্ষতির আশঙ্কা করছি।' তিনি বললেন, 'তা হলে এতক্ষণ তার ব্যাপারে তোমরা যা বলেছো, সে তো তেমন নয়!'
তাউস র. একটি 'ইলমী মজলিসে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় সেখানে খলীফা সুলাইমান ইবনু 'আবদিল মালিক এলেন; কিন্তু তিনি ভ্রুক্ষেপই করলেন না। দারস শেষ করে উঠে দাঁড়ালে তাকে বলা হলো-'আমীরুল মুমিনীন এসেছেন।' তিনি বললেন, 'আমি ইচ্ছা করেই এমন করেছি; যাতে সে বুঝতে পারে, আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে এমন লোক রয়েছে, যে তার দুনিয়ার দিকে ফিরেও তাকায় না।'
রজা ইবনু হাইওয়া একদিন মসজিদে ইমাম তাউস ইবনু কাইসান র.-কে দেখতে পেলেন। তাকে দেখে তিনি সোজা সুলাইমান ইবনু 'আবদিল মালিকের কাছে গেলেন। সুলাইমান তখন ভাবী-সম্রাট। রজা তাকে বললেন, 'তাউসকে মসজিদে দেখেছি। আপনি তাকে ডেকে পাঠাবেন?' সুলাইমান তাউসকে ডেকে পাঠালেন। তাউস এলে রজা সুলাইমানকে বললেন, 'তিনি কথা বলার আগ পর্যন্ত আপনি কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না।'
তাউস অনেক সময় বসে থাকলেন। এরপর নিজেই আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কী সৃষ্টি করেছেন?' আমরা বললাম, 'জানি না।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন।' অতঃপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা জানো, সবশেষে কার মৃত্যু হবে?' আমরা বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'সবশেষে মৃত্যুর মৃত্যু হবে।' অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমরা জানো, আল্লাহর কাছে গোটা সৃষ্টির মাঝে সবচেয়ে ঘৃণিত কে?' আমরা বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কাছে তাঁর সৃষ্টির মাঝে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো ঐ বান্দা, যাকে তিনি রাজত্ব দিয়েছেন; কিন্তু সে তা আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যবহার করে।' এরপর তিনি উঠে চলে গেলেন। রজা বলেন, 'তখন আমি লক্ষ করলাম, সুলাইমান তার হাত দিয়ে অনবরত মাথা চুলকাচ্ছিলেন। আমার ভয় হলো, নখের আঘাতে তার মাথা থেকে রক্ত বের হয় কি না।'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল তাউস র.-এর ব্যাপারে আলোচনা-প্রসঙ্গে বললেন, 'তিনি তাদের (শাসকদের) বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। একবার তাউসের ছেলে তার নাম জাল করে 'উমার ইবনু আবদুল আযীয র.-এর কাছে একটি চিঠি পাঠালো। 'উমার র. তাকে তিনশো স্বর্ণমুদ্রা দিলেন। যখন তাউসের কাছে এই সংবাদ পৌঁছলো, তখন তিনি নিজের জমি বিক্রি করে 'উমার ইবনু আবদুল আযীযের কাছে অর্থ ফেরত পাঠালেন। পরে সেই ছেলের মুমুর্ষ অবস্থায় যখন তাকে ছেলেকে দেখতে যেতে বলা হলো, তিনি অস্বীকার করলেন।'
তাউস র. এক মেঘময় কনকনে শীতের সকালের নামায পড়ছিলেন। তার পাশ দিয়ে মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ (অথবা) আইউব ইবনু ইয়াহইয়া দলবল নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাউস তখন সিজদায় ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফের নির্দেশে তাউসের মাথার ওপর একটি শাল ছুড়ে মারা হলো। কিন্তু তিনি স্বাভাবিকভাবেই দু'আ শেষ করে সিজদা থেকে মাথা তুললেন। সালাম ফেরানোর পরে তাকিয়ে কাঁধের ওপর শাল দেখে ঝেড়ে ফেলে দিলেন। এরপর বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। দ্বিতীয়বার সেটার দিকে তাকিয়ে দেখলেন না।
নু'মান (ইবনু আবী শাইবা) বর্ণনা করেন, 'তাউস র. মাঝেমাঝে লোকালয়ের বাইরে চলে যেতেন। সেখানে গিয়ে একাকী নামায পড়তেন। এমন এক মেঘময় দিনে তিনি বের হন। নামাযে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ সিজদায় পড়ে থাকেন। এমন সময় মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ (হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের ভাই) সেখান থেকে তার দলবল নিয়ে যাচ্ছিলো। মুহাম্মাদ দেখলো, তিনি ঠাণ্ডায় কাঁপছেন। তখন সে তার ওপর একটি শাল ছুড়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন না। পরে যখন মাথা উঠিয়ে, সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করলেন, শালটি দেখতে পেলেন। তিনি দাঁড়িয়ে সেটাকে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেললেন। অতঃপর চলে গেলেন।
মুহাম্মাদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে সে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয় এবং ইমামকে ডেকে পাঠায়। ইমাম সেখানে যাওয়ার পরে জিজ্ঞাসা করা হয়- 'আপনার (যাকাত-হিসাব করার) নথি কোথায়?' তিনি বললেন, 'কীসের নথি? আপনি কি আমাকে কর বা জিযয়া ওঠানোর জন্য পাঠিয়েছেন? আমি তো বরং বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে সেখানের ধনী লোকদের সাদাকাগুলো সংগ্রহ করতাম। এরপর গরিবদের মাঝে সেটা বিতরণ করতাম। আমার কাছে কোনো নথি বা সম্পদ নেই।' তখন মুহাম্মাদ তাকে জেলে বন্দি করে রাখলো এবং (তার ভাই) হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফকে চিঠি লিখে জানালো। হাজ্জাজ জবাবি চিঠিতে লিখলেন—'আহম্মক কোথাকার, তাউসকে চেনো না! তাকে তার পরিবারের কাছে যেতে দাও। তাদের সঙ্গে আগে সবাই যেভাবে আচরণ করেছে, সেভাবে আচরণ করো।'
নু'মান বলেন, তখন আমি জানতে পারলাম যে, তিনি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদেরকে সমবেত করে বলেন-'আল্লাহ তোমাদের রহম করুন। সাদাকা করো।' তখন একটা ফলকে সাদাকা বাবদ পাওয়া সম্পদগুলো লিখে রাখতেন। অতঃপর মিসকীনদেরকে ডেকে অন্য ফলকে তাদের মাঝে সম্পদ বিতরণের তথ্য লিখে রাখতেন। এভাবেই তিনি কারও কাছ থেকে গ্রহণ করতেন আর কারও কাছে বিতরণ করতেন। যখন কাজ শেষ হতো, ফলকটি মুছে নিজের গন্তব্যে যাত্রা শুরু করতেন।'
মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ ইয়ামানের গভর্নর ছিলেন। একবার তিনি তাউস ও ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহকে ডেকে পাঠালেন। তারা উভয়ে এলেন। সে-দিন ছিলো কনকনে শীতের দিন। মুহাম্মাদ তাউসের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তিনি কাঁপছেন। ভাবলেন, শীতে কাঁপুনি এসেছে। তখন তাকে এক হাজার দিরহামের একটি মূল্যবান শাল প্রদানের নির্দেশ দিলেন। শালটি তার কাঁধে রাখা হলো। কিন্তু তিনি এমনভাবে কাঁপতে থাকলেন যে, একপর্যায়ে শালটি পড়ে গেলো। তখন মুহাম্মাদ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। তারা দু'জনে বেরিয়ে এলেন। ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ তাকে বললেন, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। শুধু শুধু তাকে রাগিয়ে লাভ কী? আপনি সেটা নিয়ে আসতেন, এরপর কাউকে সাদাকা করে দিতেন!' তাউস বললেন, 'এটা তখন সম্ভব হতো, যদি সব মানুষ আমার মাথা দিয়ে চিন্তা করতো। ঘটনার শুরু ও শেষ তাদের জানা থাকতো। শাসকের কাছ থেকে পুরস্কার নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ আমাকে আদর্শ মেনে অনুসরণ করবে। অথচ তাদের কেউ জানবে না, আমি ওটা গ্রহণ করে সাদাকা করে দিয়েছি।'
এক ব্যক্তি তাউসের কাছে কিছু চাইলো। ৪২ তিনি বললেন, 'তুমি কি আমার গলায় রশি দিয়ে ঘোরাতে চাও?'
ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ তাউস র.-কে বললেন, 'আবূ 'আবদুর রহমান, খুব বেশি কঠোরতা করে ফেলছেন।' তিনি ইবনু মুনাব্বিহকে বললেন, 'আর তুমি খুব বেশি উদার হয়ে যাচ্ছো!'
তাউস র.-এর ছেলে থেকে বর্ণিত-তিনি বলেন, 'আমি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। পিতার কাছে এসে বললাম, 'আমার সঙ্গে চলুন।' এরপর আমি গিয়ে জামাকাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করলাম। যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে পিতার কাছে এলাম। তিনি বললেন-যাবেন না।' ৪৩
তাউস র.-এর ছেলে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন—রাসূল বলেছেন, “এত দিন নবীগণ ছিলেন। এরপর আসবে আমীর-উমারা। তারা (দ্বীনের) কিছু মানবে আর কিছু ছাড়বে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে, তারা (পরকালে) মুক্তি পাবে। আর যাদের তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে, তারাও হয়তো নিরাপদে থাকবে। কিন্তু যারা তাদের সঙ্গে তাদের দুনিয়ায় মিশে যাবে, তারা তাদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে।” ৪৪
টিকাঃ
৪১. তিনি প্রথম সারির তাবি'ঈ তাউস ইবনু কাইসান র.। ইবনু 'আব্বাস -এর ঘনিষ্ঠ শাগরিদ। ইবনু 'আব্বাস ছাড়াও অন্যান্য প্রায় অর্ধশত সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং তাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। ইসলামের বড় বড় অনেক ইমাম তার শিষ্য। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য-মুজাহিদ, 'আতা, যুহরী, যাহহাক প্রমুখ। তিনি ছিলেন বড় মাপের দুনিয়াবিরাগ ব্যক্তিত্ব-ফলে শাসককে পাত্তা দিতেন না। নিজে তাদের দরবারে যেতেন না। তাদের কেউ এলে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। উপরের ঘটনাগুলো এর স্পষ্ট প্রমাণ। (বিস্তারিত দেখুন-আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৫/২৪৪; তাবাকাতে কুবরা ৫/ ৫৪০; সিফাতুস সাফওয়াহ ২/১৮৮)
৪২. খুব সম্ভব তাকে শাসকদের সঙ্গে কাজ করার অনুরোধ করা হয়েছিলো।।
৪৩. পিতার আজ্ঞাবহ ছিলেন। রহিমাহুল্লাহ।
৪৪. জামি'উ মা'মার ইবনু রাশিদ (১১/৩২৯); মুসান্নাফে ইবনু আবী শাইবা (১৫/২৩৪)
📄 কাযীর পদ গ্রহণ থেকে সালাফের দূরাবস্থান
'ইমরান ইবনু হাত্তান বলেন, 'আমি আয়েশা-এর কাছে গিয়ে কাযীদের ব্যাপারে কথা বললাম। তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল বলেছেন, "কিয়ামতের দিন ন্যায় বিচারকদেরও এমন অবস্থা তৈরি হবে যে, সে সুরাইয়া-তারকায় ঝুলে থাকার কষ্ট সহ্য করতে রাজি হবে, কিন্তু দুই ব্যক্তির মাঝে একটি খেজুরের ব্যাপারে ফয়সালা দিতেও রাজি হবে না।”” ৪৫
লাইস ইবনু আবী সুলাইম সূত্রে আয়েশা থেকে বর্ণিত-নবীজী সা. ইরশাদ করেন, “কিয়ামতের দিন কাযীদের এমন অবস্থা তৈরি হবে যে, পৃথিবীতে দুইজনের মাঝে ফয়সালার পরিবর্তে যদি তারকার সঙ্গে ঝুলে থাকার প্রস্তাবও দেওয়া হতো, সেটাও গ্রহণ করে নিতো।” ৪৬
আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত-নবীজী সা. বলেছেন, "কিয়ামতের দিন এমন একটি সম্প্রদায় থাকবে, যারা কামনা করবে, যদি তাদের চুলের মুঠি ধরে সুরাইয়া-তারকার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হতো আর তারা আসমান ও যমিনের মাঝে দুলতে থাকতো, তাও গ্রহণ করে নিতো-বিনিময়ে যদি পৃথিবীতে (শাসকের সঙ্গে) কোনো কাজে জড়িত না হতো।” ৪৯
মু'আয ইবনু জাবাল থেকে বর্ণিত-নবীজী সা. বলেছেন, “কাযী জাহান্নামের এমন একটি গহ্বরে পতিত হবে, যা (এখান থেকে) এডেন (ইয়ামান) থেকেও দূরে।" ৪৮
উসমান ইবনু 'উমার-কে বললেন, 'যাও, গিয়ে মানুষের মাঝে বিচারকার্য করো।' ইবনু 'উমার বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আমাকে অব্যাহতি দিন।' উসমান বললেন, 'না, তোমাকে করতেই হবে।' ইবনু 'উমার বললেন, 'আমার ওপর এত দ্রুত ফয়সালা দেবেন না। আপনি কি আল্লাহর নবীকে বলতে শোনেননি- “যে-ব্যক্তি আল্লাহর আশ্রয় নিলো, সে সুরক্ষিত স্থানে আশ্রয় নিলো-?” তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, শুনেছি।' ইবনু 'উমার বললেন, 'আমি কাযী হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।' উসমান বললেন, 'কেন কাযী হতে চাচ্ছো না? তোমার পিতাও তো ('উমার) মানুষের মাঝে ফয়সালা করতেন।' ইবনু 'উমার বললেন, 'আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি-“যে-কাযী বিচারকার্যে যুলুম করবে, সে জাহান্নামে যাবে। যে-কাযী না-জেনে বিচার করবে, সেও জাহান্নামে যাবে। আর যে-কাযী জেনে- শুনে ইনসাফের সঙ্গে বিচার করবে, সে হয়তো কোনোমতে পার পাবে (সাওয়াবও নেই, গুনাহও নেই)। এরপরে আর কোন আশায় কাযী হতে যাবো?' ৪৯
ফযাইল ইবনু 'ইয়ায র. বলেন, 'কাযীদেরকে ওপর ঈর্ষা কোরো না। সাধারণ মানুষকে দয়া করো। যে-ব্যক্তি কাযী র দায়িত্ব নিলো, সে ছুরিবিহীন যবাই হয়ে গেলো। যে-ব্যক্তি কাযীর দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে, তার উচিত হলো একদিন বিচারকার্যে অন্য দিন কান্নাকাটিতে কাটানো। কারণ, কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।'
ইবনু শুবরুমা ৫০ র. বলেন, 'তরবারির নিচে যাওয়া আর কাযীর পদ গ্রহণ করা একই কথা।'
ইবনু হুসাইন বলেন, 'আমি ইমাম শা'বী র.-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় তার কাছে দু'জন ব্যক্তি অভিযোগ নিয়ে এলো। তিনি আমাকে বললেন, 'আপনি কথা বলুন।' আমি বললাম, 'আমার দ্বারা সম্ভব নয়।' অতঃপর তিনি তাদের মাঝে ফয়সালা করে দিলেন। তারা চলে যাওয়া পরে বললেন, 'জানি না, ঠিক করলাম, নাকি ভুল করলাম! কিন্তু আমি (সরকারী বিচারক হিসেবে) ফয়সালা করিনি। ইবনু হুসাইন বলেন, 'অতঃপর তিনি সে-সব লোকদের অভিশাপ দিলেন, যারা সেচ্ছায় কাযী হতে চায়।'
আবূ হামেদ খোরাসানী বলেন, 'খোরাসানের পথে কোনো এক শহরে একবার শাকীক বলখী ৫১র. আগমন করেন। সেখানকার কাযী তার কাছে এলে তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কুরআন পড়ো?' কাযী বললেন, 'হ্যাঁ।' শাকীক বললেন, 'তাবারাকা' (সূরা মুলক) থেকে পড়ো। কাযী পড়তে পড়তে যখন আল্লাহর বাণী :
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ ﴾
| যাতে তিনি পরীক্ষা করেন, তোমাদের মাঝে কে সর্বোত্তম 'আমালকারী। [সূরা মুলক ২] পর্যন্ত পৌঁছলেন, শাকীক তার গলা ধরে বললেন, 'তোমাদের মাঝে কার সওয়ারী সর্বোত্তম? তোমাদের মাঝে কার কাপড় সর্বোত্তম? তোমাদের মাঝে কার চেহারা সবচেয়ে সুন্দর? তোমাদের মাঝে কার বাড়ি সবচেয়ে সুন্দর? তখন কাযী শাকীক র.-কে লক্ষ করে বললেন, 'আমি আল্লাহকে ওয়াদা দিচ্ছি, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত আর এই কাজ (বিচার) করবো না।'
দাউদ ইবনু 'আলী খাল্লাদ ইবনু 'আবদুর রহমানকে ৫২ ইয়ামানে বিচারক নিয়োগ করার জন্য ডেকে পাঠালেন। খবর শুনে খাল্লাদের মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হলো! ইমাম আহমাদ বলেন, 'তিনি ফারেসী তথা অনারব ছিলেন।'
আবূ আঊন ৫৩ মিসরে এলেন। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও খুন-খারাবির পরে মিসর দখল করে নিলেন। অতঃপর হাইওয়াহ ইবনু শুরাইহকে ৫৪ ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে আবূ আউন তাকে বললেন, 'আমরা রাজা-বাদশাগণ যা বলি, তা-ই হয়। যে-ব্যক্তি আমাদের অবাধ্যতা করে, তাকে হত্যা করে ফেলি।' আমি তোমাকে কাযী হিসেবে নিয়োগ করলাম। হাইওয়াহ বললেন, 'আমি একটু বাড়িতে গিয়ে কথা বলে আসতে পারি?' তিনি বললেন, 'যাও।'
হাইওয়াহ ইবনু শুরাইহ বাড়িতে এসে মাথা ও দাড়ি ধৌত করলেন। সুগন্ধি লাগালেন। সবেচেয়ে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরলেন। এরপর আবূ আউনের কাছে ফিরে গেলেন। গিয়ে বললেন, 'আমি আপনার জবাবে সেটাই বলবো, যেটা বলেছিলেন ফিরাউনের যাদুকররা:
(وَأَنتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا )
(অর্থাৎ, আপনি যা করার করুন)। আমি আপনার দেওয়া কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবো না। আবূ আঊন তাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তিনি চলে গেলেন।
এক ব্যক্তি কাযীর দায়িত্বে নিয়োজিত হলো। ইবনুল মুবারক র. তার সম্পর্কে আলোচনা-প্রসঙ্গে বললেন, 'তার জন্য যথেষ্ট যে, সে বিশাল বিপদের মুখোমুখি হবে'।
আবুশ শা'সা ৫৫ বলেন, 'হাকাম ইবনু আইউব বসরার কয়েকজনের নিকট কাযী নির্বাজনের জন্য চিঠি লিখলেন। তাদের মাঝে আমিও ছিলাম। যদি (শেষমেশ) আমাকেও কাযীর দায়িত্ব দেওয়া হতো, তবে আমি সওয়ারী নিয়ে বের হয়ে যেতাম। (বসরা থেকে দূরে) পৃথিবীর কোনো প্রান্তে পালিয়ে যেতাম।'
ইবনুল মুবারক র.-কে বলা হলো- "আবূ 'আবদুর রহমান, সুফিয়ান সাওরী তো শাসকদের মাঝে সংস্কারের কাজ করতেন না।' তিনি বললেন, 'আল্লাহু আকবার। (তাদের দরবার থেকে) পলায়নের চেয়ে বীরত্বের কাজ আর কী হতে পারে?'
শরীক কাযীর দায়িত্ব গ্রহণের পরে সুফিয়ান সাওরী র. বলতেন- 'বন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সবর করতে পারতেন।'
হাসান ইবনু 'ঈসা বর্ণনা করেন, 'খোরাসানের গভর্নর ফযল ইবনু ইয়াহইয়া ইমাম খালেদ ইবনু সবীহের নিকট খোরাসানের কাযী পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে গভর্নর তাকে বন্দি করলো। তিনি ছিলেন খোরাসানের সবচেয়ে বড় আলিম, সবচেয়ে বড় মুহাদ্দিস। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও ফযল তাকে এ-ছুতোয় জেলে বন্দি করে রাখে।'
হাসান বলেন, 'আমি ইবনুল মুবারক র.-এর সঙ্গে বসা ছিলাম। এমন সময় সেখানে আবূ ইয়াহইয়া আকসাম ইবনু মুহাম্মাদ আসেন। ইবনুল মুবারক তাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'আবূ ইয়াহইয়া, কোত্থেকে এসেছেন?' তিনি বললেন, 'জেল থেকে। সেখানে খালেদ ইবনু সবীহকেও দেখেছি।' ইবনুল মুবারক র. বললেন, 'তাকে কেমন দেখলেন?' আবূ ইয়াহইয়া বললেন, 'আমি এমন একজন মানুষকে দেখেছি, যাকে তরবারি দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেও কাযীর পদ গ্রহণ করবেন না। এর কারণ হলো, তাকে আমি বলতে শুনেছি-'ধরে নিলাম, এ-ব্যাপারে আমিই সবেচেয়ে অভিজ্ঞ মানুষ। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সাহাবগণ যে-সব বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন, সে-সব বিষয়ে আমি কী করবো? তা ছাড়া কোনো বিষয় না-জানার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে দিতে পারি! ফলে দেখা যাবে, একজনের সম্পত্তি আরেকজনকে দিয়ে দেবো। জানতেও পারবো না যে, আমি ঠিক করলাম, নাকি বেঠিক করলাম!' এ-কথা শুনে আনন্দে ইবনুল মুবারক র.- এর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, 'আবুল হাইসাম, আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দিন।'
ইবনুল মুবারক র.-কে বলা হলো-“মারও' অঞ্চলের গভর্নর একজন কাযী নিয়োগ করতে চান। এ-ব্যাপারে তিনি কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে আগ্রহী। মানুষ গভর্নরের কাছে যাদের নাম পেশ করেছে, তাদের মাঝে নজর ইবনু মুহাম্মাদ, খালেদ ইবনু সবীহ, মারও'র কয়েকজন মাশায়েখসহ আপনার নামও রয়েছে।' এ-কথা শুনে ইবনুল মুবারক র. বললেন, 'তারা কি মনে করেছেন, আমি কারও ব্যাপারে পরামর্শ দেবো? কখনো না। আমার কাছে যদি ফুযাইল ইবনু 'ইয়াযের নাম পেশ করা হয়, তাকে নিয়োগের ব্যাপারেও পরামর্শ দেবো না।'
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামান তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন-'সুফিয়ান সাওরীর সঙ্গে আমার একদিন সাক্ষাৎ হলো। আমি বললাম, 'কোথায় যাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'হাম্মাদ ইবনু মূসার কাছে।' আমি বললাম, '(আপনার যাওয়ার দরকার নেই) আমি তাকে আপনার কাছে নিয়ে আসছি।' তখন তিনি মসজিদে চলে গেলেন। আমি হাম্মাদের কাছে গিয়ে বললাম, 'সুফিয়ান আপনাকে ডাকছেন।' তিনি আমার সঙ্গে এলেন। সুফিয়ান তাকে দেখে বললেন, 'তুমি শাসকের দরবারে উপস্থিত হও। আমরা উপস্থিত হই না। তারপরেও সেখানে আমাদের কথা ওঠে কী করে? সামনে থেকে যদি আমার নাম আসে, বলে দিয়ো, সে 'বিপদাক্রান্ত'।'
মা'মার বলেন, 'যখন ইবনু শুবরুমাকে (গভর্নরের পদ থেকে) অপসারিত করা হলো, তখন (অন্যান্যদের সঙ্গে) আমি তাকে বিদায় জানাতে গেলাম। একপর্যায়ে যখন সবাই চলে গেলো এবং তিনি আর আমি ছাড়া অন্য কেউ রইলাম না, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আবূ উরওয়া, সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। এখানে আমি আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার এই জামা পরিবর্তন করে অন্য কোনো জামা পরিনি।' অতঃপর অনেক্ষণ চুপ থাকেন। এরপর বলেন, 'আমি হালালের কথা বলছি। আর হারামের পথ তো বন্ধ।'
ইমাম ওয়াকী' বলেন, 'কাযী আবূ ইউসুফ র.-এর ওফাতের পরে খলীফা হারুনুর রশীদ আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন। তখন আমি, ইবনু ইদরীস ও হাফস ইবনু গিয়াস রওয়ানা হলাম। একটি জাহাজে করে আমরা বাগদাদে পৌঁছলাম। যখন খলীফার দরবারে ঢুকলাম, ইবনু ইদরীস কাঁপতে লাগলেন। দরজার কাছাকাছি গিয়ে তার কাঁপুনি আরও বেড়ে গেলো। একপর্যায়ে তিনি হাত ঝাঁকাতে লাগলেন। খলীফা হারুনুর রশীদ তখন একটি কুরসীতে বসা ছিলেন। তার পাশে ছিলো বিশালদেহী এক তুর্কি লোক। ওয়াকী' বলেন—তখন আমি বললাম, 'খলীফা তার পাশে বসানোর জন্য এই তুর্কি ছাড়া আর কাউকে পেলেন না!'
অতঃপর খলীফা কথা বলা শুরু করলেন। ইবনু ইদরীসের অবস্থা দেখে বললেন, তাকে দিয়ে হবে না। এরপর হাফসের দিকে মনোযোগী হলেন। তাকে প্রধান বিচারপতি বানাতে চাইলেন। কিন্তু হাফস অস্বীকৃতি জানালেন। খলীফা বারবার তাকে বোঝাচ্ছিলেন, মানাতে চেষ্টা করছিলেন, আর তিনি প্রত্যাখ্যান করছিলেন। ওয়াকী' বলেন—এভাবে তিনি বারবার আমাদেরকে অনুরোধ করছিলেন আর আমরা প্রত্যাখ্যান করছিলাম। তিনি পীড়াপীড়ি করছিলেন আর আমরাও আমাদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম; তখন তুর্কি লোকটি কথা বলে উঠলো। তার কথা শুনে দেখলাম, তার ভাষা কুরাইশের চেয়েও বিশুদ্ধ। সে বললো, 'আমীরুল মুমিনীন যদি আবূ সারায়া, আবূ র'দ, হাম্মাদ বারবারীর মতো ব্যক্তিদেরকে প্রশাসনে নিয়োগ দিতেন, তবে তোমরাই বলতে তিনি যালিম। আমাদের ওপর এমন লোকদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন, যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া উচিত হয়নি। আবার এখন যখন তোমাদেরকে নিয়োগ দিতে ডেকেছেন, তখন সেটাও অস্বীকার করছো। খলীফা হারুন তখনো হাফসকে মানাতে চেষ্টা করছিলেন। শেষমেশ বললেন, 'যদি (বাগদাদে দায়িত্ব পালন) না-ই করতে চান, তবে কুফার দায়িত্ব নিন। ঘরে বসে দায়িত্ব পালন করুন!' ৫৬
ওয়াকী' বলেন—আমি তুর্কি লোকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। সবাই জানালো- 'সে 'ঈসা ইবনু জা'ফর।'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল বলেন, 'ওয়াকী' কে এখানে-বাগদাদে নিয়ে এসে কাযীর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু তিনি অব্যাহতি চাইলেন। পরে তাকে অব্যাহতি ইবনু হুবাইরা কাসিম ইবনুল ওয়ালীদকে ডেকে পাঠালেন। তিনি দূতকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন ডেকেছেন?' দূত বললো, 'কুফার কাযী নিয়োগের জন্য।' তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, এখানে অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।' তিনি ঘরে ঢুকে দাসীকে ডেকে বললেন, 'আমার চুল এলোমেলো করে (কিছু অংশ) কেটে দাও।' দাসী করে দিলো। এরপর তিনি পুরনো ছেঁড়াখোঁড়া একটা কাপড় পরে বের হলেন। আমীর তার এমন জবুথবু অবস্থা দেখে বললেন, 'এই তার অবস্থা? যাও বেরিয়ে যাও।' এরপর তাকে বের করে দেওয়া হলো। তার জায়গাতে অন্য একজনকে ডেকে পাঠানো হলো।
'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক র. বলেন, 'সেই লোকটি ছিলেন ইবনু আবী লাইলা। ৫৭ দূত তাকে ডাকতে এলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন ডেকেছেন?' দূত বললো, 'আপনাকে কাযী নিয়োগের জন্য।' তিনি বললেন, 'অপেক্ষা করো।' এরপর ঘরে ঢুকে সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি পরলেন। সুন্দর করে পাগড়ি বাঁধলেন। সুগন্ধি লাগালেন। এরপর দূতের সঙ্গে বের হলেন। আমীর তাকে দেখে বললেন, 'এমন লোককেই নিয়োগ দেওয়া যায়। আমি আপনাকে কুফার কাযী হিসেবে মনোনীত করলাম।' এভাবেই তিনি কাযী হয়ে গেলেন।' ৫৮
ইবনু মুবারক র. বলেন, 'উনি অমন করেছেন দ্বীনের জন্য, আর ইনি এমন করেছেন দুনিয়ার জন্য।'
এক ব্যক্তি হাসান ইবনু সালিহের কাছে এসে ইবনু আবী লাইলা-প্রদত্ত ফাতওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি কোনো জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। কারণ, ইবনু আবী লাইলা তখন কাযীর দায়িত্বে ছিলেন।
একবার রাস্তায় (কাযী) শুরাইহের সঙ্গে এক লোকের সাক্ষাৎ হলো। লোকটি তাকে বললো, "আবূ উমাইয়া, আপনার বয়স হয়েছে। শরীর নরম হয়ে গেছে। আর ওদিকে আপনার পরিবার ঘুষ খাচ্ছে।' তিনি বললেন, 'সত্যি!' লোকটি বললো, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'আজকের পর থেকে আপনি কিংবা অন্য কেউ আর এমন কথা বলার সুযোগ পাবে না।'
অতঃপর শুরাইহ হাজ্জাজের কাছে গিয়ে নিজের বয়স ও শারীরীক দুর্বলতার কথা তুলে ধরে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রার্থনা করলেন। হাজ্জাজ বললেন, 'তোমার জায়গায় যোগ্য কোনো লোক দিতে পারলেই তবে তোমাকে অব্যাহতি দেবো, এর আগে না।' তিনি বললেন, 'এমন লোক আমি দিতে পারবো।' হাজ্জাজ জিজ্ঞাসা করলেন, 'কে?' তিনি বললেন, 'আবূ বুরদা ইবনু আবী মূসা।' তখন হাজ্জাজ তাকে কাযী হিসেবে নিয়োগ দিলেন। শুরাইহকে অব্যাহতি দিলেন। পরবর্তীতে শা'বীর সঙ্গে তার দেখা হলে শা'বী তাকে বললেন, 'আমার নামটা বলতে পারলেন না!' তিনি বললেন, 'আপনার ভালোর জন্যই আপনার নাম বলিনি।' ৫৯
যখন ইমাম ও কাযী আবূ ইউসুফ র. ইন্তেকাল করলেন, ফুযাইল ইবনু 'ইয়ায র. বললেন, 'তোমাদের মাঝে এমন কেউ কি আছে, যে তাকে ঈর্ষা করে?'
ইমাম মাকহুল ৬০ বলেন, 'আমার দুই হাত কেটে ফেললেও আমি কাযী হতে পারবো না। আমার মাথা ছিন্ন করে ফেললেও আমি বাইতুল মালের দায়িত্ব নিতে পারবো না।'
ইয়াযীদ ইবনু হারুন ৬১ বলেন, 'আমি চল্লিশ বছরের অধিক সময় ধরে তার মুখ থেকে এটা শুনেছি।'
হাফস ইবনু গিয়াসকে কেউ বললো- 'যদি আপনি কাযীর দায়িত্ব না নিতেন!' তিনি বললেন, 'অন্তরে নেই, অথচ মুখে বলবো, এটা আমার পছন্দ নয়।'
হাফস ইবনু গিয়াস শারকিয়্যাহ পূর্বাঞ্চলের কাযী ছিলেন। তিনি একটি বিচার করছিলেন, এমন সময় খলীফা হারুনুর রশীদের চিঠি এলো। দূত এসে দাঁড়িয়ে রইলো। বিচার শেষ করার আগ পর্যন্ত তিনি চিঠি গ্রহণ করলেন না। পরে চিঠি খুলে দেখলেন, তাতে লেখা রয়েছে—'বিচারটি না করা হোক।' বললেন, 'করা হয়ে গেছে।” ৬২
'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক র. থেকে বর্ণিত-বনী ইসরাঈলের এক কাযী মারা গেলো। তখন বাদশা তাদের মাঝে সবচেয়ে ভালো লোকদেরকে সমবেত করলেন। অতঃপর বললেন, 'তোমাদের মাঝ থেকে একশো জন মানুষকে বাছাই করো।' তারা একশো জনকে বাছাই করলো। বাদশা সেই একশো জনকে বললেন, 'তোমরা তোমাদের সেরা দশ জনকে বাছাই করো।' তারা বাছাই করলো। বাদশা সেই দশজনকে বললেন, 'তোমরা তোমাদের সেরা তিনজনকে বাছাই করো।' তারা করলেন। অতঃপর বাদশা সেই তিনজনকে বললেন, 'তোমরা তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম কে, সেটা নির্ধারণ করো।' তারা একজনকে নির্বাচন করলেন। তখন বাদশা তাকে কাযী হওয়ার প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। তখন তার কাছে ওহী এলো- 'কেন তুমি বনী ইসরাঈলের কাযী হতে চাচ্ছো না?' তিনি বললেন, 'অজ্ঞাতসারে যুলুম করে ফেলার ভয়ে।' তাকে বলা হলো- 'তোমার জন্য একটি নিদর্শন দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে ইনসাফ ও যুলুম বুঝতে পারবে। তোমার ঘরের এমন জায়গায় একটি লোহা স্থাপন করো, যেটা সচরাচর হাত দিয়ে নাগাল পাও। যদি ইনসাফের সঙ্গে ফয়সলা করো, তখন ঘরে এসে সেটা ছুঁতে পারবে। আর যদি যুলুম করে ফেলো, তবে সে-দিন সেটার নাগাল পাবে না।' তখন তিনি রাজি হলেন এবং কাযীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। কাজ শেষ করে ঘরে এসে লোহাটা ছুঁয়ে দেখলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।
একদিন বিচারকার্য শেষ করে ঘরে এসে দেখলেন, লোহাটি নাগাল পাচ্ছেন না। তখন প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। বুঝতে পারছিলেন না, কী হয়ে গেলো! তখন তার কাছে ওহী এলো-'দু'জন লোক তোমার কাছে বিচার নিয়ে এসেছিলো। তুমি মনে মনে কামনা করেছিলে, যেন ফয়সালা তাদের একজনের পক্ষে যায়, অন্যজনের পক্ষে না- যায়।' এ-কথা শুনে তিনি বললেন, 'প্রভু, এটা আমার কেবল মনে এসেছিলো। কাজে বাস্তবায়ন করিনি!' কেবল মনে আসার কারণেই যদি এই দশা হয়, কাজে পরিণত করলে কী হতো! এরপর তিনি কাযীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। ৬০
টিকাঃ
৪৫. মুসনাদু আবু দাউদ তায়ালিসী ৩/১৩২; মুসনাদু আহমাদ ৬/৭৫: বাইহাকী ১০/৯৬। তবে হাদীসটি যঈফ (দুর্বল)।
৪৬. মুসনাদু আবী ইয়া'লা ৮/১৮৮; তাবারানীর মু'জামুল আওসাত ৪/১৬৭। তবে হাদীসটির শুদ্ধতা নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
৪৭. মুসনাদু আহমাদ ২/৩৫২; মুসনাদু আবী 'ইয়ালা ১১/৮৪; হাকিম ৪/৯১; বাইহাকী ১০/৯৭। হাদীসটির সনদ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। তবে একাধিক সনদে কাছাকাছি অর্থের বক্তব্য বিদ্যমান থাকা হাদীসটির মূল বক্তব্যকে শক্তিশালী করছে।
৪৮. মুসনাদু 'আবদ ইবনু হুমাইদ (১০৮); ওয়াকী'র আখবারুল কুযাত (১/১৯); তাবারানীর মুসনাদু শামিয়্যীন ২/৯৫। হাদীসটির সনদ যঈফ।
৪৯. এটি ইবনু 'উমার -এর নিজস্ব চিন্তা ও মানহাজ। নতুবা কেউ যদি ইনসাফ ও ইখলাসের সঙ্গে কাযীর দায়িত্ব পালন করেন, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন অবশ্যই এর বিনিময় প্রদান করবেন। এ-ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। বিভিন্ন নবী-রাসূল, সাহাবীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ সাহাবীগণ বিচারের কাজ করেছেন; বরং সৎ মানুষগণ এ-কাজ না করলে অসৎ লোকেরা এটা দখল করবে। কিন্তু এটা একটি ভয়ংকর দায়িত্ব! অসংখ্য সহীহ হাদীসে এই দায়িত্বের ঝুঁকি ও ভয়ংকর পরিণতির কথা এসেছে। সে-কারণে অধিকাংশ সাহাবী ও সালাফে সালিহীন এমন ভয়ংকর দায়িত্ব থেকে দূরে থাকতেন। ইবনু 'উমারও তার স্বভাবত বিনয় ও যুহদের কারণে এটা পরিত্যাগ করেছেন। এটা ছিলো সেই সোনালি যুগের কথা। বর্তমান সময়ে এ-দায়িত্ব কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা বলা বাহুল্য।
৫০. ইরাকের ফকীহ। তাবি'ঈদের অন্তর্ভুক্ত। আনাস ইবনু মালিক -সহ কয়েকজন সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সুফিয়ান সাওরী, 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারকের মতো ইমামরা তার শাগরিদ। পরবর্তীতে তিনি কুফার কাযী হয়েছিলেন। সম্ভবত কাযীর পদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই উপরের মন্তব্যটা করে থাকবেন। এমনও আরও কিছু ঘটনা তার থেকে বর্ণিত আছে।
৫১. খোরাসানের বলখের অধিবাসী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আর ইমাম। ইবরাহীম ইবনু আদহাম র.-এর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং যুহদ শেখেন। ধনীর দুলাল হয়েও একসময় যাহিদদের ইমাম হয়ে যান। ১৯৪ হিজরীতে তিনি এক জিহাদে শাহাদাত বরণ করেন।
৫২. মুহাদ্দিস। ইমাম আবু দাউদ, নাসা'ঈ প্রমুখ তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
৫৩. বনু আব্বাসের বীর 'আবদুল মালিক ইবনু ইয়াযীদ। খোরাসান ও মিসরের গভর্নর।
৫৪. মিসরের ফকীহ ইমাম হাইওয়াহ ইবনু শুরাইহ। তিনি মুস্তাজাবুদ দা'ওয়াহ ছিলেন। 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক, ইবনু ওয়াহব প্রমুখ ইমামগণ তার ছাত্র। যুহদ ও ইবাদতে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন।
৫৫. ইবসে 'আব্বাস-এর প্রথম সারির শাগরিদ। হাসান বসরী ও ইবনু সীরীনের সমপর্যায়ের তাবি'ঈ। বসরার বিখ্যাত ইমাম। 'আমর ইবনু দীনার, আইউব সাখতিয়ানী প্রমুখ ছিলেন তার শিষ্য। তিনি কাযীর দায়িত্ব গ্রহণ পছন্দ করতেন না। ৯৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
৫৬. 'ঈসা ইবন জা'ফরের যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। ভালো লোকেরা দায়িত্ব না-নিলে অনেক সময় সে-জায়গাতে খারাপ লোক আসে; তখন আরও জটিলতা তৈরি হয়। মোটকথা, কাযীর দায়িত্ব গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান দু'টির ক্ষেত্রেই যুক্তি রয়েছে। তবে সালাফে সালিহীন তাদের ঈমান, আখিরাত, তাকওয়া এ-সব চিন্তা করে এ-সব দায়িত্ব থেকে দূরে থাকতেন।
৫৭. কুফার মুহাদ্দিস। ইবনু মাজাহ র.-এর উসতায।
৫৮. মুহাম্মাদ ইবনু 'আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা (৭৬-১৪৮ হি.)। কুফার কাযী, মুফতী ও ফকীহ। প্রায় ৪০ বছর কাযীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার ব্যাপারে ইবন মুবারক র.-এর মন্তব্য যুহদ ও অপার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।
৫৯. ছিলো, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামদের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচকই ছিলো। এর অন্যতম কারণ তাদের তাকওয়া, ইখলাস, আখিরাতের প্রতি অনুরাগ, দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি, পাশাপাশি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার চিন্তা ও কারও কারও দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক সমকালীনর যুলুমবাজ শাসকদের চিত্র।
৬০. শামের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ। প্রথম সারির তাবি'ঈদের একজন। ইবনু শিহাব যুহরীর সমপর্যায়ের।
৬১. তাবি'অ-তাবি'ঈন শাইখুল ইসলাম ইয়াযীদ ইবনু হারুন (১১৮-২০৬ হি.)। ইয়াহইয়া ইবনু মা'ঈন, 'আলী ইবনুল মাদীনী, আহমাদ ইবনু হাম্বল প্রমুখ ইমামগণ তার ছাত্র ছিলেন।
৬২. কারণ, তার আশঙ্কা ছিলো, চিঠিটি ন্যায়বিচারে বাধা হতে পারে। সে-কারণে বিচার শেষ না-করে খোলেননি। এটা দ্বারা হাফস ইবনু গিয়াসের ইনসাফ ও খোদাভীতিরই প্রমাণ পাওয়া যায়।
৬৩. এটির সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঘটনা সত্য হোক না হোক, বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব যে যথেষ্ট গুরুতর ও ভয়ংকর, সেটা প্রতিষ্ঠিত সত্য।
📄 সালাফের অন্যান্য ইমামদের তাকওয়া ও দরবারবিমুখতা
আহমাদ ইবনু হাম্বল র. বলেন, 'আমি মুহাম্মাদ ইবনু 'উয়াইনাকে দেখতাম, সুফিয়ান ইবনু 'উয়াইনার কাছে এসে তাকে ওয়ায করতেন। তার গায়ে থাকতো পশমের জুব্বা।'
সুফিয়ান ইবনু 'উয়াইনা মীনার তাঁবুতে মানুষের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন। এমন সময় সেখানে মুহাম্মাদ ইবনু 'উয়াইনা আসেন। একটা গদির ওপর মাথা রেখে আবেগ-মথিত কণ্ঠে এ-পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করেন :
إني وزنت الذي يبقى ليعدله ما ليس يبقى فلا (والله ما اتزنا)
স্থায়ী বিষয়ের (আখিরাত) সঙ্গে আমি ক্ষণস্থায়ী বিষয়কে (দুনিয়া) তুলনা করে মেলাতে চেয়েছি। আল্লাহর শপথ, আমি হিসাবে ভুল করেছি।
(খোরাসানের আমীর) ইবনু তাহির ইমাম ফিরইয়াবীর ৭০ কাছে এলেন। ভেতরে আসার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন না। বললেন, 'তাকে বলে দাও, আমি বাথরুমে যাচ্ছি।' ফিরইয়াবীর ছেলে বাইরে এসে তাকে জানালো। ইবনু তাহির বললেন, 'এই লোক আমার ওপর বাথরুমকে প্রাধান্য দিলো!'
আবূ 'আবদিল মালিক ফারেসী বলেন, 'আমি ইবনু তাহিরের সঙ্গে ছিলাম। আমরা ফিরইয়াবীর কাছে এলাম। আমি ও ফিরইয়াবীর ছেলে তার বাবার কাছে গেলাম। ফিরইয়াবীর ছেলে তার বাবাকে বললেন, 'আব্বাজান, এখানে আমাদের কিছু জমিজমা আছে। আর এই লোকটি অনেক শহর জয় করেছে। তিনি এখন আপনার দরজায় এসেছেন আপনাকে সালাম দেবেন বলে।' কিন্তু তিনি (ফিরইয়াবী) সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। বললেন, 'তাকে বলে দাও, আমার প্রস্রাবে সমস্যা-ফলে বারবার বাথরুমে যেতে হয়।' ইবনু তাহিরকে সেটাই জানানো হলো। তিনি বললেন, 'আমি শুধু দু'আ চাওয়ার জন্য এসেছিলাম।' তারপর তিনি দেখা না-করেই চলে গেলেন।'
'আবদুল্লাহ ইবনু মুহাইরীয ৭১ র. বলতেন, 'শাসকের দরবারে উপস্থিত হলে তাকে নসীহত করা ওয়াজিব।'
মুহাম্মাদ ইবনু মুকাতিল 'আব্বাদানী ৭২ বলেন, 'শাসকের সামনে হক কথা বলা ফরয।'
'উবাইদ ইবনু 'উমাইর ৭৩ বলেন, 'কোনো ব্যক্তি তাদের (শাসকের) যত কাছে যায়, আল্লাহ তার থেকে তত দূরে চলে যান। সম্পদ যত বাড়ে, তার হিসাবও তত বাড়ে। যার অনুসারী যত বেশি থাকে, তার পেছনে শয়তানও তত বেশি লাগে।'
আমাশ থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন, 'শাকীক আমাকে বললেন, 'সুলাইমান, আমাদের শাসকদের না আছে মুসলমানদের তাওকয়া, না আছে জাহেলি যুগের লোকদের বুদ্ধি-বিচক্ষণতা। দুটোর একটাও নেই।'
সাহল ইবনু আবী খাদ্দাওয়াইহ ৭৪ র. বলেন, 'আলিমদের ত্রুটির জায়গাটা আমি চিনেছি। কোনো এক প্রয়োজনে আমি ওদের (শাসকদের) দরবারে গিয়েছি। তারপরেও তাদের (আলিমদের) কেউই এ-কারণে আমার সঙ্গে রাগ দেখাননি; দূরত্ব (মাদীনার কাযী) 'উমার ইবনু 'আবদুর রহমান ইবনু খালদা ৭৫ রবী'আ ইবনু আবী আবদির রহমানকে ডেকে পাঠালেন। রবী'আ এলে তিনি তাকে বললেন, 'আমি দেখছি, তুমি ফাতওয়া দাও। সামনে থেকে যখনই কেউ এসে তোমার কাছে ফাতওয়া জিজ্ঞেস করবে, আগে নিজেকে দিয়ে শুরু করবে। নিজের নফসকে ফাতওয়া দেবে।'
আবূ জা'ফর বলেন, 'বিশর ইবনুল হারিস একবার রিফায়ী আল-মাওসিলীর কাছে একটি চিঠি লিখে আমার হাতে দিলেন। আমি সেটা রিফায়ীর কাছে পৌঁছে দিলাম। তাতে লেখা ছিলো—'যিনি আপনাকে প্রকাশ্যে দেখেন, তিনি আপনাকে গোপনেও দেখেন। আমি জানতে পেরেছি, আপনি নাকি কাযীর দরবারে গিয়েছেন! যদি আপনি কাযীর দরবারেই যান, তবে আমরা আপনার কীসের ভাই?' আবূ জা'ফর বলেন—আমৃত্যু তিনি তাকে আর কোনো চিঠি দেননি।'
রিফায়ী বলেন, 'আমার ছেলেকে কাযী বন্দি করেছিলো। তখন মানুষ প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য আমাকে রাতের বেলা কাযীর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলো। এ-প্রসঙ্গেই বিশরের চিঠি এসেছিলো।'
তাউস র. বলেন, 'আমি (কাবার) হাতীমে ছিলাম, এমন সময় হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ সেখানে এলেন। ঠিক তখন আরেকজন লোক সেখানে এলো। তার চোখে-মুখে সফরের ক্লান্তির ছাপ। হাজ্জাজ তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোত্থেকে এসেছো?' তিনি বললেন, 'ইয়ামান থেকে।' হাজ্জাজ বললেন, 'মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফের কী অবস্থা?' তিনি বললেন, 'যেমনটা আপনাকে আনন্দ দেয়। তিনি মোটাতাজাই আছেন।' হাজ্জাজ বললেন, 'আমি এটা জিজ্ঞাসা করিনি। তার চালচরিত্র, জীবনাচরণ কেমন?' লোকটি বললেন, 'বড় যালিম। প্রচণ্ড অত্যাচারী ও নিপীড়ক।' হাজ্জাজ বললেন, 'তুমি কি জানো, আমি তার ভাই?' লোকটি বললেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলুন, আপনি কি আপনার ভাইকে আমার চেয়ে সম্মানিত মনে করেন?' তখন হাজ্জাজ চলে গেলেন। তাউস বলেন—আমি সেদিনের চেয়ে আশ্চর্যজনক দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।'
ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেন, 'যখন আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার মাঝে সততা দেখতে পান, আকাশ ও মাটি দুটো একসাথে মিশে গেলেও তার জন্য রাস্তা বের করে দেন।' ৭৬
বিশর বলেন, 'আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে অপছন্দ করেন, দুনিয়ার ভোগবিলাসে মত্ত মানুষদের মাঝে ছেড়ে দেন।'
মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন র. বলতেন- 'শাসকের কোনো চিঠি বহন কোরো না। যতক্ষণ না জানো, সেটার ভেতরে কী লেখা।'
ইবরাহীম ইবনু আবী সালিহ বলেন, 'আমরা ইউসুফ ইবনু আসবাতের কাছে ছিলাম। সেখান থেকে মিসসীসার দিকে রওনা হলাম। তিনি আমাদের সঙ্গে বের হলেন। অনেকদূর এগিয়ে দিয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক লোক একটি চিঠি নিয়ে এলো। বললো, 'এটা মিসসীসাতে পৌঁছে দিন।' ইউসুফ তাকে দেখে আমাদেরকে বললেন, 'তার চিঠি নিয়ো না।' আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন?' বলা হলো-'সে (খলীফা) আবদুল মালিকের লোক।'
মুআবিয়া ইবনু 'আমর বলেন, 'কায়িস নামের একজন ব্যক্তি ছিলেন। একদিন হঠাৎ তিনি ও তার সঙ্গীরা সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়লেন। তিনি বললেন, 'তোমরা ডুবে যাওয়ার ভয় করছো? আমরা (এত নিকৃষ্ট যে) ডুবে মরারও উপযুক্ত নই।'
মূসা ইবনু 'উবাইদা রাবাযী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মানুষ তাকে দেখতে তার কাছে আসতে লাগলো। লোকেরা (খোরাসানের আমীর) মু'আয ইবনু মুসলিমকে বললো, 'আপনিও যদি তাকে একটু দেখে আসতেন।' তিনি বললেন, 'চলো, সবাই মিলে যাই।'
মু'আয ঘরে ঢুকে সালাম দিলেন। চারদিকে সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো। মূসা বললেন, 'কে? আপনি কে?' তিনি বললেন, 'আমি মু'আয ইবনু মুসলিম।' মূসা বললেন, 'আপনি? আপনাকে স্বাগত জানাতে পারছি না। যারা আপনাকে নিয়ে এসেছে, তাদেরও স্বাগত জানাতে পারছি না।' মু'আয বললেন, 'আমি আপনার জন্য দুইশো স্বর্ণমুদ্রা বরাদ্দ দিয়েছি।' এ-কথা শুনে মূসা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। বললেন, 'আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি চলে যান।' মু'আয বলেন, 'আমি বের হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আর আমার দিকে তাকালেনই না। আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ, এত বড় লাঞ্ছনার শিকার জীবনে আর কখনো হইনি।'
ইমাম আওযা'ঈ র. বলেন, 'যে-আলিম শাসকের দরবারে যায়, আল্লাহর কাছে তার চেয়ে ঘৃণিত আর কিছু নেই।'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র. যখন আবূ 'আবদুর রহমান 'উমারীর ৭৭ ব্যাপারে আলোচনা করতেন, তখন বলতেন, 'তিনি তাদের (শাসকের) ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন।'
একবার 'উমারী র. বাগদাদে খলীফা হারুনুর রশীদের দরবারে গিয়ে তাকে উপদেশ দিতে মনস্থ করলেন। খলীফা তখন কুফার গভর্নরের কাছে পত্র লিখে পাঠালেন-'তাকে আমার কাছে আসতে দিয়ো না। মরুভূমির দিকেও যেতে দিয়ো না (কয়েদ করো)।' সুফিয়ান সাওরী র. এ-ব্যাপারে জানতে পেরে তার মুক্তির প্রত্যাশা করলেন। ফলে তিনি ফিরে গেলেন।
মুসাইয়্যিব ইবনু ওয়াজিহ বলেন, 'একবার খলীফা হারুনুর রশীদ অন্দরমহলে ছিলেন। তখন আবূ 'আবদুর রহমান 'উমারী তার দিকে হাতের ইশারা করে লিপিত পঙ্ক্তিগুলো আবৃত্তি করলেন:
الله در ذوي العقول والحرص في طلب الفضول
سلاب أكسية الأرامل واليتامى والكهول
من الخيانة والغلول والجامعين المكثرين
وضعوا عقولهم من الدنيا بمدرجة السيول
ولهوا بأطراف الفروع وأغفلوا علم الأصول
ولهوا بأطراف الفروع وأغفلوا علم الأصول
وتتبعوا جمع الحطام وفارقوا أثر الرسول
আশ্চর্য লাগে, ও-সব লোকের ব্যাপারে, যাদের আল্লাহ বিবেক দিয়েছেন, সম্মান ও মর্যাদার প্রতি যাদের আগ্রহও আছে, সে-সব লোকেরা কী করে বিধবা, ইয়াতীম ও বৃদ্ধদের পোশাক কেড়ে নেয়? কীভাবে বিভিন্ন প্রতারণা, খেয়ানত ও ঠকবাজিতে লিপ্ত থাকে? আসলে তাদের বিবেকটাকে তারা স্রোতের সঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছে। প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান পরিত্যাগ করে অর্থহীন বিষয়ে বুঁদ থেকেছে। নবীজীর দেখানো-পথ ছেড়ে পার্থিব জগতের তুচ্ছ সম্পত্তির পেছনে লালায়িত হয়ে ছুটেছে।
একবার খলীফা হারুনুর রশীদ মাদীনায় এলেন। নবীজী ﷺ-এর মিম্বরে উঠে খুতবা দিতে লাগলেন। তখন ‘উমারী দাঁড়িয়ে খলীফার উদ্দেশ্যে বললেন, 'আল্লাহর রাসূলের মিম্বরে উঠে মিথ্যাচার করবেন না।'
ইবনু আওন র. মুহাম্মাদ র. থেকে বর্ণনা করেছেন— 'যদি আমীর (শাসক) তোমাকে কুরআন তিলাওয়াত করতে ডাকে, তবে তার ডাকে সাড়া দিয়ো না।
বাকর ইবনু খুনাইস থেকে বর্ণিত—হাসান র. ওয়াসিত অঞ্চলে ইবনু হুবাইরার দরবারের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন, অনেক মানুষ সেখানে কাজের সন্ধানে অপেক্ষমাণ। তিনি বললেন, 'তারা মাথায় পাতলা পাগড়ি বেঁধেছে। গায়ে সুন্দর কাপড় পড়েছে। 'আমানত' বিক্রি করে দিয়ে 'ইমারত' (নেতৃত্ব) চাইতে এসেছে। তারা শান্তি ও নিরাপদে ছিলো, অথচ এখানে মুসীবত ডাকতে এসেছে। তারা মৌজমস্তি করার জন্য উন্মত্ত। ফলে তাদের নেক 'আমাল বরবাদ হয়ে গেছে। তাদের উপরের লোকদেরকে তারা ভয় পায় আর নিচের লোকদেরকে যুলুম করে। দ্বীনকে জীর্ণ-শীর্ণ করে ঘোড়াকে মোটাতাজা করে। কবরকে সংকীর্ণ করে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করে। যে-সব গদিতে তারা হেলান দিয়ে বসে, সেগুলো অন্যায়ের টাকা দিয়ে ভরা; পরিচারকগণ তাদের নিয়ে ঠাট্টা করে। তাদের খাবারদাবার হারাম উৎস থেকে আসে। কখনো টক কখনো মিষ্টি, কখনো গরম কখনো ঠান্ডা, কখনো শুকনো কখনো ভেজ—নানা রকম খাবারে তাদের উদরপূর্তি চলতেই থাকে। ফলে তাদের বদহজম হয়। দাসীকে বলতে থাকে—'হজমের ঔষধ দাও।' অথচ ওই আহমক জানে না, দ্বীনকে তারা কত আগেই হজম করে ফেলেছে। সময় ফুরানোর পরে আগামীকাল যখন নিজের কৃতকর্ম দেখবে, নিজেই লজ্জা পাবে। কিন্তু তখন সে-লজ্জা কোনো কাজে আসবে না।'
'আবদুল্লাহ ইবনু দাঊদ ৭৮ বলতেন -'যে-ব্যক্তি শাসকের কাছে যায়, সে লাঞ্ছিত হয়।'
রবাহ ইবনু যায়িদ বলেন, 'হাজ্জাজের যুগে আবূ ওয়ায়িল শাকীক ইবনু সালাম হাতে লাঠি নিয়ে বেড়াতেন। যখন হাজ্জাজ মারা গেলো, লাঠিটি ফেলে দিলেন।' তিনি আরও বলেন, 'আমার কাছে সংবাদ এসেছে-ইবনু আউনও আবূ জা'ফরের যুগে লাঠি বহন করতেন।'
মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন ৭৯ র. বলতেন- 'যদি কোনো শাসক তোমাকে কুরআআ নের একটি সূরা পড়তেও ডাকে, তার ডাকে সাড়া দিয়ো না।'
ইউনুস ইবনু 'উবাইদ র. বলেন, 'আমি তিন ধরনের লোকের সঙ্গে বসতে পছন্দ করি না। এক. শাসক; যদি সে আমাকে কুরআন পড়তেও বলে, তবুও তার সঙ্গে বসতে পছন্দ করি না। দুই. গাইরে মাহরাম নারী। তিন. বিদআতী।
মিহরিয ইবনু ইয়াসার বলেন, 'খলীফা আবূ জা'ফরের যুগে সাওয়ার ইবনু 'আবদুল্লাহ আমাদের অঞ্চলে বিচারক হিসেবে এলেন। অতঃপর সাল্লাম ইবনু আবী মুতীকে খবর দিলেন-'আমার কাছে আসুন। আপনার সঙ্গে একটু পরামর্শ আছে।' সাল্লাম তার কাছে না এসে পরামর্শের জন্য ইউনুস ইবনু 'উবাইদের কাছে গেলেন। গিয়ে দেখলেন তিলাওয়াত শেষ করে তিনি কুরআন গুছিয়ে রাখছিলেন। বললেন, 'সাওয়ার ইবনু 'আবদুল্লাহ আমাকে পরামর্শের জন্য ডেকেছে। এ-ব্যাপারে আপনার কী মত?' তিনি বললেন, 'যদি সে তোমাকে কুরআন পড়তে ডাকে, তাও যেয়ো না!'
আবূ সালামা মূসা ইবনু ইসমাঈল বর্ণনা করেন, 'হাম্মাদ ইবনু সালামা আমাকে বলেছেন-'শাসক যদি তোমাকে কুরআন পড়তে ডাকে, তাও যাবে না।'
মাইমূন ইবনু মিহরান বলেন, 'শাসককে চিনতে যেয়ো না। তাকে যে চেনে, তাকেও চিনো না।'
'আলী ইবনু শু'আইব বলেন, 'আমি ইবনু হারবকে বলতে শুনেছি- শাসকদের সঙ্গে কোনো কিছুতে জড়িয়ো না।'
খালাফ ইবনু তামীম বলেন, 'আমি 'উবাইদুল্লাহ ওয়াস সাফীকে বললাম, 'আপনি যদি আবূ জা'ফরের দরবারে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন, হতে পারে, আল্লাহ তাআলা আপনার কথার মাধ্যমে তাকে উপকৃত করবেন।' তিনি বললেন, 'তাকে যদি আমি বলি-'আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন', ফেরেশতারা আমাকে বলবেন, 'আল্লাহ তোমাকে ভালো না রাখুন।' এটা কীভাবে করতে পারি?'
আবূ ইসহাক ফাজারী বলেন, 'আমি হারুনুর রשীদের দরবারে গিয়েছিলাম। ঢোকা থেকে বের হওয়ার পর্যন্ত তার জন্য একটি দু'আও করিনি। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো-'আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করুন'-এই দু'আটাও করেননি?' তিনি বললেন, 'না।'
আইয়ূব সাখতিয়ানী র. বর্ণনা করেন-'ইবনু সিরীন র. (আমীর) ইবনু হুবাইরার দরবারে যান; কিন্তু তিনি তাকে সালাম দেননি।'
ইমাম ওয়াকী ৮০ র.-কে বিচারকের পদ দেওয়া হলো, কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। যুক্তি হিসেবে বললেন, 'আমার এই চোখে ছানি পড়েছে।' অতঃপর হাতের আঙ্গুল দিয়ে দ্বিতীয় চোখের দিকে ইশারা করে বললেন, 'আর 'এটা' দিয়ে কিছুই দেখি না ('এটা' বলতে তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন আঙ্গুল; মানুষ বুঝেছে চোখ)।' তখন তার গায়ে ছিলো তিনটি রৌপ্যমুদ্রার মূল্যের একটি পোশাক।
শু'আইব ইবনু হারব বলেন, 'যখন তাদের (শাসকের) কানে খবর পৌঁছে যে, কেউ তাদের সমালোচনা করেছে, তারা তার বাড়িতে বিশেষ সেনা পাঠিয়ে ডেকে নেয়। এমন একটি ঘটনা ঘটেছে বসরাতে। রাজদরবারে খবর গেলো—এক লোক তাদের সমালোচনা করেছে। সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িতে সৈন্য এলো। তাকে ধরে হারুনুর রשীদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হলো। 'উমার ইবনু বাযী তখন বাদশার মাথার কাছে ছিলো। সে লোকটিকে বলতে লাগলো, 'তুমি আমাদের সমালোচনা করো! আমাদের ব্যাপারে এটা-সেটা বলো!' তখন লোকটি বললো, 'আপনার যা করার করে ফেলুন। আল্লাহর শপথ, যদি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় পেতাম, তবে আপনার সমালোচনা করতাম না।' এ-কথা শুনে খলীফা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'তাকে বের করে দাও। সে আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে!'
একবার 'উমারী র. খলীফা হারুনুর রশীদের কাছে গেলেন। খলীফা পথেই তার জন্য দাঁড়ালেন। 'উমারী তাকে বললেন, 'আপনি এটা করেছেন, আপনি ওটা করেছেন।' খলীফা তাকে বললেন, 'আপনি কী চান এখন?' তিনি বললেন, 'এভাবে করুন, ওভাবে করুন।' হারুনুর রশীদ বললেন, 'ঠিক আছে, চাচাজান; ঠিক আছে।
ইমাম আওযা'ঈ র. বলেন, 'আমি একবার আবূ জা'ফরের দরবারে গিয়ে তাকে কিছু শক্ত কথা শোনালাম।' তিনি আমাকে বললেন, 'আফসোস! সর্বনাশ!'
আওযা'ঈ বলেন, 'আমি 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আলীর দরবারে গেলাম। জল্লাদরা তরবারি হাতে দণ্ডায়মান ছিলো। আমার বসার জন্য একটি চেয়ার দেওয়া হলো। খলীফ আমাকে বললেন, 'বনু উমাইয়ার রক্তের (অর্থাৎ তাদেরকে হত্যার) ব্যাপারে আপনার মতামত কী?' তখন আমি প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য বিষয়ে কথা বলতে লাগলাম। তিনি বললেন, 'ধুত্তোর, এগুলো বাদ দিন। তাদের রক্তের ব্যাপারে কী বলেন?' আমি বললাম, 'আপনার জন্য তাদের রক্তপাত করা হালাল হবে না।' তিনি বললেন, 'কী বলছেন এ-সব? কেন?' আওযা'ঈ বললেন, 'কারণ, রাসূল মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা-কে যখন পাঠিয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন-“যতক্ষণ না মানুষ কালিমার সাক্ষ্য দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে; যখন তারা কালিমা পাঠ করবে, তখন শর'ঈ কিসাস ছাড়া তাদের রক্ত ও সম্পদ স্পর্শ করা হারাম হয়ে যাবে। আর তাদের চূড়ান্ত হিসাব থাকবে আল্লাহর হাতে।”' এ-কথা শুনে খলীফা বললেন, 'আমরা কি এই খেলাফত আল্লাহর রাসূল ﷺ থেকে পাইনি? সিফফীনের ময়দানে এই অধিকারের জন্য কি 'আলী লড়াই করেননি?' আওযা'ঈ র. বললেন, 'যদি আপনাদের এই খিলাফত আল্লাহর রাসূল-এর পক্ষ থেকে হতো, তবে 'আলী কখনোই সিফফীনের যুদ্ধ শেষে দুই মিমাংসাকারীর সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন না।' খলীফা বললেন, 'চলে যান এখান থেকে।' ৮১ আওযা'ঈ বলেন, 'সে-দিন আমার মনে হয়েছিলো, ওখান থেকে লাশ হয়েই বের হতে হবে।'
জা'ফর খাযযায ৮২ বলেন, 'আমি একজন হাশেমী বংশের লোককে বললান, 'আপনার বংশ-মর্যাদা তাকওয়ার মুখাপেক্ষী, কিন্তু মুত্তাকী ব্যক্তি বংশ-মর্যাদার মুখাপে- ক্ষী নয়।' তিনি বললেন, 'আপনি সঠিক বলেছেন।'
খলীফা সুলাইমান ইবনু আবদিল মালিক মাদীনাতে এলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ইমাম ইবনু শিহাব যুহরী র.। মাদীনায় এসে তিনি আবূ হাযিম ৮৩ র.-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে খলীফা তাকে সম্বোধন করে বললেন, 'আবূ হাযিম, আমাদের এই (দ্বীনী দুরবস্থা ও সালেহীনদের আমাদের থেকে দূরত্ব অবলম্বনজনিত) সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী?' তিনি বললেন, 'খুব সহজ! হালালভাবে সম্পদ উপার্জন করুন। ন্যায়ানুগভাবে সেটা বণ্টন করুন।' তখন যুহরী বললেন, 'ইনি অনেক বছর যাবৎ আমার প্রতিবেশী। অথচ আমার জানাই ছিলো না, ইনি এত 'ইলম ও যুহদের অধিকারী।' তখন আবূ হাযিম বললেন, 'যদি আমি ধনী হতাম, তবে ঠিকই চিনতেন ও জানতেন!'
খলীফা সুলাইমান বললেন, 'আবূ হাযিম, উপদেশ দিন।' তিনি বললেন, 'আপনি আপনার প্রাসাদের দরজায়-থাকা মানুষগুলোকে দেখুন (অর্থাৎ কাদের আপনার কাছে রাখবেন)। যদি ভালো লোকদেরকে কাছে আনেন, তবে খারাপ লোকেরা এমনিতেই দূর হয়ে যাবে। আর যদি খারাপ লোকদেরকে কাছে আনেন, তবে ভালো লোকগুলি দূরে সরে যাবে।' অতঃপর খলীফা তাকে বললেন, 'আপনার প্রয়োজন পেশ করুন।' আবূ হাযিম বললেন, 'আমার প্রয়োজন আমি এমন এক সত্তার কাছে পেশ করেছি, যাঁর কাছে সমস্ত প্রয়োজন মন খুলে দ্বিধাহীন চিত্তে তুলে ধরা যায়। তিনি যা দেন, তা-ই আমি গ্রহণ করি। আর তিনি যা না-দেন, তাতেই আমি সন্তুষ্ট থাকি।'
সুলাইমান ইবনু আবদিল মালিক মাক্কা যাচ্ছিলেন। পথে মাদীনাতে যাত্রাবিরতি দিলেন। সঙ্গীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'মাদীনাতে এমন কেউ জীবিত আছেন কি, যিনি নবীজীর সাহাবীদেরকে দেখেছেন?' তাকে বলা হলো— 'আবূ হাযিম আছেন।' তখন খলীফা তাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি দরবারে উপস্থিত হলে খলীফা বললেন, 'আবূ হাযিম, কেন দূরে দূরে থাকেন?' আবূ হাযিম বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, কই দূরে দূরে থাকি?' খলীফা বললেন, 'মাদীনার গণ্যমান্য সবাই আমার সঙ্গে সাক্ষাতে এসেছে, কিন্তু আপনি আসেননি।' তিনি বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর দোহাই লাগে, এমন কিছু বলবেন না, যা হয়নি। আমি হলফ করে বলতে পারি, আপনি আমাকে ইতঃপূর্বে চিনতেন না। আমিও আপনাকে কোনো দিন দেখিনি।' তখন সুলাইমান ইমাম ইবনু শিহাব যুহরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'শাইখ ঠিক বলেছেন। আমি ভুল বলেছি।' কথার এক পর্যায়ে সুলাইমান বললেন, 'আবূ হাযিম, মৃত্যু আমাদের ভালো লাগে না কেন?' তিনি বললেন, 'কারণ, আপনারা আপনাদের আখিরাতকে বিরান করে ফেলেছেন আর দুনিয়াকে আবাদ করেছেন। আবাদ জায়গা থেকে বিরান জায়গায় যেতে কার ভালো লাগে!'
ইবনু আবী যি'ব (খলীফা) আবূ জা'ফরের দরবারে গেলেন। সেখানে মাদীনার গভর্নর (ইবনু আবী যি'বের ভাই) হাসান ইবনু যায়েদও উপস্থিত ছিলেন। খলীফা তাকে লক্ষ করে বললেন, 'আবুল হারিস, হাসানের ব্যাপারে আপনার মতামত কী?' তিনি বললেন, 'ঠিক করে, আবার ভুলও করে।' খলীফা বললেন, 'এ-কথা বাদ দিন। এমন ঠিক ও ভুল তো নবীগণও করেন। ইচ্ছা করে ভুল (অন্যায়) করে কি না?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, করেন।' কিছুক্ষণ পরে হাসান খলীফাকে লক্ষ করে বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আবুল হারিসকে যদি আপনার নিজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, তারও জবাব পাবেন।' আবূ জা'ফর তখন তাকে লক্ষ করে বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন সম্পর্কে আপনার মত কী?' ইবনু আবী যি'ব বলেন, 'আমাকে এমন প্রশ্ন থেকে অব্যাহতি দিন।' তিনি বললেন, 'না, বলুন।' ইবনু আবী যি'ব বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আমাকে এমন প্রশ্ন থেকে রেহাই দিন।' আবূ জা'ফর বললেন, 'না, আপনাকে বলতেই হবে।' অগত্যা ইবন আবী যি'ব বললেন, 'বললে না-বলে উপায় নেই যে, তিনিও যুলুম করেন!' এ-কথা শুনে খলীফা রেগে গেলেন। ইবন আবী যি'বের কাছে এসে বললেন, 'তুমি এগুলোর কী বুঝবে? ছোট ছোট ভুলগুলোই কেবল তোমাদের চোখে পড়ে। আর আমাদের পর্বতপ্রমাণ নেক ও কল্যাণকর জিনিসগুলো ভুলে যাও। এই যে মুসলিম-রাষ্ট্র, পথঘাট, মসজিদ-মাদরাসা-এগুলো কে করেছে?' ৮৪
মাইমূন বলেন, 'যখন আমরা দরজার কাছাকাছি পৌঁছুলাম কিংবা (বললেন) বেরিয়ে গেলাম, তখন ইবনু 'উমার বললেন, 'আল্লাহর শপথ, যদি তোমাদের আয়ের মাঝে কোনো পাপ না থাকে, ব্যয়ের মাঝে পুণ্য থাকে, তবে তোমরা অন্যান্য মানুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেলে।'
'আবদুর রহমান ইবনু যিয়াদ ইবনু আনউম ৮০ একদিন (খলীফা) আবূ জা'ফরের দরবারে গেলেন। খলীফা তাকে বললেন, 'ইবনু আনউম, আপনি কি এমন প্রভুর প্রশংসা করেন না, যিনি আপনাকে হিশাম ও হিশামের আত্মীয়-স্বজনের দরজা থেকে মুক্তি দিয়েছে? তাদের দরজায় যা দেখতেন, সেগুলো দেখা থেকে রেহাই দিয়েছে?' তখন তিনি জবাবে বললেন, 'হিশামের দরজায় যে-সব জিনিস দেখতাম, খুব কমই এমন আছে, যা এখনো দেখি না (অর্থাৎ সেগুলোই দেখছি)।' শুনে আবূ জা'ফর রাগে চুপ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি জানেন, আপনার কথাকে আমি মূল্যায়ন করি। তারপরেও আপনার প্রয়োজন আমাকে বলেন না কেন?' তিনি বললেন, 'বাদশা হলো বাজারের মতো। প্রত্যেক বাজারে সেই জিনিসই নেওয়া হয়, যেটা সেখানে চলে।' তার এ-কথা শুনে আবূ জা'ফর আরও ক্রুদ্ধ হলেন। বললেন, 'আপনি বোধহয় আর থাকতে চাচ্ছেন না?' তিনি বললেন, 'সম্পদ ও সম্মান তো আপনাদের মতো মানুষের সাথে থাকার ভেতরেই। কিন্তু আমি আমার একজন বৃদ্ধাকে রেখে এসেছি। তার কাছে ফিরে যেতে চাই।' খলীফা বললেন, “ঠিক আছে, যান। অনুমতি দিলাম।' তখন তিনি উঠে চলে এলেন।৮৫
সালিহ আল-মুররী ৮৬ একদিন খলীফা মাহদীর দরবারে গেলেন। খলীফাকে সম্বোধন করে বললেন, 'আমি আপনাকে কিছু কথা বলবো। আল্লাহর ওয়াস্তে শান্ত থেকে শুনবেন। কারণ, যে-ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নসীহতের তিক্ততা হজম করে, আল্লাহর বাণীর জন্য সে-ই সবচেয়ে উপযুক্ত। আর যিনি আল্লাহর রাসূলের বংশের মানুষ, তার জন্য সবার আগে উচিত রাসূলের চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া, তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে যতটা 'ইলম দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন, তারপর আপনার আর কোনো অজুহাত থাকতে পারে না; সুতরাং নিজের পক্ষে নিজে যতই যুক্তি দাঁড় করাবেন, সাফাই গাইবেন, আল্লাহর দলিলের সামনে সেটার কোনো মূল্য নেই। আপনি হককে যতটা এড়িয়ে চলবেন, বাতিলের পথে যতটা অগ্রসর হবেন, আপনার ওপর আল্লাহর আযাব ও গযব ততটাই বাড়বে।
মনে রাখবেন, মুসলিম উম্মাহর ওপর যারা স্বৈরাচার কায়েম করবে, স্বয়ং আল্লাহর রাসূল তার বিপক্ষে বাদী হবেন। আর আল্লাহর রাসূল সা. যার বিপক্ষে দাঁড়াবেন, আল্লাহও তার বিপক্ষে দাঁড়াবেন। সুতরাং হয় আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়িয়ে বলার মতো দলীল-প্রমাণ প্রস্তুত করুন, নয়তো ধ্বংসের জন্য প্রস্তুতি নিন।
প্রবৃত্তির প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা, কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তি সবার শেষে উঠে দাঁড়াবে, যার প্রবৃত্তি তাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলেছে। আর কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে দৃঢ়পদ থাকবে, যে আল্লাহর শরী'অত পালনে সবচেয়ে বেশি ইয়াকীন ও দৃঢ়তার অধিকারী। আপনার মতো মানুষ সরাসরি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার মতো দুঃসাহস দেখায় না। কিন্তু এমন মানুষের কাছে অনেক সময় মন্দটা ভালোর খোলসে প্রকাশ পায়। তখন এক শ্রেণির ধান্দাবাজ দরবারি আলিমরা তাকে সে-ব্যাপারে সমর্থন দেয়। আর এভাবেই দুনিয়া আপনার মতো মানুষকে শিকার করে। আমি আমার কথাগুলো আপনাকে বলে দিলাম। এবার আপনার দায়িত্ব সুন্দরভাবে সেগুলো গ্রহণ করা। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কোনো ক্ষমতা নেই।' বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন খলীফা ও তার চারপাশের সহচরবৃন্দ সকলেই কাঁদলেন।'৮৭
মুহাম্মাদ ইবনু তালহা ৮৮ খলীফা মাহদীর দরবারে এলেন। দরবারের মূল ফটকের বাইরে একটা জায়গায় অন্যান্য সবার সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগলেন। মুহাম্মাদ ইবনু তালহা তখন এলোমেলো পোশাকে ছিলেন। এ-সময় সামান্য বৃষ্টি হলো। তিনি খলীফাকে লক্ষ করে উচ্চৈঃস্বরে বলতে লাগলেন, 'এটা কি ইনসাফ যে, আপনি অন্দরমহলে থাকবেন আর আমরা বাইরে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকবো?' তখন মাহদী হাসলেন। খলীফার মন্ত্রী আবূ 'উবাইদুল্লাহ বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, এনাকে চেনেন না! ইনি মুহাম্মাদ ইবনু তালহা ইবনু মুসাররিফ।' শুনে মাহদী বললেন, 'আসুন চাচা, ভেতরে আসুন।' তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন। দরজা পার হয়েই একটা জায়গাতে বসে পড়লেন। খলীফা বলতে লাগলেন, 'আমার কাছে আসুন, চাচা। ওখানে বসতে বলিনি।' তিনি বললেন, 'আমার জন্য এই জায়গাই ঠিক আছে। মুখ বিক্রি করে সম্মান কেনার দরকার নেই আমার। খাবার-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ ছিলো।' মাহদী তাকে বললেন, 'আপনার কাছ থেকে যখন খাদ্যদ্রব্য নেওয়া হয়েছিলো, তখন সেটা সস্তা ছিলো; এখন তো দাম বেড়ে গেছে।' তিনি বললেন, 'দাম সস্তা-চড়া কোনো কথা নেই। আমার খাবারের মতো হলেই হবে।' এটা শুনে মাহদী হাসতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পরে তার পাওনা শোধ করা হলো। এরপর মাহদী তাকে বললেন, 'আপনি আপনার ভাইয়ের ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করতে পারেন?' তিনি বললেন, 'কোন ভাই?' খলীফা বললেন, 'সুফিয়ান ইবনু সা'ঈদ (সাওরী)।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'সে কী করবে?' খলীফা বললেন, 'আমরা তাকে ডেকে পাঠাতে চাই। তাকে উপদেষ্টা বানিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতে চাই। সে যা পরামর্শ দেবে, আমরা সেটা গ্রহণ করবো।' তালহা বললেন, 'তাতে তো সব দায়ভার আমার কাঁধে আসবে।' মাহদী বললেন, 'কীভাবে?' তিনি বললেন, 'সে যদি বলে, তারা যা জানতো, সেটাই তো 'আমাল করতো না। এখন তাদের কাছে এমন কী অজানা বিষয় এসে গেছে, যার জন্য আমাকে প্রয়োজন হয়েছে? তখন আপনি তাকে কী বলবেন?' শুনে খলীফা বললেন, 'তা হলে আপনিই আমাকে পরামর্শ দিন।' তিনি তখন খলীফাকে বলতে লাগলেন, 'এটা করুন, ওটা করুন। এভাবে করুন, ওভাবে করুন।' খলীফা বললেন, 'আর কিছু?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ! মসজিদে গিয়ে মানুষকে নামাযের উদ্দেশ্যে সমবেত করুন। সবাই এলে তখন আপনার হাত ধরে আমি মিম্বরে উঠবো। এরপর আপনি মানুষের অভিযোগ শুনবেন। পরের দিন আবার যাবেন। এভাবে চলতে থাকবে।' এ-কথা শোনার পরে মাহদী নীরব থাকলেন। তালহাও আর কোনো কথা বললেন না।
ইসহাক বলেন, 'অতঃপর তিনি বের হয়ে যাচ্ছিলেন, আমিও তার সঙ্গে বের হলাম; তার হাত আমার হাতের মধ্যে ছিলো। আমি বললাম, 'আবূ 'আবদুল্লাহ, এ আপনি কী বললেন? যদি তিনি এমন করেন, তবে পরিবার চালাবেন কীভাবে?' তিনি বললেন, 'পরিবার চালাবে কীভাবে-জিজ্ঞাসা করছো! কাপড় বেচে পরিবার চালাবে।'
বাগদাদের বিখ্যাত যাহিদ আবূ হাশিম আল-'আবিদ শরীক ইবনু 'আবদুল্লাহকে ৮৯ (মন্ত্রী) জা'ফর ইবনু ইয়াহয়া বারমাকীর কাছ থেকে বের হতে দেখলেন। তখন তিনি বলে উঠলেন, 'আল্লাহর কাছে এমন 'ইলম থেকে পানাহ চাই, যা কোনো কাজে আসে না!' ৯০
আবুল আহওয়াস মুহাম্মাদ ইবনু হাইয়্যান বলেন, 'আমি একদিন ইসহাক আল- -আযরাককে ৯১ দেখলাম জা'ফর ইবনু ইয়াহইয়া বারমাকীর (মন্ত্রী) মায়ের কয়েকজন ভৃত্যের কাছ থেকে বের হচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি আমার হাত ধরে বললেন, 'আল্লাহর ওয়াস্তে এ-ঘটনা গোপন রেখো। কারও কাছে প্রকাশ কোরো না।'
মাইমূন ইবনু মিহরান ৯২ বলেন, 'হায়, যদি আমার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যেতো! যদি আমি কোনো দিন (সরকারি কোনো) দায়িত্ব না নিতাম!' ৯৩ বর্ণনাকারী (হাবীব ইবনু আবী মারযূক) বলেন, 'আমি বললাম, 'উমারের (ইবনু 'আবদুল আযীয) জন্যও না?' তিনি বললেন, 'কারও জন্য না।'
ইরাকের আমীর ইবনু হুবাইরা নিজের সভাসদদের একটা তালিকা তৈরি করতে চাইলেন। সেখানে ইমাম কাসিম ইবনুল ওয়ালীদ হামদানীর নামও রাখতে চাইলেন; কিন্তু কাসিম এতে অস্বীকৃতি জানালেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো- 'সমস্যা কোথায়?' তিনি বললেন, 'আমি শুনেছি, কিয়ামতের দিন একজন ঘোষক উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা দেবেন-'যালিম ও যালিমদের সহযোগীরা দাঁড়িয়ে যাও।' আমার আশঙ্কা, তাদের সহযোগী না হয়ে যাই।'
আয়েজ ইবনু 'আমর ইমাম আইউব সিখতিয়ানী ৯৪ র.-কে ইমাম যুহরী ৯৫ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। আইউব বললেন, 'তিনি একজন আলিম; কিন্তু শাসকদের সঙ্গে মিশতেন।'
মুহাম্মাদ ইবনু মাসালামা ইয়ামামী বলতেন- 'শাসকদের দরজায়-বসা আলিমের তুলনায় পায়খানার ওপর বসা মাছিও সুন্দর।'
আমরা বিনতে আবদির রহমান ৯৬ তাঁর সন্তান আবূ রিজালকে বলতেন- বৎস, রাজদরবার থেকে দূরে থাকো। কারণ, সেখানে গেলে হয়তো সত্য ও ন্যায় বলা থেকে বিরত থাকবে, নয়তো যুলুমে সাহায্য করবে। তৃতীয় কোনো পথ নেই।'
এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসি' ৯৭ র.-এর কাছে এসে শাসকের নিকট তার জন্য সুপারিশের আবেদন করলো। তিনি বললেন, 'অসম্ভব! তাদের ধারে-কাছে ঘেঁষা আত্মঘাতী কাজ।'
'আলী ইবনু আবী হামালা বলেন, 'আমাকে (হিমসের গভর্নর) 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান তার সান্নিধ্যে ডাকেন। তখন আমি 'আবদুল্লাহ ইবনু আবী যাকারিয়্যার ৯৮ সঙ্গে এ-ব্যাপারে পরামর্শ করলাম। তিনি বললেন, 'তুমি তো স্বাধীন। নিজেকে গোলাম বানাতে চাও?'
'আলী ইবনু ফুযাইল ইবনু 'ইয়ায বলেন, 'একজন আলিম এক যুবরাজের দরবারে গিয়ে তাকে ওয়ায-নসীহত করলেন। সৎ কাজের আদেশ দিলেন। অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকতে বললেন। তখন যুবরাজের নির্দেশে তাকে এক জায়গাতে বন্দি করে রাখা হলো-কিন্তু বেশ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে। কয়েদখানাতে তার সেবা ও দেখভালের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হলো। তবে তার সঙ্গে বাইরের কারও দেখা করার সুযোগ উন্মুক্ত ছিলো না। কেবল যে-ব্যক্তি যুবরাজের প্রশংসা করতে সম্মত থাকতো, তাকেই দেখা করার অনুমতি দেওয়া হতো।
একদিন এক লোক তার সঙ্গে দেখা করতে এলো। কিন্তু যুবরাজের প্রশংসার বদলে বদনাম করতে লাগলো। আলিম সাহেব এটা পছন্দ করতে পারলেন না। প্রতিবাদে উল্টো যুবরাজের প্রশংসা করতে লাগলেন। যুবরাজকে জানানো হলো-'আপনি যেই আলিমকে বন্দি করে রেখেছেন, এখন তো তিনি আপনার প্রশংসা করেন। আপনার বিপক্ষে উত্থাপিত অভিযোগ খণ্ডন করেন। যুবরাজ এ-কথা শুনে সেই আলিমকে ডেকে পাঠালেন। আলিম সাহেব এলে তাকে লক্ষ করে বললেন, 'মিয়া, সামান্য আদরআত্তি পেয়েই নিজের দ্বীনদারি ছেড়ে দিলেন! কোন মুখে আমাকে আমার রাজত্ব, ধন-সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার ওয়ায করেন!'
'আলী ইবনু ফুযাইল বলেন, 'আমার ধারণা, উক্ত আলিমের চেয়ে যুবরাজ বেশি খোদাভীরু ও ধর্মপ্রাণ ছিলেন।'
ইমাম আহমাদ র. সূত্রে বর্ণিত—সালামা ইবনু নুবাইত ৯৯ বলেন, 'আমি আমার পিতাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি কেন রাজদরবারে যান না?' তিনি বললেন, 'আমার ভয় হয়, তাদের সঙ্গে এমন কিছুর সম্মুখীন হবো, যা আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে!'
ইমাম আলকামা ১০০ র.-কে বলা হলো—'আপনি শাসকের দরবারে কেন যান না? সেখানে গেলে তারা আপনার মর্যাদা জানতে পারবে আর তাদের কাছে মানুষের জন্য আপনার সুপারিশের সুযোগ তৈরি হবে।' আলকামা বললেন, 'আমার আশঙ্কা, তাতে তারা যতটা ছোট হবে, আমি তারচেয়ে বেশি ছোট হবো।'
মুয়াবিয়া একবার এক আমীরের কাছে চিঠি লিখলেন। চিঠিতে কুফার গণ্যমান্য কিছু মানুষকে তার কাছে পাঠাতে বললেন। আমীর সেই তালিকাতে ইমাম আলকামা র.-এর নামও যুক্ত করলেন। খবর পেয়ে আলকামা তার কাছে দূত মারফত বললেন, 'আমার নাম মুছে ফেলুন। আমার নাম মুছে ফেলুন।'
'ঈসা ইবনু ইউনুস বলেন, 'শু'বা ইবনুল হাজ্জাজ ১০১ আমাকে অনেক সম্মান করতেন। একবার তিনি আমাকে বলেন—'আবূ 'আমর, তাদের (শাসকদের) দরবারে যাবেন না। তাদের দরজার ছায়াও মাড়াবেন না।'
অতঃপর একবার আমি বাগদাদে এলাম। তখন আবূ বিসতামকে দেখলাম সকাল-সন্ধ্যা তাদের দরবারে যাচ্ছেন। আমি তাকে বললাম, 'আবূ বিসতাম, আপনি তাদের দরজায় যেতে নিষেধ করে এখন নিজে সকাল-সন্ধ্যায় সেখানে যাচ্ছেন কীভাবে?' তিনি আমাকে বললেন, 'আমার ভাই সেখানে একটা কাজে গেছেন।' আমি বললাম, 'এই যুক্তিতে আপনি যেতে পারেন না!' তিনি বললেন, 'আপনি এই কথা বলেন। সুফিয়ানও এই কথা বলেন। আমি আমার ভাইকে ছেড়ে দেবো!' এ-কথা বলে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। তখন আমি সেখান থেকে চলে গেলাম।'
টিকাঃ
৭০. আবু 'আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল-ফিরইয়াবী (১২০-২১২ হি.)। সুফিয়ান সাওরী র.-এর সানিধ্যে থেকে 'ইলম অর্জন করেন। ইমাম আহমাদসহ বড় বড় ইমামগণ তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি ইমাম বুখারীর প্রথম সারির শাইখ।
৭১. 'আবদুল্লাহ ইবনু মুহাইরীয জুমাহী মাক্কী (মৃ. ৯৯ হি.)। তিনি একজন তাবি'ঈ ছিলেন। 'উবাদা ইবনু সামিত, আবু সা'ঈদ খুদরী -সহ অনেক সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ছয় ইমামসহ বড় বড় ইমামগণ তার হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন।
৭২. মুহাম্মাদ ইবনু মুকাতিল 'আব্বাদানী। 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র.-এর শিষ্য। মূসা ইবনু হারুন, আবু 'ইয়ালা প্রমুখের উস্তায। ২৩৬ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
৭৩. সাহাবীপুত্র তাবি'ঈ। নবীজী -এর যুগে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তাকে দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হন। সাহাবীদের যুগে তিনি ওয়ায করতেন। ৭৩ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
৭৪. বসরার হাফিযে হাদীস ও ইমাম। তার ছাত্রদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন—ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, 'আবদুর রহমান ইবনু মাহদী, আহমাদ ইবনু হাম্বল র.।
৭৫. 'আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের যুগে মাদীনার কাযী। তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন। আবু দাউদ, ইবনু মাজাহসহ অনেক ইমাম তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
৭৬. ইমাম আহমাদের আয-যুহদ ২৯৬
৭৭. 'উমার ইবনুল খাত্তাব-এর বংশধর বিখ্যাত 'আলিম, যাহিদ ও 'আবিদ ইমাম। 'আবদুল্লাহ ইবন মুবারক, সুফিয়ান ইবন 'উয়াইনা প্রমুখের উসতায। তিনি কম হাদীস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও কঠোর ছিলেন। শাসকের বিরুদ্ধে মুখের জিহাদে অগ্রগামী ছিলেন। সত্য প্রকাশে কারও পরোয়া করতেন না।
৭৮. 'আবদুল্লাহ ইবনু দাউদ খুরাইবী। বিশর হাফীসহ অসংখ্য ইমামের উসতায। বুখারী তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
৭৯. জগদ্বিখ্যাত ইমাম, তাবি'ঈদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ ইবনু সীরীন র.। উসমান ইবনু আফফান -এর খিলাফতের যুগে মাদীনাতে জন্মগ্রহণ করেন। আনাস ইবনু মালিক, যায়িদ ইবনু সাবিত, আবু হুরাইরা -সহ অসংখ্য সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। 'ইলম ও হাদীসের ক্ষেত্রে যেমন তিনি প্রসিদ্ধ, তারচেয়েও বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেন 'ইবাদাত, খোদাভীতি, ইখলাস, দুনিয়া-ত্যাগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। স্বপ্নের তা'বীর করার ক্ষেত্রে তিনি তাওফীকপ্রাপ্ত ছিলেন। তবে স্বপ্নের তা'বীরের ওপর তার নামে প্রচলিত গ্রন্থটি তার নয়। শাসকদের কাছ থেকে তিনি সর্বাত্মক দূরত্ব অবলম্বন করতেন।
৮০. ইরাকের মুহাদ্দিস ইমাম ওয়াকী' ইবনুল জাররাহ। ইমাম মালিক, আ'মাশ, আওযা'ঈ, সুফিয়ান সাওরী প্রমুখের কাছে 'ইলম অর্জন করেছেন। তার প্রসিদ্ধ ছাত্রদের মাঝে রয়েছেন- 'আবদুল্লাহ ইবন মুবারক, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ প্রমুখ। শাসকের কাছ থেকে তিনি দূরে থাকতেন।
৮১. 'আলী রা. খিলাফতের প্রকৃত উত্তরাধিকারী আর বনু উমাইয়ারা ছিলো খিলাফতের জবরদখলকারী এমন বিশ্বাস খণ্ডন করতেই ইমাম এই যুক্তি দিয়েছেন। কারণ, তেমন হলে মুআবিয়া-এর সঙ্গে 'আলী এ-এর যুদ্ধে জড়াতে হতো না, মুআবিয়া-এর শাসনকে স্বীকৃতি দিতে হতো না; রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে হত্যা করে ফেলতে পারতেন।
৮২. মুহাদ্দিস। মুসনাদ ও মুওয়াত্তার বর্ণনাকারী।
৮৩. মাদীনার বড় 'আলিম ও ইমাম সালামা ইবনু দীনার র.। অনেক সাহাবী ও তাবি'ঈর কাছ থেকে 'ইলম অর্জন করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য—সাহল ইবনু সা'দ, সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব প্রমুখ। তিনি বড় মাপের যাহিদ, 'আবিদ ও ওয়ায়িয ছিলেন।
৮৪. এ-সব জনকল্যাণমূলক কাজের দ্বারা যুলুম বৈধতা পায় না। দুটো স্বতন্ত্র বিষয়। শাসনের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার শুরু থেকেই শাসকের জন্য দেশ ও মানুষের মৌলিক সেবা করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ফলে এটা তার দায়িত্ব, অনুগ্রহ নয়। অপরদিকে যুলুম থেকে দূরে থাকাও শাসকের দ্বীনী ও দুনিয়াবী দায়িত্ব, এটাও অনুগ্রহ নয়। দুনিয়া ও আখিরাতে এগুলোর প্রত্যেকটির আলাদা করে হিসাব দিতে হবে।
৮৫. আফ্রিকার প্রথম সারির ইমাম ও মুহাদ্দিস 'আবদুর রহমান ইবনু আন'উম আল-আফরিকী! তিনি কয়েকজন তাবি'ঈর কাছ থেকে 'ইলম অর্জন করেন। আবু কাফর খলীফা হওয়ার আগে তার সাথি ও বন্ধু ছিলেন। পরবর্তীতে আফ্রিকাতে তিনি কাযীর দায়িত্ব পালন করেন। একবার ইরাকে এসে আবু জা'ফরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে খলীফা তাকে বাগদাদে থেকে যেতে বলেন, কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানান। এটা খুব সম্ভব সেই সময়ের ঘটনা।
৮৬. বসরার প্রখ্যাত 'আবিদ, 'আলিম ও ওয়ায়িয। সাবিত, কাতাদাসহ অনেক তাবি'ঈ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে ইলমের চেয়ে তার বেশি মনোযোগ ছিলো 'ইবাদাত, যুহদ ও তাকওয়ার প্রতি। ১৭২ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। সুফিয়ান সাওরী র. তার প্রশংসা করেছেন।
৮৭. সুবহানাল্লাহ। মুসলিম জাহানের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যের কী বুলন্দ উচ্চারণ! হকের কী অনিন্দ্য মহিমা কীর্তন! এভাবেই 'আলিমগণ যখন শাসকদের দুনিয়া থেকে অমুাপেক্ষী হয়ে সত্যকে উচ্চারণ করেন, শাসকগোষ্ঠী কাঁদতে বাধ্য হয়। আর যখন 'আলিমরা শাসকের কৃপাদৃষ্টি লাভে দৌড়ঝাঁপ করেন, তখন শাসকের দৃষ্টি থেকেই পড়ে যান।
৮৮. ইবনু মুসাররিফ র.। কুফার বড় 'আলিম ও ইমাম। তার পিতা তালহা ইবন মুসাররিফ ছিলেন আরও বড় ইমাম। তিনি পিতার কাছেই 'ইলম অর্জন করেন। ১৬৭ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
৮৯. ইনি বিভিন্ন 'আব্বাসী খলীফাদের কাযী ও প্রশাসনের অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেছেন।
৯০. অর্থাৎ 'ইলম অর্জন করার পরেও শাসকের সঙ্গ ছাড়তে না-পারলে সেই 'ইলম যেন মূল্যহীন।
৯১. প্রসিদ্ধ 'আলিম। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র.-এর উসতায।
৯২. জাযীরাতুল 'আরবের প্রসিদ্ধ তাবি'ঈ। ইবনু 'আব্বাস, 'আয়িশা, আবু হুরাইরা -সহ অনেক সাহাবী ও তাবি'ঈ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদসহ অসংখ্য ইমাম তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।
৯৩. তিনি 'উমার ইবনু 'আবদুল 'আযীয র.-এর শাসনামলে তার অধীনে কিছু সময় কাজ করেছেন।
৯৪. প্রথম সারির তাবি'ঈ আইউব সাখতিয়ানী র. (৬৬-১৩১ হি.)। মুহাম্মদ ইবনু সীরীন, হিশাম ইবনু 'উরওয়া, শু'বার মতো বড় বড় ইমামগণ তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি অত্যন্ত 'আবিদ ও যাহিদ ছিলেন। তিনি দুনিয়া ও দুনিয়াদারকে অনেক অপছন্দ করতেন। উমাইয়া খলীফা ইয়াযীদ ইবনু ওয়ালীদ তার বন্ধু ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন খলীফা হলেন, আইউব দু'আ করলেন-'আল্লাহ, তার স্মৃতি আমাকে ভুলিয়ে দাও!'
৯৫. হাদীসের বিখ্যাত মনীষী ইমাম ইবনু শিহাব যুহরী (৫৮-১২৪ হি.)। বেশ কিছু সংখ্যক সাহাবী ও প্রথম সারির তাবি'ঈদের কাছ থেকে 'ইলম অর্জন করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য-আনাস ইবনু মালিক রা ও মাদীনার প্রসিদ্ধ ফকীহগণ। হাদীস বর্ণনার পাশাপাশি তিনি উমাইয়া খলীফাদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যান। এতে অনেক ইমাম তার দিকে সমালোচনার দৃষ্টিতে তাকান, যেমনটা উপরের ঘটনাতে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী যুগে অনেকে এটাকে ইমামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তিলকে তাল বানিয়ে ইমামকে 'দরবারি 'আলিম' হিসেবে অভিহিত করেছে। এগুলো পুরোটাই অপবাদ ও বাস্তবতাবিবর্জিত গালগল্প। খলীফাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিলো নিঃসন্দেহে, কিন্তু সেটা তাদের কল্যাণকামী হয়ে; তাদের অনুগত দরবারি 'আলিম' হয়ে নয়। ফলে অনেক রাজপুত্রকে তিনি দীক্ষা দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে খলীফাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
৯৬. আমরা বিনতে 'আবদির রহমান আনসারিয়্যাহ (২৯-১০৬ হি.)। মাদীনার একজন প্রসিদ্ধ নারী তাবি'ঈ ও মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি 'আয়িশা -এর কোলে লালিত-পালিত হন। তার কাছেই দ্বীন ও 'ইলম শেখেন। ইবনু শিহাব যুহরীসহ অনেক বড় বড় ইমামগণ তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন।
৯৭. ইমামে রব্বানী মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি'। একজন সম্মানিত তাবি'ঈ। আনাস ইবনু মালিক রা. থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তার শাগরেদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন-সুফিয়ান সাওরী, মা'মার ইবনু রাশিদ।
৯৮. শামের বিখ্যাত তাবি'ঈ ফকীহ ও মুহাদ্দিস 'আবদুল্লাহ ইবনু আবু যাকারিয়্যা (মৃ. ১১৭ হি.)। সালমান ফারসী, আবুদ দারদা, 'উবাদা ইবনু সামিত-সহ বিভিন্ন সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার শিষ্যদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন-ইমাম আওযা'ঈ, আবু দাউদ র.।
৯৯. সালামা ইবনু নুবাইত (মু. ১৫০ হি.) পিতা ইবনু নুবাইত, যাহহাক থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার কাছ থেকে ইবনু মুবারক, ওয়াকী' প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।
১০০. প্রথম সারির তাবি'ঈদের একজন। তিনি নবীজী -এর জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেন; কিন্তু নবীজীর সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করেননি। সাহাবী 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ -এর ঘনিষ্ঠ শাগরিদ হন। তার কাছে দ্বীনের গভীর জ্ঞান লাভ করেন। একপর্যায়ে এমন হয় যে, স্বয়ং সাহাবীগণ তাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। ৬১ হিজরীতে তিনি ওফাত লাভ করেন।
১০১. প্রসিদ্ধ তাবি'অ-তাবি'ঈন। বসরার ইমাম ও মুহাদ্দিস আবু বিসতাম শু'বা ইবনুল হাজ্জাজ (৮৫-১৬০ হি.)। কোনো বর্ণনামতে তিনি আনাস ইবন মালিকসহ কয়েকজন সাহাবী দেখেছেন। তিনি অত্যন্ত 'আবিদ, যাহিদ ও দয়াশীল ছিলেন।